বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
শহরের এক শান্ত গলিতে সাবিহা নামের এক গৃহিণীর সংসার। দুই সন্তানের মা, স্বামী সেলিম এক নামকরা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। সংসারটি বাইরে থেকে যেন দুধে-ভাতে চলছে—কথাবার্তা, সন্তানদের স্কুল, বাজারসদাই, টুকটাক আত্মীয়দের আসা–যাওয়া। কিন্তু ভেতরে, সাবিহার মনে প্রায়ই এক অদৃশ্য শূন্যতা খেলে যেত। সংসারের নিয়মিত ব্যস্ততা তাকে দমবন্ধ করে তুলত। স্বামী যদিও দায়িত্ববান, কিন্তু তার কাছে সাবিহা ধীরে ধীরে একরকম "গৃহপরিচালিকা"য় পরিণত হয়েছে—শিশুদের দেখাশোনা আর রান্নাঘরের খবরদারিতে সীমাবদ্ধ।
এমন সময় প্রতিবেশী মহল্লারই এক তরুণ, রিয়াদ, মাঝে মাঝে তাদের বাড়ির আঙিনা দিয়ে যেত। প্রথমে সৌজন্যের খাতিরে "আন্টি" বলে ডাকত। কিন্তু একদিন হঠাৎ হাসিমুখে বলল,
—“আজ থেকে আপনাকে আর আন্টি ডাকবো না। দেখলে মনে হয় আবার বিয়ে দেওয়া যাবে, আর আপনাকে ডাকবো আন্টি? না, আর না!”
সাবিহা অপ্রস্তুত হয়ে হেসে উড়িয়ে দিল। কিন্তু বাক্যটা তার মনে কেমন অদ্ভুত আলোড়ন তুলল। “আবার বিয়ে দেওয়া যাবে”—এই শব্দগুলো তার অন্তরে এমন এক তরুণীর ছবি এঁকে দিল, যাকে সে প্রায় ভুলে গিয়েছিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের চুলের গোছা আলগা করল, ঠোঁটে সামান্য লিপস্টিক টেনে দেখল—সত্যিই কি সে এখনো আকর্ষণীয়?
এরপর থেকে রিয়াদের আচরণে এক ধরনের সূক্ষ্ম খেলা দেখা দিল। কখনো বলত,
—“নীল শাড়ীতে আপনাকে কোয়েল মল্লিকের মতো লাগে।”
কখনো বা হেসে উঠত,
—“আমি যদি আপনার মতো বউ পেতাম, সপ্তাহখানেক অফিস থেকে ছুটি নিয়ে ঘরেই থাকতাম।”
সাবিহার বুকের ভেতর তোলপাড় শুরু হলো। এ কেমন প্রশংসা! সেলিম তো এত বছরে কখনো বলেনি, "তুমি এতো সুন্দর"। সেলিমের চোখে সে শুধু বাচ্চাদের মা, সংসারের কাজের সঙ্গী। অথচ এই তরুণ প্রতিটি কথায় তাকে এক নতুন আসনে বসিয়ে দিচ্ছে—যেন সে এখনো বিয়ের যোগ্য তরুণী, এখনো কাঙ্ক্ষিত নারী।
রাতে স্বামী-স্ত্রীর ছোটখাটো ঝগড়া হলে সাবিহার মনে অভিমান বাড়ত। মনে হতো, সেলিম কি আদৌ তাকে বোঝে? আরেকদিকে রিয়াদের কথাগুলো মধুর মতো মনে গেঁথে থাকত—“আপনি তো ফেরেস্তার মতো, আপনার সঙ্গে ঝগড়া করা যায়?” কিংবা “আপনার কণ্ঠ এত সুন্দর, সারাদিন শুনলেও বোরিং লাগবে না।” এ যেন এক মায়াজাল, যেটা ধীরে ধীরে তাকে টেনে নিচ্ছিল।
কিন্তু এরই মাঝে একদিন ঘটনাটা ঘটল। মহল্লার বাজারে এক পরিচিত মহিলা সাবিহাকে টেনে আলাদা করে বলল,
—“বোন, সাবধান হবেন। রিয়াদ কেবল আপনাকেই নয়, আরও দুই-তিনজন নারীকেও একইভাবে প্রশংসার ফাঁদে ফেলেছে। তার আসল উদ্দেশ্য অন্য কিছু।”
কথাগুলো শুনে সাবিহার বুক কেঁপে উঠল। মাথার ভেতর বজ্রপাতের মতো লাগল। এতদিন যে বাক্যগুলো তাকে মোহগ্রস্ত করেছিল, সেগুলো আসলে কেবল ফাঁদ? সেলিম হয়তো তার সৌন্দর্যের ছোট ছোট দিকগুলো খেয়াল করে না, কিন্তু তার জন্য ঘাম ঝরিয়ে সংসার চালায়, রাত জেগে দুশ্চিন্তা করে। আর রিয়াদ? সে কেবল ক্ষণস্থায়ী মোহে ভোগ খুঁজে বেড়ায়।
সেই রাতে সাবিহা আয়নার সামনে দাঁড়াল। ঠোঁটে লাগানো লিপস্টিক মুছে দিল। নিজের চোখে চোখ রেখে ধীরে ধীরে বুঝল—আসল সৌন্দর্য এ নয়। আসল সৌন্দর্য হলো দায়িত্বে, ভালোবাসায়, সেই দীর্ঘ বন্ধনে, যেটা সেলিম আর সে মিলে তৈরি করেছে।
পরদিন ভোরে সেলিমের জন্য গরম চা হাতে নিয়ে সাবিহা শান্ত স্বরে বলল,
—“শোনো, তোমার একটা কথা বলব? আমি চাই তুমি মাঝে মাঝে আমায় বলো, আমি কেমন দেখতে। আমি চাই তুমি জানো, তোমার জন্যই আমি এখনো সবচেয়ে সুন্দর।”
সেলিম অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। তারপর হেসে মাথা নাড়ল,
—“তুমি কি জানো, আমার প্রতিদিনের লড়াইয়ের শক্তি কোথা থেকে আসে? তোমার চোখ থেকে। তুমি না থাকলে আমি কিচ্ছু করতে পারতাম না।”
সেই মুহূর্তে সাবিহার বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমান গলে গেল। বাইরে হয়তো প্রশংসার জাল ছড়ানো, কণ্ঠের মায়াজাল, বয়সকে উল্টে দেওয়ার মিথ্যে আশ্বাস। কিন্তু সংসারের ভেতরের ভালোবাসাটাই আসল।
রিয়াদের প্রশংসা ছিল ক্ষণিকের ধোঁয়া। কিন্তু সেলিমের নীরব দায়িত্ব ছিল দৃঢ় শিখা—যার আলোয় সাবিহা আবার নিজেকে খুঁজে পেল।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now