বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
- তুমি কোন মেয়ের সাথে কোথায় দেখা কর, সময়
কাটাও
ভেবেছ আমি জানি না?
- কি বলছ এসব?
- কি বলছি? আমার কাছে সব খবর আছে, কোন বান্ধবীর
সাথে, কোন কলিগের সাথে, কোথায় যাও। কাকে কি
কিনে
দাও।
- আজে বাজে কথা বলবে না।
দুই মোবাইলের দুই পাশে এসব কথা হচ্ছে। কান একদম
ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে। এসব শুনতে ভাল লাগছে না।
মেয়েটা বকে যাচ্ছে। ছেলেটা শুনে যাচ্ছে। একটু পর
অবস্থা আরও বেগতিক হবে। পারলে মোবাইলের ওপাশ
দিয়ে গলা টিপে ধরবে।
এবার অন্য কিছু শোনা যাক। নাহ এদের কথা বার্তা অনেক
শান্ত। মনে হচ্ছে এদের মধ্যে সম্পর্ক অনেক ভাল।
- হ্যাঁ শোন, কাল কিন্তু আমরা আবার দেখা করব ঠিক
আছে?
- আচ্ছা।
- তোমার সময় হবে তো?
- কি যে বল, তোমার জন্য সারাদিন সময় আছে।
- বাদামে চলবে না কাল। আমরা দুজন সারাদিন ঘুরে
বেড়াবো আর দুপুরে ভারী খাবার খাব।
- তোমার যা ইচ্ছা।
- রেস্টুরেন্টের খাবার অত ভাল না। একটা মুরগীর পিস
দিয়ে কারি কারি টাকা নিয়ে নেয়। আমি তার চেয়ে
রান্না করে নিয়ে আসব তোমার জন্য। খাবারের ব্যাগ
টানতে তোমার কোন অসুবিধা নেই তো?
এদের কথা শুনতে খারাপ লাগছে না। বাহ কি সুন্দর কথা
বার্তা। কথা গুলো শুনছে একটা ছয় তলা বিল্ডিঙের ছাদে
বসে বসে। যে শুনছে তার নাম ER821. নামের অনেক
বড়
মর্মার্থ আছে। E হল স্টেশনের ব্লকের নাম। R হল
রোড
নং , 8 হল বাড়ির নাম্বার আর 21 হল বাড়িতে বাস
করাদের মধ্যে ওর সদস্য নাম্বার। নাম বললেই যে কেউ
ঠিকানা খুঁজে পেতে পারে। আর এখানকার মানুষদের নাম বড়
অদ্ভুত। এক মেয়েকে শোনা গেল, তার পাশে বসা
ছেলেটাকে
ডাকছে কিলটু সোনা। অতি দ্রুত ER821 , কিলটু সোনা
লিখে ডিকশনারিতে সার্চ দিল। কোন ফলাফল নেই।
বাংলা ডিকশনারিতে সোনার অর্থ পাওয়া গেলেও, কিলটুর
কোন অর্থ নেই। কি আজব অবস্থা। একটা তিন চাকার
যানবাহন চালাচ্ছেন এক লোক। সেই লোকের নাম আবার
মামা। সবাই তার নাম জানে। মামা অর্থ যে জন্ম
দিয়েছেন তার ভাই। এটাও একটা অদ্ভুত নাম। তবে ঘুরতে
ঘুরতে ER821 সবচেয়ে বেশী এই নামের লোকই
দেখল।
এক লোক ঠাণ্ডা সরবত বিক্রি করেন তার নাম মামা,
গরম চা বিক্রি করেন তার নাম মামা, এক লোক ইঞ্জিন
যুক্ত গাড়ি চালান তার নাম মামা, যে ভাড়া তুলেন তার
নামও মামা। কি যে অবস্থা। পুরো শহর জুড়ে শুধু মামা
নামের লোকজন। এর চেয়ে ER821 এর এলাকাই কত ভাল।
এক নামের দুইজন নেই। ER821 থাকে যেখানে
সেখানটাকে
স্টেশন বলে। এখানে আবার অনেক স্টেশন। বাস
স্টেশন,
ট্রেন স্টেশন, লেগুনা স্টেশন। এসব স্টেশনে শুধু গাড়ি।
ER821 দের মত সাজানো গুছানো এলাকা না। ER821 কে
স্কুল বন্ধ কালীন সময়ে ভ্রমণে পাঠানো হয়েছে। ওর
ইচ্ছা মতই পৃথিবীতে এসেছে। পৃথিবী সম্পর্কে
অনেক
কিছু পড়েছে অনলাইন বই গুলোতে। সেই থেকে
আগ্রহ
জন্মানো। কোথাও কোথাও লেখা মানুষ সবচেয়ে
বুদ্ধিমান
প্রাণী। কোথাও লেখা এরা মাথা মোটা। বুদ্ধি বলতে কিছু
নেই। ER821 এর কোন প্রাণ নেই। প্রাণ থাকা মানুষদের
জরুরী। এদের প্রাণ হুট করে হারিয়ে যায়। এরা মরে
যায়। ER821 এর ক্ষেত্রে তেমন কিছুই ঘটে না।
পৃথিবীতে আসার আগে শরীর থেকে মেটালের
ফ্রেম সরিয়ে
পরিয়ে দেয়া হয়েছে মানুষের মত জামা কাপড়। এখন
দেখতে
একদম মানুষের মত লাগছে। বার বার করে বলে দেয়া
হয়েছে কোন মানুষ যদি পরিচয় জিজ্ঞেস করে যেন না
বলা হয়। নাম জিজ্ঞেস করলে বলতে বলা হয়েছে, টুলু।
এই
নামেরও কোন অর্থ নেই। এই নাম কি করে স্টেশনের
প্রধান রেকানের মাথায় আসল, চিন্তার বিষয়। তাই
এখানে ER821 বলা যাবে না। বলতে হবে টুলু। যে কেউ
মাইন্ড রিডার দিয়ে মনের কথা বুঝে ফেলতে পারে। টুলুর
এই মুহূর্তে অনেক ভাল লাগছে। ওর কাছে থাকা
নেটওয়ার্ক
ফ্রিকোয়েন্সি এবসর্বার দিয়ে নানা জনের মোবাইলে কথা
বার্তা শুনে। ইচ্ছা মত, যে কোন নেটওয়ার্ক
ফ্রিকোয়েন্সিতে ঢুকে, কথা গুলো এবসর্ব করে
শুনে
নিচ্ছে। কেউ কেউ অবশ্য, অন্য রকম কথা বার্তা বলে।
সেসব শুনে না টুলু। একটা প্রাইভেসির ব্যাপারও আছে।
একটু আগে শুনল দুজন ঝগড়া করছে, তুমুল ঝগড়া। তার
পরেই শুনল অন্য দুজন বেশ নরম ভাবে ভাল ভাল কথা
বলছে। এই কথা গুলো বলতে পারার পিছনে কারণ টুলুর
পিছনের মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ার। সেখানের চার
কোণা সাদা বক্স গুলোর কাজ, নেটওয়ার্ক এ কানেকশন
দেয়া। আর গোল গোল বক্স গুলোর কাজ, এক
নেটওয়ার্ক
থেকে অন্য নেটওয়ার্ক ফ্রিকোয়েন্সিতে সংযোগ
দেয়া।
টুলুর মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। মোবাইল নেটওয়ার্ক
এর ঐ গোল বক্সটার সাহায্যে একটা কাজ করে ফেলল।
যে
চারজনের ফোনে কথা শুনছিল টুলু। তাদের নেটওয়ার্ক এর
ফ্রিকোয়েন্সি চেঞ্জ করে দিল। উলটপালট করে, অন্য
জনের সাথে সংযোগ দিয়ে দিল। যারা ঝগড়া করছিল, আর
যারা খুব সুন্দর করে কথা বলছিল। তাদের মধ্যে
উলটপালট করে ফ্রিকোয়েন্সিতে সংযোগ দিল। এবার
তাদের কথা শুনছে।
- আচ্ছা তুমি কি কি রান্না করতে পার? মাছ রান্না করা
মনে হয় ঝামেলা। কাল এক কাজ কর, চিংড়ি মাছ নিয়ে
আসো, রান্না করে। আমার অনেক পছন্দ। দুজন খাব আর
পার্কে বসে গল্প করব।
- এর ভিতর চিংড়ি আসল কোথা থেকে? আমার সাথে একদম
ফাজলামি করবে না। তুমি ধরা পড়ে গেছ। তুমি গতকালও
তোমার কলিগকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে গেছ।
- তুমি এমন কর্কশ করে কথা বলছ কেন? এমন লাগছে
কেন
তোমার কণ্ঠ? আর কিসের কলিগ? কিসের রেস্টুরেন্ট?
তুমি কাল চিংড়ি রান্না করবে না? চিংড়ি রান্না করা
ঝামেলা লাগলে, তুমি চিংড়ি ভর্তা করে নিয়ে এসো।
আচ্ছা?
- কিসের কলিগ না? চিংড়ি ভর্তা খাবে? চিংড়ি ভর্তা
কেন? বাসায় আসো তোমাকেই ভর্তা বানাব আজ আমি।
টুলু শুনে মজা পাচ্ছে। নিজে নিজেই হাসছে। এমন করে
কি আগে কখনও হেসেছে? মানুষের পৃথিবীতে এসে
নিজের
ভিতর মানুষের কিছু গুণ খুঁজে পাচ্ছে। অন্য জায়গায় কথা
হচ্ছে।
- দেখো এসব একদম ঠিক না। তুমি উল্টাপাল্টা কথা
বলছ।
- কই উল্টাপাল্টা কথা বলছি? সত্যি কথা বললাম তো
কাল রান্না করে খাওয়াব।
- না মানে? কিসের রান্নার কথা বলছ?
- গাধা ছেলে একটু আগে বললাম না? আর তোমার কণ্ঠ
এতো
মোটা লাগছে কেন হঠাৎ করে? ঠাণ্ডা বাঁধিয়েছ আবার?
কতবার করে বলি এসব করবে না। ওষুধ খেয়ে নাও দ্রুত।
- আচ্ছা খাব। কিন্তু......
- কিন্তু টিন্তু বাদ। কাল ঘুরতে যাবার সময় কিন্তু
পাঞ্জাবী পরবে।
- ঘুরতে যাওয়া মানে? কই ঘুরব?
- এখন কিন্তু মাথার মধ্যে একটা বারি দিব। কালকে
আমরা সারাদিন ঘুরব সেসব ভুলে গেছ?
- না মানে...।
টুলু এখনও হাসছে। কেমন যেন ভাল লাগছে। এই ভাল
লাগটার নাম কি? এমন আগে কখনও লাগে নি কেন? রেকান
বলেছিলেন, হাসি কান্না এসব মানুষদের কাজ। আমাদের
না। টুলু তাহলে হাসছে যে? এই পরিবর্তন সত্যি ভাবায়
টুলুকে। এরপর আরও অনেকটা সময় এমন করে কাটায়।
বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সিতে ঢুকে, কথা শোনা। মাঝে মাঝে
পরিবর্তন করে দেয়া। কথার মাধ্যমে বুঝতে চেষ্টা করে
কার সাথে কেমন সম্পর্ক। যারা কথা বলছে, তাদের পেশা
কি। এসব জানতে সহায়তা করছে নিজের ডিটেকশন
মিটার টা। এটার কাজ কাউকে টার্গেট করে একটা আলোর
রশ্মি ফেললে, তার সম্পর্কে সব তথ্য চলে আসে
ডিটেকশন মিটারের স্ক্রিনে। সমস্যা একটাই বেশীর
ভাগ ক্ষেত্রেই কোন নাম প্রদর্শন করে না। নামের
জায়গায় লেখা থাকে, N/A(not available). এবার
স্টেশনে ফিরে গিয়ে রেকানকে বলতে হবে এই
যন্ত্রটা
আপডেট করতে।
এখন দুজনের কথা শোনা যাচ্ছে। এরা খুব একটা ভাল
বিষয় নিয়ে কথা বলছে বলে মনে হয় না। দুজনেই
ছেলে।
একজন অনেক কিছু বলছে, আর একজন গম্ভীর গলায়।
- হ্যাঁ কত দূর?
- আমাদের প্রায় শেষ কাজ। আজকেই স্যার আমরা ওদের
বাসায় যাব।
- আজকের মধ্যে কিন্তু কাজটা শেষ করতে হবে।
- অবশ্যই স্যার। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমরা
প্রোফেশনাল। কোন চিহ্ন থাকবে না খুন যে করব। পুলিশ
কেন, তাদের বাপ এসেও কিছু খুঁজে পাবে না।
- কথা কম বল। পুলিশের বাপকে লাগবে না। পুলিশ না
বুঝলেই হল।
টুলু এখন অন্য একটা ফ্রিকোয়েন্সি খুঁজছে। যেখানে
পুলিশ কথা বলছে। এইতো পাওয়া গেছে।
- হ্যালো, রামপুরা থানা।
- ও রামপুরা থানা? আমি ভাবছিলাম মহাখালী কলেরা
হাসপাতাল। আচ্ছা আপনাদের কাছে মহাখালী কলেরা
হাসপাতালের নাম্বার আছে?
হ্যাঁ এখানেই কাজ হবে। শুধু একটু ওলট পালট করে দেয়া।
গম্ভীর লোকটার সাথে কথা বলিয়ে দিতে হবে, কলেরা
হাসপাতাল খোঁজা মানুষটার। আর পুলিশের সাথে
প্রোফেশনাল খুনিটার।
- আপনারা কি? একটা কলেরা হাসপাতালের নাম্বার জানেন
না।
- কিসের কলেরা হাসপাতাল?
- কলেরা চিনেন না? কলেরা। ডাইরিয়ার উপরের টা।
- তুমি এসব এলোমেলো কথা বলছ কেন? খুন খুব
সাবধানে
করবে।
- কি বললেন? খুন? কলেরা হইছে বলে মরে যাবে?
ফোন
নাম্বার দিবেন না ভাল । তাই আপনি এভাবে বদ দোয়া
করবেন।
এটা লাইন লাগাতে পারলেও খুনিটার সাথে লাগাতে পারছে
না টিলু। এটা খুব সাবধানে করতে হবে। পুলিশটা বিরক্ত
হয়ে ফোন রাখার আগেই। পুলিশ যখন চুপ থাকবে তখন।
যাহ্ হয়ে গেছে।
- স্যার। ঠিকানা এটাই তো? ধানমন্ডি ১২ এ, বাসা নং
৩৮, সাংবাদিক রেজা তালুকদার। একেই তো খুন করতে
হবে? আপনি নিশ্চিত থাকুন। আজ রাতেই কাজ হয়ে যাবে।
পুলিশ কিছুই টের পাবেনা। আপনি টাকাটা ঠিক রাইখেন।
টাকা নিয়ে উলটপালট কিছু করলে কিন্তু সমস্যা হবে।
কথা গুলো শুনে একটু নড়ে চড়ে বসলেন, রামপুরা থানার
কানে ফোন ধরে রাখা পুলিশটা। চুপ করে শুনলেন। কিছুই
বললেন না। ঠিকানাটা টুকে রাখলেন। কোথা থেকে হঠাৎ
করে কল আসল মোবাইলে। কি কি বলল। তবুও ব্যাপারটা
দেখতে হবে। ধানমন্ডি থানায় ফোন দিয়ে তখনই জানিয়ে
দেয়া হল, ডিবি পুলিশ যেন সাংবাদিক রেজা তালুকদারের
বাসার দিকে কড়া নজর রাখে।
খুনটা আর হচ্ছে না। এটা ভেবে টুলু খুশি। একটা দিন
মাত্র, পৃথিবীতে থাকবে। এর ভিতর কত রকম মানুষ
দেখছে। অথচ ওদের স্টেশনে সবাই এক রকম। রেকান
যা
বলেন তাই চলে সেখানে। সবার কাজ কর্ম অনেক গুছান।
একটা হাসপাতাল দেখা যাচ্ছে, এখানে অসুস্থ, বা শরীরে
গোলযোগ থাকা মানুষদের ঠিক করা হয়। ঠিক তেমন
ওদের স্টেশনে, ওয়ার্ক শপে করা হয় এসব। শরীর
খুলে,
যন্ত্রপাতি বের করে, আবার তা লাগিয়ে ঠিক করে দেয়।
তবে টুলুর কখনও ওয়ার্ক শপে যেতে হয় নি। টুলুর
অনেক
কিছুই করতে হয় না, যা অন্য রোবটরা ওখানে করে। টুলু
ওখানে রেকানের আশেপাশেই থাকে। খুব কম বাসা
থেকে বের
হয়। রেকানের অনুমতি খুব কমই মিলে। মাঝে মাঝে মনে
হয় টুলুর, ওকে একটু আলাদা করে রাখা হচ্ছে। অন্য সবার
সাথে ঠিক যাচ্ছে না ওর। ওখানে স্কুলে পড়াশুনা করে
মাত্র কয়েকজন। বাকি সবাই স্টেশনের কাজ করে। হাঁটতে
হাঁটতে হঠাৎ কিছু একটার সাথে আঘাত খেল টুলু। পায়ের
কাছে। ব্যথা করছে। আঘাত খেয়ে কান থেকে ভয়েস
কনভার্টরটা খুলে পড়ে গেল। আশেপাশের মানুষদের
কথা
এখন কিছুই বুঝতে পারছে না টুলু। এই কনভার্টরটার কাজ,
যে কোন ভাষা কাঙ্ক্ষিত ভাষায় পরিবর্তন করে নেয়া।
এই এলাকার মানুষ গুলোর ভাষা বুঝতে পারে না টুলু। টুলুরা
এই ভাষায় কথা বলে না। এই কনভার্টরের কারণেই বুঝতে
পারে। একটা লোক পাশে এসে দাঁড়িয়েছে টুলুর পাশে।
- ভাই কি কিছু খুঁজছেন?
টুলু হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। কি বলছে লোকটা। লোকটার
কথা বুঝতে পারছে না। বুঝবার কথাও না। লোকটা একটু
এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল, শহরে নতুন নাকি? সাথে আছে
টাছে কিছু?
টুলু তাও চুপ। বলে না কিছু।
- i can't understand.
লোকটা একটু সরে গিয়ে বলে, এইটা দেখি বিদেশী।
ইংলিশ কয়।
টুলুর কাছে এসে বলে, আমার লগে আসেন। এক জায়গায়
লইয়া যাইতেছি।
টুলু ইশারায় বুঝতে পারে, লোকটা ওর সাথে যেতে
বলছে।
কনভার্টর খুঁজে না পেয়ে, লোকটার সাথেই হাঁটতে
লাগল।
- বুঝলেন ভাই। এইটা হইল বাংলাদেশ। সেই কবে থেকে
শুনি এইটা এমেরিকার মতন হইবে। এমেরিকা আর হয়
না। খালি রাস্তা ঘাটে মুত। মুত চিনেন তো?
বলে লোকটা প্যান্টের চেইন ধরে টানাটানি করে কিছু
বুঝাবার চেষ্টা করল। টুলু বুঝতে পারে না। লোকটাকে
নীরবে অনুসরণ করে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আস্তে
আস্তে
অন্ধকারহয়ে আসছে চারপাশ। একটু নির্জন জায়গায়
গিয়েই লোকটা দাঁড়িয়ে পড়ল। পকেট থেকে ধাতুর কিছু
একটা বের করে টুলুর গলার কাছে ধরল। বলল, যা আছে
সাথে দে। নয়ত গলা কাইটা ফালাইয়া দিমু।
টুলু ভাব ভঙ্গিতে বুঝতে পারছে, লোকটা জোর করে
টুলুর
কাছ থেকে কিছু চাচ্ছে। এমন কিছু পড়েছিল বইয়ে। মানুষ
নাকি মানুষকে এভাবে মাঝে মাঝে মেরে ফেলে। টুলুর
বড়
হাসি পাচ্ছে। টুলুর কিছুই হবে না, এই লোকটা জানে না।
টুলু মানুষ না। টুলু অতি উন্নত রোবট। এই ধাতুর আঘাতে
ওর কিছুই হবে না। টুলুর হাসি দেখে, লোকটা চমকে
উঠল। একটু দূরে সরে সূক্ষ্ম চোখে তাকাল। না ভয়
পেলে
হবে না। টুলুর দিকে চাকুটা নিয়ে তেড়ে আসল। এখনি
বিদায় করে দিবে পৃথিবী থেকে বিদেশীটাকে। চাকুটা
টুলুর গলায় কাছাকাছি আসতেই থেমে গেল লোকটা।
শরীর
হঠাৎ অবশ হয়ে গেছে। চোখ লেগে আসছে। টুলুর
সামনে
মাটিতে ঢলে পড়ল লোকটা। টুলু আশেপাশে তাকাল।
কেউ
নেই। এটা কি করে হল? লোকটা হঠাৎ করে এমন মাটিতে
পড়ে গেল কেন? লোকটার ঠিক পিছনে কিছু একটা পড়ে
আছে। কালো করে। একটু কাছে যেতেই পরিষ্কার।
একদম
পরিষ্কার। টুলুর কনভার্টরটা। টুলু তুলে নিল
কনভার্টর। কানে পরে নিল। লোকটা এখনও অসাড়।
ডিটেকশন মিটার বলছে, লোকটা মৃত। কিভাবে মারা গেল,
সেটা একটা ভাবনার বিষয়। হয়ত টুলু লোকটার চেয়ে
শক্তিধর, তাই আঘাত করার আগেই মরে গেছে। এসব নিয়ে
আর এতো ভাবতে চাচ্ছে না। সময় দেখল টুলু, সময় বাকি
আর ৬ ঘণ্টা। ছয় ঘণ্টা পর টুলু ER821 হয়ে চলে যাবে।
নিজের স্টেশনে।
কতদূর যেতেই টুলু শুনল একটা ছেলে কাঁদছে। কান্না,
মানুষের খুব বাজে একটা বদ গুণ। রেকান প্রায়ই বলতেন,
আবেগ একটা জিনিস, যেটা শুধু পৃথিবীর মানুষদের আছে।
এই জিনিসটা না থাকলে, ওরা এতো দিনে আমাদের চেয়ে
অনেক উপরে থাকত। আবেগ আছে বলেই এরা পিছিয়ে
পড়ছে। আবেগ আছে বলেই, এরা ক্ষুদ্র জিনিসে কষ্ট
পাচ্ছে। কাঁদছে। আর জীবনের অনেকটা ধাপ পিছিয়ে
যাচ্ছে।
টুলুর এই বাজে জিনিস দেখবার কোন ইচ্ছা নেই। পাশ
কাটিয়ে চলে গেল। পিছন ফিরে আর একবার দেখল কেন
যেন। আর একটা ছেলে ঐ ছেলেটার সামনে। এবার
ছেলেটার
চোখ চিকচিক করছে। হাতে কিছু কাগজ ধরিয়ে দিল।
তাই নিয়েই মনে হল ছেলেটা খুশি। কাগজ গুলো কিসের
জানতে ইচ্ছা করছে। ডিটেকশন মিটার বলছে এটা
money,এই দেশে বলে টাকা। এটার ব্যাপারেও জানে টুলু।
এখানে সবকিছু হয় এটার বিনিময়ে। এটা যার যত বেশী
সে তত ক্ষমতাবান। যার নেই সে অসহায়। স্টেশনে
তেমন
কিছু নেই। ওখানে প্রায় সবাইকে এক দৃষ্টিতে দেখা হয়।
রেকান সবার সব চাহিদা পূরণ করে দেন। এখানে যে কোন
চাহিদা পূরণের জন্য এটা দরকার। এখানে মানুষ গুলোর
কোন দাম নেই। তার চেয়েও বেশী এই কাগজগুলোর
দাম।
টুলু হাঁটতে শুরু করল, ডিটেকশন মিটার দিয়ে ছেলেটার
ব্যাপারে জানা যায়। তবে জানতে ইচ্ছা করছে না। টুলু
হাঁটতে লাগল, সোজা সামনের দিকে। পিছন থেকে
মোবাইল
ফোন বেজে ওঠার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। ছেলেটার
ফোন
এসেছে। নেটওয়ার্ক ফ্রিকোয়েন্সি এবসর্বার দিয়ে
ছেলেটার কথা শুনছে , কেন শুনছে জানে না।
অপ্রয়োজনীয়
কাজ একটা। অপ্রয়োজনীয় কাজ করে মানুষ, টুলু একটা
রোবট। টুলুও তাই করছে তবুও। মানুষের পৃথিবীতে
এসে
মানুষের অনেক কিছু নিজের ভিতর আঁকড়ে ধরছে। এসব
ঠিক না। ছেলেটাকে একটা মেয়ে ফোন দিয়েছে।
- ভাইয়া, মায়ের অবস্থা সত্যি খুব খারাপ রে। তুই কখন
আসবি?
- আসতেছি আমি।
- টাকা যোগাড় হইছে? মায়ের ওষুধ কিনতে পারছি না।
ঘরে টাকা নেই একটাও। ওষুধের দোকান তো বন্ধ হয়ে
যাবে।
- হ্যাঁ মাত্র এক বন্ধুর থেকে ধার করলাম। আমি আসছি।
কাঁদিস কেন পাগলী তুই? মায়ের কিছু হবে না। তোর ভাই
আছে? মায়ের ছেলে আছে না?
- আমার অনেক ভয় করছে। মা একটু পর পর কেমন
কেঁপে
কেঁপে উঠছে। ডাক্তার বলছে, তিনদিন ইঞ্জেকশন দিতে
হবে। প্রথমটা ফ্রিতে উনি দিছেন। আজ অন্যটা দিতে
হবে। বাসায় আয় ভাইয়া তাড়াতাড়ি।
- এইতো আসছি। আর তুই কাঁদবি না একদম। মা কাঁদতে
দেখলে আরও ভেঙে পড়বে। মায়ের পাশে থাক।
মোবাইল রেখে দিল ছেলেটা। রেখে নিজেই
কাঁদছে। কি
আজব অবস্থা, অন্যকে একটা কাজ করতে মানা করে,
নিজেই
সেটা করা। ছেলেটা একটা তিন চাকার যানে চরল। এটার
নাম রিকশা। টুলুর হঠাৎ করে কেন যেন মন খারাপ হয়ে
গেল। খুব খারাপ লক্ষ্মণ। মন খারাপের বীজও টুলুর
ভিতর ঢুকে গেছে। ছেলেটা বলল রিকশা চালককে, মামা,
কাওরান বাজার।
এই রিকশা চালকের নামও মামা। রিকশা চলতে লাগল।
রিকশা কাওরান বাজার যাচ্ছে। এই রিকশার সাথে যেতে
ইচ্ছা করছে টুলুর। তবে যেতে পারবে না। টুলুর কাছেও
একটা স্লিম রানার আছে। পায়ে পড়লে এটা, পৃথিবীর যে
কোন বাহনের চেয়ে দ্রুত যাবে। তবে এটা ব্যবহারের
ক্ষেত্রে নিষেধ আছে রেকানের। এটা ব্যবহার করলে
সবাই
বুঝে যাবে, টুলু মানুষ নয়। রোবট। তবে ছেলেটার
ব্যাপারটা মাথা থেকে তাড়াতে পারছে না টুলু। মাথা থেকে
কোন ভাবেই যাচ্ছে না। একবার ভাবল, ব্রেন স্ক্রানার
দিয়ে একটু আগের ঘটনাটা মাথা থেকে মুছে ফেলবে।
তবে
সেটাও সায় দিচ্ছে না, কে যেন। কে যেন কানের
কাছে
বলছে, না এটা মাথা থেকে তাড়িও না। লেগে থাকো।
লেগে
থাকো। টুলু লেগে রইল। নেটওয়ার্ক ফ্রিকোয়েন্সি
এবসর্বার দিয়ে ছেলেটার মোবাইলের নেটওয়ার্ক এর
সাথে
লেগে রইল। কোথায় কোথায় যাচ্ছে সেসব ওখানে
উঠছে।
যখন গন্তব্যে চলে যাবে তখন হুট করে টুলু সেখানে
চলে
যাবে। দেখবে কি করে।
টুলু সেখানেই বসে রইল। অন্য কিছু করতে ইচ্ছা করছে
না। মাথার ভিতর ঐ ছেলেটার চিন্তা। বার বার
নেটওয়ার্ক ফ্রিকোয়েন্সি এবসর্বারের দিকে তাকাচ্ছে।
ছেলেটা এগিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করে থেমে গেল।
কাওরান
বাজার? না এটা তো কাওরান বাজার না। অনেকটা সময়
চলে গেল। ছেলেটার নেটওয়ার্ক ওখান থেকে
নড়ছে না। টুলু
আর অপেক্ষা করতে পারছে না। দরকার হলে টুলু গিয়ে
পৌঁছে দিয়ে আসবে। তাও এভাবে থেমে থাকা যাবে না।
একটা মানুষ মারা যাচ্ছে, আর ছেলেটা ওখানে থেমে
আছে।
টুলু স্লিম রানারটা বের করল। রাস্তা দিয়ে যাওয়া
সমস্যা। গিজিগিজি বাড়িঘর। এর চেয়ে ফ্লো অপশন
চালু করে উড়ে যাওয়া ভাল। সাই করে ছেলেটার
নেটওয়ার্ক
এর জায়গায় চলে গেল। একি এতো নির্জন জায়গা।
ছেলেটা যে রিকশায় বসে ছিল সেটা নেই আশেপাশে।
ছেলেটাকেও দেখা যাচ্ছে না। একটা আলো জ্বালল টুলু।
ছেলেটা এই তো। মাটিতে শুয়ে আছে। শরীরে লাল
লাল কি
সব। ডিটেকশন মিটার বলছে ছেলেটা মৃত। কি করে
সম্ভব? মোবাইলটা ছেলেটার কাছে না। আশেপাশে কারও
কাছে। ঐ তো দেয়ালের ওপাশে কয়েকটা ছেলে।
ওদের
কাছেই মোবাইলটা। নেটওয়ার্ক ফ্রিকোয়েন্সি এবসর্বার
তাই বলছে। তার মানে টুলুর সাথে যা করতে চেয়েছিল,
চাকু
বের করে ঐ লোকটা। এই ছেলেটার সাথেও তাই
করেছে, ঐ
দেয়ালের পাশের ছেলেগুলো। ছেলেটাকে
মেরে, মোবাইল আর
টাকা ছিনিয়ে নিয়ে নিয়েছে। টুলুর শরীর কাঁপছে। কেন
কাঁপছে জানে না। পিছনের ব্যাগ থেকে, সাইলেন্ট এটম
পুশার বের করল টুলু। এটা ব্যবহারেও নিষেধাজ্ঞা
রেকানের, খুব বিপদে না পড়লে। এটার ভিতর সবচেয়ে
বিষাক্ত পরমাণু গুলো সেট করা। একটা পুশ করলে
টার্গেট করে, তাহলেই শেষ। টুলু সাইলেণ্ট এটম পুশার,
পুশ করল। এক এক করে চারজনই মাটিতে পড়ে গেল
মুহূর্তে। মোবাইলটা নিল, টুলু। নিয়ে নিল খুঁজে টাকা
গুলো। এখন টাকা গুলো দিয়ে আসতে হবে ছেলেটার
মায়ের
কাছে। ছেলেটার মা সুস্থ হবে। আর একটা
অপ্রয়োজনীয়
কাজ করার জন্য উঠে পড়ে লাগল টুলু। কিন্তু টুলু কাওরান
বাজার চিনে না। কোনদিক দিয়ে যেতে হয় তাও জানে না।
সাথে এমন কোন যন্ত্রও নেই যেটা ধরে যেতে
পারে। বসে
বসে উপায় খুঁজতে খুঁজতেই, টুলুর সামনে এসে দুজন
দাঁড়াল।
ঠিক ভাবে চেনা যাচ্ছে না। অন্ধকারে। আলো ধরতেই
দেখা
গেল, TY567 আর TY587, দুজন রোবট। নিশ্চয় রেকান
এদের পাঠিয়েছে টুলুকে সাহায্য করতে। কাওরান বাজার
খুঁজে বের করতে। টুলু ওদের দিকে হাসি মুখে এগিয়ে
যেতেই এরা গম্ভীর গলায় একসাথে বলল, রেকান
আমাদের
পাঠিয়েছেন। আপনাকে স্টেশনে ফেরত নিয়ে
যেতে। আপনার
এখন আমাদের সাথে যেতে হবে।
- অসম্ভব। এখনও সাড়ে চার ঘণ্টা বাকি। রেকান এটা
বলতে পারেন না।
- আমাদের যেটা বলা হয়েছে, আমরা সেটাই করছি। আমরা
প্রথম থেকেই আপনার পাশে ছিলাম। ইনভিসিবল রে এর
ভিতর। আপনি যখন বিপদে পড়েছিলেন, রেকানের
নির্দেশে আপনার শত্রুকে আমরাই মেরেছিলাম। তবে
তখন
ইনভিসবল রে থেকে বের হবার নির্দেশ ছিল না। এখন
রেকনের নির্দেশ, আপনাকে আমাদের সাথে যেতে
হবে।
আপনি আমাদের সাথে ইনভিসিবল রে এর ভিতর আসুন।
টুলু বুঝতে পারল, সেই সময়টায় যখন লোকটা চাকু হাতে
নিয়ে টুলুকে আঘাত করতে আসছিল এরাই তাকে
মেরেছে।
এরা প্রথম থেকেই আশেপাশে। অদৃশ্যমান রশ্মির ভেতর
থাকাতে টুলু এদের অস্তিত্ব বুঝতে পারে নি। রেকান টুলু
কে একা ছাড়েন নি পৃথিবীতে। সাথে করে দুজনকে
পাঠিয়েছেন। কিন্তু টুলু এখন যাবে না। টুলু টাকাটা সেই
মায়ের কাছে দিয়ে তারপরই যাবে।
- আমার কিছু কাজ বাকি আছে। একটু সেরে তোমাদের
সাথে
যাচ্ছি।
- রেকানের আদেশ আমরা অমান্য করতে পারি না। আপনি
এখন আমাদের সাথে যাবেন।
- অসম্ভব।
TY567 আর TY587 ইনভিসিবল রে এর মধ্যে টুলুকে
নেবার আগেই টুলু নিজের স্লিম রানারের ফ্লো অপশন
চালু
করে ছুটতে লাগল এলোমেলো। পিছনে পিছনে ধরার
জন্য
TY567 আর TY587. টুলু এলোমেলো ছুটছে, আর
বারবার
খেয়াল করছে কোথাও কাওরান বাজার লেখা আছে কিনা।
কাওরান বাজার লেখা থাকলেও ছেলেটার মা কে খুঁজে
পাওয়া
কষ্ট সাধ্য। কিভাবে পাবে? টুলু যে চিনে না তাদের
কাউকে। একটা রোবট হয়ে মানুষের জন্য মায়া, সত্যি
অবাক করা। মাথার ভিতর সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
এসব ভাবছে একদিকে, অন্য দিকে নিজেকে লুকিয়ে
বেড়াচ্ছে, পালিয়ে বেড়াচ্ছে TY567 আর TY587 এর
থেকে। এরা ছুটেই চলছে, টুলুর পিছনে। টুলু কিছু ভাবতে
পারছে না। মানুষটাকে বাঁচাতে হবে যেভাবে হোক। কিন্তু
পথ নেই। সব পথ বন্ধ। হঠাৎ করেই হাতের মোবাইলটা
বেজে উঠল। আলো ঝলমলে স্ক্রিনে ভাসছে, একটা
নাম্বার। টুলু কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কান্না
জড়ানো গলা, ভাইয়া তুই আসবি না? সত্যি কথা বল?
টাকাটা যোগাড় করতে পারিস নাই, তাই না? মায়ের
অবস্থা আরও খারাপ। ওষুধ লাগবে না। তুই আয়, মা এর
শেষ সময়ে পাশে থাক। ভাইয়া কথা বল।
মেয়েটা কেঁদে যাচ্ছে। কান্না শুনে টুলুর ভিতর কি যেন
হয়ে গেল। বুকের বাম পাশে চিনচিনে একটা ব্যথা হচ্ছে।
মনে হচ্ছে ভিতর থেকে কোন তার ছিঁড়ে যাচ্ছে। কিছুই
করতে পারছে না টুলু। মেয়েটা ভাইয়ের আশায়, মা
ছেলের
আশায় বসে আসে। তবে সবই মিথ্যে হয়ে যাচ্ছে। টুলু
কান
থেকে মোবাইলটা রাখতে যাবে, তখনই মাথার ভিতর কি
যেন খেলে গেল। নিজের নেটওয়ার্ক ফ্রিকোয়েন্সি
এবসর্বার একবার দেখল। এটাই দরকার। নিজের কানে
মোবাইল রেখে, বলল, আমি আসছি।
নেটওয়ার্ক ফ্রিকোয়েন্সি এবসর্বার দিয়ে,
ফ্রিকোয়েন্সিতে ঢুকল, নিজের হাতের মোবাইল আর
ওপাশের মোবাইলের নেটওয়ার্ক এর। এইতো
নেটওয়ার্ক
ফ্রিকোয়েন্সি এবসর্বারে লোকেশন দেখাচ্ছে। টুলু
অতি
দ্রুত, স্লিম রানার চালিয়ে চলে গেল, কাওরান বাজার ঐ
জায়গায়। যেখানে মোবাইল দিয়ে টুলুর সাথে কথা বলা
হচ্ছে। যেখানে একটা বোন ভাইয়ের অপেক্ষা করছে।
যেখানে একটা মা ছেলের। যেখানে একটা জীবন
মরণের
কাছাকাছি কিছু কাগজের জন্য। টুলু চলে এসেছে। একটা
ভাঙা বাড়িতে এরা থাকে। রাস্তার পাশে জীর্ণশীর্ণ।
আশেপাশে অনেক বিল্ডিং। সেসব অনেক সুন্দর। তবে
এটা
তেমন না। টুলু নেটওয়ার্ক সোর্স পেয়েছে। দরজায়
টোকা
দিল টুলু। ভাঙা দরজার ভিতর থেকে শব্দ চলে আসছে
ভিতরে কি বলছে। একটা মেয়ে বলছে, মা ভাইয়া আসছে।
টাকা নিয়ে আসছে। ওষুধ কেনা হবে। তুমি সুস্থ হবে।
মেয়েটা দৌড়ে চলে আসল দরজা খুলতে। টুলুর অনেক
ভাল
লাগছে। টাকাটা হাতে। মেয়েটাকে টাকা দিয়ে ওষুধ কিনতে
বলবে। তার আগে একটু দেখা যায়, মায়ের কি অসুখ।
দরজার ফোঁকর দিয়ে ডিটেকশন মিটারের আলো
ফেলল,
বিছানায় শুয়ে থাকা মহিলার উপর। সব এসেছে তথ্য।
নাম জানা নেই। রোগের কোন বর্ণনা নেই। তবে
সবসময়
unknown আসা একটা অপশনে, কিছু লেখা দেখা যাচ্ছে।
টুলু অবাক হয়ে লেখা গুলো পড়ছে। সেখানে লেখা,
Relation- mother( according to DNA)
টুলু একটু সময় নিল ব্যাপারটা বুঝতে পারার। mother বা
মা এর ব্যাপারে ডিকশনারিতে লেখা ছিল, যার দ্বারা
জন্ম হয়েছে। তার মানে......
মেয়েটা হাসি মুখে দরজা খুলেই একটু এদিক ওদিক
তাকাচ্ছে। হাসি মুখ হঠাৎ মলিন হয়ে গেল। টুলু টাকাটা
বাড়িয়ে দিল মেয়েটার দিকে। মেয়েটা এদিক ওদিক
তাকাচ্ছে এখনও। টুলুর দিকে তাকাচ্ছে না। মেয়েটাকে
ডাকল টুলু, এই যে মেয়ে, টাকা নাও।
মেয়েটা তাও তাকাল না টুলুর দিকে। কি ব্যাপার? মেয়েটা
অন্ধ নাকি? অন্ধ হলেও কথা তো শুনবে। তাও শুনছে না।
টুলু হঠাৎ পাশে কারও অস্তিত্ব অনুভব করল। দুই পাশে
TY567 আর TY587. ওরা বলে যাচ্ছে, আপনি এখন
ইনভিসবল রে এর ভিতর আছেন। আমরা এখন স্টেশনের
দিকে রওয়ানা দিচ্ছি।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now
X
এবার নিয়ে দশবার টেলিফোন করল জর্জ জুনিয়র সাবা বেনগুরিয়ানের বাড়িতে। কোন উত্তর নেই সেখান থেকে।
বিস্মিত হলো জর্জ জুনিয়র। সাবার তো টেলিফোনের জন্যে অপেক্ষা করার কথা। তার এ সময় কোথাও যাবার প্রশ্ন আসে না। গেলেও তার মোবাইল তো সে রেখে যাবার কথা নয়।
জর্জ জুনিয়র অবশেষে টেলিফোন করল সাবাদের হাউজ-সেট টেলিফোনে। একবার, দু’বার, তিনবার, কোন সাড়া নেই ওপার থেকে। রিং হচ্ছে কিন্তু কেউ টেলিফোন ধরছে না।
বিস্মিত হলো জর্জ জুনিয়র। এমন হওয়াটা অসম্ভব। বাড়ি শুদ্ধ কোথাও গেলেও রিপ্লাই ব্যবস্থা অবশ্যই চালু রেখে যাবে।
ঘড়ির দিকে তাকাল জর্জ জুনিয়র। প্লেনের আর আধ ঘন্টা দেরী। আর দেরী করা যায় না। সাবাদের বাড়িতেই যেতে হবে। দরকার হলে প্লেনের সময় পাল্টিয়ে অন্য সময় ফ্লাইট ধরবে।
উঠল জর্জ জুনিয়র। তৈরী হয়ে বাড়ি থেকে বেরুল সে। তার গাড়ি ছুটল সাবা বেনগুরিয়ানের বাড়ির দিকে।
সাবা বেনগুরিয়ানের বাড়ির গেটে এসে থামল জর্জ জুনিয়রের গাড়ি।
গাড়ি থেকেই সে দেখল গেট বন্ধ। কিন্তু গার্ড বক্স থেকে কেউ বেরিয়ে এল না। অথচ গেটের সামনে গাড়ি থামার সাথে সাথেই গেটম্যান বেরিয়ে আসার কথা। কিন্তু কেউ আজ বেরিয়ে এল না।
জর্জ জুনিয়র কয়েকবার হর্ন বাজাল।
গেটের ভেতরে একটা শব্দ হলো। মনে হলো কেউ গেট খুলছে। খুলে গেল গেট। গেটে দাঁড়ান গেটম্যান।
গাড়ি নিয়ে এগুতে চাইল জর্জ জুনিয়র।
সরল না গেটম্যান গেট থেকে। হাত তুলে গাড়ি দাঁড় করাতে বলল। জর্জ জুনিয়র একেবারে তার গা ঘেঁষে গাড়ি দাঁড় করাল। জর্জ জুনিয়র বেরিয়ে এল গাড়ি থেকে।
গেটম্যান একজন এক্স মিলিটারি ম্যান। পুরোপুরি শ্বেতাংগ বলতে যা বুঝায় তা সে না। চেহারায় একটা মিশ্রণ আছে। সুতরাং ইহুদী ধরে নেয়া যায়।
জর্জ জুনিয়রকে একটি স্যালুট দিয়ে গেটম্যান বলল, ‘কেউ বাড়িতে নেই স্যার। তবে ছোট মেম সাহেবের একটা মেসেজ আছে আপনার জন্যে।’
তার শেষের কথাটা জর্জ জুনিয়রের কানে সবটা পৌছার আগেই সে বলে উঠল, ‘কোথায় গেছে ওরা?’
‘আমি জানি না স্যার। একটা মাইক্রো এল। তা থেকে দু’জন লোক নেমে এল। তারা বাড়িতে ঢুকে বড় সাহেব ও ছোট মেম সাহেবকে নিয়ে তড়িঘড়ি করে ঐ মাইক্রোতে উঠে গেলেন।’
‘তোমাকে কিছু বলে যাননি ওরা?’
‘বড় সাহেব কিছুই বলেননি। তাঁর মুখ দেখে আমি কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস পাইনি।’
‘তার মানে? ওর মুখ কি রকম ছিল?’
‘খুব বিষন্ন, বিরক্ত।’
‘ওরা কি কোন দুঃসংবাদ পেয়েছিলেন?’
‘বলতে পারবো না স্যার। তবে মাইক্রোটি আসার ১০ মিনিট আগে বড় সাহেবের বন্ধু মিঃ শ্যারন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। তাঁকেও বিষন্ন ও উদ্বিগ্ন দেখি।’
‘মিঃ শ্যারন বেরিয়ে গিয়েছিলেন? দশ মিনিট আগে?’
‘জি হ্যাঁ।’
‘এখন বাড়িতে কেউ নেই?’
‘আছেন। হাউজ-স্টাফ। ওরা নিচের তলায়।’
‘ওদের কাউকে কিছু বলে যাননি?’
‘না, স্যার। ওরাই আমাকে জিজ্ঞেস করেছে।’
‘ওদের সাথে লাগেজ ছিল?’
‘বড় সাহেব ও ছোট মেম সাহেব দু’জনের হাতে দু’টো সুটকেস ছাড়া আর কিছুই ছিল না।’
‘ধন্যবাদ, আসি।’ বলে জর্জ জুনিয়র চলে আসছিল।
‘স্যার, ছোট মেম সাহেবের একটা চিঠি আছে আপনার জন্যে। নিন।’
গেটম্যান একটা মোটা ইনভেলাপ জর্জ জুনিয়রের দিকে বাড়িয়ে ধরল।
‘সাবার চিঠি?’ বলে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মত গেটম্যানের হাত থেকে চিঠিটি লুফে নিল জর্জ জুনিয়র। ইনভেলাপটি হাতে দ্রুত জর্জ এসে গাড়িতে চড়ল।
ওদিকে গেট তখন বন্ধ হয়ে গেছে।
ইনভেলাপটি হাতে নিয়েই জর্জ জুনিয়র বুঝেছিল, একটা শক্ত কিছু ইনভেলাপের মধ্যে রয়েছে।
তর সইল না জর্জ জুনিয়রের। সাবা কি লিখেছে তা পড়ার জন্যে অস্থির হয়েছে সে।
ইনভেলাপটি খুলল সে। বেরিয়ে এল ভিডিও ক্যামেরার একটা ডিস্ক। কোন চিঠি ইনভেলাপে নেই।
প্রথমেই হতাশার একটা চোট লাগল তার মনে যে, সাবার কোন চিঠি ইনভেলাপে নাই। পরক্ষনেই ভিডিও ডিস্ক তার মনকে ভিন্ন দিকে নিয়ে গেল। কি আছে এতে? সাবা কেন তাকে দিয়েছে এ ডিস্ক দারোয়ানের মাধ্যমে?
হঠাৎ জর্জের মনটা খুশি হয়ে উঠল। ভাবল, এই ডিস্কে নিশ্চয় এমন কিছু ডকুমেন্ট আছে যা থেকে তার প্রশ্নের জবাব মিলবে। না হলে সাবা কেন ডিস্কটা তাকে এভাবে দিয়ে গেছে। ডিস্কটা তার কাছে এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো।
জর্জ জুনিয়র ডিক্সটা রাখতে যাচ্ছিল তার জ্যাকেটের পকেটে, কিন্তু তা না রেখে চালান দিল তার মোজার ভেতরে, একজন পাকা গোয়েন্দার মত। ভাবল, জ্যাকেটে রাখলে তা ভুলেও যেতে পারে। কিন্তু মোজা খুলতে গেলে চোখে পড়বেই।
গাড়ি স্টার্ট দিল জর্জ জুনিয়র। চলল বাড়ির দিকে।
নিউ মেক্সিকো যাবার জন্যে প্রস্তুত হয়েই সে বেরিয়ে এসেছিল। কিন্তু সে পাল্টেছে তার সিদ্ধান্ত। সাবার ভিডিও টেপ না দেখে সে কোথাও পা বাড়াবে না।
সাবা বেনগুরিয়ানের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এ্যাপ্রোস রোড থেকে মূল রোডে পড়ার মুখেই জর্জ জুনিয়র দেখল একটা মাইক্রো দাঁড়িয়ে আছে। বোধ হয় হঠাৎ স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেছে। একজন লোক নেমে গাড়ির ইঞ্জিন পরীক্ষা করছে।
জর্জ জুনিয়রের গাড়ি দেখে ইঞ্জিনের উপর ঝুঁকে পড়া মাথা তুলে ইশারা করল জর্জ জুনিয়রের গাড়িকে অপেক্ষা করার জন্য।
জর্জ জুনিয়র গাড়ি রাস্তায় আড়াআড়ি দাঁড়ানো মাইক্রোর প্রায় গা ঘেঁষে দাঁড়াল।
জর্জ জুনিয়র গাড়ি থেকে বেরিয়ে দরজা ধরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘হ্যালো, সমস্যা......’
জর্জ জুনিয়র কথা শেষ করতে পারল না।
মাইক্রো থেকে ছুটে এসে তিনজন লোক জর্জ জুনিয়রকে ঘিরে ফেলল।
জর্জ জুনিয়র কিছু বুঝে ওঠার আগেই একজন ডান হাত দিয়ে তার গলা পেঁচিয়ে বাম হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল। অন্য দু’জন পা ধরে চ্যাংদোলা করে চোখের পলকে তাকে নিয়ে গাড়িতে তুলল।
মুখ চেপে ধরা লোকটি হাতে ক্লোরোফরম ভেজা রুমাল ছিল। ওরা জর্জ জুনিয়রকে যখন মাইক্রোর মেঝেতে নিয়ে রাখল, তখন সে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছে।
যখন তার জ্ঞান ফিরল সে দেখল একটা টেবিলের উপর শুয়ে আছে। সে চোখ মেলেই উঠার চেষ্টা করল।
টেবিল ঘিরে দাঁড়িয়েছিল কয়েকজন।
একজন জর্জ জুনিয়রের গালে বিরাশী কেজি ওজনের একটা থাপ্পড় কষে বলল, ‘হারামজাদা। তো জ্ঞান ফিরতে বড্ড দেরী হয়েছে।’
জর্জ জুনিয়র ছিটকে পড়ল টেবিল থেকে মেঝের উপর।
সঙ্গে সংগেই আরেকজন তাকে তুলে বসাল। এই লোকটিই সবার মধ্যে উচ্চতায় বড়। একদম ইহুদী চেহারা। বলল সে হেঁড়ে গলায়, ‘তোদের বাসার সিকিউরিটি বক্সের টেলিফোন নাম্বার কত?’
‘কেন?’ ক্লান্ত কন্ঠে বলল জর্জ জুনিয়র লোকটির দিকে তাকিয়ে।
লোকটির ডান হাতে একটা মোবাইল।
লোকটি গর্জে উঠল, ‘দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করলে থাপ্পড়ে সব দাঁত খুলে ফেলব। যা জিজ্ঞেস করেছি তার জবাব দে।’
‘দেব না।’ বলল জর্জ জুনিয়র। জর্জ জুনিয়রের কথার রেষ বাতাসে মিলাবার আগেই লোকটির প্রচন্ড একটা ঘুষি গিয়ে পড়ল জর্জ জুনিয়রের মুখে। তার নাক ফেটে গল গল করে রক্ত বেরিয়ে এল।
ঘুষি মেরেই লোকটি বলে উঠল, ‘বলবি না কথা। চেয়ে দেখ তোর প্রেমিকার দিকে।’
বলে লোকটি ইংগিত করল জর্জ জুনিয়রের মাথার পেছনের দিকে।
জর্জ জুনিয়র চমকে উঠে মাথা ঘুরিয়ে সেদিকে তাকাল। দেখল, জেলখানার মত গ্রীল দেয়া দরজার ওপারে ছোট্ট একটা কক্ষে বসে আছে সাবা বেনগুরিয়ান। তার চুল উষ্ক-খুষ্ক। দু’চোখের কোণ ফোলা। তার নাক ফেটে রক্ত বেরুচ্ছে।
ক্রোধে গা জ্বলে উঠল জর্জ জুনিয়রের। বলল, ‘মনে করেছিস নির্যাতন করেই সবার কাছ থেকে কথা আদায় করতে পারবি?’
লোকটি হো হো করে হেসে উঠল। বলল, ‘পারব। কয়েকটা ঘুষি থাপ্পড় খাওয়ার পরও মিস সাবা এ ধরনের কথা বলছিল। কিন্তু একজন মানুষ হায়েনা যখন তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং তার কাপড় খুলতে শুরু করল, তখন গলে গেল একদম মোমের মত। গড় গড় করে বলে গেল সব কথা। কম্পিউটারে কি দেখেছে, কি হয়েছে সব কিছু। তুইও বলবি।’
কথা শেষ করে লোকটি একটা তালি বাজাল। গরিলা মার্কা একজন লোক ঘরে প্রবেশ করল।
‘বিংগ যা সেল থেকে ম্যাডামকে নিয়ে আয়। তখন তোর হাত থেকে শিকার কেড়ে নিয়েছিলাম, এবার বোধ হয় তা তোর ভাগ্য জুটবে।’
শুনেই বিংগ ছুটল সেলের দিকে। দরজা খুলে পাঁজাকোলা করে সাবাকে নিয়ে এসে শুইয়ে দিল জর্জ জুনিয়রের সামনে, মেঝেতে।
‘শেষবারের মত বলছি, আমাদের কথা শোন। তাহলে তোমার চোখের সামনে হায়েনারা তোমার প্রেমিকার দেহ লুটে-পুটে খাবে না।’
‘তোমরা টেলিফোন নাম্বার কি করবে?’ বলল জর্জ জুনিয়র। তার চোখে-মুখে উদ্বেগ। সে জানে, ওরা যা বলছে তার ষোল আলাই তারা করবে। সাবাকে সে কিছুতেই এই জঘন্য পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে না।
‘টেলিফোন নাম্বার কি করবো সেটাও দেখতে পাবে।’ বলল সেই লোকটি।
লোকটি থামতেই সাবা বেনগুরিয়ান বলে উঠল, ‘জর্জ তুমি আমার কথা ভেবে ওদের সহযোগিতা করো না। ওরা আমেরিকার শত্রু।’
লোকটি দু’টি চোখ জ্বলে উঠল। সে ফুটবলের গোল কিকের মত একটা প্রচন্ড লাথি কষল সাবা বেনগুরিয়ানকে।
একবার ‘কঁক’ করে উঠার পর কুঁকড়ে গেল সে অসহ্য বেদনায়।
‘আমি বলছি, তোমরা সাবা বেনগুরিয়ানের গায়ে হাত তুলবে না।’
বলে একটা দম নিয়েই তাদের বাড়ির সিকিউরিটি টেলিফোন নাম্বার সে বলল।
‘ধন্যবাদ জর্জ জুনিয়র। তুমি আদর্শ প্রেমিকের কাজ করেছ। এবার এ কাগজটায় যা লেখা আছে তা তোমাদের সিকিউরিটি অফিসারকে জানিয়ে দাও।’
বলে লোকটি কাগজের একটা স্লিপ জর্জ জুনিয়রের হাতে তুলে দিল।
জর্জ জুনিয়র পড়ল কাগজটি। কাগজে লেখা আছে, ‘পত্রবাহকের হাতে আব্বার কমুনিকেশন টেবিলের মাস্টার কম্পিউটারটি দিয়ে দেবে। বাসায় ওটা এখন নিরাপদ নয়। আব্বার পরামর্শেই এই চিঠি লিখলাম।’
লোকটি তার মোবাইলে জর্জ জুনিয়রের দেয়া টেলিফোন নাম্বার নক করে টেলিফোনটি তুলে দিল জর্জ জুনিয়রের হাতে।
জর্জ জুনিয়র টেলিফোনটি হাতে নিল। ওপার থেকে সিকিউরিটি অফিসারের কন্ঠ পাবার পর কাগজে যা লেখা ছিল, তা বলল খুব স্বাভাবিক কন্ঠেই।
‘ধন্যবাদ জর্জ জুনিয়র। তোমার টকিং পারফরমেন্স খুব ভাল হয়েছে। পুরষ্কার হিসেবে তোমার প্রেমিকার সাথে হানিমুনের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।’
জর্জ জুনিয়র ওদিকে কান না দিয়ে বলল, ‘তোমরা ঐ কম্পিউটার দিয়ে কি করবে? মনে করেছ কম্পিউটারের রেকর্ডগুলো মুছে গেলেই রক্ষা পেয়ে যাবে?’
‘শুধু ঐ রেকর্ড নয়, সব রেকর্ডই আমরা মুছে ফেলব।’
‘কিন্তু সব কিছুর পরেও সবুজ পাহাড়ে থেকে লস আলামোসে পর্যন্ত তোমাদের তৈরী সুড়ঙ্গ গোয়েন্দাগিরীর প্রমাণ হিসেবে থেকেই যাবে।’
হো হো করে হেসে উঠল লোকটি। বলল, ‘তোমরা আমেরিকানরা বিচার-বুদ্ধিদীন গনতন্ত্র করে মাথাটা একেবারে ফাঁকা করে ফেলেছ।’
বলে একটু থামল। বলল তারপর একটু গম্ভীর কন্ঠে, ‘প্রমাণ হবে সুড়ংগটি তৈরী হয় লস আলামোস থেকে এমারজেন্সী এক্সিটের একমাত্র পথ হিসেবে। যাতে লস আলামোসে কোন সোভিয়েট হামলার সময় অতিগুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা রক্ষা করা যায়। এই গুরুত্বপূর্ণ কাজে ইহুদী বিজ্ঞানী জন জ্যাকব সহায়তা করেছে মাত্র।
লোকটির কথা শুনে স্তম্ভিত হলো জর্জ জুনিয়র। তারও এখন মনে হচ্ছে তথ্যটা খুবই যৌক্তিক । একটা মিথ্যাকে তারা এভাবে সত্য হিসেবে দাঁড় করাতে পারবে? কোন কথা সরল না জর্জ জুনিয়রের মুখ থেকে।
লোকটি বলে উঠল, ‘এদের দু’জনকে ঐ হানিমুন কক্ষে ঢুকিয়ে দাও। আমাদের ঐ কম্পিউটার উদ্ধারে এখনি ছুটতে হবে।’ বলে সে বেরিয়ে গেল।
জর্জ ও সাবাকে গ্রীলের দরজার ওপারের সেলটাতে ঠেলে দিয়ে দরজা বন্ধ করে ওরা সবাই বেরিয়ে গেল।
ডার্ক কাঁচের একটা মার্সিডিস গাড়ি জেনারেল আলেকজান্ডার হ্যামিলটনের গেটের সামনে এসে দাঁড়াল।
সিকিউরিটি বক্সের একজন সৈনিক গাড়ির নাম্বারের দিকে একবার তাকিয়েই সুইচ টিপে দরজা খুলে দিল। গাড়ি ভেতরে প্রবেশ করে গাড়ি বারান্দার দিকে গেল না। গাড়ি বারান্দার পাশ দিয়ে গিয়ে একটা ওয়ালের কাছে দাঁড়াল। দাঁড়াবার সঙ্গে সঙ্গেই স্টিলের ওয়াল উপরে উঠে গেল।
গাড়ি ঢুকে গেল ভেতরে। ভেতরে আরেকটা গাড়ি বারান্দা রয়েছে। সেখানে গিয়ে গাড়িটা থামল।
গাড়ি থামতেই এক পাশে দাঁড়ানো একজন এসে গাড়ির দরজা খুলে জেনারেল শ্যারনকে স্বাগত জানাল।
‘কেমন আছ রবিন?’ গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলল জেনারেল শ্যারন।
রবিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল আলেকজান্ডার হ্যামিলটনের প্রাইভেট সেক্রেটারি।
‘ভালো আছি স্যার। আপনি?’
‘ভালো নেই।’
‘জানি স্যার। আমাদের সাহেবকে প্রেসিডেন্ট জরুরী তলব করেছেন?’
‘তাই?’
‘জি হ্যাঁ।’
‘কখন যাচ্ছেন উনি?’
‘সম্ভবত ঘন্টা খানেক পরেই।’
‘বিশেষ কারণ কিছু আছে?’
‘আপনাদের সম্পর্কে প্রেসিডেন্টের কাছে আরও কিছু রিপোর্ট এসেছে।’
‘আসারই কথা।’
এ রকম ছোটখাট দু’একটা কথা বলতে বলতে তারা দু’তলার একটা কক্ষের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
‘স্যার একটু দাঁড়ান, আমি আসছি।’ বলে রবিন দরজা খুলে ঘরে ঢুকে গেল।
কয়েক মুহূর্ত পরে বেরিয়ে এসে বলল, ‘সাহেব আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন। আসুন স্যার।’
জেনারেল আলেকজান্ডারের স্টাডি রুমে তার টেবিলে মুখোমুখি বসেছে জেনারেল আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন এবং জেনারেল শ্যারন।
কক্ষের সবগুলো দরজা বন্ধ।
আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন নিজে গিয়ে কক্ষের প্রধান দরজা বন্ধ করে এসেছে।
দু’জনের মুখই গম্ভীর, চিন্তাক্লিষ্ট।
‘জেনারেল বলুন, কি করতে পারি আমি।’ বলল আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন।
‘প্রেসিডেন্টের সাথে জর্জ আব্রাহাম ও এ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থারের দেখা করার পথ বন্ধ করতে হবে। ওরা এখন প্লেনে। আসছেন ওয়াশিংটনে।’ শুকনো কন্ঠে বলল জেনারেল শ্যারন।
‘কিন্তু কিভাবে? বরং যেসব রিপোর্ট প্রেসিডেন্টের কাছে এসেছে তা অত্যন্ত ভয়াবহ। সবুজ পাহাড় থেকে লস আলামোস পর্যন্ত গোয়েন্দাগিরীর সুড়ঙ্গ, জর্জ আব্রাহাম, এ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থার ও জেনারেল শেরউডকে সান্তাফে আসার পথে হত্যার চেষ্টা এবং ডজন খানিক মার্কিন সৈনিক নিহত হওয়া, সান্তাফে বিমান বন্দর থেকে এফ.বি.আই-এর যে বিমানে ওদের নিয়ে আসার কথা সে বিমানে বোমা পাতা, ইত্যাদি সব ভয়াবহ অভিযোগ এসেছে প্রেসিডেন্টের কাছে আপনাদের বিরুদ্ধে। এই অবস্থায় ওদের কোন কথা বলাই তো অসম্ভব।’ বলল আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন চিন্তান্বিত কন্ঠে।
জেনারেল শ্যারনের কথায় মুহূর্তের জন্যে জেনারেল শ্যারনের মুখ অন্ধকার হয়ে উঠেছিল, ঠিক চোর হাতে-নাতে ধরা পড়লে যেমনটা হয়। কিন্তু পরক্ষণেই হেসে উঠল। বলল, ‘বলা যাবে। জর্জ আব্রাহামরা তাদের মৃত্যুবান নিজেরাই বয়ে বেড়াচ্ছে।’
‘কি সেটা?’ বলল আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন। তার কন্ঠে উৎসুক্যের সুর।
‘আহমদ মুসা তাদের সাথে আছে। এ পর্যন্ত যা কিছু ঘটেছে, তার পেছনে রয়েছে আহমদ মুসার হাত। আহমদ মুসার মত বুদ্ধিমান ও ধড়িবাজ লোক দুনিয়াতে খুব কমই আছে। সে মার্কিন সরকার ও জনগনের সাথে ইহুদীদের লড়াই বাধাবার জন্যে উঠে-পড়ে লেগেছে। লস আলামোস থেকে সান্তাফে আসার পথে যে ঘটনা ঘটেছে এবং সান্তাফে বিমান বন্দরে এফ.বি.আই বিমানে বোমা পেতে রাখার যে ঘটনা ঘটল তা পরিষ্কারভাবে আহমদ মুসার সাজানো একটা নাটক। দেখুন দুই জায়গাতেই আহমদ মুসা বিষয়টাকে ডিটেক্ট করেছে। যেভাবে, যে পরিস্থিতিতে সে তা ডিটেক্ট করেছে তার বিবরণ নিয়ে দেখুন, আগে থেকে বিষয়টা তার জানা না থাকলে এটা তার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হতো না।’ অত্যন্ত আত্মবিশ্বাস ও সাবলীলতার সাথে কথাগুলো বলল জেনারেল শ্যারন।
জেনারেল আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। জেনারেল শ্যারনের কথাগুলো তার পছন্দ হয়েছে, এটারই প্রকাশ চেহারা ঐ ঔজ্জ্বল্য। বলল সে, ‘কিন্তু একথা আরও যুক্তিগ্রাহ্য করা চাই। দেখুন, আহমদ মুসা একা মানুষ। যে দলবল নিয়ে আমেরিকা এসেছে এটার কোন প্রমাণ নেই। যে ঘটনাগুলোর কথা বললেন, তা করার জন্যে তার বেশ কিছু দক্ষ লোকের প্রয়োজন। এতবড় কাজ এক দু’জনের দ্বারা সম্ভব নয়।’
‘আহমদ মুসা আমেরিকায় একা নয়। তার লোক আমেরিকায় আসেনি, একথা ঠিক। কিন্তু সে বুদ্ধিমান ও দক্ষ লোক পেয়েছে। ইহুদী বিদ্বেষী ‘ফ্রি আমেরিকা’ আন্দোলনের সব লোকই তাদের সাথে রয়েছে। এ লোকদের মাধ্যমে এফ.বি.আই ও সি.আই.এ’র মধ্যেও কিছু লোক সে পেয়ে গেছে। আপনি জানেন, বেঞ্জামিন বেকন আহমদ মুসাকে ন্যাশভিল থেকে ওয়াশিংটন নিয়ে আসে পুলিশ ও এফ.বি.আই সকলের চোখে ধলো দিয়ে। অথচ বেঞ্জামিন বেকনে মত বহু অফিসার ও কর্মী এফ.বি.আই ও সি.আই.এ-তে রয়েছে। তারাই এখন আহমদ মুসার শক্তি। এদের দ্বারাই আহমদ মুসা হত্যা চেষ্টা ও বোমা পাতার ঘটনা ঘটিয়েছে। আর জর্জ আব্রাহাম এবং এ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থার কান কথা শুনে আহমদ মুসার বশংবদে পরিণত হয়েছে। এদের দু’জনকে দায়িত্ব থেকে না সরালে, এফ.বি.আই ও সি.আই.এ আহমদ মুসার খপ্পর থেকে উদ্ধার পাবে না।’
সম্মোহিতের মত কথাগুলো গিলছিল জেনারেল আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন, তার চোখ-মুখের খুশিই প্রমাণ করছে, জেনারেল শ্যারনের প্রতিটি কথাকে সে গ্রহণ করেছে। জেনারেল শ্যারন থামতেই সে বলে উঠল, ‘ধন্যবাদ জেনারেল, প্রকৃত রহস্য আপনি উদ্ধার করেছেন। বিষয়টা আমি এভাবে চিন্তা করিনি। তাহলে দেখা যাচ্ছে, আহমদ মুসার সাথে এখন মূল নাটেরগুরু হলো ‘ফ্রি আমেরিকা’ আন্দোলন। দেখতে হবে এখন এদেরকেও।’
‘ঠিক বলেছেন। প্রেসিডেন্টকে এ ব্যাপারে কনভিনস করতে হবে।’ বলল জেনারেল শ্যারন।
‘সেটা পারা যাবে। এক বেঞ্জামিন বেকনের দৃষ্টান্তই যথেষ্ট। এখন...।’ কথা শেষ করতে পারল না জেনারেল হ্যামিল্টন।
তাকে থামিয়ে জেনারেল শ্যারন বলে উঠল, ‘খুব জরুরী কথা, লস আলামোস থেকে আসার পথে যে হত্যাকান্ড ঘটে, সেখানে বেঞ্জামিন বেকনকে দেখা গেছে। আর গোটা ওই সময়টা সে সান্তাফেতে ছিল। সুতরাং বোমা পাতার কাজ এফ.বি.আই-এর লোক দিয়ে সেই করিয়েছে।’
‘অসংখ্য ধন্যবাদ জেনারেল শ্যারন। আর প্রমাণের দরকার নেই। এখন বলুন, সবুজ পাহাড় থেকে লস আলামোস ল্যাবরেটরী পর্যন্ত সুড়ঙ্গকে আমরা প্রেসিডেন্টের কাছে কিভাবে তুলে ধরব?’
এই সুড়ঙ্গটা হলো দুর্যোগ ও জরুরী অবস্থাকালে লস আলামোস থেকে তার গবেষণা কর্ম সরিয়ে ফেলার ও সকলে বেড়িয়ে যাবার গোপন পথ হিসেবে তৈরী হয়। এটা তৈরী হয় ঠান্ডা-যুদ্ধের শুরুতেই। বিষয়টা এত গোপন ছিল যে প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইজেন হাওয়ার এবং লস-আলামোসের তদানিন্তন প্রধান পরিচালক জেনারেল জ্যাকসন শুধু মৌখিকভাবেই জানতেন। ঠান্ডা যুদ্ধ আমলের প্রেসিডেন্টরাও লস আলামোসের সেই সময়ের প্রধান পরিচালকরাও মৌখিকভাবেই জেনেছেন। ঠান্ডা যুদ্ধের পর কোনোভাবে এই মৌখিক জানাজানির ব্যাপারে ছেদ পড়ে যায়। এই গোপন বিষয়টাই কোনোভাবে এফ.বি.আই ও সি.আই.এ’র নজরে এসে গেছে। ধূর্ত আহমদ মুসা ‘ফ্রি আমেরিকা’ আন্দোলনের সহযোগিতায় এর সন্ধান পেয়ে একে ইহুদীদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডার একটা হাতিয়ার বানিয়েছে।’ বলল জেনারেল শ্যারন।
মুখ ভরা হাসি ঝলসে উঠল জেনারেল আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের মুখে। আনন্দের আতিশয্যে আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন উঠে হ্যান্ডশেক করল জেনারেল শ্যারনের সাথে। বলল, ‘আমি দুশ্চিন্তায় মরে যাচ্ছিলাম। বাঁচালেন আপনি আমাকে। মনে হচ্ছিল আহমদ মুসা আমেরিকাতেও হিরো হতে যাচ্ছে। ধন্যবাদ এবার তাকে জিরো শুধু নয়, জেলেও ঢুকানো যাবে।’
বলে একটু থেমেই আবার দ্রুত কন্ঠে বল, ‘দেখুন জেনারেল, জর্জ আব্রাহাম ও আহমদ মুসার মত লোকেরা বসে থাকবে না। তারাও সব কথা প্রমাণের চেষ্টা করবে। সে রকম কোন দুর্বলতা আপনাদের দিক থেকে আছে কিনা বলুন।’
‘সে রকম দুর্বলতা নেই। আপনাকে বলতে অসুবিধা নেই। আমাদের কম্যুনিটির একজন সদস্যার বিশ্বাসঘাতকতায় একটা অসুবিধা হতে যাচ্ছিল। আমরা সেটা ম্যানেজ করেছি। সে ও তার প্রেমিক এখন আমাদের হাতে। আর কোনদিন তারা কিছু করার বা বলার সুযোগ পাবে না।’
‘কি করেছিল তারা?’ উৎসুক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল জেনারেল আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন।
‘আমাদের সে মেয়েটির সাথে প্রেম ছিল জর্জ আব্রাহামের ছেলে জর্জ জন জুনিয়রের। মেয়েটিকে আমি একটা দায়িত্ব দিয়েছিলাম। দায়িত্ব সে পালন করেনি, উপরন্তু সে আমার সব কথা বলে দিয়েছে জর্জ জন জুনিয়রকে।’ একটু দ্বিধান্বিত কন্ঠে কথাগুলো বলল জেনারেল শ্যারন।
কথা শেষ করেই জেনারেল শ্যারন আবার বলল, ‘স্যার এবার কিছু আশার কথা শোনান। আমরা খুবই সংকটে। এ রকম চরম অস্তিত্বের সংকটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদীরা কখনও পড়েনি।’
‘আমি মনে করি প্রেসিডেন্ট বুঝবেন। কিন্তু সমস্যা এফ.বি.আই-কে নিয়ে। ওরা আবার কি ফ্যাসাদ বাধায়। ওদের চোখ সবখানে।’ বলল জেনারেল আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন।
‘আপনি জর্জ আব্রাহাম ও অ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থারকে বের করে দেয়ার ব্যবস্থা করুন। এফ.বি.আই ও সি.আই.এ দুটোই ঠিক হয়ে যাবে। বেঞ্জামিন বেকনের মত ‘ফ্রি আমেরিকা’ আন্দোলনের ঘাপটি মারা লোকদের বের করে দিলেই সব সমস্যা দূর হবে।’ বলল জেনারেল শ্যারন।
‘কাজটা কঠিন জেনারেল শ্যারন। তবু আমি চেষ্টা করব। কিন্তু জেনারেল আমার ব্যাপারে আপনারা কি চিন্তা করেছেন?’ বলল জেনারেল আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন।
‘সে সিদ্ধান্ত আমাদের হয়ে গেছে। আগামী নির্বাচনে আপনি হবেন রানিংমেট, মানে ভাইস প্রেসিডেন্ট। পরবর্তী টার্মেই প্রেসিডেন্ট।’
‘ধন্যবাদ জেনারেল। আমি সারাজীবন আমেরিকার খেদমত করেছি। মার্কিন সর্বাধিনায়ক হিসেবে মার্কিন বাহিনীকে আমি সারা পৃথিবীর অভিভাবকত্বের মর্যাদায় উন্নীত করেছি। আমি চাই মার্কিন জাতিও সারা পৃথিবীর অভিভাবক হয়ে দাঁড়াক।’ বলল জেনারেল আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন। তার কন্ঠে আবেগ।
‘আপনি জানেন, এই নতুন বিশ্বায়নের ব্লুপ্রিন্ট নতুনভাবে তৈরী করেছিলেন বিজ্ঞানী জন জ্যাকব। দুর্ভাগ্যের বিষয় আহমদ মুসা এবং তার নতুন সাথী জর্জ আব্রাহাম ও অ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থার সেই বিজ্ঞানী জন জ্যাকবকেই গোয়েন্দাগিরীর অভিযোগে শেষ করে দিতে চাচ্ছেন। আসল লক্ষ্য এই বিশ্বায়ন পরিকল্পনা বানচাল করা।’ বলল জেনারেল শ্যারন।
‘ঠিকই বলেছেন জেনারেল। আমি যখন ব্রিগেডিয়ার তখন আমার আম্মার কাছে দেখি এই ব্লুপ্রিন্ট। আমার আব্বা একজন গোঁড়া ক্যাথলিক রাজনীতিক, কিন্তু আম্মা ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান ইহুদী। তিনি ছিলেন সিনাগগ-এর নিয়মিত সদস্য। আব্বা তখন নিউ ইয়র্কের সিনেটর, সে সময় আম্মা একদিন এই ব্লুপ্রিন্ট আমার হাতে দিয়ে বলেছিলেন, আমাদের সিনাগগ-এর এই দলিল তোকে দিলাম। এই আমানত রক্ষা করবি। আমি তাকে বলেছিলাম, রাজনীতিক হিসেবে আব্বাই তো এর আমানতদার হতে পারেন। তিনি বলেছিলেন, তিনি আমাকে ভালবাসেন সিনাগগকে নয়, সিনাগগ-এর দলিলকেও নয়। তোকে রাজনীতিক হতে হবে। যতটুকু পারিস এই বিশ্বায়নের পক্ষে কাজ করতে হবে। এই বিশ্বায়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিশ্ব নেতৃত্ব তো আমেরিকারই থাকবে। আম্মার এসব কথা আমি ভুলিনি। ভুলিনি বলেই রাজনীতি করতে চাই।’
আবেগে-উত্তেজনায় জেনারেল শ্যারনের মুখ লাল হয়ে উঠেছে। সে উঠে গিয়ে জড়িয়ে ধরল জেনারেল আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনকে।
পাশেই আরেকটা কক্ষে জেনারেল আলেকজান্ডারের প্রাইভেট সেক্রেটারি রবিন, মানে রবিন নিক্সন, টেবিলে রাখা একটা ছোট্ট যন্ত্রের উপর ঝুঁকে পড়ে কথা শুনছে।
যন্ত্রটি একটা মাইক্রো রেকর্ডার। আধুনিকতম অয়্যারলেস মাইক্রো রিসিভার এটা। আধা বর্গ মাইলের মধ্যে কোথাও রাখা আলপিনের আগার মত মাইক্রো ট্রান্সমিটার চীপস যে তথ্য প্রেরণ করে, এই রিসিভার তা রিসিভ করে সংগে সংগেই ভাষায় রূপ দিয়ে রেকর্ড এবং রিলে বা ট্রান্সমিটও করতে পারে।
রবিন নিক্সন রেকর্ড রিলেটাই এখানে শুনছে।
জেনারেল আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের সাথে জেনারেল শ্যারনের যে কথোপকথন হলো সবই রবিন নিক্সন রেকর্ড করেছে।
জেনারেল আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের সামনে তার কলমদানির তলায় মেকার কোম্পানির সোনালী যে ষ্টিকার লাগানো আছে তার উপরেই পেষ্ট করা রয়েছে সোনালী ডট আকারে একটা মাইক্রো ট্রান্সমিটার চীপ। সেই ট্রান্সমিটারই ট্রান্সমিট করেছে দুই জেনারেলের আলোচনার গোটা বিবরণ।
শুনতে শুনতে বিস্ময় ও বেদনায় পাথরের মত হয়ে গেছে রবিন নিক্সন। রিলে কখন বন্ধ হয়ে গেছে সেদিকে তার খেয়াল নেই। যন্ত্র কানের কাছে স্থির রেখে বসে আছে সে।
তার ইন্টারকম কথা বলে উঠল।
সম্বিৎ ফিরে পেয়ে তড়িঘড়ি সোজা হয়ে বসল সে। তাড়াতাড়ি মাইক্রো অয়ারলেস রিসিভারটি হাতে তুলে নিয়ে ইন্টারকমে কথা বলতে বলতে যন্ত্রটাকে তার চশমার খাপে ঢুকিয়ে ফেলল। তারপর দরজা খুলে ছুটে বেরিয়ে এল।
তার ডাক পড়েছে। মেহমানকে বিদায় দিতে হবে।
দ্রুত গিয়ে সে হাজির হল জেনারেল আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের স্টাডি রুমের সামনে।
জেনারেল হ্যামিল্টন ও জেনারেল শ্যারন দুজনে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মুখোমুখি আলাপ করছে।
রবিনকে দেখেই বলে উঠল জেনারেল হ্যামিল্টন, ‘রবিন তোমারও যাবার সময় হয়েছে। এক কাজ কর আমাদের গাড়িতে একে পৌছে দিয়ে তুমি বাসায় চলে যাবে। উনার ড্রাইভারকে গাড়ী নিয়ে অন্য এক জরুরী কাজে যেতে হবে।’
‘ইয়েস স্যার।’ মাথা নেড়ে বল রবিন নিক্সন।
হাঁটতে শুরু করেছে তখন জেনারেল শ্যারন।
রবিন নিক্সন ড্রাইভারের পাশের সিটে বসতে যাচ্ছিল। কিন্তু জেনারেল শ্যারন পেছনে তার পাশে বসতে বল।
বসল রবিন নিক্সন।
গাড়ি চলতে শুরু করেছে। রবিন নিক্সন বল, ‘স্যার ড্রাইভারকে আপনার বাড়ির লোকেশন তো বলা হয়নি। আপনি কি আইজ্যাক বেনগুরিয়ানের বাড়িতেই আছেন?'
‘ও, তুমি তো জানোই। হ্যা, ওরা সম্ভবত ওয়াশিংটনের বাইরে এখন। আমি চলে এসেছি। মনে হচ্ছে থাকতে হবে আরও বেশ কিছুদিন, তাই একটা বাসা নিয়েছি।’
রবিন নিক্সন কোন কথা বলল না।
কথা বলল জেনারেল শ্যারনই আবার। বলল, ‘বলতো রবিন, তোমাদের আমেরিকার বড় শত্রু কে?’
‘এটা রাজনৈতিক প্রশ্ন, রাজনীতিকরাই ভাল বলতে পারেন স্যার।’ বলল রবিন নিক্সন।
‘কিন্তু রবিন, দেশের শত্রু-মিত্রের ব্যাপারটা রাজনীতির বিষয় নয়, নাগরিকদের চেতনার বিষয়।’
‘নাগরিক চিন্তার দিক দিয়ে দেখলে আমেরিকার কোন শত্রু নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ বিশ্বের বৃহত্তম শক্তি। তাকে চ্যালেঞ্জ করার মত কোন শত্রু আমি দেখি না।’ বলল রবিন নিক্সন।
‘আচ্ছা বলত, ইহুদীরা কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু হতে পারে?’
‘বললাম তো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ এত বড় যে, কেউ গায়ে পড়ে তার সাথে শত্রুতা করতে আসবে না। ইহুদীরা আসবে কেন?’
‘ছোটরা কি বড়দের সাথে শত্রুতা করতে যায় না?’
‘অবশ্যই যেতে পারে। কিন্তু সেটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে। কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে মার্কিনীরা কারও শত্রু হতে পারে, আবার অন্য কেও মার্কিনীদের শত্রু হতে পারে। আমি বলেছি জাতিগত বা দেশগত শত্রু না থাকার কথা।’
‘তুমি খুব বুদ্ধিমান ও ভালো ছেলে। আচ্ছা তুমি আহমদ মুসাকে জান? তার সম্পর্কে তোমার কি ধারণা?’
ঠোঁটের কোণায় হাসি ফুটে উঠল রবিনের। বলল, ‘তার সম্পর্কে কোন প্রত্যক্ষ ধারণা আমার নেই। কিন্তু যতটুকু শুনেছি তাতে বুঝেছি সব সময় তিনি মজলুমের পক্ষেই থাকেন।’
‘এই তো ভুল করলে রবিন। যার সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা নেই তার সম্পর্কে এই রায় দেয়া তো ঠিক নয়।’
‘ঠিক বলেছেন।’
‘ধন্যবাদ রবিন।’
‘ওয়েলকাম, স্যার।’
‘ড্রাইভার, এসে গেছি। বাম দিকের গেটে দাঁড়াও।’ বলল জেনারেল শ্যারন।
গাড়ি দাঁড়াল।
জেনারেল শ্যারন গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলল, ‘রবিন নামবে নাকি?’
রবিন হাসল। বলল, ‘স্যারের সাথে তো ফ্যামিলি নেই। নেমে কি হবে স্যার?’
‘কি হবে না বল? বিরাট বাড়ি। সবই এখানে আছে। উদ্যান থেকে জিন্দানখানা সবই এখানে থাকতে পারে।’
‘জিন্দানখানা?’
হেসে উঠল জেনারেল। বলল, ‘বাড়িটা ছিল এক সময় পুলিশ অফিস। পরে এটা হয় একটা প্রাইভেট গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানের দপ্তর। সুতরাং বুঝতেই পারছ।’
‘আর বলতে হবে না স্যার’ বলে গাড়ি থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখে নিল সে বাড়িটা। গেটের আলোতে বাড়ির নাম্বারটাও সে দেখতে পেল স্পষ্টভাবে।
রবিনদের গাড়ি বিদায় না হওয়া পর্যন্ত জেনারেল শ্যারন গেটে দাঁড়িয়ে থাকল।
প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের সাথে তার আলোচনার গোটা বিবরণ পেশ করল জেনারেল শ্যারন। বিশাল হলঘর ভর্তি মানুষ। একটা বিশাল গোল টেবিল ঘিরে দুই সারি হয়ে বসেছে তারা।
‘কাউন্সিল অব আমেরিকান জুইস অ্যাসোসিয়েশনে’র সদস্য সবাই। বিশ্ব ইহুদী গোয়েন্দাচক্রের প্রধান জেনারেল শ্যারনের জরুরী তলবে তারা হাজির হয়েছে।
জেনারেল শ্যারন থামতেই ডেভিড বেগিন বলে উঠল, ‘ধন্যবাদ জেনারেল। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। অদ্ভুত দক্ষতার সাথে যুক্তিগুলো আপনি সাজিয়েছেন। আমি আশা করছি প্রেসিডেন্টকে পক্ষে আনার জন্যে তা যথেষ্ট হবে।’
ডেভিড বেগিন ‘কাউন্সিল অব আমেরিকান জুইস অ্যাসোসিয়েশনে’র সভাপতি এবং আমেরিকার শ্রেষ্ঠ ধনীদের একজন।
ডেভিড বেগিন থামলে সামনের সারি থেকে আরেকজন সদস্য বলে উঠল, ‘মিঃ বেগিন, আপনিও প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন গতকাল। সে সম্পর্কে আমরা কিছু জানতে পারিনি।’
‘ধন্যবাদ সম্মানিত সদস্য। আমরা প্রথমে জেনারেলের রিপোর্ট শুনলাম। সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমার সাক্ষাত ছিল সৌজন্যমূলক। প্রসংগক্রমে আমি সব কথা বলারই সুযোগ নিয়েছি।’
একটা দম নিল ডেভিড বেগিন।
সামনের গ্লাস থেকে এক গ্লাস পানি পান করল। কথা শুরু করল আবার, ‘সৌভাগ্যের বিষয় হলো, প্রেসিডেন্টই প্রসংগটা তুলেছিলেন। বলেছিলেন তিনি, সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গেছে জানেন তো? আমি বলেছিলাম, জানি মহামান্য প্রেসিডেন্ট। আপনি বিষয়টি তোলার জন্যে ধন্যবাদ। বিষয়টা নিয়ে আমিও কিছু বলতে চেয়েছিলাম। প্রেসিডেন্ট বলার অনুমতি দিলে আমি বললাম, মহামান্য প্রেসিডেন্ট, মনে হচ্ছে আমরা ষড়যন্ত্রের শিকার। যেদিনই শুনেছি, আহমদ মুসা আমেরিকা এসেছে সেদিনই ভয় পেয়েছিলাম সে কিছু না করে আমেরিকা থেকে যাবে না। তার দেহের প্রতিটি রক্ত কণিকায় রয়েছে ইহুদী বিদ্বেষ। আমেরিকান গণতন্ত্রের মহান শাসনে ইহুদীরা ভালো আছে, এটা তার সহ্য হবার কথা নয়। তাই হয়েছে। আসার পরেই ষড়যন্ত্র শুরু করেছে আমাদের বিরুদ্ধে। দেখুন, যতগুলো ঘটনা ঘটেছে, তার সাথে আহমদ মুসা কোন না কোনভাবে যুক্ত আছে। আমাদের সন্দেহ, সেই সবকিছুর নাটেরগুরু। আমাদের সন্দেহটাই মহামান্য প্রেসিডেন্টের কাছে তুলে ধরতে চাই। কোন প্রমাণ আমরা দিতে পারবো না। আমরা প্রেসিডেন্টের সাহায্য চাই, তিনি অমূলক অভিযোগ থেকে আমাদের রক্ষা করবেন। আমার মনে হয়েছে প্রেসিডেন্ট আমার কথায় খুশি হয়েছেন। তিনি বললেন, আমারও এই রকমই ধারণা মিঃ ডেভিড বেগিন। আমাদের গণতন্ত্রের যে সংগ্রাম, সেই সংগ্রামে ইহুদীরা আমাদের সহযোগী। তাদের কাছে থেকে বৈরী কোন আচরণ কোন সময় আমরা পাইনি, আশাও করিনা। তাই হঠাৎ করে সংঘটিত এ ঘটনাগুলো আমাকে খুবই কষ্ট দিয়েছে। আমি বিষয়টা ব্যক্তিগতভাবে দেখছি। প্রেসিডেন্টের কথা শেষ হলে আমি অনুনয়ে বললাম, মহামান্য প্রেসিডেন্ট, এফ.বি.আই প্রধান জর্জ আব্রাহাম ও সি.আই.এ চীফ অ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থার খুবই ভাল ও দক্ষ লোক, কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য ইহুদীদের প্রতি তারা সহৃদয় নন। ছোট-খাট বিভিন্ন ঘটনায় এটা দেখা গেছে। তার উপর, মহামান্য প্রেসিডেন্ট আমরা জানতে পেরেছি, আহমদ মুসা জর্জ আব্রাহামের নাতিকে ওহাইও নদীতে নিমজ্জিত হওয়া থেকে রক্ষা করায় তিনি তার প্রতি খুবই দুর্বল। আমার এ কথায় খুব কাজ হয়। প্রেসিডেন্টের চোখ-মুখ রাগে লাল হয়ে ওঠে। তিনি কঠোর কন্ঠে জিজ্ঞেস করেন, এ কথা কি সত্য? আমি বললাম, জি মহামান্য প্রেসিডেন্ট, জর্জ আব্রাহামের বোটের যিনি ড্রাইভার ছিলেন, তার কাছ থেকেই ঘটনাটা শোনা। ঐ ড্রাইভার এখন ওয়াশিংটনের পটোম্যাক নদীর একটি আর্মি সার্ভিসে কাজ করেন। তথ্যটি দেয়ার পর প্রেসিডেন্ট আমাকে ধন্যবাদ দেন এবং বলেন, রাষ্ট্রীয় কাজে যুক্তিগত প্রবণতার কোন স্থান নেই। কথা শেষ করেই তিনি আবার আমাকে জিজ্ঞেস করেন, জর্জ আব্রাহামের কোন ঘরের নাতি ওটা? আমি বলি, তাঁর বড় ছেলের ঘরের নাতি। এই একটি মাত্রই নাতি তাঁর। তাঁর বড় ছেলে জর্জ মুর আব্রাহাম প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্ণেল। পোস্টিং এ আছেন এখন আলাস্কায়। পরে বুঝলাম এই শেষ কথাগুলো না বলাই ভাল ছিল। আমি প্রেসিডেন্টের ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে উঠতে দেখেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, আপনারা তো দেখছি অনেক খবর রাখেন। আমার ভুলটা বুঝতে পেরে আমি তাড়াতাড়ি বলেছিলাম, বিষয়টা আমি বাই দি বাই জেনেছি মহামান্য প্রেসিডেন্ট। আমি বিব্রতকর অবস্থা থেকে রক্ষা পেয়ে যাই কফি নিয়ে বেয়ারা এসে পড়ায়। কফি পানের পর আমি বিদায় হই। তিনি খুব আন্তরিকতার সাথে আমাকে বিদায় দেন এবং বলেন, আপনাদের সহযোগিতাকে খুবই মুল্য দেই মিঃ ডেভিড বেগিন। উদ্বিগ্ন হবেন না, দেখব আমি সব।’ থামল ডেভিড বেগিন।
ডেভিড বেগিনের কথাগুলো গোগ্রাসে গিলছিল কক্ষে উপস্থিত সবাই। সবারই চোখ-মুখ আনন্দে উজ্জ্বল। সামনের সারি থেকে একজন বলে উঠল, ‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আপনার বলে আসা কথার পরে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা যদি জেনারেল শ্যারনের ব্রীফ করা কথাগুলো প্রেসিডেন্টকে বলেন, তাহলে তা মোক্ষম কাজে দেবে। আমি খুবই আশাবাদী। জেনারেল শ্যারন এবং মিঃ ডেভিড বেগিন দুজনকেই ধন্যবাদ।’
এবার কথা বলে উঠল ডেভিড বেগিনের পাশ থেকে পাকা চুল, পাকা গোঁফের সৌম্যদর্শন একজন বৃদ্ধ। বলল, ‘আমরা তো ঘটনার আমাদের দিকটা দেখছি বলে খুশি হচ্ছি। ঘটনার আরেকটি দিক আছে। সেখানে আমাদের কোন দুর্বলতা আছে কি না, সেটাও চিন্তা করা দরকার। তাহলে বিহিত-ব্যবস্থার বিষয়টাও আমরা ভাবতে পারব।’
‘ধন্যবাদ আপনাকে। আপনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়ের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। আমাদের দুর্বল দিকগুলোর কথা আপনারা সবাই জানেন। আমরা চেষ্টা করছি ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে আহমদ মুসার উপর দোষ চাপিয়ে সেসবের রিমেডি করতে। একটা বড় দুর্বল দিক হলো একটা জীবন্ত সাক্ষী, যে আমাদের বৈরী। সে সাক্ষী হলো আইজ্যাক বেনগুরিয়ানের মেয়ে জর্জ আব্রাহামের ছোট ছেলের প্রেমিকা সাবা বেনগুরিয়ান। সে আমাদের সব জানে এবং সবকিছু সে জানিয়েছে তার প্রেমিক জর্জ জন জুনিয়রকে। ঈশ্বরের দয়া। দুজনকেই আমরা পাকড়াও করেছি। তারা এখন আমাদের হাতে। এরা হাতছাড়া হলে আমাদের বিপদ হবে। এ দিকে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’ বলল জেনারেল আইজ্যাক শ্যারন।
‘তাদের দুজনকে হত্যা করলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।’ একজন বলে উঠল পেছন থেকে।
‘আমাদের কম্যুনিটির একজন বিশিষ্ট সদস্য আইজ্যাক বেনগুরিয়ানের একমাত্র মেয়ে সাবা। তাকে কিংবা তার প্রেমিককে এ সময় হত্যা করা ঠিক হবে না। এ নিয়ে আমাদের নিজেদের মধ্যে এখন কোন সংকট সৃষ্টি হোক তা চাই না। আসল সংকট কেটে যাক। পরে দেখা যাবে।’ বলল জেনারেল শ্যারন।
‘জেনারেল ঠিকই বলেছেন। এ সময় আমাদের ঐক্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।’ বলল ডেভিড বেগিন।
‘আমাদের এখন আর কি করণীয়?’ বলে উঠল একজন যুবক সদস্য পেছন থেকে।
‘আমরা প্রেসিডেন্টের পদক্ষেপের অপেক্ষা করছি। কি পদক্ষেপ নেন তার ভিত্তিতেই আমাদের করণীয় ঠিক করতে হবে। সিদ্ধান্ত যদি আমাদের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে রাজনৈতিক কৌশলের দিকে আমাদের যেতে হবে এবং প্রেসিডেন্টকে অসহায় ও বিচ্ছিন্ন করে কাজ আদায় করতে হবে। আর যদি সিদ্ধান্ত পক্ষে আসে, তাহলে আমাদের বৈরী পক্ষের মানে জর্জ আব্রাহাম ও ম্যাক আর্থারের সামনে এগুবার সব পথ বন্ধ করতে হবে। আর আহমদ মুসাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়া আমাদের সব সময়ের প্রধান কাজ। আমাদের অস্তিত্ব যতখানি গুরুত্বপূর্ণ, এবিষয়টাও ততখানিই গুরুত্বপূর্ণ।’ বলল জেনারেল শ্যারন।
‘আহমদ মুসার ব্যাপারে মার্কিন সরকার কি সিদ্ধান্ত পাল্টেছে?’ একজন জিজ্ঞেস করল।
‘না, পাল্টায়নি। তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারের আদেশ এখনও বহাল আছে। তবে জর্জ আব্রাহামের কারণে আদেশটা কার্যকরী হচ্ছে না।’
‘এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্টকে বলা দরকার ছিল না?’ বলল আরেকজন সদস্য।
‘খোদ নিরাপত্তা প্রধান এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। প্রেসিডেন্ট নির্দেশ দিয়েছেন বিষয়টি সেটেল্ড হওয়ার আগে আহমদ মুসাকে যেন ছাড়া না হয়।’ জেনারেল শ্যারন উত্তর দিল।
‘কিন্তু তবু আহমদ মুসা মুক্ত কিভাবে?’ প্রশ্ন অন্য একজন সদস্যের তরফ থেকে।
‘এটাও জর্জ আব্রাহামদের কারণে। আর এটা আমাদের জন্যে ভালই হয়েছে। জর্জ আব্রাহাম ও অ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থারের বিরুদ্ধে নতুন পয়েন্ট যোগ হয়েছে প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা জেনারেল আলেকজান্ডারের হাতে।’ বলল জেনারেল শ্যারন হাস্যোজ্জ্বল মুখে।
জেনারেল শ্যারনের কথা শেষ হতেই তার টেলিফোন বেজে উঠল।
মোবাইল তুলে কথা বলল শ্যারন। মুহূর্তেই তার মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
কথা শষ করে বলল সে সদস্যদের উদ্দেশ্যে, ‘জেনারেল আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন টেলিফোন করেছিলেন, তাঁর মিশন সাকসেসফুল। প্রেসিডেন্ট তাঁর মতামতের প্রতি সায় দিয়েছেন।’
সকলে একযোগে বলে উঠল, ‘আমেন।’