বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আন্দামান ষড়যন্ত্র
চ্যাপ্টার- 5
বাকি অংশ
সে উপরে গা্ছের দিকে তাকিয়ে পাতার নড়া-চড়া থেকে বুঝল বাতাস সামনে থেকে মানে পূর্ব দিক থেকে বইছে তাহলে ঠিকই যাচ্ছে আহমদ মুসা। সামনেই শত্রুদের সে পেয়ে যাবে।
ক্রলিং করে আরও মিনিট দুই এগুবার পর আহমদ মুসা চাপা কথার আওয়াজ পেল।
আরও এগুলো আহমদ মুসা।
চোখে পড়ে গেল ওরা আহমদ মুসার। জংগলের মধ্যে একটা গোলমত জায়গায় একটা তোয়ালে বিছিয়ে ৪ জন তাস খেলছে। আর দু’জন একটা গাছের আট দশ ফিট উঁচু ডালে উত্তরমুখী হয়ে বসে ফাঁকা উপকূলের দিকে নজর রেখেছে। গাছে বসা দু’জনেই সিগারেট খাচ্ছে।
হঠাৎ একটা কুকুরের আকাশ-ফাটা চিৎকারে চমকে উঠল আহমদ মুসা। দেখল সে, ওদের পাশে কুকুরটা শুয়ে ছিল, লাফ দিয়ে উঠল। উঠার আগেই সে চিৎকার দিতে শুরু করেছে। বোধ হয় কুকুরটি ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। উঠেই সে পরিচিত গন্ধ পেয়েছে, যদি আহমদ মুসার কোন জিনিস কুকুরটিকে শুকিয়ে রাখা হয়ে থাকে। অথবা অপরিচিত গন্ধ পেয়েও কুকুরটি ক্ষেপে উঠতে পারে। এসব ভাল আহমদ মুসা।
কুকুর ঘেউ ঘেউ করে উঠার সাথে সাথে চারজনের তাস খেলা বন্ধ হয়ে গেছে। তারা পকেট থেকে রিভলবার বের করে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। জংগলের আড়ালে থাকার কারণে তারা আহমদ মুসাকে দেখতে পায়নি। কিন্তু ডালে বসা দু’জন লোক ঠিকই দেখতে পেয়েছে আহমদ মুসাকে। তাদের হাতেও উঠে এসেছে রিভলবার।
আহমদ মুসার দু’হাতে দু’রিভলবারের দুটি গুলি সে একই সাথে করেছে ডালে বসা দু’জনকে লক্ষ্য করে।
বুকে গুলি খেয়ে দু’জনেই ডাল থেকে খসে পড়ল মাটিতে।
ওদিকে ওরা কুকুরের চেন খুলে দিয়েছে।
ছুটতে শুরু করেছে কুকুর। ওরা চারজন কুকুরের পেছনে। তাদের হাতের রিভলবার বাগিয়ে ধরা। হিংস্র দৃষ্টি তাদের চোখে।
আহমদ মুসার রিভলবার ডালের দু’জনকে গুলি করেই লক্ষ্য নামিয়ে নিয়ে এসেছিল নিচে কুকুর এবং সেই চারজনের দিকে।
আহমদ মুসার বাম হাতের রিভলবার টার্গেট করেছে ছুটে আসা কুকুরটিকে। গোলাকৃতি সেই ফাঁকা জায়গা থেকে জংগলে ঢোকার বেশ আগেই মাথায় গুলী খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল কুকুরটি। আর ডান হাতের রিভলবার টার্গেট করল চারজন লোককে। অধীকতর ক্ষীপ্র আহমদ মুসার ডান হাত তার সাথে বাম হাত যোগ দেবার আগেই অব্যর্থ গুলীতে তিনজনকে শিকার করা সমাপ্ত করল। বাম হাত এসে চতুর্থ জনকে গুলী করে ওদের আক্রমণে আসার চেষ্টার ইতি ঘটাল।
ঘটনার এ জায়গা থেকে উপকূলের ফাঁকা এলাকা দশ গজের বেশি দূরে নয়।
আহমদ মুসা জংগল থেকে বেরিয়ে এল। সে তাকাল শাহ বানুরা যে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে আছে সে ঝোপের দিকে। দেখল, ঝোপের আড়াল থেকে তারিক উঁকি দিচ্ছে। আহমদ মুসাকে দেখে সে ঝোপের আড়াল থেকে বাইরে এল। আহমদ মুসা তাকে গাড়িসহ সবাইকে নিয়ে আসার জন্য ইঙ্গিত করল।
দু’মিনিটের মধ্যেই তারিক সবাইকে নিয়ে হাজির হলো।
গাড়ি থামতেই শাহ বানু প্রথম নামল। বলল, ভাইয়া, আপনি ভাল আছেন তো। গুলীর আওয়াজ শুনলাম, কুকুরের আওয়াজ শুনলাম। ওদের.......।’
‘ভাল আছি। গুলীর আওয়াজ ছিল আমার, কুকুরের আওয়াজ ছিল ওদের।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওরা কারা?’ বলল সাহারা বানু।
অন্যেরা সবাই গাড়ি থেকে নেমে এসেছিল।
‘আসুন’ বলে আহমদ মুসা সবাইকে জংগলের ভেতরে নিয়ে গেল। দেখাল ৬ জনের লাশ। বলল, ‘এরা এখানে ওঁৎ পেতে বসে ছিল আমাদের অপেক্ষায়।’
‘কিন্তু আমরা এখানে আসব তা ভাবল কি করে? প্রশ্ন করল শাহ বানু।
‘যে আহত লোকটিকে রেখে গিয়েছিলাম, তাকে আমি বলে গিয়েছিলাম সাড়ে ৮টা পর্যন্ত অপেক্ষা করার জন্যে। আমি ঠিক করেছিলাম, আমি ফিরে এলে সেই গাড়িতে সে যেতে পারবে। কারণ আমার গাড়ির আর দরকার হবে না।’
‘তাকে যখন বাঁচাতে চাও, তখন যাবার সময় লিফট দিলে পারতে। গাড়ি পাওয়া যায় এমন কোথাও নামিয়ে দিতে।’ বলল সাহারা বানু।
‘কিন্তু তাকে উদ্ধারের জন্যে আপনাদের ওখানে পৌঁছার আগেই সেখানে আমাদের খবর পৌঁছে দিত।
‘বুঝেছি। ধন্যবাদ বেটা।’
‘আহত লোকটি এই ছয়জনের মধ্যে আছে?’ বলল তারিক।
‘নেই। আমরা এখানে পৌঁছার আগেই শংকরাচার্যের কোন গ্রুপ মনে হয় এখানে এসেছিল। হতে পারে এখান থেকে দু’মাইল পশ্চিমে গিয়ে যাদের কাছে আমার আত্মসমপর্ণের কথা ছিল, তারাই এখানে এসেছিল। আহত লোকের কাছে সব শুনে গাড়িতে করে আহতকে পাঠিয়ে দিয়ে অন্যেরা আমাদের ধরার জন্যে এখানে অপেক্ষা করছিল এবং আমার মনে হয়, এরাই শংকরাচার্যকে জানিয়েছিল যে, আত্মসমপর্ণের বদলে আমি শাহ বানুদের উদ্ধার করতে গেছি। এই খবর পেয়েই শংকরাচার্য শাহ বানুদেরকে লর্ড মেয়ো রোডের ঐ বাড়ি থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছিল।
‘তাই হবে ভাইয়া, আমাদের ঘরের বাইরে একজন আরেকজনকে বলছিল, ‘শয়তান ধরা দেয়নি। আর এ কুকুরকেও উদ্ধার করে নিয়ে গেছে। এখানে আর বন্দীদের রাখা যাবে না। মহগুরুচী বলেছেন, ‘ওখানে গিয়েই বাঘের শিকার ধরার মহোৎসব হবে। মহাগুরু গাড়ি ঘুরিয়ে ওখানেই যাচ্ছেন।’
‘তোমরা কি জান বাঘের শিকার ধরার মহোৎসবটা কি?’
মুখটা ম্লান হয়ে উঠল শাহ বানুর। আতংক দেখা দিল তা চোখে-মুখে। মাথা নিচু করল সে। বলল, ‘জানি ভাইয়া, গত রাতেই শংকরাচার্য স্বয়ং এই হুমকি দিয়ে গেছে। আমার সারারাত আল্লাহকে ডেকেছি। আমাদের ছিল উভয় সংকট। আমাদের পরিণতির বিষয়টা যেমন ছিল অকল্পনীয়, আপনি আত্মসমর্পণ করলে আমরা, আপনি একসাথে বিপদগ্রস্থ হতাম।’
‘আমিও এটা জানতাম শাহ বানু।’
‘তাহলে আত্মসমপর্ণে রাজি হলেন কেন?’ জিজ্ঞাসা শাহ বানুর।
‘দু’কারণে রাজি হয়েছি। এক, অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতিকে বিলম্বিত করা, দুই, তোমাদের উদ্ধারের একটা সুযোগ তৈরি করা। আল্লাহ সে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন।’
‘আল হামদুলিল্লাহ।’ একসাথে বলে উঠল শাহ বানু, সাহারা বানু দু’জনেই।
একটা নিরবতা।
নিরবতা ভাঙল তারিক। বলল, ‘আমার একটা কৌতুহল স্যার, জংগলে এদের আপনি পেলেন কি করে? আমাদের পাহারায় থেকেও এরা গুলী ছুড়তে পারলোনা কেন?’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘তুমি যখন আমার ছাত্র, তখন তো শেখাতেই হবে। শোন, যখন দেখলাম আহত লোকটি উপকূলে নেই, তখন বুঝলাম কেউ বা কারা এসেছিল। যখন শত্রুপক্ষের লোক এসেছিল, তখণ তারা অবশ্যই জেনেছে আমি এখানে ফিরে আসব। যখন তারা জেনেছে আমি ফিরে আসব, তখন অবশ্যই আমার জন্যে তারা ফাঁদ পাতবে। তারপর চিন্তা করেছি, দু’পাশের জংগলের কোন পাশে তারা অপেক্ষা করবে। সকল বিচারে আমি দেখলাম, দক্ষিণ পাশের জংগলে তাদের লুকিয়ে থাকা স্বাভাবিক। আমি দক্ষিণের জংগল ধরে অগ্রসর হলাম। এক জায়গায় পৌঁছে সিগারেটের গন্ধ পেলাম। বাতাসের গতি দেখে বুঝলাম, পূর্ব দিক থেকে সিগারেটের গন্ধ আসছে। আমি ওদের সন্ধানে অগ্রসর হলাম এবং ওদের পেয়েও গেলাম। ওদের কুকুর আমাকে টের পেয়ে গিয়েছিল। ওদের দু’জন গাছের ডালে বসেছিল পাহারার জন্যে। তারা আমাকে দেখতে পেল এবং গুলী করতে যাচ্ছিল। তার আগেই আমি গুলী করলাম। এভাবেই ঘটনার ইতি হলো।’
‘ধন্যবাদ স্যার, এই কয়েক ঘন্টায় স্যার আমি অনেক কিছু শিখে ফেলেছি।’ বলল তারিক।
‘এই তো উপযুক্ত ছাত্রের কাজ। এবার তুমি ছয়জনের মোবাইল ও রিভলবারগুলো এবং শা বানুদের নিয়ে বাইরে যাও। সামনের এক ঝোপে স্পীড বোট লুকিয়ে রেখেছি। ওটা নিয়ে আমি আসছি।’
বলে আহমদ মুসা দ্রুত হাঁটা শুরু করল পূর্বদিকে। ঝোপের আড়াল থেকে স্পীড বোট চালিয়ে পানিতে নেমে গেল।
শাহ বানুরাও তীরে এসে পড়েছে। বোটে উঠল সবাই।
‘স্যার, আমি বোট ভাল ড্রাইভ করতে পারি।’ বলল তারিক মুসা মোপলা।
‘কিন্তু রুট তো নতুন তোমার জন্যে।’ আহমদ মুসা বল।
‘অসুবিধা হবে না স্যার, আপনি তো পাশে থাকছেন।’
‘বেশ এস। তোমার উপর শিক্ষকতা করার আরও একটা সুযোগ পাওয়া গেল।’
বলে আহমদ মুসা সরে এল ড্রাইভিং সিট থেকে।
‘ধন্যবাদ স্যার’ বলে তারিক গিয়ে বসল ড্রাইভিং সিটে। বসে বলল, ‘স্যার আপনার কাছ থেকে প্রতি মুহূর্তেই শেখার আছে। আমার একটা গর্ব ছিল আমি গাড়ি ভাল ড্রাইভ করি, কিন্তু স্যার আপনার গাড়ি ড্রাইভ দেখে আমার মনে হয়েছে আমার বহু কিছু শেখার আছে।’
‘ধন্যবাদ তারিক। কি শিখতে হবে জানাটা কিন্তু একটা বড় শিক্ষা।’ বলে আহমদ মুসা বোটের ড্যাশবোর্ড থেকে একটা মানচিত্র বের করে আনল। সেটা তারিকের সামনে মেলে ধরে বলল, ‘দেখ রুটটাকে রেড মার্ক করে রেখেছি। এখন তুমি আন্দামানের পূর্ব উপকূল ধরে উত্তরে ১২ ডিগ্রী পর্যন্ত চোখ বন্ধ করে এগিয়ে যাবে। সেখানে পৌঁছার পর ডানে থাকবে হ্যাভলক আইল্যান্ড আর বামে দেখবে মেইণল্যান্ডের সাথে কীড দ্বীপপুন্জ। এ দ্বীপপুণ্জের উত্তর মাথা দিয়ে একটা চ্যানেল ঢুকে গেছে মেইন্যোন্ড। এ চ্যানেলটি পশ্চিম উপকূলে স্পাইক বে’তে গিয়ে পড়েছে। স্পাইক বে’ থেকে বের হয়ে তোমাকে আন্দামানের পশ্চিম উপকূল ধরে এগোতে হবে। উত্তরে অ্যান্ডারসন দ্বীপ পর্যন্ত গিয়ে অ্যান্ডারসন চ্যানেল দিয়ে এর মাথা পর্যন্ত পৌঁছে পূর্ব দিকে মোড় নিয়ে কয়েক মাইল গেলেই গ্রীণ ভ্যালির উপকূল পাওয়া যাবে।’
থামল আহমদ মুসা।
তারিক মানচিত্রটি হাতে নিয়ে তার সামনে ড্যাশবোর্ডের উপর আবার রাখল।
চলতে শুরু করল বোট।
সাত সীটের বোটটি খুব সুন্দর।
ড্রাইভিং সীটের পেছনে ৬টি সীট বৃত্তাকারে সাজানো। মাঝখানে একটা নীচু গোলাকার টেবিল। চেয়ার ও টেবিল সবই ক্লোজ করে মেঝেতে ফেলে রাখা যায়। তখন বোটটি কার্গো বোট হয়ে দাঁড়ায়। আবার চেয়ার-টেবিল আনফোল্ড করলেই সুন্দর ট্যুরিস্ট বোট হয়ে দাঁড়ায়।
বোটের ইঞ্জিনে ডবল সাইলেন্সার লাগানো। কোন শব্দই হয়না। নিঃশব্দে তীরের মত এগিয়ে চলে বোটটি।
আহমদ মুসার কথা শেষ করার পর একটা নিরবতা নেমেছিল।
নিরবতা ভাঙল সাহারা বানু, শাহ বানুর মা। বলল আহমদ মুসাকে উদ্দেশ্য করে, ‘বেটা আমাদের দূর্ভাগ্যের খবর তুমি কিভাবে পেয়েছিলে? কখন পেয়েছিলে?’
‘গতকাল বিকেলে আমি সুষমা রাও- এর কাছে টেলিফোন করেছিলাম। আমার টেলিফোন পেয়েই সে কাঁদতে শুরু করে এবং বলে আপনারা কিডন্যাপড হয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গেই আমি বুঝতে পারি যে কারা এই কাজ করেছে। গতকাল বিকেলেই আরেকটা বড় ঘটনা ঘটে গ্রীনভ্যালিতে। আপনাদের যারা কিডন্যাপ করেছিল, তাদেরই বার জন লোক পর্যটকের ছদ্মবেশে গিয়েছিল গ্রীনভালিতে আমার খোঁজে আমাকে ধরে আনার জন্যে। তাদের সাথে সংঘর্ষ হয়। তারা সবাই মারা যায়। তাদেরই একজনের মোবাইল থেকে শংকরাচার্যের টেলিফোন নাম্বার পাই। সন্ধ্যার পরে এই তাকে টেলিফোন করে আপনাদের বিষয়ে জানার জন্যে। সেই কথা বলার সময় হুমকি দেয় আজ সকাল ৮টার মধ্যে আমি তাদের হাতে আত্মসমর্পল না করলে সে আপনাদের ক্ষতি করবে। তাই রাতেই চলে এলাম, যাতে সকাল আটটার মধ্যে তাদের কাছে পৌঁছা সম্ভব হয়।’
‘কিভাবে এলে? এই বোট নিয়ে?’ বলল সাহারা বানু।
‘ওঁরা খুব ভালো লোক। আমি শংকরাচার্যের হাতে আটকা পড়লে বোট ওরা কোনদিনই আর ফিরে পাবেনা জেনেও অত্যন্ত মূল্যবান বোটটি আমাকে দিয়েছে যাতে ঠিক সময়ে আমি পৌঁছতে পারি এখানে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওঁদের কথা কিছুই শোনা হয়নি। কিন্তু তার আগে বল আমাদের রেখে চলে যাবার পর হঠাৎ তুমি নিরব হয়ে গেলে কেন? না এলে, না টেলিফোনেও কোন যোগাযোগ করলে। মাত্র গতকাল সুষমার সাথে তোমার যোগেোযগ হলো কেন?’ বলল সাহারা বানু।
‘মাঝখানে শংকরাচার্যদের হাতে বন্দী হয়েছিলাম, তারপর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। যখন........।’
আহমদ মুসা কথা শেষ করতে পারল না। আহমদ মুসার কথার মাঝখানেই শাহ বানু বলে উঠল, ‘বন্দী হয়েছিলেন? শংকরাচার্যদের হাতে?’ শাহ বানুর কণ্ঠে উদ্বেগ।
আহমদ মুসার উত্তর দেয়ার আগেই কথা বলল সাহারা বানু। বলল, ‘কি অসুখ হয়েছিল তোমার? নিশ্চয়ই কিছু অঘটন ঘটেছিল!’ সাহারা বানুর কণ্ঠেও উদ্বেগ।
‘হ্যাঁ, খালাম্মা আ্হত হয়েছিলাম। আমি যাচ্ছিলাম ‘রস’ দ্বীপে আহমদ শাহ আলমগীরের খোঁজে। সাগর থেকেই ওরা আমাকে বন্দী করে হেলিকপ্টার নিয়ে গিয়ে। ওদের বন্দীশালা থেকে পালাতে গিয়ে কাঁধে গুলী খেয়েছিলাম। ওরা আমার পিছু লেগেছিল গাড়ি ও হেলিকপ্টার নিয়ে। অনেকদূর পাহাড়ী এলাকায় যাবার পর ওরা আমাকে আগে ও পেছনে গাড়ি ও উপর থেকে হেলিকপ্টার দিয়ে ঘিরে ফেলে। এই অবস্থায় গাড়ি ছেড়ে দিয়ে জংগলে নামা ছাড়া উপায়ই ছিলনা। ঘন জংগলে অবিরাম খোঁজার কষ্ট এড়াবার জন্যে ওরা সংজ্ঞালোপকারী গ্যান বোমা ছোড়ে জংগলে। তখন আমি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিলাম।’ আহমদ মুসা থামল একটু।
কিন্তু থামতেই উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল শা বানু, ‘আপনি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিলেন? আবার ধরা পড়লেন আপনি?’
‘না। আমাকে ওরা সংজ্ঞাহীন অবস্থায় ধরে এনেছিল বটে, কিন্তু ধরে নিয়ে যেতে পারেনি। তোমাদের তার নাম বলেছি। আমি যাকে বড় বোন বলেছি সেই ডাক্তার সুস্মিতা বালাজীর স্বামী ড্যানিশ দেবানন্দ রাও আমাকে সেখান থেকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় উদ্ধার করেছিলেন। পরে আমি তাদের কাছে শুনেছিলাম, ড্যানিশ দেবানন্দ কোন কাজে ঐ এলাকার পাহাড়ে গিয়েছিলেন। তিনি এক জায়গায় বসে- ওদের আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে আসা, আমার জংগলে পালানো, ওদের সংজ্ঞালোপকারী গ্যাসবোমা ছোড়া, আমার সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়া, ওদের আমাকে গিয়ে ধরে নিয়ে আসা সবই চোখে দুরবীন লাগিয়ে দেখেছিলেন। তারপর তিনি পাহাড় থেকে নেমে আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যান। আমার সংজ্ঞাহীন অবস্থায় ডাক্তার সুস্মিতা বালাজী আমার গুলীবিদ্ধ স্থানে অপারেশন করেন। আমাকে কয়েকদিন ওরা নড়া-চড়া করতে দেননি। সুষমা রাওয়ের মোবাইলে তার কোন সাড়া পাচ্ছিলাম না। শেষে দ্বিতীয় আরেকটি মোবাইলের নাম্বার মনে পড়ে যায়। সেটায় গতকাল বিকেলে তাকে ফোন করে পেয়ে যাই। তার পরের ঘটনা সবকিছু বলেছি।’
‘তোমার এত বিপদ গেছে? আল হামদুলিল্লাহ, আল্লাহ তোমাকে দ্রুত সুস্থ করে তুলেছেন। তোমার বোন মেয়েটা সত্যিই ডাক্তার?’ বলল শাহ বানুর মা সাহারা বানু।
‘জি, তিনি এমবিবিএস ডাক্তার।’
‘গ্রীন ভ্যালি কি আসলেই জংগল?’ শাহ বানু বলল।
‘হ্যাঁ, একেবারে পুরোপুরি জংগল।’
‘কিন্তু জংগলে থাকেন কেন ওরা?’ শাহ বানুই প্রশ্ন করল।
‘সে অনেক কাহিনী। দু’জনেই খুব বড় ঘরের ছেলে মেয়ে। বোন সুস্মিতা বালাজী ডাক্তার এবং তার স্বামী ড্যানিশ দেবানন্দ একজন ইণ্জিনিয়ার। তিনি একজন বিপুল বিত্তশালী ইণ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠানের মালিকের ছেলে। নিজেও চাকরি করতেন পোর্ট ব্লেয়ার সরকারের অধীনে। সৎ অফিসার ছিলেন। তার সততাই কাল হয়ে দাঁড়ায়। ঐ শংকরাচার্যরা তার চরম বৈরী হয়ে দাঁড়ায়। একদিন একসাথে তারা ড্যানিশ দেবানন্দের পিতা-মাতাকে খুন করে। কৌশলে খুনের দায় চাপিয়ে দেয় ড্যানিশ দেবানন্দ ও সুস্মিতা বালাজীর উপর। প্রাণ বাঁচাবার জন্যে দেবানন্দ তার পিতার সহায়-সম্পদ শংকরাচার্যদের হাতে তুলে দিয়ে জংগলে আশ্রয় নেয়। সেই থেকে আজ বিশ বছর ওঁরা জংগলে। আরেকটা বড় সুখবর তোমাদের জন্যে সেটা হলো সুস্মিতা বালাজী, মানে আমার পাতানো বড় বোন, তোমাদের সুষমা রাওয়ের ফুফাতো বোন। তারা মহারাষ্ট্রের একই গোষ্ঠীর মেয়ে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কি বলছেন ভাইয়া, এটা সত্যি?’ বলল শাহ বানু। তার চোখে আনন্দ ও বিস্ময়।
‘সত্যি, তবে সুস্মিতা বালাজীর কথা সুষমা রাওয়ের মনে আছে কিনা জানি না। কিন্তু তার মা সুস্মিতা বালাজীকে খুব ভালবাসতেন, এখনও ভালবাসেন নিশ্চয়ই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘বুঝতে পারলাম না। মামাতো-ফুফাতো অচেনা হবে কিভাবে?’ বলল সাহারা বানু।
‘এর পেছনে কাহিনী আছে। সুস্মিতা বালাজী সুষমা রাওদের বোম্বের বাসায় থেকে মেডিকেল কলেজে পড়তো। সুষমা রাও বয়স যখন এক বছর, তখন সুস্মিতা বালাজী মেডিকেল কলেঝে শেষ বর্ষে পড়াকালে ইন্জিনিয়ারিং শেষ বর্ষের ছাত্র ড্যানিশ দেবানন্দকে পরিবারের বাধা সত্বেও বিয়ে করে। বনিয়াদী ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে ভিন্ন জাতের ছেলেকে বিয়ে করায় পরিবার তা সাথে সম্পর্ক ছেদ করে। আজ বিশ বছর হলো তার পরিবারের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ কিংবা সম্পর্ক নেই সুস্মিতা বালাজীর। সুষমা রাও তাকে চিনবে কি করে!’
‘ড্যানিশ দেবানন্দ কেমন ভিন্ন জাতের ছেলে? তারও তো হিন্দু নাম দেখছি!’ বলল শাহ বানুর মা সাহারা বানু।
‘সুস্মিতা বালাজীকে বিয়ে করার সময় ড্যানিশ দেবানন্দ হিন্দুধর্ম গ্রহণ করে। কিন্তু পিতার দিক থেকে সে পার্সি এবং মায়ের দিক থেকে থাই বৌদ্ধ। দেবানন্দের মা থাইল্যান্ডের প্রথম রাজবংশের মেয়ে এবং তারা মূলত চীনা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তোমার কাছ থেকে এই কাহিনীটা না শুনলেই ভাল ছিল। এখন খুব খারাপ লাগছে। তারা পরিবার হারিয়ে, স্বাধীন জীবন হারিয়ে জংগলে বাস করছে। কি দূর্ভাগ্য!’ বলল শাহ বানুর মা।
‘না খালাম্মা। ভাববেনা না। ওরা খুব ভাল আছে। আদিবাসীদের নিয়ে তারা এক নতুন জীবন শুধু নয়, এক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। এই সাম্রাজ্যে তারা সম্রাট। পরিবার-পরিজনদের হারিয়ে পরিবারের চেয়ে অনেক বড় আদিবাসী এক সমাজকে তারা পেয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসার মোবাইল বেজে উঠেছে। কথা শেষ করেই আহমদ মুসা পকেট থেকে মোবাইল তুলে নিল।
সুষমা রাওয়ের টেলিফোন।
‘হ্যালো। ওয়ালাইকুম ছালাম। বল সুষমা।’ বলল আহমদ মুসা।
ওপারের কথা শুনে আবার বলল, ‘না সুখবর আছে সুষমা। ওদের উদ্ধার করেছি। আমি এখন ওদের নিয়ে যাচ্ছি গ্রীণভ্যালিতে, যেখানে আমি, গত কয়েকদিন ছিলাম।’
‘না সুষমা। ওরা ওখানে ভাল ও নিরাপদ থাকবে।’
না, ওরা অজানা-অচেনা কেউ নয়। তোমার খুব আপনজন ওরা।’
‘না সত্যি বলছি।’
‘ঠিক আছে বলছি। আগে তুমি খালাম্মা ও শাহ বানুর সাথে কথা বলে নাও।’
আহমদ মুসা মোবাইল দিল সাহারা বানুকে। সাহারা বানু কথা বলল। তার কাছ থেকে মোবাইল গেল শাহ বানুর কাছে। ওদের কথা আর শেষ হয়না।
শাহ বানুই অবশেষে বলে ফেলল সুস্মিতা বালাজীর পরিচয়। বোধ হয় শাহ বানুর কাছে শুনে সুষমার যেন সব শোনা হলো না। আহমদ মুসার সাথে কথা বলতে চাইল সুষমা রাও।
শাহ বানু আহমদ মুসাকে মোবাইল দিয়ে বলল, ভাইয়া, ওদের ব্যাপারে সুষমা আপনার সাথে কথা বলতে চায়।
আহমদ মুসা মোবাইল নিয়ে ‘হ্যালো’ বলতেই ওপার থেকে সুষমা রাও বলল, ‘কি ভাইয়া, শাহ বানু যা বলল তা সত্যি? সে সত্যিই আমার হারানো বোন?’ গম্ভীর ও আবেগ জড়িত কন্ঠ সুষমার।
‘তার কথা তোমার মনে আছে?’
‘তাকে আমার মনে নেই। কিন্তু আম্মার কাছ থেকে তার কথা এত বেশি শুনি যে, তিনি আমার কাছে শত বছরের চেনার চেয়েও বেশি। আমার জন্মের পর তিনি এক বছর আমাদের বাড়িতে ছিলেন। আম্মা বলেন, তিনি এই এক বছরে আমাকে শত বছরের আদর দিয়ে গেছেন। এক বছর আমি ওর কোলেই মানুষ হয়েছি। আমার অসুখ-বিসুখ কিংবা কোন অসুবিধা হলে তিনি মেডিকেল কলেজেরে ক্লাসে যেতেন না।’ বল্ল সুষমা রাও। কান্নাজড়িত কন্ঠ সুষমার।
‘হ্যাঁ, সুস্মিতা। তিনি তোমাদের কথা খুব ফিল করেন। সেদিন তোমাদের কথা বলতে গিয়ে তিনি অনেক কেঁদেছেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তার কথা আমার আম্মা শুনলে পাগল হয়ে যাবেন ভাইয়া। আত্মীয় স্বজনের মাধ্যমে, বিভিন্ন মাধ্যমে কত যে সন্ধান করেন তিনি আপার। ভাইয়া, শাহ বানুদের নিয়ে যাচ্ছেন, আমাকেও আপার কাছে নিয়ে চলুন।’ বলল সুষমা রাও।
‘তোমার আব্বার চোখ এড়িয়ে তোমার যাওয়া কঠিন। আমি কথা দিচ্ছি সুষমা, আপাকেই তোমাদের কাছে আনব।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ ভাইয়। আমি, আমার মা সীমাহীন খুশী হবো। আপনি আপার টেলিফোন নাম্বার দিন। এখনি টেলিফোন করব।’
আহমদ মুসা সুস্মিতা বালাজীর টেলিফোন নাম্বার দিল সুষমা রাওকে।
‘ধন্যবাদ ভাইয়া, আমার সব ধন্যবাদ, সব কৃতজ্ঞতা আপনার জন্যে ভাইয়া। আবেগ রুদ্ধ কন্ঠে বলল সুষমা রাও।
‘কথা ফেরত নাও সুষমা। মানুষের সব ধন্যবাদ, সব কৃতজ্ঞতা একমাত্র আল্লাহর জন্যে।’
‘স্যরি। একজন নব্য মুসলমানের ভুল হতেই পারে। আমি আমার উক্তিটি প্রত্যাহার করলাম। কিন্তু ভাইয়া, আল্লাহ তো আল্লাহই। তিনি সর্বোপরি এবং সর্বশক্তিমান। সবকিছুর নিয়ামক ও নিয়ন্ত্রক তিনি। আমি যে কথাটা বললাম তা বললে কি তার এই অধিকারে হস্তক্ষেপ হয়, না আরও কিছু কারণ আছে?’
‘হস্তক্ষেপ অবশ্যই হয়। সব প্রশংসা, সব ধন্যবাদ-কৃতজ্ঞতা পাওয়ার যোগ্য মানুষ নয়, কারণ সব ক্ষমতা মানুষের নেই। যে কাজগুলোর জন্যে তুমি আমাকে ধন্যবাদ দিলে বা কৃতজ্ঞতা জানালে, সে কাজগুলো আমি করেছি বটে, কিন্তু এর কৃতজ্ঞতা কি আমার? একটা পুতুল ভাল নাচে, একটা কলম ভাল লিখে, এই ‘ভাল নাচ’ ও ‘ভাল লেখা’র কুতিত্ব কি পুতুল ও কলমের? তা নয়। সবাই চোখ বন্ধ করে এই কৃতিত্ব দেবে পুতুল কলমের নির্মাতাকে। কারণ নির্মাতাই পুতুল ও কলমকে এই ভাল কাজের জন্যে তৈরি করেছে। সুতরাং আমি যে ভাল কাজগুলো করেছি, তার যোগ্যতা, তার মানসিকতা, তার সুযোগ, সামর্থ্য সবই আল্লাহর কাছ থেকে পেয়েছি বিধায় প্রশংসা, ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা আল্লাহর জন্যে।
‘আপনি ঠিক বলেছেন ভাইয়া। কিন্তু একটা সমস্যা। মানুষের ভাল কাজের প্রশংসা আল্লাহকে দিতে হয়, তাহলে মানুষের মন্দ কাজের দায় আল্লাহর উপরই বর্তায়।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘পুতুল ও কলমের সাথে মানুষের পার্থক্য আছে। পুতুল ও কলমের স্রষ্টা পুতুল ও কলমকে নির্দিষ্ট একটা কাজের জন্যে সৃষ্টি করেছে, অন্য কোন কাজ করার ক্ষমতা, স্বাধীনতা পুতুল ও কলমকে দেওয়া হয়নি। কিন্তু মানুষকে আল্লাহ চিন্তা ও কাজ করার স্বাধীনতা দিয়ে পাঠিয়েছেন। এই সাথে মানুষের মঙ্গলের জন্যে, মানুষের এই বিশ্বের শান্তি ও স্বস্তির জন্যে ভাল ও ভাল পথকে আল্লাহ চিহ্নিত করে দিয়েছেন যুগে যুগে পাঠানো তাঁর নবী-রাসুলদের মাধ্যমে এবং বিধান দিয়েছেন মানুষকে ভাল কাজ হরতে হবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। এই বিধান মানুষ মান্যও করতে পারে, লংঘনও করতে পারে। ভাল কাজ করতে পারলে আল্লাহর প্রশংসা এই জন্যেই করতে হয় যে, ভাল কাজ করার শক্তি-সামর্থ্য যেমন আল্লাহ দিয়েছেন, তেমনি ভাল পথ ও কাজ চেনার সুযোগও আল্লাহই করে দিয়েছেন। অন্যদিকে মানুষ মন্দ কাজ করে, মন্দ পথে চলে তখন আল্লাহর বিধান সে লংঘন করেই করে এবং কাজ করার যে শক্তি-সামর্থ্য আল্লাহ দিয়েছেন তার অপব্যবহার করে। সুতরাং কেউ মন্দ কাজ করলে ও মন্দ পথে চললে তার দায় দাকেই বহন করতে হবে, আল্লাহকে নয়।’
আহমদ মুসা থামল। থেমেই আবার বলল সুষমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে, ‘এসব ভারী কথা এখন থাক, সাক্ষাতে হবে। এখন বল, তেমন কোন খবর আছে কিনা। তোমার আব্বা কি ভাবছেন শাহ বানুদের ও আহমদ শাহ আলমগীরের উদ্ধারের ব্যাপার নিয়ে?’
‘কিছুই ভাবছেন না ভাইয়া, এসব ব্যাপারে নিজের থেকে কিছুই বলেননি তিনি। মিনিট পাঁচেক আগে তার রুমের পাশ দিয়ে আসার সময় টেলিফোনে খুব উত্তেজিতভাবে কথা বলতে শুনলাম। তিনি কাউকে গালিগালাজ করে বলছেন, ‘সব অপদার্থের দল। একা একজন সব ওলট-পালট করে দিল। আর সকলে মিলে তোমরা ঘোড়ার ঘাস কাটলে।’ তারপর তিনি কাউকে নির্দেশ দিলেন, ‘ওদের নিয়ে অবশ্যই কোথাও তাকে উঠতে হবে, পোর্ট ব্লেয়ার বা অন্য কোথাও। বোটে তারা অন্য কোন দ্বীপেও যেতে পারে। সন্দেহজনক সকল স্থানে তোমরা অভিযান চালাও। আমি বলে দিয়েছি পুলিশ তোমাদের সাহায্য করবে।’
থামল সুষমা রাও।
‘খু্ব মূল্যবান খবর দিলে তুমি সুষমা। আমার অনুমান মিথ্যা না হলে, আমাদের ব্যাপারেই ঐ নির্দেশ তিনি কাউকে দিয়েছেন।
‘আমার মনও এরকম কিছু বলছে ভাইয়া। তার মানে আব্বা কি.........।’
কথা শেষ না করেই থেমে গলে সুষমা রাও।
‘সুষমা প্রমাণহীন কোন সন্দেহ নিয়ে অযথা মন খারাপ করোনা।’
‘কিন্তু ভাইয়া, আমার মনে সন্দেহ ক্রমে দৃঢ় হচ্ছে যে, আমার কাছ থেকে আহমদ শাহ আলমগীরকে আলাদা করার জন্যেই তাকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।’ শেষের কথাগুলো তার কান্নায় রুদ্ধ হয়ে গেল।
‘ধৈর্য্য ধর সুষমা। আহমদ শাহ আলমগীর সম্পর্কে সুখবর আমি শীঘ্রই তোমাকে দিতে পারব।’
‘ধন্যবাদ ভাইয়া। আল্লাহ আপনাকে সাহয্য করুন। আপনার সাথে সাক্ষাৎ না হলে অবস্থা আমাকে পাগল করে ফেলতো। আল্লাহর পরেই আপনার উপর আমার ভরসা।’
‘ধন্যবাদ বোন। এখন কথা শেষ করি।’
‘আব্বার ঐ নির্দেশ নিয়ে আপনি কি ভাবছেন? আপনাদের অনেক সাবধান হতে হবে। আমি খুব দুশ্চিন্তায় আছি। আপনি সময় না পেলে শাহ বানু যেন আমার সাথে যোগাযোগ রাখে।’
‘আমি ঐ বিষয়ে সিরিয়াসলি ভাবা শুরু করে দিয়েছি। তুমি চিন্তা করোনা। তোমার কথা আমি শাহ বানুকে বলব। রাখছি। আসসালামু আলাইকুম।’
‘ওয়াআলাইকুম আস সালাম।’ ওপার থেকে বলল সুষমা রাও।
আহমদ মুসা মোবাইল রাখতেই উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল সাহারা বানু, ‘সুষমা রাও কি খবর দিল বেটা?’
‘আমাকে কি বলার জন্যে বলল সুষমা?’ মা সাহারা বানু থামতেই বলল শাহ বানু।
‘সুষমা তোমাকে ঘন ঘন টেলিফোন করতে বলেছে। আর খালাম্মা, সুষমার খবরটা হলো, ওরা আমাদের খোঁজার জন্যে চারদিকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমাদের দূর্ভাগ্য। কিন্তু সুষমা এ বিষয়টা এত তাড়াতাড়ি জানল কি করে?’ বলল সাহারা বানু।
‘ক’মিনিট আগে তার আব্বা কারও সাথে টেলিফোনে যে কথাগুলো বলেছিল, তার থেকেই সুষমা এটা বলেছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘এত তাড়াতাড়ি বিষয়টা তার আব্বাই বা জানল কি করে? এমন কথা তিনি বলবেনই বা কেন? বলল সাহারা বানু। তার কপাল কুঞ্চিত।
আহমদ মুসা ম্লান হাসল। বলল, ‘খালাম্মা আপনি যে প্রশ্ন তুলেছেন, তা খুব বড় খালাম্মা।’
‘আমার ধারণা সত্য না হোক। কিন্তু মনে হচ্ছে কি জান, আহমদ শাহ আলমগীরের হারিয়ে যাওয়ার পেছনে সুষমার আব্বার হাত থাকতে পারে। যে অন্যবর্ণে বিয়ে করায় ভাগ্নীকে ত্যাগ করতে পারে, সে লোক নিজের মেয়েকে ভিন্ন ধর্মের ছেলের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যে ভিন্ন ধর্মের ছেলের ব্যাপারে যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। যদি এই ঘটনা সত্যিই হয়, তাহলে আমাদের কিডন্যাপের সাথে তিনি জড়িত থাকতে পারেন।’ বলল সাহারা বানু।
‘খালাম্মা, আপনি যেটা বলেছেন সেটা ঘটতে পারা যুক্তির মধ্যেও আসে। কিন্তু আমি ভাবছি, তিনি আরও বড় কিছুর সাথে জড়িত।’
‘সেটা কি?’ সাহারা বানুর প্রশ্ন।
‘একটা হিংস্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সাথে তিনি জড়িত। এই গোষ্ঠীর হাতেই এই পর্যন্ত আন্দামানের কয়েক ডজন মুসলিম যুবক প্রাণ দিয়েছে।’
আহমদ মুসার মুখের কথা শেষ না হতেই তার মোবাইল আবার বেজে উঠল।
মোবাইল আবার তুলে নিল আহমদ মুসা। সুস্মিতা বালাজীর টেলিফোন।
খুশী হলো আহমদ মুসা। তাকে টেলিফোন করা দরকার মনে করেছিল আহমদ মুসা।
‘হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম আপা।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ওয়ালাইকুম সালাম, ছোট ভাই। আপনাদের ওয়েলকাম। শাহ বানুরা আসছে জেনে খুব খুব খুশী হয়েছি আমরা।’
‘আমি আপনাকে টেলিফোন করব মনে করছি। আপনি জানলেন কি করে যে আমরা আসছি?’
‘সুষমা টেলিফোন করেছিল। এটা ছিল আমার জন্যে এক ঐতিহাসিক আনন্দের ঘটনা। সেই এক বছরের দেখেছিলাম তাকে। দেখলাম সে সব জানে, সব শুনেছে। আপনার কাছ থেকে টেলিফোন নাম্বার পেয়েও আমি আমি তাকে টেলিফোন করিনি সে আমাকে চিনতে পারে কিনা এই চিন্তায়। কিন্তু তার সাথে কথা বলে মনে হলো আমরা যেন একদিনের জন্যেও আলাদা হইনি। আপনাকে ধন্যবাদ, আপনার জন্যে এই আনন্দ, এই মিলন সম্ভব হলো।’
‘ওয়েলকাম আপা। আপনারা কেমন আছেন?’
‘ভালো’
‘গতকালের ঘটনার আর কোন প্রতিক্রিয়া আছে?’
‘খারাপ নেই। ভাল প্রতিক্রিয়া হলো, আপনাকে আদিবাসীরা দেবতা ভাবতে শুরু করেছে।’
‘ভাই সাহেব কি আশে-পাশে আছেন?’
‘আছেন। দিচ্ছি।’ সুস্মিতা বালাজী বলল।
‘হ্যালো ভাই সাহেব, কেমন আছেন?’
‘ভালো। আপনাকে কনগ্রাচুলেশন সাকসেসফুল মিশনের জন্যে। সত্যি আল্লাহ আপনাকে খাসভাবে সাহায্য করেন।’ বলল ড্যানিশ দেবানন্দ।
‘আলহামদুলিল্লাহ। আপনাকে একটা অনুরোধ করব।’
‘অনুরোধের প্রশ্ন কেন? বলুন কি’
‘হাইওয়ে থেকে ভ্যালিতে ঢোকার পথে, ভ্যালি মাঠটায় এবং ভ্যালি উপকূলে ল্যান্ডিং ডকটায় আপনি পাহারা বসান। তাদের বলুন অপরিচিত লোকদের দেখলে যেন আপনাদের খবর দেয়।’
‘কেন আপনি কি কোন আশংকা করছেন?’
‘সে রকম কিছু নয়, তবে আমার মন বলছে, আমাদের সাবধান হওয়া দরকার।’
‘যদি সে রকম হয়, তাহলে আমরা কি করব?’
‘লোকতেদর একত্রিত করবেন। যারা আসবে, তাদেরকে সার্চ করতে দেবেন। আমাদের না পেলেই তারা চলে যাবে। আরেকটা বিকল্প হলো, লোকদের একত্রিত করবেন সশস্রভাবে এবং যারা আসবে তাদের প্রতিহত করবেন।’
‘আপনার বিকল্পটাই গ্রহনযোগ্য। শংকরাচার্যের লোকেরা যদি ভ্যালিতে আসেই, তাহলে গতকালের ঘটনার তারা প্রতিশোধ নেবে। তাছাড়া আমাদের যদি চিনতে পারে, তাহতে তো অবস্থা আরও খারাপ হবে। সুতরাং বাধা দেওয়াই ভাল।’
‘ঠিক আছে। আমিও আপনার সাথে একমত। তবে ভাই সাহেব, ভ্যালিতে যদি কেউ যায়ই, তাহলে চূড়ান্ত পর্যায়ে ঘটনাকে ডিলে করার চেষ্টা করবেন। অথবা যারা যাবে তার আপনার প্রস্তুতির বিষয় জানার আগেই তাদের শেষ করতে পারলে সেটাই ভাল হবে।’
‘এখানেও আপনার দ্বিতীয় প্রস্তাব বেশি গ্রহণযোগ্য। তবে অবস্থা অনুসারেই আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে।’
‘ভাই সাহেব, এখন সাড়ে ৯টা। আমার খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাব ইনশাআল্লাহ।’
‘ইনশাআল্লাহ। ছোট ভাই, দোয়া করুন, আমার শান্তির ভ্যালিটাকে আল্লাহ যেন রক্ষা করেন।’
‘আমিন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তাহলে রাখি। আপনারা আসুন। খোদা হাফেজ।’
আহমদ মুসা মোবাইল রাখল।
শাহ বানু, সাহারা বানু ও তারিক সবারই মুখ উদ্বেগাকুল। আহমদ মুসার কথায় তারা বুঝেছে যে ভ্যালিতে তারা যাচ্ছে, সেখানেও বিপদ।
আহমদ মুসা মোবাইল রাখতেই সাহারা বানু বলে উঠল, ‘বেটা সেখানে কিছু হয়েছে, কোন বিপদ ঘটেছে?’
‘খালাম্মা এ নিয়ে চিন্তা করবেন না। আমরা বিপদের মধ্যেই আছি।যে কোন জায়গায় যে কোন ঘটনা ঘটে যেতে পারে। আবার কিছু নাও ঘটতে পারে। আমি ওদের একটা আশংকার কথা বলেছি। যাতে ওরা সতর্ক থাকে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আল্লাহ সহায় হোন, কিছু না ঘটুক বেটা।’ বলল সাহারা বানু।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘খালাম্মা কিছু ঘটা দরকার, ওদের আমাদের পথ রোধ করে দাঁড়ানো দরকার। তাহলেই না বুঝব আমরা ঠিক পথে চলছি এবং আরও সামনে এগুনো আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে। যদি তারা আমাকে ওদের হাতে আত্মসমর্পণের জন্যে এখানে আসতে বাধ্য না করতো, তাহলে এত সহজে ও এত তাড়াতাড়ি আপনাদের উদ্ধার করা সম্ভব হতো না।’
‘তাই বলে বিপদেকে ওয়েলকাম করছেন স্যার?’
আলোচনায় শরিক হলো তারিকও।
‘বিপদকে নয় তারিক। শত্রুপক্ষ অন্ধকার থেকে সামনে এসে দাঁড়াক, সেটাই কামনা করছি। তাতে নতুন কিছু জানাও যেতে পারে। আহমদ শাহ আলমগীর এখনো উদ্ধার হয়নি। আমি অনুমান করি কোথায় তাকে রাখা হয়েছে। কিন্তু সেটা নিশ্চিত নয়। আরও নিশ্চিত হওয়া যায় কিনা এবং ঐ জায়গা সম্পর্কে আরও খবর জানা যায় কিনা দেখতে হবে। তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে ব্যর্থ হলে তাকে বাঁচানো কঠিন হতে পারে। আমি বুছতে পারছিনা, আহমদ শাহ আলমগীরের ব্যাপারে তারা এত সিরিয়াস কেন? শুধু সুষমা রাও এর কারণ হতে পারেনা। রহস্যের কেন্দ্রে পৌঁছতে..........।’
আহমদ মুসার কথার মাঝখানে কথা বলে উঠল সাহারা বানু। বলল সে, ‘স্যরি বেটা, একটা সাংঘাতিক কথা মনে পড়ে গেছে। আগে এটা শোন। তোমার জিজ্ঞাসার জবাব এতে পেতে পার।’
মুহূর্তখানেক থেমেই সাহারা বানু বলা শুরু করল, ‘শংকরাচার্যের লোকেরা আমাদের অনেক জিজ্ঞসাবাদ করেছে। এর মধ্যে একটা বাক্সের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সবচেয়ে বেশি। বলেছে, এই বাক্স না পেলে আহমদ শাহ আলমগীর কিংবা তোমাদের কাউকে আমরা ছাড়ব না। তোমাদের ধরাই হয়েছে এই বাক্স আদায়ের জন্যে। আহমদ শাহ আলমগীর তার চোখের সামনে তার মা ও বোনের মর্মান্তিক পরিণতি দেখবে, যাতে মুখ খুলতে বাধ্য হবে। আবার তোমরা তোমাদের চোখের সামনে আহমদ শাহ আলমগীরের মর্মান্তিক পরিণতি দেখবে এবং তোমাদেরও মুখ খুলতে হবে। এসবের আগেই তোমরা যদি বাক্সের সন্ধান দাও, তাহলে তোমরা সকলেই বেঁচে যাবে। বাক্সের কথা শুনে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। কোন বাক্সের কথা বলছে, আমরা বুঝতেই পারিনি। আমি বললাম, কোন বাক্সের কথা বলছেন আপনার? কি আছে তাতে? জবাবে ওদের সর্দার লোকটি ইংরেজিতে বলল, চন্দন কাঠের একটি বাক্স। ওতে আছে আমাদের ঋষি রাজা শিবাজীর তৈরি মহামূল্যবান একটি দলিল, মোগল ধনভান্ডারের একটা নক্সা এবং আরও কিছু। আমে বলেছিলাম, এ বাক্স আমি দেখিনি। বাক্সটি আমাদের কাছে আসবে কেন? তিনি ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলেছিলেন, ভনিতা রাখুন, বাক্সটি আপনাদের কাছেই আছে। আন্দামানে আপনাদের প্রথম পুরুষ মোগল শাহজাদা ফিরোজশাহ যখন কয়েদী হিসাবে আন্দামানে আসেন, তখন তার সাখে চন্দন কাঠের এই বাক্সটি ছিল। শত বিপদে সবকিছু ছাড়তে হলেও তিনি বাক্সটি ছাড়েন নি, তিনি কি বাক্সটিকে পারিবারিকভাবে হেফাজত না করে পারেন? পারেন না। অতএব বাক্সটি আপনাদের কাছে আছে, এ ব্যাপারে কোনই সন্দেহ নেই। আমি তখন বলি, কিন্তু আমরা কেউ জানি না। সে বলে, জানেন কিনা দেখা যাবে। কাল সকালে এক ভয়ংকর শয়তান আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করছে। তারপর সবাইকে প্যাক করে আহমদ শাহ আলমগীরের কাছে নিয়ে যাব। তারপর দেখব আহমদ শাহ আলমগীর মা-বোনের অপমান কতটা সহ্য করতে পারে, আর তোমার চোখের সামনে সন্তানের আকাশ-ফাটানো আর্তচিৎকার কতটা সহ্য করতে পার দেখব। সে যেতে উদ্যত হয়েও আবার বলে, হ্যাঁ আরেকটা সুখবর শোন। এ হারামজাদা যদি কালকে আত্মসমর্পণ না করে তাহলে এক মহাঘটনার জন্যে তৈরি থেকো? তারপর চলে যায় সে।’
আহমদ মুসা চোখ নিচু করে গভীর মনেোযোগ দিয়ে শুনছিল সাহারা বানুর কথা। বাক্সের কথা ও বাক্সের ভিতরের জিনিসের কথা ভ্রুকুঞ্চিত হয়ে উঠেছিল আহমদ মুসার। তাহলে শংকরাচার্যের এই রকাক্ত মিশনের সাথে শুধু আন্দামানের ব্যাপার নয় ইতিহাসের একটি বিষয় এবং অর্থযোগও রয়েছে। তার বিস্ময় জাগল, মোগল অর্থভান্ডার কি এখনো গোপনই রয়ে গেছে, তার মনে পড়ল রাশিয়ার জারদের গুপ্তধনের কথা। তাহলে সব রাজবংশই কি তাদের জন্য গোপন অর্থভান্ডার গড়ে তোলে? হতে পারে, এটাই সে সময়ের চলমান বাস্তবতা। তার মনে আরও প্রশ্ন জাগল, শিবাজীর মহামূল্যবান দলিল মোগলদের বাক্সে কেন? কি আছে ওতে? আর ফিরোজ শাহ এত বিপদের মধ্যেও বাক্সটি ছাড়লেন না কেন? সাথে করে তা নিয়ে এলেন আন্দামানে?
এসব চিন্তায় নিজেকে প্রায় হারিয়ে ফেলেছিল আহমদ মুসা। সাহারা বানু থামলেও তাই কথা বলতে দেরি হলো আহমদ মুসার।
চিন্তায় ছেদ টেনে কথা বলল আহমদ মুসা। বলল, ‘খালাম্মা, আমার মনে হচ্ছে বাক্সের কথাটা ওরা ঠিকই বলেছে। আহমদ শাহ আলমগীরকে বন্দী করে রাখার একটা বড় কারণ এটাই।’
‘কিন্তু বেটা, কোন চন্দন কাঠের বাক্সতো আমরা দেখিনি।’ সাহারা বানু বলল।
‘কিছু মনে করবেন না খালাম্মা, এটা একটা বংশীয় গোপনীয়তার ব্যাপার, এমন কি হতে পারে যে, আপনি জানেন না কিন্তু আহমদ শাহ আলমগীর জানে?’ বলল আহমদ মুসা।
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না সাহারা বানু। ভাবছিল সে। একটু পর বলল, ‘তুমি একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছ। রাজা-বাদশাদের এটা শুধু ট্রেডিশন নয় আইনও। উত্তারধিকার সূত্রে আহমদ শাহ আলমগীর এমন কিছু পেতেও পারে। কিন্তু একটা বিষয়, আহমদ শাহ আলমগীরের পিতার এমন কোন বিশেষ বা গোপন স্থান ছিল না যেখানে সে একটা জলজ্যান্ত বাক্স সংরক্ষণ করবে, অথচ আমি জানেত পারবো না।’
এমনও তো হতে পারে, বাক্সটি দৃশ্যমান কোন স্থানে নেই। বাড়ির ভেতরে বা বাইরে কোন অদৃশ্য জায়গায় ওটা রেখেছিলেন ফিরোজ শাহ। ফিরোজ শাহ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে বিষয়টা সবাই জেনে আসছে এবং এই নিয়মেই আহমদ শাহ আলমগীর জেনেছে তার পিতার কাছ থেকে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক বলেছ বেটা। বাক্সের বিষয়টা যদি সত্য হয়, তাহলে এটাই ঘটেছে।’
বলে একটু থামল সাহারা বানু। একটা ঢোক গিলে আবার বলল, ‘আল্লাহর হাজার শোকর তারা আমাদের বন্দী করে আহমদ শাহ’র কাছে নিয়ে যেতে পারেনি। আমাদের ক্ষতি দেখলে সে ওদেরকে বাক্সের কথা বলেও দিতে পারতো।’
‘ঠিক খালাম্মা, এটা একটা বড় বাঁচা।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমরা বাঁচলাম, কিন্তু ভাইয়ার কি হবে, তার উপর তারা প্রতিশোধ নিতে পারে। কিছু ঘটে যায় যদি।’ কম্পিত কন্ঠে বলল শাহ বানু।
‘কোন ভয় নেই শাহ বানু। আমি নিশ্চত, ঐ বাক্স পাওয়া পর্যন্ত আহমদ শাহ আলমগীরকে তারা অবশ্যই বাঁচিয়ে রাখবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘বাক্সের ব্যাপারটা কি সত্যি ভাইয়া?’ শাহ বানু বলল।
‘বিশ্বাস করা, বিশ্বাস না করা কোন দিকেই সুনির্দিষ্ট কোন প্রমাণ আমার কাছে নেই। তবে এরকম কিছু থাকা আমি অস্বাভাবিক মনে করি না।’
‘কোথায় খোঁজা যেতে পারে সে বাক্স’ বলল শাহ বানু।
বাক্স খোঁজা তাদের কাজ, আমাদের কাজ হলো আহমদ শাহ আলমগীরকে পাওয়া। তবে এই বাক্সটার সন্ধান করতে চাই। বাক্সটার সাথে দু’টি ইতিহাস জড়িত। এক, মোগলদের, দুই শিবাজীর। আমার মতে বাক্সের মোগল ধনভান্ডারের চাবি ও নক্সার চেয়ে শিবাজীর দলিলটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শোনার পর থেকে ঐ দলিলটার প্রতি আমার লোভ বাড়ছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনার ভেতের কি কোন প্রকার লোভ আছে ভাইয়া?’ শাহ বানুর প্রশ্ন। তার ঠোঁটে ম্লান হাসি।
‘কেন আমি মানুষ নই? মানুষ বলেই অন্য মানুষের যা আছে, আমারও তা থাকবে।’
‘কিন্তু মানুষ বলেই সবকিছু সবার মধ্যে সবার মধ্যে থাকবে, তা কি স্বাভাবিক ভাইয়া?’
মৌলিক মানবীয় বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে অবশ্যই এটা স্বাভাবিক। কিন্তু পার্থক্য যেটা দেখা যায় সেটা মেধা ও অনুশীলণগত কারণের ফল। অনুশীলন এমনকি মেধার ঘাটতি পূরণ করে। সুতরাং শিক্ষা বা চর্চা মানুষে মানুষে বিরাট পার্থক্য তৈরি করে, আবার তেমনি পার্থক্য দূরও করে।
‘আপনার ছাত্র অনুশীলন শুরু করেছে, দেখা যাক পার্থক্য কতটা দূর করে।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘দেখা তো শেষ হয়ে গেছে শাহ বানু। তার বন্দী হওয়া থেকে উদ্ধার পর্যন্ত সে সাহসের পরিচয় দিয়েছে। পুনরায় তোমাকে উদ্ধার করার সময় এক কঠিন মুহূর্তে ঠিক সময়ে সে গাড়ি নিয়ে হাজির হয়েছিল। তারপর এই বোট চালানোর দায়িত্ব সে নেয়া পর্যন্ত সংঘাতকালীন সব পর্যায়ে সে তার দায়িত্বের অংশ ঠিকঠাক পালন করেছে। আমি তার হাতে রিভলবার তুলে দেইনি। সবার হাতে রিভলবার উঠুক আমি চাই না, তোমাদেরও চাওয়া উচিত নয়।’
‘কিন্তু ভাইয়া, রিভলবারের ব্যবহারই কিন্তু আমাদের উদ্ধার করতে এবং এ পর্যন্ত নিরাপদে পৌঁছতে সাহায্য করেছে।’ বলল শাহ বানু।
‘ঠিক। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্যে রিভলবারের যেটুকু ব্যবহারের প্রয়োজন ছিল, তার ব্যবস্থা আল্লাহ করেছিলেন।’
‘প্রয়োজনকালে সময়ের জন্যে প্রস্তুতি তো তাহলে অপরিহার্য।’ শাহ বানু বলল।
‘তার মানে তুমি তারিকের হাতে রিভলবার তুলে দেবেই। এটাই স্বাভাবিক। মোগল রক্তের সাথে তাদের সামরিক বৈশিষ্ট্য অবিচ্ছেদ্য।
‘কিন্তু ভাইয়া, রিভলবার হাতে দেওয়ার চেয়ে তুলে নেওয়াই বেশি স্বাভাবিক।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল তারিকেকে উদ্দেশ্য করে, ‘এবার তুমি জবাব দাও তারিক। নিজের বোঝা নিজেই বহন করা উচিত। আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ স্যার।’
বলে একটু থামল। শুরু করল পরক্ষণেই, ‘অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়া মোগল ট্রেডিশনে আছে। মোগল সম্রাজ্ঞীরা মোগল সম্রাটের হাতে তলোয়ার তুলে দিতেন যুদ্ধ যাত্রার সময়।’
বিব্রতকার একটা ভাব দেখা দিল শাহ বানুর চোখে-মুখে। লাল হয়ে উঠেছে তার মুখ। বলল, ওটা একটা আনুষ্ঠানিকতার ব্যাপার। যুদ্ধ যাত্রার সময়ে ওটা একটা বাড়তি উৎসাহের বিষয়। সম্রাটরা কিন্তু যোদ্ধা হিসাবেই সম্রাজ্ঞীর কাছ থেকে অস্ত্র পেয়েছেন।’
‘অস্ত্র হাতে পাওয়া যোদ্ধা হওয়ার ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই কোন বাধার সৃষ্টি করে না।’ বোটের সামনের দিকেই চোখ নিবদ্ধ রেখেই বলল তারিক।
‘যোদ্ধা হওয়া যায়না কিংবা বাধা সৃষ্টি হওয়ার কথা আমি বলিনি। আমার বলার বিষয় হলো মানসিকতা। যুদ্ধ বা সংগ্রামের জন্যে নিজেই প্রস্তুত হওয়া এবং অন্যের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হওয়ার মধ্যে মানসিকতার বিরাট পার্থক্য রয়েছে’ বলল শাহ বানু।
‘যুদ্ধ বা সংগ্রামের যে মুখোমুখি হয়নি, যুদ্ধ-সংগ্রামের যে সুযোগই পায়নি, তার ক্ষেত্রে প্রস্তুতির প্রশ্ন ওঠে না।’ বলল তারিক।
শাহ বানু হাসল একটু। বলল, ‘স্যরি আমার কথা টার্গেটেড নয়, আমি নীতি কথা বলেছি। আমি সব সময় মনে করি, আজ মুসলমানদের তো বটেই, প্রতিটি নাগরিকেরই তিনটি দায়িত্ব পালন করা দরকার। এক. সে যোদ্ধা হবে, দেশ ও জাতির জন্যে ডাক পড়লে যেন যুদ্ধে যেতে পারে। দুই. সে পুলিশ হবে যেন সে সমাজে আইন-শৃংখলা রক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারে এবং তিন. সে সংসার-ধর্ম পালনকারী একজন পরিপূর্ণ গৃহস্থ হবে। এই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হবার প্রস্তুতি তাকে সব সময় সম্পূর্ণ করে রাখতে হবে।’
‘ধন্যবাদ শাহ বানু।’ বলল আহমদ মুসা উচ্ছসিত কন্ঠে। আহমদ মুসার সাথে ধন্যবাদ দিল তারিকও।
‘তুমি চমৎকার একটা তত্ব সামনে এনেছ শাহ বানু।’ আহমদ মুসা বলল।
‘এটা আপনার কথা। আমি নতুন করে বললাম মাত্র। কোন এক ঘটনায় আপনিই একথা বলেছিলেন। ইন্টারনেট থেকেই আমি ও ভাইয়া এটা মুখস্থ করেছিলাম।’ বলল শাহ বানু।
‘ইন্টারনেঠে এটা আমি পড়িনি। কেউ বলেওনি। আমি জানতামও না। জানলে যোদ্ধা হওয়ার প্রস্তুতি অবশ্যই নিতাম।’ তারিক বলল।
‘আমাদেরকে কেউ বলেনি। আমরা ব্রাউজিং করে বের করেছি।’ বলল শাহ বানু।
‘তোমাদের ধন্যবাদ শাহ বানু। আমার নিজের জন্য স্যরি।’ তারিক বলল।
তারিকের কথা শেষ হতেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘স্যরি নয় তারিক। জানার জন্যে ওটা কোন অপরিহার্য বিষয় নয় যে দুঃখ করতে হবে। যা হোক, তোমাদের সংক্ষিপ্ত বিতর্ক ভালো হয়েছে। তোমরা দু’প্রান্তে থাকলে কোন বিতর্ক জমবে ভালো। তবে কথা পরোক্ষ হয়েছে, সরাসরি হলে আরও ভাল হতো।’
‘তুমি নতুন শুনছ তো বেটা! ওরা ওভাবেই কথা বলে। তারিক খুব শান্ত ছেলে, ভালো ছেলে। শুধু আত্মরক্ষা করে চলাই ওর অভ্যাস।’ সাহারা বানু বলল।
‘তার মানে আমি ভালো নই বলছ আম্মা?’
সাহারা বানু কথা বলার জন্যে মুখ খুলেছিল।
আহমদ মুসা তার আগেই বলে উঠল, ‘আমার বোন এমন হতেই পারে না। মা যখন নিজের সন্তানের সামনে অন্য ছেলে-মেয়ের প্রশংসা করেন, তখন স্বতঃসিদ্ধ হয়ে যায় যে, সেই মা নিজের ছেলের গুণগুলোকেই অন্যের মধ্যে দেখতে চান।’
‘সবাইকে যিনি ভালবাসেন, তাকে এভাবেই ভাবতে হয় ভাইয়া।’
বলল শাহ বানু। তার কন্ঠ গম্বীর।
শাহ বানু থামতেই তারিক বলল, ‘দুর্লভ এই গুণ শাহ বানু।’
শাহ বানু তাকাল তারিকের দিকে। তার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠেছে। কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল। তার আগেই আহমদ মুসা বলল, ‘এসব কথা এখন থাক। এস অন্যদিকে মনোযোগ দেই।’
বলে তারিকের দিকে তাকিয়ে বলল, 'তারিক বোটের মাথার উপরের কভারটা আনফোল্ড করে দাও। উপর এবং আশ-পাশ কোথাও থেকে আমাদের কেউ দেখতে পাক তা চাই না।
‘আমরা তো সাগর দিয়ে চলেছি স্যার। আমাদের দেখবে কে?’ বলল তারিক।
‘টেলিস্কোপিক বাইনোকুলারের শক্তির কথা তোমার জানার কথা। পোর্ট ব্লেয়ারের উপকূলে বসে তোমার জামার রং পর্যন্ত কেউ বলে দিতে পারে।’
‘স্যরি স্যার।’ বলে তারিক বোটের কভার আনফোল্ড করার বোতাম টিপে দিল।
ঢেকে গেল বোটের উপরটা। তার সাথে চারদিক থেকে ঝালর নেমে এসে পাশের অনেকটা ঢেকে দিল।
আহমদ মুসা চেয়ারে গা এলিয়ে দিল।
‘বেটা, বাক্সের ব্যাপারটা আমার মাথা থেকে যাচ্ছে না। তুমি কি এ নিয়ে আর কিছু ভেবেছ?’
‘আমার কিছু ভাবার দেখছি না। আপনি এ ব্যাপারে কিছু ভাবতে পারেন। আমি নিশ্চত বাক্সটি আপনাদের বাড়িতেই আছে। হতে পারে সেটা বাইরের কোন লকারে অথবা ভেতরের কোন লকারে।’
‘ভেতরের লকার কি?’ সাহারা বানু বলল।
‘ভেতরের লকার অর্থ বাড়ির দেয়াল অথবা ফ্লোরে কোন লকার রয়েছে। হতে পারে বাড়ি নির্মাণের সময় সেটা তৈরি করা হয়। আমি কিছু জিজ্ঞাসা করছি দয়া করে উত্তর দিন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘বল বেটা।’ সাহারা বানু বলল।
আহমদ মুসা প্রশ্ন শুরু কলল। শুরু হলো আলোচনা।
নিঃশব্দে এগিয়ে চলল মটর বোট।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now