বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

বসফরাসের আহ্বান চ্যাপ্টার- ৬ বাকি অংশ

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X বসফরাসের আহ্বান চ্যাপ্টার- ৬ বাকি অংশ হঠাৎ মাথার পেছনে একটা ভারি স্পর্শ অনুভব করল আহমদ মুসা। সেই সাথে একটা কর্কশ কণ্ঠ বলে উঠল, ‘তোমার হাতের রিভলভার ফেলে.....।’ লোকটির বাক্য শেষ হলো না। তার বদলে তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল একটা আর্তনাদ। লোকটির কথা শেষ হবার আগেই আহমদ মুসার মেশিন রিভলভারের কয়েকটি গুলি তার বুক এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছে। মাথার পেছনে ভারি কিছুর স্পর্শ এবং তার সাথে কর্কশ কণ্ঠ শ্রুত হবার সাথে সাথেই আহমদ মুসার আত্মরক্ষার চিন্তা মুহূর্তও দেরি না করে সিদ্ধান্ত দিয়ে দিয়েছিল। তখন আহমদ মুসার দেহ বোঁটা থেকে খসে পড়া ফলের মতোই টুপ করে দ্রুত নিচে নেমে গিয়েছিল এবং তার চেয়েও দ্রুত উপরে উঠে এসেছিল তার রিভলভার ধরা ডান হাত। আহমদ মুসার মাথা যখন লোকটির পেট পর্যন্ত নেমে এসেছিল, তখন আহমদ মুসার ডান হাত পৌঁছে গিয়েছিল তার মাথার উপরে। তর্জনী চেপেছিল আহমদ মুসা মেশিন রিভলভারের ট্রিগারে। গুলির বৃষ্টি ছুটছিল পেছনের লোকটির বুক লক্ষ্যে। লোকটির মনোযোগ কেন্দ্রীভূত ছিল তার কথার দিকে, তার রিভলভারের ট্রিগারে থাকা তর্জনীর দিকে নয়। যখন সে টের পেল তার রিভলভার থেকে টার্গেটের মাথা খসে গেছে, তখন কথা বন্ধ করে রিভলভারের নল রি-অ্যাডজাস্ট করার জন্যে যেটুকু সময় তার প্রয়োজন ছিল, সেটা সে পায়নি। তার আগেই গুলি বৃষ্টি আছড়ে পড়েছিল তার বুকে। এই অসতর্কতাই তার মুখ বন্ধ করে দিয়েছে। লোকটির লাশ পেছনে ছিটকে পড়ে গেছে। আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়ে আগের মতো পজিশন নিল সেই দরজার পাশেই। আর বেশি দেরি করতে হলো না। দ্রুত, নিঃশব্দ পায়ে শিকারী বেড়ালের মতো ছুটে এল স্টেনগানধারী তিনজন লোক। চারদিকে নজর রেখে তারা ছুটে এল লাশের দিকে। লাশের দিকে একবার তাকিয়েই তারা চোখ ভরা আতংক নিয়ে স্টেনগান বাগিয়ে কি যেন পরামর্শ করল তিনজনে। আহমদ মুসা ঘর থেকে বেরিয়ে এল প্রশস্ত করিডোরে। আহমদ মুসা ওদের মাথার উপর দিয়ে গুলি ছুঁড়ল। বলল, ‘তোমাদের অস্ত্র ফেলে দিয়ে হাত তুলে......।’ কথা শেষ না করেই আহমদ মুসা নিজের দেহকে বাম দিকে মেঝের উপর ছুঁড়ে দিল। এক ঝাঁক গুলি এসে সে যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখান দিয়ে ছুটে গেল। আহমদ মুসা দাঁড়িয়ে থাকলে তার বুক, মাথা ঝাঁঝরা হয়ে যেত। আহমদ মুসা বাঁ দিকে ঝাঁপ দিলেও তার তর্জনী রিভলভারের ট্রিগার থেকে সরেনি এবং তার দু’চোখও নিবদ্ধ ছিল ওদের ওপর। ঝাঁপ দেবার পরেই সে ট্রিগার টিপে ধরেছিল মেশিন রিভলভারের। আহমদ মুসা শূন্যে থাকতেই এক ঝাঁক গুলি ওদের দিকে ছুটে গিয়েছিল। আহমদ মুসার দেহ যখন মাটিতে পড়ল, তখন মেশিন রিভলভারের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া ওদের দেহও পড়ে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। মনে মনে প্রশংসা করল ওদের তিনজনের। মৃত্যুকে ওরা ভয় করেনি। প্রথম সুযোগেই ওরা শত্রুকে আঘাত হেনেছে। আহমদ মুসা ওদের মুভমেন্ট বুঝতে পেরে যদি যথাসময়ে ঝাঁপ না দিত, তাহলে ওদের আক্রমণ সফল হতো। আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়েই ছুটল সিনাগগের গেটের দিকে। সিনাগগের গেটের সামনে বিশাল একটা হল ঘর। এটাই প্রধান প্রার্থনা কক্ষ। প্রার্থনা কক্ষের পূর্ব প্রান্তে একটা প্রশস্ত করিডোর প্রধান গেট পর্যন্ত এগিয়ে গেছে। করিডোরের দু’পাশে কক্ষের সারি। আহমদ মুসা যখন হল পেরিয়ে করিডোর মুখের কাছাকাছি পৌঁছেছে, তখন দেখল তিনজন স্টেনগানধারী করিডোরে প্রবেশ করেছে। ওরা দেখতে পেয়েছে আহমদ মুসাকে, আহমদ মুসাও দেখেছে ওদের। ওদের করিডোরে দেখেই একটা পিলারের আড়ালে আশ্রয় নিল আহমদ মুসা। আহমদ মুসাকে দেখেই ওরা গুলি ছুঁড়তে শুরু করেছে। গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তেই ওরা এগিয়ে আসছে। আহমদ মুসা পিলারের পেছনে লুকিয়েছে, দেখেছে তা ওরা। ওরা গুলিবর্ষণ অব্যাহত রেখে এগিয়ে গেলো পিলার লক্ষ্যে। আহমদ মুসা যেন পাল্টা গুলিবর্ষণের সুযোগ না পায়, এটাই ওরা চাচ্ছে। সত্যিই আহমদ মুসা বেকায়দায়। গুলি এসে পিলারকে এমনভাবে ছেঁকে ধরেছে যে, উঁকি মারা কিংবা গুলি করার জন্যে রিভলভার ধরা হাত বাইরে নেয়ার কোন সুযোগ নেই। গুলিগুলো আসছে মাথা সমান উঁচু রেঞ্জ দিয়ে। তার উপরে গুলির লেভেল উঠছে না। ওরা করিডোর পার হয়ে সামনে এগোতে চাচ্ছে। আহমদ মুসা পিলারের ওপর দিকে তাকাল। দেখল, পিলারের প্রায় আট ফিটের মাথায় পিলারের ভেতর থেকে ইস্পাতের একটা বার এক ফিটের মতো বেরিয়ে এসেছে। ইস্পাত বারের প্রান্তটা উপর দিকে বাঁকানো। সম্ভবত ডেকোরেশন পিস অথবা ঝুলন্ত ফুলের বাস্কেট টাঙানোর জন্যেই সবগুলো বা কোন কোন পিলারে এ ধরনের ইস্পাত বার রাখা হয়েছে। আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া আদায় করল আহমদ মুসা। এটা তার জন্যে এক অমূল্য সাহায্য। আহমদ মুসা তার মেশিন রিভলভারের বাঁট কামড়ে ধরে দু’হাত উপরে তুলে ইস্পাত বারটি ধরার জন্যে বিসমিল্লাহ বলে লাফ দিল। হাতে পেয়ে গেল ইস্পাত বারটি। ইস্পাত বারটি দু’হাতে ধরার পর বাম হাতের উপর দেহের ভার ছেড়ে দিয়ে ডান হাত মুক্ত করে মুখে কামড়ে ধরে রাখা রিভলভারটি হাতে নিল। গুলি তখনও একই লেভেলে হচ্ছে। তার মানে, আহমদ মুসা লাফ দিয়ে উপরে উঠেছে এটা তারা টের পায়নি। খুশি হলো আহমদ মুসা। উঁকি মেরে দেখল, ওরা করিডোর থেকে হলে নেমে এসেছে। আহমদ মুসা সময় নষ্ট করল না। ওরা টের পেয়ে গেলে আবার সংকটে পড়বে সে। ওদের একজন আহমদ মুসার পিলারের উপর দিকে ইংগিত করে কি যেন বলে উঠল। সংগে সংগেই ওদের তিনজনের চোখ এদিকে নিবদ্ধ হলো, আর নড়ে উঠল ওদের স্টেনগান। সবকিছু বুঝে গেল আহমদ মুসা। প্রস্তুত ছিল সে। তার মেশিন রিভলভারও তৈরি। তার তর্জনী চেপে বসল রিভলভারের ট্রিগারে। লক্ষ্য একেবারে নাকের ডগায়। ওরাও দেখতে পেয়েছিল আহমদ মুসার রিভলভার। ওদের বিস্ফারিত চোখে মরিয়াভাব। উঠে আসছিল ওদের তিনটি স্টেনগান। কিন্তু স্টেনগানগুলো টার্গেট পয়েন্টে উঠে আসার আগেই ওরা আহমদ মুসার মেশিন রিভলভারের গুলি বৃষ্টির শিকার হয়ে গেল। পড়ে গেল হলের মেঝেতে তিনটি লাশ। আহমদ মুসা লাফ দিয়ে নামল পিলারের ইস্পাত বার থেকে। নেমেই করিডোরের দিকে ছুটে গিয়ে দেখল, সিনাগগের প্রধান দরজাটি বন্ধ। ওরা দরজা বন্ধ করে দিয়েই ঢুকেছিল। আহমদ মুসা পেছন ফিরে ছুটল লিফটের দিকে। লিফট দিয়ে নামল ‘গ্রাউন্ড টু’তে। ছুটল সেই খোঁয়াড়ের দিকে। খোঁয়াড়ের দেয়ালে ‘5’ আকৃতিতে সাজানো ফিংগার প্রিন্টের মতো পাঁচটি কালো দাগ তখনই পরীক্ষা করতে চেয়েছিল। আক্রান্ত হবার ফলে পারেনি। সেটাই এখন দেখতে চায় সে। আহমদ মুসা খোঁয়াড়ে ঢুকে সেই দেয়ালে ফিংগার প্রিন্টের মতো চিহ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড়াল। চিহ্নগুলোর উপর নজর পড়তেই আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার চোখ। পাঁচটি কালো চিহ্নের সবগুলোই সুস্পষ্ট ফিংগার প্রিন্ট। আহমদ মুসার কোন সন্দেহ নেই যে, ঐ ফিংগার প্রিন্ট নিহত পাঁচ গোয়েন্দার। তারা তাদের মৃত্যু নিশ্চিত জেনেই মৃত্যুর পূর্বে শত্রুকে চিহ্নিত করার জন্যে এই ফিংগার চিহ্ন রেখে গেছে একটা দর্শনীয় পদ্ধতিতে। আহমদ মুসা পকেট থেকে মোবাইল হাতে নিয়ে কল করল জেনারেল তাহির তারিককে। জেনারেল তাহির তারিক আহমদ মুসার কণ্ঠ শুনতে পেয়েই বলে উঠল, ‘কি খবর খালেদ খাকান! আপনি ভালো আছেন? এইমাত্র গোয়েন্দা সূত্র জানাল, সিনাগগে গোলাগুলি চলছে। ওখানে পুলিশ গেছে। আমিও আসছি। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রধান হাজী জেনারেল মোস্তফা কামালও যাচ্ছেন।’ উদ্বেগ জেনারেল তাহিরের কণ্ঠে। ‘পাঁচ গোয়েন্দা সম্ভবত নিহত হয়েছেন। তারা একটা গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন রেখে গেছেন। আসুন দেখবেন। গোটা সিনাগগ তদন্তও হওয়া প্রয়োজন। আপনারা এলেই আমি বেরুব। আমাকে একটু বেরুতে হবে জরুরি কাজে।’ বলল আহমদ মুসা। আহমদ মুসা থামতেই জেনারেল তাহির তারিক বলে উঠল, ‘কিন্তু সিনাগগের কি অবস্থা, কি ঘটেছে, তা তো বললেন না। এত গুলি-গোলা.....।’ তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই আহমদ মুসা বলল, ‘আমি এখানে আসছি, এ খবর এরা আগেই পেয়ে যায়। তার ফলে আমার গোপন অনুসন্ধান সম্ভব হয়নি। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। ওদের পনের জন মারা গেছে। এই মুহূর্তে সিনাগগে ওদের কোন লোক নেই।’ ‘আপনি ওখানে যাচ্ছেন, এ খবর ওরা আগেই পেয়ে যায়?’ বলল জেনারেল তাহির তারিক। ‘হ্যাঁ, পেয়ে যায়।’ বলল আহমদ মুসা। ‘আপনি তো সুস্থ আছেন?’ প্রশ্ন জেনারেল তারিকের। ‘আলহামদুলিল্লাহ্‌। ভালো আছি।’ আহমদ মুসা বলল। আহমদ মুসা সিনাগগ থেকে বেরিয়ে গেল তার গাড়ির কাছে। গাড়িটা সে পার্ক করে এসেছিল সিনাগগের বাইরে রাস্তার পাশে। আহমদ মুসা গাড়ির কাছে যেতেই রাস্তার ওপ্রান্তের দিক থেকে একটা গাড়ি এসে আহমদ মুসার কাছে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে বেরিয়ে এল মিস লতিফা আরবাকান। বলল আহমদ মুসাকে, ‘স্যার, ও গাড়ির কোথাও ওরা বোমা বা কোন বিস্ফোরক রেখে গেছে। ও গাড়িতে এখন উঠবেন না। চলুন ঐ গাড়িতে। ম্যাডাম আছেন।’ বোমা ও বিস্ফোরকের কথা শুনে চমকে উঠল আহমদ মুসা। কিন্তু তার চেয়েও বেশি চমকে উঠল ম্যাডাম মানে জোসেফাইন এখানে আসার সংবাদে। ‘আপনারা এখানে, এ সময়ে?’ দু’চোখ কপালে তুলে বলল আহমদ মুসা। উত্তরের অপেক্ষা না করেই আহমদ মুসা এগোলো গাড়ির দিকে। আহমদ মুসা গাড়ির কাছে পৌঁছতেই গাড়ির পেছন সিটের দরজার কাঁচ নেমে গেল। জানালা দিয়ে শোনা গেল জোসেফাইনের কণ্ঠ, ‘আসসালামু আলাইকুম, আসুন।’ গাড়ির দরজাও খুলে গেল সেই সাথে। আহমদ মুসা গাড়িতে উঠে বসতেই জোসেফাইন আবার বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ্‌, তিনি সুস্থ রেখেছেন তোমাকে।’ ‘আলহামদুলিল্লাহ্‌। তোমরা এখানে জোসেফাইন! আমার কাছে তো স্বপ্নের মতো লাগছে।’ বলল আহমদ মুসা। ‘আমিও ভাবিনি আসব, কিন্তু এসে গেছি। পরে কথা হবে, এবার চলি আমরা।’ বলে জোসেফাইন হাত দিয়ে ইশারা করে ডাকল তার পারসোনাল সেক্রেটারি মিস লতিফা আরবাকানকে। লতিফা আরবাকান এসে ড্রাইভিং সিটে উঠছিল। ‘আমিই ড্রাইভ করব। এই রাতে মিস লতিফার ড্রাইভ না করাই ভালো।’ বলে আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নামতে যাচ্ছিল। জোসেফাইন আহমদ মুসার হাত ধরে আটকে ফেলে বলল, ‘মিস লতিফা খুবই এক্সপার্ট ড্রাইভার। উইম্যান কার রেসিং-এ মিস লতিফা ইস্তাম্বুলের চ্যাম্পিয়ন। ওকে, গাড়ি ছাড়ুন মিস লতিফা।’ গাড়ি স্টার্ট নিয়ে চলতে শুরু করল। আহমদ মুসা আবারও বলল, ‘জোসেফাইন, তোমরা এই রাতে এই বিপদের মধ্যে এখানে এসেছ! আমি যে বিশ্বাস করতে পারছি না।’ ‘পরে সব বলব। তুমি নিশ্চিন্ত থাক। আমার কাছে তোমার দেয়া মেশিন রিভলভার আছে, জেফি জিনার কাছেও রিভলভার ছিল, লতিফা আরবাকানের কাছেও রিভলভার আছে। তুমি জান না, আমাদের মিস লতিফা আরবাকান বয়সে কম হলেও সেনাবাহিনী থেকে জেদ করে রিটায়ারমেন্ট নেয়া একজন ব্রিলিয়ান্ট সেনা অফিসার অর্থাৎ ক্যাপ্টেন। আর টুয়েন্টি ফাইভ এজ গ্রুপে মিস লতিফা সেনাবাহিনীতে পরপর তিনবার র‍্যানডম পিস্তল শুটিং-এ চ্যাম্পিয়ন ছিল। সে দক্ষতা তার আরও বেড়েছে।’ হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘মিস লতিফা আরবাকানকে ধন্যবাদ। আমি খুব খুশি যে, তুমি তাকে পিএস হিসেবে পেয়েছ। কিন্তু একটা বিষয় তুমি জান না জোসেফাইন, মিস লতিফা আরবাকান সেনাবাহিনী থেকে রিটায়ারমেন্ট নিলেও তুর্কি সেনাবাহিনীর স্বেচ্ছাসেবী মহিলা গোয়েন্দা ইউনিটের একজন বড় অফিসার এখন সে।’ বিস্ময় নামল জোসেফাইনের চোখে-মুখে, তার সাথে আনন্দও। আর মিস লতিফা আরবাকান চমকে উঠে মুহূর্তের জন্যে একবার পেছন ফিরে তাকিয়ে নিয়ে বলল, ‘ধন্যবাদ স্যার। কিন্তু আমি যতদূর জানি, এই বিষয়টাতো স্যার, আপনার জানার কথা নয়।’ ‘আমার জানার কথা নয়, এ কথা ঠিক। আমাকে কেউ জানায়নি। কিন্তু আপনাকে প্রথম দিন দেখেই জেনে ফেলেছি যে, আপনি তুর্কি সেনাবাহিনীর ‘ভি ডব্লিউ সি এস’ ইউনিটের (Voluntary Women Counter-spionage Unit) সদস্য।’ বলল আহমদ মুসা। ‘ধন্যবাদ স্যার। কিন্তু কিভাবে সেটা জানলেন?’ মিস লতিফা আরবাকানের চোখে-মুখে বিস্ময়। আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘আপনার বাঁ হাতের অনামিকায় একটা গোল্ড রিং আছে। যে গোল্ড রিং-এ ‘VWCS’ অক্ষরগুলো উৎকীর্ণ আছে। আমি জানি, ‘VWCS’-এর সকল সদস্যের বাঁ হাতের অনামিকায় এই রিং থাকে। এটা তাদের প্রাথমিক আইডেন্টিফিকেশন।’ মিস লতিফা আরবাকানের চোখে-মুখে নামল এবার অপার বিস্ময়। বলল, ‘এই ছোট বিষয়টাও আপনার নজর এড়ায়নি স্যার! আপনি অসাধারণ, অনন্য অসাধারণ স্যার আপনি।’ ‘আপনিও কম অসাধারণ নন মিস লতিফা। আমি খুব খুশি আপনাকে সাথী পেয়ে।’ বলেই জোসেফাইন প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলল, ‘সিনাগগে কি ঘটল, এটা কিন্তু আমাদের জানা হয়নি।’ ‘সেটা বলব, কিন্তু তার আগে বল, জেফি জিনা কে যার নাম তুমি বললে।’ আহমদ মুসা বলল। হাসি ফুটে উঠল জোসেফাইনের মুখে। বলল, ‘ও হো, তোমাকে তো বলা হয়নি। ওটা আমার সেই বান্ধবীর নাম, হযরত আবু আইয়ুব আনসারীর মাজারে যার সাথে আমার দেখা। তুমি এটা জান।’ ‘তাহলে ‘জেফি জিনা’ তার নাম। কিন্তু তিনি তোমার সাথে এই সময়ে এলেন কি করে? এবং তিনি এখন কোথায়?’ ‘সে অনেক কথা। এতক্ষণ ছিলেন। পুলিশ সিনাগগে ঢোকার পর উনি চলে গেছেন। হঠাৎ অসুস্থ বোধ করছিলেন।’ বলল জোসেফাইন। ‘ছাড়লে কেন? এত রাতে উনি কিভাবে গেলেন?’ আহমদ মুসা বলল। ‘অসুবিধা হবে না। উনি নিজের গাড়ি নিয়ে এসেছিলেন। তার সাথে তার পিএ মহিলাও রয়েছেন।’ বলল জোসেফাইন। ‘কিন্তু তিনি তোমার সাথে এলেন, তাকে এই রাতে পেলে কোথায়?’ আহমদ মুসা বলল। ‘সেটাই তো আসল কথা। তার কাছ থেকেই জানতে পারি, তুমি সিনাগগে যাচ্ছ এবং শত্রুরা তোমার যাওয়ার খবর আগাম পেয়ে গেছে। আমি....।’ জোসেফাইনের কথার মাঝখানে আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘তিনি তোমাকে জানান?’ আহমদ মুসার চোখ ভরা বিস্ময়। ‘হ্যাঁ, তিনি আমাকে জানান।’ ‘উনি কিভাবে জানলেন? ক’টায় তিনি জানান?’ ‘উনি রাত দশটা থেকে আমাকে টেলিফোন করছিলেন। আমার মোবাইল বন্ধ ছিল, আমি গিয়েছিলাম তোপকাপি প্রাসাদের এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। রাত এগারটা পর্যন্ত আমি ছিলাম সেখানে। উনি আমাকে টেলিফোনে না পেয়ে সোজা আমার বাসায় চলে এসে আমার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। আমি ফিরে এসে তার কাছ থেকে সবকিছু শুনি এবং সংগে সংগেই তোমাকে টেলিফোন করি।’ ‘এই খবর দেবার জন্যে তিনি ঐ রাতে তোমার ওখানে এসেছিলেন!’ বলল আহমদ মুসা। তার চোখে বিস্ময়। ‘খুব ভালো বন্ধু তিনি আমার। খবরটা তাকে খুবই উদ্বিগ্ন করেছিল। আমি তার সাথে যখন কথা বলেছি, তখন তাকে দারুণ উদ্বিগ্ন দেখেছি।’ জোসেফাইন বলল। আহমদ মুসার চোখে-মুখে তখনও দারুণ বিস্ময়। বলল, ‘কিন্তু তিনি এই গুরুতর খবরটা জানলেন কি করে?’ ‘এ বিষয়ে আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, সেদিন রাত নয়টায় ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার্স ক্লাবে গিয়েছিলেন তার একজন আমেরিকান অধ্যাপিকা বান্ধবীর সাথে দেখা করতে। বান্ধবীর কক্ষে যাবার সময় একটা কক্ষের পাশ দিয়ে তিনি যাচ্ছিলেন। রুমটার একটা দরজা খোলা ছিল। ভেতরে কেউ একজন টেলিফোনে কথা বলছিলেন। কথার মধ্যে তোমার নাম ‘খালেদ খাকান’ শুনে সে থমকে দাঁড়িয়ে যায়। ভেতরের লোকটি টেলিফোনে বলছিল, বুঝলাম। কিন্তু খালেদ খাকান লোকটা আল-আলা সিনাগগে আজ রাতে যাচ্ছে, এটা নিশ্চিত হওয়া গেল কি করে? তার কথা শেষ হওয়ার কিছু পর আবার কণ্ঠ শোনা যায়। তিনি বলেন, কখন যাচ্ছে, কতজন যাচ্ছে- এটা কি জানা গেছে? তার কথা শেষ হওয়ার পর আবার নীরবতা। কিছুপর তার কণ্ঠ শোনা যায় আবার, খবরের জন্যে ধন্যবাদ। দু’বার খালেদ খাকান আমাদের হাত থেকে বেঁচে গেছে, সেদিন খালেদ খাকান আমাদের একজন লোককে হত্যা করেছে, তার আজ শেষ দিন। সিনাগগ থেকে সে জীবন্ত বের হতে পারবে না। তার মৃত্যুদণ্ড আগেই ঘোষিত হয়েছে, আজ তা বাস্তবায়নের রাত। তার কথা বন্ধ হয়ে যায়। আর কোন কথা হয়নি। এই টেলিফোনের কথা শুনে সে সংগে সংগেই আমাকে টেলিফোন করে। বার বার আমাকে পাওয়ার চেষ্টা করে টেলিফোনে। না পেয়ে সে ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। বান্ধবীর সাথে কথা বলার প্রোগ্রাম বাতিল করে সে ছুটে আসে আমার বাসায়। প্রায় পৌনে দু’ঘন্টা অপেক্ষা করে আমাকে পায়। আমি এজন্যে দুঃখপ্রকাশ করেছিলাম। উত্তরে সে কি বলেছিল জান? বলেছিল, আরও দু’ঘন্টা অপেক্ষা করতে হলেও করতাম।’ থামল জোসেফাইন। ‘তোমার বান্ধবী আসলেই তোমার সত্যিকার একজন বান্ধবী। তাকে আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা দিও। আচ্ছা বল, তুমি তো আমাকে খবর জানালেই, আবার এলে কেন? তিনিই বা এলেন কেন?’ আহমদ মুসা বলল। ‘এখানেই জেফি জিনার ভূমিকা আছে। সে আমাকে বলে, এই খবর দেয়াই যথেষ্ট নয়, বিষয়টা পুলিশকে জানানো উচিত। তার কথার উত্তরে সত্য গোপন করে বললাম, তার কোন ব্যাপারে পুলিশকে জানানোর অনুমতি নেই। তখন সে বলে, এ রকম হতে পারে, তাহলে কিছু একটা করা দরকার। এত বড় খবর পাওয়ার পর ঘরে বসে থাকা সম্ভব কি করে? আমি বলি, আমারও মন এটাই বলছিল। কিন্তু আমরা কি করতে পারি? সে বলে, আমাদের একটা কাজই করার আছে, সেটা হলো সংকটের জায়গায় আমরা উপস্থিত হতে পারি। আমরা কোন সাহায্যে আসতে পারবো কিনা সেটা আল্লাহই বলতে পারেন। কিন্তু না গেলে আল্লাহ যে কিছু করবেন, তারও সুযোগ থাকে না। তার এ কথার পর আমরা সিনাগগে আসার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।’ থামল জোসেফাইন। ‘তোমার বান্ধবী তো আমার বিস্ময় বাড়িয়েই তুলছে। আশ্চর্য, এমন বান্ধবী এখনো দুনিয়াতে মিলে?’ বলে একটু থামল আহমদ মুসা। বলল আবার, ‘তোমার বান্ধবী জেফি জিনা কি ঐ অধ্যাপকের নাম বলেছিলেন?’ ‘আমি জিজ্ঞেস করিনি, তিনিও বলেছেন বলে মনে পড়ছে না।’ বলল জোসেফাইন। ‘নামটা জানতে হবে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘জানা যাবে। সকালেই জেনে নেব।’ বলল জোসেফাইন। ‘নামটা না জানালেও চলবে জোসেফাইন। রুমটার নাম্বার কিংবা আইডেন্টিফিকেশন পেলেও চলবে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ওটা তো পাওয়া যাবেই।’ বলল জোসেফাইন। গাড়ি তখন গোল্ডেন হর্নের দ্বিতীয় ব্রীজ অতিক্রম করছিল। বাইরে দৃষ্টি ছিল জোসেফাইনের। বলল, ‘রাতের গোল্ডেন হর্ন, মর্মর সাগর, বসফরাসের পটভূমিতে ইস্তাম্বুলকে অপরূপ লাগে। সত্যিই ইস্তাম্বুল ভূমধ্যসাগরের তীরে সবুজ জনপদের গলায় বিমুগ্ধকরী সৌন্দর্যের এক মুক্তা।’ আহমদ মুসাও দৃষ্টি ফিরিয়েছিল বাইরে। বলল, ‘আমার মনে কি হয় জানো জোসেফাইন? পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ কবির সর্বশ্রেষ্ঠ এক কবিতা হচ্ছে ইস্তাম্বুল।’ ‘ধন্যবাদ। আমিও কি কিছু বলতে পারি?’ বলল মিস লতিফা আরবাকান। ‘বলুন, মিস লতিফা।’ জোসেফাইন বলল। ‘ইস্তাম্বুলের মানুষগুলো সম্পর্কে কিছু বলুন।’ ‘বুঝেছি মিস লতিফা, আপনি কি বলতে চান। ইস্তাম্বুলের মতোই ইস্তাম্বুলের ইতিহাসও ইতিহাসের পাতায় বিশেষ করে, মুসলিম ইতিহাসের পাতায় প্রোজ্জ্বল এক মুক্তার মতো। সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ এবং সোলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টরা ইস্তাম্বুলের মুক্তার মতোই মানুষ। ওরা ইস্তাম্বুলের শুধু নয়, শুধু তুরস্কের নয়, গোটা ইসলামী দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সন্তান।’ ‘ধন্যবাদ স্যার। আমরা এসে গেছি।’ বলল মিস লতিফা আরবাকান। মর্মর সাগরের তীরে তোপকাপি প্রাসাদের দ্বিতীয় গেট দিয়ে প্রবেশ করল গাড়ি।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ বসফরাসের আহ্বান চ্যাপ্টার- ৩ বাকি অংশ
→ বসফরাসের আহ্বান চ্যাপ্টার- ৬ বাকি অংশ
→ বসফরাসের আহ্বান চ্যাপ্টার- ৫ বাকি অংশ
→ বসফরাসের আহ্বান চ্যাপ্টার- ২ বাকি অংশ
→ বসফরাসের আহ্বান চ্যাপ্টার- ১ বাকি অংশ

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now