বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

রোমাঞ্চকর গল্পঃ স্বপ্ন ( সাইকো থ্রিলার)

"ফ্যান্টাসি" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান MD.Belal Hosan (০ পয়েন্ট)

X গলগল করে মুখ থেকে গড়িয়ে রক্ত পরছে। পেটের একাংশ চিরে ফেলা হয়েছে। সেখান দিয়ে শরীরের ভেতরের কিছু অংশ ঝুলে আছে। টপটপ করে রক্ত ঝরছে সেখান দিয়ে। চেহারাটা অস্পষ্ট। তবুও চেহারায় সূক্ষ্ম একটা হাসি দেখা যাচ্ছে। এই অবস্থায় কেউ হাসতে পারে ব্যাপার টা ভাবলেই গায়ে কাটা দেয়। তবুও লোকটা হাসছেন। যেখানে মৃত্যু অনিবার্য সেখানে জীবনের শেষ হাসাটুকু হেসে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করলেন লোকটা। লোকটার দাত বের হয়ে গেছে। দাতের ফাকা অংশ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। রক্তের রং লাল না কালো বুঝা যাচ্ছে না । তবুও স্পষ্ট এগুলো রক্ত। লোকটা হাসতে হাসতে তার হাত বাড়িয়ে দেয়। হাতেও ছোপ ছোপ রক্ত লেগে আছে। ২ নুরুজী আজ ছয় দিন পর তার চেম্বারে বসেছে। চেম্বারে বসলেও তিনি আজ রোগী দেখছেন না।তার এসিস্ট্যান্ট কে বলে দিয়েছেন বিশেষ কারনে তিনি আজ রোগী দেখবেন না। কেউ আসলে তার সিরিয়াল টা রেখে বাসায় পাঠিয়ে দিতে বলা হয়েছে। কাল যথারীতি সিরিয়াল মেন্টেন করে রোগী দেখা হবে। নুরুজী রোগী দেখছেন না। কিন্তু অবসর সময় যে কাটাচ্ছেন তেমন ও না। তিনি "স্বপ্নের ব্যাখ্যা" নামক একটি বই নিয়ে বসেছেন। তিনি এইসব বইয়ে বিশ্বাস করেন তা নয়। তারপরেও তিনি বই টা দেখছেন। তিনি বই টা যোগাড় করেছেন তার বাসার দারোয়ান খলিলের কাছ থেকে। সেটাই নেড়েচেড়ে দেখছেন তিনি।বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি একটি স্বপ্ন বারবার দেখছেন। স্বপ্নটা অনেকটা এমন "নুরুজী ও আর একটা লোক গাছে উঠছেন। তারা গাছে উঠার প্রতিযোগিতা লেগেছেন লোকটা নুরুজীর আগে গাছে উঠে যাচ্ছেন। নুরুজী কোন ভাবেই লোকটাকে ধরতে পারছেন না। নুরুজী অনেক চেষ্টা করেও লোকটার আগে যেতে পারলেন না। লোকটা নুরুজীর আগে গাছের একদম উপরে উঠে গেছেন। নুরুজী তার পিছনে পিছনে উঠেছেন। লোকটা ঘুরে নুরুজীর দিকে তাকালেন। নুরুজী অবাক হয়ে দেখলেন লোকটা তো তিনি ই। আর তখন নিজেকে লোকটার ছায়া মনে হতে থাকে নুরুজীর। লোকটা নুরুজীর দিকে তাকিয়ে নুরুজী কে একটা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন " নুরুজী আর নিচে পরতে পারে না। তার আগেই তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। নুরুজী বইটা খুঁজতে খুঁজতে "নিজেকে স্বপ্নে দেখা" অধ্যায়ে একটা জায়গায় পেলেন " যদি স্বপ্নে কেউ দেখে যে পাহাড়ের চূড়া অথবা গাছের উপর থেকে অথবা কোন কিছুর উপর থেকে নিজেকে নিজে ফেলে দিচ্ছে তাহলে তার সামনে অনেক বড় বিপদ। এবং সে বিপদের কারন হবে সে নিজেই। যতোই সাবধান থাকে কোন লাভ নেই। বিপদে তাকে পরতেই হবে। বিপদ অনিবার্য। নুরুজী ব্যাখ্যাটা পড়ে হাসতে থাকেন। তিনি এইসব বইয়ে বিশ্বাস করেন না।ফুটপাথের ১০টাকার বইয়ে যদি আসোলেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা পাওয়া যেতো তাহলে হয়তো স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে অনেক গরীব কোটিপতি হয়ে যেতো। কিন্তু অশ্চার্য্য ব্যাপার হলো এই সব বইয়ে গরীব রাই বেশি বিশ্বাস করে। তারা ভাবে যদি এই বইয়ের বাহানায় তাদের ভাগ্য ফিরে যায়। নুরুজী তার স্বপ্নের ব্যাখ্যা এতো তারাতারি পেয়ে যাবে ভাবেন নি। এখন আর তার সময় কাটছে না। তিনি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখেন মাত্র সন্ধ্যা ৭টা বাজে। ৯টা পর্যন্ত তার চেম্বারে থাকার কথা। তিনি তার এসিস্ট্যান্ট কে ডেকে বলে দিলেন কেউ আসলে পাঠিয়ে দিতে।তিনি আজ সিরিয়াল ছাড়াই রোগী দেখবেন। ৩ যে ছেলেটা নুরুজীর সামনে বসে আছে ছেলেটার চুল গুলো এলোমেলো হয়ে আছে। চোখের নিচে কালো দাগের স্তর পরেছে। ছেলেটাকে দেখলে যে কেউ বলে দিতে পারবে ছেলেটা প্রচন্ড রকমের অস্থিরতায় ভুগছে। যার কারনে সে বাড়ি থেকে বের হবার সময় ও চুল গুলো ঠিক করার প্রয়োজন মনে করেনি।ছেলেটা যে রাতে ঘুমাতে পারে না তা তার চোখের নিচের কালো দাগ ই স্পষ্ট বলে দিচ্ছে। নুরুজীর হাতে ছেলেটাকে নিয়ে যেসব তথ্য আছে সে সব তথ্য অনুযায়ী ছেলেটার নাম ইমন হবার কথা। তারপরেও নুরুজী মুখে একটি হাসি টেনে ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলেন তোমার নাম কি? ছেলেটি সহজ ভাবেই উত্তর দিলো "ইমন" নুরুজী পরিবেশ হালকা করার জন্য মুখের হাসিটা ধরে রেখে বললেন তা ইমন কেমন আছো তুমি? -জ্বী ভালো। নুরুজী বললেন "ভালো যে নেই তা বুঝতেই পারছি তোমাকে দেখে।তুমি যে শার্টের একটা বোতাম উল্টো লাগিয়েছো তাও লক্ষ্য করো নি। ইমন অবাক হয়ে নিচে তাকিয়ে দেখে ঠিকি সে একটি বোতাম অন্যটার জায়গায় লাগিয়ে রেখেছে। ইমন হটাত করেই অপ্রস্তুত হয়ে যায়।বোতাম টা ঠিক করার চেষ্টা করতে থাকে। নুরুজী ইমন কে সময় দেয়। তিনি বুঝতে পারছেন ইমন কঠিন সময় পার করছে। ইমনের বোতাম লাগানো হয়ে গেলে নুরুজী শান্তভাবে ইমনকে জিজ্ঞেস করেন "তা ইমন কি সমস্যা তোমার? " ইমন স্থির ভাবে উত্তর দেয় " স্বপ্ন" নুরুজী অবাক হয়ে যান কিছুটা। কারন এই স্বপ্ন নিয়ে তিনিও কিছু ঝামেলায় আছেন। নুরুজী তার অবাক হবার ভঙ্গী টা গোপন করে বলেন "স্বপ্ন আবার কিভাবে সমস্যা করতে পারে? " -আমি জানিনা তবে আমার সব সমস্যা একটি স্বপ্ন। নুরুজী জিজ্ঞেস করেন ইমন কে "কি স্বপ্ন দেখো তুমি? ইমন ঘামতে শুরু করেছে। ইমন বলার চেষ্টা করছে কিন্তু বলতে পারছে না। নুরুজী ইমন কে অভয় দিয়ে বলেন "ইমন তুমি বলে ফেলো কোন ভয় পেও না। অস্থির হবার দরকার নেই। তোমার সময় নাও। আস্তে আস্তে বলো। রীতিমতো ইমনের হাত-পা কাপা শুরু করেছে।ইমন এক গ্লাস পানি একেবারেই খেয়ে ফেলে। কোন ভাবেই শান্ত হতে পারছে না সে। নুরুজী ইমনে অবস্থা বুঝতে পারেন তিনি বলেন "আচ্ছা ইমন তোমার বলা লাগবে না। বলতে কষ্ট হলে বাদ দাও। তুমি বাসায় চলে যাও। ইমন অস্থির হয়ে বলে উঠে না না আমার বলতে হবেই। আমি এই সমস্যা থেকে মুক্তি চাই। অনেক দিন থেকে যুদ্ধ করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে পরেছি। নুরুজী বললেন "তাহলে এক কাজ করো তুমি বাসায় চলে যাও তোমার কথা গুলো রেকর্ড করে নিয়ে আসো। অথবা লিখে নিয়ে আসো। ইমন বললো "আমি এখানেই লিখে দেই। আজ লিখে দিয়ে যাই। আমি ২-৩দিন পর আবার আসবো। সেদিন আপনি বলবেন এর সমাধান কি। আপনার এখানে কি খাতা কলম হবে? হ্যা অবশ্যই। বললেন নুরুজী। তিনি খাতা কলম ইমনের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। সাথে বললেন নিচে তোমার বাসার ঠিকানা আর মোবাইল নাম্বারটা লিখে দিয়ো।আমি দুরে সরে গেলাম। তুমি আস্তে আস্তে লিখো। নুরুজী দুর থেকে ইমন কে দেখছেম ছেলেটা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। লিখে যাচ্ছে নিজের মতো করে। ছেলেটা অসম্ভব সুন্দর একটি ছেলে। চেহারার অস্থিরতার কারনে ছেলেটার সৌন্দর্য বোঝা যাচ্ছে না। ছেলেটা কোন সমস্যায় না থাকলে তাকে রাজকুমার অথবা প্রিন্স বললেও খুব বেশি অপরাধ হতো না।কারন ছেলেটার চেহারায় সৌন্দর্যের সাথে সাথে মায়া ও রয়েছে অসম্ভব। এই দুইটা জিনিস খুব কম মানুষের চেহারাতেই থাকে। ছেলেটার নাম্বার অথবা বাসার ঠিকানা নুরুজীর প্রয়োজন নেই। তবুও তিনি চেয়েছেন। কেন চেয়েছেন জানেন না। শুধু মনে হলো নাম্বার টা লাগবে।সাথে বাসার ঠিকানা টাও। ৪ নুরুজী ইমনের লিখাটা নিয়ে বসেছেন। ইমন নুরুজী কে রিকুয়েস্ট করেছিলো বাসায় যাবারর আগে যেনো তিনি লিখাটা না পড়ে। নুরুজীর ইমনের কথাটা রেখেছেন। তিনি খুলেন নি। বাসায় এসে সব কাজ শেষ করেই তিনি লিখাটা নিয়ে বসেছেন। তিনি লিখাটা পডার আগে ইমন কে নিয়ে কিছু লিখলেন তার কম্পিউটারে। নামঃইমন বয়সঃ ২১-২৩ এর মাঝে। মন্তব্যঃ ছেলেটা অত্যান্ত ধৈর্যশীল। তার কাছের মানুষ খুব কম। নিজে নিজের কাছে অনেক একা। কারো সাথে কোন কিছু শেয়ার করতে পারে না। যার কারনে স্বপ্নের বিবরন সহজ ভাবে দিতে পারছিলো না। খাতা কলমের সাহায্য নিতে হয়েছে। ছেলেটার লেখালেখির অভ্যাস রয়েছে। খুব সম্ভবত তার সব কথা সে লিখে রাখে। কারন অতি অল্প সময়ে অনেক লিখা লিখে ফেলেছে সে। এবং কলম চালানো দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো এই কাজটায় সে বেশ অভ্যস্ত। ছেলেটা অনেক বড়লোক ঘরের ছেলে। আসার সময় গাড়ি দিয়ে এসেছে। গাড়িটা ছিলো "জাগুয়ার " ব্যান্ড এর। কারন এই গাড়ীর ডুয়েল টার্বো ইঞ্জিনের শব্দ অনেক দুর থেকে শুনলেই বোঝা যায়। আর ছেলেটা আসার আগে ও যাওয়ার সময় তিনি এই গাড়ীর ইঞ্জিনের শব্দ পেয়েছেন। নুরুজী ইমনের লিখাটা পড়তে শুরু করলেন "স্বপ্নটা আমি যখন প্রথমবার দেখি আমার বয়স খুব বেশি হবে না। বেশি হলে ৫-৬। তখন সবে মাত্র বুঝতে শুরু করেছি। এক রাতে আমি দেখলাম আমার বিছানার চারপাশে শুধু রক্ত আর আর রক্ত। আমি এদিক ওদিক তাকাতে থাকলাম দেখি দরজার সামনে একটি লোক দাড়িয়ে আছে। তার সারা শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। পেটের কিছু অংশ খুবলে আছে। লোকটার মুখে কোন যন্ত্রনা ছিলো না। ছিলো শুধু প্রশ্নবোধক চিহ্ন। লোকটা হাসছিলো। তখন আমার সামনে দিয়ে একটি তরুনী বয়সের মেয়ে তেড়ে যায় লোকটার দিকে। তার হাতে একটি ছুড়ি। সেটি দিয়ে একের পর এক আঘাত করতে থাকে লোকটার বুকে। লোকটা কোন প্রতিবাদ করার চেষ্টা করছে না। আস্তে আস্তে লোকটা নিথর হয়ে যায়। সেদিন ছিলো আমার প্রথম খারাপ রাত। আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমি সারারাত কাদি। আম্মুর কাছে চলে যাই। তবুও ভয় আমার কাটে না। এই বুঝি রক্ত আমার কাছে আসলো। এই বুঝি লোকটা আমার দিকে তেড়ে আসলো। আমি সেদিন বুঝতে পারি নি সেদিন থেকেই আমার খারাপ সময় শুরু হবে। তার পরদিন রাতে আমি ঠিক একই স্বপ্ন দেখি। আবার সেই ভয়। আবার সেই কান্না। অনেক ডাক্তারের কাছে গিয়েছি।হুজুরের কাছে গিয়েছি। তাবিজ কবজ হয়েছে। কোন ফল হয়নি। আমি এই স্বপ্ন নিয়ে বড় হতে থাকি। একদিন রাতে আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমি পানি খেয়ে আলো জ্বালাই। দেখি সে লোকটা আমার পাশে বসে আছে। গা দিয়ে রক্ত ঝড়ছে।আমার দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিলো। আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। আমি ওখানেই অজ্ঞান হয়ে যাই। এভাবে স্বপ্ন দেখা ওই লোক কে দেখা আমার প্রতিদিনের রুটিন হয়ে যায়। স্বপ্নে বাস্তবে একটি মিল। লোকটি আমার কাছে এগিয়ে আসে। কিন্তু আমাকে স্পর্শ করতে পারেনা। তার আগে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই, ঘুম ভেঙে যায়। কিছু না কিছু একটা হয়। আমি ভয়ে একা একা কাঁদি। কয়েকবার আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছি। পারি নি কোন এক অজানা কারনে। আমি আম্মু কে আব্বুকে ভয়ে কিছু বলতে পারি না। পাছে তারা আমাকে পাগল ভাবে পাগলাগারদ এ পাঠিয়ে দেয় সে ভয়ে। এর কি সমাধান আমি জানিনা। তবে এই রক্ত মাখা লোককে আমি আর দেখতে চাই না। আমি স্বাভাবিক জীবন কাটাতে চাই। ডাক্তার প্লিজ আমাকে সাহায্য করুন। আমি বাঁচতে চাই। নুরুজী লিখাটা পড়া শেষ করে যত্ন করে রেখে দিলেন। আর "ছেলেটা অনেক ধৈর্যশীল " কথাটার নিচে আন্ডার লাইন করে দিলেন। মধ্যরাতে হটাত করেই নুরুজীর ঘুম ভেঙে যায়। তার মোবাইল টা বেজে চলেছে। মোবাইল নামক যন্ত্রটা নুরুজী সাথে রাখা যেদিন থেকে শুরু করেছে সেদিন থেকেই এই যন্ত্রটা পেইন দিয়ে যাচ্ছে। নুরুজী ফোনটা রিসিভ করেন। হ্যালো বলেন। ওপার থেকে ভারী গলায় একটা আওয়াজ আসে "নুরুল ইসলাম জীবন বলছেন?" নুরুজী হ্যা সূচক উত্তর জানায়। গলাটা আরো গম্ভীর করে লোকটা বলেন "আপনি ইমনের কেইস টা ছেড়ে দিন। ওকে আপনার দেখা লাগবে না। যতো টাকা লাগে পাবেন। নুরুজী ধাক্কার মতো খান কিছুটা। তিনি বলেন "আপনি কে বলছেন? " ওপার থেকে উত্তর আসে " আমি যে ই হই আপনি ইমনের ট্রিটমেন্ট করবেন না সোজা কথা। তার জন্য আপনি যথেষ্ট মূল্য পাবেন। নুরুজী সোজা জানিয়ে দেয় "আমার অর্থের দরকার নেই। আমি ইমনের কেইস টা ছাড়ছিনা।" লোকটা এইবার উগ্র ভাবে কথা বলা শুরু করে "তাহলে তো আপনার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। ভালো চান তো ইমন থেকে দুরে থাকুন। নুরুজী হাসেন তিনি বলেন " প্লিজ আমার সাথে বাংলা ছবির ডায়লগ মারবেন না। কি করবেন করেন দেখা যাবে।" লোকটা আরো ক্ষেপে গিয়ে বলেন "ভালো হবে না। পস্তাতে হবে আপনাকে। অনেক পস্তাতে হবে এর জন্য বেশি সাহস ভালো না" লোকটা ফোন কেটে দিয়েছে। নুরুজী হাসছেন। নুরুজী পুরোপুরি সফল। তিনি লোকটাকে ২মিনিট ৩০সেকেন্ড কথা বলাতে সক্ষম হয়েছে। যার ফলে খুব সহজের লোকটার লোকেশন বের করা যাবে। লাভের লাভ আরো একটি হয়েছে। লোকটিকে রাগিয়ে দেয়া গেছে। যার ফলে লোকটার কথার মধ্যে সাময়িক সময়ের জন্য আঞ্চলিক টান চলে এসেছিলো। এখন ইমনের থেকে একটু খোঁজখবর নিলেই লোকটা আসোলে কে বের করা যাবে।রাগ চমৎকার একটা জিনিস। মানুষের ভিতরের সকল লুকায়িত তথ্য প্রকাশ পায় এই রাগের মাধ্যমে। তবে নুরুজী ও জেদ করে কি করে ফেললো সে বুঝতে পারছে না। কাজটা কি ঠিক হলো? তার যদি সত্যি ই কোন বিপদ হয়। যাই হয় হোক ইমন ছেলেটাকে সাহায্য করা দরকার। নুরুজী একটি ফোনকলের মাধ্যমে অনেক কিছুই পেয়ে গেছেন। তিনি আগে ভাবছিলেন ইমনের এই সমস্যা শুধুই স্বপ্নঘটিত। অথবা নরমাল ব্রেইন ডিজঅর্ডার। কিন্তু এখন একটা ব্যপার ক্লিয়ার হয়ে গেছে ব্যাপার টা শুধুই স্বপ্ন ঘটিত নয়। এর পিছনে লুকিয়ে আছে বড় কোন ঘটনা। যা নুরুজী কে খুঁজে বের করতেই হবে। আর এই ঘটনার রহস্য উন্মোচন ই হবে ইমনের একমাত্র ঔষধ। নুরুল এই নুরুল উঠ। অনেক দূর থেকে ডাক টা ভেষে আসছে। নুরুজী চোখ খুলে দেখে তিনি একটি গাছের উপরে বসে আছেন। গাছটা অনেক উঁচু। সেই গাছের নিচ থেকে কেউ তাকে ডাকছে। নুরুজী খুব ভালো করে লক্ষ্য করে দেখেন লোকটা আর কেউ নয় তিনি নিজেই। নুরুজী উপর থেকেই কথা বলার চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু তার মুখ থেকে কোন কথা বের হয় না। নুরুজী লক্ষ্য করছেন নিচে থাকা লোকটার মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। নুরুজী অনেক চেষ্টা করেও কথা বলতে পারছেন না। তিনি ঘামা শুরু করেছেন। নিচে থাকা নুরুজীর মতো লোকটা চিৎকার করব বললেন "নুরুল তুই ভুল করলি। তুই নিজের বিপদ ডেকে আনলি । তোকে আগেই সাবধান করেছিলাম। তুই কথা শুনিস নি। তুই ভুল করলি নুরুল বড্ড বড় ভুল করলি। নুরুজী আবারো কিছু বলতে গিয়ে ব্যর্থ হলেন। তিনি প্রাণপণে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন কিছু বলার জন্য। কিন্তু পারছেন না। তিনি তাকিয়ে তাকিয়ে নিচে থাকা তার মতো লোকটার হাসি দেখছেন। হাসির শব্দ বেড়েই চলেছে। সব কেমন যেনো ঘোরের মতো হয়ে যাচ্ছে। হাসিটা মিলিয়ে যাচ্ছে দূর থেকে দূরে। সামনে সব কিছু ধবধবে সাদা হয়ে যাচ্ছে। নুরুজী চোখ খুলে অনুভব করেন তার সারা ষরীর ঘেমে একাকার হয়ে গেছে। মাথাটা ঝিম মেরে আছে। মাত্র দেখা স্বপ্নটাকে স্বপ্ন মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে বাস্তব। মনে হচ্ছে তিনি এই দুনিয়াতে নেই। সব কিছু কেমন যেনো লাগছে। ঘুম কেটে গেলেও নুরুজীর ঘোর কাটেনি। তিনি বিছানা থেকে উঠে চোখে মুখে পানি দেন। বাহিরে তাকিয়ে দেখেন সকাল হয়ে গেছে। নুরুজী আর না ঘুমানোর পরিকল্পনা করেন। সকাল ৭টা বাজে। পাশের হোটেল থেকে খাবার আসবে নয়টায়। কিন্তু নুরুজীর এখুনি ক্ষুদা লেগেছে। তিনিসেটাকে পাত্তা না দিয়ে ভাবতে থাকেন কি দেখলেন তিনি? পরক্ষনেই নিজের মন কে শান্তনা দেন এগুলো কিছু না। সারাদিন এটা নিয়ে ভাবায় এমন স্বপ্ন দেখেছি। যেটা হওয়া স্বাভাবিক। আর স্বপ্ন কোন দিন সত্যি হতে পারেনা। নুরুজী স্বপ্নের কথা মাথা থেকে তাড়িয়ে দেবার চিন্তা করতে থাকেন। তখনি তার ইমনের স্বপ্নের কথা মনে পরে যায়। ছেলেটা বিপদে আছে। ওকে সাহায্য করা দরকার। তিনি আজ ই ইমনের সাথে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেন। একান্ত কিছু কথা। ইমন ছেলেটা নুরুজীর পাশে বসে আছে। আজ ছেলেটা লাল রঙের একটা শার্ট পড়ে এসেছে। চুল গুলো ও সুন্দর ভাবে ঠিক করে এসেছে। আজ ছেলেটার ভিতরের রুপ ফুটে উঠেছে। একটি ছেলে এতো সুন্দর হয় কি করে তা আসোলেই ভাববার বিষয়। নুরুজী মুখে হাসি টেনে বলেন "কি ইমন কেমন আছো?" ইমন আজ প্রথমবারের মতো আলতো করে একটি হাসি দিয়ে বলে "হ্যা ভালো আছি। আপনি? " "আমি ভালো আছি। আসতে কোন সমস্যা হয় নি তো?" ইমন কে জিজ্ঞেস করলেন নুরুজী। "নাহ। সমস্যা হয় নি। আপনি আমাকে গাড়ি ছাড়া আসতে বলেছেন আপনি কিভাবে জানলেন আমার গাড়ি আছে? আর আমার স্বপ্নের সমাধান কি হয়েছে?" "মনে হয় হয়েছে। আমার কিছু প্রমান দরকার। তাই তোমাকে ডাকা। আমি কিছু প্রশ্ন করবো।যতোটা পারো সত্যি উত্তর দিবে।" আচ্ছা অবশ্যই। বললো ইমন। -আচ্ছা ইমন তোমার আব্বু আম্মু তোমার সাথে কেমন ব্যাবহার করে? -হ্যা ভালো। তারা কোন দিন আমার সাথে খারাপ ব্যাবহার করেন না। -গুড। আচ্ছা তুমি যে লোকটাকে দেখো তার চেহারার হালকা বিবরন কি তুমি আমাকে দিতে পারবে? -হ্যা অবশ্যই। ইমন বর্ণনা দেয় লোকটার। নুরুজী ইমনের কথা গুলো রেকর্ড করে রাখে। ইমন নুরুজী কে জিজ্ঞেস করে এতে কি লাভ হবে? নুরুজী একটা হাসি দিয়ে বলেন "সময় হলে দেখতে পাবে। নাও জুস টা খেয়ে নাও। আর হ্যা আমি তোমার বাসায় একটু যেতে চাই।নেয়ে যাবে কি আমাকে? ইমন অস্থিরতার একটা ভাব দেখিয়ে বললো হ্যা অবশ্যই" নুরুজী ইমনের বাসাটাটা দেখে এসেছে। তিনি ভেবেছিলেন তিনি গেলে ইমনের বাবা মা ব্যাপারটা সহজ ভাবে নিতে পারবে না। অথচ ইমনের বাবা মা নুরুজী কে দেখে প্রচন্ড খুশি হয়েছে। অনেক আপ্যায়ন করেছে। এমনকি তাদের প্রতিটা রুম নুরুজী কে ঘুরিয়ে দেখেছে।যদি ইমনের কোন কাজে আসে। তারাও মনে প্রানে চায় যে ইমন সুস্থ হোক। সব হিসেব প্যাচ লেগে যাচ্ছে। নুরুজী প্রথমে ভেবেছিলো ফোনটা ইমনের বাবা করেছে। কিন্তু তাকে দেখে তেমন মনে হলো না।তাহলে ফোনটা কে করেছে। ভাবতে ভাবতে নুরুজীর মোবাইলে সে নাম্বার থেকে ফোন আসে। নুরুজী ফোনটা রিসিভভ করে না চেনার একটি ভঙ্গী করে জিজ্ঞেস করলেন কে? অপর পাশ থেকে উত্তর আসলো "অনেক বড় ডাক্তার হয়ে গেছেন তাই না। দেখি কিভাবে কি করেন। তবে আপনার পস্তাতে হবে। না করেছিলাম কথা শুনেন নি। আজ ইমনের বাসায় গিয়ে ভুলটা করছেন আপনি। অনেক পস্তাতে হবে। নুরুজী কিছুই বলে না। একটা হাসি না। ওপারে লোকটা ক্ষেপে গিয়ে কিছু খারাপ ভাষায় বকতে থাকে। নুরুজী ফোনটা কেটে দিয়ে মোবাইলটা বন্ধ করে দেয়। এই সব ফালতু ফোন কলের পিছনে বসে থেকে লাভ নেই। তার এখন অনেক কাজ। অনেক গুলো কাজ করতে হবে। আর তিনি বুঝে গেছেন ফোনের অপর পাশের লোকটা আহাম্মক ছাড়া আর কিছুই না। তিনি কিছু করতে পারবে না হুমকি ধামকি ছাড়া।কারন যারা সত্যি কিছু করার ক্ষমতা রাখে তারা ঠান্ডা মাথায় করে। বকা দিয়ে মুখ খারাপ নয়। নুরুজী আজ সকাল সকাল ই ব্যাস্ত হয়ে পরেছেন। থানায় যেতে হবে। সকালে থানা থেকে ফোন এসেছিলো। ফোনে থ্রেড দেয়া আহাম্মক টাকে সহজেই গ্রেফতার করা গেছে। নুরুজী সে লোকটার চেহারা একটু দেখতে চান। কে এই লোক। হয়তো এই লোকের ভিতর থেকেই বেরিয়ে আসবে সকল রহস্যের হিসেব। নুরুজী থানায় এসে যা দেখলেন তা দেখে তিনি মোটামুটি একটা ধাক্কা খেয়ে ফেললেন। তিনি এই দৃশ্য দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। একটি লোক থানার অসির পায়ে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। আর বাচ্চাদের মতো কান্না করছে। আর ২জন হাবিলদার লোকটার পায়ে ধরে টানা হিচড়া করছেন। কিন্তু যতো জোরে টান দিচ্ছেন লোকটা অসির পা ততো জোড়ে চেপে ধরে রাখছে। ভাবটা এমন অসি সাহেবের পায়ের ইঞ্জুরি না ঘটিয়ে তিনি পা ছাড়বেন না। অসির নাম খুব সম্ভবত মিঃ হারুন। হারুন সাহেব চিৎকার করে বলছেন "পা ছাড় ব্যাটা। আমাদের হাতে কিছু নেই। নুরুল সাহেব আসলে সব হবে। এ কথা বলায় লোকটার কান্নার বেগ বেড়ে যায়। এতোটাই বেড়ে যায় যে নাক দিয়ে সর্দি বেরুতে থাকে। কিন্তু সেদিকে লোকটার খেয়াল ই নেই। হারুন সাহেব এই দৃশ্য দেখা মাত্রই বলা শুরু করেন "ছি ছি ইয়াক। এই ব্যাটা পা ছাড়লি নাকি সেলের ভিতরে নিয়ে পেঁদানি দিবো? নুরুজী হালকা একটি কাশি দিয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিলেন। হারুন সাহেব নুরুজীর দিকে তাকিয়ে বললেন ওইতো নুরুজী এসেছেন। এটা বলার সাথে সাথে যা ঘটলো তার জন্য নুরুজী মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। লোকটা হারুন সাহেবের পা ছেড়ে,হাত দিয়ে নিজের নাক পরিষ্কার করতে করতে দৌড়ে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন নুরুজীর পায়ে। বলা শুরু করলেন "স্যার আমারে ছাইড়া দেন। আমি কিছু জানিনা। আমারে বড়সাব আপনারে ফোন দিতে কইছে আমি ফোন দিছি। স্যার আমারে ছাইড়া দেন। আমি গরীব মানুষ।" লোকটা বাচ্চাদের মতো কাঁদছে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে লোকটা আসোলেই সরল। একটু বেশি ই সরল। নুরুজী বললেন "আগে পা ছাড়ো। তোমাকে ছেড়ে দেয়া হবে। কিন্তু তোমাকে সত্যি সত্যি সব বলতে হবে। লোকটার কান্নার বেগ এইবার একটু কমে। তিনি মনে হয় নুরুজীর কথায় আস্বস্থ্য হয়েছেন। তিনি নুরুজীর পা টা ছেড়ে দিয়ে উঠে দাড়ান। বাচ্চাদের মতো হাত দিয়ে চোখের পানি নাকের পানি মুছতে মুছতে পুরো মুখ মাখামাখি করে ফেলেন। একদিম বিচ্ছিরি অবস্থা হয়ে যায়। নুরুজী তার পকেট থেকে একটি টিশ্যু বের করে লোকটাকে দেন ঠিক মতো পরিষ্কার করার জন্য। নুরুজী বসে আছে সামনে বসে আছে খলিল। একটু আগে জানা গেছে লোকটার নাম খলিল। লোকটা ইমন দের বাসার দারোয়ান। ইমনের বাবা ৫০০টাকার বিনময়ে খলিল কে দিয়ে ফোন করিয়েছেন। খলিল গরীব মানুষ। অতশত বুঝে না। ভেবেছে শুধুমাত্র ফোন করে যদি ৫০০টাকা পাওয়া যায় তাহলে আর ক্ষতি কি। প্রতিদিন তো আর এমন সুযোগ আসেনা। কিন্তু এই সামান্য ফোনকল যে তাকে থানা পর্যন্ত নিয়ে আসবে সেটা খলিল স্বপ্নেও ভাবেনি । নুরুজী খলিল কে ছেড়ে দিতে বলেছেন তবে সেটা ২দিন পর। এখন ছেড়ে দিলে খলিলের বিপদ হতে পারে। এটা শুনে বেচারা খলিল আবার কান্না শুরু করেছে। একটাই কথা "আমার দুইটা ছুডু মাইয়া আছে। আমি না গেলে ওরা একলা একলা ডরাইবো। খাইতে পারবো না।ঘরে বাজার নাই" নুরুজী খলিল কে অভয় দিয়ে বলেন তুমি চিন্তা করো না খলিল আমি তোমার মেয়েদের দেখে রাখবো। ইন্সপেক্টর হারুন নুরুজী কে জিজ্ঞেস করলেন "ইমনের বাবা কেন ওর ট্রিটমেন্ট বন্ধ করতে চায়? বাবা হয়ে ছেলের ক্ষতি চায় কেন? নুরুজীর মুখে হাসি ফুটে উঠেছে।তিনি বললেন "কাল রাত পর্যন্ত আমার মনেও এই প্রশ্ন টা ছিলো।কিন্তু সব কিছু হাতে পেয়ে এখন সব কিছু পানির মতোই পরিষ্কার। আমি থানায় আসার আগেই জানতাম ইমনের বাবার লোক ধরা পরবে। কিন্তু সেটা কে তাই দেখার জন্য আসা আরকি।" হারুন সাহেব বললেন "তার মানে আপনি আগে থেকেই সব জানতেন? " "না সব জানতাম না। শুধু ধারনা ছিলো। আর কাল সব প্রমান হাতে পেয়েছি। "কই আমি কি দেখতে পারি" "নাহ। আগে ইমন কে দেখাবো। ইমনের বাবা মা কে দেখাবো। চাইলে আপনি আসতে পারেন আমার সাথে" ইন্সপেক্টর হারুন লোভনীয় ভাবে বলেন "এমন একটি রহস্য উন্মোচনের সাক্ষী হয়ে থাকতে পারলে মন্দ হবে না" নুরুজী একটি হাসি দিয়ে বলেন "আপনি সাথে কিছু ফোর্স নিয়ে নিন তাহলে। ওখানে অনেক কিছুই হতে পারে।" ৫ নুরুজী তার বাসায় বসে আছেন। বরাবর বসেছে ইমন ও ইমনের বাবা মা। ইমনের বাবা মায়ের মুখে কৃত্তিম হাসি স্পষ্ট। নুরুজী তাদের তোয়াক্কা না করে ইমনকে জিজ্ঞেস করলেন "ইমন তুমি কি প্রস্তুত? তোমার সব কিছুর সমাধান আমার হাতে চলে এসেছে। ইমন উত্তেজিত ভাবে বললো "হ্যা আমি প্রস্তুত। আপনি বলেন তারাতারি বলেন।" নুরুজী সামনে রাখা প্যাকেট থেকে একটি ছবি বের করলেন। ছবিটা ইমনকে দেখিয়ে বললেন "ইমন এটা কে চিনো? " ইমন না সূচক উত্তর জানিয়ে দিলো। নুরুজী হাসলেন। ইমনের মায়ের দিকে তাকালেন। তার চোখে অবিশ্বাসের দৃষ্টি। নুরুজী সেদিকে খেয়াল না করে বললেন আমি জানতাম তুমি চিনবে না। নুরুজী প্যাকেট থেকে আরো একটি ছবি বের করলেন। রক্ত মাখা চেহারার একটি ছবি।ইমন কে দেখিয়ে বললেন এটা কে চিনো? ইমন চমকিয়ে উঠে। ওর হাত পা কাপা শুরু করেছে। ইমন তোতলাতে থাকে। নুরুজী ইমন কে অভয় দিয়ে বলেন ইমন ভয় পেয়ো না। চিনো কিনা বলো। ইমন বললো হ্যা চিনি। এই লোকটাকেই আমি স্বপ্নে দেখি। ইমনের মা খেঁকিয়ে উঠলো। বন্ধ করেন এই সব। কি আলতু ফালতু কাজ এগুলো। আপনি ডাক্তার ঔষধ দিন।এইসব ছবি দেখানোর মানে কি। নুরুজী সেদিকে লক্ষ্য না করে ইমন কে বললেন "গুড। ওই রক্ত মাখা লোকটাই এই ছবির লোক। ইমন লোকটার ছবি ভালো ভাবে দেখছে। লোকটা অসম্ভব সুন্দর। ইমনের চেয়েও অনেক বেশি। ইমন ছবি থেকে মুখ সড়িয়ে নুরুজী কে লক্ষ্য করে বললো, আপনি এই ছবি গুলো কোথায় পেয়েছেন?


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১২১১ জন


এ জাতীয় গল্প

→ রোমাঞ্চকর গল্পঃ স্বপ্ন ( সাইকো থ্রিলার)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now

২৮.আমেরিকারর এক অন্ধকারে (২)

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান আরাফাত হোসেন (০ পয়েন্ট)

X রাগবি মাঠের গ্যালারী। রাগবি খেলা এই মাত্র শেষ হলো। জয় পরাজয়ের প্রতিক্রিয়া তখন গ্যালারীতে। খেলা হচ্ছিল লস আলামোস ব্লু ও লস আলামোস স্টারের মধ্যে। ‘ফ্রান্সিসকো ভাস্কোডি করোনাডো’র স্মৃতি টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা ছিল আজ। ফ্রান্সিসকো প্রথম ইউরোপীয় যিনি নিউ মেক্সিকোতে পা রাখেন ১৫৪০ খৃষ্টাব্দে। তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত টুর্নামেন্টটি নিউ মেক্সিকোর সর্ববৃহৎ রাগবি টুর্নামেন্ট। দেশের শীর্ষ ৩২টি দলের খেলা ১৬টি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়। ফাইনাল খেলাটি বিভিন্ন বছর বিভিন্ন শহরে হয়ে থাকে। এ বছর হলো ‘সান জেরিনিমো’ স্টেডিয়ামে। খেলা শেষের শেষ বাঁশিটি বাজার সাথে সাথে স্ট্যানলি নামের এক শ্বেতাংগ ছেলে লাফিয়ে উঠে চিৎকার করে বলল ‘শয়তান জেরিনিমোকে যেভাবে পাছায় শুল ঢোকানো হয়েছিল, সেভাবে আজ জেরিনিমো স্টেডিয়ামেই লস আলামোস স্টারকেও সিকি ডজন গোল ঢুকানো হলো। হুর-রে’। ‘লস আলামোস স্টার রেড ইন্ডিয়ান অধ্যুষিত একটা দল। লস আলামোসের উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ অঞ্চলে তাদের রিজার্ভ এলাকায় বাস করে আপাকি, জনি ও পাবলো ইন্ডিয়ানরা। লস আলামোস স্টারকে এদেরই দল ধরা হয়। আর লস আলামোস ব্লুকে মনে করা হয় শ্বেতাংগদের দল। স্ট্যানলির কথা শেষ হতেই জন নামের একজন আপাকি ইন্ডিয়ান ছাত্র ঝাঁপিয়ে পড়ল স্ট্যানলির উপর এবং বলতে লাগল, ‘জেরিনিমো তোমার বাবা, জেরিনিমোর দেশ এটা। জেরিনিমোকে শয়তান বললি কেন? ফ্রান্সিসকোই তো শয়তান সন্ত্রাসী, অনুপ্রবেশকারী’। জেরিনিমো ছিল আপাকি ইন্ডিয়ান এবং নিউ মেক্সিকোর সব ইন্ডিয়ানদেরই তিনি জাতীয় বীর। ইউরোপীয় শ্বেতাংগরা তাকে নিউ মেক্সিকোর ‘টেরর’ হিসেবে অভিহিত করত এবং বেশ কিছু লড়াইয়ের পর তাকে গ্রেপ্তার করে ১৮৮০ সালে। স্ট্যানলি ও বিলির মধ্যে ভীষন মারামারি শুরু হয়ে গেল। দেখতে দেখতে দুই পক্ষেরই আরও কয়েকজন করে মারামারিতে যোগ দিল। যারা মারামারিতে যোগ দিতে চায় না, তারা দ্রুত সরে গেল মারামারির জায়গা থেকে। শেষ পর্যন্ত মারামারিটা শ্বেতাংগ ও ইন্ডিয়ানদের মধ্যে জাতিগত মারামারিতে পরিণত হলো। মারামারির মধ্যেই তখনও গ্যালারিতে বসে ছিল সান ঘানেম নাবালুসি। সে মারামারিতে যোগ দেয়নি, আবার উঠে পালায়নি। সান ঘানেম ইন্ডিয়ান নয়, কিন্তু আবার পুরোপুরি শ্বেতাংগও নয়। গায়ের রং সাদাও নয়, সোনালীও নয়। তার নীল চোখটা শ্বেতাংগদের থেকে একেবারে ভিন্ন। কিন্তু চুল আবার সোনালী। মারামারির মধ্যে দিয়েই ছুটে এল সান্তা আনা পাবলো সান ঘানেমের কাছে। সে সান ঘানেমের হাত ধরে টানতে টানতে বলল, ‘এভাবে বসে কেন? এস পালাই’। সান্তা আনা পাবলো ইন্ডিয়ান মেয়ে এবং পাবলো ইন্ডিয়ান গোষ্ঠীর। কিন্তু তার মুখ হ্যাটে অনেকটা ঢাকা থাকায় ইন্ডিয়ান বলে চেনা যাচ্ছে না। বোঝা যাচ্ছে হ্যাটে মুখ ঢেকে সান ঘানেমকে নিয়ে যাবার জন্যে সে এসেছে। সান ঘানেম উঠে দাঁড়িয়েছিল। এমন সময় তার সামনেই সে দেখল একজন শ্বেতাংগ তরুণ আরেকজন রেড ইন্ডিয়ানের বুকের উপর ছুরি বসাচ্ছে। সান ঘানেম সান্তা আনা পাবলোর হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো শ্বেতাংগ তরুনটির উপর এবং ছুরি সমেত তার হাত ধরে ফেলল। তারপর ছুরি কেড়ে নিয়ে জোরে ছুঁড়ে মারল দূরে। শ্বেতাংগ তরুনকে জাপটে ধরে রেখে কোন দিকে না তাকিয়েই ছুরিটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল সান ঘানেম। কিন্তু ছুরিটা ছুটে গিয়ে একটু দূরে ফাঁকা জায়াগায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন রেড ইন্ডিয়ান তরুনের বুকে আমূল বিদ্ধ হলো। তরুনটি সংগে সংগে চিৎকার করে ঢলে পড়ল গ্যালারির উপর। সান্তা আনা পাবলো সেদিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল, ভাইয়া!’ চিৎকার করেই সে ছুটল রেড ইন্ডিয়ান তরুনটির দিকে। সান্তা আনা পাবলোর চিৎকারে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল সান ঘানেম। ছুরিবিদ্ধ রেড ইন্ডিয়ান তরুনটির উপর চোখ পড়তেই ‘একি করলাম’ বলে আর্তনাদ করে উঠল সান ঘানেম। শ্বেতাংগ তরুনকে ছেড়ে দিয়ে সেও ছুটল সান্তা আনা পাবলোর মত। এ সময় চারদিক থেকে পুলিশের বাঁশি বেজে উঠল। পুলিশ ছুটে এল মারামারির জায়গায়। সান্তা আনা পাবলো ছুরিবিদ্ধ রেড ইন্ডিয়ান তরুনের কাছে পৌঁছে দু’হাত দিয়ে তার বুক থেকে ছুরিটা বের করে ‘ভাইয়া’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়ল রেড ইন্ডিয়ান তরুনটির উপর। রেড ইন্ডিয়ান তরুনটির নাম জিমি পাবলো। সান্তা আনা পাবলোর বড় ভাই। সান ঘানেমও এসে পৌঁছল জিমি পাবলোর পাশে। তারপর বসে তার মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে সান ঘানেম আবার আর্তনাদ করে বলল, ‘একি করলাম জিমি’। ছুরিটা ঠিক হৃদপিন্ডে বিদ্ধ হয়েছিল। মুহূর্ত কয়েকের মধ্যেই মারা গেল জিমি পাবলো। কয়েকজন পুলিশ এসে দাঁড়াল সেখানে। তাদের সাথে কিছু রেড ইন্ডিয়ান যুবক। রেড ইন্ডিয়ান যুবকরা সবাই এক বাক্যে বলে উঠল সান ঘানেম খুন করেছে জিমি পাবলোকে। সব পুলিশের প্রশ্নবোধক চোখ গিয়ে পড়ল সান ঘানেমের উপর। সান ঘানেমের বেদনা পীড়িত মুখ অসম্ভব রকম গম্ভীর হয়ে উঠেছে। সে জিমি পাবলোর পাশ থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। পুলিশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ আমিই খুন করেছি জিমি পাবলোকে’। সান্তা আনা পাবলো তখনও কাঁদছিল জিমি পাবলোর বুকের উপর পড়ে। সান ঘানেমের কথা কানে যেতেই চমকে উঠে মুখ তুলল সান্তা আনা। ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসল। হঠাৎ তার ঠোঁট দু’টি প্রবলভাবে কেঁপে উঠল। চোখ ফেটে নামল অশ্রু প্রবাহ। যখন পুলিশ সান ঘানেমের হাতে হাতকড়া পরাচ্ছিল, তখন সান্তা আনা কিছু বলার চেষ্টা করল, কিন্তু কাঁপা ঠোঁট দু’টি ডিঙ্গিয়ে কোন শব্দ বেরুতে পারল না। জিমি পাবলো ও সান ঘানেম দু’জনে সহপাঠি, তারা দু’জনেই রাজধানী সান্তাফে’র সান্তাফে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। জিমি পাবলোর ছোট বোন সান্তা আনাও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। জিমি পাবলো ও সান ঘানেম শুধু সহপাঠি নয়, দু’জন দু’জনের ঘনিষ্টতম বন্ধুও। পুলিশ অফিসার দু’জন পুলিশকে নির্দেশ দিল সান ঘানেমকে গাড়িতে তুলবার জন্য। দু’জন পুলিশ দু’দিক থেকে এসে সান ঘানেমের দু’বাহু চেপে ধরল নিয়ে যাবার জন্যে। পা বাড়াবার আগে সান ঘানেম অশ্রুতে ভেসে যাওয়া সান্তা আনার দিকে চোখ তুলে বলল, ‘জিমিকে আমি হত্যা করেছি, সান্তা আনা তুমি আমাকে ক্ষমা করো না’। শেষের কথাগুলো সান ঘানেমের আবেগে অবরুদ্ধ গলা থেকে ভেঙে ভেঙে বেরুল। বোবা দৃষ্টিতে চেয়েছিল সান্তা আনা সান ঘানেমেরে দিকে। সান ঘানেমের কথায় তার গোটা শরীর যেন থরথর করে কেঁপে উঠল। কি কথা যেন ঠোঁট ফুঁড়ে বেরুতে চাচ্ছে, পারছে না। পুলিশ সান ঘানেমকে নিয়ে চলতে শুরু করলে সঙগা হারিয়ে সান্তা আনার দেহ গড়িয়ে পড়ল স্টেডিয়ামের সিঁড়িতে। নিউ মেক্সিকোর রাজধানী সান্তাফে’র উপকন্ঠে এক্সপ্রেস ওয়ের কাছাকাছি বাগান ঘেরা বিশাল এক বাড়ি। বাড়িতে মৃত্যুর নিরবতা। বাড়িতে একজন শুভ্রকেশ বৃদ্ধা, একজন মাঝবয়সী মহিলা এবং একজন তরুনী। কান্নায় মূহ্যমান সবাই। চোখে মুখে তাদের আতংক ও উদ্বেগ। একটা গাড়ি বাড়ির খোলা গেট দিয়ে প্রবেশ করে গাড়ি বারান্দায় এসে থামল। গাড়ি থেকে একজন লোক ও একজন মহিলা নামল। বাড়ির বাইরের দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছিল সেই মাঝ বয়সী মহিলাটি। চোখ তার অশ্রুতে ভাসছিল। সে তাকিয়েছিল বাইরে। অপেক্ষা করছিল কারও। গাড়িটি এসে থামতেই মহিলাটির চোখে মুখে আশার স্ফুরণ জাগল। সোজা হয়ে দাঁড়াল সেই মাঝবয়সী মহিলাটি। গায়ের চাদরটা মাথার উপর তুলে দিয়ে বারান্দা ধরে কয়েক ধাপ এগিয়ে এল গাড়ি বারান্দার দিকে। গাড়ি থেকে নেমেই মহিলাটি ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল মাঝবয়সী মহিলাকে। বলল, ‘আপা ভেব না, সব ঠিক হয়ে যাবে’। লোকটিও এসে দাঁড়াল তাদের পাশে। সালাম দিল কান্নারত মহিলাকে। বলল, ‘চিন্তা করো না ভাবি, সান ঘানেম কোন অনুচিত কাজে জড়াতে পারে না, খুনতো নয়ই। কোন ব্যাপার আছে। ঠিক হয়ে যাবে সব’। মহিলা চোখ মুছে বলল, ‘এস তোমরা’। বলে অন্য মহিলাটির হাত ধরে ড্রইং রুমের দিকে হাটতে শুরু করল। ড্রইং রুমে বসে ছিল বৃদ্ধা ও তরুনীটি, ওরা সবাই ড্রইং রুমে প্রবেশ করল। লোকটি সালাম দিয়ে সোজা গিয়ে বসল বৃদ্ধার পাশে। বলল, ‘আম্মা তোমরা দেখছি খুবই ভেঙে পড়েছ। আল্লাহ আছেন’। বৃদ্ধাটি তাকাল তার দিকে। বলল, ‘অবশ্যই আল্লাহ আমাদের সহায় বেটা। কিন্তু আমরা মাত্র তিনজন বাসায়। সান ঘানেম কি অবস্থায় আছে, কে খোঁজ নেবে? ‘ভেব না, ওদিকটা আমি দেখছি। ভাইয়া কবে গেছেন?’ বলল যুবক ছেলেটি। ‘ভাইয়া’ মানে ছেলেটির বড় ভাই। এই বাড়ির মালিক। নাম কারসেন ঘানেম নাবালুসি। থাকে সান্তাফের উত্তরে সান্তা ক্লারা শহরে। কারসেন ও সারাসিন সহোদর ভাই। বৃদ্ধা তাদের মা। মাঝবয়সী মহিলাটি মরিয়ম মইনি, কারসেন ঘানেমের স্ত্রী। আর তরুণীটি কারসেন ঘানেমের মেয়ে ফাতিমা ঘানেম। ‘কারসেন কাল গেছে ওয়াশিংটন’। বলল বৃদ্ধা। কারসেন ঘানেম নাবালুসি ‘মুসলিম এসোসিয়েশন অব নিউ মেক্সিকো’র (MANEM) ডাইরেক্টর। ওয়াশিংটনের গ্রীন ভ্যলিতে আমেরিকান মুসলিম এসোসিয়েশনগুলোর সাত দিনব্যাপী যে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, কারসেন সেখানেই গেছে গতকাল। ‘আপনারা কিভাবে খবর পেলেন ভাবী?’ মরিয়ম মইনিকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করল সারাসিন ঘানেম। ‘আপনারা কিভাবে খবর পেলেন ভাবি?’ মরিয়ম মইনিকে লক্ষ্য কর জিজ্ঞেস করল সারাসিন ঘানেম। ‘আমাদের পাড়ার একটা মেয়ে সেখানে ছিল। সেই খবর দিয়েছে’। বলল মরিয়ম মইনি। ‘প্রকৃতই কি ঘটেছিল, বলেছে কিছু?’ ‘মারামারির মধ্যে সে এটা খেয়াল করেনি। জিমি পাবলো ছুরিবিদ্ধ হয়ে আর্তনাদ করে উঠলে ওদিকে সকলের চোখ যায়। রেড ইন্ডিয়ানরা সবাই দোষ দিচ্ছে সান ঘানেম খুন….’। কথা শেষ করতে পারলো না মরিয়ম মইনি কেঁদে উঠল। রুমাল দিয়ে চোখ মুছে মায়ের বদলে কথা বলে উঠল ফাতিমা ঘানেম। বলল, ‘রেড ইন্ডিয়ানরা সবাই এক কথাই বলছে। শ্বেতাংগরা কিছুই বলতে পারছে না। তারা নাকি খেয়াল করেনি। আমাদের পাড়ার মেয়েটা বলল, জিমি পাবলোর বোন নাকি ভাইয়ার পাশেই ছিল, সেই নাকি সব জানে। কিন্তু কোন কথা বলেনি সে’। ‘তার কাছ থেকে জানার কিছু উপায় আছে? সেই তো আসল সাক্ষী’। বলল সারাসিন ঘানেম। ‘আমাদের কারও ওদের বাড়িতে যাওয়া মুস্কিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে জানা যাবে। তবে…..’। কি কথা বলতে গিয়ে থেমে গেল ফাতিমা ঘানেম। ‘কি বলছিলে বল’ বলল সারাসিন ঘানেম। চোখ মুখ লাল হয়ে উঠেছে ফাতিমা ঘানেমের। একটু দ্বিধা করে সে মুখ একটু নিচু করে বলল, ‘সান্তা আনা ভালবাসে ভাইয়াকে’। ‘কে সান্তা আনা? জিমি পাবলোর বোন?’ ‘জি আংকেল। ‘তাহলে তো তার কাছ থেকে সাহায্য পাওয়া যাবে!’ বলল সারাসিন ঘানেম। তার চোখে আশার আলো। ‘পাওয়া যাবে। আমার বিশ্বাস, ভাইয়া জিমি পাবলোকে খুন করতে পারে না। ভাইয়া এবং সে দুজন খুবই অন্তরংগ বন্ধু’। ‘কেন, বোনকে নিয়ে সান ঘানেমের সাথে তার যদি কিছু ঘটে থাকে?’ ‘এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনা নেই আংকল। জিমি পাবলো সব জানতো এবং তার সম্মতি ছিল’। ‘তাহলে?’ ‘আমি জানি না, কোন ষড়যন্ত্রও হতে পারে’। ‘কি ষড়যন্ত্র?সান ঘানেম ও সান্তা আনার মধ্যে বৈরিতা সৃষ্টি?’ ‘হতে পারে’। ‘কিন্তু প্রমাণ করা যাবে কিভাবে?’ একটু ভাবল সারাসিন ঘানেম। তারপর বলল, ‘ভা্ইয়াকে কি খবর দেয়া হয়েছে?’ ‘না খবর দেয়া হয়নি’। বলল মরিয়ম মইনি। ‘খবর তাঁকে জানানো দরকার নয়?’ ‘হ্যাঁ’। ‘যদিও অতি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং এ উনি, তবু তাঁকে জানানো দরকার আমিও মনে করি’। সারাসিন ঘানেম বলল। ‘সারাসিন তুমিই তাহলে টেলিফোন কর’। ‘ঠিক আছে’। বলে মোবাইল তুলে নিয়ে ডায়াল করল সারাসিন ঘানেম। ওপারে রিং হচ্ছে। কিন্তু কোন উত্তর নেই। কেউ ধরছে না টেলিফোন। ‘হয়তো টয়লেট কিংবা আশে পাশে কোথাও গেছে’। ভাবল সারাসিন ঘানেম। মিনিট দশেক পর আবার টেলিফোন করল। কিন্তু ঐ একই অবস্থা। ওপার থেকে কোন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। ভ্রু কুঁচকে তাকাল সারাসিন ঘানেম ভাবি মরিয়ম মইনির দিকে। বলল, ‘ভাইয়া টেলিফোন অফ না করে টেলিফোন তো এইভাবে কোথাও ফেলে রাখেন না’। ‘না, সব কিছুরই তো ব্যতিক্রম আছে। তুমি কনফারেন্স অফিসে টেলিফোন কর’। মরিয়ম মইনি টেলিফোন নাম্বার তার আংকলকে দেয়ার জন্যে বলল ফাতিমা ঘানেমকে। সারাসিন ঘানেম গ্রীন ভ্যালির কনফারেন্স অফিসে টেলিফোন করে চাইল কারসেন ঘানেম নাবালুসিকে। একটু দেরী হলো। সম্ভবত কারসেনকে ডাকতে গেছে। ‘মিঃ কারসেন এসে ধরেছে টেলিফোন’। ওপার থেকে জানাল। কারসেনের সাথে সম্ভাষণ বিনিময়ের পর সব কথা জানালো সারাসিন ঘানেম। কিন্তু কথা বলতে বলতে মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠল সারাসিনের। টেলিফোন রাখার পরেও চিন্তিত দেখাল সারাসিন ঘানেমকে। ‘কি হলো সারাসিন, তোমাকে চিন্তিত দেখাচ্ছে? কিছু বলেছে কারসেন?’ জিজ্ঞেস করল মরিয়ম মইনি। ‘ভাইয়া হু, হ্যাঁ ছাড়া কোন কথা বলেনি। এত বড় ঘটনা শোনার পর তাঁর যে প্রতিক্রিয়া হওয়ার দরকার তা তার মধ্যে দেখলাম না’। বলল সারাসিন ঘানেম। ‘হয়তো খুব ব্যস্ততার মধ্যে আছে’। চিন্তিত কন্ঠে বলল মরিয়ম। ‘কিন্তু কন্ঠ? কন্ঠও তো ভাইয়ার মত মনে হলো না’। সারাসিনের চোখে মুখে বিষ্ময়। ‘এটা তুমি কি বলছ? সর্দি লাগলে গলা ভাংলে স্বরটা একটু ভিন্ন রকমের হয়, সে রকম একটা কিছু হবে’। মরিয়ম বলল। ‘শুধু কন্ঠ নয় ভাবি, ভাইয়া আমার সাথে যেভাবে কথা বলেছে, তাতে মনে হয়েছে যেন তিনি রাতারাতি সব ভূলে গিয়ে নতুন মানুষ হয়েছেন। সম্পূর্ণ অপরিচিতের মত কথা বলেছেন’। সারাসিন ঘানেম থামতেই মরিয়ম বলে উঠল, ‘একই নামের ভিন্ন কারও সাথে কথা বলনি তো তাহলে? কারসেন নাম তো অনেকেরই থাকতে পারে’। ‘সেটা কি করে সম্ভব? আমি চেয়েছি নিউ মেক্সিকোর প্রতিনিধি কারসেন ঘানেম নাবালুসিকে। তাছাড়া ভিন্ন লোক হলে কথার শুরুতেই তো তার কাছেও ধরা পড়ে যেত। কিন্তু উনি তো আমার সাথে কারসেন ঘানেম নাবালুসি হিসেবেই কথা বলেছেন’। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারল না মরিয়ম মইনি। ভাবছিল সে। কথা বলে উঠল ফাতিমা ঘানেম, ‘আংকল আবার টেলিফোন করে কনফারেন্স অফিস থেকে বিষয়টা কনফার্ম করে নিলে হয় না?’ ‘ঠিক বলেছ ফাতিমা, সেটাই করা যাক’। বলে সারাসিন ঘানেম আবার টেলিফোন তুলে নিল হাতে। আবার টেলিফোন করল ওয়াশিংটনের গ্রীন ভ্যালিতে অনুষ্ঠানরত ‘আমেরিকান কাউন্সিল অব মুসলিম এসোসিয়েশন’(ACOMA) এর কনফারেন্স অফিসে। ওখানে টেলিফোন ধরল রিসিপশনিস্ট। সারাসিন ঘানেম বলল, ‘কিছুক্ষণ আগে আমি টেলিফোন করেছিলাম। আমি কনফারেন্স এর কোন কর্তাব্যক্তির সাথে কথা বলতে চাই’। রিসিপশনিস্ট জানাল, ‘তাঁরা সবাই ভীষণ ব্যস্ত। ঘন্টা দুই পরে টেলিফোন করলে সবাইকে পেয়ে যাবেন। আর আপনার প্রয়োজন কি সেটা জানালে আমিও তাদের জানাতে পারি’। ‘ধন্যবাদ। নিউ মেক্সিকোর প্রতিনিধি কারসেন ঘানেম নাবালুসি আমার ভাই। তাঁর সাথেই আমার কথা ছিল’। ‘সুবহানাল্লাহ, তাঁর ব্যাপার নিয়েই তো ওরা ব্যস্ত। তাঁকে নিয়ে রুদ্ধদ্বার কক্ষে কি আলোচনা হচ্ছে’। ‘কেন? কি আলোচনা?’ ‘আমি বলতে পারবোনা’। ‘যিনি বলতে পারবেন তাকে দিন। আমি কারসেনের ভাই। আমার জরুরী প্রয়োজন’। শান্ত, কিন্তু শক্ত কন্ঠে বলল সারাসিন ঘানেম। একটু ধরুন স্যার, চেষ্টা করে দেখি কাউকে পাই কিনা। অল্প কয়েক সেকেন্ড পরেই সে বলল, ‘আমি লাইন দিচ্ছি, কনফারেন্সের ডাইরেক্টরের সাথে কথা বলুন। সালাম দিল সারাসিন ঘানেম। সালাম গ্রহণ করে ওপার থেকে বলল, ‘আপনি কি কারসেন ঘানেমের ভাই?’ ‘জি। আমি তার সম্পর্কে কিছু জানতে চাই। কারসেন ঘানেম, যার সাথে অল্পক্ষণ আগে কথা বললাম, তাঁকে আমার ভাই কারসেন ঘানেম বলে মনে হয়নি’। ‘আপনাকে ধন্যবাদ। আমাদেরও সেই রকম সন্দেহ। আপনার ধারণা আমাদেরকে নিশ্চিত করল’। ‘তাহলে ছদ্মবেশী কেউ কি কারসেনের ভূমিকায় অভিনয় করছে?’ ‘তাইতো এখন মনে হচ্ছে’। ‘তাহলে কারসেন ঘানেম কোথায়?’ ‘সেটা আমাদেরও প্রশ্ন’।‘ আতংকিত হয়ে উঠেছে সারাসিন ঘানেম। উদ্বেগ-উত্তেজনায় কাঁপছে তার দেহ। কম্পিত গলায় সে বলল, ‘এখন কি করণীয়?’ ‘তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে। কি অবস্থা দাঁড়ায় আপনাদের জানাব। কারসেন ঘানেমের প্রতি আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। এখনকার মত রাখি?’ সারাসিন ঘানেম টেলিফোন রাখতেই মরিয়ম মইনি আর্তকন্ঠে বলে উঠল, ‘ওখানে কি ঘটেছে সারাসিন, কারসেনের কি হয়েছে?’ সারাসিন তখন নিজেই বিমূঢ় হয়ে পড়েছে। বজ্রপাতের মতই ভয়াবহ মনে হচ্ছে তার কাছে খবরটা্। কথা বলার শক্তিও যেন তার ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু তাকে এভাবে ভেঙে পড়লে চলবে কেন? কারসেন ঘানেম উপস্থিত নেই, সান ঘানেম নেই। তাকেই তো এখন সব কিছু করতে হবে। একটু নড়ে-চড়ে বসল সারাসিন ঘানেম। বলল, ‘ভাবি, এখন আমাদেরকে আল্লাহর প্রতি খুব বেশী ভরসা করতে হবে। ওখান থেকে স্পষ্ট কিছু জানা গেল না। তবে কারসেন ঘানেমের পরিচয় দেয়া লোকটি কারসেন ঘানেম নয়।….’ সারাসিন ঘানেম এতটুকু বলতেই মরিয়ম কেঁদে উঠল। থেমে গিয়েছিল সারাসিন ঘানেম। তাকাল সে তার ভাবি মরিয়ম মইনির দিকে। বলল, ‘ধৈর্য্য ধরতে হবে ভাবি আমাদের। লোকটিকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তার কাছ থেকেই ভাইয়ার খবর জানা যাবে। কনফারেন্স কর্তৃপক্ষ বলেছেন তারাও ব্যাপারটা সিরিয়াসলি দেখছেন’। ‘চারদিক থেকে আল্লাহ আমাদের একি বিপদ দিলেন! কি হবে এখন!’ আর্তকন্ঠে বলে উঠল বৃদ্ধা, কারসেন ঘানেম এবং সারাসিন ঘানেমের মা। বলেই সে সারাসিন ঘানেমকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘এখন তো ওয়াশিংটন যেতে হবে তোর, কিন্তু সান ঘানেমের ব্যাপারটা দেখবে কে?’ কান্নারুদ্ধ কন্ঠ তার। ‘কনফারেন্স কর্তৃপক্ষ টেলিফোন করে জানাবে। ওদিকের পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে আমাদের’। বলল সারাসিন ঘানেম। মরিয়ম মইনি কিছু বলতে যাচ্ছিল, ‘টেলিফোন বেজে উঠল এ সময়। টেলিফোন ধরল সারাসিন ঘানেম। টেলিফোন ধরেই মরিয়ম মইনির দিকে চেয়ে বলল, ‘ভাবি আপনার টেলিফোন। সান্তা আনা নামে একটি মেয়ে করেছে’। ‘সান্তা আনা’ বলে ছু্টে এসে টেলিফোন হাতে নিল মরিয়ম মইনি। টেলিফোন নিয়ে নিজের সিটে ফিরে যেতে ভূলে গেল। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা বলতে শুরু করল। মরিয়ম মইনি বলছিল টেলিফোনে, ‘কেঁদো না মা বল কি ঘটেছিল। আমার সান ঘানেম তো খুন করতে…….’। কথা শেষ করতে পারলো না মরিয়ম মইনি। কান্নায় রুদ্ধ হয়ে গেল তার কন্ঠ। ‘না, আন্টি, সান খুন করেনি। ও কাউকে খুন করতে পারে না’। কান্না জড়িত কন্ঠে বলল সান্তা আনা। ‘বল মা কি দেখেছ তুমি। তুমি নাকি ছিলে ঘানেমের কাছে’। ‘আমি মারামারির ভেতর থেকে সানকে আনতে গিয়েছিলাম আন্টি। আমি যখন ওকে টেনে আনছিলাম সে সময় পাশেই একজন শ্বেতাঙ্গ একজন ইন্ডিয়ান ছেলের বুকে ছুরি বসাতে যাচ্ছিল। ইন্ডিয়ানকে বাঁচাবার জন্যে সান ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ছুরিটা কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কিন্তু ছুরি গিয়ে লাগে দূরে দাঁড়ানো ভাইয়ার বুকে। সান……’। কথা শেষ করতে পারলো না সান্তা আনা। কান্নায় জড়িয়ে গেল তার কথা। ‘সান কি তোমার ভাই জিমিকে দেখেছিল?’ জিজ্ঞেস বরল মরিয়ম মইনি। সান্তা আনা বলল, ‘না আন্টি, সান সে সময় শ্বেতাঙ্গ ছেলেটিকে জাপটে ধরেছিল, কোন দিকে তাকিয়ে সে ছুরি ফেলে দেয়নি’। ‘সত্য এই ঘটানাটা আর কেউ দেখেনি মা?’ ‘যে ইন্ডিয়ান ছেলেকে সান বাঁচিয়েছে, সেই জনি লেভেনও এটা দেখেছে। কিন্তু এখন সে উল্টো কথা বলছে’। ‘কি বলছে?’ ‘সান ঘানেম দেখেই ছুরি মেরেছে জিমি পাবলোকে’। ‘তার প্রাণ বাঁচাবার পরেও এই মিথ্যা কথা?’ ‘ইন্ডিয়ানরা এখন এক জোট হয়েছে আন্টি। একজন ইন্ডিয়ান নিহত হয়েছে শ্বেতাঙ্গের হাতে, এই সেন্টিমেন্টটাকেই বড় করে তোলা হচ্ছে। তাছাড়া জনি লেভেন হিংসা করে সান ঘানেমকে’। ‘কেন?’কোন উত্তর দিল না সান্তা আনা। ‘জান না তুমি কেন ঈর্ষা করে? ‘জানি আন্টি’। ‘কি সেটা?’ ‘কারণটা আমি আন্টি। আমি সান ঘানেমকে ভালবাসি, এটা সে দেখতে পারে না’। কান্নাজড়িতে কন্ঠে বলল সান্তা আনা। ‘এখন কি হবে মা? ওদিকে সানের আব্বাও……’। কান্নায় ভেঙে পড়ল মরিয়ম মইনি। ‘আপনি কাঁদবেন না আন্টি। ঈশ্বর আছেন। সানের জন্যে আমি সবকিছু…….’। কথা শেষ করতে পারলো না। টেলিফোন নিচে পড়ে যাওয়ার শব্দ ভেসে এল। তার সাথে শোনা গেল একটা ভারি গলা, ‘বলা হচ্ছে না তুমি সানদের পরিবারের সাথে কোন যোগাযোগ করবে না, তাদের কিছুই জানাতে পারবে না। ওরা আমাদের ইন্ডিয়ানদের শত্রু। তুমি সেই খুনি সানকে বাঁচাবার অঙ্গীকার করছ’। ‘আব্বা, আপনাকে বলেছি সানের কোন দোষ নেই। সে একজন ইন্ডিয়ানকে বাঁচাতে গিয়ে এই ঘটনা ঘটেছে’। কাঁদতে কাঁদতে বলল সান্তা আনা। ‘এই কথা তুমি কয়জন ইন্ডিয়ানকে বলবে? আর তোমার কথা কে বিশ্বাস করবে, তুমি সানের পক্ষে তো বলবেই। আমার ছেলে তার ছুরিতে নিহত হয়েছে, এটাই আজ বড় সত্য। তারা এখন আমাদের শত্রু’। ‘কিন্তু আব্বা, তারা তো শত্রু নয়, সত্যকে তো মিথ্যা দিয়ে …..’। কথা সমাপ্ত হওয়ার আগেই ওপার থেকে সান্তা আনার কান্না ভেজা কন্ঠ বন্ধ হয়ে গেল। নিশ্চয় টেলিফোন তার আব্বা মেঝে থেকে তুলে নিয়ে অফ করে দিয়েছে। টেলিফোনটা সোফায় ছুঁড়ে দিয়ে ধপ্ করে বসে পড়ল মরিয়ম মইনি। তার চোখের কোণে যে আশার আলো জ্বলে উঠেছিল তা দপ করে নিভে গেল। ঘরের সবাই তার দিকে তাকিয়ে। সারাসিন ঘানেম উদগ্রীব কন্ঠে বলল, ‘কি ঘটেছে, কি শুনলেন ভাবি?’ ‘সান্তা আনা ও তার আব্বার মধ্যে তর্ক। তার আব্বা সান্তা আনাকে জিমি পাবলোর খুনি-পরিবারের সাথে কথা বলতে দেবে না। তাই তিনি টেলিফোন সান্তা আনার হাত থেকে ফেলে দিয়েছিলেন’। থেমে একটা দম নিয়ে মরিয়ম মইনি সান্তা আনা ও তার আব্বার মধ্যে তর্কের গোটা বিবরণ দিয়ে বলল, এর পর সান্তা আনা শত ইচ্ছা করলেও আমাদের সান ঘানেমের পক্ষে সাক্ষী দিতে পারছে না। আর জনি লেভেন তো সাক্ষী বিরুদ্ধেই দিবে’। ‘জনি লেভেন কে ভাবি?’ ‘জনি লেভেন একজন ইন্ডিয়ান ছেলে’। এই জনি লেভেনকেই এক শ্বেতাঙ্গ ছেলে ছুরি দিয়ে হত্যা করতে যাচ্ছিল। সান ঘানেম লেভেনকে বাঁচাবার জন্যে শ্বেতাঙ্গ ছেলেটিকে জাপটে ধরে তার হাত থেকে ছুরি ছিনিয়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। এই ছুড়ে দেয়া ছুরিই ঘটনাক্রমে লাগে জিমি পাবলোর বুকে। এই ঘটনা সান্তা আনার মত জনি লেভেনও দেখে’। ‘লেভেনকে বাঁচাতে গিয়েই তো ঘটনা ঘটেছে, তাহলে লেভেন সান ঘানেমের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষী দেবে কেন?’ বলল সারাসিন ঘানেম। উত্তরে মরিয়ম মইনি সান্তা আনা যা বলেছিল সব জানিয়ে বলল, ‘আমার সান ঘানেম নিরপরাধী হলেও গোটা অবস্থা তার বিরুদ্ধে গেছে’। মুখে রুমাল চেপে আবার কাঁদতে লাগল মরিয়ম মইনি। সারাসিন ঘানেম বলল, ‘ভাবি। আল্লাহ একটা উপায় নিশ্চয় বের করে দেবেন। কোনভাবে যদি সান্তা আনাকে দিয়ে কোর্টে ঘটনাটা বলানো যায়, তাহলে লেভেন বিপক্ষে সাক্ষী দিলেও জেরায় সে ধরা পড়ে যাবে’। ‘কিন্তু সান্তা আনাকে হয়তো ওরা সাক্ষীই বানাবে না’। বলল বৃদ্ধা, সারাসিন ঘানেমের মা। ‘না আম্মা, তাকে সাক্ষী বানাতেই হবে, কারণ সেই প্রথম জিমি পাবলোকে ছুরিবিদ্ধ হতে দেখে এবং তার কাছে ছুটে যায়’। বলল সারাসিন ঘানেম। ‘কিভাবে সান্তা আনাকে দিয়ে সত্য কথা বলাবে! শুনলেই তো বৌমার কাছে সান্তা আনার বাপের আচরণের কথা। আর শুধু তো তার বাপ নয়, সব ইন্ডিয়ানরাই একজোট হয়েছে’। ‘বলেছি তো আম্মা। আল্লাহ একটা পথ অবশ্যই বের করে দেবেন’। সারাসিন ঘানেম বলল। ‘আংকেল, সান্তা আনাকে আমি জানি। সে মরে গেলেও ভাইয়ার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবে না। আমার মনে হচ্ছে, তাকে তারা সাক্ষী হিসেবে না নেবার সব রকম ব্যবস্থা করবে। এর প্রতিকার আমরা কিভাবে করব, সেটা আমাদের চিন্তা করা উচিত’। ‘ঠিক বলেছ মা। কিভাবে করা যাবে সেটা একটা বড় বিষয় হওয়া উচিত’। বলল সারাসিন ঘানেম। কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল মরিয়ম মইনি। টেলিফোন বেজে উঠল। থমকে গিয়ে মরিয়ম মইনি টেলিফোন তুলে নিল হাতে। টেলিফোন ধরে সালাম নিয়েই শুনল, ‘সারাসিন ঘানেম কে?’ উত্তরে বলল ‘ধরুন, দিচ্ছি’। বলে মরিয়ম এস্তে উঠে দাঁড়িয়ে টেলিফোন সারাসিনের দিকে এগিয়ে ধরে বলল, ‘নাও তোমার টেলিফোন, বোধ হয় ওয়াশিংটন থেকে’। কন্ঠস্বর কাঁপছে মরিয়ম মইনির। ‘আসসালামু আলাইকুম। সারাসিন ঘানেম বলছি’। টেলিফোন ধরে বলল সারাসিন ঘানেম। ‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম। দুঃখিত মিঃ সারাসিন, আপনার ও আমাদের সন্দেহই সত্য হয়েছে। সে একজন ইহুদী গোয়েন্দা। কারসেন ঘানেমের পরিচয় নিয়ে আমাদের সম্মেলনে যোগদান করেছিল’। ‘কারসেন ঘানেম কোথায়?’ ‘তাঁর সম্পর্কে সে একেকবার একেক কথা বলছে, তবে আমাদের ধারণা তাঁকে কোথাও বন্দী করে রেখে তার পরিচয় নিয়ে সে সম্মেলনে এসেছে’। ‘কিন্তু যদি……..’। বুকটা থরথর করে কেঁপে উঠল সারাসিন ঘানেমের এক অশুভ আশংকায়। কথাটা মুখেও আনতে পারলো না সে। ‘বুঝেছি মিঃ সারাসিন ঘানেম। তার মুখ দেখে আমরা সে রকম কোন আশংকা করছি না’। ‘আমি কি আসব ওয়াশিংটনে?’ ‘আমরা আপনাকে জানাব, যদি দরকার হয়। মিসেস ঘানেমকে আমাদের সালাম দেবেন এবং বলবেন কারসেন ঘানেমের ব্যাপারে যা যা করার সবই আমরা করব’। ‘কিন্তু ইহুদীরা যদি সত্যিই এ যুদ্ধে নেমে থাকে, তাহলে ব্যাপারটাতো সাংঘাতিক। ওরা তো এদেশে অপ্রতিদ্বন্ধী’। সারাসিন ঘানেমের কন্ঠে উদ্বেগের সুর। ‘ওরা অপ্রতিদ্বন্ধী ছিল। সব সময় থাকবে তা নয়। অন্তত এই যুদ্ধে ওরা অপ্রতিদ্বন্ধী নয়। বিশ্ব-ইহুদীরা প্রতিদ্বন্ধীতায় যাঁর কাছে বারবার হেরেছেন, সেই ব্যক্তিত্ব আল্লাহর রহমতে এখানে, আমাদের মাঝে উপস্থিত। তিনিই কারসেন ঘানেমের ব্যাপারটা দেখছেন’। ‘কে তিনি?’ ‘দুঃখিত মিঃ সারাসিন, এটা টেলিফোন। নাম বলা বোধ হয় ঠিক হবে না। ঐটুকু আপনাকে বললাম আপনাদের সান্ত্বনার জন্যে। দোয়া করবেন। রাখি’। বলে সালাম দিয়ে ওপ্রান্ত থেকে টেলিফোন রেখে দিল। টেলিফোন রেখে সারাসিন ঘানেম ওয়াশিংটন থেকে শোনা সব কথাই ধীরে ধীরে জানাল সবাইকে। কারসেন ঘানেমের স্ত্রী মরিয়ম মইনি দু’হাতে মুখ ঢেকে কান্না চাপতে চেষ্টা করল, মেয়ে ফাতিমা ঘানেম ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। রুমালে চোখ মুছতে লাগল ঘানেমদের বৃদ্ধা মা ও মিসেস সারাসিন। ঘর জুড়ে নিঃশব্দ এক কান্নার বৃষ্টি। ইহুদী খুনীরা জার্মানির নাজীদের চেয়েও ভয়ঙ্কর বুদ্ধিতে এবং নৃশংসতায়। সকলের বুকই দুরুদুরু করে কাঁপছে। নিরবতার মাঝে সারাসিন ঘানেম ধীর কন্ঠে বলে উঠল, ‘উদ্বেগ আতংকের পাশে আল্লাহর সাহায্যের দিকটাকেই এখন অমাদের বড় করে দেখতে হবে। নাম ওরা বলেনি বটে, একটা বড় আশার কথা তো ওঁরা জানিয়েছে। ঐ পথেই হয়তো আল্লাহর সাহায্য আসবে’। ‘অল পাওয়ারফুল বলে কথিত আমেরিকান ইহুদী চক্রের মোকাবিলায় আমাদের কে আছে? যার কথা তাঁরা বললেন?’ চোখ মুছতে মুছতে বলল ফাতিমা ঘানেম। ‘তোমার মতই আমি এ বিষয়ে অজ্ঞ মা’। বলল সারাসিন ঘানেম। ‘কিন্তু কে সেই আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব, যাঁর কাছে বিশ্ব-ইহুদী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হেরেছে বারবার?’ আবার জিজ্ঞাসা ফাতিমা ঘানেমের। ‘থাকতে পারেন মা, সবার খবর আমরা জানি না’। বলল সারাসিন। ‘আপনি ওয়াশিংটনে গেলে আমরা আরও কিছু জানতে পারতাম’। ফাতিমা বলল। ‘ওঁরা জানাবেন। ওঁদের টেলিফোনের অপেক্ষা করতে হবে মা’। বলে উঠে পড়ল সারাসিন ঘানেম। বলল, ‘আম্মা, ভাবি, আমি পুলিশ অফিস থেকে আসি। একজন এডভোকেটের সাথেও আলোচনা করে আসি’। ‘সান ঘানেমকে বলো, তার কোন চিন্তা নেই। আমরা সব রকম চেষ্টা করব। আল্লাহ আছেন’। বলল সান ঘানেমের দাদী, বৃদ্ধা মহিলাটি। ‘সারাসিন, সানকে তার আব্বা সম্পর্কে কিছু বলো না’। বলল সান ঘানেমের মা মরিয়ম মইনি। ‘আচ্ছা, ঠিক আছে। সালাম’। বলে বেরিয়ে গেল সারাসিন ঘানেম।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮০ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ২৮.আমেরিকারর এক অন্ধকারে (২)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন