বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

আন্দামান ষড়যন্ত্র চ্যাপ্টার- ৭

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X আন্দামান ষড়যন্ত্র চ্যাপ্টার- ৬ বাকি অংশ বলে একটু থামল আহমদ মুসা। শুরু করল আবার, ‘শুনুন ভাই সাহেব, ওরা যদি এদিকে না এগোয়, তাহলে আমিই এগুব এবং ওদের পেছন থেকে উদের উপর চড়াও হবো। আর আপনাদের লোক যেভাবে আছে, সেভাবেই থাকবে। যদি শংকরাচার্যের লোকরা আমার এদিকে ছাড়া অন্য কোন দিকে অগ্রসর হবার চেষ্টা করে, তাহলে সব গোপন স্থান থেকে একসাথে ব্ল্যাংক ফায়ার করতে হবে। যাতে ওরা কোন এক দিকে অগ্রসর হতে না পারে এং অগ্রসর হতে চাইলে যেন বিভক্ত হয়ে সব দিকে অগ্রসর হয়। এতে ওদের বিভক্ত করে মার দেয়া সহজ হবে’। ‘ধন্যবাদ ছোট ভাই। আর কোন পরামর্শ?’ ‘আপাতত নয়’। ‘সাহারা বানু, শাহ বানুরা কেমন আছে ছোট ভাই?’ ‘ভাল আছে ভাই সাহেব’। ‘থ্যাংকস আল্লাহ’। ‘এখন টেলিফোন রাখছি। আসসালামু আলাইকুম’। সালাম দিয়ে ওপার থেকে ড্যানিশ দেবানন্দ টেলিফোন অফ করল। আহমদ মুসা মোবাইল অফ করে পকেটে রেখে বলল, এস তারিক লাশ দু’টো জংগলে লুকিয়ে ফেলি’। এগিয়ে এল তারিক। বলল, ‘আমরা কি এখানে অপেক্ষা করব?’ ‘এখানে নয়, আরও সামনে গিয়ে ঐ দু’টিলার পেছনে গিয়ে অপেক্ষা করব। টিলার উপর থেকে নিচে অনেক দূর দেখা যাবে। আর দু’টিলার মাঝখান দিয়ে যে পথ তা সংকীর্ণ। শত্রুদের এখানে ট্রাপে ফেলা আমাদের জন্য অনুকূল হবে’। ‘ওরা আসবে নিশ্চিত?’ ‘কোন কিছুই নিশ্চিত নয়। আমাদের এটা আশা মাত্র। ওদের এই ভাবে বিচ্ছিন্ন করে মোকাবিলা করার আশা আমাদের সফল নাও হতে পারে’। ‘বুঝেছি স্যার’। বলে লাঋম টেনে নেয়ার জন্যে হাত লাগাল তারিক। আহমদ মুসাও। লাশ দু’টো ঝোপের আড়ালে রেকে সামনে এগিয়ে টিলার কাছে চলে এল আহমদ মুসারা’। টিলাটা অদ্ভুত ধরনের। দু’পাশের জংগলে কতকটা দেয়ালের আকারে টিলাটা বিস্তৃত। কিন্তু দু’পাশ থেকে রাস্তায় এসে টিলাটা গেটের আকার নিয়েছে। রাস্তার দু’পাশের দু’টিলা যেন গেটের স্তম্ভ। গেটের এ পাশটায় বড় একটা গাছ। গাছটার ডাল-পালা প্রায় ঢেকে দিয়েছে টিলাটাকে। গাছের তলাটা প্রায় পরিষ্কার এবং সমতল। আহমদ মুসা তার পিঠের ব্যাগের পকেট থেকে শক্ত নাইলনের ওয়াটার ওয়্যার বের করে নিল। উভচর কোট বৃষ্টিতেও কাজে লাগে, আবার সাগরে নামার জন্যে খুবই নিরাপদ। হাঙ্গর-কুমিরের দাঁত তো দুরের কথা বুলেটও এই বিশেষ নাইলন ফুটো করতে পারে না। প্যাক করলে ওয়াটার ওয়্যারটি হাতের মুঠিতে নেয়া যায়, খুললে বিরাট আকার নেয়। আহমদ মুসা ওটা খুলে মাটিতে বিছিয়ে সাহারা বানুকে বলল, খালাম্মা এখানে বসে পড়ুন। কতক্ষণ আমরা এখানে অপেক্ষা করব তা বলা মুষ্কিল। শাহ বানু ও আপনি বসুন। একটু কষ্ট কম হবে’। ‘আমাদের কষ্টের কথা বলছ? নিজের দিকে একটু তাকাও তো বেটা। তোমার গা রক্তে ভেজা। প্রতি মুহূর্ত কি টেনশনে কাটছে তোমার! দু’বাহুর মত জীবন-মৃত্যু তোমার দু’পাশে। সে তুলনায় আমরা পরম সুখে। অথচ তোমার সব কষ্ট আমাদের জন্যেই’। বলল সাহারা বানু। ‘মায়ের জন্যে সন্তানরা, বোনের জন্যে ভাইয়েরা তো কষ্ট করবেই। এ কষ্ট তাদের জন্যে কষ্ট নয়। কষ্টই যদি হবে, সন্তান, ভাই- এ সম্পর্ক তাহলে কেন?’ বলে টিলার দিকে এগুলো আহমদ মুসা। আহমদ মুসার চলার পথের দিকে অশ্রু সজল চোখে তাকিয়ে ছিল সাহারা বানু। শাহ বানু তার মাকে টেনে নিয়ে ওয়াটার ওয়্যারে বসতে বসতে বলল, ‘বিষ্মিত হয়ো না আম্মা, আহমদ মুসার কাছে আল্লাহর এই গোটা দুনিয়া তাঁর একটা ঘর। এই ঘরের বাসিন্দা তুমি, আমি পর হবো কি করে?’ চোখ মুছতে মুছতে বলল সাহারা বানু, ‘আমি ভাবছি, ওর স্ত্রী আছে, সোনার টুকরো একটা সন্তান আছে, কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে দুনিয়ার কোন বাঁধনে সে বাধা নয়। পরের জন্যে নিজকে এভাবে ভূলে যাওয়া অসম্ভব’। ভারী ও ভাঙা গলা সাহারা বানুর। আল্লাহর সৈনিকরা নাকি এমনই হয়। আহমদ মুসা ভাইয়াই একথা বলেছিলেন। নিজের পিতা, মাতা, ভাইবোন, স্বামী-সন্তান, স্ত্রী-পুত্র, বাড়ি-ঘর, ব্যবসায়-বানিজ্য সবকিছুর চেয়ে নাকি আল্লাহ, তার রসূল স. এবং তাঁদের কাজকে বেশি ভালবাসতে হয়’। শাহ বানু বলল। ‘এরাই সোনার মানুষ শাহ বানু। আল্লাহর সাহায্য এদের জন্যেই সাহারা বানু বলল। আহমদ মুসা চোখ থেকে দূরবীন নামিয়ে তাকাল তারিকের দিকে। টিলার আগাছা আর ঘাসের উপর বসে ঘুমে ঢুলছিল তারিক। আহমদ মুসা তার পিঠে একটা থাপ্পড় দিয়ে বলল, ‘উঠে দাঁড়াও। যাও নিচে গিয়ে এই টিলায় বিশবার উঠা-নামা কর। ঘুম চলে যাবে’। ‘ধন্যবাদ স্যার। বলে তারিক টিলা থেকে নামা শুরু করল। ‘ভাইয়া ওর মাথায় বরফ আছে, সেখানে টেনশন প্রবেশ করলেও তা বরফ হয়ে যায়’। বলল শাহ বানু টিলার গোড়া থেকে। টিলার গোড়ায় সে মায়ের সাথে বসেছিল। ‘ঘুমের জন্যে মাথায় বরফ থাকতে হয় না। টেনশনের মধ্যেও ঘুম এসে যেতে পারে’। কৈফিয়তের সুরে বলল তারিক। শাহ বানু মুখ খুলতে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা তার আগেই বলে উঠল, ‘কোন কথা নয় শাহ বানু। বিতর্ক ‘ড্র’ থাকুক কোন সুসময়ের জন্যে’। ‘ঝগড়ার জন্যে আমি বলিনি ভাইয়া’। বলল শাহ বানু। কণ্ঠে কিছুটা ক্ষোভ। ‘ঝগড়া নয়, আমি কথাটা ক্লিয়ার করার জন্যে বলেছি’। বলল তারিক। আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘তোমাদের দু’জনকে ধন্যবাদ’। দূরবীনে আবার চোখ রাখল আহমদ মুসা। দূরবীনের দৃষ্টি উৎরাইয়ের পথ পেরিয়ে ওদিকের চড়াই পর্যন্ত বিস্তৃত। হঠাৎ দূরবীনের দৃষ্টি এক জায়গায় স্থির হয়ে গেল। চারজন তাদের ষ্টেনগান বাগিয়ে পথ ধরে উঠে আসছে। আহমদ মুসা এদেরই অপেক্ষা করছিল। কিন্তু বিস্মত হলৌ ওদের সংখ্যা চারজন দেখে। সুস্মিতা বালাজী জানিয়েছে, ওরা দশজন এসেছে এদিকে। অবশিষ্ট ছয়জন কোথায় তাহলে? ওদের পেছনে আসছে? হঠাৎ আহমদ মুসার মনে হলো, ওরা ভিন্ন পথ দিয়ে আসতে পারে। ওদের কৌশল এই হতে পারে যে, এরা চারজন আমাদের সংঘর্ষে নিয়ে আসবে, আর ওরা ছয়জন পেছন থেকে আমাদের উপর চড়াও হবে। এ পরিকল্পনা নিয়ে ওরা ছয়জন এ চারজনের আগেই নিশ্চয় যাত্রা করেছে। তাহলে তো ওরা অনেকখানি কাছে এসে গেছে। সতর্ক হলো আহমদ মুসা। উঠে দাঁড়াল টিলার উপর। ছয় জন এদিকে আসার জন্যে রাস্তার কোন পাশটা বেছে নেবে ওরা? তীক্ষন দৃষ্টি মেলে আহমদ মুসা গোটা পথটায় একবার নজর বুলাল। তার কাছে ধরা পড়ল, রাস্তার দক্ষিণ পাশ গোটাটাই কিছু খাড়া পাহাড় এবং গভীর খাদে ভরা। এ পাশ দিয়ে আসা অনেক সময়সাপেক্ষই শুধু নয়, ভীষন কষ্টকরও। সুতরাং এ পথ তারা অবশ্যই বিবেচনা থেকে বাদ দেবে। অতএব নিশ্চিত যে, ওরা উত্তরের জংগল পথেই আসছে। আহমদ মুসাকে গভীর ভাবনায় নিমজ্জিত দেখে সাহারা বানু ও শাহ বানু দু’জনেই উঠে এসেছে। বলল সাহারা বানু, ‘তুমি খুব ভাবছ, কিছু ঘটেছে বেটা? ‘ওরা আসছে খালাম্মা। চারজনকে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ওরা তো দশ জন। আর ছয় জন নিশ্চয় অন্য পথে আসছে। মনে হচ্ছে আমাদেরকে এই চারজনের সাথে ব্যস্ত রেখে ঐ ছয় জন অন্যপথে এসে পাশ বা পেছন থেকে আমাদের উপর চড়াও হবার পরিকল্পনা করছে’। উদ্বেগ ফুটে উঠল সাহারা বানুদের মুখে। কিছু বলতে যাচ্ছিল সাহারা বানু। এই সময় দু’টি শুকর ছানা পূর্ব থেকে এসে তাদের পাশ দিয়ে ভীত সন্ত্রস্তভাবে ছুটে পালাল পশ্চিম দিকে। এদিকে নজর পড়তেই এক হাত তুলে আহমদ মুসা কথা বলতে নিষেধ করল সাহারা বানুদের। ভ্রুকুঞ্চিত হয়েছিল আহমদ মুসার। তার মনে হলো শুকর ছানার ভয়ের উৎস ঐ ছয়জন হতে পারে। তার মানে ওরা জংগলের এই প্রান্ত বরাবরই আসছে। ‘খালাম্মা ঐ ছয়জন জংগলের এ প্রান্ত দিয়েই আসছে’। বলেই চোখ ফিরাল আহমদ মুসা শাহ বানুর দিকে। বলল দ্রুত, ‘শাহ বানু তুমি খালাম্মাকে নিয়ে রাস্তার ওপাশে টিলার আড়ালে চলে যাও। তারিকও যাও সাথে’। নির্দেশ পেয়েই শাহ বানু ওয়াটার ওয়্যার তাড়াতাড়ি গুটিয়ে নিয়ে বলল, ‘চল আম্মা’। শাহ বানু তারিকের দিকেও একবার তাকাল। ‘চল শাহ বানু’। তারিকও বলল। ‘কোন নির্দেশ ভাইয়া?’ চলতে শুরু করে শাহ বানু বলল। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় শুকিয়ে গেছে ওদের মুখ। কথা বলার সময় শাহ বানুর কণ্ঠ কাঁপছিল। হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘নির্দেশ হলো, ভয় পেয়ো না। ওরা আমাদের দেখতে পায়নি, আমরা ওদের দেখেছি। আমরা বেটার অবস্থানে। আমাদের জন্যে এটা আল্লাহর সাহায্য। আর নির্দেশ হলো, তোমাদের সকলের কাছে লোডেড রিভলবার আছে। যদি কিছু করণীয় হয়, মন তোমাদের বলে দেবে যাও’। আহমদ মুসার নিশ্চন্ত হাসি এবং আশার কথা শাহ বানুদের চলা অনেক সহজ করে দিল। সাহসও যেন ওরা ফিরে পেল। ‘ধন্যবাদ ভাইয়া’ বলে উঠল শাহ বানু ও তারিক একই সঙ্গে এবং ওরা চলে গেল। আহমদ মুসা আবার টিলার শীর্ষে উঠে গেল। ডাল পালা ও আগাছার আড়ালে ওটা সুন্দর জায়গা। ওখান থেকে একই সাথে রাস্তা ধরে আসা চারজন এবং জংগলের প্রান্ত দিয়ে আসা ছয় জন সকলকেই চোখে রাখা যাবে। আহমদ মুসা দেখল রাস্তার চারজন চাশ গজের মধ্যে এসে গেছে। আহমদ মুসা অনুমান করল ছয় জনের অগ্রবাহিনী নিশ্চয় তিনশ গজের মধ্যে চলে এসেছে। আহমদ মুসা পকেট থেকে ফুল লোডেড দু’টি রিভলবার হাতে তুলে নিল। আহমদ মুসার প্রধান মনোযোগ জংগলের দিকে। জংগল বড় বড় গাছে ভরা। তবে শাল জাতীয় গাছগুলোর দীর্ঘ কাণ্ড শাখা-পাতা শূন্য। তার ফলে জংগলের আকাশটা যতটা নিবিড়-ঘন, নিচটা ততটাই ফাঁকা। তবে মাটিতে প্রচুর আগাছা রয়েছে, আগাছার অনেকগুলো বেশ বড়ও। তাই জংগলের তলাটা সহজে দৃষ্টিগোচর নয়। বিশেষ করে রাস্তার প্রান্ত বরাবর প্রচুর ঝোপ জংগল রয়েছে। এ সবের মধ্যে দিয়ে কেউ যদি লুকিয়ে আসতে চায়, তাহলে তারা সহজে চোখে পড়ার কথা নয়। কিন্তু আহমদ মুসার চোখে দূরবীন থাকায় ঝোপ-ঝাড়ের গলি-খুঁজা তার কাছে অনেক স্বচ্ছ হয়ে উঠেছে। আগাছা, শাখা-প্রশাখার সামান্য নড়া-চড়াও তার নজর এড়াচ্ছে না। অবশেষে ওরা ছয় জন আহমদ মুসার দূরবীনে ধরা পড়ল। ওরা ছয় জন ষ্টেনগান বাগিয়ে বৃত্তাকারে বিড়ালের মত নিঃশব্দ পদক্ষেপে এগিয়ে আসছে। বৃত্তের সামনের দু’জনের চোখ সামনে, মানে পশ্চিমে, বৃত্তের দু’পাশের দু’জনের দৃষ্টি দু’দিকে, দক্ষিণ ও উত্তরে। আর বৃত্তের পেছনের দু’জন পেছনে চোখ রেখে কতকটা উল্টো হেঁটে এগিয়ে আসছে। আহমদ মুসা মনে মনে প্রশংসা করল ওদের পরাকল্পনার। আহমদ মুসা ভাবল, ওরা টিলার দেয়ালে এসে বাধা পাবে। তারপর তারা টিলা পেরিয়ে সোজা সামনে এগুবে টিলার উপরের এদিকটা সার্চ করতে আসবে কিনা এটা একটা বড় প্রশ্ন। ওরা টিলার দেয়ালের কাছে এসে গেছে। সকলেই ওরা চারদিকে তাকাচ্ছে টিলায় ওঠার আগে। আহমদ মুসা রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে রিভলবার বাগিয়ে। ওদের বৃত্তের সামনের দু’জন অতিসন্তর্পণে হামাগুড়ি দিয়ে টিলার দেয়ালে উঠে দেয়ালের ওপাশ মানে পশ্চিম পাশটায় নজর বুলাল। ঠিক তাদের মতই বৃত্তের দক্ষিন পাশে যে ছিল সে টিলার দেয়ালে উঠে ক্রলিং করে টিলার দেয়াল বেয়ে অনেক খানি উপরে উঠে এল এবং চারদিকটা দেখল। তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে আবার নেমে গিয়ে বৃত্তে যোগ দিল। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল আহমদ মুসা। লোকটি যদি আর দু’গজ এগুতো কিংবা আহমদ মুসা যদি টিলার একদম শীর্ষে আশ্রয় না নিত, তাহলে লোকটির চোখে পড়ে যেত। আহমদ মুসা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল। আহমদ মুসা এই মুহূর্তে ওদের আক্রমণ করতে চায় না। আহমদ মুসা চাইল পেছনের চারজনও আরও কাছে আসুক। যাতে একসাথে সবাইকে আক্রমণের আওতায় আনা যায়। আহমদ মুসার ইচ্ছা, ছয় জনের দলকে তাদের পেছন থেকে এবং চার জনের দলকে সামনে থেকে সে আক্রমণ করতে চায়। তার আরও লক্ষ্য হল, কেউ যেন লুকবার সময় না পায়। ছয় জনের বৃত্তটি টিলার দেয়াল পেরিয়ে সামনে এগুলো। গজ চারেক এগুবার পর হঠাৎ বৃত্তের সামনের দু’জন থমকে দাঁড়াল। তাদের একজন নিচু হয়ে মাটি থেকে একখণ্ড কাগজ হাতে তুলে নিল। আহমদ মুসার দূরবীনে ধরা পড়ল চকলেটের একটি মোড়ক। হয় শাহ বানু, নয়তো তারিক চকলেট খেয়ে ওটা মাটিতে ফেলে দিয়েছিল। আহমদ মুসাই দিয়েছিল ওদের চকলেট। চকলেটের কাগজটি পেয়ে মুহূর্তেই ছয় জনের বৃত্তটির সবাই মাটিতে শুয়ে পজিশন নিল। ওরা চারদিকে তাকাচ্ছিল। ওদের সন্দিগ্ধ ও সতর্ক দৃষ্টি্ ওরা চারদিকটা ভালোভাবে দেখে নেবার পর তাদের সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো টিলার দিকে। সেই আগের মত বৃত্তাকারে চারদিকে চোখ রেখে তারা এগুলো টিলার দিকে। তাদের হাতের অস্ত্রগুলো উদ্যত এবং ট্রিগারে আঙ্গুল। আহমদ মুসা নিশ্চিত, এবার ওরা টিলা সার্চ না করে ফিরবে না। আহমদ মুসা অত্যন্ত সন্তর্পণে টিলার মাথাটা ডিঙ্গিয়ে ওপারের ঢালটায় চলে গেল। রিভলবার দু’টো মাটিতে রেখে লাইট মেশিনগানটার ব্যারেল ওদিকে ঘুরিয়ে নিল আহমদ মুসা। কিন্তু ব্যারেল ঘুরাতে গিয়ে বিপত্তি ঘটল। একটা বড় পাথর স্থানচ্যুত হয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল ওপাশে নিচের দিকে। ওটা ওদের নজরে পড়তে দেরি হলো না। সংগে সংগেই ওদিক থেকে শুরু হলো ব্রাশ ফায়ার। মেশিনগানের ট্রিগারে আঙ্গুল রেখে আহমদ মুসা অপেক্ষা করছিল। প্রায় পঞ্চাশ রাউন্ডের মত গুলীর পর গুলী কমে এল। সম্ভবত! ওরা রেজাল্ট দেখার জন্যেই গুলী কমিয়ে দিয়েছিল। আহমদ মুসার হাত মেশিনগানের ট্রিগারেই ছিল। ওদের গুলী কমার সঙ্গে সঙ্গে আহমদ মুসা মাথাটা তুলে মেশিনগানের ব্যারেল টার্গেটের বরাবর নিয়ে গুলী বৃষ্টি শুরু করল। মেশিনগানের ব্যারেল কয়েকবার ঘুরিয়ে প্রায় পনের সেকেন্ড ট্রিগার চেপে রাখল। দশ সেকেন্ড গুলীর পর ওদিক থেকে গুলীর শব্দ একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। আহমদ মুসা চকিতে একবার পেছন ফিরে তাকাল পেছনের চারজনের অবস্থান দেখার জন্যে। দেখল, ওরা কাছে চলে এসেছে। ষ্টেনগান বাগিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে ছুটে আসছে ওরা। ওদের লক্ষ্য টিলা্ আহমদ মুসা ঘুরিয়ে নিল তার লাইট মেশিনগান। ট্রিগার টানল মেশিনগানের। শুরু হলো গুলী বৃষ্টি। ওরা ছিল বৃত্তাকারে। আর এরা চার জন ছিল রাস্তার আড়াআড়ি একটা লাইনে। গুলীবৃষ্টি হবার সঙ্গে সঙ্গে দু’জন ছুটে রাস্তার ওপাশের জংগলে ঢুকে গেল। দু’জনের লাশ পড়ে গেল রাস্তায়। গুলী বন্ধ করে আহমদ মুসা টিলার পশ্চিম পাশে ছয় জনের অবস্থা দেখার জন্যে হামাগুড়ি দিয়ে টিলার পশ্চিম পাশে চলে এল। ওপারে গিয়েই দেখতে পেল টিলার গোড়ার কয়েকগজ দূরে ওরা ছয়জন বৃত্তাকারেই মরে পড়ে আছে। আহমদ মুসা দ্রুত নিচে গেল। ভাবল দু’জন ওরা ওপারের জংগলে ঢুকেছে, এখনি যেতে হবে ওপারের টিলার দিকে। কিন্তু এ ভাবনা শেষ হবার আগেই আহমদ মুসার কানে প্রায় একসাথে দু’টি গুলীর শব্দ এসে প্রবেশ করল। সোজা হয়ে দাঁড়াল আহমদ মুসা। আর কোন গুলীর শব্দ হলো না। স্বস্তি ফুটে উঠল আহমদ মুসার মুখে। সে নিশ্চিত, গুলী দু’টি শাহ বানু ও তারিকের রিভলবারের এবং গুলী দু’টি ছোঁড়া হয়েছে ওপাশের জংগলে পালানো দু’জনকে লক্ষ্য করেই। আর তারা দু’জনই মারা গেছে। ওদের ষ্টেনগানের কোন গুলী শোনা যায়নি। তার মানে ওরা গুলী করার সুযোগই পায়নি। তাকাল আহমদ মুসা টিলার দিকে। দেখল, শাহ বানু, সাহারা বানু ও তারিক টিলার নিচে রাস্তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আহমদ মুসা ওদিকে তাকাতেই শাহ বানু বলল ‘ভাইয়া আমরা আসতে পারি?’ ‘এস’। আহমদ মুসা বলল। শাহ বানুরা এপারে এলে আহমদ মুসা বলল, দু’জনের দু’সফল গুলীর জন্যে ধন্যবাদ’। বিষ্ময় নামল শাহ বানু ও তারিকের চোখে-মুখে। বলল শাহ বানু, ‘ভাইয়া জানলেন কি করে যে, আমরা দু’জনে গুলী করেছি এবং তা সফল হয়েছে?’ ‘ওদের দু’জনের হাতে ষ্টেনগান ছিল, আর তোমাদের হাতে ছিল রিভলবার। দু’গুলী একসাথেই হয়েছে। তোমাদের গুলীর পরে ষ্টেনগান থেকে কোন গুলী হয়নি। এ সবই আমার কথার প্রমাণ’। বলল আহমদ মুসা। ‘আল্লাহকে ধন্যবাদ ভাইয়া। আপনি এতদ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন ভাইয়া?’ শাহ বানু বলল। ‘বেটা, তুমি ওদের ধন্যবাদ দিচ্ছ তোমার প্রাপ্য ধন্যবাদ আড়াল করার জন্য বুঝি!’ বলল সাহারা বানু। ‘পানিতেই যার বাস, তার কাছে পানি নতুন নয়, কিন্তু পানিতে যারা নতুন পা দিল, ধন্যবাদ তো তাদেরই প্রাপ্য খালাম্মা’। আহমদ মুসা বলল। ‘আমাদের এত বড় স্বীকৃতি দিচ্ছেন ভাইয়া? বেশি হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে আমি, মেয়েরা, এই মহান কাজে অচল’। বলল শাহ বানু। তার কণ্ঠ গম্ভীর। ‘শাহ বানু, মেয়েদের এমন ছোট করে দেখলে, মানুষের অর্ধেকটাই ছোট হয়ে যায়। অথচ মোগলদের নূরজাহান, মুসলিম শাসক চাঁদ সুলতানা, বীর নারী হামিদা বানু প্রমুখের ইতিহাস তোমরা জান’। আহমদ মুসা বলল। ‘ধন্যবাদ ভাইয়া! আপনি..................। আহমদ মুসার মোবাইল বেজে উঠায় শাহ বানু কথা শেষ না করেই থেমে গেল। আহমদ মুসা মুখের কাছে তুলে নিল মোবাইল। বলল, ‘জি আপা, ওয়া আলাইকুম সালাম’। ‘ছোট ভাই ভাল আছেন আপনারা? গুলী-গোলার শব্দে আমরা এখানে উদ্বিগ্ন’। বলল সুস্মিতা বালাজী। ‘হ্যাঁ ভাল আছি। ওদের দশজনই মারা গেছে, আলহামদুলিল্লাহ’। ‘আলহামদুলিল্লাহ। আপনারা তাহলে এখন আসছেন?’ হ্যাঁ আসছি। ওদিকের খবর কি?’ ‘এই মাত্র আমাদের স্কুলের গার্ড টেলিফোন করেছিল। গোলা-গুলীর শব্দ শুনে ওরা খুব খুশি। এ খবর শুনে উদ্বিগ্ন হয়ে আমি টেলিফোন করলাম’। ‘হতে পারে, গোলা-গুলী শুনেই ওরা ধরে নিয়েছিল তারা শত্রুদের খতম করেছে। যাক ওখানে এখন ওরা কয়জন আছে?’ ‘ওরা দশ এগার জন আছে’। ‘ঠিক আছে আপা। আপনার যেভাবে আছেন, সেভাবেই থাকুন। আমরা আসছি। ‘ঠিক আছে ছোট ভাই। সালাম’। ‘আসসালামু আলাইকুম’। আহমদ মুসা মোবাইল পকেটে রেখে বলল, ‘চল আমরা যাত্রা করি। তার আগে শাহ বানু ও তারিক তোমরা অ্যামুনিশনের বাক্সের সাথে সাথে ওদের ষ্টেনগানগুলো কাঁধে তুলে নাও। আমাকেও কিছু দাও’। ‘না, ষ্টেনগানগুলো আমি নেব’। বলে সাহারা বানু ষ্টেনগানগুলো কুড়িয়ে নেবার জন্যে এগুলো। ‘না খালাম্মা, আপনি নন। ওরাই পারবে’। আহমদ মুসা বলল। ‘বেটা, তুমি না এইমাত্র নূরজাহান, সুলতানা রাজিয়াদের উদাহরণ দিলে। আরও উদাহরণ আছে। ভারতের বেগম হযরত মহল, ইসলামের প্রাথমিক যুগের বীর নারী খাওলার মত যুদ্বের ময়দানে অসীম বীরত্ব প্রদর্শন করেছেন অসংখ্য মুসলিম নারী। তাহলে আমি এই কয়টা ষ্টেনগান বহনের অধিকার পাব না কেন? সন্তানদের যুদ্ধে মা কি অংশ নিতে পারে না?’ ‘ধন্যবাদ খালাম্মা। আমাদের মায়েরা এইভাবে জেগে উঠলে আমাদের জাতি নতুন এক সোনালী দিনের মুখ অবশ্যই দেখবে’। বলে আহমদ মুসা নিজে ষ্টেনগানগুলো কুড়িয়ে সাহারা বানুর কাঁধে ঝুলিয়ে দিল। তারা গ্রীনভ্যালির উদ্দেশ্যে আবার যাত্রা শুরু করল। রাস্তায় উঠে আসতেই আহমদ মুসার মোবাইল আবার বেজে উঠল। মোবাইল নিয়ে মুখের কাছে তুলে ধরে বলল, ‘জি আপা, আসসালামু আলাইকুম। কোন নতুন খবর?’ ‘ওয়া আলাইকুম আসসালাম। ছোট ভাই এইমাত্র আমদের স্কুলের গার্ড জানাল, এইমাত্র ওদের সর্দার ওদের সবাইকে গ্রীনভ্যালি ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছে। যে দশ জন উপকূলের দিকে গিয়েছিল সবাই মারা গেছে। ওরা বলেছে, আবার তৈরি হয়ে হেলিকপ্টার নিয়ে খুব শীঘ্রই নাকি ওরা আবার আসবে’। গার্ড আরও জানাল জোর প্যাকিং চলছে দু’এক মিনিটের মধ্যেই ওরা যাত্রা শুরু করবে। ছোট ভাই, আমাদের এখন কি করণীয়?’ বলল সুস্মিতা বালাজী উত্তেজিত তার কণ্ঠস্বর। ‘বুঝেছি আপা। ভাই সাহেব কোথায়?’ ‘বাইরে লোকদের কাছে গেছে। আমাকে বল তোমার পরামর্শ’। ‘আপা প্রথম কথা হলো, ওদের কাউকেই গ্রীনভ্যালি থেকে যেতে দেয়া যাবে না। গ্রীনভ্যালির ভবিষ্যত নিরাপত্তার জন্যেই গ্রীনভ্যালির এসব কাহিনী বাইরে প্রকাশ হতে দেয়া উচিত হবে না। দ্বিতীয় কথা, ওরা প্রস্তুত হয়ে যাত্র শুরুর আগে ওদের আক্রমণ করা যাবে না। পালাবার সময় মানুষের মন দুর্বল হয়, ঐক্য বিনষ্ট হয় এবং পাল্টা আক্রমণের উদ্যোগ প্রায়ই থাকে না। তৃতীয় কথা, ওরা যখন পালিয়ে যাবার জন্যে রাস্তায় উঠবে, তখন উত্তর দিকে রিংরোডের সংযোগস্থলে যারা আছে, তারা আক্রমনে আসবে। এই আক্রমণে তারা পেছনে গুলী ছুঁড়তে ছুঁড়তে সামনে দৌড়াবে, তখন পূর্ব দিকে হাইওয়ে গামী রাস্তার পাশে যারা আছে, তারা পাশ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়বে’। ‘ধন্যবাদ ছোট ভাই, সুন্দর পরিকল্পনা’। বলল সুস্মিতা বালাজী। ‘শুনুন আপা, আমাদের এখানে যারা এসেছিল, তাদের মধ্যে শংকরাচার্য নেই। তাহলে তিনি ওখানেই আছেন। তাকে জীবন্ত ধরতে পারলে ভাল। একটু দেখবেন’। ‘কঠিন কথা বলেছেন ছোট ভাই, এটা কে দেখাবে? আপনার মত মাথা ঠাণ্ডা করে, পরিকল্পনা করে গুলী করার লোক আমাদের নেই’। ‘ঠিক আছে আপা, আল্লাহ ভরসা। যেটা হবার সেটাই হওয়া উচিত। আর কোন কথা আপা?’ ‘না, আপাতত নেই। আপনারা যতটা সম্ভব দ্রুত আসুন। কি হবে আমার ভয় করছে। রাখলাম। আসসালামু আলাইকুম’। ‘ওয়া আলাইকুম আসসালাম’ বলে মোবাইল বন্ধ করল আহমদ মুসা। শাহ বানুরা সবাই তাকিয়ে ছিল আহমদ মুসার দিকে। আহমদ মুসা সংক্ষেপে সুখবরটা ওদের দিল। যাত্রা শুরু হল আবার।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯৯ জন


এ জাতীয় গল্প

→ আন্দামান ষড়যন্ত্র চ্যাপ্টার- ৩ বাকি অংশ
→ আন্দামান ষড়যন্ত্র চ্যাপ্টার- ৩
→ আন্দামান ষড়যন্ত্র চ্যাপ্টার- ২
→ আন্দামান ষড়যন্ত্র চ্যাপ্টার- ২
→ আন্দামান ষড়যন্ত্র চ্যাপ্টার- ১
→ আন্দামান ষড়যন্ত্র চ্যাপ্টার- ৪
→ আন্দামান ষড়যন্ত্র চ্যাপ্টার- ৪ বাকি অংশ
→ আন্দামান ষড়যন্ত্র চ্যাপ্টার- ৫
→ আন্দামান ষড়যন্ত্র চ্যাপ্টার- ৫ বাকি অংশ
→ আন্দামান ষড়যন্ত্র চ্যাপ্টার- ৬
→ আন্দামান ষড়যন্ত্র চ্যাপ্টার- ৬ বাকি অংশ
→ আন্দামান ষড়যন্ত্র চ্যাপ্টার- ৭
→ আন্দামান ষড়যন্ত্র চ্যাপ্টার- ৭ (শেষ)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now