বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
'ভাই আর একটু জোরে চালা তো।'- আমি
রিক্সাওলাকে তাড়া দেই। মফস্বল শহরে
রাত বারটার দিকে বাস আশা করা ঠিক না।
তার পরেও কেন জানি মনে হচ্ছে শেষ
বাসটা হয়ত একটুর জন্য মিস করব। তাই এই
তাড়াহুড়া। হয়তো শুনব একমিনিট আগে
ছেড়ে গিয়েছে শেষ বাস।
বাস স্টেশন অন্ধকার, মনে হচ্ছে
ইলেকট্রিসিটি নেই। মরার উপর খাড়ার ঘা
আরকি! আশেপাশে তাকিয়ে কোন
জনমানব চোখে পড়লনা। মনটাই খারাপ হয়ে
গেল। আজ সকাল থেকেই কুফা যাচ্ছে।
কাল সকালে ঢাকায় না পৌছুতে পারলে
বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে।
রিক্সাওয়াল কে বিদায় করে দাড়িযে
রইলাম। দেখা যাক, যদি কোন ট্রাকও পাই
তাও রওনা হয়ে যাব আল্লাহ ভরসা করে।
অষ্পষ্টভাবে শব্দগুলো কানে যেতেই কান
পেতে শোনার চেষ্টা করলাম। বাসের
গায়ে চাপড় দিয়ে ডাকাডাকির শব্দ বলে
মনে হল। আমি একটু সামনে এগুলাম। হ্যা,
ঠিকই। বাসের হেলপার সম্ভবতঃ বাসের
গায়ে জোড়ে চাপড়াচ্ছে আর
প্যাসেন্জার ডাকছে। প্রায় সব বাসগুলোই
এই কাজ করে। প্যাসেন্জার না পেলে
স্ট্যান্ড থেকে একটু দুরে দাড়িয়ে
ডাকাডাকি করতে থাকে। বেশী
প্যাসেনজারের আশায়।
আমি দ্রুত এগুতে থাকি। ’এই বাস এই।’ - আমি
দু একবার হাকও দিলাম। ’আমাকে নিয়ে
যাও। দাড়াও, আমাকে নিয়ে যাও।’
আশ্চর্য। যতই এগুতে থাকি মনে হয় বাস ঠিক
তত দুরেই রয়ে গেছে। ছেড়ে চলে গেল
নাকি? আমি হতাশ হয়ে দাড়াতেই আবারও
শুনলাম বাস চাপড়ানোর শব্দ।
আমি আবছা অন্ধকারে এবার দৌড়াতে
লাগলাম। ’এই দাড়াও এই দাড়াও।’
আমি এগুতে থাকি। আশ্চর্য। সেই একই
ঘটনা। বেটা ড্রাইভার কি আমাকে নিয়ে
ইদুর বেড়াল খোলা শুরু করল নাকি?
কতক্ষন দৌড়ালাম জানিনা। হঠাৎ বাসের
গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলাম।
অন্ধকারে খেয়ালই করিনি।
বাসের ভিতরে কোন আলো নেই। দরজার
সামনে গিয়েও কাউকে পেলাম না। কি
ব্যাপার এই বাসটাই কি প্যাসেন্জার
খুজছিল? নাকি অন্যটা।
বাসের গেটে পা দিতেই হঠাৎ যেন প্রান
ফিরে পেল বাসটি। এক মুহুর্ত আগেও
যেটাকে মনে হচ্চিল জনশুন্য। আমি উঠার
পর হঠাৎ সে দৃশ্য পাল্টে গেল। আবার
হেলপারের সেই ডাক। বাসের ভেতরে
যাত্রীদের কথোপকথন। মাঝারি সাইজের
বাস। ভিতর ১৮ থেকে ২০ জনের মত লোক
হবে। সবাই যার যার মত বসে নিজেদের
মধ্যে আলাপ করছে। আমি উঠে পিছনের
দিকে গেলাম। একেবাওে শেষ সিটটা
একদম খালি দেখে ওখানে বসলাম।
দৌড়ে ঘেমে গেছি। একটু রেস্ট নিয়ে
নেই।
’এই যে ভদ্রলোক, এই’ - কেউ আমার জামা
ধরে টান দিল মনে হল! আমি জানালা
দিয়ে উকি দিলাম। অন্ধকারে ঠিকমত
দেখা যাচ্ছেনা। তবে বুঝলাম বাসের
হেলপার আমাকে জানালা দিয়ে
ডাকছে।
’কি হয়েছে’- আমি জিজ্ঞেস করি।
সামনে মানুষের ছায়া। সম্ভবতঃ হেলপার।
’আপনে এই বাসে উঠছেন ক্যান? আপনে এই
বাসে যাইতে চান কেন?’ - জিজ্ঞেস
করে ছায়ামুর্তি।
’কেন অসুবিধা কি? এটা কি রিজার্ভ বাস?
দেখ আমি খুব সমস্যায় পড়েছি। আমার খুব
যাওয়া দরকার’ - আমি সাফাই গাইতে
থাকি।
’আমরাই তিনদিন ধইরা যাইতে চেষ্টা
করতাছি তা পারতাছিনা। আর আপনে
আইজকা আইসাই যাইতে চাইতাছেন?’ - কে
যেন ভিতর থেকে বলে উঠল কথাগুলো।
সম্ভবতঃ বাসের ভিতর থেকে কোন
প্যাসেনঞ্জার।
’আপনি নামেন।’ - হেলপার আমাকে তাড়া
দেয়।
’দেখ আমাকে যেতেই হবে। দরকার হলে
দ্বিগুন ভাড়া দেব। আর বাস তো খালিই
পড়ে আছে। তোমাদের সমস্যা তো ঠিক
বুঝলাম না।’
’সমস্যা আমাদের না। আপনারই হইবো। ভাল
চান তো নামেন’ - হেলপার বলে উঠে।
আমি পাত্তা দিলাম না। মাঝে মাঝে
এরা এরকম ফালতু আচরন করে থাকে।
’আচ্ছা বাসটা এত দেরী করছে কেন?’
বাসের ভিতরেই প্রশ্নটা ছুড়ে দিলাম।
’আমাদের আর একজন বাকি আছে। ও এখনো
আইসা পৌছায় নাই।’ - আবারো ভেতর
থেকেই কেউ একজন বলে উঠল। - ’এই
বুইড়ারে নিতে গিয়াই বাসটা দেরী
কইরা ফালায়। সে জন্যই’- এপাশ থেকে
দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা যায়। - ’তারপরও
কেন যে বুইড়া দেরী কইরা আসে’
কি মুশকিল। প্যাসেন্জার বাস আবার
একজনের জন্য দাড়িয়ে থাকে নাকি?
আমি ভাবতে থাকি। আচ্ছা ডাকাত দল
নয়তো! কিছুদুর গিয়ে বাস ডাকাতি শুরু
করবে?
আমার কাছে তেমন টাকা পয়সা নেই।
আসলে বলতে গেলে কিছুই নেই। তাই ভয়
পাওযার কোন কারনই নেই। যা হবার হবে।
পেছনেই বসে থাকব বলে ঠিক করলাম।
বিপদ দেখলে জানালা দিয়ে পগার পার
হতে চেষ্টা করব।
’ঐ খাড়া। আমি আইয়া পড়ছি।’ - বাইরে
কারো চিৎকার শোনা যায়।
একজন বৃদ্ধ। এর জন্যই কি এতক্ষন দেরী করল
বাসটি? কারন বৃদ্ধ উঠতেই মূহুর্তে তুমুল
বেগে ছুটে চলল বাস। ধীরে ধীরে বৃদ্ধ
লোকটি বাসের পেছন দিকে চলে আসল।
আমার ঠিক সামনের সিটে বসার আগে এক
মুহুর্তের জন্য তার সাথে চোখাচোখি হল
আমার। তার চোখ দেখে ভয়ানক চমকে
গেলাম আমি। নির্জিব ঘোলা দুটি চোখ!
মুহুর্তেই গাড়ীর ভেতরে অন্ধকার নেমে
এল। খুব সম্ভবতঃ বাতি নিভিয়ে দিয়েছে
ড্রাইভার! কিন্তু ঐ চোখ দুটো অমন কেন? ও
কি অন্ধ?
আমি একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম।
সারাদিনের ক্লন্তি ভর করল আমার উপর।
কতক্ষন কেটে গেল জানিনা। হঠাৎ
সম্পুর্নরুপে তন্দ্রার ঘোর কেটে গেল।
চারিদিক নিঝুম অন্ধকার, কোন সাড়া শব্দ
নেই। আমি যেন উড়ে চলেছি অন্ধকারে!
চারিদিকে কিছু চোখে পড়লনা। আমি
তো বাসের ভিতর থাকার কথা। বিষয়টা
কি? দ্রুত উঠে দাঁড়াতেই আবার বাসের
ভিতর আলো জলে উঠল। ঠিক আগের মত
করে প্রান ফিরে পেল যেন বাসটি! ধেৎ,
খুবসম্ভবতঃ ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিলাম।
আমি আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। কতক্ষন
ঘুমিয়েছি বলতে পারবনা। হঠাৎ জোরে
হুইসেলের শব্দে কানে তালা লেগে
গেল। ট্রেনের হুইসেল না? চারপাশে
আবারো সেই অন্ধকার। চিৎকার
চেচামেচির শব্দ শোনা যাচ্ছে। ’আরো
জোরে যা, আরো জোরে’ ’আইজকা পার
হইতেই হইব’ ’জোরে চালা’ ’আমার আইজকা
যাইতেই হইব’ ইত্যাদি ইত্যাদি। হঠাৎ আমার
সামনেই মনে হল সেই বৃদ্ধের গলা শুনলাম।
- জোরে চালা বাবা, আইজকা পার কইরা
দে বাবা, আইজকা পার কইরা দে।’
কানের কাছের ট্রেনের একটানা হুইসেল
আরো বিকট হয়ে বাজছে। - ’অই ড্রাইভার,
জোওে চালা।’ - বুড়ো তাড়া দিচ্ছে
ড্রাইভারকে। আমি আন্দাজে জানালার
দিকে যাবার জন্য চেষ্টা করলাম।
সংঘর্ষের বিকট আওয়াজটা কানে যাবার
ঠিক আগমুহুর্তে বৃদ্ধের চিৎকার কানে
বাজল ’আইজকাও পারলিনা হারামজাদা।’
তারপর আর কিছু মনে নেই।
*************************************
’ভাই আপনে কেডা? বাসের ভিতরে কি
করেন?’ - অস্পস্ট কন্ঠের আওয়াজ কানে
যেতেই আমি ধরমরিয়ে উঠে বসলাম।
কোথায় আমি?
মুখের উপর কেউ ঝুকে ছিল। আমি উঠে
বসতেই সোজা হয়ে দাড়াল। ছেড়া
গেন্জী গায় লুঙ্গি পরিহিত মধ্যবষস্ক একজন
মানুষ।
চারিদিকে তাকাতেই অবাক হয়ে
গেলাম। একটা ভাঙা চোরা বাসের
ভিতরে আধশোয়া আমি। মুহুর্তেই মনে
পড়ে গেল সব। বাস এ্যাক্সিডেন্ট
করেছে। সৌভাগ্য আমার আমি বেঁচে
আছি।
নিজের হাত পা নাক মুখ সব এক নজরে
দেখে নিলাম। কপাল ভালো আমার
কোথাও কোন চোট লাগেনি। তবে
আশ্চর্য হলাম আমি ছাড়া আর কেউ ভিতরে
নেই দেখে। সবাই বের হয়ে গেছে?
আমি একাই পড়ে আছি?
লোকটির সাহায্য নিয়ে বাসের ভিতর
থেকে বের হযে এলাম। রেল লাইনের
ঠিক পাশে প্রায় দুখন্ড হয়ে রয়েছে
বাসটি। পেছনের খন্ডে ছিলাম আমি।
গতকাল রাতে এই বাসেই উঠেছিলাম
আমি। দুমরে মুচড়ে গেলেও চিনতে
পারলাম।
একটু সামনে রেল ক্রসিং দেখতে
পেলাম। ট্রেনটি বাসটিকে এতদুর পর্যন্ত
টেনে হিচড়ে নিয়ে এসেছে!
আশ্চর্যের ব্যাপার আশেপাশে কোথাও
কেউ নেই। এতবড় দুর্ঘটনা ঘটে গেল আর
কেউ এলনা এখানে? নাকি সবাইকে বের
করে নিয়ে গেছে? আমাকে কেউ
খেয়াল করেনি?
’আচ্ছা, বাসের অন্যান্য যাত্রীদের কি
অবস্থা? কেউ কি মারা গেছে?’ - আমি
জিজ্ঞেস করি লোকটিকে।
লোকটি সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকাল।
আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে উল্টো
জিজ্ঞেস করল - 'আপনে কে কনতো?
ভাঙ্গা বাসে ঢুকছিলেন ক্যান এত
সকালে?’
’তুমি কে আগে সেইটা বল? বাসের সব
যাত্রীরাই বা কোথায় গেল?’ - আমি
আসলে কিছুই মেলাতে পারছিনা।
’দেখেন মালিক সাব আমারে বাসের
পাহারাদার বসাইছে। কেউ যাতে কিছু
চুরি না কইরা নিয়া যায় সেইটা দেখার
জন্য। আপনেরে দেইখা তো ভদ্রলোকই
মনে হইতেছে। বাসে উঠছিলেন ক্যান
সেইটা কন’
এই ব্যাটার আচরন রহস্যময়। কিছু একটা গুব্লেট
হয়ে গেছে মনে হচ্ছে। - ’আরে বোকা
তুমি বুঝতে পারছনা গাড়িটা রাতে
এক্সিডেন্ট করেছে আর আমি ভাগ্যগুনে
বেঁচে গেছি।’ - আমি বোঝানোর চেষ্টা
করি লোকটিকে।
আবারো অদ্ভুত সন্দেহজনক দৃষ্টিতে
তাকাল লোকটা আমার দিকে। - ’দেখেন
উল্টাপাল্টা কথা কইয়েননা। তিনদিন ধইরা
গাড়ীর ভিতরে পইরা রইছেন আর কেউ
দেহে নাই কইবার চান?’
এনবার আমার অবাক হবার পালা। ’তিনদিন
মানে? আমিতো গতকাল রাতে বাসে
উঠেছিলাম।’ - আচ্ছা এই লোক
উল্টাপাল্টা কথা বলছে কেন। আমি
চারিদিকে আর কেউ আছে কিনা
দেখলাম।
’আফনে আহেন তো আমার সাথে।
মাস্টারের সাথে কথা কই।’ - লোকটি
আমার হাত টানতে লাগল।
’মাস্টারটা আবার কে?’ - আমি ঝটকা দিয়ে
হাত ছাড়িয়ে নিলাম। ব্যাটা একটা আস্ত
পাগল।
ঐ যে ’আঙ্গুল তুলে ক্রসিংএর পাশে
রেলএর ঘরটা দেখাল। চলেন লাইন
মাস্টারের লগে কথা কই।
গুড আইডিয়া। এই পাগলের সাথে কথা
বলার চেয়ে মাস্টারের সাথে কথা বলাই
উত্তম। আমিও রাজি হলাম।
’কিরে ব্যটা রমজাইন্যা ডাকস ক্যান’।' -
লোকটির ডাকে ভিতর থেকে রেলের
পোষাক পরা একজন - খুব সম্ভবতঃ ক্রসিংএর
ডিউটিরত গার্ড হবে - বের হয়ে এল।
’দেখেন এই লোক’ - আমার দিকে আঙ্গুল
তুলে দেখাল সে - ’আমাগো গাড়ির
পিছে শুইয়া আছিল সক্কাল বেলা। হেয় কয়
হেও এক্সিডিন হইছে।’
আশ্চর্য! সেও সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকাল
আমার দিকে। - ’আপনেরে দেইখা তো
ভদ্রলোক মনে হয়। কি করেন আপনে?’
আমি বল্লাম। সব শেষে এও বল্লাম যে,
গতকাল রাতে ঐ বাসে ছিলাম আমি এবং
এক্সিডেন্ট এর কবলে পড়েছি।
ওরা দুজন মুখ চাওয়া চাওয়ি করল। - ’কথা
সইত্য।’ - লোকটি বলতে শুরু করল। -
’এক্সিডিন হইছে। গার্ডের ভুলের কারনে
খুব খারাপ এক্সিডিন হইছে। থানা পুলিশ
অনেককিছু হইয়া গেছে। কিন্তু
সেইডাতো গত পরশুদিন। ১১ তারিখ
রাইতে। আর আইজতো ১৩ তারিখ তাইনা?’
সত্যিই আজ তের তারিখ। গতকাল সন্ধায়
জরূরী ফোন আসে ঢাকা থেকে। রাতেই
যেতে হবে। গতকাল ১২ তারিখ উপজেলা
লেভেলে বড় একটা প্রোগ্রাম হয়েছে
আমাদের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে। গত
এক মাস ধরেই এই ১২ তারিখ আমার মুখস্ত।
আমার নীরবতা দেখে লোকটি আবারো
বলতে শুরু করল - ’আর গতরাইতে এতবড়
এক্সিডেন্ট হইলে এইখানে মানুষ থাকতো
না? আর লাশগুলা গেল কই? এত তাড়াতাড়ি
উধাও হইয়া গেল?’
’এবার আমার অবাক হবার পালা। লাশগুলো
মানে? লোকজনও মরেছে নাকি?’
’এতবড় একটা এক্সিডিন। মানুষ মরবো না? এয়
কয়কি? এইখান থাইকা ছেঢ়ড়াইয়া বাসটা
দুইটুকরা কইরা ফালাইলো আর আপনে ’-
হতাশ শোনাল লোকটির গলা।
আসলে সত্যিই। বেশ বড় এক্সিডেন্টই
হয়েছে। রাতের ঘটনা একটুমনে করার
চেষ্টা করলাম। ট্রেনের দ্রুত হুইসেল, বাস
ট্রেন সংঘর্ষেও শব্দ, চিৎকার, কান্না -
তারপর আর কিছু মনে নেই। কিন্তু এতবড়
দুর্ঘটনায় আমার কিছুই হলনা? অবাক হয়ে
ভাবি আমি। কোথাও একটু ছড়েও যায়নি
আমার। আশ্চর্য!!
’হায় কপাল এ কিয়ের মইধ্যে পড়লাম সক্কাল
বেলা’ - দেখি রমজান নামের লোকটিও
অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
’খাড়ান খাড়ান, এক মিনিট। আপনেরে
একটা জিনিস দেখাই।’
লোকটি মুহুর্তেও মধ্যে ঘরে ঢুকে একটা
দৈনিক পত্রিকা নিয়ে এল। ’আইজ তো ১৩
তারিখ তাইনা? এইযে দেখেন ১১
তারিখের পেপার।’ - আমাকে পত্রিকার
তারিখটা ভাল করে দেখিয়ে নিল আগে।
দেখছেন তারিখ? এবার দেখেন। পুরো
পত্রিকা মেলে ধরল সে। হেডিং দেখে
তাজ্জব বনে গেলাম। মর্মান্তিক সড়ক
দুর্ঘটনায় ১৭ জন নিহত।
ঠিক নিচেই প্রকাশিত ছবিটা দেখে
শিউরে উঠলাম আমি। সারি সারি লাশের
ছবির; ইনসেটের ছবিটা চিনতে এতটুকু কষ্ট
হলনা। সেই বৃদ্ধের মুখ - যে শেষ মুহুর্তে
ড্রাইভারকে লক্ষ করে বলে উঠেছিল -
’আইজও পারলিনা হারামজাদা।’
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now
X
সরদার আবুবকর বিগোভিট এর বৈঠকখানা।
কথা বলছিল মুহাম্মাদ ইয়েকিনী। ইমাম সাহেবকে উদ্ধারের কাহিনীটাই সে বলছিল। শুনছিল বসে তার আব্বা-আম্মা এবং বোন ফাতেমা মুনেকা।
এই কাহিনী ইয়েকিনী ইতোপূর্বে কয়েকবার বলেছে। কিন্তু শুনে যেন কারও তৃপ্তি নেই। স্বাদ যেন কাহিনীর বাড়ছেই। পিতার নির্দেশে তাই তাকে কাহিনীটা আবার বলতে হচ্ছে।
বিশাল বৈঠকখানাটি আজ সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো। আজ সরদার আবুবকর বিগোভিট আহমদ মুসার সম্মানে এলাকার গণ্যমান্যদের দাওয়াত করেছে।
কেউ এসে এখনও পৌঁছায়নি। আহমদ মুসা গেছে হাসান ইকোকুকে সাথে নিয়ে এলাকাটা ঘুরে দেখতে। গত দু’দিন আহমদ মুসা শুধু বেড়িয়েই কাটিয়েছে। মুসলমানদের ঘরে ঘরে গেছে। বাচ্চাদের কোলে নিয়েছে। রোগীদের পাশে গিয়ে তাদের সান্ত্বনা দিয়েছে। কুন্তা কুম্বে এলাকায় একটা ভালো ক্লিনিক করার জন্যে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এলাকাটা দেখে, এলাকার মুসলমানদের সাথে কথা বলে আহমদ মুসা মন্তব্য করেছে, ক্রস-এর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ক্যামেরুনে সংঘবদ্ধ যে প্রতিরোধ এতদিন হতে পারেনি, এখান থেকে তা শুরু হতে পারে।
‘কোক’-এর কাছ থেকে যে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, তা দিয়ে একটা প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলার ব্যবস্থা আহমদ মুসা করেছে।
জন স্টিফেন, ফ্রাসোয়াসহ ‘কোক’দের যাদেরকে আটক করা হয়েছে, তাদের কুন্তা কুম্বে এলাকার অনেক উত্তরে একটা মুসলিম এলাকায় আটক রাখা হয়েছে। তাদের মাধ্যমে কোককে জানানো হয়েছে, চারটি শর্ত পূরণ করলে তাদেরকে মুক্তি দেয়া হবে। কিন্তু কতজন এবং কারা বন্দী আছে, সে কথা ‘কোক’কে জানতে দেয়া হয়নি। অন্যদিকে পুলিশকে বলা হয়েছে, আক্রমণকারী প্রায় সবাই মারা গেছে। এই সতর্কতার মাধ্যমে বাইরের প্রতিক্রিয়া এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অন্যদিকে জন স্টিফেন ও ফ্রাসোয়াকে আরও চাপের মধ্যে ফেলা হয়েছে, যাতে তারা দাবি মেনে নিতে তৎপর হয়।
প্রথম শর্ত হলোঃ কুন্তা কুম্বে এলাকার যে জমিখণ্ড ‘কোক’ প্রতারণামূলকভাবে কিনে নিয়েছে এবং ইয়াউন্ডিগামী হাইওয়ের দক্ষিণে ইদেজা অঞ্চলের যে হাজার হাজার একর মুসলিম ভূমিখণ্ড ‘কোক’ গত পাঁচ বছরে জাল দলিল, জবরদস্তিমূলক ক্রয় এবং নানা প্রতারণার মাধ্যমে দখল করে নিয়েছে, তা ফেরত দিতে হবে। দ্বিতীয় শর্তঃ ইদেজা অঞ্চল থেকে গত পাঁচ বছরে উচ্ছেদকৃত মুসলমানদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে যাতে তারা আবার বাড়ি-ঘর তৈরি করে পুনর্বাসিত হতে পারে। তৃতীয় শর্তঃ প্রকৃত খ্রিস্টান মিশনারীরা তাদের কাজ চালাতে পারবে, কিন্তু সেবার নামে ষড়যন্ত্ররত সকল এনজিও-এর কাজ বন্ধ করে দিতে হবে। এবং চতুর্থ শর্ত হলোঃ ‘কোক’কে তার অতীতের সকল দুষ্কর্ম স্বীকার করে লিখিতভাবে মুসলমানদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। ‘কোক’ যতদিন এ শর্তগুলো পূরণ না করবে, ততদিন ‘কোক’-এর লোকদের আটক রাখা হবে।
সরদার আবুবকর বিগোভিট এবং তার পরিবারের সদস্যরা বৈঠকখানায় বসে মেহমানদের অপেক্ষা করছে এবং ইয়েকিনীর কাছ থেকে কাহিনী শুনছে ইমাম সাহেবকে উদ্ধারের।
কাহিনী শেষ করে থামল মুহাম্মাদ ইয়েকিনী।
‘সেদিনের সে ভোর থেকে আজ পর্যন্ত আহমদ মুসা ভাইয়ার সবকিছুই আমার কাছে রূপকথা মনে হচ্ছে। আর তিনি যেন রূপকথার সর্বজয়ী এক রাজপুত্র।’ বলল ফাতেমা মুনেকা।
‘কিন্তু রাজপুত্রের রাজকন্যা তো নেই।’ বলল মুহাম্মাদ ইয়েকিনী।
‘থাকবে না কেন, তার রূপকথার জগত তো আমরা দেখিনি, আমরা চিনি না।’ বলল ফাতেমা মুনেকা।
‘সত্যি বলেছিস মা, তার আমরা কিছুই চিনি না, কিছুই জানি না। মাঝে মাঝে আমার মনে কি হচ্ছে জানিস, ও আসলে ফেরেশতা। আল্লাহ পাঠিয়েছেন আমাদের মত অসহায়দের জন্যে। দেখ না, কি দুঃসময়ে সে নাযিল হয়েছে, আর কিভাবে সব ঘটনার মোড় আমাদের অনুকূলে ফিরিয়ে দিল।’ বলল সরদার আবুবকর বিগোভিট।
তার কথা শেষ না হতেই হেসে উঠেছিল ফাতেমা মুনেকা। তার আব্বা থামতেই সে বলল, ‘আব্বা তুমি মজার কথা মনে করিয়ে দিয়েছ। আমি কালকে যাচ্ছিলাম স্কুলের দিকে। ‘মোকাচি’ চাচাজানের চার বছরের মেয়েটি ছুটে আমার কাছে এসে বলল, ‘ফেরেশতা কোথায়? আসেনি?’
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, ‘ফেরেশতা কোথায়? আসবে কোত্থেকে?’
‘ইশ, মিথ্যে বলছ। বল না।’
আমি বললাম, ‘বোকা মেয়ে। আমি ঠিক বলছি। ফেরেশতা কোত্থেকে আসবে?’
এই সময় চাচী মা এলেন। তিনি শুনছিলেন আমাদের কথা। হেসে বললেন, ‘আয়েশা ঠিকই বলেছে।’
‘কি ঠিক বলেছে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘তুমি জান না? তোমাদের যে মেহমান, তাকে তো সবাই ফেরেশতা বলছে।’
‘কেন?’
‘এমন মানুষ হঠাৎ কোত্থেকে আসবে? আর এমন সময়ে? আল্লাহ তো ফেরেশতা পাঠান এভাবে।’
উত্তরে আমি কিছু বলিনি আব্বা। হাসতে হাসতে চলে গিয়েছিলাম। এখন দেখছি, তুমিও একই কথা বলছ।’
‘ওদের কোন দোষ নেই, আমারও দোষ নেই। যখন কোন ঘটনার কোন বোধগম্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না, তখন এভাবে একটা উত্তর যোগাড় করে নিতে হয়। তাছাড়া এভাবে ফেরেশতা তো আল্লাহ পাঠাতে পারেন মানুষের সাহায্যে।’
ফাতেমা মুনেকা গম্ভীর হলো। বলল, ‘ঠিকই বলেছ আব্বা, ব্যাখ্যা না পেয়েই আমি তাকে রূপকথার রাজপুত্র বলেছি। একইভাবে ফেরেশতাও তাকে বলা যেতে পারে। কিন্তু আসলেই উনি কে আব্বা?’
এই সময় বাইরে গলার শব্দ পাওয়া গেল।
মুহাম্মাদ ইয়েকিনী তাড়াতাড়ি উঠে গেল। বাইরে একটু নজর বুলিয়ে ভেতরে মুখ বাড়িয়ে বলল, ‘ইমাম সাহেব এসেছেন।’
ফাতেমা মুনেকা এবং তার মা সঙ্গে সঙ্গেই উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘আমরা পর্দার ওপাশে যাচ্ছি।’ বলে চলে গেল পর্দার ওপাশে।
বৈঠকখানার বিরাট হল ঘরের একটা অংশকে পর্দা টাঙিয়ে আলাদা করা হয়েছে।
ইয়েকিনী ইমাম সাহেবকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল।
মধ্যবয়সী ইমাম সাহেবের নাম আলী উকেচুকু। সে লেখাপড়া করেছে নাইজেরিয়ার ঐতিহাসিক মুসলিম নগরী ‘কানো’র ‘আল জামেয়াতুল ইসলামিয়া’ বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ইমাম আলী উকেচুকু শুধু ইমামের দায়িত্বই পালন করেন না, এখানকার মাদ্রাসায় তিনি শিক্ষকতাও করেন। সরদারের তিনি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উপদেষ্টারও দায়িত্ব পালন করেন।
ইমাম সাহেব বসলে সরদার ইমাম সাহেবকে লক্ষ্য করে বলল, ‘আপনি আসার আগের মুহূর্তে ফাতেমা মুনেকার প্রশ্ন ছিল, অলৌকিক মেধা ও বুদ্ধিসম্পন্ন আমাদের মেহমানের আসল পরিচয় কি?’
ইমাম আলী উকেচুকুর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল আনন্দে। বলল, ‘আমিও দু’দিন ধরে এ বিষয়টা ভেবেছি। আমি মনে হয় তাকে চিনতে পেরেছি সরদার।’
‘আপনি তাকে চিনতে পেরেছেন হুযুর?’ পর্দার ওপার থেকে বলল ফাতেমা মুনেকা।
‘হ্যাঁ মা, আমি তাকে চিনতে পেরেছি। আমি এখানে আসার আগে টেবিলের কাগজপত্র গোছাতে গিয়ে গত বছর ‘কানো’র আন্তর্জাতিক সেমিনার থেকে যে কাগজপত্র এনেছিলাম, তা হাতে পড়ল। সে কাগজপত্র ঘাঁটার সময় যত্ন করে একটা এনভেলাপে তুলে রাখা ফটো পেয়ে গেলাম। ফটোটা ওখানকার দৈনিক থেকে কেটে নিয়েছিলাম। এই ফটোর দিকে নজর পড়ার সাথে সাথে সব কিছু মনে পড়ে গেছে আমার।’
‘ফটোটা কার?’ ইয়েকিনীর কণ্ঠে অধৈর্য্যের সুর।
‘এই ফটোটাই আমাদের মেহমান আহমদ মুসার।’
‘এতে আর কি হলো? কি বোঝা গেল?’ বলল ইয়েকিনী।
‘বলছি বাবা।’ বলে হাসল ইমাম সাহেব। তারপর একটু থামল। গম্ভীর হলো তার মুখ। বলল, ‘আসলে আমি বড় বোকা। মেহমানের নাম শুনে এবং তার কাজ দেখেই আমার বোঝা উচিত ছিল ইনি কে? কিন্তু আমি পারিনি। কারণ, নাম একইরকম হলেও বহু বিপ্লবের নায়ক, বিশ্ববিখ্যাত ব্যক্তিত্ব যে আমাদের এই কুন্তা কুম্বেয় আমাদের মাঝে আসবেন তা ভাবতেই পারিনি।’
ইমাম সাহেবের কথা শেষ না হতেই ইয়েকিনী ছিটকে উঠে দাঁড়াল এবং পর্দার ওপার থেকে ফাতেমা মুনেকা ছুটে বেরিয়ে এল মাথা ও গায়ের চাদর জড়িয়ে ধরে। বলল দু’জনেই, ‘হুযুর, এ আপনি কি বলছেন, ইনিই কি সেই আহমদ মুসা?’ তাদের দু’জনের চোখে-মুখে আকাশজোড়া বিস্ময় উপচে পড়ছে।
‘কোন আহমদ মুসার কথা বলছ? তোমরা চেন তাকে?’ বলল সরদার আবুবকর।
‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে মক্কার রাবেতা জার্নালে তার সম্পর্কে পড়েছি। অন্যান্য কাগজেও পড়েছি। আব্বা, ফিলিস্তিন, মিন্দানাও, মধ্য এশিয়া, ককেশাস, বলকান, স্পেন প্রভৃতি বিপ্লব ও পরিবর্তনে তিনিই নেতৃত্ব দিয়েছেন।’
বৃদ্ধ আবুবকর বিগোভিট-এর চোখে-মুখে নেমে এল প্রথমে একরাশ বিস্ময়! তারপর সে বিস্ময়ের স্থানে ফুটে উঠল উজ্জ্বল এক আনন্দের দ্যুতি। বলল, ‘ঠিকই বলেছ তোমরা। যাকে ফেরেশতা ভেবেছি, তিনি ফেরেশতা না হলেও জগতের শ্রেষ্ঠ মুজাহিদ অবশ্যই হবেন।’
ইমাম আলী উকেচুকু পকেট থেকে খবরের কাগজ থেকে কেটে নেয়া একটি ছবি টেবিলে রাখল।
ইয়েকিনী ও ফাতেমা মুনেকা ঝুঁকে পড়ল ছবির উপর। সাদা শার্টের উপর কোট-টাই পরা একজন যুবক। ছবিটির নিচে ক্যাপশনঃ ‘আহমদ মুসা- গ্রেটেস্ট রিভ্যুলুশনারী অব দ্য এজ’।
ফাতেমা মুনেকা ছবিটি নিয়ে ছুটে তার পিতার কাছে গিয়ে বলল, ‘দেখ আব্বা, আমাদের মেহমান। কোন পার্থক্য নেই। ইউরোপীয় পোশাক বাদ দিয়ে দেখ।’
বাইরে পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। ঘরের সবাই সেদিকে তাকাল।
ঘরে এসে প্রবেশ করল আহমদ মুসা এবং হাসান ইকোকু। দরজায় পা দিয়েই আহমদ মুসা সালাম দিয়েছিল।
সালাম নিয়ে ফাতেমা মুনেকা ছুটল হাসান ইকোকুর দিকে। তার সামনে ছবিটি মেলে ধরল। ছবি ও ক্যাপশনের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঞ্চিত হলো হাসান ইকোকুর। সে ছবি থেকে চোখ তুলে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। তার চোখে অফুরান বিস্ময় ও শত জিজ্ঞাসা।
আহমদ মুসা তার এই পরিবর্তন দেখে তার দিকে এগিয়ে গেল এবং ছবিটি নিল মুনেকার হাত থেকে। ছবির দিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা সে বুঝল। হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে।
কিন্তু সে তাকিয়ে দেখল, কারও মুখে হাসি নেই। শুধু তাই নয়, আহমদ মুসা ঘরে ঢোকার সাথে সাথে সরদার আবুবকর, ইমাম আলী উকেচুকুসহ সবাই দাঁড়িয়ে গেছে এবং দাঁড়িয়ে আছে। সবাই বিস্ময়-বিহ্বলতা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
আহমদ মুসা ছবিটা ফাতেমা মুনেকার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে চেয়ারে এসে বসল এবং সবাইকে বসতে অনুরোধ করে বলল, ‘বুঝতে পারছি, আমার পরিচয় আপনারা জেনে গেছেন। আমিও গোপন রাখতাম না।’
সবাই বসল। কিন্তু মুহাম্মাদ ইয়েকিনী ও হাসান ইকোকু আগে হলে যেভাবে কাছে এসে বসত, সেভাবে তারা বসল না। বসল দূরে গিয়ে।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘ইয়েকিনী, হাসান ইকোকু, আমার পরিচয় প্রকাশ হয়ে পড়ার পর আমি কি পর হয়ে গেলাম, দূরে সরে গেলে এমন করে!’
কিন্তু তাদের মুখভাবের পরিবর্তন ঘটল না। তারা কথা বলল না। বলতে পারল না।
বিস্ময় ও সংকোচের জড়তা সবাইকে জড়িয়ে আছে।
অস্বস্তিকর নীরবতা ভাঙল সরদার আবুবকর। বলল, ‘কি বলব, কিভাবে বলব বুঝতে পারছি না। ইমাম সাহেবের কাছে ছবি দেখে আমরা আপনার পরিচয় জানতে পেরেছি। ইয়েকিনী ও ফাতেমাও আপনার সম্পর্কে অনেক পড়েছে শুনলাম। এত বড় অতিথি যে আমাদের মাঝে, বুঝতে পারিনি আমরা। কত যে বেআদবি হয়েছে আমাদের!’ আবেগে রুদ্ধ হয়ে গেল বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর। তার দু’চোখ দিয়ে বেরিয়ে এল দু’ফোঁটা অশ্রু।
আহমদ মুসা বৃদ্ধের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, ‘আপনি আমার পিতার মত। আপনি এভাবে কথা বললে আমি দুঃখ পাব। আমার প্রতি বিশেষ সম্মান প্রদর্শন আমাকে খুব পীড়া দেয়। আপনাদের কাছে আমার পরিচয় না দেয়ার একটা বড় কারণ এটাই। আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়, আমি মুসলিম, আমি আপনাদের কারও সন্তান, কারও ভাই- এ পরিচয়কেই আমি সবচেয়ে ভালবাসি।’ আহমদ মুসার কথাগুলো খুব শান্ত, খুব ভারি শোনাল।
আহমদ মুসার হৃদয় নিঃসৃত কথাগুলো অন্তর স্পর্শ করল সকলের। এক আনন্দময় আবেগ ফুটে উঠল তাদের চোখে-মুখে।
কিন্তু কথা কেউ বলতে পারল না। এবারও বৃদ্ধ সরদারই মুখ খুলল। বলল, ‘আপনি কত বড়, একথাগুলোও তার প্রমাণ...’
কথা শেষ করতে পারলো না সরদার আবুবকর। বাইরে অনেকগুলো পায়ের শব্দ এবং অনেকের কণ্ঠ শোনা গেল।
বৃদ্ধ সরদার চোখ মুছে মুহাম্মাদ ইয়েকিনীকে বলল, ‘মেহমানদের নিয়ে এস, বসতে দাও।’
ফাতেমা মুনেকা উঠে চলে যাচ্ছিল পর্দার ওপারে মেয়েদের জন্যে নির্দিষ্ট জায়গায়। তার চোখের দুই কোণ অশ্রুসিক্ত।
‘ফাতেমা বোন।’ ডাকল আহমদ মুসা।
ফাতেমা থমকে দাঁড়িয়ে ফিরে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়েছিল। ফাতেমা মুনেকার দিকে এক ধাপ এগিয়ে বলল, ‘রিপোর্টের রেকর্ড সম্পূর্ণ করেছ?’
ফাতেমা মুনেকা চোখ তুলে তাকাতে পারল না আহমদ মুসার দিকে। মুখ নিচু রেখেই বলল, ‘জ্বি, সম্পূর্ণ করেছি।’ ফাতেমা মুনেকার কথা সংযত ও সম্ভ্রমপূর্ণ।
‘ইদেজার রিপোর্টও রেকর্ড করেছ?’
ফাতেমা মুনেকা আহমদ মুসার দিকে এক পলক তাকিয়ে বলল, ‘জ্বি, করেছি।’
‘ধন্যবাদ, ফাতেমা।’ বলে আহমদ মুসা তার চেয়ারে ফিরে এল।
ফাতেমা চলে গেল।
সব মেহমান আসার পর খাওয়ার আগে সরদার আবুবকর বিগোভিট আহমদ মুসার নতুন পরিচয় প্রকাশ করল সকলের কাছে। সকলেই আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মত খুশি হলো। সকলে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে স্বাগত জানাল আহমদ মুসাকে।
আহমদ মুসাও বর্তমান সংকটকালের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে কিছু বলল।
খাবার শেষে সকলে চলে যাবার পর সরদার আবুবকরের বৈঠকখানায় বসে থাকল আহমদ মুসা, মুহাম্মাদ ইয়েকিনী, হাসান ইকোকু, সরদার আবুবকর। পরে ফাতেমা মুনেকা এবং তার মা’ও এসে বসল।
এবার প্রথম কথা বলল হাসান ইকোকু। বলল আহমদ মুসাকে উদ্দেশ্য করে, ‘কিছু মনে করবেন না। মনে হচ্ছে, আপনি এক নিমেষে আকাশে উঠে গেছেন এবং আমরা মাটিতে রয়েছি। কিছুতেই যেন আপনার নাগাল পাচ্ছি না।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘এটা আমার দুর্ভাগ্য।’
‘তা মনে করতে পারেন। কিন্তু জাতির জন্যে এটা সৌভাগ্য।’ বলল ফাতেমা মুনেকা।
‘তাহলে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকাটাই আমার ভাগ্য?’
‘উপরে থাকাকে বিচ্ছিন্ন বলে না।’ বলল ইয়েকিনী।
‘আপনার সম্পর্কে আমরা অনেক কিছু জানতে চাই।’ বলল হাসান ইকোকু।
‘কিছুই জানার নেই। বলেছি, আমার জন্ম মধ্য এশিয়ার সিংকিয়াং-এ। আর নাম তো আমার জানই। অন্য সব কথাই শুনেছ।’
আহমদ মুসা একটু থামল। শুরু করল আবার, ‘জনাব, আজ আমি ইয়াউন্ডি যেতে চাই।’ সরদারকে উদ্দেশ্য করে বলল আহমদ মুসা।
সকলের মুখ ম্লান হয়ে গেল আহমদ মুসার একথায়। হঠাৎ পাল্টে গেল ঘরের পরিবেশ।
বৃদ্ধ সরদার দ্রুত কণ্ঠে বলল, ‘যাবেন? কেন? আজই? এদিকে যে সমস্যা থেকেই গেল?’
‘এত তাড়াতাড়ি কেন? নিশ্চয় অসন্তুষ্ট হয়েছেন?’ বলল মুহাম্মাদ ইয়েকিনী।
‘না, আপনার যাওয়া হবে না। গত দু’দিন যিনি ছিলেন, তিনি প্রকৃত আহমদ মুসা নন। আজ আমরা প্রকৃত আহমদ মুসাকে পেলাম। কমপক্ষে দু’দিন থাকতে হবে।’ বলল ফাতেমা মুনেকা।
হাসল আহমদ মুসা। সকলেই হাসল মুনেকার একথায়।
‘ফাতেমা বোন, যদি সব কথা জানতে, দু’দিন নয়, দু’ঘণ্টাও থাকতে বলতে পারতে না।’ একটু থামল আহমদ মুসা। টেবিলে রাখা গ্লাস থেকে পানি খেল। তারপর বলল, ‘যে ভোরে আমি এখানে এসেছি, সেই ভোরেই আমি ইয়াউন্ডি পৌঁছতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আযান শুনে নামায পড়তে এসে আটকে গেলাম। আল্লাহই এখানে আমাকে নিয়ে এসেছিলেন। এখানকার জরুরি কাজগুলো শেষ হয়েছে। আর দেরি করা যায় না।’
‘দেখুন, কত বড় ভুল আমাদের! আপনাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি, ক্যামেরুনে আসার আপনার উদ্দেশ্য কি? ইয়াউন্ডিতে কেন যাচ্ছিলেন?’ বলল সরদার আবুবকর।
‘ঠিক বলেছ আব্বা। এমন জিজ্ঞাসা আমাদের মনে জাগা উচিত ছিল। আমি আমেরিকান জার্নালের এক রিপোর্টে পড়েছিলামঃ ‘আহমদ মুসা ঝড়ের ডাকে ঝড় নিয়েই কোথাও যায়। তার প্রতিটি পদক্ষেপ ইতিহাস।’ বলল ফাতেমা মুনেকা।
‘একদিক দিয়ে ঠিকই বলেছে ওরা। ঝড়ো পরিস্থিতিই আমাকে টেনে নিয়ে যায়, অথবা ঠেলে নিয়ে যায়। ক্যামেরুনে মুসলিম জাতিসত্তা বিলোপের যে ঝড় উঠেছে, ‘ক্রস’-এর আগ্রাসী বন্যা ‘ক্রিসেন্ট’কে ভাসিয়ে নেয়ার যে পরিস্থিতি- তা-ই আমাকে ক্যামেরুনে টেনে এনেছে।’
থামল আহমদ মুসা। সকলের চোখ আহমদ মুসার উপর নিবদ্ধ।
গম্ভীর হয়ে উঠেছে আহমদ মুসার মুখ। শুরু করল তার কথা আবার, ‘দু’জন লোককে ফ্রান্স থেকে কিডন্যাপ করে আনা হয়েছে ক্যামেরুনে। মূলত তাদের উদ্ধারের জন্যেই আমি তাদের পেছনে পেছনে ছুটে এসেছি ক্যামেরুনে।
এই কিডন্যাপের পেছনে জড়িয়ে রয়েছে ক্যামেরুনের দক্ষিণাঞ্চল থেকে মুসলিম উচ্ছেদের বিরাট এক কাহিনী। সমগ্র দক্ষিণ ক্যামেরুনের মত উপকূলীয় কাম্পু উপত্যকা থেকেও মুসলমানদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। এই কাম্পু ছিল দক্ষিণ ক্যামেরুনের সর্বশেষ মুসলিম বসতি। কিন্তু কাম্পু উপত্যকা থেকে সব মুসলিম পরিবার উচ্ছেদ হলেও দশ হাজার একরের একটা ভূখণ্ডের মালিক ওমর বায়া খ্রিস্টানদের ভয়, হুমকি, নির্যাতন কোন কিছুর কাছে নতি স্বীকার করেনি। তার আব্বাকে খুন করা হয়। যখন কাম্পু এলাকায় তার এক পরিবারের জন্যে বাস করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়, সে পালিয়ে আসে উত্তর ক্যামেরুনের পশ্চিমাঞ্চলে। তবু সে জমি খ্রিস্টানদের দেয়নি। ‘কোক’-এর সন্ত্রাসবাদী সহযোগী সংগঠন ‘ওকুয়া’ ছুটে আসে ওমর বায়ার পেছনে পেছনে। তারা ওমর বায়াকে খুন করার জন্যে হামলা করে, ওমর বায়া প্রাণ বাঁচাতে সমর্থ হয়। কিন্তু খুন হয় তার মা। প্রাণ বাঁচাবার জন্যে ওমর বায়া পালিয়ে যায় ফ্রান্সে। ‘ওকুয়া’ও ছুটে যায় ফ্রান্সে। ‘ব্ল্যাক ক্রস’-এর সাহায্য নিয়ে তারা চেষ্টা করে ওমর বায়াকে কিডন্যাপ করতে।’
এইভাবে আহমদ মুসা কিভাবে এক হোটেলে ওমর বায়াকে বাঁচাতে গিয়ে তার সাথে আহমদ মুসার পরিচয় হয়, কিভাবে ব্ল্যাক ক্রস পরে ওমর বায়াকে কিডন্যাপ করে, কিভাবে আহমদ মুসা তাকে উদ্ধার করে, কিভাবে ওমর বায়া আবার কিডন্যাপ হয় এবং তাকে কিভাবে কফিনে করে ক্যামেরুনে নিয়ে এসেছে, তার বিস্তারিত কাহিনী বর্ণনা করে আহমদ মুসা বলল, ‘‘ব্ল্যাক ক্রস’ ও ‘ওকুয়া’ ক্যামেরুনের চীফ জাস্টিসের এক প্রিয়জনকেও কিডন্যাপ করে এনেছে। তাদের লক্ষ্য, তাকে পণবন্দী রেখে চীফ জাস্টিসকে বাধ্য করে ওমর বায়ার জমি তারা হস্তান্তর করে নেবে এবং তারপর ওমর বায়াকে খুন করে সব সমস্যার ইতি ঘটাবে।’
থামল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা থামলেও কেউ কোন কথা বলল না। সকলের বিস্ময় ও বেদনাপীড়িত দৃষ্টি আহমদ মুসার উপর নিবদ্ধ। আর তাদের চোখে ভাসছে আহমদ মুসা বর্ণিত কাহিনীর দৃশ্যগুলো।
বেশ কিছু পর কথা বলল মুহাম্মাদ ইয়েকিনী, ‘আপনি এসেছেন, ‘ব্ল্যাক ক্রস’ এবং ‘ওকুয়া’ কি জানে?’
‘বোধ হয় জানে না। আমি মরে গেছি- এই ধারণা তারা নিশ্চয় এখনও পোষণ করে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কেন?’ বলল হাসান ইকোকু।
‘ফ্রান্সের লা-ইল থেকে যখন তারা ওমর বায়াকে কিডন্যাপ করে, আমি তাদের পিছু নিয়েছিলাম। পথে এক জায়গায় ওরা আমার গাড়িতে বোমা হামলা চালায়। বোমা বিস্ফোরণের পূর্ব মুহূর্তে আমি গাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে সমর্থ হই। বোমা বিস্ফোরণে গাড়ি টুকরো টুকরো হয়ে যায়। আমি যখন পথের পাশে ঝোপের আড়ালে অবসাদগ্রস্তের মতো নির্জীব হয়ে পড়েছিলাম, তখন ওরা প্রজ্জ্বলিত গাড়ি দেখে নিশ্চিত হয়ে যায় যে, আমি গাড়ির সাথে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছি।’
‘কিন্তু তারপরও তো ওদের সাথে আপনার সংঘাত হয়েছে?’
‘হয়েছে। কিন্তু সেটা যে আমি ছিলাম সেটা তারা সম্ভবত বোঝেনি।’
আহমদ মুসা থামলেও কেউ কথা বলল না।
ফাতেমা মুনেকা একটু পর বলল, ‘‘ব্ল্যাক ক্রস’ ও ‘ওকুয়া’ এখানে ‘কোক’-এর লোকদেরও সহায়তা পাবে। এদের মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে আপনি একা।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘শত্রু কত বড়, কত শক্তিশালী সেটা ভাবার সময় নয় এটা। আমি এখন যুদ্ধক্ষেত্রে। আমার লক্ষ্য আমার ভাইকে মুক্ত করা, শত্রুর ষড়যন্ত্র প্রতিরোধের চেষ্টা করা। সাফল্য-ব্যর্থতা আমার হাতে নয়, সে চিন্তাও আমার নেই।’
‘বাবা, এই আল্লাহ নির্ভরতাই আপনাকে জগতজোড়া নাম দিয়েছে, সাফল্য দিয়েছে। আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘজীবী করুন।’
‘আমাদের একটি ছোট্ট সংগঠন আছে।’ বলল হাসান ইকোকু।
‘সংগঠন? কি নাম?’ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার।
‘ক্যামেরুন ক্রিসেন্ট।’ বলল মুহাম্মাদ ইয়েকিনী।
‘বাহ, সুন্দর নাম! কবে করেছ? কোথায় অফিস? কতজন সদস্য? কি উদ্দেশ্য?’ প্রশ্নের বান ডাকল আহমদ মুসার আনন্দিত মুখে।
‘ইয়াউন্ডির মুসলিম ছাত্র-যুবক মিলে আমরা করেছি। দুয়ালাসহ কয়েকটি শহরে আমরা শাখা করেছি। সব মিলে আমাদের সদস্য সংখ্যা এখন পাঁচশ’। ইয়াউন্ডিতে আমাদের মূল অফিস। আমাদের লক্ষ্য, মুসলমানদেরকে আর্থিক ও আইনগত সহায়তা দেয়া এবং তাদের পুনর্বাসনে সাহায্য করা।’
‘চমৎকার। তোমাদের নেতা কে?’
চট করে জবাব দিল মুহাম্মাদ ইয়েকিনী। বলল, ‘আমাদের হাসান ইকোকু সেক্রেটারি জেনারেল।’
মুহাম্মাদ ইয়েকিনীর কথা শেষ না হতেই আহমদ মুসা উঠে গিয়ে হাসান ইকোকুকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়ে বলল, ‘মোবারকবাদ হাসান।’
লজ্জিত হাসান ইকোকু মাথা নত করে বলল, ‘দোয়া করবেন।’
বলেই হাসান ইকোকু ইয়েকিনীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘নিজের কথা বলেনি ও। ইয়েকিনী আমাদের সংগঠনের পরিকল্পনা সম্পাদক।’
আহমদ মুসা ইয়েকিনীকে কাছে টেনে নিয়ে তার পিঠ চাপড়ে বলল, ‘আসল পদটা তুমি পেয়েছ ইয়েকিনী।’
‘তোমাদের সভাপতি কে?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘গারুয়ার রাজপুত্র আবদুল্লাহ রাশিদি ইয়েসুগো। সেও ইয়াউন্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।’
‘‘গারুয়ার রাজপুত্র’ কথার অর্থ পরিষ্কার হলো না।’ বলল আহমদ মুসা।
‘উত্তর ক্যামেরুনের মান্দারা পর্বতের দক্ষিণে নাইজেরিয়া ও চাদ-এর মাঝখানে বেনু নদী এবং বেনুর উপনদীগুলো দ্বারা বিধৌত বিশাল উপত্যকার নাম গারুয়া। এই গারুয়া উপত্যকার মাঝখানে বেনু নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত ‘গারুয়া’ নগরী। নাইজেরিয়ার ‘কানো’ যেমন নাইজেরিয়ার ঐতিহাসিক মুসলিম নগরী, তেমনি ‘গারুয়া’ ক্যামেরুনের ঐতিহ্যবাহী মুসলিম শহর। এই শহর ছিল ‘গারুয়া’ উপত্যকা, লেক চাদ পর্যন্ত ক্যামেরুনের গোটা এলাকা এবং চাদ ও নাইজেরিয়ার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত মুসলিম সালতানাতের রাজধানী। উনবিংশ শতকে ফরাসি শাসন প্রতিষ্ঠিত হবার সময় ইয়েসুগো রাজবংশের মুসলিম শাসকের সাথে তাদের ঘোরতর যুদ্ধ হয়। শেষ পর্যন্ত ফরাসীরা তাদের স্বায়ত্তশাসন স্বীকার করে নেয়। পরে ঔপনিবেশিক ষড়যন্ত্রে ইয়েসুগো মুসলিম সালতানাতের অবলুপ্তি ঘটলেও ইয়েসুগো পরিবার উত্তর ক্যামেরুনের গারুয়া উপত্যকায় অত্যন্ত প্রভাবশালী। ভূখণ্ডগত সালতানাত তাদের না থাকলেও মানুষের মনের সালতানাতে তারা এখনও বাদশাহ। আবদুল্লাহ রাশিদি ইয়েসুগো গারুয়ার এই রাজবংশের সন্তান। ইতিহাসের ছাত্র সে। আপনার দেখা পেলে সে আকাশের চাঁদ পাওয়ার মত খুশি হবে।’ দীর্ঘ বক্তব্যের পর থামল ইয়েকিনী।
‘ইয়েকিনীর বর্ণনার মধ্যে উৎসাহ যেন একটু বেশিই ছিল, তাই না হাসান? তবে রক্ষা, রাজকন্যার বিবরণ আসেনি।’ মুখ টিপে হেসে বলল ফাতেমা মুনেকা।
মুহাম্মাদ ইয়েকিনীর মুখে লজ্জার একটা ছায়া নামল। তাদের আব্বা-আম্মা যেখানে বসেছিল সেদিকে এক পলক চেয়ে বিক্ষুব্ধ কণ্ঠে ইয়েকিনী বলল, ‘চোরের সাক্ষী বানানো হচ্ছে গাঁইট কাটাকে। বলব তোদের দু’জনের কথা আহমদ মুসা ভাইকে?’
ইয়েকিনীদের আম্মা কিছু আগে ভেতরে গিয়েছিল এবং তাদের আব্বাও সম্ভবত উঠে গিয়েছিল টয়লেটে।
‘ক্ষেপছ কেন? আমি মিথ্যা বা খারাপ কিছু বলিনি।’ বলল ফাতেমা মুনেকা।
ইয়েকিনীর কথায় ফাতেমা মুনেকা ও হাসান ইকোকু দু’জনের মুখেই বিব্রতকর ভাব ফুটে উঠেছিল।
ইয়েকিনী কিছু বলতে যাচ্ছিল, আহমদ মুসা তাকে বাঁধা দিয়ে হেসে বলল, ‘আমি জানি, তোমরা মিথ্যা কেউ বলনি। ফাতেমা ও হাসানকে আমি দেখছি। তাদের কথা না বললেও চলবে। ইয়েসুগো রাজকন্যার কথা আরেকদিন শুনব।’
মুহাম্মাদ ইয়েকিনী, ফাতেমা মুনেকা, হাসান ইকোকু তিনজনের চোখে-মুখেই এক ঝলক লজ্জা নেমে এল। মুখ নিচু করেছিল তারা তিনজনেই।
কথা শেষ করে একটু থামল আহমদ মুসা। গম্ভীর হলো তার মুখ। বলল, ‘তোমাদের ‘ক্যামেরুন ক্রিসেন্ট’-এর কথা শুনে কি খুশি হয়েছি বোঝাতে পারবো না। আমি আফ্রিকার এ অঞ্চলের অন্ধকার বুকে একে আলোর সূর্য মনে করছি। ইয়াউন্ডি গিয়ে নিশ্চয় এ সংগঠনের সাথে আরও পরিচিত হতে পারব।’
‘ইনশাআল্লাহ।’ বলল ইয়েকিনী এবং হাসান দু’জনেই।
এ সময় সরদার আবুবকর বিগোভিট প্রবেশ করল বৈঠকখানায়।
আহমদ মুসা তাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘জনাব, আমি ঘণ্টাখানেকের মধ্যে যাত্রা করতে চাই, আপনি অনুমতি দিন।’
‘এ কি বাবা! তুমি আমাদের সকলের সরদার। তুমি বিশ্বের মজলুম মুসলমানদের মাথার মণি। তুমি অনুমতি চাচ্ছ আমার কাছে! আর অপরাধী করো না বাবা।’ বৃদ্ধের শেষ কথাগুলো ভেঙ্গে পড়ল বুক উপচানো আবেগে।
একটু দম নিল। তারপর আবার শুরু করল, ‘অবশ্যই তুমি যাবে বাবা। সবকিছুর চেয়ে মূল্যবান তোমার সময়। বিশেষ কাজেই আল্লাহ তোমাকে এখানে এনেছিলেন। কাজ না থাকলেও তুমি আমাদের দেখতে আসবে, এ আশা আমরা অবশ্যই করব।’
‘দোয়া করুন, এমন অবসর যেন আমার হয়। শান্তি যেন আসে সব দেশে, গোটা দুনিয়ায়।’
‘তুমি একা যাবে ইয়াউন্ডি?’
‘একাই এসেছিলাম, একা যেতে কোন অসুবিধা নেই। তবে কেউ সাথে গেলে খুশি হবো।’
‘কাকে সাথে নিতে চাও? বল?’
‘হাসান ইকোকুর এখানে প্রয়োজন আছে। ইয়েকিনীকে ছাড়তে পারেন কিনা।’
‘তুমি যাকে ইচ্ছা নিয়ে যাবে, জিজ্ঞাসার কোন প্রয়োজন নেই বাবা।’
আহমদ মুসা ইয়েকিনীর নাম করার সাথে সাথে ইয়েকিনী লাফিয়ে উঠেছিল ‘আল্লাহু আকবার’ বলে। ছুটে গিয়েছিল ফাতেমা মুনেকার কাছে। তার মাথায় একটা শক্ত টোকা দিয়ে বলেছিল, ‘কেমন এখন, দেখলি তো?’
‘এভাবে বলছ কেন? তোমার সাথে আমার প্রতিযোগিতা নাকি?’ বলল মুনেকা মুখ ভার করে।
বৃদ্ধ সরদার সস্নেহ হাসিতে বলল, আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘তুমি কিছু মনে করো না বাবা। পিঠাপিঠি এ দু’ভাই-বোনের গণ্ডগোল সব সময় লেগেই থাকে।’
‘মুনেকাই সব সময় লেগে থাকে আব্বা, আমি কিছু বলি না।’ বলল ইয়েকিনী।
‘আমি লেগে থাকি? আমার সব কথা, সব কাজে তুমি বাগড়া দাও।’ তীব্র প্রতিবাদ করে বলল ফাতেমা মুনেকা।
‘ধন্যবাদ ইয়েকিনী, ফাতেমা। ভাই-বোনের মধুর ঝগড়া আমার খুব ভাল লাগছে। সত্যি বলছি, আমার কাছে এ এক দুর্লভ দৃশ্য। আমার মত একা এক পৃথিবীর বাসিন্দা যারা তারা ছাড়া কেউ এটা বুঝবে না।’ হাসিমুখে কথাগুলো বলতে শুরু করেছিল আহমদ মুসা। কিন্তু যখন কথা শেষ করল, কণ্ঠ তখন প্রায় রুদ্ধ হয়ে এসেছিল তার।
আহমদ মুসার কণ্ঠস্বরে ফাতেমা মুনেকা, ইয়েকিনী, হাসান সকলেরই চেহারা হঠাৎ পাল্টে গিয়েছিল। তাদের মুখে ফুটে উঠেছিল একটা বেদনাময় বিস্ময়ের চিহ্ন।
পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে হেসে উঠল আহমদ মুসা। বলল, ‘ইয়েকিনী, আমার সঙ্গী হওয়ার মধ্যে তুমি যেমন আনন্দ দেখছ, তেমনি নিরানন্দও আছে। আমার সাথী হওয়া মানে সাক্ষাৎ বিপদের সাথী হওয়া, মনে রেখ। ব্ল্যাক ক্রস ও ওকুয়া যখন জানবে, আমি বেঁচে আছি এবং ক্যামেরুনে এসেছি, তখন পাগল হয়ে উঠবে ওরা আমাকে ধরা অথবা মারার জন্যে।’
মুহাম্মাদ ইয়েকিনী উঠে আহমদ মুসার পায়ের কাছে এসে বসল। বলল, ‘আপনার সাথী হয়ে আমি আগুনেও ঝাঁপ দিতে পারব।’
আহমদ মুসা তাকে টেনে নিয়ে কপালে চুমু খেয়ে বলল, ‘আগুনে ঝাঁপ দেয়া নয়, আমরা জয়ী হয়ে গাজী হতে চাই।’
বলেই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘সময় বেশি নেই। তৈরি হতে হবে। তুমি তৈরি হয়ে নাও ইয়েকিনী।’
ঘরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আহমদ মুসা ফাতেমা মুনেকাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘রিপোর্টের রেকর্ডগুলো আমাকে দিয়ে যাও, ফাতেমা।’
আহমদ মুসা হাঁটছিল গাড়ির দিকে। তার আগে আগে চলছিল ইয়েকিনী, বড় এক ব্যাগ হাতে।
আহমদ মুসার পাশাপাশি চলছিল ফাতেমা মুনেকা এবং হাসান ইকোকু।
কথা বলতে বলতে এগোচ্ছিল তারা।
ফাতেমা মুনেকা বলল এক সময়, ‘ভাইয়া, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?’
‘কি কথা?’
‘দেখুন, আমরা মায়ের জাতি। ঘরই আমাদের পৃথিবী, ঘরই আমাদের সব।’
বলে একটু থামল ফাতেমা। একটু দ্বিধা করল। ঢোক গিলল একটা। তারপর বলল, ‘আপনি সেদিন বলেছিলেন, আপনার ঘর নেই, বাড়ি নেই এবং কেউ নেই। আজ আবার বললেন, এই পৃথিবীতে আপনি একা। কথাগুলো ভুলতে পারছি না। ঘর নেই কেন আপনার?’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘ওটা আমি কথার কথা বলেছি। ঘর থাকা খুব বড় কথা নয়। আমার একটা ঘর নেই, কিন্তু দুনিয়ার শত ঘর আমার ঘর হয়েছে।’
‘এসব কথা বলে প্রশ্ন পাশ কাটাতে পারেন, কিন্তু এক বোনের চোখকে ফাঁকি দিতে পারেন না। ঘর নিজের একটাই হয়, শত ঘর নিজের ঘর হয় না ভাইয়া। এবং একটি ঘর থাকা মানুষের মৌলিক অধিকার।’ বলল ফাতেমা।
‘বোনের কথা আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু ঘর থাকা বড় কথা নয়, ঘরে যিনি থাকবেন তিনি ঘরে থাকা বড় কথা। তিনি যদি ঘরে না থাকেন, ঘর আর ঘর থাকে না।’
‘ঘরে তিনি থাকবেন না কেন? ঘর ছাড়া জীবন হয় না।’
‘তোমার একথাও ঠিক বোন। কিন্তু ব্যতিক্রম থাকতে পারে। কিছু লোককে যেমন প্রয়োজনে দেশ ছাড়তে হয়, তেমনি কিছু লোককে ঘর ছাড়তে হতে পারে।’
‘কিন্তু দেশ ছাড়া আর ঘর ছাড়া এক কথা নয়। দেশ ছাড়লেও ঘর সবারই থাকে। মানুষ ঘর ছাড়তে পারে না। কোন সময়ের জন্যে বা বহু সময়ের জন্যে কেউ ঘরে না থাকলেও ঘর থাকে, ঘরে আলো জ্বলে এবং একজোড়া বা দুইজোড়া কিংবা তারও বেশি চোখ ঘরে ফেরার পথ চেয়ে অপেক্ষার প্রহর গোনে।’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘ফাতেমা, তোমাকে আমি সাংবাদিক বানাতে চাচ্ছি। আমি আশাবাদী, তুমি ভাল লেখিকাও হবে।’
কিন্তু ফাতেমা হাসল না। বলল, ‘না ভাইয়া, আপনি আমার প্রশ্নের জবাব দিন।’
গম্ভীর হলো আহমদ মুসা। দূর দিগন্তের দিকে চোখ তুলে চাইল। বলল ধীরে ধীরে, ‘সিংকিয়াং-এ তোমারই মত আর এক বোন নাছোড়বান্দা হয়ে একটা ঘর করে দিয়েছিল। কিন্তু সে ঘরের বাতি নিভে গেছে, প্রবল ঝড় সে ঘর উড়িয়ে নিয়েছে বোন।’ আহমদ মুসার কথাগুলো এত নরম, এত বেদনাসিক্ত যে তা ফাতেমা মুনেকা এবং হাসান ইকোকুর হৃদয়কেও আলোড়িত করল।
তৎক্ষণাৎ কোন উত্তর দিতে পারলো না ফাতেমা। পরে ধীরে ধীরে বলল, ‘সে কাহিনী এখনও আমরা জানি না ভাইয়া। তবে নিভে যাওয়া বাতি আবার জ্বলে উঠে, ভেঙ্গে যাওয়া ঘর আবার উঠে দাঁড়ায়, এটাই দুনিয়ার নিয়ম।’
‘আমি সে বাতি জ্বলে উঠার অপেক্ষা করছি না, তা বলতে পার না বোন।’
‘ধন্যবাদ ভাইয়া। জ্বলে উঠবে যে আলোকখণ্ড, তার সন্ধানও তো ভাইয়ার জানার কথা।’
‘সব কথা একদিনে শেষ করা ঠিক হবে না বোন।’ বলে হেসে উঠল আহমদ মুসা।
ইয়েকিনী গাড়ির কাছে দাঁড়িয়েছিল।
আহমদ মুসারা সেখানে পৌঁছে গিয়েছিল।
আহমদ মুসার কথার উত্তরে ফাতেমা মুনেকা কিছু বলতে যাচ্ছিল। ইয়েকিনী তাতে বাঁধা দিয়ে বলল, ‘ভাইয়া, ফাতেমার কথার প্যাঁচে পড়লে এখানেই রাত কাবার হবে। আর বিপ্লব ছেড়ে সাহিত্যও করতে হতে পারে। ও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিবেটে এক নাম্বার।’
‘দেখুন, সে গায়ে পড়ে আমার সাথে লাগছে। আমি তো তার সাথে কথা বলিনি। আব্বার কাছে তখন সে কি ভালটাই সাজল!’ তীব্র প্রতিবাদ করে বলল ফাতেমা মুনেকা।
সঙ্গে সঙ্গেই কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল ইয়েকিনী। আহমদ মুসা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আজ থাক, একদিন আয়োজন করে তোমাদের দু’জনের ডিবেট শুনবো।’
বলে আহমদ মুসা ফাতেমার দিকে চেয়ে বলল, ‘ঠিক আছে বোন?’
‘ঠিক আছে। কিন্তু আসল কথাই ভাইয়ার না বলা থাকল।’ একটু হেসে ওড়নাটা কপালের উপর আরও টেনে দিতে দিতে বলল ফাতেমা।
‘ধৈর্য্যে পুরষ্কার ডাবল হয়।’ বলল আহমদ মুসা।
‘সেটা কি শোনার বদলে দেখা?’ আনন্দে নেচে উঠল ফাতেমার চোখ।
‘তা আমি বলতে পারব না।’ বলে হাসতে হাসতে আহমদ মুসা গাড়িতে উঠার জন্যে সেদিকে এগোলো।
ফাতেমা ও হাসান ইকোকুর কাছে বিদায় নিয়ে আহমদ মুসা ও ইয়েকিনী গাড়িতে উঠল।
গাড়িটা ‘দুয়ালা’ থেকে আনা ‘কোক’-এর সেই জীপ।
আহমদ মুসা বসল ড্রাইভিং সিটে এবং তার পাশের সিটে বসল ইয়েকিনী।
‘বিসমিল্লাহ’ বলে চাবি ঘুরিয়ে গাড়ির ইঞ্জিন অন করল আহমদ মুসা।
জেগে উঠল ইঞ্জিন। স্টার্ট নিয়ে চলতে শুরু করল গাড়ি।
পেছনে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে ফাতেমা ও হাসান।
জবাবে ইয়েকিনী হাত নাড়ল গাড়ি থেকে।
ড্রাইভিং সিটে বসা আহমদ মুসার দৃষ্টি তখন সামনে- ইয়াউন্ডির দিকে। সে চোখে একটা স্বপ্ন, কুন্তা কুম্বেয় যে আলোর বীজ বপিত হলো তা যদি ইয়াউন্ডিতে প্রজ্জ্বলিত করা যায়, তাহলে সেটা আজকের অন্ধকার আফ্রিকার জন্যে হবে এক মহান সূর্যোদয়।