বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
পূজার কদিন আমাদের বাড়ি-বাড়ি পূজা দেখা, বাড়ি-বাড়ি পূজার প্রসাদ গ্রহণ, নিরন্তর ষষ্ঠী থেকে দশমী বাড়ি-বাড়ি এই প্রসাদ গ্রহণে আমাদের যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। মুড়াপাড়ায় বড়-বড় জমিদার তাদের আমলাদের ছেলেপেলেদের থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত রাখত।
পঞ্চমীতে মুড়াপাড়া যেতাম। একাদশীর দিন নৌকায় বাড়ি ফিরতাম।
আমাদের বাড়িতে গৃহদেবতার নিত্যপূজা ছাড়াও কার্তিক পূজা হতো ঘটা করে। আশ্বিন-কার্তিক বলতে গেলে পূজার মাসই বলা যায়। ঠাকুরদা মারা গেলেন। আশ্বিনের এক রাতে, পুবের ঘরে মা আমাদের নিয়ে থাকতেন। তিনি আমাদের ডেকে তুললেন।
ঘুম থেকে উঠে দেখি উঠোনে ঠাকুরদা শুয়ে আছেন। তিনি যে মৃত বোঝার বয়স ছিল না, এইটুকু শুধু মনে আছে। ভোররাতের দিকে বেশ ঠান্ডা পড়ায় ঠাকুরদার পাশে বসে ছিলাম। কখন ঠাকুরদাকে জড়িয়ে ঘুমিয়েও পড়েছিলাম লেপের নিচে। পুকুরপাড়ে ঠাকুরদাকে নিয়ে যাওয়া হয়। আত্মীয়স্বজনে ভর্তি বাড়িটা। পুকুরের দক্ষিণপাড়ে ঠাকুরদার দাহ হয়।
ঠাকুরদা মারা গেছেন, আত্মীয়স্বজনে ভর্তি বাড়ি। বাড়ির সবাই আছে। কেবল আমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথায় গেল ছেলেটা! - মুখাগ্নির সময় টের পাওয়া গেল, বাড়ির সেই ছেলেটা লেপের নিচে ঠাকুরদাকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে।
নিখোঁজ থাকার পেছনে আমারও দোষ নেই।
ঠাকুরদার মৃত্যু নিয়ে সবাই ব্যস্ত। অঞ্চলের বিখ্যাত কবিরাজ তারিণী সেন ঘণ্টায়-ঘণ্টায় ওষুধ পালটে দিচ্ছেন। ঠাকুরদার আচ্ছন্ন অবস্থার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।
আমি সেই যে ঠাকুরদার পাশে বসেছিলাম, বসেই আছি।
রাত বাড়লে কখন ঠাকুরদার পাশে লেপ টেনে শুয়ে পড়েছি খেয়াল নেই - আত্মীয়স্বজনের তো শেষ নেই - শত হলেও আমার ঠাকুরদা বড় কর্তা বলে চিহ্নিত - আবার বহু মানুষের গুরুঠাকুর - খবর তো এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকে না।
খবর ছড়ায়।
লোকজন লাইন দিয়ে উঠে আসছে।
আমার ঠাকুরদা কারো গুরুঠাকুর, আবার কারো রাজপুরোহিত। মুড়াপাড়ার জমিদার দীনেশবাবু ঘোড়ায় চড়ে চলে এসেছেন, জমিদার তারকবাবুর হাতিও দূরে দেখা যাচ্ছে, তিনিও বোধহয় আসছেন - বাইরের উঠোনে সামিয়ানা টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণের ঘরে শিষ্য এবং যজমানদের ভিড়। জায়গা হচ্ছে না। পুকরপাড়ে অর্জুনগাছের ছায়ায় শতরঞ্চি বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে - পুকুরের দক্ষিণপাড়ে ভিড়।
আমাদের রনাদা, ধনাদার একদ- বিশ্রাম নেই। নানা প্রকারের হুঁকো, জাত বিচারে হুঁকোর বন্দোবস্ত - সেজন্য রমণীদা সম্মান্দির বাড়ি থেকে চলে এসেছেন - তিমি কাকা, ভবানী জেঠা, চিনি কাকা, বংশের যে যেখানে আছে সবাই হাজির।
একমাত্র বড় জেঠামশাই দক্ষিণের ঘরে একা নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলছেন।
ঠিক একা বলা যাবে না। তবে তিনি কারো সঙ্গে কথা বলছেন না।
তিনি তাঁর মতো ইজিচেয়ারে পা তুলে আরাম উপভোগ করছেন।
মানুষ মরে গেলে ঘরে রাখতে নেই।
আমার ঠাকুরদার ঊর্ধ্বশ্বাস উঠে গেছে। রাতের দিকেই যায়-যায় অবস্থা, দীনবন্ধু কাকা তাঁর শিয়রে বসে আছেন। আত্মার কী ইচ্ছে কেউ জানে না। কেবল একটা বিষয়েই সকলের নজর, আত্মা যেন ঘরের ভেতরে দেহত্যাগ না করে।
ঠাকুরদাকে সেজন্যে উঠোনে রাখা হয়েছে - মুক্ত হাওয়া, মুক্ত আকাশের নিচে তাঁর প্রাণবায়ু অনন্তের সঙ্গে মিলে যাক - এই ইচ্ছা বাবা-কাকাদের। সম্মান্দির বাড়ি থেকে ভবানী জেঠা খবর পেয়ে রওনা দিয়েছেন। ছয় ক্রোশ রাস্তা তাঁকে হেঁটে আসতে হবে। ঠাকুরদার নির্দিষ্ট আমগাছের গোড়ায় দুজন লোক বসে আছে। হাতে কুড়ুল। গাছটাকে কাটা হবে, তারপর চেলাকাঠ করে ঠাকুরদাকে শুইয়ে দেবে চেলা কাঠের ওপর।
বল হরি, হরি বল।
ঠাকুরদাকে তোলা হচ্ছে -
বাবা-কাকারা বারবার আমার খোঁজ করছেন।
ভোলা গেল কোনখানে?
ভোলা গেল কোথায়?
রাতে বেশ ঠান্ডা পড়েছে।
আমিও ঠান্ডায় কিছুটা কাতর। একমাত্র ঠাকুরদার লেপের তলায় কিছুটা উষ্ণতা আছে। প্রথমে পা ঢুকিয়ে দিতেই টের পেলাম বেশ আরামদায়ক বোধ হচ্ছে। গ্রামের মানুষজনের ভিড় সারাবাড়িতে, ঠাকুরদার যজমান গ্রামের পর গ্রাম ছড়িয়ে আছে - ঠাকুরদার অন্তিমকালের যে আর দেরি নেই - হেঁচকি থেমে গেলেই শেষ - প্রাণবায়ুকে দেখা যায় কিনা জানা নেই। তবু আমার কৌতূহল ঠাকুরদার প্রাণবায়ু শরীর থেকে বের হবার সময় যদি জোনাকি পোকার মতো খপ করে ধরে ফেলা যায়, যাবেটা কোথায়।
যখন বুঁদ হয়ে আছি - হেঁচকি থেমে গেল - সারা বাড়িময় ঠাকুরদাকে ঘিরে রেখেছিল যারা, তারা আর মুহূর্ত দেরি করলেন না - বল হরি, হরি বল, বলে বিছানার চার কোনায় ধরে পুকুরপাড়ে হাঁটা দিলো -
বড়দা চেঁচাচ্ছে, এই ভোলা পৈঠায় বসে থাকলি কেন!
ছোটকাকা চেঁচাচ্ছে, কান্নার সময় পাওয়া যাবে, আগে এদিকে আয়।
বাবার বিছানা ধর।
আমরা নাতিরা, ঘিরে ফেললাম ঠাকুরদার বিছানা। ব্রাহ্মণের মৃতদেহ ছোঁয়াছুঁয়ি হয়ে যায় সেই আতঙ্কও কম নয়। মৃতের স্পর্শ যেন কোনো অব্রাহ্মণ না পায়, বামুনের মড়া বামুনকেই বহন করতে হবে - দীনবন্ধু কাকার তদারকিতে অর্জুনগাছের নিচে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে - লাহুরচরের শীতল চক্রবর্তী সঙ্গে আছেন। শ্মশানের খালকাটা সবে শেষ করছেন তিনি।
একটি আস্ত আমগাছের গুঁড়ি ফালা-ফালা করে দীনবন্ধু কাকার নির্দেশে চিতা সাজানো হচ্ছে। পাটকাঠির আঁটি নামে-নামে বিলি করা হচ্ছে - অর্থাৎ আমরা সবাই হাতে পাটকাঠির আঁটি নিয়ে প্রস্ত্তত। এখনো মেলা কাজ বাকি।
আমার বড় জেঠিমা দুদু কাকাকে বললেন, আপনার ঠাকুরভাই তো কাল ফেরেননি।
আমার পাগল জেঠামশাই খুশিমতো গাঁয়ে-গাঁয়ে ঘুরে বেড়ান, গ্রামের পর গ্রাম সব আমাদের যজমান। আমার সেজ জেঠামশাই এবং বাবা মুড়াপাড়ার জমিদারি সেরেস্তায় আছেন, তাদেরও খবর পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে মৃত্যু নিশ্চিত নয়। উপসর্গ দেখে মৃত্যু স্থির করতে হয়, শ্বাসক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলেই যে মৃত্যু হয়, আমার ঠাকুরদার বেলায় তা বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
আমার ঠাকুরমা ঠাকুরদার শিয়রে আজ দুদিন টানা বসে আছেন।
তাঁর শাঁখা-সিঁদুর মুছে দিতে হবে।
ঠাকুরদার প্রাণবায়ু গত হলেই কাজটা করার কথা।
গোপাটে সকাল থেকেই লোক জমায়েত হচ্ছে - শত হলেও আমার দাদু এ-অঞ্চলের ঠাকুরকর্তা, শুভ সময় কখন একমাত্র তিনিই বলে দিতে পারেন, তাঁর নির্দেশমতো সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত স্থির হয়।
পঞ্জিকার পাতা উলটে তিনি কাউকে বলে দেন। সূর্যোদয়, সূর্যাসেত্মর সময় জানার জন্য সকাল থেকেই লোক সমাগম হতে থাকে।
আমাদের বাড়ির সামনে উঠোন, পেছনে উঠোন - তাছাড়া অন্দরের উঠোনও একটি আছে। অন্দরের উঠোনের দুপাশে দুটো ঘর। একটা নিরামিষ ঘর আর একটি আমিষ ঘর।
বড় জেঠিমা নিরামিষ ঘরে ঠাকুরমার নিরামিষ রান্নার বন্দোবস্ত করে থাকেন। ঠাকুরদার মৃত্যুর পর নিরামিষ ঘরের দায়িত্ব এই দুজনের। অর্থাৎ আমার ঠাকুরমা, নয় জেঠিমা। - সবারই বয়েস হয়েছে। তারপরের ধাপে, আমার ধন-জেঠিমা - শেষের ধাপে রাঙ্গা কাকিমা, ছোট জেঠিমা - এসব নানা ধাপে নিরামিষ-আমিষ রান্না হয়। আমার মেলা জেঠিমা-কাকিমা। বাবা-জেঠারা প্রবাসে থাকেন, দুদু কাকা বাড়ির গৃহকর্তা। তাঁর-ই অনুশাসনে সংসার চলে।
আমাদের ভাইবোন মেলা।
খুড়তুতো, জেঠতুতো ভাইবোন মিলে আমরা আঠারোজন।
ছোট কাকার স্ত্রী গর্ভবতী।
অন্দরের উঠোনে একটি চিরস্থায়ী অসুজ ঘর তৈরিই থাকে।
কাকিমা-জেঠিমারা প্রয়োজনমতো সেই অসুজ-ঘরে ঢুকে যান।
বাবা-জেঠারা কিংবা কাকারা অধিকাংশই প্রবাসে, শুধু দুদু কাকা বাড়ির গৃহকর্তা - জমিজমা দেখাশোনার ভার তাঁর ওপর। আমরা কেউ-কেউ সম্মান্দির বাড়িতেও বড় হয়েছি। পাশের গাঁয়ের মাইনর স্কুলের পাঠ শেষ করে সম্মান্দির বাড়িতে চলে যাই। একইসঙ্গে ঠাকুরভাইও যান। আমার ছোটদাদু রামচন্দ্র মুড়াপাড়ার জমিদারিতে কাজে ঢুকেছিলেন - আমার বাবাকেও তিনি সঙ্গে নিয়ে যান। সেই থেকে বাবাও তাঁর খুড়ামশাইয়ের সঙ্গে থেকে জমিদারির আদায়পত্রের কাজ শিখে নেন।
আসলে আমি দুটো বাড়িতেই বড় হয়েছি।
দেশভাগ হয়ে যাওয়ায় প্রথমে রাইনাদি বাড়ির সবাই হিন্দুস্থানে রওনা হয়ে যান।
তবে দেশের বাড়ির দুই বাড়িরই কাকা-জেঠারা দেশ ভাগ হয়ে যাওয়ায় হিন্দুস্থানে রওনা হয়ে যান। তখন বর্ষাকাল - দুটো তিন মালস্না নৌকায় মা, কাকিমা-জেঠিমারা যে-যার প্রিয় টুকিটাকি জিনিসপত্র সব নৌকায় তুলে নেন। বাকি তৈজসপত্র অ-দামে
কু-দামে বিক্রি করে দেওয়া হয়। আমার ঠাকুরদার বদ্রি হুঁকোটির প্রতি টোডারবাগের হাজি আবদুলস্নাহর চিরদিনই লোভ ছিল। ঠাকুরমা হাজি আবদুলস্নাহকে ডেকে বললেন, নে, রেখে দে। আমাদের কথা মনে হলে টিকা জ্বেলে মনের সুখে হুঁকো টানিস।
সোনা-জেঠামশাই বাদ সাধলেন।
না দেওয়া যাবে না, বংশের হুঁকো আর যা-ই করা যাক তোদের দেওয়া যাবে না।
হুঁকোটি আমাদের সঙ্গেই যাবে। সব স্মৃতিই বিনাশ,
বাপ-ঠাকুরদার স্মৃতি এই বদ্রি হুঁকো কিছুতেই দেওয়া যাবে না।
বাড়িঘর সবই বিক্রি হয়ে গেছে - টিনের চালগুলি আমরা নৌকায় ওঠার আগে খুলে ফেলা হলো।
অবশ্য আমরা তখন গয়না নৌকায় - ফাউসার খালে তিন মালস্না নৌকা দুটি নোঙর ফেলে আছে - বাড়ির কোষা নৌকাটিতেও তোলা হয়েছে বড়-বড় টিনের বাক্স - টিনের চাল খুলে দেওয়া হলে আমরা গিয়ে গয়না নৌকায় আশ্রয় নিলাম। বদুরুজ্জা সাহেব
আমাদের ঘরবাড়ি ক্রয় করেছেন। তাঁর বাড়ির লোকজন যে-যার ভাগমতো ঘরে-ঘরে ঢুকে গেছে - নৌকায় বসে কিছু-কিছু দৃশ্য দেখা যায়। আমার খুবই কান্না পাচ্ছিল, মা-জেঠিমারাও ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। জাফরুলস্না সাহেব বললেন, দেশ তো অদৃশ্য হয়ে যায় না। মন খারাপ লাগলে ঘুরে যাবেন - থাকা-খাওয়ার অসুবিধা হবে না। আপনেরা আমাগো চিরকালের মেমান - তা কি ভোলা যায়! দেশ ভাগ হয়েছে তো কী হয়েছে - দিল তো ভাগ হয় নাই।
আমরা তখন দশম শ্রেণির ছাত্র। বড়দা এবং আমি থাকি সম্মান্দির বাড়িতে। বড়দা আমার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়। দেশ ভেঙে যাচ্ছে - বড়দার মানে উমাশঙ্কর পরীক্ষায় বারবারই ফেল করার অভ্যাস।
আমরা দুজনেই একসঙ্গে টেস্ট পরীক্ষা দিই। তখন রাইনাদির বাড়ি থাকি।
রাইনাদির বাড়ির অস্তিত্বও আর নেই।
বদুরুজ্জা সাহেব তাঁর পরিবার নিয়ে আমাদের বাড়িতে উঠে গেছেন। বাবা গৃহদেবতা গলায় ঝুলিয়ে হিন্দুস্থানে রওনা হয়ে গেছেন। আমাদের টেস্ট পরীক্ষা হলেই আমরাও চলে যাব। পাকিস্তানে থাকার আর প্রয়োজন নেই। আমাদের ঠাকুর দেবতা মেলা, রাধা গোবিন্দের বড়-বড় দুটো পেতলের মূর্তি, শালগ্রাম শীলা, একটি নৃসিংহ কবচ, আমার দুদু কাকা গলায় ঝুলিয়ে বাড়ি থেকে
বের হয়ে গেলেন। ঠাকুর দেবতারাও আমাদের সঙ্গে দেশছাড়া হলেন।
এখন আমাদের সম্বল একমাত্র আমার মেজকাকা। তিনি বহরমপুরে থাকেন, একটি প্রাচীন শ্যাওলাধরা বাড়ি আমাদের বসবাসের জন্য ব্যবস্থা করা হলো। বহরমপুর শহরে থাকেন তিনি।
শহরে মাস্টারদা বললেই তাঁকে সবাই চিনত। মেজকাকা খাদি- ভা-ারে খাগড়ার বাজারে একটি সেলাই কল সম্বল করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। জ্ঞান কাকা খাদি-ভা-ারের মালিক। তিনি স্বদেশি, মেজকাকার তিনি আশ্রয়দাতা।
বহরমপুরের নতুন বাজারে তালই বাবুর একটি অতিকায় লজঝড়ে দুতালা বাড়ি। মেজকাকা সেই বাড়ির দোতলায় একটি অংশে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে থাকতেন। নিজের বসবাস থেকে উচ্ছেদ হওয়া যে কত মর্মান্তিক বাড়িটিতে থাকার সময় টের পেয়েছিলাম।
মেজকাকার নির্দেশেই ঘরবাড়ি বিক্রি। খাদি-ভা-ারের এককোনায় একটি সেলাই কল নিয়ে তাঁর দর্জির দোকান।
দোকানটি খোলা, বন্ধ করা, ধূপ-ধুনো দেওয়া, ঘর ঝাঁট দেওয়ার কাজ আমার মেজকাকাই করেন। দোকানে তাকে-তাকে সাজানো থাকে সিল্ক, তসর, মটকার থান। আমার কাকা এককোনায় একটি সেলাই কল সম্বল করে খদ্দেরের আশায় বসে থাকেন।
খদ্দের হচ্ছে লক্ষ্মী। তার মনোরঞ্জন করাও কাজ তাঁর। জ্ঞান কাকা সকালের দিকে একবার আসেন।
লাল মলাটের একটি খাতায় দৈনিক বেচাকেনার হিসাব থাকে। তাছাড়া খদ্দেরদের মাপমতো পাঞ্জাবি, হাফশার্ট, বেস্নজার মাপ নিয়ে খাতায় লেখা হয়।
জ্ঞান কাকা অবসর বুঝে আসেন। খাতাটি উলটেপালটে দেখেন - এই পর্যন্ত, তারপর জ্ঞান কাকা এলে শহরের গণ্যমান্য লোকেরাও ভিড় করেন। জ্ঞান কাকা রাজনীতি করেন। তিনি কংগ্রেসের জেলা সম্পাদক, তাঁকে নানাজনের আবদারও মেটাতে হয়।
জ্ঞান কাকা কংগ্রেসের জেলা সম্পাদক। তাঁর দায়িত্বের শেষ নেই। মিছিল, মিটিং এবং আলোচনা চলে। আমার মেজকাকার নির্দেশেই পেয়ালাভর্তি চা আসে। সকালে তিনি দোকানে বসেই পার্টির কাজকর্মের তদারকি করেন।
মেজকাকার সামনে সেলাইকল।
খাতায় খদ্দেরদের নাম লেখা, ডেলিভারির দিন উল্লেখ করতে হয়।
খাদি-ভা-ারের খ্যাতিও কম নয়।
আসলে খাদির শার্ট-পাঞ্জাবির ওয়েস্ট কোট কার কবে ডেলিভারি সব কিছুই ফর্দমতো দিতে হয়। এজন্য খাদি-ভা-ারের সুনামও আছে - কাজের ভিড় লেগেই থাকে। আমার কাকার ফুরসত থাকে না।
এরপরে আছে বাড়ির বাজার - কাকা থলে হাতে ঢুকলে বাজারও হয়ে যায়। কাকার চেলারা খুব সস্তায় প্রয়োজনীয় সামগ্রী থলেয় ভরে দেন। দোকান ফেলে কাকাই জ্ঞান কাকার বাজার করে দেন। তিনি একবার উঁকি দিয়ে দেখেনও না, কী বাজার হলো!
হরিহর সব জানে।
হরিহর আমার ছোট কাকা - তাঁর কাজ শেষে তিনি জ্ঞান কাকার টুকিটাকি কাজও করে দেন।
দেশভাগের সঙ্গে-সঙ্গে পূর্ববঙ্গ থেকে লক্ষ-লক্ষ মানুষ রেল কিংবা হাঁটাপথে হিন্দুস্থানে ঢুকতে শুরু করেছে। যে-যেখানে খালি জায়গা পাচ্ছে দলবেঁধে বসে পড়ছে। কারো কিছু বলার নেই। রিফুজি বললেই সাত খুন মাফ।
আমরাও ট্রেনে-বাসে উঠে পড়তাম। টিকিট চাইলে এককথা - রিফুজি।
রিফুজি বললেই কারো কিছু বলার সাহস থাকত না। তবে কাশিমবাজারের আদি রাজবাড়িতে ঢুকতে কেউ সাহস পায়নি। রাজবাড়ির তহশিলদার খাকির হাফপ্যান্ট, হাফশার্ট পরে আমাদের কলোনিতে ঘুরে বেড়াত।
রাজার আমবাগান, সুমিষ্ট আম - তবে জমির অধিকার পাওয়ার জন্য রাজবাড়ির অফিসে কিছুটা অর্থ দিতে হতো। সেই অর্থের বিনিময়ে রাজবাড়ির সিল দেওয়া রসিদ মিলত। জমির অধিকার সেই যে বর্তাল, আর কার ক্ষমতা আছে জমি থেকে রিফুজিদের উৎখাত করে।
আমার জেঠামশাই রাজবাড়ির অফিসে গিয়ে পঁচিশ বিঘা জমির বন্দোবস্ত করেছেন। রাজবাড়ির সিল দেওয়া একটি কাগজে তার উল্লেখ আছে। পঁচিশ বিঘা জমির মালিকানা উপেন্দ্র ব্যানার্জির এবং তাঁর সহোদর ভাইরা ভোগ করবে।
আমার জেঠামশাই সেই জমি ভাইদের নামে বিলি-বণ্টন করার পর আমাদের নিজস্ব বসবাসের জায়গা স্থির হয়। পঁচিশ বিঘার জমিটি বনজঙ্গলে ভর্তি। জঙ্গলের ভেতর বড়-বড় শালগাছের মেলা। জেঠামশাই সব জমিই ভাইদের নামে-নামে ভাগ করে দেন।
প্রায় তিন বিঘা করে জমি ভাইদের নামে-নামে, বাকি জমি গৃহদেবতার নামে -
আমার দুদু কাকা গৃহদেবতার পূজারি। আপাতত তাঁরই অধিকার।
এদেশে আসার পরই জেঠামশাই ভাইদের ডেকে বলেছেন - আমাদের একান্নবর্তী সংসার কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি। যে-যার মতো অন্নসংস্থানের দায় তোমাদের সবার।
পরিবারে বলতে গেলে কোনো উপার্জন নেই। ছোট কাকা কংগ্রেসের জেলা অফিসের দেখাশোনা করতেন - জ্ঞান কাকা বললেন, হরিহর জেলা অফিসের দেখাশোনা করে। তাঁর একটা নির্দিষ্ট মাইনে থাকলে আমাদের পরিবারে সুবিধে হবে।
জেঠামশাই মাথা চুলকে বললেন, দাদা একটা কথা আছে।
কী কথা!
এঁদের সবারই যদি কোনো কাজের ব্যবস্থা হয়।
জ্ঞান কাকার অসীম ক্ষমতা। তিনি ইচ্ছা করলে পারেন।
দ্যাখ হরিহর সবই করা যায়। তবে এই নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
প্রতিক্রিয়া হলেও কিছু করার নেই।
বাবা শুনে বললেন, আমার চলে যাবে। দেশ থেকে যজমানরা চিঠি লিখেছে, তারাও চলে আসতে চায়। সবাই চলে এলে
পুজো-আর্চা করে কিছু আয় হতে পারে।
সংসারে বাবা-মা, ছোট দুটো ভাইবোনও আছে, কলোনিতে আমাদের যজমানরা আছে, তাদের পুজো-আর্চা আছে - কথা আছে প্রতাপ চন্দ্রও চলে আসছে, তাঁর গৃহদেবতার পূজা আছে। দেশ ভাগ হয়ে যাওয়ায় কে কোথায় যাচ্ছে কিছুই ঠিক নেই, সবাই চ্যাটার্জি-ব্যানার্জি হয়ে আছে, চেনা বামুনের বড় অভাব, এইতো শ্যামবাবুর সঙ্গে দেখা, তিনি বললেন চেনা বামুন ছাড়া কাকে অন্নপূর্ণার সেবাইত করি বলুন তো - এই চেনা বামুনের হিসেব দেখতে গেলে, আমার বাবা, জেঠা-কাকারা একটা বিশ্বাসের জায়গা আগেই ঠিক করে ফেলেছে।
বামুনের কাজের অভাব হয় না - আমাদের কলোনিতে, একঘর বামুন, তাঁর খোঁজখবর সবাই রাখে। এদেশে এসেই দুটো দুর্গাপূজার ভার পেয়ে গেছে সে। দেশ থেকে ফুরফুর করে মানুষজন ঢুকে যাচ্ছে। তাদের কথা, সব তো হলো, মেয়ের বিয়ে ঠিক হচ্ছে - চেনা বামুন না পেলে হয়!
মেজকাকা বলেছেন, আমার দাদারা সবাই তো দেশ থেকে চলে আসছে - চেনা বামুনের অভাব হবে না।
আমার বাবা দেশেও পুজো-আর্চা করতেন। এদেশে এসেই তিনি প্রথমে একটি পঞ্জিকা কিনে ফেললেন। বিবাহের দিনক্ষণ বলে কথা। শুভ-অশুভ বলে কথা। বাবা পঞ্জিকা দেখে সব বলে দিতেন - শুভ-অশুভ দিন তাঁর কথাতেই স্থির হতো। তিনি গীতার সব শেস্নাক মুখস্থ করে ফেলেছিলেন। তাঁর জীবনচর্চায় একজন খাঁটি বামুনের লক্ষণগুলি স্পষ্ট ছিল।
মাথায় খাটো চুল - শিখাটি সুবৃহৎ, পৈতা ধবধবে সাদা।
তবে মাথায় শিখা রাখতে রাজি হতাম না।
বাবা জোরজার করলে বলতাম, শিখা না রাখলে কিছু হয় না বাবা।
তবু পৈতার সময় আমার জেঠামশাইর নির্দেশ, শিখাটিকে তুচ্ছ করতে নেই। বামুনের শিখা নেই হয় নাকি।
হয়।
গোঁয়ার্তুমি করবে না। শিখা না থাকলে তুমি বামুনের সন্তান কে বিশ্বাস করবে!
সবাই বিশ্বাস করবে।
কী করে সম্ভব।
গলায় পৈতা আছে না।
গলায় পৈতা থাকলেই হলো।
ওটা তো জামার নিচে থাকবে। তোমার গলায় পৈতা আছে বুঝবে কী করে।
ঠিক বুঝবে। আপনাকে আমার পৈতা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।
বাবা বললেন, গুরুজনদের কথা শুনতে হয়। গুরুজনের অবাধ্য হতে নেই। অবাধ্য হলে ঈশ্বর কুপিত হন।
পৈতা না থাকলে একসময় তুমি মূক-বধির হয়ে যাবে।
ভয় পেতাম। সত্যি যদি মূক-বধির হয়ে যাই।
আমাদের সেই পূর্ববঙ্গের গ্রামে এমনিতেই বামুন ঠাকুরের অভাব। লক্ষ্মীপূজায় সরস্বতীপূজায় বামুনেরও অভাব। ঘরে-ঘরে পূজা - লক্ষ্মীর সরা ঘরে-ঘরে আসত। একজন বামুন ঠাকুর চাই। আমার শৈশবেই উপনয়নের কাজটি সারা হয়ে যায়। ফলে আমিও বামুন ঠাকুর হয়ে গেছি, ঘরে-ঘরে কোজাগরি লক্ষ্মীপূজা - গাঁয়ে দু-ঘর মাত্র বামুনের পরিবার, আর পাশের গ্রামগুলিও হিন্দুপ্রধান। হিন্দুদের আলাদা গ্রাম, মুসলমানদের আলাদা গ্রাম।
জাতকুল দেখে বাড়িঘর। হিন্দুগ্রামে কোনো মুসলমানের বসবাস ছিল না - পাশের টোডারবাগ গ্রামটিতে মুসলমানরা ঘরবাড়ি করে বসবাস করত। আমাদের গায়ে কোনো মুসলমান পরিবার ছিল না। মুসলমানরা ছিল অচ্ছুত। তবে বিপদে-আপদে মুসলমানরাই ছিল রক্ষাকর্তা।
হিন্দু-মুসলমানের আলাদা অবস্থান, অথচ ঝগড়া-বিবাদে হিন্দু মাতববরদের ওপর ভরসা ছিল মুসলমানদের। মুসলমানদের ওপরও যথেষ্ট ভরসা রাখত হিন্দুরা।
অথচ আমাদের বাড়িতে, শুধু আমাদের বাড়ি কেন, যে-কোনো সম্পন্ন হিন্দু পরিবারের বিশ্বস্ত কাজের মানুষ ছিলেন এঁরাই।
বাড়ির বউ বাপের বাড়ি যাবে - সঙ্গে যাবে কে।
সঙ্গে যাবে রহমান। সে ধনবউকে পৌঁছে দিয়ে আসবে।
আমার মনে আছে, মামারবাড়ি যাওয়ার সময় মা রনাদাকে ডেকে পাঠাতেন। রনাদা যে পারিশ্রমিক পাবেন জানতেন।
পোটলা-পুঁটলি তিনি মাথায় তুলে নিতেন। আমি-বড়দা তুলে দিতাম। তারপর বাড়ি থেকে নেমে মাঠে পড়তাম। বড়দিনের ছুটিতে মা আমাদের নিয়ে বাপের বাড়ি যাবেন, কিংবা অষ্টমী স্নানে যাবেন, সঙ্গে পাহারাদার আমাদের রনাদা। এত বিশ্বাসী তিনি, টাকা-পয়সাও তার কাছে থাকত। রনা-ধনা দুই ভাই আমাদের বাড়ির দক্ষিণের ঘরে থাকতেন। ঘরের তক্তপোশে থাকতেন আমাদের মাস্টারমশাই, মেঝেতে মাদুর পেতে শুতেন রনাদা।
বাড়িরচার ভিটিতে চারটি চৌচালা ঘর। দক্ষিণের ঘরের সংলগ্ন ঠাকুরঘর।
দক্ষিণের ঘরটি বৈঠকখানা হিসেবে রাখা হয়েছে। পুবের ঘরটিতে থাকেন বড় জেঠিমা। আমার জেঠামশাই নিখোঁজ। এতে বাড়িতে কোনো ত্রাস নেই। জেঠামশাইর স্বভাবই এরকমের। দু-একদিন তার কোনো খোঁজ থাকে না।
তাঁর মাথা খারাপ আছে।
আগে আমরা নানা জায়গায় খোঁজ করতাম, আমার ঠাকুরভাই, অর্থাৎ আমাদের বড়দা খুঁজতে বের হতো, দক্ষিণের ঘরের বারান্দায় একটা ইজিচেয়ার পাতা থাকত।
ইজিচেয়ারটি জেঠামশাইয়ের নিজস্ব - বাড়িতে থাকলে জেঠামশাই ইজিচেয়ারটিতেই লম্বা হয়ে শুয়ে থাকেন। এক-দুদিন ঠিকঠাকই চলে তাঁর। বাড়িতে জেঠামশাই থাকলে তাঁকে দেখাশোনার ভার আমাদের ওপরেই থাকত। তিনি মানসিকভাবে কিছুটা বিপন্ন। তাঁর চিকিৎসারও শেষ ছিল না। সাধু-সন্ন্যাসী এলে রাতের আশ্রয় আমাদের দক্ষিণঘর।
আমাদের স্যারও দক্ষিণের ঘরে থাকেন। আমাদের পড়াশোনাও সে-ঘরেই হয়।
একটা বড় টেবিল, টেবিলের চারপাশে চেয়ার, সকালে আমরা
পাঁচ ভাই, খুড়তুতো, জেঠতুতো ভাই মিলে আমরা পাঁচজন, সকালে এবং রাতে পড়াশোনা হয় এই ঘরে।
জেঠামশাই বাড়ি থাকলে বারান্দায় একটি ইজিচেয়ার পাতা থাকে। জেঠামশাইর দখলে এই ইজিচেয়ারটি। তিনি বাড়ি থাকলে ইজিচেয়ারে লম্বা হয়ে শুয়ে থাকেন। ঘরের ভেতরে জেঠতুতো-খুড়তুতো ভাই মিলে পড়াশোনায় মগ্ন থাকি। সকালে তাঁর অধীনেই থাকতে হয়। রাতেও। রাত দশটার পর আমাদের ছুটি।
এ-বছর আমার এক পিসতুতো দাদাও হাজির। আমাদের বাড়িতেই তার পড়াশোনার ব্যবস্থা হয়েছে। কলাগাছিয়া স্কুলে তাকে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছে।
কলাগাছিয়া মাইনর স্কুলের পড়া শেষ হলেই আমরা বাড়িছাড়া হতাম। বড়দা উমাশঙ্কর এবং আমি সম্মান্দির বাড়িতে চলে গেছিলাম। আমার চিনি কাকিমা তাঁর ছেলেমেয়েদের কলকাতায় ফের নিয়ে গেছেন। হাতিবাগানে বোম পড়ায় কলকাতা শহর খালি হয়ে যাচ্ছিল। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। বোমা পড়ার আতঙ্ক আর নেই। তবে যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ায় আবার যে-যার জায়গায় - চিনি কাকিমাও কলকাতায় ফিরে গেলেন। সঙ্গে রেখা, কালী, দুলাল, শুধু ধনঠাকুরমা বাড়িতে থাকলেন। আমি ঠাকুরভাই আছি - আমরা পানাম স্কুলের ছাত্র। সম্মান্দির বাড়ি থেকে রাইনাদির বাড়ির দূরত্ব চার ক্রোশের মতো। ধনঠাকুরমা আমাদের নিয়ে সম্মান্দির বাড়িতে থেকে গেলেন। টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে আমিও চলে যাব।
আমার সহোদর দাদা চন্দ্রশেখর চলে গেল মামারবাড়ি মনোহরদি। দুপতারা হাইস্কুলে তাকে ভর্তি করে ছিলেন আমার দাদু। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে ছারখার হয়ে গেল। আমি আর বড়দা আছি সম্মান্দির বাড়িতে, আমার দাদা চন্দ্রশেখর আছেন আমার মামারবাড়ি মনোহরদি গ্রামে। দক্ষিণের ঘর খালি - শিক্ষক অনিল পাকরাশি - যার শাসনে আমরা বড় হচ্ছিলাম, তিনিও এক সকালে বিদায় নিলেন।
দেশে কী যে হচ্ছে!
এমন এক সুন্দর দেশ, যার অর্জুনগাছের ছায়ায় আমার ঠাকুরদার দাহপর্ব সারা হয়েছে। চারপাশের মুসলমান গ্রাম থেকে লোকের ভিড়। লাদুরচর থেকে ঝেঁটিয়ে সব মানুষজন দাহ পর্বে যোগদান করেছিল - মুসলমান গ্রাম থেকেও লোক ভেঙে পড়েছিল, কারণ দাহ প্রক্রিয়া দেখার কৌতূহল সবার - একজন মানুষকে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া সহজ কথা নয়।
ঠাকুরমার নির্দেশ, তাঁর মৃত্যুর পর অর্জুনগাছের নিচেই যেন দাহকার্য করা হয় - আমাদের বাড়ির যেকোনো মৃত্যুর দাহকার্য সম্পাদনে এই অর্জুনগাছটি নির্দিষ্ট ছিল - এলাকায় দু-ঘর ব্রাহ্মণের বাস। বাকি গ্রামগুলি হিন্দুপ্রধান। তাদের দাহকার্য হতো দন্দের ব্রহ্মপুত্রের ঘাটে। শুধু আমাদের নিজস্ব শ্মশান পুকুরপাড়ের অর্জুনগাছটার নিচে - আমার ঠাকুরদা-ঠাকুরমার চিতাও অর্জুনগাছটার নিচে।
আমাদের বাড়িটা লোকজনে ভর্তি। আত্মীয়স্বজনে সবসময় ভর্তি থাকত। বালি থেকে মেজপিসি এসে থেকে গেলেন মাসের পর মাস। আমার পিসেমশাই বেকার। চরসিন্দুর চিনির কলে তিনি চাকরি করতেন। কথায়-কথায় দু-মাস, ন-মাসের জন্য বিনা নোটিশে চিনির কলটি বন্ধ হয়ে যেত। আমার পিসিমা তার ছেলেমেয়েদের নিয়ে সোজা আমাদের বাড়িতে চলে আসতেন।
উত্তরের বড় ঘরে থাকতেন ঠাকুরমা - ঠাকুরমার ঘরে সবাই আশ্রয় নিত। সুবৃহৎ এই চৌচালা ঘরটির খোপে-খোপে আমার পিসিরা বিনা নোটিশে এসে উঠতেন। ঠাকুরদা বেঁচে নেই - ঠাকুরমার ঘরে প্রয়োজনে আমরাও শুতাম। দক্ষিণের ঘরে পড়াশোনা - দক্ষিণের ঘরে স্যার থাকেন - তাঁর নিজস্ব একটি তক্তপোশ আছে, শতরঞ্চি পাতা আছে। বিছানার এক প্রান্তে সারি-সারি বই। আমাদের স্যার আইএ পাস - তাঁর ইচ্ছে তিনি প্রাইভেটে বিএ পরীক্ষা দেবেন - দিলেনও, পাশ করেও গেলেন। স্কুলের হেডমাস্টারও হয়ে গেলেন।
আমরা স্কুলে যেতাম আমাদের স্যারের সঙ্গে। স্যারের দায়িত্ব আমাদের সামলানো। যেমন তিনি সকালে ঘরে-ঘরে দরজায় নাড়া দিয়ে আমাদের সতর্ক করে দিতেন -
তিনি বলতেন, ওঠ এবার। বেলা কিন্তু কম হয়নি।
আমার মা জেঠি কাকিমারা এতে খুব একটা খুশি ছিলেন না - প্রাণভরে যে একটু ঘুমোবেন তারও উপায় ছিল না। আমার কাকিমা জেঠিমারা খুবই বিরক্ত হতেন। কিন্তু স্যারের মুখের ওপর কারো কথা বলার সাহস নেই। বাবা-কাকা-জেঠারা প্রবাসে। আমরা এতগুলি ভাইবোন। আমরা মেলা ভাইবোন -
আমাদের বোনেরা পড়াশোনার তাড়া থেকে ছাড় পেত। তারা পছন্দমতো বই নিয়ে পড়তে বসত। পড়তেই বসত না কেউ-কেউ। এত সকালে আমাদের ঘুম ভাঙে না।
রাতে দশটার আগে ছুটি পাই না।
ঠিক দশটায় রান্নাঘরে পিঁড়ি পড়ত।
পিঁড়ি পড়ার শব্দ শোনা যেত দক্ষিণের ঘর থেকে।
এই শব্দ শোনার প্রতীক্ষায় আমরা কান খাড়া করে রাখতাম।
অথবা, স্যার বাইরে যাব।
বাইরে যাব বললেই তিনি ছেড়ে দিতেন।
ছেড়ে না দিয়েও উপায় নেই।
কারণ কার ছোট বাইরের, কার বড় বাইরের দরকার, প্রকৃতির ডাককে উপেক্ষা করা যায় না। তিনি বিনা দ্বিধায় বলতেন, যাও।
আমরাও এই ছুতোয় বের হয়ে দেখতাম রান্নাঘরে পাত পড়ার আয়োজন হয়েছে কিনা।
এক নম্বর শান্তি।
ছোট বাইরের তাগিদ শান্তিরই বেশি। তবে একবার, বেশি হলে দুবার বাইরে যাওয়ার অনুমতি মিলত।
রাত দশটা পর্যন্ত স্যার আমাদের পড়ায় বসিয়ে রাখতেন।
একান্নবর্তী পরিবারে আমাদের জেঠিমা, মা, কাকিমারা পালা করে নিরামিষ-আমিষের ঘর সামলাতেন।
তবে আমার বড় জেঠামশাই - দিনের বেশিরভাগ সময়ই বাড়ির দক্ষিণের ঘরে ইজিচেয়ারে শুয়ে থাকতেন।
পড়ার ঘরে ইজিচেয়ারেও তিনি শুয়ে থাকতেন।
আমার বড় জেঠামশাই মর্জি হলে সকালে খেতেন, মর্জি না হলে সকালেই বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতেন।
আমার জেঠিমা চেঁচামেচি শুরু করতেন।
ওরে অচল, দ্যাখ তোর জেঠামশাই কোথায় যাচ্ছে।
আমার সোনাভাই, অর্থাৎ আমাদের মেজদাই জেঠামশাইকে রুখে দিতে পারত।
কোথায় যাবেন!
জেঠামশাই কোনো জবাব দিতেন না।
জেঠামশাই নিজের মতো হাঁটা দিতেন।
আমার বড়দা উমাশঙ্কর বইটই ফেলে দৌড়ে আসত।
জেঠামশাইকে আগলে বলত, আপনি আমাদের পড়তেও দেবেন না। আমরা পাশ করব কী করে!
জেঠামশাইয়ের কেমন তখন বোধোদয় হতো।
তিনি ভালো মানুষ হয়ে যেতেন।
সুবোধ বালকের মতো ঠাকুরভাইয়ের হাত ধরে দক্ষিণের ঘরের দিকে হাঁটা দিতেন।
তাঁকে একটা টুলে বসিয়ে দিয়ে সামনে একটা বই খুলে দিলেই তিনি শান্ত।
যেন কত মনোযোগী ছাত্র।
মুশকিল ছিল সেই বইটি আর তার কাছ থেকে ফেরত নেওয়া যেত না।
আমরা এজন্য একটি অপ্রয়োজনীয় অথবা গল্পের বই হাতের কাছে রেডি রাখতাম।
স্কুল খোলা থাকলে আমরা গৃহশিক্ষকের আওতায় চলে যেতাম।
তাঁর কথাই শেষ কথা।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now