বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

বান্দরবনে তিন বান্দর।।

"মজার অভিজ্ঞতা" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান MD.Belal Hosan (০ পয়েন্ট)

X শীতকাল ভাপা পিঠা খাওয়ার সময়। আর বিয়েশাদি করার সময়। বন্ধুরা বিয়েশাদি করে কক্সবাজারের সমুদ্রপাড়ে গিয়ে সেলফি তুলছে। সেলফি তুলতে লাগছে পাঁচ মিনিট, ফেসবুকে লোড করতে লাগছে এক মিনিট। এসব দেখে আমরা তিন বন্ধু মিলে ঠিক করলাম, বউ নিয়ে দেশের বাইরে চলে যাব। সেলফি তুলতে হলে ওখানে গিয়ে তুলব। সব যখন ঠিকঠাক শুধু দুটি কারণে যাওয়া হলো না। ১। কারো পাসপোর্ট নেই। ২। কারো বউ নেই। ‘বউ না থাকলে কি ঘুরতে যাব না?’ রাজু চায়ের কাপে সুড়ুত করে টান মেরে বলল। ‘অবশ্যই। বউ-বাচ্চা নিয়ে যাওয়া মানে ভেজাল।’ তন্ময়ের মন্তব্য। ‘চল, তাহলে কাল ফুটি। কাল বছরের প্রথম দিন।’ আমি বললাম। ‘কই যাবি?’ দুজনেই জানতে চাইল। ‘বান্দরবান!’ বিনা নোটিশে বাড়ি ছাড়ার যেমন আবেদন আসে, আমরাও বিনা নোটিশে পরদিন সকালে ব্যাগপ্যাক নিয়ে বের হয়ে পড়লাম। যাওয়ার সময় গলির মুখে এক ভদ্রলোকের মুখোমুখি হয়ে গেলাম। আমাদের এত সকালে দেখে তিনি অবাক। ‘কোথায় যাও তোমরা এত সকালে?’ ‘আঙ্কেল আমরা বান্দরবান যাচ্ছি।’ রাজুর জবাব। আমাদের আগাগোড়া অবলোকন করার পর তিনি বললেন, ‘ইউ পিউপল ডিজার্ভ দ্যাট প্লেস।’ আমরা কিছু না বলে চলে এলাম। ‘কী রে তুই আঙ্কেলকে কিছু বলিস নাই?’ তন্ময় আমাকে জিজ্ঞেস করল। ‘না। বললে এখন যেটা বলল, বাসায়ও এসব কিছু বলত আর কি।’ ‘আঙ্কেল তোরে খালি খালি ছিলার ওপরে রাখে না?’ ‘হ্যাঁ।’ দীর্ঘশ্বাস চেপে বললাম আমি। ‘কিছু বলস না?’ ‘কিভাবে বলি? একে তো বাবা, তার ওপর বয়সেও বড়।’ সবাই গলা ছেড়ে হেসে ফেললাম। বাসস্টেশনে টিকিট কাটতে গিয়ে শুনলাম, একদম পেছনে সিট পাওয়া যাবে। সেই স্কুল থেকে ভার্সিটি পর্যন্ত সারা জীবন পেছনেই বসলাম। ‘উই পিউপল ডিজার্ভ দিস।’ তন্ময়ের কথায় আরেক প্রস্থ হাসাহাসি হলো। বাস ছাড়ার আগমুহূর্তে রাজু বলল, ‘আমার একটু ওয়াশরুমে যেতে হবে।’ এটা রাজুর পুরনো অভ্যাস। কোনো কাজ হওয়ার আগে আগে তার টয়লেটে যেতে হয়। আমাদের বন্ধুসমাজে চালু আছে, বিয়ের সময় কবুল বলতে বললে রাজু বলতে পারে, ‘ইয়ে মানে, আমার একটু ওয়াশরুমে যেতে হবে।’ হেলপারকে বলতেই হেলপার চেঁচিয়ে বলল, ‘ওস্তাদ এখন ছাইড়েন না, এক ভাই টাট্টিখানায় যাইব।’ ‘মান-ইজ্জতের ফালুদা।’ পাশে বসা তন্ময়কে বিড়বিড় করে বললাম। ‘শীতকালে ফালুদা না, বল মান- ইজ্জতের এক্সপ্রেসো কফি।’ রাজু ফিরল, বাস ছাড়া হলো। রাজুকে বসতে হলো এক মোটা আঙ্কেলের পাশে। বাসচালকের কাজকারবার দেখে মনে হলো, তার জীবনের দুটি উদ্দেশ্য। ১। পেছনের যাত্রীদের হাড্ডি-মাংস আলাদা করে ফেলা। ২। ঋধংঃ ্ ঋঁত্রড়ঁং সিরিজে পল ওয়াকারের জায়গায় নিজেকে রিপ্লেস করা। বান্দরবান যখন পৌঁছলাম, তখন ঝলমলে রোদ। স্টেশনে নেমেই আমরা বিকেল সাড়ে ৬টার রিটার্ন টিকিট করে ফেললাম। মার্কোপোলো বলেছেন, ‘কোথাও পৌঁছে আগে আসার ব্যবস্থা করে ফেলবে বৎস।’ টিকিট করে একটা হোটেলে ঢুকে চা, পরোটা আর ডিম ভাজি খেলাম। এরপর রওনা দিলাম স্বর্ণমন্দিরের উদ্দেশে। লোকাল ‘সিএনজি নাকি টেম্পো’—এই সাইজের একটা বাহনে করে রওনা দিলাম। ওই টেম্পোর এক আঙ্কেল স্বর্ণমন্দির যাব শুনে তার ইতিহাস বর্ণনা শুরু করলেন। ‘বাঙালি কথা বলতে পছন্দ করে, শুনতে না।’ তন্ময় ফেসবুকে স্টেটাস দিল। যথারীতি স্বর্ণমন্দিরে পৌঁছলাম। তখন সূর্যের যৌবনকাল চলছে। বেশ রোদ। মন্দিরের গায়ে লেগে লেগে রোদ ছিটকে পড়ছে। আশপাশের সবাইকে দেখলাম, সেলফি তুলতে ব্যস্ত। ‘প্রকৃতি না দেখে মানুষ ক্যান যে খালি সেলফি তোলে?’ এটা বলে তন্ময় কয়েকটি সেলফি তুলে ফেলল। সেলফি তুলে দেখলাম, সে আশপাশের কয়েকটা লোককে স্বর্ণমন্দিরের ইতিহাস বলা শুরু করল। টেম্পোতে এতক্ষণ যা শুনে এসেছি তা-ই ছাড়ছে। ‘বাঙালি কথা বলতে পছন্দ করে, শুনতে না।’ তন্ময়ের স্টেটাসটা আমার টাইমলাইনে শেয়ার দিয়ে দিলাম। স্বর্ণমন্দির থেকে নেমে খানিকটা দূরেই একটি কুয়ার মতো দেখলাম। সেটাতে অনেক টাকা ভাসছে! দুই টাকা থেকে শুরু করে ৫০, ১০০ টাকা পর্যন্ত। ‘এটাতে মনে হয়, লোকেরা আশা পূর্ণ হওয়ার জন্য টাকা ফেলে।’ এই বলে তন্ময় একটি পাঁচ টাকার কয়েন ফেলে বিড়বিড় করল। ইদানীং তার গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে কী যেন একটা সমস্যা চলছে। পাশ দিয়ে বৃদ্ধ এক লোক যাচ্ছিল। গায়ে চাদর, চোখ কুঁচকে আছে। তাকে দেখে আমি বললাম, ‘আচ্ছা দাদা, এই কুয়ায় কি সাঁতার কাটা যাবে? বেশিক্ষণ লাগবে না, ধরেন দু-একটা ডুবসাঁতার দিয়েই উঠে পড়ব।’ বৃদ্ধ রেগে চেঁচিয়ে কী-সব বলে ওঠল। আমরা দ্রুত ওখান থেকে কেটে পড়লাম। বান্দরবানে খাবারের দাম বেশি হবে ভেবে আমরা চট্টগ্রাম থেকেই কেক, কলা, ড্রিংকস নিয়ে এসেছিলাম। নীলাচল বলে একটি জায়গায় গিয়ে ওসব খেলাম। পানি কিনতে গিয়ে এক দোকানে শুনি, দেড় লিটার পানি ৪০ টাকা! যার দাম এমনিতে ২৫ টাকা। দাম শুনে আমি বলে উঠলাম—‘কাইফা হালুকা।’ দোকানদার অবাক হয়ে তাকালে বললাম, ‘না ভাই, আসলে দাম শুনে ভাবলাম আরবের কোনো মরুভূমিতে আছি।’ খাবারদাবার সেরে বাসস্টেশনে এসে দেখি, তখনো মাত্র ৫টা। কিন্তু আমাদের টিকিট সাড়ে ৬টার। ‘এখন কোনো বাস নেই?’ ‘আছে, তবে পেছনের সিট।’ ‘চলবে।’ আমি আর তন্ময় বলে উঠলাম। এর মধ্যেই দুটি মেয়ে এসে বলল, ‘চট্টগ্রামের এখন কোনো টিকিট নেই?’ ‘ছিল, ওনারা নিয়ে ফেলেছেন।’ কাউন্টারের লোকটা আমাদের দেখিয়ে দিল। ‘তাহলে পরের বাসেই যাব।’ এই বলে মেয়ে দুটি ওয়েটিং রুমে বসল। ‘ভাই, এখন কেমন জানি শরীর খারাপ লাগছে। আমরাও পরের বাসেই যাব।’ এই বলে আমরাও ওয়েটিং রুমে বসলাম। কাউন্টারের লোকটা মেয়েগুলোকে ডকে আমাদের টিকিট ডেমেয়েগুলো হাসতে হাসতে আমাদের সামনে দিয়ে বাসে উঠে চলে গেল। ‘নারী সর্বদাই ছলনাময়ী’—


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১১৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ বান্দরবনে তিন বান্দর।।

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now

২১.কঙ্গোর কালো বুকে (৫)

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান আরাফাত হোসেন (০ পয়েন্ট)

X ‘সলো’ বন্দরের শ্বেতাংগ কলোনীর মধ্যখানে সুন্দর একটি দু’তলা বাড়ি। বাড়িটা জর্জের। আহমদ মুসাকে ব্ল্যাক ক্রসের নেতা গোছের যে লোকটি বন্দী করে এনেছিল, এ তারই বাড়ি। বাড়ি ঠিক নয়। এটা ব্ল্যাক ক্রস- এর স্থানীয় অফিস। নিচের তলায় অফিস রুম এবং ব্ল্যাক ক্রস- এর ব্যবহৃত অন্যান্য ঘর। দু’তলায় ব্ল্যাক ক্রস- এর সলো’র প্রধান জর্জ তার স্ত্রী এবং একটি মেয়ে নিয়ে থাকে। তখন রাত আটটা। নিচের তলায় একটা দরজা বিশিষ্ট জানালা বিহীন একটা ঘর। এই ঘরেই আহমদ মুসা বন্দী আছে। হাতে খাবার একটা প্যাকেট এবং পানির একটা বোতল নিয়ে জর্জ এসে দরজার সামনে দাঁড়াল। পেছনে পায়ের শব্দ শুনে তাকিয়ে দেখল স্ত্রী এলিজাবেথ এবং মেয়ে মেরী। বলল, ‘তোমরা আবার কেন?’ ‘ক্ষতি আছে কি?’ জিজ্ঞাসা করলো এলিজাবেথ জর্জকে। ‘ক্ষতি নেই। কিন্তু বন্দীকে নিয়ে আমরা বিপদে আছি। বন্দী পরিচয় না দেয়া পর্যন্ত খাবার দেয়ার হুকুম নেই। চব্বিশ ঘন্টা গেল তার পরিচয় সে দেয়নি। এসেছি আবারও চেষ্টা করে দেখি। না হলে খাবার আবার ফেরত যাবে। তোমাদের এ সবে না থাকাই ভাল। বিশেষ করে মেয়েটার।’ ‘কিন্তু মেয়েটাকেই তো রাখা যাচ্ছে না। সে তো তোমাদের পলিটিক্স বোঝে না। বন্দীর কথা তার মুখ থেকে যাচ্ছে না।’ জর্জ কিছু বলল না। ঘুরে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে এগুলো। দরজার বিরাট তালা ছাড়াও দরজার মাঝামাঝি অংশে দরজার পাল্লার গায়ে একটা তালা ঝুলছে। ওটা একটা জানালা। বন্দীর সাথে কথা বলা, তাকে খাবার দেয়া ইত্যাদি করানেই এ জানালার ব্যবস্থা। জর্জ জানালা খুলল। ভেতরে স্টিলের একটা খাটিয়ায় শুয়ে ছিল আহমদ মুসা। পাশেই একটা চেয়ার ছিল সেটা নিয়ে জানালার সামনে বসল জর্জ। আহমদ মুসার মুখটা ম্লান। কিন্তু তাতে হাসি ফুটে উঠল জর্জদের দেখে। আহমদ মুসা ভেতরে ভেতরে অধৈর্য্য হয়ে উঠেছে। ক্ষুধার জ্বালায় নয়, পাঁচ দিনের ২টা দিন অর্থহীন ভাবে চলে যেতে দেখে। আহমদ মুসা বন্দিত্বকে এক অর্থে আল্লাহর একটা দয়া হিসেবেই গ্রহন করেছিল। মুস্লিম নেতৃত্ববৃন্দ কে ব্ল্যাক ক্রস কোথায় বন্দি করে রেখেছে তার কথা উদ্ধার করা দরকার। কিন্তু এখন তা সম্ভব হয় নি। জর্জ চেয়ারে বসে মুখ খোলার আগে আহমদ মুসা ই কথা শুরু করল। বলল, ‘ওয়েল কাম, খুব ভাল আছি।’ আচ্ছা লোক ত তুমি। চব্বিশ ঘণ্টা খেতে পাওনি। বলছ ভাল আছি। তাহলে তোমার খারাপ কোনটা? ‘বলল জর্জ। ‘না তোমারা ভাল রেখেছ আমাকে। তোমাদেরকে এমন বন্দীখানা অ ত আছে যেখানে বন্দিদেরকে নিদ্দ্রিশ্ত সময় হত্যা করা হয় পয়জনাস গ্যাস ব্যবহার করে।’ হাসল জর্জ। বলল।’ ও তুমি বোমাসা’র মাবোইডিং বন্দীখানার কথা বলছ? ওটা একটা বিশেষ ব্যাবস্থা। আহমদ মুসা উত্তর শুনে কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। এত বড় সাংঘাতিক কথা জর্জ দিয়ে দিল। আজকের প্রথম তীরই অব্যর্থ। আল্লাহর শুক্রিয়া আদায় করল মনে মনে। বলল, ‘বিশেষ ব্যাবস্থা কেন?’ ‘ওখানে আছে সব বিশ্ববিখ্যাত লোক। তাই ব্যাবস্থা ও বিশ্ববিখ্যাত। একটা এক্সপেরিমেন্ট ও ‘। ‘এক্সপেরিমেন্ট?’ ‘হ্যাঁ। একটা স্লো পয়জনাস গ্যাস এয়ারকন্ডিশন এর সাথে সেট করা হয়। গ্যাস মিটারে যে সময় নির্দিষ্ট করা হবে, সে অনুসারে গ্যাস এয়ারকন্ডিশন এর উইন্ড ওয়েভের সাথে ছড়িয়ে পড়ে। যিনি নির্দিষ্ট সময় ধরে ঐ গ্যাস গ্রহন করবেন, তিনি ঐ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মারা যাবেন। ‘ ‘তোমার পুলিসকে ভয় করো না।?’ লোকেশনকে স্পেসিফিক করার উদ্দেশে প্রশ্ন করল আহমদ মুসা। ‘হো হো করে হাসল জর্জ। বলল, ‘ব্ল্যাক ক্রস কচি খোকা নাকি? একটা বাইবেল সোসাইটির আড়ালে যেভাবে যে ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা পুলিশের বাবার ও সাধ্য নেই যে খুজে বের করে।’ কথা শেষ করেই জর্জ বলল,’ ওসব যাক। এখন বল, ‘তুমি কে? তুমি আমাদের কিছু জান দেখছি।’ আহমদ মুসা মনে মনে আল্লাহর শুক্রিয়া আদায় করল। ঠিকানা র অন্তত তিনটা ক্লু পাওয়া গেছে, জা তার কাছে চাওয়ার চেয়ে বেশি মনে হচ্ছে। ব্ল্যাক ক্রসের এ লোকটা নিশ্চিত আজ দিল খোলা মুডে আছে। আর লক্তার স্ত্রি অ মেয়ে শুরু থেকেই তার প্রতি সহানুভূতিশীল মনে হয়েছে। ‘আমার পরিচয় দেবার কিছু নেই। থাকলে তোমরাই যোগাড় করবে।’ হাশি মুখে বলল আহমদ মুসা। ‘কিন্তু মনে রেখ, পরিচয় না দিলে তোমার খাবারও নেই।’ ‘তোমাকে ব্রিটিশ বলে মনে হয়। বন্দীর সাথে বুঝি এই আচরণ করতে হয়?’ ‘এটা ব্রিটিশ বন্দীখানা নয়। কেমন করে জানলে আমি ব্রিটিশ?’ ‘তোমার ফরাসি উচ্চারণ ব্রিটিশ দের মত। ‘ ‘পরিচয় দিলে ক্ষতি কি? ছাড়া যখন পাচ্ছ না, তখন পরিচয় গোপন করে লাভ কি?’ ‘লাভ - ক্ষতি ভাবছি না। আমি তোমাদেরকে কন সহযোগিতা করবোনা।’ ‘তোমার আর ভোগান্তি আছে।’ উঠে দাঁড়াল জর্জ। তার মুখ ক্রোধে লাল হয়ে উঠেছে। খাবারের প্যাকেট অ পানির বোতল হাতে নিতে যাচ্ছিল। জর্জের স্ত্রি এলিজাবেথ ছো মেরে খাবার প্যাকেট অ পানির বোতলটা তুলে নিয়ে বলল, ‘তুমি যাও আ সবের ব্যাবস্থা আমি করছি।’ ‘এলিজা ভুল করছ। আমি জানি তুমি কি করবে। কিন্তু শোন,এ খাদ্য আমাদের নয়, আমাদেরকেও ইনি মেহমান নন। সুতরাং নিয়মের বাইরে আমরা কিছু করতে পারি না। ‘বলে জর্জ খাবার প্যাকেট এবং পানির বোতল নেবার জন্য হাত বাড়াল এলেজাবেথ এর দিকে। এলিজাবেথ স্বামীকে তা না দিয়ে জানালা দিয়ে খাদ্য অ পানীয় ঘরের ভেতরে ছুড়ে মারল। আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘এ সবের জন্য দুঃখিত, আপনি দয়া করে খেয়ে নেবেন।’ জর্জ স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। তিব্র কন্থে বলল, ‘জান এলিজা, তোমার খামখেয়ালীপনার দায় আমার উপর বর্তায়।’ এলিজাবেথ উত্তর দিতে একটু সময় নিচ্ছিল। ইতিমধ্যে আহমদ মুসা খাতিয়া থেকে উঠে খাবারের প্যাকেট অ পানির বোতল মেঝে থেকে কুঁড়িয়ে নিয়ে ছলে এল জানালায়। জর্জের দিকে খাবারের প্যাকেট অ পানির বোতল ছুড়ে ধরে বলল, ‘নিন, কিছু মনে করবেননা। মেয়েরা তো মূলত মা। তাদের মন নরম।’ বলে আহমদ মুসা স্থম্ভিত এলিজাবেথ এর দিকে চেয়ে বলল, ‘আপনাকে ধন্যবাদ বোন। কষ্ট পাবেন না। এমন না খেয়ে থাকার অভ্যাস আছে আমার। ‘ আহমদ মুসা খাটিয়ায় ফিরে এসে আবার শুয়ে পড়ল। মুহূর্ত দেরি না করে মেয়ের হাত ধরে এলিজাবেথ সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে চলে গেল। অপমান অ যন্ত্রণায় তার মুখটা অস্বাভাবিক রুপ নিয়েছে। জর্জ খাবারের প্যাকেট এবং পানির বোতল নিয়ে কিছুক্ষণ হতভম্বের মত দারিয়েছিল। তার মনেও যন্ত্রণা। একজন বন্দীর মানবিকতার কাছে সে হেরে গেল। কোন বন্দি এমন হয়, এই প্রথম সে তা দেখল। আবার ভাবল, সে তো জর্জ নয়। সে তো ব্ল্যাক ক্রস এর একজন দায়িত্বশীল। মনের দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে দেবার চেষ্টা করে সেও সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল উপরে উঠার জন্য। পরখনেই আবার ঘুরে দাঁড়াল। ভাবল, খাবার প্যাকেট এলিজাবেথ তার হাতে দেখলে কষ্টটা তার আরও বাড়বে। ফিরে এসে জর্জ জানালার কাছে দাঁড়াল। আহমদ মুসা লক্ষ্য করে বলল, ‘খাবার নাও, এস।’ ‘আপনাদের নীতির খেলাপ হবে।’ ‘তা হবে। কিন্তু কত আইনই তো ভেঙে থাকি। একটা ভাল কাজে না হয় ভাঙলাম আবার।’ ‘এটা আমার প্রতি করুনা, না স্ত্রীকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য? ‘ হাসল জর্জ। বলল, ‘তুমি কে জানি না। কিন্তু আর দুশ বন্দীর মত যে নও তা পরিষ্কার। ‘ একটু থামল। আবার শুরু করল, ‘স্ত্রির প্রতি সান্ত্বনা এটা।’ ‘তাহলে নিতে পারি।’ ‘কেন? ‘ ‘আমি চাই না আমার কারনে আপনাদের মধ্যে কোন মতান্তর ঘটুক।’ ‘তুমি আমাদের চারজন লোককে খুন করেছ। কিন্তু তোমাকে দেখে তো খুনি মনে হয় না। কেন আমাদের লোককে অনুসরণ করেছিলে? ‘ ‘সবই জানবে এক সময়। ধন্যবাদ।’ বলে আহমদ মুসা খাবার অ পানি নিয়ে তার খাটিয়ায় ফেরত এল। জর্জ উঠে গেল উপরে। সিঁড়ি দিয়ে উঠেই ড্রইং রুম। ড্রইং রুমের সোফায় বসে আছে এলিজাবেথ। তার পাশেই মেরি। মেরীর পাশের সোফায় বসতে বসতে জর্জ বলল, ‘খুশি তো এলিজা, খাবার দিয়ে এসেছি।’ হটাত এলিজাবেথের দু চোখ থেকে দু ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। বলল, ‘আমার বাড়াবাড়ি জন্য আমি দুঃখিত। লোকটি যেই হন, তিনি আমার স্বামীকে নতুন জীবন দিয়েছেন। উনি ট্রিগার টিপতে যাচ্ছিলেন, মেরী তোমার সামনে দাড়িয়ে অনুরধ করায় ট্রিগার তিনি টিপেন নি। ছোট্ট বাচ্চার কথা তিনি শুনেছেন। আমি সারা জীবন কৃতজ্ঞ থাকব তার প্রতি। ‘লোকটা ভাল আব্বু। ‘বলল মেরী মায়ের কোলে মুখ গুজে। ‘আমার খুব খারাপ লাগছে, তিনি রিভল্বার নামালেন, আর তুমি তাকে গুলি করলে। সরে না দাঁড়ালে তার বুকে গুলি লাগত। জীবন রক্ষার বিনিময়ে তিনি জীবন দিতে বসেছিলেন।’ ‘তুমি ঠিকই বলেছ। কিন্তু আমি দায়িত্ত পালন করেছি মাত্র। ও সুযোগ পেত, তাহলে পেছন থেকে আমাদের যে চারজন আসছিল, তারা বিপদে পড়তো। সে যেমন শার্প শুটার তাতে সে আমাদের গাড়ির কভার নিতে পারলে সবাইকে শেষ করতে পারত।’ ‘তোমার দিক থেকে তুমি ঠিকই আছ। কিন্তু তার ত্যাগ অ মানবিকতার কোন মূল্য তোমরা দাওনি।’ ‘সে যেটা করেছে মহানুভবতা। কিন্তু তার মূল্য দেয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব। জীবন - মৃত্যু র খেলায় ে সুযোগ নেই এলিজাবেথ। ‘তোমারা তাকে ছেড়ে দিতে পার।’ ‘না পারি না। সে আমাদের লোকদের হত্যা করেছে। আমাদের গাড়িকে অনুসরণ করেছে। সে আমাদের চেনে, অথচ তার কোন পরিচয় আমরা এখনও পাইনি। ‘ ‘উনি নিজে বাঁচতে গিয়েই খুন করেছেন, তার আগে তোমরা তাকে মেরে রক্তাক্ত করেছ।’ জর্জ কোন জবাব দিল না। এলিজাবেথ ই আবার কথা বলল, ‘তাকে দেখে তোমার কি খুনি মনে হয়?’ ‘এলিজা আমি তুমি কি মনে করি তা কিছু আসে যায় না। বাস্তবে যা ঘটেছে, সেটাই এখন বড় কথা। ‘ ‘তোমার তাকে কি করবে? ‘ ‘সেটা পরিচয় উদ্ধার এর পরে ঠিক হবে। ‘ ‘পরিচয় তো সে বলবে না।’ ‘আমরা তার ফটো বারবারিতে পাঠিয়েছি। সেখান থেকে সে ফটো আজ সকালে গেছে নাইরোবিতে। সে বড় কেউ হলে তার পরিচয় শিগ্রই জানা যাবে।’ ‘যাই বল, লোকটা বড় কেউ বলে। বড় কেউ না হলে ওমন বড় মন কার হয় না। আর শিশুরা শত্রু মিত্রু খুব তাড়াতাড়ি চিনতে পারে। আমাদের মেরী বিশ্বাসই করে না যে লোকটা চোর-ডাকাত কিংবা খুনি।’ ‘তুমি ঠিকই বলেছ। আমার দেয়া খাবার সে নিত না। কিন্তু যখন বললাম খাবারটা দিচ্ছি আমার স্ত্রীকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্যে তখন সে খাবার নিয়েছে। খুনি-দস্যুদের আচরণ এমন হয় না।’ ‘তাহলে কে সে?’ ‘সেটাই তো প্রশ্ন। একদিকে যেমন প্রশংসনীয় মানবিকতা দেখছ, অন্যদিকে তেমনি সে অত্যন্ত দক্ষ যোদ্ধা। তুমি যা বলেছ, সে যদি রিভলবার না নামাত, তার পরিকল্পনা মত চলত, তাহলে শেষের চারজনসহ কেউ আমরা বাঁচতাম না।’ ‘ঠিক বলেছ। জীবন-মৃত্যুর যুদ্ধে জীবন না নিলে জীবন দিতে হয়। একটা শিশুর অনুরোধে সে জীবন না নিয়ে সে জীবন দেয়ারই বন্দোবস্ত করেছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে তার মানবিক মনটাই বড়।’ এলিজাবেথ কথা শেষ করতেই টেলিফোন বেজে উঠল। জর্জ গিয়ে টেলিফোন ধরল। টেলিফোনে কথা শুনছিল জর্জ। শুনতে শুনতে তার মুখভাব পাল্টে গেল। চোখে-মুখে ফুটে উঠল বিস্ময় ও উত্তেজনা। এলিজাবেথও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল। নিশ্চয় সাংঘাতিক কিছু ঘটেছে। জর্জ টেলিফোন ছেড়ে দিতেই এলিজাবেথ উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল, ‘কিছু ঘটেছে, কোন দুঃসংবাদ?’ জর্জ সোফায় বসতে বসতে বলল, ‘বড় সুসংবাদ, তোমার জন্যে অবশ্য দুঃসংবাদ হতে পারে। লোকটির পরিচয় জানা গেছে।’ ‘জানা গেছে? কে তিনি?’ ‘আমরা যাকে হন্যে হয়ে খুঁজছি এ সেই আহমদ মুসা।’ ‘আহমদ মুসা?’ জগতের সব বিস্ময় যেন এসে চোখে-মুখা নামল এলিজাবেথের। ‘হ্যাঁ। যাকে হাতে পাওয়ার জন্যে আমরা কত কি না করেছি, সেই কিনা এসে আমাদের বন্দীখানায় বসে আছে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।’ এলিজাবেথ কোন কথা বলল না। জর্জই কথা বলল। মুখ ভরা হাসি নিয়ে বলল, ‘জান, নতুন বস সাইরাস শিরাক আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছে। নিশ্চয় আমাদের প্রমোশন হবে। অবশ্যই ইউরোপের বড় শহরে আমি পোস্টিং পাব।’ এলিজাবেথ নির্বাক বসে। জর্জের কথা তার কানে যাচ্ছে, কিন্তু কোন প্রতিক্রিয়া নেই। জর্জই আবার মুখ খুলল। বলল, ‘নাইরোবি থেকে একটা বিশেষ টিম বারবারেতি এসেছে। ওরা রওনা দিয়েছে সলোর উদ্দেশ্যে। রাতেই ওরা আহমদ মুসাকে নিয়ে যাবে।’ চমকে জেগে ওঠার মত নড়ে উঠল এলিজাবেথ। বলল, ‘কোথায় নিয়ে যাবে?’ ‘প্রথমে বারবারেতি, তারপর নাইরোবি। সেখান থেকে ইউরোপে। জান আহমদ মুসা জগতের সবচেয়ে মূল্যবান বন্দী।’ ‘জানি। তোমার খুব খুশী লাগছে, তাই না?’ নির্বিকার কন্ঠে বলল এলিজাবেথ। ‘খুশী হবো না মানে? আহমদ মুসার মত ভয়ংকর এবং বিশ্ববিখ্যাত লোক আমার হাতে ধরা পড়েছে। এ তো ঐতিহাসিক ভাগ্য।’ ‘তার প্রাণদন্ড হলে বুঝি তুমি আরও খুশী হবে?’ ‘সেটা বড়দের ব্যাপার। তবে সে আমাদের নেতাসহ অসংখ্য লোককে খুন করেছে।’ ‘সেটা আমি জানি। কিন্তু সে তোমাকে নতুন জীবন দিয়েছে।’ ‘তুমি কি বলতে চাচ্ছ?’ ‘তার জন্যে কি আমাদের কিছুই করণীয় নেই?’ ‘কি আছে?’ ‘আমার কি মনে হচ্ছে জান, তোমার হাত থেকে চাবিটা নিয়ে বন্দীখানার তালা খুলে ওঁকে বলি, আপনি চলে যান। আমার স্বামীকে বাঁচিয়েছিলেন। আমি আপনাকে বাঁচালাম।’ ‘পাগল হয়েছ। তাহলে তোমার স্বামীই শুধু মরবে না। তুমি মরবে এবং আমাদের সন্তানও মরবে।’ এলিজাবেথ কেঁপে উঠল। তার মুখ হয়ে গেল ফ্যাকাশে। সে দু’হাতে মাথা চেপে ধরে মাথাটা এলিয়ে দিল সোফায়। রাত তখন ১২টা। বারবারেতি থেকে ব্ল্যাক ক্রসের সে দলটা এল। জর্জ ও তার স্ত্রী এলিজাবেথ জেগেই ছিল। গেট খুলে দিল জর্জ। এক তলা থেকে দু’তলায় উঠার সিঁড়ির মাঝখানের ল্যান্ডিং-এ দাঁড়িয়ে এলিজাবেথ। বারবারেতি থেকে আসা ৫ সদস্যের ক্ষুদ্র দলটির নেতৃত্ব করছিল হ্যারি, ব্ল্যাক ক্রসের একজন অপারেশন কমান্ডার সে। হ্যারি ঘরে ঢুকেই বলল, ‘বন্দী কোথায় নিয়ে চল জর্জ।’ ‘না আগে উপরে চলুন। একটু কিছু মুখে দেবেন, তারপর এদিকে আসবেন।’ ‘না না জর্জ, খাওয়া-দাওয়া সেরেছি। কোন সময় নষ্ট না করে আহমদ মুসাকে নাইরোবি পৌঁছাতে হবে। সুতরাং চল।’ বন্দীখানার দরজায় দাঁড়িয়ে হ্যারি বলল, ‘আহমদ মুসাকে বেঁধে রাখা হয়েছে?’ ‘না।’ বলল জর্জ। ‘তাহলে তোমরা স্টেনগান বাগিয়ে দাঁড়াও।’ সাথে আসা চারজনের দিকে চেয়ে বলল হ্যারি। এবং নিজেও সে তার রিভলবার হাতে তুলে নিল। জর্জ খুলল দরজা। ঘরে ঢোকার আগে হ্যারি চিৎকার করে বলল, ‘আহমদ মুসা হাত তুলে দাঁড়াও। কোন প্রকার চালাকির চেষ্টা করলে তুমি ঝাঁঝরা হয়ে যাবে।’ ‘দেখুন, মিথ্যা ভয় দেখাবেন না। আমার দেহকে ঝাঁঝরা করার শক্তি আপনার নেই। আপনি শুধু পারেন আমাকে নাইরোবি পৌঁছাতে।’ শান্ত কন্ঠে বলল আহমদ মুসা। ‘হাত তোল।’ আবার চিৎকার করে বলল হ্যারি। ‘ওরা সার্চ করেছেন, আমার হাতে কোন অস্ত্র নেই। তবু যখন তোমাদের ভয়, তখন হাত তুললাম।’ বলে আহমদ মুসা দু’হাত উপরে তুলল। হ্যারি সবাইকে নিয়ে ঘরে ঢুকল। চারজন স্টেনগান বাগিয়ে। আর রিভলবার বাগিয়ে হ্যারি আগে আগে চলছিল। এলিজাবেথ সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়েছিল। ওখান থেকে বন্দীখানার ভেতরের সবকিছুই দেখা যায়। এলিজাবেথের মনে দুঃখ, কৃতজ্ঞতার চিহ্ন স্বরূপ লোকটার জন্যে সে কিছুই করতে পারলো না। এই দৃশ্যগুলো দেখতে গিয়ে তার মনের কষ্টটা বাড়ছিল। কিন্তু বিশ্ববিখ্যাত লোকটির সাথে ঘটনাগুলো না দেখে সে থাকতে পারছিল না। হ্যারি ও জর্জ মাঝখানে। তাদের দু’পাশে দু’জন করে স্টেনগানধারী। তারা আহমদ মুসার চারগজের মধ্যে পৌঁছলে আহমদ মুসা বলল, ‘আপনারা দাঁড়ান।’ আকস্মিক এই নির্দেশে সবাই দাঁড়িয়ে পড়ল। তার কথার রেশ মিলিয়ে না যেতেই আহমদ মুসা আবার বলল, হ্যারিকে লক্ষ্য করে, ‘আপনার বেল্টের সাথে হাতকড়া ঝুলছে ওটা আমার হাতে পরাতে আসছেন আমি জানি। কিন্তু তার আগে আমার কয়েকটা কথা আছে।’ ‘কি কথা?’ ‘আমাদের নেতৃবৃন্দকে বন্দী করে রেখেছেন, তাদের কি হবে? আমি বন্দী হলে তারা ছাড়া পাবে কিনা?’ ‘তোমার চিন্তা তুমি কর। ওদের কথা ভাবছ কেন?’ বলল হ্যারি। ‘তোমাদের শর্ত ছিল আমি আত্মসমর্পণ করলে তাদের তোমরা ছেড়ে দেবে।’ ‘সে শর্তটা ছিল তোমাকে হাতে পাবার একটা কৌশল। তোমাকে হাতে পাওয়ার পর সে শর্তের কোন ভ্যালিডিটি এখন নেই।’ ‘অর্থাৎ আমাকে পেলেও তাদের তোমরা ছাড়বে না?’ ‘দেখ এসব কথার আমি কোন জবাব দেব না। শুনে রাখ, ব্ল্যাক ক্রস-এর হাতে বন্দী হবার পর কেউ আর বেঁচে থাকে না। আমরা চাই না আমাদের কথা বলার জন্যে কোন বন্দীখানার বাইরে...’ তার কথা শেষ হতে পারলো না। আহমদ মুসার উপরে উঠানো দুই হাত হঠাৎ বিদ্যুৎ গতিতে নিচের দিকে ছুটে গেল। তার দেহটা প্রবল এক পাক খেল। পা দু’টি উপরে উঠে হাতুরির মত আঘাত করল হ্যারি এবং জর্জ দু’জনকে। তারপর পা দু’টি ভূমি স্পর্শ করার সংগে সংগেই স্প্রিং-এর মত তার দেহ সোজা হয়ে দাঁড়াল। সে উঠে দাঁড়িয়েছিল ডানপাশের দ্বিতীয় স্টেনগানধারীর প্রায় গা ঘেঁষে। স্টেনগানধারীর বিস্ময়ের ঘোর তখনও কাটেনি। আহমদ মুসা তার হাত থেকে স্টেনগান কেড়ে নিয়ে ট্রিগার চেপে তা ঘুরিয়ে আনল বামপাশের দুই স্টেনগানধারী থেকে তার ডান পাশের জন পর্যন্ত। স্টেনগানধারী চারজনের চারটা লাশ পড়ে গেল বন্দীখানার মেঝেতে। আহমদ মুসার পায়ের হাতুড়ির মত কিক খেয়ে হ্যারি এবং জর্জ দু’জনেই ছিটকে পড়ে গিয়েছিল মেঝের উপর। আহমদ মুসা স্টেনগানের গুলী থামিয়ে দেখল, হ্যারি ও জর্জ দু’জনেই উঠে দাঁড়াচ্ছে। আহমদ মুসা দেখেছিল হ্যারির হাত থেকে ছিটকে পড়া রিভলবারটা আহমদ মুসার পায়ের কাছে পড়ে আছে। আহমদ মুসা স্টেনগান বাম হাতে নিয়ে তাড়াতাড়ি ডান হাতে রিভলবারটা তুলে নিল। তুলে নিয়ে মাথা খাড়া করেই দেখল, হ্যারির হাত বোমা সহ তার পকেট থেকে বেরিয়ে আসছে। আহমদ মুসা সময় নষ্ট করল না। রিভলবারের ট্রিগার টিপল। গুলী গিয়ে বিদ্ধ করল হ্যারির কব্জীকে। আহত হাতটি বাম হাতে চেপে ধরে বসে পড়ল সে। জর্জও পকেটে হাত দিয়েছিল। ‘দেখুন জর্জ, পকেট থেকে হাত বের করবেন না। একটা নিষ্পাপ শিশুর আবেদন একবার আপনাকে বাঁচিয়েছে। এবার বাঁচবেন না।’ আহমদ মুসা একটু অমনোযোগী হয়ে পড়েছিল হ্যারির দিকে থেকে। সেই সুযোগে হ্যারির বাম হাত ডান হাত থেকে গড়িয়ে পড়া বোমাটি তুলে নিয়েছিল। আহমদ মুসা শেষ মুহুর্তে তা দেখে ফেলেছে। তার রিভলবার দ্বিতীয় বার গর্জন করে উঠল। এবার বাম হাতের কব্জীতে নয়, বাম বাহুর সন্ধীতে গুলী গিয়ে আঘাত করল। ছিটকে কাত হয়ে পড়ে গেল হ্যারির দেহ। এই সময় এলিজাবেথ এবং তার মেয়ে চিৎকার করে ঘরে প্রবেশ করল। সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়েছিল এলিজাবেথ। গোলা-গুলীর শব্দে তার মেয়ে মেরিও এসে দাঁড়িয়েছিল। এলিজাবেথের পাশে। তারা দু’জনেই কাঁপছিল। যখন আহমদ মুসার কন্ঠ চিৎকার করে উঠল জর্জের উদ্দেশ্যে এবং পরক্ষণেই গুলীর শব্দ হলো, এলিজাবেথ বুঝল তার স্বামীই এবার টার্গেট হয়েছে। সেই কারণেই কাঁদতে কাঁদতে এসে ঘরে ঢুকেছিল। আহমদ মুসা এলিজাবেথকে লক্ষ্য করে বলল, ‘আপনারা বেরিয়ে যান। এসব রক্ত ও হিংস্রতা থেকে শিশুদের দূরে রাখবেন।’ তারপর আহমদ মুসা জর্জকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘ঘরের চাবিটা আমাকে দিন। আমি তালা লাগিয়ে যাচ্ছি। আমি চলে যাবার পর বের হবেন।’ চাবিটা আহমদ মুসাকে দেবার কোন লক্ষণই দেখা গেল না জর্জের দিক থেকে। ‘আমি দু’বার আদেশ করে না মিঃ জর্জ।’ জর্জও তা নিশ্চয় বুঝতে পেরেছে। সে পকেট থেকে চাবিটা বের ফেলে দিতে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা বলল, ‘না না আমার হাতে দিবেন।’ হাতে চাবিটা নিয়ে আহমদ মুসা রিভলবার বাগিয়ে পিছু হটে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তালা লাগিয়ে দিল ঘরে। এলিজাবেথ ও মেরী সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়েছিল। কাঁপছিল তারা। আহমদ মুসা ছোট্ট মেরীর দিকে চেয়ে বলল, ‘ভয় নেই মা। মা ছেলেকে ভয় করে না।’ বলে আহমদ মুসা এলিজাবেথের দিকে চেয়ে বলল, ‘আমি এই চাবিটা আপনাদের গেটের বাইরে ফেলে রেখে যাব। একটু খুঁজে নিয়ে দরজা খুলে দেবেন আমি চলে যাবার পাঁচ মিনিট পর। আমি চাই না তারা আমার পিছু নিক।’ আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়ে যাবার জন্যে পা বাড়িয়ে থমকে দাঁড়াল। এলিজাবেথের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, ‘খেতে দেবার জন্যে ধন্যবাদ। সে খাওয়া আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। চলতে পারছি আমি ভালোভাবে।’ কথা শেষ করে মুখ ঘুরিয়ে আবার চলতে শুরু করল আহমদ মুসা। এলিজাবেথের গলায় এসে অনেক কথা ভীড় জমিয়েছিল। আপনি বাচ্চাদের এত ভালবাসেন কেন? আপনার বাচ্চা আছে কিনা? এমন শিশুতোষ মন নিয়ে আপনি এতবড় বিপ্লবী কি করে হলেন? কিন্তু কিছু বলতে পারলো না। কোন কথাই তার গলা থেকে বের হলো না। খেতে দেয়ার জন্যে ধন্যবাদ দিল। কিন্তু তার স্বামীর জীবন সে যে ফিরিয়ে দিয়েছে, এজন্যে ধন্যবাদটুকুও সে দিতে পারলো না। শুধু বোবার মত চেয়ে থাকল সে আহমদ মুসার চলে যাওয়া পথের দিকে। আহমদ মুসা বেরিয়ে যাবার কয়েক মুহুর্ত পর মেরী বলল, ‘আম্মা আমি তো ওঁকে ভয় করিনি। মৃত্যু দেখে, রক্ত দেখে আমার ভয় লেগেছে।’ এলিজাবেথ কোন কথা না বলে ঘড়ির দিকে তাকাল। দেখল পাঁচ মিনিট হয়ে গেছে। বলল মেরীকে, ‘চল চাবি নিয়ে আসি।’ বলে মেরীর হাত ধরে বাইরে বেরুবার জন্যে সামনে পা বাড়াল। ‘উঠি আব্বা।’ বলল পুলিশ অফিসার ম্যাকা। ‘উঠবি? তাড়া কেন?’ বলল ওকোটা উচি, পুলিশ অফিসার জাগুয়াস ম্যাকার আব্বা। বয়স তার ১২০ বছরের মত। ‘একজন মেহমান এসেছেন, তাকে হোটেলে রাখতে যেতে হবে।’ ‘কৈ কেউ বলেনি তো! কে মেহমান?’ জাগুয়াস ম্যাকা সব ঘটনা তার আব্বাকে জানিয়ে বলল, ‘ ঐ কমন্ড কাল্লা নামটার জন্যেই বোধ হয় তাকে আপন মনে হচ্ছে।’ ‘খেয়েছে মেহমান?’ ‘হ্যাঁ আব্বা, খাবার দিয়ে এসেছি। পাওলা নোয়ানি ওদিকে দেখছে। আমি আপনার সাথে কথা বলতে এসেছি।’ ‘ওঁর কেউ আছে সলো’তে?’ ‘না নেই।’ ‘তাকে ‘মেহমান’ বলছিস, আবার ‘আপন মনে হচ্ছে’ বলছিস, তারপর তাকে হোটেলে রাখতে যাচ্ছিস কেন?’ ‘মেহমানের সাথে দু’টি কুকুর আছে। ওরকম শিকারী কুকুর আমি কোনদিন দেখিনি। তার সম্পর্কে মনে হয় আরও কিছু জানার আছে। তাই হুট করে বাড়িতে এনে রাখা ঠিক মনে করছি না আব্বা।’ ‘চাকুরি করছিস তো পুলিশের, সবকিছুতেই তোর এখন সন্দেহ ঢুকেছে। তবু তুই যা বলেছিস যুক্তিসংগত।’ ‘তাহলে আসি আব্বা।’ ‘আচ্ছা আয়।’ ম্যাকা পা বাড়াল বাইরে গেস্ট রুমে আসার জন্যে। ওদিকে গেস্ট রুমের টেবিলে ব্ল্যাক বুলের খাবার রেখে ম্যাকা ব্ল্যাক বুলকে বলেছিল, ‘তুমি খাও। আমি আব্বার সাথে কথা বলে আসি। পাওলাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। কিছু দরকার হলে তাকে বলো।’ ম্যাকা চলে গেলে ব্ল্যাক বুল ঢুকেছিল টয়লেটে। মুখ হাত ধুয়ে ব্ল্যাক বুল ফ্রেস হয়ে গেস্ট রুমে ফিরে আসছিল। দরজায় প্রচন্ড ধাক্কা খেল ব্ল্যাক বুল কারো সাথে। গেস্ট রুমের ভেতর থেকে কেউ যেন ছুটে বের হয়ে আসছিল। দরজায় পর্দা থাকায় কেউ কাউকে দেখতে পায়নি। ধাক্কা খেয়ে ওপাশ থেকে কেউ সশব্দে পড়ে গিয়েছিল। ব্ল্যাক বুল তাড়াতাড়ি ভেতর ঢুকে দেখেছিল একটি মেয়ে মাটিতে পড়ে আছে। বয়স তার একুশ-বাইশ হবে। স্বাস্থ্যবান, নাদুস-নুদুস চেহারা। আফ্রিকান সিংহীর মত দেখতে। ব্ল্যাক বুল দ্রুত গিয়ে মেয়েটিকে টেনে তুলেছিল। বলেছিল, ‘স্যরি, আমার আরও সাবধানে আসা উচিত ছিল। লাগেনি তো কোথাও?’ মেয়েটি ব্ল্যাক বুলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। একবার তাকিয়েই চোখ বন্ধ করেছিল। বলেছিল, ‘লাগার কথা নয়। কিন্তু দেহের উপর কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না তো। বোধ হয় মাথার পেছনটায় একটু বেশী লেগেছে।’ ‘দেখি।’ বলে ব্ল্যাক বুল মেয়েটির পেছনে গেল। দেখল, মাথার পেছনে কিছু পরিমাণ জায়গা থেঁতলে গেছে। সামান্য রক্তও বেরিয়েছে। ব্ল্যাক বুল তাকে টেনে চেয়ারে বসাল। বলল, ‘কিছুটা জায়গা থেঁতলে গেছে, রক্তও বেরুচ্ছে। আমার কাছে ভালো ওষুধ আছে লাগিয়ে দিচ্ছি।’ বলে ব্যাগ থেকে এ্যান্টিবায়োটিক স্পঞ্জ বের করে আঘাতের জায়গাটা পরিষ্কার করল। তারপর সেখানে তুলা দিয়ে এ্যান্টিবায়োটিক ক্রিম লাগিয়ে দিল। বলল, ‘দেখবে বেদনাই হবে না।’ মেয়েটি এ্যান্টিবায়োটিক স্পঞ্জ ও লোশন হাতে নিয়ে নেড়ে-চেড়ে বলল, ‘এমন ওষুধ আমাদের দেশে পাওয়া যায় না, কোথায় পেলেন?’ বলে মেয়েটি তাকাল ব্ল্যাক বুলের দিকে। তার চোখে মুগ্ধ দৃষ্টি। ব্ল্যাক বুল বাল্যকাল ডিঙাবার পর এই প্রথম একটি মেয়েকে বাধ্য হয়ে স্পর্শ করেছে এবং সান্নিধ্যে এসেছে। মেয়েটির এই মুগ্ধ দৃষ্টি তার কাছে নতুন। ব্ল্যাক বুলের চোখ সে দৃষ্টির সামনে কেমন যেন বিব্রত হয়ে পড়েছিল। চোখ নামিয়ে নিয়েছিল সে। বলেছিল, ‘এগুলো ফ্রান্সের তৈরী।’ মেয়েটি চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে বলেছিল, ‘আপনি বুঝি আমাদের মেহমান, ভাইয়ার সাথে এসেছেন?’ ‘হ্যাঁ ওঁর সাথে এসেছি, উনি আমার বিরাট উপকার করেছেন। তোমার নাম কি পাওলা?’ ‘কি করে জানলেন আমার নাম?’ ‘তোমার ভাইয়ার কাছ থেকে। তিনি খাবার দিয়ে বলে গেলেন, পাওলা আসছে, কিছু দরকার হলে তার কাছে চাইবে।’ ‘হ্যাঁ। ঘরে কাউকে না দেখে আপনাকে খুঁজতেই তো যাচ্ছিলাম। এই সময় এই এ্যাকসিডেন্ট হওয়ায় নতুন ওষুধ দেখা হলো।’ বলে হেসে উঠেছিল পাওলা। পাওলা খুব স্মার্ট ও খোলামেলা। বোধ হয় এটা আফ্রিকান কালো মেয়েদের সারল্যেরই একটা চিহ্ন। পাওলা একটু থেমেই আবার বলেছিল, ‘নিন খেতে বসুন।’ বলে সে টেবিলে খাবার সাজাতে লেগে গিয়েছিল। ‘হাতটা একটু পরিষ্কার করে আসি।’ বলে ব্ল্যাক বুল বাইরে গেল। খাচ্ছিল ব্ল্যাক বুল। পাওলা সামনে দাঁড়িয়েছিল। মাঝে-মধ্যে এটা-ওটা তুলে দিচ্ছিল। একটি মেয়ের এক জোড়া চোখের সামনে তার পরিবেশনা এইভাবে খাওয়া ব্ল্যাক বুলের জীবনে এই প্রথম। জীবনে এই প্রথম তার মনে হচ্ছিল সে যেন বিশিষ্ট কেউ, যাকে একটি সম্মানী মেয়ে দাঁড়িয়ে থেকে যত্নের সাথে খাওয়াচ্ছে। চোখ তুলে মেয়েটির দিকে তাকাতে লজ্জা বোধ হচ্ছিল ব্ল্যাক বুলের। এই লজ্জার অনুভূতিও তার কাছে নতুন। হঠাৎ পাওলা বলে উঠেছিল, ‘বাপরে! একটা ধাক্কায় আমি কুপোকাত। আমি দৌড়াচ্ছিলাম। ধাক্কায় আপনারই পড়ার কথা ছিল। কিন্তু ছিটকে পড়লাম আমি। আপনি সিংহের সাথে লড়তে পারবেন।’ ব্ল্যাক বুল হেসেছিল। ‘হাসছেন যে!’ বলেছিল পাওলা। ‘গত রাতে আমি আমার দু’টি কুকুর নিয়ে সিংহের তাড়া খেয়ে গাছে উঠে বসেছিলাম।’ খিল খিল করে হেসে উঠেছিল পাওলা। বলেছিল, ‘তারপর?’ ‘তারপর আর কি। দিন হলে সিংহ চলে গেলে গাছ থেকে নেমে সলো’র পথ ধরলাম। তোমার ভাইকে না পেলে আরও একরাত গাছে কাটাতে হতো।’ ‘কুকুর দু’টো আপনার সাথে কেন? আপনি কি কাজে কোথায় এসেছেন?’ ‘সে অনেক কথা। পরে বলব।’ ‘পরে কখন? আপনি তো চলে যাবেন।’ পাওলার চলে যাবেন শব্দটা ব্ল্যাক বুলের হৃদয়ের কোথায় যেন একটা সুঁচ ফুটিয়ে দিল। চলে যাওয়ার কথা যেন মন পছন্দ করছিল না। ‘ও, তাই তো!’ তবু কষ্ট করেই বলেছিল ব্ল্যাক বুল। ‘এখন কোথায় যাবেন?’ ‘কোন একটা হোটেলে।’ ‘ও তাহলে তো সলো’তেই থাকছেন। আমাকে জানাবেন হোটেলের ঠিকানা?’ ‘তোমার টেলিফোন নম্বারটা দিও।’ ‘নম্বার লাগবে না। টেলিফোন তুলে বলবেন পুলিশ সুপারের বাসা। আর কিছু বলতে হবে না। আচ্ছা, আপনার কে আছেন?’ ‘আমার?’ বলে ব্ল্যাক বুল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকেছিল। তারপর বলেছিল, ‘দুভার্গ্য, আমার কেউ নেই।’ ‘কেউ নেই!’ বলে বিস্ময় দৃষ্টি নিয়ে পাওলা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, এই সময় ঘরে প্রবেশ করল পাওলার ভাই জাগুয়াস ম্যাকা। ‘এই তো তোমার খাওয়া হয়ে গেছে। একটু কি রেস্ট নেবে?" ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল ম্যাকা। ‘না দরকার নেই।’ ‘কুকুরকে খেতে দিয়েছিস?’ পাওলার দিকে চেয়ে প্রশ্নটা করেই আবার বলে উঠল, ‘পরিচয় হয়েছে এর সাথে? এ আমার ছোট বোন পাওলা নোয়ানি। কলেজ পাশ করেছে। পুলিশ ট্রেনিংও শেষ করেছে।’ ‘হয়েছে। আমি ওকে দেখেই বুঝতে পেরেছি ও পাওলা।’ ‘কুকুরকে আগেই খেতে দিয়েছি।’ বলল পাওলা। ‘ধন্যবাদ পাওলা।’ বলে ম্যাকা ব্ল্যাক বুলকে বলল, ‘তুমি তৈরী হয়ে নাও। আমি হ্যাটটা নিয়ে আসি।’ পাওলা থালা-বাসন গুছিয়ে কাজের মেয়ে ডেকে তার হাতে পাঠিয়ে তার পেছনে যেতে যেতে দরজায় গিয়ে ফিরে দাঁড়াল। বলল, ‘এখান থেকে যাওয়ার পর আমাকে কি জানাতে চেয়েছিলেন বলুন তো?’ ‘কি?’ ‘এই ভুলে গেছেন। হোটলের নাম।’ ‘স্যরি, এটার কথা বলেছ। না আমি ভুলিনি। হোটেলে উঠেছে ব্ল্যাক বুল। হোটেলে উঠার পর একটু রেস্ট নিয়ে ব্ল্যাক বুল তার কুকুর দু’টি নিয়ে বেড়িয়ে পড়ল ‘সলো’কে দেখার জন্য। দুইটি লক্ষ্য। এক, তার পিতৃপুরুষের সেই সলো গ্রামকে পায়ে হেঁটে দেখা। দুই, কুকুর দু’টিকে সুযোগ দেয়া তাদের ঘ্রান শক্তির মাধ্যমে আহমদ মুসাকে তারা খুঁজে বের করতে পারে কিনা। আহমদ মুসাকে এই সলোত্ই আনা হয়েছে সে নিশ্চিত। প্রায় চার ঘন্টা পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াল ব্ল্যাক বুল। কিন্তু তার মনে হলো চার ঘন্টায় শহরের একটা অংশ মাত্র সে দেখতে পারল। তার ধারণার চেয়ে বন্দর-শহরটি অনেক বড়। ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল ব্ল্যাক বুল। শেষে যেখানে সে পৌঁছল সেটা সংঘ নদী তীরের টুরিস্ট অবজারভেটরী। এটা একটা উঁচু টাওয়ার। এর মাথায় চড়ে পর্যটকরা আফিকার বনজ রূপ উপভোগ করে। ক্লান্ত হলেও ব্ল্যাক বুলের লোভ হল তার মাতৃভূমিকাকে আরও ভালভাবে দেখা। কুকুর দু’টি নিয়েই উপরে উঠল ব্ল্যাক বুল। খুশী হলো উপরে উঠে। ছোট বেলা থেকেই বনজংগল দেখছে ব্ল্যাক বুল। কিন্তু টাওয়ারে উঠে বনের যে রূপ দেখল, তা ছিল তার কাছে আকর্ষণীয়। জংগলের অন্ধকার যাকে বলে, সেই অন্ধকার দেখল ব্ল্যাক বুল দক্ষিণে তাকিয়ে। গোটা দক্ষিণ দিগন্ত ঘন অন্ধকারে ঢাকা। সে অন্ধকাররে দিকে তাকালে আনন্দ নয়, বুকটা কেঁপে উঠে ভয়ে। খুব কাছেই সংঘ নদীর পানি। কালোর প্রতিবিম্ব তার পানিকে কালি বানিয়ে দিয়েছে। টাওয়ারে ছোট একটা রেস্টুরেন্ট আছে। আছে একটা টেলিফোন বুথ। পাওলার কাছে টেলিফোন করার কথা মনে পড়ল ব্ল্যাক বুলের। হোটেলের নাম জানিয়ে তাকে টেলিফোন করবে এ ওয়াদা সে দিয়ে এসেছে। টেলিফোন করল ব্ল্যাক বুল। ওপার থেকে জবাব এল, ‘হ্যালো, আমি পাওলা।’ ‘চিনতে পেরেছ?’ বলল ব্ল্যাক বুল। হাসল পাওলা। বলল ‘চিনতে না পারলে নাম জিজ্ঞেস করলাম না কেন?’ ‘ধন্যবাদ।’ ‘না, ধন্যবাদ আমারই দেবার কথা।’ ‘কেন?’ ‘এই টেলিফোন করার জন্য, মনে থাকার জন্য। কেমন লাগছে হোটেল?’ ‘বোঝার সময়ই পাইনি। হোটেলে ব্যাগেজ রেখেই বেরিয়ে এসেছি। পায়ে হেঁটে শহর দেখার জন্য।’ ‘শহর কোথায়, বলুন বন-জংগল দেখার জন্য। তা পায়ে হেঁটে কেন?’ ‘সলো’র মাটির স্পর্শ আমার কাছে সোনার চেয়ে মুল্যবান মনে হচ্ছে। ভালো লাগছে এর বন-জংগলের দিকে চেয়ে থাকতে।’ ‘সলো’র সাথে এই প্রেমে পড়ার কারণ?’ ‘বলবো একদিন।’ ‘এ নিয়ে দু’বার বললেন ‘একদিন’ বলবেন। সে দিনটি কবে আসবে?’ ‘আমি জানি না।’ ‘দেখুন, আমি পুলিশের ট্রেনিং নিয়েছি। আমি কিছু বুঝতে পারি। আমার মনে হচ্ছে, বড় একটি মিশন নিয়ে আপনি সলো এসেছেন। বলবেন না আমাকে?’ ‘শুনে কি করবেন?’ ‘আর কিছু না হোক, আপনার চিন্তার অংশীদার হতে পারি।’ ‘শুনতে নতুন লাগছে। ধন্যবাদ।’ ‘নতুন লাগছে কেন?’ ‘এমন অংশীদার কখনও আমার হয়নি।’ ‘এখন বলতে আপত্তি আছে?’ ‘বলব দেখা হলে।’ ‘কখন হোটেলে ফিরবেন?’ ‘জানি না। এখন রাখি। টাওয়ারের ব্যস্ত পাবলিক বুথ তো।’ ‘দুঃখিত, ঠিক আছে। আমরাও এখনি একটু বেরুব। বাই।’ ‘বাই।’ ব্ল্যাক বুল টাওয়ার থেকে সামান্য উত্তরে নদীর ধারে ওয়াশিংটন মনুমেন্টের মত একটা মিনার দেখতে পেল। টাওয়ার থেকে নেমে ব্ল্যাক বুল মনুমেন্টের দিকে চলল। মনুমেন্ট এলাকাটি খুবই সুন্দর। মনুমেন্ট এলাকার তিনদিক ঘিরে সবুজ গাছের সুশৃঙ্খল বেষ্টনি। বেষ্টনি নদীর পানি পর্যন্ত নেমে গেছে। সবুজ বেষ্টনির মাঝখানে দাঁড়িয়ে মনুমেন্টটি। মনুমেন্ট শীর্ষে উতকীর্ণ শিরোনামটি অনেক দূর থেকে পড়া যায়। লেখা আছে "স্মরণ স্তম্ভটি দেশ মাতৃকার হারানো সন্তানদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত।" ‘হারানো সন্তান’ বলতে কি বুঝানো হয়েছে ব্ল্যাক বুল বুঝতে পারলো না। দেশের উতসর্গীত জীবন জানা অজানা সৈনিক অথবা নাগরিকদের স্মরণ স্তম্ভ সে দেখেছে। কিন্তু ‘হারানো’ বলতে কাদের বুঝানো হয়েছে? ভেতরে প্রবেশ করল ব্ল্যাক বুল। ভেতরে লোকজন তেমন নেই। যারা আছে, তারা অধিকাংশই শিশু ও কিশোর। তারা মনুমেন্টের চারদিকের বিস্তৃত লনে ছুটে বেড়াচ্ছে, খেলাধুলা করছে। ব্ল্যাক বুল গিয়ে দাঁড়াল মনুমেন্টের সামনে। কংক্রিটের তৈরী স্মরণ স্তম্ভে বসানো শ্বেত পাথরে খোদিত নামের সারি দেখতে পেল ব্ল্যাক বুল। দেখল সে, মনুমেন্টের এ দিকটা মনুমেন্টের সম্মুখ দিক নয়। সংঘ নদীর পাশটা এর সম্মুখ দিক। ব্ল্যাক বুল ঘুরে মনুমেন্টের সম্মুখ দিকে দাঁড়াল। দেখল, সামনের প্রশস্ত শ্বেত পাথরে লেখা অনেক কথা। তারপর নামের শুরু। ব্ল্যাক বুল পড়ার জন্য আরও সামনে এগিয়ে গেল। দেখল, লেখার উপর একটি শিরোনাম। শিরোনামটি হলোঃ ‘স্বজন হারানোর বিয়োগান্ত সেই ঘটনা।’ শিরোনামের পরেই সেই ঘটনার বিবরণ। পড়তে লাগল ব্ল্যাক বুলঃ ‘তখন দাস ব্যবসায়ের অন্ধকার যুগ। সেই অন্ধকার যুগের এক ভোর বেলা। সমৃদ্ধ গ্রাম সলো’র মানুষ গভীর ঘুমে অচেতন। শত বন্দুকের গুলীর শব্দে তাদের ঘুম ভাঙল। শুরু হলো দাস ব্যবসায়ীদের লেলিয়ে দেওয়া সৈন্যের বন্দুক, কামানের বিরুদ্ধে তীর-ধনুকের অসম লড়াই। গ্রামবাসীদের তীর-বর্শার সঞ্চয় শীঘ্রই শেষ হয়ে গেল। যুদ্ধ শেষ হলো গ্রামের দুইশ’ জনের নিহত এবং প্রায় তিনশ’ জনের বন্দী হওয়ার মধ্যে দিয়ে। বন্দী তিনশ’ জনের মধ্য থেকে যুবক, যুবতী বাছাই করে দেড়শ’ জনকে তিনটি বড় বোটে করে ওরা ধরে নিয়ে যায়। সলোর জীবনে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্যের দিন। যারা নিহত হলো, তারা হলো শেষ। তাদের লাশ ছিল দুঃখের মধ্যেও একটা সান্ত্বনা। কিন্তু দাস ব্যবসায়ীরা যাদের ধরে নিয়ে গেল, তারা বেঁচে থেকেও মৃত্যু যন্ত্রণায় নিমজ্জিত হলো এবং আত্মীয়-স্বজনদের বুকে রেখে গেল সারা জীবনের জন্য যন্ত্রণার জ্বলন্ত অঙ্গার। সেই যন্ত্রণার ইতি হয়নি এখনও। সেই যন্ত্রণারই এক প্রতিবিম্ব এই কালো মিনার। যন্ত্রণার এই কালো মিনারে উতকীর্ণ করে রাখা হলো আমাদের সেই হারানো সন্তানদের নামগুলো। পাঠক, এখানে এক মুহুর্ত হলেও দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করুন আমাদের হারানো মানিকদের জন্য- ঈশ্বর যেন তাদের আত্মার শান্তি দান করেন।’ পড়তে পড়তে ঝর ফর করে অশ্রু নেমে এল ব্ল্যাক বুলের দু’চোখ দিয়ে। অবিরতভাবে তা গড়িয়ে চলল গন্ড বেয়ে। ঝাপসা চোখেই আকুলভাবে পড়তে লাগল নামগুলো। প্রথম নামই পড়ল, ‘কমন্ড কাল্লা’ তার দাদার নাম। নামটা পড়ার সাথে সাথেই কান্নার এক প্রবল উচ্ছাস এসে গ্রাস করল ব্ল্যাক বুলকে। কয়েক মুহুর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে চোখ মুছল ব্ল্যাক বুল। মুখ এগিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে চুমু খেল ‘কমন্ড কাল্লা’ নামের উপর। চুমু দিতে গিয়ে আবার অপ্রতিরোধ্য কান্নায় ভেঙে পড়র ব্ল্যাক বুল। একটি হাতের সযত্ন স্পর্শ অনুভব করল ব্ল্যাক বুল তার কাঁধে। চমকে উঠে ফিরে তাকাল। তার কাঁধে হাত রেখে দাড়িয়ে আছে জাগুয়াস ম্যাকা, তার পাশে পাওলা। দু’জনের চোখে-মুখে রাজ্যের বিস্ময়! ব্ল্যাক বুল কুকুরের চেন হাত থেকে ছেড়ে দিয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে দু’হাতে দু’টি চোখ মুছে নিয়ে বলল, ‘আপনারা? এখন? এখানে?’ ব্ল্যাক বুলের চোখে বিস্ময়। বিস্ময়ের ঘোর তখনও কাটেনি ম্যাকা ও পাওলার চোখ থেকে। ‘প্রতি বছর এই দিন আমাদের পরিবারের সকলেই একবার এইখানে আসি’ বলল ম্যাকা। ‘এই দিন কেন?’ ‘এই দিন এই স্থান থেকে অন্যান্য অনেকের সাথে তুমি যে নামটায় চুমু দিলে সেই আমাদের কমন্ড কাল্লা চিরতরে হারিয়ে গেছে। প্রতিবছর এদিন এসে আমরা তার প্রার্থণা করি, আর তার উদ্দেশ্যে নদীতে ফুল ভাসিয়ে দেই।’ ব্ল্যাক বুলের চোখে তখন বিস্ময় ঠিকরে পড়ছে। বলল, ‘কমন্ড কাল্লার উদ্দেশ্যে কেন? কমন্ড কাল্লা আপনাদের কে?’ ‘কিন্তু তার আগে তুমিবল, তুমি এমন আকুল হয়ে কাঁদছ কেন? কমন্ড কাল্লার নামে চুমু দিলে কেন? ব্ল্যাক বুলের চোখে আবার অশ্রু নামল। সে মুখ নিচু করল। অল্পক্ষণ পরে মুখ তুলল। অশ্রু ধোয়া তার মুখ। আবেগে কাঁপছে তার দুটো ঠোঁট। বলল সে, ‘কমন্ড কাল্লা আমার দাদু।’ এক প্রবল উচ্ছাসে ভেঙে পড়ল তার কন্ঠ। ব্ল্যাক বুলের মুখ থেকে বেরুনো শব্দগুলো যেন এক বজ্রপাত। বিস্ময়ের প্রচন্ড আঘাতে ম্যাকা ও পাওলা কাঠের মত শক্ত হয়ে গিয়েছিল, নিজেদের যেন হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু তারপরেই কাঠের বুকে নামল যেন অশ্রুর ঝরণা। বাঁধ ভাঙা এক উচ্ছাসে ভেঙে পড়া ম্যাকা পাগলের মত জড়িয়ে ধরল ব্ল্যাক বুলকে। তার চোখ থেকে নামল অশ্রুর বন্যা। বিস্ময়ে কাঠ হয়ে যাওয়া পাওলার দু’চোখ থেকে নামছিল অশ্রুর অবিরল ধারা। কিছুক্ষণ পর ম্যাকা নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বলল, ব্ল্যাক বুলকে উদ্দ্যশ্য করে, ‘তোমার দাদু কমন্ড কাল্লাহ এবং আমাদের দাদী দুই আপন ভাইবোন। সেই দুর্ভাগ্যের দিন তোমার দাদুর হারিয়ে যাওয়া এবং তার বাপ-মা নিহত হওয়ার পর পরিবারের একমাত্র জীবিত মানুষ ছিলেন আমাদের দাদী। অশ্রু রুদ্ধ কন্ঠে ‘ভাই’ বলে ব্ল্যাক বুল আবার জড়িয়ে ধরল ম‌্যাকাকে। ম্যাকাও ‘আমার ভাই’ বলে জড়িয়ে ধরল ব্ল্যাক বুলকে। এক সময় ব্ল্যাক বুল ম্যাকাকে ছেড়ে দিয়ে তাকাল পাওলার দিকে। ব্ল্যাক বুল পাওলার দিকে তাকানোর সাথে সাথে পাওলার দু’গন্ডে শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুর ধারা আবার সজীব হয়ে উঠল হঠাৎ চোখ ফেটে নেমে আসা নতুন অশ্রুতে। কালো পাওলার কালো গ্রানাইটের মত মসৃন ঠোঁট দু’টি কেঁপে উঠল প্রচন্ড এক আবেগে। ‘পাওলা!’ আবেগ রুদ্ধ কন্ঠে ডাকল ব্ল্যাক বুল। সে ডাক বোধ হয় ধ্বসিয়ে দিল পাওলার বিবেচনার বাঁধকে। তার আবেগের নদীতে যেন জেগে উঠল প্রচন্ড বন্যা। যেন তারই প্রচন্ড ধাক্কায় পাওলা গিয়ে আছড়ে পড়ল ব্ল্যাক বুলের বুকে। আবেগাপ্লুত ব্ল্যাক বুল এই অপরিচিত আকস্মিকতায় প্রথমটায় বিমুঢ় হয়ে পড়ল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে আলতোভাবে পাওলার পিঠে হাত বুলাল। তারপর পাওলাকে ধরে নিয়ে ম্যাকা’র সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ভাইয়া, পাওলা এখনও ছোটই আছে। কিন্তু খুব ভালো মেয়ে পাওলা।’ ম্যাকার চোখে তখনও অশ্রু। কিন্তু তার ঠোঁটে ফুটে উঠল একটা সস্নেহ হাসি। বলল, আমাদের জন্যে নতুন সুখবর যে, পাওলাকে তুমি ভাল বলেছ। ওর অত্যাচারে সবাই অতিষ্ঠ। তাই তো ওকে পুলিশে চাকুরী দিচ্ছি।’ ‘ভাইয়া......।’ চোখ মুছে পাওলা বলতে শুরু করল। ম্যাকা তাকে বাধা দিয়ে বলল, ‘আমি তোকে কিছু বলিনি। কমন্ড কাল্লা তোকে ভাল বলল তাই তোকে কিছু তথ্য দিতে যাচ্ছিলাম। যাক এসব, সবাই এখন চল যাই বাসায়। আব্বাকে এ সুখবর তাড়াতাড়ি দিতে না পারলে বুক ফেটে যাবে আমার।’ ‘ভাইয়া, আমার নাম ‘কমন্ড কাল্লা’ নয়। এখানে এসে এই নাম আমার এ জন্যেই বলেছি যাতে এই নামের সূত্র ধরেও যদি আমার দাদু বংশের কাউকে খুঁজে পাই।’ রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল ব্ল্যাক বুল। ‘তোমার উদ্দেশ্য স্বার্থক হয়েছে। তোমার কমন্ড কাল্লা নামই তোমার প্রতি আমাকে আকৃষ্ট করে। যার ফলে আগ্রহ করে তোমাকে গাড়িতে নেই, বাড়িতে নিয়ে আসি।’ একটু থেমেই ম্যাকা আবার বলল, ‘তাহলে তোমার নাম কি?’ নাম আমার একাধিক হয়েছে। ছোট বেলা জর্জ জায়েদী, তারপর ব্ল্যাক বুল এবং অবশেষে ‘আবদুল্লাহ জায়দ রাশিদী।’ ‘এতো মুসলিম নাম।’ বিস্মিত কন্ঠে বলল ম্যাকা। ‘হ্যাঁ, মুসলিম নাম।’ ‘তার মানে? তুমি মুসলিম? তোমার এত নাম পরিবর্তনের কারণ? ‘আমার দীর্ঘ দুঃখের ইতিহাসের সাথে এর কারণ যুক্ত আছে।’ গভীর বেদনার্ত কন্ঠে বলল ব্ল্যাক বুল। ম্যাকা ও পাওলা দু’জনের মুখও গম্ভীর হয়ে উঠল। ম্যাকা ব্ল্যাক বুলের কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘চল ভাই বাসায় ফিরি, তোমাদের ইতিহাস শোনার আগে আর কিছুই ভাল লাগবে না।’ ‘চলুন।’ বলে ব্ল্যাক বুল কুকুরের চেন তুলে নিতে যাচ্ছিল। তার আগেই চেন দু’টি তুলে নিল পাওলা। বলল, ‘কুকুর দু’টি এখন আমার।’ বলে পাওলা কুকুর দু’টির পিঠ ও মাথা নেড়ে আদর করল। কুকুর দু’টিও লেজ নেড়ে গা ঘেঁষে দাঁড়াল পাওলার। যেন নতুন প্রভূকে তারা স্বাগত জানাচ্ছে। এত তাড়াতাড়ি আমার টম, টমি’কে তুমি দখল করে ফেললে? এ দু’টির প্রতি কিন্তু ভাইয়ারও একটা দাবী ছিল।’ হেসে বলল ব্ল্যাক বুল। ম্যাকা হাসল। বলল, ‘পাওলা’র পক্ষে আমি আমার দাবী পরিত্যাগ করলাম।’ কথা শেষ করেই ‘এস, আর দেরী নয়’ বলে ম্যাকা হাঁটতে শুরু করল। গেটের বাইরে এসে সবাই ম্যাকার জীপে উঠল। সামনে ড্রাইভিং সিটে বসল ম্যাকা। আর পেছনের সিটে ব্ল্যাক বুল এবং পাওলা। গাড়ি চলতে শুরু করল ম্যাকাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে। ব্ল্যাক বুল বলছিল কাহিনী। তার দাদু কমন্ড কাল্লার কাহিনী। জাগুয়াস ম্যাকা, তার আব্বা, পাওলা এবং ম্যকার স্ত্রী, ফুফু সবাই পিনপতন নীরবতার মধ্যে শুনছিল। ব্ল্যাক বুলের মুখে কমন্ড কাল্লার কাহিনী। বৃদ্ধের পাশে বসেছিল ব্ল্যাক বুল। আর তাদের সামনে অর্ধচন্দ্রাকারে বাড়ির সবাই। রাজ্যত্যাগী রাজা যায়দ রাশিদীর সাথে কমন্ড কাল্লার ইয়াউন্ডি পৌঁছা পর্যন্ত কাহিনী বলে থামল ব্ল্যাক বুল। সকলেরই চোখে অশ্রু। ‘তারপর?’ বৃদ্ধ বলল। ব্ল্যাক বুল পরবর্তী কাহিনী শুরু করল। কি করে সুলতান যায়দ রাশিদীর একমাত্র পুত্র মারা গেল, কেন যায়দ রাশিদী হজ্জ্ব যাত্রা বন্ধ করে ইয়াউন্ডিতে ছেলের কবরের পাশে স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিলেন, মহৎ হৃদয় যায়দ রাশিদী কমন্ড কাল্লাকে স্বাধীনভাবে যেখানে ইচ্ছা চলে যেতে অনুমতি দিলেও তিনি থেকে গেলে কি করে যায়দ রাশিদী তাকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করে একমাত্র কন্যার সাথে বিয়ে দিলেন। একটু থামল ব্ল্যাক বুল। আবার শুরু করল, ‘এইভাবে কমন্ড কাল্লা একজন শাহজাদী এবং বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হলেন। কিন্তু সুখ সইল না তার কপালে। খৃষ্টান মিশনারীরা হত্যা করল সুলতান যায়দ রাশিদী এবং তার স্ত্রীকে। সকল সম্পত্তি আত্মসাতের জন্য সম্পত্তি একমাত্র উত্তরাধিকারী কমন্ড কাল্লার স্ত্রীকেও বন্দী করল এবং কমন্ড কাল্লাকে তাদের একজন নিকৃষ্ট কর্মচারী হতে বাধ্য করল। তার কোন স্বাধীনতা ছিল না, বাইরে বেরুবার কোন সুযোগ ছিল না। শুরু হয়েছিল তার এক ধরনের দাস জীবন। এ দুর্বিসহ জীবন ছিল আমার আব্বার এবং আমিও তা ভোগ করে এসেছি।’ ‘তোমার সে কাজটা কি ছিল?’ জিজ্ঞেস করল ম্যাকা। ‘সে এক ঘৃনিত কাজ। ঘাতকের দায়িত্ব পালন। তারা যাদের বন্দী করে আনত, তাদের শিরচ্ছেদ করা চিল আমার কাজ।’ একটু থামল ব্ল্যাক বুল। তারপর বলল, ‘আমার হতাশ ও অন্ধকারময় জীবন এভাবেই হয়ত কেটে যেত, কিন্তু জীবন চিত্র আমার পাল্টে গেল হঠাৎ। একজন মহান মানুষ এবং মহাবিপ্লবীকে ওরা বন্দী করে আনল। তার কাছ থেকেই আমি প্রথম জানলাম আমি মানুষ, মানুষ হিসেবে শির উঁচু কারে আবার মানুষের মধ্যে দাঁড়াতে পারি। তিনি ওদের পরাভূত ও ধ্বংস করে নিজে মুক্ত হলেন এবং করে অন্ধকার জিন্দানখানা থেকে আমাকেও মুক্ত করে আনলেন। এবং প্রতিষ্ঠা করলেন যায়দী রাজবংশের এক উত্তরসুরী হিসেবে, যায়দ রাশিদীর বাড়ি ও প্রচুর সম্পদও আমার হাতে তুলে দিলেন। আমি নতুনভাবে আমার পিতৃধর্ম ইসলামে ফিরে এলাম। আমার নতুন নাম হলো আবদুল্লাহ যায়দ রাশিদী। আমার পিতা যেহেতু প্রকাশ্যে ইসলাম ধর্ম পালন করতে পারতেন না, আমার মুসলিম নামও রাখা সম্ভব ছিল না। তাই তিনি আমার নাম রেখেছিলেন জর্জ রাশিদী। নামের অর্ধেক খৃস্টান, অর্ধেক মুসলমান। আর ঘাতক হিসেবে ওরা আমার নাম রেখেছিল ব্ল্যাক বুল।’ থামল ব্ল্যাক বুল। ‘তারপর? এখানে এলে কেমন করে? আমাদের কথা মনে পড়ল কি করে?’ বলল ম্যাকা। সংগে সংগে উত্তর দিল না ব্ল্যাক বুল। পাশের বালিশটায় একটু হেলান দিয়ে বসল। বলল, ‘সে অনেক কথা। আমি আসিনি। আমাকে অন্য একজন সাথে করে নিয়ে এসেছেন ভিন্ন এক মিশনে। ভাগ্যই আমাকে এখানে এইভাবে নিয়ে এসেছে।’ ‘কার সাথে? কি মিশন?’ বলল পাওলা। ‘বিরাট একটি মিশন। মিশনটা আমার নয়। আমি একজন সহযোগী মাত্র। বলা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছি না।’ ‘মিশন যার, যার সাথে তুমি এসেছ সে কোথায়?’ বলল ম্যাকা। ব্ল্যাক বুলের মুখ ম্লান হয়ে উঠল। বেদনা ভারাক্রান্ত মুখ নিচু করল সে। ব্ল্যাক বুলের বেদনাক্লিষ্ট মুখের দিকে চেয়ে সকলে বেদনা অনুভব করল। কেউ কথা বলল না। ব্ল্যাক বুলই কথা শুরু করল আবার। বলল, ‘উনি আহত অবস্থায় বন্দী হয়েছেন।’ ব্ল্যাক বুলের কথা ভারী, অশ্রু ভেজা। অস্বস্তি এবং বেদনার ছায়া নামল গোটা ঘরে। নীরবতা ভেঙ্গে মুখ খুলল ম্যাকা। বলল, ‘তার জন্যে এমন ভালবাসা, কে সে?’ ‘এ সেই লোক যে আমাকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে এসেছে, যে আমাকে নতুন জীবন দিয়েছে, যাকে আমি আমার জীবনের চেয়ে বেশী ভালোবাসি।’ ‘কোথায় সে আহত এবং বন্দী হলো?’ ‘সংঘ হাইওয়ের যেখানে কাদেলী রোড এসে মিশেছে সেখানে।’ সোজা হয়ে বসল ম্যাকা। তার চোখ-মুখ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। বলল, ‘আমি বারবারেতি থেকে আসার পথে ওখানে চারটি লাশ দেখেছি। আর হাইওয়ের পাশে কাদেলী রোডের মুখে গুলীতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া একটা জীপ দেখেছি। এই ঘটনার কথা তুমি বলছ?’ ‘গুলীতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া জীপটি করেই আমরা এসেছিলাম। আর ঐ চারজন নিহত হয়েছে আমার সাথীর হাতে।’ ‘তোমার সাথীর হাতে? তাহলে তোমার সাথী বন্দী হলো কিভাবে?’ ‘ওদের ওঁত পেতে থাকা চারটি গাড়ি আকস্মিকভাবে আমাদের ঘেরাও করে ফেলে এবং হঠাত করেই বন্দুকের মুখে আমার সাথীকে ধরে নিয়ে যায় হাইওয়ের উপর। ওরা বন্দুকের বাঁট দিয়ে আমার সাথীকে মারধোর করে ওঁকে রক্তাক্ত করে ফেলে। কিন্তু অসম্ভব রকমের সামান্য সুযোগের সদ্ব্যবহার করে আমার সাথী ওদের চারজনকে হত্যা করে। পঞ্চম জনকেও যখন গুলী করতে যাবে, এ সময় একটি পাঁচ ছয় বছরের শিশু হঠাত সামনে এসে তার পিতাকে হত্যা না করার আবেদন জানায়। আমার সাথী রিভলবার নামিয়ে নেয়। এই সুযোগে পঞ্চম ব্যক্তি তাকে লক্ষ্য করে গুলী করে। সে নিজেকে বাঁচাতে পারলেও হাত আহত হয় এবং তার হাত থেকে রিভলবার ছিটকে পড়ে যায়। ঠিক এই সময় আরও দু’টি গাড়িতে আরও চারজন সেখানে হাজির হয়। বন্দী হয়ে যায় আমার সাথী।’ ‘তুমি বাঁচলে কেমন করে?’ ‘আমি কৃষ্ণাঙ্গ, আমাকে ওরা গাইড মনে করেছে। তাই গুরুত্ব দেয়নি। অবশ্য শেষে ব্রাশ ফায়ার করেছিল আমার গাড়ি লক্ষ্যে। মেঝেতে শুয়ে থাকায় বেঁচে গেছি।’ ‘ওরা কি সবাই শ্বেতাংগ ছিল?’ ‘ওরা শ্বেতাংগ ছিল। আমার সাথী এশিয়ান।’ ‘এশিয়ান? বল তো ঐ শ্বেতাংগরা কারা?’ ব্ল্যাক বুল একটু দ্বিধা করল। তারপর বলল, ‘ওরা ব্ল্যাক ক্রস-এর লোক।’ ‘ব্ল্যাক ক্রস?’ ম্যাকা’র কন্ঠ প্রায় চিৎকার করে উঠল। ‘তুমি চেন ওদের?’ বলল বৃদ্ধ, ম্যাকার আব্বা। সংগে সংগে উত্তর দিল না ম্যাকা। সে অনেকটা বিস্ময়-বিমুঢ় হয়ে পড়েছিল। একটু সময় নিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ চিনি আব্বা। সমগ্র পৃথিবী বিস্তৃত অত্যন্ত শক্তিশালী এবং দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসবাদী সংগঠন।’ থামল ম্যাকা। একটু পর বলল, ‘আমাদের উপর সরকারী নির্দেশ আছে পারতপক্ষে ওদের কাজে যেন আমরা নাক না গলাই। ওদের এড়িয়ে চলতে বলা হয় আমাদেরকে।’ কথা শেষ করে ব্ল্যাক বুলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওদের সাথে তোমার সাথীর ঝগড়া কিসের? তোমার সাথীর মিশনের লক্ষ্য কি ওরা?’ ‘হ্যাঁ।’ বলে একটু থামল ব্ল্যাক বুল। চিন্তা করল। তারপর বলল, ‘ঝগড়ার কাহিনীটা বিরাট।’ এরপর একে একে ব্ল্যাক বুল ক্যামেরুনে কি করে ব্ল্যাক ক্রস সমূলে উৎপাটিত হলো এবং ব্ল্যাক ক্রসের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হলো কার হাতে, কি করে ওরা বারবারেতি’র ইসলামী কনফারেন্স স্থানে বিস্ফোরন ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক মুসলিম নেতাদের পনবন্দী করল তার বিস্তারিত বিবরন দিয়ে বলল, ‘ব্ল্যাক ক্রস শর্ত দিয়েছে আমার সাথী আত্মসমর্পন করলে তবেই তারা ছেড়ে দেবে মুসলিম নেতাদের। আমার সাথী তাদের মুক্ত করার লক্ষ্য নিয়েই আসছিলেন মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রে।’ ওদিকে বিস্ময়ে থ’ হয়ে গেছে ম্যাকা। তার চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠেছে বিস্ময়ে। ব্ল্যাক বুল থামলে সে প্রায় চিৎকার করে উঠল, ‘কি বলছ তুমি! ওখান থেকে কেউ বাঁচেনি। মুসলিম নেতৃবৃন্দরা সবাই অস্বাভাবিক রকম শক্তিশালী বিস্ফোরনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছেন। আমরা এটা জানি, গোটা দুনিয়া এটা জানে। ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) একটি বিশেষজ্ঞ দলও ঘটনাস্থল পরীক্ষা করে গেছে। তারাও আমাদের সাথে একমত। তুমি নতুন কথা বলছ।’ ‘আপনি ঠিকই বলেছেন। ব্ল্যাক ক্রস এ রকম বিশ্বাসই জন্মিয়েছে। কিন্তু আসল ঘটনা হলো মুসলিম নেতৃবৃন্দকে কিডন্যাপ করার পর তারা বিস্ফোরন ঘটিয়েছে।’ ‘সত্যি?’ ‘হ্যাঁ, কোন সন্দেহ নেই।’ ‘কি করে তোমরা জানলে?’ ‘ওরা চিঠি পাঠিয়েছে। তাতে তারা ঐ শর্ত উল্লেখ করেছে।’ ‘তোমার সাথীকে হাতে পাওয়ার জন্যে তাদের এটা একটা ফাঁদও তো হতে পারে।’ ‘শুধু চিঠি নয়, আরও প্রমান পাওয়া গেছে।’ ব্ল্যাক বুল থামলেও ম্যাকা কোন কথা বলল না। ভাবছিল সে। বেশ কিছুক্ষন পর বলল, ‘হতেও পারে। ব্যাপারটা আমাদের পুলিশের জন্যে হবে বিব্রতকর।’ বলে একটু থামল। বলল তারপর, ‘কিন্তু তোমার এই সাংঘাতিক সাথীটা কে, যে একা লড়তে এসেছে, ব্ল্যাক ক্রসের সাথে এবং তাদের বিরুদ্ধে লড়ে জয়ী হয়েছে ক্যামেরুনে?’ ‘শুধু ক্যামেরুন নয়। ফ্রান্সেও লড়েছে এবং জয়ী হয়েছে।’ ‘এটাও যে অবিশ্বাস্য কথা বলছ। এমন ব্যক্তিত্ব কে আছে?’ ‘আছে।’ ‘কিন্তু কে সে?’ একটু দ্বিধা করল ব্ল্যাক বুল। তারপর বলল, ‘বলব, কিন্তু একটা শর্ত।’ একটু থামল। তারপর বলল, ‘আপনি পুলিশের লোক। আমার অনুরোধ তাঁর নাম বা পরিচয়টা পুলিশ বা সরকারের জানা ঠিক হবে না।’ ভ্রু কুঞ্চিত করল ম্যাকা। একটু সময় নিয়ে বলল, ‘তোমার শর্ত মানব যদি তিনি মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রের লোক না হন এবং এখানকার কোন নাগরিক বা দেশের সাথে সংশ্লিষ্ট কোন অপরাধ যদি তিনি করে না থাকেন।’ ‘আপনার শর্ত মানলাম।’ বলে একটা ঢোক গিলল ব্ল্যাক বুল। তারপর বলল, ‘তিনি আহমদ মুসা।’ ব্ল্যাক বুল নাম উচ্চারণের সাথে সাথে শক খাওয়ার মত এক ত্বড়িত তরঙ্গ খেলে গেল ম্যাকা’র গোটা দেহে। তার মুখ-চোখে ফুটে উঠল প্রশ্নমাখা এক বিস্ময়। তার চোখ দুটি স্থির হয়ে কিছুক্ষন চেয়ে থাকল ব্ল্যাক বুলের দিকে। তারপর বলল, ‘কোন আহমেদ মুসা? বিশ্ব ব্যাপী পএ পত্রিকায় যাকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সে কি?’ ‘হ্যাঁ, সে’ ‘অর্থ্যাৎ বলছ বিশ্ব বিশ্রুত আহমেদ মুসা তোমার সাথী এবং এখন তিনি মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রে?’ ‘তাকে বন্দী করে ‘সলো’র দিকেই আনা হয়েছে’ ‘সলোর দিকে? কেন? তাকে তো বারবারেতোএ মত বড় শহরের দিকে নিয়ে যাবার কথা। ‘কারণ বোধ হয় এই যে, মুসলিম নেতৃবৃন্দকে সলো থেকে বোমাসার মধ্য কোথাও বন্দী করে রাখা হয়েছে?’ ম্যাকা কোন কথা বলল না। বুঝা গেল সে ভাবছে। কিছুক্ষন পর বলল, ‘আমরা মনে হয় এখন উঠতে পারি। আবদুল্লাহ যায়দ ক্লান্ত। ওর বিশ্রাম প্রয়োজন।’ বলে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়তে পাওলার দিকে চেয়ে বলল, ‘মেহমানখানা একটু বাইরের দিকে। ওখানে যায়দকে রাখা ঠিক হবে না ওকে তুমি তোমার ঘরে নিয়ে যাও। আর তুমি যাও আম্মার ঘরে।’ হাঁটার জন্য পা বাড়াতে বাড়াতে বলল ব্ল্যাক বুলকে লক্ষ্য করে তুমি রেষ্ট নাও। আমি আসছি। কথা আছে।’ পাওলা ব্ল্যাক বুলকে নিজের ঘরে পৌছে দিয়ে বলল, ‘পছন্দ হবে তো ঘরটা?’ ‘তোমার দুঃখ হচ্ছে না?’ ‘দুঃখ হবে কেন?’ ‘তোমার ঘর দখল করলাম’ দখল করবই বা না কেন? তুমি আমার কুকুর দখল করেছ, আমি তোমার ঘর দখল করলাম।’ পাওলা মুখ টিপে হাসল। বলল, আপনি আমার ঘর দখল করেছেন, না আমার ঘরে এনে আপনাকে দখল করলাম?’ ‘কুকুর দখল যত সহজ, মানুষ দখল কি তত সহজ?’ ‘মনে হয় মানুষ দখল বেশি সহজ। তবে সমস্যা হল দখলে যাবার পরেও মানুষ তা স্বীকার নাও করতে পারে, যা কুকুর পশু হলেও করে না।’ ‘তার মানে দখল হওয়ার পরেও আমি স্বীকার করছি না!’ ‘মানুষের মনের খবর আমি জানব কি করে? যাই আমি’। দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল পাওলা। দরজা পর্যন্ত গিয়ে ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘মনের ‘সময়-কালটা’ কিভাবে চলে বলুন তো?’ ব্ল্যাক বুল প্রশ্নটা ঠিক বুঝতে পারল না। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল পাওলার দিকে। পাওলা একটু হাসল। বলল, ‘পারলেন না। পারলেন না বলেই তো মানুষ দখল কঠিন বলেছেন। জানেন, মন কখনো এক পলকে হাজার দিলের পথ চলে, আবার কখনো হাজর দিনেও এক পলকের পথ চলতে পারে না। কুকুরের কিন্তু এ শক্তি নেই।’ বলে পাওলা দরজা পার হয়ে ছুটে পালাল। হাসি ফুটে উঠল ব্ল্যাক বুলের ঠোঁটে। হৃদয় জুড়ে তার স্নিগ্ধ প্রশান্তি। মনে হলো, এমন গল্প যদি সে পাওলার সাথে অনন্তকাল ধরেও করে, তবুও তার মনে ক্লান্তি আসবে না। সত্যি পাওলার মধ্য সে যেন হারিয়ে যাচ্ছে। তার মনে হল এই হারিয়ে যাওয়ার যে সুখ, তার তুলনা দুনিয়াতে নেই। ব্ল্যাক বুলের মন আগের চেয়ে অনেক সজীব, অনেক জীবন্ত হয়ে উঠেছে। কিন্তু দেহ জুড়ে ক্লান্তি। ‘ধীরে ধীরে ব্ল্যাক বুল পাওলার স্পর্শ জড়িত শূন্য বিছানার দিকে এগুলো। পরদিন সকাল বেলা। সকাল ৭টায় পাওলা হন্তদন্ত হয়ে ব্ল্যাক বুলের ঘরে প্রবেশ করল। বলল, ‘ভাইয়া টেলিফোন করেছে। আপনাকে, যেতে হবে।’ ‘কোথায়?’ শ্বেতাংগ কলোনীর একটা বাড়ীতে বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া চারজন লোকের লাশ পাওয়া গেছে। দু’টি কুকুর নিয়ে আপনাকে এক্ষুণি যেতে হবে ওখানে।’ ‘আমাকে?’ ‘কেন’ ‘আমি জানিনা’ ‘কুকুর দিয়ে আসামী ধরার ব্যবস্থা? কিন্তু আমি তো চিনি না?’ ‘গাড়ি রেড়ি। আমি আপনাকে নিয়ে যাবো।’ ‘ঠিক আছে চলো’ ওরা গিয়ে জীপে উঠল ড্রাইভিং সিটে বসল পাওলা। পাশের সিটেই ব্ল্যাক বুল। ‘কিন্তু আমার মনে হয় কুকুরকে দিয়ে অপরাধী ধরার জন্য ডাকেননি। ঐ চারজনের মধ্যে আহমেদ মুসা নেই তো।’ ব্ল্যাক বুলের শুকনো কন্ঠ, চোখে মুখে প্রচন্ত উদ্বেগের চিহৃ। ‘এসব চিন্তা বাদ দিন। আপনার কাছ থেকে এবং ভাইয়ার কাছ থেকে আহমেদ মুসার যে কাহিনী শুনেছি, তাতে তিনি অখ্যাত সলো শহরে মার খেয়ে মরবেন না তা নিশ্চিত করে বলতে পারি।’ ‘তুমি ঠিকই বলেছ পাওলা। আহমেদ মুসা, যে ‘আহমেদ মুসা’ তা উদ্বেগের তোড়ে ভুলেই গিয়েছিলাম।’ ‘ভাইয়ার সাথে গত বিকেলে অত কি কথা বললেন?’ ‘আমি কই বললাম। তিনি বললেন আমি শুনলাম’ ‘বিষয়?’ ‘ভাইয়া ব্ল্যাক ক্রস সম্পর্কে কিছু খোঁজ খবর নিয়েছিলেন, তাই আমাকে বলছিলেন।’ ‘কিছু পেয়েছেন নাকি ভাইয়া?’ ‘না পাননি তবে খোঁজ খবর নিয়ে জেনেছেন বিস্ফোরনের একদিন পর ব্ল্যাক ক্রস-এর একটি বড় দল সংঘ নদী পথে সলো অতিক্রম করে দক্ষিণে চলে গেছে। যতটা তিনি খোঁজ নিয়েছেন তার গোয়েন্দা সূত্রে তাতে ব্ল্যাক ক্রস-এর ঐ দলটি মধ্য আফ্রিকার সীমান্ত অতিক্রম করে বোমাসার দিকে চলে গেছে।’ ‘ব্ল্যাক ক্রসের ঐ দলেই কি পণবন্দী মুসলিম নেতৃবৃন্দরা ছিলেন?’ ‘ভাইয়া তাই মনে করেন, কারণ বিস্ফোরনের ঘটনার পর ব্ল্যাক ক্রসের কেউ বারবারোতি থেকে অন্য দিকে যায়নি।’ ‘তাহলে পরিষ্কার’ ‘ঠিক তাই’ ‘আছা এখন দুঃচিন্তা থেকে মুক্ত হোন’। ‘হলাম’। ‘এখন ‘তোমার’ মানে আপনার পরিকল্পনা কি?’ ব্ল্যাক বুল পাওলার দিকে চেয়ে হাসল। বলল, ‘তুমি থেকে আবার আপনিতে যাচ্ছ কেন?’ আপন করে আবার পর করতে চাচ্ছ বুঝি?’ ‘যায়দ’ ভয় করে। তোমাকে কাছে টানতে গেলে তুমি যদি দূরে ঠেলে দাও।’ সামনে চোখ নিবদ্ধ রেখে আবেগরুদ্ধ কন্ঠে কথাগুলো বলল পাওলা। ‘যার জীবনটাই মরুভুমিতে কাটছে, সে বুঝি মরুদ্যানকে দূরে ঠেলতে পারে? পাওলা বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ’। মুখে তার ফুটে উঠল একটু দুষ্টুমির হাসি। ‘এটা শিখলে কোথায়?’ ‘প্রত্যেকবার খাওয়ার পর তোমাকে বলতে শুনেছি। নামযে তোমাকে বলতে শুনেছি। ভাইয়া এবং দাদুর সাথে কথা বলার সময় খুশি হলেই তোমাকে এটা বলতে শুনেছি।’ ‘আমি মুসলমান, আমার ধর্ম তোমার ভাল লাগবে?’ ‘দেখ আমাদের স্থানীয় যে ধর্ম। তা আসলে ধর্ম নয়। বাইরের ধর্মের মধ্য খৃষ্ট ধর্মের চেয়ে ইসলাম ধর্মকেই আমরা ভাল মনে করি। এখন তো আরো ভাল লাগবে তোমার ধর্ম এবং আমাদের দাদুর ধর্ম বলে’। ‘শুধু কি ‘ভালো’ বলা পর্যন্ত শেষ?’ ‘এই তো ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পড়লাম, শিখিয়ে দিলে তোমার নামাযও আমি পড়ব। মুসলমানতো হয়েই গেলাম।’ হাসল ব্ল্যাক বুল। বলল, ‘এগুলো তো ধর্মের বাহ্যিক অনুষ্ঠান, বিশ্বাসের আনুষ্ঠানিক প্রকাশ। কিন্তু বিশ্বাসটাই গোড়ার কথা।’ ‘বিশ্বাস কি?’ ‘স্রষ্টা এবং তাঁর আদেশ সম্পর্কে তোমার সিদ্ধান্তর নাম।’ ‘বুঝতে পারছিনা। উদাহরণ দিয়ে বলত’। ‘যেমন- আামদের ধর্ম বলে, এই পৃথিবী ও আকাশসহ গোটা বিশ্ব চরাচরের একজন স্রষ্টা আছেন। সমস্ত সৃষ্টি তাঁর দেয়া নির্দিষ্ট বিধানের আধীনে চলে। মানুষের দেহ ব্যবস্থাপনাও তাঁর দেয়া নিয়মে চলে। শুধুমাত্র মানষের ইচ্ছা শক্তিকেই আল্লাহ স্বাধীন রেখেছেন। মানুষ ইচ্ছা করলে ভাল কাজও করতে পারে, খারাপ কাজও করতে পারে। স্রষ্টা মানুষকে কাজের স্বাধীনতা এই জন্যেই দিয়েছেন যে, তিনি পরীক্ষা করতে চান কে ভাল পথে চলে, আর কে খারাপ পথে চলে। মৃত্যুর পর পৃথিবীর সব মানুষ, পৃথিবীতে সে কি কাজ করেছে তার জবাবদিহীর জন্য আল্লাহর কাছে হাজির হবে। যারা ভাল কাজ করবে বা সত্য পথে দুনিয়ায় চলছে তাদের দেয়া হবে অনন্ত শান্তি’। ব্ল্যাক বুল একটু থামল। সে থামতেই পাওলা চট করে বলে উঠল ‘কোনটা ভাল কাজ বা কোনটা ভাল পথ, যে পথে চললে পুরষ্কার পাওয়া যাবে এবং যে পথে চললে মিলবে শান্তি- এসব মানুষ বুঝবে কি করে? না বুঝলে কিভাবে মানুষ শাস্তি এড়াবার চেষ্টা করবে?’ ‘তার ব্যবস্থা না করে স্রষ্টা শাস্তির ব্যবস্থা করেননি। প্রথম মানুষকে আল্লাহ যখন দুনিয়াতে পাঠান, তখনই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন পৃথিবীতে তিনি মানুষের জন্যে সত্য পথ প্রদর্শক পাঠাবেন। তাঁরা তাদের কাছে আল্লাহর কাছ থেকে আসা ভালো কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজের নিষেধ মানুষকে জানাবেন, বুঝাবেন এবং নিজেরা তা পালন করে দেখাবেন। মানুষের জন্যে আল্লাহর শেষ বার্তাবাহক এসেছেন ৫৭০ খৃষ্টাব্দে এবং তিনিই ইসলামের নবী। আমরা তাঁর মাধ্যমে আসা আল্লাহর আদেশ নিষেধ মেনে চলি’। ‘এই আদেশ, নিষেধ এবং বিশ্বাসগুলো কি? তোমার উপরোক্ত কথাগুলো মেনে নেয়া কি বিশ্বাস?’ ‘হ্যাঁ তাই। তবে মূল বিশ্বাসটাকে এইভাবে বলা যায়ঃ স্রষ্টা এক। তিনি সবকিছুর মালিক ও নিয়ন্ত্রক এবং বিধানদাতা। ৫৭০ খৃষ্টাব্দে তাঁর পাঠানো মোহাম্মাদ মোস্তফা (স.) তাঁর শেষ বার্তাবাহক। এবং যেসব আদেশ নিষেধ তিনি স্রষ্টার কাছ থেকে এনেছেন, যা আল কোরআন নামক গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়েছে, তা মানুষকে মেনে চলতে হবে’। ‘খুব সুন্দর ব্যবস্থা। আদেশ নিষেধের কিছু উদাহরণ দাও তো’। ‘সব মানুষ এক আদমের সন্তান। সাদা-কালো কোন ভেদাভেদ করা যাবে না। শাসক-শাসিত, ধনী-গরীব সবাই আল্লাহর কাছে সমান। সকলের প্রতি সুবিচার করতে হবে। সকল অন্যায়-জুলুম নিষিদ্ধ। প্রতিটি মানুষের আহার, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি মৌলিক প্রয়োজনসমূহ পূরণ করতে হবে ইত্যাদি জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে আদেশ-নিষেধ রয়েছে। আর এ কাজগুলো করার জন্যে যে চরিত্র দরকার তা গঠন করার জন্যে রয়েছে আনুষ্ঠানিক ইবাদাতের’। ‘তাহলে দেখছি, গোটা জীবনকেই নিয়ন্ত্রণ করবে ধর্ম’। ‘হ্যাঁ তাই’। ‘মজার তো! আচ্ছা, আমি মুসলমান হয়ে গেলাম বললেই মুসলমান হয়ে যাব?’ ‘না। বিশ্বাসের একটা ঘোষণা দিতে হয় এবং কতকগুলো মূল কাজ করতে হয়’। ‘কেমন ঘোষণা?’ ‘ঘোষণা করতে হয়ঃ ‘আল্লাহ এক, মুহাম্মাদ (স.) তাঁর প্রেরিত রসুল’। এরপর নামায পড়তে, যাকাত দিতে, রোজা রাখতে এবং হজ্জ করতে রাজী হয়ে যেতে হয়’। ‘নামায বুঝেছি। অন্যগুলো কি?’ ইতিমধ্যে গাড়ি এসে পড়েছে শ্বেতাংগ কলোনির সেই বাড়িটির গেটে। গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। ‘আচ্ছা উত্তর পরে দেব’। বলে ব্ল্যাক বুল গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। পাওলাও নামল গাড়ি থেকে। সেই সাথে নামাল কুকুর দু’টিকে। গেট খুলে তারা ভেতরে প্রবেশ করল। কুকুর দু’টি টেনে নিয়ে পাওলা আগে এবং ব্ল্যাক বুল পেছনে চলল। ওরা গাড়ি বারান্দায় পৌঁছতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল জাগুয়াস ম্যাকা। ভেতরে দেখা গেল আরও কয়েকজন পুলিশ। ‘যায়দ তোমাকে কষ্ট দিয়েছি। কারণ, আমার মনে হচ্ছে তোমার সেই সংঘ হাইওয়ের চারজনের হত্যার সাথে এ হত্যার কিছুটা মিল দেখতে পাচ্ছি। ওখানে চারজন শ্বেতাংগ, এখানেও চারজন শ্বেতাংগ। ওরাও ছিল ব্ল্যাক ক্রসের, এরাও ব্ল্যাক ক্রসের’। বলল ম্যাকা। ‘ব্ল্যাক ক্রসের?’ ‘হ্যাঁ’। একটু থেমে ম্যাকা বলল, ‘তোমাকে কুকুর আনতে বলেছি। কারণ ওরা আহমদ মুসার গন্ধের সাথে পরিচিত’। ‘তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন, আহমদ মুসা এখানে ছিল কিনা বা আছে কিনা?’ ব্ল্যাক বুলের কণ্ঠে উত্তেজনা। ‘ঠিক তাই’। ‘চলুন দেখি’। সবাই ভেতরে প্রবেশ করল। চারটি লাশ যেখানে পড়ে আছে, সেখানে প্রবেশ করল সবাই। পাওলা দু’টি কুকুরের চেন হাতে ধরেছিল। ঘরে প্রবেশ করার সাথে সাথে কুকুর দু’টি ছুটল ঘরের একদম বিপরীত প্রান্তে রাখা খাঁটিয়ার দিকে। পাওলার হাত থেকে চেন খুলে গেল। কুকুর দু’টি খাটিয়ার কাছে ছুটে গিয়ে লাফ দিয়ে খাটিয়ার উপর উঠল। মাথা নিচু করে বিছানা শুকতে লাগল। তার সাথে তারা লেজ নাড়াচ্ছিল এবং তাদের মুখ থেকে এক প্রকার নরম শব্দ বেরুচ্ছিল। ম্যাকা, ব্ল্যাক বুল এবং পাওলা তিনজনের চোখেই বিষ্ময়। ওরাও দ্রুত গিয়ে খাটিয়ার পাশে দাঁড়াল। ব্ল্যাক বুল খাটিয়ার পাশে দাঁড়াবার পর কুকুর দু’টি ব্ল্যাক বুলের দিকে তাকিয়ে তাদের লেজ নাড়া এবং মুখের শব্দ বাড়িয়ে দিল। ব্ল্যাক বুলের চোখে-মুখে তখন বিমুঢ় ভাব। ‘কুকুরের এই আচরণের কি অর্থ করা যায়?’ বলল ম্যাকা। ‘কোন সন্দেহ নেই, এখানেই এই খাটেই আহমদ মুসা শুয়ে ছিল’। কুকুর দু’টি একটুও ভুল করেনি’। ব্ল্যাক বুলের শুকনো ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে অশ্রু ভেজা ভারী কণ্ঠ বেরিয়ে এল। ঘরের চারদিকে আর একবার চেয়ে ম্যাকা বলল, ‘নিশ্চয় কোন বন্দী এখানে ছিল। তিনি যদি আহমদ মুসা হন, তাহলে বলতে হবে তিনি এ চারজনকে হত্যা করে বন্দীখানা থেকে চলে গেছেন’। ‘চলে যেতে পেরেছেন?’ ব্ল্যাক বুলের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ‘আমি গোটা বাড়ি সার্চ করেছি। সব দেখে মনে হয়েছে একটি পরিবার উপর তলায় বাস করতো। তাড়াহুড়া করে তারা চলে গেছে। হতে পারে হত্যাকান্ডের পর এবং আহমদ মুসা চলে যাবার পর তারা বাড়ি ছেড়েছে। আবার এও হতে পারে, আহমদ মুসা পালাতে পারেনি, তাকে নিয়েই গৃহবাসীরা অন্যত্র সরে পড়েছে’। ম্যাকা’র শেষ কথাটা শুনে ব্ল্যাক বুলের মুখটা চুপসে গেল। ম্যাকা আবার বলল, ‘তবে তিনি চলে যেতে পেরেছেন, এটাই স্বাভাবিক। শুধু ঘরের ভেতর চারজন নিহত হওয়ায় প্রমাণ হয়, বাইরে কোন সংঘর্ষ হয়নি। লাশের অবস্থান, রক্তের চিহ্ণ থেকে বুঝা যায়, আহমদ মুসার বৈরী পক্ষের ৫জন লোক ঘরে প্রবেশ করেছিল। তার মধ্যে ৪জন নিহত এবং অন্যজন আহত হয়’। ‘আহত হয়েছে এবং সে ব্ল্যাক ক্রসের লোক এটা কেমন করে বুঝলেন?’ ঘরের উত্তর-পূর্ব কোণে জমাট বেধে থাকা রক্তের দিকে ইংগিত করে বলল এ রক্ত নিহত চারজনের কারো নয় এবং আহমদ মুসারও নয়। আহমদ মুসার গুলীতে নিহত লাশের যে পজিশন তাতে আহমদ মুসা কোণায় গিয়ে আহত হবার কোন যুক্তি নেই। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ঐ রক্ত আহমদ মুসার হলে কুকুরগুলো প্রথমে ওখানেই ছুটে যেত’। ‘ঠিক বলেছেন ভাইয়া। আমার আর কোন সন্দেহ নেই। আহমদ মুসা ভাই এখান থেকে নিশ্চয় বেরিয়ে গেছেন। গেট দিয়ে ঢোকার সময় থেকেই আমার টম ও টমির চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং মাটির ঘ্রাণ নেয়া শুরু করে’। ‘তোমার কথাই ঠিক হোক। চল আমরা যাই পুলিশ এদিকের ব্যবস্থা করবে’। বেরিয়ে এল তারা তিনজন। বাড়িতে এসে গাড়ি থেকে নেমেই ম্যাকা বলল, ‘এস তোমরা, আগে জরুরী কয়েকটা কথা বলে নেই’। তারা গিয়ে বসল ড্রইং রুমে। ‘তারা বলেছিল, আহমদ মুসাকে সারেন্ডার করতে যেতে হবে কোথায়?’ ম্যাকাই প্রথমে কথা শুরু করল। ‘বোমাসা এয়ারপোর্টের কাছাকাছি কোন জায়গা’। বলল ব্ল্যাক বুল। ‘তাহলে মুক্ত হয়ে আহমদ মুসা বোমাসা যেতে পারে বলে মনে কর?’ ‘পণবন্দী মুসলিম নেতৃবৃন্দের উদ্ধার আহমদ মুসার টার্গেট’। ‘যেহেতু আহমদ মুসাকে আত্মসমর্পণ করতে বলেছে বোমাসায়, তাহলে ওদের পণবন্দী করে রেখেছে বোমাসা অথবা বোমাসারই আশেপাশে কোথাও। এই ধারণায় আহমদ মুসার বোমাসা যাওয়াটাই সবচেয়ে যুক্তিসংগত’। ‘আমারও তাই মনে হয়’। ম্যাকার কপাল কুঞ্চিত। সে ভাবছিল। ব্ল্যাক বুল থামলেও তৎক্ষণাৎ সে কথা বললো না। একটু পর বলল, ‘কি জানি বলেছিলে ওদের দেয়া সময়ের আর পাঁচদিন বাকী?’ ‘পাঁচ দিনের মধ্যে দু’দিন চলে গেছে। আর মাত্র তিনদিন বাকী’। ‘তাহলে তো অবিলম্বে বোমাসা যাত্রা করতে হয়। কিন্তু আমি তো কাল সকালের আগে যেতে পারবো না। অফিসে জরুরী কাজ’। ‘কাল গেলে বাকী থাকবে আর দু’দিন। খুব অল্প সময় হবে না?’ ‘তা হবে। অসুবিধা হবে না। বোমাসার পুলিশ প্রধান উপাংগো আমার বন্ধু। সে আমার ক্ল্যাস মেট। এক সাথেই ফ্রান্সে আমরা পুলিশ ট্রেনিং-এ ছিলাম’। ‘খুব ভালো হবে যদি আমরা ওখানকার পুলিশের সাহায্য পাই। ‘হ্যাঁ পাব, ইতিমধ্যে বোমাসা পুলিশ কাজ শুরু করে দিয়েছে। আমরা গেলে তা আরও ভালো হবে। ‘তাহলে আমরা কাল সকালে যাচ্ছি?’ ‘অবশ্যই। দেখি পারলে তার আগেও’। ব্ল্যাক বুল হঠাৎ উঠে গিয়ে ম্যাকার পায়ের কাছে বসল। তার দু’হাঁটুতে হাত রেখে বলল, ‘ভাইয়া দেখবেন অদ্ভুত এক যাদুকরি মানুষ তিনি। দেখা পেলে আপনি তাকে ভালো না বেসে পারবেন না। অত বড় ত্যাগী মানুষ দুনিয়াতে নেই। জানেন!’’ বলে থামল ব্ল্যাক বুল। ‘কি? বল’। বলল ম্যাকা। ‘ফ্রান্সের রাজকুমারীর সাথে ওঁর বিয়ে। বিয়ের পোশাক পরে দু’জনেই বিয়ের আসরে বসেছেন। এই সময় তিনি মুসলিম নেতৃবৃন্দের পণবন্দী হওয়ার খবর পেলেন এবং জানলেন তাদের শর্তের কথা যে, আহমদ মুসা আত্মসমর্পণ করলে তবেই তাদের মুক্তি। তিনি বিয়ের আসর থেকে উঠে দাঁড়ালেন এবং রাকজুমারীকেও বুঝালেন, এই অবস্থায় তিনি বিয়ে করতে পারেন না। এবং তিনি আমাকে নিয়ে চলে এলেন। তার কাছে নিজের কাজের চেয়ে, আল্লাহর বান্দা মানুষের উপকারের চেয়ে বড় কিছু নেই’। ‘যায়দ তার সম্পর্কে বেশী কিছু জানি না। কিন্তু যতটুকু জানি তাতে বুঝি, তিনি আমাদের মত কোন মানুষ নন’। বলল ম্যাকা। ‘ভাইয়া আমার পুলিশ ট্রেনিং আছে। আমিও তো যাচ্ছি বোমাসা’। আবদারের সুরে বলল পাওলা। ‘তা আমি জানি না। দেখ, যায়দ যদি অনুমতি দেয়’। বলে দ্রুত উঠে গেল ম্যাকা। তার ঠোঁটে হাসি। লজ্জায় মুখ নিচু করেছে পাওলা। তার ভাইয়া বেরিয়ে গেল ড্রইং রুম থেকে। ব্ল্যাক বুলের চোখে-মুখেও লজ্জার ছায়া নেমে ছিল। কিন্তু পরক্ষণেই তার ঠোঁটে ফুটে উঠল হাসি। বলল, ‘পাওলা দেখলে তো ভাইয়া কত ভাল। এখন আমার অনুমতি চাও’। পাওলার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। লজ্জার সাথে মিশে তা তাকে করে তুলল অপরূপ। সে উঠে দাঁড়িয়ে ব্ল্যাক বুলের পিঠে একটা কিল বসিয়ে ছুটে পালাতে পালাতে বলল, ‘এই যে অনুমতি নিলাম’। ব্ল্যাক বুল মুগ্ধ দৃষ্টিতে পলায়ন রতা পাওলার দিকে চেয়ে রইল। পাওলা চলে গেছে, কিন্তু ব্ল্যাক বুল সেদিক থেকে তার চোখ ফেরাতে পারেনি। হঠাৎ আনমনা হয়ে পড়েছে ব্ল্যাক বুল। তার চোখে ভেসে উঠেছে অতীতের এক দৃশ্য। অতীতের হতভাগ্য কশাই ব্ল্যাক বুল এবং আজকের এস সৌভাগ্যবান যায়দের মধ্যে কত পার্থক্য। আল্লাহর প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতায় দু’চোখের কোণায় অশ্রু নামল ব্ল্যাক বুলের।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৭৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ২১.কঙ্গোর কালো বুকে (৫)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন