বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

​“বাবার দেওয়া জমি” অধ্যায় - ১

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোঃ আরাফাত রহমান (০ পয়েন্ট)

X ⚪ অধ্যায় ১: মাটির ক্রন্দন ও একান্নবর্তী ঘর ​শালদহ গ্রামের বুক চিরে বয়ে যাওয়া আড়িয়াল খাঁ নদীর ঘোলা জল কার্তিক মাসের শেষাশেষি এসে কিছুটা শান্ত রূপ ধারণ করেছে। জল কমতে শুরু করায় নদীর চরে জেগে উঠেছে নরম পলিমাটি। সেই মাটির সোঁদা সুবাস বাতাসে ভেসে এসে মিশে যায় গ্রামের মেঠো পথের ধুলোয়। ভোরের কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি; বাঁশঝাড়ের মাথাগুলো ধোঁয়াটে চাদরে ঢাকা। ঠিক এই সময়ে, যখন পুব আকাশে সূর্যের আলো কেবল কাঁচা সোনার মতো ফুটে উঠছে, শালদহ গ্রামের বিখ্যাত ‘চকবাজারের মাঠের’ দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন আব্দুল করিম। ​আব্দুল করিমের বয়স ষাট পেরিয়েছে। কোমরে জড়ানো খাটো তেনাপড়া লুঙ্গি, গায়ে একটা পুরনো চাদর, যা একসময় সাদা ছিল কিন্তু এখন মাটির রঙে রূপান্তর ঘটেছে। তার পায়ে কোনো জুতো নেই। দীর্ঘ চার দশক ধরে এই মাটির বুকে খালি পায়ে হেঁটে হেঁটে তার পায়ের পাতা দুটো খসখসে, ফেটে যাওয়া চৌচির মাটির মতোই শক্ত হয়ে গেছে। তার পিঠটা সামান্য নুয়ে পড়েছে বটে, কিন্তু চোখের দৃষ্টি এখনও চিল-পাখির মতো তীক্ষ্ণ, বিশেষ করে যখন তিনি নিজের জমির দিকে তাকান। ​এই চকবাজারের মাঠে তিন কানি জমি আব্দুল করিমের শুধু সম্পত্তি নয়, তার নিশ্বাস, তার বেঁচে থাকার একমাত্র দলিল। এই জমি তার বাবা তাকে দিয়ে গিয়েছিলেন ব্রিটিশদের খাজনার চাবুক পিঠে সহ্য করেও। কত মন্বন্তর গেল, কত বন্যা গেল, কিন্তু করিম এই মাটির মায়া ছাড়েননি। ​জমির আইলে দাঁড়িয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন করিম। কাশির একটা দমক উঠল তার বুক চিরে। বুকটা চেপে ধরে তিনি মাটির দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বললেন, “কী রে মাটি, তুই তো ভালোই আছিস। কিন্তু আমার যে সময় ফুরায়া আইল। তর ভার কার হাতে দিয়া যাই?” ​গ্রামের অন্য প্রান্তে, আব্দুল করিমের একান্নবর্তী গৃহস্থ বাড়িতে তখন উনুন জ্বলে উঠেছে। খড়ের ধোঁয়ায় চারপাশটা আচ্ছন্ন। রান্নাঘরে বসে মাটির হাঁড়িতে চাল ধুয়ে দিচ্ছিলেন রহিমার মা। বয়সের ভারে তার শরীরী লাবণ্য হারিয়ে গেলেও মুখাবয়বে এক ধরনের শান্ত, গম্ভীর দীপ্তি রয়ে গেছে। তিনি এই সংসারের কেন্দ্রবিন্দু, এক নীরব শক্তি। উনুনের লাল আলো তার মুখের বলিরেখাগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তুলছিল। ​উঠোনে বসে তখন ধান ঝাড়ার কুলো মেরামত করছিল বড় ছেলে রহিম। রহিম তার বাবার মতোই বাস্তববাদী, মাটির সমঝদার। তার চওড়া কাঁধ, রোদে পোড়া তামাটে গায়ের রঙ আর মিতভাষী স্বভাব তাকে গ্রামের মানুষের কাছে একজন ‘খাঁটি চাষী’ হিসেবে পরিচিত করেছে। সে বোঝে, এই সংসারে টিকে থাকতে হলে মাটির সাথে লড়াই করতে হবে, কোনো ফাঁকিবাজি চলবে না। ​হঠাৎ করেই ঘরের বারান্দা থেকে চটি জুতোর খটখট শব্দ তুলে বেরিয়ে এলো ছোট ছেলে কাদের। পরনে তার ধবধবে সাদা ধুতি আর পিরহান। চুলে সযত্নে তিল তেল মাখা, চোখে এক অদ্ভুত চঞ্চলতা আর অস্থিরতা। সে এই কাদা-মাটির জীবন পছন্দ করে না। তার মন পড়ে থাকে সাত মাইল দূরের মহকুমা শহরে, কিংবা তারও ওপারে—কলকাতার ট্রামের শব্দ আর ঝকমকে বিজলি বাতির আলোয়। ​কাদেরকে ওভাবে বের হতে দেখে রহিম কুলোটা পাশে রেখে গম্ভীর গলায় বলল, “কই রওনা দিলা সকাল সকাল? আজ তো চকের পুব ধারের জমিতে কামিজ দেওয়ার কথা ছিল। আইলডা বান্ধা নাগব।” ​কাদের কিছুটা বিরক্ত হয়ে মুখের ওপর আলগা চাদরটা টেনে নিয়ে বলল, “তোমার ওই কাদার কামে আমারে টানো ক্যা বড় ভাই? আমি শহরে যাচ্ছি। গফুর মিয়ার সাথে একটা দরকারি কথা আছে। কলকাতায় পাটের চালানি ব্যবসার একটা হদিস পাইছি। এই বন্ধা গাঁয়ে পইড়া থাকলে জীবনডায় শ্যাষ হইয়া যাইব।” ​রহিম শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, “শহরের আলোয় চোখ ধোঁয়া চইলা যায় কাদের। বাপে কইছে, মাটি যারে ফিরায়, তারে দুনিয়ার কেউ জায়গা দেয় না। নিজের জমির থেইকা বড় কোনো ব্যবসা নাই।” ​“ঐ তোমার বাপের পুরান আমলের কতা!” কাদের হাত নেড়ে উড়িয়ে দিল। “দুনিয়া বদলাইতাছে বড় ভাই। সাহেবরা এদেশ ছাড়ব ছাড়ব করতাছে। এখন ব্যবসার মোক্ষম সময়। এই মাটির তলে মাথা গুঁইজা মরার কোনো মানে হয় না।” ​রান্নাঘর থেকে রহিমার মা বের হয়ে এলেন। আঁচলে হাত মুছতে মুছতে দুই ভাইয়ের দিকে চেয়ে শান্ত অথচ অমোঘ স্বরে বললেন, “ঝগড়া থামাগো বাপেরা। ভাইয়ে ভাইয়ে কাইজ্যা করলে ঘরের লক্ষ্মী পালায়। কাদের, তুই শহরে যাচ্ছিস যা, কিন্তু মনে রাখিস—তোর বাপের শরীলটা ভালো না। এই সংসারের হাল তোমাগোর দুই ভাইরেই ধরাধরি কইরা টানতে হইব।” ​মায়ের কথার ওপর কথা বলার সাহস কাদেরের নেই। সে একটা অসন্তোষের নিশ্বাস ফেলে দ্রুত পা চালিয়ে বাড়ির বাইরে চলে গেল। রহিম আবার কুলো মেরামতে মন দিল, কিন্তু তার হাত সচল থাকলেও মনের ভেতর একটা আশঙ্কার মেঘ জমতে শুরু করল। সে জানে, কাদেরের এই শহরের মোহ একদিন তাদের সাজানো সংসারটাকে তছনছ করে দিতে পারে। ​বেলার বাড়ার সাথে সাথে শালদহ গ্রামের ‘চৌধুরী হাটে’ মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। এই হাটটি গ্রামের সব রাজনীতির আখড়া। আর এই আখড়ার অলিখিত সুলতান হলেন ইসমাইল গাজী—গ্রামের প্রধান মাতবর। ইসমাইল গাজীর পরনে দামি মসলিনের পাঞ্জাবি, হাতে রুপোর আংটি, আর মুখে পান-জর্দার সুবাস। সে দেখতে যেমন সুপুরুষ, তার ভেতরের চালগুলো তেমনই কুটিল। ব্রিটিশ সরকারের নায়েব-গোমস্তাদের সাথে তার ওঠাবসা। ​হাটের এক কোণে তামাকের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ইসমাইল গাজী নজর রাখছিল হাটে আসা মানুষগুলোর ওপর। তার চোখ গিয়ে পড়ল আব্দুল করিমের ওপর, যিনি চকের জমি থেকে ফিরে হাটের এক কোণে শাক বিক্রি করতে বসেছেন। ​ইসমাইল গাজী তার পাশে এসে দাঁড়াল। মুখে এক কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বলল, “কী করিম ভাই, শরীল কেমন? শুনলাম কাশিতে নাকি বুক ফাট্টা যায়? তা, এই বয়সে আর কত খাটবা? চকবাজারের ওই তিন কানি জমি নিয়া এত আদিখ্যেতা না কইরা আমার কাছে পত্তন দিয়া দাও না কেন? এককালীন ভালো টাকা পাইবা, বাকি জীবনটা বইসা খাইবা।” ​عبدুল করিম সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। মাতবরের কুটিল উদ্দেশ্য তার বুঝতে বাকি রইল না। তিনি গায়ের চাদরটা শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে বললেন, “মাতবর সাহেব, মাটি বেচার কতা আর মুখে আইনেন না। ওই জমি আমার বাপের হাতের ছোঁয়া। যে নিজের বাপ-দাদার মাটি বেচে, সে নিজের ইজ্জত বেচে। করিমের জান থাকতে ওই জমি অন্য কারও নামে হইব না।” ​মাতবরের চোখের কোণটা এক মুহূর্তের জন্য সরু হয়ে উঠল, কিন্তু সে হেসেই উড়িয়ে দিল। “আচ্ছা আচ্ছা, অত গরম দেখাও ক্যান ভাই! দিনকাল তো ভালো না। শুনতাছি দেশ নাকি ভাগ হইব। কে কোথায় যায় তার ঠিক নাই। নিজের জমি ধইরা রাখতে পারবা তো?” ​মাতবর চলে যাওয়ার পর করিমের মনটা কু গাইতে লাগল। ব্রিটিশদের শেষ সময়ে চারদিকের বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। হিন্দু-মুসলমানের ভেতরে একটা চাপা উত্তেজনা, রাজনৈতিক দলগুলোর আনাগোনা, আর তার ওপর এই গ্রামের ভেতরের লোভী মানুষগুলোর নজর। ​দুপুরের কড়া রোদ যখন বাঁশঝাড়ের ওপারে হেলে পড়েছে, তখন করিম বাড়ির পথ ধরলেন। শরীরের ক্লান্তি আর মনের দুশ্চিন্তা তাকে গ্রাস করছিল। গ্রামের কাঁচা রাস্তার পাশ দিয়ে বয়ে চলা খালের পাড়ে এসে তিনি একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য বসলেন। ​ঠিক তখনই খালের ঘাট থেকে কলসি কাঁখে উঠে আসছিল আমেনা। আমেনা এই গ্রামের সাধারণ মেয়েদের মতো নয়। সে একা চলতে ভয় পায় না, তার চোখে-মুখে এক ধরনের স্পষ্টবাদিতা আছে। তার বাবা মারা যাওয়ার পর নিজের সামান্য জমিটুকু সে নিজেই আগলে রেখেছে গ্রামের লোভী শকুনের হাত থেকে। ​করিমকে দেখে আমেনা থমকে দাঁড়াল। কাপড়ের আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বলল, “করিম চাচা, এই কড়া রোদে খালের পাড়ে বইসা ক্যান? শরীল খারাপ করব তো।” ​করিম আমেনার দিকে চেয়ে একটু হাসলেন। বললেন, “না রে মা, একটু দম লিতাছি। তুই কই থেইকা আইলি?” ​“ঘাট থেইকা জল আনলাম। চাচা, একটা কথা শুনলাম হাটে—মাতবর নাকি কাদেরের সাথে কী সব ফিসফাস করতাছে? কাদের ভাইরে তো চেনেন, শহরের বাতাসে ওর মন উডুউডু। একটু নজর রাইখেন।” আমেনার গলায় কোনো দ্বিধা ছিল না। সে শুধু নিজের অবস্থানই বোঝে না, গ্রামের কোথায় কী ঘটছে তারও খবর রাখে। ​করিম স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তার নিজের ঘরের খবর বাইরের একটা মেয়ে এসে তাকে সতর্ক করছে! তার মানে আগুন ভেতরে ভেতরে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তিনি আমেনাকে কিছু না বলে শুধু মাথা নাড়লেন এবং ধীর পায়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলেন। ​সন্ধ্যা নেমে এলো শালদহ গ্রামে। ঘরে ঘরে সাঁঝের বাতি জ্বলে উঠল। আব্দুল করিমের বাড়ির বারান্দায় একটা হ্যারিকেন জ্বলছে মৃদু আলোয়। উঠোনের এক কোণে বসে রহিম আর তার মা রাতের খাবারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কাদের তখনও শহর থেকে ফেরেনি। ​করিম বারান্দার খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে আছেন। তার বুকের ভেতর থেকে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। তিনি আকাশের দিকে তাকালেন, যেখানে অন্ধকার ক্রমশ ঘন হচ্ছে। তিনি বুঝতে পারছেন, তার আয়ু আর বেশিদিন নেই। কিন্তু যে মাটির জন্য তিনি নিজের পুরো জীবনটা বিলিয়ে দিলেন, সেই মাটি কি তার ছেলেদের এক করে রাখতে পারবে? নাকি এই জমিই হয়ে উঠবে দুই ভাইয়ের চিরশত্রুতার কারণ? ​হ্যারিকেনের আলোটা বাতাসে কাঁপছিল। ঠিক তখনই দূর থেকে কাদেরের জুতো জোড়ার খটখট শব্দ আবার শোনা গেল। করিম চোখ বুজলেন, তার কানের কাছে যেন মাটির এক অস্ফুট ক্রন্দন ধ্বনি ভেসে এলো—যা কেবল তিনিই শুনতে পান, আর কেউ না। অধ্যায় -২ আসছে.............


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ​“বাবার দেওয়া জমি” অধ্যায় - ১

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now