বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আয়না পিশাচ
সাদিয়া শারমিন স্নিগ্ধা
*********************************
অনেক রাত৷ বাইরে ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে৷ সাথে ঝোড়ো বাতাস৷ আজকের মতো রবিনের সাথে কথা শেষ করে ফোনটা রাখলো তুলি৷ তুলির মুখটা খুশি মাখা আর চোখের তারায় শত স্বপ্নের ঝিলিক৷ কয়েকমাস আগেও রবিন শুধু বন্ধুই ছিলো, আর এখন! ভেবেই তুলি মুচকি হাসলো৷ স্বাভাবিকভাবে হয়তোবা রবিন সারাজীবন শুধু ওর বন্ধু হয়েই থাকতো৷ কিন্তু রবিন, সায়মা নামের যে মেয়েটিকে ভালবাসতো সেই মেয়েটি ভয়ংকর এক রোড এক্সিডেন্টে অসময়ে হারিয়ে গেল৷ সায়মার মৃত্যুতে মানসিকভাবে প্রচন্ড ভেঙে পড়া রবিনের পাশে থাকতে থাকতেই কখন যে দুজনই দুজনের সাথে জড়িয়ে গেছে বুঝতেই পারেনি ওরা কেউই৷ তুলি ভাবে, ও তো আর কারো কাছ থেকে রবিনকে অন্যায়ভাবে কেড়ে নেয়নি বরং সায়মার মৃত্যুতে ভেঙে পড়া রবিনকে অনেক স্বাভাবিক করে তুলেছে৷ জানালা দিয়ে আসা বৃষ্টির ছাঁটে ভাবনায় ছেদ পড়ে তুলির৷ ঈশ! জানালার সামনের বেডশীটটুকু একেবারে ভিজে গেছে বৃষ্টির পানিতে! তাড়াতাড়ি করে জানালা বন্ধ করতে ওঠে তুলি৷ তুলিদের বাসাটা কিছুটা পুরনো আমলের৷ কাঠের পাল্লার জানালা৷ জানালার গ্রিল দিয়ে বাইরে হাত ঢুকিয়ে পাল্লা ধরে টান দিলো তুলি৷ আসছেনা তো!হয়তো বাতাসে আটকে যাচ্ছে ভেবে আরও জোরে টান দিলো তুলি৷
একি! কিছুতেই যে আসছেনা! যেন কেউ বাইরে থেকে জানালার কাঠের পাল্লা টেনে ধরে আছে! ভয় পেয়ে আরও জোরে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে জানালাটা বন্ধ করা চেষ্টা করতে লাগলো তুলি৷ কিন্তু হঠাৎ ই বাম হাতের কব্জিতে খুব ঠাণ্ডা কিছু একটার স্পর্শে অস্ফুট একটা শব্দ করে হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে নিলো৷ কি ভীষণ ঠাণ্ডা স্পর্শ! যেন কেউ বিশাল একখণ্ড বরফ চেপে ধরেছে কব্জিতে৷ জানালার কাছ থেকে ছিটকে সরে আসতেই কিছু একটার সাথে ধাক্কা খেয়ে পাই করে পেছনে ঘুরলো তুলি৷ আবছা আলোয় যা দেখলো তাতে শরীর হিম হয়ে গেল ওর৷ ওর মতো করেই অগোছালো ভাবে বসে আছে আরেকটা তুলি!একই রকম দেখতে, একই চুল, একই চোখ, ঠোঁট৷ যেন আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখছে তুলি৷ চিৎকার করার জন্য মুখ খুলেও কোনো চিৎকার বের হলোনা মুখ দিয়ে, শুধু জান্তব একটা গোঙানির মতো বের হচ্ছে৷ সে দেখলো সামনে বসা ওর প্রতিবিম্বের মতো মেয়েটির মুখভঙ্গি হঠাৎ পরিবর্তন হতে শুরু করেছে৷ রূপটা ভয়ংকর থেকে আরও ভয়ংকর হচ্ছে! সমস্ত মুখ রক্তমাখা, আর বাতাসে কি পঁচা একটা গন্ধ! কঙ্কালসার, দুর্গন্ধময় আর রক্তমাখা হাত দুটো যেন ওর গলা লক্ষ্য করেই এগিয়ে আসছে৷ সাথে সাথে জ্ঞান হারালো তুলি৷
পরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙলো তুলির কিংবা জ্ঞান ফিরলো, ধড়মড়িয়ে উঠে বসেই চারদিকে ভালো করে দেখে নিলো৷ সব স্বাভাবিক! কোন বাজে গন্ধ কিংবা রক্ত কিচ্ছু নেই এমনকি জানালাটাও তো বন্ধই! ছুটে গিয়ে বাসার আর সবাই কে ঘটনাটা বলতেই সবাই হাসাহাসি শুরু করে দিলো৷ ছোট ভাইটা তো বলেই ফেললো, "এত রাত জাগলে তো এরকম দুঃস্বপ্ন দেখবা-ই আপু!" ঠিকই, দুঃস্বপ্নই হয়তোবা! তাই যেন হয়!রবিনকে বলবে নাকি!এটা ভেবেই আবার ভাবনাটা সাথে সাথে মাথা থেকে দূর করে দিলো তুলি৷দূর,দুঃস্বপ্নের কথা বলে আর কি হবে!
এরপর কেটে গেছে বেশ কিছুদিন৷ সব স্বাভাবিকই ছিলো৷ কিন্তু হঠাৎই একদিন বিপর্যয় ঘটে গেল৷ নিঝুম দুপুর,নিজের ঘরে বসে রবিনকে টেক্সট করছিলো তুলি৷ বাসার সবাই গেছে একটা বিয়ের দাওয়াতে৷ ইচ্ছে করেই যায়নি ও৷ ছোট ভাই টাও বাসাতেই আছে অবশ্য, পরীক্ষা দিয়ে এসে ঘুমিয়েছে একটু৷ ফোনের দিকেই তাকিয়েছিল তুলি৷ চোখের কোণে কিছু একটা দেখে সতর্ক হলো৷ কেউ যেন একটা ওর জানালার সামনে দিয়ে খুব দ্রুত হেঁটে চলে গেল! অবাক ব্যাপার! ওর জানালা তো রাস্তার দিকে না৷ এই ভরদুপুরে আবার এদিক দিয়ে কি যাবে! সাথে সাথেই আরেকটা কথা মনে হতেই ভয়ে চোখ মুখ শাদা হয়ে গেল তুলির৷ ওদের বাসা তো দুই তলাতে! কেউ যদি জানালার সামনে দিয়ে হেঁটে যায়ও তবু তো নিচে না তাকালে তাকে দেখাই যাবেনা৷
শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা একটা ভয়ের অনুভূতি নেমে যায় তুলির৷ চিৎকার দিতে চায়, পারেনা৷ ভয় পেলে মানুষ নাকি দৌড়াতে পারেনা, কই তুলি তো পারছে৷ দৌড়ে কিচেন থেকে কিচেন নাইফটা তুলে নিয়ে দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরে ঘরে ফিরে আসলো তুলি৷ জানালায় সতর্ক দৃষ্টি৷ পাশের ঘরেই থাকা ছোট ভাইটাকে ডাকার কথা একবারও মনেই পড়লো না৷
ঐ তো আবার! আবার কেউ একজন জানালার সামনে দিয়ে যাচ্ছে৷ তুলি স্পষ্ট দেখলো, একটা মেয়ে! গোঙানির মতো একটা শব্দ করেই চাকুটা ছুড়তে গিয়েই থেমে গেল তুলি, একেবারে স্থির হয়ে গেল৷ ওর সামনে ওর প্রতিবিম্ব দাঁড়িয়ে আছে! একই দাঁড়ানোর ভঙ্গি, একই রকম দেখতে, একই চুল, একই চোখ, ঠোঁট! তুলি আয়নাতে নিজেই যেন নিজেকে দেখছে! কিন্তু সামনে তো কোন আয়না নেই! এইতো,এইতো সামনের মেয়েটার মুখভঙ্গি পরিবর্তন হচ্ছে,ভয়ংকর থেকে আরও ভয়ংকর হচ্ছে৷সেদিন রাতের সেই রক্তমাখা মুখ৷ চারিদিকে পঁচা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে৷ সেদিনের মতোই মেয়েটার কঙ্কালসার,দুর্গন্ধময় আর রক্তমাখা হাতদুটো এগিয়ে আসছে তুলির গলা লক্ষ্য করে৷ আড়চোখে নিজের হাতের চাকুটা একবার দেখে নিলো তুলি৷দুহাতে শক্ত করে চাকুটা চেপে ধরে মেয়েটার বুক লক্ষ্য করে সজোরে গেঁথে দিলো তুলি৷
কিন্তু একি!শুধু কাঁচ ভাঙার ঝনঝন শব্দ ছাড়া আর কিছুই তো হলোনা৷ যেন মাঝখানের আয়নাটা শুধু ভাঙলো৷ আয়নার ওপাশে তুলিরূপী মেয়েটার মুখে ফুটেছে ক্রুর হাসি! ক্রুদ্ধ তুলি আবারো মেয়েটার বুকে চাকু বসালো, কিন্তু না! এবারো সেই কাঁচ ভাঙার শব্দই শুধু৷ নোংরা মেয়েটার ক্রুর হাসি এবার পরিণত হলো অট্টহাসিতে৷ হতভম্ব হওয়া তুলির হঠাৎই কি মনে হতে নিজেই নিজের হাতে চাকু বসিয়ে টান দিলো৷ হ্যাঁ ঐতো! ঐতো পিশাচ মেয়েটার হাত কেটে রক্ত পড়ছে৷ হাত চেপে গুঙিয়ে উঠলো না মেয়েটা? এবার শরীর দুলিয়ে হেসে উঠলো তুলি, ওর চোখ ততক্ষণে আয়না-মেয়েকে খুনের নেশায় রক্তরাঙা৷ দুহাতে চাকুটা চেপে ধরে নিজের বুকে পেটে সমস্ত শরীরে এলোপাথাড়ি ভীষণ গতিতে আঘাত করতে করতে তুলি দেখলো আয়না-মেয়ে কিভাবে ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে,কিন্তু ওর মুখে হাসি কেন!তুলি ক্রোধে চিৎকার করে নিজের মুখ ছিন্নভিন্ন করে ফেলে৷ হ্যাঁ হয়েছে, এবার হাসি থেমেছে৷ ঘরের মেঝে রক্তে ভেসে যাচ্ছে, তুলির সেদিকে সামান্য ভ্রুক্ষেপও নেই৷ শরীরের সমস্ত শক্তি শেষ হয়ে নিথর হয়ে লুটিয়ে পড়তে পড়ত তুলি শুনল আয়না-মেয়ে কথা বলছে! চিৎকার করে করে বলছে,"আমার রবিন শুধু আমার, শুধুমাত্র আমার৷ রবিন আমাকে কথা দিয়েছে জীবনে-মরণে সবসময় শুধু আমারই থাকবে৷ আমার আর রবিনের মাঝে যেই আসুক না কেন তার পরিণতি এমনই হবে!" শরীরের শেষ শক্তিটুকু একসাথে করে কিছু একটা হয়তো বলতে চেয়েছিলো তুলি, মুখ খুলেছিলো কিন্তু কিছু বলার সুযোগ আর হলোনা!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now