বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
সকালে ঘুম থেকে উঠেই এমন একটা খবর
পাবে তা আশা করেনি শায়ন।
তাই বাসায় কোনো কিছু না বলেই
বের হয়ে এসেছে। বসের ফোন পেয়ে
সময় নষ্ট করেনি মোটেও।
এক্সিলারেটরে পায়ের চাপ বাড়িয়ে
দিলো সে। গাড়ির স্পিড বেড়ে
গিয়েছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব
পৌছাতে চায় ও। গন্তব্য রাফিনের
বাসা। বস রিটায়ার্ড কর্নেল.
আনোয়ার হুসাইনের কথাটা এখনো
কানে বাজছে ওর।
“রাফিন কিডন্যাপ হয়েছে। ওর বাসায়
গিয়ে রিপোর্ট দাও আমাকে।"
আফতাব চৌধুরী রাফিন। শায়নের
সাথেই কাজ করে ছেলেটা,
বাংলাদেশ কাউন্টার
ইন্টেলিজেন্সে জয়েন করেছে বছর
দুয়েকের মত হয়েছে। শায়নের থেকে
জুনিয়র পোস্টে কাজ করলেও ছেলেটা
শায়নকে স্যার না বলে “শায়ন ভাই”
বলেই ডাকে, শায়নও ওকে বন্ধুর মতই
মতোই মনে করে, তাই
স্বাভাবিকভাবেই কিছু বলে না।
চৌকস এই ছেলেটা তার বুদ্ধি ও জ্ঞান
দিয়ে খুব সহজেই সকলের আস্থাভাজন
পাত্রে পরিণত হয়েছে। আর সেই
ছেলেটাই কিনা হঠাৎ করে
কিডন্যাপড !!! একদম মানা যায় না।
সবকিছু গোছানো,শুধু বিছানাটা
ছাড়া। চাদরটা এলোমেলোভাবে
আছে। বালিশটা এক পাশে ফেলে
রাখা। শায়ন একবার চোখ বুলিয়ে
নিলো রাফিনের ঘরটাতে। রুমে তেমন
কিছুই নেই। একটা বিছানা, বিছানার
ডান পাশে সাইড টেবিল। টেবিলে
রাখা ছোট্ট একটা টেবিল-ল্যাম্প। আর
রাফিনের একটা ছবি। রুমের বাম পাশে
বাথরুমের দরজাটা হালকা খোলা।
একবার বাথরুমেও চোখ বুলিয়ে নিলো
শায়ন। অস্বাভাবিক কিছুই চোখে
পড়েনি ওর।
নাহ!! মাথায় ঢুকছেনা। কিভাবে
রাফিন কিডন্যাপ হলো তা বুঝতে
পারছেনা শায়ন।
তবে এটুকু নিশ্চিত অজ্ঞান করে নিয়ে
গিয়েছে ওকে। রুমে ঢুকেই খুব হালকা
কিন্তু পরিচিত ক্লোরোফর্মের গন্ধ
নাকে এসেছে শায়নের।
কিন্তু এমন একটা জলজ্যান্ত মানুষকে
কিভাবে তুলে নিয়ে গেলো?? তাও
আবার নিজের বাড়ি থেকেই??
রাফিনের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে
একমনে ভাবছিলো শায়ন। হঠাৎ পায়ে
কিছু একটার খোঁচা লাগতেই ভীষণ
চমকে উঠলো শায়ন। তাকিয়ে দেখলো
পায়ের কাছে একটা কবুতর। ভীষণ সুন্দর
কবুতরটা। মানুষের খুব কাছাকাছি
থাকে বলে ভয় একদমই নেই। কবুতর
সাধারণত মানুষ জোড়া হিসেবে পালন
করে। একটা কবুতর দেখে একটু কৌতূহলী
হয়ে শায়ন নিচু হয়ে ধরতে চাইলেই একটু
দূরে সরে গেল কবুতরটা।
- স্যার, কোন ক্লু খুঁজে পাওয়া যায়নি।
হঠাৎ বেরসিকের মত বলে উঠল একজন
পুলিশ অফিসার।
শায়ন ব্যালকনি থেকে ঘরে প্রবেশ
করলো। ঘরে ঢুকে পুলিশ অফিসারকে
উদ্দেশ্য করে কিছু বলতে গিয়ে মুখ
খুলেও আবার বন্ধ করে ফেললো। কারণ
তার চোখ আটকে গেছে রাফিনের
ঘরে একটা দেয়াল পেইন্টিং এর ওপর।
পেইন্টিংটা রুমের দরজার ঠিক পাশের
দেয়ালে। সেই পেইন্টিংটার ওপরে
একটা কাগজ আটকানো। বোঝাই
যাচ্ছে হালকা আঠা দিয়ে লাগানো
হয়েছে কাগজটা। খেয়াল করে না
তাকালে চোখে পড়তোনা এটা।
কাগজটার দিকে কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে
তাকিয়ে রইলো শায়ন।
খুব ছোট্ট করে একটা মেসেজ লেখা
আছে সেখানে।
মেসেজটা পড়ে চোয়াল শক্ত হয়ে
এলো শায়নের। হাত মুঠো পাকিয়ে
গেলো অজান্তেই। একটানে
পেইন্টিংটার ওপর থেকে কাগজটা
তুলে নিলো ও। বের হয়ে এলো
রাফিনের ঘর থেকে।
একই সাথে রুম থেকে বের হয়ে আসলো
পুলিশ অফিসারটি।
তার হাতে কাগজটা দিয়ে বললো,
"এটা ল্যাবে পাঠাও। হাতের ছাপ,
কলমের কালি, কখন লেখা হয়েছে সব
কিছুর রিপোর্ট আমার চাই!"
"ইয়েস স্যার," বলেই একটা স্যালুট ঠুকে
বের হয়ে গেলো লোকটা।
কাগজটার লেখা শায়নের মাথায়
ঘুরছে এখনো। ওর ভেতরে রাগ আর বন্ধুর
প্রতি দায়িত্ব দুটোই নাড়া দিচ্ছে।
এখনো মনে হচ্ছে চোখের সামনে
ভাসছে লেখাটা।
"Try but fail"
নিজের অফিসের ডেস্কে বসে আছে
শায়ন। শরীরটাকে চেয়ারের সাথে
হেলান দিয়ে বসে বসে ভাবছে সে।
রাফিনের বাসা থেকে সেদিন তেমন
কিছুই পাওয়া যায়নি। রাফিনের
সাথে থাকতো শুধু ওর অন্ধ চাচা। তিনি
অসুস্থ, শয্যাশায়ী। রাফিনের ছোট্ট
অ্যাপার্টমেন্টের একটা ছোট্ট রুমেই
তিনি সারাদিন শুয়ে থাকেন। তাকে
জিজ্ঞেস করে তেমন কোন লাভ হয়নি।
রাতে তিনি বেঘোরে ঘুমুচ্ছিলেন।
সন্দেহজনক কোন শব্দই নাকি পান নি।
রাফিনের কললিস্ট রিপোর্ট
আনিয়েছিল। সেগুলো দেখছে। তেমন
কারো সাথেই কথা বলেনি। তাই
কাওকে সন্দেহের চোখে দেখতেও
পারছেনা।
শায়ন কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইলো
চেয়ারে। এরপর মাথাটা হেলান
দিলো চেয়ারে। তাকিয়ে আছে
উপরে ঘুরতে থাকা সিলিং ফ্যানের
দিকে। দরজায় টোকার শব্দ শুনে সোজা
হয়ে বসলো শায়ন। তাকিয়ে রইলো
দরজার দিকে।
- আসতে পারি স্যার?
ওদের অফিসের এক জুনিয়র অফিসার
দাড়িয়ে। হাতে ফাইল। ফাইলের ওপর
লেখা আছে রাফিনের নাম।
- আসো তাসিন।
- স্যার,, রাফিন স্যারের ফাইলটা।
- হুম! রেখে যাও। আর কিছু পেলে ওর
ব্যাপারে?
- স্যার রাফিন ভাইয়ের বাসা থেকে
আর কিছুই পাওয়া যায়নি। কিভাবে
তাকে তুলে নিয়ে গেলো সেটাও
বুঝতে পারছিনা। গত কাল রাতে
বাসায় ফিরে তিনি নাকি সরাসরি
নিজের রুমে চলে যান। রাতে খাওয়া-
দাওয়া করেননি। খুব চিন্তিত
দেখাচ্ছিল তাকে। ওদের বাসার
কাজের বুয়ার কাছে জেনেছি।
- হুম! আচ্ছা যাও। আমি একটু একা
থাকতে চাই। কেউ আসলে বলে দিয়ো
আমি ব্যস্ত। আর মুবিনকে দিয়ে এককাপ
কফি পাঠিয়ে দিয়ো।
- আচ্ছা স্যার।
আবার চিন্তার সাগরে ডুব দিলো
শায়ন। রাফিন ইন্টেলিজেন্সের
ভেতরকার অনেক কিছুই জানে, তার
কিডন্যাপ হওয়াটা অনেক বেশী
চিন্তার কারণ। বোঝাই যাচ্ছে কোন
প্রকার মুক্তিপণের জন্য রাফিনকে
কিডন্যাপ করা হয়নি। সে ক্ষেত্রে
ইন্টেলিজেন্স বেশ খানিকটা হুমকির
মুখে আছে। নিজের রুমে ডেকে এ কথা
গুলা কিছুক্ষণ আগে বস বলেছেন। যদিও
বলাটা এমনিই বলা, পরিস্থিতি
বোঝার মত বুদ্ধি শায়নেরও আছে।
কিডন্যাপের সাথে কারা জড়িত যদিও
বা এখন পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছে না তবে
এটুকু বোঝা যাচ্ছে কাজটার সাথে এমন
কেউ জড়িত যে শুধু রাফিনকে না
শায়নকেও নিজের হাতের মুঠোতে
নিতে পারে।
কফির ধূমায়িত কাপের দিকে
তাকিয়ে রইলো ও। গরম কফির কাপ
থেকে ধোয়া বের হচ্ছে। নিজের
ভেতর থেকে নিজেরই এক অস্তিত্ব
মিশে যাচ্ছে বাতাসে। কফির কাপে
চুমুক দিতে দিতে রাফিনের ফাইলটা
টেনে সেখান থেকে ফরেনসিক
রিপোর্টের এনভেলাপটা বের করলো
শায়ন। এনভেলাপ থেকে ঐ ছোট্ট
ম্যাসেজের কাগজটার ফরেনসিক
রিপোর্টটা বের করে দেখতে
লাগলো। রিপোর্টে বলা হয়েছে
লিখাটা লিখতে সাধারন বলপয়েন্ট
কলম ব্যবহার করা হয়েছে তবে
রিপোর্টের কোনায় মন্তব্য লেখার
জায়গাটায় ছোট্ট করে একটা লেখা
আছে। সেখানে বলা হয়েছে,
লেখাটা সম্ভবত রাশিয়ান কোন
মানুষের লেখা। কেন সেটা ব্যাখ্যা
করেছেন ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের
হেড ডঃ নজরুল ইসলাম।
মন্তব্য এবং তার ব্যাখ্যা পড়ে শায়ন খুব
পুলকিত অনুভব করলো। সেই সাথে কি
যেন একটার কথা মনে পড়ি পড়ি করেও
মনে পড়ছে না শায়নের।
এনভেলাপ থেকে পরবর্তী কাগজটা
বের করল শায়ন। চিরকূটটা থেকে একটু
মাটির নমুনা পাওয়া গেছে। সেই
মাটি সম্পর্কে বিস্তারিত লেখা
আছে। এই মাটি বাংলাদেশের
কোথায় কোথায় পাওয়া যায় সেটাও
লেখা আছে রিপোর্টে।
যেহেতু চিরকূটটার গায়ে ঐ মাটি
পাওয়া গেছে। তার মানে হয়তোবা
লেখার সময় কাগজটা হাত থেকে পড়ে
গেছিলো মাটিতে। তার মানে
চিরকূটটা কিডন্যাপাররা শায়নের
বাসায় বসে লেখেনি, আগেই লিখে
এনেছে। প্ল্যানেরই অংশ ছিলো
চিরকূটটা, হঠাৎ করে লেখা হয়নি।
কিন্তু একটা ব্যাপার শায়ন বুঝতে
পারছে না, এতো ঝামেলার মাঝে
কেন গেল কিডন্যাপাররা? তারা তো
চাইলে রাফিনের বাসায় বসেই
কাজটা করতে পারতো। আরেকটা
ব্যাপার মোটামুটি ক্লিয়ার হয়েছে,
রাফিন খুন হয়নি। কিডন্যাপারদের
উদ্দেশ্য খুন করা নয়। খুন করতে চাইলে
তারা খুব সহজেই রাফিনের বাসায়ই
রাফিনকে খুন করতে পারতো। তাদের
উদ্দেশ্য হয় রাফিনের কাছ থেকে
ইনফরমেশন বের করা নাহয় রাফিনকে
বন্দী রেখে মুক্তিপণ হিসেবে কিছু
একটা চাওয়া। এবং সেটা যে টাকা
নয় এ ব্যাপারে শায়ন মোটামুটি শিওর।
যারা রাফিনকে ধরে নিয়ে গেছে
তারা নিঃসন্দেহে প্রফেশনাল।
রাফিনের কাছ থেকে ইনফরমেশন
আদায় করাটা করাটা যেমন সহজ হবেনা
তেমনি ওরাও রাফিনকে এত সহজে
রাফিনকে ছেড়ে দেবেনা। ইনফরমেশন
গোপন রাখতে গিয়ে রাফিনকে কি
পরিমাণ টর্চার সহ্য করতে হতে পারে
এটা চিন্তা করে শায়নের কপালে
একটা ভাঁজ পড়লো। পরমুহূর্তেই চোয়াল
দৃঢ় হয়ে গেল তার। কাছের বন্ধু ও
সহকর্মীর ওপর টর্চার সে কোনভাবেই
হতে দেবেনা।
রাফিনের বাসায় যেতে হবে আবার।
হয়ত কোন ব্যাপার চোখ এড়িয়ে গছে
তার। কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে
অবশিষ্ট অংশটুকু পেটে চালান করে
দিলো সে। তারপর প্রায় দৌড়ে বের
হয়ে গেলো অফিস থেকে।
বাইরে পার্ক করে রাখা গাড়িতে
উঠেই ইগনিশনে চাবি ঢুকিয়ে মোচড়
দিতেই স্টার্ট নিলো গাড়িটা।
এক মুহূর্ত দেরী না করে
এক্সিলারেটরে পায়ের চাপ বাড়িয়ে
দিলো।
রাফিনের বাসার দিকে ছুটে চলছে
গাড়ি।
হতাশ বোধ করছে শায়ন।
রাফিনের বাসায় এসে কোন লাভই
হয়নি। ‘বিকেলটাই মাটি হলো’
ভাবতে ভাবতে ব্যালকনিতে গিয়ে
একটা সিগারেট ধরালো শায়ন। হঠাৎই
চোখ গেল কবুতরটার দিকে। একটু ভালো
করে খেয়াল করে দেখলো কবুতরের
ডান পায়ে একটা রিং পড়ানো,
খানিকটা কৌতুহল বোধ করে
কবুতরটাকে খুব সাবধানে ধরে ফেললো
শায়ন। চিকন লোহার রিং টা কেন
কবুতরের পায়ে পড়ানো হয়েছে বুঝতে
পারলো না। যদি এটা কোন টাইপের
গয়না হতো তবে সেটা অন্য কোন দামী
ধাতুর হত।
- স্যার, আমারে ডাকছেন?
বুয়ার ডাকে সম্বিত ফিরে পেলো
শায়ন।
- জ্বী ডেকেছি। এক কাপ চা
খাওয়াতে পারবেন?
- জ্বে স্যার, পারমু। রং চা না দুধ চা?
- রং চা ই দেন।
- জ্বে আইচ্ছা।
বলে চলে যেতে উদ্যত হলো বুয়া। কি
ভেবে শায়ন আবার তাকে ডাকলো।
- খালা, শুনুন।
- জ্বে স্যার?
- আচ্ছা, এই কবুতরটা কি রাফিনের?
- জ্বে, হের নিজের।
- কবুতর কি একটাই ছিল? নাকি জোড়া
ছিল?
- না স্যার, একটাই ছিল। আমি হ্যারে
অনেক দিন কইছি এইডার জোড়া
কিন্না আনতে কিন্তু হ্যায় কিছু না
কইয়্যা খালি হাসে।
- কবে কিনেছিল বলতে পারেন?
- তা হইবো প্রায় বছরখানেক। কিন্তু
এট্টুও যত্ন নেয় না হ্যায়। আমিই পালি।
কি যেন ভাবলো একটু শায়ন। তারপর
আবার জিজ্ঞেস করলো...
- আচ্ছা, ও কি কখনো কবুতরটা নিয়ে
কিছু করে? মানে আমি জানতে চাচ্ছি
কবুতরকে খাওয়ায় নাকি কিংবা আদর
করে নাকি?
- না, তেমুন একটা না। হ্যায় বাসায়ই
তো কম থাকে। থাকলেও কইতরের
ধারে যায়না। তয় মাঝে মাঝে
কইতররে উড়ায়া দিয়া হাততালি
দিয়া খেলে। কইতরডা দুইডা
ডিগবাজি দিয়া অনেক দূর যায়। হ্যায়
চাইয়্যা চাইয়্যা দ্যাহে।
- আচ্ছা, ঠিক আছে। আপনি যান।
বুয়াকে বিদায় করে দিয়ে হাতে ধরা
কবুতরটার দিকে ভালো করে
তাকালো শায়ন। কবুতরটা ‘রেসিং
হোমার’ প্রজাতির। এই কবুতর খুব একটা
সহজলভ্য নয়। সাধারণত রেস খেলার জন্য
এই কবুতর ব্যবহার করা হয়। এই কবুতর কিনতে
গেলেও বেশ কিছু টাকা গুনতে হবে।
কবুতর প্রেমীদের কাছে এই কবুতর অনেক
দামী। তবে কবুতরের প্রতি রাফিনের
ব্যবহারে তাকে কবুতর প্রেমী মনে
হচ্ছেনা। শায়নের কাছে একটু রহস্যজনক
লাগলো কবুতরের বিষয়টা। কবুতরের
পায়ের দিকে তাকাতেই একটা
ব্যাপার খেয়াল করলো শায়ন। সাথে
সাথে কিছু একটা মাথায় আসলো তার।
ব্যাপারটা মাথায় আসতেই মনে হলো
এখুনি অফিসে যাওয়া দরকার। রহস্যের
জট খুলতে শুরু করছে একটু একটু।
............................................................
ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে দাঁড়িয়ে
আছে শায়ন।
জায়গাটা সাভারের কাছাকাছি।
মোটামুটি জনমানবশূন্য এলাকা।
কিডন্যাপারদের ঘাঁটি হিসেবে অতি
উত্তম জায়গা।
সামনে দাঁড়ানো বাড়িটাতেই যে
রাফিন আছে সে ব্যাপারে
মোটামুটি শিওর শায়ন।
- তুমি বাড়ির পেছন দিক দিয়ে ঢুকবে,
আমি সামনের দিকটা দেখবো। কোন
রকম শব্দ করা যাবেনা। এবং একা
কাউকে দেখতে পেলেই গুলি করবে,
যতটা নিঃশব্দে পারো। ওরা কিন্তু
সংখ্যায় অনেক বেশী থাকতে পারে।
সো কোন ভুল করা যাবেনা, সেক্ষত্রে
মার্ডারও হতে পারো। মনে রেখো
সুযোগ কিন্তু একটাই পাবে।
তাসিনকে পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে
দিতেই তাসিন মাথা নেড়ে
জানালো যে সে বুঝতে পেরেছে।
নির্দেশ পেয়েই তাসিন বেড়ালের
মতো নিঃশব্দে সামনে যেতে
লাগলো। আসন্ন রোমাঞ্চকর দৃশ্যের কথা
ভেবে বুকে জমে থাকা নিঃশ্বাসটা
‘হুফ’ করে ছেড়ে দিয়ে সামনে বাড়লো
শায়ন।
বাড়িটার সামনের দিকে একটা
মানুষকে দেখা যাচ্ছে। হালকা
ঝিমুচ্ছে। নিঃশব্দে পা টিপে টিপে
তার সামনে গিয়ে রিভলবারের
বাঁটটা দিয়ে ঘাড়ের পেছনে আঘাত
করলো শায়ন। টুঁ শব্দ করতে পারলো না
লোকটা। নীরবে ঢলে পড়লো। আপাতত
২-৪ ঘন্টা জ্ঞান ফিরবে না আশা করা
যায়।
তাকে একটা গাছের সাথে বেঁধে
মুখে রুমাল গুঁজে বাড়ির ভেতরে
ঢোকার প্রস্তুতি নিলো শায়ন।
পুরো বাড়িটাই অন্ধকার বলা চলে। শুধু
একটা রুমে ডিম লাইটের মত হালকা
আলো জ্বলছে। সেখানেই রাফিন
আছে বলে ধারণা করছে শায়ন।
একটু এগুতেই চোখে পড়লো তাসিন
উল্টাদিক থেকে পা টিপে টিপে
আসছে। শায়নকে দেখে প্রথমে হাতের
২ আঙুল ও পরে একটা হাত গলা কাঁটার
মত করে দেখিয়ে বোঝালো ২ জনকে
খতম করে দিয়েছে।
দুজনে একসাথে হয়ে আস্তে আস্তে
এগুতে লাগলো।
“গুস্তাভ”
হঠাৎ একটা বাজখাঁই কন্ঠস্বর শুনে দুজনেই
পাশে থাকা একটা টেবিলের নিচে
আশ্রয় নিলো।
“গুস্তাভ” আবার ডাকতে লাগলো
দৈত্যটা। ডাকতে ডাকতে তাদের
এদিকেই আসছে। গুস্তাভ যে তাসিনের
গুলিতে ধরাধাম ত্যাগ করেছে সেটা
এখনো বুঝতে দৈত্য বুঝতে পারেনি,
ভেবে কিছুটা স্বস্তি পেল শায়ন।
কাছাকাছি আসতেই টেবিলের একটু
কোণা দিয়ে তাকালো শায়ন।
বাজখাঁই কন্ঠের মালিককে দেখে
বিষম খেল সে, দেখতে আসলেই
দৈত্যের মত। আবছা আলোয় চেহারা
দেখে শায়ন ঠিক বুঝতে পারলো কোন
দেশের লোক সে। হতে পারে স্পেন
বা রাশিয়ার।
টেবিলের একদম কাছাকাছি আসতেই
তাসিন একটা পা বাড়িয়ে দিল।
তাতে দৈত্যের অবস্থানের কোন
পরিবর্তনই হলো না, তবে সে বুঝে
গেলো সে নিরাপদ নয়। দৈত্য কোমরে
হাত দিতেই শায়ন আর দেরী করলো
না। উল্টাভাবে মাথা বের করে একটা
গুলি চালান করে দিল দৈত্যর চিবুক
বরাবর।
রিভলবার ধরা হাতেই স্রেফ কাটা
কলাগাছের মতো পড়ে গেল দৈত্য।
এক সেকেন্ড দেরী হলেই তার
অবস্থাটা কি হতো সেটা আর ভাবতে
চাইছে না শায়ন।
বেচারা তাসিনের দিকে তাকানো
যাচ্ছে না।
তাসিনকে ওঠার তাড়া দিলো শায়ন।
আবার রাফিনের সম্ভাব্য রুমমুখী রওনা
দিলো তারা। প্ল্যান দুজন দরজার দুদিক
দিয়ে আক্রমণ করবে। দরজার যে পাশটার
গা ঘেঁষে শায়ন দাঁড়িয়ে আছে সে
পাশ থেকে রুমের একপাশটা দেখা
যাচ্ছে। তার দৃষ্টিসীমার মাঝে সে
কোন মানুষ দেখতে পেল না।
তাসিনের দিকে তাকাতেই তাসিন
ইশারায় জানালো একজন আছে
ভেতরে। তাসিনকে পূর্বনির্দেশ মত
অপেক্ষা করার ইশারা দিয়ে আচমকা
ঘরে ঢোকার প্রস্তুতি নিতে লাগলো
শায়ন।
শেষ লোকটাকে মারতে মোটেও বেগ
পেতে হয়নি। আচমকা আক্রমণে সে খেই
হারিয়ে ফেলতেই পর পর দুটা বুলেট
তার বুকে পাঠিয়ে দিলো শায়ন।
ঘরের ভেতর একটা চেয়ারে রাফিনকে
বসে থাকতে দেখে হাসি মুখে
এগিয়ে গেল শায়ন। শায়নের দিকে
তাকিয়ে একটা শুকনো হাসি দিয়ে
চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো রাফিন।
- আমাকে কীভাবে খুঁজে পেলে শায়ন
ভাই?
- ওসব কথা পরে হবে। আগে বলো
এখানে মোট কতজন আছে? জানো
কিছু?
- নাহ, শায়ন ভাই।
- আচ্ছা যাই হোক, এটা রাখো, আর
আমার সাথে আসো। আগে এখান
থেকে বেরোতে হবে। তারপর তোমার
সাথে অনেক কথা আছে।
কোমর থেকে অন্য একটা রিভলবার
টেনে বের করে রাফিনের দিকে
এগিয়ে দিলো শায়ন।
আস্তে আস্তে পা টিপে বাড়ির
বাইরে চলে আসলো শায়ন আর রাফিন।
- শায়ন ভাই, আপনার কাছে সারাজীবন
কৃতজ্ঞ থাকবো আমি।
হাঁটতে হাঁটতে কথাগুলো বলছিল
রাফিন।
- আরে রাখো তো।
- এবার বলেন কীভাবে আমার খোঁজ
পেলেন?
- তোমার বাসায় একটা নোট রেখে
এসেছিল কিডন্যাপাররা, আর
সেটাতে লাল মাটির নমুনা পেয়েই
আমার সন্দেহ হয়েছে, তাদের
আস্তানা এমন কোথাও যেখানে
লালমাটি আছে। আর তাদের আস্তানা
যে মোটামুটি ঢাকা থেকে
কাছাকাছি কোথাও এটা তো সহজেই
আন্দাজ করা যায়। দুয়ে দুয়ে চার
মিলিয়ে বের করে ফেললাম।
- ব্রিলিয়ান্ট শায়ন ভাই।
- তোমাকে কারা কিডন্যাপ করেছিল
সেটা সেটা জানো?
- নাহ।
- মাফিয়ার লোকজন।
শুনে রাফিনের মুখটা হা হয়ে গেল।
- আগেই অবাক হয়ো না। এখন এমন কিছু
বলবো যেটা শুনে তোমার অবাক হবার
মাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।
বলেই চুপ হয়ে গেল শায়ন। রাফিনের
চোখে প্রশ্ন দেখে আবার বলা শুরু
করলো শায়ন...
- আর এই মাফিয়া এবং তোমার
কিডন্যাপের সাথে জড়িত আমাদের বস
কর্নেল আনোয়ার হুসাইন।
রাফিনের চোখটা বড় বড় হয়ে গেল।
- আমার আগেই সন্দেহ হয়েছিল যে
আমাদের ভেতরকার কেউ
নিশ্চিতভাবে মাফিয়ার সাথে
জড়িত। নাহয় আমরা যতবারই মাফিয়ার
কোন ডনদের পেছনে লাগি তারা
কীভাবে টের পেয়ে যায়? তোমার
মনে আছে সেবারের কথা? যেবার
তুমি আর আমি তোমার বাসায় বসে
করা ৫ মিনিটের প্ল্যানে সেলিম
চৌধুরীকে ধরতে বেরিয়েছিলাম।
মনে করে দেখো, আমাদের সেই টপ
সিক্রেট প্ল্যানের কথা আমি তুমি
বাদে শুধুমাত্র বস জানতেন। সেবারো
আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এর একটাই কারণ
কোন না কোন ভাবে সেলিম চৌধুরীর
কাছে খবর পৌছে গিয়েছিল। তুমি আর
আমি তো একসাথেই ছিলাম, আমাদের
মাঝে কেউ জানায়নি, তাহলে
সেলিম চৌধুরী খবর পেল কীভাবে?
উত্তর একটাই বস জানিয়েছে। তোমার
কি মনে হয় এ বিষয়ে?
পাশে তাকাতেই দেখলো রাফিন
নেই। পিছে ঘুরে তাকাতেই বুকে
লাথি খেয়ে পড়ে গেল শায়ন।
লাথিটি দিয়েছে তারই বন্ধু রাফিন।
তাল সামলাতে না পেরে প্রায় ৬
ফিট দূরে গিয়ে পড়লো শায়ন।
কিছুটা ধাতস্থ হতেই দেখলো
রিভলবার হাতে সামনে দাঁড়িয়ে
আছে রাফিন, মুখে ক্রুর হাসি।
নিজের কোমরের দিকে হাত
বাড়াতেই রাফিন বলে উঠলো...
- উহু, এই ভুল করো না। তুমি রিভলবার
বের করতে করতেই অন্তত তিনটা বুলেট
তোমার বুকে পাঠানোর ক্ষমতা আমি
রাখি। আমার ক্ষিপ্রতা সম্পর্কে
তোমার থেকে ভালো আর কে জানে,
শায়ন আহমেদ?
বলেই আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে
হাসলো রাফিন।
- কিছু মনে করো না। আসলে তোমার
বিশ্লেষণ শুনে অনেক কষ্টে হাসি
চেপে রেখেছি। আর পারলাম না।
জ্বলজ্বলে চোখ নিয়ে শায়ন শুধু
তাকিয়ে রইলো, কিছু বলল না।
- তোমার ধারণা কিছুটা ঠিক আছে।
আমাদের ভেতর কেউ একজন মাফিয়ার
ইনফরমার হিসেবে কাজ করছে, তবে
সেটা বস নয়, সেটা আমি। লাস্ট ৭ বছর
ধরে আমি মাফিয়ার সাথে আছি।
মাফিয়ার ইনফরমার হিসেবে কাজ
করার উদ্দেশ্যেই আমার
ইন্টেলিজেন্সে জয়েন করা। আর আমার
কিডন্যাপ আমারই সাজানো।
তোমাকে এখানে টেনে আনার
জন্যে। সে উদ্দেশ্যেই মাটিটা
লাগানো হয়েছে ঐ নোটটাতে যাতে
কুকুরের মত গন্ধ শুকে শুকে তুমি এখানে
চলে আসো। এটা তুমিও পারবে তা
আমি জানতাম, তোমার ওপর আমার সে
বিশ্বাসটুকু আছে। তাই এসে ধরা দিলে
আমারই ফাঁদে। তবে এতোটা
তাড়াতাড়ি পারবে বুঝতে পারিনি।
সে জন্যে আমার কোন লোক রেডি
ছিল না, তাই আমি হারালাম আমার
কিছু চৌকস লোককে।
শায়ন কিছু বলল না।
- এখন আমি কি করবো জানো?
তোমাকে খুন করে খুব সুন্দর ভাবে এখান
থেকে পালিয়ে যাবো। সবাই ভাববে
তুমি খুন হয়েছ আমাকে বাঁচাতে এসে।
আর আমি কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে
থাকবো। তারপর বের আসবো। সবাই
ভাববে এজেন্ট রাফিন
কিডন্যাপারদের হাত থেকে
পালিয়ে এসেছে নিজ কৌশলে।
শায়ন তাও কিছু বলল না, মুখের কোনায়
একটু হাসি দেখা গেল শুধু।
- ওহ হো তোমার একটা প্রশ্ন আছে, যদিও
তুমি করনি। তাও আমি বলি, জানতে
ইচ্ছা করছে না কীভাবে সেলিম
চৌধুরী তোমার আমার প্ল্যানের
খবরটা পেল?
মুচকি হেসে জানতে চাইলো রাফিন।
শায়ন এবারও কিছু বলল না, হাসিটা
খানিকটা বিস্তৃতি পেল শুধু।
- বার্তাবাহক হিসেবে কবুতরের কোন
বিকল্প নেই, বুঝলে ভায়া?
হাসিমুখে জানলো রাফিন।
শায়ন কোমরে হাত দিল।
প্রায় সাথে সাথেই ট্রিগার চাপলো
রাফিন !!!
ক্লিক ! ক্লিক !!
কোন গুলি বের হলো না। রাফিন আশ্চর্য
হয়ে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে
আছে। উত্তেজনায় আসলে রিভলবারে
গুলি আছে কিনা সে ব্যাপারটা সে
চেক করেই দেখেনি।
ততক্ষণে শায়নের মুখে শোভা পাচ্ছে
হাসি আর হাতে শোভা পাচ্ছে
রিভলবার।
দেরী না করে রাফিন উল্টো ঘুরে
দৌড় দিতে গিয়ে দেখে ১০ ফিট দূরে
দাঁড়িয়ে আছে তাসিন। তার হাতেও
বিদঘুটেদর্শন রিভলবার। রাফিন বুঝতে
পারলো যে সে ধরা পড়ে গেছে।
- তোমার ব্যাপারে এখানে আসার
আগেই আমি জানতে পেরেছি সব। এখন
বাকিরাও জানবে সব কারণ তোমার
হাতে ধরা আমার দেয়া
রিভলবারটাতে একটা ছোট্ট টেপ
রেকর্ডার আছে। তোমার ‘রেসিং
হোমার’ কবুতরটাই তোমার সর্বনাশ
করলো। আর তাছাড়া এতো
তাড়াতাড়ি তোমাকে কীভাবে
খুঁজে পেয়েছি সেটা দেখেও তোমার
কি একটুও সন্দেহ জাগেনি?
রাফিন কিচ্ছু বলছে না। শুধু তাকিয়ে
আছে শায়নের দিকে।
- দিকনির্দেশনা দিতে কবুতরের কোন
বিকল্প নেই, বুঝলে ভায়া?
রাফিনের দিকে তাকিয়ে মুচকি
হেসে চোখ টিপ দিয়ে বলল শায়ন।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now
X
ইয়াউন্ডির বাণিজ্যিক এলাকায় 'ওকুয়া'র সেই ঘাঁটি।
পিয়েরে পল এবং ফ্রান্সিস বাইক সোফায় পাশাপাশি বসে।
কথা বলছিল ফ্রান্সিস বাইক, 'টেলিফোনে সব কথা বলা যাবে না বলে আপনাকে বিশ্রাম থেকে তুলে এনেছি এখানে। আমি দুঃখিত।'
'ধন্যবাদ বাইক' বলুন। আপনাকে খুব বিষণ্ন মনে হচ্ছে। অভিযানের কোন খবর এসেছে?' বলল পিয়েরে পল।
'এসেছে সেটা বলার জন্যেই তো ডেকেছি।'
'বলুন। খারাপ কিছু?' উদগ্রীব কন্ঠ পিয়েরে পলের।
'খুবই খারাপ। চীফ জাষ্টিসের মেয়েকে কিডন্যাপ করার জন্যে যে চারজনকে আমরা পাঠিয়েছিলাম, তারা সবাই খুন হয়েছে।'
'খুন হয়েছে! চারজনই?' সোজা হয়ে বসল পিয়েরে পল। তার চোখে বিস্ময়।
'হ্যাঁ, চারজনই খুন হয়েছে।'
'পুলিশের হাতে? তুমিতো বলেছিলে পুলিশ আমাদেরই সহযোগিতা করবে!'
'পুলিশ আমাদের সহযোগিতা করেছে। তারা সরেছিল এলাকা থেকে। মেয়েটিকে ধরে গাড়িতে ওঠাবার সময় তার চিৎকারে রাস্তা দিয়ে চলমান একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ে। সেই গাড়ি থেকে একজন যুবক নেমে এসে সব ভন্ডুল করে দেয়। আমাদের চারজন লোককে হত্যা করে। চীফ জাষ্টিসের মেয়ের একজন শ্বেতাংগ বান্ধবী মাত্র আহত হয়েছে, আমাদের লোকদের গুলিতে।'
'একজন যুবক গাড়ি থেকে নেমে এসে এ কান্ড ঘটাল, কি করছিল আমাদের লোকেরা?'
'একটু দূরে মোতায়েন করা আমাদের লোকদের কাছে যা শুনেছি তা উদ্বেগজনক।'
'কি সেটা?'
'মনে হচ্ছে যে লোকটি দুয়ালা, কুম্ভে কুম্বা এবং ইদেজা'য় আমাদের সর্বনাশ করেছে, এ যুবকটি সেই লোক ছিল।'
'আমাদের লোকেরা তার চেহারার কথা কি বলেছে?'
'ফর্সা এশিয়ান।'
'তাহলে এখানেও আহমদ মুসা? ঘটনাস্থলে সে কি করে এল? চীফ জাস্টিসের সাথে তার কোন যোগ আছে? সেদিন তোমাদের বন্দীখানায় যে চারজন মারা গেল, সেটাও কি তাহলে আহমদ মুসার কীর্তি?'
'হতে পারে। তবে চীফ জাস্টিসের সাথে আহমদ মুসার কোন যোগ আছে, তার কোন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের লোক এবং পুলিশের মতে এশিয়ান যুবকটির গাড়ি মেয়েটির চিৎকার শুনে তার সাহায্যের জন্যে থেমেছিল, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।'
'এখন কি ভাবছ?'
ফ্রান্সিস বাইক সোফায় ঠেস দিয়ে বসল। তারপর বলল, 'আহত শ্বেতাঙ্গ মেয়েটিকে নিয়ে ওরা সবাই চলে যায় সামরিক হাসপাতালে। হাসপাতাল থেকে আমাদের লোক জানায়, সেখানে চীফ জাস্টিস, তার মেয়ে, সেই এশিয়ান যুবক সবাই আছে।'
'এশিয়ান যুবকটি কেন?'
'সেই-ই আহত শ্বেতাঙ্গিনীকে তুলে নিয়ে গাড়িতে উঠিয়েছে। সাথেও গিয়েছিল।'
একটু থেমে ফ্রান্সিস বাইক আবার শুরু করল, 'হাসপাতাল থেকে আমাদের লোক আরও জানায়, অপারেশনের পর শ্বেতাঙ্গ মেয়েটিকে এক নম্বর ভিআইপি কেবিনে তুলেছে। সেখানে চীফ জাস্টিস ও তার মেয়েও রয়েছে। গেট ছাড়া তেমন কোন পাহারা নেই। আমি সংগে সংগে গেটের দু'জন গার্ডকে ম্যানেজ করার নির্দেশ দিয়ে ইয়াউন্ডির খোদ অপারেশন কমান্ডার এবং তার সহকারীকে হাসপাতালে পাঠিয়েছি চীফ জাস্টিসের নাকের ডগার উপর দিয়ে তার মেয়েকে ধরে আনার এবং সেই এশিয়ান যুবককে দেখার সাথে সাথে হত্যা করার জন্যে।'
'তোমার এই ত্বরিৎ এ্যাকশনের জন্যে তোমাকে ধন্যবাদ। কিন্তু দু'জন লোক কি কম হয়নি অভিযানের জন্যে?'
'গেটের গার্ড ম্যানেজ হয়ে যাবার পর সেখানে আর কোন ভয় নেই। তাছাড়া যে দু'জনকে পাঠিয়েছি তারা দু'জন দু'ডজনের সমান।'
'চমৎকার। ধন্যবাদ তোমাকে। যিশু আমাদের সহায় হোন।'
'আমিন।'
এই সময় ইন্টারকমে ফ্রান্সিস বাইকের একান্ত সচিবের কন্ঠ শোনা গেল।
ফ্রান্সিস বাইক দ্রুত উঠে টেবিলে গেল। চেয়ারে বসে বলল, 'বল শুনছি।'
'স্যার এইমাত্র হাসপাতাল থেকে জানাল...'
'কি জানাল?'
'জানাল আমাদের দু'জন লোক নিহত হয়েছে।'
কথা শোনার সাথে সাথে ফ্রান্সিস বাইকের চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠল। কথা যোগাল না কিছুক্ষন।
একটু সময় নিয়ে বলল, 'কিভাবে নিহত হলো? কার হাতে নিহত হলো?'
'এক এশিয়ান যুবকের হাতে।’
'এশিয়ান যুবকের হাতে?'
'জি স্যার। যে সময় আমাদের দু'জন লোক এক নম্বর ভিআইপি রুমে প্রবেশ করে, তখন সে ঘরে শুধু এশিয়ান যুবক এবং আহত মেয়েটি ছিল। আমাদের দু'জনেই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে।'
আর কোন কথা না বলে ফ্রান্সিস বাইক টলতে টলতে এসে ধপ করে সোফায় বসে পড়ল। সোফায় মাথাটা ঠেস দিয়ে চোখ বুজে দু'হাতে মাথা চেপে ধরল।
'কি বলল, ওরা দু'জনই এশিয়ান যুবকটির হাতে মরেছে?'
চোখ না খুলেই ফ্রান্সিস বাইক বলল, ‘হ্যাঁ। সব তো শুনলেন। কি সাংঘাতিক ঐ লোকটি!'
'বিস্মিত হচ্ছ ফ্রান্সিস বাইক! তুমি তো জান ফ্রান্সে 'ব্ল্যাক-ক্রস' এর অর্ধশতেরও বেশী লোক ওর হাতে মারা গেছে। বলতে গেলে আমাদের কার্যকরী জনশক্তি ও নিঃশেষ করে দিয়েছে।'
'আমাদের ও সেই অবস্থা হতে যাচ্ছে। আমাদের যে দশজন লোক এই দু'দিনে মারা গেল, তারা ছিল 'ওকুয়া'র হাত পা। তাদের মানের একজনও আর ক্যামেরুনে নেই।'
'এখন কি ভাবনা হওয়া উচিত আমাদের?'
'দেখছি ঐ যুবকটিই আমাদের পথে এখন প্রধান বাধা। তাকে সরাতে না পারলে বোধ হয় আমরা এগুতে পারবো না।'
'ঠিক বলেছ। তবে আমি চীফ জাস্টিসের সাথে একটু আলোচনা করে দেখি আহমদ মুসা বা এশিয়ান যুবকটির সাথে তার কোন যোগ আছে কিনা। থাকলে ভয় দেখিয়েও তাকে দিয়ে এমন কিছু করা যাবে না।'
'কিভাবে বুঝবেন যোগ আছে কিনা?'
'তার সাথে কথা বললেই বুঝা যাবে। তার কথা যদি সহযোগিতামূলক হয়, তিনি যদি তার আগের কথার উপর থাকেন, তাহলে বুঝব আহমদ মুসার সাথে তার কোন যোগাযোগ হয়নি। আর যদি তাকে শক্ত দেখা যায় এবং সহযোগিতা করতে তিনি যদি রাজি না হন, তাহলে পরিস্কার বুঝা যাবে তিনি আর আমাদের হাতে নেই।'
'তার মেয়েকে কিডন্যাপের চেষ্টার কথা যদি তিনি তোলেন?'
'বলব, ওটা আমাদের কাজ নয়। কোন নারীলোভীদের চেষ্টা ওটা। আমরা কিছূ করলে তা ঠেকাবার ক্যামেরুনে কেউ নেই।’
হাসি ফুটে উঠল ফ্রান্সিস বাইকের ঠোঁটে। বলল, 'ভাল যুক্তি। তাকে যদি বুঝানো যায়, তাহলে তো আমরা আমাদের পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে পারি। আর এই সাথে এশিয়ান যুবকটির উপরও চোখ রাখতে পারি।'
'হ্যাঁ আমরা তাই করব।'
ফ্রান্সিস বাইকের ইন্টারকম কথা বলে উঠল। তার একান্ত সচিব জানাল, 'ইদেজা থেকে ফাদার জেমস এসেছেন।'
'পাঠিয়ে দাও।' ফ্রান্সিস বাইক জানাল একান্ত সচিবকে।
মিনিট খানেকের মধ্যেই ফাদার জেমস প্রবেশ করল ঘরে।
ফ্রান্সিস বাইক এবং পিয়েরে পল দু'জনেই উঠে দাঁড়িয়ে তাকে স্বাগত জানাল। হ্যান্ডশেক করতে করতে পিয়েরে পল বলল, 'আপনি তো খারাপ খবর নিয়ে আসেন। আজ কি এনেছেন?'
ফাদার জেমস পাশের সোফায় বসতে বসতে বলল, 'দুর্ভাগ্য আমার, আজকের খবরটাও খারাপ।'
'অসময়ে এবং কোন খবর না দিয়ে হঠাৎ আসাতেই বুঝতে পেরেছি খবর খারাপই হবে। বলুন সেটা কি? খারাপ খবর শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি।' বলল ফ্রান্সিস বাইক।
'কুন্তে কুম্বার প্রস্তাবে আমাদের ইদেজা নেতৃবৃন্দ রাজী হয়েছেন।'
'কারা রাজী হয়েছে বললেন?'
'ইদেজার নেতৃবৃন্দ।'
'ইদেজার নেতৃবৃন্দ কারা?'
'কেন জন স্টিফেন, ফ্র্যাঁসোয়া বিবসিয়েররা।'
'কুন্তে কুম্বার কি প্রস্তাবে তারা রাজী হয়েছেন?'
'সেদিন তো আমি বলে গিয়েছিলাম। লিখেও পাঠিয়েছি।'
'সেগুলো ফাইলে অবশ্যই আছে। কুন্তে কুম্বার প্রস্তাব মনে হচ্ছে, মনে রাখা উচিত ছিল। বলুন প্রস্তাব গুলো।' বলল ফ্রান্সিস বাইক।
'সংক্ষেপে প্রস্তাবগুলো হলো, ইয়াউন্ডি হাইওয়ের দক্ষিনে ইদেজা পর্যন্ত সকল মুসলিম ভূ-খন্ড তাদেরকে ফেরত দেয়া, গত পাঁচ বছরে উচ্ছেদকৃত মুসলমানদের পূনর্বাসন এবং ক্ষতিপূরণ দান, সত্যিকার খৃস্টান মিশনারীরা থাকবে, কিন্তু এন.জি.ওদের ষড়যন্ত্রমূলক কাজ বন্ধ করতে হবে এবং 'কোক'কে লিখিতভাবে তার অপরাধের স্বীকৃতি দিতে হবে।'
'এ প্রস্তাবগুলো জন স্টিফেন এবং বিবসিয়েররা মেনে নিয়েছেন?'
'জি নিয়েছেন।'
'কি করে নিশ্চিত হলেন?'
'আমার সাথে তাদের দেখা হয়েছে।'
'দেখা হয়েছে! আপনার সাথে?'
'হ্যাঁ, আমার সাথে দেখা হয়েছে।'
'অসম্ভব ব্যাপার! কিভাবে দেখা হলো?'
'গতকাল সকালে স্টিফেন-এর চিঠি পেলাম। তাতে তিনি লিখেছিলেন, জরুরী কথা আছে। পত্র বাহকের সাথে এসে আমার সাথে দেখা করবেন। আমি গিয়েছিলাম।'
'ভয় করেনি? আপনাকেও যদি আটকে রাখতো?'
'আমি আমার সন্দেহের কথা পত্রবাহককে বলেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, আমরা যদি আপনাকে আটকাতে চাই, কিডন্যাপ করতে চাই, যে কোন সময়ে তা করতে পারি। এর জন্যে কোন ছলনার প্রয়োজন হয় না। আমি তার কথা বিশ্বাস করেছিলাম।'
'কোথায় আটকা আছে, আপনি জেনেছেন তাহলে।'
'না জানতে পারিনি। চোখে টেপ এঁটে গগলস পরিয়ে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।'
'স্ট্রেঞ্জ! আপনি এতে রাজি হয়েছিলেন?'
'রাজি হয়েছি স্টিফেনের সাথে সাক্ষাতের স্বার্থে।'
'জায়গাটা কোথায় কতদুর কিছুই বুঝতে পারেননি?'
'সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত জীপ গাড়িতে চলার পর আমি সেখানে পৌঁছি। যেখানে নিয়ে আমার চোখ খোলা হয়, সেটা একটা কক্ষ। একটাই মাত্র দরজা। ঘরটি পরিপাটি করে সাজানো। আরামদায়ক বসবাসের মত সবকিছুই সেখানে রয়েছে।'
'জায়গাটা কি কুন্তে কুম্বার কোন স্থানে হবে?'
'না। কুন্তে কুম্বার ডাবল দুরত্বে আমি গিয়েছি।'
'কুন্তে কুম্বার রাস্তা পাকা, তুমি যে পথে গিয়েছ সেটা কেমন ছিল?'
'অধিকাংশই কাঁচা।'
'বল দেখা হওয়ার পর কি হলো? সেখানে কে কে ছিল?'
'জন স্টিফেন এবং ফ্রাঁসোয়া বিবসিয়ের।'
'কি কথা হলো?'
'প্রথমে স্টিফেন আপনাদের কথা জিজ্ঞেস করেছেন। বাইরের পরিস্থিতি কি জানতে চেয়েছেন। তার পর বললেন, 'আমরা অনেক ভেবে দেখলাম ওদের প্রস্তাবে রাজি হওয়া ছাড়া কোন পথ নেই।' আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে কি একথা বললেন?’ তারা উত্তরে বলেছিলেন, 'না তা নয়।' তারপর তারা জানতে চেয়েছিলেন, আমরা FWTV-এর প্রোগ্রাম এবং WNA-এর নিউজ দেখেছি কিনা। আমি হ্যাঁ বলেছিলাম। তারা বলেছিলেন, 'এধরনের প্রোগ্রাম এবং নিউজ আরও আসবে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন, উদ্বাস্তু কমিশন এবং দুনিয়ার মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সাথে তথ্য প্রমাণ সহ লবীং করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই ক্যামেরুন সরকার এসব সংস্থার কাছ থেকে চিঠি পাওয়া শুরু করেছে। আমরা কিছু চিঠির কপি দেখেছি। ফলে ক্যামেরুন সরকার বাধ্য হবে তদন্তে নামতে। আমরা জানতে পেরেছি, মুসলিম উদ্বাস্তুদের একত্র করা হচ্ছে তাদের জমি-জমার দলিল-দস্তাবেজ সহ। তারা ইয়াউন্ডিতে বিশাল মিছিল ও দাবীনামা দেবার ব্যবস্থা করবে। আমরা মনে করি, এসব হলে ‘কোক’ এবং ‘ওকুয়া’র বদনাম হবে। সব গোমর ফাঁস হয়ে যাবে। তার ফলে শুধু ক্যামেরুন নয়, পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশ, এক কথায় গোটা আফ্রিকায় আমাদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এ ক্ষতি এড়ানোর জন্যে যদি ওঁদের চার দফা মেনে নেই তাতে ক্ষতির পরিমাণ আমাদের কম হবে এবং পৃথিবী জোড়া বদনাম এবং ভেতরের ঘটনা ফাঁস হওয়া থেকে আমরা রক্ষা পাব। আমি তাদের এ কথার উত্তরে বলেছিলাম, তাদের দাবী খুব ছোট নয়। জবাবে তারা বলেছিলেন, কিছু দরকষাকষি করার সুযোগ আছে। যেমন তারা দাবী জানিয়েছে, ইয়াউন্ডি হাইওয়ের দক্ষিণের সব মুসলিম ভুখন্ড ফেরত দিতে হবে। এখানে আমি বলেছি, যেসব জমির হস্তান্তর সন্দেহ যুক্ত সেসব জমি ফেরত দেয়া হবে এবং যাদের জমি ফেরত দেয়া হবে না তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার মাধ্যমে পুনর্বাসন করা হবে। চার দফা দাবীর সংশোধনীর একটা প্রিন্টেড কপি আমি তোমাকে দেব। সব কিছু বিচার করে তাদের চার দফা দাবী আমাদের মেনে নেয়া উচিত।’ কথা শেষে স্টিফেন থেমেছিলেন। তারপর বলেছিলেন, ‘আমার এ প্রস্তাব তুমি আমাদের নেতৃবৃন্দকে জানাবে!’
‘স্যার আমি সেই জানাবার দায়িত্ব পালনের জন্যেই এসেছি।’ থামল ফাদার জেমস!
কথা বলল ফ্রান্সিস বাইক! বলল, ‘তোমাদের মধ্যে যখন কথা হয়, তখন সেখানে ওদের কেউ ছিল?’
‘না ছিল না। আমাকে পৌছে দিয়েই ওঁরা চলে গেছে। যদি আড়ি পেতে থাকে, কিংবা কোনভাবে কথা যদি রেকর্ড করে থাকে সেটা ভিন্ন কথা।’
‘জন স্টিফেনরা তাহলে ওদের অনুপস্থিতিতেই এসব কথা বলেছে। তাদের চোখে-মুখে, কথা-বার্তায় কোন ভয়ের চিহ্ন ছিল? মানে, আমি বলতে চাচ্ছি কথাগুলো তাদের আন্তরিক, না শেখানো?’ বলল ফ্রান্সিস বাইক।
‘কথাগুলো তাদের আন্তরিক বলেই মনে হয়েছে।’
‘আপনার মত কি এ সম্বন্ধে?’
‘একক মতামতের কি প্রয়োজন। দরকার সম্মিলিত সিদ্ধান্ত।’
‘তবু আপনি কি ভাবছেন এ নিয়ে? সকলের ভাবনা নিয়েই তো সিদ্ধান্ত হবে।’ বলল ফান্সিস বাইক।
‘আমার মনে হয় স্টিফেনরা ঠিকই বলেছে। শত্রুরা আঁট-ঘাঁট বেধেই কাজ শুরু করেছে। ওদের দাবী মেনে না নিলে বড় ধরনের কেলেংকারীর মধ্যে আমরা পড়তে পারি।’
‘দাবী মেনে নিলে কি কেলেংকারী এড়ানো যাবে? আর ঐ চারটি দাবী মেনে নিলেই কি তাদের দাবী শেষ হয়ে যাবে?’ ফ্রান্সিস বাইক বলল।
‘কুন্তে কুম্বার দাবী তো এটুকুই!’
‘কিন্তু কুন্তে কুম্বাকে যারা বুদ্ধি ও শক্তি দিচ্ছে, তাদের দাবী কিন্তু এটুকুই নয়। তাদের লক্ষ্য সমগ্র দক্ষিণ ক্যামেরুনের সকল মুসলিম ভুখন্ড ফেরত নেয়া এবং তাদের পুনর্বাসন করা।’ ফান্সিস বাইক বলল।
‘আমি একথা স্টিফেনকে বলেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, সে দাবী এখনো উঠেনি। যদি তা উঠেই যুক্তি-প্রমাণ সহকারে, তাহলে আমরা তা অস্বীকার করতে পারবো না।’
‘এটা তার কথা, সকলের কথা নয়।’ বলল ফ্রান্সিস বাইক।
‘তাহলে বলুন, এখন কি করণীয়?’
‘করণীয় হলো, এক শয়তান এশিয়ান প্রবেশ করেছে ক্যামেরুনে তাঁকে ধ্বংস করা।’
‘কে সে? তাকে ধ্বংস করলেই কি সব ঠিক হয়ে যাবে?’
‘আপনি জানেন না কুন্তে কুম্বাকে সেই জাগিয়েছে। কুন্তে কুম্বা যা করেছে সবই তার পরামর্শ। ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভি, ওয়ার্ল্ড নিউজ এজেন্সী যে সংবাদ প্রচার করেছে তাও তারই গোপন হাতের কারসাজি। সর্বোপরি, এ পর্যন্ত প্রায় ২০ জনের মত লোক তার হাতে নিহত হয়েছে।’
‘অবিশ্বাস্য কথা বলছেন। এমন বিশ্বকর্মা কে সে?’
‘হ্যাঁ তাকে বিশ্বকর্মা বলতে পার। গোটা বিশ্বেই সে কাজ করছে। কিন্তু একশ ভাগ নিশ্চিত না হয়ে তার নাম আমরা বলব না।’
কয়েক মুহুর্ত চুপ থাকল ফাদার জেমস। তারপর বলল, ‘আমি তাহলে কি জানাব মিঃ স্টিফেনদের?’
‘জানাবেন তাদের প্রস্তাবে কেউ রাজি নন। আরও জানাবেন, কি করতে হবে না হবে তা মুক্তরা ঠিক করবে, বন্দীরা নয়।’
‘এইভাবে কথা বলা কি ঠিক হবে? আমরা তাদের মুক্তির জন্যে কিন্তু কিছুই করতে পারিনি।’
‘সব সময় সবকিছু সহজে করা যায় না। এক্ষেত্রে ধৈর্য ধরতে হয়। মুক্ত হতে পারছি না বলে জাতিকে বিক্রি করে দিয়ে মুক্ত হতে হবে তা ঠিক নয়।’
‘ওরা কিন্তু নিজের মুক্তির জন্যে এ কথা বলেনি, জাতির স্বার্থেই এটা ছিল ওদের সুচিন্তিত অভিমত।’
উত্তর দিতে যাচ্ছিল ফ্রান্সিস বাইক। কিন্তু তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ পরে মুখ খুলল পিয়েরে পল। বলল, ‘বিষয়টা যদিও আপনাদের সংগঠনের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার, তবু বিষয়টা যেহেতু জাতীয়, তাই কথা না বলে পারছি না।’
বলে একটু থামল পিয়েরে পল। তারপর আবার শুরু করল, ‘পশ্চাতাপসরণকে জাতীয় স্বার্থ বলছেন ফাদার জেমস! জাতীয় স্বার্থ সামনে অগ্রসর হওয়ার মধ্যে। যিশুর ক্রস দক্ষিণ ক্যামেরুন থেকে ক্রিসেন্টকে বিতাড়িত করেছে। এখন ‘ক্রস’ – এর টার্গেট উত্তর ও পূর্ব ক্যামেরুনকে ক্রিসেন্ট এর স্পর্শ থেকে মুক্ত করা। এরপর ক্রস অগ্রসর হবে নাইজেরিয়া ও চাদ হয়ে আরও উত্তরে, আরও পুবে।’
টেবিল চাপড়ে ফ্রান্সিস বাইক বলল ‘ফাদার জেমস মিঃ পিয়েরে পল যে কথা বলেছেন, এটাই জাতির কথা, জাতির স্বপ্ন। এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের আমরা সৈনিক। আমরা কোন নীতি-দুর্নীতির পরোয়া করি না। উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে, স্বপ্ন সার্থক করার জন্যে যা করা দরকার তা করেছি এবং করব।’
‘আমি মনে করি স্টিফেনরাও এটাই, মনে করেন স্যার। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষ কেবল সামনেই অগ্রসর হয় না। কৌশলগত কারণে তাকে অনেক সময় পিছাতেও হয়। স্টিফেনরা এই কৌশলের কথাই বলেছেন।’
‘যুক্তি হিসেবে আপনার কথা ভাল। কিন্তু পিছানোর কৌশল নেয়ার সময় এসেছে বলে আমি মনে করি না। বলতে গেলে লড়াই এখন একজনের সাথে। একজনের ভয়ে আমরা পিছু হটব, এটা কি সুস্থ পরামর্শ হতে পারে মিঃ জেমস?’ বলল পিয়েরে পল।
‘একজন কিংবা কয়জন সেটা বোধ হয় বিবেচ্য বিষয় নয় স্যার। বিবেচ্য বিষয় হলো, আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় দিক দিয়েই প্রথম বারের মত এমন এক সংকটে আমরা পড়েছি যা সত্যিই আমাদের বিপদে ফেলতে পারে।’
একটু দম নিল ফাদার জেমস। তারপর বলল, ‘দেখুন স্যার, জন স্টিফেন এবং ফ্রাঁসোয়া বিবসিয়ের আফ্রিকায় খৃষ্টের সৈনিক-বাহিনীর সবচেয়ে আত্ম-নিবেদিত, নিঃস্বার্থ এবং সাহসী সেনাধ্যক্ষ। সেই দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ক্রসের যে অগ্রাভিযান শুরু হয়েছে, তাতে মিঃ জন স্টিফেন এবং ফ্রাঁসোয়া বিবসিয়ের সব সময় অগ্র-বাহিনী পরিচালনার ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। স্যার আমরা জানি ইদেজা এখন ক্রসের উত্তর ও পুবমুখী যাত্রার অগ্রবর্তী ঘাঁটি এবং এ ঘাঁটির দায়িত্বে রয়েছেন জন স্টিফেন এবং ফ্রাঁসোয়া বিবসিয়ের। সুতরাং আমি মনে করি, তাদের মতামতের একটা মুল্য আছে।’
চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছে পিয়েরে পলের। তাতে অসন্তুষ্টির একটা বিস্ফোরণ। বলল সে, ‘জবাব দিন ফাদার ফ্রান্সিস বাইক।’
ফ্রান্সিস বাইকের মুখ গম্ভীর। সে বলল, ‘আরও একটা কথা বলেননি ফাদার জেমস। সেটা হলো, আপনি অগ্রবর্তী ইদেজা ঘাঁটির তথ্য প্রধান। অতএব আপনার মতামতেরও মূল্য আছে।’
একটু থামল ফ্রান্সিস বাইক।
ফ্রান্সিস বাইকের কথায় ফাদার জেমস এর চোখ-মুখও লাল হয়ে উঠেছে। তার চোখে-মুখে অপমানিত হওয়ার চিহ্ন।
ফ্রান্সিস বাইক আবার শুরু করল, ‘দেখুন ফাদার জেমস, আমরা জন স্টিফেন এবং ফ্রাঁসোয়া বিবসিয়েরকে শ্রদ্ধা করি, কিন্তু আমরা বন্দীদের কথায় পরিচালিত হতে পারি না। বন্দী হওয়ার পর তারা আর আপনার কিংবা কারো নেতা নন। সুতরাং আমরা তাঁদের মতামতের কানা-কড়ি মূল্য দিতে রাজী নই। কথাটা আপনার কাছে পরিষ্কার?’
‘জি স্যার।’ মুখ নিচু করে বলল ফাদার জেমস।
‘এখন থেকে আপনার নেতৃত্বে চলবে ইদেজা ঘাঁটি। আর আমাদের না জানিয়ে কোন কথা বলবেন না জন স্টিফেনদের সাথে। ঠিক আছে?’
‘ঠিক আছে স্যার।’ মুখ না তুলেই বলল ফাদার জেমস। মুখ তুললে দেখা যেত, তার মুখে প্রবল অসন্তুষ্টির চিহ্ন। একটা পুরানো ঝড় তার মনে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছেঃ ‘আমরা কি সত্যই খৃষ্টের আধ্যাত্ম-সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছি, না ভুমি-লিপ্সা বা সাম্রাজ্য লিপ্সা চরিতার্থ করছি!’
কিছু বলতে যাচ্ছিল ফাদার জেমস। এই সময় মুখ খুলল ফ্রান্সিস বাইক। বলল, ‘মিঃ পিয়েরে পল, বসে থাকা তো যায় না। আমরা এখন কি করতে পারি?’
‘শয়তানটাকে খুঁজে বের করা এখন প্রধান কাজ।’
‘কিন্তু কিভাবে? তার কি কোন ফটো আছে?’
‘আছে। ফ্রান্সে।’
‘আপনি তো দেখেছেন।’
‘ফটো দেখেছি। কিন্তু সমস্যা হলো এক পোশাকে এবং এক মুখাবয়বে সে থাকে না।’
‘তবু আমরা মোটামুটি একটা বর্ণনা সহ একজন এশিয়ানের সন্ধানে লোক লাগাতে পারি।’
‘হ্যাঁ, তাই করতে হবে।’
কিছু বলতে যাচ্ছিল ফ্রান্সিস বাইক।
তার আগেই ইন্টারকম কথা বলে উঠল, ‘নাস্তা রেডি। মেহমান নিয়ে আসুন।’
ফ্রান্সিস বাইক এবং পিয়েরে পল উঠে দাঁড়াল। তার সাথে ফাদার জেমসও।
রোড ম্যাপ অনুসরণ করে আহমদ মুসা যখন ‘লা-ফ্যাংগ’ রোডে পৌছল তখন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা।
রাশিদি ইয়েসুগোর বাড়ি থেকে মাগরিবের নামায পড়ে ‘ওকুয়া’র গাড়ি থেকে পাওয়া ঠিকানা নিয়ে আহমদ মুসা বেরিয়েছে ওকুয়া অথবা কোক-এর ঘাঁটির সন্ধানে। আহমদ মুসা নিশ্চিত নয় যে ঠিকানা সে পেয়েছে তা ওকুয়া না কোক-এর ঘাঁটি, না তাদের কোন লোকের ঠিকানা ওটা।
আহমদ মুসার ইচ্ছা ছিল দিনের আলোতে ‘লা-ফ্যাংগ’ রোডে পৌছা, যাতে ঠিকানা খুঁজে পাওয়া সহজ হয়। কিন্তু চীফ জাস্টিসের বাড়ি থেকে ফিরে গোসল করে খেয়ে রেষ্ট নিতে গিয়ে আহমদ মুসা ঘুমিয়ে পড়েছিল।
রাশিদি ইয়েসুগো ইচ্ছা করেই তাকে ডাকেনি। লায়লা ইয়েসুগো স্মরণ করিয়ে দিলে সে বলেছিল, ‘ঘুম তার প্রয়োজন বলেই এসেছে। যে ধকল গেছে গত কয়েক ঘন্টায়, ওর বিশ্রাম দরকার।’
‘কি মজা না ভাইয়া, মারিয়া জোসেফাইন আহমদ মুসার বাগদত্তা!’ বলেছিল লায়লা ইয়েসুগো।
‘ডাক নাম তো ডোনা জোসেফাইন, না?’
‘হ্যাঁ ভাইয়া, ফরাসী রাজকুমারী বলে নয়, তিনি আহমদ মুসার সত্যিই উপযুক্ত সঙ্গিনী।’
‘এত কিছু জেনে ফেলেছিস তুই?’
‘কেন, মুহাম্মাদ ইয়েকিনির কাছে তুমিও তো শুনলে! শুনলে না যে, তিনি আহমদ মুসার সন্ধানে একক সিদ্ধান্তে ফ্রান্স থেকে ক্যামেরুন চলে এসেছেন। শুনলে না, আজকের দু’টি ঘটনায় কি সাংঘাতিক পরিস্থিতিতে মারিয়া জোসেফাইন ‘ওকুয়া’র দু’জন লোককে হত্যা করেছে। কত বড় সাহস থাকলে এটা পারে বলত।’
‘কিন্তু তুই তো পিস্তল চালাতেও পারিস না।’
‘এর জন্যে তোমরা দায়ী। ইয়েসুগো পরিবারের মেয়েদের কাজ করা, পরিশ্রম করা তোমরা নিষিদ্ধ করে রেখেছ। কিন্তু আজ তোমাকে বলছি ভাইয়া, আমি শুধু পিস্তল নয়, মেশিন গানও চালাতে জানি। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুটিং ক্লাবের সদস্য।’
‘তোকে অভিনন্দন লায়লা। ঐ নিষিদ্ধের কাজটা আমি করিনি। সংগ্রামের যে সময় এসেছে, তাতে ঐ অতীত ঐতিহ্য আর মানা যাবে না। ইসলামের সোনালী যুগে মেয়েরাও যুদ্ধ করেছে।’
‘ধন্যবাদ ভাইয়া’, বলে একটু থেমেছিল লায়লা। বলেছিল তারপর, ‘আমরা সত্যিই ভাগ্যবান ভাইয়া, কিংবদন্তির আহমদ মুসা আমাদের মেহমান এবং তার বাগদত্তা মারিয়া জোসেফাইন আমরা বন্ধু’।
‘তা বটে। তবে সত্যিকার আনন্দ আমাদের তখনই হবে, যখন তিনি বিজয়ী হবেন, মিশন যখন তার সফল হবে, যে সংগ্রামের মিশন নিয়ে তিনি ক্যামেরুনে এসেছেন।’
‘ক্যামেরুনে মুসলিম জাতির অস্তিত্ব যে বিনাশের মুখে, এ বিষয়টা তো আমরা এমন করে ভাবিনি যেমন করে ভেবে ছুটে এসেছেন আহমদ মুসা।’
‘ভেবেছি হয়ত আমরা। কিন্তু এ পরিণতি আমরা মেনে নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, এভাবে ধ্বংস হওয়াটাই আমাদের ভাগ্য, করার কিছু নেই।’
‘কিন্তু আহমদ মুসা তা ভাবেননি। তিনি জয়ের কথা ভেবেছেন, বিজয়ের জন্যেই তিনি ছুটে এসেছেন।’
‘এখানেই আহমদ মুসার সাথে আমাদের পার্থক্য।’
‘কিন্তু ভাইয়া, কিভাবে তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করবেন?’
‘সামনে কি হবে আল্লাহই জানেন। কিন্তু ইতিমধ্যেই তিনি যা ঘটিয়েছেন, তাতে সম্ভাবনার দ্বার খুলে গেছে। তুই তো শুনেছিস, কুন্তে কুম্বার চার দফা প্রস্তাব ইন্দেজার বন্দী নেতারা মেনে নিয়েছেন। তাদের নেতারা এটা মানবেন কিনা জানি না। তবে তারা এখন আক্রমণাত্বক অবস্থান থেকে রক্ষণাত্মক ভূমিকায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে।’
আহমদ মুসা যখন বাদ মাগরিব রাশিদি ইয়েসুগোর বাড়ি থেকে বের হচ্ছিল, তখন সেখানে রাশিদি এবং ইয়েকিনি হাজির ছিল। রাশিদি ইয়েসুগো মুখ ভার করে বসেছিল, ‘আপনার যুক্তি খন্ডন করার সাধ্য আমাদের নেই। কিন্তু একা বের হচ্ছেন অভিযানে, আমার খুব খারাপ লাগছে আপনাকে একা ছেড়ে দিতে।’
‘ধন্যবাদ’ দিয়ে কোন কথা না বলে হেসে বিদায় নিয়েছিল আহমদ মুসা।
‘লা-ফ্যাংগ’ রোডের মাঝামাঝি জায়গায় নেমে গাড়ি ছেড়ে দিচ্ছিল আহমদ মুসা।
‘লা-ফ্যাংগ’ ইয়াউন্ডির পুরানো এলাকার রাস্তা হলেও বেশ প্রশস্ত এবং সুন্দর সাজানো গুছানো।
মধ্য ক্যামেরুনের বিখ্যাত ‘ফ্যাংগ’ গোত্রের নাম অনুসারে এই রাস্তার নামকরণ। শহরের এই অঞ্চলে ‘ফ্যাংগ’ গোত্রের নিবাস।
আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির ভাড়া চুকিয়ে দিতে যাচ্ছে, এমন সময় সমবেত কন্ঠের হৈ চৈ ও চিৎকার শুনতে পেল। তাকিয়ে দেখল, পনের বিশজন লোক মহা হৈ চৈ-এর সাথে একজন লোককে তাড়া করছে। সবাই কৃষ্ণাংগ।
যাকে তাড়া করেছে সে পাগলের মত প্রাণপণে ছুটছে বাঁচার জন্যে। কিন্তু পারছে না। আক্রমণকারীদের সাথে তার দূরত্ব কমে আসছে।
কাছাকাছি এলে আহমদ মুসা দেখল, লোকটি আহত। কপাল দিয়ে নেমে আসা রক্তের ধারা মুখ প্লাবিত করে গড়িয়ে পড়ছে।
হৃদয়টা কেঁদে উঠল আহমদ মুসার।
ভাড়ার টাকাটা পকেটে রেখে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ফরাসী ভাষায় বলল, ‘দাঁড়াও তোমরা।’
আহমদ মুসার কথা শুনে পলায়নরত লোকটি আহমদ মুসার দিকে একবার তাকিয়েই ছুটে এল এবং আহমদ মুসার পায়ের কাছে আছড়ে পড়ে আর্তনাদ করে ফরাসী ভাষায় বলল, ‘আমাকে বাঁচান। মেরে ফেলবে ওরা আমাকে।’
আক্রমণকারী লোকেরা মুহূর্তের জন্যে থমকে দাঁড়িয়েছিল। তারপরেই ওরা সমবেতভাবে এগুলো আবার আহমদ মুসার পায়ের কাছে পড়ে থাকা লোকটির দিকে। লোকগুলোর কারো হাতে লাঠি, কারো হাতে ছোরা।
আহমদ মুসা পায়ের কাছে এসে পড়া লোকটিকে বাঁ হাত দিয়ে টেনে তুলে পাশে দাঁড় করাল। লোকটি দাঁড়িয়ে আহমদ মুসার পেছনে সরে এল।
আহমদ মুসা তার দিকে অগ্রসরমান লোকদের উদ্দেশ্য করে বলল, ‘তোমরা আর এক পা এগুবে না। এভাবে তোমরা আইন হাতে তুলে নিতে পার না।’
কিন্তু ওরা আহমদ মুসার কথা শুনল না। আগে কয়েকজন এগিয়ে আসছিল, এবার সকলেই এগিয়ে আসতে শুরু করল।
আহমদ মুসা তার জ্যাকেটের পকেট থেকে মেশিন রিভলবার বের করে তাদের দিকে তাক করে কঠোর কন্ঠে বলল, ‘আর এক পা এগুলে গুলী চালাব। সবাইকে লাশ বানাব।’
এবার থমকে গেল ওদের এগিয়ে আসা।
ওদের মধ্যে একজন ফরাসী ভাষায় চিৎকার করে বলল, ‘ওকে আমাদের হাতে ছেড়ে দাও। ও আমাদের মেয়েকে কিডন্যাপ করেছে।’
‘একে তোমরা চেন?’
‘চিনি’, ওদের একজন বলল।
‘নাম জান?’
‘জানি।’
‘ঠিকানা জান?’
‘জানি।’
‘তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নাও। তোমাদেরকে আইন হাতে তুলে নিতে দেব না।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা আহত লোকটিকে গাড়িতে উঠতে বলল এবং নিজেও পিছু হটে গাড়ির দিকে চলল।
আহমদ মুসারা চলে যাচ্ছে দেখে আক্রমণকারী লোকরাও এগিয়ে আসতে লাগল সতর্কতার সাথে।
আহত লোকটি আগেই গাড়িতে উঠে বসেছিল। আহমদ মুসাও উঠে বসল।
ওরা ছুটে এসে গাড়ি ঘেরাও করতে অগ্রসর হলো।
আহমদ মুসা গাড়ি ছাড়তে বলল ট্যাক্সিওয়ালাকে।
‘স্যার ওরা ‘ফ্যাংগ’ গোষ্ঠী। আমার গাড়ির নাম্বার দেখে ফেলেছে। পরে আমাকে ধরবে।’ গাড়ি স্টার্ট না দিয়েই বলল একথাগুলো।
‘দেখ আমি কাউকে দুইবার নির্দেশ দেই না। তোমার দোষ হবে কেন? তুমি নির্দেশ পালন করছ মাত্র।’ শান্ত অথচ কঠোর কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
ট্যাক্সিওয়ালা আহমদ মুসার দিকে একবার চেয়ে গাড়ি ছেড়ে দিল।
ইতিমধ্যেই গাড়িতে লাথি ও লাঠির বাড়ি এসে পড়তে শুরু করেছে।
কিন্তু সহজেই ওদের ঘেরাও ভেদ করে গাড়ি বেরিয়ে গেল।
আহমদ মুসা আহত লোকটিকে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার নাম কি?’
‘অগ্যাস্টিন ওকোচা।’
‘বল, তুমি কোথায় যাবে?’
‘লা-ফ্যাংগ’ রোডের মুখে ‘ওয়ান্ডি এ্যাভেনিউ’তে আমার বাড়ি।’
‘ওয়ান্ডি এ্যাভেনিউতে নিয়ে চল ড্রাইভার’, ট্যাক্সিওয়ালার দিকে চেয়ে বলল আহমদ মুসা।
‘ওরা যে অভিযোগ করল, সেটা সত্য কিনা ওকোচা?’ আহত লোকটির দিকে চেয়ে আহমদ মুসা বলল।
‘ওরা মিথ্যা কথা বলেছে। আমি কিডন্যাপ করিনি। আমরা পরস্পরকে বিয়ে করেছি।’
‘তাহলে ওদের ওরকম কথা বলা এবং সাংঘাতিক ক্রোধের কারণ কি?’
‘কারণ ওরা ‘ফ্যাংগ’ গোত্রের এবং আমি ‘ওয়ান্ডি’ গোত্রের।’
‘শত্রুতা কিসের দুই গোত্রের মধ্যে?’
‘শত্রুতা নয়, আত্মসম্মানের প্রশ্ন।’
‘আত্মসম্মানের প্রশ্ন?’
‘এই দুই গোত্র অন্য গোত্রের মেয়ে নেয়াকে বিজয়ের এবং মেয়ে দেয়াকে পরাজয়ের মনে করে। আমরা শিকার হয়েছি এই মর্যাদা-সংকটের। আমার গোত্র আমার বিয়েকে স্বাগত জানিয়েছে, কিন্তু ‘ফ্যাংগ’ গোত্র মেয়েটিকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। ব্যর্থ হওয়ায় আমাকে হত্যার উদ্যোগ নিয়েছে।’
‘এ ধরনের সব বিয়েতেই কি এমন হয়?’
‘এতটা হয় না। আমার স্ত্রী ‘ফ্যাংগ’ গোত্রের সরদারের মেয়ে। তাদের গোত্র ও সরদারের অপমানে তারা মরিয়া হয়ে উঠেছে। আপনি আশ্রয় না দিলে ওরা আজ আমাকে হত্যা করত।’ বলতে বলতে কেঁদে ফেলল ওকোচা।
‘এই যখন অবস্থা তুমি সাবধান হওনি কেন?’
ওকোচা চোখ মুছে বলল, আমি সব সময় সাবধান। ‘ফ্যাংগ’ এরিয়ায় আমি আসি না। ফ্যাংগ গোত্রের আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু মৃত্যু শয্যায়। গোপনে তাকে দেখতে এসেছিলাম। কিন্তু ব্যাপারটা প্রকাশ হয়ে পড়ায় আমি বিপদে পড়ে যাই।’
‘দুই গোত্রের মধ্যেকার এই বিরোধ বা ভুল বুঝাবুঝির সমাধান কি?’
‘শিক্ষিত হওয়া এবং সামাজিক রীতি-নীতির কিছু পরিবর্তন হওয়া।’
‘দুই গোত্র কোন ধর্মের অনুসারী?’
‘ফ্যাংগ গোত্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তাদের গোত্র ধর্মের অনুসারী। কিন্তু ওয়ান্ডী গোত্রের অর্ধেকই খৃস্টান। বাকি অর্ধেকের তিন ভাগের দুই ভাগ গোত্র ধর্মের এবং এক ভাগ মুসলমান। কিন্তু ফ্যাংগ গোত্রে খৃস্টানদের সংখ্যা খুবই নগন্য। সে গোত্রে গোত্র ধর্মের বাইরে যারা আছে তাদের চার ভাগের তিন ভাগই মুসলমান। তবে ফ্যাংগ গোত্রের খৃস্টানরা সংখ্যায় নগণ্য হলেও তারা শিক্ষিত বিত্তবান এবং প্রভাবশালী।’
‘ফ্যাংগ গোত্রে খৃস্টানের সংখ্যা কম এবং ওয়ান্ডি গোত্রে খৃস্টানের সংখ্যা বেশি কেন?’
‘ফ্যাংগ গোত্রের সাথে উত্তরের মুসলিম প্রধান ফুলানি গোত্রের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে যে কারণে খৃস্টানরা উত্তরের ফুলানী গোত্রের মধ্যে প্রবেশ করতে পারেনি, সে কারণেই সম্ভবত ফ্যাংগ গোত্রের উপর খৃস্টানদের প্রভাব কার্যকর হয়নি।’
আহমদ মুসার বুঝতে বাকি রইল না ওয়ান্ডি গোত্র পুরোপুরিই খৃস্টান প্রভাবিত, ফ্যাংগ গোত্র তা নয়। কিন্তু আহমদ মুসা ওকুয়া’র যে দুটি ঠিকানা নিয়ে এসেছে তার একটি ‘ফ্যাংগ’ রোডে, অন্যটি ‘ওয়ান্টি’ এ্যাভেনিউতে। খৃস্টান প্রভাবের দৃষ্টিকোণ থেকে তো ‘ফ্যাংগ’ রোডে ওকুয়া’র কোন ঘাঁটি থাকার কথা নয়। আহমদ মুসার মনে পড়ল ‘ওকোচা’র কথা। ‘ফ্যাংগ’ গোত্রে খৃস্টানদের সংখ্যা কম হলেও কম সংখ্যক খৃস্টান যারা আছে তারা বুদ্ধিমান, বিত্তবান ও প্রভাবশালী। সুতরাং তাদের আশ্রয়ে ‘ওকুয়া’র ঘাঁটি গড়ে উঠতেই পারে।
‘ওয়ান্ডি’ এ্যাভেনিউ-এর বিশাল বাড়ির গেটের সামনে আহমদ মুসার গাড়ি দাঁড়াল।
‘ওকোচা’ গাড়ি থেকে মুখ বের করে একটা সংকেত দিল। সংকেতটাকে আহমদ মুসার কাছে গেরিলার বন্ধু বৎসল ডাক-এর মত মনে হলো।
ওকোচা’র সংকেতের সাথে সাথেই গেটের দরজা খুলে গেল।
আহমদ মুসা বলল, ‘ভেতরে যাবার তো প্রয়োজন নেই।’
‘একটু কষ্ট করুন।’ বলল ওকোচা।
গাড়ি গিয়ে গাড়ি বারান্দায় প্রবেশ করল।
গাড়ি থেকে নামল ওকোচা।
গাড়ি ঘুরে এসে আহমদ মুসার দরজা খুলে ধরে ওকোচা বলল, ‘দয়া করে একটু নামুন।’
‘ওকোচা, আমি জরুরী কাজে বেরিয়েছি। আমি সময় নষ্ট করতে পারবো না। আমাকে মাফ কর।’
‘তুমি বলে সম্বোধন করে আমাকে ছোট ভাইয়ের মর্যাদা দিয়েছেন, আমার বাড়িতে একটু পদধুলি দিয়ে আমাকে ধন্য করুন।’
আহমদ মুসা নামল গাড়ি থেকে।
ওকোচা আহমদ মুসাকে নিয়ে প্রবেশ করল ড্রইংরুমে।
ততক্ষনে রক্তাক্ত ওকোচার খবর বাড়ির ভেতরে পৌঁছে গিয়েছিল। ব্যস্তভাবে বাড়ির সকলেই এসে প্রবেশ করল ড্রইংরুমে।
একজন মাঝ বয়সী মহিলা আর্তনাদ করে জড়িয়ে ধরল ওকোচাকে। আরেকজন তরুণী, এক বাক্যেই যাকে ব্ল্যাক বিউটি বলা যায়, তাকিয়ে ছিল উদ্বেগ ও বেদনা পীড়িত দৃষ্টি নিয়ে ওকোচার দিকে। আরও অনেকের মধ্যে সর্বাগ্রে এসে দাড়িয়েঁছিল অটুট স্বাস্থ্যের একজন মাঝ বয়সী ভদ্রলোক। আহমদ মুসার বুঝতে অসুবিধা হলো না, মাঝ বয়সী মহিলাটি ওকোচার মা, তরুণীটি স্ত্রী এবং প্রৌঢ় ভদ্রলোক তার আব্বা।
‘ওকোচা ঘটনা কি, আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা।’ উদ্বেগ মেশানো গম্ভীর কণ্ঠে বলল ভদ্রলোকটি।
ওকোচা তার মা’কে শান্ত করে তার আব্বার দিকে তাকাল এবং আহমদ মুসাকে দেখিয়ে বলল, ‘আব্বা, এই ভদ্রলোককে আমি জানি না, তার নামও এখনো আমি শুনিনি। কিন্তু তিনি দেবদূতের মত আর্বিভূত হয়ে আমাকে বাঁচিয়েছেন। তিনি বাঁচাতে এগিয়ে না এলে এখন আমার লাশ পড়ে থাকতো ‘লা ফ্যাংগ’ রোডে।’
‘কেন? ব্যাপার কি? ফ্যাংগ’রা তোমাকে . . ..
‘হ্যাঁ, আব্বা। ওরা টের পেয়ে যায় যে, আমি বন্ধুর বাড়িতে গেছি। ওরা পনের বিশ জন আমাকে আক্রমণ করে ফেরার পথে ওবাড়ি থেকে বের হবার পরই। আহত অবস্থায় আমি দৌড়ে পালাচ্ছিলাম। ইনি বিদেশী বলেই বোধ হয় সাহায্য করতে আসেন। এঁর হাত থেকেও ওরা আমাকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছিল। ইনি রিভলবার বের করে ওদের মাথা গুঁড়িয়ে দেবার হুমকি না দিলে আমাকে ছিনিয়েই নিয়ে যেত।’
চোখ লাল হয়ে উঠল ওকোচার আব্বার। ভয়ংকর হয়ে উঠল তার কাল মুখ। বলল, ‘তুমি চেন তাদের?’
‘কয়েকজনকে চিনি।’
‘তাদের বাড়ি?’
‘আমার বন্ধু ‘সেবজী’র বাড়ির পাশের ওরা।’
‘আজ রাতেই এর প্রতিশোধ আমি নেব।’ হুংকার দিয়ে উঠল অগাষ্টিন ওকোচার আব্বা।
বলে সে কয়েক ধাপ সামনে এগিয়ে এসে আহমদ মুসার সামনে দাড়িয়ে তার একটা হাত তুলে নিয়ে চুমু খেয়ে বলল, ‘আমরা আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। তুমি একটু বসো বাবা। আমি একটু বেরুব।’
আহমদ মুসা দেখল ওকোচার আব্বা শান্তভাবে কথা বলতে চেষ্টা করলেও তার মুখের ভয়ংকর ভাব যায়নি এবং তার চোখে জ্বলছে প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে।
আহমদ মুসা বুঝল সে কোথায় যাচ্চে। বাইরে যাচ্ছে দল গুছাতে। তারপরই যাবে অভিযানে।
‘আমি একটা কথা বলতে পারি আপনাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে?’ ওকোচার আব্বার দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা।
‘অবশ্যই বলবে।’ ওকোচার আব্বা চলতে শুর করেও থমকে দাঁড়িয়ে বলল।
‘আমার মত হলো এ ধরণের পাল্টা অভিযানে না যাওয়াই ভালো।’
‘কেন?’
‘এতে বিরোধ আরও বিস্তৃত হবে।’
‘তা হবে। কিন্তু আমার প্রতিশোধ নেয়া হযে যাবে।’
‘আইনের মাধ্যমে প্রতিশোধ নেয়া যায়। ওদের চেনেন। ওদের বিরুদ্ধে মামলা দিন।’
হাসল ওকোচার আব্বা। বলল, ‘তুমি সভ্য দেশের মানুষ, জংগলের আইন জান না। এখানে শক্তি দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হয়, আইন দিয়ে নয়।’
‘কিন্তু এরপরও আমি বলব, যে ইস্যু নিয়ে এই বিরোধ, তাতে এই বিরোধ মিটিয়ে ফেলার মধ্যেই কল্যাণ আছে।’
‘আমি এটাই চেয়েছিলাম। কিন্তু ফ্যাংগরা আজ বুঝিয়ে দিয়েছে তারা বিরোধ চায়, রক্তারক্তি চায়। আমি আজ রাতেই ওদের শতজনকে হত্যা করে ওদের চাওয়া পূরন করতে চাই। আমি অনেক ধৈর্য ধরেছি। আমি চাইলে ফ্যাংগদের মাথা অনেক আগেই গুড়িয়ে দিতে পারতাম। এবার তাই করব।’
‘আমার একটা প্রস্তাব আছে।’
‘কি প্রস্তাব?’
‘আপনি যদি এই মূহুর্তে কিছু করতেই চান, তাহলে সশস্ত্র অভিযানে না গিয়ে সশস্ত্রভাবে সোজা ফ্যাংগদের সর্দার অর্থাৎ ওকোচার শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে উঠুন এবং ওকোচার রক্ত মাখা শার্ট ওকোচার শ্বশুরকে উপহার দিন। কোন কথা তাকে বলবেন না। শুধু জানাবেন ‘ফ্যাংগদের আক্রমনে আহত ওকোচার শার্ট।’ ফেরার সময় পারলে একটা সাদা গোলাপ পা দিয়ে মাড়িয়ে আসবেন।’
শেষের বাক্যটা বলতে গিয়ে হাসল আহমদ মুসা।
কিন্তু আর কেউ হাসল না। ওকোচার আব্বা, ওকোচা, তার তিন বড় ভাই, ওকোচার মা ও স্ত্রী সকলেই স্তম্ভিত আহমদ মুসার কথায়। যেন তারা অবিশ্বাস্য কোন দৃশ্য দেখছে, এইভাবে তাকিয়ে আছে আহমদ মুসার দিকে।
চোখভরা বিস্ময় নিয়ে ওকোচার আব্বা দু’ধাপ এগিয়ে এল আহমদ মুসার একদম মুখোমুখি। তারপর ডান হাত দিয়ে আহমদ মুসার মুখ ঈষত তুলে ধরে বলল, ‘তুমি কে বাবা? এমন অদ্ভুত চিন্তা তোমার মাথায় এল কি করে? আমার মনে হচ্ছে, শতজনকে হত্যা করার চাইতেও এটা তৃপ্তিদায়ক হবে।’
কথা শেষ করেই সে ঘুরে দাঁড়াল এবং ছেলেদের উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আমি এখনি যাব। সকলকে খবর দাও। তিনটি গাড়িতে যাব। সবাই সব রকমের অস্ত্রসজ্জিত হবে।’
ওকোচার আব্বা কথা শেষ করতেই আহমদ মুসা বলল, ‘আমাকে এবার বিদায় দিন।’
ওকোচার দিকে চেয়ে বলল, ‘চলি আমি।’
ওকোচার আব্বা কথা শুনেই হৈ চৈ করে উঠল। বলল, ‘যাবে মানে? তুমি তো বসোইনি। মেহমানদারী কিছুই হয়নি।’
বলেই সে তাড়া দিল সেই মাঝ বয়সী মহিলা ও তরুণীটিকে। কিন্তু পরক্ষণেই বলল, ‘দাঁড়াও দাঁড়াও, কারো সাথেই তো পরিচয় হয়নি।’
ওকোচার আব্বা একে একে স্ত্রী, পুত্রবধু এবং ওকোচার তিন ভাইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল।
পরিচিত হবার পর ওকোচার মা বলল, ‘বাছা, ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুক।’ আর ওকোচার স্ত্রী বলল, ‘আমরা আপনার কাছে ঋণী থাকব চিরদিন।’
আহমদ মুসা তাদেরকে ধন্যবাদ দিয়ে ওকোচার আব্বার দিকে চেয়ে হাত জোড় করে বলল, ‘মাফ করুন আজ আমি যাই। জরুরী কাজ আছে।’
‘তাহলে যাবেই? কথা দাও আসবে আরেকদিন।’
‘কথা দিতে পারবনা। যদি সম্ভব হয় আসব।’
বলে আহম্মদ মুসা সকল কে শুভেচ্ছা জানিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে চলতে শুরু করল।
তার পাশাপাশি হাঁটতে লাগল ওকোচা।
ওকোচার আব্বাও ড্রইং রুমের দরজা পর্যন্ত তাদের এগিয়ে দিল।
ওকোচা আহমদ মুসার গাড়ির দরজা খুলে ধরে বলল, ‘কোথায় যাবেন?’
আহমদ মুসা গাড়িতে ঢোকার জন্যে নিচু হয়েও আবার সোজা হয়ে দাঁড়াল।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘বন্ধুদের একটা আড্ডায় যাব।’
বলে আহমদ মুসা ঢুকে গেল গাড়িতে।
ওকোচা গাড়ির জানালায় মুখ রেখে বলল, ‘ভাইয়া কবে আশা করব আপনাকে আমাদের বাড়িতে?’
‘গড নোজ।‘ হেসে বলল আহমদ মুসা।
গাড়ি স্টার্ট নিল। চলতে শুরু করল।
ওকোচা হাত নেড়ে বিদায় জানাল।
গাড়ি চলে গেলেও ওকোচা দাড়িয়ে ছিল।
তার আব্বা এসে তার পাশাপাশি দাঁড়াল। বলল, ‘ওকোচা, নাম কি পরিচয় কি জেনেছ?’
ওকোচা ঝট করে ঘুরে দাড়াল তার পিতার দিকে। দুঃখিত কণ্ঠে বলল, ‘কিছুই জিজ্ঞেস করা হয়নি। নাম কি, কি পরিচয়, কোথায় উঠেছেন, কিছুই জানি না।’
‘ভুল আমাদের হয়েছে। আমরা কিছু জিজ্ঞেস করলাম না কেন?’
‘এ যে কত বড় ভুল, উনি কি মনে করবেন ভাবতে আমার লজ্জা লাগছে।’
‘ওর সম্পর্কে যা শুনলাম তোমাকে বাঁচাবার ব্যাপারে এবং যা বুঝলাম অল্প সময়ে, ও কোন সাধারণ ছেলে নয়। কিছুই মনে করবে না। কিন্তু ওর পরিচয় ও নাম জানা একটা সাধারণ সৌজন্যের জন্যেও প্রয়োজন ছিল।’
‘সত্যি খুব খারাপ লাগছে আব্বা। বলতে গেলে সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে উনি আমাকে নতুন জীবন দিয়েছেন।’
‘কোথায় গেল জান?’
‘বন্ধুদের আড্ডায়, ঠিকানা বলেননি।’
‘চাইলে সেও তার নাম ও পরিচয় জানাতে পারত কিন্তু সে ইচ্ছা তার ছিল না।’
বলে একটু থামল। তারপর বলল, ‘চল ভেতরে। ডাক্তার এখনি এসে পড়বে।’
দুজনেই আবার ড্রইং রুমে প্রবেশ করল।
ওকোচার বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় আহমদ মুসা ভাবল তার তো ইচ্ছা ছিল লা ফ্যাংগ রোডের ওকুয়া’র ঘাটিতে প্রথম হানা দেয়া। কিন্তু ঘটনাচক্র তাকে নিয়ে এসেছে ওয়ান্ডি এ্যাভেনিউতে। সুতরাং ওয়ান্ডি এ্যাভেনিউর ওকুয়া’র ঠিকানায় প্রথম যাবে সে।
৭০ নম্বর ওয়ান্ডি এ্যাভেনিউ আহমদ মুসার টার্গেট, কিন্তু গাড়ি থেকে নামল ৬৫ নম্বরে।
ট্যাক্সিওয়ালাকে ভাড়া চুকিয়ে দিয়ে আহমদ মুসা ফেল্ট হ্যাটটা মাথায় তুলে ধীরে ধীরে এগুলো ৭০ নাম্বারের দিকে।
৭০ নাম্বার একটি বড় চার তলা বিল্ডিং। উত্তর মুখী বাড়িটির পূর্ব পাশ দিয়ে একটা রাস্তা ওয়ান্ডি এভেনিউ থেকে বেরিয়ে দক্ষিণ দিকে চলে গেছে।
বাড়িটির দিকে একবার নজর বুলিয়ে নিয়ে আহমদ মুসা বাড়ির সামনে দিয়ে একবার হেঁটে গেল। দেখল বাড়িটার পশ্চিম পাশে দিয়েও একটা গলি দক্ষিণ দিক থেকে এসে ফুটপাতে মিশেছে। দেখেই বুঝা যায় গলিটা গাড়ি-ঘোড়া চলার জন্যে নয়, মাত্র পায়ে হাঁটার পথ।
আরও দেখল বাড়িটার সামনে একটা লন। লনের দু’পাশে গাড়ি দাড়ানো। লনটা প্রাচীর ঘেরা। প্রাচীর চার ফুটের মত উচু। তার উপর তিন ফুটের মত গ্রিলের প্রাচীর।
বিশাল গেট পেরিয়ে লনে প্রবেশ করতে হয়। গেট পুরু ইস্পাতের প্লেট দিয়ে ঢাকা।
গেটের এক পাশে গার্ড রুম।
লন থেকে প্রশস্ত সিড়ির প্রায় ৬টির মত ধাপ পেরিয়ে তবেই এক তলার মেঝেতে উঠা যায়।
বাড়িটির দিকে তাকিয়েই আহমদ মুসার মনে হলো এটা একটা অফিস বিল্ডিং।
আহমদ মুসা বাড়িটার পশ্চিম পাশের লেন দিয়ে বাড়ির পশ্চিম, দক্ষিণ ও পূর্ব দিকটা ঘুরে এল। দক্ষিণ দিকের গলি পথটা আসলে একটা সুয়ারেজ প্যাসেজ।
আহমদ মুসা ফুটপাতে দাড়িয়ে এখন কি করবে তা ভাবতে গিয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল। সবে সাড়ে ৭টা।
কিন্তু পরক্ষনেই সে ভাবল। কি করবে তা ভাবার আগে তাকে নিশ্চিত হতে হবে যে এই বাড়িটা সত্যিই ওকুয়া’র কোন ঘাঁটি বা তাদের কোন লোকের বাড়ি বা অফিস কিনা।
জানার উপায় কি?
গেটে জিজ্ঞেস করা নিরাপদ নয়। ওকুয়া ক্ষ্যাপা কুকুরের মত হয়ে আছে। সব বিদেশী, বিশেষ করে এশিয়ানকে তাদের সবাই সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখবে।
আহমদ মুসার মনে পড়ল ওকোচার কথা। তাকে এঠিকানার কথা জিজ্ঞেস করলে নিশ্চয় জানা যেত। কিন্তু যা গত হয়ে গেছে তা নিয়ে ভেবে আর লাভ নেই।
বাকি থাকে বাড়িতে প্রবেশ করে জানা। বাড়িতে প্রবেশ করার কথাই ভাবল আহমদ মুসা।
কিন্তু পরক্ষনেই ভাবল গেটম্যানকে একবার বাজিয়ে তো দেখা যায়।
ভাবনার সাথে সাথেই আহমদ মুসা পকেটে থেকে একটা কাঁচা-পাকা গোঁফ বের করে পরে নিল। এবং পকেট থেকে ফোল্ডেড লাঠি বের করে লাঠি বানিয়ে স্বাস্থ্যসন্ধানী সন্ধ্যা ভ্রমণকারী সাজলো।
ধীরে ধীরে এগুলো ফুটপাত ধরে গেটের দিকে। তার হাতের লাঠি ফুটপাতের শক্ত বুকে ঠক ঠক শব্দ তুলল।
গেটে গিয়ে সে দাড়াল।
গেট এলাকা উজ্জ্বল আলোতে প্লাবিত।
আহমদ মুসা গেটের মুখোমুখি হয়ে গোটা গেটের উপর চোখ বুলালো। যেন সে সাইনবোর্ড সন্ধান করছে।
গেটের গার্ড রুমের একটি জানালা বাইরের দিকে।
জানালা দিয়ে গার্ড মুখ বাড়িয়ে বলল, ‘মশায় কি খুঁজেন?’
‘অফিসের সাইনবোর্ড নেই?’
‘না, এটা অফিস নয়। কোন অফিস খুঁজছেন?’
‘কিংডম অব ক্রাইস্ট কে চেনেন? একজন বলেছিল এখানে কোথাও তার অফিস।’
‘চিনি। কিন্তু এখানে কোথাও তো তাদের অফিস নেই। কত নম্বর বলেছিল?’
‘যতদূর মনে পড়ে ৭০ নম্বর বলেছিল।’
‘না এটা কিংডম অব ক্রাইস্ট এর অফিস নয়। কে ঠিকানাটা দিয়েছিল?’
‘গির্জার একজন ভাল খৃস্টান কর্মীর কাছ থেকে পেয়েছিলাম। খৃস্টের জন্য আমি কিছু উইল করে যেতে চাই।’
‘গার্ড উত্তরে তৎক্ষনাৎ কিছু বলল না। কয়েক মুহূর্ত ভাবল। তারপর বলল উনি কিছুটা ঠিকই বলেছিলেন। এটা কিংডম অব ক্রাইস্ট (কোক) এর অফিস নয়, তবে ঐ সংস্থার বন্ধুরা এখানে থাকেন। তাদেরকে বললেই আপনার কাজ হয়ে যাবে। সব ব্যবস্থা করে দেবেন তারা। কালকে একবার আসুন।’
‘কেন সন্ধ্যায় ওঁরা থাকেন না?’
‘থাকেন, আছেন কিন্তু রাতে দেখা হবে না।’
‘ও আচ্ছা। কখন এলে পাওয়া যাবে? এটা কি ওদের বাড়ি?’
‘বাড়ি না ঠিক। কালকে আসুন। বলে গার্ড সরে গেল জানালা থেকে।’
ও চলে গেলে ক্ষতি নেই আহমদ মুসার। যা জানবার তা জানা হয়ে গেছে। এটা ওকুয়া’র একটা ঘাঁটি তাতে কোন সন্দেহ নেই এখন আহমদ মুসার। আরো একটা জিনিস মনে হল, চার তলা বাড়ির বিশালত্ব প্রমান করে এটা ওকুয়া’র কোন ছোটখাট ঘাঁটি নয়।
আহমদ মুসা সরে এল বাড়িটার সামনে থেকে। তারপর সিদ্ধান্ত নেবার জন্য দাড়াল ফুটপাতের এক প্রান্তে।
বাড়িটাতে প্রবেশ করা দরকার দুইটা কারনে। ওমর বায়াকে ওরা কোথায় বন্ধি করে রেখেছে তা জানার একটা পথ হতে পারে। অথবা ওমর বায়াদের পেয়েও যেতে পারে।
সময় সম্পর্কে চিন্তা করল আহমদ মুসা। এ ধরনের অভিযানের জন্যে দুইটা সময় ভাল। এক হলো সন্ধ্যা রাত, দুই গভীর রাত। আহমদ মুসা সন্ধ্যা রাতকেই পছন্দ করল।
চোখ বন্ধ করে বাড়ির চার দিকের দৃশ্যটা সামনে এনে বাড়িটিতে ঢুকার পথ সম্পর্কে চিন্তা করল।
বাড়িটার দুই পাশে এবং পেছনের দিকে কোন ব্যালকনি নেই। পেছনে চাকর-বাকরদের একটা দরজা থাকে, সেটাও নেই। বেয়ে উপরে উঠার মত পানির পাইপও নেই।
দুইটা পথই মাত্র খোলা আছে বাড়িতে ঢোকার, ছাদের কার্নিশে হুক আটকিয়ে কর্ড বেয়ে ছাদে উঠা অথবা সামনে একদম সদর দরজা পথে।
সন্ধ্যা রাতে কর্ড বেয়ে ছাদে উঠা বিপজ্জনক। সুতরাং পথ একটাই খোলা সামনে দিয়ে সদর দরজা পথে।
চোখ বন্ধ করে বাড়ির সামনেটা আবার সামনে নিয়ে এল আহমদ মুসা।
সামনে দিয়ে প্রবেশের দুইটা পথ। গেটের গার্ডকে পরাভূত করে তার পোশাক পরে বাড়িটে প্রবেশ করা। দ্বিতীয় গার্ডের চোখ এড়িয়ে পুব অথবা পশ্চিম দিকের প্রাচীর যেখানে একতলার বারান্দার সাথে মিশেছে সেখান দিয়ে প্রবেশ করা। অবশ্য এ জায়গায় প্রাচীরের উচ্চতা সাত ফিটের মত এবং তার উপর চার ফিট গ্রিলের বেড়া। এখানে বারান্দা থেকে প্রাচীরের শীর্ষ দেশ মাত্র চার ফুটোর মত উঁচু। অর্থাৎ চার ফিটের গ্রীলের বাধা পার হলেই বারান্দা। আরেকটা সুযোগ হলো, গ্রীলের ফাঁক দিয়ে আহমদ মুসা দেখেছে রেলিং-এর ধার ঘেঁষে বারান্দায় ফুলের টব সাজানো। অনেক টবে পাতা ওয়ালা বেশ বড়-সড় গাছও আছে,যা আড়াল হিসেবে কাজ করতে পারে। প্রাচীরের শীর্ষদেশ পর্যন্ত ওঠা সহজ। লাফ দিয়ে উঠে প্রাচীরের গ্রীল ধরতে পারলে নিমিষেই বারান্দায় চলে যাওয়া যাবে।
সামনে দিয়ে প্রবেশের এই দ্বিতীয় পথটাই পছন্দ করল আহমদ মুসা।
হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত ৮টা।
আহমদ মুসা ধীরে ধীরে এগুলো পশ্চিম প্রাচীরের সেই দক্ষিন প্রান্তের দিকে। বাড়ির পশ্চিম দিকের লেনটাতে দু’একজন লোক ক্বচিত দেখা যায়।
কোন দেয়ালের গা বেয়ে পাঁচ সাত ফিট লাফিয়ে ওঠা আহমদ মুসার কাছে নস্যি।
আহমদ মুসার কোনই কষ্ট হলো না প্রাচীরের গা বেয়ে লাফিয়ে উঠে গ্রিল ধরে বারান্দায় গিয়ে নামতে।
বারান্দায় টবের পাশে বসে তাকাল গেটের দিকে এবং বারান্দার দিকে। দেখল গেট রুমের কোন দরজা বা জানালা দক্ষিন দিকে নেই। বুঝল, একটাই জানালা উত্তর দিকে আর দরজা পশ্চিম পাশে গেটের পাশাপাশি।
হাঁফ ছেড়ে বাঁচল আহমদ মুসা। দেখল বারান্দায়ও কেউ নেই।
টবের পাশে নিজেকে গুটিয়ে রেখে ভেতরে প্রবেশের উপায় সম্পর্কে চিন্তা করল।
তার সামনে পুব-পশ্চিম লম্বা বারান্দা।
বারান্দা থেকে ভেতরে প্রবেশের তিনটি দরজা। মাঝ বরাবর একটি। দু’প্রান্তে দুটি।
আহমদ মুসা লক্ষ্য করল তার প্রান্তে যে দরজা রয়েছে, তার লক পয়েন্টে বড় ধরনের একটা লাল বিন্দু জ্বল জ্বল করছে। কিন্তু অন্য দু’টি দরজায় তা নেই। তার বদলে ঐ দু’টি দরজার লক পয়েন্টে রয়েছে জ্বলজ্বল সবুজ চোখ।
আহমদ মুসার কাছে এই আলোক সংকেতের সরলার্থ দাঁড়ায়, লাল সংকেতের দরজায় নক করা যাবে না, প্রবেশের জন্যে এ দরজা নয়। সবুজ চিহ্নিত দরজা দু’টি প্রবেশের।
গেটের দিক থেকে শব্দ পেয়ে আহমদ মুসার চিন্তায় ছেদ পড়ল। তাকাল আহমদ মুসা গেটের দিকে।
দেখল, একটা গাড়ি ঢুকছে গেট দিয়ে।
গাড়িটি এসে দাঁড়াল বারান্দার সিঁড়ির গা ঘেঁষে।
গাড়ি থেকে নামল তিনজন লোক, একজন স্বেতাংগ, দু’জন আফ্রিকান কৃষ্ণাংগ।
তারা সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল বারান্দায়।
আহমদ মুসার হাতে রিভলবার আগে থেকেই ছিল। আশংকিত হবার চেয়ে খুশী হলো সে ওদের দেখে। ওরা কিভাবে দরজা খোলে দেখা যাবে।
আহমদ মুসা পকেট থেকে মাইক্রো দূরবীণ বের করে হাতে নিল। আহমদ মুসা লক্ষ্য করল, ওরা তিনজন বারান্দায় আহমদ মুসার প্রান্তের দিকে এগিয়ে আসছে।
বিস্মিত হলো আহমদ মুসা। তার মেশিন পিস্তলের ট্রিগারে আঙুল রাখল সে।
কিন্তু ওরা তিনজন গিয়ে দাঁড়াল লাল সংকেতওয়ালা আহমদ মুসার প্রান্তের দরজার সামনে।
আহমদ মুসা মাইক্রো দূরবীণ তার চোখে লাগাল।
মাইক্রো দূরবীণ একটি বিশেষ আধারে স্থাপিত একটা ক্ষুদ্র কাঁচ খন্ড। পেন্সিল কাটারের মত এ ক্ষুদ্র দূরবীণ দিয়ে পাঁচ ফিট থেকে সিকি মাইল দূর পর্যন্ত স্থানের আলপিনের মরিচাও সুস্পষ্টভাবে চোখে পড়ে।
তিনজনের মধ্যকার শ্বেতাংগ লোকটি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে লাল সংকেতের ঠিক উপরে দরজার গায়ে তর্জনি দিয়ে টোকা দিল ছয়টি।
আহমদ মুসা পরিস্কার দেখতে পেল, লাল সংকেতের ঠিক উপওে দরজার রঙের সাথে মিশানো আয়াতকার একটা ছক। তাতে শূন্য থেকে নয় পর্যন্ত অংকগুলো ক্রমিকভাবে সাজানো। অংকগুলোও ঠিক দরজার রঙের। সতর্ক দৃষ্টি না হলে খুঁজে পাবার কথা নয়। আহমদ মুসা আবারও দেখল, শ্বেতাংগ লোকটির তর্জনি তিন, ছয় ও নয়-এর উপর ক্রমিকভাবে দুইবার ঘুরে এল। একবার উর্ধ ক্রমিক, একবার নিম্ন ক্রমিক।
শ্বেতাংগ লোকটির ছয়টি টোকা সম্পন্ন হবার সাথে সাথে লাল সিগন্যালটি নিভে গেল। সেখানে জ্বলে উঠল সবুজ সংকেত। আর তার সাথে সাথেই খুলে গেল দরজা।
ওরা তিনজন ভেতরে ঢুকে গেল।
বিস্ময়ের সাথে আরেকটা বিষয় লক্ষ্য করল আহমদ মুসা, এ দরজার লাল আলো নিভে যাওয়ার সাথে সাথে মাঝের দরজার সবুজ সংকেত নিভে গিয়ে লাল সংকেত জ্বলে উঠল। অল্পক্ষণ পরে পূর্ব প্রান্তের দরজাটিরও সবুজ সংকেত নিভে লাল সংকেত জ্বলে উঠল। পরে সবগুলো সংকেতই একে একে তার সাবেক অবস্থায় ফিরে এল।
ঐ দুই দরজার রং পরিবর্তনের খেলা আহমদ মুসা কিছুই বুঝল না।
ওরা তিনজন চলে যাবার পর আহমদ মুসা মিনিট দশেক অপেক্ষা করল। তারপর গেটের দিকে তাকাল। দেখল দরজা বন্ধ। গার্ড রুমের দরজা খোলা। কিন্তু গার্ডকে দেখা যচ্ছে না।
বিসমিল্লাহ বলে আহমদ মুসা দ্রুত বেরিয়ে এল টবের আড়াল থেকে। কয়েক ধাপে পৌঁছে গেল দরজার সামনে। দ্রুত হাতে সে লাল সংকেতের উপরের ছকটায় শাহাদাত আঙুলি দিয়ে আঘাত করল উল্লেখিত তিনটি নম্বরে, যেমন সে দেখেছিল।
সংগে সংগেই লাল সংকেতের জায়গায় জ্বলে উঠল সবুজ সংকেত।
খুলে গেল দরজা।
আহমদ মুসা প্রবেশ করল ভেতরে।
পেছনে দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
ভেতরটা দেখেই অবাক হয়ে গেল আহমদ মুসা। লিফট রুমের মত একটা কক্ষ। তার তিন দিকেই দেয়াল, পেছনে বাইরে যাবার দরজা।
মনে চিন্তা উদয় হলো আহমদ মুসার, সে কি তাহলে ফাঁদে পড়ল!
পরক্ষণেই ভাবল, জ্বলজ্যান্ত তিনজন লোক এই মাত্র ঢুকল, তারা চলে গেছে, নিশ্চই এর আরো দরজা আছে।
চারদিকে তীক্ষ্মভাবে নজর বুলাতে গিয়ে আহমদ মুসা পুব দিকের দেয়ালে ৪ ফুটের মত উচ্চতায় কাঠ রঙা দুই অংকের একটা ছক খুঁজে পেল। অংক দু’টি হলো তিন এবং ছয়।
খুশীতে মনটা নেচে উঠল আহমদ মুসার। দরজা খোলারই ‘কি’ বোর্ড এটা। কিন্তু দুইটা অংক কেন?
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে এ চিন্তা উদয় হলো যে, তিন কোড সংকেতের একটি ‘নয়’, এখানে নেই। তাহলে ‘নয়’ কে বাদ দিয়ে অন্য সিস্টেম কি এখানে রাখা হয়েছে?
চিন্তার সাথে সাথেই আহমদ মুসা অংক দু’টিতে ঠিক আগের মতই একবার উর্ধ ক্রমিক, একবার নিম্ন ক্রমিকে টোকা দিল।
সাথে সাথেই খুলে গেল দরজা। দরজার পরে যে কক্ষে আহমদ মুসা প্রবেশ করল, তা আগের ন্যায়ই লিফট রুমের মত একটা কক্ষ।
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে পড়ল বাইরে পরের দু’টি দরজার সবুজ সংকেত লাল হয়ে যাওয়া ও পরে তা আবার সবুজ হয়ে যাবার কথা। বুঝল আহমদ মুসা, বাইরের তিনটি দরজার পেছনেই তিনটি লিফট রুমের মত কক্ষ আছে যাতে রয়েছে বাইরের মতই কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত দরজা। প্রথম দরজা যখন সবুজ সংকেত জ্বলে, তখন দ্বিতীয় দরজায় লাল সংকেত জ্বলে ওঠে। প্রথম কক্ষ থেকে যখন দ্বিতীয় কক্ষে প্রবেশ করা হয়, তখন বাইরে দ্বিতীয় সবুজ সংকেত জ্বলে ওঠে, আর তৃতীয় দরজায় জ্বলে লাল সংকেত। যখন দরজা খুলে তৃতীয় কক্ষে প্রবেশ করা হয় তৃতীয় অর্থাৎ শেষ দরজায় সবুজ সংকেত জ্বলে ওঠে।
প্রথম কক্ষের মতই দ্বিতীয় কক্ষের পুব দিকের দেয়ালের ঠিক একই স্থানে এক অংকের একটা ছক খুঁজে পেল আহমদ মুসা। সে অংকটা ‘তিন’। হিসাবে ‘তিন’-ই হওয়া উচিত। ‘তিন’ না হলেই বিপদে পড়ত আহমদ মুসা।
‘তিন’ অংকটি তর্জনি দিয়ে পুর্বের রীতি অনুসারে দুই বার টোকা দিল আহমদ মুসা।
দরজা খুলে গেল আগের মতই সংগে সংগে। তৃতীয় কক্ষে প্রবেশ করল আহমদ মুসা।
কিছুক্ষণ দাঁড়াল কক্ষটির মাঝখানে। সে নিশ্চিত এই কক্ষেরই ভেতরে প্রবেশের পথ আছে।
আহমদ মুসা কক্ষটির বিশেষ করে দক্ষিণ দেয়ালের উপর সতর্ক দৃষ্টি বুলাল। আহমদ মুসার ধারণা ভেতরে যাবার দরজা এই দেয়ালেই থাকবে। ভাগ্যবান আহমদ মুসা, দেয়ালের ঠিক মাঝখানে সেই চার ফুট উপরে কাঠ রংয়ের একটা ‘শূন্য’ খুঁজে পেল।
খুঁজে পেয়ে খুশী হলো আহমদ মুসা। কিন্তু চিন্তায় পড়ল ‘কোড’ ভাঙা নিয়ে । দরজা খোলার জন্যে ‘শূন্য’ অংকে কয়টা টোকা দিতে হবে? যুক্তি বলে, আগের তিন দরজার ক্রমিক অনুসারে হয় একটা টোকা দিতে হবে, নয়তো সর্বোচ্চ নয়টি টোকা দিতে হয়।
আহমদ মুসা প্রথমে শূন্য অংকে একটা টোকা দিল। তারপর অপেক্ষা করল। না, দরজা খোলার নাম নেই। পরে গুনে গুনে শূন্যের উপর নয়টি টোকা দিল। এবার অপেক্ষা করতে হলো না। শেষ টোকা পড়ার সাথে সাথেই সামনে থেকে কক্ষের গোটা দক্ষিণ দেয়ালটাই সরে গেল।
কিন্তু দেয়াল সরে যাওয়ায় যা তার চোখে পড়ল, তাতে একরাশ বিস্ময় এসে তাকে ঘিরে ধরল।
প্রায় অর্ধ ডজন স্টেনগান তার দিকে ‘হা’ করে তাকিয়ে আছে। তারা গোটা ঘরে অর্ধ বৃত্তাকারভাবে দাঁড়িয়ে।
বৃত্তের মাঝখানে দু’জন লোক। একজন শ্বেতাংগ, আরেকজন কৃষ্ণাংগ। তাদের হাতে একদম লেটেস্ট মডেলের মেশিন রিভলবার। দু’টিই উদ্যত তার দিকে।
আকস্মিকতায় বিমূঢ় হয়ে পড়া আহমদ মুসার দিকে চেয়ে হো হো করে হেসে উঠল শ্বেতাংগ লোকটি। বলল, ‘ওয়েলকাম আহমদ মুসা তোমার জন্যে আমরা অপেক্ষা করছি।’
বলেই আবার হো হো করে হাসল সে। শুরু করল আবার, ‘তোমার প্রশংসা করছি আহমদ মুসা। পৃথিবীতে তোমার তুলনা শুধু তুমিই। আমাদের চারটা দরজার যে কোড তুমি পানির মত ভেঙে বেরিয়ে এলে তা ভাঙবার সাধ্য আর কারও নেই। তোমাকে কনগ্রেচুলেশন।’
শ্বেতাংগ লোকটি থামতেই কৃষ্ণাঙ্গ লোকটি বলে উঠল, ‘কিন্তু তুমি বোকাও আহমদ মুসা। তুমি তোমার শত্রুকে, ওকুয়া’কে অবমূল্যায়ন করেছ। তুমি কি করে ভাবলে যে ওকুয়ার হেড কোয়ার্টার এত অরক্ষিত, তুমি গার্ডকে ফাঁকি দিয়ে প্রাচীর টপকে প্রবেশ করবে আর কেউ দেখতে পাবে না?’
আহমদ মুসা মনে মনে স্বীকার করল, ঠিকই সে ওকুয়া’কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়নি। তাদের ঘাঁটির নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ইউরোপীয় মানে বিচার করেনি। প্রাচীর এবং তার গ্রীলের গায়ে যে অতি সূক্ষ্ম ‘এলার্ম’ তার জড়ানো থাকতে পারে, এটা সে ভাবেইনি। তারপর দরজার আলোক সংকেতের পাশাপাশি কক্ষগুলোতে টিভি ক্যামেরার চোখ তার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারে, এ বিষয়টার দিকেও সে ভ্রুক্ষেপ মাত্র করেনি। আহমদ মুসার এখন মনে হচ্ছে, এলার্ম তার বা অন্য কোন কৌশলের মাধ্যমে তারা তার প্রবেশ টের পেয়ে গেছে এবং দরজা ও কক্ষগুলোর টিভি ক্যামেরার মাধ্যমে তাকে দেখেছে।
ছাদ ফাটা অট্টহাসি হাসল শ্বেতাংগ লোকটি। বলল, ‘কি ভাবছ আহমদ মুসা। তোমার ভুলের কথা ভাবছ? তোমার ভুল মানে আমাদের বিজয়। কিন্তু এ বিজয় অনেক মূল্যে আমরা অর্জন করলাম। তুমি আমাদের কত লোক মেরেছ, কত ক্ষতি করেছ, তার কোন পরিমাপ নেই। এর পরেও আজ আমি আনন্দিত আহমদ মুসা। তোমার মূল্য তুমি জাননা। তোমাকে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ধনাগারের মূল্য বিক্রি করা যায়, আবার তোমাকে পনবন্দী বানিয়ে কয়েকটি রাষ্ট্রের কোষাগারের সমুদয় অর্থ হাতে আনা যায়।’
‘ঠিক বলেছেন। আমার সব ক্ষতি পূরণ হয়েছে। সামনের প্রতিবন্ধকতার দেয়ালও ভেংগে পড়েছে। এখন চীফ জাস্টিস শয়তান সুড় সুড় করে সব লিখে দেবে। ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভি এবং ওয়ার্ল্ড নিউজ এজেন্সিও এখন আমাদের ঘাঁটতে আসবে না। ও! এখনি আমার ইচ্ছা করছে চীফ জাস্টিসকে একটা টেলিফোন করতে।’
আহমদ মুসা অনুমান করল এরা কে, তবু প্রশ্ন করল, ‘এত খুশি হচ্ছেন, আপনারা কারা? মনে হচ্ছে অনেকদিন থেকে আপনাদের সাথে আমার সম্পর্ক।’
‘ওর উৎসুক্যটা মিটিয়ে দাও ফাদার।’ বলল, শ্বেতাংগ লোকটি।
‘তার উৎসূক্য মেটানোর আমাদের কি দায়িত্ব। আর আমাদের পরিচয় নিয়ে তার কি।’ বলল, কৃষ্ণাংগ লোকটি।
‘উৎসুক্য নয়, পরীক্ষা করলাম আপনাদের সাহসের মাত্রাকে। চিনি আমি আপনাদের। ব্ল্যাক ক্রসের প্রধান পিয়েরে পল এবং ‘কোক’ এবং ‘ওকুয়া’র প্রধান ফ্রান্সিস বাইকের ছবি আমি দেখেছি ফ্রান্সের ক্রিমিনাল লিস্টে।’
‘ক্রিমিনাল লিস্টে! মিথ্যে কথা। মুখ সামলে কথা বল আহমদ মুসা।’ ‘ক্রোধে’ ফুঁসে উঠল পিয়েরে পল।
‘মিথ্যে কথা আমি বলিনি। পুলিশ এবং প্রশাসন আপনাদের ফেবার করে, সুযোগ দেয়। এটা তাদের বেআইনি দুর্বলতা। কিন্তু আইনের চোখে আপনারা ক্রিমিনাল। লিস্টে নাম থাকবে না কেন?’
‘এর জবাব তুমি পাবে আহমদ মুসা।’ রক্ত চক্ষু তুলে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলে পিয়েরে পল একজন স্টেনগানধারীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওর পকেট সার্চ করে অস্ত্র কেড়ে নাও। ওর হাতে হাতকড়া, পায়ে বেড়ি পরিয়ে দাও। দেখাব কে ক্রিমিনাল।’
স্টেনগানধারী এ নির্দেশ পালন করল।
‘হাতকড়া এবং পায়ে বেড়ি দিয়ে মানুষকে ক্রিমিনাল বানানো যায় না মিঃ পিয়েরে পল, ক্রিমিনাল হয় মানুষ অপরাধের কারনে।’
শান্ত ও স্বভাবিক কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার কথার উত্তরে কিছু না বলে নির্দেশ দিল পিয়েরে পল, ‘একে এক নম্বর সেলে নিয়ে ভরো।’
‘ডঃ ডিফরজিস এবং ওমর বায়াকে কোথায় রেখেছেন পিয়েরে পল?’
ক্রুদ্ধ পিয়েরে পল এবং ফ্রান্সিস বাইক কেউই এ প্রশ্নের উত্তর দিল না।
চারজন প্রহরী আহমদ মুসার হাত পা ধরে নাগর-দোলার মত করে নিয়ে চলল।
আহমদ মুসার চোখ তারা বাঁধেনি। সুতরাং সব কিছুই দেখল পথের আশে-পাশের।
আহমদ মুসাকে ভূগর্ভস্থ কক্ষে নামানো হলো।
তাকে প্রবেশ করানো হলো একটি সেলে। সেল বলতে যা বুঝায় কক্ষটি তা নয়।
বেশ প্রশস্থ ঘর। তবে একটি দরজা ছাড়া কোন জানালা নেই। ছাদ অনেক ওপরে। ছাদের কোডে ঢাকা বাল্ব থেকে ম্লান আলো ছড়িয়ে পড়েছে ঘরে।
আহমদ মুসাকে মেঝেয় ফেলে ওরা চলে যাচ্ছিল।
আহমদ মুসা বলল, ‘কি ব্যাপার, তোমাদের বন্দীখানা যে একেবারে শূন্য।’
ওরা চারজনই থমকে দাঁড়াল। একজন বাঁকা হেসে বলল, ‘কেন একা থাকতে ভয় করবে? ভয় নেই সাথী আছে।’
‘কোথায়, কাউকে তো দেখছিনা?’
‘আছে তোমার আশে-পাশেই।’
‘তোমরা একজন শ্বেতাংগকে বন্দী করে রেখেছ।’
‘কোন শ্বেতাংগ বন্দী আমাদের নেই, মেহমান আছে।’
একজন প্রহরীর এই কথা শেষ হতেই অন্যজন দ্রুত বলে উঠল, ‘এর সাথে খোশ গল্প কি, চল।’
বলে সে চলতে শুরু করল। তার সাথে অন্যরাও।
তারা চলে যাওয়ার সাথে সাথে দরজা বন্ধ হয়ে গেল। দরজাটি তালাবদ্ধ হবারও শব্দ পেল আহমদ মুসা।
বন্দীখানা খুব খারাপ নয়। ঘরের একপাশে মেঝের সাথে আঁটা স্টিল ফ্রেমের খাটিয়ায় বিছানা পাতা। ঘরের এক কোণে বেসিনে পানির টেপ। এটাসড টয়লেট।
খুব খুশি হলো আহমদ মুসা।
কিন্তু খুশিটা উবে গেল, যখন মনে পড়ল যে ওদের কাছ থেকে আসল কথাটাই আদায় করা যায়নি। ওদের কথায় বুঝা গেলনা ডঃ ডিফরজিস ও ওমর বায়া কোথায়। ওরা বলল কোন শ্বেতাংগ বন্দী নেই আছে মেহমান। এ কথা বলল কেন? আমি তো মেহমানের কথা জিজ্ঞেস করি নি। তাদের তো কত মেহমানই থাকতে পারে। তার কথা আমাকে বলবে কেন? তাহলে সে শ্বেতাংগ মেহমান কি আলাদা ধরনের মেহমান? সে কি ডঃ ডিফরজিস? এই শ্বেতাংগ মেহমানকে প্রহরী কোথায় দেখেছে? এ বাড়িতে?
অনিশ্চয়তার মধ্যেও আহমদ মুসা নিশ্চিত হলো সে ডঃ ডিফরজিস ও ওমর বায়ার কাছাকাছি পৌছেছে, খুবই কাছাকাছি।
আহমদ মুসায় খাটিয়ায় উঠে শুয়ে পড়েছিল। ওমর বায়াদের বিষয়ে চিন্তা করতে করতেই কখন যেন ঘুমের কোলে ঢলে পড়ল সে।