বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

আদনান এবং প্রশ্ন রহস

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X আদনান এবং প্রশ্ন রহস ------------------------- *** আবিদ হোসেন জয় *** |১| বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। টিনের ছাদে বৃষ্টির ফোটা পড়ার শব্দ সময়ের সাথে হচ্ছে তীব্র থেকে তীব্রতর। আদনান চোখ বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে আছে কিন্তু তার কান রীতিমত সজাগ। টিনের ছাদে পড়ন্ত বৃষ্টির পানির ফোটার শব্দের সাথে এক নতুন শব্দের যোগ হল। ভারি মোলায়েম মিষ্টি আওয়াজ। কে যেন আদনানকে ডাকছে- বাবা আদনান। বাবা আদনান। আদনান চোখ খুলে রীতিমত অবাক হল। রঙ্গিন শাড়ি পড়া এক নারী তার মাথার কাছে বসে আছে। কপালের মাঝখানটায় কালো টিপ,চোখে সামান্য কাজল আর ঘন বেনীতে পাকানো কালো চুল। মনের অন্তঃস্থে সংরক্ষিত,সযত্নে অঙ্কিত মায়ের চিত্রটি যেন প্রাণের সাড়া পেয়ে জাগ্রত হয়ে আদনানের মাথার কাছে এসে বসেছে। সে বুঝতে পারল পৃথিবীর ওপার থেকে তার মৃত মার আগমন ঘটেছে। আদনান চোখ বন্ধ করে ফেলল। মাকে নিয়ে একটা প্রশ্ন তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আচ্ছা মা বেঁচে থাকলে কি এরকম যুবতী থাকত? না মোটেও না। মার মুখে চামড়ার ভাজ পড়ত,চোখের নিচে চিন্তার কালো ছাপ থাকত, ঘন কালো চুলের ফাঁকে ফাঁকে সাদার রেখা ঝিলিক দিত। আদনান এসব ভাবতে ভাবতে এক গভীর চিন্তায় ডুবে যাচ্ছে। হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল। আদনান চোখ খুলে দেখল তার কাল্পনিক মার অস্তিত্ব শূণ্যে মিশে গেছে। সে নরম বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়াল, ঘুম ঘুম চোখে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলল। বাসার কাজের ছেলেটি এসেছে, হাতে গরম চায়ের কাপ। আদনান মুখ না ধুয়ে কারও সাথে কথা বলে না। সে ধীরে ধীরে বাথরুমের দিকে গেল, সযত্নে হাতমুখ ধুয়ে বের হয়ে আসলো। দরজার উপর ঝুলানো সাদা টাওয়ালটা দিয়ে হাত মুছতে মুছতে কাজের ছেলেটিকে বলল, " তুই দাড়িয়ে আছিস কেন? চা টা টেবিলে রেখে চলে যা"। ছেলেটি চায়ের কাপ টেবিলে রাখতে রাখতে বলল, "আপনার চাচা আপনারে একটা চিঠি দিতে বলছেন"। আদনান খানিকটা উৎসাহ নিয়ে বলল, "তার মানে চাচা বাড়িতে নেই"? না নাই- এ কথা শুনেই আদনান দ্রুত একটা সিগারেট ধরাল। কিছু ধোঁয়া জানালার দিকটায় অগ্রসর হল আর কিছু ধোঁয়া মাথার উপরে পাক খেতে লাগল। আদনান বাম হাত ইশারা করে বলল,"চিঠিটা দে দেখি" ছেলেটা চিঠিটা দিয়ে দ্রুত গতিতে রুম ছাড়ল। আদনান চিঠিটা খুলতেই দেখল ভাজ করা কাগজের থেকে এক হাজার টাকার একটি কচকচে নোট বের হয়ে এসেছে। সে টাকাটা পকেটে রেখে অখন্ড মনযোগে চিঠিটি পড়তে শুরু করল- প্রিয় আদনান, আশাকরি ইতোমধ্যেই তুমি সকালের আলো গায়ে মেখে চোখের ঘুম দূর করে দিয়েছ। আমি একটা কাজে আমার এক বন্ধুর বাসায় যাচ্ছি। কাজের কথায় আসি, তুমি আমার সকল নিয়ম সম্পর্কে জ্ঞাত আছো। তুমি জানো আমি সবসময় দুটো কথা বলি- ১) টাকা কোন সস্তা কাগজের টুকরো নয় যা চাইলেই পাওয়া যাও ২) বই পুস্তক দ্বারা অর্জিত শিক্ষা দ্বারা জ্ঞানের ভান্ডার বৃদ্ধি করলেই হয় না বরং তা জীবনের প্রতি মুহূর্তে প্রয়োগ করতে হয়। আমি তোমাকে যে এক হাজার টাকা দিয়েছি তা শুধু শুধু তোমাকে দেইনি। তোমাকে এর বিনিময়ে দুটো কাজ করতে হবে। একটির জন্য তোমাকে করতে হবে শারীরিক পরিশ্রম আর একটির জন্য করতে হবে মানসিক পরিশ্রম। প্রথম কাজ: তুমি আমাদের পুরোনো বাড়িটায় যাবে,সেখানে গিয়ে ভাড়াটিয়েদের কাছ থেকে ভাড়া সংগ্রহ করবে এবং সেখানে দু'দিন অবস্থান করে বাড়িতে যেসব সমস্যাগুলো আছে সেগুলোর সমাধান করবে। দ্বিতীয় কাজ: তোমাকে আমার একটি প্রশ্নের উত্তর বের করতে হবে। এবং উত্তরটি আমার চিঠির পেছনে লিখা ঠিকানায় চিঠি লিখে পাঠাতে হবে। প্রশ্ন: একজন মার দুটো সন্তান। প্রথম সন্তানের বয়স চার এবং দ্বিতীয় সন্তানটির বয়স পাঁচ। দুজনই মৃত্যুশয্যায়। আর তাদের মার কাছে শুধু একটি মাত্র রুটি আছে। এই পুরো একটি রুটি তিনি যেই শিশুটিকে খাওয়াবে শুধু সেই শিশুটিই বাঁচবে। এই ক্ষেত্রে যদি কারো মৃত্যু ঘটে তাহলে কার মৃত্যু ঘটবে? আদনান আমি জানি প্রশ্নটা বেশ কঠিন তবে এটাও জানি এর উত্তর তুমি খুঁজে পাবে। তোমাকে শুধু একটা কথা বলি প্রশ্নটা বেশ ভাল করে লক্ষ করবে। অনেক সময়ই কিছু গুরুত্বপূর্ন ব্যাপার আমাদের চোখে পড়ে না। আবার মাঝে মাঝে আমরা নিজ চোখেও ভুল দেখি কিংবা যা ভাবি তা ঠিক হয় না। যেমন তুমি এখন ভাবছ এমতাবস্থায় তোমার পকেটে তোমার নিজ সম্পদ হিসেবে এক হাজার টাকা আছে কিন্তু তোমাকে দেওয়া আমার পক্ষ থেকে টাকাটা কি সত্যিই এক হাজার কিনা সেই ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। ইতি তোমার চাচা আদনান চিঠিটা পড়েই তাৎক্ষনিক এক হাজার টাকার নোটটা হাতে নিল । বেশ ভালভাবে চোখে পড়ছে একের পেছনে তিনটি শূন্য। তাহলে চাচা কেন বলল সে নিশ্চিত নয়? এটা যে চাচার মানুষকে চিন্তার এক বিশেষ দুর্বিপাকে ফেলবার পছন্দের খেলা এই কথা বুঝতে আদনানের কষ্ট হল না। আদনান খানিকটা সময়ের জন্য টাকার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলল। তার উৎকর্ণ মনযোগ এখন প্রশ্নটিকে ঘিরে। প্রশ্ন পড়ে মনে হচ্ছে একটা শিশুর মৃত্যু ঘটবে কিন্তু কোন শিশু? আচ্ছা মা কি এখনো রুমে আছে? আদনান মাথা ঘুরিয়ে চারপাশটা একবার দেখে নিল। কারও অস্তিত্ব তার চোখে পড়ছে না। কাল্পনিক মার আবার আগমন ঘটলে তাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে ঐ অবস্থায় তিনি থাকলে কি করতেন। আদনান জানালা দিয়ে সরু সরু চোখে বাইরে তাকালো। বৃষ্টির ধারার অবসান চোখে পড়ছে, তার সাথে চোখে পড়ছে টিনের ছাদ থেকে বেয়ে বেয়ে পড়া পানির ফোঁটা.... |২| সালাম মিয়া আদনানের উদ্দেশ্যে এক লম্বা সালাম দিল। আদনান ভারি শান্ত গলায় সালামের জবাব দিয়ে বাড়ির চারপাশটা দেখতে লাগল। তাদের পুরোনো বাড়িটা বেশ সুন্দর। বড় বড় লালচে দেয়ালে ঘেরা টিনসেড ঘর,ঘরের সামনে প্রশস্ত উঠোনে সারি ধরে ছোট ছোট ফুলের গাছ আর মেইন দরজার একপাশে একটি বড় আম গাছ, গাছের ডালপালাগুলো ঝুকে পড়েছে রাস্তার দিকে। আদনান সালাম মিয়ার দিকে না তাকিয়েই বলল,"আপনি এই বাড়ি দেখাশোনা করেন তাই তো?" সালাম মিয়া নিচু গলায় উত্তর দিল,"জ্বি আমিই দেখাশোনা করি। - আমি কি কাজে এসেছি তা জানেন তো? - জ্বি জানি,আপনার চাচা আমায় সব বলছেন। - এখন এই বাড়ির বিবরন আমায় দিন। - এই বাড়িতে মোট পাঁচটা রুম,দুইটা রুম নিয়া একটা পরিবার ভাড়া থাকে, আর এক রুমে ব্যাচেলর দুই জন ভাড়া থাকে আর একটায় আমি থাকি আর একটা ফাকা থাকে। - ফাকা রুমটায় নিশ্চয়ই আজ আমি থাকব? - জ্বি ঐ রুমটা আপনার জন্য পুরা রেডি কইরা রাখছি। হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসা চিৎকারে আদনান এবং সালাম মিয়ার কথোপকথনের অবসান ঘটল। সালাম মিয়া দ্রুত পায়ে পশ্চিমের ঘরগুলোর দিকে এগিয়ে গেল,আদনানও তার পিছু পিছু অগ্রসর হচ্ছে। পশ্চিমের কোণার ঘরটায় ধুকতেই আদনান দেখল একটা নয় দশ বছরের ছেলে তার মার কাছে কষে চড় খাচ্ছে। আর ঘরের একপাশে বিছানায় শুয়ে আছে রোগাক্রান্ত এক ছোট ছেলে,মাথায় ভেজা কাপড়ের পট্টি আর শরীরে মোটা নকশী কাঁথা। সালাম মিয়া ছেলেটিকে মারের হাত থেকে বাঁচাল। হ্যাঁচকা টান দিয়ে নিয়ে এলো ঘরের উঠোনের দিকে। আদনানও তার পিছু পিছু চলে এলো। ছেলেটি এখনো কাঁদছে,নরম গাল বেয়ে বেয়ে চোখের জল পড়ছে। মুখে বিরক্তিকর চিহ্ন নিয়ে সালাম মিয়া ছেলেটিকে বলল,"চুপ কর আর কাঁদিস না। ছেলেটিও বিড়বিড় করে কি যেন উত্তর দিল আদনানের কান অব্দি তা পৌছাল না। সালাম মিয়া সামান্য অস্বস্তি নিয়ে আদনানকে বলল," এই পোলার একটু সমস্যা আছে"। আদনান ভুরু কুঁচকে বলল,"কি সমস্যা"? - কয়েকদিন আগে রাতেরবেলা উঠানে পাইচারি করতাছিল হঠাৎ নাকি ও দেখছে ঐ বড় আমগাছ থেকা কি জানি একটা লাফ দিয়া রাস্তায় পড়ছে,তারপর ভীষন ভয় পাইছে,মাঝে মধ্যেই ভয়ে চিৎকার দিয়া উঠে অমনি ওর মা ও রাইগা যায়, দেয় ধইরা মাইর। - কি পড়তে পারে আমগাছ থেকে? - ও তো কয় ভূত কিন্তু আমি এসব ভূত তূতে বিশ্বাস করি না। আদনান ছেলেটির কাঁধে হাত রেখে বলল,"তোমার নাম কি"? ছেলেটি ভীষন শান্ত গলায় উত্তর দিল,"রাজু আমার নাম"। আদনান বলল,"ভয় নেই আজ রাতে আমি এখানেই থাকব,আমি তুমি আর সালাম মিয়া দেখব কোন সেই ভূত"। আদনানের কথা শুনে ছেলেটির চোখমুখ থেকে ভয়ের চিহ্ন চলে গেল। আদনানের ভেতর ও এক ধরনের উৎসাহ কাজ করছে। অন্যদিকে সালাম মিয়া তার মোটা মোটা আঙ্গুল দিয়ে দাড়ি গোঁফে বিলি কাটছে। |৩| সময় রাত নয়টা। আদনান,রাজু আর সালাম মিয়া উঠোনে চেয়ার পেতে বসে আছে। উঠোনে কোন আলোর ব্যবস্থা নেই,চারিদিকে থমথমে অন্ধকার। শীতল হাওয়া বইছে তবুও রাজু ধীরে ধীরে ঘামছে,ভেতরে এক অদ্ভুত ধরনের ভয় কাজ করছে। আদানান বেশ ভালভাবে ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে। সে ভয় কাটাবার চিন্তা ভাবনা করছে। গভীর আলোচনায় ডুবে গেলে কেমন হয়? একবার আলোচনায় ডুবে গেলে ছেলেটির ভয় কেটে যাবে তারসাথে সামান্য আনন্দও পাবে। কিন্তু তা আর হলো না। হঠাৎ বড় আম গাছটার দিকে বিস্তীর্ণ হাওয়া খেলতে লাগল। সকলের দৃষ্টি নিবদ্ধ হল আম গাছটার দিকে। গাছের ডালপালাগুলো হাওয়ায় ঢুলতে লাগল। ধপ্ করে কি যেন দল বেধে নেমে পড়ল রাস্তার দিকে। আদনানের কানে ভেসে এলো অস্থিরভাবে দৌড়ানোর শব্দ। সালাম মিয়া ভয়ে আঁতকে উঠল,বিড়বিড় করে দোয়া পড়তে লাগল। রাজু চিৎকার দিয়ে চিৎপাত হয়ে পড়ে গেল, ঠক্ করে লাগল মাথা মাটিতে। হুলস্থুল কান্ড বেধে গেল, ঘর থেকে বের হয়ে এলো রাজুর মা। সালাম মিয়া আর রাজুর মা সযত্নে রাজুকে তুলে নিয়ে গেল ঘরে। আদনান এখনো ভুরু কোঁচকানো সরু সরু চোখে তাকিয়ে আছে আম গাছটার দিকে। হঠাৎ সে ঠোঁটের কোণায় মৃদু হাসি নিয়ে বিড়বিড় করে কবিতার দুটো লাইন বলতে লাগল, "পেঁচার ধূসর পাখা উড়ে যায় নক্ষত্রের পানে জলা মাঠ ছেড়ে দিয়ে চাঁদের আহবানে" রাত বারোটা বাজে এখনো রাজুর জ্ঞান ফিরেনি। রাজুর মা বিরতিহীনভাবে কাঁদছে। আদনান আর সালাম মিয়া উঠোনে গা ছেড়ে দিয়ে বসে আছে চেয়ারে। আদনান ক্লান্ত স্বরে সালাম মিয়াকে বলল,"চাচা বলেছিলেন বাড়িতে কিছু সমস্যা আছে"। সালাম মিয়া হ্যাঁ সূচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়িয়ে বলল,"জ্বি উঠোনো কোন বাতি নাই আর আমগাছের আমগুলা চুরি হইয়া যায় এই দুইটা সমস্যাই আছে"। - আচ্ছা আমি কাল সব ব্যবস্থা করব আর আপনি এক কাজ করবেন ভাড়াটিয়েদের কাছ থেকে ভাড়া সংগ্রহ করে রাখবেন। সালাম মিয়া এক শব্দে উত্তর দিল,"আচ্ছা"। আদনানের চোখ ঘুমে ঢুলে আসছে, রাজ্যের ক্লান্তি শরীরের ভেতর অনুভূত হচ্ছে। চোখটা বন্ধ করে মাথা হেলিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে পেছনে। হঠাৎ রাজুর মার উচ্চস্বর ভেসে এলো ঘর থেকে। তাৎক্ষনিক আদনান এবং সালাম মিয়া চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়াল, দ্রুত পা বাড়াল পশ্চিমের ঘরের দিকে। "রাজুর জ্ঞান ফিরেছে কিন্তু শরীরে বেশ ভাল জ্বর,মাথায় পানি ঢালতে হবে"- রাজুর মার মুখ থেকে এ কথা শুনে আদনান সালাম মিয়াকে ইশারা করল পানির ব্যবস্থা করতে। ঘুণে খাওয়া পুরোনো কাঠের দরজাটা ধরে দাড়িয়ে আছে আদনান। সে নিজ চোখে দেখছে এক করুণ দৃশ্য। যা দেখলে ঘুমে ঢুলে আসা চোখ দুটোও জাগ্রত হয়ে ওঠে, মনের অন্তঃস্থে এক অসহ্য যন্ত্রনা কড়া নাড়ে,বোবা প্রকৃতি হতে বয়ে আসা নিরবতা প্রবেশ করে নিজের ভেতরে। প্রশস্ত রুমটার দুই ধারে পাতানো নরম ও উষ্ণ বিছানায় শুয়ে আছে রোগাক্রান্ত দুই ছেলে আর ঘরের মাঝখানটায় কাতর হয়ে এক অস্থির আশঙ্কায় কাঁদছে তাদের মা। হঠাৎ রাজুর মা কান্না ভরা গলায় বিলাপ করতে লাগল,"রাজু অনেক ভয় পেয়েছিল,কি সব যেন বলল ভূত দেখেছে,হুজুরের কাছে যাবে হুজুর গায়ে ফুঁ দিয়ে দিলে ভূত আর আসবেনা হাবিজাবি,অকে অবহেলা করেছিলাম আজ ছেলেটা অসুস্থ হয়ে পড়ল, দুটোছেলেই আমার ভীষন অসুস্থ কি করব এখন আমি!!" আদনান শান্ত গলায় বলল,"আপনাকে যদি একটা প্রশ্ন করি আপনি কি উত্তর দিতে পারবেন"? রাজুর মা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,"কি প্রশ্ন"? আদনান বলতে লাগল- ধরুন আপনার দুই ছেলেই মৃত্যুশয্যায়, আপনার কাছে একটি রুটি আছে,এই রুটিটি আপনি আপনার যেই ছেলেকে খাওয়াবেন শুধুমাত্র সেই ছেলেটিই বাঁচবে,আপনি তখন কি করবেন"? রাজুর মা অবাক হয়ে গেল, খানিকটা চটে গিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,"কি বলছেন আপনি এসব? আপনি আমার ভয় বাড়িয়ে দিচ্ছেন। তিনি আবারো কাঁদতে শুরু করলেন ,খানিকটা উচ্চস্বরে বলে উঠলেন,"আমি কাউকে মরতে দেব না,কাউকে না"। তার কন্ঠে উচ্চারিত সেই বাক্য ছন্দের তালে তালে ঢেউয়ের মত আছড়ে পড়ল দেয়ালে দেয়ালে... আদনান ঘর ছেড়ে উঠোনে এসে দাড়িয়েছে। সে অসহ্য এক যন্ত্রনায় বোবা হয়ে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। তারা ভরা বিস্তিত আকাশের মাঝে সে তার মাকে খুঁজছে। মা যদি থাকে জ্বলজলে তারার রুপে। আদনানের মাকে বলতে ইচ্ছে করছে- মা আমি চাচার সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছি। মা কে জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে করছে- মা তুমি যদি ঐ জায়গায় থাকতে তবে তুমি কি করতে? |৪| আদনান বড় রাস্তার ধারে দাড়িয়ে আছে। তার এখন মনে পড়ছে তার চাচার পছন্দের সেই বাণী- "বই পুস্তক দ্বারা অর্জিত শিক্ষা দ্বারা জ্ঞানের ভান্ডার বৃদ্ধি করলেই হয় না বরং তা জীবনের প্রতি মুহূর্তে প্রয়োগ করতে হয়।" আদনানকে এখন তাই করতে হবে তাকে তার সংক্ষিপ্ত ছাত্র জীবনে শেখা প্লাস মাইনাসের সূত্র প্রয়োগ করে রাজুর এবং বাড়ির সমস্যাগুলো দূর করতে হবে। তার মগজে খেলা করছে এখন সূত্রের খেলা। প্লাস মাইনাসের সূত্র। প্লাসে মাইনাসে মাইনাস, মাইনাসে মাইনাসে প্লাস। তাকে মাইনাস হিসেবে পরপর দুটো নেগেটিভ কাজ করতে হবে অতঃপর পাওয়া যাবে কাঙ্খিত প্লাস। ইতোমধ্যেই সে একটা নেগেটিভ কাজ খুঁজে পেয়েছে। আদনানের পকেটে এখন একটি এক হাজার টাকার কচকচে নোট। সব টাকা খরচ করা যাবে না। কম দামে সস্তা একটি লাইট আর নেট কিনতে হবে। এই কাজটা নেগেটিভ হিসেবে ধরা যায়। রাস্তার ধারে টেবিল চেয়ার পেতে কয়েকজন লাইট বিক্রি করছে। তাদের লাইটের বিজ্ঞাপন তাদের বাজানো এক ইলেকট্রিক যন্ত্র থেকে ঢেউয়ের মতো ভেসে আসছে- ৩০০ টাকার এনার্জি লাইট মাত্র ১০০টাকা। ৭০% ডিসকাউন্টে পাচ্ছেন। হ্যা ভাই শুধু মাত্র কোম্পানির প্রচারের জন্য, ছয় মাসের ওয়ারুন্টি সহ পাচ্ছেন স্টার এনার্জি লাইট.... সস্তায় এই লাইট কেনা যেতে পারে অন্তত ছয়মাস নিশ্চিন্তে ব্যবহার করা যাবে। আদনান পকেট থেকে এক হাজার টাকা বের করল, আরো একবার বেশ ভাল করে লক্ষ করল চকচকে নোটটায় একের পেছনে তিনটি শূন্য। সে লাইট কিনে বাকি নয়শ টাকা পকেটে রাখল। কিছু দূর যাওয়ার পর সে দোকান থেকে সস্তায় কয়েক গজ নেট কিনল। তার পকেটে এখন ৬০০টাকা আছে। সে ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটছে। তার সম্পূর্ন চিন্তাভাবনা এখন আর একটা নেগেটিভ কাজের লক্ষে। হঠাৎ এক বৃদ্ধলোক তার দিকে হাত পেতে দিয়ে ক্লান্ত স্বরে বলল,"সকালে কিছু খাইনাই পেটে বহুত ক্ষুধা কিছু টাকা দাও"। আদনান ভুরু কুঁচকে লোকটির দিকে তাকালো। উস্কখুস্ক চেহারার লোক,গায়ে ছেড়া পান্জাবি,বয়সের কারনে রোগাক্রান্ত দেহটি নুয়ে পড়েছে সামনের দিকে। নেগেটিভ আরও একটি কাজের ধারনা আদনানের মস্তিষ্কে কড়া নাড়ল। সে বৃদ্ধ লোকটিকে বলল, আমার সাথে আমার বাসায় যাবেন? সকালের নাস্তা খাবেন,দুপুরেরটাও খেতে দিব শুধু একটা কাজ করতে হবে"। বৃদ্ধ লোকটি বলল," কি কাজ"? - তেমন কিছুনা আমি আপনার ব্যাপারে একজনকে কিছু কথা বলব আপনি শুধু মাথা নাড়াবেন আর আমার সাথে সাথে একটু তাল মেলাবেন, চিন্তা করবেন না আপনার কোন ক্ষতি হবে না। বৃদ্ধ লোকটি অদ্ভুত এক হাসি দিয়ে বলল,"এই বয়সে ক্ষতির ভয় আমি করিনা ,আমি তোমার কথায় রাজি"। আদনান লোকটিকে নিয়ে বাসার দিকে হাঁটছে। একটা নেগেটিভ কাজ করা শেষ আর একটা বাকি। সেটা করার পর যদি রাজুর মনের ভেতরকার ভয় দূর হয় তবে সেটাই হবে কাঙ্খিত প্লাস। ঘন্টার কাঁটা বারোটার ঘরে ঘুরছে। আকাশে উত্তপ্ত সূর্য। সকালথেকেই রৌদ্রছায়ার খেলা চলছে। কখনো রোদ কখনো ছায়া কখনো আবার মনে হয় এই বুঝি বৃষ্টি এলো। রাজুর জ্বর কমেছে। এই অসহ্য গরমেও সে কষ্ট করে বসে আছে উঠোনে। সালাম মিয়ার মুখে ভূত তাড়ানোর কথা শুনে উৎসাহ নিয়ে সে এসেছে দেখতে। আদনানের এক হাতে লাইট আর এক হাতে নেট। আর সালাম মিয়ার চোখে মুখে অবাক বিস্ময় । উঠোনো বিছানো সাদা চাদরটায় আদনানের সঙ্গে আসা বৃদ্ধ লোকটি বসে আছে। আদনান রাজুকে উদ্দেশ্য করে বলল- কি রাজু রেডি তো? এখনই শুরু হবে ভূত তারানো, এই যে লোকটিকে দেখছ?উনার নাম ভূত বাবা, উনি ভূত তাড়ান,কত কত ভূত যে উনি বোতলে আটকে মাটি চাপা দিয়েছেন তার হিসেব নেই তাই না বাবা?- এ কথা শুনতেই বৃদ্ধ লোকটি দু'বার হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়াল। আদনান লাইট আর নেট টি দুহাতে তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,"এই নিন এই দুটো জিনিসে ফুঁ দিয়ে দিন, লাইট টা উঠোনে লাগানো হবে আর নেট টা দিয়ে গাছের ভূতগুলোকে আটকে রাখা হবে যাতে আর বের হতে না পারে, আর এই লাইটের কারনে কখনো তাদের আর দেখা যাবেনা কারন তারা আলো ভয় পায়"। বৃদ্ধ লোকটি পীর পীর ভাব নিয়ে জোরে জোরে দু'বার ফুঁ দিল। আর উচ্চস্বরে বলল,"ভূতের যত শক্তি হইয়া যাইব বন্ধি"। আদনান লাইট আর নেট সালাম মিয়াকে দিয়ে বলল, যান উঠোনে লাইট লাগানোর ব্যবস্থা করুন আর রাস্তার দিকে গাছের যেসব ডালপালাগুলো ঝুকে পড়েছে সেগুলো নেট দিয়ে আটকে দিবেন।" সালাম মিয়া বিড়বিড় করে বললেন,"এতে কি ভূত সত্যিই আটকা পড়ব"? আদনান ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি নিয়ে বলল," নাহ এতে উঠোনে আলোর ব্যবস্থা হবে আর গাছের আম চুরি হওয়া বন্ধ হবে,যারা সেদিন গাছ থেকে রাস্তার দিকে নেমেছিল তারা ছিল আম চোর।" কথাগুলো যেন সালাম মিয়ার মাথার উপর দিয়ে চলে গেল,সে অবাক হয়ে দাড়ি গোঁফে বিলি কাঁটতে শুরু করলেন... |৫| আদনান পুরোনো বাড়ি থেকে বের হয়ে রাস্তায় পা রাখল। ক্ষনেক্ষনে সে তার বাসার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বাসায় গিয়ে কাগজ কলম নিয়ে চাচাকে চিঠি লিখতে হবে। তার আগে মাথায় সাজাতে হবে প্রতিটি বাক্য। আদনান হাঁটতে হাঁটতে বাক্যগুলো সাজাতে শুরু করল- প্রিয় চাচা, আমি আপনার দেওয়া কাজ যথাযতভাবে সম্পন্ন করেছি। বাড়ির সমস্যাগুলোর সমাধান করেছি,আসার সময় সালাম মিয়ার কাছ থেকে ভাড়া সংগ্রহ করেছি। আর সেই কঠিন প্রশ্নটির উত্তর খুঁজে পেয়েছি। প্রশ্নটি যতটা কঠিন ঠিক ততটাই সোজা। আপনি ঠিকই বলেছেন মাঝে মাঝে গুরুত্বপূর্ন কিছু ব্যাপার মানুষের চোখে পড়ে না। বেশিরভাগ মানুষই এই প্রশ্নটা পড়ার পর প্রথমে চিন্তা করবে কোন শিশুর মৃত্যু ঘটবে কিন্তু মজার ব্যাপার এখানে একবারও বলা হয়নি কোন শিশুর মৃত্যু ঘটবে,শুধু বলা হয়েছে কার মৃত্যু ঘটবে। এই প্রশ্নে মোট তিনজনের কথা উল্লেখ আছে,দুইটা শিশু আর তাদের মা,তাই তিনজনের মধ্যে যে কোন জনেরই মৃত্যু ঘটতে পারে। কিন্তু একজন মা কখনই তার একটি শিশু কে বাঁচাবে না বরং সে তার জান প্রান দিয়ে হলেও দুই শিশুকে বাঁচাবে সেই ক্ষেত্রে মৃত্যু ঘটলে শুধুমাত্র মার মৃত্যুই ঘটবে। আমি সযত্নে আপনার.. আচ্ছা সযত্নে বানান যেন কি? আদনান গভীরভাবে ভাবতে লাগল, স এর নিচে কি ব নাকি শুধু স? হঠাৎ বানানের কথাই বা কেন মনে পড়ল?মনের খাতায় লিখতে তো বানানের প্রয়োজন হয় না। এসব এখন চিন্তা করতে ভাল লাগছেনা। বাসায় গিয়ে ধীরে সুস্থে লিখা যাবে। আদনান কোঁদাল ভর্তি ময়লার মত এসব চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে শুরু করল। সে পকেটে হাত দিতেই মনে পড়ল তার কাছে এখন ছয়শ টাকা আছে। সে আরও একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেল। এ কারনেই তার চাচা বলেছিল তাকে দেওয়া টাকাটা কি সত্যিই এক হাজার কিনা সে ব্যাপারে সে নিশ্চিত নয়। আদনান ঠোঁটের কোণে এক মৃদু হাসি নিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল- সত্যিই টাকা কোন সস্তা কাগজের টুকরো নয় যা চাইলেই পাওয়া যায়....


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২৯ জন


এ জাতীয় গল্প

→ আদনান এবং প্রশ্ন রহস
→ আদনান এবং প্রশ্ন রহস

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now