বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নীল পদ্মরাগ (শার্লক হোমসের বাংলা গোয়ন্দা গল্প) পর্ব-১

"ওয়েস্টার্ন গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান MD.Belal Hosan (০ পয়েন্ট)

X এই অনুবাদটির অনুবাদস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুবাদকের বিনা অনুমতিতে অন্যত্র প্রকাশ বেআইনি! বড়োদিনের দিন দুয়েক পরে সকালের দিকে আমার বন্ধু শার্লক হোমসকে উৎসবের শুভেচ্ছা জানাতে গিয়েছিলাম। হোমস তার পার্পল-রঙা ড্রেসিং গাউনটা পরে সোফায় হেলান দিয়ে বসেছিল। তার ডানদিকে পাইপ রাখার তাক আর হাতের কাছে ছড়ানো ছিল একগাদা সদ্যপঠিত প্রভাতী সংবাদপত্র। সোফার পাশে চেয়ারে ঝুলছিল একখানা জীর্ণ পুরনো ফেল্ট হ্যাট। টুপিটা জায়গায় জায়গায় ফাট–ব্যবহারের অযোগ্য। চেয়ারের উপর রাখা লেন্স আর ফরসেপস দেখে বুঝলাম, ওটা ভাল করে পরীক্ষা করার জন্যেই ওভাবে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। বললাম, “তুমি ব্যস্ত মনে হচ্ছে। আমি হয়ত এসে কাজে বাধা দিলাম।” “মোটেও না। বরং এই যে তোমার মতো এক বন্ধুর সঙ্গে আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে দুটো কথা কইতে পারি, এটা কতো আনন্দের বলো তো। এই ব্যাপারটা খুবই সামান্য।” তারপর টুপিটার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে সে বলল, “কিন্তু ওই জিনিসটার সঙ্গে এমন কিছু বিষয় জড়িত যেগুলো শুধু মনোহারীই নয়, যথেষ্ট শিক্ষণীয়ও বটে।” বাইরে খুব বরফ পড়ছিল। জানলার কাঁচ ঢেকে গিয়েছিল পুরু বরফের আস্তরণে। আরামকেদারায় বসে ফায়ারপ্লেসের গনগনে আগুনে হাতটা সেঁকতে সেঁকতে বললাম, “মনে হচ্ছে, এই সাদাসিধে দেখতে টুপিটার সঙ্গে বেশ একটা মারকাটারি গল্প জড়িয়ে আছে আর তুমি এটার সূত্র ধরে রহস্যের সমাধান করে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার কথা ভাবছো।” হোমস হেসে বলল, “না না, অপরাধ নয়। আসলে কয়েক মাইল এলাকার মধ্যে চল্লিশ লক্ষ লোক গুঁতোগুঁতি করলে কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটে যায়। এটাও সেই রকমই একটা ঘটনা। এত লোকের ক্রিয়া- প্রতিক্রিয়ার মধ্যে, এত সম্ভাব্য ঘটনীয় ঘটনার মধ্যে অনেক ছোটোখাটো ঘটনাও থাকে, যেগুলো খুব উল্লেখযোগ্য ও অদ্ভুত ধরনের হয়, কিন্তু সবসময় তার সঙ্গে কোনো অপরাধের যোগ থাকে না। আমরা তো আগেও এমন ঘটনা ঘটতে দেখেছি।” আমি বললাম, “দেখিনি আবার! আমি শেষ যে ছ- খানা কেস নোট করেছি, তার মধ্যে তিনটের সঙ্গেই তো–আইনের চোখে যাকে অপরাধ বলে– তার কোনো যোগ নেই।” “ঠিক বলেছো। আইরিন অ্যাডলারের কাগজ উদ্ধার, মিস মেরি সাদারল্যান্ডের সেই অভূতপূর্ব কেস আর সেই বাঁকা-ঠোঁটওয়ালা লোকটির রহস্যের কথা বলছো তো। এই ব্যাপারটাও যে একই রকম নিরীহ, তা হলপ করে বলতে পারি। কমিশনেয়ার [*] পিটারসনকে চেনো তো?” “হ্যাঁ, চিনি বৈকি।” “জিনিসটা সে-ই জুটিয়েছে।” “এটা পিটারসনের টুপি?” “না না, পিটারসন এটা কুড়িয়ে পেয়েছে। মালিকের পরিচয় অজ্ঞাত। হাতে নিয়ে দ্যাখো। ফুটো টুপি বলে অবছেদ্দা কোরো না। জেনো, এটাও একটা বৌদ্ধিক সমস্যা। ও হ্যাঁ, এর এখানে আগমনের ইতিবৃত্তটাও আগে শুনে নাও। বড়োদিনের সকালে একটা নধর রাজহাঁস আর এই টুপিটা নিয়ে পিটারসন হাজির। হাঁসটা খুব সম্ভবত এখন পিটারসনের রান্নাঘরের উনুনে। ঘটনাটা এই রকম: বড়োদিনের দিন ভোর চারটে নাগাদ পিটারসন টটেনহ্যাম কোর্ট রোড ধরে নিজের বাড়িতে ফিরছিল। সামনের রাস্তায় গ্যাসের আলোয় সে দেখল একটি লম্বা লোক একটু যেন টলতে টলতে হাঁটছে। লোকটার কাঁধে ছিল একটা সাদা হাঁস। গুজ স্ট্রিটের কোনার দিকে যেতেই একদল গুন্ডার সঙ্গে লোকটার ঝামেলা বাধল। একটা গুন্ডা লোকটা টুপিটা তার মাথা থেকে খুলে ফেলে দিল। লোকটা আত্মরক্ষার জন্য নিজের লাঠিটা মাথার উপর তুলে ঘোরাতে গেল। কিন্তু তাতে তার পিছনের দোকানের জানলার কাঁচটি ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তুমি জানো, পিটারসন সৎ ছেলে। সে লোকটাকে গুন্ডাদলের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ছুটে গেল। এদিকে জানলার কাঁচ ভেঙে লোকটা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ওই অবস্থায় একটা উর্দিপরা পুলিশ-গোছের লোককে ছুটে আসতে দেখে হাঁসটা ফেলেই দৌড় লাগালো টটেনহ্যাম কোর্ট রোডের পিছনদিককার ছোটো গলিপথের গোলকধাঁধার দিকে। পিটারসনকে দেখে গুন্ডাদলও পালাল। সেই অকুস্থল থেকেই এই ছেঁড়া টুপি আর সেই অনবদ্য বড়োদিনের ভোজটিকে উদ্ধার করে আনল পিটারসন।” “আর তারপর নিশ্চয় জিনিসগুলো তার মালিকের কাছে পৌঁছে দিয়ে এল?” “এখানেই তো সমস্যা, বন্ধু। হাঁসটার বাঁ পায়ের সঙ্গে একটা ছোটো কার্ড আটকানো ছিল। তাতে লেখা ছিল ‘মিসেস হেনরি বেকারের জন্য’। টুপিটার লাইনিং-এর উপর ‘এইচ. বি.’ লেখাটাও স্পষ্ট। কিন্তু আমাদের শহরে কয়েক হাজার বেকার পদবীধারী লোক পাওয়া যাবে, যাদের মধ্যে অন্তত কয়েকশো লোকের নাম হেনরি বেকার। এই হারানো সম্পত্তিটি তার সঠিক মালিকের হাতে তুলে দেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়!” “ও! তাই পিটারসন হাঁসটা তোমার কাছে নিয়ে এল?” “পিটারসন জানে যে, ছোটোখাটো ব্যাপারেও আমার আগ্রহ আছে। তাই বড়োদিনের দিন সকালেই হাঁস আর টুপিটা আমার কাছে নিয়ে এল। হাঁসটা আজ অবধি আমার এখানেই ছিল। কিন্তু দেখলাম, ঠান্ডা সত্ত্বেও জিনিসটায় পচ ধরছে। তাই আর দেরি না করে, যে ওটা কুড়িয়ে পেয়েছিল, তাকেই ওটার সদ্ব্যবহারের দায়িত্ব দিলাম। বেচারা ভদ্রলোকের বড়োদিনের ডিনারটা মাঠে মারা গেল। টুপিটা রেখে দিয়েছি। এখন দেখি এটা অন্তত ওঁকে ফেরত দেওয়া যায় কিনা।” “ভদ্রলোক হারানো-প্রাপ্তির বিজ্ঞাপন দেননি?” “না।” “তুমি তাহলে কী সূত্র পেলে?” “পর্যবেক্ষণ করে যতটুকু অনুমান করা যায়, ততটুকুই।” “এই টুপিটা পর্যবেক্ষণ করে?” “হ্যাঁ।” “ঠাট্টা করছ? এই পুরনো ফুটো টুপিটা পর্যবেক্ষণ করে তুমি কী অনুমান করলে শুনি!” “আমার পদ্ধতি তোমার জানা। এই লেন্সটা নাও। দ্যাখো তো, জিনিসটা পর্যবেক্ষণ করে তুমি এর মালিক সম্পর্কে কী ধারণা পাও।” জিনিসটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখলাম। খুব সাধারণ কালো রঙের একটা গোল টুপি। শক্তপোক্ত, তবে অবস্থা খুব খারাপ। ভিতরে রংচটা লাল রেশমের লাইনিং। নির্মাতার নাম নেই। তবে, হোমস যেমন বলেছিল–‘এইচ. বি.’ আদ্যক্ষরটা এককোণে খুব এবড়োখেবড়ো হরফে লেখা। দু-পাশে টুপি আটকানোর ছিদ্র। তবে ইলাস্টিকটা ছেঁড়া। ছেঁড়াফোঁড়া, ধুলোমাখা টুপি। জায়গায় জায়গায় দাগ। আবার কালি লাগিয়ে দাগগুলো ঢাকার চেষ্টা করা হয়েছে। টুপিটা আমার বন্ধুর হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বললুম, “কিছুই তো দেখতে পেলুম না।” “ভুল করছ, ওয়াটসন, সবই দেখতে পেয়েছো। শুধু জানতে পারোনি যে দেখতে পেয়েছো। আসলে কার্যকারণগুলো ঠিকঠাক মেলাতে পারছো না।” “তাহলে দয়া করে তুমিই বলো এই টুপি থেকে কী কার্যকারণ আবিষ্কার করলে?” টুপিটা হাতে তুলে নিয়ে নিজের স্বভাবসিদ্ধ অদ্ভুত পর্যবেক্ষণ ভঙ্গিতে সেটার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল হোমস। তারপর বলল, “সবটা হয়তো সঠিক জানা যাবে না। তবে কয়েকটা জিনিস খুব স্পষ্ট; অন্যগুলোর সম্ভাবনাও বেশ উজ্জ্বল। যেমন, এই লোকটা যথেষ্ট বুদ্ধি ধরে। গত তিন বছরের মধ্যে কোনো এক সময় তার অবস্থা বেশ ভাল ছিল। তারপর কোনো কারণে অর্থসংকটে পড়ে। আগে লোকটার বেশ দূরদৃষ্টি ছিল। এখন সেই দূরদৃষ্টি আর নেই। পকেটের জোর কমে যাওয়ায় স্বভাবটাও একটু খারাপ হয়েছে। মদ্যপানের মতো খারাপ উপসর্গও সম্ভবত জুটেছে। তাছাড়া, খুব জোর দিয়ে বলা চলে, ভদ্রলোকের স্ত্রী আর তাঁকে আগের মতন ভালবাসেন না।” “বটে!” আমার ব্যঙ্গোক্তি ধর্তব্যের মধ্যে না এনে হোমস বলে চলল, “তবে কিছুটা আত্মমর্যাদাবোধ এখনও লোকটার মধ্যে রয়ে গেছে। লোকটা অলস প্রকৃতির। বেশি বাইরে বেরোয়-টেরোয় না। শরীরও বিশেষ দেয় না। মাঝবয়সী। মাথায় কাঁচাপাকা চুল। কিছুদিন আগেই কেটেছে। মাথায় লাইম-ক্রিম মাখে। এই টুপি থেকে এই ব্যাপারগুলোই নিশ্চিত করে বলে যায়। আর হ্যাঁ, খুব সম্ভবত লোকটার বাড়িতে গ্যাসের আলো নেই।” “ঠাট্টা করছ, হোমস?” “এক বর্ণও না। এত কথার পরেও বলে দিতে হবে যে, কি করে এগুলো জানতে পারলাম?” “আচ্ছা, আমি না হয় বোকাসোকা লোক। তোমার কথার কিছুই বুঝি না। কিন্তু তুমি কি করে বুঝলে যে, এই লোকটা বুদ্ধিমান?” উত্তরে হোমস টুপিটা নিজের মাথায় পরল। তার কপাল ঢেকে দিয়ে তার নাকের ডগা অবধি নেমে এল সেটা। সেটা দেখিয়ে হোমস বলল, “টুপিটার আকারটাই বলে দেয়, এত বড়ো মাথা যার, তার মগজেই নিশ্চয় কিছু আছে।” “কী করে বুঝলে লোকটার অবস্থা আগে স্বচ্ছল ছিল; কিন্তু এখন অবস্থা পড়ে গেছে?” “এই টুপিটা বছর তিনেকের পুরনো। এই রকম বাঁকা ধারওয়ালা টুপি তখনই বাজারে উঠেছিল। এমনিতে এটা খুব ভাল মানের টুপি। রেশমের বেড় আর লাইনিং-এর কাপড়টা দ্যাখো। বেশ দামি। যদি লোকটা তিন বছর আগে এই টুপিটা কিনতে পারে, এবং তারপর আর টুপিটা না পালটায় তাহলে বুঝতে হবে তাঁর অবস্থা এখন ভাল যাচ্ছে না।” “আচ্ছা বেশ, বোঝা গেল। কিন্তু তাঁর দূরদর্শিতা ও আত্মসম্মানবোধের কী প্রমাণ পেলে?” শার্লক হোমস হাসল। ছোট্টো চাকতি আর আঙটার উপর হাত রেখে বলল, “এখানেই আছে দূরদৃষ্টির পরিচয়। এগুলো টুপিতে লাগানো থাকে না। লোকটা নিশ্চয় অর্ডার দিয়ে বানিয়েছে। এর থেকেই বোঝা যায় যে, লোকটার দূরদৃষ্টি আছে। টুপিটা যাতে হাওয়ায় না উড়ে যায় এটা তারই ব্যবস্থা। কিন্তু দ্যাখো, এর ইলাস্টিকটা ছিঁড়ে গেছে। লোকটাও সেটা নতুন করে লাগায়নি। তার মানে দূরদৃষ্টি তার আগের থেকে কমে এসেছে। এটা স্বভাবের দুর্বলতার লক্ষণ। অন্যদিকে এই দাগগুলো কালি দিয়ে ঢাকার চেষ্টাটাই বলে দিচ্ছে লোকটা এখনও তার আত্মমর্যাদাবোধ সম্পূর্ণ হারায়নি।” “হুম! তুমি যা বলছ, তা একেবারে ফেলে দেওয়া যায় না!” “আরও শুনবে? এই লোকটা মাঝবয়সী, মাথায় কাঁচাপাকা চুল, সম্প্রতি চুল কেটেছে, লাইম-ক্রিম ব্যবহার করে–এসবের প্রমাণ কী? লাইনিং-এর নিচের অংশটুকু খুব কাছ থেকে পরীক্ষা করে দ্যাখো। লেন্স দিয়ে দেখলে দেখবে, নাপিতের কাঁচিতে কাটা চুলের কয়েকটা ডগা চিটে আছে। আর লাইম-ক্রিমের একটা আবছা গন্ধ পাবে। এই যে ধুলো দেখছো, এটা রাস্তার খড়খড়ে ধূসর ধুলো নয়, এই রকম হালকা বাদামি ধুলো বাড়ির ভিতরেই দেখা যায়। তার মানে এটা বেশির ভাগ সময় ঘরের মধ্যেই টাঙানো থাকে। টুপির ভিতরে ঘামের দাগ দেখে বুঝবে লোকটা খুব ঘামে। কারোর মাথা এতো ঘামা সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ নয়।” “কিন্তু কিভাবে বুঝলে যে, তাঁর স্ত্রী তাঁকে আর আগের মতন ভালবাসেন না?” “এই টুপিতে বেশ কয়েক সপ্তাহ ব্রাশ পড়েনি। ওয়াটসন, তোমার বউ যদি তোমাকে এই রকম ধুলোমাখা টুপি পরে বাইরে যেতে দেয়, তাহলে জানবে তুমি একটি হতভাগা। তোমার বউ আর তোমাকে ভালবাসে না।” “সে তো অবিবাহিতও হতে পারে।” “না। সে বাড়িতে একটা হাঁস নিয়ে যাচ্ছিল স্ত্রীকে তুষ্ট করতে। হাঁসের পায়ের কার্ডটায় কী লেখা ছিল মনে করে দ্যাখো।” “হুম! তোমার কাছে দেখছি সব কিছুরই উত্তর আছে। কিন্তু কী করে বুঝলে লোকটার ঘরে গ্যাসের আলো নেই?” “টুপিতে একটা-দুটো ট্যালোর[†] দাগ থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু দ্যাখো পাঁচ-পাঁচটা দাগ। এ থেকে নিঃসন্দেহে ধরে নেওয়া যায়, লোকটা খুব ঘন ঘন ট্যালো জ্বালে। রাতের অন্ধকারে এক হাতে টুপি আর অন্য হাতে জ্বলন্ত মোমবাতি ধরে উপরে ওঠে। গ্যাসজেট থেকে ট্যালোর দাগ পড়ে না। কি, মিলছে তো?” আমি হেসে বললাম, “নিঃসন্দেহে অসামান্য তোমার পর্যবেক্ষণ শক্তি! কিন্তু তুমি বলছো, কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটেনি। একটা হাঁস খোয়া-যাওয়া ছাড়া কারো কোনো ক্ষতি হয়নি। তাহলে আর এই সব পাঁচ-সাত ভেবে মাথা খারাপ করছো কেন হে?” হোমস একটা কী বলার জন্য মুখ খুলেছিল। কিন্তু এমন সময় দড়াম করে দরজা খুলে ঘরে ঢুকে এল কমিশনেয়ার পিটারসন। তার চোখমুখ লাল। একটা হতভম্ব ভাব। “মিস্টার হোমস, ওই হাঁসটা! ওই হাঁসটা, মশায়!” সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল। “অ্যাঁ? কী হয়েছে ওই হাঁসটা? ওটা কী আবার জ্যান্ত হয়ে উঠে ডানা মেলে জানলা দিয়ে উড়ে পালিয়ে গেছে?” উত্তেজিত লোকটার মুখটা ভাল করে দেখার জন্য সোফায় বসেই শরীরটাকে মোচড় দিল।“না মশায় না! দেখুন, আমার বউ ওই হাঁসটার পেট থেকে কী পেয়েছে!” এই বলে পিটারসন নিজের হাতটা মেলে ধরল। একটা জ্বলজ্বলে নীল পাথর। মটরশুঁটির দানার চেয়েও ছোটো। কিন্তু এত চকচকে যে মনে হচ্ছিল পিটারসনের হাত থেকে বিজলি আলো ঠিকরাচ্ছে। একটা শিস দিয়ে উঠে বসল হোমস। “বাই জোভ, পিটারসন! তুমি যে গুপ্তধন পেয়েছো হে। জিনিসটা কী জানো তো?” “মশায়, এটা কী হিরে? হিরে তো খুব দামি পাথর। কাঁচ কাটা যায়।” “এটা যে-সে দামি পাথর নয়। এটা হল সবচেয়ে দামি পাথর।” আমি বলে ফেললাম, “কাউন্টেস অফ মরকারের নীল পদ্মরাগ নয় তো!” “হ্যাঁ, সেটাই। এটা কেমন দেখতে তা আমার আগেই জানা ছিল। ‘দ্য টাইমস’-এ প্রায়ই এটার সম্পর্কে একটা বিজ্ঞাপন বেরোচ্ছে। আশ্চর্য পাথর এটা। এর আসল দাম শুধুই অনুমান করা যায়। এটার উপর ১০০০ পাউন্ড পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। তবে সেটা এর আসল দামের যে কুড়ি ভাগের এক ভাগও নয়, তা বলাই যায়।” “এক হাজার পাউন্ড! হা ভগবান!” কমিশনেয়ার ধপ করে একটা চেয়ারে বসে পড়ল। তারপর আমাদের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল। “হ্যাঁ, এক হাজার পাউন্ড। আমার মনে হয় এটার সঙ্গে কাউন্টেসের কিছু অমূল্য মধুর স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এটা ফিরে পাওয়ার জন্য উনি অর্ধেক সম্পত্তি হাতছাড়া করতেও অরাজি হবেন না।” আমি বললাম, “যতদূর মনে পড়ছে, এটা হোটেল কসমোপলিটান থেকে খোয়া গিয়েছিল।” “ঠিক বলেছো। বাইশে ডিসেম্বরের ঘটনা। ঠিক পাঁচ দিন আগে। কলের মিস্ত্রি জন হরনারকে গ্রেফতার করা হয় লেডির গয়নার বাক্স থেকে এটা সরানোর অভিযোগে। তার বিরুদ্ধে প্রমাণ এতই অকাট্য ছিল যে তাকে অ্যাসিজেসে [‡] পেশ করা হয়। আমার কাছে এই ঘটনার কাগজপত্র আছে মনে হয়।” হোমস কাগজপত্র হাতড়ে, তারিখের উপর চোখ বুলিয়ে, একটাকে বের করে আনল। তারপর সেটা দু-ভাঁজ করে পড়তে শুরু করল: হোটেল কসমোপলিটান থেকে চুরি রত্ন। এমাসের ২২ তারিখে কাউন্টেস অফ মোরকারের গয়নার বাক্স থেকে নীল পদ্মরাগ নামে একটি মহামূল্য রত্ন চুরির অভিযোগে জন হরনার নামে এক ছাব্বিশ বছর বয়সী কলের মিস্ত্রিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। হোটেলের প্রধান-পরিচারক জেমস রাইডারের সাক্ষ্য থেকে জানা গিয়েছে যে, রাইডার হরনারকে কাউন্টসের ড্রেসিং রুমে নিয়ে এসেছিল একটা ফায়ার প্লেসের একটা ভাঙা শিক ঝালাই করানোর জন্য। রাইডার কিছুক্ষণ হরনারের সঙ্গে ছিল। তারপর রাইডারের ডাক পড়ায় সে কিছুক্ষণ হরনারকে একলা রেখে কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যায়। ফিরে এসে সে দেখে হরনার চলে গেছে। ঘরের দেরাজ ভাঙা। যে ছোট্টো মরোক্কীয় বাক্সে কাউন্টসে রত্নটি রাখতেন, সেটি খালি অবস্থায় ড্রেসিং টেবিলের উপর খোলা পড়ে আছে। রাইডার সঙ্গে সঙ্গে অ্যালার্ম বাজায়। সেই দিন সন্ধ্যেবেলাই হরনারকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু রত্নটা তার কাছে বা তার ঘরে কোথাও পাওয়া যায়নি। কাউন্টেসের খাস-পরিচারিকা ক্যাথারিন কাসক রাইডারের চিৎকার শুনে ছুটে আসে। তার সাক্ষ্যের সঙ্গে রাইডারের সাক্ষ্য হুবহু মিলে গেছে। বি ডিভিশনের ইনস্পেক্টর ব্র্যাডস্ট্রিট হরনারকে গ্রেফতার করার কথা জানান। তিনি বলেন, হরনার গ্রেফতারের সময় পাগলের মতো ছটফট করছিল এবং খুব কড়া ভাষায় নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করছিল। তার বিরুদ্ধে আগেও ডাকাতির অভিযোগ থাকায় ম্যাজিস্ট্রেট চটজলদি কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে তাকে অ্যাসিজেসে পাঠিয়ে দেন। অভিযুক্ত অত্যন্ত বিহ্বল হয়ে পড়েছিল। ম্যাজিস্ট্রেটের রায় শুনে সে অজ্ঞান হয়ে যায়। তখন তাকে ধরাধরি করে কোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়। কাগজটা পাশে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হোমস খানিকক্ষণ চিন্তা করে বলল, “হুম! এই হল পুলিশ- কোর্টের ব্যাপার। এখন আমাদের কাছে প্রশ্ন হল, গয়নার বাক্স থেকে খোয়া যাওয়ার পর টটেনহ্যাম কোর্ট রোডের হাঁসের পেটে রত্নটা গেল কী করে? দেখলে তো, ওয়াটসন, আমাদের ওই একটুখানি পর্যবেক্ষণজনিত অনুমান কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে! ব্যাপারটাকে আর নেহাতই নিরীহ ব্যাপার বলা চলে না। এই পাথরটা বেরোলো হাঁসের পেট থেকে। হাঁসটা মিস্টার হেনরি বেকারের–যে ভদ্রলোকের খারাপ টুপি আর অন্যান্য চরিত্রবৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বক্তৃতা দিয়ে তোমাকে এতক্ষণ বিরক্ত করছিলাম। এবার আমাদের সবার আগে কাজ হবে ভদ্রলোককে খুঁজে বের করা এবং এই ছোট্টো রহস্যটায় তাঁর কী ভূমিকা রয়েছে সেটা জানা। তা করতে হতে আমাদের প্রথমে সবচেয়ে সহজ পদ্ধতিটি অবলম্বন করতে হবে। সন্ধ্যের কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দিতে হবে। কাজ না হলে, তখন অন্য পদ্ধতি ভাবব।” “কী বলবে বিজ্ঞাপনে?” “একটা পেনসিল আর একটুকরো দাও দেখি। হ্যাঁ, এবার শোনো: গুজ স্ট্রিটের কোণ থেকে একটা হাঁস ও একটা কালো ফেল্ট টুপি পাওয়া গিয়েছে। মিস্টার হেনরি বেকার নামে কারোর এই জিনিস দুটি খোয়া গিয়ে থাকলে তিনি আজ সন্ধ্যে সাড়ে ছটায় ২২১বি বেকার স্ট্রিটে এসে দেখা করুন। খুবই পরিস্কার ও সংক্ষিপ্ত।” “কিন্তু এটা কী তাঁর চোখে পড়বে?” “অবশ্যই। ভদ্রলোক নিশ্চয় কাগজের দিকে নজর রাখবেন। গরিব মানুষ। তাঁর কাছে এই খোয়া যাওয়াটা বড়ো ব্যাপার। ভুল করে একটা জানলার কাঁচ ভেঙে ফেলেছিলেন। তারপর পিটারসনকে দেখে ভয় পেয়ে পালিয়ে যান। পরে হাঁসটা ওভাবে ফেলে আসার জন্য ভদ্রলোক নিশ্চয় খুব আফসোস করেছেন। তাছাড়া তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এতে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করা সহজ হবে। তাঁকে যারা চেনে, তারাই তাঁকে বিজ্ঞাপনটা দেখিয়ে দেবে। পিটারসন, শোনো। বিজ্ঞাপন এজেন্সিতে গিয়ে এটাকে সন্ধ্যের কাগজে ছাপানোর ব্যবস্থা করো দেখি।” “কোন কাগজটা, মশায়?” “‘গ্লোব’, ‘স্টার’, ‘পল মল’, ‘সেন্ট জেমস’স’, ‘ইভনিং নিউজ স্ট্যান্ডার্ড’, ‘ইকো’ আর অন্যান্য, যাতে তুমি ভাল বোঝো।” “খুব ভাল কথা, মশাই। আর পাথরটা?” “ও হ্যাঁ, পাথরটা আমি রাখছি। ধন্যবাদ। আর, শোনো, পিটারসন, ফেরার পথে একটা হাঁস কিনে আমাকে দিয়ে যেয়ো তো। তোমরা তো ওই হাঁসটা দিয়ে আজ ভোজ করবে। আমাকে তো ভদ্রলোককে ওটার বদলে কিছু একটা দিতে হবে।” কমিশনেয়ার চলে গেলে, হোমস পাথরটা আলোর সামনে তুলে ধরে বলল, “জিনিসটা বেশ, তাই না! কেমন চকচক করছে দ্যাখো। আলো ঠিকরে পড়ছে যেন। সত্যি বলতে কী, এই পাথরটাই যত নষ্টের গোড়া। শুধু এই পাথর কেন, যে কোনো রত্নই এমন হয় – শয়তানের সবচেয়ে প্রিয় টোপ। যেসব রত্ন বেশ বড়ো আকারের বা বয়সে প্রাচীন, সেসব রত্নের সঙ্গে একটা না একটা খুনখারাপির ঘটনা জড়িত থাকবেই। পাথরটার বয়স তো এখনও কুড়িও হয়নি। এটা পাওয়া গিয়েছিল দক্ষিণ চীনের অ্যাময় নদীর তীরে। আকার-আকৃতি গুণাবলি সব পদ্মরাগের মতো, শুধু পদ্মরাগ হয় চুনির মতো লাল, এটা নীল। বয়সের কম হলে কী হবে, এর ইতিহাস খুব হেলাফেলার নয়। এখনই এর সঙ্গে দুটো খুন, একটা ভিট্রিওল-হামলা, একটা আত্মহত্যা, কয়েকটা ডাকাতির ঘটনা জড়িয়ে পড়েছে। আর এই সব কিছুর জন্য দায়ী এই চল্লিশ গ্রেন ওজনের কাঠকয়লার স্ফটিকটা। কে বলবে, এমন সুন্দর খেলনাটা আসলে ফাঁসিকাঠ আর জেলখানার রসদদার? এটাকে আমার স্ট্রং বক্সে[§] তুলে রাখি আর কাউন্টেসকে লিখে দিই যে আমরা এটা পেয়েছি।” “তোমার কী মনে হয়, এই হরনার লোকটা নির্দোষ।” “বলতে পারব না।” “ও! আর এই অন্য লোকটি? হেনরি বেকার? ইনিও কী এই ব্যাপারে জড়িত?” “আমার কী মনে হয় জানো? এই হেনরি বেকার লোকটি সম্পূর্ণ নির্দোষ। যে হাঁসটা সে বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, তার আসল দাম যে একটা নিরেট সোনার হাঁসের দামের চেয়েও বেশি, এই ব্যাপারটা সেটা লোকটার সম্পূর্ণ অজানাই থেকে গিয়েছিল। আমাদের বিজ্ঞাপনের উত্তর পেলে আমি একটা ছোট্ট পরীক্ষার মাধ্যমেই সেটা প্রমাণ করে দিতে পারব।” “আর ততক্ষণ কিছুই করবে না?” “কিচ্ছু না।” “তাহলে আমি এক চক্কর রোগী দেখে আসি। তবে সাড়ে ছটার আগেই ফিরে আসব। এই আজব রহস্যের সমাধান কিভাবে করো সেটা আমাকে দেখতেই হবে।” “সেই ভাল। আমি সাতটায় ডিনার করি। আজ একটা উডকক [**] এসেছে মনে হচ্ছে। ও হ্যাঁ, আজকাল যা সব ঘটছে, তাতে করে আমি মিসেস হাডসনকে আমাদের পাখিটার পেট একবার পরীক্ষা করে দেখে নিতে বলেছি।” একটা রোগীকে দেখতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল। বেকার স্ট্রিটে পৌঁছোতে পৌঁছোতেই সাড়ে ছ- টা বেজে গেল। গিয়ে দেখি বাড়ির সামনে স্কচ বনেট টুপি আর কোট পরা একটা লোক থুতনি-অবধি বোতাম আটকিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। ফ্যানলাইটের [††] উজ্জ্বল অর্ধবৃত্তাকার আলো এসে পড়েছে তার উপরে। দরজার কাছে আসতেই দরজা খুলে গেল। আমরা দু-জনে একসঙ্গে হোমসের ঘরে ঢুকলাম। হোমস চট করে আরামকেদারা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। হাসিমুখে অতিথিকে অভ্যর্থনা জানিয়ে বলল, “আপনিই নিশ্চয় মিস্টার হেনরি বেকার। আসুন, অনুগ্রহ করে আগুনের ধারে এসে বসুন, মিস্টার বেকার। আজ খুব শীত পড়েছে, আপনার স্বাস্থ্যও এই শীতের অনুকূল বলে মনে হচ্ছে না। আহ্, ওয়াটসন। একেবারে ঠিক সময়ে এসেছো। ওই টুপিটা কী আপনার, মিস্টার বেকার?” “হ্যাঁ, মশাই, নিঃসন্দেহে ওটা আমারই টুপি।” ভদ্রলোকের চেহারা লম্বা। কাঁধটা চওড়া। মুখখানা বুদ্ধিদীপ্ত। মুখে কাঁচাপাকা ছুঁচলো দাড়ি। নাক আর গালটা ঈষৎ লাল। হাতটা সামনের দিকে বাড়াতে একটু কেঁপে উঠল। তখনই লোকটার অভ্যাস সম্পর্কে হোমসের অনুমানের কথা মনে পড়ল। লোকটার ধুলোট কালো ফ্রক-কোটটা সামনের দিকে উপর পর্যন্ত বোতাম আঁটা। কলারটা তোলা। সরু কব্জিটা কোটের হাতার ভিতর থেকে বেরিয়ে ছিল, কোনো কাফ বা শার্টের চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল না। খুব ধীরে সুস্থে থেমে থেকে কথা বলছিলেন। খুব সন্তপর্ণে শব্দ চয়ন করছিলেন। দেখে মনে হচ্ছিল, ভদ্রলোক পণ্ডিত মানুষ; কিন্তু ভাগ্যের ফেরে অবস্থান্তরে পড়েছেন। হোমস বলল, “এই জিনিসগুলো দিনকয়েক ধরে আমাদের কাছে আছে। আমরা ভেবেছিলাম, আপনি আপনার ঠিকানা জানিয়ে বিজ্ঞাপন দেবেন। কিন্তু আপনি বিজ্ঞাপন দিলেন না দেখে একটু অবাকই হয়েছি।” লজ্জিত একটা হাসি হেসে আগন্তুক ভদ্রলোক বললেন, “এখন আর আমার আগের মতো অর্থসামর্থ্য নেই। আমি ধরেই নিয়েছিলাম, যে গুন্ডাদল আমাকে আক্রমণ করেছিল, তারাই আমার টুপি আর হাঁস নিয়ে পালিয়েছে। তাই ওগুলোর ফিরে পাওয়ার বৃথা আশায় আর নিরর্থক অর্থব্যয় করার সাহস হয়নি।” “খুবই স্বাভাবিক। ও হ্যাঁ, হাঁস বলতে মনে পড়ল। আমরা ওটা খেয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছি।” ভদ্রলোক আঁতকে উঠে বললেন, “খেয়ে ফেলেছেন!” “হ্যাঁ, তা না করলে ওটা একেবারেই নষ্ট হয়ে যেত। তবে ওই সাইডবোর্ডের উপর আর একটা হাঁস রাখা আছে। মনে হয়, ওটা আপনার চাহিদা পূরণ করতে পারবে। জিনিসটা ওজনে প্রায় এক আর বেশ তাজা।” মিস্টার বেকার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “ও হ্যাঁ, অবশ্যই অবশ্যই।” “অবশ্য আমরা আপনার নিজের হাঁসটার পালক, পা, নাড়িভুড়ি ইত্যাদি রেখে দিয়েছি, যদি চান তো…” ভদ্রলোক এবার হো হো করে হেসে উঠলেন। বললেন, “আমার সেই অভিযানের স্মৃতি হিসেবে সেগুলো মূল্যবান বটে। কিন্তু তাছাড়া আমার সেই পুরনো সঙ্গীর দেহাবশেষ আমার আর কী কাজে লাগবে, তা ভেবে পাচ্ছি না। না মশাই, যদি অনুমতি করেন, তাহলে আপনার সাইডবোর্ডে রাখা ওই চমৎকার হাঁসটাই নিয়ে যেতে চাই।” হোমস আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে কিঞ্চিৎ কাঁধ ঝাঁকালো। মুখে বলল, “তবে এই নিন আপনার টুপি আর আপনার হাঁস। হ্যাঁ, ভাল কথা, আপনি আমাকে বলতে পারেন ওই আগের হাঁসটা আপনি কোত্থেকে পেয়েছিলেন? হাঁস-মুরগি খাওয়াটা আমার শখ বলতে পারেন। কিন্তু এমন নধর হাঁস আমি খুব কমই দেখেছি।”


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯৯ জন


এ জাতীয় গল্প

→ নীল পদ্মরাগ (শার্লক হোমসের বাংলা গোয়ন্দা গল্প) পর্ব-১
→ নীল পদ্মরাগ (শার্লক হোমসের বাংলা গোয়ন্দা গল্প) শেষ পর্ব
→ নীল পদ্মরাগ (শার্লক হোমসের বাংলা গোয়ন্দা গল্প) পর্ব-১

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now

২৫.আটলান্টিকের ওপারে (৩)

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান আরাফাত হোসেন (০ পয়েন্ট)

X গ্রান্ড টার্কস দ্বীপ থেকে সোজা দক্ষিণে একটা দ্বীপ। নাম'ভিজকায়া মামুন্ড'। ‘ভিজকায়া'দ্বীপের ‘কেজান’ গ্রাম। গ্রামের কম্যুনিটি হল। কম্যুনিটি হলের মাঝখানে বৃত্তাকার চত্বরে তখন নাচ চলছে। প্রতি সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কম্যুনিটি হলে এই ধরনের সামাজিক সমাবেশ হয়। এতে খাওয়া-দাওয়া হয়, নাচ-গান চলে, খেলা-ধুলাও হয়ে থাকে। কম্যুনিটি হলের এক প্রান্তে একটা টেবিলে জেনিফার, তার মামী এবং মামাতো বোন সারা উইলিয়াম। লায়লা জেনিফার সপ্তাহখানেক হলো মামা বাড়ি এসেছে আত্মগোপনের তাকিদে। লায়লা ইতিমধ্যেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গায়ের রং তার সোনালী, স্বর্ণাভ চুল, নীল চোখ এবং আফ্রিকান মেয়েদের মত বলিষ্ট শরীর। নীচু স্বরে কথা বলছিল তারা। লায়লা জেনিফারের মামী কথা বলছিল সামাজিক পরিবেশের দ্রুত পরিবর্তনশীলতা নিয়ে। বলছিল সে, 'যারা একদিন তাদের দিকে মুখ তুলে কথা বলতে সাহস করত না, তারা এখন মাথায় চড়ে বসতে চাচ্ছে।' 'আমাদের নতুন জেনারেশন বেপরোয়া ধরনের। কারণ হয়তো এটাই মামী।' বলল জেনিফার। 'তুমি সাধারণ প্রবণতার কথা বলছ, মা। যদি এটা সাধারণ প্রবণতাই হতো, তাহলে সবার মধ্যেই এটা দেখা যেত। কিন্তু তাতো নয়। দেখা যাচ্ছে, কারো কারো কাছে হঠাৎ যেন আমরা অবাঞ্চিত হয়ে পড়েছি’। ‘সম্পর্কের অবনতি থেকে এমনটা হওয়া স্বাভাবিক।' ‘একদমই চিনি না, বা কোন সম্পর্ক কোনদিন ছিল না, এমন ক্ষেত্রেও তো এটা ঘটছে। সেদিন অটো হুইলারে করে বন্দরে যাচ্ছিলাম। তৃষ্ণা পাওয়ায় নামলাম 'ভিজকায়া মামুন্ড' রেস্টুরেন্টে। এই পুরনো রেস্টুরেন্টে ছোটবেলা থেকে হাজারো বার গিয়েছি। কিন্তু সেদিন যা দেখলাম, কোনদিন সেখানে তা ঘটেনি। পুরনো ওয়েটারের কাছে পানি চাইলে সে কাগজের গ্লাসে পানি দিল। বললাম, ‘কাগজের গ্লাস কেন?' 'হুকুম।'সে বলল। আমি বললাম, ‘সবাইকে কাগজের গ্লাস দেয়া হচ্ছে?' সে বলল, ‘সবাইকে নয় এক শ্রেণীর মানুষকে দেয়া হচ্ছে।' 'সেই এক শ্রেণীর সাথে কি আমাদের উইলিয়াম পরিবার আছে?' বললাম আমি। উত্তরে ওয়েটার ফিস ফিস করে বলল, 'আছে।' একশ'বছর আগে আমাদের উইলিয়াম পরিবার এই দ্বীপে আসে, তখন এই দ্বীপে কিছুই ছিল না। এই রেস্টুরেন্টেরও প্রতিষ্টা আমাদের টাকায় হয়। রেস্টুরেন্টে উপস্থিত খদ্দরদের অধিকাংশই তখন ছিল আফ্রিকান-ক্যারিব ইন্ডিয়ান কম্যুনিটির। ক্রীতদাস হিসেবে আফ্রিকান নিগ্রোদের সাথে'ক্যারিব গোত্রীয় ইন্ডিয়ানদের বিয়ের ফলে এই কম্যুনিটির উদ্ভব ঘটেছে। এদের মধ্যে স্পেনীয় মুর ও তুর্কি মুসলিমদের রক্তও রয়েছে। এ কম্যুনিটির বিপুল সংখ্যক মানুষ বিশ্বাসের দিক দিয়ে মুসলিম। এদেরকেও কাগজের গ্লাস দেয়া হয়েছে। এই কম্যুনিটির লোকেরা আমাকে সমর্থন করল। এই সময় রেস্টুরেন্টের পরিচালক মিঃ জন কাউন্টার থেকে উঠে এসে আমার টেবিলে বসল। নীচু স্বরে বলল, 'এসব নিয়ে কথা না বলাই ভাল ম্যাডাম। সময় পাল্টেছে।' আমি ক্ষুদ্ধ কণ্ঠে বললাম, 'কিন্তু উইলিয়াম পরিবারের সাথে এই অবিচার কেন?' মিঃ জন বলল, ‘এখন বলা হচ্ছে ম্যাডাম, আপনার উইলিয়াম পরিবার সান সালভাডোর থেকে পালিয়ে এসেছিল এবং বাঁচার জন্যেই আশ্রয় নিয়েছিল এই বিজন দ্বীপে।' আমি বললাম, ‘পালাবে কেন সানসালভাডোর থেকে?' সে বলল, আমি শুনলাম বলা হচ্ছে, আপনাদের উইলিয়াম পরিবার 'হিদেন' মানে ধর্মদ্রোহী। আমি প্রতিবাদ করে বললাম, ‘মিথ্যে কথা।' সে বলল, “‍কিন্তু বলা হচ্ছে, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের সানসালভাডোরে কলম্বাসের চীফ নেভিগেটর হিসেবে আগত আবু আলী আন্দালুশি খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে আবু আলী উইলিয়াম হয়ে যান এবং খৃষ্টান হিসেবেই সানসালভাডোরে বসতি স্থাপন করেন। অন্যান্য অনেক চালাক মুসলমানদের মত বিয়ে করে স্থানীয় আরাক রেডইন্ডিয়ানদের এক সর্দার কন্যাকে এবং নিজেকে শক্তিশালী করার পর আবু আলী স্বধর্ম অর্থ্যাৎ ইসলাম ধর্মে ফেরত যান। এই বিশ্বাসঘাতকতার জন্যেই উইলিয়াম পরিবার ধর্মদ্রোহী।' আমি তার কথার প্রতিবাদ করে বললাম, “আমার পূর্ব পুরুষ আবু আলী আন্দালুশি খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেননি। ওটা ছিল কলম্বাসের প্রচার। তিনিই আবু আলীর নামের শেষাংশ ‘আন্দালুশী' পাল্টে উইলিয়াম করেন। প্রতিকূল অবস্থার কারণে আবু আলী কলম্বাসের এই অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে চুপ থাকেন। এই চুপ থাকার অর্থ তার খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করা নয়।' মিঃ জন প্রতিবাদ করে বলল, ‘কলম্বাসের মত মহান একজনের উপর কি এমন অন্যায় চাপাতে পারেন?' আমি বললাম, ‘কলম্বাস মুসলিম বিদ্বেষী 'মহান' ছিলেন। তার অলিখিত একটা নীতি ছিল মুসলিম হিসেবে কোন লোককে তিনি জাহাজে নেবেন না। কিন্তু যাদেরকে নিতে তিনি বাধ্য হয়েছেন, তাদেরকে খৃষ্টান বলে পরিচয় দিয়েছেন। আবু আলী আন্দালুশির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।' মিঃ জন অবশেষে বলল, 'আমি যা বললাম তা আমার শোনা কথা। কিন্তু আপনাদের কাগজের গ্লাস ও কাগজের প্লেট দেবার আদেশ আমি লংঘন করতে পারবো না।' আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'এ আদেশ কার, সরকারের অবশ্যই হতে পারে না।' সে বলল, 'আমি ওদের চিনি না, কিন্তু ভয় করি। ব্যবসায় করতে হলে ওদের কথা আমার মানতে হবে।' থামল জেনিফার মামী আয়েশা উইলিয়াম। লায়লা জেনিফার ও সারা উইলিয়াম উদ্বেগের সাথে শুনছিল আয়েশা উইলিয়ামের কথা। মামী থামলে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে লায়লা জেনিফার বলল, 'কিন্তু মামী এসব হচ্ছে কি, কোথেকে হচ্ছে?' ‘জানি না বাছা। তবে আমি দেখছি, এক শ্রেণীর মানুষের মধ্যে ইদানিং পরিবর্তন এসেছে। সমাজ সম্পর্ক তারা বদলে দিতে চাচ্ছে।' ‘কোন শ্রেণীর কথা বলছেন?'জেনিফারই বলল। ‘মুখ্যত শ্বেতাংগের মধ্যেই এটা বেশি দেখা যাচ্ছে...' আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু জেমস ক্লাইভকে দেখে থেমে গেল জেনিফারের মামী। জেমস ক্লাইভ বৃটিশ বংশোদ্ভুত একজন পিওর শ্বেতাংগ যুবক। সে পাশ দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ ফিরে দাঁড়িয়েছিল জেনিফারদের টেবিলের দিকে এগিয়ে এল। দাঁড়াল এসে লায়লা জেনিফারের পাশে। লায়লা জেনিফারের মামাত বোন সারা উইলিয়ামের দিকে তাকিয়ে জেনিফারকে দেখিয়ে বলল, ‘এ কে সারা?' ‘আমার ফুফাতো বোন জেনিফার।' ‘বা নামও সুন্দর।'বলে জেমস ক্লাইভ জেনিফারের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। এটা নাচের আমন্ত্রণ। জেনিফার হাত না বাড়িয়ে বলল, ‘দুঃখিত’। জেনিফারের কথার সাথে সাথেই সারা উইলিয়াম বলে উঠল ‘মুসলমানদের অনেকেই এভাবে নাচে না জেমস।' জেনিফার'দুঃখিত'বলার সংগে সংগেই সংকুচিত হয়ে পড়েছিল জেমস ক্লাইভ। কিছুটা আহতও হয়েছিল সে। সারা উইলিয়ামের কথা শুনে হাসতে চেষ্টা করে বলল, ‘এখনও এ মাটির সংস্কৃতি গ্রহণ করো সারা, না হলে এ মাটিতে বাস করতে পারবে না।' মুখটা ম্লান হলো সারা উইলিয়ামের। কিন্তু বলল তবু, ‘এ মাটির সংস্কৃতি এটা নয়, এ এসেছে ইউরোপ থেকে।' ‘ইউরোপ এ মাটি জয় করেছে, অতএব এটাও ইউরোপ এবং ইউরোপের সাংস্কৃতিই এর সংস্কৃতি।' ‘কিন্তু জেমস, এ দ্বীপপুঞ্জসহ ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের দুই তৃতীয়াংশ মানুষ আফ্রিকা থেকে আসা। তাদের অর্ধেকেরও বেশি মুসলমান। তারা এ দেশ আবাদ করেছে, বসবাসযোগ্য করেছে। সুতরাং তাদের সংস্কৃতি এ মাটির সংস্কৃতি হবে না কেন?' ‘এসব কুটযুক্তি দিয়ে শেষ রক্ষা হবে না সারা।' বলে সে ঘুরে দাঁড়িয়ে অন্য একটি টেবিলের অন্য একটি মেয়ের হাত ধরে গিয়ে শামিল হল নাচের সারিতে। জেনিফারদের তিনজনের মুখই ম্লান। সারা উইলিয়ামের চোখে-মুখে ভয়েরও চিহ্ন। তিনজনই নীরব। নীরবতা ভাঙল জেনিফারের মামী আয়েশা উইলিয়াম। বলল, ‘ক'বছর আগেও উইলিয়াম পরিবারকে হুমকি দূরে থাক, এমনভাবে মাথা উঁচু করে কথা বলার সাধ্য কারো ছিল না।' ‘আম্মা সবাই জানে জেমস যেদিকে হাত বাড়ায় খালি হাত তার ফিরে আসে না। আমার ভয় করছে লায়লার জন্যে। ও এমনিতেই বিপদে আছে।' সারার আম্মা কিছু বলতে যাচ্ছিল। এমন সময় টেবিলের সামনে এসে দাড়াল গ্রামের বার্নস পরিবারের কালমা বার্নস। তার মুখ মলিন। আয়েশা উইলিয়াম তাকে বসতে বলল, 'কি হয়েছে মিঃ বার্নস? কিছু ঘটেছে?' ‘শিশু সনদে আমার ছেলেটি মারা গেছে। নিয়ে আসা হয়েছে। জানাযার জন্যে দাওয়াত দিতে এসেছি।' ‘ভুমিষ্ট হবার পর সম্পূর্ণ সুস্থ শুনেছিলাম। হঠাৎ কি হয়েছিল?' ‘হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। ডাক্তাররা সব চেষ্টা করেও রোগ ধরতে পারেনি। কোন একটা নতুন ভাইরাস এসেছে বলে ডাক্তাররা মনে করছে। আমি তো গত ৭ দিন শিশু সনদে যাতায়াত করছি। এর মধ্যেই ৪ টি শিশু মারা গেছে।' কালমা বার্নস থামতেই লায়লা জেনিফার দ্রুত বলে উঠল, ‘ঐ চারটি শিশু ছেলে না মেয়ে?' বার্নস একটু চিন্তা করল। তারপর বলল, ‘চারটি শিশুই ছেলে।' ‘মাফ করবেন, কোন মেয়ে শিশু কি ঐ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে?'বলল জেনিফার। বার্নস হঠাৎ যেন জেগে উঠল। বলল, 'একটা মজার প্রশ্ন করেছেন তো? ঠিকই কোন মেয়ে শিশু ঐ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়নি। আমার জানা মতে গোটা ছয়েক মেয়ে শিশু এখন শিশু সনদে রয়েছে। অথচ ছেলে শিশু এখন শিশু সনদে একটিও নেই। ৪টি ছিল, ৪টিই মরে গেছে।' মনে মনে শিউরে উঠল লায়লা জেনিফার। শিশু সনদে ছেলে শিশু যেমন এখন একটিও নেই, তেমনি গোটা দেশ থেকে, গোটা ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ থেকে মুসলিম পুরুষ উজাড় করবে। হঠাৎ তার মনে প্রশ্ন জাগল, শিশু সনদে ঐ চারটি ছেলে শিশু মুসলিম ছিল কিনা। সংগে সংগেই লায়লা জেনিফার প্রশ্ন করল, ‘ঐ চারটি পুরুষ শিশু মুসলিম পরিবারের ছিল কিনা?' ‘জি হ্যাঁ।'বার্নস জবাবে বলল। কথা শেষ করেই বার্নসই আবার প্রশ্ন করল, ‘এ প্রশ্নের হেতু কি? মুসলিম অমুসলিম পার্থক্য আসছে কেন?' ‘না এমনি কৌতুহল।'ম্লান হেসে বলল লায়লা জেনিফার। ‘আপনার কৌতুহল ঠিক আছে। আমি ম্যাটারনিটিতে বলাবলি করতে শুনেছি যে, আজকাল মুসলিম ছেলে সন্তান বাঁচছে না।' ‘কারণ সম্পর্কে ওরা কি বলে?'বলল জেনিফার। ‘ঐ সম্পর্কে কিছু শুনিনি। হায়াত মৃত্যুর উপর কারও হাত নেই।' ‘ঠিক।'বলল আয়েশা উইলিয়াম। পাশেই এক টেবিল ওপারে একটা মেয়ে মাথা নিচু করে চা খাচ্ছিল। মেয়েটিকে দেখতে পেয়েছে সারা উইলিয়াম। তার আম্মার কথা শেষ হতেই সে মেয়েটিকে লক্ষ্য করে বলে উঠল, 'কি সুসান মনে হচ্ছে তোমার মাথায় এক পাহাড় চেপে বসেছে?' মেয়েটির নাম সুমা সুসান। লোকাল কাউন্সিলের একজন কর্মচারী। সে চোখ তুলে তাকিয়ে সারা ও তার মাকে দেখেই উঠে দাঁড়াল টেবিল থেকে। এসে সারাদের টেবিলে বসতে বসতে বলল, ‘আমি এদিকে খেয়াল করিনি। খালাম্মা আপনি কেমন আছেন?'সুমা সুসানের লক্ষ্য সারার মা। ‘তোমার কথা বল আগে। তোমাকে এত বিমর্ষ দেখাচ্ছে কেন?' গম্ভীর হলো সুমা সুসান। একটুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, ‘এমন নগ্ন অবিচার কি সহ্য করা যায়?' ‘কোন অবিচারের কথা বলছ?'প্রশ্ন করল সারা। ‘মামুন শেরম্যান-এর নাগরিকত্ব হয়নি, অথচ মুলিভান স্মিথ যেন-তেন দরখাস্ত করেই নাগরিকত্ব পেয়ে গেছে।'বলল সুসান। শেরম্যান জার্মান বংশোদ্ভুত একজন কানাডীয় মুসলিম ছাত্র। সুসানের সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। আর মুলিভান স্মিথ একজন ডেনিশ যুবক। ‘হলো না কেন? আমি তো জানি সব ঠিক-ঠাক হয়ে গিয়েছিল।'বলল সারা। ‘শুনলাম একটা মহল থেকে চাপ দেয়া হয়েছে তাকে নাগরিকত্ব না দেয়ার জন্যে।'সুসান বলল। ‘কোন মহল?'জিজ্ঞেস করল জেনিফার। ‘সেটা বলতে তার ভয় করছে।' ‘মুলিভানের ক্ষেত্রে এ চাপ আসেনি?'আবার জিজ্ঞেস করল জেনিফার। ‘না।'সুসান জানাল। ‘মামুন শেরম্যান মুসলমান এবং মুলিভান স্মিথ খৃষ্টান, এই পার্থক্য ছাড়া উভয়ের মধ্যে আর কোন পার্থক্য আছে কি?'জেনিফারের প্রশ্ন। ‘আমি দেখিনা। বরং নাগরিকত্ব পাওয়ার পক্ষে মামুনেরই প্লাস পয়েন্ট বেশি।' 'তাহলে?' একটু ভেবে সুসান বলল, ‘দরখাস্ত করার সময় ওর পরিচিত একজন ওকে তার'ধর্ম ইসলাম'একথা না লেখার জন্যে পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু বিশ্বাস গোপন করতে সে রাজী হয়নি।' ‘এর অর্থ মুসলমানদের প্রতি বৈষম্য করা হচ্ছে।'বলল সারা উইলিয়াম। কিছু বলতে যাচ্ছিল জেনিফার। কিন্তু তার আগেই তার মামী বলল, ‘এখানে আর নয়। চল তোমরা বাসায়। সব কথা সব জায়গায় বলা ঠিক নয়।' বলে উঠে দাঁড়াল আয়েশা উইলিয়াম। সারা সুসানকেও টেনে নিয়ে আসল বাসায়। তারা বসল সারাদের বৈঠকখানায়।' সারাদের ‘উইলিয়াম'পরিবারটি এই ভিজকায়া মামুন্ড দ্বীপের সবচেয়ে পুরনো ও অভিজাত পরিবার। বিরাট বাড়ি। বসেই জেনিফারের মামী আয়েশা উইলিয়াম বলল, 'সামাজিক ও রাজনৈতিক সামগ্রিক অবস্থার সাথে জেনিফারের বিপদের কথা মেলানোর পর আমার ভাল ঠেকছে না। কথাবার্তায় আমাদের সাবধান হওয়া দরকার। জেমস-এর হুমকিটা কোন বিচ্ছিন্ন ব্যাপার নয়।' 'ঠিক বলেছেন মামী। চারদিকটা যেন আমাদের ক্লোজ হয়ে আসছে। কিন্তু কি হচ্ছে, আমরা কি করব কিছুই বুঝা যাচ্ছে না।'বলল জেনিফার ম্লান কণ্ঠে। ‘এসব বুঝবে কে? দেখবে কে?'বলল সুসান। আয়েশা উইলিয়াম দ্বীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘এটাই এখনকার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আমাদের সংখ্যা আছে, শক্তি নেই। আমাদের বিত্ত যতটুকু আছে, বুদ্ধি ততটুকু নেই।' ‘দিন দিন অবস্থা এমন খারাপ হয়ে যাচ্ছে কেন?'বলল সারা উইলিয়াম। সারা উইলিয়ামের মা সোফায় হেলান দিল। তার মুখে কান্নার মত করুণ হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘এই ক্যারিবিয়ান দ্বীপাঞ্চলেরও তো আদি বাসিন্দা ছিল আরাক ও ক্যারিব রেডইন্ডিয়ানরা। লাখ লাখ সংখ্যায় তারা ছিল কিন্তু তারা এখন নেই। আমাদের রক্তে তারা বেঁচে আছে মাত্র। আফ্রিকা ও এশিয়া থেকে আমাদের পূর্ব পুরুষরা দাস, শ্রমিক, চাকুরে ও অভিযাত্রী হিসেবে এই অঞ্চলে এসেছিল। তারাই আবাদ করেছে এই ভূখন্ডগুলো। কে জানে রেডইন্ডিয়ানদের মত তাদেরও দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে কিনা।'থামল আয়েশা উইলিয়াম। সবাই নীরব। সকলের মুখেই ভয় ও হতাশার চিহ্ন। আয়েশা উইলিয়ামই আবার মুখ খুলল। বলল, ‘লায়লা জেনিফারের মাথায় যে বিপদ এসে চেপেছে, তার কারণ কি? লায়লার কি অপরাধ? তার সাথীদের কি অপরাধ ছিল? তাদের পরিসংখ্যানে জনসংখ্যাগত একটা সমস্যা প্রকাশ পেয়েছিল। এর বেশি তো কিছু নয়? কেন তার সাথীরা খুন হলো? কেন খুনের ছোরা লায়লার মাথার উপর উদ্যত? কে করবে এই সমস্যার সমাধান?'থামল আয়েশা উইলিয়াম। এবারও সবাই নীরব। সবারই মুখে আয়েশা উইলিয়ামের মতই একই অব্যক্ত প্রশ্ন। একটা অটো হুইলার টেম্পো জাতীয় উন্নতমানের গাড়ি সশব্দে এসে সারাদের গেটে থামল। জেনিফাররা সবাই তাকাল সেদিকে। গাড়ি থেকে নেমে একটি মেয়ে দ্রুত এগুলো সারাদের বৈঠকখানার দিকে। মেয়েটি কৃষ্ণাংগ। কিন্তু চেহারা নিগ্রোদের মত নয়। চেহারায় এশিয়া ও ইউরোপের মিশ্রণ আছে। তাকে দেখেই আনন্দে চিৎকার করে উঠল লায়লা জেনিফার, ‘হ্যাল্লো মাকোনি।'বলে জেনিফার ছুঠল তার দিকে। হাত ধরে টেনে নিয়ে এসে পরিচয় করিয়ে দিল সবার সাথে, ‘এ হলো আমার বন্ধু শুভাকাঙ্খী সুরাইয়া মাকোনি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক রিলেশন্স অফিসার। আরেকটা পরিচয় হলো, আমাদের দূর্ভাগ্যজনক সেই সমীক্ষায় ইনি পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেছেন।' সবার সাথে হ্যান্ডসেক ও কুশল বিনিময় করে সুরাইয়া মাকোনি বসল। বসেই লায়লা জেনিফারের দিকে সহাস্যে তাকিয়ে বলল, ‘গুডলাক জেনিফার।' লায়লা জেনিফার চমকে উঠল। বলল, ‘বিপদের সময় একথা কেন মাকোনি?' সুরাইয়া কোন কথা না বলে একখণ্ড কাগজ তুলে দিল জেনিফারের হাতে। আয়েশা উইলিয়াম, সারাহ উইলিয়াম এবং সুমা সুসান এক রাশ কৌতূহল নিয়ে দেখছিল ব্যাপারটা। লায়লা জেনিফারও কৌতুহল নিয়ে হাতে নিল কাগজ খন্ড। কাগজটি একটি ফ্যাক্স শিট। একটা ফ্যাক্স মেসেজ ওটা। ইংরেজীতে লেখা ফ্যাক্স মেসেজটি পড়ল লায়লা জেনিফার। পড়েই'ও গড'বলে চিৎকার করে উঠে দাঁড়াল জেনিফার। তারপর দু'হাতে মুখ ডেকে বসে পড়ল। বিস্মিত উদ্বিগ্ন আয়েশা উইলিয়াম প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল সুরাইয়া মাকোনির দিকে। ‘ওটা অকল্পনীয় এক আনন্দের প্রকাশ খালাম্মা। চিন্তা করবেন না।' বলল মাকোনি আয়েশা উইলিয়ামকে লক্ষ্য করে। মুখ থেকে দু'হাত সরিয়ে মুখ তুলল লায়লা জেনিফার। তার গোটা মুখ অশ্রুতে ধোয়া। ঠোঁটে আনন্দের হাসি। বলল, ‘সত্যি মামী, এ এক অকল্পনীয় আনন্দ, অভাবিত এক সুসংবাদ।' বলতে ইয়ে আবার কেঁদে ফেলল জেনিফার। বলল কাঁদতে কাঁদতেই, ‘আমাদের মত এত ক্ষুদ্র মানুষদের আল্লাহ্ এত দয়া করবেন!' ‘কিছুই বুঝতে পারছি না।'বলে সারা উইলিয়াম জেনিফারের হাত থেকে কাগজ খন্ডটি টান দিয়ে কেড়ে নিল। পড়ল সে। পড়ে সেও চিৎকার করে উঠল, ‘অসম্ভব, অবিশ্বাস্য ব্যাপার। সত্যি কি এ ফ্যাক্স তার?'সারা উইলিয়াম দৃষ্টি মাকোনির দিকে। মাকোনি মুখ খোলার আগেই 'কি ব্যাপার, দেখি ওতে কি আছে'বলে আয়েশা উইলিয়াম কাগজ খন্ডটি কেড়ে নিল সারা-এর কাছ থেকে। দ্রুত নজর বুলাল সে ফ্যাক্স মেসেজটির উপর। পড়লঃ "প্রিয় বোন লায়লা, আসসালামু আলাইকুম, যার নামে আপনার ফ্যাক্স মেসেজ ছিল, তার নির্দেশে আপনাকে জানাচ্ছি, তিনি আপনার ফ্যাক্স-মেসেজ পড়েছেন। এই মুহূর্তে তিনি বিমানে, মদীনার পথে। মদীনা পৌছার পর তিনি প্রথম সুযোগেই টার্কস দ্বীপপুঞ্জ সফর করবেন। ওয়াচ্ছালাম। আপনার এক ভাই আসিফ আজিম মস্কো" ফ্যাক্স মেসেজ থেকে মুখ তুলে আয়েশা উইলিয়াম বলল, 'কিছুই তো বুঝলাম না। কার ফ্যাক্স মেসেজ? কে টার্কস দ্বীপপুঞ্জে আসছেন?' ‘ও আম্মা, তুমি আগের ঘটনা জান না ও মেসেজটি মহামান্য ভাই আহমদ মুসার।'বলল সারা উইলিয়াম। ‘কোন আহমদ মুসা? যার নাম পত্র-পত্রিকায় পড়েছি?' ‘জ্বি আম্মা।' ‘বল কি? তিনি লায়লা জেনিফারের কাছে ফ্যাক্স করতে যাবেন কেন? তোমরা মস্করা করছ আমার সাথে। বল তো, ‘প্রকৃত ঘটনা কি?' সারা উইলিয়ামের মুখে হাসি। বলল, 'সে জন্যেই তো আম্মা আমি ব্যাপারটাকে অসম্ভব ও অবিশ্বাস্য বলেছিলাম। ঘটনা ঠিক আম্মা। লায়লা সত্যি ফ্যাক্স পাঠিয়েছিলেন তাঁর কাছে।' রাজ্যের বিস্ময় এসে ভীড় করল আয়েশা উইলিয়ামের চোখে-মুখে। কিছুক্ষণ সে কথা বলতে পারল না। হাঁ করে তাকিয়ে থাকল সারা উইলিয়ামের দিকে। এক সময় ধীরে ধীরে বলল, 'ফ্যাক্স সত্য হলে তিনি তো আসছেন। এত বড় দয়া আল্লাহ এই দ্বীপবাসীকে করবেন।' ‘মামী, আমারও এই কথা। একটি অতি নগন্য বালিকার ফ্যাক্সকে আহমদ মুসা এইভাবে অনার করবেন। আল্লাহ এতবড় দয়া করবেন এই দ্বীপবাসীকে। আমি ফ্যাক্স করেছিলাম একটা আবেগবশত। তাঁর আসার জন্যে নয়।' ‘তুমি তাঁর ঠিকানা পেলে কোথায়?'বলল জেনিফারের মামী। ‘ঠিকানা তো জানি না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীতে বিশ্বের ইসলামী সংগঠনগুলোর একটা ইনডেক্স পেয়েছিলাম। তাতে মক্কার রাবেতায়ে আলমে আল-ইসলামীর ফ্যাক্স নম্বার ও ঠিকানা ছিল। আমি ঐ ফ্যাক্সে আহমদ মুসাকে চিঠিটা পাঠিয়েছিলাম।' ‘তুমি ফ্যাক্স পাঠিয়েছিলে মক্কায়, কিন্তু উত্তর তো এল মস্কো থেকে।'বলল তার মামী। লায়লা মুখ খোলার আগেই কথা বলে উঠল সুরাইয়া মাকোনি। বলল, ‘তখন আহমদ মুসা যেহেতু মস্কো ছিলেন, তাই রাবেতা মনে হয় ফ্যাক্সটা মস্কোয় তাঁর কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিল।' ‘থ্যাংকস গড। ভাগ্য জেনিফারের।'বলল জেনিফারের মামী আয়েশা উইলিয়াম। ‘ভাগ্য জেনিফারের নয় মামী, ভাগ্য দ্বীপবাসীর। আল্লাহর বিশেষ দয়াতেই এটা হয়েছে। না হলে নগন্য এক বালিকার মক্কায় পাঠানো ফ্যাক্স মস্কোতে যায়!'বলল জেনিফার। ‘আমারও তাই মনে হচ্ছে, আল্লাহ আমাদের প্রতি মুখ তুলে চেয়েছেন। বিশ্বাস করবেন না খালাম্মা , ফ্যাক্সটা পাওয়ার পর আমার অবস্থা কি হয়েছিল। জেনিফার তো আনন্দে কেঁদেছে। আর আমি কাঁপতে শুরু করেছিলাম। একটা অদৃশ্য শক্তি যেন আমাকে এখানে ঠেলে এনেছে। আমার মনে হচ্ছে, দুঃখের দিন আমাদের শেষ হচ্ছে।'বলল সুরাইয়া মাকোনি। ‘তাই যেন হয়।'বলে আয়েশা উইলিয়াম একটু থামল। তারপর বলল, ‘ফ্যাক্সে আহমদ মুসার নাম নেই। বুঝলাম না এটা কেন?' ‘এটা খুবই সোজা ব্যাপার মামী। মেসেজ উনি পাঠিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাক্সে। এটা যে কারও হাতে পড়তে পারতো এবং প্রকাশ হয়ে পড়তো আহমদ মুসা এখানে আসছে। আর তখনই ওটা আগুনের মত ছড়িয়ে পড়তো সবখানে। আর তাতে ওঁর চেয়ে বিপদে পড়তাম আমরাই বেশি।'জেনিফার বলল। ‘বুঝেছি আমি। থ্যাংকস গড, যে ও রকম কিছু হয়নি।'বলল তার মামী। কথা শেষ করেই সে জেনিফার ও সারার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মেহমানকে ভেতরে নিয়ে যাও। খাবার এবং রেষ্টের ব্যবস্থা কর।' ‘যাচ্ছি মামী।'বলে হেসে উঠে দাঁড়াল জেনিফার। জেনিফার, সারা এবং মাকোনি তিনজনেই ভেতরে চলে গেল। সুসানও চলে যাবার জন্যে উঠে দাঁড়াচ্ছিল। এ সময় আরেকটি অটো হুইলার এসে দাঁড়াল গেটে। গাড়ি থেকে নামল অপরিচিত এক ভদ্রলোক। বয়স চল্লিশের মত হবে। দেহের শক্তিশালী গড়ন। চোখ-মুখের চেহারা খুব তীক্ষ্ণ। শরীরের রং কালো, কিন্তু দৈহিক গড়নে বৃটিশ। সুসান আবার বসে পড়েছিল তার সোফায়। দু'জনেই তাকিয়েছিল ভদ্রলোকের দিকে। ভদ্রলোক আসছিল বৈঠকখানার দিকে। সুসান ও আয়েশা উইলিয়াম দু'জনেই উঠে দাঁড়িয়েছিল। আয়েশা উইলিয়াম ভদ্রলোককে স্বাগত জানিয়ে বসতে অনুরোধ করল। তার চোখে প্রশ্নবোধক দৃষ্টি। ভদ্রলোকের ঠোঁটে ঈষৎ হাসি। বসতে বসতে সে বলল, 'আপনি নিশ্চয় আয়েশা উইলিয়াম?' নিজের পরিচয় দেয়ার সৌজন্যটুকু প্রদর্শন না করে বরং তাকে প্রশ্ন করল এতে দারুণ বিরক্ত হলো আয়েশা উইলিয়াম।এ ধরনের আচরণ থানার পুলিশ এবং কোটের উকিলরা করে থাকে। হঠাৎ তার মনে হলো, সৌজন্য বোধহীন লোকটি ঐ ধরনের কেউ নয় তো? কোন মতলব নিয়ে আসেনি তো? সাবধান হলো সে। লোকটির প্রশ্নের উত্তরে আয়েশা উইলিয়াম ছোট্র উত্তর দিল, ‘হ্যা।' ‘আপনার ননদ কন্যা লায়লা জেনিফার কতদিন এখানে এসেছেন?' মনে মনে আঁৎকে উঠল আয়েশা উইলিয়াম। তার মনে হলো, লোকটি তাহলে জেনিফারের খোঁজেই এসেছে। নিজেকে সামলে নিয়ে আয়েশা উইলিয়াম স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, ‘এসেছেন'নয় এসেছিলেন'বলুন। ‘তার মানে তিনি চলে গেছেন?'লোকটির কণ্ঠে কিছুটা হতাশা এবং ব্যস্ততা। ‘এই তো আপনি আসার পনের বিশ মিনিট আগে।' কথা শেষ করেই আয়েশা উইলিয়াম প্রশ্ন করল, 'দু্ঃখিত আপনাকে চিনতে পারলাম না। আমার নাম জানলেন কি করে? আমার ননদ কন্যাকে আপনার কি প্রয়োজন?' ‘বলছি, লায়লা জেনিফার কোথায় গেল বলতে পারেন?'বলল লোকটি। গ্রান্ড টার্কস-এ গেছে, নিশ্চয় বিশ্ববিদ্যালয়েই গেল। জানতে পারি কি, কি ধরনের প্রয়োজন জেনিফারের সাথে?' লোকটি একটু চিন্তা করল, তারপর বলল, ‘আমি বেসরকারী গোয়েন্দা সংস্থার একজন সদস্য। আমরা দায়িত্ব পেয়েছি জেনিফারকে খুঁজে বের করার।' ‘কেন জেনিফার কি ফেরারী আসামী যে, তাকে এভাবে খুঁজে বের করার জন্যে লোক নিয়োগ করতে হবে?" ‘আমি কিছু জানিনা ম্যাডাম। তাকে খুঁজে বের করাই শুধু আমাদের দায়িত্ব।' ‘এই দায়িত্ব কে দিয়েছে? পুলিশ?' ‘আমি তাও জানি না। জানতে পারে আমাদের সংস্থা। তবে পুলিশ নয় এটুকু জানি।' ‘কারণ, উদ্দেশ্য, ইত্যাদি না জেনে এ ধরনের দায়িত্ব গ্রহণ কি নৈতিক?' ‘এর উত্তরের দায়িত্ব আমার সংস্থার উপর বর্তায়, আমার উপর নয়।' আমার ভাগ্নি যদি এখানে থাকতো, তাহলে কি করতেন? ধরে নিয়ে যেতেন? এটা কি সম্ভব ছিল?' ‘স্যরি ম্যাডাম, ধরা আমার দায়িত্ব নয়। সন্ধান পেলে আমি ওদের জানিয়ে দিতাম এবং জেনিফার কোথাও গেলে আমি ওকে ফলো করতাম। যাতে তিনি আমার চোখের বাইরে না যেতে পারেন। ধরা, না ধরা, এসব দায়িত্ব ওদের।' ‘কিভাবে আপনি জানাতেন?' লোকটি পকেট থেকে একটা মোবাইল টেলিফোন বের করল। বলল, ‘এই টেলিফোন ব্যবহার করতাম।' কথা শেষ করে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, 'চলি ম্যাডাম। দুর্ভাগ্য আমার। আসার পথে মিনিট বিশেক আগে একটা অটো হুইলার বন্দরের দিকে যেতে দেখেছি। হতে পারে ওটাতেই তিনি গেছেন।' বলে গেটের দিকে পা বাড়াল লোকটি। লোকটির অটো হুইলার স্টার্ট নিয়ে চলে গেল। ঠিক সে সময়েই পরিচিত একটা ছেলে হাতে একটা ইনভলপ নিয়ে প্রবেশ করল গেট দিয়ে। ছেলেটি জেমস ক্লাইভ-এর ছোট ভাই। তাকে দেখে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করল আয়েশা উইলিয়াম। তখনই কম্যুনিটি সেন্টারের কথা তার মনে পড়ে গেল। ছেলেটি এসে তার হাতের ইনভেলপটি তুলে দিল আয়েশা উইলিয়ামের হাতে। ইনভেলপের উপর লেখা লায়লা জেনিফারের নাম। ইনভেলপ দিয়েই চলে গেছে ছেলেটি। ইনভেলপ খুলল আয়েশা উইলিয়াম। মাত্র কয়েক লাইন লেখা। পড়ল। "প্রিয় লায়লা জেনিফার, আজ রাতে ৮টায় আমাদের খামার বাড়িতে আপনাকে ডিনারের আমন্ত্রণ। ডিনারে যোগ দিয়ে আমাকে ধন্য করবেন। জেমস ক্লাইভ" বৈঠকখানায় প্রবেশ করল সারা এবং জেনিফার, সারা বাইরের দরজা-জানালা বন্ধ করে দিল। তারপর তার মায়ের কাছে ফিরে এসে বলল, ‘প্রাইভেট গোয়েন্দার সব কথা আমরা শুনেছি। ও চিঠিতে কি আছে আম্মা। চিঠিটা পড়ছিল জেনিফার। কম্পিত হাতে জেনিফার চিঠিটা তুলে দিল সারা-এর হাতে। সারা চিঠিটা পড়ে বলল, 'সর্বনাশ আম্মা, এর অর্থ ভয়ংকর। ওদের লাম্পট্যের আড্ডা ওদের খামার বাড়ি।' সারার মা আয়েশা উইলিয়াম-এর চোখে-মুখে তখন অপমান ও উদ্বেগের কালো ছাপ। 'ঐ লম্পটের ক্ষমতার উৎস কি, সারা?'বলল লায়লা জেনিফার। 'কাকুজ ও টার্কস দ্বীপপুঞ্জের বৃটিশ গভর্নরের সিকুরিটি বাহিনীতে আছে ওর ভাই। এটা এবং শ্বেতকায় হওয়া এ দু'টোই তার ক্ষমতার উৎস। ওরা আমাদের টার্কস দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দা নয়। বাড়ি কাকুজ দ্বীপপুঞ্জের গ্রান্ড কাকুজে। আর গ্রান্ড কাকুজ বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়ে বলে কথা আছে। কিন্তু তাকে কোনদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে দেখা যায়নি। আজ এক বছর হলো ওদের পরিবারের একটা অংশ এ দ্বীপে এসেছে। বৃটিশ গভর্নর নাকি তাদেরকে জমির পত্তনি দিয়েছে। ওদের জমির পরিধি ক্রমেই বাড়ছে। পরিস্কার মনে হচ্ছে ওরা বাস করতে নয় দ্বীপ দখল করতে এসেছে। এ পর্যন্ত ওরা প্রায় ৫০টি টার্কো পরিবারকে বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ করেছে, যাদের সকলেই মুসলমান।' 'এ অবিচারের কোন প্রতিকার হয়নি?' 'বিচার চাওয়াই হয়নি। এই যে ডিনারের দাওয়াত দিয়েছে। না গেলে ধরে নিয়ে যাবে। ফেরত দিয়ে যাবে সকালে। কোথায় বিচার পাওয়া যাবে এর। বিচার চাওয়ার চেষ্টা করলে প্রণেই মেরে ফেলবে।' 'একক নয়, সম্মিলিত উদ্যোগ তো নেয়া হয়নি।' বলল জেনিফার। 'বড় চাচা কেন নিহত হয়েছেন, তাঁর বড় ছেলে আলী ভাইয়া কোন ভয়ে আমাদের দ্বীপাঞ্চলের বাইরে গ্রেট ইন্ডিয়াতে আশ্রয় নিয়েছে তা তুমি ভুলে গেছ। একটা সমিতি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল, এটাই ছিল তাদের অপরাধ।' লায়লা জেনিফারের মুখ মলিন হয়ে উঠল। তার মামী আয়েশা উইলিয়াম ধপ করে বসে পড়ল সোফায়। বলল, 'সারা, জেনিফার তোমরা তোমাদের কাপড়-চোপড় গুছিয়ে নাও। এক্ষুণি বেরুতে হবে, এ বাড়ি ছাড়তে হবে তোমাদের।' 'কোথায় যাব?'বলল সারা। 'মেয়েদের যাওয়ার জায়গা সীমাবদ্ধ। আপাতত তোমরা যাও জেনিফারদের বাড়িতে। ওখানে অন্তত জেমস-এর মত শয়তান নেই। আর যারা জেনিফারকে খুঁজছে, তারা তো জেনে গেল জেনিফার গ্রান্ড টার্কস-এর দিকে গেছে। সুতরাং তার বাড়িতে তারা খোঁজ এই মুহূর্তে করবে না। দু'একদিন সেখানে থাক, তারপর দূরে কোথাও যাবার বন্দোবস্ত করা যাবে।' সুসান চলে গিয়েছিল, সুরাইয়া মাকোনি মুখ মলিন করে বসেছিল জেনিফারের পাশে। সে বলল, 'জেনিফার তার বাড়িতে নিরাপদ নয়। বাড়ির উপর ওদের চোখ রাখার কথা। তবে লুকয়ে গিয়ে দু'একদিন সেখানে লুকিয়ে থাকতে পারবে।' 'এটাই হবে। তবে জেনিফারকে তো আর এ বাড়িতে রাখাই যাবেনা।'বলে আয়েশা উইলিয়াম সারা-এর দিকে তাকিয়ে বলল, 'তোমরা সোজা বেরিয়ে পুবদিকে বন্দরের দিকে যেতে পারবে না। বাড়ির পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে উপত্যকা দিয়ে পশ্চিম উপকূলে গিয়ে নৌকা নিতে হবে তোমাদের।' সারা ও জেনিফার তৈরি হবার লক্ষ্যে বাড়ির ভেতরে যাবার জন্যে পা বাড়াল। 'আমিও এক সংগে বেরুতে চাই খালাম্মা। আমি যদি পুবদিকে যাই, তাহলে শত্রুদের কিছুটা বিভ্রান্ত করা যাবে।'বলল সুরাইয়া মাকোনি। 'ঠিক বলেছ মা।' সবাই বাড়ির ভেতরে চলে গেল। লায়লা জেনিফার কাপড় গুছিয়ে ব্যাগে নিচ্ছিল। পাশে দাঁড়িয়েছিল মাকোনি। এক সময় জেনিফার বলল, 'আমি বুঝতে পারছি না এই চতুর্মূখি সংকটে আহমদ মুসা একা এসে কি করবেন। কেমন করেই বা তার দেখা পাবো।' 'তুমি নিশ্চন্ত থাক জেনিফার, আহমদ মুসা আল্লাহ ছাড়া আর কারও উপর নির্ভর করে এখানে আসছেন না। আর সন্দেহ নেই, যাকে খুঁজে নেবার তিনিই খুঁজে নেবেন। কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা।' 'কি?' 'তাঁর ফ্যাক্স পড়ে তোমার যা দশা হয়েছিল ওঁকে কাছে পেলে তোমার কি দশা হয়, সেটাই আমার চিন্তার বিষয়।'মুখ টিপে হেসে বলল মাকোনি। 'কি আর হবে। সমুদ্রের কাছে বৃষ্টি বিন্দু কোন মূল্য রাখে?'বলল জেনিফার। 'রাখে না। কিন্তু সমুদ্রের বুকে বৃষ্টি বিন্দু বিলীন হয়ে যেতে তো বাধা নেই।' 'মাকোনি তুমি ভিন্ন দিকে যাচ্ছ।'কৃত্রিম চোখ রাঙিয়ে বলল জেনিফার। এ সময় সারা সেখানে এল। বলল, 'আমি রেডি।' ব্যাগের চেন টানতে টানতে জেনিফার বলল, 'আমিও রেডি।' 'রেডি আমিও। তবে পথ ভিন্ন।'বলল মাকোনি। তিনজনেই একসাথে হেসে উঠল। কিন্তু আয়েশা উইলিয়ামের চোখ তখন অশ্রুতে ভারি। মনে মনে তার আকুল প্রার্থনা, আল্লাহ তার মেয়েদের মান-সম্মান রক্ষা করুন, তাদের নিরাপত্তা দান করুন। গ্রান্ডস টার্কস দ্বীপের প্রধান বন্দরটির দৃশ্য নয় বরং বন্দরটির নাম;জোয়ান ডি সুসুলামা'আহমদ মুসার দৃষ্টি আকর্ষণ করল বেশি। ভাষা সম্পর্কে আহমদ মুসার যতটুকু জ্ঞান আছে, তাতে তার মনে হচ্ছে আরবী শব্দাংশের উপর এখানে স্পেনীয় রং ছড়ানো হয়েছে। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ বিশেষ করে টার্কস দ্বীপপুঞ্জের মানচিত্রের উপর নজর বুলাতে গিয়ে এমন শংকর দৃশ্য সে অনেক দেখেছে। যেমন'ভিজকায়া মামুন্ড'দ্বীপ। এর'ভিজকায়া'শব্দ স্পেনীয়, কিন্তু ‘মামুন্দ'শব্দ আফ্রিকান। যেমন ভিজাকয়া মামুন্ড'দ্বীপের'কেজান'গ্রাম।' কেজান'নামটি তুর্কি। ‘কেজান'নামটি যেমন তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরের মাইল চল্লিশ পশ্চিমের একটি ছোট্ট শহরের নামের সাথে মেলে, তেমনি এই দ্বীপের ‘মামুন্ড'নামাংশটি আফ্রিকার মুসলিম রাষ্ট্র গিনি'র বেফিং নদী তীরের ছোট্র বন্দরের নামের সাথে মিলে যায়। এর অর্থ আমেরিকার কোলে দাঁড়ানো এই দ্বীপাঞ্চলে আফ্রিকা ও এশিয় মুসলিম দেশ থেকে মুসলিম ও সেই সাথে মুসলিম ঐতিহ্যের ব্যাপক আগমন ঘটেছে। আহমদ মুসা একটা মোটর বোট থেকে টার্কস দ্বীপপুঞ্জের গ্রান্ড টার্কস দ্বীপের ‘জোয়ান ডি সুসুলামা'বন্দরের জেটিতে বিসমিল্লাহ বলে পা রাখল। আহমদ মুসা পোর্টরিকোর সামজুয়ান বন্দর থেকে এসেছে এই টার্কস দ্বীপপুঞ্জে। এর আগে ওয়াশিংটন থেকে এসেছিল ফ্লোরিডার মিয়ামিতে এবং মিয়ামি থেকে পোর্টরিকোর সামজুয়ান-এ। বন্দরে নেমে তিন দিকের সাগরের দিকে তাকিয়ে আহমদ মুসার মনে হলো সে যেন এক ভেলায় দাঁড়িয়ে আছে। বন্দরের পাশেই বাতিঘরের টাওয়াঁর। টাওয়ারটি পর্যটকদের জন্যে একটি আকর্ষণীয় স্থান। টাওয়ারে দাঁড়িয়ে গোটা টার্কস দ্বীপপুঞ্জ এবং আটলান্টিকের অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করা যায়। আহমদ মুসা জেটি থেকে উপরে উঠতেই একটি তরুণ ছুটে এল। বলল, ‘স্যার টাওয়ার দর্শন মাত্র দুই পাউন্ড কমিশনসহ। যাবেন।' তরুণটির পরণে প্যান্ট এবং গায়ে সার্ট। খুব সাধারণ। স্বাস্থ্য ভাল, কিন্তু চোখে-মুখে ক্লান্তির চিহ্ন। গায়ের রং হালকা কালো। 'তোমার নাম কি?'আহমদ মুসা জিজ্ঞেস করল তরুণটিকে। 'কুমামি।'বলল তরুণটি। আহমদ মুসা কখনও ইংরেজী, কখনও স্পেনিশ ভাষায় কথা বলছিল। বলল, 'আচ্ছা কুমামি, আমি দুই পাউন্ড দিলে তোমার কমিশন কত থাকবে?' 'পঁচাত্তর পেনি।' 'সারাদিনে কত আয় হয় তোমার?' 'পর্যটক না এলে কিছু হয় না। মুট বয়ে হয়তো তখন সারাদিনে চার পাঁচ পাউন্ড হয়।' 'কিন্তু পর্যটক যখন মোটামুটি মেলে?' 'তখন বিশ পঁচিশ পাউন্ড পর্যন্ত হয় স্যার।' 'এ আয় তো মন্দ নয়।' 'স্যার এর মধ্যে খরচ আছে।' 'কি খরচ?' 'পুলিশ ও বন্দর সুপারভাইজারকে দিতে হয়। এসব খরচসহ খাওয়া-দাওয়া বাদ দিলে আট দশ পাউন্ট টেকে স্যার।' 'বাড়িতে তোমার কে আছে?' 'আব্বা, আম্মা, দুই বোন। একটি ভাই হয়েছিল। গতকাল মারা গেছে সাত দিন বয়সে।' 'কি হয়েছিল?'জেনিফার চিঠির কথা মনে পড়ায় কতকটা আঁৎকে উঠেই প্রশ্ন করল আহমদ মুসা। 'মাতৃসনদে ছিল। কি রোগ হয়েছিল ডাক্তাররাও বলতে পারেনি।' 'শিশু মৃত্যুর পরিমাণ কি বেড়েছে ইদানিং?' 'তাই তো মনে হয়। গত মাসে মাতৃসনদে ৪টি শিশু মারা গেছে। তবে শ্বেতাংগদের শিশু মরছে না, মরছে আমাদের।' 'মেয়ে শিশু না ছেলে শিশু বেশি মারা যায়?' 'তা বলতে পারবো না। তবে গত মাসে আমাদের মাতৃসনদে মৃত ৪টি শিশুর সবাই ছেলে।' উত্তরে আহমদ মুসা আর কোন কথা বলল না। হাঁটতে হাঁটতে কুমামি'র হাতে দুটি পাউন্ড তুলে দিয়ে বলল, 'যাও টাওয়ারের টিকিট করে আন।' বন্দরের যাত্রী লাউঞ্চের যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আহমদ মুসা কথা বলছিল, সে জায়গাটা বেশ নিরিবিলি। আহমদ মুসা নামাযের জায়গা খুঁজছিল। জায়গাটা পছন্দ হলো। কুমামি চলে গেলে আহমদ মুসা ওজু করে এসে ধীরে সুস্থে যোহরের নামায পড়ল। নামায শেষ করে পেছন ফিরে দেখল, কুমামি দাঁড়িয়ে আছে। আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'টিকিট করেছ কুমামি?' 'জি স্যার।'বলে টিকিট আহমদ মুসার হাতে দিল। টিকিট দেওয়ার সময় কুমামি কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে গেল। তার চোখ-মুখ দেখে মনে হয় কিছু বলবে সে। কিছু তুমি বলবে কুমামি?'জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা। 'স্যার, আপনি মুসলমান?'প্রশ্ন করার সময় তার চোখে-মুখে আনন্দের প্রকাশ ঘটল। 'তোমাকে খুব খুশি মনে হচ্ছে, কেন?'জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা। 'স্যার, আমার জীবনে এই প্রথম একজন মুসলমান বিদেশী পেলাম।' 'মুসলিম পর্যটক পেলে খুশি লাগে কেন?' 'স্যার, আমরাও মুসলমান।' 'তোমরা মানে তোমাদের পরিবার মুসলমান?' 'জি স্যার। আমার নাম আলী কুমামি।' 'কিন্তু নাম জিজ্ঞেস করলে তো শুধু'কুমামি'বলেছ।' 'অপরিচিত কারো কাছে'আলী'নাম বলি না।' 'কেন?' 'তাতে অসুবিধা হয় স্যার।' 'মুসলিম পরিচয় দিলে কি ধরনের অসুবিধা হয়?' 'সেটা পরিস্কার বলা মুস্কিল। আমাদের আলাদা ধরনের মানুষ মনে করা হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে অবিশ্বাস করা হয়। শাসক ও শ্বেতাংগরা অনেক ক্ষেত্রে আমাদের মানুষ মনে করে না। ছোট-খাট দোষ হলেও আমাদের মাফ করা হয় না।' 'তুমি থাক কোথায়?' 'বন্দর ও রাজধানীর মাঝামাঝি জায়গার একটা গ্রামে।' 'গ্রামে কতজন মুসলমান?' 'তিন ভাগের দুই ভাগই মুসলমান।' 'বাকি এক ভাগ?' 'কিছু খৃষ্টান আছে, কিছু অন্য ধর্ম।' 'শ্বেতাংগের সংখ্যা কত?' 'আমাদের গ্রামে শ্বেতাংগ ছিল না। বছর খানেক আগে সরকার কয়েক ঘর শ্বেতাংগ বসিয়েছে। তারপর থেকে দু'একটি করে শ্বেতাংগ-ঘর বাড়ছে।' আহমদ মুসা ব্যাগ হাতে তুলে নিয়ে বলল, 'চল টাওয়ারে যাই। আমাকে আবার গ্রান্ড টার্কস মানে রাজধানীতে যেতে হবে।'বলে টাওয়ারের দিকে হাঁটতে শুরু করল। টাওয়ারের একদম শীর্ষে বাতিঘর। টাওয়ারে প্রবেশের দরজার ডান পাশের দেয়ালে ফাউন্ডেশন স্টোন। স্প্যানিশ ভাষায় কয়েক লাইন লেখা। দাঁড়াল আহমদ মুসা ফাউন্ডেশন স্টোনের সামনে। বাতিঘরের ইতিহাস সম্পর্কে কয়েক লাইন লেখা হয়েছে ফাউন্ডেশন স্টোনে। পড়ল আহমদ মুসা। "টার্কস দ্বীপপুঞ্জ প্রথম দেখতে পান অভিযাত্রী'জুয়ানা পন্স ডি লিওন'১৫১২ সালে। দ্বীপে প্রথম অবতরণ করেন'ও, এ্যাফেনডিও'। এ্যাফেনডিও ১৫১২ সালেই এই বাতিঘরের প্রতিষ্ঠা করেন। পরে দ্বীপের বৃটিশ গভর্নর আলডেবার্গ বাতিঘরের বর্তমান রূপ দেন।" 'ও, এ্যাফেনডিও'নাম পড়তে গিয়ে হোচট খেল আহমদ মুসা। স্প্যানিশ শব্দ মালায় এ ধরনের শব্দ নেই। তুর্কি'এ্যাফেন্দী'শব্দের এটা স্পেনিওকরণ কি?'ও'-এর পূর্ণরূপ কি হতে পারে?' মনে প্রশ্ন নিয়েই আহমদ মুসা প্রবেশ করল টাওয়ারে। টাওয়ারের শীর্ষে বাতিঘর। তার নিচেই অবজারভেটরী হল। অবজারভেটরী হলের চারদিকে ফাইবার কাচের উইনডো এবং চারদিকে চারটি দূরবীন। চারদিকে তাকিয়ে চমৎকৃত হলো আহমদ মুসা। উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণে আটলান্টিকের অথৈ নীল পানি। পশ্চিম দিকে তাকিয়ে বামপাশে টার্কস দ্বীপপুঞ্জের অর্ধ ডজনের মত এবং ডানে তাকিয়ে কাকুজ দ্বীপপুঞ্জের দ্বীপগুলোকে আদিগন্ত নীল পানিতে ভেলার মত ভাসতে দেখল আহমদ মুসা। মহাসাগরের বিশালত্বের মাঝে বড়ই অসহায় মনে হলো দ্বীপগুলোকে। টার্কস দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে কাছের দ্বীপপুঞ্জ বাহামা। কিন্তু তারও প্রধান দ্বীপ সত্তর আশি মাইল পশ্চিম-উত্তরে। টার্কস দ্বীপপুঞ্জ থেকে ডোমিনিকান রিপাবলিকের অবস্থান প্রায় একশ'মাইল দক্ষিণে, আর কিউবা প্রায় দু'শ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে। এমন অবস্থানের ক্ষুদ্র দ্বীপপুঞ্জের মানুষগুলো অসহায় হবে সেটাই স্বাভাবিক। অবজারভেটরীর নিচেই রেষ্টুরেন্ট। রেস্টুরেন্টে নাস্তা করে আহমদ মুসা নিচে নেমে এল। বলল সে আলী কুমামিকে, 'তুমি গ্রান্ড টার্কস-এর চার্লস বিশ্ববিদ্যালয় চেন?' 'না স্যার, গ্রান্ড টার্কস-এ দু'একবার গেছি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে যাইনি।' আহমদ মুসা পঞ্চাশ পাউন্ড-এর মত হবে কয়েকটা নোট আলী কুমামির হাতে গুজে দিয়ে বলল, 'তোমার আব্বা-আম্মার জন্যে মিষ্টি নিয়ে যাবে। তোমার ঠিকানা নিয়েছি। সুযোগ পেলে দেখা করব।' বলে আহমদ মুসা একটা গাড়ি ডেকে উঠে বসল। চলল গাড়ি রাজধানী শহর গ্রান্ড টার্কস-এর পথে। গ্রান্ড টার্কস শহরের ঠিক মাঝখানে চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি ছোট, কিন্তু ছবির মত সুন্দর। ইংল্যান্ডের যুবরাজ চার্লস-এর বাক্তিগত অনুদানে এই বিশ্ববিদ্যায়টি গড়ে ওঠে। প্রধান গেট দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করল আহমদ মুসা। প্রশাসনিক অফিস থেকে অর্থনীতি বিভাগের লোকেশন জেনে নিয়ে আহমদ মুসা গিয়ে হাজির হলো অর্থনীতি বিভাগের অফিসে। লায়লা জেনিফার অর্থনীতি বিভাগের ছাত্রী। আহমদ মুসা অর্থনীতি বিভাগ থেকে লায়লা জেনিফারের খোঁজ নিতে চায়। সে জানে জেনিফার বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই, কোথাও আত্মগোপন করে আছে। অফিসে তার বাড়ির ঠিকানা আছে। এই ঠিকানা পেলে লায়লা জেনিফারকে সন্ধান করার একটা পথ সে পাবে। আহমদ মুসা অর্থনীতি বিভাগের পাবলিক রিলেশন্স অফিসের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালো। দরজায় পর্দা। আহমদ মুসা পর্দার এ পারে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ভেতরে আসতে পারি।' সংগে সংগে জবাব এল না। একটু পর একটা কণ্ঠ বলল, ‘ভেতরে আসুন।' আহমদ মুসা ঘরে প্রবেশ করল। দেখল, দরজার ঠিক বিপরীত প্রান্তে সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ওপারে একটা রিভলবিং চেয়ারে বসে একজন কৃষ্ণাংগ মেয়ে। আহমদ মুসাকে স্বাগত জানাবার জন্যেই সম্ভবত সৌজন্যের খাতিরে সে উঠে দাঁড়িয়েছে। একজন বিদেশীকে দেখায় তার চোখে-মুখে একটা কোতূহল। মেয়েটির টেবিলের সামনে দু'টি চেয়ার। তার একটিতে আগে থেকেই একজন শ্বেতাংগ লোক বসে। গায়ে ডোরাকাটা টি সার্ট, পরণে জিনসের প্যান্ট। আহমদ মুসা টেবিলের সামনে পৌঁছলে মেয়েটি হাত বাড়াল হ্যান্ডশেকের জন্যে এবং বলল, ‘আমি মাকোনি। তথ্য অফিসার।' আহমদ মুসা হ্যান্ড শেকের জন্যে হাত না বাড়িয়ে বলল, 'স্যরি ম্যাডাম। মেয়েদের সাথে হ্যান্ডশেক করা আমার সংস্কৃতি অনুমোদন করে না।' মেয়েটির চোখে-মুখে বিব্রতভাব ফুটে উঠল। কিছুটা অপমানের চিহ্নও। পর মুহূর্তেই মেয়েটি নিজেকে সামলে নিয়ে মুখে হাসি টানার চেষ্টা করে বলল, ‘বসুন।'বলে নিজেও বসে পড়ল। আহমদ মুসা বসতে বসতে বলল, 'ধন্যবাদ। আমি আহমদ আবদুল্লাহ। এসেছি ওয়াশিংটন থেকে। আমি আপনার কিছু সহযোগিতা চাই।' পাশের লোকটি বিস্ময় ও বিরক্তি নিয়ে তাকিয়েছিল আহমদ মুসার দিকে। আহমদ আবদুল্লাহ নাম শুনে তার চোখে বিতৃষ্ণা ও তাচ্ছিল্যের ভাব ফুটে উঠল। 'আহমদ আবদুল্লাহ'নাম শুনে মাকোনি চমকে উঠেছিল। লোকটি তাহলে মুসলমান। আহমদ মুসার নাম সে শুনেছে।'আহমদ আবদুল্লাহ'আবার কে? শেষে তার মুখ প্রসন্ন হয়ে উঠেছিল। 'বলুন, কি সহযোগিতা করতে পারি?'বলল মাকোনি। ‘অর্থনীতি বিভাগের একজন ছাত্রী লায়লা জেনিফারের দেখা কিভাবে পেতে পারি?' চমকে ওঠে মাকোনি মনে মনে। চকিতে একবার তাকাল পূর্ব পাশে বসা লোকটির দিকে। মাকোনির চোখে-মুখে ভয়ের চিহ্ন। জিজ্ঞাসা জেগে উঠল তার মনে, কে এই লোক?'আহমদ আবদুল্লাহ'নামের লোকটি কি আহমদ মুসা হতে পারে? জিজ্ঞাসারও কোন উপায় নেই লোকটির সামনে। জেনিফারের কোন তথ্য দেয়াও সম্ভব নয়। লোকটি সামান্য সন্দেহ করলেও কারও রক্ষা নেই। ‘লায়লা জেনিফার আমাদের ছাত্রী। সে এখন কোথায় আছে আমরা জানি না। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছে না বেশ কিছুদিন।' ‘তার স্থায়ী একটা ঠিকানা বা পোস্টাল ঠিকানা নিশ্চয় আপনাদের কাছে আছে। সে ঠিকানা পেলেও আমার চলবে।' বিপদে পড়ে গেল মাকোনি। এই ঠিকানা সে দিতে পারে। কিন্তু ভয় করলো মাকোনি। লোকটির সামনে এই ঠিকানাটুকুও দেয়া যায় না। মাকোনি পরিস্কার লক্ষ্য করেছে, আহমদ আবদুল্লাহ নামক লোকটির মুখে'লায়লা জেনিফারের নাম শুনেই এ লোকটির চোখ দু'টি সাংঘাতিক সতর্ক ও শক্ত হয়ে উঠেছে। এসব ভেবে মাকোনি বলল, ‘মাফ করবেন, অভিভাবক বা নিকট আত্বীয় নন এমন কাউকে আমরা আমাদের ছাত্রীর ঠিকানা দেই না।' 'অল রাইট, তাঁর কোন বন্ধু বান্ধবের ঠিকানা দয়া করে দিতে পারেন, যারা চাইলে আমাকে সাহায্য করতে পারেন।' 'স্যরি, এ সাহায্যও তার ক্লাসমেটদের কেউ করতে পারেন। আমি পারছি না। আজ একাডেমিক একটা ছুটির দিন। আপনি কাল এলে তার ক্লাসমেটদের পাবেন।' ‘ধন্যবাদ। আপনাকে কষ্ট দিতে হলো বলে দুঃখিত।' কথা শেষ করেই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। আহমদ মুসার পাশের লোকটিও উঠে দাঁড়াল। মাকোনিকে লক্ষ্য করে বলল, 'তাহলে ম্যাডাম আমিও উঠি। পরে আসব।' আহমদ মুসার পেছনে পেছনে লোকটিও বেরিয়ে গেল মাকোনির অফিস থেকে। মাকোনি উঠে দাঁড়িয়েছিল ওদের বিদায় দেবার জন্যে। ওরা বেরিয়ে যেতেই মাকোনি ধপ করে তার চেয়ারে বসে পড়ল। মাকোনির খুব খারাপ লাগছে'আহমদ আবদুল্লাহ'নামের লোকটিকে কোন সাহায্য করতে না পারার জন্যে। ঐ লোকটিও তো আহমদ মুসা হতে পারে!লোকটির দৃষ্টি ও চেহারায় অপরূপ পবিত্রতা। আর ব্যক্তিত্বে রয়েছে প্রচন্ড এক সম্মোহনী। যতক্ষণ সে বসেছিল তার মনে হয়েছিল আলোর এক অদৃশ্য ছায়া যেন তার চারদিকে। যে লোকটি সামনে বসে থাকার কারণে মাকোনি'আহমদ আবদুল্লাহ'নামের লোককে কোন সহযোগিতা করতে পারল না, মাকোনি নিশ্চিত সে লোকটি, হন্তা গ্রুপের একজন। জেনিফারকে পেলেও তারা তাকে খুন করবে। মনের অস্থিরতার জন্যে মাকোনি সিটে বসে থাকতে পারলো না। সে উঠে দাঁড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বেরিয়ে করিডোরে কাউকে দেখতে পেল না মাকোনি। ‘আহমদ আবদুল্লাহ'নামের লোকটি কোনদিকে যেতে পারে? রেজিস্টার অফিসের দিকে যেতে পারে কি? বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরুবার রাস্তা এবং রেজিস্টারের অফিস একই দিকে। সেদিকেই ছুটল। করিডোরে ধরে কিছু দূর ছুটে যাবার পর যে দৃশ্যটা দেখল, তাতে তার বুক কেঁপে উঠল। 'আহমদ আবদুল্লাহ'নামের লোকটা সামনে। তার পেছনে হন্তা গ্রুপের সেই লোক। হাতে রিভলবার। রিভলবারের নল দিয়ে আহমদ আবদুল্লাহ নামের লোকটির পিঠের মাঝে গুঁতো দিয়ে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনের গেটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। মাকোনিও সম্মোহিতের মত তাদের পেছনে পেছনে চলল নিজেকে তাদের চোখ থেকে আড়াল করে। করিডোরের পথে দু'চারজন এ দৃশ্যটা দেখল। তারা রিভলবারধারী শ্বতাংগকে সম্ভবত গোয়েন্দা পুলিশ মনে করে বেশি কৌতূহল না দেখিয়ে কেটে পড়ল। মাকোনি চিন্তা করল'আহমদ আবদুল্লাহ'নামের লোকটি যদি আহমদ মুসা হতো, তাহলে তো সুবোধ বালকের মত শ্বেতাংগ লোকটির রিভলবারের খোঁচা খেয়ে সামনে এগুতো না! তাহলে লোকটি আহমদ মুসা নয়। মনটা খারাপ হয়ে গেল মাকোনির। আবার ভাবল, আহমদ মুসা না হোক, বেচারা মুসলমান তো! করিডোরটি যেখানে গিয়ে শেষ হয়েছে, সেটা একটি বিশাল গেট। এটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনের দিকের দরজা। এ দরজার পর কিছু ফাঁকা জায়গা। তারপরেই শুরু হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাসিক এলাকা। দরজাটি থেকে আরও দুটি করিডোর ডান ও বাম দিকে চলে গেছে। গেটে পৌছেই শ্বেতাংগ লোকটি চিৎকার করে বলল, 'দাঁড়াও।' এ কথা বলেই সে দু'পাশের করিডোরের দিকে দ্রুত তাকাল। রিভলবারসহ তার হাতটা তখন নিচে নেমে গিয়েছিল। আর আহমদ মুসাকে থামতে বলার সংগে সংগেই সে চোখের পলকে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। ঘুরে দাঁড়িয়েই আহমদ মুসা তার বাম হাত দিয়ে শ্বেতাংগটির রিভলবার ধরা ডানহাতের কবজিতে একটা প্রচন্ড মোচড় দিয়ে ডান হাত দিয়ে একটা কারাত চালাল তার কানের নিচে ঘাড়ের নরম জায়গাটায়। লোকটির দেহ টলে উঠল এবং আছড়ে পড়ে গেল। আহমদ মুসা লোকটির রিভলবার তুলে নিতে যাচ্ছিল। নিচু হয়েছিল সে। ডানদিক থেকে আসা পায়ের শব্দ শুনে মুখ তুলল সেদিকে। দেখল আর এক শ্বেতাংগ ছুটে এসে ঝাঁফিয়ে পড়েছে তার উপর। তখন কিছু করার ছিল না। আহমদ মুসা উবু হয়ে বসে পড়ল। ঝাঁফিয়ে পড়া লোকটির পেট এসে আঘাত করল আহমদ মুসার পিঠে। লোকটির মাথা ও হাত গেল আহমদ মুসাকে অতিক্রম করে। আহমদ মুসার দেহটি কাত হয়ে গিয়েছিল। পড়ে থেকেই শ্বেতাংগ লোকটি আহমদ মুসার গলা জাপটে ধরার চেষ্টা করছিল। আহমদ মুসা লোকটির দু'হাত ধরে পাক খেয়ে নিজের শরীরটাকে উল্টে দিল। লোকটির দু'হাত মুচড়ে যাওয়ায় লোকটি কাবু হয়ে পড়ল। আহমদ মুসা লোকটির বাঁম হাত ছেড়ে দিয়ে তার ডান হাত আগের মতই ধরে রেখে নিজের দেহকে আর এক পাক ঘুরিয়ে নিল। লোকটির ডান হাত আরও মুচড়ে যাওয়ায় লোকটি ব্যথায় চিৎকার করে উঠল এবং তার দেহটি উল্টে ছিটকে পড়ল মাটিতে। আহমদ মুসা লোকটির ডান হাত মোচড় দিয়ে ধরে রেখে একটা পা দিয়ে তার দেহকে চেপে রেখে বলল, ‘তোমরা কে? আমার সাথে তোমাদের শত্রুতা..' আহমদ মুসা কথা শেষ করতে পারল না। একটা ভারি কিছুর আঘাত এসে পড়ল তার মাথায়। সংগে সংগে সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে গেল সে মাটিতে। গোটা ব্যাপারটা মাকোনি রুদ্ধশ্বাসে দেখছিল। খুশী হয়েছিল সে যখন'আহমদ আবদুল্লাহ'নামের লোকটি দ্বিতীয় লোকটিকেও কাবু করে ফেলেছিল। কিন্তু হঠাৎ তার চোখে পড়ল বাম দিকের করিডোর দিয়ে বিড়ালের মত নিঃশব্দে একজন শ্বেতাংগ এগিয়ে আসছে। তার হাতে ভারি একটা কাঠের টুকরো। সে যখন আহমদ মুসার পেছনে গিয়ে আহমদ মুসার মাথার উপর কাঠের টুকরোটি তুলল, তখন চিৎকার করে উঠতে চেয়েছিল মাকোনি। কিন্তু তার গলা থেকে কোন স্বর বের হয় নি। ভয়ে রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল তার কণ্ঠ। আহমদ মুসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেলে মাকোনি ছুটে পালাল সেখান থেকে। তার সমগ্র মন জুড়ে একটাই আতংক তখন, খুনিরা তাহলে'আহমদ আবদুল্লাহ'নামের লোকটিকেও খুন করল। সে যদি আহমদ মুসা হয়? আহা! সে তো সহজেই দু'জনকে কুপোকাত করেছিল। লোকটি যদি পেছন থেকে এসে চোরের মত আঘাত না করতো। আহমদ মুসার কারাতে যে জ্ঞান হারিয়েছিল, তার সাথী দু'জন তার জ্ঞান ফিরিয়ে আনল। সে সংজ্ঞা ফিরে পেয়েই উঠে দাঁড়িয়ে প্রচন্ড এক লাথী চালাল সংজ্ঞাহীন আহমদ মুসার পাঁজরে। তারপর বলল, ‘এখন মনে হচ্ছে এ শয়তানকে জেনিফাররা হায়ার করে এনেছে।' ‘তাহলে একে নিয়ে যাচাই করতে হয়।'বলল দ্বিতীয় জন। ‘জঞ্জাল বহন করে লাভ নেই। বেঁচে গেলে আপনাতেই বাপ বাপ বলে দ্বীপ ছেড়ে পালাবে।'বলল দ্বিতীয় জন। ‘কিন্তু লোকটাকে খুব শেয়ানা মনে হচ্ছে।'বলল তৃতীয়জন। ‘শিক্ষাও হয়েছে। না হলে, এরপর জানটাও যাবে।'বলল প্রথম জন। বলে সে আহমদ মুসার সংজ্ঞাহীন দেহে আরেকটা লাঠি চালিয়ে সাথীদের বলল, ‘চল যাই।' ওরা দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। ওরা বেরুবার আগেই একজন ছাত্র এসে দাঁড়িয়েছিল দরজায়। ওদের শেষ জনের কথা এবং লাথি দেয়ার দৃশ্যটা সে দেখতে পেয়েছিল। ওদের বেরিয়ে যেতে দেখে ছাত্রটি বলল, 'কি হয়েছে? কি ঘটনা?' ‘বিদেশী ঐ কুত্তাকে জিজ্ঞেস কর।'বলল ওদের একজন। বলে সবাই চলে গেল। ভেতরে দুকল ছাত্রটি। ছাত্রটির বয়স একুশ বাইশ বছর হবে। দেহের বলিষ্ট গড়ন। মাথার চুল কালো। চোখ নীল। শ্বেতাংগ। বসে পড়ল ছাত্রটি আহমদ মুসার পাশে। হাতের বই মাটিতে রেখে দ্রুত নাড়ি পরীক্ষা করল সে আহমদ মুসার। স্বগত উচ্চারণ করল, ‘থ্যাংকস গড, লোকটি বেঁচে আছে।' ছাত্রটি দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে ছুটল বাইরে। বাইরে কোন গাড়ি পেল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্যারের গাড়ি যাচ্ছিল, অনুরোধ করে দাঁড় করাল সে গাড়ি। ‘কি ব্যাপার, জর্জ?'বলল ড্রাইভিং সিটে বসা অধ্যাপকটি বিস্মিত কণ্ঠে। ছাত্রটির নাম জর্জ জেফারসন। এই চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন তুখোড় ছাত্র সে। ইতিহাসের ছাত্র জর্জ অনার্স পরীক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ নাম্বার পাওয়ায়'চার্লস গোল্ড মেডেল'পেয়েছে এবং স্কলারশীপ পেয়েছে অক্সফোর্ডে উচ্চ শিক্ষার। ‘স্যার একজন মুমূর্ষ লোককে হাসপাতালে নিতে হবে।' ‘কোথায়?' ‘স্যার এই গেটের ভেতরে।' ‘স্যার আমি গাড়ি ড্রাইভ করতে পারবো, গাড়িটা আমাকে দিতে পারেন, যদি অবিশ্বাস না করেন।' অধ্যাপকটি গাড়ি থেকে নামল। বলল, ‘তোমাকে অবিশ্বাস করলে বিশ্বাসের আর কোন জায়গা থাকে না জর্জ।'বলে গাড়ির চাবী জর্জের হাতে তুলে দিয়ে বলল, ‘চল দেখি, কে লোকটি, কি ব্যাপার?' ‘স্যার লোকটি একজন বিদেশী। তিনজন লোক তার মাথায় আঘাত করে পালিয়ে গেল।' চলল দু'জন গেটের ভেতরে। অধ্যাপকটি সংজ্ঞাহীন আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, 'লোকটি এশিয়ান হে। লোকটাকে তো গুন্ডা বদমাশ বলে মনে হয় না।'বলল জন ফিলিপ। অধ্যাপক জন ফিলিপ চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের একজন সিনিয়র প্রফেসর। ‘আমারও তাই ধারণা স্যার। যারা মেরে পালাল ওদের বর্ণবাদী ধরণের বলে আমার মনে হলো। ওরা হুমকী দিয়ে গেছে, শিক্ষা না হলে এরপর লোকটির জান যাবে।' ‘চল তোমাকে আমি সাহায্য করি লোকটাকে গাড়িতে তুলতে।' বলে অধ্যাপকটি আহমদ মুসার পায়ের দিকটা ধরল। ‘ধন্যবাদ স্যার'বলে জর্জ আহমদ মুসার মাথার দিকটা হাতে তুলে নিল। ‘ধন্যবাদ দিচ্ছ কেন? মনে হচ্ছে তোমার কাজটা যেন আমি করে দিচ্ছি। দেখ, তুমি সমাজ সেবা করে বেড়াও একথা ঠিক, কিন্তু সুযোগ পেলে আমি করি না। একথা ঠিক নয়।' ‘ধন্যবাদ স্যার। আপনারাই তো আমাদের মডেল।' ‘দেখ জর্জ, নীতিহীন বিনয় ভালো নয়। সবাইকে মডেল বানিও না, বিপদে পড়বে।' ‘ধন্যবাদ স্যার।'ঠোঁটে হাসি টেনে বলল জর্জ। গাড়ির কাছে তারা এসে গেছে। দু'জন ধরাধরি করে আহমদ মুসাকে গাড়িতে তুলল। ড্রাইভিং সিটে বসল জর্জ। গাড়ি ছুটে চলল রানী এলিজাবেথ হাসপাতালের দিকে। রানী এলিজাবেথ হাসপাতালটি নতুন। কিন্তু মধ্য ক্যারিবিয়ানের সবচেয়ে আধুনিক ও সুসজ্জিত হাসপাতাল। বাহামা, ডোমিনিকান রিপাবলিক, এমনকি কিউবা থেকেও কখনও কখনও রুগী এখানে আসে। হাসপাতালের ঈমারজেন্সিতে নেয়ার সাথে সাথেই আহমদ মুসাকে নিয়ে একদল ডাক্তার ছুটল ইনটেনসিভ কেয়র ইউনিটে। এদের মধ্যে জর্জের বড় বোন ডাঃ মার্গারেটও রয়েছে। মারিয়া মার্গারেট হাসপাতালের একজন সার্জন। দু'ঘন্টা পর মার্গারেট বেরিয়ে এসে অপেক্ষমান জর্জকে বলল, ‘লোকটি কে জর্জ?' ‘আমি চিনি না। তিনজন লোক মেরে একে বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনের গেটে ফেলে রেখে গিয়েছিল। আমি তুলে এনেছি।' ‘অল্পের জন্যে বেঁচে গেছে লোকটি। ব্রেণের কোন ক্ষতি হয়নি। তবে জ্ঞান ফিরতে কয়েক ঘন্টা সময় লাগতে পারে। ছোট একটা অপারেশনের দরকার হবে।' বলে একটু থেমেই আবার বলল, ‘তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাও। আমি ওঁর দিকে খেয়াল রাখব। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরার পথে এস।' ‘লোকটি বিদেশী। কিন্তু তাঁর ব্যাগ খুঁজে ওঁর কিছু কাপড় চোপড়, টুকিটাকি ধরনের কয়েকটা অদ্ভুত জিনিস পেয়েছি। নাম-ঠিকানা জানা যায়, এমন কিছুই পাইনি।'বলল জর্জ। ‘ওঁর পকেটে একটা মানিব্যাগ এবং একটা পাসপোর্ট পাওয়া গেছে। পাসপোর্টে ওর নাম আহমদ আবদুল্লাহ। তুর্কি পাসপোর্ট। সৌদি আরব, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয়ে এখানে এসেছেন।' বলে মার্গারেট মানিব্যাগ ও পাসপোর্ট জর্জের দিকে তুলে ধরল এবং বলল'এগুলো ওঁর কাছে থাকলে হারাতে পারে।' ‘এগুলো তোমার কাছেই থাক না আপা।' ‘আমি ডাক্তার। রোগীর পকেটের জিনিস আমার কাছে থাকতে পারে না।' ‘অবশ্যই থাকতে পারে তোমার কাছে অভিভাবক হিসেবে, আর না হয় হাসপাতালের অফিসে রেখে দাও।' ‘অফিসে রাখতে চাই না, মানিব্যাগে অনেক পাউন্ড আছে।' জর্জ আর কথা না বাড়িয়ে জিনিস দু'টি হাতে নিল। তারপর বড় বোন মার্গারেটের কাছে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরার জন্যে। মাকোনি উদ্বেগ-অস্বস্তির তাড়ায় বেশিক্ষণ তার অফিসের সিটে বসে থাকতে পারলো না।'আহমদ আবদুল্লাহ'নামের লোকটিকে কি ওরা মেরে ফেলল? না ধরে নিয়ে গেল? অথবা আহত করে ফেলে রেখে গেল কিনা? মাকোনি যেন অনেকটা সম্মোহিতের মতই ফিরে এল সেই গেটে। কিন্তু আহত আহমদ মুসা যেখানে পড়েছিল, সেখানে রক্তের দাগ ছাড়া আর কিছুই দেখল না। বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল মাকোনির। নিশ্চয় সেই খুনিরা ধরে নিয়ে গেছে আহত'আহমদ আবদুল্লাহ'নামের লোকটিকে। খুনিরা অবশ্যই তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে নিয়ে গেছে। কথা বের করার পর নিশ্চয় ওরা তাকে মেরে ফেলবে। ফিরে এল মাকোনি তার অফিসে আবার। ধপ করে বসে পড়ল তার সেই চেয়ারে। ‘এখন কি করা যায়?'এই এক প্রশ্ন বার বার ঘুরে এসে তাকে পীড়া দিতে লাগল। ভাবল সে, বিষয়টা জেনিফারকে জানানো দরকার। সে হয়তো ভেঙে পড়বে, তবু তাকে জানানো দরকার। কিন্তু জানাবে কেমন করে? জেনিফারদের একটা গোপন মোবাইল টেলিফোন আছে। ওর আব্বা পোর্টরিকো কেন্দ্রীক একটা আমেরিকান কোম্পানীর কাছ থেকে নিয়ে এসেছে। গোটা মধ্য ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ ওর আওতায় আসে। সে গোপন নম্বার তার কাছে আছে। কিন্তু জেনিফারকে তো বাড়িতে পাওয়া যাবে না। মামীর বাড়ি থেকে পালিয়ে এক দু'দিনের বেশি তার বাড়িতে থাকার কথা নয়। তবু মাকোনি টেলিফোন করল লায়লা জেনিফারকে। পেল তাকে বাড়িতে। বলল, ‘জেনি'আহমদ আবদুল্লাহ'নামের একজন লোক আমার অফিসে এসে তোর খোঁজ করছিল?' ‘কোথাকার লোক?'উত্তেজিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল জেনিফার। ‘এশিয়ান লোক।' ‘এশিয়ান লোক? নিশ্চয় সে তাহলে আহমদ মুসা।'আবেগ-রুদ্ধ কণ্ঠ জেনিফারের। ‘এত নিশ্চিত হচ্ছিস কেমন করে?' 'তোর অফিসের ফ্যাক্সেই তাঁকে মেসেজ পাঠানো হয়েছিল। তাতে তোর অফিসের ফ্যাক্স নাম্বার ছিল। সুতরাং আহমদ মুসাতো তোর অফিসেই প্রথম আসবে।' 'ঠিক বলেছিস। আমি এদিকটা তো চিন্তা করিনি। কিন্তু সর্বনাশ হয়ে গেছে।'কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলল মাকোনি। ‘কি সর্বনাশ হয়ে গেছে?'ওপার থেকে উদ্বেগাকুল জিজ্ঞাসা জেনিফারের। ‘হ্যাঁ সর্বনাশ য়ে গেছে।'বলে কেঁদেই ফেলল মাকোনি। ‘কাঁদবি না। তাড়াতাড়ি বল কি হয়েছে। আমি কিন্তু সহ্য করতে পারছি না।' মাকোনি চোখ মুছে গোটা কাহিনী লায়লাকে শোনাল। শেষ কথা শোনার সাথে সাথেই ‘সত্যি সর্বনাশ হয়ে গেছে মাকোনি' বলে কান্নায় ভেঙে পড়ল লায়লা জেনিফার। তার হাত থেকে টেলিফোন পড়ে গেল। মাকোনি চেষ্টা করেও আর কথা বলতে পারলো না। গভীর হতাশায় চেয়ারে গা এলিয়ে দিল মাকোনি। একটা কথা বার বার তার বুকে কাঁটার মত বিঁধতে লাগল, ‘এতবড় একজন বিপ্লবী এখানে এসে এভাবে প্রাণ হারাবে?'আবার মনকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করল এই ভেবে, ‘খুনিরা ওকে ধরে নিয়ে গেছে, কিন্তু মেরে ফেলবেই এমন তো নাও হতে পারে।'


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮২ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ২৫.আটলান্টিকের ওপারে (৩)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন