বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

দুষ্টু মিষ্টি ঝগড়া

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মিজানুর রহমান (০ পয়েন্ট)

X দেহের মাঝে সর্বচ্চ রাগ নিয়ে ঘরের দরজা চাপিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে বসে আছে নওশিন। ইমুর মাঝেও আজ নওশিনের সমান সমান রাগ। ইমু ঘরে ঢুকতেই নওশিন বলে উঠলো--- --এসে পরেছিস! আমি এতক্ষণ তোর জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। আমি চলে যাচ্ছি! আর কোনদিনও ফিরবোনা। নিজের খেয়াল রাখিস। আর শুন! গরমটা অনেক বেশি তাই বেশি করে পানি পান করিস! . ইমু ঢের টের পাচ্ছে নওশিন অনেক রেগে আছে। কারণ রেগে গেলেই নওশিন কেবল ইমুকে তুইতোকারি বলা শুরু করে। তবে তার মাঝেও রয়েছে সীমাহীন ভালবাসা। যা শুধু ইমু নিজেই উপলদ্ধি করতে পারে। ইমু কি হয়েছে, না হয়েছে জিজ্ঞাসু না করে বলল--- --ঐ যে আলমারির ড্রয়ারটায় কিছু টাকা রাখা আছে! ঐ টাকাটা নিয়ে যা, পথে লাগতে পারে। --এলিয়েন! তুই কিন্তু এইবার আমার পিছুপিছু ছুটবিনা! --ঠিকাছে! ঠিকাছে! তোর পিছুপিছু ছুটতে আমার বয়েই গেছে। তা কোথায় যাবি সিদ্ধান্ত নিয়েছিস? টিকিট কেটেছিস? না কাটলে বল, আমিই একটা টিকিট কেটে দিচ্ছি! --তোকে বলবো কেন? আমার যে দিকে দুচোখ যায় সেদিকে চলে যাবো! তোর টিকিট কাটা লাগবেনা! --তোর দুচোখতো বাবার বাড়ি ছাড়া আর কোনদিকেই যায়না! চল তোকে এগিয়ে দিয়ে আসি! --তোর এগিয়ে দিতে হবেনা। আমি একাই যেতে পারবো। --তাহলে এইবারের মতো আমার জন্য টেবিলে খাবারটা বেরে রেখে দিয়ে যা! --খবরদার! একদম আমার রাগ কমানোর চেষ্টা করবিনা। এইবার বাবা তোর একটা বিহিত করবে। তবেই ফিরবো, নয়তো না! --আরে যা যা, খাবারটা বেরে দিয়ে চলে যা, বাবা আমাকে খুব ভালো করেই জানে, আমি কেমন! আর এটাও জানে তার মেয়েটা কেমন! --হ্যা যাচ্ছি, জিন্স প্যান গুলা যখন কাঁচবি তখন কাঁদবি আর বলবি, "কি ভুলটাই না করলাম" যখন সকাল বেলা আরামের ঘুম ভেঙ্গে রান্না করে খেয়ে যেতে হবে, 'তখন শুধু কষ্টে চোখের পানি আর নাকের পানি ফেলবি। আমি যাচ্ছি....! --যা, বাবাকে গিয়ে আমায় একটা ফোন দিতে বলিস। --চিন্তা করিসনা, উনি এখানে আসতেও পারে। অল্প দুরত্ব তো! ফোন নাও দিতে পারে! --মানে? --হা হা হা, তুই ভেবেছিস আমি আমার বাবার কাছে যাবও তাইনা! ভুল ভেবেছিস, আমিতো আমার শ্বশুর আব্বাজানের কাছে চলে যাচ্ছি! তারপর সেই তোকে এসে বুঝাবে "কত ধানে, কত চাউল"! . ইমু একটু থমকে গেলো নওশিনের কথা শুনে। ভাবছে বাবাকে ও কিছু বললে আমায় আস্ত রাখবেনা। পুরও কাহিনীটা তখন উল্টোদিকে মোড় নেবে। ইমু একটু কাপা কন্ঠে বলল--- --কেন! কেন! তুই আমার বাবার কাছে যাবি কেন? --বারে তুইয়ি তো বসর রাতে বলেছিলি! 'আজ থেকে তোর মা, আমার মা! তোর বাবা, আমার বাবা! তোর ছোটভাই, আমার ছোটভাই! আমিতো সেদিন থেকেই তাদের নিজের মা-বাবাই জেনেছি। তাই আমার বাবার কাছে আমি চলে যাচ্ছি। --তোর বাবাতো বগুরাতে সেখানে যা! আমার বাবার কাছে যাবি কেন? --তোর বাবা বগুরা, তুই বললিনা, 'বাবা আমাকে ভাল করেই জানে' দেখি কতটা জানে! --পাখি শুন, তোর কোথাও যাওয়া লাগবেনা। আমি তোকে কাল বিকেলে ঠিকি ঘুরতে নিয়ে যাবো, --তোর এমন কাল আমি বিয়ের পর থেকেই শুনছি। কতদিন হলো একটু বাইরে সবুজে ঢাকা লেকের পারে গিয়ে বসিনা। একটু বাতাসে দাঁড়াই না। চার দেয়ালের মধ্যে থাকতে থাকতে আমার সব কোলাহল দিন দিন নিমেষ হয়ে যাচ্ছে। . ইমু মনে মনে বলল, 'এমনিতেই যে কোলাহলময়ী, এর পরেও আবার কোলাহল বাড়াতে চাচ্ছে" --বললাম তো কাল তোমায় নিয়ে সত্যি বেড় হবো, --সত্যিতো? --সত্যি, --না! না! তুই এইবারও মিথ্যা বলছিস! . কথাটা বলেই নওশিন ব্যাগের হুট টেনে হাটা শুরু করলো। ইমু দৌড়ে গিয়ে সামনে দু'হাত মেলে দাঁড়িয়ে বলল--- --পাখি প্লিজ যেওনা, আমি তোমায় সত্যি বলছি কাল বেড়াতে নিয়ে যাবো। . নওশিন একটু আড়চোখে ইমুর দিকে তাকিয়ে বলল-- --কি ব্যাপার আদরটা এতো বাড়লো কেন! অনেক বেশি বেশিই লাগছে! ও তোর বাবার বাড়িতে যাবার কথা বলেছি বলে তাইনা? আমি সত্যিই যাচ্ছি, ভালো থাকিস। --প্লিজ যেওনা পাখি, --বাবাকে দেখে তোর খুব ভয় লাগে? --হুম, তুমিতো সেটা জানোই! --ঠিকাছে আমি যাবোনা, তবে তোকে এখন একটা কাজ করতে হবে। --কি বলো, তুমি যা বলবে আমি তাই করবো। পাপ্পি দিতে হবে! খায়িয়ে দিতে হবে! মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম আনাতে হবে? --জ্বী না, আপাতত নিচে নেমে আমার জন্যে একটা আইসক্রিম আনলেই হবে। --আমিতো মাত্র উঠলাম, এখন আইসক্রিম খেতে হবেনা পাখি। তার চেয়ে ভালো, চলো তোমায় ভাত খায়িয়ে দেই। --ঐ তুই যাবিনা, আচ্ছা যেতে হবেনা, আমিই চললাম! . নওশিন কথাটা বলেই ব্যাগের হুট আবার ধরলো। ইমুও নওশিনের সাথে সাথে হাত দিয়ে ব্যাগের হুট ধরে বলল--- --ঠিকাছে, ঠিকাছে, আমি যাচ্ছি। তুমি একটু আমার জন্য খাবারটা বেরে রাইখো কেমন! --ঠিকাছে যা.... . ইমু মুখটা মলিন করে টেনে টেনে কয়েক পা বাড়িয়ে দরজার সামনে যাওয়াতেই নওশিন ডাকলো--- --এই শোন এলিয়েন! কষ্ট করে আর এখন নামতে হবেনা। যা গিয়ে ফ্রেস হয়ে নে, আমি টেবিলে খাবার দিচ্ছি। তুই আইসক্রিম আনার বদলে শুয়ে শুয়ে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিবি।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৮৯ জন


এ জাতীয় গল্প

→ দুষ্টু মিষ্টি ঝগড়া

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now

৮.সিংকিয়াং থেকে ককেশাস (৬)

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান আরাফাত হোসেন (০ পয়েন্ট)

X বাকুর ‘ককেশাস সিক্রেট’ প্রধান মুহাম্মদ বিন মুসার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ করে এবং বাকুতে অবস্থানরত সাইমুম প্রতিনিধি দলের নেতা আলী আজিমভের সাথে প্রয়োজনীয় আলোচনা সেরে সালমান শামিল সেদিন রাতেই ইয়েরেভেনে ফিরে এসেছে। ‘কুমুখী’ ও ‘মুগী’ গ্রামের ভয়াবহ হত্যাকান্ড এবং আল্লামা ইব্রাহীম এদতিনার হারিয়ে যাওয়া সালমান শামিলকে অস্থির করে তুলেছে। ‘হোয়াইট উলফ’ দেখা যাচ্ছে ‘ককেশাস ক্রিসেন্ট’-এর সব কিছুই জানে এবং তাদের পরিকল্পনা মুতাবিক একের পর এক ঘটনা ঘটিয়েই চলেছে, কিন্তু ‘ককেশাস ক্রিসেন্ট’ তাদের কোন নাগালই পাচ্ছেনা। তাদের একজন লোকেরও পরিচয় জানা যায়নি। তাদের বিরুদ্ধে ‘ককেশাস ক্রিসেন্ট’ কার্যত এক ইঞ্চিও এগুতে পারেনি। এই ব্যর্থতার বেদনা সালমান শামিলের অন্তরকে স্থির থাকতে দিচ্ছেনা। আল্লামা ইব্রাহিম এদতিনার হারিয়ে যাওয়ার পর আন্দোলন পরিচালনার বিরাট দায়িত্ব তার ওপর অর্পণ করা হয়েছে। সাংগঠনিক অনেক কাজ তার পড়ে রয়েছে। এরপরও কিছুমাত্র দেরি না করে ছুটে এসেছে ইয়েরেভেনে। তার আশা এখান থেকেই সে সামনে এগুবার একটা ‘ক্লু’ পাবে। সালমান শামিলের লক্ষ্য সোফিয়া এঞ্জেলা। তার ধারণা সোফিয়া এঞ্জেলার কাছ থেকে একটু সূত্র পাওয়া যাবে। সালমান শামিলকে সাবধান করার মত ‘এ্যকুরেট’ খবর সোফিয়া যে সূত্র থেকে পেয়েছে, সে সূত্র ধরে এগুলেই, সালমান শামিলের বিশ্বাস, ‘হোয়াইট উলফ’ এর একটা ঠিকানায় পৌঁছা যাবে। সালমান শামিল ও উসমান এফেন্দী ভোরে এসে পৌঁছেছে ইয়েরেভেনে। এসে ফজরের নামায পড়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম থেকে উঠল সকাল আটটায়। হাতমুখ ধুয়ে এসে দেখল টেবিলে সেদিনের কাগজ। সালমান শামিল কাগজটি হাতে নিয়ে আরেকবার বিছানায় গা এলিয়ে দিল। কাগজের এক জায়গায় গিয়ে চোখ আটকে গেল সালমান শামিলের। আগের দিন রাতে সালমান শামিলের ঘরে যে অভিযান পরিচালিত হয়েছিল, তার ওপর রিপোর্ট করেছে পত্রিকাটি। শিরোনাম দিয়েছে, ‘নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের দেশ বরেণ্য কৃতি ছাত্র এবং ইনস্টিটিউট অব এডভানস্ড নিউক্লিয়ার ফিজিক্স’- এর চূড়ান্ত বর্ষের ছাত্র সালমানকে বাসভবন থেকে কে বা কারা অপহরণ করেছে। অকুস্থল পরিদর্শন করতে গিয়ে এই রিপোর্ট দেখেছে, অত্যাধুনিক ল্যাসার বীম দিয়ে দরজার তালা গলিয়ে ফেলে তার ঘরে প্রবেশ করা হয়। ওয়াকিফহাল মহলের ধারণা একটি শক্তিশালী মহল সুপরিকল্পিতভাবে এই কাজ করেছে। এ ব্যাপারে তার প্রতিবেশী জনাব খলিলভ থানায় একটা মামলা দায়ের করেছে। পুলিশী তদন্ত চলছে। পুলিশ এ পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করেনি।’ খবর পড়ে মাথায় হাত দিল সালমান শামিল। কি ঝামেলা। এখন আবার থানায় যেতে হবে, বলতে হবে আমি অপহৃত হইনি। তা বললেই ঘটনার শেষ হয়ে যাবেনা। অপহরণকারীরা কারা এসেছিল, তাদের ব্যাপারে কতটুকু জানি, ইত্যাদি নানা রকম সাক্ষ্য দেয়ার ঝামেলায় তাকে পড়তে হবে। তাছাড়া তার ইনস্টিটিউটেতো এ নিয়ে হৈ চৈ পড়ে গেছে। এতো সব ঝামেলায় সে জড়িয়ে পড়তে চায়না। অনেক চিন্তা ভাবনা করে সালমান শামিল থানার জন্যে জবানবন্দী তৈরী করে উসমান এফেন্দীর হাতে দিয়ে বলল, এটা তুমি খলিলভকে দিয়ে এস। সে থানায় পৌছেঁ দেবে এটা। থানায় খলিলভ যেন বলে, নিরাপত্তার কারণেই আমি কয়েকদিন বেরুতে পারবেোনা। উসমান এফেন্দীকে পাঠিয়ে দিয়ে সালমান শামিলও বেরিয়ে পড়ল ইনস্টিটিউটের উদ্দেশ্যে। তখন বেলা সড়ে আটটা। দশটায় ইনস্টিটিউটের ক্লাস শুরু হয়। ছেলেদের কাছে অন্তহীন জবাবদিহির ঝামেলা এড়াবার জন্যে সে আগেই ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টরের সাথে দেখা করে সব কথা বলে সোফিয়ার সাথে কথা বলা যায় কিনা চেষ্টা করে আজকের মত সরে পড়তে চায়। ইনস্টিটিউটের পাশেই ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর পল জনসনের বাড়ি। ভদ্রলোকের বয়স ষাটের কাছাকাছি হবে। দীর্ঘ দেহ। ব্যায়াম পুষ্ট সুগঠিত দেহ। মনেই হয়না যে, বয়স তার চল্লিশের বেশি হবে। মুখে হাসি সব সময় লেগেই থাকে যেন। অথচ সে হাসে অত্যন্ত কম। তাঁর মুখে হাসি হাসি ভাবটা আসলে তার শিশুসুলভ সারল্যের দীপ্তি। একজন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, জ্ঞানের একজন নিবেদিত সাধক সে। ভাল ছাত্ররা তার কাছে সন্তানের চেয়েও প্রিয়। সালমান শামিল এসে ইনস্টিটিউটের প্রশাসনিক ভবনের কাছে গাড়ি থেকে নামল। প্রশাসনিক ভবনের নিচের তলাতেই ড. পল জনসনের অফিস। ঢুকতেই বাম পাশের প্রথম ঘরটি। সালমান শামিল অফিসের বারান্দায় উঠতেই একজন বেয়ারা মুখোমুখি হলো। সালমান শামিলকে দেখে ভুত দেখার মতই সে দাড়িয়ে গেছে। বলল, শুনলাম স্যার, আপনি না ... সালমান শামিল তাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বলল, হ্যাঁ আমি ফিরে এসেছি। বলে সে দ্রুত ডিরেক্টরের অফিসের দিকে চলে গেল। কিন্তু বেয়ারাটি চলে গেলনা, সালমান শামিল ড. পল জনসনের অফিসে ঢোকা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকল অফিসের সিড়িঁর ওপর। সালমান শামিল দরজার লক ঘুরিয়ে একটু ফাঁক করে দেখল ড. পল জনসন এক মনে টেবিলে কাজ করছেন। স্যারকে এই সময় বিরক্ত করার ব্যাপারে সালমান শামিল একটু দ্বিধা করল। কিন্তু পর মুহূর্তেই দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে বলল, আসতে পারি স্যার? ড. পল জনসন চমকে উঠে মাথা তুলল। সালমান শামিলের উপর চোখ পড়তেই তাঁর শিশু সুলভ চোখে একটা আনন্দের দীপ্তি চিকচিক করে উঠল। ছোট্ট করে সে বলল, এস বৎস। সালমান শামিল গিয়ে তাঁর টেবিলের কাছে দাঁড়াল। ড. জনসন তাঁর চোখ দুটি সালমান শামিলের ওপর থেকে সরায়নি। তাকে একটা চেয়ার দেখিয়ে বলল, বস। ড. জনসনের হাসি মাখা মুখ। বলল, বোধ হয় বলতে এসেছ যে, তুমি অপহৃত হওনি? জি স্যার। জান, আমি ঘটনার কথা খুটিয়ে খুটিয়ে শুনেছি। যখন শুনলাম, তোমার ঘুমানোর পোশাকটা বিছানার উপর পড়ে আছে, তখনই আমি বুঝেছি তুমি অপহৃত হওনি, সরে পড়তে পেরেছ। আমি সেদিন বিছানায় ঘুমোতেই যাইনি স্যার প্যান্ট-শার্ট পরা অবস্থায় সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কিছুক্ষণ কথা বলল না ড. পল জনসন. তার চোখটা বুজে গেছে। কিছু একটা চিন্তা করছে সে। ঐ অবস্থাতেই সে প্রশ্ন করল, কিছু চিন্তা করেছ, কারা তোমার সে শক্র? কারা তা জানতে পারিনি স্যার। সালমান শামিল ইচ্ছা করেই ‘হোয়াইট উলফ’-এর নাম গোপন করল আমি চিন্তা করেছি বৎস। প্রথমে ভেবেছিলাম, তোমার অসাধারণ প্রতিভার প্রতি হিংসা পরায়ন কেউ এটা করতে পারে। কিন্তু পরে মনে হয়েছে তা নয়। তোমার শক্রু আরও বড় কেউ। বলতে বলতে ড. পল জনসনের হাসি মাখা মুখটা ম্লান হয়ে গেল। কে হবে স্যার? আমি জানি না, তবে আমার মনে হয়েছে গোটা ককেশাসে যে ভয়াবহ সন্ত্রাসটা চলছে তার সাথে তোমার ব্যাপারটা নিঃসম্পর্ক নয়। মুহূর্ত কয়েক থেমেই আবার শুরু করল, তোমাকে নিয়ে সত্যিই আমি উদ্বিগ্ন বৎস। কেন স্যার? তোমার বিপদ কাটেনি। আমি তোমাকে ইনস্টিটিউটে আসা এ্যালাও করবোনা। এতে তোমার ক্ষতি হবে। কিন্তু তোমার প্রতিভার মূল্য তার চেয়ে অনেক বড়। আমি আগে জানতে পারলে তোমার এই আসাও আমি এ্যালাও করতামনা। তুমি এখান থেকে ফিরে যাও এখনি। ড. পল জনসনের মুখটা গম্ভীর। তাহলে ইনস্টিটিউটে যাব না? না। স্যার সোফিয়ার সাথে দেখা করতে চেয়েছিলাম। হ্যাঁ তার সাথে তুমি দেখা করতে পার। বড় ভাল মেয়ে। তোমার খবর শুনে কেঁদে কেঁদে একাকার। আমাকে এসে বলেছে, আমি পুলিশকে বলে দেই পুলিশ যেন তোমার অনুসন্ধানের ব্যাপারে কোন গাফলতি না করে। তাহলে উঠি স্যার। কোথায় যাবে? সোফিয়া তো এখন লাইব্রেরীতে এসেছে। না তুমি যাবে না। একটু উচ্চ কণ্ঠে বলল ড. পল জনসন। রাগ ফুটে উঠল তাঁর কণ্ঠে। একটু থেমেই আবার সে বলতে শুরু করল, আমি চাই তুমি কারো চোখে না পড়। শোন সালমান, পরাজয়ের প্রতিহিংসা আরও ভয়ংকর। যাদের সেদিন পরাজিত করেছ, তারা কি পরাজয় মেনে নিয়েছে ভেবেছ? ড. পল জনসনের এই কথা সালমান শামিলের মনকেও কাঁপিয়ে দিল। সালমান শামিল সত্যিই ব্যাপারটাকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করেনি। এই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছে, চারিদিকেই শত্রুর চোখ। খোলামেলা চলতে সে পারে না। সালমান শামিল মাথা নিচু করে বলল, এখন আমি বুঝতে পেরেছি স্যার। ড. পল জনসন টেলিফোনের দিকে হাত বাড়াতে বাড়াতে বলল, সালমান, পাশে আমার রেস্ট রুমে গিয়ে বস। আমি সোফিয়াকে ডেকে পাঠাচ্ছি। সালমান শামিল ড. জনসনের অফিস থেকে বেরিয়ে এসে প্রবেশ করল রেস্ট রুমে। দুমিনিট পরেই সোফিয়া এসে উঁকি দিল ড. জনসনের রুমে। কালো স্কার্টের ওপর কালো শার্ট পরেছে সোফিয়া। ড. জনসন মাথা নিচু করে টেবিলে কাজ করছিল। সোফিয়া বলল, আসব সার? আমার রেস্ট রুমে যাও। মাথা না তুলেই বলল ড. জনসন। সোফিয়া এঞ্জেলা দ্বিতীয় প্রশ্ন করার সাহস পেল না, কিন্তু বুঝলনা কেন সেখানে যাবে। ডেকেছিলেন তো তিনি। ঐ রুমে তো কাউকে তিনি প্রবেশ করতে দেন না। আস্তে আস্তে গিয়ে লক ঘুরিয়ে দরজা খুলল রেস্ট রুমের। উকি দিল ভেতরে। সালমান শামিলের ওপর নজর পড়তেই চমকে উঠল সোফিয়া। মুহূর্ত কয়েক তার নড়ার শক্তি থাকলনা। সোফায় গা এলিয়ে চোখ বুজে বসেছিল সালমান শামিল। সে টের পেলনা দরজার দাঁড়ানো সোফিয়াকে। দরজায় কয়েক মুহূর্ত দাড়িয়েঁ সোফিয়া ছুটে গিয়ে ঝাপিয়ে পড়ল সোফার ওপর। সালমান শামিলের একটা হাত ছড়ানো ছিল সোফায়। সোফিয়া উপুড় হয়ে আঁকড়ে ধরেছে সে হাত। অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে সে বলছে, তুমি বেঁচে আছ সালমান, আমার বিশ্বাস হচ্ছেনা, আমার বিশ্বাস হচ্ছে না, তুমি পেরেছ ওদের হাত থেকে ছুটে আসতে। সালমান শামিলও মুহূর্তের জন্যে বিমুঢ় হয়ে পড়ল সোফিয়ার এমন ভেঙ্গে পড়ায়। সালমান শামিল এতটা আশা করেনি। সালমান শামিল হাত টেনে নিতে চেষ্টা করল। কিন্তু পারলনা, বলল, শান্ত হও সোফিয়া। বলেছি না যে জীবন-মৃত্যু আল্লাহর হাতে। একটু থেমে সালমান শামিল আবার বলল, তুমি সেদিন সাবধান না করলে আমি হয়তো কিছু বুঝতে পারতাম না, পালাতেও পারতমাম না। মুখ তুলল সোফিয়া। অশ্রু ধোয়া তার মুখ। বলল, ওরা তোমার ধরতে পারেনি? না। তাহলে তুমি কোথায় ছিলে? কাগজে নিউজ বেরুল। আমরা এদিকে অস্থির। ‘আমরা’ কে, শুধু তো তুমি? না, তুমি ডিরেক্টর স্যারকে জান না। তিনি তোমাকে ছেলের চেয়েও বেশি ভালবাসেন। সোফিয়া এঞ্জেলা শান্ত হয়ে সোফায় সালমান শামিলের পাশে বসল। তুমি নাকি খুব কেঁদেছিলে? বলল সালমান শামিল। কে বলল? ডিরেক্টর স্যার। তুমি কি চেয়েছিলে? আমি হাসি? হাসলে কি হতো? কিছুই হতো না। কিন্তু তোমার মত কি সব মানুষ পুস্তকের পাতায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে বসে আছে। তাদের একটা মন আছে। মন তো অনেকেরই আছে, কিন্তু কেউ তো কাঁদেনি? যার ইচ্ছা কেঁদেছে। সে কথায় তোমার কাজ নেই। এখন বল, স্যারের এ নিষিদ্ধ রুমে কেন? স্যারের সাথে দেখা করতে এসেছিলাম। স্যার লাইব্রেরীতে যেতে দেয়নি। কেন? স্যার আমার নতুন বিপদের ভয় করছেন। স্যার বলেছেন, তিনি আগে জানতে পারলে ইনস্টিটিউটে আসতেই তিনি আমাকে নিষেধ করতেন। তিনি এতটা আশংকা করছেন? মুখ কালো করে বলল সোফিয়া। তিনি বলেছেন পরাজিত শত্রুরা আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। উদ্বেগ ফুটে উঠল সোফিয়ার চোখে-মুখে। কি চিন্তায় যেন সে ডুবে গেল। ধীরে ধীরে তার চোখে-মুখে উদ্বেগের স্থলে ভয় ও আতংক ফুঠে উঠল। বলল, স্যার ঠিকই বলেছেন সালমান। তোমার ইনস্টিটিউটে আসার তাহলে কি হবে, পরীক্ষা সামনে, কেমন করে পরীক্ষা দেবে? সালমান শামিল মুখে হাসি টেনে বলল, ইনস্টিটিউটে আসতে পারবনা, পরীক্ষা দিতে পরবনা। তুমি খুশি হবে। খুশি হব? বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলেল বলল সোফিয়া। হ্যাঁ। ইনস্টিটিউটে শেষ পরীক্ষাটায় তুমি প্রথম স্থান অধিকার করবে। মুহূর্তে বেদনায় নীল হয়ে গেল সোফিয়ার মুখ। বোবা দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকল সালমান শামিলের দিকে। তার চোখ থেকে কয়েক ফোটা অশ্রু খসে পড়ল তার গন্ডে। বলল, সালমান তুমি এত নিষ্ঠুর! তুমি এত কম মূল্যে মানুষকে বিচার কর! তুমি কি জান না, তোমার রেজাল্ট নিয়ে আমার চেয়ে বেশি গর্ব আর কেউ করেনা? বলে দুহাতে মুখ ঢাকল সোফিয়া। সালমান শামিল গম্ভীর কণ্ঠে বলল, আমি ওটা কথার কথা বলেছি সোফিয়া। তুমি এতটা সিরিয়াসলি...... সালমান শামিলকে বাধা দিয়ে সোফিয়া বলল, না এ সময় তুমি এমনভাবে কথা বলতে পারনা। স্বীকার করছি, এভাবে বলা আমার ভুল হয়েছে। কোন বিষয়ই, বিশেষ করে নিজের ব্যাপার, তুমি সিরিয়াসলি নাও না। এটা তোমার দোষ। স্বীকার করছি সোফিয়া। সোফিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, এখন কি করবে ভাবছ? স্যার বলেছেন, সরে থাকতে হবে কিছু দিন। কত দিন? আমি জানি না। আবার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল, সোফিয়া। সে নত মুখে শার্টের বোতাম খুটছিল। এক সময় সে মুখ তুলল। বলল, আমার সাথে দেখা হবে না? যদি সম্ভব না হয়? তোমার কোন খবর জানাবে না? চেষ্টা করব। দুজনেই নীরব। মাথা নিচু করে বসে আছে সোফিয়া। সালমান শামিল একবার সে নত মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমাকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করব সোফিয়া? সোফিয়া মুখ তুলে বলল, কর। সালমান শামিল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে বলল, আমার বিপদ আসছে, এ খবর তুমি কার কাছ থেকে পেয়েছিলে? সোফিয়া এঞ্জেলা মাথা তুলে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে সালমান শামিলের দিকে তাকাল। বলল, এ তথ্যের কি তোমার খুব বেশি প্রয়োজন? শত্রুকে না চিনলে আমি তার কাছ থেকে কিভাবে আত্মরক্ষা করব? সোফিয়া আবার কিছুক্ষণ চুপ থাকল। তার মুখ নিচু, গম্ভীর। কালো বেদনার একটা ছায়া তার গোটা মুখে। একটা যন্ত্রণা যেন তার চোখ-মুখ থেকে ঠিকরে পড়েছে। সালমান শামিলসেদিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। বলল, আমি চাপ দেব না সোফিয়া। সোফিয়া চোখ তুলল। তার চোখ জলে ভরা। বলল, সালমান তোমাকে অদেয় আমার কিছু নেই। তার চোখ থেকে কয়েক ফোটা পানি খসে পড়ল। সোফিয়া চোখ মুছে বলল, আমার বাবা, আমার বাবার কাছ থেকে শুনেছি। তোমার বাবা? বিস্ময় ঝরে পড়ল সালমান শামিলের কণ্ঠে। সোফিয়া মুখ তুলে স্পষ্ট কণ্ঠে বলল, আমি জানতে পেরেছি আমার বাবা ‘হোয়াইট উলফ’-এর একজন নেতা। সালমান শামিল কিছুক্ষণ স্তব্ধভাবে বসে রইল। কোন কথা বলতে পারছিলনা; অনেকক্ষণ নীরবতার পর বলল, তোমাকে বললেন কেন? না, আমাকে বলেনি। বলে একটু থামল সোফিয়া। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল: একদিন রাত দশটা। আবার শোবার ঘরের পাশ দিয়ে আসছিলাম। হঠাত আবার একটা কথা আমার কানে গেল। আব্বা আম্মাকে বলছেন, ‘একটা বিরল প্রতিভার মৃত্যু হল এলিজা।‘ আব্বার এই কথা শুনে কৌতুহলবশত আমি থমকে দাঁড়ালাম। কে, কোন প্রতিভা? মা, প্রশ্ন করলেন আব্বাকে। সালমান শামিল। বললেন আব্বা। সালমান মারা গেছে? কবে? সোফিয়া তো বলেনি কিছু? মা বিস্ময় প্রকাশ করলেন। মরেনি, মরার পরোয়ানা জারি হয়ে গেছে। কি বলছ তুমি? হ্যাঁ এলিজা–‘হোয়াইট উলফ’ এর ‘প্রতিরোধ নির্মূল’-এর পরিকল্পনায় সালমান শামিলের নামও এসেছে। অতএব তাকে মরতে হবে। এর কোন নড়চড় হতে পারে না? উৎকণ্ঠার সাথে মা বললেন। না। বরং তার নাম অনেক পরে ছিল, তাকে সামনে আনা হয়েছে। যতই বল এটা অন্যায় অযৌক্তিক নিষ্ঠুরতা। এলিজা, মুখ সংযত কর। দরকার হলে ‘হোয়াইট উলফ’ কিন্তু হাসতে হাসতে তোমার বুকেও ছুরি বসাতে পারে। এর কাছে কোন ব্যক্তি নয়, জাতি বড়। আম্মাকে ধমক দিয়ে আব্বা এই কথাগুলো কঠোর ভাষায় বললেন। তাদের মধ্যে আর কি কথা হয়েছিল জানি না আমি। আমার সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার মত অবস্থা ছিল না। আমি কাঁপতে কাঁপতে সেখান থেকে ফিরে এসেছিলাম। তার পরদিনই আমি তোমাকে সাবধান করেছি। থামল সোফিয়া এঞ্জেলা। দু’জনেই চুপচাপ। কারো মুখেই কোন কথা নেই। দেয়াল ঘড়িতে দশটা বাজার শব্দ হলো। সালমান শামিল উঠে দাঁড়িয়ে বলল, তোমার ক্লাসের সময় হলো, তুমি যাও সোফিয়া। সোফিয়াও উঠে দাঁড়াল। বলল কিছু বললে না? কি বলব? আল্লাহই আমার ভরসা। স্লান হেসে বলল সালমান শামিল। দু’জনে চলতে শুরু করল। দরজার কাছাকাছি এসে সোফিয়া সালমান শামিলের হাত চেপে ধরে বলল,সালমান, ডিরেক্টর স্যার ঠিকই বলেছেন। তুমি খুব সাবধানে থেকো। তুমি তোমার ওপর অবহেলা করো না। সালমান মুখটা ঘুরিয়ে সোফিয়ার দিকে ফিরে বলল, তুমি দেখেছ আমি অসাবধান নই সোফিয়া। বাকি আল্লাহর হাতে। বলে সালমান শামিল বেরিয়ে এল ঘর থেকে। তার সাথে সোফিয়াও। করিডোরে বেরিয়ে সালমান শামিল সালমান একবার ডক্টর পল জনসনের দরজার দিকে তাকাল। কিন্তু তাকে আর বিরক্ত করা ঠিক মনে করল না। সে বারান্দার সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নেমে এল নিচের নলে। ওখানেই তার গাড়ি দাঁড়িয়েছিল। সালমান শামিল গাড়িতে উঠে বসল। গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে সালমান শামিল একবার ফিরে চাইল বারান্দার দিকে। দেখল সেখানে শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে আছে সোফিয়া এঞ্জেলা। সালমান শামিল হাত তুলল। সোফিয়াও হাত তুলে বিদায় জানাল। স্টার্ট দিয়ে সালমান শামিলের গাড়ি তীরের মত বেরিয়ে গেল ইন্সটিটিউটের গেট দিয়ে রাস্তায়। সেই পথের দিকে তাকিয়ে অচল মূর্তির মত দাঁড়িয়ে ছিল সোফিয়া এঞ্জেলা। গাড়ি তার দৃষ্টির আড়ালে চলে গেছে অনেক্ষন। কিন্তু পথের ওপর তার শূন্য দৃষ্টিটা আটকে আছে। এই সময় প্রচণ্ড একটা ধাতব সংঘর্ষের তীক্ষ্ণ শব্দ ভেসে এল বাগানের ওপার থেকে। বাগানের ওপারেই জন পল রোড। শব্দটি সোফিয়া এঞ্জেলার মনকেও কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। কিন্তু তার তন্ময়তা ভাঙতে পারল না। শব্দটি বাতাসে মিলিয়ে যাবার অল্পক্ষণ পরেই গেটের দারোয়ান ছুটে এল। হন্ত-দন্ত হয়ে সে গিয়ে ঢুকল ডক্টর জনসনের ঘরে। বিস্মিত সোফিয়া এঞ্জেলাও এক পা, দু’পা করে এগুচ্ছিল ডক্টর জনসনের ঘরের দিকে। এই সময় ডক্টর জনসন দারোয়ানের সাথে দ্রুত বেরিয়ে এল তার ঘর থেকে। উদ্বিগ্ন তার চখ-মুখ। সোফিয়া এঞ্জেলাকে সামনে পেয়ে বলল, শুনেছ? কি স্যার? সোফিয়া এঞ্জেলার চখে-মুখে উদ্বেগ। দারোয়ান বলছে, আমাদের গেটে একটা এ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। এ্যাকসিডেন্টে সালমান শামিলের জীপ উল্টে যায়। একটু দম নিল ডক্টর জনসন। তারপর কথা শুরুর আগেই অধৈর্য সোফিয়া এঞ্জেলা বলল, সালমান শামিল কোথায়? তার কথা আর্ত চিৎকারের মত শোনাল। ও জীপ থেকে ছিটকে পড়ে। একটা মাইক্রোবাস তাকে তুলে নিয়ে গেছে। কথা শেষ করেই ডক্টর পল জনসন বারান্দার সিঁড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। বলল, এস তোমরা। সবাই এসে গেটে দাঁড়াল। গেটের পর প্রায় সাত ফুটের মত ফুটপাত। তারপর শুরু হয়েছে রাস্তা। সালমান শামিলের জীপটি গেটের ডান দিকে প্রায় গজ দশেক দূরে রাস্তার ওপর উল্টে পড়ে আছে। দারোয়ান জানাল, সালমান শামিলের জীপটি রাস্তায় উঠে যখন ডান দিকে মোড় নিতে যাচ্ছিল, তখন উত্তর দিক থেকে একটা ট্রাক আসে। তার সাথে ধাক্কা খেয়ে জীপটি উল্টে যায়। সালমান শামিল রাস্তার ওপর ছিটকে পড়েই উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করে। এই সময় একটা মাইক্রোবাস এসে তার পাশে দাঁড়ায়। মাইক্রোবাস থেকে দু’জন লোক নেমে তাকে মাইক্রোবাসে টেনে তোলে। সেন্ট জন পল রোড বাম দিকে ইন্সটিটিউটের একাডেমী ভবনের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে। ওদিক থেকে ট্রাক এল কেন? আর যেখানে ট্রাকটা এসে জীপের সাথে ধাক্কা খেয়েছে, এত বড় রাস্তা ফেলে সেখানে ট্রাকটা এল কেন? এক্সিডেন্টের পর যে উঠে দাঁড়াতে পারে, তাকে তুলে নিয়ে মাইক্রোবাসটি ঐভাবে চলে গেল কেন? এ প্রশ্ন সামনে আসার পর ডক্টর জনসন অজান্তেই যেন দু’হাতে তার মাথা চেপে ধরল। একটা যন্ত্রনা যেন অনুভব করছে সে। অস্ফুটে তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ‘মাই ইলফেটেড বয়’। পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল সোফিয়া এঞ্জেলা। উদ্বেগে সে যেন কাঁপছে। বলল, স্যার হাসপাতালে দয়া করে খোঁজ নিন। না হয় চলুন হাসপাতালে। ডক্টর জনসন ধীরে ধীরে ফিরল সোফিয়া এঞ্জেলার দিকে। তাঁর মুখ বেদনার্ত, গম্ভীর। বলল, মাই ডটার, হাসপাতালে ওকে পাওয়া যাবে না। কেন স্যার? আর্তস্বরে বলল সোফিয়া এঞ্জেলা। যাকে এ্যাক্সিডেন্ট মনে করেছ, সেটা এ্যাক্সিডেন্ট নয়। তাকে আবার কিডন্যাপ করা হয়েছে। ‘ও গড’ বলে চিৎকার করে উঠে দু’হাতে মুখ ঢেকে রাস্তার ওপরেই বসে পড়ল সোফিয়া এঞ্জেলা। অন্ধকার ঘরে চোখ খুলল সালমান শামিল। চিন্তা করতে চেষ্টা করল কোথায় সে? বুঝল কংক্রিটের একটা নগ্ন মেঝেতে সে শুয়ে আছে। তার মনে পড়ল, সে জীপ নিয়ে ইনস্টিটিউটের গেট দিয়ে বের হয়ে এসেছিল। সে বাম দিক মোড় নেবার জন্য স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে নিচ্ছিল। হঠাৎ তার চোখে পড়ে বাম দিক থেকে একটা ট্রাক তার জীপ লক্ষ্যে ছুটে আসছে। কিছু করার আগেই ট্রাকটির প্রচণ্ড একটা আঘাতে জীপ সমেত সে ছিটকে পড়ে। মনে পড়ছে মাথাটা প্রচণ্ড বাড়ি খেয়েছিল পিচ ঢাকা রাস্তার সাথে। চোখ তার অন্ধকার হয়ে আসে। এই সময়েই কারা যেন তাকে গাড়িতে টেনে তলে। একটা মিষ্টি গন্ধ তার নাকে প্রবেশ করে। আর কিছুই মনে নেই তার। সালমান শামিল হাত-পা নেড়ে দেখল, হাত-পা বাঁধা নেই। কপালের বাম পাশে একটা জায়গা খুব ব্যথা করছে। মাথার ঐ জায়গাটাই রাস্তার সাথে বাড়ি খেয়েছিল। উঠে বসল সালমান শামিল। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। রাত না দিন কিছুই বোঝা যাচ্ছে ন। কোথায় সে? সন্দেহ নেই, সে শত্রুর হাতে। এবং তার অনুমান মিথ্যা না হলে ‘হোয়াইট উলফ’-এর হাতে সে বন্দী। ডক্টর স্যারের কথাই সত্য হল, ‘হোয়াইট উলফ’ তার পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে কোন সুযোগই নষ্ট করেনি। সালমান শামিল উঠে দাড়াল। শরীরটাকে খুব হালকা ও দুর্বল মনে হল। ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। অন্ধকারে হাতড়িয়ে ঘরের দেয়াল স্পর্শ করল সালমান শামিল। দেয়াল ধরে সে দরজার সন্ধানে এগুল। কিছু খোঁজার পরই দরজা পেয়ে গেল। হাত দিয়েই বুঝল ইস্পাতের দরজা। আরেকটু খুঁজে হাতল পেয়ে গেল দরজার। হাতল ধরে টান দিল সে। সঙ্গে সঙ্গে আলো জ্বলে উঠল, কিন্তু দরজা খুলল না। সালমান শামিল দেখল, বিরাট হল ঘর। হল ঘরের এক পাশে শোবার সুন্দর একটি ডিভান। আর অন্য পাশে সিংহাসনের মত বড় এবং সুন্দর একটা চেয়ার। ঘরের লম্বালম্বি দু’পাশ দিয়ে শোফা সেট সাজানো। শ্বেত পাথরের মেঝ। দেখলে মনে হয় এক দরবার কক্ষ এটা। একমাত্র ঐ দরজা ছাড়া কোন দরজা-জানালা ঘরে নেই। কিন্তু কোন অস্বস্তি বোধ হচ্ছে না। এতক্ষণ সালমান শামিল উপলব্ধি করল, ঘরটা এয়ারকন্ডিশন করা। সালমান শামিল দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল। দেখল সে তার সামনেই দরজাটা নিঃশব্দে খুলে গেল। বুঝল স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল সালমান শামিল। বেরিয়ে সে দীর্ঘ বারান্দায় এসে দাঁড়াল। দু’পাশে তাকিয়ে দেখল, বারান্দাটি সামনে গোল হয়ে বেঁকে গেছে। বারান্দার পরেই উন্মুক্ত উঠান। ওটাও বারান্দার মতই। গোল হয়ে বেঁকে যাওয়া। উঠান এক বিরাট মাঠের মত। মাঝখানটা উঁচু। চারদিকটা ঢালু হয়ে চারদিকের বিল্ডিং এর বারান্দায় গিয়ে ঠেকেছে। উঠানের মাঝখানে উঁচু শীর্ষবিন্দুটিতে শ্বেত পাথরের একটা বেদী। বেদীর উপর শ্বেত মর্মরের একটা সুদৃশ্য মূর্তি। সালমান শামীল উঠান পেরিয়ে সেই বেদীর উপর গিয়ে দাঁড়াল। মূর্তিটির মুখোমুখি হতেই সালমান শামিল চিনল ওটা শামিউনের মূর্তি। শামিউন খৃষ্টান আর্মেনিয়ার জাতীয় বীর। বৃহত্তর খৃস্টান আর্মেনিয়া গড়ার স্বপ্ন নতুন করে সে চাঙ্গা করে এবং সর্বশেষ সংগ্রাম তার দ্বারাই পরিচালিত হয়। রাশিয়ান জারের পতন ঘটলে ১৯১৮ সালের আটাশে মে ককেশাসের মুসলমানরা স্বাধীনতা ঘোষণা করে। কম্যুনিস্ট বিপ্লবের আগে লেনিন ককেশাসের মুসলমানদের এই স্বাধীনতারই আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু প্রতিশ্রুতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে লেনিন মুসলমানদের স্বাধীনতার কণ্ঠ রোধ করার জন্য ১৯১৭ সালে বিপ্লবের পরই বিশাল কম্যুনিস্ট বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে শামিউনকে ককেশাসে পাঠায়। আর্মেনীয় শামিউন ছিল বৃহত্তর খৃষ্টান আর্মেনিয়া গড়ার স্বপ্নে বিভোর মুসলিম বিদ্বেষী একজন মানুষ। শামিউন কম্যুনিস্ট বাহিনী নিয়ে ককেশাসে প্রবেশ করে প্রথমে ট্রেড ইউনিয়ন ও আঞ্চলিক নির্বাচনের প্রহসন করে ককেশাসের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেবার চেষ্টা করে। কিন্তু ককেশীয় সচেতন জনগণ তাদের সে ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেয়। সবখানেই মুসলিম নেতৃবৃন্দ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। এরপরই শুরু হয় গণহত্যা। শামিউন বিশাল কম্যুনিস্ট বাহিনীর সহায়তায় ১৯১৮ সালের মার্চ থেকে পরবর্তী চার-পাঁচ মাসে উল্লেখযোগ্য মুসলিম নেতৃবৃন্দসহ পচাত্তর হাজার মুসলিম নর-নারীকে হত্যা করে। কিন্তু চির স্বাধীনতাকামী ককেশীয় মুসলমানরা এত সহজে দমবার পাত্র ছিল না। তারা নতুন করে সংঘবদ্ধ হয় এবং চার মাসের চেষ্টায় শামিউনসহ কম্যুনিস্ট বাহিনীকে তারা ককেশাস থেকে বিতাড়িত করে। কিন্তু ককেশীয় মুসলমানদের দূর্ভাগ্য, ক্রিমিয়া, তাতারিয়া ও মধ্য এশিয়ার মুসলমানদের অব্যাহত পরাজয়ে ককেশাসের উপর কম্যুনিস্ট চাপ বৃদ্ধি পায়। ১৯২০ সালের ২৭ এপ্রিল শামিউন রুশ সৈন্যের সাহায্যে ককেশাস দখল করে নেয়। তার অত্যাচার ও গণহত্যার ফলে মুসলিম জনপদগুলো শ্মশানে পরিণত হয়। পুড়িয়ে দেয়া মসজিদ, স্কুল, পাঠাগার ইত্যাদিতে বহু বছর কেউ পা দেয়নি। এই জালিম শামিউনই আর্মেনিয়ার এক মহান নায়ক। কম্যুনিস্টদের জন্য এত কিছু করেও শামিউন কিন্তু কম্যুনিস্টদের কাছ থেকে কিছুই পায়নি। ককেশাস কম্যুনিস্টদের করতলগত হবার পর বৃহত্তর আর্মেনিয়া গঠিত হয়নি, বরং ককেশাসকে জর্জিয়া, আজারবাইজান, তাতারিয়া ও আর্মেনিয়ার মাঝে ভাগ করে দেয়া হয়। আর্মেনিয়ার ভাগে সবচেয়ে কম অঞ্চলই পড়ে। আজ মুসলমানদের উদ্যোগে কম্যুনিস্ট সাম্রাজ্য যখন ধ্বসে পড়েছে, তখন আর্মেনিয়রা তাদের বৃহত্তর খৃস্টান আর্মেনিয়ার স্বপ্ন নিয়ে আবার মাথা তুলেছে ককেশাসের মুসলমানদের বিরুদ্ধে। আর তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে মুসলমান বিদ্বেষী কম্যুনিস্ট ও খৃষ্টান রাষ্ট্রগুলো। সালমান শামিলের মনে হল, শ্বেত মর্মরে গড়া শামিউনের উই উদ্ধত মূর্তি তাদের সে সম্মিলিত চেষ্টারই প্রতীক। পুজোর বেদীতে শামিউনকে প্রতিষ্ঠা করে তারা শামিউনের সেই গণহত্যা ও সন্ত্রাসেরই পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চাচ্ছে ককেশাসে। সালমান শামিল দেখল, শামিউনের বাম হাতে একটা মানচিত্র। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। বৃহত্তর আর্মেনিয়ার মানচিত্র ওটা। পারস্যের একটা অংশ এবং গোটা পূর্ব আনাতোলিয়াসহ কৃষ্ণ সাগর ও কাম্পিয়ান সাগরের সমগ্র অঞ্চলকে বৃহত্তর আর্মেনিয়ার অংশ দেখানো হয়েছে। ডান হাত তার মুষ্টিবদ্ধভাবে উপরে তোলা যা শক্তির প্রতীক। অর্থাৎ শক্তির জোরেই তারা বৃহত্তর আর্মেনিয়া গঠন করবে। সালমান শামিলের চোখ নেমে এল নিচে। তার চোখ শামিউনের পায়ের তলার বেদীতে নিবদ্ধ হতেই ভীষণভাবে চমকে উঠলো সালমান শামিল। দেখল, শামিউনের মূর্তি যে প্রস্তরখণ্ডের উপর দাঁড়িয়ে আছে, তার চারদিক ঘিরে নরমুণ্ডু সারিবদ্ধভাবে সাজানো। নরমুণ্ডুগুলো পিতলের প্লেটে রাখা। যেন অর্ঘ দেয়া হয়েছে শামিউনের পায়ে। নরমুণ্ডুগুলো শামিউনের পদ-তলের সোপান ঘিরে একটি বৃত্ত রচনা করেছে। শামিউনের বাম পাশ থেকে আরেকটি বৃত্তের কাজ শুরু হয়েছে। এ অসমাপ্ত বৃত্তের শেষ নরমুণ্ডুটি সালমান শামিলের একেবারে সামনেই। সালমান শামিল বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করল এই শেষ নরমুণ্ডটির আগের পিতলের প্লেটটি খালি। একটা প্লেট খালি রেখেই পরের প্লেটে শেষ নরমুণ্ডটি রাখা হয়েছে। একটা কৌতুহলই হলো। সালমান শামিল কয়েক পা সামনে এগুলো। সামনের নরমুণ্ডটি তার কাছে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠলো। শামিউনের মূর্তি-মুখো করে দাঁড় করিয়ে রাখা নরমুণ্ডটির মাথার খুলিতে কাল কালিতে লেখা তিনটি শব্দ তার নজরে পড়ল। পড়ার জন্যে সামনে একটু ঝুঁকে পড়লো সালমান শামিল। কালো কালির “আল্লামা ইব্রাহিম এদতিনা” নামটি জ্বল জ্বল করে উঠল তার সামনে। হদয়ের কোথায় যেন প্রচণ্ড এক ধাক্কা খেল সালমান শামিল। মুহূর্তের জন্যে নিঃশ্বাস নিতেও সে ভুলে গেছে যেন। অব্যক্ত যন্ত্রণার একটা ঢেউ খেলে গেল তার গোটা দেহে -সমগ্র স্নায়ূতন্ত্রীতে। আরেকটু ঝুঁকে পড়লো সালমান শামিল নরমুণ্ডটির ওপর। ঔষধ দিয়ে মাথাটি পরিষ্কার করা হয়েছে। সালমান শামিল দেখল হাড়গুলো একদম কাঁচা। মনে হচ্ছে, আজই বা এই মাত্র একে এখানে রাখা হয়েছে। লেখার কালিগুলো যেন এখনও ভাল করে শুকায়নি। অর্থাৎ তাকে কিডন্যাপ করে আজ কালের মধ্যেই খুন করা হয়েছে। সালমান শামিল মাথা তুলে পাশের নরমুণ্ডটির দিকে এগিয়ে গেল। মাথার খুলিতে সেই কালো কালিতে লেখা নাম পড়ল, ‘আবুল বরকত আহমদভ’। আবুল বরকত আহমদভ ছিল ককেশাসের নাগারনো কারাবাখ অঞ্চলের ‘ককেশাস ক্রিসেন্ট’ এর প্রধান। দিন আটেক আগে সে হারিয়ে যায়। সালমান শামিল মাথা তুলল। বেদনা বিস্ফোরিত তার চোখ। তার মনে জেগে উঠল জিজ্ঞাসা, তাহলে কি আমাদের হারানো সব নেতৃবৃন্দকে এনে শামিউনের পায়ে অর্ঘ দেয়া হয়েছে? সালমান শামিল গুণে দেখল, প্রথম বৃত্তটিতে বিশটি মাথা এবং অসমাপ্ত দ্বিতীয় বৃত্তটিতে ছটি মাথা। হিসেব মিলে যায়, বিগত কয়েক সপ্তাহে ছাব্বিশজন মুসলিম নেতার অন্তর্ধান ঘটেছে, আর ছাব্বিশটি মাথাই এখানে আছে। তবুও একবার ঘুরে ঘুরে নামগুলো দেখল। নজর বুলাল তাদের কংকালে পরিণত হওয়া মুখের দিকে। চোখ ফেটে অশ্রু নেমে এল তার। সবশেষে সে এসে দাঁড়াল ছাব্বিশ নম্বরে রাখা পিতলের খালি প্লেটের কাছে, মনে পড়লো, হ্যাঁ-তালিকায় তার নাম ছাব্বিশ নম্বরে ছিল। অর্থাৎ এ প্লেটটি তার মাথার জন্যেই নির্ধারিত। যেহেতু তার মাথা পাওয়া যায়নি এ পর্যন্ত, তাই ওটা খালি রাখা হয়েছে। এই সময় বেদীর বুক থেকে একটা কণ্ঠ ধ্বনিত হল। বলল, সালমান ঠিকই ভাবছ, এ প্লেটটি তোমার জন্যেই নির্ধারিত। শিঘ্রই তুমি ওর গৌরব বৃদ্ধি করবে। সালমান শামিল, বুঝল, বেদীর সাথে মাইক্রোফোন সংযোগ রয়েছে। সালমান শামিল চারদিকে একবার নজর বুলালো। চারদিকে ঘোরানো বিশাল বিল্ডিং এর সবগুলো দরজাই বন্ধ, একমাত্র তার ঘরের দরজাটা ছাড়া। সালমান শামিল ধীরে ধীরে বেদী থেকে নেমে এল। সে গোটা বিল্ডিংটা একবার দেখতে চায়। কি আছে, কে আছে ঐ বন্ধ ঘরগুলোতে। কেন কেউ তার সামনে আসছে না। সালমান শামিল যে ঘরে ছিল সেটা বেদীর পূর্ব দিকে। সালমান শামিল পশ্চিম প্রান্তের বিল্ডিং এর দিকে নেমে গেল। ঘোরানো বিল্ডিংটা গোটাটাই তিনতলা। দূর্গের মত দেখতে। ধরণ-ধারণ ও অবস্থা দেখলেই বোঝা যায়, শত বছরেরও বেশি পুরানো বিল্ডিং। কিন্তু খুবই মজবুত তাতে কোন সন্দেহ নেই। সালমান শামিল চিন্তা করে পেল না, এমন বিল্ডিং ইয়েরেভেনের কোথায় আছে। ইয়েরেভেনের প্রতি ইঞ্চি জায়গা সে চেনে। আড়াই হাজার বছর আগের ধ্বংসাবশেষ, এক হাজার, দেড় হাজার বছর আগের ভগ্ন প্রাসাদসহ সব কিছুই সে দেখেছে। কিন্তু এ ধরণের একটা জায়গা, এ ধরণের একটা ভবন তো কোথাও দেখেনি! তাহলে কি এটা ইয়েরেভেন নয়? আর্মেনিয়ার দূর্গম স্থানের কোন কি গোপন নগরী? সালমান শামিল এসে বারান্দায় উঠে একটা কক্ষের দরজার দিকে চলল। এ সময় একটা কণ্ঠ বিকট শব্দে হেসে উঠল। বলল, সালমান শামিল ঘরগুলো তুমি সার্চ করতে চাও? পারবে না। দরজা তুমি কোনভাবেই ভাঙতে পারবে না। আর ভাঙলেও কোন লাভ হবে না। এই গোটা বিল্ডিং এ তুমি ছাড়া আর কেউ নেই। তুমি বেঁচে থাকা পর্যন্ত ওখানে কারো যাবারও দরকার নেই। কণ্ঠটি একটু থামল। একটু পরেই আবার বলে উঠল, ‘হোয়াইট উলফ’ একটা শিকারের ওপর দু’বার ঝাপিয়ে পড়ে না। কিন্তু তোমার ক্ষেত্রে একটা অসম্ভব ব্যতিক্রম ঘটেছে। তাই তোমার ব্যাপারে তারা একটা মজার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তোমার গায়ে তারা হাত লাগাবে না। একজন মানুষ ক্ষুধায়-তৃষ্ণায় কিভাবে তিল তিল করে মৃত্যুবরণ করে সে দৃশ্যটা তারা ধীরে সুস্থে দেখবে। কথা শেষ করে কণ্ঠটি আবার সেই বিকট শব্দে হেসে উঠল। এক সময় তার হাসিটিও থেমে গেল। সালমান শামিল কয়েক মূহুর্ত বিমূঢ়ের মত দাঁড়িয়ে থাকল। সে ঐ কন্ঠের কোন কথাকেই অবিশ্বাস করলো না। ‘হোয়াইট উলফ’-এর পেছনে খৃষ্টানদের যে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংস্থা ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান এবং যে কম্যুনিষ্ট সন্ত্রাসবাদী সংস্থা, ‘ফ্র’ রয়েছে, তাদের চেয়ে জঘন্য, বর্বর, পশু কোন কিছু আর দুনিয়াতে নেই। এদের উম্মত্ত ও বিকৃত মানসিকতা সব পারে। সালমান শামিল ফিরে দাঁড়াল। সে হাঁটতে শুরু করল তার ঘরের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে সে ভাবল, তার প্রতিটি পদক্ষেপ ওরা টেলিভিশন ক্যামেরায় দেখছে। বিল্ডিংসহ গোটা এলাকার সবকিছুই নিশ্চয়ই টেলিভিশন ক্যামেরার আওতায়। সালমান শামিল তার ঘরের দরজায় এসেও আবার বারান্দায় ফিরে গেল। বসে পড়ল সে বারান্দার পাথরের মেঝেতে। অনেক হেঁটেছে। খুব ক্লান্তি লাগছে তার। আর খাদ্য ও পানি পাওয়া যাবে না শুনে ক্ষুধা-তৃষ্ঞাও যেন হঠাৎ বেড়ে গেল।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৭৮ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ৮.সিংকিয়াং থেকে ককেশাস (৬)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন