বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
বসফরাসের আহ্বান
চ্যাপ্টার- ২
বাকি অংশ
ডঃ ওমর আবদুল্লাহ ইবনে আবু বাকর ও জেনারেল তাহির তারিক পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। পরে ডঃ ওমর আবদুল্লাহ বলল, ‘আপনার কাছে কোন কিছুই বলতে আমাদের আপত্তি নেই। আমাদের ইন্সটিটিউটে অনেক বিষয় নিয়ে গবেষণা চলছে। অনেক বিষয়ে আমরা সাফল্য পেয়েছি। সম্প্রতি সবচেয়ে বড় সাফল্য আমাদের অর্জিত হয়েছে। সেটা হচ্ছে, আমরা গণবিধ্বংসী অস্ত্রের হাত থেকে মানুষকে বাঁচানোর নিরাপদ প্রতিরক্ষা কৌশল আবিষ্কারে সাফল্য অর্জন করেছি। আমাদের বিজ্ঞানীরা ‘ম্যাগনেটিক কন্ট্রোল গাইডেড ইন্টিগ্রেটেড ফোটন-নেট (MCGI Foton-Net)’ আবিষ্কার করেছে। এটা কোন অস্ত্র নয়, কিন্তু উড়ে আসা সব রকম অস্ত্রকে এই ফোটন-নেট গিলে ফেলতে পারে এবং তা আকাশের নিরাপদ দূরত্বে বহন করে নিয়ে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।’
আহমদ মুসার মুখের চেহারা পাল্টে গেছে। আনন্দ-বিস্ময়ের ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছে তার চোখে-মুখে। সোজা হয়ে বসেছে সে সোফায়। ডঃ ওমর আবদুল্লাহর কথা শেষ হতেই আহমদ মুসা বলল, ‘এটা কি তত্ত্বগত আবিষ্কার না এর পরীক্ষাও হয়েছে?’
‘সব রকম টেস্ট শেষ হয়েছে। এখন আমাদের ‘সোর্ড’ শতভাগ অ্যাকিউরেট।’ বলল ডঃ ওমর আবদুল্লাহ।
‘‘সোর্ড’ কি? ওটা কি ‘ফোটন-নেট’ এর নাম?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘জ্বি, ‘সোর্ড’ ‘ম্যাগনেটিক কন্ট্রোল গাইডেড ইন্টিগ্রেটেড ফোটন-নেট (MCGI Foton-Net)’-এর ব্যবহারিক নাম। SOWRD (সোর্ড)-এর এলাবোরেশন হলোঃ Savior Of World Rational Domain (SOWRD)।’ বলল জেনারেল তাহির তারিক।
‘ব্যবহারিক নামটাতো চমৎকার! তবে আরও সুন্দর হতো যদি Rational-এর জায়গায় ‘Human’ যোগ করা যেত। অবশ্য ডাকনামটা ‘সোর্ড’ হতো না, কিংবা কোন ভালো শব্দও হতো না।’ আহমদ মুসা বলল।
ডঃ ওমর আবদুল্লাহ সংগে সংগেই বলে উঠল, ‘ধন্যবাদ জনাব আহমদ মুসা। আমাদের চিন্তা মিলে গেছে। আমরাও ‘Human’-এর কথাই চিন্তা করেছিলাম। তবে ব্যবহারিক নামের সংক্ষিপ্ত উচ্চারণে একটা তাৎপর্য আনার জন্যেই আমরা ‘Rational’ শব্দ এনেছি। তবে ‘Human’ ও ‘Rational’ ভিন্ন শব্দে হলেও একই অর্থ বুঝায়। ‘Human’ বা মানুষ হলো Rational। পশুর গুণ যেমন Animality বা পশুত্ব, তেমনি মানুষের গুণ Rationality বা মনুষ্যত্ব। Rational বলেই মানুষ প্রকৃতপক্ষে মানুষ। সুতরাং Rational Domain দ্বারা ‘Human Domain’ বুঝাচ্ছে।’
‘ধন্যবাদ, আপনাদের সিদ্ধান্ত ঠিক।’
একটু থামল আহমদ মুসা। সংগে সংগেই আবার বলে উঠল, ‘সোর্ড আবিষ্কারের বিষয় কোন পর্যায় পর্যন্ত জানাজানি হয়েছে?’
‘ওআইসি’র শীর্ষ দুই ব্যক্তি, ওআইসি নিরাপত্তা কমিটির আমরা তিনজন, তুর্কি প্রধানমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট পাঁচ জন বিজ্ঞানী ছাড়া আর কেউ জানে না এই আবিষ্কারের কথা।’ বলল জেনারেল তাহির তারিক।
‘প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকে ‘সোর্ড’ কি ব্যাপক ব্যবহারের উপযোগী হতে পারে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘আণবিক বোমার চেয়ে অনেক কম জটিল এবং খরচও তার চেয়ে অনেক কম। ব্যবহারের দিক থেকে অনেক কম ঝুঁকিপূর্ণ। ব্যাপক ব্যবহারের মতো এই প্রযুক্তিটি।’
কথা শেষ করে জেনারেল তাহির তারিক বলে উঠল, ‘জনাব আহমদ মুসা, আমরা বোধহয় আলোচনা থেকে অনেকটা দূরে সরে এসেছি।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আমাদের আলোচনা ঠিক পথেই চলছে জনাব। ভবিষ্যতে নতুন কিছু সামনে আসবে কিনা আমি জানি না, তবে এই মুহূর্তে আমি নিশ্চিত, ‘সোর্ড’-এর আবিষ্কার রোমেলী দুর্গে বিপদ ডেকে এনেছে।’ থামল আহমদ মুসা।
ডঃ ওমর আবদুল্লাহ ও জেনারেল তাহির তারিক দু’জনেই চমকে উঠে প্রায় একসাথে আহমদ মুসার দিকে তাকাল। বিস্মিত চার চোখের দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো আহমদ মুসার মুখে। তাদের বিস্ময়ভরা চোখে একটা বিহ্বলতাও ফুটে উঠেছে। হঠাৎ করেই তাদের মনে দানা বেঁধে উঠতে শুরু করেছে নতুন আতংকের একটা অস্থিরতা। মুখে তাদের কোন কথা যোগাল না।
আহমদ মুসাই আবার কথা বলে উঠল, ‘আমার মনে হয়, ‘সোর্ড’-এর তথ্য এমন কোন পক্ষের কাছে পৌঁছেছে, যারা এর ব্যাপারে সাংঘাতিক সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা ‘সোর্ড’-এর ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য জানতে চায় কিংবা সব তথ্য জেনে গেছে, এখন অন্য কিছু করতে চায়।’
‘অন্য কিছু বলতে তারা কি করতে চায় ভাবছেন?’ জিজ্ঞাসা জেনারেল তাহির তারিকের। তার কণ্ঠে উদ্বেগ।
চোখ বন্ধ করেছে আহমদ মুসা। ভাবছে সে। অন্যদিকে ডঃ ওমর আবদুল্লাহ ও জেনারেল তাহির তারিক অপার আগ্রহ ও আশংকা নিয়ে তাকিয়ে আছে আহমদ মুসার দিকে।
একসময় আহমদ মুসা চোখ খুলল। সোজা হয়ে বসল সে। বলল, ‘অনেক কিছুই করতে পারে। ‘সোর্ড’-এর প্ল্যান চুরি, ফাইল চুরি এবং সোর্ড-এর ল্যাবরেটরী প্রোটোটাইপ চুরি থেকে শুরু করে বিজ্ঞানীদের হত্যা, কিডন্যাপ ইত্যাদি সব ধরনের ঘটনাই ঘটতে পারে।’ থামল আহমদ মুসা।
ডঃ ওমর আবদুল্লাহ এবং জেনারেল তাহির তারিকের মুখ-চোখের আলো যেন দপ করে নিভে গেল। আতংকের মূর্তিমান অন্ধকার নামল তাদের চোখে-মুখে। কিছুক্ষণ তারা কথা বলতেই পারল না।
ওদের নীরবতা ভাঙলে ডঃ ওমর আবদুল্লাহ বলল, ‘ঘটনা এতদূর গড়িয়েছে, সর্বনাশ! যে কোনো মুহূর্তেই একটা কিছু ঘটে যেতে পারে। জনাব আহমদ মুসা, আপনি দয়া করে তাড়াতাড়ি চলুন ইস্তাম্বুলে। আপনি শুধু শুনেই ঘটনা ধরে ফেলেছেন। ইনশাআল্লাহ, ওখানে গেলে সংকটটাও আপনি দূর করতে পারবেন।’ উদ্বেগ-আতংকে কম্পিত কণ্ঠ ডঃ ওমর আবদুল্লাহর।
‘জনাব, এখন একদিন দেরি করতেও আমাদের ভয় হচ্ছে। জনাব ওমর আবদুল্লাহ আমাদের কথা বলেছেন। আপনি আমাদের অনুরোধ রাখুন।’ বলল জেনারেক তাহির তারিক। তার কণ্ঠেও উদ্বেগ।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘আপনারা এখন বাঁধা দিলেও আমি ইস্তাম্বুল যাব, বসফরাসে রোমেলী দুর্গে যাব।’
ডঃ ওমর আবদুল্লাহ ও জেনারেল তাহির তারিকের মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে উঠল দু’জনেই। তারা উঠে এসে জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে। বলল ওমর আবদুল্লাহ, ‘আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘ সুস্থ জীবন দান করুন। আল্লাহ জ্ঞান, বুদ্ধি, শক্তি আপনার বাড়িয়ে দিন।’ আবেগে ভারি শোনাল ডঃ ওমর আবদুল্লাহর কণ্ঠস্বর।
দু’জনেই ফিরে গিয়ে বসল তাদের আসনে।
আহমদ মুসাও বসল।
বসেই ডঃ ওমর আবদুল্লাহ পকেট থেকে দু’টি চিঠি বের করে আহমদ মুসার দিকে এগিয়ে দিল। বলল, ‘একটা ম্যাডাম জোসেফাইনের জন্যে। তাকে তুরস্কের ম্যাডাম প্রেসিডেন্ট তার পক্ষের স্টেট গেস্ট হিসেবে তুরস্ক সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। অন্য চিঠিতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট তার পক্ষে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে আপনাকে আমন্ত্রণ করেছেন। এ আমন্ত্রণ আপনারা গ্রহণ করলে তারা সম্মানিত বোধ করবেন।’
আহমদ মুসা চিঠি দু’টি গ্রহণ করে আবার তা ডঃ ওমর আবদুল্লাহর হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, ‘দুঃখিত, আমরা এ আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পারছি না।’
অন্ধকার নামল ডঃ ওমর আবদুল্লাহর মুখে। বলল, ‘কিন্তু এই তো বললেন, আপনি যাচ্ছেন।’
‘যাব, কিন্তু রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে যাব, এ কথা আমি বলিনি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘রাষ্ট্রীয় অতিথি করলে, তাতে আপনি আপত্তি করবেন কেন?’ বলল ডঃ ওমর আবদুল্লাহ।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আমরা ঢাক-ঢোল পিটিয়ে তুরস্কে যেতে চাই না। রাষ্ট্রীয় অতিথি হলে এটাই ঘটবে।’
‘বুঝেছি জনাব আহমদ মুসা। আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার সিদ্ধান্তই ঠিক।’ বলল ডঃ ওমর আবদুল্লাহ। তার মুখ এবার উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
‘তাহলে কিভাবে যাবেন, কখন যাবেন আমরা জানলে ব্যবস্থা নিতে পারি জনাব।’ বলল জেনারেল তাহির তারিক।
‘সেটাও আমার ওপর ছেড়ে দিন। আপনাদের কোন ব্যবস্থা করতে হবে না। এখন দয়া করে যদি সম্ভব হয়, তাহলে রোমেলী দুর্গের ভেতরের এবং দুর্গের ‘ওআইসি আইআরটি’র ভেতরের একটা করে মানচিত্র, পাঁচ বিজ্ঞানীর ছবি ও তাদের বিস্তারিত বায়োডাটা আজকেই আমাকে দিন।’ বলল আহমদ মুসা।
ওআইসি’র সেক্রেটারি জেনারেল তাকাল ওআইসি’র সিকিউরিটি প্রধান জেনারেল তাহির তারিকের দিকে।
জেনারেল তাহির তারিক সংগে সংগেই বলে উঠল, ‘আল্লাহর হাজার শোকর, আপনি কাজ শুরু করেছেন। আমি নিজেই এগুলো আপনাকে পৌঁছে দিয়ে যাব জনাব।’
জেনারেল তাহির তারিক থামতেই ডঃ ওমর আবদুল্লাহ বলে উঠল, ‘জনাব আহমদ মুসা, আপনাদের যাওয়ার ব্যাপারে তাহলে আমাদের কিছু করণীয় আছে কিনা?’
‘জনাব, আমি যখন যেটা প্রয়োজন বোধ করব, তখনই তা জানাব।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আলহামদুলিল্লাহ। ঠিক আছে। আমরা জেনারেল তারিককে আপনাকে সহযোগিতা করার জন্যে মনোনীত করেছি। তিনি জানালেই আমরা সব ব্যবস্থা করে দেব। তাছাড়া আমাদের তো বটেই, তুর্কি প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের দরজাও আপনার জন্যে চব্বিশ ঘণ্টা খোলা থাকবে।’
‘ধন্যবাদ জনাব।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ। আমরা এখন উঠতে চাই জনাব আহমদ মুসা। আমাদের জন্যে আপনার আর কোন কথা?’
ডঃ ওমর আবদুল্লাহ বলল।
আহমদ মুসা একটু ভেবে বলল, ‘আমি রোমেলী দুর্গে পৌঁছা পর্যন্ত বাইরের সকল লোকের আইআরটি সেন্টারে প্রবেশ বন্ধ থাকবে, বিজ্ঞানীরা আইআরটি সেন্টারের বাইরে বেরুতেঁ পারবেন না এবং আমি সেখানে যাচ্ছি কিংবা নতুন তদন্ত হচ্ছে, এমন কোন কথা সেন্টারের কাউকে জানানো যাবে না।’
‘আপনার পরামর্শ অক্ষরে অক্ষরে পালিত হবে জনাব।’ বলল জেনারেল তাহির তারিক।
বিদায় চেয়ে উঠে দাঁড়াল ডঃ ওমর আবদুল্লাহ। উঠে দাঁড়াল জেনারেল তাহির তারিকও।
তাদের সাথে আহমদ মুসাও উঠে দাঁড়াল।
বিদায়ী হ্যান্ডশেকের হাত বাড়িয়ে ডঃ ওমর আবদুল্লাহ বলল, ‘জনাব আহমদ মুসা, আপনি ওআইসি’র সবচেয়ে স্পর্শকাতর এবং সবচেয়ে বিপদগ্রস্ত একটা প্রজেক্টের প্রতি যে এহসান করলেন, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি এহসান আল্লাহ আপনার প্রতি, আপনার পরিবারবর্গের প্রতি করুন।’ আবেগে ভারি কণ্ঠ ডঃ ওমর আবদুল্লাহর।
‘আল্লাহ আমাদের সকলের সহায় হোন। আমার কোন এহসান নেই, আমি কোন এহসান করিনি। আল্লাহ আমাকে যে এহসান করেছেন, তারই কিছুটা আমি বণ্টন করি মাত্র তাঁর সন্তুষ্টি লাভের জন্যে।’ বলল আহমদ মুসা। আহমদ মুসার কণ্ঠও ভারি।
ফিরে দাঁড়িয়ে চলে যাবার জন্যে পা বাড়িয়েছিল ওরা দু’জন। আহমদ মুসা ডঃ ওমর আবদুল্লাহকে সম্বোধন করে বলল, ‘চিঠি তুর্কি প্রেসিডেন্টের দপ্তরে ফেরত যাওয়া দরকার, যাতে ঐ দপ্তর জানতে পারে যে, আমি আমন্ত্রণ গ্রহণ করিনি।’
ডঃ ওমর আবদুল্লাহ মুখ ফিরিয়ে বলল, ‘ধন্যবাদ জনাব আহমদ মুসা। তাই হবে। আমি সব বুঝতে পেরেছি।’
ডঃ ওমর আবদুল্লাহ থামতেই জেনারেল তাহির তারিক বলল, ‘যে আল্লাহ আপনাকে এই অসীম দূরদৃষ্টি দিয়েছেন, আমি প্রাণভরে তাঁর শুকরিয়া আদায় করছি। আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘ হায়াতে কামেলা দান করুন।’
‘আলহামদুলিল্লাহ।’ বলল আহমদ মুসা।
ওরা দু’জন আবার ঘুরে দাঁড়াল। চলতে শুরু করল দরজার দিকে।
ওদের পিছে পিছে হাঁটছে আহমদ মুসা। গাড়ি পর্যন্ত ওদের পৌঁছে দিল।
‘আমার কোন সন্দেহ নেই, তোমার এই ইস্তাম্বুল অ্যাসাইনমেন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি দেখতে পাচ্ছি, বসফরাসের এই আহবানের মধ্যে তোমার জন্যে এক কঠিন দায়িত্বের হাতছানি আছে। তুমি সাংঘাতিক ব্যস্ত থাকবে। আমি ও আহমদ আবদুল্লাহর উপস্থিতি কি তোমাকে অসুবিধায় ফেলবে না?’ বলল ডোনা জোসেফাইন।
আহমদ মুসা ও জোসেফাইন সোফায় পাশাপাশি বসেছিল।
আহমদ মুসা জোসেফাইনের একটা হাত হাতে তুলে নিয়ে বলল, ‘তোমার উপস্থিতি এক শূন্যতা থেকে আমাকে বাঁচাবে। আমার প্রেরণা, আমার শক্তি বাড়বে জোসেফাইন।’
জোসেফাইন আহমদ মুসার হাতটা দু’হাতে ধরে তুলে নিয়ে, তাতে মুখ গুঁজে বলল, ‘আমি জানি। কিন্তু ভাবছি আহমদ আবদুল্লাহর কথা। ভিন্ন আবহাওয়া ও অপরিচিত পরিবেশে সে কেমন থাকবে?’
‘ভালো থাকবে ইনশাআল্লাহ। বসফরাসের পশ্চিম তীরে, ইস্তাম্বুলের ইউরোপীয় অংশে, গোল্ডেন হর্নের পূর্বকূলে যেখানে বসফরাস, গোল্ডেন হর্ন ও মর্মর সাগর একসাথে আছড়ে পড়েছে, এমন জায়গায় তুর্কি সরকারের ভিভিআইপি রাষ্ট্রীয় অতিথিদের একটা রিসোর্ট এলাকা আছে। সেখানে সবচেয়ে সুন্দর একটা কটেজ তুমি পাচ্ছ। দেখবে, খুব ভালো থাকবে আহমদ আবদুল্লাহ।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তুমি যে বর্ণনা দিলে, তাতেই বুকটা আমার তোলপাড় করে উঠেছে। বুঝতে পারছি কেমন লাগবে জায়গাটা। ধন্যবাদ তোমাকে। কিন্তু তুমি তো বললে রাষ্ট্রীয় আতিথ্য তুমি প্রত্যাখ্যান করেছো, তাহলে রাষ্ট্রীয় অতিথিদের রিসোর্ট কি করে আবার এল?’ বলল জোসেফাইন।
‘আমার ও তোমার নামে আসা রাষ্ট্রীয় আতিথ্যের চিঠি প্রত্যাখ্যান করেছি, রাষ্ট্রীয় আতিথ্য প্রত্যাখ্যান করিনি। ভিন্ন নামে ফরাসি রয়্যাল সদস্যের ভিন্ন এক পরিচয়ে তুমি রাষ্ট্রীয় অতিথি হয়েছ। আর আমি যাচ্ছি ট্যুরিস্ট হিসেবে। আমি হবো অলিখিত রাষ্ট্রীয় অতিথি। আমরা যাব একই প্লেনে, কিন্তু ডিপারচার লাউঞ্জ থেকে তুমি বেরুবে ভিভিআইপি গেট দিয়ে, আর আমি বেরুবো সাধারণ বিজনেস ক্লাসের গেট দিয়ে।’ আহমদ মুসা বলল।
জোসেফাইন সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘তারপর?’
‘তারপর তুরস্কের ম্যাডাম প্রেসিডেন্টের পার্সোনাল সেক্রেটারি মিস লতিফা আরবাকান তোমাকে রাষ্ট্রীয় কায়দায় রিসিভ করে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে নিয়ে যাবে। সেখানে তুমি ম্যাডাম প্রেসিডেন্টের সাথে ডিনার করবে, বিশ্রাম নেবে। পরে তোমাকে নিয়ে যাওয়া হবে ‘গোল্ড রিসোর্ট’-এ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তুমি তখন সেখানে থাকবে না?’ বলল জোসেফাইন শুকনো কণ্ঠে।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আমি তখন অনেকখানি দূরে ইস্তাম্বুলের পূর্বাংশে রোমেলী দুর্গে অথবা দুর্গসংলগ্ন কোন এক বাড়িতে বা ফ্ল্যাটে থাকব।’
জোসেফাইনের মুখে অন্ধকার নেমে এল। সে আস্তে আস্তে নিজের মাথা আহমদ মুসার কাঁধে ন্যস্ত করল। বলল, ‘বুঝতে পেরেছি। কিন্তু তুমি আছ, অথচ নেই, এটা আমি সহ্য করব কি করে? সবই যে শূন্য হয়ে যাবে?’
আহমদ মুসা জোসেফাইনকে কাছে টেনে নিয়ে বলল, ‘এ অসুবিধাটুকু তোমাকে মানিয়ে নিতে হবে। তুমি তো সেখানে একা হয়ে যাচ্ছ না। এখান থেকে আয়া ও পরিচারিকা দু’জনকে নিচ্ছ। তোমার সাথে সর্বক্ষণ ম্যাডাম প্রেসিডেন্টের পিএস মিস লতিফা আরবাকান থাকবেন। ইংরেজি, ফরাসি ও আরবিতে ভীষণ ফ্লুয়েন্ট চৌকস মেয়েটিকে দেখবে তোমার খুবই ভালো লাগবে। নিরাপত্তার বিষয়টা ঠিক রেখে আমি যতটা পারি সেখানে যাবার চেষ্টা করব।’
‘ধন্যবাদ তোমাকে।’ বলে কোল থেকে উঠে বসল জোসেফাইন। একটা হাত দিয়ে আহমদ মুসার গলা পেঁচিয়ে সোফায় গা এলিয়ে বলল, ‘আমরা কবে যাচ্ছি?’
আহমদ মুসা উত্তর দেবার জন্যে মুখ খুলেছিল। সেই সময়েই টেলিফোন বেজে উঠল। থেমে গেল আহমদ মুসা।
জোসেফাইন দ্রুত উঠে গিয়ে টেলিফোন ধরল। আহমদ মুসার টেলিফোন।
কর্ডলেস রিসিভারটি এনে আহমদ মুসার হাতে দিল জোসেফাইন। ফিস ফিস করে বলল, ‘জনাব ওমর আবদুল্লাহর টেলিফোন।’
আহমদ মুসা টেলিফোন তুলে সালাম দিতেই ওপার থেকে সালাম গ্রহণ করে বলে উঠল ওআইসি’র সেক্রেটারি জেনারেল ওমর আবদুল্লাহ ইবনে আবু বাকর, ‘দুঃসংবাদ আহমদ মুসা, রোমেলী দুর্গের আমাদের রিসার্চ ইঞ্জিনিয়ার ইন্তেকাল করেছে।’
‘ইন্তেকাল?’ প্রশ্ন আহমদ মুসার।
‘ডাক্তাররা তাই বলেছেন। হার্ট ফেইলিওর।’ বলল ওমর আবদুল্লাহ ওপার থেকে।
‘বয়স কত হবে?’
‘চল্লিশ।’
‘কি দায়িত্ব ছিল তার?’
‘সে একজন লাইট মেটাল ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার। কনসেপ্ট অনুসারে যারা সোর্ড-এর বডি ডিজাইন ও নির্মাণ করেছে, তাদের একজন সে।’ বলল ডঃ ওমর আবদুল্লাহ।
‘সোর্ড সম্পর্কে সে কি জানত?’
‘জানত না। কনসেপ্ট-এর দিক দিয়ে সে এতটুকু জানত যে, কণাবিজ্ঞানের অত্যন্ত তীব্র গতির কোন কণা পরীক্ষণের যন্ত্র তারা তৈরি করছে। যন্ত্রের তিনটা অংশ। প্রত্যেকটা অংশকে সে একটা যন্ত্র হিসেবে জানত। কিন্তু তিনটা মিলে যে একটা যন্ত্র সেটা জানত না। যন্ত্রের তিন অংশের একীকরণের কাজ বিজ্ঞানীরা নিজে করেছেন।’
‘আলহামদুলিল্লাহ।’ স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল আহমদ মুসা।
‘জনাব আহমদ মুসা, তার সম্পর্কে এতকিছু জিজ্ঞেস করছেন কেন? আপনি কিছু সন্দেহ করছেন?’ বলল ডঃ ওমর আবদুল্লাহ।
‘সন্দেহ করাই উচিত। তবে আরও বিস্তারিত জানার পর নিশ্চিত বলা যাবে।’
‘ভয়ংকর কথা বলেছেন আহমদ মুসা। সন্দেহ সত্য হলে তো.....।’ কথা শেষ করতে পারলো না ডঃ ওমর আবদুল্লাহ। শুকনো গলায় তার কথা যেন আটকে গেল।
‘জনাব, আপনি জেনারেল তাহির তারিককে বলুন, আজই আমি ইস্তাম্বুল যাব। ব্যবস্থা যেন করেন।’ বলল আহমদ মুসা শান্ত শক্ত কণ্ঠে।
‘ধন্যবাদ জনাব আহমদ মুসা। আপনার কাছে আমরা এটাই চাচ্ছি। অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। ধরে নিন সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। আপনারা প্রস্তুত হোন।’ বলল ডঃ ওমর আবদুল্লাহ।
‘ধন্যবাদ জনাব।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তাহলে সব ঠিক হয়ে গেল। এখনকার মতো এতটুকুই।’
সালাম দিয়ে টেলিফোন রেখে দিল ডঃ ওমর আবদুল্লাহ।
আহমদ মুসাও টেলিফোন রেখে দিল।
পাশে দাঁড়িয়েছিল জোসেফাইন।
আহমদ মুসা তাকাল জোসেফাইনের দিকে। আহমদ মুসার চোখে একটু বিব্রত দৃষ্টি। জোসেফাইনের সাথে পরামর্শ ছাড়াই ইস্তাম্বুল যাত্রার তারিখ আজ স্থির করে ফেলেছে। সব গুছিয়ে নেয়া কঠিন হবে।
আহমদ মুসার চোখের ভাষা, মুখের ভাব, মনের কথা জোসেফাইনের চেয়ে বেশি কে আর বুঝতে পারবে!
জোসেফাইন ধীরে ধীরে আহমদ মুসার আরও কাছে এগিয়ে এসে কাঁধে একটা হাত রেখে বলল, ‘ভেব না তুমি, দেখবে আমি সব ঠিক করে নেব। মূল গোছ-গোছটা করাই আছে। তুমি ঠিকই সিদ্ধান্ত নিয়েছ।’
জোসেফাইন আরও ক্লোজ হলো আহমদ মুসার। কাঁধে রাখা হাতটা দিয়ে গলা পেঁচিয়ে ধরে বলল, ‘ইন্তেকাল করেছেন যিনি, তিনি কি নিহত হয়েছেন বলে তুমি সত্যিই মনে কর?’
‘এখনও এটাই আমার বিশ্বাস।’ আহমদ মুসা বলল।
‘দেখা যাচ্ছে, রোমেলী দুর্গে এ পর্যন্ত যতগুলো মৃত্যুর ঘটনা ঘটলো, সবই অপঘাতে, কিন্তু সবগুলোই হত্যাকাণ্ড। তাহলে তো দাঁড়াচ্ছে, প্রতিপক্ষ অত্যন্ত চালাক। ধরা-ছোঁয়া, এমনকি সন্দেহের সম্পূর্ণ বাইরে থেকে সামনে এগোতে চাচ্ছে। এ হবে এক কঠিন শত্রু।’
‘ঠিক বলেছ জোসেফাইন। তবে আমার কিন্তু খুব আনন্দ লাগছে। বসফরাস আমাকে ডাকছে। ইস্তাম্বুলের কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসকে জীবন্ত দেখতে পাচ্ছি আমার সামনে। অদৃশ্য শত্রু কে, কেমন জানি না। কিন্তু ইস্তাম্বুলের হয়ে লড়াইয়ে যেতে খুবই ভালো লাগছে আমার।’ বলল আহমদ মুসা।
‘না, তুমি ইস্তাম্বুলের হয়ে লড়াইয়ে যাচ্ছ না। তুমি ইস্তাম্বুলে লড়াইয়ে যাচ্ছ ‘সোর্ড’-এর পক্ষে—মানে মানুষের ‘Rational Domain’-এর হয়ে।’ বলল জোসেফাইন।
আহমদ মুসা জোসেফাইনকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। বলল, ‘তুমি আমার ‘বন্ধু’ এবং ‘গাইড’। এখন ফিলোসফারও।’
‘না, এগুলো আমার উপযুক্ত পরিচয় নয়।’ বলল জোসেফাইন।
‘উপযুক্ত পরিচয় তাহলে কি?’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমি স্ত্রী, আমি সহধর্মিণী।’ বলল জোসেফাইন।
‘সে তো আছই। তার ওপর তুমি ‘ফ্রেন্ড, ফিলোসফার এন্ড গাইড’।’ আহমদ মুসা বলল।
‘দেখ, ছোট বিশেষণ বড় বিশেষণকে বিশেষিত করতে পারে না, ছোট গুণ পরে এসে বড় গুণের মাথায় বসতে পারে না। ‘স্ত্রী’ নারীর জন্যে হিমালয়ের মতো সর্বোচ্চ এক পরিচয়। অন্য কোন ‘বিশেষণ’, অন্য কোন ‘গুণ’কে ভিন্নভাবে এনে এর পাশে দাঁড় করানো এর অমর্যাদা করা। ‘স্বামী’ ও ‘স্ত্রী’ উভয় পরিচয়ই পূর্ণাংগ। স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের জন্যে যা উচিত, যা প্রয়োজন তার সবকিছুর সমাহার এই দুই পরিচয়ে।’ বলল জোসেফাইন।
আহমদ মুসা জোসেফাইনের মুখ নিজের মুখের কাছে এগিয়ে আনতে আনতে বলল, ‘ভারি, খুব ভারি কথা বলেছ জোসেফাইন, তার ওপর এখন একটা মিষ্টি প্রলেপ প্রয়োজন।’
আহমদ মুসার মুখ এগিয়ে যাচ্ছিল জোসেফাইনের মুখের দিকে।
জোসেফাইন দুই মুখের মাঝখানে তর্জনী দাঁড় করিয়ে আহমদ মুসার বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে খসিয়ে নিয়ে ছুটে পালাতে পালাতে বলল, ‘আমার এখন অনেক কাজ। তোমার লাগেজ আমি গুছিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু তোমার ইমারজেন্সী হ্যান্ডব্যাগ তোমাকেই গুছিয়ে নিতে হবে।’
‘ধন্যবাদ জোসেফাইন।’ বলে আহমদ মুসাও উঠে দাঁড়াল।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now