বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
শার্টটেইল ক্রিকের উজানে ছুটছে ওরিন ওসমানের রৌন। ব্লাডি বেসিন আর স্কেলেটন রিজ পেরোল ওটা, একটা পাহাড়ি ঝরনার অদূরে ভার্দেয় পৌঁছাল। সেই রাতে হার্ডস্ক্র্যাবল ক্রিকের কাছে একটা খাড়াইর কোনায় বিছানা পাতল সে। অনেক রাত এখন, ইচ্ছে করেই সে আগুন ধরাল না।
চিন্তাভাবনা করে জায়গাটা বাছাই করেছে সে। পেছনে, আকাশপানে মাথা তুলেছে পাহাড়। বাঁয়ে খাড়া ঢাল নেমে গেছে হার্ডস্ক্র্যাবল ক্রিক অভিমুখে। ওর ক্যামপ অনেকটা হার্ডস্ক্র্যাবল মেসার গোড়ায়, অদূরে মাথা তুলেছে ডেডম্যান মেসা। সামনের জমি ঢালু হয়ে চলে গেছে ক্রিকের দিকে। প্রচুর শুকনো কাঠ রয়েছে। পাহাড়ের কার্নিশ জায়গাটাকে বৃষ্টি থেকে রক্ষা করছে।
হঠাত্ জেগে গেল ওরিন। মুহূর্তের জন্য নিশ্চল পড়ে রইল। আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেছে। কাত হয়ে শোয়া অবস্থায় তারাগুলো দেখতে পাচ্ছে সে। মাঝরাতের বেশি হবে এখন, অনুমান করল সে। কেন ঘুম ভেঙেছে, বুঝতে পারল না। তবে দেখল, রৌনটা ওর দিকে কয়েক কদম এগিয়ে এসেছে, মাথা উঁচু এবং কান খাড়া।
‘সামলে, বেটা,’ সাবধান করল ওরিন।
বেডরোলের ভেতর থেকে পিছলে বেরিয়ে এল সে, বুট পরে পায়ের ভরে সোজা হলো। অন্ধকারে হাতড়ে কাছে টেনে নিল উইনচেস্টারটা।
ওপরে পাহাড়ের চাতাল, তাই সে যেখানে আছে, সেই জায়গাটা নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। বোল্ডার আর সিডার ঝোপগুলো বাড়তি আড়াল জোগাচ্ছে। পাহাড়ের অন্ধকারের পটে রৌনটাকে দেখা যাবে না, কিন্তু ওর জায়গা থেকে, সহজেই দেখতে পাচ্ছে ক্রিকের পাড় আর খোলা জমির প্রায় ত্রিশ গজ এলাকা।
অসপষ্ট নড়াচড়া আর চাপা কণ্ঠস্বর শোনা গেল নিচে। তারপর শুনশান। রাইফেলটা নামিয়ে রেখে কোমরে গানবেল্ট বাঁধল ওরিন, সন্তর্পণে চাতাল ছেড়ে ঝোপের ভেতর গিয়ে ঢুকল।
খানিক পর, নড়াচড়ার শব্দ শুনল সে, তারপর একটা নিচু কণ্ঠস্বর: ‘কাছে-পিঠেই আছে কোথাও। খুব বেশি দূরে যেতেই পারে না ব্যাটা। ওরা বলল, হারামিটা এ পথেই এসেছে। ফসিল ক্রিকের পর ছেড়ে দিয়েছে মূল ট্রেইল।’
দুজন লোক। অপেক্ষা করতে লাগল ওরিন, সিডার ঝোপের ভেতর দাঁড়িয়ে, চোখে কাঠিন্য, সমস্ত পেশি টানটান এবং তৈরি। লোকগুলো নির্বোধ। কী ভেবেছে? সে বোকা?
তাসের জুয়ায় একজন জোচ্চুরি করেছিল একবার। তাকে যমের বাড়ি পাঠিয়েছে সে। প্রতিশোধ নিতে এসে লোকটার বাকি তিন ভাইও মারা পড়েছে। ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে লড়বারও অভিজ্ঞতা আছে তার। গৃহযুদ্ধের পরপর ডাকোটায় স্যু আর শাইয়েন গোত্রের বিরুদ্ধে লড়েছে। মিনেসোটায় লিটল ক্রো গণহত্যার কিছু দিন পরের ঘটনা এটা। অ্যাপাচি আর
কিওয়াদেরকে মোকাবেলা করেছে বারকয়েক।
এবার লোক দুটোকে দেখতে পেল সে। দুটো ছায়ামূর্তি চড়াই বেয়ে উঠে আসছে, ধূসর নুড়ি-পাথরের ঢালের পটে রেখায়িত হয়ে উঠেছে ওরা।
এতক্ষণ নিজের ভেতরে যে বুনো স্বভাবটাকে দাবিয়ে রাখছিল ওরিন, এবার শেকল ছিঁড়ল সেটা। আর অপেক্ষা করা যায় না। রৌনটাকে দেখে ফেলবে ওরা, তারপর ওকে নিকেশ না করা অবধি নড়বে না। অতএব, যা করার এখুনি করত হবে। চকিতে ফাঁকায় বেরিয়ে এল সে, নিঃশব্দে।
‘কাউকে খুঁজছ?’
লাট্টুর মতো ঘুরল ওরা। ওরিন নক্ষত্রের ঝিলিক দেখতে পেল একটা পিস্তলের ব্যারেলে এবং নিজের পিস্তলের ভোঁতা, কর্কশ কাশির আওয়াজ শুনল। লুটিয়ে পড়ল একজন, খাবি খাচ্ছে। অপরজন টলে উঠল প্রথমে, তারপর ঘুরে দৌড়ল ত্রস্ত পায়ে, গোঙাচ্ছে, অর্ধেক ভয়ে এবং অর্ধেক ব্যথায়। জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল ওরিন, পিস্তল তাক করতে চেষ্টা করল লোকটার দিকে, কিন্তু ঝোপের আড়ালে তাকে হারিয়ে ফেলল।
মৃত লোকটার উদ্দেশে ঘুরল ওরিন কিন্তু কাছে গেল না। নিহত আততায়ীকে সে পাশ কাটাল দূর দিয়ে, নিজের ঘোড়ার কাছে ফিরে গেল। শান্ত করল রৌনটাকে, তারপর শুয়ে পড়ল। কয়েক মিনিটের মধ্যে, ঝিমোতে শুরু করল সে।
ভোর তাকে আবিষ্কার করল লাশের সামনে। রৌনের পিঠে স্যাডল চাপানো হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। সিলভার সিটিতে যে দুজন লোক ওর পিছু নিয়েছিল, এই লোকটা তাদের একজন। হ্যাংলা, শ্যামলা-মুখো, চোয়াল ভাঙা, কপালের দু-পাশে কয়েক গাছি রুপোলি চুল। ডান চোখের ওপরে পুরোনো একট ক্ষত, গভীর এবং লালচে।
হাঁটু মুড়ে বসল সে, লোকটার পকেট তল্লাশি করল, কয়েকটা চিঠি আর একতাড়া কাগজ পেল। নিজের পকেটে ওগুলো চালান করল ওরিন, তারপর ঘোড়ায় চেপে সতর্ক ভঙ্গিতে রওনা হলো ক্রিকের উজানে। স্যাডলের ওপর আড়াআড়ি ফেলে রেখেছে উইনচেস্টার, বিপদ মোকাবেলার জন্য তৈরি। কোনো কিছুই ঘটল না।
ধীর লয়ে গড়িয়ে চলে সকাল, বৃষ্টির পর পরিবেশ গুমোট, নিশ্চল। কানের পাশে ভনভন করছিল একটা মাছি, হ্যাটের ঝটকায় ওটাকে তাড়াল ওরিন। সাবলীল অথচ জোর পায়ে ছুটছে রৌন, একেক কদমে অনেকটা জায়গা অনায়াসে অতিক্রম করছে। দ্রুত অথচ নিশ্চিত ভঙ্গিতে এগিয়ে চলেছে দূরের বেগুনি রেনজের দিকে, ঘাসে ছাওয়া তৃণপ্রান্তরের ওপর দিয়ে, দু-পাশে পাইন আর অ্যাসপেনের সারি। এখানে-সেখানে দীর্ঘ কটনউডের পত্রপল্লবে বাতাসের ফিসফাস।
স্বপ্নের জায়গা এটা, গরু-মোষ কিংবা ভেড়া চরাবার জন্য আদর্শ জায়গা, মানুষের বসত গড়বার জায়গা। সামনে-বাঁয়ে, সুউচ্চ মোগাইওন রিম মাথা তুলেছে আকাশপানে। ওই রিমটার পেছনেই, মালভূমিতে, পিভটরক। মর্মরিত একটা অ্যাসপেন কুঞ্জবনের পাশ কাটিয়ে তরাইয়ের লম্বা উপত্যকার দিকে তাকাল সে।
এই প্রথম গরুর পাল দেখল সে; হূষ্টপুষ্ট, পরিতৃপ্ত গরুর পাল, নাবাল জমির তাজা ঘাস খেয়ে নাদুসনুদুস হয়েছে। একবার দূরে একজন অশ্বারোহীকে চোখে পড়ল, কিন্তু ওর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করল না সে। এ মুহূর্তে ট্রেইলটাই সন্ধান করছে। উত্তর-পুবে মুখ ব্যাদান করল একটা ক্যানিয়ন; ঘোড়া ঘুরিয়ে সে দিকে রওনা হলো ওরিন, ক্যানিয়ন থেকে নেমে আসা ক্রিক উজিয়ে। এখন ক্রমাগত ওপরে উঠছে সে। ভ-ূখণ্ডের চেহারা থেকে অনুমান করল, রিমে পৌঁছাতে প্রায় তিন হাজার ফুট খাড়াই পেরোতে হবে। তবে সে শুনেছে, সামনেই ট্রেইল আছে একটা, তাই এগিয়ে চলল।
রিম অবধি শেষ আটশ ফুটি ট্রেইলটা বন্ধুর এবং বিসর্পিল। নাগাড়ে উঠে গেল ওরিন। রিমের মাথায় মালভূমির বাতাস আশ্চর্য রকমের সতেজ ও স্বচ্ছ। সামনে এগোল সে। ইতিউতি কয়েকটা গরু চরছে। একটু বাদে, সরু ট্রেইলের ধারে কাঠের এবড়োখেবড়ো সাইনটা চোখে পড়ল তার। ওতে লেখা—পিভটরক এক মাইল।
একটা চ্যাপ্টা-মাথা ঢিবির ওপর নিচু, ছড়ানছিটানো বাড়ি, বর্গক্ষেত্রের তিন দিক লম্বা বার্ন আর চালাঘরে ঘেরা। যে দিকটা খোলা, সে দিকেই রিম আর ট্রেইল। ওই ট্রেইল ধরেই আসছিল ওরিন। কটনউড, পাইন আর দেবদারু গাছের সারি সুরক্ষা দিয়েছে বিল্ডিংগুলোকে। কোরালের ঘোড়াগুলোর পশমে শেষ বিকেলের আলোর দ্যুতি দেখতে পাচ্ছিল সে।
একটা বুড়ো লোক বেরিয়ে এল স্টেইবল থেকে, হাতে কারবাইন। ‘ঠিক আছে, স্ট্রেনজার। ওখানেই থাম। এখানে কী চাও?’
একগাল হাসল ওরিন। সাবধানে হাত তুলে, চ্যাপ্টা কার্নিশের টুপিটা ঠেলে দিল পেছনে। ‘মিসাস মোনা কার্টিসকে খুঁজছি,’ বলল। ‘আমার কাছে খবর আছে।’ ইতস্তত করল সে। ওর স্বামীর খবর।’
নিচু হলো কারবাইনের মাজল। ‘মিস্টার কার্টিসের? তার কী খবর থাকতে পারে?’
‘ভালো খবর না,’ ওরিন বলল লোকটাকে। ‘উনি মারা গেছেন।’
আশ্চর্যজনকভাবে বুড়োকে ভারমুক্ত মনে হয়। ‘আচ্ছা,’ সংক্ষেপে বলল সে। ‘অবশ্য আমরা এমন কিছুই আশঙ্কা করছিলাম। তা, কীভাবে মারা গেছে?’
দোনামোনা করল ওরিন। ‘এল পাসোর একটা সালুনে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়েছিল, তারপর ড্র করতে ভীষণ দেরি করেছিল।’
‘ও কখনোই ফাস্ট ছিল না।’ ওরিনকে জরিপ করল বুড়ো। ‘আমার নাম জিম ডেভিডসন। তুমি নিশ্চয়ই টনি মারা গেছে—শুধু এই কথাটা বলতে সেই এল পাসো থেকে অ্যাদ্দূর ছুটে আসনি? কী জন্য এসেছ?’
‘সেটা মিসাস কার্টিসকেই বলব। তবে এখানে আসার পথে শুনেছি, তুমি এদের পুরোনো লোক, তাই তোমাকেও বলা যায়। আমি ওর জন্য কিছু টাকা নিয়ে এসেছি। টনি কার্টিস মারা যাওয়ার মুহূর্তে আমাকে দিয়ে বলেছে ওর কাছে পৌঁছে দিতে। পাঁচ হাজার ডলার।’
‘পাঁচ হাজার?’ অপলকে ওরিনকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে ডেভিডসন। ‘মানতে বাধ্য হচ্ছি, টনি তোমাকে খুব বিশ্বাস করেছিল। অনেক দিনের পরিচয়?’
মাথা নাড়াল ওরিন। ‘মাত্র কয়েক মিনিটের। মৃত্যুপথযাত্রী, আর কোনো উপায়ও ছিল না তার।’
বাড়ির একটা দরজা আছড়ে পড়ার আওয়াজে ওরা দুজনেই ঘুরল সে-দিকে। সুঠাম গড়নের এক যুবতী হেঁটে আসছে ওদের দিকে। ওর লাল চুলে ঝিলমিল করছে রোদ। সাধারণ একটা সুতির পোশাক পরনে, কিন্তু পরিপাটি। মেয়েটার আগে আগে দৌড়ে এল একটা ছোট্ট ছেলে, বয়স পাঁচ কি ছয় বছর হবে। ওরিনের দিকে ঝুঁকে এল সে, তারপর থমকে দাঁড়িয়ে একবার ওর মুখ এবং আরেকবার ওর পিস্তল দুটো দেখতে লাগল।
‘হাউডি, বুড়ো খোকা!’ স্মিত হেসে বলল ওরিন। ‘তোমার সপার কোথায়?’
চমকে উঠল ছেলেটা, লজ্জা পেল। পিছিয়ে গেল এক কদম, হতচকিয়ে গেছ আচমকা প্রশ্নে। ‘আ… আমার কোনো সপার নেই!’
‘সে কী? কাউহ্যান্ডের সপার নেই? ঠিক আছে, ব্যবস্থা করব একটা তোমার জন্য।’ পলক তুলল ও। ‘আদাব, মিসাস কার্টিস। আমি ওরিন ওসমান। তোমার জন্য একটা খারাপ খবর নিয়ে এসেছি।’
ঈষত্ পাণ্ডুর হয় মোনার মুখাবয়ব, কিন্তু চিবুক উঁচু। ‘তুমি কি বাসায় আসবে একটু, মিস্টার… ওসমান? জিম, ওর ঘোড়াটা প্লিজ কোরাল করে দাও।’
রাঞ্চ হাউসের লিভিং রুমটা সুপরিসর, শীতল। মেঝেয় ছোট্ট নাভাহো গালিচা পাতা, চেয়ার আর ডিভানগুলো সুন্দর করে ট্যান করা গরুর চামড়া দিয়ে মোড়া। প্রশংসার দৃষ্টিতে ঘরের পারপাশে নজর বোলায় ওরিন, আরিজোনার রোদে দীর্ঘ পথযাত্রার পর শীতলতা উপভোগ করছে। ঠিক যেমনটা করছে এই মেয়েটির সারল্যকেও। ড্রুসিলার সঙ্গে কোথায় যেন মিল আছে এর। ড্রুসিলার কথা মনে পড়তে বেদনায় টনটন করে উঠল ওর বুক।
হঠাত্ ওর মুখোমুখি হলো মেয়েটা। ‘এবার বোধ হয় আমাকে বলতে পার তুমি। কিছু রাখ-ঢাক বা ভণিতা করার দরকার নেই।’
যথাসম্ভব দ্রুত এবং সবিস্তারে ব্যাখ্যা করল ওরিন। যখন শেষ করল সে, মেয়েটার মুখ সাদা, চোয়াল পাথর। ‘আ… আমি এই ভয়টাই করছিলাম। যখন চলে যায়, আমি জানতাম ও আর ফিরবে না। তুমি বুঝতে পারছ, টনি মনে করত… না, বিশ্বাস করত আমাকে সে রক্ষা করতে পারেনি, ওর বাবাকে রক্ষা করতে পারেনি।’
পকেট থেকে অয়েল স্কিনে মোড়া প্যাকেটটা বের করল ওরিন। ‘তোমার জন্য পাঠিয়েছে এটা। বলেছে, এতে পাঁচ হাজার ডলার আছে। তোমাকে দিতে বলেছে।’
মোনা নিল প্যাকেজটা; ওটার দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলল ঝরঝর করে। ‘হ্যাঁ।’ মেয়েটার কণ্ঠস্বর এত নিচু, ওরিনের কানে প্রায় পৌঁছায় না কথাগুলো। ‘ওর পক্ষে সম্ভব এটা করা। হয়তো ভেবে থাকবে, অন্তত এটুকু সে করতে পারে আমার, আমাদের জন্য। জান…।’ চোখ তুলল মোনা কার্টিস, ‘আমরা একটা ক্যাটল ওয়রের মধ্যে আছি। খুব সাংঘাতিক লড়াই। এটা সেই লড়াই করার টাকা। আমার ধারণা, টনি মনে করেছিল… মানে, ও নিজে গানফাইটার না, এই টাকাটা হয়তো কাজে আসবে, ঘাটতিটা পুষিয়ে দেবে। তুমি হয়তো অবাক হয়েছ এভাবে টাকা পাঠানোয়।’
‘না,’ বলল ওরিন, ‘হইনি। আমি বরং বাইরে কাউহ্যান্ডদের কাছে যাই। তুমি হয়তো এ সময়ে একা থাকতে চাইবে।’
‘দাঁড়াও!’ মোনার আঙুল ওর আস্তিন টেনে ধরে। ‘তুমি ওর সঙ্গে ছিলে, এত দূর এসেছ কষ্ট করে, আমি চাই, তুমি জান সব কিছু। আমার আর টনির মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। আসলে ও…, নিজেকে ও কাপুরুষ মনে করেছিল। মনে করেছিল, আমার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। অনেক দিন ধরেই আমাদের ঝামেলা চলছে ইয়োলো জ্যাকেটের জ্যাক প্যালেন্সের সঙ্গে। কার্ল রৌভ গায়ে পড়ে ঝগড়া লাগায় টনির সঙ্গে। মতলব ছিল, ওকে খুন করা। কিন্তু টনি লড়তে রাজি হয়নি। পিছিয়ে গিয়েছিল। সবাই বলেছে ও কাপুরুষ। টনি হজম করতে পারেনি ব্যাপারটা। একদিন রাতের অন্ধকারে চলে গেছে বাড়ি ছেড়ে।’
ভ্রূকুটি করে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল ওরিন, চিন্তা করছে কিছু। যে ছেলেটা ঝগড়া বাধিয়ে ছিল ওর সঙ্গে, সপর্ধা দেখিয়ে পিস্তল বের করতে গিয়েছিল, সে আর যা-ই হোক কাপুরুষ ছিল না। নিজের কাছে প্রমাণ করছিল কিছু? হতে পারে। কিন্তু কাপুরুষ ছিল না।
‘ম্যাম,’ ঝট করে বলল সে, ‘তুমি তার বিধবা স্ত্রী। ওর সন্তানের মা। তোমার একটা কথা জানা দরকার। তোমার স্বামী আর কী ছিল, আমি জানি না। আমি তাকে বেশি সময় দেখিনি। কিন্তু সে কাপুরুষ ছিল না। একেবারেই না। দেখ…’ দ্বিধা করে ওরিন, নিজের বিব্রতকর অবস্থার কথা ভেবে ফাঁপরে পড়েছে। এই মেয়েটাকে বলতে চাইছে না, সে-ই তার স্বামীকে খুন করেছে, আবার এটাও চাইছে না মেয়েটা ভাবুক, তার স্বামী কাপুরুষ ছিল। ‘সে যখন পিস্তলের দিকে হাত বাড়িয়েছিল, আমি তার চোখ দেখতে পেয়েছিলাম। আমি সেখানে ছিলাম, ম্যাম, দেখেছি সব কিছু। টনি কার্টিস কাপুরুষ ছিল না।’
কয়েক ঘণ্টা পর, বাংকে শুয়ে ঘটনাটা নিয়ে ভাবে ওরিন। পাঁচ হাজার ডলারের ব্যাপারটা সত্যিই রহস্যময়। কোত্থেকে এল টাকাটা? কার্টিস পেল কীভাবে?
পাশ ফিরল ওরিন, কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ল। কাল সকালে সে ট্রেইলে নামছে আবার।
পরদিন সকালে যখন বিছানা ছাড়ল ওরিন, বাইরে ঝলমলে রোদ্দুর। সময় নিয়ে গোসল আর আর দাড়ি কামানো সারল সে, পিঠে রোদ উপভোগ করতে করতে, কাঁধ থেকে গুরুদায়িত্ব নেমে যাওয়ায় হালকা বোধ করছে। বাংকহাউসে ফিরে গানবেল্ট বাঁধছে সে—এমন সময়ে কতগুলো ঘোড়া এগিয়ে আসার আওয়াজ পেল। দরজায় গেল ওরিন, উঁকি দিল বাইরে।
উঠানে দাঁড়িয়ে তিনজন ঘোড়সওয়ার; পোড়া-মুখো নাটো বা ডেভিডসন—কাউকেই দেখা যাচ্ছে না আশেপাশে। ওদের একজন পরিচিত, ইয়োলো জ্যাকেটে দেখেছে, জ্যাক প্যালেন্স। লোকটা বিশালদেহী, চওড়া কাঁধ, শরীরে মেদের লেশমাত্র নেই। নিষ্ঠুর চেহারা।
মোনা কার্টিস বেরিয়ে এল সিঁড়ির মাথায়।
‘ম্যাম,’ প্যালেন্স বলল ঝটপট, ‘তোমাকে উচ্ছেদ করতে এসেছি আমরা। দশ মিনিট সময় দিচ্ছি, এর মধ্যে তৈরি হয়ে নাও। আমার লোক তোমার বাকবোর্ডে ঘোড়া জুড়ে দেবে। এই জায়গা আমার, দলিল আছে, তোমরা জবরদখল করে রেখেছ। অনেক সহ্য করেছি, কিন্তু আর না।’
চকিতে আস্তাবলের দিকে নজর বোলাল মোনা। কিন্তু প্যালেন্স মাথা নাড়ল। ‘ডেভিডসন কিংবা ওই দোআঁশলাটাকে খুঁজে লাভ নেই, ওরা কাজে বেরোনোর পরই আমরা এসেছি। আমার লোক ট্রেইলে নজর রাখছে। আমরা বিনা ঝামেলায় তোমাকে তাড়াতে চাইছি।’
‘তুমি যেতে পার, মিস্টার প্যালেন্স। আমি নড়ছি না!’
‘নড়ছ,’ প্যালেন্স বলল অধৈর্য্যের স্বরে। ‘আমরা জানি, তোমার স্বামী মারা গেছে। তোমাকে আমরা এভাবে
আমাদের রেঞ্জ দখল করে থাকতে দিতে পারি না।’
‘এটা আমার রেঞ্চ, আমি থাকব এখানে।’
খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসল প্যালেন্স। ‘আমাদেরকে জোর খাটাতে বাধ্য কোর না, ম্যাম। দরকার হলে, আমরা কিন্তু তা করব। এই দুর্গম জায়গায় কেউ কিস্যু জানতে পারবে না।’ দম নেওয়ার জন্য থামল প্যালেন্স, তারপর যোগ করল, ‘কাজেই, তুমি যাচ্ছ এবং এখনি।’
ওরিন পা রাখল বাংকহাউসের বাইরে, ঘোড়সওয়ারদের দিকে দ্রুত এগিয়ে গেল তিন কদম। শান্ত, নিশ্চিত পদক্ষেপ, কিন্তু ভেতরে ভেতরে মুখিয়ে আছে একটা ঝামেলা বাধানোর জন্যে। উত্তেজনাটা অবদমন করল সে, নিশ্চুপ রইল একটু সময়। তারপর মুখ খুলল।
‘প্যালেন্স, তুমি একটা মাথামোটা গর্দভ এবং মাস্তান। এখানে এসেছ একজন মহিলার দুর্বলতার সুযোগ নিতে, কারণ তোমার ধারণা, তিনি অসহায়। কিন্তু তোমার ধারণা ভুল। এবার ঘোড়া ঘুরিয়ে কেটে পড়… কোনো চালাকির চেষ্টা না। আর কক্ষনো পা রাখবে না এই জমিতে।’
মুহূর্তের জন্য ফ্যাকাশে হয়ে গেল প্যালেন্সর মুখ, তারপর ক্রোধে কালো। সামান্য সামনে ঝুঁকল সে। ‘অ, তুমি এখনো আছ এখানে? বেশ, তোমাকেও চলে যাওয়ার সুযোগ দিচ্ছি। ভাগ!’
আরেক কদম আগে বাড়ল ওরিন, উত্তেজনার খই ফুটছে ওর ভেতরে। স্থির দৃষ্টিতে ওদের মাপছে সে, দেখল, একজনের চোখ শঙ্কায় বস্ফািরিত হলো।
‘সাবধান, বস! সাবধান!’
‘হ্যাঁ, সাবধান, প্যালেন্স,’ বলল ওরিন। ‘তুমি ভেবেছিলে এই মহিলা একা, কিন্তু তিনি একা নন। আমাকে যদি কাজ দেন, আমিও থাকব। তোমাদেরকে এই তল্লাট ছাড়া করব। কবরেও পাঠাতে পারি। কোনটা তোমাদের পছন্দ, বেছে নাও। তোমরা তিনজন। আমি একা। যদি শকুনের খোরাক হতে চাও, পিস্তলের দিকে আর আধা ইঞ্চি হাত বাড়ালেই তোমাদের খায়েশ পূরণ হবে; তিনজনেরই।’
আরও এক কদম এগোল সে। এখন উত্তেজনার চরমে পৌঁছেছে, একটা লড়াইয়ের জন্য উন্মুখ হয়ে উঠেছে তার সমগ্র অস্তিত্ব। ভেতরে ভেতরে চাঞ্চল্যবোধ করছে সে, কিন্তু সমস্ত পেশি তৈরি, মাথা ঠান্ডা। হাতের পাঞ্জা মেলে ধরল সে, আরেক পা এগোল।
‘আয়, কায়োটের বাচ্চারা, সাহস থাকে তো আয়!’
প্যালেন্সের মুখ শুকনো, চোয়াল দেবে গেছে। চোখ দুটো বস্ফািরিত। মুখের ভেতর তেতো বোধ করছে সে। তার অন্তরাত্মা বলছে মামলা খারাপ—সে সাক্ষাত্ যমের মুখে। সহসা একটা সত্য উপলব্ধি করল জ্যাক পালেন্স, যখন মাশুল চড়া, জুয়া খেলার সাহস তার নেই। সামনে দাঁড়ানো এই শান্ত মানুষটাকে যে বুনো আগ্রহ তাতিয়ে তুলছে, সেটা সপষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে; ওর আপাত-নিরাবেগ চেহারার আড়ালে প্রস্তুতির তীব্রতা পরিষ্কার। ভেতরে ভেতরে অসুস্থবোধ করল প্যালেন্স।
‘বস,’ ফ্যাঁসফেঁসে গলায় বলল ওর পাশের লোকটা, ‘চল, কেটে পড়ি। এই লোক বিষাক্ত।’
পমলের ওপর আস্তে করে সহজ ভঙ্গিতে হাতটা রাখল জ্যাক প্যালেন্স। ‘মোনা, তুমি তাহলে বন্দুকবাজ ভাড়া করছ? এভাবেই মোকাবেলা করতে চাইছ ব্যাপারটা?’
‘আমি মনে করি, তোমরাই ভাড়া করেছ আগে,’ শান্ত কণ্ঠে জবাব দিল মোনা। ‘তোমরা এবার বিদেয় হও।’
‘ফেরার পথে,’ ওরিন পরামর্শ দিল, ‘হার্ডস্ক্র্যাবল ক্যানিয়নে থেমে যেয়ো একবার। ওখানে তোমার এক ভাড়াটে খুনির লাশ পড়ে আছে। কাল রাতে সে ভুল হিশেব করেছিল।’
অদ্ভুত চোখে তাকাল প্যালেন্স। ‘তুমি কী বলছ, আমি বুঝতে পারছি না!’ ঝামটে উঠল। ‘আমি কাউকে পাঠাইনি।’
অপলকে ওর গমন-পথের দিকে তাকিয়ে রইল ওরিন, কপালে চিন্তার ভাঁজ। প্যালেন্সর চোখে যথার্থই বিস্ময় ফুটেছিল, কিন্তু সে যদি ওই লোক দুটোকে পাঠিয়ে না থাকে, তাহলে কে পাঠাল? সিলভার সিটি এবং এল পাসোতে দু-জায়গাতেই ছিল লোক দুটো, আবার দেখা যাচ্ছে, এই অঞ্চলও তাদের চেনা এবং ইয়োলো জ্যাকেটে তাদের কেউ একজন বন্ধু আছে। এমনও হতে পারে, ওরা আসলে তার পিছু নেয়নি বরং শুরুতে টনি কার্টিসের পিছু নিয়েছিল।
ঘুরে মেয়েটির উদ্দেশে স্মিত হাসল ওরিন। ‘কায়োট,’ বলল কাঁধ ঝাঁকিয়ে। ‘হম্বিতম্বিই সার, সাহস নেই।’
অদ্ভুত দৃষ্টিতে মোনা দেখছিল ওকে। বলল, ‘তুমি… তুমি ওদের খুন করতে, না? কেন?’
কাঁধ উঁচুনিচু করল ওরিন। ‘জানি না। হয়তো এ জন্য যে… মানে কোনো পুরুষ একজন মেয়েকে একা পেয়ে তার সুযোগ নেবে, আমার এটা পছন্দ না। তা ছাড়া’… স্নিগ্ধ হাসি ছড়িয়ে পড়েছে ওর মুখে… ‘প্যালেন্সকে আমার সজ্জন মনে হয়নি।’
‘আমাদের পয়লা নম্বর দুশমন এই লোক,’ সিঁড়ি থেকে নেমে এল মোনা। ‘কথাটা কি সত্যি তোমার মনের, মিস্টার ওসমান? মানে, ওই যে তখন বলছিলে, আমার এখানে কাজ করবে? আমার মানুষ দরকার; তবে এটাও বলে রাখি, জেতার সম্ভাবনা আমাদের খুব কম। বলতে পার, লড়াইটা একতরফা।’
‘হ্যাঁ, মনের কথা।’ আসলেই কি মনের কথা? অবশ্যই। একটা পুরোনো চিনা প্রবাদ মনে করে ওরিন—তুমি যদি কারও জীবন রক্ষা কর, সে তোমার দায় হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অবশ্য সে রকম না, কিন্তু এই মহিলার স্বামীকে হত্যা করেছে সে, তাই মহিলা বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া অবধি তার সঙ্গে থাকাটা ওর দায়। শুধু এটাই একমাত্র কারণ কি? ‘আমি থাকব,’ বলল ওরিন। ‘এর শেষ দেখে ছাড়ব। সারা জীবন যুদ্ধ করেছি আমি, এর চেয়ে অনেক তুচ্ছ কারণে অস্ত্র ধরেছি, তাই এখন থেমে যাওয়াটা লজ্জার ব্যাপার হবে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now