বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ভুল ডিজিট

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান নাসরুল্লাহ (০ পয়েন্ট)

X মাত্র একটি ডিজিট। ওই একটিমাত্র ডিজিটের ভুল। ইচ্ছাকৃত নয় মোটেই। একেবারেই অসতর্কতাপ্রসূত সেই মধুর ভুল। সে জানত সেই ভুল থেকেই একদিন ফুল ফুটবে, ফুলের সৌরভে আমোদিত হবে বুকের বাগান! বাগান থাকবে আর সেই বাগানে পাখি থাকবে না, তা-ই কিছুতে হয়! অন্তরে অন্তরে বেশ কদিন দগ্ধ হয় এই প্রশ্নে- বনে যদি ফুটল কুসুম, নেই কেন সেই পাখি! শাকিল তখন আকাশ পাতাল ভেবে ভেবে হয়রান, কোন সুদূরের আভাস থেকে আনবে তারে ডাকি! না, সে পাখিকে ডেকে আনাও লাগেনি। উড়তে উড়তে ঘুরতে ঘুরতে সেই পাখিই একদা ডানা মেলে ঢুকে পড়েছে শাকিলের দিগন্তে। সে পাখির ডানায় রৌদ্রের গন্ধ। শাকিল তখন আনন্দে আত্মহারা, উদ্বেগে দিশাহারা- এ পাখির জন্যে সে কোথায় পাবে ছায়া-সুনিবিড় শান্তির নীড়! আহা রৌদ্রদগ্ধ পাখি, মেঘভারানত একটুখানি শীতল ছায়া তো সে চাইবেই। কিন্তু একটি ভুল ডিজিটের কাছে এ কোন প্রার্থনা। সমুদয় ঘটনাপ্রবাহ তো এগিয়ে চলে ওই ভুল ডিজিটের সূত্র ধরেই। ব্যাপারটা একটু খোলাসা করা দরকার। শাকিল তখন পরিপূর্ণ বেকার। ঢাকা শহরে দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাসায় নিতান্ত গলগ্রহ হয়ে থেকে। দু’দুটো ছেলেমেয়েকে সকাল সন্ধ্যায় পড়ানোর বাইরে আর কোনো কাজ নেই। সারাদিন টো টো করে ঘোরে কাজের সন্ধানে। হাতে বায়োডাটার খাম, পকেটে সস্তায় কেনা চায়না মোবাইল সেট। ডুয়েল সিম। কখন কোনটায় কম রেটে কথা বলা যায়, সেইসব হিসাব নিকাশ করে ফোন ব্যবহার করে। একটি গ্রামীণ অপরটি বাংলালিংক। বেশ সক্রিয়ভাবে ভাবছে, ইয়ারটেলেরও একটা সিম কিনে ফেলবে; ওদের নাকি বেকার সহায়ক প্যাকেজ আছে। এরই মাঝে অঘটনটা ঘটে গেল। বেকার যুবক শাকিলের কি তখন মাথা ঠিক আছে! মোবাইলের নম্বর টিপতে গিয়ে একটা ডিজিট তো ভুলভাল হতেই পারে! তাই বলে সেই ভুল এভাবে স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে! শাকিলের বেলায় হয়েছে তাই। দ্রুত হাতে এক সময় বায়োডাটার খামের কোনায় মোবাইল নম্বরটি লিখে নিয়েছিল সে। রেফারেন্সেরও রেফারেন্স। বেকার জীবনে কিছুই উপেক্ষা করার নয়। ‘যেখানে দেখিবে ছাই…’ তত্বে বিশ্বাস রাখতে হয়। নীলমনিগঞ্জ হাইস্কুলের ধর্মীয় শিক্ষক মৌলানা আব্দুল হাকিম পুত্রপ্রতিম ছাত্র শাকিলের চাকরির জন্যে সুপারিশ করেন তাঁর বড় সম্মন্ধির কাছে। পুত্রপ্রতিম বললে তো হবে না, তাঁর কোনো পুত্র সন্তান নেই, আছে তিন কন্যা। ধর্মকর্মে শাকিলের বিশেষ মতি না থাকলেও শাকিলের বাবা তাঁর অনুগত শিষ্য হবার কারণে মৌলানা সাহেব এ পরিবারের সবার প্রতি এক প্রকার স্নেহ এবং দায়িত্ব বোধ করেন। স্থানীয় কলেজ থেকে বিএ পাশ করার পর শাকিলকে ঠেলে ঢাকায় পাঠানোর পেছনে তাঁর ভূমিকাও কম নয়। লাজুক প্রকৃতি এবং কবি-স্বভাবের কারণে বাড়ি ছাড়ার প্রশ্নে তার নির্লিপ্তি দেখে মৌলানা সাহেব সাহস যোগান বাইরে পা না বাড়ালে তোমার চোখমুখ খুলবে? জীবনের তাগিদে আমি বাড়ি ছেড়ে আসিনি? সেই কোথায় নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ, আর কোথায়….। কথা শেষ হয় না তাঁর, গলা ধরে আসে। পেটের ধান্দায় এ জীবনে লড়াই তো তিনি কম করেননি! শেষে নবীজিকেও তিনি টেনে আনেন দৃষ্টান্ত হিসেবে। নবী কেন জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করেছিলেন সেই প্রেক্ষাপটও তুলে ধরেন। তো সেই মৌলানা সাহেবের সম্মন্ধি একদিন একটি মোবাইল নম্বর দিয়ে জানান, যা বলার তা বলাই আছে, ওই নম্বরে ফোন করে জাফর সাহেবের সঙ্গে দেখা করলেই ব্যবস্থা হয়ে যাবে। শাকিল প্রথমে বুঝতেই পারে না- ব্যবস্থা মানে কী! চাকরি পাওয়া কি অতোই সোজা! খামের কোনায় লেখা মোবাইল নাম্বারের দিকে সে বারবার তাকায়, ডিজিটগুলো বারবার পড়তে পড়তে এক রকম মুখস্ত-ই হয়ে যায়। ছ’সাত মাস নানান দরজায় ধাক্কা খেয়ে সে ভাগ্য খোলার চাবি পেয়েছে যেন। একদিন কাঁপা কাঁপা হাতে তার মোবাইল সেটের বাটনগুলোতে আঙুল ছুঁইয়ে নেয়। তারপর সুনির্দিষ্ট ডিজিটে চাপ দেয়। ওপারে রিং হয়। এপারে ভেসে আসছে রবীন্দ্রসংগীতের মূর্ছনা-‘তুমি কোন কাননের ফুল, কোন গগনের তারা…।’ বাব্বা! প্রাইভেট ফার্মের এমডির ফোনে এই রকম ওয়েলকাম টিউন! জাফর সাহেব তো বেশ রুচিশীল মানুষ! শাকিলের মন ভরে যায় আনন্দে- তাঁর অধীনে চাকরি বোধ হয় ক্লান্তিকর হবে না। ফোনটাই তো রিসিভড হচ্ছে না! ব্যস্ত মানুষ, আবারও বিরক্ত করা ঠিক হবে? কিন্তু চাকরিটা যে খুবই দরকার শাকিলের। মিনিট পাঁচেকের মাথায় সে আবার ডায়াল করে। রিং হয়। সে ওয়েলকাম টিউন শুনতে পায় ‘….তোমায় কোথায় দেখেছি, যেন কোন স্বপনের পারা।’ শাকিল অনুমান করে রবীন্দ্রসংগীতের ভক্ত যখন, নিশ্চয় জাফর সাহেব তিরিক্ষি মেজাজের মানুষ হবেন না। কিন্তু ফোনটা ধরবেন তো! ফোন করেই তো তাকে জেনে নিতে হবে, তিনি কখন সময় দেবেন, কোথায় তাঁর অফিস! নাহ এভাবে কতবার বিরক্ত করা যায়! হতাশার ঘন কালো মেঘ এসে শাকিলের আকাশে থমকে দাঁড়ালে সহসা বিদ্যুৎ ঝলসে ওঠে, ব্রজপাতের মতো কড়কড়ে শব্দে বেজে ওঠে তার মোবাইল ফোন। মনিটরে চোখ পড়তেই লাফিয়ে ওঠে হৃৎপিণ্ড। এ কী! সেই অ-ধরা নম্বর থেকে ফোন আসছে! এখন কী করবে শাকিল, কেটে দিয়ে আবার ব্যাক করবে! দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে বিমূঢ় হয়ে পড়ে, শেষমেষ সবুজ রংয়ের ইয়েস-বাটন টিপেই ফ্যালে- হ্যালো! স্লামালেকুম। আমি…’ ওপার থেকে রিনরিনে এক নারীকণ্ঠ ভেসে আসে, ‘আপনি কি এই নম্বরে ফোন করেছিলেন?’ ‘জ্বি, আমি শাকিল। নীলমনিগঞ্জ হাইস্কুলের ধর্মীয়- শিক্ষক মৌলানা….’ ‘আপনি কাকে চান?’ ‘না মানে, আমি জাফর স্যারের সঙ্গে একটু…’ ‘সরি। রং নাম্বার।’ শাকিল আকাশ থেকে আছড়ে পড়ে মাটিতে- রং নাম্বার! বাঁশপাতার খামের কোনায় লেখা নম্বরটির সঙ্গে মোবাইলের স্ক্রীনে উদ্ভাসিত নম্বর মিলিয়ে দেখার উদ্যম পায় না। তবু দ্রুত চোখে একবার মিলিয়ে নেয়Ñজিরো ওয়ান সেভেন ওয়ান সিক্স…. এই তো সব ঠিকই আছে। ভুলটা কোথায়! হঠাৎ কোথা থেকে কী হয়ে গেল। জগৎ সংসারের সকল ঘটন-অঘটনের মূলে নারীর উপস্থিতি থাকতেই হবে! জাফর সাহেবের পিএস টিএস নয় তো! এ কোন গেরো বাঁধল সম্মুখে? কিন্তু তাকে যে পৌঁছতেই হবে জাফর সাহেবের কাছে! এখন কী করবে সে! আবার সেই একই নম্বরে ফোন করবে? আবারও সেই ভ্রান্তি! আবার অপমান হওয়া! ভেতরে ভেতরে ভয়ানক বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত বোধ করে। ক্লান্তিতে নুয়ে পড়ে শরীর মন। মোবাইল সেটের নম্বরগুলোতে চোখ পড়তেই কী যে অবসন্নতায় পেয়ে বসে ভেতরে ভেতরে। তখন ভাবে-আজ থাক, কাল না হয় দেখা যাবে! তাতে গোটা জগৎসংসারে কার এমন কী-ই বা ক্ষতি বৃদ্ধি ঘটবে! পরদিন সকালে অন্যান্য দিনের মতোই নাগরিক আকাশে গনগনে সূর্য ওঠে, কাকেরা মেতে ওঠে প্রাত্যহিক কোলাহলে, যানবাহনের চেতনাবিধ্বংসী শব্দে আড়মোড়া ভাঙে উত্তপ্ত রাজপথ; তবু নৈমিত্তিক এই দিনটি শাকিলের কাছে আসে অন্য রকম হয়ে। চাকরির ইন্টারভিউ দেওয়ার মতো প্রস্তুতি গ্রহণের পর জাফর সাহেবকে ফোন করতেই সে হাতের মুঠোয় পেয়ে যায় ভাগ্যবদলের চাবি। না কি আলাদীনের চেরাগ বলবে একে! রবীন্দ্রসংগীতের ওয়েলকামটিউন ছাড়াই জাফর সাহেবকে খুব ভালো লাগে, সহৃদয় মানুষ মনে হয়। রাশভারি গুরুগাম্ভীর্য নেই। সামান্য হা করতেই আন্তরিকতা দিয়ে সবটুকু বুঝে নেন। মোবাইল ফোনে কথা বলার পর ঘন্টা ছয়েকের মধ্যে মতিঝিল অফিসে সাক্ষাৎ, অতপর চাকরি। হাতে হাতে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার। সুচারুভাবে সব কিছু সাজানো। সব কিছু যেন স্বপ্নের ঘোরের মধ্যে ঘটে যায়। দিনশেষে বাসায় ফেরার পর সেই ঘোর না কাটতেই সে মোবাইল সেট নিয়ে গবেষণায় বসে- ভুলটা তাহলে কোথায়! সেই একই নম্বর, অথচ সেই নারীকণ্ঠ নেই, সেই রবীন্দ্রসংগীত নেই; ব্যাপারটা কী! আগের দিনের কললিষ্ট বের করে সে খুব সতর্ক দৃষ্টিতে নম্বর মেলায়। অচিরেই ধরা পড়ে একটিমাত্র ডিজিটের পার্থক্য। কোন কাননের ফুলের শেষ ডিজিট হচ্ছে নাইন; আর জাফর সাহেবের শেষে আছে সিক্স। ইংরেজি অক্ষরে উল্টোপাল্টা চেহারা এই দুটি ডিজিটের। পুরো নম্বরে নয়, গোলমালটা ধরা পড়ে শেষ ডিজিটে এসে। ভুল নম্বর জেনেও শাকিলের খুব ভালো লাগে ওই মোবাইল নম্বর। ইচ্ছে করে, ওই নম্বরে আবার ফোন করতে, আবারও কোন কাননের ফুল শুনতে ইচ্ছে করে। না না, শুধু গান নয়, সেই কণ্ঠে শুনতে ইচ্ছে করে-‘সরি! রং নাম্বার।’ দিনে দিনে ইচ্ছেটি প্রবল অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। এক সময় নিজের সঙ্গে তর্ক করে, কী হয় ফোন করলে? সেদিন তো বলার মতো পরিচয়ই ছিল না। বেকার বাউণ্ডুলে অথবা নীলমনিগঞ্জ হাইস্কুলের শিক্ষক মৌলানা আব্দুল হাকিমের ছাত্র- এ দুটির মধ্যে একটিও কি উপস্থাপনযোগ্য পরিচয় হলো! হোক প্রাইভেট ফার্মের চাকরি, তবু সেটাই আজ তার নিজস্ব পরিচয়। এ পরিচয় সে নিজে মুখে বলবে না কেন! সগৌরবে বলবে। সগর্বে বলবে- সেও গান ভালোবাসে, রবীন্দ্রসংগীতের ভক্ত। সেদিন একটিমাত্র ডিজিটের ভুলের জন্যে সে খুব দুঃখিত, আবার গোপনে গোপনে আনন্দিতও। একজন সংগীতপ্রিয় মানুষ এই অনুতাপ এবং আনন্দের কিছুই বুঝবে না? সামান্য একটি ভুল থেকে ধীরে ধীরে কীভাবে ফুল ফুটতে পারে, সে কথা আদৌ বুঝবে না? ভেতরে ভেতরে সাগর সমান আকুলতার ঢেউ, তবু জেনে শুনে ভুল নম্বরে ফোন করতে হাত সরে না শাকিলের। মনে মনে নিজেকে সাজিয়ে গুছিয়ে তোলে, ভুলের বৃন্তে নতুন ফুল ফোটায়, সে ফুলের মদির গন্ধে বুঁদ হয়ে থাকে; কিন্তু সেই বিশেষ নম্বরে ফোন করা আর হয়ে ওঠে না। এরই মাঝে একদিন মৌলানা সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে যায় শাকিল। এই দুর্মূল্যের বাজারে এত সহজে একটা চাকরি পাওয়া কি চাট্টিখানি কথা! সেই সুবাদে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে কৃতজ্ঞতা জানাতেই তিনি একগাল হেসে হঠাৎ বিকট শব্দের একটি বোমা ফাটান। তিনি অপকটেই জানান, তাঁর ভাগ্নি অর্থাৎ মৌলানা সাহেবের বড় মেয়ে সুরাইয়ার বিয়ের জন্যে মামা হিসেবে এই চাকরিদানের দায়িত্বটুকু পালন করেছেন মাত্র। চা-বিস্কুটে আপ্যায়নের পর প্রবল কৌতূহলে তিনি জানতে চান-তা বাবাজি বিয়েটা কবে নাগাদ সারতে চাও। জবাব দেবে কী আকস্মিক বোমার শব্দে শাকিলের বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। কর্ণকুহর বধির হয়ে যায়, চৈতন্য যেনবা স্তব্ধ হয়ে যায়। তবু সে অস্পষ্ট শুনতে পায় ভুল নম্বরের সেই ওয়েলকাম-টিউন- তুমি কোন কাননের ফুল…।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৭৮ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ভুল ডিজিট

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now