বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"ভূতুড়ে কান্ড"
হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
-----------------------
১ ম পর্ব
যে কাজ যুক্তি দিয়ে বোঝানো যায় না, কিংবা যে কাজ আশ্চর্যজনক ভাবে ঘটে যায় তাকে আমরা বলি ভূতুড়ে কান্ড।
আবার ভূতেরা নিজেরা যে কাজ করে তাকে তো ভূতুড়ে কান্ড বলেই।
আমাদের পরিবারে এমনই এক ভূতুড়ে কান্ড ঘটেছিল।
পরীক্ষা দিয়ে মামার বাড়ি বেড়াতে গিয়েছি। দিদিমা আর মামাদের আদরের সঙ্গে প্রচুর আম, জাম, জামরুল খাচ্ছি। তোফা আনন্দে সময় কাটাচ্ছি।
তিন মামা। বড়মামা রেলে কাজ করতেন। বৌ ছেলেমেয়ে নিয়ে শহরের বাসাবাড়িতে থাকতেন। মাসে একবার বাড়ি আসতেন।
তিনি মেজমামাকে তাঁরই অফিসে চাকরি পাইয়ে দেবার কথা বলেছিলেন ; কিন্তু মেজমামা রাজী নন। ছেলেবেলা থেকেই মেজমামা একটু ভিন্ন প্রকৃতির। সব ব্যাপারেই বেপরোয়া।
তিনি বলেছিলেন, " চাকরি-বাকরি আমার ধাতে পোষাবে না। আমি স্বাধীন ব্যবসা করব।"
তা মেজমামা স্বাধীন ব্যবসাই শুরু করেছিলেন। পাঁচ মাইল দূরের ভেড়ি থেকে মাছ কিনে গঞ্জের হাটে ব্যাপারীদের কাছে সেই মাছ বিক্রি করা। পরিশ্রমের কাজ কিন্তু ভাল টাকাই হাতে থাকত।
ছোটমামা কিছু করত না। মামাদের চাষবাসের জমি দেখত আর অবসর সময় জাল দিয়ে পাখি ধরত, কাঠি দিয়ে খাঁচা তৈরি করে তাতে পাখিগুলোকে রাখত। তবে বেশীদিন নয়। হঠাৎ একদিন খাঁচার দরজা খুলে পাখিগুলোকে উড়িয়ে দিত। এক নম্বরের খেয়ালী লোক।
আমার গল্প অবশ্য মেজমামাকে নিয়ে।
গল্পই বা বলি কেন, একেবারে আমার চোখে দেখা ঘটনা।
মেজমামা খুব ভোরে উঠে সাইকেলে রওনা হয়ে যেতেন। খুব ভোরে, তখন ভাল করে আলোও ফুটত না। রাস্তাটা অনেকটা পাকা নয়। মানুষের পায়ে পায়ে চলে সরু একটু রেখা। বেশ কিছুটা যাবার পর ইউনিয়নবোর্ডের পাকা রাস্তা।
একদিন ভোরেই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। থেকে থেকে বিদ্যুতের ঝিলিক আর মেঘের গর্জন। বোঝা যাচ্ছে একটু পরেই ঝড়জল শুরু হয়ে যাবে।
মেঘের ডাকে আমিও ভোর ভোর উঠে পড়েছি। উঠে মেজমামার যাওয়ার তোড়জোড় দেখছি।
দিদিমা বললেন, " ওরে, এই আবহাওয়ায় আজ না হয় নাই বেরোলি। আকাশের অবস্থা ভাল নয়। এখনই জোর তুফান উঠবে।"
ঝড়কে দিদিমা তুফান বলতেন।
মেজমামা হাসলেন। বললেন, " তাই বলে বর্ষাকালে বাড়ির বাইরে যাওয়া যায় না? আমার কাছে বর্ষাতি আছে, কোনও অসুবিধে হবে না।"
মেজমামা যখন বেরোলেন তখন ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি আরম্ভ হয়েছে। বাতাসও বেশ জোর।
আধ ঘন্টার মধ্যে দারুণ ঝড় উঠল। চারদিক অন্ধকার। বাজের শব্দে কান পাতা দায়। সেই সঙ্গে তুমুল বর্ষণ। এধারে ওধারে বড় বড় গাছ মড়মড় করে ভেঙে পড়ল কি বাড়ির চালা উড়ে গেল। ধসে পড়ল মাটির দেওয়াল। দিদিমার কথাই ঠিক। তুফানই বটে।
আমি জানলার ধারে চুপচাপ বসে প্রকৃতির তাণ্ডব দেখছি। একটু পরেই দিদিমা এসে আমার পাশে বসলেন।
বসেই আক্ষেপ করতে লাগলেন, " এই দূর্যোগে বাড়ির কুকুর বেড়াল বাইরে বের হয় না,আর এত বারণ স্বত্তেও ছেলেটা রাস্তায় বের হল!"
সত্যিই চিন্তার কথা। এই ঝড়জলে বর্ষাতি আর মেজমামাকে কতটুকু রক্ষা করতে পারবে। হাওয়ার দাপটে সাইকেল চালানোই মুশকিল। সাইকেল থেকে নেমে যে কোনও গাছের তলায় আশ্রয় নেবেন, তাও নিরাপদ নয়। মাথার ওপর গাছের ডাল ভেঙে পড়লেই হল।
সন্ধ্যা পর্যন্ত একটানা ঝড়বৃষ্টি চলল। দিদিমা খাওয়া দাওয়া ছেড়ে বিছানা নিলেন। মেজমামার নাম করে অঝোরে কান্না।
মেজমামা ফিরলেন রাত আটটা নাগাদ। সাইকেল নেই। হেঁটেই এসেছেন। হাঁটু পর্যন্ত কাদা। পরনের জামাকাপড় ছিন্নভিন্ন। বর্ষাতির খোঁজ নেই।
দিদিমা মেজমামাকে জাপটে ধরলেন। কিছুতেই ছাড়বেন না। শুধু কি জাপটে ধরা, ভেউভেউ করে কান্না।
মেজমামা বিরক্ত হয়ে বললেন, " আহ, ছাড়! জাপটাজাপটি আমার ভাল লাগে না। আমি মরছি নিজের জ্বালায়।"
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, " মেজমামা, তোমার সাইকেল? "
" বটগাছ চাপা পড়ে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে গেছে।"
" বটগাছ চাপা?"
" হ্যাঁ, কাঞ্চনতলার কাছে দারুণ ঝড় উঠল। বটগাছের ডাল মড়মড় করে ভেঙে পড়ল আমার ওপর। সাইকেল চুরমার হয়ে গেল। আমি ছিটকে পড়লাম মাটির ওপর। এই দেখ না"।
মেজমামা চুল সরিয়ে দেখালেন। মাথার এক জায়গায় রক্ত জমে কালো হয়ে আছে।
এরপর থেকে মেজমামা কেমন যেন বদলে গেলেন।
মাছের ব্যবসা বন্ধ। সারাটা দিন ঘুমিয়ে কাটাতেন। রাত্রে বেরিয়ে যেতেন। কখন ফিরতেন কে জানে!
দিদিমা অনেক বলতেন, কিন্তু মেজমামা নির্বিকার।
শেষকালে দিদিমার নির্দেশে আমি শুতাম মেজমামার সঙ্গে। অবশ্য আলাদা খাটে।
একদিন খুব ভোরে মেজমামার ডাকে ঘুম ভেঙে গেল।
" এই, এক কাপ চা খাওয়াতে পারিস?"
ঘরের কোণে স্টোভ ছিল। তাকের ওপর চা, চিনি, কাপ ডিশ। আগে আগে ভোরে ব্যবসার কাজে বের হবার সময় মেজমামা নিজে চা করে খেতেন।
ঘুম জড়ানো গলায় বললাম, " তুমি নিজে করে খাও না।"
মেজমামা যেন ভয় পেয়ে গেলেন, " না, না, আ...আ...আমি আগুনের কাছে যেতে পারব না। ভয় করে।"
" ভয় করে" কথাটা মেজমামার মুখে নতুন শুনলাম। মেজমামা চিরকাল দূর্দান্ত প্রকৃতির। দারুণ সাহস।
সেই দূর্ঘটনার পর থেকে মেজমামা কেমন যেন কুঁকড়ে গেছে। কারও সঙ্গে ভাল করে কথাও বলেন না। কেউ ডাকতে এলে বলে দেন, " বলে দাও, আমি বাড়ি নেই।"
আরও আশ্চর্যের ব্যাপার মাথার একদিকের রক্ত জমে থাকাটা যেন একইরকম রয়ে গেল। ওষুধপত্র মালিশ কিছুতেই কিছু হল না।
অগত্যা উঠে মেজমামাকে এক কাপ চা তৈরি করে দিলাম। নিজেও খেলাম এক কাপ।
তারপর এক রাতে এমন একটা ব্যাপার ঘটল, যাতে আমি বেশ ভয়ই পেয়ে গেলাম।
( পরবর্তী পর্ব আগামীকাল সন্ধ্যায়)
----------------
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now