বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

বোকা সাথী

"মজার গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান MD.Belal Hosan (০ পয়েন্ট)

X এক নাপিত। তার সঙ্গে এক তাঁতীর খুব ভাব। নাপিত লোককে কামাইয়া বেশি পয়সা উপার্যন করিতে পারে না। তাঁতি কাপড় বুনিয়া বেশি লাভ করিতে পারে না। দুই জনেরই খুব টানাটানি। আর টানাটানি বলিয়া কাহারও বউ কাহাকে দেখিতে পারে না। এটা কিনিয়া আন নাই, ওটা কিনয়িা আন নাই বলিয়া বউরা দিনরাই কেবল মিটির মিটির করে। কাতই আর ইহা সহ্য করা যায়। একদিন তাঁতি যাইয়া নাপিতকে বলিল, ‘বউ এর জ্বালায় আর ত বাড়িতে টিকিতে পারি না’। নাপিত জবাব দিল, ‘ভাইরে ! আমারও সেই কথা। দেখনা আজ পিছার (ঝাড়ু) বাড়ি দিয়া আমার পিঠের ছাল আর রাখে নাই’। তাঁতি জিজ্ঞাসা করে, ‘ আচ্ছা ভাই, ইহার কোন বিহিত কারা যায় না?’। নাপিত বলে, ‘চল ভাই, আমরা দেশ ছাড়িয়া বিদেশে চলিয়া যাই। যেখানে বউরা আমাদের খুজিয়াও পাইবে না; আর জ্বালাতনও করিতে পারিবে না’। সত্যি সত্যিই একদিন তাহারা দেশ ছাড়িয়া পালাইয়া চলিল। এদেশ ছাড়াইয়া ওদেশ ছাড়াইয়া যাইতে যাইতে তাহারা এক বিজন বন-জঙ্গলের মধ্যে আসিয়া পড়িল। এমন সময় হালুম হালুম করিয়া এক বাঘ আসিয়া তাদের সামনে খাড়া। ভয়ে তাঁতি ত ঠির ঠির করিয়া কাপিতেছে। নাপিত তাড়াতাড়ি তার ঝুলি হইতে একখানা আয়না বাহির করিয়া বাঘের মুখের সামনে ধরিয়া বলিল, ‘এই বাঘটা ত আগেই ধরিয়াছি। তাঁতী ! তুই দড়ি বাহির কর- সমনের বাঘটাকেও বাঁধিয়া ফেলি’। বাঘ আয়নার মধ্যে তার নিজের ছবি দেখিয়া ভাবিল, ‘এরা না জানি কতবড় পালোয়ান। একটা বাঘকে ধরিয়া রাখিয়াছে। আবার আমাকেও বাঁধিয়া রাখিতে দড়ি বাহির করিতেছে’। এই না ভাবিয়া বাঘ লেজ উঠাইয়া দে চম্পট। তাঁতি তখনো ঠির ঠির করিয়া কাঁপিতেছে। বনের মধ্যে আঁধার করিয়া রাত আসিল। ধারে কাছে কোন ঘর বাড়ি নাই। সেখানে দাঁড়াইয়া থাকিলে বাঘের পেটে যাইতে হবে। সামনে ছিল এক বড় গাছ। দউজনে যুক্তি করিয়া সেই গাঠে উঠিয়া পড়িল। এদিকে হইয়াছে কি? সেই যে বাঘ ভয় পাইয়া পালাইয়া গিয়াছিল, সে যাইয়া আর বাঘদের বলিল, ‘অমুক গাছের তলায় দুইজন পালোয়ান আসিয়াছে। তাহারা একটা বাঘকে ধরিয়া রাখিয়াছে। আমাকেও বাঁধিতে দড়ি বাহির করিতেছিল। এই অবসরে আমি পালাইয়া আসিয়াছি। তোমরা কেহ ওপথ দিয়া যাইও না’। বাঘদের মধ্যে যে মোড়ল- সেই জাঁদরেল বাঘ বলিল, ‘কিসের পালোয়ান? মানুষ কি বাঘের সাথে পারে? চল সকলে মিলিয়া দেখিয়া আসি’ জঙ্গী বাঘ-সিঙ্গিবাঘ-মামুদ বাঘ- খুতখুতে বাঘ-কুতকুতে বাঘ, সকল বাঘ তর্জন-গর্জণ করিয়া সেই গাছের তলায় আসিয়া পৌছিল। একে ত রাত অন্ধারী, তার উপর বাঘের হুঙ্কার- অন্ধকারে জোড়া জোড়া বাঘের চোখ জ্বলিতেছে। তাই না দেখিয়া তাঁতি ত ভয়ে কাঁপিয়া অস্থির। নাপিত যত বলে- ‘তাঁতী এক সাহসে ভর কর!’ তাঁতী ততই কাপেঁ। তখন নাপিত দড়ি দিয়া তাঁতীকে গাছেল ডালের সঙ্গে বাঁধিয়া রাখিল’। কিন্তু তাহারা গাছের আগডালে আছে বলিয়া বাঘ তাহাদের নাগাল পাইতেছে না। তখন জাঁদরেল বাঘ আর সব বাঘদের বলিল, ‘দেখ তোরা একজন আমার পিঠে ওঠে-তার পিঠে আরেক জন ওঠ- তার পিঠে আরেক জন ওঠ-এমন কলিয়া উপরে উঠিয়া হাতের থাবা দিয়া এই লোক দু’টোকে নামাইয়া লইয়া আয়’। এই ভাবে একজনের ঠিঠে আর একজন তার পিঠে আর একজন করিয়া যেই উপরের বাঘটি তাঁতিকে ছুতে যাইবে, অমনি ভয়ে ঠির ঠির করিয়া কাঁপিতে কাঁপিতে দড়িসমতে তাঁতী ত মাটিতে পড়িয়া গিয়োছে। উপরের ডাল হইতে নাপিত বলিল- ‘তাঁতী তুই দড়ি দিয়া মাটির উপর হইতে জাঁদরেল বাঘটিকে আগে বাধ, আমি উপরের দিক হইতে একটা একটা করিয়া সবগুলি বাঘকে বাঁধিতেছি’। এই কথা শুনিয়া নিচের বাঘ ভবিল আমাকেই ত আগে বাঁধিতে আসিবে। তখন সে লেজ উঁচাইয়া দে দৌড়- তখন এ বাঘের উপর পড়ে ও বাঘ, সে বাঘের উপর পড়ে আরেক বাঘ। নাপিত উপর হইতে বলে, ‘ জোলা মজবুত করিয়া বাঁধ- মজবুত করিয়া বাঁধ। একটা বাঘও যেন পালাইতে না পারে’। সব বাঘ তখন পালাইয়া সাফ। বাকি রাত টুকু কোনরকমে পাড় করিয়া পরদিন সকাল হইলে তাঁতী আর নাপিত বন ছাড়াইয়া আর এক রাজার রাজ্যে আসিয়া উপস্থিত হইল। রাজা রাজসভায় বসিয়া আছেন। এমন সময় নাপিত তাঁতীকে সঙ্গে লইয়া রাজার সামনে যাইয়া হজির। ‘মহারাজ প্রণাম হই’। রাজা বলিল, ‘ কি চাও তোমরা?’ নাপিত বলিল’ ‘আমরা দুইজন বীর পালোয়ান। আপনার এখানে চাকুরি চাই’। রাজা বলিলেন, ‘তেমারা কেমন বীর তা পরখ না করিলে ত চাকরি দিতে পারি না? আমার রাজবাড়িতে আছে দশজন কুস্তিগীর, তাহাদের যদি কুস্তিতে হারাইতে পার তবে চাকরি মিলিবে’। নাপিত বলিল, ‘মহারাজের আর্শিবাদে নিশ্চয় তাহাদের হারাইয়া দিব’। তখন রাজা কুস্তি পরখের একটি দিন স্থির কলিয়া দিলেন। নাপিত বলিল, ‘মাহারাজ ! কুস্তি দেখিবার জন্য ত কত লোক আসবে, কত মজা হইবে। মাঠের মধ্যে একখানা ঘর তৈরী করিয়া দেন। যদি বৃষ্টি-বাদল হয়, লোকজন সেখানে যাইয়া আশ্রয় লাইবে’। রাজার আদেশে মাঠের মধ্যে প্রকান্ড খড়ের ঘর তৈরী হইল। রাতে নাপিত চুপি চুপি যাইয়া তাহার ক্ষুর দিয়া ঘরের সমস্ত বাঁধন কাটিয়া দিল। প্রকান্ড খড়ের ঘর কোনরকমে খামের উপর খাড়া হইয়া রহিল। পরের দিন কুস্তি দেখিতে হাজার হাজার লোক জমা জইয়াছে। রাজা আসিয়াছেন- রানী আসিয়াছেন- মন্ত্রী, কোটাল, পাত্রমিত্র কেহ কোথাও বাদ নাই। মঠের মধ্যখানে রাজাবাড়ির বড় বড় কুস্তিগীরেরা গায়ে মাটি মাখাইয়া লড়াইয়ের সমস্ত কায়দাগুলি ইস্তেমাল করিতেছে। এমন সময় কুস্তিগীরের পোশাক পরিয়া নাপিত আর তাঁতী মাঠের মধ্যখানে উপস্থিত। চারিদিকে লোক তাহাদের দেখিয়া হাততালি দিয়া উঠিল। নাপিত তখন তাঁতীকে সঙ্গে করিয়া লাফাইয়া একবার একদিকে যায় আবার ওদিকে যায়। আর ঘরের এক একখানা চালা ধরিয়া টান দেয়। হুমড়ি খাইয়া ঘর পড়িয়া যায়। সভার সব লোক অবাক। রাজবাড়ির কুস্তিগীরেরা ভাবে ‘হায় হায় না জানি ইহারা কত বড় পালোয়ান। হাতের এক ঝাঁকুনি দিয়া এত বড় আটচালা ঘরখানা ভাঙ্গিয়া ফেলিল। ইহাদের সঙ্গে লড়িতে গেলে ঘরেরই মত উহারা আমাদের হাত-পাগুলো ভাঙ্গিয়া ফেলিবে। চল আমরা পালাইয়া যাই’। তাহারা পালাইয়া গেলে নাপিত তখন মাঠের মধ্যখানে দাঁড়াইয়া বুক ফুলাইয়া রাজাকে বলিল, ‘মহারাজ ! জলদি করিয়া আপনার পালোয়ানদের ডাকুন দেখি ! তাগাদের কার গায়ে কত জোর’। কিন্তু কে কার সঙ্গে কুস্তি করে? তাহারা ত আগেই পালাইয়াছে। রাজা তখন নাপিত আর তাঁতীকে তাঁর রাজ্যের সেনাপতি নিযুক্ত করিলেন। সেনাপতির চাকরি পাইয়া তাঁতী আর নাপিত ত বেশ সুখেই আছে। এর মধ্যে কোথা হইতে এক বাঘ আসিয়া রাজ্যে মহা উৎপাত লাগাইয়াছে। কাল এর ছাগল লইয়া যায়, পরশু ওর গরু লইয়া যায়, তারপর মানুষও লইয়া যাইতে লাগিল। রাজা তখন নাপিত আর তাঁতীকে বলিল, ‘ তোমরা যদি এই বাঘ মারিতে পার তবে আমার দুই মেয়ের সঙ্গে তোমাদের দুই জনের বিবাহ দিব’। নাপিত বলিল, এর আর এমন কঠিন কাজ কি? অবে আমাকে পাঁচ মন ওজনের একটি বড়শি আর গোটা অস্টেক পাঁঠা দিতে হইবে। রাজার আদেশে পাঁচমন ওজনের একটি লোহার বড়শি তৈরি হইল। নাপিত তখন লোকজনের নিকট হইতে জানিয়া লইল. কোথায় বাঘের উপদ্রব বেশি, আর কোন সময় বাঘ আসে। তারপর নাপিত সেই বড়শির সঙ্গে সাত-আটটা পাঁঠা গাঁথিয়া এক গাছির লোহার শিকলে সেই বড়শি আটকাইয়া এক গাছের সঙ্গে বাঁধিয়া রাখিল। তারপর তাঁতীকে সঙ্গে লইয়া গাছের আগ ডালে উঠিয়া বসিয়া রহিল। অনেক রাতে বাঘ আসিয়া সেই বড়শি সমতে পাঠা গিলিতে লাগিল। গিলিতে গিলিতে গলায় বড়শি আটকাইয়া গিয়া তর্জন-গর্জন করিতে লাগিল। সকাল হইলে লোকজন ডাকাইয়া নাপিত আর তাঁতি লাঠির আঘাতে মাঘটিকে মারিয়া ফেলিল। এ খবর শুনিয়া রাজা ভারী খুশী। তারপর ঢোল-ডগর বাজাইয়া নাপিত আর তাঁতীর সঙ্গে দুই মেয়ের বিবাহ দিয়া দিল। বিবাহের পরে বউ লইয়া বাসর ঘরে যাইতে হয়। তাঁতী একা বাসর ঘরে যাইতে ভয় পায়। নাপিতকে সঙ্গে যাইতে অনুরোধ করে। নাপিত বলে, ‘বেটা তাঁতী! তোর বাসর ঘর আমি যাইব কেমন করিয়া ? আমাকে ত আমার বউ এর সঙ্গে ভিন্ন বাসর ঘরে যাইতে হইবে। তুই কোন ভয় করিস না। খুব সাহসের সঙ্গে থাকবি’। এই বলিয়া তাহাকে বাসর ঘরের মধ্যে ঠেলিয়া দিল। বাসর ঘরে যাইয়া তাঁতী এদিক চায়-ওদিক চায়। আহা হা কত ঝাড়-কত লণ্ঠন ঝিকিমিকি জ্বলিতেছে। আর বিছানা ভরিয়া কত রঙ্গের ফুল। তাঁতী কোথায় বসিবে তাহাই ঠিক করিতে পারে না। তখন অতি শরমে পাপোশখানার উপর কুচিমুচি হইয়া বসিয়া তাঁতী ঘামিতে লাগিল। কিছুক্ষণ পরে পানের বাটা লইয়া, পায়ে সোনার নুপুর ঝুমুর ঝুমুর বাজাইয়া পঞ্চসখী সঙ্গে করিয়া রাজকন্যা আসিয়া উপস্থিত। তাঁতী তখন ভয়ে জড়সড় । সে মনে করিল, হিন্দুদের কোন দেবতা যেন তাহাকে কাটিতে অসিয়াছে। সে তখন তাড়াতাড়ি উঠিয়া রাজকন্যার পায়ে পড়িয়া বলিল, ‘মা ঠাকরুন ! আমার কোন অপরাধ নাই। সকলই নাপিত বেটার কারসাজি’। রাজকন্যা সকলই বুঝিতে পারিল। কথা রাজার কানেও গেল। রাজা তখন তাঁতী আর নাপিতকে তাড়াইয়া দিলেন। নাপিত রাগিয়া বলে, ‘বোকা তাঁতী। তোর বোকামীর জন্য অমন চাকুরিটাত গেলই- সেই সঙ্গে রাজকন্যাও গেল। তাঁতী নাপিতকে জড়াই ধরিয়া বলিল, ‘তা গেল ! চল ভাই , দেশে যাইয়া বউদের লাথি গুতা খাই। সেত গা সওয়া হইয়া গিয়াছে। এমন সন্দেহ আর ভয়ের মধ্যে থাকার চাইতে সেই ভাল’। মূলঃ বাঙ্গালীর হাসির গল্প-পল্লীকবি জসীমউদ্দীন


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১০১ জন


এ জাতীয় গল্প

→ বোকা সাথী
→ বোকা সাথী
→ বোকা সাথী

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now

৯.ককেশাসের পাহাড়ে (২)

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান আরাফাত হোসেন (০ পয়েন্ট)

X সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার পিতা সেন্ট জর্জ সাইমনের বাড়ি। সময় তখন ৫টা। এই মাত্র সে বাইরে থেকে ফিরল। বাথরুমে গিয়েছিল। হাত-মুখ ধুয়ে বাথরুমে থেকে বেরুতেই সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার মা এলিজাবেথ বলল, তোমার মেয়ের যেন কি হয়েছে। -কার, সোফিয়ার? কি হয়েছে? -জানি না, সেই ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করেছে, আর খুলেনি। সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা জর্জ সাইমন ও এলিজাবেথের একমাত্র সন্তান। স্ত্রীর কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে গেল জর্জ সাইমনের। উদ্বেগ ফুটে উঠল তার চোখে-মুখে। বলল, তুমি ডাকনি এলিজা? -অনেক ডেকেছি। -অসুখ করেনি তো? -অসুখ করলে দরজা বন্ধ করবে কেন? ‘চল তো দেখি’ বলে জর্জ সাইমন সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার ঘরের দিকে চলল। পেছনে সোফিয়ার মা। সোফিয়ার আব্বা সোফিয়ার দরজায় ধীরে ধীরে নক করল, ডাকল, সোফিয়া মা, দরজা খোল তো। কয়েকবার ডাকাডাকির পর দরজা খুলে গেল। দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা। চুল উস্কো-খুস্কো। চোখ-মুখ ফোলা। অনেক কেঁদেছে সে। -কি হয়েছে মা তোমার? উদ্বেগ ঝরে পড়ল সেন্ট জর্জ সাইমনের কণ্ঠে। কোন উত্তর দিল না সোফিয়া। জর্জ সাইমন সোফিয়ার কপালে হাত দিয়ে বলল, অসুখ করেনি তো মা? সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সোফিয়ার মা সোফিয়াকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, কাঁদিসনে মা, কি হয়েছে আমাদের বল। সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা কেঁদেই চলল। কোন জবাব দিল না। সোফিয়া মাথায় হাত বুলিয়ে তার বাবা বলল, বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু ঘটেছে মা? মায়ের বুক থেকে মুখ তুলে পিতার দিকে চাইল সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা। চোখের পানিতে ধোয়া তার মুখ। চোখ দু’টি লাল। বলল, আব্বা, সালমান শামিল নেই, আজ------------ কথা শেষ করতে পারলো না। কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল তার। এক সাগর মমতা ও উদ্বেগ নিয়ে সেন্ট জর্জ সাইমন তাকিয়ে ছিল মেয়ের দিকে। কিন্তু সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার কথা শোনার সাথে সাথে একখণ্ড ঝড় যেন তার মুখের উপরে দিয়ে বয়ে গেল। একটা বিস্ময়-বিমূঢ় ভাব এসে তাকে গ্রাস করল। ধীরে ধীরে সেখানে ফুটে উঠল আতংকও। কোন কথা বলতে পারল না। পাথরের মত নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল সে। সোফিয়ার মা এলিজাবেথও নির্বাক। তার অসহায় দৃষ্টি স্বামীর দিকে। আর সোফিয়া এ্যাঞ্জেলাও একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পিতার দিকে। অন্তর্ভেদী তার দৃষ্টি। যেন সে পিতাকে পাঠ করতে চায়। অনেকক্ষণ পর কিছুটা স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করে সোফিয়ার আব্বা বলল, আবার ওকে কিডন্যাপ করেছে, এই তো? একটু থেমে একটা ঢোক গিলে নিয়ে বলল, ঠিক আছে, খোঁজ করা যাবে। তুমি কেঁদো না মা। সোফিয়া তার মাকে ছেড়ে দিয়ে পিতার দু’টি হাত জড়িয়ে ধরে বলল, খোঁজ করা যাবে আব্বা? তাকে পাওয়া যাবে? আবার নিশ্চুপ হয়ে গেল সেন্ট জর্জ সাইমন। হৃদয়টা তার কেঁপেও উঠল। হোয়াইট ওলফের হাতে পড়লে তাকে কি খোঁজা যায়, না খুঁজে পাওয়া যায়! কিন্তু মেয়েকে কি বুঝ দেবে সে? মেয়ে যে এই সর্বনাশ করে বসে আছে কে জানে। এখন মেয়েকে কি বলবে সে! আবার অনেকক্ষণ পর মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, খুঁজতে তো হবেই মা। একটু দম নিয়ে বলল, আর তুমি কেঁদো না মা। তুমি বড় হয়েছ, লেখা-পড়া শিখেছ। সবই জান তুমি। মোহামেডানদের সাথে তো আমাদের এখন যুদ্ধ চলছে। ওদের জন্যে তুমি আমি কি-ই বা করতে পারব। -আব্বা ওরা তো যুদ্ধে নামে নি। আমরাই তো ওদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছি। বলল সোফিয়া। -ইতিহাস তো আজ থেকে শুরু নয় মা, এই সংঘাতের শুরু অনেক আগে। -কিন্তু আব্বা, কোন একসময়ের সংঘাতের জন্যে এখনকার নিরপরাধ লোকরা কি দায়ী? জর্জ সাইমন মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, মা, ভুলে যেও না তুমি জাতির একজন। জাতির স্বার্থকে তোমার বড় করে দেখতে হবে। -আব্বা, জাতির স্বার্থ, আর জাতির কোন এক গোষ্ঠীর স্বার্থ কি এক জিনিস? কেঁপে উঠল সেন্ট জর্জ সাইমন। মেয়ের কথা যেন হৃদয়ের কোথায় গিয়ে তীরের মত বিদ্ধ হলো। সেই সাথে একটা ভয় ছড়িয়ে পড়ল তার চোখে-মুখে। তার তর্জনীটা সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার ঠোঁটের কাছাকাছি তুলে বলল, পাগলি এইভাবে কথা বলতে নেই। কথা শেষ করেই প্রসংগ পাল্টিয়ে বলল, তুমি দুপুরেও কিছু খাওনি মা, মুখ-হাত ধুয়ে খেয়ে নাও। পরে কথা বলব। বলে সেন্ট সাইমন তার রুমের দিকে চলে এল। সোফিয়ার মা সোফিয়াকে বলল, চল মা, হাত-মুখ ধুয়ে কিছু খাবি। -একটুও ক্ষুধা নেই মা। -অবুঝ হোস না মা। তোর আব্বা তো সবই বলল। একটু শুকনো হাসি ফুটে উঠল সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার মুখে। সে হাসি কান্নার চেয়েও করুণ। বিছানায় গিয়ে বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ল সোফিয়া। সোফিয়ার মা এ্লিজাবেথ এবার কেঁদে ফেলল। বালিশ থেকে মুখ তুলে মায়ের দিকে চেয়ে একটু হাসতে চেষ্টা করে বলল, আমি একটু পরেই খেতে আসছি মা। রাত তখন ১০টা। রাত ১০টায় মিঃ সাইমন তার গাড়ি নিয়ে বেরুল। নিজেই ড্রাইভ করছিল। মিঃ সাইমন গেট দিয়ে বেরুবার পর দারোয়ান গেট বন্ধ করতে যাচ্ছিল। এই সময় সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার গাড়িও বেরিয়ে এল। এইভাবে রাত দশটায় সোফিয়াকে একা বেরুতে দেখে দারোয়ানের চোখে মুহূর্তের জন্যে একটা বিস্ময়ের চিহ্ন ফুটে উঠল। কিন্তু কিছুই বলল না। মিঃ সেন্ট সাইমনের গাড়ি রাস্তায় পড়ার কয়েক মুহূর্ত পরে সোফিয়ার গাড়িও গিয়ে রাস্তায় পড়ল। রাত দশটার রাস্তা। গাড়ির ভিড় অনেক কম। সেন্ট সাইমনের গাড়ি অনুসরণ করে এগিয়ে চলছে সোফিয়ার গাড়ি। সোফিয়ার মুখ শক্ত। চোখে দৃঢ়তার ছাপ। তার স্থির দৃষ্টি সামনে প্রসারিত। সে অনেক চিন্তা-ভাবনা করেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে বরাবরই দেখে আসছে, প্রতি বৃহস্পতিবার রাত দশটায় তার পিতা বেরিয়ে যান গাড়ি নিয়ে। ফেরেন শেষ রাতে অথবা সকালে। সে জানে না, কিন্তু তার ধারণা, হোয়াইট ওলফের কোন সাপ্তাহিক বৈঠক বসে এদিন। সে বৈঠকেই তার আব্বা যান। তার আব্বার জীবনে গোপনীয় কোন কিছুই নেই। যেখানে যে কাজেই তিনি যাবেন, বলে যাবেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতের তার এই সফরের কথা কাউকে তিনি বলেন না। সোফিয়ার ধারণা, তার পিতাকে অনুসরণ করলেই হোয়াইট ওলফের আস্তানার সন্ধান পাওয়া যাবে। আর আস্তানার খোঁজ পেলে সালমানের সন্ধান সে করতে পারবে। সালমানের তো কেউ নেই সাহায্য করার। সোফিয়া কিভাবে বসে থাকতে পারে! জানে সে, হোয়াইট ওলফ কত ভয়ংকর। কিন্তু কোন ভয়ই আজ তার মনে নেই। সালমান থাকবে না, এমন দুনিয়া সে কল্পনাই করতে পারে না। বিভিন্ন রাস্তা ঘুরে সেন্ট সাইমনের গাড়ি পার্ক রোডে এসে পড়ল। পার্ক রোড থেকে গাড়ি গিয়ে পড়ল ইয়েরেভেন হাইওয়েতে। ইয়েরেভেন হাইওয়ে দিয়ে সেন্ট সাইমনের গাড়ি ক্রমশ ইয়েরেভেন শহরের বাইরে এসে পড়ল। ‘যাচ্ছে কোথায় তার আব্বা’ চিন্তা ফুটে উঠল সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার চোখে-মুখে। সোফিয়া মনে করেছিল, শহরেই হোয়াইট ওলফের কোন ঘাঁটিতে তার আব্বা যাচ্ছে। শহরের বাইরে আসতে দেখে তার মনে প্রশ্ন জাগল, আব্বা কি প্রতি বৃহস্পতিবারে এভাবে শহরের বাইরে কোথাও যান? ইয়েরেভেন হাইওয়েতে গাড়ি আসা-যাওয়া তখন আরও কম। অনেকটা নির্জন রাস্তা। সোফিয়া তার পিতার গাড়ি থেকে তার গাড়ির দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিল। কোনভাবেই সে পিতার চোখে পড়তে চায় না। ইয়েরেভেন হাইওয়েতে ১৫ মিনিট চলার পর সেন্ট সাইমনের গাড়ি হাইওয়ে থেকে নেমে গেল। আরাগাত রোড ধরে তার গাড়ি এবার দক্ষিণ দিকে এগিয়ে চলল। সোফিয়াও আরাগাত রোডে তার গাড়ি নামিয়ে নিল। আরাগাত রোডটি দক্ষিণে সাত-আট মাইল এগুবার পর আরাগাত পর্বতের পাদদেশে গিয়ে শেষ হয়েছে। যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকে আরেকটি পাথুরে রাস্তা এঁকে-বেঁকে পাহাড়ের উপর উঠে গেছে। এই পাহাড়েই একটি ঢালে বিখ্যাত আমবার্ড দুর্গ। বিখ্যাত এই দুর্গের ভেতরই আর্মেনীয় খৃস্টানদের সবচেয়ে প্রাচীন সানাইন ধর্মমন্দির অবস্থিত। সোফিয়া এবার অনেকটা ভয় পেয়ে গেল। তার আব্বা পাহাড়ে কোথায় যাচ্ছে? নিষিদ্ধ এলাকা আমবার্ড দুর্গে কি? আমবার্ড দুর্গের কথা মনে হতেই তার গা অনেকটা ছমছম করে উঠল। বাইরে থেকে সবাই একে রহস্যের আকর বলে মনে করে। আর্মেনিয়ার খৃস্টান ধর্মগুরু ফাদার পল এবং তিনি যাকে দয়া করে বিশেষ অনুমতি দেন তিনি বা তারাই শুধু ঐ প্রাচীন দুর্গ ও ধর্মকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারে। ভয়বোধের সাথে সোফিয়া আনন্দিতও হল। সালমানকে হোয়াইট ওলফরা মেরে না ফেললে নিশ্চয় এমন জায়গাতেই রেখেছে। সালমানকে মেরে ফেলতে পারে, এমন কথা মনে হতেই সোফিয়ার মনটা মোচড় দিয়ে উঠল। না, না, সালমান মরতে পারে না। মন বলছে, সে মরতে পারে না। সুউচ্চ মাউন্ট আরাগাত পর্বতের একদম কাছে চলে এসেছে। পর্বতের কালো দেয়াল গোটা দক্ষিণ দিগন্তটাকেই যেন গ্রাস করেছে। গাড়ির গতি কমে এসেছিল। সোফিয়া তার আব্বার গাড়ির রেয়ার লাইট দেখে তাকে অনুসরণ করছিল। আরাগাত রোডে পড়ার পর সোফিয়া তার গাড়ির লাইট নিভিয়ে দিয়েছিল। নিভিয়েছিল পিতার এবং কারো নজরে পড়ার ভয়ে। অনেকক্ষণ থেকেই গাড়ির চড়াই যাত্রা শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ, গাড়ি মাউন্ট আরাগাতের গা বেয়ে উঠতে শুরু করেছে। সামনে হঠাৎ একসময় সেন্ট সাইমনের গাড়ির রেয়ার লাইট নিভে গেল। হেডলাইটটিও। সঙ্গে সঙ্গে সোফিয়াও তার গাড়ি থামিয়ে দিল। অল্প কিছুক্ষণ গাড়ির ভেতর অপেক্ষা করার পর গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। সামনে অন্ধকার। পাহাড়ের উপরটাও। আমবার্ড দুর্গ পাহাড়ের এক প্রশস্ত ঢালে—নিচে থেকে দেখা যায় না। অন্ধকারে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল সোফিয়া। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই দেখল, একটা টর্চ জ্বলতে জ্বলতে ক্রমে পাহাড়ের উপর উঠে গেল। সোফিয়া এখন তার কি করা উচিত ভাবছিল। এমন সময় দু’দিক থেকে দু’জন এসে তাকে ঘিরে দাঁড়াল। তাদের হাতে স্টেনগান। কাঁধে ঝুলানো ওয়াকি টকি। তাদের একজন ভারি গলায় বলল, কে আপনি? সোফিয়া এমন অবস্থার কথা ভাবেনি। সে প্রথমটায় খুব ভীত হয়ে পড়ল। তারপর বুঝল, এরা নিশ্চয় হোয়াইট ওলফের লোক এবং আব্বা নিশ্চয় হোয়াইট ওলফের এক ঘাঁটিতে এসেছেন। সাহস ফিরে এল সোফিয়ার। বলল, আমি সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা। আমি আমার আব্বা সেন্ট সাইমনের সংগে এসেছি। সোফিয়ার কথা শুনে দু’জন তাদের উদ্যত স্টেনগানের ব্যারেলটা নিচে নামাল এবং তাদের একজন দূরে গিয়ে ওয়াকি টকিতে কি যেন আলোচনা করল। তারপর ফিরে এসে বলল, ম্যাডাম, আপনাকে আমাদের সাথে যাওয়ার হুকুম হয়েছে। --কোথায়? --দুর্গে। --কে বলেছে, আব্বা? --না। --কে? --হুকুম তো একজনই দেন। --কে? --লর্ড মাইকেল পিটার। মাইকেল পিটারের নাম শুনে শিউরে উঠল সোফিয়া। হোয়াইট ওলফের প্রধান এই মাইকেল পিটার। মা’র কাছ থেকে শোনা, দয়া, অনুকম্পা না কি এই লোকটির অভিধানে নেই। সাক্ষাত এক যম সে। নির্দেশ অস্বীকার করার কোন উপায় ছিল না সোফিয়ার। দু’জন লোকের একজন আগে এবং একজন পেছনে পেছনে চলল। তারা একটা পুরানো পাথুরে পথ ধরে পাহাড়ের উপরে উঠতে লাগল। পথ বেশ প্রশস্ত, ধাপে ধাপে উপরে উঠে গেছে। আমবার্ড দুর্গটি যখন তৈরি হয়, তখনি এ রাস্তাটি তৈরি। আমবার্ড দুর্গের প্রশাসনিক ওয়ার্ডের একটি কক্ষে বন্দী সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা। কক্ষে একটা শোবার খাট, আর কিছুই নেই। বাথরুম ঘরের সাথেই। একটি মাত্র দরজা। কক্ষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। কক্ষে খাটের উপর হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছে সোফিয়া। চুল উস্কো-খুস্কো। মুখ ম্লান। যেন তার উপর দিয়ে কত ঝড় বয়ে গেছে। চারদিন হল সে এই কক্ষে বন্দী হয়ে আছে। চারদিন ধরেই চলছে জিজ্ঞাসাবাদ। মনে পড়ে সেদিন রাতে দু’জন প্রহরীর সাথে এ কক্ষে এসে পৌঁছার সংগে সংগেই স্বয়ং মাইকেল পিটার এ কক্ষে এসেছিলেন। তারপর জিজ্ঞাসা শুরু হয়েছিল এইভাবেঃ --মা এ্যাঞ্জেলা, তোমার আব্বা তোমাকে সাথে এনেছে? --না। --তোমার আব্বা জানতেন তুমি আসছ? --না। --তুমি জানতে বৃহস্পতিবার রাতে তোমার আব্বা কোথায় যান? --কোথায় যান তা জানতাম না। --কি জানতে তাহলে? --এইটুকু অনুমান করতাম যে, তিনি হোয়াইট ওলফের কোন সিটিং-এ যান। --কেমন করে জানলে তিনি হোয়াইট ওলফের লোক? --হঠাৎ একদিন জেনে ফেলি। --কিভাবে? --হোয়াইট ওলফ সম্পর্কে কোন মন্তব্য করতে মাকে তিনি নিষেধ করেছিলেন। --তোমার মা কি সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন? --নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে। --তুমি সালমান শামিলের খোঁজে এসেছিলে। --হ্যাঁ। --সালমান শামিল হোয়াইট ওলফের টার্গেট, একথা তোমার আব্বা তাকে জানিয়েছিল, যার ফলে সে সাবধান হয় এবং প্রথম দফা বেঁচে যায়, ঠিক না? --না। --সালমান শামিল তাহলে তা কিভাবে জানতে পারল বলতে পার? --হয়তো কোনভাবে জেনেছে। --তুমি সালমানকে ভালবাস তোমার আব্বা জানেন? --না। --তোমার মা? --না। --সালমান শামিল কে জান? --সে মুসলমান এবং একজন ছাত্র। --ককেশোস ক্রিসেন্টকে চেন? --না। --নাম শুনেছ? --না। --তোমার আব্বা জানতেন? --জানি না। প্রথম দিনের জিজ্ঞাসাবাদ এখানেই শেষ হয়। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠার পরই সোফিয়া দেখতে পেয়েছিল কক্ষের দক্ষিণ পাশের কাঠের দেয়াল উঠে গেল। বেরিয়ে এল কাঁচের দেয়াল। কাঁচের দেয়ালের ভেতর দিয়ে ওপারের কক্ষে চোখ পড়তেই দেহটা যেন কাঠ হয়ে গেল তার। দেখল, তার আব্বা চেয়ারে বসা। তার সামনে আরেক চেয়ারে বসে মাইকেল পিটার। মাইকেল পিটারের মুখ নড়ছে, কথা বলছে সে। সোফিয়া বুঝলো, তার আব্বাকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তার আব্বা একবার এদিকে চাইল। ভাবলেশহীন মুখ। বরং চোখে একটা প্রসন্ন দৃষ্টি। কি জিজ্ঞাসাবাদ চলছিল সোফিয়া কিছুই শুনতে পাচ্ছিল না। তবে তার আব্বার মুখ খুব কমই নড়তে দেখছিল। হঠাৎ একসময় মাইকেল পিটারকে জ্বলে উঠতে দেখা গেল। ক্রোধে উঠে দাঁড়ালো সে। তার চোখে যেন আগুন। এর পরেই মাইকেল পিটার ঢুকলো সোফিয়ার কক্ষে। কক্ষে ঢুকে এদিক-ওদিক কয়েকবার পায়চারি করে শান্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করল, তোমার পিতা কে জান? জানি, তিনি একজন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা। জান, আমরা চাই তার সম্মান এবং মর্যাদা অটুট থাকুক? জানি। কিন্তু তোমরা আমাদের সাহায্য করছ না। কি সাহায্য? তুমি না জানলেও তোমার আব্বা জানেন, এ এলাকার মুসলমানদের ‘ককেশাস ক্রিসেন্ট’ আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী। আমাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে প্রধান বাঁধা। সালমান শামিল ‘ককেশাস ক্রিসেন্টের’ একজন শীর্ষ নেতা। আমরা নিশ্চিত, তার মাধ্যমে আমাদের কৌশল ও পরিকল্পনার কথা ককেশাস ক্রিসেন্টের কাছে পৌঁছেছে। কি পৌঁছেছে, কতটুকু পৌঁছেছে এটুকুই শুধু আমরা তোমাদের কাছে জানতে চাই। দুঃখিত, এ ব্যাপারে কিছুই জানি না। কিছুই জান না, তাহলে হোয়াইট ওলফের কাছ থেকে সালমান শামিলকে উদ্ধার করতে এসেছ কেন? শত্রু তোমাদের কাছে বড় হলো কেন? মাইকেল পিটারের চোখ দু’টি ক্রোধে জ্বলে উঠেছিল। কথা শেষ করেই সে বেরিয়ে গিয়েছিল। সোফিয়া তার পিতার কক্ষের দিকে চাইল। কাঠের দেয়ালে গিয়ে চোখ ধাক্কা খেল। কাঠের দেয়ালটা কখন যেন আবার নেমে এসেছে। এভাবেই তিনদিন ধরে জিজ্ঞাসাবাদ চলছিল। সেদিন ডঃ পল জনসনের বিশ্রাম কক্ষে সালমান শামিলের সাথে সোফিয়ার আলোচনার বিষয়টা তারা খুঁটে খুঁটে জিজ্ঞাসা করেছিল। মধ্য এশিয়ার মুসলিম বিপ্লবের নায়ক আহমদ মুসা ককেশাস ক্রিসেন্টের সাহায্যে ককেশাসে এসেছে, এটা সোফিয়া জানে কি না বার বার জিজ্ঞাসা করেছে। সব ক্ষেত্রেই সোফিয়ার ‘না’ বলা ছাড়া উপায় ছিল না। আসলে তো কিছুই জানে না সে। কিন্তু মাইকেল পিটার তা বিশ্বাস করেনি। বরং মনে হয়েছে, সোফিয়ার প্রতি তার সন্দেহ যেন আরও ঘনীভূত হয়েছে। সোফিয়া বুঝতে পেরেছে, তার পিতাকেও এইভাবে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তৃতীয় দিন জিজ্ঞাসাবাদ শেষে যাবার সময় রক্তচক্ষু তুলে বলেছে, সেন্ট সাইমনের মেয়ে বলে তোমাকে যথেষ্ট সুযোগ দেয়া হয়েছে। হোয়াইট ওলফের বিচার কত কঠোর তুমি জান না। হাঁটুতে মুখ গুঁজে এইভাবে গত তিনদিনের স্মৃতিচারণে ডুবে গিয়েছিল সোফিয়া। তখন রাত অনেক হয়েছে। মন্দিরের পেটা ঘড়িতে ৯টা বাজার শব্দ অনেকক্ষণ আগে শোনা গেছে। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দে ভাবনার জাল ছিড়ে গেল সোফিয়ার। মুখ তুলল সোফিয়া। দেখল, হোয়াইট ওলফ প্রধান মাইকেল পিটার বাম হাতে দরজা খুলে ধরে আছে। খোলা দরজা দিয়ে প্রবেশ করছে সোফিয়ার আব্বা সেন্ট জর্জ সাইমন। মাইকেল পিটারের ডান হাতে রিভলভার। সোফিয়া পিতার মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল। তার সৌম্যশান্ত মুখটি বেদনায় নীল। দু’চোখের কোণায় কালি পড়ে গেছে। চুল উস্কো-খুস্কো। চারদিন আগের পোশাকটাই এখনও তার পরনে। গোটা চেহারাটাই তার বিধ্বস্ত। মন হাহাকার করে উঠল সোফিয়ার। ‘আব্বা’ বলে চিৎকার করে উঠে সোফিয়া ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল তার আব্বাকে। বলল, কেমন আছ তুমি আব্বা? কোন কথা বলতে পারলো না সেন্ট সাইমন। শুধু মাথায় হাত বুলাতে লাগল সোফিয়ার। অশ্রু নেমে এল তার দু’চোখ থেকে। মাইকেল পিটারের ঠোঁটে হাসি। সাপের মতো ঠান্ডা সে হাসি। হাতের পিস্তলটি নাচিয়ে নাচিয়ে সে বলল, সোফিয়া তোমার জন্যে একটি খবর। সোফিয়া পিতাকে ছেড়ে দিয়ে একটু সরে দাঁড়াল। মাইকেল পিটার বলল, হোয়াইট ওলফের বিচার-কমিটি তোমাদের বিষয় বিস্তারিত পর্যালোচনা করে আজ সন্ধ্যায় তাদের রায় ঘোষণা করেছে। রায়ে হোয়াইট ওলফের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা, ককেশাস ক্রিসেন্টের সাথে সম্পর্ক রাখা এবং তাদের কাছে তথ্য পাচারের দায়ে তোমার পিতাকে অভিযুক্ত করেছে। বিচার-কমিটি মনে করে, সালমান শামিলের ক্ষেত্রে প্রথম অভিযান সফল না হওয়া, বাকুতে আমাদের একটি অপারেশনের বিপর্যয় ঘটা, লেক আরাকস এবং তাগাবান এর আমাদের শক্তিশালী ইউনিট সমূলে ধ্বংস হওয়া—এই পরপর ঘটনাগুলো ককেশাস ক্রিসেন্টের কাছে তথ্য পাচারেরই ফল। বুড়ো ডঃ পল জনসনেরও মাথা খারাপ হয়েছে। তার বিশ্বাসঘাতকতায় ইয়েরেভেনেও আমাদের বেশ লোকক্ষয় হয়েছে। তাকে মরতে হবে। একটু দম নিল মাইকেল পিটার। তারপর শুরু করল আবার, তবে তোমার আব্বার দীর্ঘ জাতিসেবা এবং হোয়াইট ওলফের প্রতি তার অবদানের কথা স্মরণ করে দলের প্রতি বিশ্বস্ততা প্রমাণের একটা সুযোগ তাকে দেয়া হয়েছে। ককেশাস ক্রিসেন্টের একজন এজেন্টকে নিজ হাতে খুন করে তাকে এ বিশ্বস্ততার প্রমাণ দিতে হবে। কেমন মনে কর তুমি এ বিচারকে? সোফিয়া কোন জবাব দিল না। শুধু প্রশ্নবোধক একটা দৃষ্টি তুলে ধরল মাইকেল পিটারের দিকে। উত্তরের অপেক্ষা না করে মাইকেল পিটার মুখে ক্রুর হাসি টেনে বলল, সেই এজেন্ট তুমি। তোমার পিতার উপর তোমাকে হত্যার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মুহূর্তের জন্যে চোখ দু’টি বিস্ফারিত হয়ে উঠল সোফিয়ার। কিন্তু তাতে ভয় নয়, বিস্ময়। ওদের আজব, নিষ্ঠুর সিদ্ধান্তেই এ বিস্ময়। সোফিয়া তার আব্বার দিকে চোখ তুলল। দেখল, স্নেহময় কোমল এক দৃষ্টি, কোন ভাবান্তর নেই তাতে। সোফিয়া বলল, আব্বা, তুমি কিছু ভেব না, আমি মৃত্যুকে ভয় করি না, সামান্য দুঃখও নেই আমার মরতে। একটু থেমেই মাথাটা নিচু করে আবার বলতে শুরু করল, শুধু একটাই দুঃখ, সালমান শামিলের কোন সন্ধান করতে পারলাম না, জানি না কোথায়------- মাইকেল পিটার সোফিয়াকে থামিয়ে দিয়ে বলল, তোমাকে দুঃখ করতে হবে না। তাকে শীঘ্রই আমরা তোমার কাছে পাঠাব। পৃথিবীর কোথাও আশ্রয় নিয়ে সে আমাদের হাত থেকে বাঁচবে না। তবে সবার আগে তোমাকেই মরতে হচ্ছে। কথা শেষ করেই প্রচন্ড শব্দে হেসে উঠল মাইকেল পিটার। হাসতে হাসতেই হাতের রিভলভারটি তুলে দিল সেন্ট সাইমনের হাতে। বলল, নাও তাড়াতাড়ি কাজ শেষ কর, অনেক কাজ আছে। সেন্ট সাইমন যন্ত্রের মত রিভলভারটি হাত দিয়ে ধরল। সংগে সংগেই রিভলভারশুদ্ধ হাতটি তার উপরে উঠে গেল। রিভলভারের নলটি ঠেকল তার মাথায়। কেউ কিছু বোঝার আগেই গুলির শব্দ হলো। মাথাটি একদিকে কাত হয়ে গেল সেন্ট সাইমনের। নিঃশব্দে দেহটি তার আছড়ে পড়ল মেঝের উপর। ‘আব্বা’ বলে সেন্ট সাইমনের বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল সোফিয়া। কিন্তু তা মুহূর্তের জন্যেই। সেন্ট সাইমনের হাতে রিভলভারটি তখনও। সোফিয়া পিতার বুক থেকে মাথা তুলে রিভলভারটি হাতে তুলে নিয়েই ঘুরে দাঁড়াল। মাইকেল পিটার হাসিমুখে মজা উপভোগ করছিল। সোফিয়াকে রিভলভার তুলে নিতে দেখেই হাসি মিলিয়ে গেল মাইকেল পিটারের মুখ থেকে। আর পরমুহূর্তেই বাঘের মতো সে লাফ দিল সোফিয়াকে লক্ষ্য করে। সোফিয়ার রিভলভারও গর্জে উঠল সেই মুহূর্তে। লাফ দেয়া অবস্থায় মাঝপথেই মাইকেল পিটারের গুলিবিদ্ধ দেহ আছড়ে পড়লো সেন্ট সাইমনের লাশের পাশে। হেডকোয়ার্টারের সবগুলো কক্ষই ছিলো টেলিভিশন সার্কিটের আওতায়। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে সব কক্ষের সবকিছুই দেখা যায়। মাইকেল পিটার পড়ে যাবার পরেই খবর হয়ে গেল সবখানে। চারিদিক থেকে সবাই ছুটে এল। দশ-বারোজন প্রবেশ করল ঘরে। সবার হাতে স্টেনগান। তাদের সাথে ঘরে এসে ঢুকেছে হোয়াইট ওলফের দু’নম্বর ব্যক্তি, ডেপুটি প্রধান জর্জ জ্যাকব এবং সিকিউরিটি প্রধান রবার্ট র‍্যাফেলো। গুলি করার পরেই সোফিয়া রিভলভার ফেলে দিয়ে পিতার বুকের উপর পড়ে কাঁদছিল। জর্জ জ্যাকব, রবার্ট র‍্যাফেলোসহ অন্যান্যরা ঘরে ঢুকে হোয়াইট ওলফ প্রধান মাইকেল পিটারের প্রাণহীন দেহের দিকে কিছুক্ষণ স্তম্ভিতের মত তাকিয়েছিল। বিস্ময়, বেদনা তাদেরকে যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিয়েছে। কিছুক্ষণ পর জর্জ জ্যাকব রবার্ট র‍্যাফেলোর দিকে তাকিয়ে বলল, র‍্যাফেলো ডাইনিকে তুলে নিয়ে যাও। ওর খাল খুলতে হবে। জর্জ জ্যাকবের চিৎকার শুনে সোফিয়া মাথা তুলল। রবার্ট র‍্যাফেলো সোফিয়ার দিকে এগিয়ে গেল। পাশেই পড়ে ছিল রিভলভার। সোফিয়া রিভলভার তুলে নিতে যাচ্ছিল। র‍্যাফেলো লাফ দিল রিভলভারের লক্ষ্যে। র‍্যাফেলোর বাম পা গিয়ে পড়ল রিভলভারের দিকে বাড়ানো সোফিয়ার হাতের উপর। বুটের তলায় পিষ্ট হয়ে গেল সোফিয়ার ডান হাত। কঁকিয়ে উঠল সোফিয়া। ঠিক এই সময় বাইরে কিছুদূর থেকে ভেসে এল স্টেনগানের একটানা ব্রাশফায়ারের শব্দ। চমকে উঠে সবাই বাইরের দিকে তাকাল। রবার্ট র‍্যাফেলো মেঝে থেকে রিভলভার তুলে নিয়ে এগুলো দরজার দিকে। তার পেছনে অন্যরাও। এসময় দরজার বাইরে থেকে পায়ের শব্দ পাওয়া গেল।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮২ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ৯.ককেশাসের পাহাড়ে (২)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন