বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মহেন্দ্র ভাবিতে লাগিল, “আমি
বলিয়াছি মিথ্যা কথা, আমি
বিনোদিনীকে ভালোবাসি না”।
অত্যন্ত কঠিন করিয়া বলিয়াছি।
আমি যে তাহাকে ভালোবাসি
তাহা না-ই হইল, কিন্তু ভালোবাসি
না, এ কথাটা বড়ো কঠোর। এ কথায়
আঘাত না পায় এমন স্ত্রীলোক কে
আছে। ইহার প্রতিবাদ করিবার
অবসর কবে কোথায় পাইব।
ভালোবাসি এ কথা ঠিক বলা যায়
না; কিন্তু ভালোবাসি না, এই
কথাটাকে একটু ফিকা করিয়া, নরম
করিয়া জানানো দরকার।
বিনোদিনীর মনে এমন-একটা নিষ্ঠুর
অথচ ভুল সংস্কার থাকিতে দেওয়া
অন্যায়।”
এই বলিয়া মহেন্দ্র তাহার বাক্সর
মধ্য হইতে আর-একবার তাহার চিঠি
তিনখানি পড়িল। মনে মনে কহিল,
“বিনোদিনী আমাকে যে
ভালোবাসে, ইহাতে সন্দেহ নাই।
কিন্তু কাল সে বিহারীর কাছে অমন
করিয়া আসিয়া পড়িল কেন। সে
কেবল আমাকে দেখাইয়া। আমি যখন
তাহাকে ভালোবাসি না স্পষ্ট
করিয়া বলিলাম, তখন সে কোনো
সুযোগে আমার কাছে তাহার
ভালোবাসা প্রত্যাখ্যান না
করিয়া কী করিবে। এমনি করিয়া
আমার কাছে অবমানিত হইয়া হয়তো
সে বিহারীকে ভালোবাসিতেও
পারে।”
মহেন্দ্রের ক্ষোভ এতই বাড়িয়া
উঠিতে লাগিল যে, নিজের
চাঞ্চল্যে সে নিজে আশ্চর্য এবং
ভীত হইয়া উঠিল। নাহয় বিনোদিনী
শুনিয়াছে, মহেন্দ্র তাহাকে
ভালোবাসে না–তাহাতে দোষ
কী। নাহয় এই কথায় অভিমানিনী
বিনোদিনী তাহার উপর হইতে মন
সরাইয়া লইতে চেষ্টা করিবে–
তাহাতেই বা ক্ষতি কী।ঝড়ের সময়
নৌকার শিকল যেমন নোঙরকে
টানিয়া ধরে, মহেন্দ্র তেমনি
ব্যাকুলতার সঙ্গে আশাকে যেন
অতিরিক্ত জোর করিয়া ধরিল।
রাত্রে মহেন্দ্র আশার মুখ বক্ষের
কাছে ধরিয়া জিজ্ঞাসা করিল,
“চুনি, তুমি আমাকে কতখানি
ভালোবাস ঠিক করিয়া বলো।”
আশা ভাবিল, “এ কেমন প্রশ্ন।
বিহারীকে লইয়া অত্যন্ত লজ্জাজনক
যে-কথাটা উঠিয়াছে, তাহাতেই কি
তাহার উপরে সংশয়ের ছায়া
পড়িয়াছে।” সে লজ্জায় মরিয়া
গিয়া কহিলল, “ছি ছি, আজ তুমি এমন
প্রশ্ন কেন করিলে। তোমার দুটি
পায়ে পড়ি, আমাকে খুলিয়া বলো–
আমার ভালোবাসায় তুমি কবে
কোথায় কী অভাব দেখিয়াছ।”
মহেন্দ্র আশাকে পীড়ন করিয়া
তাহার মাধুর্য বাহির করিবার জন্য
কহিল, “তবে তুমি কাশী যাইতে
চাহিতেছ কেন।”
আশা কহিল, “আমি কাশী যাইতে
চাই না, আমি কোথাও যাইব না।”
মহেন্দ্র। তখন তো চাহিয়াছিলে।
আশা অত্যন্ত পীড়িত হইয়া কহিল,
“তুমি তো জান, কেন
চাহিয়াছিলাম।”
মহেন্দ্র। আমাকে ছাড়িয়া তোমার
মাসির কাছে বোধ হয় বেশ সুখে
থাকিতে।
আশা কহিল, “কখনো না। আমি সুখের
জন্য যাইতে চাহি নাই।”
মহেন্দ্র কহিল, “আমি সত্য
বলিতেছি চুনি, তুমি আর-কাহাকেও
বিবাহ করিলে ঢের বেশি সুখী
হইতে পারিতে।”
শুনিয়া আশা চকিতের মধ্যে
মহেন্দ্রের বক্ষ হইতে সরিয়া গিয়া,
বালিশে মুখ ঢাকিয়া, কাঠের মতো
আড়ষ্ট হইয়া রহিল–মুহূর্তপরেই
তাহার কান্না আর চাপা রহিল না।
মহেন্দ্র তাহাকে সান্ত্বনা দিবার
জন্য বক্ষে তুলিয়া লইবার চেষ্টা
করিল, আশা বালিশ ছাড়িল না।
পতিব্রতার এই অভিমানে মহেন্দ্র
সুখে গর্বে ধিক্কারে ক্ষুদ্ধ হইতে
লাগিল।
যে-সব কথা ভিতরে-ভিতরে আভাসে
ছিল, সেইগুলা হঠাৎ স্পষ্ট কথায়
পরিস্ফুট হইয়া সকলেরই মনে একটা
গোলমাল বাধাইয়া দিল।
বিনোদিনী মনে মনে ভাবিতে
লাগিল–অমন স্পষ্ট অভিযোগের
বিরুদ্ধে বিহারী
কেন কোনো প্রতিবাদ করিল না।
যদি সে মিথ্যা প্রতিবাদও করিত,
তাহা হইলেও যেন বিনোদিনী একটু
খুশি হইত। বেশ হইয়াছে, মহেন্দ্র
বিহারীকে যে-আঘাত করিয়াছে,
তাহা তাহার প্রাপ্যই ছিল।
বিহারীর মতো অমন মহৎ লোক কেন
আশাকে ভালোবাসিবে। এই
আঘাতে বিহারীকে যে দূরে লইয়া
গেছে, সে যেন ভালোই হইয়াছে–
বিনোদিনী যেন নিশ্চিন্ত হইল।
কিন্তু বিহারীর সেই মৃত্যুবাণাহত
রক্তহীন পাংশু মুখ বিনোদিনীকে
সকল কর্মের মধ্যে যেন অনুসরণ
করিয়া ফিরিল। বিনোদিনীর
অন্তরে যে সেবাপরায়ণা
নারীপ্রকৃতি ছিল, সে সেই আর্ত মুখ
দেখিয়া কাঁদিতে লাগিল। রুগ্ণ
শিশুকে যেমন মাতা বুকের কাছে
দোলাইয়া বেড়ায়, তেমনি সেই
আতুর মূর্তিকে বিনোদিনী আপন
হৃদয়ের মধ্যে রাখিয়া দোলাইতে
লাগিল; তাহাকে সুস্থ করিয়া সেই
মুখে আবার রক্তের রেখা, প্রাণের
প্রবাহ, হাস্যের বিকাশ দেখিবার
জন্য বিনোদিনীর একটা অধীর
ঔৎসুক্য জন্মিল।
দুই-তিন দিন সকল কর্মের মধ্যে এইরূপ
উন্মনা হইয়া ফিরিয়া বিনোদিনী
আর থাকিতে পারিল না।
বিনোদিনী একখানি সান্ত্বনার
পত্র লিখিল, কহিল-
“ঠাকুরপো, আমি তোমার
সেদিনকার সেই শুষ্ক মুখ দেখিয়া
অবধি প্রাণমনে কামনা করিতেছি,
তুমি
সুস্থ হও, তুমি যেমন ছিলে তেমনিটি
হও–সেই সহজ হাসি আবার কবে
দেখিব, সেই উদার কথা আবার কবে
শুনিব। তুমি কেমন আছ, আমাকে
একটি ছত্র লিখিয়া জানাও।
তোমার বিনোদ-বোঠান।”
বিনোদিনী দরোয়ানের হাত দিয়া
বিহারীর ঠিকানায় চিঠি
পাঠাইয়া দিল।
আশাকে বিহারী ভালোবাসে, এ
কথা যে এমন রূঢ় করিয়া, এমন
গর্হিতভাবে মহেন্দ্র মুখে উচ্চারণ
করিতে পারিবে, তাহা বিহারী
স্বপ্নেও কল্পনা করে নাই। কারণ,
সে নিজেও এমন কথা স্পষ্ট করিয়া
কখনো মনে স্থান দেয় নাই।
প্রথমটা বজ্রাহত হইল–তার পরে
ক্রোধে ঘৃণায় ছটফট করিয়া বলিতে
লাগিল, “অন্যায়, অসংগত, অমূলক।”
কিন্তু কথাটা যখন একবার উচ্চারিত
হইয়াছে, তখন তাহাকে আর সম্পূর্ণ
মারিয়া ফেলা যায় না। তাহার
মধ্যে যেটুকু সত্যের বীজ ছিল, তাহা
দেখিতে দেখিতে অঙ্কুরিত হইয়া
উঠিতে লাগিল। কন্যা দেখিবার
উপলক্ষে সেই যে একদিন
সূর্যাস্তকালে বাগানের উচ্ছ্বসিত
পুষ্পগন্ধপ্রবাহে লজ্জিতা বালিকার
সুকুমার মুখখানিকে সে নিতান্তই
আপনার মনে করিয়া বিগলিত
অনুরাগের সহিত একবার চাহিয়া
দেখিয়াছিল, তাহাই বার বার মনে
পড়িতে লাগিল, এবং বুকের কাছে
কী যেন চাপিয়া ধরিতে লাগিল,
এবং একটা অত্যন্ত কঠিন বেদনা
কণ্ঠের কাছ পর্যন্ত আলোড়িত হইয়া
উঠিল। দীর্ঘরাত্রি ছাদের উপর
শুইয়া শুইয়া বাড়ির সম্মুখের পথে
দ্রুতপদে পায়চারি করিতে করিতে,
যাহা এতদিন অব্যক্ত ছিল তাহা
বিহারীর মনে ব্যক্ত হইয়া উঠিল।
যাহা সংযত ছিল তাহা উদ্দাম হইল;
নিজের কাছেও যাহার কোনো
প্রমাণ ছিল না, মহেন্দ্রের বাক্যে
তাহা বিরাট প্রাণ পাইয়া
বিহারীর অন্তর বাহির ব্যাপ্ত
করিয়া দিল।
তখন সে নিজেকে অপরাধী বলিয়া
বুঝিল। মনে মনে কহিল, “আমার তো
আর রাগ করা শোভা পায় না,
মহেন্দ্রের কাছে তো ক্ষমা
প্রার্থনা করিয়া বিদায় লইতে
হইবে। সেদিন এমনভাবে চলিয়া
আসিয়াছিলাম, যেন মহেন্দ্র দোষী,
আমি বিচারক–সে অন্যায় স্বীকার
করিয়া আসিব।”
বিহারী জানিত, আশা কাশী
চলিয়া গেছে। একদিন সে সন্ধ্যার
সময় ধীরে ধীরে মহেন্দ্রের দ্বারের
সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইল।
রাজলক্ষ্মীর দূরসম্পর্কের মামা
সাধুচরণকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা
করিল, “সাধ্দা, কদিন আসিতে
পারি নাই–এখানকার সব খবর
ভালো?” সাধুচরণ সকলের কুশল
জানাইল। বিহারী জিজ্ঞাসা
করিল, “বোঠান কাশীতে কবে
গেলেন।” সাধুচরণ কহিল, “তিনি যান
নাই। তাঁহার কাশী যাওয়া হইবে
না।” শুনিয়া, কিছু না মানিয়া
অন্তঃপুরে যাইবার জন্য বিহারীর
মন ছুটিল। পূর্বে যেমন সহজে যেমন
আনন্দে আত্মীয়ের মতো সে
পরিচিত সিঁড়ি বাহিয়া ভিতরে
যাইত, সকলের সঙ্গে স্নিগ্ধ
কৌতুকের সহিত হাস্যালাপ করিয়া
আসিত, কিছুই মনে হইত না, আজ
তাহা অবিহিত, তাহা দুর্লভ,
জানিয়াই তাহার চিত্ত যেন
উন্মত্ত হইল। আর-একটিবার, কেবল
শেষবার, তেমনি করিয়া ভিতরে
গিয়া ঘরের ছেলের মতো
রাজলক্ষ্মীর সহিত কথা সারিয়া,
একবার ঘোমটাবৃত আশাকে বোঠান
বলিয়া দুটো তুচ্ছ কথা কহিয়া আসা
তাহার কাছে পরম আকাঙ্ক্ষার
বিষয় হইয়া উঠিল। সাধুচরণ কহিল,
“ভাই, অন্ধকারে দাঁড়াইয়া রহিলে
যে, ভিতরে চলো।”
শুনিয়া বিহারী দ্রুতবেগে ভিতরের
দিকে কয়েক পদ অগ্রসর হইয়াই
ফিরিয়া সাধুকে কহিল, “যাই একটা
কাজ আছে।” বলিয়া তাড়াতাড়ি
প্রস্থান করিল। সেই রাত্রেই
বিহারী পশ্চিমে চলিয়া গেল।
দরোয়ান বিনোদিনীর চিঠি লইয়া
বিহারীকে না পাইয়া চিঠি
ফিরাইয়া লইয়া আসিল। মহেন্দ্র
তখন দেউড়ির সম্মুখে ছোটো
বাগানটিতে বেড়াইতেছিল।
জিজ্ঞাসা করিল, “এ কাহার
চিঠি।” দরোয়ান সমস্ত বলিল।
মহেন্দ্র চিঠিখানি নিজে লইল।
একবার সে ভাবিল, চিঠিখানা
লইয়া বিনোদিনীর হাতে দিবে–
অপরাধিনী বিনোদিনীর লজ্জিত
মুখ একবার সে দেখিয়া আসিবে–
কোনো কথা বলিবে না। এই চিঠির
মধ্যে বিনোদিনীর লজ্জার কারণ
যে আছেই, মহেন্দ্রের মনে তাহাতে
কোনো সন্দেহ ছিল না। মনে পড়িল,
পূর্বেও আর-একদিন বিহারীর নামে
এমনি একখানা চিঠি গিয়াছিল।
চিঠিতে কী লেখা আছে, এ কথা না
জানিয়া মহেন্দ্র কিছুতেই স্থির
থাকিতে পারিল না। সে মনকে
বুঝাইল–বিনোদিনী তাহার
অভিভাবকতায় আছে, বিনোদিনীর
ভালোমন্দের জন্য সে দায়ী। অতএব
এরূপ সন্দেহজনক পত্র খুলিয়া দেখাই
তাহার কর্তব্য। বিনোদিনীকে
বিপথে যাইতে দেওয়া কোনোমতেই
হইতে পারে না।
মহেন্দ্র ছোটো চিঠিখানা খুলিয়া
পড়িল। তাহা সরল ভাষায় লেখা,
সেইজন্য অকৃত্রিম উদ্বেগ তাহার
মধ্য হইতে পরিষ্কার প্রকাশ
পাইয়াছে। চিঠিখানা পুনঃপুন পাঠ
করিয়া এবং অনেক চিন্তা করিয়া
মহেন্দ্র ভাবিয়া উঠিতে পারিল
না, বিনোদিনীর মনের গতি কোন্
দিকে। তাহার কেবলই আশঙ্কা
হইতে লাগিল, “আমি যে তাহাকে
ভালোবাসি না বলিয়া অপমান
করিয়াছি, সেই অভিমানে
বিনোদিনী অন্য দিকে মন দিবার
চেষ্টা করিতেছে। রাগ করিয়া
আমার আশা সে একেবারেই
ছাড়িয়া দিয়াছে।”
এই কথা মনে করিয়া মহেন্দ্রের
ধৈর্যরক্ষা করা একেবারে অসম্ভব
হইয়া উঠিল। যে বিনোদিনী তাহার
নিকট আসিয়াছিল, সে যে
মুহূর্তকালের মূঢ়তায় সম্পূর্ণ তাহার
অধিকারচ্যুত হইয়া যাইবে, সেই
সম্ভাবনায় মহেন্দ্রকে স্থির
থাকিতে দিল না। মহেন্দ্র ভাবিল,
“বিনোদিনী আমাকে যদি মনে মনে
ভালোবাসে, তাহা বিনোদিনীর
পক্ষে মঙ্গলকর–এক জায়গায় সে বদ্ধ
হইয়া থাকিবে। আমি নিজের মন
জানি, আমি তো তাহার প্রতি
কখনোই অন্যায় করিব না। সে
আমাকে নিরাপদে ভালোবাসিতে
পারে। আমি আশাকে ভালোবাসি,
আমার দ্বারা তাহার কোনো ভয়
নাই। কিন্তু সে যদি অন্য কোনো
দিকে মন দেয় তবে তাহার কী
সর্বনাশ হইতে পারে কে জানে।
মহেন্দ্র স্থির করিল, নিজেকে ধরা
না দিয়া বিনোদিনীর মন কোনো
অবকাশে আর-একবার ফিরাইতেই
হইবে।
মহেন্দ্র অন্তঃপুরে প্রবেশ করিতেই
দেখিল, বিনোদিনী পথের মধ্যেই
যেন কাহার জন্য উৎকণ্ঠিত হইয়া
প্রতীক্ষা করিতেছে। অমনি
মহেন্দ্রের মনে চকিতের মধ্যে
বিদ্বেষ জ্বলিয়া উঠিল।
কহিল,”ওগো, মিথ্যা দাঁড়াইয়া
আছ, দেখা পাইবে না। এই তোমার
চিঠি ফিরিয়া আসিয়াছে।” বলিয়া
চিঠিখানা ফেলিয়া দিল।
বিনোদিনী কহিল,”খোলা যে?”
মহেন্দ্র তাহার জবাব না দিয়াই
চলিয়া গেল। বিহারী চিঠি খুলিয়া
পড়িয়া কোনো উত্তর না দিয়া
চিঠি ফেরত পাঠাইয়াছে মনে
করিয়া বিনোদিনীর সর্বাঙ্গের
সমস্ত শিরা দব্ দব্ করিতে লাগিল।
যে দরোয়ান চিঠি লইয়া গিয়াছিল,
তাহাকে ডাকিয়া পাঠাইল; সে
অন্য কাজে অনুপস্থিত ছিল,
তাহাকে পাওয়া গেল না। প্রদীপের
মুখ হইতে যেমন জ্বলন্ত তৈলবিন্দু
ক্ষরিয়া পড়ে, রুদ্ধ শয়নকক্ষের মধ্যে
বিনোদিনীর দীপ্ত নেত্র হইতে
তেমনি হৃদয়ের জ্বালা অশ্রুজলে
গলিয়া পড়িতে লাগিল। নিজের
চিঠিখানা ছিঁড়িয়া ছিঁড়িয়া
কুটিকুটি করিয়া কিছুতেই তাহার
সান্ত্বনা হইল না–সেই দুই-চারি
লাইন কালির দাগকে অতীত হইতে
বর্তমান হইতে একেবারেই মুছিয়া
ফেলিবার, একেবারেই “না” করিয়া
দিবার কোনো উপায় নাই কেন।
ক্রুদ্ধা মধুকরী যাহাকে সন্মুখে পায়
তাহাকেই দংশন করে,ক্ষুব্ধা
বিনোদিনী তেমনি তাহার চারি
দিকের সমস্ত সংসারটাকে
জ্বালাইবার জন্য প্রস্তুত হইল। সে
যাহা চায় তাহাতেই বাধা? কোনো
কিছুতেই কি সে কৃতকার্য হইতে
পারিবে না। সুখ যদি না পাইল, তবে
যাহারা তাহার সকল সুখের
অন্তরায়, যাহারা তাহাকে
কৃতার্থতা হইতে ভ্রষ্ট, সমস্ত
সম্ভবপর সম্পদ হইতে বঞ্চিত
করিয়াছে, তাহাদিগকে পরাস্ত
ধূলিলুন্ঠিত করিলেই তাহার ব্যর্থ
জীবনের কর্ম সমাধা হইবে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now