বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
বই
১ম পর্ব
অসীম পিয়াস
১.
বইয়ের নামটা দেখে খুব অবাক হল কামাল।
“বই”।
এই নামের বই হতে পারে, ধারণা ছিলনা। বইটা পেয়েছে নীলক্ষেতের ফুটপাথে। দোকানটাতে হরেক রকমের বই। কেউ সম্ভবত তার ব্যক্তিগত লাইব্রেরী পুরোটা বেচে দিয়েছে। তারই সব নিয়ে দোকান খুলেছে। সব ধরনের বইই আছে। কোনটা ছেড়ে কোনটা নেবে, তা নিয়ে যখন চিন্তায় আছে, তখনই বইটা আবিষ্কার করল।
বই
সাদা মলাটে, কালো কালিতে লেখা। মোটামুটি মোটা একটা বই। ৬১৯ পাতা, বেশ পুরনো মনে হয়। বহুদিন কারো হাতে পড়েনি। মলাট জায়গায়-জায়গায় ক্ষয়ে গেছে। কোন লেখকের নাম নেই। বইয়ের ভেতরেও নেই। এমনকি প্রকাশনী বা সংস্করণ কিছুই নেই। পাতা উল্টে বুঝল গল্পের বই। বেশ অনেকগুলো গল্প আছে ভিতরে কিন্তু কোনো সূচিপত্র নেই। বইয়ের পাতা গুলোও বেশ নরম হয়ে গেছে। শুধুমাত্র নামের আকর্ষণেই বইটা কিনে নিলো সে, সাথে টুকটাক আরো বেশ কয়েকটা বইয়ের জন্য মন কেমন কেমন করতে লাগল। কিন্তু আরো নিতে গেলে বাজেট ক্রস করে যাবে। প্রতি মাসের শুরুতে বেতন পেয়ে বই কেনে কামাল। নতুন বই কিনতে গেলে এখন অনেক খরচ, তাই নীলক্ষেতের পুরনো বইয়ের দোকান গুলোই ভরসা। আশংকার কথা হল, পুরনো বইয়ের দোকানগুলো কমে যাচ্ছে।
এতগুলো বই নিয়ে ফিরতে বেশ কষ্ট হবে। কামাল থাকে ওর বড় বোনের বাসায়। বাড্ডা এলাকায় দুলাভাইয়ের পাঁচতলা বাসা। তার দোতলায় একই সাথে ওরা থাকে।
বইগুলো দেখে লাবণ্য বেশ খুশি হবে।
লাবণ্য কামালের ভাগ্নি, ইন্টারমিডিয়েটে পড়ে। গল্পের বইয়ের প্রচণ্ড ভক্ত। যদিও তার এসব বই পড়া মানা। তার পরও লুকিয়ে পড়া চাই।
কামালের রুম থেকেই সে বইয়ের যোগান পায়। ধরা পড়লেও কামাল কিছু বলে না। শুধু সাবধান করে যেন ওর বাবা না দ্যাখে।
ওর খুশির কথা ভেবেই এতগুলো বই টেনে নেওয়ার কষ্ট ভুলে গেল কামাল। জ্যাম ঠেঙ্গিয়ে ফিরতে সন্ধ্যা পার হয়ে গেল।
বাসায় ফিরতেই লাবণ্য দৌড়ে এলো। ও জানত যে কামাল বই কিনতে যাচ্ছে । এত বই দেখতেই খুশি আর ধরে না।
-ইশ মামা, এত বই কোনটা রেখে কোনটা পড়ব!
ওর হাসি মুখটা দেখে কেমন একটা কষ্ট লাগল কামালের। আসলে লাবণ্যর চেহারা বেশি ভালো না। তাই ও কেমন কমপ্লেক্সে ভোগে। বান্ধবীদের সাথে খুব একটা মেশে না।
খুব বেশি বান্ধবী নেই ও বোধ হয়। তাই বই-ই ওর সবচে কাছের বন্ধু। একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে কামাল বলল, ‘সব গুলোই পড়া যাবে, কিন্তু একবারে একটার বেশি নেওয়া যাবে না এবং অবশ্যই ক্লাসের পড়া ফাঁকি দেওয়া যাবে না।’
কামালের কথা লাবণ্যর কানে গেল বলে মনে হল না, ও বই বাছতে ব্যস্ত।
চারটা বই হাতে নিয়ে বলল,
-এগুলো নিয়ে যাই।
-কি বলছি শুনিস নাই? একবারে একটা।
-একটা পড়তে তো মাত্র একদিনও লাগে না।
-না লাগুক, আমি তো বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি না। শেষ হলেই আবার এসে নিয়ে যাওয়া যাবে।
মুখ বেজার করে ও একটা বই বেছে নিলো।
কামাল বলল-ঠিক আছে। বাবা যেন না দেখে।
-দেখবে না। বলে লাবণ্য চলে গেল।
কামালও কাপড় পাল্টে, হাতমুখ ধুয়ে একটা বই নিয়ে বসে পড়ল।
প্রথমে ‘বই’ বইটা পড়ার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু বেশি বড় বলে বাদ দিল।
আপা খেতে ডাকার আগ পর্যন্ত আর হুশ ছিল না।
খেয়েও আবার বই পড়তে পড়তে কখন যে ঘুমিয়ে গেল টেরও পায়নি কামাল।
***
সকালে লাবণ্যকে খুব শুকনো দেখা গেল।
কামাল জিজ্ঞাসা করল,
-কিরে, ঘুমাসনি রাতে? কান্নাকাটি করছিস নাকি? বইটা খুব কষ্টের?
লাবণ্য মাথা ঝাঁকাল।
কামাল হেসে দিল,
-তোকে নিয়ে আর পারা যায় না, বই পড়ে কেউ এতো কাঁদে? যা, গোসল টোসল কোরে দ্যাখ ভাল লাগতে পারে।
-আচ্ছা বলে ও উঠে চলে গেল।
কামাল খেয়ে অফিসে চলে গেল।
***
অফিস থেকে সেদিনই বলা হল যে ট্রেনিং এর জন্য ভারত যেতে হবে। কামাল সহ আরও চারজন। মেয়াদ দুই মাস আর যেতে হবে এক সপ্তাহের মাথায়।
পরের এক সপ্তাহ প্রস্তুতির জন্য খুব ব্যাস্ততার মধ্যে গেল।
যাওয়ার সময় লাবণ্যর মন খুব খারাপ, কিন্তু সেদিনের কেনা বইয়ের বান্ডিল হাতে তুলে দিতেই মেঘ কেটে সূর্য উঠল।
কামালেরও মনটা ভাল হয়ে গেল।
২.
ট্রেনিং ভালই চলছিল। আর বাকি যখন এক সপ্তাহ তখন হঠাৎ খবর এলো যে লাবণ্যকে নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শুনেতো কামালের মাথা খারাপের মত অবস্থা। কাজ, ট্রেনিং ফেলে সেদিনই ঢাকা ফিরে এলো সে।
বাসার অবস্থা বর্ণনা করা সম্ভব না। আপা বরাবর অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন। দুলাভাই থমথমে। লাবণ্যর ছোট ভাই অরণ্যর কাছ থেকে জানা গেল শরীর খারাপ লাগছিল বলে লাবণ্য সেদিন কলেজ যায়নি। ঘরেই ছিল সারাদিন। দুপুরে খাওয়ার পর আর রুম থেকে বেরোয়নি। সবাই ভেবেছে বোধহয় ঘুমাচ্ছে। সন্ধ্যায় নাস্তা খেতে ডাকতে গিয়ে দ্যাখে যে নেই। নেই তো নেই। কোথাও নেই। ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। দুপুর থেকে কেউ ঢোকে বা বেরোয়নি। সারা ঘর তোলপাড় করয়ে ফেলা হল। তারপর থানা হাসপাতাল কোনটিই বাদ নেই। সবচে অদ্ভুত হল লাবণ্যর সব কিছুই রয়ে গেছে, ওর মোবাইল হাতব্যাগ, ব্যাগে টাকা সব। বিছানা টেবিল সবই আগের মত, যেটা যেখানে ছিল সবই আছে শুধু লাবণ্য নেই। আত্মীয় স্বজনে বাড়ী ভরে গেছে। নানা জনের নানা মতামতে প্রচণ্ড বিরক্ত লাগছিল কামালের। এর মধ্যেই দুলাভাই একপাশে টেনে নিয়ে বললেন,
-তোমার সাথে তো লাবণ্যর ভালই খাতির ছিল।
-হুমম
-ও কি কখনো কোন ছেলে টেলের সাথে খাতিরের কথা...
-নাতো। ওরকম কিছুর কথা কখনো বলেনি। ওর বান্ধবীদেরকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে?
-না, আমিতো কাউকে চিনি না। তোমার আপাতো অজ্ঞান হয়েই থাকছে বেশির ভাগ সময়।
-আচ্ছা আমি দেখছি।
***
অরণ্যও এ ব্যাপারে কিছু জানে না। লাবণ্যর মোবাইল থেকে ওর বান্ধবীদের ফোন করা হল। সবাই এক বাক্যে স্বীকার করল যে, লাবণ্যের কারো সাথেই এ ধরণের কোনো সম্পর্ক ছিল না। কথাটা বিশ্বাসযোগ্য, কারণ ওরকম কিছু হলে অন্তত একজন হলেও তো জানত। তারপর ও ওর রুমে গিয়ে ওর বই খাতা ডায়েরী তন্ন-তন্ন করে খোঁজা হল। কোন চিঠি বা চিরকুট পাওয়া যায় কিনা। কিন্তু কিছুই পাওয়া গেল না।
ওর পড়ার টেবিলের উপর খুব সুন্দর একটা মেয়ের ছবি। কামাল অরণ্যকে জিজ্ঞাসা করল ছবিটা কার?
অরণ্য বলল, ‘কেন লাবণ্যর।’
কামাল অবাক হয়ে বলল, ‘লাবণ্য এত সুন্দর হল কবে?’
-কেন, তুমি জানো না? তোমার এনে দেয়া বই দেখে রূপচর্চা করেই তো ও এত সুন্দর হয়েছিল।
-আমার এনে দেয়া বই? আমি কোনো রূপচর্চার বই এনে দেইনি তো।
-ও তো আমাদের তা ই বলেছিল।
কামাল চিন্তা করেও ভেবে পেল না যে কবে সে লাবণ্যকে রূপচর্চার বই এনে দিয়েছিল।
তবে চিন্তাটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না, আবার লাবণ্যকে খোঁজাখুঁজিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
কিছুতেই কিছু হল না, একটা জলজ্যান্ত মেয়ে উধাও হয়ে গেল। যেখানে যেভাবে সম্ভব খোজ করা হল, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া হল,পুলিশ দায়সারা গোছের কিছু কথা বার্তা বলে তাদের খোঁজাখুঁজি বন্ধ করে দিল। লাবণ্যকে আর পাওয়া গেল না।
৩.
লাবণ্য হারানোর পর প্রায় মাসখানেক পর হয়ে গেল। বাসা থেকে সমস্ত আনন্দ উধাও। কামাল অফিস থেকে বাসায় ফেরে অনেক দেরি করে। তেমন কিছুই করা হয় না এখন। এর মধ্যেই এক ছুটির দিনে দুপুরে শুয়ে আছে এমন সময় দুলাভাই ঘরে এলেন। হাতে একটা বই। এসে বিছানার কোনায় চুপচাপ বসে থাকলেন কিছুক্ষণ। দেখে কামাল উঠে বসল। তারপর বইটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘তোমার বই বোধহয়। লাবণ্যের ঘরে পেলাম। বলে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।’
কামাল গিয়ে জড়িয়ে ধরল। দুলাভাই ফুঁপিয়ে বলতে লাগলেন,
-বই পড়ার জন্য ওকে কত বকেছি। আর বকব না, ও যত ইচ্ছে বই পড়বে। আমি নিজে ওকে গল্পের বই কিনে দেব। ওকে ফিরে আসতে বল...
কামাল নিজেও কখন কাঁদতে শুরু করেছে, তা জানে না। কিই বা বলার আছে!
কামাল অবশ্য এখন বই পড়া ছেড়ে দিয়েছে। বইগুলোর দিকে তাকাতেই লাবণ্যর কথা মনে পড়ে। কতবার কল্পনা করেছে যে, কেউ যেন দরজায় উকি দিয়ে বলছে, ‘মামা একটা বই নেই।’
ও সব বই এগিয়ে দিয়ে বলছে, ‘একটা কেন, সব বই তোর।’
-স-অ-ব!
-হুম, শুধু আর হারিয়ে যাবি না, বল?
লাবণ্য জবাব দেয় না, আগের মতই বই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
কল্পনাটা আর সত্যি হয় না।
দুলাভাই চলে যেতে দেখা গেল যে, সেই বইটা, “বই”।
এটাই বোধহয় লাবণ্যর পড়া শেষ বই। বইটা দেখে মনে হচ্ছে আগের চেয়ে নতুন হয়ে গেছে। প্রচ্ছদেও নামটা আগে ক্ষয় হওয়া ছিল। এখন বেশ ঝকঝকে। ভিতরে পাতা মনে হল যেন আগের মত নরম নেই। পাতা উল্টে দেখি মোট পাতা ৬৩৫। মনে হল যেন আগের বার আরও কম ছিল। এসব দেখেই বইটার প্রতি আবার আগ্রহ বোধ করল কামাল।
অনেক দিন পর আবার বই পড়া শুরু করল সে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now