বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ব্ল্যাক ঈগলের সন্ত্রাস
চ্যাপ্টার- ৩
বাকি অংশ
আহমদ মুসা ড্রইংরুমে বসেছিল। ফরহাদ এসে বলল, ‘আমরা প্রস্তুত ভাইয়া।’
ফরহাদের পেছনে যয়নব যোবায়দা ও দাদীও এসে দাঁড়িয়েছে।
ওদিকে দুটো অটো রিকশাও এসে গেছে।
আহমদ মুসা ভাবনায় ডুবেছিল।
ফরহাদের কথায় চমকে উঠে মুখ তুলল আহমদ মুসা।
ফরহাদও চমকে উঠল। আহমদ মুসাকে এমন অপ্রস্তুত সে কখনও দেখেনি। বলল, ‘স্যার, খারাপ কিছু ভাবছেন?’
হেসে উঠল আহমদ মুসা। বলল, ‘ভাবছিলাম। তবে খুব খারাপ কিছু নয়।’
সবার দিকে তাকিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘তোমরা রেডি? ঠিক আছে তোমরা একটু পরে বের হবে। আমি বেরিয়ে গিয়ে টি-স্টলে চা-খেতে বসতে পারি, এতটা সময় পরে বের হবে। তিনটা পায়নি, দুটো অটো রিকশা পেয়েছে। ফরহাদ তুমি একটিতে ড্রাইভারের পাশে বসবে।’
সবার মুখে-চোখে উদ্বেগ। যয়নব যোবায়দা বলল, ‘বাইরে কিছু কি ঘটার আশংকা করছেন?’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘সব সময় সবকিছুর জন্যে প্রস্তুত থাকা ভালো।’
বলে আহম মুসা বাইরে বেরিয়ে এল। বেরুবার সময় পকেটের রিভলবার এবং শোল্ডার হোলষ্টারে হ্যান্ডমেশিনগানের অস্তিত্ব অনুভব করল।
আহম মুসা বেরিয়ে সোজা চলল টি-ষ্টলের দিকে। যাবার সময় দেখল আগন্তুকের সংখ্যা আরও একজন বেড়েছে।
ছয় জনের দু’জন বসে পুলিশের সাথে আলাপ করছে। অবশিষ্ট চারজন যে যেখানে ছিল সেখানেই বসে আছে।
আহমদ মুসা পুলিশদের কাছে চা পাঠাতে বলে এবং নিজের জন্য এক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে একটা বেঞ্চিতে বসল যয়নব যোবায়দাদের বাড়িকে সামনে রেখে। এখানে বসে ছয়জন আগন্তুকসহ পুলিশ বক্স, দুই অটোরিকশা সবই চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে।
দৃষ্টি সামনে রেখে চায়ে চুমুক দিচ্ছে আহমদ মুসা।
ফরহাদরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। বারান্দা থেকে লনে নেমেই দ্রুত গাড়িতে উঠল।
তাদের বাড়ি থেকে বেরুতে দেখে ছয়জনই উঠে দাঁড়িয়েছে। তাদের অবস্থা কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মত। যেন শিকার এভাবে পালাবে তারা আশা করেনি।
অটো রিকশা তখন চলতে শুরু করেছে।
পুলিশের কাছে যে দু’জন ছিল, তাদের একজন হাত দিয়ে একটা সংকেত দিল। সংগে সংগেই ছয় জনের পোশাকের ভেতর থেকে ছয়টি হ্যান্ডমেশিনগান বেরিয়ে এল। দু’জন গুলী করল অটো রিকশার চাকা লক্ষে। পুলিশের কাছের দু’জন চোখের পলকে চা খাওয়ারত পুলিশদের নিরস্ত্র করে পুলিশ বক্সের ভেতর ঠেলে দিল। অন্যজন ফাঁকা আওয়াজ করে ত্রাসের সৃষ্টি করল।
এরা ছয় জনেই এই কান্ড করে বসবে, আহমদ মুসা এটা ভাবেনি। এই অবস্থায় এত বড় কিডন্যাপের ঘটনার জন্যে আরও লোক তাদের চাই এবং তাদেরই অপেক্ষা তারা করছে; খুব বেশি হলে তারা সাথীদের খবর দেয়া এবং যয়নব যোবায়দাদের ফলো করার মত কাজ করতে পারে---এটাই ভেবেছিল আহমদ মুসা। সে ক্ষেত্রে আহমদ মুসা পুলিশ দিয়ে তাদের আটকাবে মনে করেছিল। কিন্তু তারা এল একদম ডাইরেক্ট একশনে।
আহমদ মুসা চায়ের কাপ পিরিচ রেখে এক লাফে রাস্তায় নেমে এল। পকেট থেকে রিভলবার বের করে বাঁ হাতে নিল এবং হ্যান্ড মেশিনগান রাখল ডান হাতে।
আহমদ মুসা প্রথমে টার্গেট করল পুলিশের কাছের দু’জনকে, পরে যে দু’জন অটো রিকশার কাছে চলে গিয়েছিল সে দু’জনকে।
চারটি গুলী করতেই বাকি দু’জন ফিরে তাকিয়েছে আহমদ মুসার দিকে এবং গুলী করতে শুরু করেছে।
আহমদ মুসা শুয়ে পড়েছে একটা বিদ্যুতের পিলারকে আড়াল করে।
ওরা গুলী করতে করতে আহমদ মুসার দিকে ছুটে আসছে।
আহমদ মুসা ডান হাতের হ্যান্ডমেশিনগানের নল বিদ্যুৎ পিলারের বাইরে একটু বাড়িয়ে পিলার বরাবর সামনে অন্ধভাবে গুলী বর্ষণ শুরু করল। লক্ষ্য প্রতিপক্ষের গুলীর টার্গেট সরিয়ে দেয়া।
ওরা ছুটে আসছিল। ওদের কোন আড়াল ছিল না।
আহমদ মুসা গুলী বর্ষণ করলে পাল্টা আক্রমণের মুখে পড়ে ওরা রাস্তার এক পাশে সরে যেতে লাগল। কয়েক মুহূর্তের জন্যে ওদের গুলীর লক্ষ্য সরে গিয়েছিল।
এই সুযোগই চাচ্ছিল আহমদ মুসা এবং এই সুযোগের সে পুরো সদ্ব্যবহার করল।
বেরিয়ে এল পিলারের আড়াল থেকে। লক্ষ্য স্থির করে এবার গুলী করল। গুলীর বৃষ্টি গিয়ে ছেঁকে ধরল রাস্তার পাশে সরে যাওয়া দু’জনকে।
দু’জনেই মুখ থুবড়ে পড়ল। ওদের গুলী বন্ধ হয়ে গেল।
উঠে দাঁড়িয়ে আহমদ মুসা ছুটল যয়নব যোবায়দাদের দিকে। যাবার পথে পুলিশবক্সের ছিটকিনি খুলে বের করল পুলিশদের।
পুলিশরা আহমদ মুসাকে অসংখ্য ধন্যবাদ দিয়ে বলল, ‘স্যার আমরা চা খাচ্ছিলাম। আকস্মিকভাবে ওরা আমাদের আক্রমণ করে। উপযুক্ত ফল পেয়েছে সন্ত্রাসীরা। দেখছি সবাই মারা গেছে স্যার। ধন্যবাদ স্যার। ওঁদের অবস্থা কি?’
‘ওঁরা ভালো আছেন। ওদিকে যাচ্ছি।’ বলে আহমদ মুসা চলল অটো রিকশার দিকে।
অটোরিকশার ড্রাইভার দু’জন গাড়ি থেকে নেমে আহমদ মুসাকে দেখে আতংকে চুপসে গেছে। আহমদ মুসা ওদের লক্ষ্য করে বলল, ‘দেখছি একটা করে টায়ার নষ্ট হয়েছে, বাড়তি চাকা নেই?’
‘আছে স্যার।’ বলল ড্রাইভারদের একজন।
‘তাড়াতাড়ি চাকা লাগাও।’ নির্দেশ দিল আহমদ মুসা।
আর ফরিদদের উদ্দেশ্য করে বলল, ‘তোমরা ড্রইং রুমে গিয়ে একটু বস। আমি এদিকে পুলিশদের দেখি ওরা হেডকোয়ার্টারকে জানাল কিনা।’
যয়নব যোবায়দা, দাদী ও দুই পরিচারিকা নামল।
‘দাদী আপনারা একটু বসুন। চাকা ঠিক হলে আমি ডাকব।’ বলল আহমদ মুসা দাদীকে।
‘আল্লাহ তোমাকে দীর্ঘজীবী করুন ভাই’ বলে দাদী হাঁটতে লাগল। তার কণ্ঠ কান্না জড়ানো।
আহমদ মুসা পুলিশদের সাথে কথা বলল। তারা হেডকোয়ার্টারকে জানিয়েছে। এসপি উদয় থানি নিজে আসছে। আহমদ মুসাও উদয় থানি এবং ব্যাংককে থাই সহকারী গোয়েন্দা প্রধান পুরসাত প্রজাদিপকের সাথে কথা বলল। দু’জনেই বলল আমরা আশংকা করেছিলাম সরকারি স্থাপনা বা সেনা অথবা পুলিশের উপর হামলা হবে। কিন্তু হামলা হলো শাহ পরিবারের উপর। তারা শাহ পরিবারের আরও কাউকে পণবন্দী করতে চায়। তারা মনে করে সরকারের উপর এতে চাপ বেশি পড়বে এবং সন্ত্রাসীদের ছাড়তে বাধ্য হবে। এই অবস্থায় শাহ পরিবার সম্পর্কে কিছু প্রস্তাব পরামর্শ দিয়ে তারা তাদের কথা শেষ করেছে। তারা দু’জনেই আহমদ মুসার আকাশস্পর্শী প্রশংসা শুরু করেছিল। কিন্তু আহমদ মুসা টেলিফোন রেখে দেয়ার হুমকি দেয়ায় সে পথে তারা বেশি এগোতে পারেনি।
ততক্ষণে অটো রিকশার চাকা লাগানো হয়ে গিয়েছিল।
আহমদ মুসা উঠে গেল ড্রইংরুমে।
যয়নব যোবায়দারা কথা বলেছিল।
সবারই চোখে অশ্রু।
আহমদ মুসা কথা শুরুর আগেই দাদী কেঁদে উঠল। বলল, ‘আমরা কোথায় যাব ভাই? শাহবাড়িতে আক্রমণ হলো, এলাম এখানে। এ গোপন বাড়িটির সন্ধানও তারা পেয়ে গেল। ডাক্তার ফাতেমার ওখানে যাব। ওটাও নিশ্চয় গোপন থাকবে না। মাঝখানে তাকেও বিপদে ফেলা হবে। আমাদের জন্যে তো কোন নিরাপদ স্থান দেখছি না ভাই’ কান্নারুদ্ধ কণ্ঠেই কথাগুলো বলল দাদী।
আহমদ মুসা সোফায় বসল। নরম কণ্ঠে ধীরে ধীরে বলল, ‘আমরা জঘন্য এক বেপরোয়া শত্রুর কবলে পড়েছি দাদী। তবে এই আক্রমণ ওদের শক্তির পরিচয় নয। এগুলো ওদের দুর্বলতা ও হতাশা থেকে বাঁচার সর্বশেষ অপচেষ্টা। আমরা জয়ী হবো দাদীমা, ইনশাআল্লাহ।’
একটু থামল আহমদ মুসা।
সোফায় একটু ঠেস দিল। বলতে শুরু করল আবার, ‘নিরাপদ জায়গা আছে দাদীমা। এইমাত্র থাই সহকারী গোয়েন্দা প্রধানের সাথে কথা হলো। এসব ঘটনায় সরকার খুবই উদ্বিগ্ন জানালেন তিনি। সরকারি তরফ থেকে তাকে বলা হয়েছে আপনার পরিবারকে নিরাপদ সরকারি তত্ত্বাবধানে রাখার জন্য। এসপি উদয় থানিও বলেছেন এ কথা। তিনি এখানে আসছেন। দাদীমা আপনারা চাইলে সরকার এই মুহূর্তেই এ ব্যবস্থা করবেন। আপনারা কি করবেন বলুন দাদীমা।’
‘আমি কিছু ভাবতে পারছি না ভাই। যা করার তুমিই করবে।’ বলল দাদী ভাঙা গলায়।
দাদীর কথা শেষ হতেই যয়নব যোবায়দা বলল, ‘পাত্তানী অঞ্চলের শাসক এবং পরবর্তীকালে প্রধান পাত্তানী পরিবার হিসাবে এই পরিবার নান উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে এগিয়েছে, কিন্তু কখনই সরকারি নিরাপত্তা হেফাজত নেয়নি। সব সময় এই পরিবার জনপ্রিয়তাকে তাদের নিরাপত্তা মনে করেছে। এখনকার আমাদের অবস্থা অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে খারাপ। এ জন্যই নিশ্চয় আমাদের সাহায্যে আল্লাহ আপনাকে নিয়ে এসেছেন। এ পর্যন্ত আল্লাহর এ ব্যবস্থা আমাদের জন্যে যথেষ্ট হয়েছে। ভবিষ্যতেও যথেষ্ট হবে বলে আমি মনে করি।’
থামল যয়নব যোবায়দা। প্রথম দিকে তার কণ্ঠ ছিল কান্নারুদ্ধ। কিন্তু শেষ দিকে কান্না মুছে গিয়ে তার কণ্ঠ হয়ে উঠেছিল দৃঢ় প্রত্যয়ী।
উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে আহমদ মুসার মুখ। বলল, ‘যয়নব যোবায়দা, তুমি ‘সাকোথাই’ রাজবংশের যুবকদের এবং পাত্তানী রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ‘চাউসির বাংগসা’ ওরফে সুলতান আহমদ শাহের যোগ্য উত্তরসূরীর মত কথা বলেছ। তোমাকে ধন্যবাদ। তবে বোন যয়নব যোবায়দা আল্লাহ তাঁর ব্যবস্থা শুধু আহমদ মুসাকে দিয়ে নয়, সরকারকে দিয়েও চালাচ্ছেন। সেই হিসাবে সরকার যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা আল্লাহর ব্যবস্থারই অংশ হতে পারে।’
‘ঠিক বলেছেন। আমাকে শুধরে দেয়ার জন্যে ধন্যবাদ। আমি বিষয়টা আপনার উপরই ছেড়ে দিচ্ছি ভাই সাহেব।’ বলল যয়নব যোবায়দা।
‘ধন্যবাদ বোন যয়নব যোবায়দা। ওরা প্রস্তাব করেছে, ব্যাংককে সরকারি নিরাপত্তায় থাকতে। আমি..........।’
আহমদ মুসার কথার মাঝখানেই যয়নব যোবায়দা বলে উঠল, ‘নিজ মানুষদের ফেলে আমরা অন্য কোথাও যেতে পারব না।’
‘আমি সে কথাই বলতে যাচ্ছিলাম। এই যাওয়াকে মানুষ অন্য দৃষ্টিতে নিতে পারে। এজন্যে আমার প্রস্তাব হলো, তোমরা শাহ বাড়িতেই থাকবে। এই বাড়িকে সরকার ফুল সিকিউরিটির মধ্যে নিয়ে আসবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘হ্যাঁ ভাই, এটাই ভালো হবে।’ দাদী বলল।
‘আমারও এটাই মত।’ যয়নব যোবায়দা বলল।
‘আমারও সুবিধা হলো দাদীমা। এই ব্যবস্থা হলে আমি একটু হাল্কা বোধ করব। আমি একদিন বা কয়েকদিন পাত্তানী শহরে থাকছি না।’ বলল আহমদ মুসা।
দাদী, যয়নব যোবায়দা ও ফরহাদ তিনজনেরই প্রশ্নবোধক দৃষ্টি ছুটে এল আহমদ মুসার দিকে। কথা বলল যয়নব, ‘আপনি কি তাহলে কোথাও যাচ্ছেন ভাই সাহেব?’
‘হ্যাঁ। তোমাদেরকে শাহ বাড়িতে পৌছে দেবার পর সম্ভব হলে আজকেই।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কোথায়?’ দাদী বলল।
‘জাবের জহীর উদ্দিনের খোঁজে।’
‘পুলিশের সাথে?’ বলল ফরহাদ ফরিদ উদ্দিন।
‘না। পুলিশের পথ আর আমার পথ ভিন্ন হবে।’
‘আপনি সুস্থ নন। ডাক্তার খালাম্মা কি আপনাকে অনুমতি দেবেন?’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘এই ‘না’ বলা ডাক্তারের দায়িত্ব, কিন্তু আমার কাজ আমার প্রয়োজনে। ডাক্তারের দায়িত্ব থেকে রোগীর প্রয়োজন সব সময় অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে।’
একজন পুলিশ ড্রইং রুমের দরজায় এসে দাঁড়াল। বলল, আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘এসপি স্যার এখানে আসতে চান স্যার।’
‘হ্যাঁ, ওয়েলকাম, আসতে বল।’ বলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
যয়নব যোবায়দা গায়ের চাদরটা আরও ঠিক করে নিল এবং কপালে নেমে আসা মাথার রুমালটাকে চোখের উপর পর্যন্ত নামিয়ে নিল।
হাবিব হাসাবাহর সামনে টেবিলের উপর মোবাইল রাখা।
কল চলছে।
মোবাইলের ইনকামিং ও আউটগোয়িং ভয়েস অপশন অন করা।
মোবাইল টেবিলে রেখেই যেমন কথা বলা যাচ্ছে, তেমনি কথা শোনাও যাচ্ছে।
শূন্য অফিস ঘর।
মাত্র হাবিব হাসাবাহই তার চেয়ারে বসে।
মোবাইলে ওপার থেকে কথা ভেসে আসছে।
হাবিব হাসাবাহর বিব্রত মুখ। বিধ্বস্ত চেহারা।
ফোনের ওপ্রান্ত থেকে কথা বলছেন, ইহুদীবাদী বিশ্ব গোয়েন্দা সংস্থা ইরগুন জাই লিউমি’র (ইজালি) প্রধান আলেকজান্ডার জ্যাকব। সে কথা বলছে ইসরাইলী হাইফার গোপন হেডকোয়ার্টার থেকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘ইরগুন জাই লিউমি’র (ইজালি) হেডকোয়ার্টার বন্ধ হওয়াতে হাইফাতেই তাদের গোপন হেডকোয়ার্টার খোলা হয়েছে। এখানে হেডকোয়ার্টার হওয়াতে ইজালি’র লাভ হয়েছে। ইহুদী রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদকে ব্যবহার করা কিংবা মোসাদের তাদেরকে ব্যবহার করা সহজ হয়েছে।
ওপার থেকে আলেকজান্ডার জ্যাকব বলছিল, ‘এই বিভেন বার্গম্যান কয়েকদিন আগে পর্যন্ত আন্দামানে ছিল। ভারতীয় গোয়েন্দা সূত্র থেকে এই মাত্র শুনলাম, বিভেন বার্গম্যান আসলে আহমদ মুসা। এই আহমদ মুসা আমাদের মূর্তিমান যম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে জায়নবাদীদের সে উৎখাত করেছে। তার হাতে আমাদের সর্বশেষ বিপর্যয় ঘটেছে আন্দামানে। আমরা সেখানে মহাসংঘকে সহযোগিতা করছিলাম। আমাদের শীর্ষ গোয়েন্দা কোহেনকে সে খুন করেছে এবং সেখানে আমাদের গোটা নেটওয়ার্ক তার হাতে ধ্বংস হয়েছে। থাইল্যান্ডে যা ঘটেছে, আহমদ মুসার জন্যে তা ঘটানো খুবই স্বাভাবিক। সে অদ্ভুত কুশলী। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সে সব সময় সংশ্লিষ্ট দেশের আইনকে অর্থাৎ সরকারকে পক্ষে রাখতে সমর্থ হয়। এই অসাধ্য সাধন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও। তারই কৌশল ও চেষ্টায় সেখানে আমরা জায়নবাদী মানে ইহুদীবাদীরা মার্কিনীদের কাছে বন্ধু থেকে শত্রুতে পরিণত হই। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সে আমাদের মোকাবিলায় ইহুদীদের ব্যাপক সমর্থন অর্জন করে। ইহুদীবাদীরা রাজনৈতিক সন্ত্রাসী এবং ধার্মিক ইহুদীরা তা নয়- তার এই যুক্তি মার্কিন ইহুদীরাও গলধঃকরণ করে। এহেন ধূর্তের সাথে লড়াইয়ে থাইল্যান্ডে আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা খুব বড় নয়। সবচেয়ে অসুবিধার ব্যাপার হয়েছে, থাই সরকারকে সে শুধু পাশে পাওয়া নয়, সেখানকার মুসলমানদের সে নির্দোষ প্রমাণ করতে পেরেছে। এই অবস্থায় থাইল্যান্ডে আমাদের প্রধান কাজ হলো আহমদ মুসাকে হত্যা করা। জাবের জহীর উদ্দিন এবং তার পরিবারের লোকরা হবে আহমদ মুসাকে বাগে পাওয়ার টোপ। সুতরাং জাবের জহীর উদ্দিনকে ধরে রাখা আমাদের জন্য অপরিহার্য। ৪৮ জন বন্দীকে ছাড়লেও তাকে ছাড়বে না। যে কোন ত্যাগের বিনিময়ে আমরা আহমদ মুসাকে হাতে পেতে চাই। শাহ পরিবারের লোকদের পণবন্দী করার চেষ্টা অব্যাহত রাখ। আলটিমেটাম ঘোষণার পরেই শাহ পরিবারের সদস্যদের কিডন্যাপ করার আরও একটা উদ্যোগ নিয়েছিলে, এজন্যে তোমাকে মোবারকবাদ। তুমি ব্যর্থ হয়েছ, আমাদের আরও ছয়জন লোকের জীবন গেছে, একে আমি বড় করে দেখছি না। এক.......।’
আলেকজান্ডার জ্যাকবের কথার মাঝখানেই হাবিব হাসাবাহ বলে উঠল, ‘মাফ করবেন এক্সিলেন্সী। একটা কথা। এবার যে প্ল্যান আমরা করেছিলাম, তা প্রায় অব্যর্থ ছিল। কিন্তু পরিকল্পনার মাঝপথেই শাহ পরিবারের সদস্যরা অন্য কোথাও যাবার জন্যে বেরিয়ে পড়ে। তখন পর্যন্ত ওখানে আমাদের জমা হয়েছিল মাত্র ছয়জন লোক। এরাই মরিয়া হয়ে ওদের কিডন্যাপের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এরপরও আহমদ মুসা না থাকলে তারা সফল হতো, এটা আমরা নিশ্চিত হয়েছি।’
বললাম তো সে আমাদের যম। ওকেই আগে সরাতে হবে। জাবের জহীর উদ্দিন ভালো টোপ। প্রভু জিহোবা আমাদের সাহায্য করুন।’ বলল ওপার থেকে আলেকজান্ডার জ্যাকব।
‘এক্সিলেন্সি, মনে হচ্ছে ওরা আলটিমেটাম না মেনে জাবের জহীর উদ্দিনকে উদ্ধার করার চেষ্টা করবে।’ হাবিব হাসাবাহ বলল।
‘আমরা এটাই চাই।’
‘উদ্ধারের চেষ্টায় তো ঝাঁপিয়ে পড়বে পুলিশ। আহমদ মুসা যদি না আসে!’
‘তুমি আহমদ মুসাকে চেন না। পুলিশের উপর ভরসা করে বসে থাকার লোক আহমদ মুসা নয়। পুলিশ উদ্ধারে আসবে। কিন্তু উদ্ধারের জন্য মূল ভূমিকা সে পালন করবে, এটা দেখতেই পাবে।’ ওপার থেকে বলল আলেকজান্ডার জ্যাকব।
‘ঠিক এক্সিলেন্সী। এ পর্যন্ত সব ঘটনার মধ্যে সে আছে।’ বলল হাবিব হাসাবাহ।
‘এই মুহূর্ত থেকে আহমদ মুসার পেছনে লোক লাগিয়ে দাও। তারা প্রতি পদে তাকে অনুসরণ করবে। সে উদ্ধার অভিযানে এসে তোমাদের দেখতে পাওয়ার আগে তোমরা যেন তাকে দেখতে পাও। এমন হলে তবেই আশা করা যায় তোমরা আহমদ মুসাকে কাবু করার সুযোগ পাবে।’ আলেকজান্ডার জ্যাকব বলল।
‘ধন্যবাদ এক্সিলেন্সী।’ বলল হাবিব হাসাবাহ।
‘ওয়েলকাম। ওকে। বাই।’ ওপার থেকে টেলিফোন রেখে দিল আলেকজান্ডার জ্যাকব।
মোবাইল অফ করল হাবিব হাসাবহও।
যে বিধ্বস্ত চেহারা ছিল হাবিব হাসাবাহর, সেটা অনেকটাই কেটে গেছে এখন। মহাশক্তিধর আলেকজান্ডার জ্যাকব সর্বশেষ কয়েকটি বিপর্যয় ও ব্যর্থতার জন্যে তাকে খেয়ে ফেলবে এই ভয় ছিল হাবিব হাসাবাহর। কিন্তু বিভেন বার্গম্যানই আহমদ মুসা এটা জানার পর তার বিপর্যয় ও ব্যর্থতার অপরাধ আলেকজান্ডার জ্যাকবরা ভুলেই গেছে। এখন তার বিপর্যয়-ব্যর্থতাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছে। মনে মনে দারুণ খুশি হাবিব হাসাবাহ। সে ধন্যবাদ দিল আহমদ মুসাকে। আহমদ মুসা অতটা যোগ্য ও ক্ষমতাধর না হলে হাবিব হাসাবাহর আজ অব্যাহত ব্যর্থতা ও বিপর্যয়ের জন্যে কি যে গতি হতো, তা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে।
হাবিব হাসাবহ গুনগুনিয়ে একটা গানের কলি গাইতে গাইতে কলিং বেলে চাপ দিল নতুন অপারেশন প্রধানকে ডাকার জন্যে। বস আলেকজান্ডার জ্যাকবকে টেলিফোন করার আগে সবাইকে রুম থেকে বের করে দিয়েছিল নিজের নাজেহাল অবস্থাকে অন্যের কাছ থেকে আড়াল করার জন্যে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now