বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
নীল পদ্মরাগ (শার্লক হোমসের বাংলা গোয়ন্দা গল্প) শেষ পর্ব
X
মিস্টার বেকার উঠে দাঁড়ালেন। সদ্য-পাওয়া
হাঁসটা বগলদাবা করে বললেন, “অবশ্যই, মশাই।
আমরা দিনের বেলা মিউজিয়ামে কাজ করি।
মিউজিয়ামের কাছে আলফা ইন হল আমাদের
প্রিয় আড্ডা। তার মালিকের নাম উইন্ডিগেট।
ভারী ভাল লোক। তিনি একটা হাঁস ক্লাব স্থাপন
করেছেন। প্রতি সপ্তাহে কয়েক পেনি করে চাঁদা
দিলে আমরা বড়োদিনের সময় একটা হাঁস পাই।
আমি আমার চাঁদা সময়মতো দিয়ে এসেছিলাম।
বাকি সবটাই তো আপনার জানা। আপনার কাছে
আমি ঋণী থেকে গেলাম, মশাই। আমার বয়স বা
সম্মানের কথা ভাবলে, এই স্কচ বনেট জাতীয় টুপি
আর এই আমাকে মানায় না।” যাওয়ার সময় তিনি
মাথা ঝুঁকিয়ে বেশ কেতাবি কায়দায় একটা
অভিবাদন জানিয়ে গেলেন। বেশ মজা লাগল
দেখে।
তিনি চলে গেলে হোমস দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে
বলল, “এই হল মিস্টার হেনরি বেকারের গল্প।
বোঝাই যাচ্ছে, তিনি ঘটনার কিছুই জানেন না।
ওয়াটসন, তোমার কি খিদে পেয়েছে?”
“না, কেন?”
“তাহলে চলো, সন্ধ্যের খাবারটা একেবারে
রাতেই খাওয়া যাবে; এইবেলা এই টাটকা সূত্রটার
পিছু নেওয়া যাক।”
“বেশ, তাই চলো।”
বেশ শীত পড়েছিল সে রাতে। আমরা গলায় ভাল
করে আলস্টার [‡‡] পরে মাফলার জড়িয়ে বের
হলাম। মেঘহীন আকাশে তারা ঝিলমিল করছিল।
পথের লোকেদের মুখ থেকে পিস্তলের গুলির মতো
ধোঁয়া বের হচ্ছিল। ডকটর’স কোয়ার্টার, উইমপোল
স্ট্রিট, হার্লে স্ট্রিট, উইগমোর স্ট্রিট পেরিয়ে
অক্সফোর্ড স্ট্রিটে এসে পড়লাম। আমাদের
পায়ের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। আধঘণ্টার
মধ্যে ব্লুমসবেরির আলফা ইনে এসে পড়লাম।
হলবোর্নের দিকে যে রাস্তাটা গেছে তারই এক
কোণে একটা ছোটো পাবলিক হাউস। হোমস
প্রাইভেট বারের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে লাল-
মুখো, সাদা অ্যাপ্রন-পরিহিত মালিকের কাছে দুই
গ্লাস বিয়ার অর্ডার করল।
বলল, “তোমার বিয়ার নিশ্চয় তোমার হাঁসের মতোই
ভাল।”
লোকটা অবাক হয়ে বলল, “আমার হাঁস!”
“হ্যাঁ, আধঘণ্টা আগেই তোমার হাঁস ক্লাবের সদস্য
মিস্টার হেনরি বেকারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল।”
“ও, হ্যাঁ! এবার বুঝেছি। তবে কিনা, মশাই, ওই হাঁস
ঠিক আমার নয়।”
“তাই নাকি! তাহলে কার?”
“কভেন্ট গার্ডেনের এক হাঁসওয়ালার কাছ থেকে
ডজন দুয়েক আনিয়েছিলাম।”
“বটে! ওখানকার কয়েকজনকে চিনি। ওগুলো ঠিক
কার থেকে আনিয়েছিলে?”
“লোকটার নাম ব্রেকিনরিজ।”
“ও! তাকে চিনি না। আচ্ছা, এই নাও তোমার
বিয়ারের দাম। তোমার ব্যবসার উন্নতি হোক।
শুভরাত্রি।”
বাইরের হিমেল হাওয়ায় আবার বেরিয়ে এসে সে
কোটের বোতাম লাগাতে লাগাতে বলল, “এবার
গন্তব্য মিস্টার ব্রেকিনরিজের দোকান। বুঝে
দ্যাখো, ওয়াটসন, আমরা যে লক্ষ্যে চলেছি, তার
এক দিকে একটা সামান্য হাঁস। কিন্তু অন্যদিকে
একটি নিরপরাধ লোক যাকে আমরা নির্দোষ
প্রমাণ করতে না পারলে তাকে সাত বছর বিনা
অপরাধেই জেল খাটতে হবে। এমনও হতে পারে যে,
আমরা দেখব আসলে চুরিটা সেই করেছে। কিন্তু
ভাগ্যক্রমেই হোক, আর যেভাবেই হোক, আমাদের
হাতে এমন একটা সূত্র এসে গেছে যা পুলিশের
হাতেও আসেনি। এর শেষ দেখেই ছাড়ব। চলো
দক্ষিণ দিকে। তাড়াতাড়ি।”
হলবোর্ন পেরিয়ে এনডেল স্ট্রিটে এসে পড়লাম।
বসতি এলাকার আঁকাবাঁকা পথ ধরে কভেন্ট
গার্ডেন মার্কেটে পৌঁছালাম। সেখানে সবচেয়ে
বড়ো দোকানগুলোর একটার নাম ব্রেকিনরিজের
নামে। মালিকের মুখটা ঠিক ঘোড়ার মতো
লম্বাটে। দু-পাশে ছাঁটা জুলপি। একটা ছেলেকে
দোকানের শাটার ফেলতে সাহায্য করছিল।
হোমস বললে, “শুভ সন্ধ্যা। বেশ শীত পড়েছে আজ
রাতে।”
বিক্রেতা মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানাল।
তারপর আমার সঙ্গীর দিকে প্রশ্নালু চোখে
তাকাল।
মার্বেলের শূন্য স্ল্যাবগুলোর দিকে আঙুল
দেখিয়ে হোম জিজ্ঞাসা করলে, “সব হাঁস বিক্রি
হয়ে গেছে দেখছি।”
“কাল সকালে আসুন। পাঁচশো হাঁস চাইলেও দিতে
পারবো।”
“সে আমার কোনো কাজে লাগবে না।”
“তবে ওই যে দোকানটায় গ্যাস জ্বলছে, ওটায়
যান।”
“কিন্তু আমাকে যে তোমার দোকানের কথাই বলা
হয়েছে।”
“কে বলেছে?”
“আলফার মালিক।”
“ও, হ্যাঁ। আমি তাকে ডজন দুয়েক পাঠিয়েছিলাম।”
“হাঁসগুলো বেশ ছিল। তা ওগুলো পেয়েছিলে
কোত্থাকে?”
অবাক কাণ্ড। প্রশ্নটা শুনেই বিক্রেতা রাগে
ফেটে পড়ল। সে এবার ঘাড় ঘুরিয়ে কোমরে হাত
দিয়ে যুদ্ধং দেহি ভূমিকায় দাঁড়াল। বলল, “পথে
আসুন মশায়! কি চাইছেন বলুন দেখি! ঝেড়ে
কাশুন।”
“বাঁকা কথা তো কিছুই বলিনি। আমি শুধু জানতে
চেয়েছি যে হাঁসগুলো তুমি আলফায় বিক্রি
করেছিল, সেই হাঁসগুলো তুমি কার কাছ থেকে
কিনেছিলে?”
“অ! আর যদি না বলি, তাহলে কী করবে?”
“কিছুই না। মামুলি ব্যাপার। কিন্তু আমি আশ্চর্য
হচ্ছি, এই সামান্য কথায় তুমি এতটা উত্তেজিত হচ্ছ
কেন?”
“উত্তেজিত হব না! এমন কথা শুনলে কার মাথার
ঠিক থাকে? ভাল দামে ভাল মাল বেছবো, ব্যস,
লেনদেন খতম। ‘হাঁস কোথায়?’ ‘কার থেকে হাঁস
কিনেছো?’ ‘ওই হাঁসের কত দাম?’ হাঁস তো নয়, যেন
আর কিছু। সামান্য হাঁস নিয়ে কত কথা!”
হোমস গা-ছাড়া ভাব দেখিয়ে বলল, “কি করে
জানবো বলো যে, আরও পাঁচ জন ওই হাঁসের খোঁজ
করছে। তবে তুমি না বললে, বাজিটা হেরে যাবো।
হাঁস-মুরগির ব্যাপারে আমি নিজেকে একরকম
বিশেষজ্ঞই মনে করি। আর একজনের সঙ্গে বাজি
ধরেছি যে, যে হাঁসটা আজ খেলাম সেটা
পাড়াগেঁয়ে হাঁস।”
হাঁসওয়ালা খুব সংক্ষেপে রাগত গলা বলল, “অ!
তবে আপনি বাজি হেরেছেন। ওটা শহুরে হাঁস।”
“আমার দেখে তা মনে হল না।”
“আমি বলছি তাই।”
“মানি না।”
“ল্যাংটোবেলা থেকে হাঁস বেচছি, মশাই। আপনি
আমাকে হাঁস চেনাচ্ছেন? আমি বলছি, আলফায়
যে হাঁসগুলো বেচেছি, সেগুলো শহুরে হাঁস।”
“তুমি বললেই আমাকে বিশ্বাস করতে হবে?”
“তাহলে বাজি রাখুন।”
“মিছিমিছি অর্থব্যয় করবেন। আমি জানি আমি যা
বলছি তা ঠিক। এক সভারেন [§§] বাজি রইল; শুধু ওই
বাজে তক্কো করার জন্য আপনাকে শিক্ষে
দেওয়ার জন্যে।” তারপর ব্যঙ্গের হাসি হেসে
দোকানদার বলল, “বিল, বইগুলো আমাকে এনে দে
তো রে।”
ছোটো ছেলেটা একটা ছোটো মোটা বই আর
একটা বেশ বড়ো চকচকে মলাটের বই আনল। দুটো
বইই একসঙ্গে ঝুলন্ত বাতির নিচে রাখা হল।
হাঁসওয়ালা বলল, “এই যে হাঁসবিশেষজ্ঞ মশাই।
ভেবেছিলাম আমার সব হাঁস বিক্রি হয়ে গেছে।
কিন্তু না, এখনও একটা আছে। এই ছোটো খাতাটা
দেখুন।”
“দেখলাম। তাতে হলটা কী?”
“এটা হল আমি যাদের থেকে হাঁস কিনি তাদের
নামের তালিকা। দেখেছেন? আচ্ছা, এবার দেখুন,
এই পাতাটা পাড়াগেঁয়ে হাঁসের মালিকদের
তালিকা। নামের পাশে যে নম্বর দেখছেন
সেগুলো বড়ো লেজার বইয়ে তাদের অ্যাকাউন্ট
নম্বর। এবার দেখুন। অন্য পাতায় লাল কালিতে কী
লেখা আছে? এই হল আমার শহরের
সরবরাহকারীদের তালিকা। এবার, তিন নম্বর
নামটা পড়ুন। পড়ুন পড়ুন, আমাকে পড়ে শোনান।”হোমস পড়ল, “মিসেস ওকশট, ১১৭, ব্রিক্সটন রোড–
২৪৯।”
“হ্যাঁ, ঠিক। এবার লেজারের পাতায় যান।”
হোমস নির্দিষ্ট পাতাটি খুলল, “এই যে এখানে,
‘মিসেস ওকশট, ১১৭ ব্রিক্সটন রোড, ডিম ও
পোলট্রি সরবরাহকারী।”
“শেষ লাইনটায় কী লেখা আছে?”
“‘২২শে ডিসেম্বর। সাত শিলিং ছয় পেন্স দরে
২৪টি হাঁস।’”
“ঠিক। এবার, নিচে দেখুন। কী লেখা আছে?”
“‘আলফার মিস্টার উইন্ডিগেটের নিকট ১২ শিলিং
দরে বিক্রীত হইয়াছে।’”
“এবার কী বলবেন?”
শার্লক হোমস মুখখানি ব্যাজার করল। তারপর
পকেট থেকে এক সভারেন বের করে স্ল্যাবের
উপর ছুঁড়ে দিয়ে মহাবিরক্তির ভাব দেখিয়ে
পৃষ্ঠপ্রদর্শন করল। কয়েক ইয়ার্ড দূরে এসে একটা
ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে সে তার
স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় মুখে কোনো শব্দ না করে
হেসে উঠল।
বলল, “এই রকম গোঁফ আর পকেট থেকে গোলাপি
খাতা উঁকি দিচ্ছে দেখলেই বুঝবে, একে বাজি
দিয়েই টোপ গেলাতে পারবে। ওকে একশো
পাউন্ড দিলেও এত কিছু বলত কিনা সন্দেহ। কিন্তু
দ্যাখো, একটা বাজির টোপ ফেলে কত সহজেই ওর
পেট থেকে সব বের করে নেওয়া গেল। যাই হোক,
ওয়াটসন, মনে হচ্ছে আমরা আমাদের অনুসন্ধানের
শেষ পর্বে এসে পৌঁছে গেছি। এখন ভাবতে হবে,
মিসেস ওকশটের কাছে আজ রাতেই যাওয়া উচিত
না কাল যাবো। নিঃসন্দেহে যা বুঝলাম, এই
ব্যাপারটা নিয়ে আমরা ছাড়াও আরও কেউ
উৎসাহিত। আমার উচিত…”
তার কথা চাপা দিয়ে হঠাৎ দূরে একটা উচ্চ
কোলাহল উঠল। যে দোকানটা থেকে এক্ষুনি
বেরিয়ে এলাম সেই দোকানটার থেকেই। পিছন
ফিরে দেখি একটা বেঁটেখাটো ইঁদুরমুখো লোক
ঝুলন্ত আলোর বৃত্তের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, আর ওই
হাঁসওয়ালা ব্রেকিনরিজ রাগতমুখে দোকানের
দরজা ধরে দাঁড়িয়ে ঘুষি বাগিয়ে লোকটাকে কী
সব বলছে।
তার চিৎকার কানে আসছিল, “যথেষ্ট হয়েছে
তোমার আর তোমার হাঁস। চুলোর দোরে যাও গে।
ফের যদি ফালতু বকতে আসো তবে তোমার পিছনে
কুকুর লেলিয়ে দেবো। মিসেস ওকশটকে এখানে
নিয়ে এসো, যা বলার তাঁকেই বলব। তোমার কাছে
কেন জবাবদিহি করব হে? তোমার থেকে হাঁস
কিনেছিলাম নাকি?”
লোকটা কুঁই কুঁই করতে করতে বলল, “না, কিন্তু
ওগুলোর একটা যে আমার ছিল।”
“তাহলে মিসেস ওকশটকে জিজ্ঞাসা করো গে
যাও।”
“উনি আমাকে বললেন তোমাকে জিজ্ঞাসা
করতে।”
“তাহলে প্রুশিয়ার রাজাকে জিজ্ঞাসা করো গে
যাও। যত্তো সব! যথেষ্ট হয়েছে। এবার বেরোও
এখান থেকে।” এই বলে দোকানি রীতিমতো
ঘাড়ধাক্কা দিয়ে লোকটাকে বের করে দিল।
লোকটাও অন্ধকারে মিশে গেল।
হোমস ফিসফিসিয়ে বলল, “মনে হচ্ছে, আর
ব্রিক্সটন রোডে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ওয়াটসন,
আমার সঙ্গে এসো। এই লোকটার পিছু নেওয়া
যাক।” বাজারের লোকজনের ভিড় ঠেকে হোমস
এগিয়ে গেল। খানিকক্ষণের মধ্যে লোকটাকে
ধরেও ফেলল। কাঁধে হাত রাখতেই লোকটা পিছন
ফিরে তাকালো। গ্যাসের আলোয় দেখলাম, ভয়ে
লোকটার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।
সে কাঁপা-কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করল, “কে
আপনারা? কী চান?”
হোমস মৃদুস্বরে বলল, “মাপ করবেন, কিন্তু আপনার
সঙ্গে ওই দোকানির বাক্যালাপ আমার কানে
এসেছে। মনে হচ্ছে, এই ব্যাপারে আপনাকে কিছু
সাহায্য করতে পারি।”
“আপনি? আপনি কে? এই ব্যাপারে আপনি কী
জানেন?”
“আমার নাম শার্লক হোমস। আমার কাজই হল
অন্যেরা যে খবর রাখে না, সেই খবরটি রাখা।”
“কিন্তু আপনি তো এই ব্যাপারে কিছুই জানেন
না।”
“আজ্ঞে না, আমি সবই জানি। ব্রিক্সটন রোডের
মিসেস ওকশট ব্রেকিনরিজ নামে এক দোকানিকে
কয়েকটা হাঁস বেচেছিলেন। সেই হাঁসগুলি
ব্রেকেনরিজ বেচে দেয় আলফার মিস্টার
উইন্ডিগেটের কাছে। উইন্ডিগেট তার ক্লাব সদস্য
মিস্টার হেনরি বেকারকে সেই হাঁস বিক্রি করে।
এই হাঁসটাকেই তো তুমি খুঁজছ?”লোকটা তার দুই হাত আর কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো
বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “মশাই, আপনার মতো
একজনকেই তো খুঁজছিলাম। আপনি ভাবতেও
পারবেন না, এই ব্যাপারটার সঙ্গে আমার
জীবনমরণ সম্পর্ক জড়িয়ে আছে।”
একটা চার-চাকার গাড়ি যাচ্ছিল পাশ দিয়ে।
সেটাকে দাঁড় করিয়ে হোমস বলল, “তাহলে চলুন
কোথাও একটা গিয়ে আরামসে আলোচনা করা
যাক। এই বাজারে বড্ড চিৎকার চ্যাঁচামেচি।
কিন্তু সবার আগে–আপনার নামটা তো জানা হল
না।”
লোকটা খানিক ইতস্তত করে শেষে অন্য দিকে মুখ
করে বলল, “আমার নাম জন রবিনসন।”
হোমস মিষ্টি গলায় বলল, “না না, আপনার আসল
নামটা বলুন। বেনামিদের সঙ্গে কাজ করা বড়ো
অসুবিধাজনক।”
লোকটা সাদা গালদুটো লাল হয়ে এল। সে বলল,
“আচ্ছা, ঠিক আছে। আমার আসল নাম হল জেমস
রাইডার।”
“ভাল! তার মানে আপনিই হোটেল কসমোপলিটনের
প্রধান পরিচারক। দয়া করে এই ক্যাবটিতে [***]
উঠুন। যা জানতে চাইছেন, তার সবই আমার কাছে
শুনবেন।”
লোকটা একবার আমার দিকে একবার হোমসের
দিকে আধা-ভয় আধা-আশা ভরা দৃষ্টি নিয়ে
তাকাল। সে বুঝতে পারছিল না যে, তার কপালে
লাভ না লোকসান লেখা আছে। দোনোমোনো
করতে করতেই সে ক্যাবে উঠল। আধঘণ্টায় আমরা
পৌঁছে গেলাম আমাদের বেকার স্ট্রিটের
বৈঠকখানায়। লোকটা গাড়িতে কিছুই বলল না।
তবে তার ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস আর হাত কচলানি
থেকে বুঝতে পারছিলাম যে, সে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে
আছে।
ঘরে ঢুকে হোমস হাসিমুখে বলল, “হ্যাঁ, এসে গেছি
বাড়ি। বেশ সুন্দর আগুন জ্বলছে। মিস্টার রাইডার,
আপনি দেখি শীতে কাঁপছেন। আসুন, এই বেতের
চেয়ারটায় বসুন। আমি ঘরের জুতোটা পরে আসি।
তারপর আপনার ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করব।
হ্যাঁ, এইবার! আপনি জানতে চাইছিলেন না, ওই
হাঁসগুলোর কী হয়েছে?”
“হ্যাঁ, মশায়।”
“অথবা, আমার যতদূর ধারণা, তার মধ্যে একটি হাঁস
সম্পর্কে জানতে চাইছিলেন। ওই যে হাঁসটার
লেজের দিকে কালো ডোরা দাগ আর বাকিটা
পুরো সাদা, সেইটা।”
রাইডার উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল, “হ্যাঁ, মশায়! বলতে
পারেন ওটা কোথায় গেছে?”
“ওটা এখানে এসেছিল।”
“এখানে?”
“হ্যাঁ, আশ্চর্য সেই হাঁস, বুঝলেন মশাই। সত্যিই
আপনি ওটার প্রতি আগ্রহ না দেখালেই অবাক
হতুম। সেই মরা হাঁস একটা ডিমও পেরেছিল। ছোট্ট
একটা উজ্জ্বল নীল রঙের ডিম। এমন ডিম কখনও
দেখিনি। সেটা আমি আমার মিউজিয়ামে রেখে
দিয়েছি।”
লোকটা পড়ে যাচ্ছিল। কোনো রকমে ডান হাত
দিয়ে ম্যান্টলপিসটা [†††] ধরে সামলে নিল।
হোমস তার স্ট্রংবক্সের ডালা খুলল। তারপর নীল
পদ্মরাগটা বের করে ধরল। জিনিসটা একটা তারার
মতো চকচক করছিল। একটা অদ্ভুত সুন্দর শীতল
বহুকোণী আলো ঠিকরে পড়ছিল ওটা থেকে।
রাইডার শুকনো মুখে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল।
সে বুঝতে পারছিল না, ওটা দাবি করাটা ঠিক
হবে কিনা।
হোমস শান্তভাবে বলল, “তোমার খেলা শেষ,
রাইডার। না না, ধরে দাঁড়াও। নইলে পিছনের
আগুনে পড়ে যাবে। ওয়াটসন, ওকে চেয়ারটায়
বসিয়ে দাও। অপরাধ করতে যেরকম কলজের জোর
লাগে তা ওর নেই। আর এক গ্লাস ব্র্যান্ডি খাইয়ে
দাও। হ্যাঁ! এবার ওকে মানুষের মতো দেখাচ্ছে
বটে। একেবারে ইঁদুরের মতো হয়ে গিয়েছিল!”
সে খানিকক্ষণ টলতে লাগল। যেন পড়ে যাবে।
ব্র্যান্ডি খেয়ে গালের রংটা একটু ফিরল। তারপর
বসে হোমসের দিকে সন্ত্রস্ত চোখে তাকিয়ে
রইল।
“আমার কাছে প্রায় সব তথ্য আর প্রমাণই আছে।
তাই তোমাকে বেশি কিছু বলতে হবে না। শুধু
কয়েকটা কথা জানলেই আমার সব জানা পূর্ণ হবে।
রাইডার, তুমি কী এই নীল পাথরটার কথা কাউন্টেস
অফ মোরকারের কাছ থেকে শুনেছিলে?”
লোকটা কাঁপা-কাঁপা গলায় বলল, “ক্যাথরিন
কসাক আমাকে ওটার কথা বলে।”
“ও! মাননীয়া কাউন্টেসের খাস-পরিচারিকা। আর
শুনেই হঠাৎ-বড়োলোক হবার স্বপ্নে বিভোর হয়ে
গেলে। যাক, এমন লোভ অনেক ভাল মানুষও
সামলাতে পারে না, তুমি তো কোন ছার। তবে,
রাইডার, তুমিও ভালমানুষ নও। যাকে বলে একখানি
ছিঁচকে চোর। তুমি জানতে, হরনার নামে ওই কলের
মিস্ত্রিটার নামে আগেও একটা কেলেঙ্কারি
আছে। আই তার দিকেই সবার সন্দেহ টানতে কষ্ট
হবে না। তারপর কী করলে? তুমি আর তোমার এই
সহচরীটি মিলে কাউন্টেসের ঘরে গ্যাঁড়াকল করে
রাখলে যাতে লোকটাকে ডাকতে হয়। তারপর সে
চলে গেলে, তুমি গয়নার বাক্স থেকে গয়নাটা
সরালে। তারপর অ্যালার্ম বেল বাজালে আর ওই
বেচারাকে গ্রেফতার হতে হল। তারপর তুমি…”
হঠাৎ রাইডার চেয়ার ছেড়ে মেঝেতে নেমে
গেল। তারপর হোমসের পা জড়িয়ে ধরল, কাঁদো
কাঁদো গলায় বলে উঠল, “ভগবানের দোহাই, দয়া
করুন! আমার বাবা-মার কথা ভাবুন। ওঁরা জানতে
পারলে একেবারে ভেঙে পড়বে। আমি আগে
কখনও এমন কাজ করিনি। কোনোদিন করব না।
প্রতিজ্ঞা করছি। বাইবেলের দিব্যি। দয়া করে
আমাকে আদালতে নিয়ে যাবেন না। খ্রিস্টের
দোহাই, নিয়ে যাবেন না।”হোমস কড়া ভাষায় বলল, “চেয়ারে গিয়ে বোসো।
খুব তো নাকে কাঁদছ এখন। ওই বেচারি নির্দোষ
করনারকে ফাঁসাবার আগে মনে ছিল না এসব
কথা!”
“আমি পালিয়ে যাবো, মিস্টার হোমস। এই দেশ
ছেড়েই পালিয়ে যাবো মশাই। তাহলে ওর বিরুদ্ধে
মামলাটা আর টিকবে না।”
“আচ্ছা! সেকথা পরে ভাবব। আগে বলো দেখি,
তারপর ঠিক কী কী করলে। পাথরটা হাঁসের পেটে
গেল কী করে? আর সেই হাঁসই বা খোলা বাজারে
এলো কী করে? যদি বাঁচতে চাও তো সব খুলে
বলো।”
রাইডার একবার জিভ দিয়ে তার শুকনো ঠোঁটদুটো
চেটে নিল। তারপর বলল, “যেমন যা ঘটেছে সবই
বলছি, মশাই। হরনার গ্রেফতার হওয়ার পর মনে হল,
পাথরটা নিজের কাছে রাখা আর নিরাপদ হবে
না। যে কোনো মুহুর্তে পুলিশ আমার ঘরে
খানাতল্লাশি করতে পারে। হোটেলেও এমন
কোনো নিরাপদ জায়গা নেই যেখানে ওটা রাখা
যেতে পারে। তাই আমার বোনের বাড়ি চলে
গেলাম। আমার বোন ওকশট নামে একজনকে বিয়ে
করে ব্রিক্সটন রোডে থাকে। সেখানেই সে
বাজারে বিক্রির জন্য হাঁস পালন করে। মনে
হচ্ছিল, সারা রাস্তায় পুলিশ আর গোয়েন্দারা
আমার পিছু নিয়েছে। ওই শীতের রাতেও ব্রিক্সটন
রোডে যেতে ঘেমেনেয়ে গেলাম। বোন
জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে, আমাকে এত
ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে কেন। আমি শুধু বললাম,
হোটেলে একটা দামি রত্ন চুরি গেছে। তাই মন
খারাপ। তারপর বাড়ির পিছনের উঠোনে গিয়ে কী
করা যায় ভাবতে লাগলাম।”
“মডসলি নামে আমার এক বন্ধু আছে। স্বভাব ভাল
না। পেন্টনভিলে জেল খেটে সদ্য ছাড়া
পেয়েছিল। তার সঙ্গে একদিন দেখা হল। সে
আমাকে চোরেদের কাজকারবারের কথা বলল।
চোরাই মাল কিভাবে কোথায় বেচা যায়, সেও
বলল। লোকটার কিছু গোপন কথা আমি জানি, তাই
জানতাম ও আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে
না। ও থাকে কিলবার্নে। সেখানেও যাওয়া স্থির
করলাম। ওই ভাল দামে মাল বিক্রির ব্যবস্থা করে
দিত। কিন্তু নিরাপদে ওর কাছে যাবো কি করে?
অনেক কষ্টে হোটেল থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম।
যেকোনো মুহুর্তে আমার দেহতল্লাশ করলেই তো
আমার ওয়েস্টকোটের পকেট থেকে পাথরটা
বেরিয়ে পড়বে। দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে
আছি। এমন সময় দেখলাম, আমার পায়ের কাছে
হাঁসগুলো ঘুরছে। হঠাৎ মাথায় একটা মতলব খেলে
গেল। ভাবলাম, এটাকে কাজে লাগিয়ে দুনিয়ার
সেরা গোয়েন্দাকেও বোকা বানিয়ে ছাড়ব।
“কয়েক সপ্তাহ আগে আমার বোন আমাকে
বলেছিল যে আমি বড়োদিনের উপহার হিসেবে
একখানা হাঁস নিতে পারি। আমার বোন কথার
খেলাপ করে না। ভাবলাম, এই মওকায় একখানা
হাঁস বেছে নিই, সেটাই আমার সঙ্গে কিলবার্নে
পাথরটা বয়ে নিয়ে যাবে। উঠোনে একটা ছোটো
ছাউনি মতন ছিল। আমি তার পিছনে একখানা
হাঁসকে তাড়িয়ে নিয়ে গেলাম। বেশ বড়োসড়ো
একটা হাঁস। সাদা। কালো দাগওয়ালা লেজ।
ধরলাম হাঁসটাকে। ওটার মুখ হাঁ করে যতখানি আঙুল
যায় ঢুকিয়ে পাথরটা পুরে দিলাম। হাঁসটা পাথরটা
গিলে নিল। কিন্তু হাঁসটা খুব ডানা ঝাপটাতে
লাগল। আমার বোন ব্যাপারটা কি দেখার জন্য
বেরিয়ে এল। আমি যখন তার সঙ্গে কথা বলার জন্য
পিছন ফিরেছি ওমনি হাঁসটা আমার হাত ছাড়িয়ে
দৌড়ে দলের সঙ্গে মিশে গেল।
“আমার বোন জিজ্ঞেস করল, ‘হাঁসটা নিয়ে কী
করছিস্, দাদা?’
“আমি বললাম, ‘কিছু না। তুই বলেছিলি বড়োদিনে
আমাকে একখানা হাঁস দিবি। আমি দেখছিলাম,
কোনটা সবচেয়ে মোটা।’
“বোন বলল, ‘ও, ওই যে তোর জন্য আলাদা করে
রেখেছি। আমরা ওটাকে বলি ‘দাদার হাঁস’। ওই যে
বড়ো সাদা হাঁসটা। মোট ছাব্বিশটা আছে। একটা
তোর, একটা আমাদের, বাকি দু-ডজন বাজারে
যাবে।’
“আমি বললাম, ‘ধন্যবাদ, ম্যাগি। তবে তোর কাছে
সবগুলোই একরকম হয় তো আমি যেটা ধরেছিলাম,
সেটাই নিই।’
“বোন বলল, ‘কিন্তু অন্যটার ওজন অন্তত তিন পাউন্ড
বেশি। তোর জন্যই ওটাকে খাইয়ে দাইয়ে মোটা
করেছি।’
“আমি বললাম, ‘আমার ওটাই বেশি পছন্দ। ওটাই
নেবো। এখনই নিয়ে যাই?’
“আমার বোন একটু অসন্তুষ্ট হল। কিন্তু মুখে বলল,
“আচ্ছা, তুই যা ভাল বুঝিস্! কোনটা নিবি?
“‘ওই যে কালো ডোরা লেজওয়ালা সাদা হাঁসটা।
পালের মধ্যে ঘুরছে।’
“‘ঠিক আছে, মেরে নিয়ে যা।’
“তারপর, মিস্টার হোমস, আমার বোন যেমনটা বলল,
তেমনটাই করলাম। একটা হাঁস নিয়ে গেলাম
কিলবার্নে। আমার বন্ধুকে আমার ফন্দির কথা
বললাম। ওই লোকটাকেই একমাত্র সব কথা খুলে
বলা যেত। আমরা খুব হাসলাম। তারপর একটা ছুরি
নিয়ে হাঁসটা কাটলাম। কিন্তু পাথরটা সেখানে
ছিল না। আমার তো মাথায় বজ্রাঘাত। নিশ্চয়
কোনো ভুল হয়েছে। হাঁসটা ফেলে বোনের বাড়ি
ছুটে এলাম। পিছনের উঠোনে গেলাম। কিন্তু
সেখানে একটা হাঁসও ছিল না।
“বোনকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হাঁসগুলো কোথায়
গেল, ম্যাগি?’
“‘দোকানে গেছে, দাদা।’
“‘কোন দোকানে?’
“‘কভেন্ট গার্ডেনের ব্রেকিনরিজের দোকানে।’
“আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আচ্ছা আমি যে
হাঁসটা নিয়েছি, ওই রকম দেখতে আরও একটা হাঁস
আছে কী?’
“‘হ্যাঁ, দাদা। ওই রকম লেজওয়ালা দুটো হাঁস আছে।
একই রকম দেখতে। আমি দুটোকে আলাদা করে
চিনতে পারতাম না।’
“তখনই ব্যাপারটা জলের মতো স্পষ্ট হয়ে গেল।
দৌড়ে গেলাম ওই ব্রেকিনরিজ লোকটার কাছে।
কিন্তু ততক্ষণে সে সব হাঁস বেচে দিয়েছে।
আমাকে বললও না, কার কাছে বেচেছে।
আপনারা তার কথাই শুনেছেন আজ রাতে। সবসময়
ওইরকমভাবেই আমার সঙ্গে কথা বলেছে ও। আমার
বোন ভাবছে, আমি বোধহয় পাগল হয়ে গেছি।
আমার নিজেরই মনে হচ্ছে, আমি পাগল হয়ে
গেছি। আর এখন… এখন আমি দাগি চোর! যেটা চুরি
করে চোর হলাম, সেটাই হারালাম। ভগবান
আমাকে রক্ষা করুন! ভগবান আমাকে রক্ষা করুন।’
লোকটা দুই হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলল।
অনেকক্ষণ কারো মুখে কোনো কথা ফুটল না। শুধু
দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। আর টেবিলের কানায় হোমসের
আঙুল চালানোর টিপ টিপ শব্দ। তারপর হোমস উঠে
দরজাটা খুলল।
বলল, “বেরিয়ে যাও!”
“অ্যাঁ, মশায়? ও! ঈশ্বর আপনার ভাল করুন!”
“একটাও কথা নয়। বেরিয়ে যাও!”
কোনো কথার দরকারও পড়ল না। লোকটা ছুটে
বেরিয়ে গেল। দুড়দাড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে
দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে রাস্তায় গিয়ে পড়ল।
তারপর শুনলাম রাস্তা দিয়ে তার ছুটে পালানোর
পায়ের শব্দ।
পাইপটা টেনে নিয়ে হোমস বলল, “কথা হল,
ওয়াটসন, পুলিশ আমাকে তাদের খামতি ধরিয়ে
দেওয়ার জন্য রাখেনি। হরনারের বিপদ থাকলে সে
ব্যাপার আলাদা। তবে এই লোকটা তার বিরুদ্ধে
সাক্ষ্য দেবে না। মামলাটাও আর টিকবে না।
আমি যেটা করলাম, সেটা বেআইনি। কিন্তু এতে
একটা লোককে বাঁচানো গেল। লোকটা আর
চুরিচামারি করবে না। সাংঘাতিক ভয় পেয়েছে।
এই লোকটাকে জেলে পাঠালে এ শেষটায় দাগি
অপরাধীতে পরিণত হত। তাছাড়া এই উৎসব ক্ষমার
উৎসব। কাকতালীয়ভাবে আমাদের দরজায় একটা
রহস্য এসে পড়েছিল। সেটার সমাধান করতে
পারাটাই আমার পুরস্কার। খাবার ঘণ্টাটা বাজাও,
ডাক্তার, এবার অন্য একটা রহস্যের সমাধান করি।
অবশ্য সেটাও এক পক্ষীরহস্য।”
–
রচনা-পরিচিতি
অনূদিত নাম: নীল পদ্মরাগ
মূল নাম: ‘দি অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য ব্লু
কারবাঙ্কল’
মূল রচনা: স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
অনুবাদ: অর্ণব দত্ত
অলংকরণ: সিডনি পেজেট
‘দি অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য ব্লু কারবাঙ্কল’
ব্রিটিশ লেখক স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের
শার্লক হোমস গল্প-সংকলন দি অ্যাডভেঞ্চার অফ
শার্লক হোমস-এর বারোটি গল্পের মধ্যে সপ্তম
গল্প। এটি ১৮৯২ সালের জানুয়ারি সংখ্যায় প্রথম
প্রকাশিত হয় স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিন-এ।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now
X
ঘাটের তিনদিক ঘিরে লোকজনদের বসিয়ে দিয়ে আহমদ মুসা ইসহাক আবদুল্লাহ, নোয়ানকো ও কলিন কামালকে সাথে নিয়ে উঠে এল সেই টিলায়।
আহমদ মুসার ব্যবস্থা অনুসারে ঘাটের পূর্ব দিকে থাকবে নোয়ানকো, মধ্য অঞ্চলে থাকবে কলিন কামাল এবং পশ্চিম ঘাট থেকে আসা যাওয়ার পথ অঞ্চলে থাকবে ইসহাক আবদুল্লাহ।
সম্ভাব্য ঘটনাবলী তাদের সামনে তুলে ধরে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছে সবাইকে আহমদ মুসা।
ইসহাক আবদুল্লাহ, নোয়ানকো ও কামাল প্রত্যেকের সাথে থাকবে ১০জন লোক। সকলেই তারা ষ্টেনগান সজ্জিত।
টিলার মাথায় সবে বসেছে আহমদ মুসা এবং ওরা দু’জন। এ সময় ঘাট থেকে কিছু দূরে অন্ধকার সাগর বক্ষে হঠাৎ জ্বলে উঠল সার্চ লাইটের আলো।
আহমদ মুসাদের তিনজনের চোখই আঠার মত লেগে গেল দৃশ্যটির প্রতি।
সার্চ লাইটের আলো উত্তরমুখী অর্থাৎ ঘাটের দিকে নয়।
আহমদ মুসা বুঝল এটা ক্যামোফ্লেজ। তারা বুঝতে দিতে চায়না যে আলোটা ঘাটে আসছে।
আলোটা তিনবার নিভল, তিনবার জ্বলল। আহমদ মুসার বুঝতে বাকি রইল না যে ওরা সিগন্যাল দিচ্ছে, এবার ওরা সিগন্যাল আশা করছে।
আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি নীল কাগজ নিয়ে টর্চের মাথা মুড়ে নিল।
ইসহাক আবদুল্লাহ বলে উঠল, ‘ভাইয়া, লাল সংকেত দিয়ে ওদের বিদায় দেয়া যায় না?’
আহমদ মুসা ইসহাক আবদুল্লাহর দিকে তাকাল। হাসল। বলল, ‘তোমার কি ভয় করছে?’
‘ভয় নয়। ওদের বোকা বানিয়ে বিদায় করা।’ বলল ইসহাক আবদুল্লাহ।
‘বোকা বানিয়ে বিদায় করলে চালাক হয়ে আবার ফিরে আসবে। সেই ফিরে আসাটা আমাদের জন্যে আরও মারাত্মক হতে পারে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ঠিক কথা।’ বলল ইসহাক আবদুল্লাহ।
আহমদ মুসা টর্চ জ্বালিয়ে তিনবার নীল আলোর সংকেত দিল।
আহমদ মুসা নীল সংকেত দেয়ার পর মুহূর্তেই একটা হেড লাইট জ্বলে উঠল। হেড লাইট এগিয়ে আসতে লাগল ঘাটের দিকে।
দশ মিনিটের মধ্যেই হেড লাইটটি ঘাটে এসে পৌছল। তার পাশে জ্বলে উঠল আরও চারটি হেড লাইট।
আহমদ মুসা বুঝল, পাঁচটি বোট এসে নোঙর করেছে ঘাটে।
পাঁচটি হেড লাইটের আলোতে গোটা ঘাট আলোকিত হয়ে উঠেছে। পরে এক সাথেই পাঁচটি হেড লাইট নিভে গেল।
প্রথমে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঢেকে গেল ঘাট। পরে অন্ধকার ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে গেল। চাঁদ না থাকলেও কুয়াশা ও মেঘহীন আকাশের তারার আলো গাছ-গাছড়ার ছায়াহীন ঘাটকে বেশ স্বচ্ছ করে তুলেছে। বোটে মানুষের চলাফেরা বেশ দেখা যাচ্ছে।
আহমদ মুসার চোখে ইনফ্রারেড গগলস। বেশ ক’মিনিট গেল। কোন বোট থেকেই কাউকে নামতে দেখলো না আহমদ মুসা।
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে হলো সংকেতের পর আছে ব্রিফিং। এর অর্থ কি তাহলে এই যে, ওরা ঘাটে আসার পর এদিকের অবস্থা সম্পর্কে ব্রিফিং নেবার পর তারা অভিযান শুরু করবে! তাহলে তাকে তো ঘাটে যেতে হবে।
ঠিক এই সময়েই ঘাট থেকে হ্যান্ড মাইকের অনুচ্চ শব্দ ভেসে এল। বলা হলো, ‘মিঃ ওবোটে মাইকেল, আপনি তাড়াতাড়ি আসুন। আমরা দেরী করতে চাই না।’
আহ্বান শোনার সাথে সাথে আহমদ মুসা বলল, ‘বুঝা গেছে, অভিযান শুরুর আগে ওরা ব্রিফিং এর অপেক্ষায় আছে। সুতরাং আমাকে ওখানে যেতে হবে।’
‘আপনি তো ওবোটে মাইকেল নন, আপনি যাবেন কি করে? বলল কলিন কামাল।
‘আমি তো ওবোটে মাইকেল এর জায়গায় অভিনয় করছি।’
‘সেটা তো অভিনয়। আপনি গেলেই ধরা পড়ে যাবেন।’ বলল নোয়ানকো।
‘কিন্তু সম্ভবত ওরা ওবোটে মাইকেলের ব্রিফিং না পেলে অভিযানেই নামবে না।’
‘তাতে আমাদের তো ক্ষতি নেই।’ বলল ইসহাক আবদুল্লাহ।
‘অভিযানে নামবে না অর্থ অভিযান করবে না, সেটা নয়। তারা আরও কোন একটা বিপজ্জনক পথ বেছে নিয়ে এগুতে পারে। সুযোগ তাদের না দিয়ে আমরা চাই আমাদের পরিকল্পনার আওতার মধ্যে এনে শত্রুদের বিনাশ করতে। ওদের চলে যাবার সুযোগ দিতে চাই না।’
‘সেটা অন্যভাবে হয় না? আমরা এখন ওদের আক্রমণ করতে পারি না?’ বলল ইসহাক আবদুল্লাহ।
‘আক্রমণের আগে ওদের সবাইকে পাঁচটি বোট থেকে মাটিতে নামাতে হবে। বোটে থাকলে বেশির ভাগ পালিয়ে যাবার সুযোগ পাবে। এ সুযোগ আমরা কাউকেই দিতে চাই না।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আপনি গেলেই কি ওরা নামবে? আপনাকে চিনে ফেললে তো উল্টো ঘটবে।’
‘তা ঘটতে পারে। ঝুঁকি না নিয়ে উপায় নেই। আমার ধারণা, আমাকে যেতে দেখলেই ওরা ওদের বাহিনীকে ঘাটে নামাবে এবং অভিযানের প্রস্তুতি নেবে। ব্রিফিং পাওয়ার পর কিভাবে কোনদিকে যাত্রা শুরু করবে তা ঠিক করবে।’
‘বুঝলাম, কিন্তু আপনি ওখানে গেলেই তো ধরা পড়বেন।’ বলল নোয়ানকো উদ্বিগ্ন কণ্ঠে।
‘ধরা পড়ার ঝুঁকি অবশ্যই আছে। কিন্তু এমনও হতে পারে, আমি ব্রিফিং-এর জন্যে ওদের বোটে উঠার পর শত্রুদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার সুযোগ আমাদের হবে।’
‘কিভাবে?’ বলল ইসহাক আবদুল্লাহ।
নোয়ানকো থাকছে পূর্ব দিকে। কলিন কামাল থাকছে মধ্য অঞ্চলে অর্থাৎ উত্তরে, ইসহাক আবদুল্লাহ থাকছে পশ্চিমে এবং দক্ষিণে।’
আহমদ মুসা থামতেই নোয়ানকো কিছু বলতে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা তাকে বাধা দিয়ে বলল, ‘আর কোন কথা নয়। দেরী হয়ে যাচ্ছে। আমি উঠলাম।’
বলে আহমদ মুসা মাটিতে তোয়ালের উপর পড়ে থাকা হ্যাটটা তুলে মাথায় নিয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, তোমরা যে যার জায়গায় চলে যাও। ঘাট থেকে যখন গুলী বর্ষণের শব্দ পাবে, তখন পরিকল্পনা অনুসারে তোমরা আক্রমণ শুরু করবে। আর আমি ঘাটে পৌছার পাঁচ থেকে দশ মিনিটের মধ্যে যদি ওদিক থেকে গুলীর শব্দ না পাও, তাহলে তোমরাই পরিকল্পনা অনুসারে আক্রমণ শুরু করবে এবং নিজেদের বুদ্ধিবিবেক অনুসারে কাজ করবে।’
‘ওদিক থেকে গুলীর শব্দ না পাবার অর্থ?’ শুকনো কণ্ঠে প্রশ্ন করল ইসহাক আবদুল্লাহ।
‘আমি যদি বন্দী হয়ে যাই বিনা যুদ্ধে তাহলে গুলীর শব্দ পাবে কি করে/’
বলেই আহমদ মুসা ওদের আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সকলকে সালাম জানিয়ে টিলা থেকে ঘাটের উদ্দেশ্যে নামতে শুরু করল।
আর ইসহাক আবদুল্লাহ, কলিন কামাল ও নোয়ানকো হতবুদ্ধি হবার মত নির্বাক হয়ে আহমদ মুসার গমন পথের দিকে চেয়ে রইল।
এক সময় ঠোঁট ফেড়ে কথা বেরুল ইসহাক আবদুল্লাহ। বলল, ‘একজন মানুষ কত বড় হলে এভাবে পরার্থে নিজেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে।’ আবেগে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল ইসহাক আবদুল্লাহর।
‘না উনি মানুষ নন ইসহাক ভাই, আল্লাহ নিশ্চয় আমাদের সাহায্যের জন্যে ফেরেশতা পাঠিয়েছেন।’ কথা বলতে বলতে চোখ মুছল নোয়ানকো।
কলিন কামাল কিছু বলতে যাচ্ছিল। ইসহাক আবদুল্লাহ বাধা দিয়ে বলল, ভাইয়েরা, আর কোন কথা নয়। চলুন আমরা তাঁর আদেশ পালন করি। যে যার নির্দিষ্ট জায়গায় চলে যাই। আর যাবার আগে এসো আমাদের তিনজনের ৬ হাত একত্র করে আল্লাহর নামে শপথ করি, আমাদের ভাই আহমদ আবদুল্লাহ যেমন মৃত্যুর মুখে ঝাঁপিয়ে পড়তে গিয়ে পেছনে ফিরে তাকাননি, তেমনি আমরা আমাদের একজন বেঁচে থাকা পর্যন্ত লড়াই করে যাব, পরাজয় নিয়ে কেউ ঘরে ফিরবো না।
তারা ছয় হাত একত্র করে শপথ গ্রহণ করল।
তাদের তিনজনের চোখ থেকেই অশ্রু গড়াচ্ছিল। তাদের চোখে মুখে অপার্থিক এক আলো। নতুন মানুষ যেন তারা।
‘ঐ যে ওবোটে মাইকেল আসছে।’ উচ্ছসিত কণ্ঠে বলল জন ব্ল্যাংক।
জন ব্ল্যাংক তার কমান্ড বোটের ডেক কেবিনে বসে উন্মুক্ত দরজা দিয়ে তাকিয়েছিল ঘাট থেকে যে পথটা চলে গেছে দ্বীপের অভ্যন্তরে সে পথের দিকে।
পাঁচ বোটের শতাধিকে লোক নিয়ে যে অপারেশন টিম সাউথ টার্কো দ্বীপে অভিযানে এসেছে জন ব্ল্যাংক তার অধিনায়ক।
জন ব্ল্যাংকের পাশেই আরেকটা চেয়ারে বসেছিল জিম টেইলর।
জন ব্ল্যাংকের কথা শেষ হতেই জিম টেইলর বলল, ‘কি দেখে বুঝলেন ওবোটে মাইকেল আসছে, ঐ নীল টর্চের আলো?’
‘হ্যাঁ তাই। ঐ নীল টর্চই আমাদের কূলে আসার সবুজ সংকেত দিয়েছে।’
‘পাশের বোট থেকে রবার্ট ফুটকে ডাকলে ভালো হয় না। ওবোটে মাইকেলদেরকে তো তার মাধ্যমেই এই এ্যাসাইনমেন্ট দেয়া হয়েছিল।’ বলল জিম টেইলর।
‘হ্যাঁ তাকে ডাক। সেও তো এই টার্কস দ্বীপপুঞ্জের লোক। ব্রিফিং-এর সাথে সাথে আলোচনাও সেরে নেয়া যাবে।’
জিম টেইলর চেয়ার থেকে উঠে ডেক কেবিন থেকে ডেকে বেরিয়ে গেল।
কমান্ড বোটের গায়ের সাথে গা লাগিয়ে দু’পাশে দু’টি করে চারটি বোট নোঙর করা।
পাশের প্রথম বোটেই ছিল রবার্ট ফুট।
দু’মিনিটের মধ্যেই জিম টেইলর রবার্ট ফুটকে ডেকে নিয়ে কেবিনে প্রবেশ করল।
তারা কেবিনে ঢুকতেই জন ব্ল্যাংক জিমকে লক্ষ্য করে বলল, ‘জিম তুমি আমাদের সকল বোটের সবাইকে নির্দেশ দাও আর্মস-এ্যমুনিশন নিয়ে এখনি ঘাটে নামতে। ওবোটে মাইকেলের সাথে কথা বলার পর আমরা আর এক মিনিটও অপেক্ষা করবো না। যাও, কুইক।’
জিম ডেকে বেরিয়ে দেখল, ওবোটে মাইকেল তখনও ঘাট থেকে বেশ খানিকটা দূরে।
সে বোটগুলোর ক্যাপ্টেনদের ডেকে নির্দেশ জারি করল, ‘এখনি তোমরা তোমাদের লোক ও সকল আর্মস-এ্যামুনিশনসহ ঘাটে নেমে যাও এবং ফরমেশন নিয়ে দাঁড়াও।’
হুকুম জারির দু’মিনিটের মধ্যে পাঁচটি বোটের শতাধিক লোক অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে ঘাটে নেমে ফরমেশন নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
জেটির পরেই ইট-পাথর বিছানো একটা ছোট্ট চত্বর। জেলেরা বোট থেকে মাছ ও মালপত্র নামিয়ে প্রথমে এখানেই জমা করে, অনেক সময় ভাগ-বাটোয়ারা করে। গাড়িও এসে এখানেই দাঁড়ায়। এই চত্বর থেকেই একটা রাস্ত বেরিয়ে গেছে দ্বীপের অভ্যন্তরে।
এই চত্বরের উপরে ঘাসে ঢাকা অনেকখানি ফাঁকা জায়গা। বোট থেকে নেমে সবাই সেই ফাঁকা জায়গাতেই শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছে।
এই ফাঁকা জায়গার পর আগাছা ও ছোট ছোট গাছ-গাছালীতে পূর্ণ এবড়ো-থেবড়ো এলাকা শুরু হয়েছে।
নির্দেশ দিয়ে এসে জিম টেইলর জন ব্ল্যাংকের পাশে এসে বসল। জন ব্ল্যাংকের অন্যপাশে বসেছে রবার্ট ফুট।
‘ওবোটে মাইকেল এসেছে।’ বাইরের দিকে তাকিয়ে বলল জন ব্ল্যাংক।
কথা শেষ করেই আবার বলল, ‘জিম যাও তাকে এই কেবিনে নিয়ে এস।’
জিম কেবিন থেকে বেরিয়ে কেবিনের দরজায় একপাশে দাঁড়িয়ে জন ব্ল্যাংকের পারসোনাল গার্ড জনকে ঘাটের দিকে এগিয়ে ওবোটে মাইকেলকে দেখিয়ে বলল, ‘ওঁকে এই বোটে নিয়ে এস।’
গার্ড বোট থেকে নেমে কিছুটা এগিয়ে ওবোটে মাইকেলের মুখোমুখি হয়ে বলল, ‘মিঃ ওবোটে আসুন। মিঃ জন ব্ল্যাংক ঐ বোটে আছেন।’
মিঃ ওবোটের মাথার হ্যাটটা তার কপাল পর্যন্ত নেমে এসেছে। ফলে মুখের অবয়বটা স্পষ্ট নয়।
‘সিওর।’ মাত্র এই শব্দটা উচ্চারণ করে ওবোটে বোটের দিকে যাত্রা শুরু করল। পেছনে গার্ড।
বোটের ডেকে দাঁড়িয়ে ছিল জিম টেইলর।
ওবোটে বোটে উঠল। গার্ড বোটের নিচে জেটিতেই দাঁড়িয়ে থাকল। ডেক থেকে ওবোটেকে ভেতরে নিয়ে যাবার দায়িত্ব জিম টেইলরের।
জিম টেইলর ওবোটের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘ওয়েলকাম মিঃ ওবোটে। চলুন, মিঃ ব্ল্যাংক আপনার অপেক্ষা করছেন।
‘ধন্যবাদ।’ বলে ওবোটে কেবিনের দিকে পা বাড়াবার আগে পেছন ফিরে চারদিকটা একবার দেখল। দেখল সে বোটের গলুই-এর কাছে জেটিতে দাঁড়ানো গার্ডকেও।
ওবোটে কেবিনে প্রবেশ করল।
জিম টেইলর আগেই প্রবেশ করেছিল। সে গিয়ে বসেছিল তার চেয়ারে।
ওবোটে বেশধারী আহমদ মুসা কেবিনে প্রবেশ করে কপাল পর্যন্ত নেমে যাওয়া হ্যাট কপালের উপরে তুলে দিল।
জন ব্ল্যাংক, জিম টেইলর এবং রবার্ট ফুট আহমদ মুসার মুখের দিকে তাকিয়ে ভুত দেখার মত চমকে উঠেছিল। একজন কৃষ্ণাংগ টার্কসবাসীর বদলে দেখছে একজন কালার্ড এশিয়ানকে!
তারা তাদের বিমূঢ় ভাব কাটিয়ে উঠার আগেই আহমদ মুসা কাঁধের ষ্টেনগান হাতে নিয়ে তাদের দিকে তাক করে বলল, ‘হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন আমি আপনাদের ওবোটে নই।’
বলেই ষ্টেনগানের ট্রিগারে হাত চেপে ওদের দিকে চেয়ে কঠোর কণ্ঠে বলল, ‘তোমাদের আজকের খেলাটা শেষ। বেঘোরে জীবন দিতে না চাইলে তোমরা অস্ত্র ফেলে দাও, তোমাদের লোকদের অস্ত্র ফেলে দিতে বল এবং আত্মসমর্পণ.......।’
আহমদ মুসার কথা শেষ হতে পারল না। একটা আঘাত এসে পড়ল মাথায়।
আহমদ মুসা টের পায়নি যে, গার্ড জনকে সে বোটের নিচে গলূই-এর কাছৈ দেখে এসেছিল, আহমদ মুসা ও জিম টেইলর কেবিনে ঢোকার পর সে বোটে উঠে এসে কেবিনের দরজার পাশেই দাঁড়িয়েছিল। কেবিনের দরজা বন্ধ না থাকায় আহমদ মুসার সব কথাই সে শুনতে পেয়েছিল। সে বিপদটা আঁচ করতে পেরে বিড়ালের মত নিঃশব্দে আহমদ মুসার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল এবং ষ্টেনগানের বাঁট দিয়ে আঘাত করেছিল আহমদ মুসার মাথায়।
ষ্টেনগানের বাঁটের বাড়িটা আহমদ মুসার ঠিকই লাগল। তবে কেবিনের ছাদটা নিচু হওয়ায় ষ্টেনগানের বাঁট ছাদে একটা বাড়ি খেয়ে তারপর আহমদ মুসার মাথায় গিয়ে আঘাত করে।
সুতরাং আঘাতটা যতটা ভয়াবহ হবার কথা তা হলো না। কিন্তু দেখা গেল আহমদ মুসা মাথায় আঘাত খাওয়ার সংগে সংগেই টলে উঠে একটা পাক খেয়ে কাত হয়ে পড়ে গেল কেবিনের মেঝেয়। ডান হাত থেকে তার ষ্টেনগান খসে পড়েছিল।
ওরা তিনজনই চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিল।
‘ধন্যবাদ জন, তুমি ঠিক সময়ে এসে পড়েছিলে।’ বলল জন ব্ল্যাংক।
একটু থেকে ক্রুদ্ধ চোখে আহমদ মুসার দিকে চেয়ে সে বলল, ‘এই তাহলে সেই শয়তান এশিয়ান যার কথা তোমরা এত বলেছ। তাই না রবার্ট ফুট।’
রবার্ট ফুট কথা বলতে যাচ্ছিল। সে কথা বলার আগেই জন ব্ল্যাংক আবার বলল, ‘জন তাড়াতাড়ি ওকে সার্চ কর। জ্ঞান ফেরার আগেই ওকে বেঁধে ফেল। ওর জ্ঞান ফেরা পর্যন্ত অভিযান শুরু করা যাচ্ছে না। তার কাছ থেকে কথা বের করতে হবে তারা কি জেনেছে, কতটা জেনেছে।’
আহমদ মুসার দেহটা পড়েছিল বোটের আড়াআড়ি এবং জনের বিপরীত দিকে অর্থাৎ জন ব্ল্যাংকের দিকে কাত হয়ে।
নির্দেশ পেয়ে জন ব্ল্যাংক আহমদ মুসার পেছন দিকটা ঘুরে আহমদ মুসার সামনের দিকে এগিয়ে সবে কোমর বরাবর পৌছেছে।
চোখের পলকে এই সময় আহমদ মুসার দু’টি পা বিদ্যুত বেগে উঠে এসে জনের গলা সাঁড়াশির মত চেপে ধরৈ তাকে আছড়ে ফেলল কেবিনের মেঝেতে। সেই সাথে কোটের পকেটের উপর পড়ে থাকা আহমদ মুসার বাম হাত পকেট থেকে রিভলবার বের করে তিনজনকে লক্ষ্য করে তিনটি গুলী ছুঁড়ল পর পর।
ওরা তিনজন কিছু বুঝে উঠার আগেই গুলী খেয়ে ঢলে পড়ে গেল মেঝের উপর।
ওদিকে জন আহমদ মুসার দু’পায়ের সাঁড়াশিতে বন্দী হয়ে মেঝেতে আছড়ে পড়েও তার ডান হাত দিয়ে যখন সঁড়াশির চাপ ঢিলা করার চেষ্টা করছে, বাম হাত দিয়ে তখন সে বেল্টে গুজে রাখা রিভলবার বের করে আহমদ মুসার বুক অথবা মাথা তাক করার চেষ্টা করছে।
তিনজনকে গুলী করেই আহমদ মুসা মনোযোগ দিয়েছিল জনের দিকে। সে দেখতে পেল জনের কসরত। আহমদ মুসা সময় নষ্ট করল না। চতুর্থ গুলী করল জনকে লক্ষ্য করে।
জন একেবারে বুকে গুলী বিদ্ধ হলো।
আহমদ মুসা উঠে বসল। ভাবছিল সে, নিশ্চয় ওদের লোকেরা বোটের কেবিনে গুলীর শব্দ শুনে এদিকে ছুটে আসছে।
আহমদ মুসা উঠে বসেই ছিটকে পড়া ষ্টেনগানটা টেনে নিল কাছে।
উঠে দাঁড়াচ্ছে আহমদ মুসা। এ সময়ই ঘাটের তিন দিক থেকে প্রায় এক সাথেই অনেকগুলো ষ্টেনগান গর্জে উঠল।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়েছে। তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। এদিকে গুলীর শব্দ শুনে এরা এদিকে আসার আগেই গুলীর শব্দ পাওয়ার সাথে সাথে আহমদ মুসার লোকেরা আক্রমণ শুরু করেছে।
এদিক থেকেও গুলী বর্ষণ শুরু হয়েছে। তখন গুলী বৃষ্টির পালা চলছিল।
আহমদ মুসা কেবির দরজায় উঁকি দিল। দেখল, ডজনখানেক লোক ছুটে আসছে কেবিনের দিকে। তাদের হাতে উদ্যত ষ্টেনগান। তারা মুখ দিয়ে চিৎকার করছে, ‘স্যার, এখানে কি ঘটেছে? আপনারা আসুন। হুকুম দিন, তিনদিক থেকেই শত্রু আক্রমণ করেছে।’
আহমদ মুসা কেবিনের দরজায় এসে চিৎকার করে বলল, ‘হুকুম দেবার মত তোমাদের নেতারা কেউ বেঁচে নেই। তোমরা অস্ত্র ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ কর।’
আহমদ মুসার কণ্ঠস্বর শোনার সাথে সাথে ওদের ডজনখানেক ষ্টেনগান নড়ে উঠল। আহমদ মুসা এর জন্যে তৈরিই ছিল। নিজের শেষ কণ্ঠস্বর বাতাসে মেলাবার আগেই তার ষ্টেনগান অগ্নি বৃষ্টি করল। এক ঝাঁক গুলী গিয়ে ওদের জড়িয়ে ধরল।
এদের পরিণতি দেখে বোটের দিকে আসার চেষ্টা আর কেউ করল না। তবু আহমদ মুসা তার গুলী অব্যাহত রাখল যাতে ওরা এদিকে আক্রমণে আসার বা পিছু হটে পালাবার কোন সুযোগ না পায়।
প্রায় পনের মিনিট গুলী চলার পর গুলী থেমে গেল। বোটের সামনে ঘাটের উপরে উন্মুক্ত জায়গা টুকুতে তখন লাশ আর লাশ। কেউ বাঁচেনি। চারদিক থেকে আক্রান্ত হওয়ায় কেউ পালাতেও পারেনি।
ইসহাক আবদুল্লাহর দল, কলিন কামালের দল এবং নোয়ানকোর দল প্রায় এক সাথেই ছুটে এল বোটের দিকে আহমদ মুসার কাছে।
ইসহাক, কলিন কামাল ও নোয়ানকো এসে আহমদ মুসাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। বলল, ‘আল্লাহ আমাদের বিজয় দিয়েছেন। আপনি ভাল আছেন তো?’
আহমদ মুসা বলল, ‘আমি ভাল আছি। তোমরা সবাই ভাল তো? আমাদের লোকদের কি অবস্থা?’
‘মাত্র তিনজন আহত। তাছাড়া সবাই ভাল।’ বলল ইসহাক আবদুল্লাহ।
‘আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করেছেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘প্রথমে এদিক থেকে চারটা গুলীর শব্দ পাওয়া গেছে। কি ঘটেছিল?’ বলল নোয়ানকো।
‘দেখবে ভেতরে এস।’
বলে আহমদ মুসা বোটের কেবিনের দিকে চলতে শুরু করল।
আহমদ মুসার সাথে ইসহাক আবদুল্লাহ, কলিন কামাল ও নোয়ানকো প্রবেশ করল কেবিনে।
কেবিনে পড়ে থাকা চারটি লাশের দিকে চোখ পড়তেই ইসহাক আবদুল্লাহ বলে উঠল, ‘তাহলে এই চারজনকে গুলী করার শব্দ আমরা পেয়েছিলাম?’
ইসহাক টর্চ জ্বেলে লাশগুলো দেখছিল।
‘হ্যাঁ। এই চারজনের ঐ তিনজন হলো নেতা। আর এ ছিল শীর্ষ নেতার ব্যক্তিগত গার্ড।’ লাশগুলোর দিকে ইংগিত করে বলল আহমদ মুসা।
‘তাহলে নেতা নেতাদের মেরেছেন কর্মীরা কর্মীদের মেরেছে।’ বলল নোয়ানকো।
‘না নোয়ানকো, তুমি খেয়াল করনি, কর্মীদের যারাই যখন বোটের দিকে আসার চেষ্টা করেছে, তারা মারা পড়েছে আহমদ আবদুল্লাহ ভাইয়ের হাতে। তিনি পেছন দিক থেকে এভাবে পাহারা না দিলে হয়তো শত্রুদের বেশির ভাগই পালিয়ে যেত। এখন সংবাদ পৌছাবার মত একজনও পালাতে পারেনি।’
‘আমরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি যে, আহমদ আবদুল্লাহ ভাই বোটে নেতাদের কাছে আসার দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন।’ বলল কলিন কামাল।
ইসহাক আবদুল্লাহ টর্চের আলো ঘুরাতে গিয়ে হঠাৎ চোখ পড়ল আহমদ মুসার মুখে। আহমদ মুসার মাথা ও মুখের ডান পাশ রক্তাক্ত দেখে আঁৎকে উঠল ইসহাক আবদুল্লাহ। বলল, ‘একি, আহমদ আবদুল্লাহ ভাই আপনি তো আহত!’
ইসহাক আবদুল্লাহর কথার সাথে সাথেই অন্য দু’জনও ঝুকে পড়ল আহমদ মুসার দিকে।
‘আপনার কি গুলী লেগেছে আহমদ আবদুল্লাহ ভাই?’
‘তোমরা ব্যস্ত হয়ো না। গুলী লাগেনি। পেছন থেকে ঐ গার্ড চুপি চুপি এসে ষ্টেনগানের বাঁট দিয়ে মাথায় আঘাত করেছিল। মাথার ডান পাশের কিছুটা থেঁথলে গেছে।’
বলে ঘুরে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, ‘চল বাইরে, অনেক কাজ আছে।’
আহমদ মুসা বেরিয়ে এল। তার সাথে ওরা তিনজনও।
‘অন্তত ফাষ্ট এইড আপনার এখনি নেয়া দরকার।’ বলল কলিন কামাল।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘ঠিক আছে ডাঃ কলিন কামাল, প্রথম কাজটা সেরে নেই। তারপর তোমার ডাক্তারী বিদ্যা প্রদর্শনের সুযোগ দেব।’
বলে একটু থেমেই আহমদ মুসা ইসহাক আবদুল্লাহর দিকে চেয়ে বলল, ‘কয়েকটা জরুরী কাজ করতে হবে। এক. ওদের সমস্ত লাশ বোটে তুলে গভীর সাগরে ফেলে দিয়ে আসতে হবে। দুই. ঘাটের সব রক্ত ধুয়ে-মুছে সাফ করে ফেলতে হবে রাতের মধ্যেই। তিন. আগের তিনটি বোটের মত এ পাঁচটি বোটকেও আমাদের সেবু নদীতে ডুবিয়ে রাখতে হবে। চার. ভোর রাতেই থানায় গিয়ে ডায়েরী করতে হবে, কয়েকটি বোটে করে ডাকাত এসেছিল। আমাদের চারজন লোককে খুন ও তিনজনকে আহত করেছে। তারপর গ্রামবাসী জেগে উঠে একযোগে ধাওয়া করলে ওরা পালিয়ে গেছে। ইদানিং এই ধরনের ডাকাতের আনাগোন বেড়ে গেছে। ওকারী গ্রাম বা ওকারী ঘাট এলাকায় পুলিশ ফাঁড়ি বা রাত্রিকালীন পাহারা চাই। পাঁচ. কিছু পয়সা খরচ করে হলেও খবরের কাগজে ডাকাতের হানা, চারজন নিহত ও তিনজন আহত হওয়ার খবর ভালো করে প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে এবং এই নিউজে এই এলাকার জন্যে স্বতন্ত্র পুলিশ ফাঁড়ি ও সার্বক্ষণিক পুলিশ পাহারা দাবী করতে হবে। ছয়. এদের কাছ থেকে পাওয়অ শতখানেক ষ্টেনগান, শতখানেক রিভলবার, বিপুল গোলাবারুদ এই রাতেই লুকিয়ে ফেলতে হবে এবং ঔষধগুলো আমারে ষ্টোরে জমা করতে হবে। সাত. আজকের এই খবর সিডি কাকেম গ্রামে এখনি পৌছতে হবে এবং জর্জকে আসতে বলতে হবে সকালের মধ্যেই। আট. অবিলম্বে আরও দু’শ যুবককে যুদ্ধ ট্রেনিং দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য বিভিন্ন দ্বীপ থেকে আস্থাভাজন দু’শ যুবক সংগ্রহ করতে হবে। নয়. আরও কয়েকটি দ্বীপে অন্তত ভিজকায়া মামুন্ড এবং গ্রান্ড টার্কস দ্বীপে আমাদের নতুন ঘাঁটি গড়ে তুলতে হবে। প্রধান ঘাঁটি এখানেই থাকবে। দশ. এ পর্যন্ত প্রাপ্ত ৮টি মোটর বোট সমন্বয়ে একটা নৌবহর আমাদের থাকবে। এগুলোর জন্যে তেল ও প্রয়োজনীয় সবকিছু প্রস্তুত রাখতে হবে। যে কোন জরুরী মুহূর্তে যাতে এগুলো কাজে লাগানো যায়। এগার. আমাদের এ দ্বীপের খৃষ্টান ও অন্যধর্মী অধ্যুসিত উত্তরাংশের উপর নজর রাখা এবং অন্যান্য দ্বীপ থেকে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহের জন্য একটা গোয়েন্দা ইউনিট গঠন করতে হবে।’ দীর্ঘ বক্তব্যের পর থামল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা থামতেই আনন্দে চিৎকার করে উঠল ইসহাক আবদুল্লাহ ও কলিন কামাল। তারা বলল, ‘আজকের এই ঘটনার পর মহাকিছু ঘটাতে পারে শত্রুরা, এ নিয়ে আমরা আনন্দের মধ্যেও উদ্বিগ্ন ছিলাম। আপনার এই পরিকল্পনা তার জবাব দিয়েছে, যা আমরা আশা করছিলাম, তার চেয়েও অনেক বেশি। জিন্দাবাদ, আহমদ আবদুল্লাহ ভাই জিন্দাবাদ। সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি আপনাকে এই জ্ঞান দিয়েছেন এবং আমাদের মধ্যে দয়া করে পাঠিয়েছেন।’
শেষের কথাগুলো তাদের আবেগে ভারি হয়ে উঠল।
আহমদ মুসা এসব কথার দিকে কান না দিয়ে বলল, ‘নোয়ানকো তুমি একজন কাউকে সাথে নিয়ে গ্রামে যাও। লোকদেরকে এখানে পাঠিয়ে তুমি যাবে সিডি কাকেম গ্রামে। আর ইসহাক আবদুল্লাহ তুমি থানার জন্যে এফ আই আর লিখতে বস। আর ডাঃ কলিন তুমি দেখ আহতরা কি অবস্থায় আছে।’
কথা শেষ করে আহমদ মুসা বোটের সামনে চত্বরে দন্ডায়মান সাথীদের দিকে মুখ করে দাঁড়াল। বলল, ‘বিজয়ী সাথী ভাইরা, তোমাদের মোবারকবা। আল্লাহ তোমাদের একটা বড় বিজয় দিয়েছেন। বিজয়ের কৃতিত্ব তোমাদের। তোমাদের যা আছে তাই নিয়ে শত্রুদের বিরুদ্ধে নির্ভয়ে দাঁড়িয়েছ এবং যা সাধ্য তোমাদের, তা করেছ। এ জন্যেই আল্লাহ তোমাদের বিজয় দিয়েছেন। আমরা আনন্দিত হবো, কিন্তু গর্বিত হবো না, অলস হবো না। শত্রুদের পরাজয় শুরু হয়েছে বটে, কিন্তু অনেক দীর্ঘ পথ আমাদের পাড়ি দিতে হবে। তোমাদেরকে আরও সতর্ক, আরও দক্ষ, আরও কুশলী হতে হবে। আল্লাহ আমাদেরকে আরও বড় বিজয় দেবেন।’ থামল আহমদ মুসা।
সামনের ওরা সমস্বরে ধ্বনি দিল, ‘আল্লাহু আকবর।’
ওদের একজন দাঁড়িয়ে থাকা সারি থেকে দু’ধাপ এগিয়ে এল। বলল, ‘নিপীড়ন, পরাজয়, আত্মসমর্পণ এবং নিশ্চিহ্ণ হয়ে যাওয়াকে যখন আমরা আমাদের ভাগ্য লেখা হিসেবে ধরে নিয়েছিলাম, তখন আপনার আগমন আমাদের নতুন জীবন দিয়েছে। আপনার উসিলায় আমরা পরাজয়ের জায়গায় বিজয় পেতে শুরু করেছি। আল্লাহর অসীম দয়া হিসেবে আপনাকে আমরা পেয়েছি। আপনি যে নির্দেশ আমাদের দেবেন, সে নির্দেশ আমরা পালন করব, জীবনের বিনিময়ে হলেও।’
‘আলহামদুলিল্লাহ। ধন্যবাদ ভাইয়েরা। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুন।’
বলে আহমদ মুসা তাকাল ইসহাক আবদুল্লাহর দিকে। দেখল, নোয়ানকো গ্রামে যাবার জন্যে তৈরি হয়েছে। নেমে গেছে বোট থেকে।
‘খসড়ার জন্যে কাগজ তো দরকার। আমার কাছে কাগজ তো নেই।’ আহমদ মুসা তাদের দিকে মনোযোগ দিতেই বলে উঠল ইসহাক আবদুল্লাহ।
আহমদ মুসা তার পিঠে ঝুলানো ব্যাগের দিকে ইংগিত করে বলল, ব্যাগের পকেটে দেখ তোমার প্রয়োজন মত কাগজ পাবে।’
কাগজ নিয়ে নিল ইসহাক আবদুল্লাহ।
এবার এগিয়ে এল কলিন কামাল আহমদ মুসার দিকে।
‘ডাঃ কলিন তুমি আগে অন্য আহতদের প্রয়োজনটা সেরে এসো।’
‘ওদের ব্যবস্থা আগেই করেছি। ওদের আঘাতগুলেঅ অপারেশনের মত গুরুতর নয়।’ বলল কলিন কামাল।
‘ধন্যবাদ।’ বলে আহমদ মুসা বসল ফাষ্ট এইড নেবার জন্যে।
বাহামার সানসালভাদর।
কলম্বাস বন্দরে হোয়াইট ঈগলের সেই অফিস সংলগ্ন একটা সুন্দর বাড়ি। বাড়ির ড্রইং রুম।
সোফায় বসে আছে মাঝ বয়সের রাশভারি একজন আমেরিকান।
চেহারায় কাঠিন্য। চোখ ঠান্ডা। বিরাট শরীর।
এই ব্যক্তিটিই আমেরিকান কন্টিনেন্ট হোয়াইট ঈগল-এর চীফ। নাম ডেভিড গোল্ড ওয়াটার।
তার চোখে-মুখে কিছুটা অস্থিরতা। কারও যেন অপেক্ষা করছে সে।
এই সময় অনেকটা ঝড়ের বেগেই প্রবেশ করল ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের হোয়াইট ঈগল-এর প্রধান জি,জে, ফার্ডিন্যান্ড।
ঢুকে সম্ভাষণ বিনিময়ের পর সোফায় বসতে বসতে দ্রুত কণ্ঠে বলল, ‘আপনি এসেছেন শুনে প্রথমে আমার বিশ্বাস হয়নি। এভাবে তো আপনি আসেন না। কোত্থেকে, কিভাবে বলুন, কেমন আছেন আপনি?’ এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে চুপ করল ফার্ডিন্যান্ড।
‘সত্যিই আমিও ভাবিনি আসব। আমার ফ্লাইট সিডিউল ছিল সোজা প্রিটোরিয়া (দক্ষিণ আফ্রিকা) থেকে ওয়াশিংটন। বিমান বন্দরে এসে শুনলাম সানসালভাদরের নতুন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দ ‘কলম্বাস’-এ বিমানটি সৌজন্য অবতরণ করবে। সুযোগ পেয়ে আমি টিকিট চেঞ্জ করলাম। ঠিক করলাম কয়েক ঘণ্টা সানসালভাদরে কাটিয়ে পরে মিয়ামী হয়ে ওয়াশিংটন যাব।’ একটু থামল।
একটা হ্যাভানা চুরুট ধরিয়ে মুখে পুরে বলল, ‘তোমার সাথে বেশ অনেক দিন দেখা নেই। ভাবলাম তোমাদের কিছু খবর নিয়ে যাই। নতুন ডেমোগ্রাফিক রিষ্ট্রাকচার প্রোগ্রামে মুসলিম জনসংখ্যা বিলোপ কর্মসূচী এখানে কতদূর এগুলো সরেজমিন জানতে পারলে ভালই লাগবে।’ থামল ডেভিড গোল্ড ওয়াটার।
‘ধন্যবাদ। অগ্রগতি উৎসাহব্যঞ্জক। বলা যায় আশার চেয়ে বেশি। চলতি বছর মুসলিম পুরুষ শিশুর মৃত্যুর হার ২৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এই অগ্রগতি রাখতে পারলে, আগামী দশ বছরের মধ্যে ১৫ বছর পর্যন্ত মুসলিম বালকের সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায় চলে যাবে। পরবর্তী দশ বছরের মধ্যে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের মুসলিম মেয়েরা বিয়ের জন্যে মুসলিম যুবক খুঁজে পাবে না। পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে শতকরা প্রায় ১০০ ভাগ মুসলিম মেয়ের বিয়ে হবে খৃষ্টান অথবা অন্য কোন ধর্মের ছেলের সাথে। এর বছর দুয়েকের মধ্যে কোন মুসলিম শিশু খুঁজে পাওয়া যাবে না ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে। তারপর দুই তিন দশকের মধ্যে এই দ্বীপপুঞ্জে মুসলিম জনসংখ্যা শূন্যের কোঠায় নেমে যাবে।’
‘ব্রাভো! ব্রাভো! ফার্ডিন্যান্ড। যদি তা হয় তাহলে বলে দিচ্ছি, নোবল পিস প্রাইজ তুমি পেয়ে যাবে।’ বলল গোল্ড ওয়াটার।
‘নোবেল পিস প্রাইজ? কেমন করে?’ বলল ফার্ডিন্যান্ড।
‘ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জকে ধর্ম ও জাতিগত সংঘাত থেকে মুক্ত করে শান্তি স্থাপনের জন্যে।’ বলল গোল্ড ওয়াটার।
‘অশান্তির মাধ্যমে শান্তি!’ বলে হো হো করে হেসে উঠল ফার্ডিন্যান্ড।
‘কথাটা মনে হয় তুমি নতুন শুনলে! আমাদের পশ্চিমীদের রাজনীতি তো এটাই। এ রাজনীতির বিভিন্ন নাম আছে। কিন্তু লক্ষ্য একটাই পশ্চিমী আদর্শ নিয়ন্ত্রিত এক মতের, এক পথের, এক বিশ্ব।’
‘নোবেল পুরষ্কার কথা পরে। একটা সংকটের কথা বলা হয়নি আপনাকে।’
‘সংকট? কি সেটা?’
‘বলেছিলাম আপনাকে যে, গ্রান্ড টার্কস-এর চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কয়েকজন ছাত্রের সমীক্ষায় মুসলিম পুরুষ শিশুদের সংখ্যা হ্রাস ধরা পড়েছিল, তাদেরসহ একজন সাংবাদিককে আমরা হত্যা করেছি। কিন্তু সমীক্ষার সাথে জড়িত এক মুসলিম ছাত্রী পলাতক ছিল। তাকে ধরতে গিয়ে আমাদের চারজন লোক রহস্যজনকভাবে খুন হয়। সেই............’
ফার্ডিন্যান্ডকে বাধা দিয়ে গোল্ড ওয়াটার বলল, ‘রহস্যজনক বলছেন কেন?’
‘রহস্যজনক এই কারণে যে, হত্যাকান্ডটি এলাকার গ্রামবাসীদের দ্বারা হয়নি। হয়েছে একজন এশিয়ানের হাতে।’
‘এশিয়ান? কে সে?’
‘কে জানি না, কিন্তু লোকটি গ্রান্ড টার্কস দ্বীপে এসে প্রথমেই সেই মুসলিম মেয়েটির খোঁজ করে। আমাদের লোকেরা তাকে সন্দেহ করে তাকে মারপিট করে।’
‘তারপর?’
‘তার খোঁজ আমরা রাখিনি। খুব সাধারণ কেউ তাকে আমরা মনে করেছিলাম।’
‘আচ্ছা বল, কি বলছিলে।’
‘আমাদের চারজন লোক হত্যার প্রতিশোধ নেবার জন্যে আমরা তিরিশজন লোকের একটা শক্তিশালী দল পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু তারা হারিয়ে গেছে। তাদের জীবিত অথবা মৃত কোন চিহ্ণ আমরা খুঁজে পাইনি।’
‘কি বলছ তুমি, এটা কি সত্য?’
‘সত্য। আমরা লোক পাঠিয়ে গোটা দ্বীপ তন্ন তন্ন করে দেখেছি। কোথাও সন্দেহ করার মত কিছু পাইনি।’
‘অসম্ভব ব্যাপার। দ্বীপের কেউ কিছু বলতে পারেনি?’
‘না, পারেনি।’
‘বোটগুলো?’
‘বোটগুলোও পাওয়া যায়নি!’
কিছু বলতে যাচ্ছিল গোল্ড ওয়াটার। এ সময় ঘরে প্রবেশ করল শিলা সুসান। ফার্ডিন্যান্ডের একমাত্র মেয়ে।
ঢুকেই বলল, ‘স্যরি ড্যাডি। তোমরা গল্প করছ তাই কেউ আসতে সাহস করছে না। গ্রান্ড টার্কস থেকে দু’জন লোক এসে আপনার অপেক্ষা করছে।’
শিলা সুসান-এর হাতে রঙের তুলি। পাশেই আর্ট রুমে বসে সে আর্ট করছিল। সেখান থেকে রিসেপশন রুমের কথাবার্তা শোনা যায়। শুনেই ওদের সাহায্য করতে এসেছে।
কথা শেষ করেই শিলা সুসান গোল্ড ওয়াটারকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘গুড মর্নিং স্যার।’
শিলা সুসানের কথা শেষ হতেই ফার্ডিন্যান্ড সুসানের দিকে ইংগিত করে বলল, ‘এ আমার মেয়ে শিলা সুসান, ওয়াশিংটনের জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। আর্ট ওর বিশেষ সখ।’
‘ওয়েলকাম বেটি। বস।’ বলল গোল্ড ওয়াটার।
‘ধন্যবাদ।’ বলে বসল সুসান।
ইন্টারকমে রিসেপশনে খবর পাঠিয়েছিল ফার্ডিন্যান্ড।
দু’জন লোক প্রবেশ করল ড্রইং রুমে।
তারা সম্ভাষণ বিনিময়ের পর বলল ফার্ডিন্যান্ডকে, ‘আমরা গ্রান্ড টার্কস থেকে এসেছি জরুরী খবর নিয়ে।’
ফার্ডিন্যান্ডের ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে উঠল। বলল, ‘জন ব্ল্যাংকরা কোথায়?’
ফার্ডিন্যান্ডের কথা শেষ হতেই শিলা সুসান বলে উঠল, ‘ড্যাডি আমি যাই। যেসব মারামারির কথা চলছিল, সে রকম মারামারির কথাই আবার শুরু হবে। আমি এসব শুনতে পারব না। বলে উঠে দাঁড়াল শিলা সুসান।
শিলা সুসানের কথা শুনে হেসে উঠেছিল গোল্ড ওয়াটার। বলল, ‘যে মারামারি জীবনের জন্যে, সে মারামারিতে বিতৃষ্ণা থাকলে চলবে কেন বেটি?’
‘মারামারিটা জীবনের জন্যে অর্থাৎ আত্মরক্ষার জন্যে হচ্ছে কি?’ বলল শিলা সুসান।
‘অবশ্যই বেটি।’ গোল্ড ওয়াটার।
সুসান কিছু বলতে যাচ্ছিল তার আগেই ফার্ডিন্যান্ড বলল সুসানকে, ‘তোমাকে আইন না পড়িয়ে ভুল করেছি মা। ভাল আইনজীবি হতে।’ হাসতে হাসতে কথা বলছিল ফার্ডিন্যান্ড।
সুসান উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, ‘ড্যাডি আজ নয়, আরেকদিন ঝগড়া করব। চলি।’
বলে সুসান ড্রইং রুম থেকে বেরিয়ে তার আর্ট রুম ঢুকল।
সুসান বেরিয়ে যেতেই প্রশ্নবোধক দৃষ্টি তুলে ধরল ফার্ডিন্যান্ড গ্রান্ড টার্কস থেকে আসা লোক দু’টির দিকে।
লোক দু’টির মুখ শুকনো এবং চোখে উদ্বেগ। চারদিকের কোন কথার দিকেই তাদের মনোযোগ নেই।
ফার্ডিন্যান্ড তাদের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টি তুলে ধরতেই তাদের একজন বলল, ‘সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গেছে আমাদের ওখানে।’
‘ভনিতা নয়, ঘটনা বল।’ কিছুটা শক্ত কণ্ঠে বলল ফার্ডিন্যান্ড।
‘সাউথ টার্কো দ্বীপে যারা অভিযানে গিয়েছিল, তাদের কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।’ বলল তাদের একজন কম্পিত কণ্ঠে।
‘কি?’ চিৎকার করে উঠল ফার্ডিন্যান্ডের কণ্ঠ। যেন বাজ পড়ল ঘরে।
চমকে উঠেছে ওরা দু’জনও। ভ্রু কুঁচকে উঠেছে গোল্ড ওয়াটারেরও।
অবিশ্বাস্য বিস্ময়ে আচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে ফার্ডিন্যান্ডের মুখ।
চিৎকারের শব্দ মিলিয়ে যাবার আগেই ফার্ডিন্যান্ড বলল, ‘ওরা ফিরে আসেনি?’
‘আসেনি।’
‘কোন খবর দেয়নি?’
‘না।’
‘তারপর?’
‘দুপুর পর্যন্ত আমরা মনে করেছি, অপারেশনের পর তারা পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে। কিন্তু দুপুরেই টেলিফোন পেলাম সাউথ টার্কো দ্বীপের আমাদের অফিস থেকে। জানাল, অভিযানের আগে যে তিনজনকে পরিস্থিতি সম্পর্কে খবর সংগ্রহের জন্যে পাঠানো হয়েছিল, কেউ ফিরেনি, অভিযানে যাদের আসার কথা তাদেরও কোন চিহ্ণ পাওয়া যায়নি।’
‘অভিযানে আসার কথা’ বলেছে কেন, অভিযানে ওরা যায়নি?’
‘সে কথা তারা জানে না।’
‘চিহ্ণ খুঁজে পেল না কেন? ওরা কি ওখানে গিয়েছিল?
‘সাউথ টার্কো পুলিশ ষ্টেশন থেকে বিষয়টা তারা জানতে পারে।’
‘পুলিশ ষ্টেশন থেকে?’
‘হ্যাঁ। গ্রামবাসীদের তরফ থেকে খুব সকালে থানায় কেস হয় যে, ডাকাতরা তাদের গ্রাম আক্রমণ করতে এসেছিল। পথে তিনজনকে পেয়ে ডাকাতরা তাদের হত্যা করে। পরে গ্রামবাসীরা জেগে উঠলে ওরা পালিয়ে যায় তাদের বোটে চড়ে।’
লোকটি থামলেও ফার্ডিন্যান্ড কথা বলতে পারলো না। সে স্তম্ভিত চোখে তাকিয়ে আছে লোকটির দিকে। এ ধরনের অবিশ্বাস্য ঘটনা ঐ দ্বীপে এর আগেও একবার ঘটেছে। সে ঘটনায় হাওয়া হয়ে গিয়েছিল ৩০ জন লোক। কিন্তু আজকের ঘটনায় কথা বলার শক্তি যেন সে হারিয়ে ফেলেছে। একশ’ জনেরও বেশি সশস্ত্র লোক সেখানে নেই, ফিরেও আসেনি, তাদের নিহত হবার ঘটনাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তাহলে ওরা গেল কোথায়! এবারের ঘটনায় একটাই শুধু নতুন বিষয়, ওদের পক্ষের তিনজন লোক নিহত হয়েছে এ পক্ষের লোকদের হাতে।
‘ওদের পক্ষের যে তিনজন লোক নিহত হয়েছে, তারা কিভাবে নিহত হয়েছে?’ অনেকক্ষণ পর বলল ফার্ডিন্যান্ড।
‘ষ্টেনগানের ব্রাশ ফায়ারে নিহত হয়েছে।’
‘থানা তদন্তে গিয়েছিল?’
‘হ্যাঁ। আমাদেরও লোক গিয়েছিল পুলিশের সাথে। তারা গ্রাম, ঘাট এলাকা, ঘাট পর্যন্ত রাস্তা, আশপাশ এলাকা সবই তারা পুলিশের সাথে ঘুরে ঘুরে দেখেছে, কিন্তু সন্দেহজনক কোথাও কিছু দেখতে পায়নি।’
‘কি চিহ্ণ তারা খুঁজেছে?’
‘কোন বড় সংঘাত-সংঘর্ষ ও রক্তারক্তি হলে তার একটা চিহ্ণ থাকবেই। সে রকম কিছু তারা পায়নি।’
লোকটি কথা শেষ করলেও ফার্ডিন্যান্ড কথা বলল না। ভাবছিল সে। বলল এক সময়, ‘থানা কি বলেছে?’
‘পুলিশরা তিনটা খুনকেই বড় করে দেখছে। তারা মনে করছে, রাতে কোন জলদস্যু গ্রামগুলোর উপর চড়াও হতে এসেছিল। গ্রামবাসীদের আবেদনে দ্বীপের দক্ষিণাঞ্চলে দু’টি পুলিশ বক্স বসেছে এবং রাতে পুলিশ এলাকায় টহল দিচ্ছে।’
‘গ্রান্ড টার্কস-এর পুলিশকে কিংবা পুলিশে আমাদের যারা আছে তাদের কিছু বলা হয়নি?’
‘না বলা হয়নি। বললে তো সব কথাই বলতে হবে। এ সিদ্ধান্ত আমরা নিতে পারিনি।’
‘ঠিক করেছ। ওখানকার বৃটিশ পুলিশের মধ্যে বেয়াড়া পুলিশ অফিসার অনেক আছে যাদের কাছে ঘটনার প্রকাশ ঘটলে আমাদের ক্ষতি হবে।’ বলল গোল্ড ওয়াটার।
বলে গোল্ড ওয়াটার তাকাল ফার্ডিন্যান্ডের দিকে এবং বলল, ‘ওর কাছ থেকে আর কিছু জানার আছে?’
‘সামান্য দু’একটা কথা।’ বলে ফার্ডিন্যান্ড লোকটিকে আবার জিজ্ঞেস করল, ‘ওদের কাছে অনেকগুলো মোবাইল টেলিফোন ছিল। ওদের কোন টেলিফোন পাওয়া যায়নি?’
‘না স্যার।’
‘তোমরা কি সাগরে সন্ধান করেছ?’
‘জ্বি। আমাদের কয়েকটা বোট দ্বীপটির চারদিকের গোটা সমুদ্র এলাকা তন্ন তন্ন করে দেখেছে। সেখানেও কিছু পাওয়া যায়নি।
লোকটি কথা শেষ করতেই ফার্ডিন্যান্ড তাকে বলল, ‘তোমরা গিয়ে রেষ্ট নাও। দরকার হলেই ডাকব তোমাদের।’
লোক দু’জন বেরিয়ে গেলে ফার্ডিন্যান্ড বিমূঢ় দৃষ্টি তুলে তাকাল গোল্ড ওয়াটারের দিকে। বলল, ‘আপনি কিছু বুঝলেন?’
‘আমি মনে করি সেখানে অলৌকিক কিছু ঘটেনি। আমাদের লোকেরা হয় বন্দী হয়েছে, নয়তো সবাই নিহত হয়েছে।’ বলল গোল্ড ওয়াটার।
‘এটা কি সম্ভব? সর্বোধুনিক অস্ত্রসজ্জিত আমাদের ১০০ জন লোককে ওখানকার গ্রামবাসীরা হত্যা বা বন্দী করবে কেমন করে?’
‘তা আমি জানি না। কিন্তু বন্দী বা হত্যা ছাড়া অন্য কোন ব্যাখ্যা বাস্তব নয়।’
‘বন্দী বা নিহত হওয়ার ঘটনাই বা বাস্তব হয় কি করে?’
‘আমারও এটা প্রশ্ন। কিন্তু হত্যা বা বন্দী হওয়া ছাড়া অন্য কিছুর কথা আমি চিন্তাও করতে পারছি না।’
‘পাঁচটা বোট গেল কোথায়?’
‘ওরা ওগুলো সাগরে ডুবিয়ে দিতে পারে।’
‘কেন? এ ধরনের বোট তো তাদের জন্যে খুব লোভনীয়।’
‘শত্রুকে তুমি গেঁয়ো বললেও আমার মনে হচ্ছে ওরা খুব বুদ্ধিমান। আমাদের লোকদের ওরা হত্যা বা বন্দী করেছে এটা তারা কোনভাবেই প্রমাণ হতে দিতে চায় না। থানায় তারা ডাকাত পড়ার ইজাহার দিয়ে দারুণ বুদ্ধিমানের কাজ করেছে। নিজেদের মজলুম প্রমাণ করে পুলিশকেও তারা তাদের পক্ষে নিতে চায়।’
‘কিন্তু হঠাত এ বুদ্ধি তাদের মাথায় এলো কি করে? এ গ্রামবাসীদের জানি আমরা। এরা প্রতিবাদ করা তো দূরে থাক প্রতিবাদের ভাষাও জানতো না। এদের এমন সাহস, শক্তি ও বুদ্ধি আসবে কোত্থেকে?’
‘এই উত্তর আমার কাছেও নেই।’
গোল্ড ওয়াটার থামলেও ফার্ডিন্যান্ড কিছুক্ষণ কথা বলল না।
বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ফার্ডিন্যান্ড বলল, ‘আমাদের জিজ্ঞাসার জবাব পাওয়ার জন্যে এবং শত্রুকে আর বাড়িতে না দেবার জন্যে এখনই সর্বাত্মক অভিযান পরিচালনা করতে হবে বলে আমি মনে করছি।’
‘না ফার্ডিন্যান্ড এ ধরনের অভিযান করে আমরা যে সংকটে পড়েছি তাকে আরও বৃদ্ধি করবে। এ পর্যন্ত দুই ঘটনায় আমাদের লোকবলের ক্ষতি হয়েছে, আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু ইমেজের ক্ষতি হয়নি। আমাদের এই আক্রমণের ঘটনা প্রকাশিত হবার সাথে সাথে আমরা সন্ত্রাসী বলে চিহ্নিত হবো বিশ্বের সকলের কাছে।’ বলল গোল্ড ওয়াটার।
‘আমরা পুলিশের সহযোগিতা পাব। সুতরাং খুব অসুবিধা কি হবে?’
‘কিছু পুলিশের বা বেশিরভাগ পুলিশের পাবে, সব পুলিশের পাবে না। সুতরাং বিষয়টা প্রকাশ পাবে। এ নিয়ে হৈ চৈ হবে। হৈ চৈ করবে বৃটেনবাসীরাও। সুতরাং বৃটিশ পুলিশকে প্রকাশ্যে আমরা পক্ষে পাব না।’
‘ঠিক বলেছেন। প্রকাশ্য অভিযান ক্ষতিকর হবে। আগের মতই গোপনে পুনরায় একটা চেষ্টা করতে আমরা পারি।’
‘পারি। কিন্তু আগের চেয়ে তা কঠিন হবে। আগে পুলিশ পাহারা ছিল না, এখন পুলিশ আছে। তাছাড়া কিছু না জেনে অন্ধকারে ঝাঁপ দেয়াকে যুক্তিসঙ্গত মনে করি না।’
‘তাহলে?’
‘আমার মতে ব্যাপক হত্যাকান্ড চালিয়ে কোন জনগোষ্ঠীকে দমন করা এখন বিপজ্জনক। এ বিষয়টা খুব তাড়াতাড়ি জানাজানি হয়ে যায় এবং চারদিক থেকে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ওঠে, এমনকি বিভিন্ন মানবাধিকার গ্রুপ ও জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন থেকে এর তদন্তও হয়। সুতরাং সামরিক অভিযানের পথে অগ্রসর হওয়া যাবে না। আমি মনে করি, আমরা যে পথে অর্থাৎ মুসলিম জনসংখ্যা হ্রাস করার যে পথে অগ্রসর হচ্ছি, সেটা দীর্ঘ মেয়াদী হলেও এটাই নিরাপদ। এ কার্যক্রমটাই আমাদের আরও জোরদার করা দরকার।’ বলল গোল্ড ওয়াটার।
‘তাহলে সাউথ টার্কো দ্বীপে আমরা এখন কিছুই করব না? এত বড় পরাজয় মেনে নেয়া খুবই কষ্টকর হবে।’ বলল ফার্ডিন্যান্ড।
‘কিছুই করব না, এ কথা ঠিক নয়। আমাদের গোয়েন্দা ইউনিটের লোকদের সেখানে ছড়িয়ে দাও। জানতে চেষ্টা কর, সেখানে কি ঘটেছে, কারা দায়ী। যারা দায়ী, তাদের এক এক করে কিডন্যাপ কর এবং শেষ করে দাও। আমাদের লোকেরা এক সাথে হারিয়ে গেছে, আর ওরা এক এক করে হারিয়ে যাবে।’
ফার্ডিন্যান্ডের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, ‘যিশুকে ধন্যবাদ, আমাদের লোকেরা খুশী হবে এ কর্মসূচী পেলে। আর মুসলিম পুরুষ শিশু জন্মের পরেই শেষ করে দেয়ার ব্যাপারটা আমরা জোরদার করব।‘
‘কিন্তু সাবধান, খুব গোপনে বুদ্ধিমত্তার সাথে এ কর্মসূচী এগিয়ে নিতে হবে। এটাও খুব বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াবে, যদি জানাজানি হয়ে যায়।’
‘আমরা খুব সাবধান এ ব্যাপারে। আমাদের বিশ্বস্ত লোকদের দিয়ে আমরা এ কাজ করাচ্ছি। চিন্তার কোন কারণ নেই।’
‘খুশী হলাম।’
‘কিন্তু মারাত্মক কিছু দু:সংবাদও শুনলেন’
‘এ রকম কিছু দু:সংবাদের জন্যে তৈরি থাকতে হয়, এক তরফা একটা কাজ হয়ে চলবে, এটা স্বাভাবিক নয় ফার্ডিন্যান্ড।’ চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিতে দিতে বলল গোল্ড ওয়াটার। থামল একটু।
তারপর চায়ের কাপটা পিরিচে রাখতে রাখতে বলল, ‘এখন উঠি ফার্ডিন্যান্ড। কলম্বাস গীর্জার ফাদারের সাথে একটু কাজ আছে। সেটা সেরে রেষ্ট হাউজে ফিরব।’
বলে উঠে দাঁড়াল গোল্ড ওয়াটার।
ফার্ডিন্যান্ড তার সাথে হ্যান্ডশেক করতে করতে বলল, ‘ঈশ্বরই আজ আপনাকে এখানে নিয়ে এসেছিল। আপনার মূল্যবান পরামর্শ গোটা পরিস্থিতি পাল্টে দিয়েছে। কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’
গোল্ড ওয়াটার বলল, ‘কাকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছ, এটা তোমার কাজ, আমার কাজ শুধু নয়, সকলের কাজ।’
ফার্ডিন্যান্ড গাড়ি বারান্দায় গোল্ড ওয়াটারকে গাড়িতে তুলে দিয়ে ফিরে এল। নিজের ষ্টাডি রুমে যাবার পথে ফার্ডিন্যান্ড তার মেয়ে শিলা সুসানের আর্ট রুমে উঁকি দিল। বলল, ‘স্কেচটা শেষ করতে পেরেছ সুসান?’
শিলা সুসান একটা স্কেচের দিকে তাকিয়ে গালে হাত দিয়ে বসেছিল। তার আব্বার কথা কানে যেতেই ফিরে তাকাল তার আব্বার দিকে। হাসল। বলল, ‘আর্টের একটা রঙ লাল বটে, ড্যাডি, কিন্তু মানুষের লাল রক্তের সাথে এর আকাশ-পাতাল পার্থক্য।’
‘তাতো বটেই। কিন্তু তারপর কি?’ বলল সুসানের আব্বা ঠোঁটে হাসি টেনে।
‘ওপাশে তোমাদের রক্তারক্তির গল্পে আমার রঙের কাজ আমি করতে পারিনি। আমার আর্ট রুম অনেকটা ড্রইং-এর অংশ। আমার এ রুম পাল্টে দাও।’
শিলা সুসানের আব্বা ফার্ডিন্যান্ড সুসানের শেষের কথাগুলো যেন শুনতেই পায়নি। বলল, ‘পাগল মেয়ে, রক্তারক্তির গল্প কোথায় শুনলে। খবর এসেছে আমাদের একশ’ লোককে ওরা সম্ভবত হত্যা করেছে। এ বিষয় নিয়েই আমরা আলোচনা করছিলাম।’
‘একশ’ লোক হত্যা হওয়া মানে রীতিমত একটা যুদ্ধ। এটা কি রক্তারক্তি নয়? ‘ওরা’ কারা ড্যাডি?’
‘সাউথ টার্কো দ্বীপের মুসলমানরা।’
‘কিন্তু ওদের সাথে তোমাদের বিরোধ কেন? কেন একশ’ লোকের বাহিনী পাঠিয়েছিল ওদের বিরুদ্ধে?’
‘এটা অস্তিত্বের রাজনীতি। তুমি এখন ছোট, পড়াশুনা করছ। আরও বড় হও বুঝবে মা। ধন্যবাদ।’
বলে ঘুরে দাঁড়িয়ে তার ষ্ট্যাডি রুমের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
তার আব্বা চলে গেলেও শিলা সুসান দরজার দিকেই তাকিয়ে রইল। তার চোখের শূন্য দৃষ্টি বাইরে প্রসারিত। তার আব্বার শেষ কথাই তার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। তার আব্বার শেষ কথা থেকে সুসান এটুকু বুঝেছে, বিষয়টা বড় রাজনীতির ব্যাপার। কিন্তু রাজনীতির সাথে এই হত্যাকান্ড কেন? বিভেদের এই হানাহানি ভাল লাগে না তার। তার বিশ্ববিদ্যালয়ে নিগ্রো ছাত্রদের ক্যান্টিন ও ক্লাসে বসার জায়গা আগে আলাদা ছিল। এখন এক হয়েছে। কিন্তু মন, সম্পর্ক ও সামাজিকতা তো হয়নি। সেই বিভেদের দেয়াল এখনও খাড়াই আছে। এ থেকে হানাহানি ও রক্তারক্তির ঘটনাও ঘটেছে। এই ক’দিন আগে একজন কৃষ্ণাংগ ছাত্রের সাথে শ্বেতাংগ ছাত্রীর প্রেম নিয়ে যে গন্ডগোল ও হানাহানি হয়েছে তা দেখে মনে হয়েছে কৃষ্ণাংগ ছাত্রটি যেন মানুষ নয়, পশু। শেষে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়তে হয়েছে। এটাকেও নিশ্চয় বলা হবে অস্তিত্বের রাজনীতি। তাহলে দেখা যাচ্ছে, স্বতন্ত্র অস্তিত্বই আসল সমস্যা। কিন্তু স্বতন্ত্র তো একটা বাস্তবতা। এই বাস্তবতা সমস্যা হয়ে দাঁড়ালে তো বিপদ! এর সমাধান কোথায়? সকল ধর্ম, জাতীয়তা, স্বত্তা-স্বাতন্ত্রের উর্ধে ওঠা? মাথা ব্যথা বলে কি মাথা কেটে ফেলতে হবে?
মাথা ঘুরে গেল শিলা সুসানের। আর চিন্তা করতে পারল না।
হাতের স্কেচ এবং তুলিটা টেবিলে ছুঁড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল সে।