বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

​“বাবার দেওয়া জমি” অধ্যায় - ২

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোঃ আরাফাত রহমান (০ পয়েন্ট)

X ⚪ অধ্যায় ২: বুকের ভেতর ফসলের ঘ্রাণ ​কার্তিকের কুয়াশা কেটে অগ্রহায়ণের মিষ্টি রোদ শালদহ গ্রামের মাঠের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। মাঠজুড়ে এখন পাকা ধানের হলদে আভা। বাতাসে সেই নতুন ধানের একটা চনমনে সুবাস ভেসে বেড়ায়, যা কৃষকের বুকে এক অদ্ভুত চঞ্চলতা তৈরি করে। গ্রামীণ বাংলায় এই সময়টা নবান্নের, আনন্দের। কিন্তু আব্দুল করিমের একান্নবর্তী সংসারে সেই আনন্দের ওপর এক অদৃশ্য আশঙ্কার ছায়া দুলছিল। ​ভোরবেলাতেই আব্দুল করিম আজ দুই ছেলেকে ডেকে তুললেন। অনেকদিন পর তার শরীরটা আজ একটু হালকা লাগছে, কাশির উপদ্রবও কম। তিনি রহিম আর কাদেরকে বললেন, “আজ তোরা কেউ অন্য কামে যাইবি না। আমার সাথে চকের জমিতে যাবি।” ​কাদেরের একটু আপত্তি ছিল, কিন্তু বাবার মুখের ওপর কথা বলার সাহস এই সমাজে তখনও তৈরি হয়নি। রহিম আর কাদের বাবার পিছু পিছু রওনা হলো। রহিমের কাঁধে লাঙল-জোয়াল আর কোদাল, আর কাদের হাঁটছে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে, যাতে তার ধুতির কোণে মাটির কাদা না লাগে। ​গ্রামের আলপথ ধরে হাঁটার সময় আব্দুল করিম দুপাশে তাকিয়ে দেখছিলেন। ব্রিটিশ রাজত্বের শেষ সময়ে চারপাশের মানুষের চোখে-মুখে এক ধরণের অনিশ্চয়তা। হাটে-ঘাটে গুঞ্জন—দেশ নাকি দুভাগ হয়ে যাবে। সাহেবরা নাকি চলে যাবে নিজেদের দেশে। কিন্তু করিম ওসব রাজনীতির মারপ্যাঁচ বোঝেন না। তার কাছে দেশ মানে এই শালদহ গ্রাম, আর স্বাধীনতা মানে নিজের জমিতে বুক ফুলিয়ে লাঙল চালানো। ​চকবাজারের মাঠের ঠিক মাঝখানে এসে করিম থামলেন। তিন কানি উর্বর জমি রোদের আলোয় চকচক করছে। করিম মাটির আইলে বসে পড়লেন। তারপর দুই হাত দিয়ে এক খাবলা মাটি তুলে নিলেন নিজের হাতের তালুতে। সেই মাটি নাকের কাছে নিয়ে গভীর একটা শ্বাস টেনে ছেলেদের দিকে তাকালেন। ​“দেখছস বাপেরা?” করিমের গলাটা আজ গভীর ও গম্ভীর শোনাল। “এইডা শুধু মাটি না। এইডা হইলো আমাগো জ্যান্ত খোদা। এই মাটিতে হাত দিলে আমার বাপের হাতের ঘাম টের পাই। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে এই গাঁয়ের কত মানুষ না খাইয়া মরল, কত মানুষ জমি বেইচ্যা ভিখারি হইলো, কিন্তু আমার বাপ এই তিন কানি জমি বুক দিয়া আগলাইয়া রাখছিল। নীলকুঠির সাহেবরা আমার বাপের পিঠে চাবুক মারছিল এই জমির খাজনার লাইগা, তাও বাপ আমার জমি ছাড়ে নাই।” ​রহিম বাবার কথার গভীরতা অনুধাবন করে শ্রদ্ধায় মাথা নোয়াল। সে মাটির দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি বুঝি বাজান। এই মাটির এক একটা কণা আমাগো রক্তের লাহান।” ​কিন্তু কাদের মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিল। সে এক চিলতে শুকনো ঘাস পা দিয়ে মাড়াতে মাড়াতে বলল, “বাজান, অতীত ধইরা পইড়া থাকলে তো পেট চলব না। দুনিয়া আগাইয়া যাইতাছে। শহরে এখন পাটের ব্যবসা যারা করতাছে, তারা এক এক বছরে হাজার টাকা কামাইতাছে। আর আমরা এই রোদে পুইড়া, বৃষ্টিতে ভিজা সারা বছরে যা পাই—তা দিয়া শুধু ভাতের চালই জোটে। এই মাটির মায়া আমাগো ফকির বানাইয়া রাখব।” ​করিম করিমের চোখ দুটো ক্ষণিকের জন্য জ্বলে উঠল। তিনি মাটির দলাটা আবার জমিতে নামিয়ে রেখে কাদেরের দিকে চেয়ে বললেন, “টাকা তো কাগজের টুকরো রে কাদের! আজ আছে, কাল নাই। কিন্তু এই মাটি তোরে কোনোদিন উপাস রাখব না। তুই যদি মাটির যত্ন করস, মাটি তোরে রাজার লাহান খাওয়াইয়া রাখব। শহর তোরে টাকা দিতে পারে, কিন্তু সম্মান আর পরিচয় দিতে পারব না।” ​কাদের আর কোনো তর্ক করল না, তবে তার চেহারার অবজ্ঞা লুকোতেও পারল না। সে মনে মনে ভাবল, বুড়ো মানুষটা যুগের হাওয়া বুঝতে পারছে না। ​ঠিক সেই সময় জমির পাশের খালের ঘাট থেকে একটা চড়া গলা ভেসে এলো, “ও করিম চাচা! সাত সকালে পোলাগো লইয়া জমিতে কীসের দরবার বসাইলা?” ​করিম তাকিয়ে দেখলেন, আমেনা খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে গরুকে ঘাস খাওয়াচ্ছে। তার পরনে একটা সুতির শাড়ি, চুলে খোপ খড়া। আমেনার চোখে এক ধরনের তীব্র আত্মবিশ্বাস ছিটকে বেরোচ্ছে। এই পুরুষশাসিত সমাজে আমেনা একাই তার বিধবা মায়ের সংসার টানে। তার নিজের বাবার রেখে যাওয়া এক কানি জমি সে নিজেই দেখাশোনা করে, কাউকে এক ইঞ্চি জমিও ঠকাতে দেয় না। ​করিম একটু হেসে বললেন, “আরে আমেনা! না রে মা, পোলাগো একটু মাটির গূণাগুণ বোঝাইতাছি। তা তুই একলা একলা এই সকালে গরুর ঘাস কাটতাছস? তোর ভাইডা তো কোনো কাজের না।” ​আমেনা একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ভাইয়ের ভরসায় থাকলে তো না খাইয়া মরন লাগব চাচা। শহরের ছায়াবাজি দেখ্যা ওরও মাথা খারাপ হইয়া গেছে। জমি জমার কামে ওর শরীল ম্যাচম্যাচ করে।” কথাটি বলার সময় আমেনা আড়চোখে কাদেরের দিকে তাকাল। ​কাদের নিজেকে শহরের বাবু ভাবতেই পছন্দ করে। আমেনার এই খোঁচা তার গায়ে লাগল। সে একটু ত্যাড়ছা গলায় বলল, “মেয়েছেলের মুখে এত বড় বড় কথা ভালো দেখায় না আমেনা। পুরুষ মাইনষের হিসাব-নিকাশ আলাদা।” ​আমেনা কলসিটা কোমরে তুলে নিয়ে সোজা কাদেরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “পুরুষ মাইনষের হিসাব যদি শুধু জমি বন্ধক দেওয়া আর শহরের দালালের পিছে ঘোরা হয়, তবে সেই হিসাবের চেয়ে মেয়েছেলের ঘরের কোণের হিসাব অনেক ভালো কাদের ভাই। মাটির খেদমত করতে কলিজা লাগে, শুধু ধুতি পইড়া বাবু সাজলে মাটির মায় বোঝা যায় না।” ​আমেনার এই স্পষ্ট জবাবে কাদেরের মুখটা লাল হয়ে গেল। রহিম মনে মনে আমেনাকে বাহবা দিল। সে জানে, এই মেয়েটা যা বলে, তা খাঁটি সোনা। করিমও আমেনার দিকে চেয়ে মনে মনে ভাবলেন, এই মেয়েটা যদি তার ঘরের বউ হয়ে আসত, তবে তার সংসার কোনোদিন ভাঙত না। ​দুপুরের দিকে করিম দুই ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। রোদের তেজ তখন বেশ চড়া। রহিমার মা এতক্ষণে উঠোনে নতুন ধানের খড় শুকাতে দিয়েছেন। পুরো বাড়ি সোনালী খড়ে ছেয়ে গেছে। ​দুপুরের ভাত খাওয়ার সময় এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো ঘরটিতে। রহিমার মা বড় থালায় ভাত বেড়ে দিলেন। করিমের পাতে একটা বড় মাছের টুকরো দিয়ে বললেন, “আজ শরীরটা কেমন বুঝতাছ? কাইল রাতে তো খুব কাশছিলা।” ​করিম ভাতে হাত দিয়ে বললেন, “শরীল আর কত ভালো থাকব বউ? দিন তো ফুরায়া আইল। তবে আজ চকের জমিতে গিয়া মনে হইলো, আমার বাপে যেন আমারে ডাকতাছে। রহিমরে নিয়া আমার কোনো চিন্তা নাই। চিন্তা শুধু কাদেররে নিয়া।” ​কাদের ভাতের থালা থেকে মাথা তুলে বলল, “আমার নিয়া তোমার এত চিন্তা ক্যান বাজান? আমি তো চোর-ডাকাত হই নাই। আমি নিজের পায়ে দাঁড়াইতে চাই। গফুর মিয়া কইছে, কলকাতায় নাকি এখন একটা পাটের আড়ত দেওয়ার খুব ভালো সুযোগ আছে। মাত্র পাঁচশ টাকা পুঁজি দিতে পারলে...” ​“পাঁচশ টাকা!” রহিমার মা চমকে উঠলেন। “এই সংসারে এত টাকা কই পাবি কাদের? তোর বাপের চিকিৎসার টাকাই জোটে না ঠিকমতো।” ​কাদের রহিমের দিকে তাকিয়ে বলল, “চকের জমির পুব ধারের অংশটা যদি আমরা মাতবরের কাছে মোশাজেরা (বন্ধক) রাখি, তবে মাতবর এক কালীন সাতশত টাকা দিতে রাজি আছে। সেই টাকা দিয়া ব্যবসা শুরু করুম, আর লাভ হইলেই জমি ফিরায়া আনুম।” ​রহিম হাতের গ্রাসটা থালায় নামিয়ে রাখল। তার চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠল। “কাদের! তুই বাপের সামনে বইসা জমি বন্ধকের কথা কস? তাও আবার ওই ইসমাইল মাতবরের কাছে? তুই জানস না মাতবরের নজর ওই জমির ওপর কতদিনের? একবার ওই শকুনের হাতে জমি গেলে, সেই জমি আর কোনোদিন ফেরত আইব না।” ​করিম কিছু বললেন না। তিনি শুধু স্তব্ধ হয়ে কাদেরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে ভাতের থালায় পড়ল। যে জমির আইলে দাঁড়িয়ে আজ সকালেই তিনি পূর্বপুরুষের রক্তের ইতিহাস শোনালেন, সেই জমির ওপর তার নিজের ছোট ছেলেই কুঠারাঘাত করতে চাইছে। ​ঘর জুড়ে এক গুমোট, দমবন্ধ করা নীরবতা নেমে এলো। বাইরে তখন বিকেলের বাতাস খড়ের স্তূপ উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, যেন এক আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস দিচ্ছিল শালদহ গ্রামের এই ছোট্ট পরিবারটিতে। অধ্যায় - ৩ আসছে..........


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ​“বাবার দেওয়া জমি” অধ্যায় - ২
→ ​“বাবার দেওয়া জমি” অধ্যায় - ১

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now