বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

একটি আজিব কাহিনী

"ফ্যান্টাসি" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান MD.Belal Hosan (০ পয়েন্ট)

X অনেক ক্ষন ধরে সামনে বসা মানুষ টার দিকে তাকিয়ে আছেন ডঃ তাহসিনা। মাথাটা নিচু করে বসেই আছে সেই লোক। অনেকক্ষণ ধরে বসে থেকে থেকে শেষে বলতে শুরু করল- “আমার যে সমস্যা সেটা হল আমার পেটে একটা ফোঁড়া ঊঠেছে।” বলেই শুন্য দৃষ্টিতে ডঃ তাহসিনার দিকে তাকিয়ে থাকল। ডঃ তাহসিনা অনেক ভাল একজন সাইকায়াট্রিষ্ট। উনি এর আগে ও অনেক মেন্টাল রুগীকে ভাল করেছেন। কিন্তু আজকের এই রুগি এসে বসেছে তো বসেছে কথা বলার কোন নাম গন্ধ নাই। অনেক ক্ষন মাথা নিচু করে চুপ করে থেকে শেষে বলতে শুরু করল। ” আমার সমস্যার শুরু যখন আমি আমার স্ত্রি মাহমুদা কে খুন করি। আমার স্ত্রি কে নিয়ে আমি খুব সুখে ছিলাম। কিন্তু আমার একটা এক্সিডেন্টের কারনে ডাক্তার আমাকে বলেন যে আমি আর কোন দিন বাবা হতে পারবোনা। এর পর মাহমুদা আমাকে প্রথম প্রথম মেনে নিয়েছিল। আমাদের বিয়ে হবার পর ঠিক করেছিলাম ৩ বছর পর বাচ্চা নেব। এর মাঝেই ঘটে যায় সেই এক্সিডেন্ট। এরপর মাস ছয়েক ঠিক ছিল। কিন্তু একদিন আমি জানতে পারি মাহমুদার সাথে আমার এক আত্মীয়র অবৈধ সম্পর্ক হয়েছে। এটা শোনার পর আমার মাথা ঠিক ছিলনা। আমি দুইবার আত্মহত্যা করতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারিনি। এর মাঝেই আমাকে মাহমুদা ওর অবৈধ সম্পর্কের কথা জানায়। আমি বিমূঢ় ছিলাম বেশ কিছু দিন। কিন্তু এর মাঝেই জানতে পারি মাহমুদা কনসিভ করেছে। এটা শুনে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। ওর পেটে বাচ্চা যখন ৮ মাস – তখন আমি একদিন মাহমুদা কে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলি। মেরে ফেলি পেটের বাচ্চা টাকে ও। আমি একজন পুলিশ অফিসার ছিলাম সেই সময়। এখন আমি রিটায়ার্ড। সেই সময় আমার ক্ষমতা বলে মাহমুদা কে আমি আমার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে কোন রকমে দাফন করে আসি। এর পর আমি অনেক দিন দেশের বাইরে ছিলাম।” বলেই একবার দম নিল লোকটা। তারপর টেবিল থেকে পানির জগটা নিয়ে অদ্ভুত ভাবে পানি গ্লাসে না ঢেলে জগ থেকেই ঢকঢক করে খেয়ে ফেলল অর্ধেক পানি। তারপর আরেকটা দম নিয়ে আবার বলা শুরু করল সে – ” এর পরের বছর আমি দেশে ফিরে আসি। চাকরি থেকে ছুটি নিয়েছিলাম। সেখানে আবার জয়েন করি। কিন্তু দুই মাস আগে আমি ঈদের ছুটিতে গ্রামে যাই। সেখানে ঈদের দিন রাতে আমি একাকী বসে ছিলাম আমার বাড়ির পেছনের বারান্দায়। তখন দেখি মাহমুদার কবর থেকে একটা বাচ্চা ছেলে বাবা বাবা করে ডেকে আমার দিকে দৌড়ে এসে আমার মাঝে ঢুকে গেছে। সেদিন রাতে আমি খানিকটা নেশা করেছিলাম। তাই সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে সব আজগুবি মনে করে ভুলে যাই। কিন্তু পরদিন আমার পেটে নাভীর গোড়ায় একটা ফোঁড়া ঊঠে। প্রথমে এটা ফোঁড়ার মতই ছিল কিন্তু আস্তে আস্তে এটা বড় হতে থাকে। আমি এই কয়দিন প্রায় সময় স্বপ্নে দেখছি একটা বাচ্চা ছেলে আমাকে বাবা বাবা করে ডাকছে আর বলছে আমার পেট থেকে নাকি তার জন্ম হবে। এই যে দেখেন আমার পেটের মাঝে এটা কি”- বলে শার্টের ভাজ খুলে দেখায় ডঃ তাহসিনাকে। তাহসিনা কিছুক্ষন দেখেন ফোঁড়া টা। বেশ বড় আকারের একটা ফোঁড়া। লালচে ভাব ধরেছে। তারপর হেসে লোকটাকে বললেন- “দেখুন মি.”- বলে নামটা জানার জন্য তাকালেন উতসুক দৃষ্টিতে লোকটার দিকে। উনি বললেন “ রাকিব- মোঃ রাকিব”। “হুম – দেখুন রাকিব সাহেব- আপনার হ্যালুসিনেশন হয়েছিল- সেই দিন রাতে। আপনি আপনার স্ত্রীকে অনেক ভালবাসতেন। সেই ভালবাসা আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে। তাই আপনি উনাকে এবং উনার সন্তান কে মেরে ফেলে অনেক কষ্ট পাচ্ছিলেন। সেইদিন আপনার পিতৃসত্ত্বা আপনার মাঝে আপনার মৃত সন্তান কে ঢুকে যেতে দেখিয়েছে। এটা নিছক ই কল্পনা। আর বেশি কিছু না”। বলে মিষ্টি করে হেসে রাকিব সাহেবের দিকে তাকালেন। “ কিন্তু আমার পেটের এই ফোঁড়া কিভাবে আসল?” এবার ক্ষেপে গেলেন রাকিব সাহেব। “এটা কো- ইন্সিডেন্স মাত্র। এটার সাথে আপনার স্বপ্ন কিনবা হ্যালুসিনেশন কে মেলালে তো চলবেনা”-বললেন ডঃ তাহসিনা। “ দেখেন আমি মেলাচ্ছিনা। কিন্তু ইদানিন আমার পেটের ভেতর কিছু একটা লাথি মারে। কিছু একটা হচ্ছে আমার পেটের ভেতর”- বলেই প্রায় কেঁদে ফেলে রাকিব সাহেব। “ দেখুন আপনাকে আমি কিছু ঔষধ লিখে দিচ্ছি।এগুলো খান। আশা করি আপনার ভাল ঘুম হবে। এবং আপনার এই বিশাল ফোঁড়া ও কমে যাবে” বলেই খস খস করে কিছু ঔষধ লিখে প্যাড থেকে কাগজ ছিড়ে দেন রাকিব সাহেব কে। তারপর বললেন-“ আপনার যে কোন সমস্যা হলে আমি নিজে গিয়ে আপনাকে দেখে আসব। আপনার এখানে আসার আর দরকার নেই। এইখানে আমার ফোন নাম্বার দেয়া আছে। সেখান থেকে আমাকে ফোনে জানাবেন কি হয়েছে”- বলেই ঊঠে পড়লেন ডঃ তাহসিনা। “আমার একটা সেমিনার আছে- আমাকে এখন সেখানে যেতে হবে” বলে বের হয়ে গেলেন ডঃ তাহসিনা। ………….. তিন মাস পর রাত ১টায় ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল ডঃ তাহসিনার। উনি ফোনটা ধরেই আরেক পাশ থেকে শুনতে পেলেন- রাকিব সাহেবের কন্ঠ- “ আপা একটু আসবেন আমার বাসায়? প্লিজ আপা আসেন।প্লিজ আসেন। আমার পেটে প্রচন্ড ব্যাথা করছে” বলেই বাসার ঠিকানা দিলেন ডঃ তাহসিনাকে। সারাদিন মেডিক্যাল এ সেমিনারে ছিলেন তিনি। তাই বাসায় এসে মাত্র শুয়েছেন। কিন্তু এই রকম কল এলে প্রায় সময় তিনি ঘুম রেখেই দৌড় মারেন রূগীর বাসায়। নিজের জীবনের চেয়ে রোগীকে অনেক গুরুত্ব দেন তিনি। আর এই রাকিব সাহেবের ব্যাপারটা নিয়ে তিনি অনেক পড়াশুনা করেছেন ইদানিন। তাই তিনি এত রাতে ফোন পেয়ে কোন রকমে পোশাক পাল্টে গাড়ি নিয়ে বের হলেন। রাকিব সাহেবের বাসায় বাসা গুলশানে। সেখানে পৌছে একটা সাদা রঙ এর বাড়ির সামনে গিয়ে গাড়ি থামিয়ে নিজেই ঢুকে পড়লেন ভেতরে। বাড়িতে গিয়ে বেল টেপার পর খুলে দিল একজন বৃদ্ধা মহিলা। তিনি রাকিব সাহেব কোথায় জিজ্ঞাসা করতেই মহিলা তাহসিনাকে নিয়ে গেলেন একটা ঘরে। সেখানে শুয়ে আছেন রাকিব সাহেব। কিন্তু রাকিব সাহেব কে দেখেই ভয় পেয়ে যান তিনি।রাকিব সাহেবের পেটটা অস্বাভাবিক ভাবে ফোলা। ঠিক যেন সন্তান সম্ভবা মায়ের মত। আর ঠিক সেই সময় রাকিব সাহেব চিৎকার করে ঊঠে অজ্ঞান হয়ে যান। এবং সেই সময় তাহসিনার চোখের সামনে ঘটল এক বিষ্ম্য় কর ব্যাপার। রাকিব সাহেবের নাভির উপরের ফোঁড়া থেকে একটা লালচে পিণ্ড বের হতে লাগল। আস্তে আস্তে পিন্ড টার কিছু অংশ বের হয়ে চোখ আর মুখে অস্তিত্ব জানান দিল। এর পর তাহসিনা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। তাড়াতাড়ি করে দরজা খুলে দেয়া মহিলা কে গামছা আর কুসুম গরম পানি আনতে বলে নিজে কোন রকম টান দিয়ে বের করেন বাচ্চা টাকে। অদ্ভুত সুন্দর সেই সন্তান টাকে কোলে নিয়ে হতভম্ভ হয়ে যান তিনি। বাচ্চা টা যেন ঘুমাচ্ছে। এর মাঝে তোয়ালে নিয়ে সেই মহিলা আসলে তিনি তোয়ালে দিয়ে কোন রকম বাচ্চা টাকে মুছিয়ে দেন। তারপর খেয়াল করেন বাচ্চা টা কাঁদছে না। তিনি অনেক চেষ্টা করছেন। কিন্তু কোনভাবেই বাচ্চাটাকে কাঁদাতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত দেখলেন বাচ্চাটা মারা গেছে। বাচ্চাটা মারা যাবার পর তিনি রাকিব সাহেবের দিকে খেয়াল দিলেন। এতক্ষন তিনি যেন ঘোরের মাঝে ছিলেন। মেডিক্যাল সায়েন্স কে বোকা বানিয়ে এই মাত্র এই লোকটা একটা বাচ্চা জন্ম দিল। কিন্তু বাচ্চাটাকে তিনি বাঁচাতে পারলেন না। আগে জানলে তিনি ঠিক ই রাকিব সাহেবের ব্যাবস্থা করতেন। তিনি তাড়াতাড়ি রাকিব সাহেব এর নার্ভ দেখলেন। কিন্তু হতাশ হলেন। তিনি ভেবেছিলেন রাকিব সাহেব অজ্ঞান হয়েছেন। আসলে তিনি মারা গেছেন সেই চিৎকার দিয়েই। এবার কিছু টা মুষড়ে পড়লেন তাহসিনা। তিনি লোকটাকে বিশ্বাস করলে দুইজন কেই হয়ত বাচানো যেত। এরপর তাহসিনা সেই বাচ্চাটাকে গোপনে সরিয়ে ফেলার ব্যাবস্থা করেন। সেই বৃদ্ধা মহিলা কে দিয়েই বাচ্চাটাকে সেই বাড়ির এক কোনায় কবর দেবার ব্যাবস্থা করেন। আর রাকিব সাহেব কে কবর দেয়া হয় তার গ্রামের বাড়িতে। এই সব ব্যাপার ভাল মত সারতে সারতে উনার কয়েকদিন লেগে যায়। এর তিন দিন পর রাতে ক্লান্ত ডঃ তাহসিনা মাত্র হাসপাতাল থেকে এসে বাসায় খেয়ে দেয়ে শুয়েছেন।এমন সময় উনার ঘরের বারান্দায় একটা আলতো টোকা দেয় কেউ একজন। তখন ও ঘুমান নি তাহসিনা। আস্তে করে ডিম লাইট জ্বালিয়ে ঊঠে বারান্দার দরজা খুলেই দেখেন একটা বাচ্চা ছেলে দাড়িয়ে আছে দরজার ওপাশে।মুখে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে আন্টি আন্টি বলে ঝাপিয়ে পরে তাহসিনার শরীরের সাথে মিশে যায়। ব্যাপারটা এতই তাড়াতাড়ি হয়েছে যে তাহসিনা বেশ কিছুক্ষন নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর অজ্ঞান হয়ে পড়লেন তিনি সেখানেই। পরদিন জ্ঞান ফিরে নিজেকে মাটিতে দেখে প্রথমে ভয় পেয়ে যান তিনি।তারপর রাতের ঘটনা কে নিছক স্বপ্ন ভেবে হেসে ঊড়িয়ে দিলেন তিনি। তারপর ফ্রেশ হবার জন্য বাথরুমে গেলেন। হাত মুখ ধুয়ে বের হতে যাবেন তখন পেটে চিনচিনে একটা ব্যাথা টের পেলেন। তাড়াতাড়ি নাইট গাঊনটা সরিয়ে পেটে হাত বুলালেন তিনি। এবং দিনের আলোতেই পরিষ্কার টের পেলেন তিনি – উনার পেটের যেখানে নাভি- ঠিক তার উপরেই একটা ফোঁড়া ঊঠেছে। লালচে ফোঁড়াটা দেখতে ঠিক রাকিব সাহেবের সেই ফোঁড়াটার মত। সাদৃশ্য টা টের পেতেই আবার জ্ঞান হারালেন সাইকিয়াট্রিষ্ট ডঃ তাহসিনা… সূত্র:-অজানার রাজ্য


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১০৬ জন


এ জাতীয় গল্প

→ একটি আজিব কাহিনী

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now

২২.অদৃশ্য আতঙ্ক (৭-শেষ)

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান আরাফাত হোসেন (০ পয়েন্ট)

X বরফ ঢাকা আপার আল্পস-এর আবহাওয়া অনেকটাই অনিশ্চিত। ম্যাটার হর্ণ-এর ‘স্কি-রিপোর্ট’ থেকে তাতিয়ানা যখন বেরিয়েছিল, তখন আবহাওয়াটা পরিস্কারই ছিল। সে ফিরছিল মঁথে শহরের নাতাশার ওখান থেকে। মাঝ পথেই সে মুখোমুখি হলো তূষার বৃষ্টি এবং প্রবল বাতাসের। রণ নদী থেকে কয়েক মাইল পুবে ‘মার্টিনি’ শহর পেরিয়ে কয়েক মাইল সামনে গিয়ে তাতিয়ানা বরফবৃষ্টির মধ্যে একটা গাড়িকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। গাড়িটার পেছনে সে দেখল রেড এলার্ট লাইট জ্বলছে। গাড়িটা ডোনার। সেও ফিরছিল ‘ম্যাটার হর্ণ’ থেকে জেনেভায়। এখানে এসে হঠাৎ তার গাড়ি বিকল হয়ে গেছে। গাড়ির এয়ারকন্ডিশন কাজ করছে না। অভাবিত এক বিপদে আটকা পড়েছে ডোনা এবং তার আব্বা। তাদের করবার কিছুই নেই। রেড এলার্ট বাতি জ্বালিয়ে তারা অপেক্ষা করছে সাহায্যের। টেলিফোনে সাহায্যের আবেদন করেছে নিকটবর্তী পুলিশ স্টেশনে। তাতিয়ানার গাড়ি গিয়ে দাঁড়াল ডোনার গাড়ির পাশে। ডোনা ও তার আব্বা বেরিয়ে এল গাড়ি থেকে। তাতিয়ানা কোন কথা বলার আগেই ডোনার আব্বা বলল, ‘আমি মিশেল প্লাতিনি ডিবেরী লুই। একজন ফরাসী সাবেক কুটনীতিক। এ আমার মেয়ে মারিয়া জোসেফাইন লুই। আমরা গাড়ি বিকল হওয়ায় এখানে আটকা পড়ে গেছি।’ তাতিয়ানা ডোনার আব্বার মুখের দিকে মুহূর্ত কয়েক স্থির দৃস্টিতে চেয়ে ঈষৎ মাথা নুইয়ে বাউ করে বলল, ‘আপনার নাম আমার মনে পড়ছে। আমি তখন অনেক ছোট। আপনাকে দেখেছিও মনে হয় মস্কোতে দু’একটা অনুষ্ঠানে।’ ‘তোমার পরিচয় কি মা? মস্কোয় তোমার বাড়ি কিংবা ...’ ‘বলব সব। আমার গাড়িতে চলুন। পুলিশ আপনার গাড়ি পৌঁছে দেবে।’ ‘পুলিশকে খবর দিয়েছি।’ ‘ঠিক আছে। ওদের এখন বলে দেব, ওরা গাড়ি ‘মঁথে’ পৌঁছে দেবে। ওখানেই আমরা উঠছি।’ সবাই এসে তাতিয়ানার গাড়িতে উঠল। ড্রাইভ করছিল তাতিয়ানা। তার পাশের সিটে বসল ডোনা। আর ডোনার আব্বা বসল পেছনের সিটে। তাতিয়ানা গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বলল, ‘আপনাদের কথা, আপনাদের পরিবারের কথা তখন আব্বা-আম্মার কাছে শুনেছি। ইশ্বরকে ধন্যবাদ, অনেকদিন পর আপনাদের সাক্ষাত লাভের সৌভাগ্য হলো।’ ‘তোমার পরিচয় দিলেনা মা?’ পেছনের সিট থেকে বলল ডোনার আব্বা। ‘আমি দুর্ভাগা পিটার পরিবারের সন্তান। জার আলেকজান্ডার প্রথম এর পৌত্র পিটার চতুর্থ-এর পৌত্রের মেয়ে আমি।’ ‘হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে। তোমার আব্বার নাম আলেকজান্ডার পিটার। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অনেকবার দেখা সাক্ষাত হয়েছে। তোমাকে দেখেছি। তুমি মারিয়া অর্থাৎ ডোনাকেও নিশ্চয় দেখে থাকবে।’ তাতিয়ানা ডোনার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ‘মনে পড়ে আপনার কিছু?’ ডোনাও হেসে বলল,‘দু’চার বার কথা-বার্তাহীন কিছুক্ষণের দেখার কথা মনে রাখা সম্ভব নয়।’ ‘ঠিকই বলেছেন। আমি কিছু স্মরণ করতে পারছি না।’ ‘তবু দেখা হয়েছে এটা কিন্তু কম কথা নয়।’ ‘অবশ্যই। মনে না থাকা অতীতটাই এখন আমাদের বন্ধুত্বের দৃঢ় বুনিয়াদ হতে পারে।’ ‘নিশ্চয়।’ ‘তোমার নাম কি মা? পেছন থেকে তাতিয়ানাকে লক্ষ্য করে বলল ডোনার আব্বা। ‘আমি তাতিয়ানা।’ ‘ওয়েলকাম, পিটার দি গ্রেটের কন্যাকে।’ ‘নামটাই এখন আছে, বাকি সবটুকুই দুর্ভাগ্য।’ ‘ঐ দুর্ভাগ্য আমাদের ‘লুই’ পরিবারেও।’ ‘কিন্তু লুই পরিবার ফ্রান্সে যে মর্যাদার আসনে রয়েছে, তা আমাদের নেই।’ ‘ভেব না মা, তোমাদেরও সে দিন আসছে।’ বলে একটু থেমেই সে আবার বলল, ‘জান যে আলেকজান্ডার, প্রথম-এর প্রত্যক্ষ বংশধর তুমি, তিনি রুশদের কাছে কত বড়?’ ‘জানি আংকেল। কিন্তু সেটা যে আপনাদের বিরুদ্ধে যায়?’ হাসতে হাসতে বলল তাতিয়ানা। ডোনার আব্বা কথা বলতে যাচ্ছিল। বলতে গেলে তার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে ডোনা বলল, ‘ফরাসী সম্রাট নেপোলিয়ন রুশ সম্যাট আলেকজান্ডার প্রথম-এর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন, এটা আমাদের জন্যে দুঃখের। কিন্তু আলেকজান্ডার (প্রথম) রুশ জাতিকে যে রক্ষা করেছিলেন এ জন্যে শ্রদ্ধার পাত্র তিনি আমাদের। ‘ধন্যবাদ আপনাদের।’ ‘ওয়েলকাম। আমার খুব আনন্দ লাগছে যে পিটার দি গ্রেটের একজন কন্যার এইভাবে দেখা পেলাম।’ ‘আমার কথাই কিন্তু আপনি বলেছেন। আমার অনেক শোনা লুই পরিবারের আপনাদের দেখা হওয়াতে আমার সৌভাগ্য বলে মনে করছি।’ বাইরে তুষার বৃষ্টি বেড়ে গেছে। সেই সাথে বাতাসের বেগটাও বেড়েছে। এই আবহাওয়ায় তুষার ঢাকা পিচ্ছিল পথে গাড়ি চালানো খুবই ঝুঁকি পূর্ণ। ডোনা কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল। কিন্তু ডোনার আব্বা তাকে বাধা দিয়ে বলল,‘কথা বলার চেয়ে সমানের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখাই বোধহয় আমাদের ভাল।’ ‘ধন্যবাদ আংকেল। আমরা অনেকটা এসেছি। সামনেই রণ নদী। নদী-তীর বরাবর রাস্তাটা আরও একটু ভাল হবে।’ ‘ধন্যবাদ তোমাকে তাতিয়ানা। তুমি ভাল ড্রইভ কর।’ ‘ধন্যবাদ আংকেল।’ চলতে লাগল গাড়ি। চারদিকের তুষার শুভ্র মৌন পরিবেশের মধ্যে দিয়ে চলছে গাড়ি। অবিরল ধারায় আকাশ থেকে নামা তুষার কণা সাদা আলোর তীর বৃষ্টির মত বিদ্ধ করছে পৃথিবীর নীরব বুককে। নীরবতার বুক চিরে দুর্বিনীতের মত এগিয়ে চলছে গাড়িটি। একদিন পর। রণ নদীর তীরে ‘মঁথে’ শহর। নাতাশার বাড়ি। নাতাশার তিন তলা সুন্দর বাড়িটা নদীর তীরেই। দু’দিনের দারুণ খারাপ আবহাওয়ার পর এক খন্ড রোদে চারদিক ঝলমল করে উঠেছে। ডোনা তার বেড রুমের ব্যালকোনিতে বসে নিজেকে মেলে দিয়েছে দুর্লভ রোদে। ভেতরে বেড এবং টেবিল ড্রেসিং করছিল তাতিয়ানা। তিন তলার দু’টি পাশাপাশি কক্ষে থাকে ডোনা ও তাতিয়ানা। নিজের ঘর ড্রেসিং করার পর ডোনার ঘর ড্রেসিং করছে তাতিয়ানা চুপি চুপি। ঘর বাড়ি ঠিক রাখার এ কাজগুলো নিজেদেরই করতে হয়। কিন্তু ডোনাকে কোন কাজেই হাত দিতে দেয় না তাতিয়ানা। তাই সে ডোনার ঘরটা ড্রেসিং করে নিচ্ছে চুপি চুপি ডোনাকে ব্যালকোনিতে পাঠিয়ে। ‘কোথায় তুমি তাতিয়ানা এস।’ ব্যালকোনি থেকে ডাকল ডোনা। ‘এই আসছি ডোনা।’ বলে জোরে হাত চালাল তাতিয়ানা। ডোনার টেবিল ঠিক করার সময় তাড়াহুড়ো করে ডোনার হাতব্যাগ সরাতে গিয়ে খোলা হাত ব্যাগ থেকে ডোনার ছোট্ট নোটবুকটা ছিটকে পড়ে গেল মেঝেতে। নোট বুক থেকে একটা ফটো বেরিয়ে পড়ল। মেঝে থেকে নোটবুক ও ফটো তুলতে গিয়ে ফটোর উপর নজর পড়তেই ভূত দেখার মত চমকে উঠল তাতিয়ানা। এ যে আহমদ মুসার ছবি! ডোনার হাত ব্যাগে কোত্থেকে এল! ফটো হাতে তুলে নিয়ে কিছুক্ষণ পাথরের মত স্থির হয়ে বসে থাকল তাতিয়ানা। তার মনে নানা’ প্রশ্নের ভীড়। আহমদ মুসার ফটো এইভাবে কার কাছে থাকতে পারে? থাকতে পারে পুলিশের কাছে, গোয়েন্দা পুলিশের কাছে। অথবা থাকতে পারে আহমদ মুসার কোন আত্মীয়ের কাছে। কিংবা থাকতে পারে আহমদ মুসার প্রেমিকার কাছে। ডোনা কে? সেকি গোয়েন্দা পুলিশ? আহমদ মুসার আত্মীয় কি সে? আত্মীয় অবশ্যই নয়। ফ্রান্সের ‘লুই’ পরিবার ও এশিয়ান মুসলিম আহমদ মুসার মধ্যে কোন রক্তের সম্পর্ক থাকতে পারে না। তাহলে ডোনা হয় গোয়েন্দা পুলিশ, নয়তো আহমদ মুসার প্রেমিকা। ‘আহমদ মুসার প্রেমিকা’ কথাটা ভাবতেই তাতিয়ানার ঠোঁটে বেদনার একখন্ড হাসি ফুটে উঠল। মনে মনে বলল, ‘আহমদ মুসার পাথর হৃদয় কাউকে ভালবাসতে পারে না।’ তাহলে কি ধরে নিতে হবে ডোনা ফরাসী গোয়েন্দা পুলিশ? তাই হবে যদি আহমদ মুসার সাথে তার হৃদয়ের সম্পর্ক না থাকে। কিন্তু ডোনাকে গোয়েন্দা পুলিশ ভাবতে কষ্ট লাগল তাতিয়ানার মনে। মাত্র একদিনেই ডোনা তাতিয়ানার হৃদয় জয় করে নিয়েছে। ‘তাতিয়ানা আসছ না যে?’ আবার ডোনা ডাকল ব্যালকোনি থেকে। তাতিয়ানা তাড়াতাড়ি ফটো, নোটবুক হাত ব্যাগে ঢুকিয়ে টেবিলে রাখতে রাখতে বলল, ‘এই আসছি।’ বলে তাতিয়ানা মুখে হাসি ফুটিয়ে স্বাভাবিক হয়ে ছুটল ডোনার কাছে। সেই সাথে ভাবল ডোনাকে জানতে হবে। গিয়ে সে ডোনার গলা জড়িয়ে ধরে তার পাশে বসে বলল, ‘মনে হচ্ছে তর সইছে না। প্রেমে পড়লে এমন হয়।’ ‘তাহলে প্রেমে পড়ার অভিজ্ঞতা তোমার আছে? তাই কি?’ বলল ডোনা। তাতিয়ানা ভাবল, নিজে ধরা না দিলে ডোনাকে ধরা যাবে না। বলল, ‘আছে, কিন্তু খুব খারাপ অভিজ্ঞতা।’ ‘মানে?’ ‘প্রেমে পড়েছি কিন্তু প্রেম পাইনি। সুতরাং অভিজ্ঞতা খুব তিক্ত।’ ডোনা তাতিয়ানাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘মিথ্যা বলছ। তোমার মত লাখে একজন নেই। তুমি প্রেম পাবে না ঠিক নয়।’ তাতিয়ানা ডোনার মুখ টেনে নিজের চোখের সামনে এনে হেসে বলল, ‘তোমার মত কোটিতে একজন মিলে না এমন প্রতিদ্বন্দ্বী যদি থাকে? তাছাড়া কারও হৃদয় যদি পাথরের হয়, তাহলে সেখানে ফুল ফুটবে কি করে?’ কথা শেষ করেই তাতিয়ানা বলল,‘নিশ্চয় আমার মত তিক্ত অভিজ্ঞতা তোমার নেই?’ ডোনা জবাব দিল না সংগে সংগে। তার ঠোঁটে মিষ্টি হাসি। তাতিয়ানা সেদিকে চেয়ে বলল, ‘বুঝেছি। তোমার মিষ্টি হাসি জবাব দিয়েছে। এখন বল কোন সে সৌভাগ্যবান?’ ডোনা গম্ভীর কন্ঠে বলল, ‘বলতে পার আমি সুখী, কিন্তু সেই সাথে অসুখীও।’ ‘সুখটা আবার অসুখ হলো কি করে?’ ‘সুখের আকাশ যদি বিপদের পর বিপদের কালবৈশাখীতে ভরা থাকে, তাহলে সুখ আর থাকে কোথায়?’ ‘বুঝলাম না, তোমাদের এমন বিপদের কথা তো শুনিনি?’ ‘তাঁর জীবনও তো আমার জীবন!’ ‘বুঝেছি। সেই ‘তিনি’টা কে?’ প্রশ্নটা করতে গিয়ে বুকটা কেঁপে উঠল তাতিয়ানার। যে বিপজ্জনক জীবনের কথা ডোনা বলছে, সে জীবনটা আহমদ মুসার নয়তো? ভাবতেই বুকটা তার যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যেতে চাইল। তার মন বলল, উত্তরটা না শোনাই ভাল। তাতিয়ানার প্রশ্নের জবাব ডোনা তৎক্ষণাৎ দেয়নি। তাতিয়ানার দুর্বল মন জবাবের জন্যে ডোনাকে আর চাপ দিল না। উঠে দাঁড়াল তাতিয়ানা। বলল, ‘চল, অ্যান্টি, আংকেলরা ব্রেকফাষ্ট টেবিলে এসে গেছেন।’ ব্রেক ফাষ্ট সেরে রোদ আরেকটু তেতে উঠল ডোনা ও তাতিয়ানা নিচে নেমে এল রণ নদীর তীরে বেড়াবার জন্যে। পাশাপাশি দু’জন হাঁটছিল। প্রশ্নটার উত্তর ডোনা দেয়নি। কিন্তু তারপর থেকে তাতিয়ানার মন ভাল নেই। একটা অস্বস্তিকর যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়েছে যেন তার রক্তের প্রতিটি কণিকায়। জবাব তাকে পেতেই হবে। মনটাকে শক্ত করে নিল তাতিয়ানা। তারপর ডোনাকে কাছে টেনে তার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমার জবাব কিন্তু দাওনি।’ ‘কি বলব বল।’ সলজ্জ হেসে বলল ডোনা। ‘তিনি ফরাসী নিশ্চয়? দুরু দুরু বুকে প্রশ্ন করল তাতিয়ানা। ‘না তিনি ফরাসী নন।’ জবাব শুনে বুক ছ্যাঁৎ করে উঠল তাতিয়ানার। কিন্তু সামলে নিল নিজেকে। প্রশ্ন করল, ‘বিদেশী? কোন দেশী?’ ‘ও এশিয়ান। কিন্তু ওর নির্দিষ্ট কোন দেশ নেই।’ বুকে একটা হাতুড়ির ঘা লাগল তাতিয়ানার। মিলে যাচ্ছে। আহমদ মুসার সথে মিলে যাচ্ছে তাঁর বর্ণনা। তাহলে আহমদ মুসাই কি সে? কিন্তু কোন নির্দিষ্ট দেশ না থাকা আরও শত শত লোক আছে। কোন প্রশ্ন করতে পারলো না তাতিয়ানা। ডোনাও কথা বলল না। হাঁটছিল দু’জন পাশাপাশি। অনেক্ষণ পর কম্পিত বুকে শেষ প্রশ্নটা করল, ‘কে এই অদ্ভুত মানুষ?’ ‘নামটা নিষিদ্ধ। কিন্তু তোমাকে বলা যায়। তিনি ‘আহমদ মুসা।’ তীব্র শক ওয়েভের মত একটা আঘাত সামলাতে গিয়ে তাতিয়ানা তার চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল। নদী তীরের অসমান রাস্তায় বরফ মোড়া একটা পাথরের সাথে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল তাতিয়ানা। ডোনা তাড়াতাড়ি তাকে তুলে বলল, ‘তুমি ঠিক আছে? কোথাও লাগেনি তো তোমার?’ ‘ব্যস্ত হয়ো না ডোনা। কোথাও লাগেনি আমার। খেয়াল করিনি পাথরটাকে। হোঁচট খেয়েছি।’ ডোনা তাকে বুকে জড়িয়ে বলল, ‘তোমাকে কেমন বিমর্ষ লাগছে। তোমার শরীর খারাপ হয়নি তো?’ ‘না ডোনা ভাল আছি। একটু মাথা ধরা তেমন কিছু নয়।’ ‘তাহলে চল ঠান্ডায় ঘুরে কাজ নেই। বাসায় ফিরে যাই।’ ‘তাই চল।’ বাসায় ফিরে এল ওরা। তাতিয়ানা নিজেকে এতক্ষণ সামলে রাখতে পেরেছিল। বাসায় ফিরে ডোনা বলল তাতিয়ানাকে, ‘তুমি একটু রেষ্ট নাও। মাথার ব্যথা না কমলে বিকেলে ডাক্তারকে কনসাল্ট করা যাবে।’ ডোনা নিজের ঘরে চলে গেল। তাতিয়ানা নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। এতক্ষণ মনের সকল শক্তি দিয়ে নিজেকে ধরে রেখেছিল। আর পারল না। মেঝের উপরই সে কান্নায় ভেঙে পড়ল। অতীতে আরও অনেক কেঁদেছে তাতিয়ানা। সে কান্না ছিল না পাওয়ার। কিন্তু আজকের কান্না সব হারানোর। কাঁদতে কাঁদতে অবসন্ন তাতিয়ানা ঘুমিয়ে পড়েছিল মেঝেতেই। তাতিয়ানা ডোনা ও তার আব্বাকে নিয়ে সেদিনই বিকেলে ফিরে এসেছিল জেনেভায়। সেদিন দুপুরে ডোনা ফাতেমা হিরেনের সাথে টেলিফোনে কথা বলে জানতে পেরেছিল, আহমদ মুসা ফিরে আসার পর গত রাতে শত্রুর ঘাঁটিতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। কথাটা শুনে মুষড়ে পড়েছিল ডোনা। আর আপাত শান্ত তাতিয়ানার হৃদয়ে উঠেছিল উদ্বেগ-উৎকন্ঠার ঝড়। তাতিয়ানা সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডোনাকে ঘুণাক্ষরেও কিছু জানতে না দেয়ার। ডোনার কাছ থেকে আরও কিছু সে শুনেছে। বুঝেছে, দীর্ঘদিন ধরে অসংখ্য ঘটনার মধ্যে দিয়ে আহমদ মুসার সাথে তার গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ওদের মাঝখানে তার দাঁড়ানো ঠিক নয়। এসব কথা ভাবতে গিয়ে হৃদয় যেন রক্তক্ষরণ হয়েছে তাতিয়ানার। আহমদ মুসার খবর পাওয়ার পর তাতিয়ানা আর দেরী করতে চায়নি। বিকেলেই চলে এসেছে ওদের নিয়ে। জেনেভা পৌঁছেই ডোনা তাতিয়ানাকে নিয়ে চলে গেল ওয়ার্ল্ড নিউজ (WNA) এজেন্সীর অফিসে। ফাতেমা হিরেনকে অফিসেই পেল ডোনা। ‘ওয়েলকাম মিস মারিয়া লুই। আমরা আপনার অপেক্ষা করছি।’ বলল ফাতেমা হিরেন। ‘আর কোন খবর আছে?’ বলেই ডোনা তাতিয়ানাকে দেখিয়ে বলল, ‘মিস তাতিয়ানা পিটার। আমার বোন, বন্ধু সব।’ ‘খুশী হলাম। কেমন আছেন?’ বলল ফাতেমা হিরেন। ‘আমিও খুশী হলাম। ভাল আছি।’ বলল তাতিয়ানা। ‘ধন্যবাদ।’ বলে ফাতেমা হিরেন ডোনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওঁর খোঁজ নেবার জন্যে সাহায্য চাওয়া হয়েছিল। তিনজন এসেছেন।’ ‘কাদের কাছে সাহায্য চাওয়া হয়েছিল?’ ‘সাইমুমের কাছে।’ ‘আচ্ছা কোত্থেকে ওরা এসেছেন?’ ‘ফ্রান্স থেকে।’ ‘ওরা কি বলেছেন?’ ‘যে ঠিকানা আমাদের কাছে আছে, সে ঠিকানায় ওরা খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। আজ রাতেই ওরা ঐ ঠিকানায় ঢুকবেন, যদি আপনারা ভিন্নমত না করেন।’ ‘ওরা বলেছেন এটা?’ ‘না এ মত মিঃ গটেফ এবং মিঃ জারমিসের। পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার আগে তারা আপনার মত নিতে বলেছেন।’ ‘ধন্যবাদ। পরিকল্পনা ঠিকই আছে। সাইমুমের লোকদের পরামর্শ দেবার মত আমার কিছু নেই। তবে ঠিকানার লোকেশান এবং ওরা রাতে ঠিক কয়টায় ওখানে পৌঁছবেন, তা আমরা জানতে চাই।’ ‘ঠিক আছে মিঃ গটেফকে বলে আপনাকে জানিয়ে দিচ্ছি।’ বলল ফাতেমা হিরেন। ‘ধন্যবাদ। আমরা বাসায় যাচ্ছি। তথ্য দু’টো যত তাড়াতাড়ি জানতে পারি ততই আমাদের সুবিধা।’ ‘আরেকটা কথা। মিঃ গটেফ বলেছেন, ওঁরা তিনজন অভিযানে গেলে বাড়ির বাইরে বাড়িটার উপর চোখ রাখার জন্যে মিঃ গটেফ ও মিঃ জারমিস কিছু লোক রাখার ব্যবস্থা করেছেন। ‘তা রাখতে পারেন। তবে ব্যাপারটা সাইমুমের লোকদের জানাতে হবে। আর ওঁদের আরও জানাবেন, আশে-পাশে আমাদের মত কেউ থাকতে পারে।’ বলে ডোনা উঠে দাঁড়াল। ফাতেমা হিরেনও উঠে দাঁড়াল। গাড়ি পর্যন্ত এসে বিদায় জানাল। গাড়ি চলতে শুরু কররে তাতিয়ানা বলল, ‘তোমার সিদ্ধান্তকে মোবারকবাদ জানাচ্ছি ডোনা।’ ‘কোন সিদ্ধান্ত?’ ‘শত্রুর ঠিকানায় আমাদের যাবার সিদ্ধান্ত।’ ‘তুমিও আমার সাথে যাবে তাতিয়ানা?’ তাতিয়ানার বুকের বেদনাটা চিন চিন করে উঠল। আহমদ মুসা বিপদে, একথা জেনেও সে চুপ করে বসে থাকবে! একটা বেদনার হাসি ফুটে উঠল তাতিয়ানা ঠোঁটে। বলল, ‘তুমি যাবে, আর আমি ঘরে বসে থাকব- একথা ভাবতে পার তুমি?’ মুখ না তুলেই কথা বলল তাতিয়ানা। ‘না পারি না তাতিয়ানা। মাত্র দু’দিনে আমরা যে শত বছরের মত একাত্ম হয়ে গেছি। তোমাকে ঘরে রেখে আমি যেতে পারতাম না। মনে হতো অর্ধেক শক্তি যেন আমি রেখে গেলাম। তুমি না যেতে চাইলেও তোমাকে টেনে নিয়ে যেতাম।’ ডোনা আনন্দে ডান হাত স্টেয়ারিং- এ রেখে বাম হাত বাড়িয়ে দিল তাতিয়ানার দিকে। তাতিয়ানা ডান হাত দিয়ে চেপে ধরল ডোনার হাত। ‘আমরা সুখে-দুঃখে এক সাথে।’ তাতিয়ানার হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলল ডোনা। ‘না সুখে নয়, সকল দুঃখে আমরা এক সাথে।’ ‘সুখে নয় কেন?’ ‘সুখটা রিজার্ভ থাক। দুঃখটাই ভাগ করে নেই।’ ‘সুখ নিয়ে তুমি স্বার্থপর হতে চাচ্ছ কেন তাতিয়ানা?’ ‘কিছু সুখ আছে যেখানে স্বার্থপর হতে হয়। ওর ভাগ দেয়া যায় না ডোনা।’ তাতিয়ানার ঠোঁটে হাসি, কিন্তু তার চোখে অশ্রু টল টল করে উঠল। ড্রাইভিং সিটে বসা ডোনার চোখ সামনের দিকে নিবদ্ধ থাকায় এই অশ্রু সে দেখতে পেল না। ‘তাতিয়ানা তুমি শত বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলছ। জীবন সম্পর্কে এই অভিজ্ঞতা তুমি পেলে কোথায়?’ হাসল তাতিয়ানা। বেদনার হাসি। বলল, ‘অনেক সময় এক মুহূর্তও একশ’ বছরের অভিজ্ঞতা এনে দেয়। ‘ঠিক বলেছ তাতিয়ানা।’ ‘গাড়ি এসে দাঁড়াল ডোনার বাসার গাড়ির বারান্দায়। তাতিয়ানারাও এখানে থাকছে, যদিও সে এসে উঠেছে মিঃ কেলভিনের জেনেভার বাসায়। তার লাগেজ সবই রয়েছে সেখানে। শুধু সে থাকছে ডোনার সাথে। রাত ১১টা বাজার ১৫ মিনিট আগেই ডোনা ও তাতিয়ানা ৯৯ নং লেক আইল্যান্ড বাড়িটার পাশে গিয়ে পৌঁছল। ‘সন্ধ্যার আগে এসে ডোনারা বাড়িটার চারদিক দেখে গেছে। ডোনা তার গাড়ি দাঁড় করাল ৯৯ ও ৯৮ নং বাড়ির মাঝখানের প্যাসেজটায়। সেখান থেকে ৯৯ নং বাড়িটার তিনদিকে নজর রাখা যায়। সাইমমের ওরা তিনজন, যারা আসবে এই বাড়িতে আহমদ মুসার সন্ধান নিতে আসার কথা রাত ১১টায়। ডোনারা ১৫ মিনিট আগে এসেছে। ওরা তিনজন কখন আসছে, কখন কোনদিক দিয়ে প্রবেশ করছে, ভেতরে কি ঘটে তার প্রতি দৃষ্টি রাখতে চায় তারা। ডোনা বুঝতে পারল না সাইমুমের ওরা রাত ১১টা বেছে নিল কেন, রাত ১২টার পরে নির্জন পরিবেশে কেন নয়? আবার ভাবল, জনাকীর্ণ পরিবেশে ঝুকিপূর্ণ অভিযানের বিশেষ সুবিধাও আছে। হয়তো শত্রুর অসতর্ক অবস্থার এই সুযোগ তারা নিতে চায়। ঠিক কাঁটায় কাঁটায় রাত ১১টায় সাইমুমের ওরা তিনজন এল। বাড়ি থেকে একটু সামনে ফুটপাতের কার পার্কিং এ গাড়ি দাঁড় করাল ওরা। ডোনার চোখে ‘নাইট বাইনোকুলার’ এবং কানে ডিস্ট্যান্ট হেয়ারিং মাইক্রো এ্যান্টেনা রয়েছে। এই বাইনোকুলার দিয়ে সিকি মাইল দূর পর্যন্ত রাতেও দেখা যায়। হেয়ারিং মাইক্রো এ্যান্টেনা দিয়ে দু’শ গজ দূরের ফিসফিসানি কথা পর্যন্ত শোনা যায়। ডোনা শুনতে পেল গাড়ির ভেতরে ওদের তিনজনের শলাপরামর্শ। ওদের একজন গাড়িতে অপেক্ষা করবে। আধ ঘন্টার মধ্যে না ফিরলে সেও বাড়িতে প্রবেশ করবে অন্য পথে। দু’জন ওরা নেমে এল গাড়ি থেকে। ওরা বাড়ির সামনে এসে সোজা প্রধান গেটে গিয়ে দাঁড়াল একেবারে স্বাভাবিক মানুষের মত। যেন এ বাড়িটা তাদেরই। তারপর পকেট থেকে চাবি বের করে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল। ডোনা বুঝল, দরজার তালা খোলার জন্যে ওরা মাষ্টার কি ব্যবহার করছে। এটা খুবই সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু ডোনা চমৎকৃত হলো শক্র ঘাঁটিতে প্রবেশের সময় ওদের স্বাভাবিকতা, নির্ভিকতা ও ঠান্ডা মাথার কাজ দেখে। ডোনা তাতিয়ানার কানে কানে ফিস ফিস করে বলল, ‘আহমদ মুসার সাইমুম সত্যিই অনন্য।’ ‘সত্যিই চমৎকৃত হওয়ার মত ঘটনা। বলর তাতিয়ানা। ওরা ভেতরে চলে গেল তারপর সব নীরব। ‘৯৯নং এই বিল্ডিংটি সম্পূর্ণ সাউন্ড প্রুফ। মনে হয় স্টুডিও হিসাবেই একে সাউন্ড প্রুফ করা হয়েছিল।’ বলল ডোনা। আধ ঘন্টা পার হয়ে গেল। কেউ ফিরল না। ডোনা দেখল, গাড়ি থেকে তৃতীয় ব্যক্তি বের হয়ে এল। সে বাড়ির সামনের দিকটা এড়িয়ে ডোনাদের গাড়ি বাড়িটার যে পাশে ছিল সেই পাশে এসে বিল্ডিং- এর নিচে দাঁড়াল। ডোনা বুঝতে পারল, সাইমুমের এ লোকটি বাড়ির এ পাশ দিয়ে সম্ভবত জানালার গরাদ খুলে বা কেটে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করবে। ডোনা তাতিয়ানাকে ইশারা করে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। সম্ভপর্ণে সাইমুমের তৃতীয় লোকটির পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। শেষ মুহূর্তে পায়ের শব্দ পেয়েছিল লোকটি। বোঁ করে ঘুরে সে বিভলবার তুলতে যাচ্ছিল। ‘রিভলবারের দরকার নেই। আমরা আহমদ মুসার শুভাকাঙ্খী। জানার কথা আপনাদের।’ বলল ডোনা। লোকটির রিভলবার নেমে গেল। বলল, ‘জি ম্যাডাম, আমরা জানি। বলুন, কি আদেশ। নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেছে। ওরা তো ফিরল না।’ ‘আপনার ভেতরে প্রবেশের প্রয়োজন নেই। আপনি নিচে পাহারায় থাকুন। বাড়ি থেকে যাতে কেউ বেরুতেও না পারে, ঢুকতেও না পারে। আপনার টেলিফোন আছে?’ ‘আছে।’ ‘এখন থেকে ঠিক একঘন্টা পরেও আমরা না ফিরলে পুলিশে টেলিফোন করবেন। বলবেন, এই বাড়িতে কিছু লোককে কিডন্যাপ করে রাখা হয়েছে।’ ‘জি, আচ্ছা। কিন্তু আপনারা কি ভেতরে প্রবেশ করবেন?’ ‘হ্যাঁ।’ ‘কিন্তু এটা কি ঠিক হবে? ভেতরে সাংঘাতিক কিছু ঘটেছে।’ ‘আমরাও তাই মনে করি। সব বিবেচনা করেই আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ বলে একটু থেমেই আবার বলল, ‘আপনি আপনার দায়িত্ব বুঝতে পেরেছেন তো?’ ‘জ্বি।’ ‘ঠিক আছে। আপনি আপনার গাড়িতে বসে অপেক্ষা করুন।’ লোকটি সালাম দিয়ে যেভাবে ঘুরা পথে এখানে এসেছিল, সেভাবেই সে তার গাড়ির দিকে চলে গেল। ‘তাতিয়ানা আমরা বাড়ির পেছনের দিক দিয়ে ঢুকব।’ বলল ডোনা। ‘তোমার সিদ্ধান্ত ঠিক আছে।’ বলে তাতিয়ানা একটু থামল। তার ভেতরটা উদ্বেগ-উৎকন্ঠায় কাঁপছে এই ভাবনায় যে, ভেতরে ভয়ানক কিছু ঘটছে। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলল, ‘ভেতর সম্পর্কে তুমি কি ভাবছ ডোনা?’ ‘ও ভাবনাটা মন থেকে আমি দূরে রাখতে চাচ্ছি। তা না হলে এগুতে পারব না, দুর্বল হয়ে পড়ব। এস কিছু না ভেবেই আমরা প্রবেশ করি। তোমার ভয় করছে কি?’ ‘কিসের ভয়? কি আছে জীবনে? জীবনের কোন মায়া আমার নেই।’ ডোনার দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে তাতিয়ানার মুখোমুখি হয়ে তার ঠোঁটে নিজের তর্জনি চাপা দিয়ে বলল, ‘এমন কথা বলো না তাতিয়ানা। জীবনকে ভালবাসা আল্লাহকে ভালবাসার অংশ।’ ‘কিন্তু জীবন কোরবানী না দিলে তো কোন বড় কাজ হয় না। ইসলামও তো এই কুরবানী চেয়েছে।’ ‘কিন্তু সেটা জীবনকে ভালবেসে আল্লাহর পথে সর্বাত্মক কাজ করার একটা অংশ। লক্ষ্য এখানে কাজ করা। কাজ করতে গিয়ে জীবন দেয়ারও প্রয়োজন হতে পারে।’ ‘ধন্যবাদ ডোনা। বুঝেছি ব্যাপারটা। আসলে আমি ভয় পাচ্ছি না সেই কথাই বলতে চাচ্ছিলাম।’ ‘ধন্যবাদ।’ ‘বলে ডোনা বিল্ডিং-এর ছায়ার ঘন অন্ধকারের মাঝ দিয়ে বাড়ির পেছন দিকে চলল। বাড়ির দেয়াল ঘেঁষে লেকের পানির কিনার পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ালো ডোনা। বাড়ির দেয়াল পানির ভেতর আরও কিছুটা এগিয়ে গেছে, তারপর পাওয়া যাবে বাড়ির পেছনের বাগান ঘেরা রেলিং। ডোনা ও তাতিয়ানা দু’জনেই পরেছে ট্রাক-স্যুট। তার উপর পরেছে গলা থেকে পা পর্যন্ত নামানো গাউন। গাউনের উপর দিয়ে কোমরে বেল্ট আটকানো। মাথায় কালো রুমাল। তার উপর ফেল্ট হ্যাট। গাউন দু’হাতে উঁচু করে ধরে পানিতে নামল ডোনা। তার পেছনে তাতিায়ানা। দু’জনেরই রাবারের মোজা পরা। হাঁটুর উপর পর্যন্ত উঠানো। হাঁটু পানি পর্যন্ত নেমেই দেখল তারা রেলিং এর প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। উপরে রেলিং এর দিকে একবার তাকিয়ে ডোনা বেল্টে ঝুলানো পকেট থেকে সিল্কের কর্ড বের করে রেলিং লক্ষ্যে ছুড়ল। দু’বারের চেষ্টা ব্যর্থ হবার পর তৃতীয় চেষ্টায় কর্ডের হুক রেলিং- এর সাথে আটকে গেল। সিল্কের কর্ড বেয়ে প্রথমে উঠল ডোনা। তারপর তাতিয়ানা। বাগানে দাঁড়িয়ে বাড়ির দিকে নজর বুলিয়ে দেখল, বাগানের গোটা উত্তর পাশ জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা। বাগানের পশ্চিম অংশে মনে হলো গোডাউন জাতীয় কিছু। বাড়ির এপাশে একটি সিঁড়ি দেখে খুশী হলো ডোনা। বলল, ‘তাতিয়ানা এই সিঁড়িটা আমাদের জন্যে আল্লাহর রহমত।’ ‘তা বটে। কিন্তু কোন তলায় প্রথম ঢুকবে বলে মনে করছ?’ চিন্তার রেখা ফুটে উঠল ডোনার চোখে মুখে। বলল, ‘গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছ। ভাবতে হবে এ নিয়ে।’ তারা সিঁড়ির দিকে এগুবে, এমন সময় একটা শব্দ শুনে চাইল সামনের দিকে। দেখল, সিঁড়ি যেখানে শেষ হয়েছে তার সামনেই দেয়ালের গায়ে একটা দরজা নড়ে উঠছে। ডোনা তাতিয়ানাকে নিয়ে বসে পড়ল। ফুলের গাছার ফাঁক দিয়ে তারা দেখল ইস্পাতের দরজা খুলে একজন লোক বেরিয়ে এল। তার হাতে বৈদ্যুতিক লন্ঠন। সেই আলোতে দেখা গেল, বিদ্যুতের কিছু তার এবং একটা বাল্ব তার হাতে। লোকটি হাতের বিদ্যুতের তারের প্রান্তটা নিয়ে সিঁড়ির সাথে বাঁধল এবং তাতে বাল্ব জ্বালাতেই আলো জ্বলে উঠল। ডোনা বুঝল, বাগানের দিক থেকে তারা মনে হয় কিছু সন্দেহ করছে। তাই এদিকে আলো জ্বেলে রাখল। লোকটা ফিরে যাচ্ছিল দরজার দিকে। ডোনা সংগে সংগে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল। ছোট একটা পাথরের টুকরো ছুড়ে মারল লোকটিকে লক্ষ্য করে। লোকটি শক খাওয়া মানুষের মত চমকে উটে ফিরে দাঁড়াল। তার হাতে উদ্যত হযে উঠেছে রিভলবার। ডোনা তার সাইলেন্সার লাগানো রিভলবার থেকে প্রথম গুলীটা ছুড়ল লোকটিকে লক্ষ করে। লোকটি বুকে গুলী খেয়ে নিঃশব্দে ঢলে পড়ল মাটির উপর। ডোনা ও তাতিয়ানা দেরী না করে হামাগুড়ী দিযে দরজার দিকে চলল। দু’জন ভেতরে ঢুকল। দরজা বন্ধ করে দিল ডোনা। ‘তুমি ঠিকই বলেছিলে ডোনা, পুরো বাড়িটাই সাউন্ড গ্রুফ।’ ভেতরে ঢুকে চারদিকে তাকিয়ে বলল তাতিয়ানা। ডোনা ডিস্ট্যান্ট হেয়ারিং কানে লাগাল। কানে লাগিয়েই বলল, ‘তাতিয়ানা গুণ গুণ করতে করতে কেউ এদিকেই মনে হয় আসছে। ডোনা ও তাতিয়ানা সিঁড়ির নিচে রাখা একটা বাক্সের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। অল্পক্ষণের মধ্যেই একজন স্টেনগানধারী পাশের করিডোর দিয়ে এল। তার লক্ষ্য দরজা। কিন্তু দরজার দিকে তাকিয়ে দরজা বন্ধ দেখেই সে চিৎকার করে ডেকে উঠল, ‘হেভেন তুমি কোথায়? তোমার ডাক পড়েছে উপরে।’ বলে সে চারপাশে নজর করছিল। বাদদিকে তাকাতে গিয়েই সে দেখতে পেল উদ্যত রিভলবার হাতে দাঁড়ানো ডোনা ও তাতিয়ানাকে। সেদিকে সে তার স্টেনগান ঘুরাতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই ডোনার একটা গুলী গিয়ে বিদ্ধ করল স্টেনগান ধরা লোকটির ডান হাতকে। স্টেনগান পড়ে গেল তার হাত থেকে। ডোনা দু’পা এগিয়ে বলল, ‘দ্বিতীয় গুলী এবার বক্ষদেশ বিদ্ধ করবে। বল, ‘বন্দীদের তোমরা কোথায় রেখেছ?’ লোকটি মুখ খুলল না। ক্ষেপন করার মত সময় নেই ডোনাদের হাতে। ডোনার দ্বিতীয় গুলী গিয়ে বিদ্ধ করল লোকটির বক্ষদেশকে। ইতিমধ্যে তাতিয়ানা কুড়িয়ে নিয়েছিল লোকটির স্টেনগান। ‘তাতিয়ানা, আমার মনে হয় কর্তা ব্যক্তিরা উপরে আছেন। বন্দীও থাকতে পারে উপরে। চল আমরা যতদূর সম্ভব ওদের সংগঠিত হবার সুযোগ না দিয়ে এগুব।’ সিঁড়ি দিয়ে ডোনা ও তাতিয়ানা উঠতে লাগল পাশাপাশি। ওরা দু’তলায় দেখল, দু’টো করিডোর দু’তলার দু’দিকে চলে গেছে। আর সিঁড়ি উঠে গেছে তিন তলায়। ডোন উৎকর্ণ হয়ে উঠেছিল। বলল, ‘তাতিয়ানা সাবধান, অনেকগুলো পায়ের শব্দ পাচ্ছি। পশ্চিম দিক থেকে যেন কারা আসছে।’ বলে ডোনা পুব দিকের করিডোরের দিকে চলে গেল। আর তাতিয়ানা এক দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে দু’তলার হাফ ল্যাডিং-এ গিয়ে দাঁড়াল। মাত্র বিশ সেকেন্ড। পশ্চিম পাশের করিডোর দিয়ে ৪জন লোক বেরিয়ে নিচে নামার জন্যে সিঁড়ি মুখে চলে এল। তাদের সকলের হাতেই স্টেনগান। তাতিয়ানা প্রস্তুত ছিল। ওরা চারজনও শেষ মুহূর্তে দেখতে পেল তাতিয়ানাকে। কিন্তু কিছু করার তারা সুযোগ পেল না। তার আগেই তাতিয়ানার গুলী বৃষ্টি ওদের ঘিরে ধরল। সিঁড়ি মুখেই ওরা চারজন হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। সংগেই সংগেই বেরিয়ে এসেছিল ডোনা। তুলে নিয়েছিল স্টেনগান। তাতিয়ানার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল। এই সময় পূর্ব দিকের করিডোরের দিক থেকে একটি কন্ঠ চিৎকার করে উঠল, ‘স্টেনগান ফেলে দিয়ে হাত তুলে দাঁড়াও।’ ডোনাকে লক্ষ্য করে নির্দেশটা দেয়া হয়েছিল। ডোনা করিডোরের দিকে ফিরে তাকিয়েই ফেলে দিল স্টেনগান। তাতিয়ানা ইতিমধ্যে ছুটে এসেছে দু’তলার সিঁড়ির মাথায়। দাঁড়াল সে দেয়ালের প্রান্ত ঘেঁষে স্টেনগান বাগিয়ে। ডোনা স্টেনগান ফেলে দেয়ার সাথে সাথে করিডোরের দিক থেকে তিনজন ছুটে এসেছিল। তারা তাতিয়ানার স্টেনগানের সহজ শিকারে পরিণত হলো। আগের চারজনের সাথেই ওদের তিনজনের লাশ পড়ে গেল সিঁড়ির মাথায়। তিন তলার করিডোর থেকে পায়ের শব্দ ভেসে আসছিল। উপর থেকে ছুটে আসা পায়ের শব্দ আগেই টের পেয়েছিল ডোনা তার ডিস্ট্যান্ট হেয়ারিং এ্যান্টিনায়। স্টেনগান তুলে নিয়ে সিঁড়ির রেলিং- এর কভার নিয়ে সাপের মত উঠে গিয়ে হাফ ল্যান্ডিং মুখে ওঁৎ পেতে বসেছিল ডোনা। দু’জন তিনতলার পুব দিকের করিডোর দিয়ে ছুটে এসে সিঁড়ি দিয়ে নামতে যাচ্ছিল। ডোনার প্রস্তুত স্টেনগান অগ্নিবৃষ্টি করল তাদের প্রতি। দু’জনেরই দেহ ঝাঁঝরা হয়ে গেল। ঝরে পড়ল তাদের দেহ সিঁড়ির মাথায়। ডোনা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘তাতিয়ানা এস।’ বলে ডোনা ছুটে উপরে তিন তলায় উঠে গেল। তিন তলার ল্যাডিং-এর সীমানায় দেয়ালে পিঠ লাগিয়ে স্টেনগান বাগিয়ে দু’পাশের করিডোরের দিকে নজর রাখল সে। তাতিয়ানা উঠে এলে দু’জন দুই করিডোরের দিকে নজর রাখল। ডোনা উৎকর্ণ হয়ে দেখল, না কোন দিক দিয়েই কোন শব্দ আসছে না। পল পল করে দু’মিনিট চলে গেল। না কোন দিক থেকেই কোন শব্দ আসছে না। ‘তাতিয়ানা, তুমি দুই করিডোরের দিকে নজর রাখ। আমি পশ্চিম অংশটা দেখে আসি।’ বলে ডোনা পশ্চিম দিকের করিডোর দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। ফিরে এল পাঁচ মিনিট পর। বলল, ‘একেবারে শূন্য। কেউ নেই।’ ‘নিচে তো অবশ্যই কেউ নেই। উপরেও কি কেউ নেই?’ ‘থাকলে সাত-আট মিনিট কেউ বসে থাকতো না। বিশেষ করে তারা যখন জানে না এদিকে কি ঘটেছে।’ এরপর দু’জনের একজন সামনে অন্যজন পেছন দিকে নজর রেখে পুব দিকের অংশে প্রবেশ করল। বিড়ালের মত সন্তর্পণে কিছুটা চলার পর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ডোনা উৎকর্ণ হয়ে শুনতে চেষ্টা করল কোন শব্দ কোথা থেকে আসে কিনা। এক জায়গায় দাঁড়াবার পর হঠাৎ ডোনার এ্যান্টেনায় ভেসে এল ক্লিক করে উঠা মোটা ধাতব একটা শব্দ। ডোনা নিশ্চিত হলো, এটা দরজা খোলা বা বন্ধ হবার শব্দ। শব্দের ডাইরেকশন বুঝতে চেষ্টা করে দেখল, যে করিডোরে তারা দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে পুবদিকে খুব কাছে থেকেই এ শব্দটা এসেছে। এগুলো দু’জন করিডোর ধরে পুব দিকে। একটু এগিয়েই পেল উত্তর দক্ষিণ একটা করিডোর। ডোনা ও তাতিয়ানা করিডোরের দুই দেয়াল ঘেঁষে দু’জন খুব সন্তর্পণে মুখ বাড়াল করিডোরে। করিডোর শূন্য। তবে খুব সামনেই করিডোরের ওপাশের দেয়ালে একটা দরজা। ডোনা ভাবল, এই দরজা দিয়েই কেউ বেরিয়েছে বা ঢুকেছে তিরিশ-চল্লিশ সেকেন্ড আগে। দরজার নব ঘুরিয়ে দেখল দরজা খোলা। স্টেনগান বাগিয়ে ডোনা এক ঝটকায় খুলে ফেলল দরজা। প্রবেশ করল ডোনা। কিন্তু তাতিয়ানা তৎক্ষণাৎ প্রবেশ করল না। দরজায় দাঁড়িয়ে চোখ রাখল বাইরের দিকে। ভেতরে ঢুকেই ডোনা দেখতে পেল, ঘরের উত্তর পাশে একটা চেয়ারে আহমদ মুসা আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। আরও দু’জন হাত-পা বাঁধা মেঝেতে পড়ে আছে। দুজনেই আহত। ছুটে যাচ্ছিল ডোনা আহমদ মুসার দিকে। সে খেয়াল করেনি আহমদ মুসার পেছনেই আরেকজন দাঁড়িয়ে আছে। তারও হাতে স্টেনগান। তার হাত উঠে গেল দেয়ালের সুইচে। চিৎকার করে বলল, ‘হাত থেকে স্টেনগান ফেলে দিয়ে হাত তুলে দাঁড়াও। এক মুহূর্ত দেরী হলে আমি বিদ্যুতের ৪৫০ ভোল্টের সুইচ টিপে দেব। গোটা চেয়ার বিদ্যুতায়িত হয়ে অঙ্গারে পরিণত হবে আহমদ মুসা।’ সঙ্গে সঙ্গে পাথরের মত দাঁড়িয়ে গেল ডোনা। ফেলে দিল হাত থেকে স্টেনগান। হাত তুলে দাঁড়াল সে। চমকে উঠেছিল তাতিয়ানা। আশ্বস্ত হলো ডোনার স্টেনগান ফেলার শব্দ শুনে। একটু সময় পাওয়া গেল। তাতিয়ানা তার রিভলবার বাগিয়ে দরজার চৌকাঠ ঘেঁষে কোন রকমে ডান চোখটা ভেতরে নিয়ে আহমদ মুসার পিছনে দাঁড়ানো লোকটাকে এক ঝলক দেখে নিয়ে বিসমিল্লাহ বলে গুলী করল তার মাথা লক্ষ্যে। গুলী লোকটার কপাল ভেদ করে বেরিয়ে গেল। ছিটকে তার দেহটা দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল। ছুটল ডোনা আহমদ মুসার বাঁধন খুলে দেয়ার জন্যে। তাতিয়ানাও ঘরে প্রবেশ করে ছুটল সেদিকে বাঁধন খুলতে ডোনাকে সাহায্য করার জন্য। বাঁধন খুলতে খুলতে হঠাৎ ডোনা চিৎকার করে উঠল, ‘তাতিয়ানা কেউ আসছে।’ ডোনা আহমদ মুসার সামনে হাতের বাঁধন খুলছিল। আর তাতিয়ানা পাশে দেহের বাঁধন কেটে দিচ্ছিল। ডোনার চিৎকারের সংগে সংগে তাতিয়ানা ঘুরে দাঁড়াল। ডোনাও ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। তাতিয়ানা ও ডোনা দু’জনেই দেখল, ঘরের মেঝে ভেদ করে একজন লোক আবির্ভূত হয়েছে ঘরের দক্ষিণ প্রান্তে। তার হাতের রিভলবার উঠে এসেছে আহমদ মুসার লক্ষ্যে। লোকটির তর্জনি নড়ে উঠছ। তর্জনি চেপে বসেছে রিভলবারের ট্রিগারে। বিমূঢ় তাতিয়ানা চিৎকার করে আছড়ে পড়ল গিয়ে ডোনার দেহের উপর। ঢেকে দিল ডোনার দেহকে নিজের দেহ দিয়ে। আর সেই সাথেই রিভলবার গর্জন করে উঠল লোকটির। তাতিয়ানার বুকের পাশ ভেদ করে গেল গুলীটি। ডোনা ততক্ষনে তার কোমরের বেল্টে ঝুলানো পকেট থেকে রিভলবার তুলে নিয়েছিল। সে বামহাতে তাতিয়ানাকে জড়িয়ে রেখে ডান হাত তুলে গুলী করল লোকটিকে। লোকটি এগিয়ে আসছিল সম্ভবত, আহমদ মুসাকে সঠিকভাবে টার্গেট করার জন্যে। দু’পা এগুতে পারল না। ডোনার গুলী তার কপাল গুড়িযে দিল। ডোনা তাড়াতাড়ি তাতিয়ানাকে অতি সন্তর্পণে মেঝের উপর নামিয়ে রেখে আহমদ মুসার অবশিষ্ট বাঁধন কেটে দিয়েই তাতিয়ানার দেহ কোলে তুলে নিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। আহমদ মুসা মুক্ত হয়েই প্রথমে সাইমুমের দু’জনের বাঁধন কেটে দিল। সাইমুমের দু’জন যোদ্ধা উঠেই দু’টো স্টেনগান হাতে তুলে নিল। আহমদ মুসা তাতিয়ানার পাশে বসে তার একটি হাত হাতে নিয়ে বলল, এ তোমার কি হলো তাতিয়ানা। তুমি কিভাবে এখানে এলে, এর সাথে জড়িয়ে পড়লে!’ ‘আমার আল্লাহ আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন। তাঁর কাছে সর্বান্তকরণে এমন কিছুই তো চেয়েছিলাম।’ ধীর কন্ঠে বলল তাতিয়ানা। ‘ডোনা তাতিয়ানাকে তুলে নাও। হাসপাতালে নিতে হবে।’ বলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। তাতিয়ানা ম্লান হাসল। বলল, ‘তুমি ব্যস্ত হয়ো না। হাসপাতালে যাবার সময় আমার নেই।’ ডোনা কেঁদে উঠে জড়িয়ে ধরল তাতিয়ানাকে, ‘না মরতে পার না, মরতে দেব না তোমাকে। এ তুমি কি করলে। কেন তুমি তোমার জীবন দিয়ে আমাকে বাঁচাতে গেলে?’ তাতিয়ানা ডোনার দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে বলল, ‘ না ডোনা, এক পাথর হৃদয়ে ফুল ফুটাতে পেরেছ তুমি, এক মহা বিপ্লবীর পাথর হৃদয় গলাতে পেরেছ তুমি, তুমি তার প্রিয়তমা। তোমার জীবন অসীম মূল্যবান, তোমাকে বাঁচতে হবে ওঁর জন্যেই।’ ‘থাম, এসব কি বলছ তুমি।’ বলে তাতিয়ানার মাথা টেনে নিল বুকের আরও কাছে। মুখ নিচু করে পাথরের মত বসেছিল আহমদ মুসা তাতিয়ানার পাশেই। বহু কষ্টে তাতিয়ানা মুখ ঘুরিয়ে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। অস্ফুট স্বরে বলল, ‘তাতিয়ানার দিকে একটু তাকাবে না?’ আহমদ মুসা তাকাল তাতিয়ানার দিকে। এই প্রথম তাতিয়ানার চোখে চোখ রাখল আহমদ মুসা। হাঁপাচ্ছিল তাতিয়ানা। আহমদ মুসার চোখে চোখ রেখে ক্ষীণ কন্ঠে বলল, ‘একদিন তোমাকে বলেছিলাম, বিপ্লবীর মন থাকতে নেই। বলেছিলাম, বিপ্লবীরা রক্ত স্রোতের দেয়াল পেরিয়ে হৃদয়ের সবুজ উপত্যকা দেখতে পায় না। ... আমার কথা ঠিক ছিল না। ... আমি স্বীকার করছি, তুমি বিপ্লবী, কিন্তু তোমার একটি নরম মন আছে, সবুজ একটি হৃদয় আছে। তো...মাকে অভি...নন্দ...ন।’ বহু কষ্টে কথা শেষ করল তাতিয়ানা। চোখ দু’টি তার বুজে গেল। আহমদ মুসার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠেছে। ঠোঁট দু’টি তার পাথরের মত স্থির। অশ্রু যে কথা বলল, ঠোঁট তা বলতে পারল না। ধীরে ধীরে তাতিয়ানা চোখ খুলল। ডোনার দিকে চেয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘ডোনা, আরও কাছে এস, তোমাকে একটা চুমু খাব।’ ডোনা পাগলের মত চুমু খেল তাতিয়ানার কপাল, চোখ, গাল, ঠোঁট সবর্ত্র। কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘তুমি আমাকে এসব কথা বলনি কেন? কেন বলনি তুমি ওকে চিনতে, ভালোবাসতে! আমি ওঁকে ছাড়তে পারব না তাই বুঝি!’ এক টুকরো ম্লান হাসি ফুটে উঠল তাতিয়ানার ঠোঁটে। তার ক্ষীণ কন্ঠে ধ্বনিত হলো, ‘ডোনা বোন, সারাজীবন ধরে জীবনটা ভোগ করলেও আজকের মৃত্যুর মত এত সুখ আমি পেতাম না। কেঁদনা বোন, আমি মরে গেলেও তোমার মধ্যে আমি বেঁচে থাকব। আমরা দু’জন না একাত্মা! তাহলে তোমার চোখ আমার চোখ, তোমার ঠোঁট আমার ঠোঁট, তোমার কথা আমার কথা হবে না কেন?’ তাতিয়ানার শেষ কথাগুলো ক্ষীণতর হতে হতে নীরবতায় মিলিয়ে গেল। পরক্ষণেই কষ্ট করে চোখ আবার খুলল তাতিয়ানা। তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘তোমাকে একটা ভার দিতে পারি?’ ‘বল।’ শুকনো কন্ঠ আহমদ মুসার। এই একটা শব্দ উচ্চারণ করতে গিয়েও তার ঠোঁট কাঁপল। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল তাতিয়ানার। হাঁপাচ্ছিল সে। দু’হাতে পাঁজরটা চেপে ধরে অস্ফুট কন্ঠে বলতে শুরু করল আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে, ‘আমার ব্রীফকেসে একটা ডায়েরী আছে। লক করা। এই ডায়েরী এবং আমার হাতের এই আংটি তোমাকে পৌঁছে দিতে হবে আমার ফুফু প্রিন্সেস ক্যাথরিন (তৃতীয়) কে। আমার পর পিটার পরিবারের একমাত্র উত্তরাধিকারী সে। উনি থাকেন প্যারিসের সোন নদীর দক্ষিণ তীরে লুই এর প্যালেস এলাকার ঐ বাড়িতে।’ বলে তাতিয়ানা ডোনার দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ কন্ঠে বলল, ‘আমার আঙুল থেকে আংটি খুলে ওকে দাও।’ তাতিয়ানার ডান হাতের অনামিকা থেকে আংটি খুলতে খুলতে ডোনা বলল, ‘আমাদেরও বাড়ি ঐ এলাকায়। আমি এক ক্যাথরিনকে চিনি।’ তাতিয়ানার কানে কথাগুলো পৌঁছল কিনা বুঝা গেল না। সে বলেই চলল, ‘পিটার দি গ্রেট থেকে শুরু করে ক্যাথরিন (প্রথম), এলিজাবেথ, পিটার (তৃতীয়), ক্যাথারিন (দ্বিতীয়), পল (প্রথম), আলেকজান্ডার (প্রথম), নিকোলাস (প্রথম), আলেকজান্ডার (দ্বিতীয়), নিকোলাস (দ্বিতীয়)- অর্থাৎ সব রুশ সম্রাট এই আংটি সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে পরেছেন।’ তাতিয়ানার শেষ কথাগুলো ভেংগে পড়ল গভীর ক্লান্তিতে। চোখ বুজে গেল তাতিয়ানার। দেহের স্পন্দন তার শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিছু বলার জন্যে ঠোঁট নাড়ছিল তাতিয়ানা। চোখ তার ঈষৎ ফাঁক হযে গেল। চোখ দু’টো আহমদ মুসার দিকে টেনে নিয়ে বলল, ‘আমার কবর দেয়ার সুযোগ হলে মুসলিম মতে আমার দাফন করো। তুমি মরজেস থেকে চলে আসার পর আমি জেনে...ভায় এ ...সে ইস...লাম গ্রহ..ণ করে..ছি।’ তাতিয়ানার কথা থেমে যাবার সাথে সাথে তার দেহটাও নিশ্চল হয়ে পড়ল। ‘তাতিয়ানা, বোন আমার।’ বলে তাতিয়ানাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল ডোনা। ডোনার গাড়ির ড্রইভিং সিটে বসল আহমদ মুসা। আর ডোনা তাতিয়ানার মরদেহ কোলে করে গাড়ির পেছনের সিটে বসল। বসতে গিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল ডোনা। এই গাড়ি করে দু’জন এসেছিলাম এবং পরিকল্পনা করেছিলাম। আর এখন ... কান্নায় রুদ্ধ হয়ে গিয়েছল ডোনার কন্ঠ। আহমদ মুসা পিছন ফিরে চাইল, কিন্তু কোন কথা বলল না। সাইমুমের দু’জন গিয়ে উঠেছিল সাইমুমের গাড়িতে। উপর থেকে নামার আগেই আহমদ মুসা টেলিফোন করেছিল পুলিশকে যে, লেক আইল্যান্ড-এর ৯৯ নং বাড়িতে বড় ঘটনা ঘটেছে। আপনারা আসুন। একইভাবে WNA, FWTV, রায়টার, এএফপি, এপি- সবাইকে টেলিফোন করে খবর দিয়েছে। রাত থেকেই রেডিও এবং টিভি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে WNA ও FWTV সংবাদ সংস্থা দু’টির চাঞ্চল্যকর হত্যা রহস্য গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ল। বলা হলো, ব্ল্যাক ক্রস সংবাদ সংস্থা দু’টিকে বন্ধ করার, ধ্বংস করে দেয়ার ষড়যন্ত্র এঁটেছিল। লেক আইল্যান্ডে তাদের নিজস্ব ঘাঁটিতে ব্ল্যাক ক্রসের প্রধান সাইরাস শিরাকসহ তাদের ১৩ জন লোককে নিহত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এবং পাওয়া গেছে সিসি মাছির প্রজনন ও পালন ক্ষেত্র। পুলিশের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সম্ভবত ব্ল্যাক ক্রসএর প্রতিদ্বন্দ্বী কোন গ্রুপ অথবা গোপন সৌখিন কোন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাদের হত্যা করে তাদের ষড়যন্ত্র ধরিয়ে দেবার ব্যবস্থা করেছে। সুইজারল্যান্ডের সবগুলো দৈনিক ব্যানার হেডে খবরটি ছেপেছে। তারা সুইচ পুলিশের ব্যর্থতার তীব্র নিন্দা করেছে এবং দু’টি সংবাদ সংস্থার বিরুদ্ধে পরিচালিত ষড়যন্ত্রে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সর্বাধিক প্রচাতি ‘দার ব্লিক’ পূর্বাপর ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে অবশেষে লিখেছে, “এই ঘটনা শুধু দু’টি সংবাদ সংস্থার নিরাপত্তাহীনতা নয়, গোটা সংবাদপত্র জগতের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তাকে হুমকির সম্মুখিন করে তুলেছে। ব্ল্যাক ক্রস-এর গোটা কার্যক্রমের উপর ইন্টারপোলের মাধ্যমে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তারা ইতিপূর্বে অনেক কুকীর্তি করেছে, মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ করেছে। মনে করা হচ্ছে, পুলিশের এবং প্রশাসনের একটি মহলের সাথে যোগ সাজশের মাধ্যমে বর্ণবাদী এই সংগঠনটি সর্বত্র যথেচ্ছাচার চালিয়ে যেতে পারছে। সুইচ পুলিশের কারা এর সাথে জড়িত রয়েছে, তারও অবশ্যই তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।’ সব শেষে ‘দার ব্লিক’ লিখেছে, WNA এবং FWTV সংস্থা দু’টিসহ নিহতদের পরিবারের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ হওয়া প্রয়োজন।’ WNA-এর চেয়ারম্যান মিঃ গটেফ এবং FWTV -এর চেয়ারম্যান মিঃ জারমিস জেনেভা বিমান বন্দরে আহমদ মুসার সাথে বিদায়ী হ্যান্ডশেক করতে গিয়ে বলল, ‘যে অবিস্মরনীয় কাজ আপনি করলেন, তার কৃতিত্ব দেবার জন্যে দুনিয়ার মানুষ লোক খুঁজে পাচ্ছে না। আহমদ মুসা আপনার কি ইচ্ছা করে না এই কৃতিত্বের মালিক হতে?’ আহমদ মুসা হেসে বলল, ‘আমার কোন কিছুই আমার নয়? সব কিছু যিনি দিয়েছেন, কৃতিত্ব তো তারই হবার কথা। সব কিছু যিনি দিয়েছেন তাঁর জন্যেই আমি কাজ করছি।’ ‘একেই বলে বোধ হয় ফি সাবিলিল্লাহর কাজ?’ বলল মিঃ গটেফ। মিঃ গটেফের কথা শেষ হতেই মিঃ জারমিস বলল, ‘প্রশংসা নয়, আমাদের কৃতজ্ঞতা আপনি নিন। এ দু’টি সংবাদ সংস্থা ধ্বংস হলে মুসলমানদের শুধু যে তাৎক্ষণিক অপূরণীয় এক ক্ষতি হতো তা নয়, এ ধরনের আর কোন সংবাদ সংস্থা গড়ে উঠতো না, গড়ে উঠতে তারা দিত না। এক অন্ধকারে ডুবে যেত মুসলিম উম্মাহ।’ ‘সে মুসলিম উম্মারই তো আমি একজন গর্বিত সদস্য। সুতরাং একজন উপকৃতকে আবার কৃতজ্ঞতা কেন?’ বলে আহমদ মুসা আবার সালাম দিয়ে পা বাড়াল বিমানের দিকে। বিমানে ডোনা এবং তার আব্বা আগেই উঠে গেছে। আহমদ মুসা বিমানে উঠে ডোনার আব্বার পাশে বসল। ডোনার আব্বার ওপাশে বসেছে ডোনা। আহমদ মুসা বসতেই ডোনা বলল, ‘মদীনা শরীফ থেকে কি খবর পেলেন?’ ‘তাতিয়ানার লাশ সকাল ১১টায় পৌঁছেছে মদীনা শরীফের বিমান বন্দরে। সেখান থেকেই দাফন গাহে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আবার জানাযা হয়েছে সেখানে। দাফন হয়ে গেছে।’ বলল আহমদ মুসা। সেদিন ঘটনার পর রাতেই আহমদ মুসা জুরিখস্থ সৌদি দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করে তাতিয়ানার লাশ মদীনায় দাফন করার অনুমতি চায়। সৌদি দূতাবাস রাতেই রিয়াদে সরকারের কাছে মেসেজ পাঠায়। সংগে সংগেই সরকার অনুমতি দিয়ে টেলিফোন করে। সকালেই সৌদি দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে তাতিয়ানার লাশ দাফনের জন্যে মদীনা শরীফ পাঠানো হয়। আমিনার (মেইলিগুলি) কবরের পাশেই তার কবর দেয়ার ব্যবস্থা করেছে আহমদ মুসা। ‘আলহামদুল্লিাহ।’ স্বগত উচ্চারণ করল ডোনা। ‘প্যারিসে টেলিফোন করে ক্যাথারিন-এর কোন খোঁজ পেয়েছিলে?’ ডোনাকে লক্ষ্য করে প্রশ্ন করল আহমদ মুসা। সংগে সংগে ডোনা কোন উত্তর দিল না। একটু সময় নিয়ে ধীর কন্ঠে বলল, ‘মাফ করবেন’ ভেবেছিলাম বিমানে আপনাকে খবরটা দেব না। ওখানকার খবর মনে হচ্ছে ভাল নয়। আমি যে ক্যাথারিনকে চিনি, তিনি দু’দিন আগে অর্থাৎ এখানে তাতিয়ানার মৃত্যুর দিন প্যারিস থেকে নিখোঁজ হয়েছেন।’ ‘নিখোঁজ হয়েছেন? না কিডন্যাপ হয়েছেন?’ ‘দু’য়ের মধ্যে পার্থক্য কি?’ ‘খোঁজ না পাওয়ার অর্থ কিডন্যাপ হওয়া নয়। কাউকে না বলে হঠাৎ কোথায়ও চলে গেলে, মারাত্মক আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেও মানুষ নিখোঁজ নয়।’ ‘বুঝেছি। ধন্যবাদ। তাঁকে কিডন্যাপ করা হয়েছে বলেই মনে হয়। তিনি যথারীতি রাতে শয়ন করেন, কিন্তু সকাল বেলা তাকে বেডে পাওয়া যায়নি। তার জানালার গরাদ খোলা ছিল।’ ‘তুমি যে ক্যাথারিনকে চিন সে কি রুশ।’ ‘হ্যাঁ রুশ।’ ‘তাহলে তোমার সন্দেহ কেন যে এ ক্যাথারিন সে ক্যাথারিন নাও হতে পারে?’ ‘তাতিয়ানা ক্যাথারিন তৃতীয় -এর কথা বলেছে। আমার ক্যাথারিন তৃতীয় কিনা জানি না। আর রুশদের মধ্যে ক্যাথারিন নাম প্রচুর।’ ‘ক্যাথারিনের সাথে কিভাবে তোমার পরিচয়?’ ‘আমরা একই স্কুলে পড়েছি।’ ‘সে যে পিটার পরিবারের কিংবা রাশিয়ার রাজপরিবারের কেউ, এমন কোন কিছু জানতে পারনি?’ ‘না। তার বাসায় কোন সময় যাইনি। দেখিনি বাসা কোন সময়। কেউ তার বাসায় গেছে বলেও শুনিনি। আব্বা হয়তো কিছু বলতে পারেন, পিটার পরিবারের কেউ আমাদের ওখানে থাকে কিনা।’ ‘স্যরি। আমিও জানি না। রুশ বিপ্লবের পর সেখানকার রাজপরিবারের যারা পালিয়ে এসেছে, তারা সবাই আত্মগোপন করে থাকছে। এমনকি তারা আগে ছেলে মেয়েদের স্কুলে পর্যন্ত পাঠাতো না সোভিয়েত গোয়েন্দাদের চোখে পড়ার ভয়ে। সুতরাং বাড়ির পাশে থাকলেও তাদের আসল পরিচয় জানা কঠিন।’ ‘ঠিক বলেছেন। এটাই স্বাভাবিক ছিল।’ বলে একটু থেমেই আহমদ মুসা আবার বলল, ‘মাফ করো ডোনা আরেকটা প্রশ্ন। তোমার ক্যাথারিন কি ধরনের জামা-কাপড় পরতো?’ ‘সবার থেকে আলাদা। লম্বা হাতাওয়ালা এবং পায়ের গোড়ালী পর্যন্ত নামানো জামা বা স্কার্ট পরতো সে।’ ‘আমার অনুমান মিথ্যা না হলে এই ক্যাথারিন সেই ক্যাথারিনই হবেন।’ ‘তাহলে তো দুঃসংবাদ। আমরা যার জন্যে ছুটে যাচ্ছি, তিনি তো নেই।’ ‘কে জানে, হয়তো আমরা আর এক রহস্যের মুখোমুখি। তাতিয়ানা চলে গেছে, কিন্তু তার ডায়েরী এবং তার আংটি, জার সম্যাটদের সৌভাগ্য অঙ্গুরী, আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে কে জানে?’ চমকে উঠল ডোনা। তার চোখে নামল উদ্বেগের একটা ছায়া। বুকও যেন কাঁপল তার। কথা বলল না সে। আহমদ মুসাও কোন কথা বলল না। অথৈ শূন্যে সাঁতার কেটে ছুটে যাচ্ছে বিমান প্যরিসের উদ্দেশ্যে। আহমদ মুসা তার ক্লান্ত দেহটা এলিয়ে দিল বিমানের সিটে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৬ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ২২.অদৃশ্য আতঙ্ক (৭-শেষ)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন