বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

রোমাঞ্চকর গল্পঃ স্বপ্ন ( সাইকো থ্রিলার)

"ফ্যান্টাসি" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান MD.Belal Hosan (০ পয়েন্ট)

X গলগল করে মুখ থেকে গড়িয়ে রক্ত পরছে। পেটের একাংশ চিরে ফেলা হয়েছে। সেখান দিয়ে শরীরের ভেতরের কিছু অংশ ঝুলে আছে। টপটপ করে রক্ত ঝরছে সেখান দিয়ে। চেহারাটা অস্পষ্ট। তবুও চেহারায় সূক্ষ্ম একটা হাসি দেখা যাচ্ছে। এই অবস্থায় কেউ হাসতে পারে ব্যাপার টা ভাবলেই গায়ে কাটা দেয়। তবুও লোকটা হাসছেন। যেখানে মৃত্যু অনিবার্য সেখানে জীবনের শেষ হাসাটুকু হেসে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করলেন লোকটা। লোকটার দাত বের হয়ে গেছে। দাতের ফাকা অংশ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। রক্তের রং লাল না কালো বুঝা যাচ্ছে না । তবুও স্পষ্ট এগুলো রক্ত। লোকটা হাসতে হাসতে তার হাত বাড়িয়ে দেয়। হাতেও ছোপ ছোপ রক্ত লেগে আছে। ২ নুরুজী আজ ছয় দিন পর তার চেম্বারে বসেছে। চেম্বারে বসলেও তিনি আজ রোগী দেখছেন না।তার এসিস্ট্যান্ট কে বলে দিয়েছেন বিশেষ কারনে তিনি আজ রোগী দেখবেন না। কেউ আসলে তার সিরিয়াল টা রেখে বাসায় পাঠিয়ে দিতে বলা হয়েছে। কাল যথারীতি সিরিয়াল মেন্টেন করে রোগী দেখা হবে। নুরুজী রোগী দেখছেন না। কিন্তু অবসর সময় যে কাটাচ্ছেন তেমন ও না। তিনি "স্বপ্নের ব্যাখ্যা" নামক একটি বই নিয়ে বসেছেন। তিনি এইসব বইয়ে বিশ্বাস করেন তা নয়। তারপরেও তিনি বই টা দেখছেন। তিনি বই টা যোগাড় করেছেন তার বাসার দারোয়ান খলিলের কাছ থেকে। সেটাই নেড়েচেড়ে দেখছেন তিনি।বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি একটি স্বপ্ন বারবার দেখছেন। স্বপ্নটা অনেকটা এমন "নুরুজী ও আর একটা লোক গাছে উঠছেন। তারা গাছে উঠার প্রতিযোগিতা লেগেছেন লোকটা নুরুজীর আগে গাছে উঠে যাচ্ছেন। নুরুজী কোন ভাবেই লোকটাকে ধরতে পারছেন না। নুরুজী অনেক চেষ্টা করেও লোকটার আগে যেতে পারলেন না। লোকটা নুরুজীর আগে গাছের একদম উপরে উঠে গেছেন। নুরুজী তার পিছনে পিছনে উঠেছেন। লোকটা ঘুরে নুরুজীর দিকে তাকালেন। নুরুজী অবাক হয়ে দেখলেন লোকটা তো তিনি ই। আর তখন নিজেকে লোকটার ছায়া মনে হতে থাকে নুরুজীর। লোকটা নুরুজীর দিকে তাকিয়ে নুরুজী কে একটা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন " নুরুজী আর নিচে পরতে পারে না। তার আগেই তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। নুরুজী বইটা খুঁজতে খুঁজতে "নিজেকে স্বপ্নে দেখা" অধ্যায়ে একটা জায়গায় পেলেন " যদি স্বপ্নে কেউ দেখে যে পাহাড়ের চূড়া অথবা গাছের উপর থেকে অথবা কোন কিছুর উপর থেকে নিজেকে নিজে ফেলে দিচ্ছে তাহলে তার সামনে অনেক বড় বিপদ। এবং সে বিপদের কারন হবে সে নিজেই। যতোই সাবধান থাকে কোন লাভ নেই। বিপদে তাকে পরতেই হবে। বিপদ অনিবার্য। নুরুজী ব্যাখ্যাটা পড়ে হাসতে থাকেন। তিনি এইসব বইয়ে বিশ্বাস করেন না।ফুটপাথের ১০টাকার বইয়ে যদি আসোলেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা পাওয়া যেতো তাহলে হয়তো স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে অনেক গরীব কোটিপতি হয়ে যেতো। কিন্তু অশ্চার্য্য ব্যাপার হলো এই সব বইয়ে গরীব রাই বেশি বিশ্বাস করে। তারা ভাবে যদি এই বইয়ের বাহানায় তাদের ভাগ্য ফিরে যায়। নুরুজী তার স্বপ্নের ব্যাখ্যা এতো তারাতারি পেয়ে যাবে ভাবেন নি। এখন আর তার সময় কাটছে না। তিনি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখেন মাত্র সন্ধ্যা ৭টা বাজে। ৯টা পর্যন্ত তার চেম্বারে থাকার কথা। তিনি তার এসিস্ট্যান্ট কে ডেকে বলে দিলেন কেউ আসলে পাঠিয়ে দিতে।তিনি আজ সিরিয়াল ছাড়াই রোগী দেখবেন। ৩ যে ছেলেটা নুরুজীর সামনে বসে আছে ছেলেটার চুল গুলো এলোমেলো হয়ে আছে। চোখের নিচে কালো দাগের স্তর পরেছে। ছেলেটাকে দেখলে যে কেউ বলে দিতে পারবে ছেলেটা প্রচন্ড রকমের অস্থিরতায় ভুগছে। যার কারনে সে বাড়ি থেকে বের হবার সময় ও চুল গুলো ঠিক করার প্রয়োজন মনে করেনি।ছেলেটা যে রাতে ঘুমাতে পারে না তা তার চোখের নিচের কালো দাগ ই স্পষ্ট বলে দিচ্ছে। নুরুজীর হাতে ছেলেটাকে নিয়ে যেসব তথ্য আছে সে সব তথ্য অনুযায়ী ছেলেটার নাম ইমন হবার কথা। তারপরেও নুরুজী মুখে একটি হাসি টেনে ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলেন তোমার নাম কি? ছেলেটি সহজ ভাবেই উত্তর দিলো "ইমন" নুরুজী পরিবেশ হালকা করার জন্য মুখের হাসিটা ধরে রেখে বললেন তা ইমন কেমন আছো তুমি? -জ্বী ভালো। নুরুজী বললেন "ভালো যে নেই তা বুঝতেই পারছি তোমাকে দেখে।তুমি যে শার্টের একটা বোতাম উল্টো লাগিয়েছো তাও লক্ষ্য করো নি। ইমন অবাক হয়ে নিচে তাকিয়ে দেখে ঠিকি সে একটি বোতাম অন্যটার জায়গায় লাগিয়ে রেখেছে। ইমন হটাত করেই অপ্রস্তুত হয়ে যায়।বোতাম টা ঠিক করার চেষ্টা করতে থাকে। নুরুজী ইমন কে সময় দেয়। তিনি বুঝতে পারছেন ইমন কঠিন সময় পার করছে। ইমনের বোতাম লাগানো হয়ে গেলে নুরুজী শান্তভাবে ইমনকে জিজ্ঞেস করেন "তা ইমন কি সমস্যা তোমার? " ইমন স্থির ভাবে উত্তর দেয় " স্বপ্ন" নুরুজী অবাক হয়ে যান কিছুটা। কারন এই স্বপ্ন নিয়ে তিনিও কিছু ঝামেলায় আছেন। নুরুজী তার অবাক হবার ভঙ্গী টা গোপন করে বলেন "স্বপ্ন আবার কিভাবে সমস্যা করতে পারে? " -আমি জানিনা তবে আমার সব সমস্যা একটি স্বপ্ন। নুরুজী জিজ্ঞেস করেন ইমন কে "কি স্বপ্ন দেখো তুমি? ইমন ঘামতে শুরু করেছে। ইমন বলার চেষ্টা করছে কিন্তু বলতে পারছে না। নুরুজী ইমন কে অভয় দিয়ে বলেন "ইমন তুমি বলে ফেলো কোন ভয় পেও না। অস্থির হবার দরকার নেই। তোমার সময় নাও। আস্তে আস্তে বলো। রীতিমতো ইমনের হাত-পা কাপা শুরু করেছে।ইমন এক গ্লাস পানি একেবারেই খেয়ে ফেলে। কোন ভাবেই শান্ত হতে পারছে না সে। নুরুজী ইমনে অবস্থা বুঝতে পারেন তিনি বলেন "আচ্ছা ইমন তোমার বলা লাগবে না। বলতে কষ্ট হলে বাদ দাও। তুমি বাসায় চলে যাও। ইমন অস্থির হয়ে বলে উঠে না না আমার বলতে হবেই। আমি এই সমস্যা থেকে মুক্তি চাই। অনেক দিন থেকে যুদ্ধ করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে পরেছি। নুরুজী বললেন "তাহলে এক কাজ করো তুমি বাসায় চলে যাও তোমার কথা গুলো রেকর্ড করে নিয়ে আসো। অথবা লিখে নিয়ে আসো। ইমন বললো "আমি এখানেই লিখে দেই। আজ লিখে দিয়ে যাই। আমি ২-৩দিন পর আবার আসবো। সেদিন আপনি বলবেন এর সমাধান কি। আপনার এখানে কি খাতা কলম হবে? হ্যা অবশ্যই। বললেন নুরুজী। তিনি খাতা কলম ইমনের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। সাথে বললেন নিচে তোমার বাসার ঠিকানা আর মোবাইল নাম্বারটা লিখে দিয়ো।আমি দুরে সরে গেলাম। তুমি আস্তে আস্তে লিখো। নুরুজী দুর থেকে ইমন কে দেখছেম ছেলেটা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। লিখে যাচ্ছে নিজের মতো করে। ছেলেটা অসম্ভব সুন্দর একটি ছেলে। চেহারার অস্থিরতার কারনে ছেলেটার সৌন্দর্য বোঝা যাচ্ছে না। ছেলেটা কোন সমস্যায় না থাকলে তাকে রাজকুমার অথবা প্রিন্স বললেও খুব বেশি অপরাধ হতো না।কারন ছেলেটার চেহারায় সৌন্দর্যের সাথে সাথে মায়া ও রয়েছে অসম্ভব। এই দুইটা জিনিস খুব কম মানুষের চেহারাতেই থাকে। ছেলেটার নাম্বার অথবা বাসার ঠিকানা নুরুজীর প্রয়োজন নেই। তবুও তিনি চেয়েছেন। কেন চেয়েছেন জানেন না। শুধু মনে হলো নাম্বার টা লাগবে।সাথে বাসার ঠিকানা টাও। ৪ নুরুজী ইমনের লিখাটা নিয়ে বসেছেন। ইমন নুরুজী কে রিকুয়েস্ট করেছিলো বাসায় যাবারর আগে যেনো তিনি লিখাটা না পড়ে। নুরুজীর ইমনের কথাটা রেখেছেন। তিনি খুলেন নি। বাসায় এসে সব কাজ শেষ করেই তিনি লিখাটা নিয়ে বসেছেন। তিনি লিখাটা পডার আগে ইমন কে নিয়ে কিছু লিখলেন তার কম্পিউটারে। নামঃইমন বয়সঃ ২১-২৩ এর মাঝে। মন্তব্যঃ ছেলেটা অত্যান্ত ধৈর্যশীল। তার কাছের মানুষ খুব কম। নিজে নিজের কাছে অনেক একা। কারো সাথে কোন কিছু শেয়ার করতে পারে না। যার কারনে স্বপ্নের বিবরন সহজ ভাবে দিতে পারছিলো না। খাতা কলমের সাহায্য নিতে হয়েছে। ছেলেটার লেখালেখির অভ্যাস রয়েছে। খুব সম্ভবত তার সব কথা সে লিখে রাখে। কারন অতি অল্প সময়ে অনেক লিখা লিখে ফেলেছে সে। এবং কলম চালানো দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো এই কাজটায় সে বেশ অভ্যস্ত। ছেলেটা অনেক বড়লোক ঘরের ছেলে। আসার সময় গাড়ি দিয়ে এসেছে। গাড়িটা ছিলো "জাগুয়ার " ব্যান্ড এর। কারন এই গাড়ীর ডুয়েল টার্বো ইঞ্জিনের শব্দ অনেক দুর থেকে শুনলেই বোঝা যায়। আর ছেলেটা আসার আগে ও যাওয়ার সময় তিনি এই গাড়ীর ইঞ্জিনের শব্দ পেয়েছেন। নুরুজী ইমনের লিখাটা পড়তে শুরু করলেন "স্বপ্নটা আমি যখন প্রথমবার দেখি আমার বয়স খুব বেশি হবে না। বেশি হলে ৫-৬। তখন সবে মাত্র বুঝতে শুরু করেছি। এক রাতে আমি দেখলাম আমার বিছানার চারপাশে শুধু রক্ত আর আর রক্ত। আমি এদিক ওদিক তাকাতে থাকলাম দেখি দরজার সামনে একটি লোক দাড়িয়ে আছে। তার সারা শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। পেটের কিছু অংশ খুবলে আছে। লোকটার মুখে কোন যন্ত্রনা ছিলো না। ছিলো শুধু প্রশ্নবোধক চিহ্ন। লোকটা হাসছিলো। তখন আমার সামনে দিয়ে একটি তরুনী বয়সের মেয়ে তেড়ে যায় লোকটার দিকে। তার হাতে একটি ছুড়ি। সেটি দিয়ে একের পর এক আঘাত করতে থাকে লোকটার বুকে। লোকটা কোন প্রতিবাদ করার চেষ্টা করছে না। আস্তে আস্তে লোকটা নিথর হয়ে যায়। সেদিন ছিলো আমার প্রথম খারাপ রাত। আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমি সারারাত কাদি। আম্মুর কাছে চলে যাই। তবুও ভয় আমার কাটে না। এই বুঝি রক্ত আমার কাছে আসলো। এই বুঝি লোকটা আমার দিকে তেড়ে আসলো। আমি সেদিন বুঝতে পারি নি সেদিন থেকেই আমার খারাপ সময় শুরু হবে। তার পরদিন রাতে আমি ঠিক একই স্বপ্ন দেখি। আবার সেই ভয়। আবার সেই কান্না। অনেক ডাক্তারের কাছে গিয়েছি।হুজুরের কাছে গিয়েছি। তাবিজ কবজ হয়েছে। কোন ফল হয়নি। আমি এই স্বপ্ন নিয়ে বড় হতে থাকি। একদিন রাতে আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমি পানি খেয়ে আলো জ্বালাই। দেখি সে লোকটা আমার পাশে বসে আছে। গা দিয়ে রক্ত ঝড়ছে।আমার দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিলো। আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। আমি ওখানেই অজ্ঞান হয়ে যাই। এভাবে স্বপ্ন দেখা ওই লোক কে দেখা আমার প্রতিদিনের রুটিন হয়ে যায়। স্বপ্নে বাস্তবে একটি মিল। লোকটি আমার কাছে এগিয়ে আসে। কিন্তু আমাকে স্পর্শ করতে পারেনা। তার আগে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই, ঘুম ভেঙে যায়। কিছু না কিছু একটা হয়। আমি ভয়ে একা একা কাঁদি। কয়েকবার আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছি। পারি নি কোন এক অজানা কারনে। আমি আম্মু কে আব্বুকে ভয়ে কিছু বলতে পারি না। পাছে তারা আমাকে পাগল ভাবে পাগলাগারদ এ পাঠিয়ে দেয় সে ভয়ে। এর কি সমাধান আমি জানিনা। তবে এই রক্ত মাখা লোককে আমি আর দেখতে চাই না। আমি স্বাভাবিক জীবন কাটাতে চাই। ডাক্তার প্লিজ আমাকে সাহায্য করুন। আমি বাঁচতে চাই। নুরুজী লিখাটা পড়া শেষ করে যত্ন করে রেখে দিলেন। আর "ছেলেটা অনেক ধৈর্যশীল " কথাটার নিচে আন্ডার লাইন করে দিলেন। মধ্যরাতে হটাত করেই নুরুজীর ঘুম ভেঙে যায়। তার মোবাইল টা বেজে চলেছে। মোবাইল নামক যন্ত্রটা নুরুজী সাথে রাখা যেদিন থেকে শুরু করেছে সেদিন থেকেই এই যন্ত্রটা পেইন দিয়ে যাচ্ছে। নুরুজী ফোনটা রিসিভ করেন। হ্যালো বলেন। ওপার থেকে ভারী গলায় একটা আওয়াজ আসে "নুরুল ইসলাম জীবন বলছেন?" নুরুজী হ্যা সূচক উত্তর জানায়। গলাটা আরো গম্ভীর করে লোকটা বলেন "আপনি ইমনের কেইস টা ছেড়ে দিন। ওকে আপনার দেখা লাগবে না। যতো টাকা লাগে পাবেন। নুরুজী ধাক্কার মতো খান কিছুটা। তিনি বলেন "আপনি কে বলছেন? " ওপার থেকে উত্তর আসে " আমি যে ই হই আপনি ইমনের ট্রিটমেন্ট করবেন না সোজা কথা। তার জন্য আপনি যথেষ্ট মূল্য পাবেন। নুরুজী সোজা জানিয়ে দেয় "আমার অর্থের দরকার নেই। আমি ইমনের কেইস টা ছাড়ছিনা।" লোকটা এইবার উগ্র ভাবে কথা বলা শুরু করে "তাহলে তো আপনার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। ভালো চান তো ইমন থেকে দুরে থাকুন। নুরুজী হাসেন তিনি বলেন " প্লিজ আমার সাথে বাংলা ছবির ডায়লগ মারবেন না। কি করবেন করেন দেখা যাবে।" লোকটা আরো ক্ষেপে গিয়ে বলেন "ভালো হবে না। পস্তাতে হবে আপনাকে। অনেক পস্তাতে হবে এর জন্য বেশি সাহস ভালো না" লোকটা ফোন কেটে দিয়েছে। নুরুজী হাসছেন। নুরুজী পুরোপুরি সফল। তিনি লোকটাকে ২মিনিট ৩০সেকেন্ড কথা বলাতে সক্ষম হয়েছে। যার ফলে খুব সহজের লোকটার লোকেশন বের করা যাবে। লাভের লাভ আরো একটি হয়েছে। লোকটিকে রাগিয়ে দেয়া গেছে। যার ফলে লোকটার কথার মধ্যে সাময়িক সময়ের জন্য আঞ্চলিক টান চলে এসেছিলো। এখন ইমনের থেকে একটু খোঁজখবর নিলেই লোকটা আসোলে কে বের করা যাবে।রাগ চমৎকার একটা জিনিস। মানুষের ভিতরের সকল লুকায়িত তথ্য প্রকাশ পায় এই রাগের মাধ্যমে। তবে নুরুজী ও জেদ করে কি করে ফেললো সে বুঝতে পারছে না। কাজটা কি ঠিক হলো? তার যদি সত্যি ই কোন বিপদ হয়। যাই হয় হোক ইমন ছেলেটাকে সাহায্য করা দরকার। নুরুজী একটি ফোনকলের মাধ্যমে অনেক কিছুই পেয়ে গেছেন। তিনি আগে ভাবছিলেন ইমনের এই সমস্যা শুধুই স্বপ্নঘটিত। অথবা নরমাল ব্রেইন ডিজঅর্ডার। কিন্তু এখন একটা ব্যপার ক্লিয়ার হয়ে গেছে ব্যাপার টা শুধুই স্বপ্ন ঘটিত নয়। এর পিছনে লুকিয়ে আছে বড় কোন ঘটনা। যা নুরুজী কে খুঁজে বের করতেই হবে। আর এই ঘটনার রহস্য উন্মোচন ই হবে ইমনের একমাত্র ঔষধ। নুরুল এই নুরুল উঠ। অনেক দূর থেকে ডাক টা ভেষে আসছে। নুরুজী চোখ খুলে দেখে তিনি একটি গাছের উপরে বসে আছেন। গাছটা অনেক উঁচু। সেই গাছের নিচ থেকে কেউ তাকে ডাকছে। নুরুজী খুব ভালো করে লক্ষ্য করে দেখেন লোকটা আর কেউ নয় তিনি নিজেই। নুরুজী উপর থেকেই কথা বলার চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু তার মুখ থেকে কোন কথা বের হয় না। নুরুজী লক্ষ্য করছেন নিচে থাকা লোকটার মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। নুরুজী অনেক চেষ্টা করেও কথা বলতে পারছেন না। তিনি ঘামা শুরু করেছেন। নিচে থাকা নুরুজীর মতো লোকটা চিৎকার করব বললেন "নুরুল তুই ভুল করলি। তুই নিজের বিপদ ডেকে আনলি । তোকে আগেই সাবধান করেছিলাম। তুই কথা শুনিস নি। তুই ভুল করলি নুরুল বড্ড বড় ভুল করলি। নুরুজী আবারো কিছু বলতে গিয়ে ব্যর্থ হলেন। তিনি প্রাণপণে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন কিছু বলার জন্য। কিন্তু পারছেন না। তিনি তাকিয়ে তাকিয়ে নিচে থাকা তার মতো লোকটার হাসি দেখছেন। হাসির শব্দ বেড়েই চলেছে। সব কেমন যেনো ঘোরের মতো হয়ে যাচ্ছে। হাসিটা মিলিয়ে যাচ্ছে দূর থেকে দূরে। সামনে সব কিছু ধবধবে সাদা হয়ে যাচ্ছে। নুরুজী চোখ খুলে অনুভব করেন তার সারা ষরীর ঘেমে একাকার হয়ে গেছে। মাথাটা ঝিম মেরে আছে। মাত্র দেখা স্বপ্নটাকে স্বপ্ন মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে বাস্তব। মনে হচ্ছে তিনি এই দুনিয়াতে নেই। সব কিছু কেমন যেনো লাগছে। ঘুম কেটে গেলেও নুরুজীর ঘোর কাটেনি। তিনি বিছানা থেকে উঠে চোখে মুখে পানি দেন। বাহিরে তাকিয়ে দেখেন সকাল হয়ে গেছে। নুরুজী আর না ঘুমানোর পরিকল্পনা করেন। সকাল ৭টা বাজে। পাশের হোটেল থেকে খাবার আসবে নয়টায়। কিন্তু নুরুজীর এখুনি ক্ষুদা লেগেছে। তিনিসেটাকে পাত্তা না দিয়ে ভাবতে থাকেন কি দেখলেন তিনি? পরক্ষনেই নিজের মন কে শান্তনা দেন এগুলো কিছু না। সারাদিন এটা নিয়ে ভাবায় এমন স্বপ্ন দেখেছি। যেটা হওয়া স্বাভাবিক। আর স্বপ্ন কোন দিন সত্যি হতে পারেনা। নুরুজী স্বপ্নের কথা মাথা থেকে তাড়িয়ে দেবার চিন্তা করতে থাকেন। তখনি তার ইমনের স্বপ্নের কথা মনে পরে যায়। ছেলেটা বিপদে আছে। ওকে সাহায্য করা দরকার। তিনি আজ ই ইমনের সাথে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেন। একান্ত কিছু কথা। ইমন ছেলেটা নুরুজীর পাশে বসে আছে। আজ ছেলেটা লাল রঙের একটা শার্ট পড়ে এসেছে। চুল গুলো ও সুন্দর ভাবে ঠিক করে এসেছে। আজ ছেলেটার ভিতরের রুপ ফুটে উঠেছে। একটি ছেলে এতো সুন্দর হয় কি করে তা আসোলেই ভাববার বিষয়। নুরুজী মুখে হাসি টেনে বলেন "কি ইমন কেমন আছো?" ইমন আজ প্রথমবারের মতো আলতো করে একটি হাসি দিয়ে বলে "হ্যা ভালো আছি। আপনি? " "আমি ভালো আছি। আসতে কোন সমস্যা হয় নি তো?" ইমন কে জিজ্ঞেস করলেন নুরুজী। "নাহ। সমস্যা হয় নি। আপনি আমাকে গাড়ি ছাড়া আসতে বলেছেন আপনি কিভাবে জানলেন আমার গাড়ি আছে? আর আমার স্বপ্নের সমাধান কি হয়েছে?" "মনে হয় হয়েছে। আমার কিছু প্রমান দরকার। তাই তোমাকে ডাকা। আমি কিছু প্রশ্ন করবো।যতোটা পারো সত্যি উত্তর দিবে।" আচ্ছা অবশ্যই। বললো ইমন। -আচ্ছা ইমন তোমার আব্বু আম্মু তোমার সাথে কেমন ব্যাবহার করে? -হ্যা ভালো। তারা কোন দিন আমার সাথে খারাপ ব্যাবহার করেন না। -গুড। আচ্ছা তুমি যে লোকটাকে দেখো তার চেহারার হালকা বিবরন কি তুমি আমাকে দিতে পারবে? -হ্যা অবশ্যই। ইমন বর্ণনা দেয় লোকটার। নুরুজী ইমনের কথা গুলো রেকর্ড করে রাখে। ইমন নুরুজী কে জিজ্ঞেস করে এতে কি লাভ হবে? নুরুজী একটা হাসি দিয়ে বলেন "সময় হলে দেখতে পাবে। নাও জুস টা খেয়ে নাও। আর হ্যা আমি তোমার বাসায় একটু যেতে চাই।নেয়ে যাবে কি আমাকে? ইমন অস্থিরতার একটা ভাব দেখিয়ে বললো হ্যা অবশ্যই" নুরুজী ইমনের বাসাটাটা দেখে এসেছে। তিনি ভেবেছিলেন তিনি গেলে ইমনের বাবা মা ব্যাপারটা সহজ ভাবে নিতে পারবে না। অথচ ইমনের বাবা মা নুরুজী কে দেখে প্রচন্ড খুশি হয়েছে। অনেক আপ্যায়ন করেছে। এমনকি তাদের প্রতিটা রুম নুরুজী কে ঘুরিয়ে দেখেছে।যদি ইমনের কোন কাজে আসে। তারাও মনে প্রানে চায় যে ইমন সুস্থ হোক। সব হিসেব প্যাচ লেগে যাচ্ছে। নুরুজী প্রথমে ভেবেছিলো ফোনটা ইমনের বাবা করেছে। কিন্তু তাকে দেখে তেমন মনে হলো না।তাহলে ফোনটা কে করেছে। ভাবতে ভাবতে নুরুজীর মোবাইলে সে নাম্বার থেকে ফোন আসে। নুরুজী ফোনটা রিসিভভ করে না চেনার একটি ভঙ্গী করে জিজ্ঞেস করলেন কে? অপর পাশ থেকে উত্তর আসলো "অনেক বড় ডাক্তার হয়ে গেছেন তাই না। দেখি কিভাবে কি করেন। তবে আপনার পস্তাতে হবে। না করেছিলাম কথা শুনেন নি। আজ ইমনের বাসায় গিয়ে ভুলটা করছেন আপনি। অনেক পস্তাতে হবে। নুরুজী কিছুই বলে না। একটা হাসি না। ওপারে লোকটা ক্ষেপে গিয়ে কিছু খারাপ ভাষায় বকতে থাকে। নুরুজী ফোনটা কেটে দিয়ে মোবাইলটা বন্ধ করে দেয়। এই সব ফালতু ফোন কলের পিছনে বসে থেকে লাভ নেই। তার এখন অনেক কাজ। অনেক গুলো কাজ করতে হবে। আর তিনি বুঝে গেছেন ফোনের অপর পাশের লোকটা আহাম্মক ছাড়া আর কিছুই না। তিনি কিছু করতে পারবে না হুমকি ধামকি ছাড়া।কারন যারা সত্যি কিছু করার ক্ষমতা রাখে তারা ঠান্ডা মাথায় করে। বকা দিয়ে মুখ খারাপ নয়। নুরুজী আজ সকাল সকাল ই ব্যাস্ত হয়ে পরেছেন। থানায় যেতে হবে। সকালে থানা থেকে ফোন এসেছিলো। ফোনে থ্রেড দেয়া আহাম্মক টাকে সহজেই গ্রেফতার করা গেছে। নুরুজী সে লোকটার চেহারা একটু দেখতে চান। কে এই লোক। হয়তো এই লোকের ভিতর থেকেই বেরিয়ে আসবে সকল রহস্যের হিসেব। নুরুজী থানায় এসে যা দেখলেন তা দেখে তিনি মোটামুটি একটা ধাক্কা খেয়ে ফেললেন। তিনি এই দৃশ্য দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। একটি লোক থানার অসির পায়ে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। আর বাচ্চাদের মতো কান্না করছে। আর ২জন হাবিলদার লোকটার পায়ে ধরে টানা হিচড়া করছেন। কিন্তু যতো জোরে টান দিচ্ছেন লোকটা অসির পা ততো জোড়ে চেপে ধরে রাখছে। ভাবটা এমন অসি সাহেবের পায়ের ইঞ্জুরি না ঘটিয়ে তিনি পা ছাড়বেন না। অসির নাম খুব সম্ভবত মিঃ হারুন। হারুন সাহেব চিৎকার করে বলছেন "পা ছাড় ব্যাটা। আমাদের হাতে কিছু নেই। নুরুল সাহেব আসলে সব হবে। এ কথা বলায় লোকটার কান্নার বেগ বেড়ে যায়। এতোটাই বেড়ে যায় যে নাক দিয়ে সর্দি বেরুতে থাকে। কিন্তু সেদিকে লোকটার খেয়াল ই নেই। হারুন সাহেব এই দৃশ্য দেখা মাত্রই বলা শুরু করেন "ছি ছি ইয়াক। এই ব্যাটা পা ছাড়লি নাকি সেলের ভিতরে নিয়ে পেঁদানি দিবো? নুরুজী হালকা একটি কাশি দিয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিলেন। হারুন সাহেব নুরুজীর দিকে তাকিয়ে বললেন ওইতো নুরুজী এসেছেন। এটা বলার সাথে সাথে যা ঘটলো তার জন্য নুরুজী মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। লোকটা হারুন সাহেবের পা ছেড়ে,হাত দিয়ে নিজের নাক পরিষ্কার করতে করতে দৌড়ে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন নুরুজীর পায়ে। বলা শুরু করলেন "স্যার আমারে ছাইড়া দেন। আমি কিছু জানিনা। আমারে বড়সাব আপনারে ফোন দিতে কইছে আমি ফোন দিছি। স্যার আমারে ছাইড়া দেন। আমি গরীব মানুষ।" লোকটা বাচ্চাদের মতো কাঁদছে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে লোকটা আসোলেই সরল। একটু বেশি ই সরল। নুরুজী বললেন "আগে পা ছাড়ো। তোমাকে ছেড়ে দেয়া হবে। কিন্তু তোমাকে সত্যি সত্যি সব বলতে হবে। লোকটার কান্নার বেগ এইবার একটু কমে। তিনি মনে হয় নুরুজীর কথায় আস্বস্থ্য হয়েছেন। তিনি নুরুজীর পা টা ছেড়ে দিয়ে উঠে দাড়ান। বাচ্চাদের মতো হাত দিয়ে চোখের পানি নাকের পানি মুছতে মুছতে পুরো মুখ মাখামাখি করে ফেলেন। একদিম বিচ্ছিরি অবস্থা হয়ে যায়। নুরুজী তার পকেট থেকে একটি টিশ্যু বের করে লোকটাকে দেন ঠিক মতো পরিষ্কার করার জন্য। নুরুজী বসে আছে সামনে বসে আছে খলিল। একটু আগে জানা গেছে লোকটার নাম খলিল। লোকটা ইমন দের বাসার দারোয়ান। ইমনের বাবা ৫০০টাকার বিনময়ে খলিল কে দিয়ে ফোন করিয়েছেন। খলিল গরীব মানুষ। অতশত বুঝে না। ভেবেছে শুধুমাত্র ফোন করে যদি ৫০০টাকা পাওয়া যায় তাহলে আর ক্ষতি কি। প্রতিদিন তো আর এমন সুযোগ আসেনা। কিন্তু এই সামান্য ফোনকল যে তাকে থানা পর্যন্ত নিয়ে আসবে সেটা খলিল স্বপ্নেও ভাবেনি । নুরুজী খলিল কে ছেড়ে দিতে বলেছেন তবে সেটা ২দিন পর। এখন ছেড়ে দিলে খলিলের বিপদ হতে পারে। এটা শুনে বেচারা খলিল আবার কান্না শুরু করেছে। একটাই কথা "আমার দুইটা ছুডু মাইয়া আছে। আমি না গেলে ওরা একলা একলা ডরাইবো। খাইতে পারবো না।ঘরে বাজার নাই" নুরুজী খলিল কে অভয় দিয়ে বলেন তুমি চিন্তা করো না খলিল আমি তোমার মেয়েদের দেখে রাখবো। ইন্সপেক্টর হারুন নুরুজী কে জিজ্ঞেস করলেন "ইমনের বাবা কেন ওর ট্রিটমেন্ট বন্ধ করতে চায়? বাবা হয়ে ছেলের ক্ষতি চায় কেন? নুরুজীর মুখে হাসি ফুটে উঠেছে।তিনি বললেন "কাল রাত পর্যন্ত আমার মনেও এই প্রশ্ন টা ছিলো।কিন্তু সব কিছু হাতে পেয়ে এখন সব কিছু পানির মতোই পরিষ্কার। আমি থানায় আসার আগেই জানতাম ইমনের বাবার লোক ধরা পরবে। কিন্তু সেটা কে তাই দেখার জন্য আসা আরকি।" হারুন সাহেব বললেন "তার মানে আপনি আগে থেকেই সব জানতেন? " "না সব জানতাম না। শুধু ধারনা ছিলো। আর কাল সব প্রমান হাতে পেয়েছি। "কই আমি কি দেখতে পারি" "নাহ। আগে ইমন কে দেখাবো। ইমনের বাবা মা কে দেখাবো। চাইলে আপনি আসতে পারেন আমার সাথে" ইন্সপেক্টর হারুন লোভনীয় ভাবে বলেন "এমন একটি রহস্য উন্মোচনের সাক্ষী হয়ে থাকতে পারলে মন্দ হবে না" নুরুজী একটি হাসি দিয়ে বলেন "আপনি সাথে কিছু ফোর্স নিয়ে নিন তাহলে। ওখানে অনেক কিছুই হতে পারে।" ৫ নুরুজী তার বাসায় বসে আছেন। বরাবর বসেছে ইমন ও ইমনের বাবা মা। ইমনের বাবা মায়ের মুখে কৃত্তিম হাসি স্পষ্ট। নুরুজী তাদের তোয়াক্কা না করে ইমনকে জিজ্ঞেস করলেন "ইমন তুমি কি প্রস্তুত? তোমার সব কিছুর সমাধান আমার হাতে চলে এসেছে। ইমন উত্তেজিত ভাবে বললো "হ্যা আমি প্রস্তুত। আপনি বলেন তারাতারি বলেন।" নুরুজী সামনে রাখা প্যাকেট থেকে একটি ছবি বের করলেন। ছবিটা ইমনকে দেখিয়ে বললেন "ইমন এটা কে চিনো? " ইমন না সূচক উত্তর জানিয়ে দিলো। নুরুজী হাসলেন। ইমনের মায়ের দিকে তাকালেন। তার চোখে অবিশ্বাসের দৃষ্টি। নুরুজী সেদিকে খেয়াল না করে বললেন আমি জানতাম তুমি চিনবে না। নুরুজী প্যাকেট থেকে আরো একটি ছবি বের করলেন। রক্ত মাখা চেহারার একটি ছবি।ইমন কে দেখিয়ে বললেন এটা কে চিনো? ইমন চমকিয়ে উঠে। ওর হাত পা কাপা শুরু করেছে। ইমন তোতলাতে থাকে। নুরুজী ইমন কে অভয় দিয়ে বলেন ইমন ভয় পেয়ো না। চিনো কিনা বলো। ইমন বললো হ্যা চিনি। এই লোকটাকেই আমি স্বপ্নে দেখি। ইমনের মা খেঁকিয়ে উঠলো। বন্ধ করেন এই সব। কি আলতু ফালতু কাজ এগুলো। আপনি ডাক্তার ঔষধ দিন।এইসব ছবি দেখানোর মানে কি। নুরুজী সেদিকে লক্ষ্য না করে ইমন কে বললেন "গুড। ওই রক্ত মাখা লোকটাই এই ছবির লোক। ইমন লোকটার ছবি ভালো ভাবে দেখছে। লোকটা অসম্ভব সুন্দর। ইমনের চেয়েও অনেক বেশি। ইমন ছবি থেকে মুখ সড়িয়ে নুরুজী কে লক্ষ্য করে বললো, আপনি এই ছবি গুলো কোথায় পেয়েছেন?


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১২১১ জন


এ জাতীয় গল্প

→ রোমাঞ্চকর গল্পঃ স্বপ্ন ( সাইকো থ্রিলার)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now

২৮.আমেরিকার এক অন্ধকারে (৫)

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান আরাফাত হোসেন (০ পয়েন্ট)

X কারসেন ঘানেম নাবালুসির বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল আহমদ মুসা। ঘানেম পরিবারকে অনেক সময় দিতে হয়েছে। খেতেও হয়েছে ওদের অনুরোধে। হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, বেলা ছয়টা বাজে। তিন ঘন্টা সময় খরচ হয়েছে। আহমদ মুসা সবুজ পাহাড়ে যেতে চায়। রাতে কোন গাড়ি ওদিকে যেতে চায় না। অথচ আহমদ মুসার ইচ্ছা, আজই সে ওখানে যাবে। ওখান থেকেই কারসেন ঘানেমকে ওরা কোথায় নিয়েছে তার ঠিকানা তাকে বের করতে হবে। ওখানে নিশ্চয় কোন ক্লু পাওয়া যাবে কিংবা ওখানকার কেউ বা অনেকেই জানতে পারে এ অঞ্চলে ইহুদী ঘাঁটি আর কোথায় আছে। জেনারেল শ্যারন, গোল্ড ওয়াটার এবং কলিন্সরা কেউই অবশ্য ওখানে নেই। আহমদ মুসা ওখান থেকে পালানোর পর ওখানে তারা থাকতে পারে না। এবং ওই ঘাঁটির গুরুত্বও তাদের কাছে অবশ্যই কমে গেছে। সুতরাং ওখানকার পাহারায় আগের সেই নিশ্ছিদ্রতা থাকবে বলে মনে হয় না। এটা আহমদ মুসার জন্যে সুযোগ। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাকে কারসেনকে উদ্ধারের একটা ক্লু বের করতেই হবে। ডাঃ মার্গারেট ও লায়লা জেনিফারের কথা তার মনে পড়ল। ওরা বন্দী। ওদের উদ্ধারেরও কোন ব্যবস্থা সে করতে পারেনি। কিন্তু ভাবল আহমদ মুসা, কান টানলেই মাথা আসবে। কারসেন ও ডাঃ মার্গারেটদের উদ্ধার হয়তো একটা ঘটনাই হয়ে দাঁড়াতে পারে। গাড়ি বারান্দার দিকে এগোলো আহমদ মুসা। বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিল ঘানেম পরিবারের সদস্যরা। ওদের মুখে যদিও বিষন্নতার ছাপ, তবু উদ্বেগ তাদের কেটে গেছে। পাবলো পরিবারের পরিবর্তনের কথা এবং সান ঘানেমকে সহযোগিতার কথা শুনে তারা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে। লাখো কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে তারা আহমদ আব্দুল্লাহ রূপী আহমদ মুসাকে। আহমদ মুসা তার ঘটনার যতটুকু বলেছে, তাতেই তারা অনেকখানি আশ্বস্ত হয়েছে, কারসেনকে উদ্ধারের ব্যাপারে তার উপর আস্থা রাখা যায়। গাড়িতে আহমদ মুসা। গাড়িটা সেই ড্রাইভার বিলের। আহমদ মুসা সান্তা আনাদের বাড়ি থেকে বেরোবার পর সোজা ছুটে গিয়েছিল তার পরিচিত সেই ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে। তার মন চাইছিল বিল ড্রাইভারকে। তাকে পেলে খুবই ভালো হতো। ভাগ্য ভালো আহমদ মুসার। বিলকে সে পেয়েছিল। কিন্তু বিল তাকে চেনেনি। সান্তাফে’র কথা বলে গাড়িতে উঠে বসে আহমদ মুসা। গাড়ি চলতে শুরু করলে আহমদ মুসা বলেছিল, ‘বিল আমরা কয়টায় সান্তাফে পৌঁছাতে পারবো?’ বিষ্মিত চোখে বিল মাথা ঘুরিয়ে তাকায় আহমদ মুসার দিকে। বলে, ‘স্যার আমার নাম জানলেন কি করে?’ ‘তুমি আমাকে ভূলে গেছ, আমি তোমাকে ভূলিনি বিল। তুমি আমাকে সবুজ পাহাড়ে নিয়ে গিয়েছিলে মনে নেই?’ বিব্রতকর অবস্থা ফুটে ওঠে বিলের চোখে মুখে। বলে, ‘স্যার আমি কিছু বুঝতে পারছি না। আপনার কথার ধরন ও স্বর শুনে মনে হচ্ছে আমি আপনাকে চিনি। আমি যাকে সবুজ পাহাড়ে নিয়ে গিয়েছিলাম, তার মতই আপনার কন্ঠ। কিন্তু সে তো শ্বেতাংগ ছিল না’। ‘তুমি জান, বিপদে পড়লে চেহারা অনেক সময় পরিবর্তন করতে হয়?’ বলেছিল আহমদ মুসা। বিব্রতভাব কাটেনি ড্রাইভার বিলের। সে একবার বোকার মত তাকাল আহমদ মুসার দিকে। কিছুই বোঝেনি সে। আহমদ মুসা এক হাতের গ্লাভস্ খুলে হাতটা বিলের সামনে তুলে ধরল। বলল, ‘দেখ আমি কি শ্বেতাংগ?’ হাসি ফুটে উঠল বিলের ঠোঁটে। বলল, ‘এতক্ষণে বুঝেছি স্যার, মুখে আপনি মুখোশ পরেছেন। কিন্তু একেবারে নিখুঁত হয়েছে স্যার’। তারপর একটু থেমেই বলল, ‘স্যার আপনি কবে কিভাবে ছাড়া পেলেন? আমি তো ধরে নিয়েছিলাম ওরা আপনাকে নিশ্চয়ই মেরে ফেলেছে। আমি পুলিশকে জানিয়েছি ব্যাপারটা’। ‘কি জানিয়েছ?’ ‘আপনাকে কিডন্যাপের কথা। কিন্তু পুলিশ আমার কথা বিশ্বাস করেছে কিনা জানি না। কিন্তু এফ.বি.আই বিষয়টায় খুবই গুরুত্ব দিয়েছে। গত কয়েকদিন আমার কাছে অনেক বার তারা এসেছে’। ‘কেন?’ ‘আপনার পুরো বিবরণ ও আপনার সাথে আমার যা যা কথা হয়েছে তা জানার জন্যে’। ‘ওরা কি করবে? উদ্ধার করতে যেতো নাকি?’ ‘না স্যার, ওরা নাকি একজন এশিয়ানকে খুঁজছে। তার সাথে আপনার কোন মিল আছে কিনা তা নিশ্চিত হতে চেয়েছে তারা’। ‘অবশেষে তারা কি চিন্তা করেছে?’ ‘তা জানি না। তবে মনে হয়েছে তারা আপনাকে চায়’। ‘কেন তোমার এটা মনে হলো?’ ‘তাদের আমি মন্তব্য করতে শুনেছি, দু’জন এক ব্যক্তি যদি তারা নাও হয়, তাহলেও ক্ষতি নেই, একজনকে পাওয়া গেলে অন্যজনকেও পাওয়া যাবে’। আরও একটা ব্যাপার, আমাদের ট্যাক্সি ড্রাইভারদেরকে ক’দিন আগে পুলিশ অফিস থেকে বলে দেয়া হয়েছে, যে কোন বিদেশী, বিশেষ করে কোন এশিয়ানকে পেলেই যেন আমরা তাদের খবর দেই’। ‘খবর দেবে?’ ‘কি যে বলেন স্যার। আপনি খুব ভাল মানুষ। অন্য কেউ হলে সেদিন আমি তার কাছ থেকে ভাড়া পেতাম না। আপনি একবার বিপদে পড়েছিলেন, আর আপনাকে বিপদে ফেলতে চাইনা। কিন্তু স্যার ওরা কারা, সেদিন আপনাকে ঐভাবে ধরে নিয়ে গেল?’ ‘একজন লোককে কিডন্যাপ করে ওরা বন্দী করে রেখেছে। তাকেই আমি উদ্ধার করতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু আমার যাওয়ার খবর ওরা আগেই পেয়ে যায় এবং আমাকে ঐভাবে বন্দী করে’। ‘সে কি উদ্ধার হয়েছে? ‘না’। ‘সে কি আপনার কেউ?’ ‘বন্ধু লোক’। ‘পুলিশকে বললেই তো পারেন’। ‘পুলিশ জানে, কিন্তু কিছুই হচ্ছে না’। ‘ঠিক বলেছেন স্যার, ইদানিং পুলিশ অনেক বিষয়ে যেন গরজ করতে চায় না’। এইভাবে গল্পে গল্পেই তারা সান্তাফে’র উপকন্ঠে কারসেন নাবালুসির বাড়িতে এসে পৌঁছেছিল। আহমদ মুসা গাড়িতে বসে গাড়ি বারান্দায় নেমে আসা কারসেনের মা, স্ত্রী ও মেয়ের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে বলল, বিল এবার চল’। গাড়ি স্টার্ট দিল বিল। কিন্তু কারসেন ঘানেমদের গেট পার হয়েই বিল গাড়ি দাঁড় করাল। ‘দাঁড়ালে কেন? বলেছি না যে, সবুজ পাহাড়ে যাব এখান থেকে বেরিয়েই’। বলল আহমদ মুসা। ড্রাইভার বিল মাথা ঘুরিয়ে পেছনে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘স্যার একটা ব্যাপার ঘটে গেছে’। বিলের কন্ঠ শুকনো। ‘কি ব্যাপার বিল, মনে হয় তুমি ভয় পেয়ে গেছ?’ বলল আহমদ মুসা। ‘জি স্যার। আমি গাড়ি নিয়ে এখানে আসার সময় বাড়ির পশ্চিম কোণে রাস্তার ওপাশে একটা গাড়ি দাঁড়ানো দেখেছিলাম, সেটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে’। ‘দাঁড়িয়ে আছে তো কি হয়েছে। রাস্তার পাশে এ ধরনের গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে না?’ ‘গাড়ি রেখে আমি বাইরে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে দেখলাম গাড়ি থেকে তিনজনের মধ্যে একজন বেরিয়ে এই বাড়ির উদ্দেশ্যে আসতে লাগল। আমিও এলাম। আমাকে ওরা পথচারী মনে করেছিল, সন্দেহ করে নি। আমি দেখলাম, লোকটি গেট অতিক্রম করে আরও সামনে এগিয়ে ড্রইংরুম বরাবর প্রাচীরের নিচে দাঁড়াল। ড্রইংরুম ও সেই প্রাচীরের মাঝখানে ছিল বাগান। লোকটি চারদিক দেখে হঠাৎ প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। আমি দূরে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। অমি ওদের নজরে পড়ে যাব এই ভয়ে গেট দিয়ে প্রবেশ করতে পারছিলাম না। প্রায় ২০ মিনিট পর লোকটি আবার প্রাচীর ডিঙিয়ে বেরিয়ে এল এবং দ্রুত ফিরে গেল গাড়িতে। এ সময় রাস্তায় কয়েকটা ট্রাক এল। আমি সেই ট্রাকের আড়াল নিয়ে গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করি’। থামল ড্রাইভার বিল। আহমদ মুসার ভ্রু কুঞ্চিত হলো। বলল, ‘ধন্যবাদ বিল। লোকগুলো কি শ্বেতাংগ?’ ‘শ্বেতাংগ’। ওদের তিনজনের চুলের ছাঁট ছোট ও এক রকমের?’ ‘এক ঝলক দেখেছি, খেয়াল করিনি’। ‘যাকে দেখছো তার?’ ‘তার চুল লম্বা’। ‘খুশীর খবর বিল, ওরা পুলিশের লোক নয়। যারা আমাকে সবুজ পাহাড়ের ওখানে বন্দী করেছিল, এরা তারাই’। ‘কিন্তু এখানে কেন?’ ‘আমার খোঁজে’। ‘কেমন করে ওরা জানে আপনি এখানে আসবেন?’ ‘এই বাড়ির মালিক কারসেন ঘানেমকে ওরা বন্দী করে রেখেছে। আর আমি এসেছি কারসেন ঘানেমকে উদ্ধার করতে। সুতরাং আমি কারসেন ঘানেমের বাড়িতে আসব, এ ব্যাপারে তারা নিশ্চিত ছিল’। ‘এটা তো খারাপ খবর, খুশীর খবর বললেন যে?’ ‘আমিও তো ওদের খুঁজছি। পেয়ে গেলাম, এটা খুশীর খবর নয়?’ ‘কিন্তু এখন তো বিপদ স্যার। আমাদের অপেক্ষায় ওরা বসে আছে’। ‘তাহলে চল যাই, দেখি ওরা কি বলে’। ‘আপনি মনে হয় ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। গেলে ওরা গুলি করবে, নয়তো আগের মতই আপনাকে বন্দী করবে। আমার মনে হচ্ছে, ওদের একজন যে ভেতরে গিয়েছিল সেটা কে এসেছে তা নিশ্চিত হবার জন্যে। তারা নিশ্চয়ই আপনার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছে’। ‘কিন্তু আমাকে চিনবে কি করে?’ ড্রাইভার তৎক্ষনাৎ উত্তর দিল না। কিন্তু একটু পরেই বলল, ‘স্যার ওদের একজন তো ভেতরে এসেছিল, নিশ্চয় আপনার কথা শুনে আপনার পরিচয় তারা জেনেছে’। ঠিক বলেছ বিল। তোমার বুদ্ধি আছে। বৈঠক খানার পূর্ব ও দক্ষিণ দু’দিকের জানালই খোলা ছিল। আমাদের কথাবার্তা নিশ্চয় ওদের লোক শুনেছে’। ‘আমি তো সে কথাই বলছি স্যার। সব জেনে ওরা আঁট-ঘাঁট বেঁধে বসে আছে’। আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘কিন্তু আমাদের তো যেতেই হবে, এখানে বসে থাকা তো যাবে না’। ‘তাহলে বলুন স্যার, কি করব এখন?’ ‘তুমি রাস্তায় নেমে দ্রুত গাড়ি ছাড়বে। এমন ভাব প্রকাশ করবে যে, তুমি ওদের পাশ দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যেতে চাইছ। ওরা এটা ভেবে আমাদের ফলো করার প্রস্তুতি নেবে। কিন্তু তোমার গাড়ি আকস্মিকভাবে ওদের গাড়ির গা ঘেঁষে দাঁড়াবে। ‘তারপর?’ ‘তারপর তুমি সিটের উপর শুয়ে পড়বে। যা করার আমিই করব’। ‘ঠিক আছে স্যার’। বলে গাড়িতে স্টার্ট দিল বিল। ছুটে চলল গাড়ি। আহমদ মুসা রিভলবার বের করে হাতে নিল। বসেছে সে পেছনের সিটে, বাম দরজার গা ঘেঁষে। জানালা খোলা। বিল এক্সপার্ট ড্রাইভার। শত্রু গাড়িটার কাছে পৌঁছা পর্যন্ত গাড়ির গতি একটুও না কমিয়ে নিজের গাড়িকে শত্রুর গাড়ির সমান্তরালে এনে হার্ড ব্রেক কষল। শত্রু গাড়ির পেছনের সিটে দু’জন বসে ছিল। আহমদ মুসা এসেছে ওদের ঠিক লাইনে। গাড়ি ব্রেক কষার পর গাড়ির ঝাঁকুনি শেষ হবার আগেই আহমদ মুসার রিভলবার দু’বার গুলি বর্ষণ করল। পাশের গাড়ির পেছনের সিটের দু’জন লোক মাথায় গুলি খেয়ে নিঃশব্দে ঢলে পড়ল সিটের উপর। গুলি করেই আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নেমে ছুটে গিয়ে ও গাড়ির দরজা এক ঝটকায় খুলে ড্রাইিভং সিটের পাশে বসল। তার রিভলবার ড্রাইভিং সিটে বসা লোকটির দিকে তাক করা। বলল সে লোকটিকে, ‘বল, জেনারেল শ্যারন ও গোল্ড ওয়াটার কোথায়?’ লোকটির হতভম্ভ ভাব তখনো কাটেনি। বিষ্ফারিত নেত্রে তাকাল সে আহমদ মুসার দিকে। কোন উত্তর দিল না। আহমদ মুসা তাকে লক্ষ্য করে গুলি করল। গুলিটা লোকটার কানের একটা অংশ ছিঁড়ে নিয়ে চলে গেল। লোকটি কঁকিয়ে উঠে একটা হাত দিয়ে কান চেপে ধরল। ‘দশ সেকেন্ডের মধ্যে যদি কথা না বল তাহলে এবারের গুলি তোমার মাথা গুঁড়ো করে দেবে’। বলে আহমদ মুসা রিভলবার তাক করল তার মাথা বরাবর। লোকটির কন্ঠ চিৎকার করে উঠল, ‘এই সামনেই এক্সপ্রেস ওয়ের ফোরটি ফোর্থ লেনের প্রায় মুখেই চার নাম্বার বাড়িতে ওরা আছে’। ‘আর কে থাকে সেখানে?’ ‘আরও আছে চারজন প্রহরী’। ক’ তলা বাড়ি? দোতালা। ‘জেনারেল শ্যারন ও গোল্ড ওয়াটার এবং প্রহরী ছাড়া আর কেউ নেই সেখানে?’ ‘আমি জানি না স্যার। বাড়ির ভেতরে কোনদিন আমি ঢুকিনি’। আহমদ মুসা চারদিকে তাকাল। সামনেই কিছু দূরে রাস্তার দক্ষিণ পাশে একটা টিলা এবং সংকীর্ণ উপত্যকা দেখতে পেল। আহমদ মুসা ড্রাইভিং সিটের লোকটিকে ঐ উপত্যকার দিকে যাবার নির্দেশ দিল। গাড়ি চলতে লাগল। আহমদ মুসা বিলকে পেছনে পেছনে আসার নির্দেশ দিল। টিলার গোড়ায় এসে পৌঁছল তাদের গাড়ি। ‘তুমি যে ঠিকানা দিলে সেখানে ওরা কত দিন আছে?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা লোকটিকে। ‘দশ বার দিন’। ‘তার আগে কোথায় ছিল?’ ‘সবুজ পাহাড়ে’। ‘তুমি কোথায় থাক?’ ‘ঐ ঠিকানার নিচের তলায়। শুধু রাতে থকি। দিনের ডিউটি মিঃ কারসেনের বাড়ি পাহারা দেয়া’। ‘কি জন্যে পাহারা দাও?’ ‘একজন এশিয়ানকে ধরার জন্যে’। ‘তোমার বাড়ি কোথায়?’ ‘ফ্লোরিডায়’। ‘নিউ মেক্সিকোতে কিভাবে?’ ‘ওদের সাথে এসেছি’। ফ্লোরিডায় তুমি কোথায় থাক?’ ‘ওদের সাথে’। ‘ওরা কোথায় থাকে?’ ‘বীচ ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে’। ‘কেন ওদের বাড়ি বা ঘাঁটি নেই ওখানে?’ ‘আছে,কিন্তু আমি জানি না’। আহমদ মুসার রিভলবারের নল উপরে উঠল। আহমদ মুসার কঠিন মুখের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল লোকটি, ‘ফ্লোরিডার মিয়ামীতে একটা সিনাগগ আছে। শহরের সবচেয়ে প্রাচীন গির্জা সেটা। তার সাথে রয়েছে একটা প্যালেস সদৃশ বাড়ি। এই পুরানো প্যালেস ও সিনাগগ নিয়েই ফ্লোরিডার মিয়ামীতে ওদের হেড কোয়ার্টার। সেখানে কোন প্রয়োজন হয়নি, তাই যাওয়াও হয়নি সেখানে। শুনেছি এটা তাদের দ্বিতীয় হেড কোয়ার্টার’। ‘এফ.বি. আই-এর যে লোকটি ওদের সাথে থাকে সে কি এখনো আছে?’ নেই স্যার। লোকটি থামলেও আহমদ মুসা কিছু বলল না। সে ভাবছিল, লোকটির কাছে তেমন কিছু আর পাবার নেই। প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘তোমাদের ড্যাস বোর্ডে দেখছি ফার্স্ট এইড বক্স আছে, দেখত ওখানে কি আছে?’ সংগে সংগেই বিনা বাক্যব্যয়ে লোকটি ফার্স্ট এইড বক্সের কেবিনটা খুললো। সন্ধানি চোখ বুলাতে লাগল আহমদ মুসা ফার্স্ট এইড বক্সের জিনিসগুলোর উপর। আহমদ মুসা খুঁজছে কোন ধরনের ক্লোরোফরম। তাঁর নিশ্চিত বিশ্বাস, হোয়াইট ঈগল ও জেনারেল শ্যারনরা তাদের কিডন্যাপ, হাইজ্যাক, ইত্যাদি কাজে ক্লোরোফরম ব্যবহারে অভ্যস্ত। একে ওরা খুবই নিরাপদ বলে মনে করে। সুতরাং এ বস্তুটা এ গাড়িতে কোথাও বা কারও কাছে পাবার কথা। আহমদ মুসার অনুমান মিথ্যা হল না। ফার্স্ট এইড বক্সে এ্যন্টি সেপটিক ক্রিম টিউবের পাশেই আরেকটা টিউব পাওয়া গেল সেটাই ক্লোরোফরম টিউব। টিউবের গায়ে লিখা আছে, ‘সিক্স আওয়ার’স এ্যনেসথেশিয়া’। তার মানে যে কোন কাউকে এই ক্লোরোফরম দিয়ে ছয় ঘন্টা ঘুম পাড়িয়ে রাখা যায়। আহমদ মুসা ক্লোরোফরম টিউবটি হাতে নিয়ে লোকটিকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তোমার পকেট থেকে রুমাল বের কর’। লোকটি রুমাল বের করল। আহমদ মুসা তাকে বলল, ‘রুমালে ক্লোরোফরম ঢাল’। যন্ত্র চালিতের মত নির্দেশ পালন করল লোকটি। ‘ক্লোরোফরম ভেজা রুমালটি নাকে চেপে ধরে বড় বড় নিঃশ্বাস নাও’। বলে আহমদ মুসা আবার রিভলবার তাক করল লোকটিকে। লোকটি আহমদ মুসার দিকে ভীত দৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে ক্লোরোফরম ভেজা রুমাল নিজের নাকে চেপে ধরে বড় বড় নিঃশ্বাস নিতে লাগল। মাত্র কয়েক সেকেন্ড। লোকটির হাত থেকে ক্লোরোফরম ভেজা রুমাল খসে পড়ল এবং সংগা হারিয়ে ফেলল লোকটি। আহমদ মুসা ওদের তিনজনের কাছ থেকে তিনটি রিভলবার কুড়িয়ে নিয়ে গাড়ি থেকে বের হলো। পেছনেই দাঁড়িয়েছিল বিলের গাড়ি। আহমদ মুসা গিয়ে গাড়িতে উঠল। ‘স্যার, কারসেনকে যারা বন্দী করে রেখেছে, এরা কি তারাই ছিল?’ বলল ড্রাইভার বিল। ‘হ্যাঁ, এরা সেই দলের। চল, দলের গোছা যেখানে, সেখানে যাব’। ‘কোনদিকে যাবো স্যার?’ ‘এক্সপ্রেস ওয়েতে ওঠ। তারপর ফোরটি ফোর্থ লেনের মুখে গিয়ে দাঁড়াও। গাড়ি ছাড়ল ড্রাইভার। ‘স্যার, ফোরটি ফোর্থ লেনে ইহুদীদের একটা সিনাগগ আছে’। ড্রাইভার বলল। ‘কত নাম্বার কিংবা কতটা ভেতরে জান?’ ‘না স্যার, লেনের প্রায় মুখেই সিনাগগটা। ‘প্রায় মুখেই?’ জি স্যার’। ‘বাড়িটার নাম্বার যদি চার হয়, তাহলে ঐ বাড়িতেই আমরা যাচ্ছি’। ‘ঠিক আছে স্যার’। বলল ড্রাইভার। ‘কিন্তু আহমদ মুসা মানুষ, সে হাওয়া নয়। সশরীরেই তাকে পালাতে হয়েছে। তার পালানো রোধ করতে পারলো না তোমার লোকরা, আর কারণ খুঁজে বের করতে পারলো না আহমদ মুসা পালাল কিভাবে’। বলল ক্ষোভের সাথে গোল্ড ওয়াটার। ‘আপনার ক্ষোভ ঠিক আছে মিঃ গোল্ড ওয়াটার। সত্যিই সমাধান করা গেল না, এই রহস্যের’। বিষন্ন মুখে বলল জেনারেল শ্যারন। ‘কিন্তু আমার মনে হয় কি জান, তোমার লোকরা তাকে অন্ধকুপে রাখার নাম করে পালিয়ে যেতে দিয়েছে’। গোল্ড ওয়াটার বলল। ‘কেন পালিয়ে যেতে দেবে?’ ‘তা আমি জানি না। তবে অর্থ অবিশ্বাস্য ও অসংখ্য অনেক কিছুই ঘটাতে পারে’। ‘না, গোল্ড ওয়াটার, অর্থের বিনিময়ে কোন ইহুদী আহমদ মুসাকে ছেড়ে দেয়া তো দুরের কথা, কোন সাহায্যও করতে পারে না’। ‘এটা তো তত্ত্ব কথা’। ‘বাস্তবতা এটাই কি মিঃ গোল্ড ওয়াটার?’ ‘তাহলে বলতে হবে আহমদ মুসা হাওয়াই হয়েছে’। ‘যা ইচ্ছা বলুন। কিন্তু আমার জীবনে এমন বিষ্ময়ের মুখোমুখি কোনদিন হইনি আর’। ‘এখন বলুন সবুজ পাহাড় থেকে এক এশিয়ান যখন উধাও হলো, তখন আর এক এশিয়ান লস আলামোসে উদয় হলো কি করে?’ গোল্ড ওয়াটার বলল। ‘সে এশিয়ানের যে স্কেচ আমি পুলিশের কাছে দেখেছি, তাতে আমার মনে হয়েছে সে আহমদ মুসা’। ‘বললেই তো হবে না, তা প্রমাণ করবেন কি করে?’ ‘প্রমাণ করতে পারলে তো এক মহাকাজ হয়ে যেত। গোটা আমেরিকা শুধু নয়, গোটা পশ্চিমী দুনিয়া আহমদ মুসাকে গ্রেপ্তার করার জন্যে পাগল হয়ে যেত’। ‘ঠিক বলেছেন জেনারেল। আমরা যদি এই একটা বিষয় প্রমাণ করতে পারি, তাহলে আহমদ মুসার দিন শেষ হয়ে যাবে। তখন সহজেই সে চিহ্নিত হবে যে সৌদি আরব, পাকিস্তান, ইরানের মত যত মুসলিম দেশ অথবা অন্য কোন সন্ত্রাসী দেশের পক্ষে সে নিউক্লিয়ার ও স্ট্রাটেজিক টেকনলজি চুরির কাজে লিপ্ত রয়েছে। তখন সে দুনিয়ার কোন দেশে আশ্রয় পাবে না এবং বাঁচার আর তার কোন পথও খোলা থাকবে না। আন্তর্জাতিক পুলেশের সাহায্যেও তখন তাকে গ্রেফতার করা যাবে’। ‘নিশ্চিত থাক গোল্ড ওয়াটার এটাই ঘটবে।একটু মুশকিল হয়েছে, লস আলামোসে কেউই তাকে ভালো করে দেখেনি, মাত্র এক মহিলা অফিসার ছাড়া। সে মহিলা আবার দেখা যাচ্ছে তার প্রতি দুর্বল। বুঝলেন মিঃ গোল্ড ওয়াটার, সেই মহিলা অফিসারের কাছে ঐ এশিয়ানের যে মহানুভব আচরণের কথা শুনেছি, এবং কাউকে হত্যা না করে শুধু পায়ে গুলি করে ওদের নিষ্ক্রীয় করে পালিয়ে যাওয়ার যে কাহিনী ওরা বলেছে, তাতে আমি নিশ্চিত হয়েছি সে আহমদ মুসা ছাড়া আর কেউ নয়’। ‘কিন্তু বলুন, এখন প্রমাণ করার পথ কি?’ ‘চিন্তা করছি মিঃ গোল্ড ওয়াটার, অনেকগুলো অল্টারেনটিভ পথ আছে। দেখি কোনটা কাজে লাগে’। ‘আরেকটা কথা জেনারেল, আমরা মিঃ কারসেন ঘানেমের ভারটা বয়ে বেড়াচ্ছি কেন?’ ‘ওদের হাতে বন্দী আমাদের কোহেনের মুক্তিপণ সে’। ‘ডাঃ মার্গারেট ও লায়লা জেনিফার আমাদের হাতে থাকার পর আর কিছুর প্রয়োজন নেই। ‘মিঃ কারসেন ঘানেম অন্তর্ধান হওয়ার বিষয় তার পরিবার এবং কাউন্সিল অব মুসলিম এ্যাসোসিয়েশনস-এর পক্ষ থেকেও পুলিশকে জানানো হয়েছে। বিষয়টা নিয়ে এফ.বি.আইও মাথা ঘামাচ্ছে। সুতরাং সে আমাদের কাছে থাকার মধ্যে একটা ঝুঁকিও আছে’। ‘আপনার কথার মধ্যে যুক্তি আছে মিঃ গোল্ড ওয়াটার। কিন্তু…… কথা শেষ করতে পারল না জেনারেল শ্যারন। গুলির শব্দ ভেসে এল নিচ তলা থেকে। প্রথমে ব্রাস ফায়ারের শব্দ। তারপর রিভলবারের শব্দ। জেনারেল শ্যারন কলিং বেলে টিপ দিয়ে সে এবং গোল্ড ওয়াটার দু’জেনই উৎকর্ণ হলো। ঘরে প্রবেশ করল একজন প্রহরী। ‘কি ব্যাপার নিচে? বলল জেনারেল শ্যারন। ‘স্যার নিচে যাচ্ছিলাম। আপনার ডাকে ফিরে এসেছি’। ‘ঠিক আছে, তুমি…….. জেনারেল শ্যারনের কথা শেষ না হতেই দু’টি স্টেনগানের ব্রাশ ফায়ারের শব্দ ভেসে এল। কথা শেষ না করেই উঠে দাঁড়াল জেনারেল শ্যারন এবং তার সাথে গোল্ড ওয়াটার। চল দেখি। প্রহরীকে উদ্দেশ্য করে বলল জেনারেল শ্যারন। আগে আগে দ্রুত ছুটল প্রহরী। সে নামার সিঁড়ির মুখে গিয়ে পৌঁছতেই সিঁড়ির গোড়া থেকে গুলির শব্দ ভেসে এল। অব্যাহতভাবে নিচে থেকে ছুটে আসছে গুলি। প্রহরী পেছনে তাকিয়ে চাপা কন্ঠে বলল, ‘স্যার কেউ গুলি করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে’। ‘আমাদের লোকরা কোথায়?’চিৎকার করল শ্যারন। ‘ওরা তিনজনই নিচে ছিল স্যার’। ‘তাহলে ওরা মারা পড়ল? তুমি গুলি কর, সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে আসা লোকদের ঠেকাও’। বলল শ্যারন। ‘কিন্তু স্যার, সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসা গুলির বিরতি নেই। ‘কাপুরুষ’ বলে ধমকে উঠল জেনারেল শ্যারন। প্রহরী লোকটি সংগে সংগেই গুলি করতে করতে এগুলো সিঁড়ির মুখে। কিন্তু সিঁড়ির মুখে পৌঁছতেই এবং নিজের স্টেনগানের নল সিঁড়ির গোড়ার দিকে ঘুরানোর আগেই তার দেহ ছুটে আসা গুলির ঝাঁকে ঝাঁঝরা হয়ে আছড়ে পড়ল সিড়িঁর মুখে। সংগে সংগেই জেনারেল শ্যারন গোল্ড ওয়াটারের হাত ধরে টেনে যে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল সেই ঘরে ঢুকে গেল এবং দরজা বন্ধ করে ছুটল বিপরীত দিকের আরেক দরজার দিকে। খুলল সে দরজা। দরজার পরেই একটা সিঁড়ি বাড়ির পেছনের চত্বরে নেমে গেছে। দরজাটা বন্ধ করে জেনারেল শ্যারন গোল্ড ওয়াটারকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নিচে নেমে গেল। ‘আমরা কি পালাচ্ছি জেনারেল শ্যারন?’ দৌড়াতে দৌড়াতেই বলল গোল্ড ওয়াটার। ‘না পালাচ্ছি না, অসম যুদ্ধ থেকে পশ্চাদপসরণ করছি। নিশ্চয় শত্রুরা সংখ্যায় অনেক এসেছে। প্রথম চোটেই তারা হত্যা করেছে নিচে আমাদের তিনজন প্রহরীকে। থামল জেনারেল শ্যারন। সিঁড়ির নিচেই বাড়িটার পেছনের চত্বরে একটা ছোট হেলিকপ্টার দাঁড়িয়ে আছে। হেলিকপ্টারের দিকে ছুটছে ওরা দু’জন। ‘জেনারেল শ্যারন, বন্দী মিঃ কারসেনকে যে আমরা ফেলে এলাম?’ ‘কেন তুমি যে বললে তাকে আর বয়ে বেড়ানোর দরকার নেই। সেজন্যেই তাকে আর নিলাম না’। ‘ভালই করেছ। একটা পুণ্য তো আমরা করলাম’। বলল গোল্ড ওয়াটার মুখ টিপে হেসে। তখন ওরা হেলিকপ্টারে উঠে বসেছে। হেলিকপ্টারের ড্রাইভিং সিটে বসেছে জেনারেল শ্যারন। হেলিকপ্টার স্টার্ট নিয়ে যখন উঠে এসেছে বিল্ডিং সমান উঁচুতে, তখন তারা দেখতে পেল মাত্র একজন লোক দরজা ভেঙে পেছনের সিঁড়ি দিয়ে নিচের চত্তরে নেমে এল। ‘মিঃ জেনারেল মনে হচ্ছে আক্রমণটা মাত্র একজন লোকের ছিল’। বলল গোল্ড ওয়াটার। ‘নিশ্চয় তাহলে সে আহমদ মুসা মিঃ গোল্ড ওয়াটার’। বলল জেনারেল শ্যারন। কি করে বুঝলেন? ‘সে একা এবং হেলিকপ্টার লক্ষ্য করে একটা গুলিও সে ছুঁড়ল না। অন্য কেউ হলে গুলির ঝাঁক শূন্যে পাঠিয়ে মনের ঝাল মেটাতো। কিন্তু আহমদ মুসা কোন অনর্থক কাজ করে না’। ‘তাহলে জেনারেল শ্যারন আহমদ মুসাকে বলে দিন তার দিন ঘনিয়ে আসছে। আমেরিকাই তার শেষ শয্যা হবে’। এ কথাটাই জেনারেল শ্যারন এভাবে বলল হেলিকপ্টারের মাইক চত্বরের দিকে তাক করে, ‘এখানে আমাদের কোন কাজ নেই। আমরা চললাম আহমদ মুসা। তোমার শেষ দিন ঘনিয়ে আসছে। আমাদের হাতে অথবা মার্কিন সরকারের হাতে তোমাকে ধরা দিতেই হবে। ডাঃ মার্গারেট ও লায়লা জেনিফার ভালই আছে। তোমার আত্মসমর্পণের জন্যে আরোও দশদিন বাড়িয়ে দিয়ে গেলাম, যদিও আমাদের লোকদের তর সইছে না তাদের কাছে পাওয়ার জন্যে’। একটা কন্ঠ শোনা গেল চত্বর থেকে। কন্ঠটি চিৎকার করে বলল, ‘জেনারেল শ্যারন, তোমাদের হিসেব কোনদিনই ঠিক হয়নি, ঠিক কোনদিনই হবে না’। জেনারেল শ্যারন বলল, মিঃ গোল্ড ওয়াটার নিশ্চয় চিনতে পারছেন কন্ঠটি আহমদ মুসার’। কিছু বলতে চেয়েছিল জেনারেল শ্যারন, কিন্তু দেখল আহমদ মুসা চত্বর থেকে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে উঠে ঘরে ঢুকে গেল। জেনারেল শ্যারন তার হেলিকপ্টারের দিকে মনোযোগ দিল। উপরে উঠে এল হেলিকপ্টার। নিচে নেমে গেল শহরের দৃশ্য। হেলিকপ্টার ছুটল এয়ার পোর্টের উদ্দেশ্যে। আহমদ মুসা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে ভাবল, কারসেন ঘানেম কি এখানে বন্দী ছিল? ওরা কি কারসেন ঘানেমকে নিয়ে গেল? কিন্তু জেনারেল শ্যারন তো শুধু ডাঃ মার্গারেট ও লায়লা জেনিফারের নাম বলল, কারসেন ঘানেমের নাম বলেনি। কারসেন ঘানেম যদি তাদের সাথে হেলিকপ্টারে থাকত, তাহলে তার কথা ভূলে যাবার কথা নয়। না কারসেন ঘানেম এখানে বন্দী ছিল না? সেটাও হতে পারে, কিন্তু সেক্ষেত্রেও ডাঃ মার্গারেট ও লায়লা জেনিফারের সাথে কারসেন ঘানেমের নাম তার বলার কথা। সিঁড়ি থেকে ঘরে প্রবেশ করে আহমদ মুসা ভাবল, ঘাঁটিটা একটু ভালো করে দেখা দরকার। ওরা তাড়াহুড়ো করে পালিয়েছে, দলিল দস্তাবেজ কিছু ফেলে যেতে পারে। বাড়িটা দোতলা। সিনাগগেরই একটা অংশ এটা। দোতলার পথসহ ছয়টি বেডরুম। বেডরুমগুলো সিনাগগ করিডোরের সাথে যুক্ত। ফ্যামিলি হাউজ নয়, দেখতে অনেকটা গেস্ট হাউসের মত। হতে পারে সিনাগগের কর্তৃপক্ষ এবং গেস্টদের জন্যেই এটা তৈরী হয়েছে। আর নিচের তলায় কিচেন, ডাইনিং, ড্রইং ইত্যাদি। আহমদ মুসা ঘরগুলো এক এক করে খুঁজল। দু’একটা কাগজ যা পেল পকেটে পুরল। সুযোগমত পরীক্ষা করা যাবে। সর্বশেষ ঘর, যার দেয়াল সিনাগগের সাথে যুক্ত এবং যার একটি মাত্র জানালা ও একটি মাত্র দরজা, তালাবদ্ধ অবস্থায় পেল। অন্য ঘরগুলো সবই খোলা ছিল। বদ্ধ দরজায় টোকা দিল আহমদ মুসা। কিন্তু কোন সাড়া পেল না। আরও কয়েকবার টোকা দেয়ার পর ভেতর থেকে শব্দ ভেসে এল ‘কে?’ ভয়মিশ্রিত কম্পিত কন্ঠ। আহমদ মুসা আশান্বিত হল। জবাব না দিয়ে আহমদ মুসা গুলি করল কি হোলে। খুলে ফেলল দরজা। দরজা খুলতেই আহমদ মুসার নজর পড়ল ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া একটি মুখের উপর। মাথার চুল তার উস্কো খুস্কো। পোশাক ময়লা, বিপর্যস্ত। চেহারা পুরো শ্বেতাংগ নয়। চোখ, মুখ ও রঙে সেমেটিক ছাপ আছে। ‘আপনি কি কারসেন ঘানেম?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা। গোলাগুলির শব্দে এমনি নার্ভাস হয়ে থাকার কথা। এই অবস্থায় গুলি করে দরজা খুলে একজন লোককে রিভলবার হাতে ভেতরে প্রবেশ করতে দেখলে যা হবার তাই হয়েছে। আসামীর মত তার অবস্থা। কথা সরছিল না তার মুখ থেকে। তাকিয়ে আছে সে ফ্যাল ফ্যাল করে আহমদ মুসার দিকে। আহমদ মুসা বলল, ‘আমি আহমদ আব্দুল্লাহ। আপনি কারসেন ঘানেম নিশ্চয়?’ এতক্ষণে লোকটি সহজ হয়ে উঠে দাঁড়াল। তার মুখে ফুটে উঠল আনন্দের চিহ্ন। সে দ্রুত কন্ঠে বলল, ‘হ্যাঁ আমি কারসেন ঘানেম’। আহমদ মুসা গিয়ে হ্যান্ডশেক করল তার সাথে। বলল, ওরা পালিয়েছে, চলুন আপনি মুক্ত। কিন্তু হ্যান্ডশেক করতে গিয়েই দেখতে পেল, তার ডান হাতে লাগানো হ্যান্ডকাফের সাথে লম্বা চেইন বাঁধা। চেইনের শেষ প্রান্তটা খাটিয়ার এক পায়ার সাথে যুক্ত। আহমদ মুসা গুলি করে হ্যান্ডকাফটা ভেঙে ফেলল। আলহামদুলিল্লাহ। আপনি কে জানি না, আপনাকে ধন্যবাদ। আলহামদুলিল্লাহ। আসুন, পরিচয় পরে হবে। বলে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে চলল। কারসেন ঘানেম ও আহমদ মুসা করিডোর ও ড্রইং রুমে চারটি লাশ ডিঙিয়ে বাইরের বারান্দায় বেরিয়ে এল। ‘যে লাশগুলো দেখলাম, ওগুলো আপনার হাতে নিহত?’ সতর্ক ও ফিসফিসে কন্ঠে জিজ্ঞেস করল কারসেন ঘানেম। ‘আমি গুলি করেছি, কিন্তু জান কবজ করেছে আজরাইল’। বলল আহমদ মুসা। হেসে উঠল কারসেন ঘানেম। বলল, ‘এই রক্তাক্ত পরিবেশেও আপনি হাসালেন। অদ্ভূত লোক তো আপনি’। ‘অদ্ভূত তো হবোই কারণ এর আগে অবশ্যই আপনি আমাকে দেখেন নি’। বলতে বলতে আহমদ মুসা মুখ বাড়িয়ে বারান্দা থেকে উঁকি দিল। দেখল, বিলের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে পাশেই। আহমদ মুসা ডাকতে যাচ্ছিল। কিন্তু দেখল ডাকার আগেই গাড়িটি ছুটে এসে দাঁড়াল গাড়ি বারান্দায়। ‘আসুন মিঃ কারসেন বলে আহমদ মুসা ছুটল গাড়ির দিকে। দুজনেই গাড়িতে উঠে বসল। বলল বিলকে লক্ষ্য করে আহমদ মুসা, ‘বিল তাড়াতাড়ি সরে পড়, পুলিশ এল বলে’। ‘স্যার, ঘরের জানালা দরজাগুলো বোধ হয় এয়ারটাইট। শব্দ বাইরে খুব একটা আসেনি। আমি কাছে ছিলাম বলে কিছুটা শুনতে পেয়েছি’। বলল বিল। ‘তোমাকে ধন্যবাদ বিল, এ জন্য যে তুমি পাশেই এসে অপেক্ষা করছিলে’। ‘আপনি গাড়ি থেকে নামলে আমি কিছুতেই ওখানে থাকতে পারিনি। কি ঘটছে অন্ততঃ জানাও তো দরকার। এ জন্যেই আপনার আদেশ অমান্য করেই চলে এসেছি। তাতে একটা লাভ হয়েছে’। ‘কি লাভ?’ ‘শব্দ শুনে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়েছিল। জিজ্ঞেস করেছিল আমাকে কি হচ্ছে ওখানে?’ আমি বলেছিলাম, ভিড়িওতে ওয়ার ফিল্ম চলছে ওখানে’। ধন্যবাদ দিয়ে গাড়িটি চলে যায়। ‘তোমার উপস্থিত বুদ্ধি তো দারুন!’ বলল আহমদ মুসা। ‘আই কিউ টেস্টে আমি ক্লাসে ফার্স্ট ছিলাম স্যার’। বলল বিল। ধন্যবাদ বিল। ‘স্যার ইনিই কি মিঃ কারসেন ঘানেম?’ হ্যাঁ বিল। ড্রাইভার বিল বলল ‘মিঃ কারসেন ঘানেম আপনার সামনের দিনগুলো শুভ হোক’। ‘ওয়েলকাম মিঃ বিল’। বলল কারসেন ঘানেম। ‘ধন্যবাদ স্যার’। বলে বিল আহমদ মুসার দিকে চেয়ে বলল, ‘এখন গাড়ি কোথায় নেব স্যার?’ ‘বলত গাড়ি কোথায় নেবে? দেখি তোমার আই কিউ কেমন?’ ‘গাড়ি এখন মিঃ কারসেন ঘানেমের বাড়িতে নেব’। বলল বিল। ‘ধন্যবাদ বিল’, বলল আহমদ মুসা। ‘আপনারা আমার বাড়ি চেনেন?’ বিষ্মিত কন্ঠে বলল কারসেন ঘানেম। ‘চিনতাম না। আজ তিনটায় আপনার বাড়িতে গিয়েছিলাম। ওখানে লাঞ্চ করেছি। আপনার বাড়িতে আসাটা মহালাভজনক হয়েছে’। বলল আহমদ মুসা। ‘কিভাবে?’ বলল কারসেন ঘানেম। কারসেন ঘানেম থামতেই বিল বলল, ‘একটা কৌতুহল স্যার, কেউ কি মারা গেছে, এত গোলাগুলি হলো’। ‘হ্যাঁ বিল, ওরা চারজন মারা গেছে। নেতা দু’জন হেলিকপ্টারে পালিয়েছে’। ‘তাহলে ওদের মোট মরল ছয়জন। বন্দী মুক্তি ও ছয়জন হত্যা, বিশাল বিজয় স্যার’। ‘আর দু’জন কোথায় মরল, চারজন তো দেখলাম’ বলল কারসেন ঘানেম’। আর দু’জন মরেছে আপনার বাড়ির এক প্রান্তে, আমাদের সাথেই এক সংঘর্ষে। কিছু বলতে যাচ্ছিল কারসেন ঘানেম। কিন্তু গাড়ি এসে গেল কারসেন ঘানেমদের বাড়ির গেটে। গেট পেরিয়ে গাড়ি ভেতরে ঢুকল। গাড়ি বোধ হয় চিনতে পেরেছিল কারসেন পরিবারের লোকেরা। গাড়ি বারান্দায় গিয়ে থামতেই দেখা গেল কারসেন ঘানেমের মা, স্ত্রী ও মেয়ে সবাই এসে বারান্দায় হাজির। দাঁড়িয়ে আছে ওরা তিনজন। তিনজনেরই মাথা ও গায়ে চাদর। প্রথমে তাদের সবারই মুখ ছিল উদ্বেগ ও আতংকে ঢাকা। কিন্তু গাড়ির ভেতরে কারসেন ঘানেমকে দেখেই প্রথমে ঘানেমের মেয়ে ফাতিমা আব্বু বলে আনন্দে চিৎকার করে উঠল। কারসেন ঘানেমের মা এবং স্ত্রীও দেখেছে। কিন্তু তারা চিৎকার নয়, দু’হাত উপরে তুলেছে আল্লাহর উদ্দেশ্যে। তাদের চোখ দিয়ে অশ্রু নেমে এসেছে ঝরঝর করে। ফাতিমা আনন্দে চিৎকার করার পর মুহূর্তেই তার আনন্দ কান্নায় রূপান্তরিত হয়েছে। কারসেন ঘানেম গাড়ি থেকে নামল। উঠল সিঁড়ি দিয়ে বারান্দায়। মা ও মেয়ে জড়িয়ে ধরল তাকে। পাশেই দাঁড়িয়ে তার স্ত্রী তখন বোবা কান্নায় ভাসছে। মা ও স্ত্রী কারসেনকে ধরে ভেতরে নিয়ে চলল। মেয়ে ফাতিমা ঘানেমও তাদের পেছনে পেছনে চলতে শুরু করল, কিন্তু সে হঠাৎ ফিরে দাঁড়াল। তাকাল গাড়ির দিকে। তারপর দৌড়ে নেমে এল গাড়ি বারান্দায়। গাড়ির জানালা দিয়ে আহমদ মুসার দিকে চেয়ে বলল, ‘আংকেল নামেন নি কেন? আসুন। চলুন ভেতরে’। বলে গাড়ির দরজা খুলে ফেলল ফাতিমা ঘানেম’। নামল আহমদ মুসা গাড়ি থেকে। বিলের দিকে চেয়ে বলল, ‘বিল একটু বস। মিঃ কারসেন ঘানেমের সাথে জরুরী কিছু কথা আছে আমার। আসছি আমি’। বলে ফাতিমা ঘানেমের পেছনে পেছনে চলল আহমদ মুসা। আহমদ মুসাকে নিয়ে গেল ড্রইংরুমে। আহমদ মুসাকে বসতে বলে সামনের সোফায় সেও বসল। আহমদ মুসা বসে বলল, ‘ফাতিমা তুমি যাও, তোমার আব্বুর সাথে কথা বল গিয়ে। আমি বসছি’। ‘না পরে বলব। আব্বুও তো এখানে আসবেন’। বলল ফাতিমা ঘানেম। ফাতিমার কথা শেষ হতেই কারসেন ঘানেম ড্রইংরূপে প্রবেশ করল। সালাম দিল আহমদ মুসাকে। তারপর ফাতিমার দিকে চেয়ে বলল, ‘ধন্যবাদ ফাতিমা। মা, তুমি ওকে সাথে করে ভেতরে নিয়ে এসেছ। আমি ভূলেই গিয়েছিলাম’। বলে আহমদ মুসার দিকে চেয়ে বলল, ‘আমি দুঃখিত মিঃ আহমদ আব্দুল্লাহ। পারিবারিক এক আবেগ আমাকে ভাসিয়ে নিয়েছিল। আমি দুঃখিত’। ‘দুঃখের কিছু নেই তো! আমি আপনার জায়গায় হলে এটাই ঘটতো। আর আপনি তো বাড়িতে ছিলেন না, আপনার মা-ই তো আপনার প্রতিনিধিত্ব করেছে। এখনও ঐ দায়িত্বই সে পালন করেছে’। আহমদ মুসা বলল। ‘ধন্যবাদ’। বলে ফাতিমার দিকে চেয়ে বলল, ‘আবার ধন্যবাদ মা তোমাকে’। একটু থেমে আবার বলল, ‘আমাদের সান ঘানেমের চেয়ে একটু বড় হবেন। মিঃ আব্দুল্লাহ তোমার ভাইয়ার মত। ভাইয়াই বলবে এঁকে। ফিরল তারপর সে আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘আপনি একটু বসুন। আমি গোসল সেরে আসি। এক সাথেই খাব’। বলে যাবার জন্যে ঘুরে দাঁড়াল কারসেন ঘানেম। যেতে যেতে বলল, ‘ফাতিমা তোমার ভাইয়ার সাথে কথা বল। আমি আসছি’। তার আব্বা ভেতরে চলে যেতেই ফাতিমা ঘানেম বলল, ‘আমরা আপনাদের এখানকার সংঘর্ষ দেখেছি’। ‘গাড়িতে যে গোলাগুলি হলো সেটাও?’ বলল আহমদ মুসা। ‘হ্যাঁ’। ‘কিভাবে?’ ‘আপনাদের চলে যাওয়া দেখার জন্যে আমরা ছাদে উঠেছিলাম’। বলে একটু থামল। সংগে সংগেই আবার বলল, ‘ওরা কারা ছিল?’ ‘তোমার আব্বাকে যারা কিডন্যাপ করেছিল, ওরা তাদেরই লোক ছিল?’ ‘ওরা কি করছিল এখানে? কি করে চিনলেন আপনি ওদের?’ আহমদ মুসা ঘটনাটা তাকে খুলে বলল। ফাতিমা ঘানেম চোখ কপালে তুলে বলল, ‘সর্বনাশ, আমাদের বাড়িতে কে আসে, কে যায় সর্বক্ষণ ওরা পাহারা দিত? তাহলে তো ওরা আমাদের ক্ষতি করতে পারতো’। ‘না ওরা শুধু একজনের জন্যে অপেক্ষা করেছে’। ‘কার?’ ‘এসব কথা থাক। ঐ গাড়িটা পুলিশের চোখে পড়েছে’? ‘জি না। স্টেট পুলিশ এতটা তৎপর হতে পারলে তো ভালই হতো। ‘কিন্তু এফ.বি.আই ওরকম নয়?’ ‘না এফ. বি.আই খুব ভাল’। ‘কিন্তু ভাল হওয়াটা আমার জন্যে খারাপ’। কেন?’ ‘এসব পরে বলব। বলত নিউ মেক্সিকো থেকে ফ্লোরিডার রুট কোনটা ভাল?’ ‘কিন্তু আসল কথা সব আপনি পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন’। হাসল আহমদ মুসা। ‘পাশ কাটানো নয়, ভবিষ্যতের জন্যে তুলে রাখা’। এভাবে আহমদ মুসা ও ফাতিমা ঘানেমের আলোচনায় বেশ সময় কেটে গেল। প্রায় এক ঘন্টা পরে নাস্তার ট্রলিসহ প্রবেশ করল কারসেন ঘানেম, তার স্ত্রী ও তার মা। নাস্তা পরিবেশন করে কারসেন ঘানেমের স্ত্রী ও তার মা চলে গেল। ড্রাইভার বিলকে ডেকে আনল কারসেন ঘানেম নাস্তার জন্যে। নাস্তা শেষ হলে ড্রাইভার বেরিয়ে গেল। মিসেস ঘানেম ও কারসেন ঘানেম নাস্তার টেবিল পরিষ্কার করে নাস্তার ট্রলি ভেতরে রেখে এল। ড্রইংরুমে বসেছে সবাই। কারসেন ঘানেম বসেছে আহমদ মুসার সামনের সোফায়। কারসেন ঘানেম মধ্য বয়স অতিক্রম করেছে। মাথার চুলের বড় একটা অংশ পেকে গেছে। চোখে মুখে একটা কৃচ্ছতার ছাপ। সম্ভবত বন্দী অবস্থার চিহ্ন এটা। কারসেন ঘানেমের স্ত্রী মিসেস ঘানেমই প্রথম শুরু করল। বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘আমাদের এখানে ডিনার করবেন কিন্তু, ব্যবস্থা করেছি’। ‘ডিনার করতে গেলে তাড়াহুড়ো হবে। আজ রাতেই নিউ মেক্সিকো থেকে চলে যেতে হচ্ছে’। বলল আহমদ মুসা। ‘কিন্তু এত তাড়া কিসের?’ বলল কারসেন ঘানেম। ‘জনাব আপনাকে পৌঁছে দিয়েই আমি চলে যেতাম, কিন্তু কিছু কথা আপনার কাছ থেকে শোনার আছে, তাই অপেক্ষা করেছি’। ‘কিন্তু তার আগে আপনার পরিচয় জানার জন্যে উদগ্রীব আমরা। দয়া করে কি বলবেন কিছু?’ ‘ওটা পরেও হতে পারবে। কিন্তু আপনি বলুন, যারা আপনাকে বন্দী করে রেখেছিল, তাদের সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানতে পেরেছেন কি না?’ ‘ওরা কখনই আমার সামনে তাদের নিজেদের কোন ব্যাপারে আলাপ করতো না। আমি যতটা শুনেছি, তাদের আলাপের সিংহভাগই থাকত আহমদ মুসাকে নিয়ে। প্রথম দিনেই তারা আমাকে বলেছে, আহমদ মুসাকে বন্দী করতে পারলেই আমাকে তারা ছেড়ে দেবে। অনেক কয়দিন পর তারা আমাকে বলল, তোমার কপাল খারাপ। আহমদ মুসাকে বন্দী করতে গিয়ে আমাদের একজন লোক ধরা পড়েছে। তাকে মুক্ত করা এবং আহমদ মুসাকে বন্দী করার আগে তোমার আর ছাড়া নাই। সেদিনই তারা ওখান থেকে আমাকে সরিয়ে ফেলল। ওখানে আহমদ মুসা নাকি আসছে আমাকে উদ্ধার করার জন্যে। এ দিনই সন্ধ্যায় ওরা আমাকে বলল, সুখবর, আহমদ মুসাকে আমরা বন্দী করেছি, এখন আমাদের লোক ছাড়া পেলেই তুমি মুক্তি পাবে। কিন্তু পরদিনই তারা আবার রাগে দুঃখে গর্জন করতে লাগল যে আহমদ মুসা তাদের বন্দীখানা থেকে হাওয়া হয়ে গেছে। ওদের একজন এসে আমাকে বলল, তোমার জন্যে দুঃসংবাদ এবং আমাদের জন্যে সুসংবাদ যে, আহমদ মুসা এবার সত্যিকার বিপদে পড়তে যাচ্ছে, যদি আমাদের অনুমান সত্য হয়। গোটা মার্কিন প্রশাসন তার বৈরী হওয়ার সাথে সাথে গোটা পশ্চিমা জগৎ তার বৈরী হয়ে দাঁড়াবে। সি.আই.এ, এফ.বি.আই ও অন্যান্য পশ্চিমী গোয়েন্দা সংস্থার যৌথ অভিযান আহমদ মুসা মাটির তলায় ঢুকলেও সেখান থেকে তাকে বের করে আনবে। আর আমরা যদি আগে ধরে ফেলতে পারি, তাহলে আর কথা নেই’। থামল কারসেন ঘানেম। ‘ওদের আলোচনায় ওদের কোন ঘাঁটির নাম বা টেলিফোন নাম্বার কিছু পেয়েছেন’। ‘না এ রকম কোন ঘটনা ঘটেনি। তবে একদিন তাদের আলোচনায় দু’জন মহিলা বন্দী ও তার সাথে আহমদ মুসা এবং একটি সিনাগগের নাম বলছিল’। ‘কি বলছিল ওরা?’ উদগ্রীব কন্ঠে জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা। ‘ওরা বলছিল, আহমদ মুসা যতই চেষ্টা করুক সলোমন সিনাগগের সন্ধান সে পাবে না। আর সন্ধান পেলেও সেখানে ডাঃ মার্গারেট ও লায়লা জেনিফার বন্দী আছে তার সন্ধান পাবে না এবং ডাঃ মার্গারেট ও লায়লা জেনিফারকে উদ্ধারও করতে পারবে না। অবশেষে তাকে আমাদের কাছে আত্মসমর্পন করতেই হবে’। ‘কি বলল সলোমন সিনাগগ সম্পর্কে? কোথায় এ সিনাগগটি?’ নাম সলোমন সিনাগগ, কিন্তু কোথায় তা তারা বলেনি’। বলে মুহূর্তকাল থেমেই সে আবার বলল, ‘বলুন তো এ আহমদ মুসা কি সেই বহুল আলোচিত বিপ্লবী আহমদ মুসা?’ ‘হ্যাঁ’। ‘আমিও তাই ভাবছি। তা না হলে আহমদ মুসাকে এত ভয় পাবে কেন? কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, আমার মত এক ক্ষুদ্র ব্যক্তিকে উদ্ধার করার জন্যে তাঁর মত অত বিরাট ও মহান ব্যক্তিত্বের আগমন ঘটবে কেন? এটা কি এ জন্যেই যে, তার কারণেই আমি বন্দী হয়েছি?’ আহমদ মুসা একটু হাসল। বলল, ‘আপনাকে ধন্যবাদ। সিনাগগের নামটা দিলেন এটা একটা বড় সাহায্য’। ‘কিন্তু আপনি এ নাম দিয়ে কি করবেন?’ কিন্তু প্রশ্ন করেই হঠাৎ আবার বিষ্ময়ে বিষ্ফারিত হবার মত চোখ বড় বড় করে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘আপনিই কি তাহলে আহমদ মুসা?’ কারসেন ঘানেমের এই প্রশ্নে কারসেন ঘানেমের স্ত্রী মরিয়ম মইনি এবং মেয়ে ফাতিমা ঘানেমও চমকে উঠল। তাদেরও বিষ্ময় দৃষ্টি গিয়ে নিবদ্ধ হলো আহমদ মুসার মুখের উপর। আহমদ মুসার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠছে। বলল, মিঃ কারসেন ঘানেম, পরিচয়ের কি এখানে প্রয়োজন আছে?আমাদের কাজ করা প্রয়োজন। ‘দুঃখিত আমার আরো আগেই দৃষ্টি খুলে যাওয়া উচিত ছিল। স্ত্রীর কাছে আমি ইতিমধ্যেই শুনেছি পাবলো পরিবারের সাথে কথা বলে কিভাবে শত্রু থেকে তাদেরকে ঘানেম পরিবারের বন্ধুতে রূপান্তরিত করেছেন, তারপর নিজ চোখে আমি দেখলাম কিভাবে আপনি একা শত্রুদের নিহত ও বিতাড়িত করে আমাকে মুক্ত করে নিয়ে এলেন, এতেই আমার চোখ খুলে যাওয়া উচিত ছিল’। বলে কারসেন ঘানেম উঠে গিয়ে আহমদ মুসার কাছে হাঁটু গেড়ে বসে আহমদ মুসার দু’হাত নিয়ে চুমু দিয়ে বলল, ‘আমরা সৌভাগ্যবান যে, আপনার সাক্ষাৎ আমরা পেয়েছি, আপনার পদধুলি আমাদের বাড়িতে পড়েছে। আমাদের অভিনন্দন গ্রহণ করুন’। ‘সবার যিনি স্রষ্টা, তারই সব প্রশংসা মিঃ কারসেন ঘানেম। আমাকে তাহলে উঠতে হয়’। ‘রাতে না গেলেই কি নয়? রাতে থাকুন। কাল যাবেন’। বলল মরিয়ম মইনি, কারসেন ঘানেমের স্ত্রী। ‘আপনার ব্যাগ ব্যাগেজ কোথায়? হোটেলে? ওগুলো আমরা নিয়ে আসতে পারি’। উঠে দাঁড়িয়ে বলল ফাতিমা ঘানেম। হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘গায়ে যা আছে এই নিয়ে আমি এসেছি নিউ মেক্সিকোতে। পাবলোদের ওখান থেকে আসার সময় সান্তা আনা একটা ছোট্ট ব্যাগে কিছু কাপড় চোপড় ও ঔষধ ভরে দিয়েছে। ওটা গাড়িতে আছে’। ‘ঔষধ কেন? আপনি অসুস্থ?’ বলল কারসেন ঘানেম। আহমদ মুসা নিজের বাম বাহুর সন্ধি দেখিয়ে বলল, ‘এখানে গুলি লেগেছিল। আট দশদিন পড়েছিলাম পাবলোদের ওখানে। এখন ভাল’। ‘কি কারণ গুলি লাগল। ঐ ইহুদীদের সাথে সংঘর্ষে?’ বলল কারসেন ঘানেম। ‘ওদের এক আঘাতে কপালের কিছুটা ফেটে গিয়েছিল। কিন্তু গুলিটা লেগেছিল আলামোসে সরকারী সৈন্যদের সাথে সংঘর্ষকালে’। ‘তাহলে ওরা আপনার কথাই বলছিল। লস আলামোসে আপনিই ঢুকেছিলেন? আহমদ মুসা কিছু বিষয় বাদ দিয়ে সংক্ষেপে গোটা ঘটনা ওদের জানিয়ে বলল, ‘এখনও মার্কিন সরকার জানে না যে, আহমদ মুসা লস আলামোসে ঢুকেছিল। তারা মনে করছে কোন একজন এশিয়ান ঢুকেছিল। এখন এ অঞ্চলে এশিয়ান যাকেই পাচেছ ধরছে এবং মেলাবার চেষ্টা করছে সে আহমদ মুসা কিনা। এ জন্যেই আমাকে শ্বেতাংগের ছদ্মবেশ পরতে হয়েছে’। বলে আহমদ মুসা মুখ থেকে স্কিন মাস্ক খুলে ফেলল। ঘরে উপস্থিতদের আরেকবার বিষ্ময় ও আনন্দের পালা। আরও কিছু আলোচনা চলল। আহমদ মুসা টয়লেটে গিয়ে স্কিন মাস্কটা পরে এসে বলল, ‘আমাকে উঠতে হবে। রাতে গেলেই সুবিধা বেশী’। ‘কোথায় যাবেন?’ জিজ্ঞেস করল কারসেন ঘানেম। ‘যাব ফ্লোরিডার দিকে’। ‘কেন?’ ‘ডাঃ মার্গারেট ও লায়লা জেনিফারদের উদ্ধার করতে চেষ্টা করব। কোথায় ওদের পাব জানি না’। ‘ভয়াবহ এই বিপদ মাথায় নিয়ে আপনি চলাফিরা করবেন কি করে?’ বলল মরিয়ম মইনি। ‘আর মাত্র দশদিন সময় হাতে আছে। এর মধ্যেই ওদের উদ্ধার করতে হবে। উদ্ধার করতে না পারলে ওদের কাছে আমাকে ধরা দিতে হবে। না হলে দশদিন পর ওরা দু’জনকেই হত্যা করবে অনেক লাঞ্ছনার মধ্য দিয়ে’। ‘মেয়ে দু’টি আপনার কে?’ জিজ্ঞেস করল কারসেন ঘানেম। ‘আমার কেউ নয়। কিন্তু ক্যারিবিয়ানে যখন ছিলাম, ওরা আমাকে মূল্যবান সাহায্য করেছে। তাদের বিপদের কারণ মূলত এটাই। তাদের পণবন্দী করে ওরা মনে করছে, তাদের রক্ষার জন্যে আমি ওদের কাছে আত্মসমর্পন করব। অথবা ওদের উদ্ধার করতে গেলে আমাকে ধরার একটা সুযোগ তারা পেয়ে যাবে’। ‘ইহুদী গোয়েন্দা সংস্থা ও হোয়াইট ঈগলের সাথে সরকারও তৈরী হলে আপনি এগোবেন কি করে?’ ‘আমার মনে হয় পশ্চিম এলাকার চাইতে পূর্ব এলাকায় এশিয়ানদের উপর সরকারের সন্দেহ কম থাকবে। তাছাড়া একটা ছদ্মবেশ আমার আছেই। অসুবিধা হবে না’। আহমদ মুসা থামতেই ফাতিমা ঘানেম বলল, ‘আমি একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে পারি জনাব?’ ‘অবশ্যই পার’। আহমদ মুসা বলল। ‘আপনার সম্পর্কে আমরা অনেক শুনেছি, কিন্তু দেশ কোথায় জানি না’। ‘দেশ বলতে যদি জম্মস্থান বল, তাহলে আমার দেশ চাইনিজ তুর্কিস্তান। আর দেশ বলতে যদি আমি কোন দেশের নাগরিক বুঝিয়ে থাক, তাহলে নির্দিষ্ট কোন দেশ আমার নেই। বলতে পার প্রায় সব মুসলিম দেশের আমি নাগরিক’। ‘আপনার কে আছে?’ আমার রক্ত সম্পর্কের কেউ বেঁচে নেই। আমার স্ত্রী আছেন’। ‘মাফ করবেন ভাইয়া, উনি কোন দেশের, কোথায় আছেন?’ বলল ফাতিমা ঘানেম। ‘উনি ফরাসী মেয়ে, উনি এখন আছেন মদিনায়। মদিনা চেন?’ ‘জি হ্যাঁ, আমাদের রাসূলের রওযা শরীফ ওখানে। মদিনাই ছিল তাঁর রাজধানী। ‘ধন্যবাদ ফাতিমা। বলত ফাতিমা, মদিনা আল্লাহর রসূলের রাজধানী ছিল, সেটাই ইসলামী বিশ্বের রাজধানী হওয়া কি উচিত নয়?’ ‘অবশ্যই জনাব। কিন্তু কিভাবে?’ ‘সেটা তো তোমরা মুসলিম তরুণ তরুণীরাই বলবে। তোমাদেরকেই এটা করতে হবে’। ‘মুসলিম তরুণী হিসেবে আমার দায়িত্বের কথা ভাবিইনি কোনদিন’। ‘ভাবনি, কিন্তু এখন ভাবা কি উচিত নয়?’ এখন মনে হচ্ছে ভাবা দরকার’। ধন্যবাদ, ফাতিমা’। আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘আমি আসি’। ‘আপনাকে আমরা আটকাতে পারবোনা। কিন্তু মনে রাখবেন আজকের দু’টি ঘন্টা আমাদের জীবনের ‘স্বর্গীয় এক স্বপ্ন’ হয়ে থাকবে। যা আমাদেরকে আনন্দের চেয়ে বিচ্ছেদের কষ্টই বেশী দিয়ে চলবে’। বলল মরিয়ম মইনি। তাঁর কন্ঠ ভারি। ‘এমন শত সহস্র স্মৃতির জ্বলন্ত অংগার নিয়ে আমি বেঁচে আছি মিসেস ঘানেম’। ‘কিন্তু আপনার হৃদয় আকাশের মতই বিশাল, আমাদের নয়’। বলল কারসেন ঘানেম। আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়ে চলতে শুরু করেছে। ফাতিমা বলল, ‘ভাইয়া আপনি পরশ পাথর। আমাদের মত আত্মবিস্মৃত লোহারা আপনার পরশে সোনা হতে পারে। কিন্তু জগতের লক্ষ কোটি মুসলিম তরুণীরা এ পরশ পাবে কোথায়?’ আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াল। বলল, ‘একটু ভূল হলো বোন। পরশ পাথর আমি নই, পরশ পাথর হলো আল কোরআন এবং নবীর জীবন কথা। এ দুই পরশ পাথরের স্পর্শ নাও, দেখবে তুমি সোনা হয়ে গেছ, সবাই সোনা হয়ে যাবে’। সবাইকে সালাম দিয়ে বারান্দার সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল আহমদ মুসা গাড়ি বারান্দায়। সবাই এসে দাঁড়িয়েছে গাড়ি বারান্দায়। সবার চোখে মুখে একটা কিছু হারিয়ে ফেলার বেদনা। আহমদ মুসা গাড়িতে উঠে বসে সবার উদ্দেশ্যে হাত নাড়ল। স্টার্ট নিল গাড়ি। ছুটে বেরিয়ে এল কারসেন ঘানেমদের বাড়ি থেকে। ‘কোথায় যাব স্যার?’ ‘এয়ারপোর্ট’। নির্দেশ দিয়ে গাড়ির সিটে গা এলিয়ে দিল আহমদ মুসা। চোখে তন্দ্রা আসছিল। হঠাৎ আহমদ মুসার খেয়াল হল, তাকে ঔষধ খেতে হবে। আহমদ মুসা ব্যাগটা টেনে নিল। ঔষদের প্যাকেট বের করল ব্যাগ থেকে। প্লাস্টিকের একটা সুন্দর চেন আটকানো প্যাকেটে ঔষধ। চেন টেনে প্যাকেট খুলল। খুলেই দেখতে পেল একটি মানিব্যাগ। বিষ্ময়ের সাথে মানিব্যাগ হাতে নিল আহমদ মুসা। দেখল, মানিব্যাগ ভর্তি ডলার। সান্তা আনা এ মানিব্যাগের কথা তাকে বলেনি। গোপন করেছে আহমদ মুসা নিষেধ করবে ভেবে। একজন বিদেশী মেয়ের এই সীমাহীন শুভেচ্ছা ও আন্তরিকতায় হৃদয়টা আলোড়িত হয়ে উঠল আহমদ মুসার। দু’চোখের কোণা ভারি হয়ে উঠল তার। এই শুভেচ্ছা, এই আন্তরিকতার কোনই মূল্য দিতে পারবে না সে। মনে পড়ল বিদায়কালীন সান্তা আনার শেষ আকুতি, ‘একজন বোনের দুই চোখ চিরদিন আপনার খোঁজ করবে’। আহমদ মুসা কি পারবে একটি হৃদয়ের সবটুকু আন্তরিকতা নিংড়ানো এই দাবীর প্রতি সাড়া দিতে? এমন মমতার কত কুসুম যে সে পদদলিত করে এসেছে তার ইয়ত্তা নেই। আহমদ মুসার আরো মনে হলো, সান্তা আনার ডলারগুলো আল্লাহ তায়ালার যেন এক বিশেষ রহমত। তার কোমরের বেল্টে যে ডলার গুলো লুকানো আছে তা গাড়ি ভাড়া দেয়া ও বিমানের টিকিট কেনার পর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। বর্তমান অবস্থায় সান্তাফে কিংবা এদিকের কোন সিটি থেকে তার গোপন কোড নম্বর ব্যাবহার করে ব্যাংক থেকে টাকা উঠানোও নিরাপদ নয়। ওয়াশিংটন কিংবা নিউ ইয়র্কের মত মাল্টি ন্যাশনাল সিটি ছাড়া তার ব্যাংকে যাওয়া সামনে হয়তো আরও কঠিন হয়ে উঠবে। সুতরাং সান্তা আনার টাকা তার খুবই উপকার করবে। সান্তা আনা যদি জানতে পারতো তার গোপনে দেয়া ডলারগুলো কত উপকারে আসছে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮১ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ২৮.আমেরিকার এক অন্ধকারে (৫)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন