বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
অনতিকাল পরেই মহেন্দ্র তাহার
ছাত্রাবাসে চেনা হাতের অক্ষরে
একখানি চিঠি পাইল। দিনের বেলা
গোলমালের মধ্যে খুলিল না–বুকের
কাছে পকেটের মধ্যে পুরিয়া
রাখিল। কালেজে লেকচার শুনিতে
শুনিতে, হাসপাতাল ঘুরিতে ঘুরিতে,
হঠাৎ এক-একবার মনে হইতে লাগিল,
ভালোবাসার একটা পাখি তাহার
বুকের নীড়ে বাসা করিয়া ঘুমাইয়া
আছে। তাহাকে জাগাইয়া তুলিলেই
তাহার সমস্ত কোমল কূজন কানে
ধ্বনিত হইয়া উঠিবে।
সন্ধ্যায় এক সময় মহেন্দ্র নির্জন ঘরে
ল্যাম্পের আলোকে চৌকিতে বেশ
করিয়া হেলান দিয়া আরাম করিয়া
বসিল। পকেট হইতে তাহার
দেহতাপতপ্ত চিঠিখানি বাহির
করিয়া লইল। অনেকক্ষণ চিঠি না
খুলিয়া লেফাফার উপরকার
শিরোনামা নিরীক্ষণ করিয়া
দেখিতে লাগিল। মহেন্দ্র জানিত,
চিঠির মধ্যে বেশি কিছু কথা নাই।
আশা নিজের মনের ভাব ঠিকমতো
ব্যক্ত করিয়া লিখিতে পারিবে,
এমন সম্ভাবনা ছিল না। কেবল
তাহার কাঁচা অক্ষরে বাঁকা লাইনে
তাহার মনের কোমল কথাগুলি
কল্পনা করিয়া লইতে হইবে। আশার
কাঁচা হাতে বহুযত্নে লেখা নিজের
নামটি পড়িয়া মহেন্দ্র নিজের
নামের সঙ্গে যেন একটা রাগিনী
শুনিতে পাইল–তাহা সাধ্বী
নারীহেৃদয়ের অতি নিভৃত
বৈকুণ্ঠলোক হইতে একটি নির্মল
প্রেমের সংগীত।
এই দুই-একদিনের বিচ্ছেদে
মহেন্দ্রের মন হইতে দীর্ঘ-মিলনের
সমস্ত অবসাদ দূরহইয়া সরলা বধূর
নবপ্রেমে উদ্ভাসিত সুখস্মৃতি আবার
উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছে।
শেষাশেষি প্রাত্যহিক ঘরকন্নার
খুঁটিনাটি অসুবিধা তাহাকে
উত্ত্যক্ত করিতে আরম্ভ করিয়াছিল,
সে-সমস্ত অপসারিত হইয়া
কেবলমাত্র কর্মহীন কারণহীন একটি
বিশুদ্ধ প্রেমানন্দের আলোকে
আশার মানসীমূর্তি তাহার মনের
মধ্যে প্রাণ পাইয়া উঠিয়াছে।
মহেন্দ্র অতি ধীরে ধীরে লেফাফা
ছিঁড়িয়া চিঠিখানা বাহির করিয়া
নিজের ললাটে কপোলে বুলাইয়া
লইল। একদিন মহেন্দ্র যে-এসেন্স
আশাকে উপহার দিয়াছিল, সেই
এসেন্সের গন্ধ চিঠির কাগজ হইতে
উতলা দীর্ঘনিশ্বাসের মতো
মহেন্দ্রের হৃদয়ের মধ্যে প্রবেশ
করিল।
ভাঁজ খুলিয়া মহেন্দ্র চিঠি পড়িল।
কিন্তু এ কী। যেমন বাঁকাচোরা
লাইন, তেমন সাদাসিধা ভাষা নয়
তো। কাঁচা-কাঁচা অক্ষর, কিন্তু
কথাগুলি তো তাহার সঙ্গে মিলিল
না। লেখা আছে-
“প্রিয়তম, যাহাকে ভুলিবার জন্য
চলিয়া গেছ,এ লেখায় তাহাকে
স্মরণ করাইয়া দিব কেন। যে
লতাকে ছিঁড়িয়া মাটিতে ফেলিয়া
দিলে, সে আবার কোন্ লজ্জায়
জড়াইয়া উপরে উঠিতে চেষ্টা করে।
সে কেন মাটির সঙ্গে মাটি হইয়া
মিশিয়া গেল না!
“কিন্তু এটুকুতে তোমার কী ক্ষতি
হইবে, নাথ। নাহয় ক্ষণকালের জন্য
মনে পড়িলই বা। মনে তাহাতে
কতটুকুই বা বাজিবে। আর, তোমার
অবহেলা যে কাঁটার মতো আমার
পাঁজরের ভিতরে প্রবেশ করিয়া
রহিল। সকল দিন, সকল রাত, সকল
কাজ, সকল চিন্তার মধ্যে যে দিকে
ফিরি, সেই দিকেই যে আমাকে
বিঁধিতে লাগিল। তুমি যেমন করিয়া
ভুলিলে, আমাকে তেমনি করিয়া
ভুলিবার একটা উপায় বলিয়া দাও।
“নাথ, তুমি যে আমাকে
ভালোবাসিয়াছিলে, সে কি
আমারই অপরাধ। আমি কি স্বপ্নেও
এত সৌভাগ্য প্রত্যাশা
করিয়াছিলাম। আমি কোথা হইতে
আসিলাম, আমাকে কে জানিত।
আমাকে যদি না চাহিয়া দেখিতে,
আমাকে যদি তোমার ঘরে বিনা-
বেতনের দাসী হইয়া থাকিতে হইত,
আমি কি তোমাকে কোনো দোষ
দিতে পারিতাম। তুমি নিজেই
আমার কোন্ গুণে ভুলিলে প্রিয়তম,
কী দেখিয়া আমার এত আদর
বাড়াইলে। আর, আজ বিনা-মেঘে
যদি বজ্রপাতই হইল, তবে সে বজ্র
কেবল দগ্ধ করিল কেন। একেবারে
দেহমন কেন ছাই করিয়া দিল না।
“এই দুটো দিনে অনেক সহ্য করিলাম,
অনেক ভাবিলাম, কিন্তু, একটা কথা
বুঝিতে পারিলাম না-ঘরে
থাকিয়াও কি তুমি আমাকে
ফেলিতে পারিতে না। আমার জন্যও
কি তোমার ঘর ছাড়িয়া যাওয়ার
কোনো প্রয়োজন ছিল। আমি কি
তোমারএতখানি জুড়িয়া আছি।
আমাকে তোমার ঘরের কোণে,
তোমার দ্বারের বাহিরে ফেলিয়া
রাখিলেও কি আমি তোমার চোখে
পড়িতাম। তাই যদি হয়, তুমি কেন
গেলে, আমার কি কোথাও যাইবার
পথ ছিল না। ভাসিয়া আসিয়াছি,
ভাসিয়া যাইতাম।”
এ কী চিঠি। এ ভাষা কাহার, তাহা
মহেন্দ্রের বুঝিতে বাকি রহিল না।
অকস্মাৎ আহত মূর্ছিতের মতো
মহেন্দ্র সে-চিঠিখানি লইয়া
স্তম্ভিত হইয়া রহিল। যে-লাইনে
রেলগাড়ির মতো তাহার মন
পূর্ণবেগে ছুটিয়াছিল, সেই লাইনেই
বিপরীত দিক হইতে একটা ধাক্কা
খাইয়া লাইনের বাহিরে তাহার
মনটা যেন উল্টাপাল্টা স্তূপাকার
বিকল হইয়া পড়িয়া থাকিল।
অনেকক্ষণ চিন্তা করিয়া আবার সে
দুইবার তিনবার করিয়া পড়িল।
কিছুকাল যাহা সুদূর আভাসের মতো
ছিল, আজ তাহা যেন ফুটিয়া উঠিতে
লাগিল। তাহার জীবনাকাশের এক
কোণে যে ধূমকেতুটা ছায়ার মতো
দেখাইতেছিল, আজ তাহার উদ্যত
বিশাল পুচ্ছ অগ্নিরেখায় দীপ্যমান
হইয়া দেখা দিল।
এ চিঠি বিনোদিনীরই। সরলা আশা
নিজের মনে করিয়া তাহা
লিখিয়াছে। পূর্বে যে কথা সে
কখনো ভাবে নাই, বিনোদিনীর
রচনামত চিঠি লিখিতে গিয়া সেই-
সব কথা তাহার মনে জাগিয়া
উঠিতে লাগিল।নকল-করা কথা
বাহির হইতে বদ্ধমূল হইয়া তাহার
আন্তরিক হইয়া গেল; যে-নূতন
বেদনার সৃষ্টি হইল, এমন সুন্দর করিয়া
তাহা ব্যক্ত করিতে আশা কখনোই
পারিত না। সে ভাবিতে লাগিল,
“সখী আমার মনের কথা এমন ঠিকটি
বুঝিল কী করিয়া। কেমন করিয়া
এমন ঠিকটি প্রকাশ করিয়া বলিল।”
অন্তরঙ্গ সখীকে আশা আরো যেন
বেশি আগ্রহের সঙ্গে আশ্রয় করিয়া
ধরিল, কারণ, যে-ব্যথাটা তাহার
মনের মধ্যে, তাহার ভাষাটি তাহার
সখীর কাছে–সে এতই নিরুপায়।
মহেন্দ্র চৌকি ছাড়িয়া উঠিয়া ূি
কুঞ্চিত করিয়া বিনোদিনীর উপর
রাগ করিতে অনেক চেষ্টা করিল,
মাঝে থেকে রাগ হইল আশার উপর।
“দেখো দেখি, আশার এ কী মূঢ়তা,
স্বামীর প্রতি এ কী অত্যাচার।”
বলিয়া চৌকিতে বসিয়া পড়িয়া
প্রমাণস্বরূপ চিঠিখানা আবার
পড়িল। পড়িয়া ভিতরে ভিতরে
একটা হর্ষসঞ্চার হইতে লাগিল।
চিঠিখানাকে সে আশারই চিঠি
মনে করিয়া পড়িবার অনেক চেষ্টা
করিল। কিন্তু এ ভাষায় কেনোমতেই
সরলা আশাকে মনে করাইয়া দেয়
না। দু-চার লাইন পড়িবামাত্র একটা
সুখোন্মাদকর সন্দেহ ফেনিল মদের
মতো মনকে চারি দিকে ছাপাইয়া
উঠিতে থাকে। এই প্রচ্ছন্ন অথচ
ব্যক্ত, নিষিদ্ধ অথচ নিকটাগত,
বিষাক্ত অথচ মধুর, একই কালে উপহৃত
অথচ প্রত্যাহৃত প্রেমের আভাস
মহেন্দ্রকে মাতাল করিয়া তুলিল।
তাহার ইচ্ছা করিতে লাগিল,
নিজের হাতে-পায়ে কোথাও এক
জায়গায় ছুরি বসাইয়া বা আর কিছু
করিয়া নেশা ছুটাইয়া মনটাকে আর-
কোনো দিকে বিক্ষিপ্ত করিয়া
দেয়। টেবিলে সজোরে মুষ্টি
বসাইয়া চৌকি হইতে লাফাইয়া
উঠিয়া কহিল, “দূর করো, চিঠিখানা
পুড়াইয়া ফেলি।” বলিয়া
চিঠিখানি ল্যাম্পের কাছাকাছি
লইয়া গেল। পুড়াইল না, আর-একবার
পড়িয়া ফেলিল। পরদিন ভৃত্য টেবিল
হইতে কাগজপোড়া ছাই অনেক
ঝাড়িয়া ফেলিয়াছিল। কিন্তু
তাহা আশার চিঠির ছাই নহে,
চিঠির উত্তর দিবার অনেকগুলো
অসম্পূর্ণ চেষ্টাকে মহেন্দ্র পুড়াইয়া
ছাই করিয়াছে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now