বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আজও আকাশে অনেক তারা দেখলাম। তারা আর আকাশের প্রতি অনেক আগে থেকেই আমার দুর্বলতা। তবে জোছনার প্রতি আমার আরো বেশি আকর্ষণ । মাত্র অনার্স শেষ করলাম, তাই ধীরে ধীরে আমার উপর পরিবারের চাপ বাড়ছে। মনে হয় চাকরি টস্ক্রি করা দরকার, তবে আমার যে রেজাল্ট তা দিয়ে চাকরি পাওয়াটা একটু কঠিনই হবে। যাই হোক আপাতত আকাশ আর তার দেখেই দিন পার করছি। শীত মনে হয় এসে পড়ল, তার আগমনি বার্তা বাতাসে। যাই হোক আমার পরিবারের কথ বলে নেই একটু, একটা সাদামাটা পরিবার। বাবা সরকারি চাকুরি জীবী, অল্প বেতনের চাকুরি। মা পুরোপুরি একজন সংসারী মহিলা। রান্না বান্না আর আমাদের দেখা শুনাই তার একমাত্র কাজ। আর এক ছোট ভাই আছে H.S.C দিবে এবার। ও আমার থেকে অনেক ভাল ছাত্র। ছোট ভাইটা নাম সমুদ্র। ওর নামটার মাঝে একধরনের বীশালতা আছে। ওর খুব ইচ্ছা ও প্রানী বিজ্ঞানি হবে।
আমাদের বাড়ীটা ছোট্ট একটা বাড়ী। আমার আর সমুদ্রের একটাই ঘড়, বাবা মার একটা, আর একটা বসার ঘড়। বাবার যে চাকরি তাতে এত বড় বাড়ী বানানোর সামর্থ্য নেই। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া। আলতাফ হোসেন আমার বাবা অতিব সৎ লোক। আমাদের বাড়ীর বাউন্ডারির ভেতর অনেক যায়গা, সেখানে অনেক গাছ টাছ আছে, বাবার সখ তাই আছে। তবে আমার ভাল লাগে বাড়ির উঠান। যখন জোছনা পুরো যৌবন নিয়ে আমাদের ঊঠানে পরে আমার তখন ঘোরের মত লাগে। আমি উঠনে দাড়াই জোছনা তার পুরো সৌন্দর্য নিয়ে হাজির হয় আমাকে ভিজিয়ে দিয়ে যায়। আর ফুল গাছ থেকে সুবাসে ভরে যায় পুরো বাড়ী। এই জোছনায় ভীজে সব ভুলে যাওয়া যায়।
আমাদের বাসার সামনের বাসায় একটা মেয়ে থাকে। ওদের পুরো পড়িবারটিই প্রতিবেশি হিসেবে অনেক আন্তরিক। মেয়েটার নাম অনু। মাঝে মঝে আসে আমাদের বাসায়। ওকে দেখলেই বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে উঠে। ওর মার সাথে খুব ভাব। বাসায় এসে মার সাথে গল্প গুজব করে। আমার সাথে খুব একটা কথা হয় না। হঠাৎ সামনা সামনি হয়ে গেলে কথা হয়। আমার ধক কর উঠাটা সামাল দিয়ে ওর সাথে কথা বলাটা আমার জন্যে সাহসিকতার ব্যাপার। তাও বলি-
– কেমন আছো অনু?
– জী ভাল। আপনি?
– এইতো ভাল। লেখাপরা কেমন চলছে?
– ভাল। আচ্ছা আমার কেন জানি মনে হয় আপনি এক্ট কুজ হয়ে হাটেন।
– আ-আ আমি আসি। তুমি যাও মা রান্না ঘরে আছে।
আমার সাথে দেখা হলেই মেয়েটা আমাকে বিব্রত করার জন্যে নানা ধরনের কিছু না কিছু বলে। আমি তখন আর কথা বলি না। প্রস্থান করাটাই তখন মুখ্য বলে মনে হয়। অনু এবার কোন একটা প্রাইভেট ইউনিভারসিটিতে জানি ভর্তি হয়েছে। ওরা প্রায় ধনিই বলা যায়। গারি বাড়ি দুই আছে। অনুকে কেন জানি বড় ভাল লাগে। তবে ভাল লাগা পর্যন্তই থাকতে হবে। এর আগে যাওয়া যাবে না। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেদের এর বেশি যেতে নেই। মেয়েটার সবি ভাল লাগে। খুব বিষন্ন চোখ, মায়া মায়া। আবার ঐ চোখেই রাজ্যের রহস্য।
আজকে একটা কোম্পানিতে ইন্টারভিউ দিলাম। ইন্টারভিউ বোর্ডে তিনজন আছে। তারা কেউ আমাকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছুক না। প্রায় ৫ মিনিট বসে থেকে আমি বললাম আমি আসি। তারা যেন যেন বেচে গেল। এখন আমার বাসায় যাওয়া উচিত, মাথা ব্যাথা করছে। তবু কেন জানি যেতে ইচ্ছে করছে না। আমি উদ্দেশ্য বিহীন হাটাছি, হাতির ঝিল নামক জায়গাটা সরকার প্রচুর টাকা খরচ করে আধুনিক করার চেষ্টা করেছে। তবে ঝিলের পানি থেকে দুরগন্ধ দূর করতে পারেনি। আধুনিকের সাথে প্রাচিনতার মিল মিশ। ও আচ্ছ আমার নামটা বলা হয়নি। আমি অর্ণব । দুই ভাইয়ের নামের মানে এক। হা- হা, আমার রাগি গম্ভির বাবার হাস্যকর কাজ। বাবা প্রচন্ড রাগি। বাবাক যখন ঘরে আসেন আমরা সব চুপচাপ। টিভিও দেখা হয় না। আমার ঘর ছাড়া আমার আর শুধু বাড়ির উঠান ভালো লাগে। টিভি বসার ঘরে। তাই দেখা হয় না। তবে সমুদ্র মনে হয় কাউকেই ভয় পায় ন। বাবাকেও না। ও দিব্যি ঘোরাফেরা করে। আমি মনে হয় গত ৪-৫ বছরে বাবার সাথে খেতে বসি নি। তবে মায়ের সাথে আমার অনেক মিল। সেদিনিত মা বল্ল-
– ও খোকা একটা চাকরি বাকরি কর, করে ঘরে বউ নিয়ে আয়। আমি আর একলা পারি না।
– মা আগে চাকরি তো হোক।
– তোর কি কাউকে পচ্ছন্দ আছে। ও বাসার অনু কে কেমন লাগে?
– কেমন আবার লাগবে ? ভালই লাগে। তবে তুমি যে ভালো লাগার কথা বলছ তা না।
– ঐ হলেই হল। তুই নাকি অনুরে সাথে কথা বলিশ না।
– কি কথা বলব মা? আর এই চ্যাপ্টার ক্লোজ। ভাত দাও। একটা ডিম ভেজে দাও, আর একটা লাল মরিচ। আর রসুনের আচারটা তো আছে নাকি?
– তুই যা বোস আমি আসছি।
হাটতে হাটতে এগুলোই ভাবছিলাম। সন্ধ্যা যেন ঘটা করেই নামল। বাসায় ফিরেই বাবার সাথে দেখা। আলতাফ সাহেব তার গম গমে গলায় বলল-
– কি ইন্টারভিউ কেমন হল?
– ভালই বাবা।
– ভাল হলে তো ভালই। যাও ফ্রেস হয়ে নাও। আমি বাজারে যাচ্ছি। কিছু লাগবে?
– না বাবা
আমার বাপ এমন কেন? সব সময়ি রাগি রাগি একটা ভাবে থাকে।
মা বলল-
– খোকা ইন্টারভিউ কেমন হোল?
– ইন্টারভিউ শূন্য হয়েছে
– শূন্য মানে কিরে খোকা?
– ওরা আমাকে শূন্য প্রশ্ন করেছে, আমি শূন্য উত্তর দিয়েছি। ৫ মিনিট আমার চেহারা দেখে বিদায়।
– বলিশ কি থাক মন খারাপ করিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে।
– হয়ে গেলে তো ভালই। মা আজ আলু ভর্তা কর তো, আর ঘরে লেবু আছে না?
– তুই যা বোস আমি নিয়ে আসছি, আলু ভর্তা করেই রেখেছি। আর সমুদ্রকেও ডাক।
সমুদ্র আর আমি খাচ্ছি,
– দাদা তোর চাকরিটা কি হবে?
– না ম০নে হয়
– ধুর তোর চাকরি হলে আমি কিছু জিনিস কিনতাম তোর প্রথম বেতনের টাকা দিয়ে?
– কি কিনতি?
– কিছু গাছ আর দুটা কচ্ছপের বাচ্চা।
– বলিস কি কচ্ছপের বাচ্চা দিয়ে কি করবি?
– পালব। চিন্তা করেছি উঠনে একটা ছোট্ট পুকুর বানবো, ঐ খানেই পালব।
– বাবা আস্ত রাখবে না।
– সে দেখা যাবে।
আমি অবাক হলাম, এই ছেলেটা বাবাকে মোটেও ভয় পায় না। যাই হোক আমি খাওয়ায় মোনজগ দিলাম। আলু ভরতা আমার কাছে বেহেস্তি খাবার।
সকালে উঠানে দারালেই ভালো লাগে। আজও দারালাম ও বাসার বারান্দায় অনুকে দেখা যাচ্ছে। মনে হয় মাত্র গোসল করে এসেছে। এত কমল আর স্নিগ্ধ লাগছে। অনেক রুপবতি মেয়েটা অনু এখন আর আগের মত আসে না। মেয়েটার মুখটা আগের মত আর হাসিখুসি নেই। ওদের বাসায় আবার কিছু হোল নাকি? আমার একটু খোজ খবর নেয়ার দরকার, মা কে জিজ্ঞেস করলে হয়ত জানা যাবে।
ছোট ভাইটার সামনে HSC পরীক্ষা। আমার খোজ খবর নেয়া উচিত। আমি কেন এমন? নিতে হবে, আস্তে আস্তে বাবার ঊপর থেকে চাপ কমাতে হবে। শুনেছি বাবা আর সমুদ্র নাকি কোথায় যাবে গ্রামের দিকে। সমুদ্রের সামনে পরীক্ষা তাই আমাদের কেমন এক চাচা জানি হয় তার কাছে দোয়া চাইতে। দুইদিনের ব্যাপার, তবুও ঘরটা ফাকা ফাকা লাগবে।
একটা ইন্টারভিউ দিলাম। একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। এসিসট্যান্ট মেনেজার হিসেবে। ১৫০০০ টাকা বেতন হবে। আমার জন্যে যা অনেক। ইন্টারভিউ ভালই হয়েছে, মনে হয় হয়ে যাবে। এখন রাস্তায় রাস্তায় হাটছি। নতুন কিছু কাপর চোপর কিনতে হবে। আজ আর কাল চাকরি তো হবেই। তো কাপর চোপর লাগবেই। প্রথম বেতন থেকে সমুদ্রকে কিছু টাকা দিব ওর কচ্ছপ কিনতে।
বাসায় আস্তেই শুনি বাব আর সমুদ্র রোওনা দিয়ে দিয়েছে। আমার জন্যে অপেক্ষা করেছিল। আমার দেরি দেখে চলে গেছে। আমার ইন্টারভিউ ভালো হয়েছে শুনে মা অনেক খুশি। খাওয়া দাওয়া শেষ করতেই দেখি অনু হাজির। মেয়েটাকে দেখতে কেমন জানি উদ্ভ্রান্তর মত লাগছে। চোখ অসম্ভব ফোলা আর লাল লাগছে।। কান্না কাটি করেছে নাকি? আমার সামনে এসে বলল-
– অর্ণব দা তোমার সাথে আমার কথা আছে
– আমার সাথে আবার কি কথা? আচ্ছা বল।
– আমরা কাল কনাডা চলে যাচ্ছি। একেবারের জন্যে।
আমার ভেতরটা স্তব্দ হয়ে গেল। খা খা করছে বুকটা কেমন জানি। নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম-
– কই মা তো বলেনি। তুমিও তো বলনি।
– আগে বললে কি হত? আপনি কি আমাকে যেতে মানা করতেন?
– কি আশ্চর্য আমি মানা করব কেন? মাথা খারাপ হল নাকি তোমার?
– না আমার মাথা ঠিকি আছে। তাহলে আমাকে আপনি কিছু বলতে চান না?
– না কি বলবো, ভাল থেক।
অনু চলে যাচ্ছে। আমার বুকে কেমন জানি এক ধরনের শুন্য লাগছে, মন চাইছে মেয়েটাক্লে এক দৌড়ে ধরে বলি তুমি যেরতে পারবে না, তোমাকে আমার কাছেই থাকতে হবে। পারলাম না।
আমার ঠিকানায় একটা চিঠি এসেছে। আমার চাকরিটা হয়ে গেছে। আমি মাকে কিছু না বলেই রাস্তায় হাটতে বের হলাম। মানুষ দেখতে ভালই লাগে। বাতাসে পুরো শীত শীত ভাব। বুকের ভেতর তাও কই জানি একটা শুন্যতা রয়ে গেছে। অনুরা চলে গেছে আজ ৪-৫ দিন হল। ও বাড়ির বারান্দাটা আজ শুন্য। পুরো বারান্দা আলকিত করে আর অনু দারায় না। দারায় না আমার সামনে। আমাকে বিব্রতও করে না। পকেটে মোবাইলটা বেজে উঠল। মা ফোন দিয়েছে-
– অর্ণব তুই কই? তারাতারি আয় খোকা।
মা কথা বলতে পারছে না। কেমন জানি ফোপাচ্ছে। কাদছে। মার কথা শুনেই অনাহূত কোন ঘটনার আশঙ্কায় বুকটা কেপে উঠল।
বাবা আর সমুদ্র গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকাউ এসে তাদের গারি এক্সিডেন্ট করে। তারা বাংলাদেশ মেডিকেলে আছেন, মাকে খালার বাসায় রেখে এসেছি। এখনো জানি না বাবা আর ভাইয়ের কি অবস্থা। মনে মনে খালি আল্লাহ কে ডকছি। সব যেন ঠিক হয়ে যায়।
বাবা আর সমুদ্র মারা গেছে আজ ৬ দিন হল। মা এখন কারো সাথেই কথা বলছে না। প্রথম দিন বাবার লাশ দেখেই মার কথা বন্ধ হয়ে গেছে। ছোট ভাইটা তাও দুইদিন মৃত্যুর সাথে খেলা করে হারি মেনে নিল। মানতে পারলাম না আমি। সমুদ্রের জ্ঞান একটু ফিরেছিল, আমার সাথে তখন ওর কথাও হোল।
– দাদা বাবা আর নেই না।
– না। নেই।
আমিও বললাম যন্ত্রের মত।
– আমিও চলে যাব। ঐ যে বাবা আমাকে নিতে এসেছে।
– কথা বলিশ না ছোট।
– আইন্সটাইন একটা কথা বলেছিল- (গতি বাড়ালে নাকি সময় থমকে যায়।) কিন্তু দাদা আমি তো স্থির হয়ে আছি, তাও আমার সময় স্থির হয়ে গেছে। আইন্সটাইন বেটার তথ্য ভুল প্রমানিত হল।
– চুপ করে ঘুমা।
একেবারেই ঘুমিয়ে গেল। আমি কাদি নি এখনো, বাড়ির কোনায় বাবা আর সমুদ্র শুয়ে আছে।
এখন অনেক রাত, উঠন জুরে ভরা জোছনা খেলা করছে। অনু একটা চিঠি পাঠিয়েছে-
( অর্ণব দা, আমি শুনেছি তোমাদের কথা। এত কষ্ট তুমি একা নিতে পারবে না।
তোমার একজন দরকার। আমিই তোমার সেই একজন। তুমি জানো না হয়ত
অর্ণব দা, তোমার মা কত শক্ত একজন মহিলা, আমি তার কাছ থেকেই শুনেছি সব।
তুমি একা না, আমি আছি আজীবন। ও অর্ণব দা এবার এলে ফিরিয়ে দিবে না তো।
আমি আসছি কিন্তু।)
চিঠি পরতে পরতে আমার চোখ ঘোলা হয়ে যাচ্ছে। জোছনা যেন উপছে পরছে আজ। আমি অনুর জন্যে অপেক্ষা করছি।
বিষন্ন জোছনায় উঠোনো যেন কেদে উঠছে। ফুলের গন্ধে সারা বারি ভরে গেছে। জেগে আছি আমি আর বিষন্ন জোছনা।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now