বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ক্ষমতার বড়াই

"মজার গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান MD.Belal Hosan (০ পয়েন্ট)

X কুদ্দুস নতুন বিয়ে করেছে। পেশায় সে রেলওয়ে গেটম্যান। বউ বায়না ধরেছে স্বামীর অফিস দেখে তাই কুদ্দুস তার বউকে নিয়ে এসেছে কর্মস্থল দেখাতে। স্বামীর অফিস দেখে বউ মহা বিরক্ত। এটা কোনো অফিস হলো? ছোট্ট একটা ঘরে কোনো মতে বসার মতো একটা চেয়ার, ছোট্ট একটা টেবিল আর আছে একটা রেললাইন অার বাঁশ দিয়ে বানানো গেট। আরেকজন বসানোর মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। কুদ্দুস তার বউকে শান্তভাবে নিজের চেয়ারে বসালো এবং এক দৌড়ে ঠান্ডা ম্যাঙ্গো জুস এনে তাকে মাথা ঠান্ডা করতে বলো। তারপর বউকে পটানোর জন্য বলতে লাগলো, ‘আমার অফিস ছোট হলে কি হবে, আমার কিন্তু অনেক ক্ষমতা। আমি ইশারা ছাড়া ট্রেন এক পাও এগোয় না। আমি যদি বলি চলতে তবে চলে আর যদি বলি থাম তবে থেমে থাকে’। কুদ্দুসের কথা শুনে বউ তো বেশ অবাক। সে খুশি হয়ে উঠলো তার স্বামীর ক্ষমতার কথা শুনে। তার ক্ষমতার প্রমাণ হাতেনাতে দেয়ার জন্য সে কিছুক্ষণ পর তার রেলগেটের দিকে আগত এক ট্রেন থামিয়ে দিল লাল পতাকা দেখিয়ে। তারপর খুবই গর্ব নিয়ে কুদ্দুস তার বউকে বলল, দেখেছো আমার ক্ষমতা? কত বড় একটা ট্রেন থামিয়ে দিলাম। বউ এবার মহাখুশি। এদিকে ট্রেন থেকে নেমে এলো ট্রেনের ড্রাইভার। যখন সে শুনলো গেটম্যান অযথা ট্রেন থামানোর সিগন্যাল দিয়েছে। শুনে তার মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেলো তাই সে কুদ্দুসের দুই গালে কষে দুইটা চড় মারলেন। স্বামীকে চড় খেতে দেখে কুদ্দুসের বউ ড্রাইভারকে বলে উঠল, ‘আপনি আমার স্বামীকে মারলেন কেনো’? ড্রাইভার বললো, ‘ট্রেন থামিয়ে ও নিজের ক্ষমতা দেখাল। আর অযথা ট্রেন থামালে আমি কি করতে পারি সে ক্ষমতা দেখিয়ে দিলাম’।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯৮ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ক্ষমতার বড়াই

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now

১৩.আন্দালুসিয়ার প্রান্তরে (৫-শেষ)

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান আরাফাত হোসেন (০ পয়েন্ট)

X মাদ্রিদে ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের হেড কোয়ার্টার। ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের প্রধান বুটাগুয়েনা ভাসকুয়েজ বিরাট কক্ষের বিশাল টেবিলে বসে আছে। তার সামনে টেবিলে একটা মেসেজ। ফ্যাক্সে এসেছে অল্প আগে। এসেছে ইটালীর ট্রিয়েস্ট থেকে। এয়ার কন্ডিশন ঘরেও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠেছে ভাসকুয়েজের। মনের ভেতরের অবস্থা তার আরও খারাপ। ক্রুদ্ধ অন্তর থেকে তার রক্ত ঝরছে যেন। গোটা দেহের রক্ত তার টগবগ করে ফুটছে। এতবড় পরাজয়, এতবড় বিপর্যয়ের কথা ভাবতে পারেনি ট্রিয়েস্টে। রাত আটটায় সে খবর পেল, জোয়ান যে স্যাম্পল নিয়ে গিয়েছিল তেজষ্ক্রিয় পরীক্ষার জন্যে সে স্যাম্পলসহ তেজষ্ক্রিয় রিপোর্ট এবং কম্পিউটার ডিস্ক ইরগুন জাই লিউমির হাতে এসেছে। সে স্যাম্পল, তেজষ্ক্রিয় রিপোর্ট এবং কম্পিউটার ডিস্কসহ মাদ্রিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাসফরে যাওয়া দলটিকে রাত ১২টা প্লেনে মাদ্রিদে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। ভীষণ খুশী হয়েছিল ভাসকুয়েজ আহমদ মুসার পরিকল্পনা ভন্ডুল করতে পেরে। এক ট্রিয়েস্টেই এই পরীক্ষা আহমদ মুসা করতে পারতো, কিন্তু সেটার হলো গুড়ে বালি। ট্রিয়েস্টে আর পারবে না তারা এই পরীক্ষার জন্যে যেতে। আর ইউরোপ আমেরিকার কোন গবেষণাগারে তো আহমদ মুসা কিংবা হিদেন(মুসলমান) তো ঢুকতেই পারবে না। সুতরাং বুঝতেই পারবে না, স্পেনের বাদশাহ ফয়সল মসজিদ কমপ্লেক্সসহ স্পেনের ঐতিহাসিক মুসলিম স্থাপনা কোন মহাধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এসব খুশীর চিন্তা বুকে নিয়েই ভাসকুয়েজ রাতে ঘুমিয়ে ছিল। কিন্তু সকালে ৮টায় অফিসে এসেই এই ফ্যাক্স মেসেজ পেল ট্রিয়েস্ট থেকে। ভয়ানক দুঃসংবাদ। ট্রিয়েস্ট থেকে ইরগুন জাই লিউমি লিখেছে, ‘গত রাত ১২টার দিকে সি-কুইন মোটেলের সামনে ইরগুন জাই লিউমি’র একজন গেরিলাকে হত্যা করে শিক্ষাসফর দলের নেতা মিঃ ভিলারোয়াকে কিডন্যাপ করে নিয়ে গিয়ে তার কাছ থেকে সেই স্যাম্পল, তেজষ্ক্রিয় রিপোর্ট, ডিস্ক সব কেড়ে নিয়েছে একজন লোক। এর কিছুক্ষন আগে দাউদ ইমরানের বাড়িতে আমাদের দ’জন মূল্যবান লোক খুন হয়েছে। এছাড়া রেস্ট হাউজে জোয়ানের ঘরের সামনে আরো দু’জন এবং গবেষণা কেন্দ্রের ফটকে অন্য আরো চারজন লোক আমাদের নিহত হয়েছে। ইরগুন জাই লিউমি’র মূল্যবান বিজ্ঞানী দাউদ ইসরানের পোড়া দেহ পাওয়া গেছে তার নিজ গাড়ির ধ্বংসাবশেষ থেকে। মোট আমাদের দশজন খুন হয়েছে আপনার কাজে। এর জন্যে ক্ষতিপূরণ হিসেবে আরও এক মিলিয়ন ডলার আমরা চাই।’ ইরগুন জাই লিউমি’র এই মেসেজ পড়েই এয়ার কন্ডিশন ঘরে ঘামছে ভাসকুয়েজ। কাজের কাজ কিছুই হলো না। এক মিলিয়ন ডলার যাবার পথে। ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান ট্রিয়েস্টের পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র আই সি টি পি থেকে জোয়ানের নিয়ে যাওয়া স্যাম্পলটি, এর তেজষ্ক্রিয় রিপোর্ট এবং ডিস্ক চুরি করার দায়িত্ব দিয়েছিল ইরগুন জাই লিউমিকে। বিনিময় হিসেবে অগ্রিম দিয়েছিল এক মিলিয়ন ডলার। আরও কথা দিয়েছিল প্রতিটি লোকের ক্ষতির জন্যে দেবে এক লাখ ডলার। মাদ্রিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জোয়ান পুরাতন কিছূ ইট খন্ড ও কংক্রিট খন্ডাংশের তেজষ্ক্রিয় পরীক্ষার জন্যে এসেছে ট্রিয়েস্টে-একথা ইরগুন জাই লিউমিই জানিয়েছিল ভাসকুয়েজকে। ভাসকুয়েজের ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান যে স্পেনের মুসলিম স্থাপনাগুলো ধ্বংসের জন্যে তেজষ্ক্রিয় প্রয়োগ করেছে, এখবর ইরগুন জাই লিউমি রুশ গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে জানতে পারে। ইরগুন জাই লিউমি’র এজেন্ট আই সি টি পি’র বিজ্ঞানী দাউদ ইমরান পুরোনো ইটের ভাঙা টুকরার বয়স পরীক্ষা করেই ধরে নেয় ওগুলো কর্ডোভা বা গ্রানাডার মুসলিম স্থাপত্য থেকে আনা। যেহেতু সে জানে, তার কাছে সব বিষয় পরিস্কার হয়ে যায়। সংগে সংগেই সে সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং বিষয়টি ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানকে জানাবার ব্যবস্থা করে। ভীষণ ক্রোধ ও দুঃখের সাথে বিস্ময়ও বোধ হচ্ছিল ভাসকুয়েজের। ইরগুন জাই লিউমি’র ১০জন গেরিলা এজেন্টকে খুন করল কে? জোয়ান সম্পর্কে আমরা জানি যে, সে জীবনে কোনদিন পিস্তল ধরেনি। সে নিরেট একজন একাডেমিশিয়ান। তার কাছ থেকে এ ধরনের কাজ আশা করা যায় না। তাহলে এই হত্যাকান্ড চালাল কে? আহমদ মুসা কি! এই সময় ইন্টারকম কথা বলে উঠল। বলল, ট্রিয়েস্ট থেকে ফিরে আসা শিক্ষা সফরকারী দলের সহকারী নেতা অধ্যাপক জোস এসেছেন। ‘পাঠিয়ে দাও।’ দ্রুত বলল ভাসকুয়েজ। মিনিট খানেকের মধ্যেই মধ্যবয়সী এক ভদ্রলোককে নিয়ে ভাসকুয়েজের সেক্রেটারী প্রবেশ করল। ভদ্রলোক বসলে বেরিয়ে গেল ভাসকুয়েজের পি, এস। কথা বলল ভাসকুয়েজ প্রথম। বলল, ‘ক’টার প্লেনে উঠেন ট্রিয়েস্ট থেকে?’ ‘রাত বারটায়।’ ‘তাহলে ১২টার আগের সব খবর আপনি রাখেন।’ ‘সব জানি না, কিছু শুনেছি মাত্র। বিজ্ঞানী দাউদ ইমরানের বাড়িতে তার দু’জন লোক খুন হয়েছে।’ ‘আর কিছু?’ ‘জানি না।’ ‘কি জন্যে এসেছেন, কি বলতে চান, বলুন।’ ‘অধ্যাপক ভিলারোয়া আপনাকে বলতে বলেছেন, আপনার কাছে পৌঁছানোর জন্যে বিজ্ঞানী দাউদ ইমরান কিছু কাগজ ও জিনিসপত্র দিয়েছিলেন, সেগুলো একজন লোক ছিনিয়ে নিয়েছে তাকে কিডন্যাপ করে। যে তাঁকে কিডন্যাপ করেছিল, সেই লোকটিই মটেল সি-কুইনের গাড়ি বারান্দায় একজন লোককে খুন করে। খুন করার পরেই অধ্যাপক ভিলারোয়াকে কেডন্যাপ করা হয়।’ ‘আপনি তখন সেখানে ছিলেন?’ ‘ছিলাম।’ ‘আর কে ছিল?’ ‘হোটেলের কয়েকজন সহ আসরা সাত আটজন ছিলাম।’ ‘একজন লোক এসে একজনকে খুন করল, আর একজনকে কিডন্যাপ করল, আপনারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি কাজটা করেছিলেন?’ ‘কি ঘটল, কি ঘটছে তা আমরা বুঝে উঠার আগেই সব শেষ হয়ে গেছে তাছাড়া লোকটি সশস্ত্র, ভয়ানক ক্ষিপ্র। আমরা ছিলাম খালি হাতে’ ‘আপনি খুনি লোকটাকে দেখেছেন ?’ ‘দেখেছি’ ‘কি রকম সে দেখতে ?’ ‘গায়ের রং সাদাটে স্বর্ণাভ। কালো চুল। চেহারায় এশীয়।’ একটু ভাবল ভাসকুয়েজ। তারপর পাশের ফাইল কেবিনেট থেকে একটা ফটো বের করে অধ্যাপক জোসের সামনে তুলে ধরল। বলুন তো, ‘এই লোক কি না।’ অধ্যাপক জোস খুশী হয়ে উঠল। বলল, ঠিক এই লোক। এখানে জ্যাকেট গায়ে, আর সেখানে স্যুট পরে।’ চোখ দু’টি জ্বলে উঠল ভাসকুয়েজের। মুখের মাংস পেশীগুলো যেন শক্ত হয়ে উঠল তার। ‘ধন্যবাদ অধ্যাপক, আমার কথা শেষ। ‘ কষ্ট করে যেন কথা কয়টি উচ্চারন করল ভাসকুয়েজ। অধ্যাপক জোস বেরিয়ে যেতেই ভাসকুয়েজ প্রচন্ড এক মুষ্টাঘাত করল টেবিলে। মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ‘বিষ্ট আহমদ মুসা! তুমিই তাহলে গিয়েছিলে ট্রিয়েস্টে।’ বলেই ইন্টারকমে পি,এস, কে নির্দেশ দিল, ‘জুবি জারিটাকে আসতে বল, এখুনি।’ জুবি জারিটা স্প্যানিশ ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের নতুন অপারেশন চীফ। অপারেশন চীফ সিনাত্রা সেন্ডো নিহত হবার পর জুবি জারিটা এই দায়িত্বে এসেছে। মাদ্রিদের বাদশাহ ফয়সাল কমপেক্সে আহমদ মুসাদেরকে ধরার জন্যে যে অভিযান করেছিল, সেই অভিযানে সিনাত্রা সেন্ডো নিহত হয়। সিনাত্রা সেন্ডো তার চারজন সাথীকে নিয়ে যে গাড়িতে ছিলো, সেই গাড়িটিই আহমদ মুসার বোমায় বিস্ফোরিত হয় এবং সংগীদের সমেত নিহত হয়। মিনিট দেড়েকের মধ্যেই জুবি জাড়িটা দরজায় এসে দাঁড়াল এবং প্রবেশ অনুমতি চাইল। অনুমতি নিয়ে দরজা ঠেলে জুবি জাড়িটা প্রবেশ করল ঘরে। সারে পাঁচ ফিটের প্রমান সাইজের মানুষ জুবি জাড়িটা। সামরিক বাহিনীর কর্নেল ছিলেন। চাকুরী থেকে বরখাস্ত হয়েছে চরম বর্নবাদী মানসিকতার জন্যে। ন্যাটো বাহিনীতে এক মহড়া কালে একজন আমেরিকান মুসলিম নিগ্রো অফিসারের সাথে অন্যায়ভাবে মারপিট করার কারনে তাকে বরখাস্ত করা হয়। ক্লু-ক্ল্যাঙ্-ক্ল্যান তাকে লূফে নিয়েছে। মাত্র দু’বছরের মধ্যে সে অপারেশন চীফের আসন লাভ করেছে। ভাসকুয়েজ খুবই আদর করে তাকে, তার এক রোখা ও আপষহীন আচরনের জন্যে। উত্তেজিতভাবে পায়চারি করছিল ভাসকুয়েজ। জুবি জারিটা ঘরে ঢুকতেই ভাসকুয়েজ ফিরে এল তার চেয়ারে। চেয়ারে বসে দাঁড়ানো জুবি জাড়িটাকে বসতে বলল। জুবি জাড়িটা মেরুদন্ড খাড়া রেখে এ্যটেনশনের কায়দায় চেয়ারে বসল। ‘জানো কিছু খবর?’ নিরস কন্ঠে বলল ভাসকুয়েজ। ‘কোন খবর স্যার?’ ‘এক মিলিয়ন ডলার গেছে, আরেক মিলিয়ন ডলার যাবার পথে।’ জুবি জাড়িটা কোন প্রশ্ন না করে উদ্বেগের সাথে তার প্রশ্ন বোধক দৃষ্টি তুলে ধরল। ভাসকুয়েজই আবার মুখ খুলল। বলল, শয়তান জোয়ানই জয়ী হয়েছে। সেই স্যাম্পুল, তেজস্ক্রিয় রিপোর্ট এবং কম্পিউটার ডিস্ক যা হাত করা হয়েছিল আই সি টি পি’ থেকে, তা ওরা ছিনিয়ে নিয়েছে, তার সাথে ইরগুন জাই লিউমি’র দশ জন লোক খুন হয়েছে। এক মিলিয়ন ডলার পানিতে গেল। দশজন লোকের ক্ষতিপুরণ আরও ১ মিলিয়ন ডলার দিতে হবে।’ ‘ওরা ছিনিয়ে নিয়েছে? ইরগুনের দশজন লোক খুন হয়েছে?’ বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে বলল জুবি জাড়িটা। ‘এই সর্বনাশ করেছে কে বলতে পার?’ ‘জোয়ান তো অবশ্যই নয়, গবেষণা কেন্দ্রের কেউ হতে পারে বলে আমি মনে করি না।’ ‘তাহলে?’ ‘এতবড় কাজ এমন নিখুঁত ভাবে একজনেই করতে পারে, সে হলো আহমদ মুসা।’ ‘ধরতে পেরেছ তাহলে। লজ্জা বোধ হচ্ছে না একজনের কাছে বার বার এভাবে হারতে।’ জুবি জাড়িটার মুখে যেন এক পোচ কালি কেউ মাখিয়ে দিল। একটা ঢোক গিলে জুবি জাড়িটা বলল, ‘কি করতে হবে স্যার, আদেশ করুন।’ ‘কি আদেশ করবো, কি করতে হবে তা শোনার জন্যেই তো তোমাকে ডেকেছি। ‘ ‘স্যার আমি ট্রিয়েস্টে যেতে পারি। ওখানে নিশ্চয় আহমদ মুসার সাঙাত আছে, ওদের খুঁজে বের করে আহমদ মুসার কাছে পৌঁছার পথ করতে পারি।’ ‘গর্দভ, আহমদ মুসার সাঙাত খোঁজার জন্যে ট্রিয়েস্ট যাবে, এখানে মাদ্রিদে আহমদ মুসার সাঙাত নেই?’ ‘স্যার জোয়ানের পরিবারের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি অনেক চেষ্টা করেও। ওরা তাদের নিজের বাসায় থাকে না।’ ‘আর কোন সাঙাত বুঝি আহমদ মুসার নেই?’ জানো, বাসক গেরিলা নেতা ফিলিপের বোনকে বাঁচিয়ে আহমদ মুসা এখন বাস্‌কদের কাছে জামাই আদর পাচ্ছে ?’ ‘জি স্যার, আমি বাস্‌কদের পরিচিত ঘাটিগুলোর দিকে নজর রেখেছি। তবে, ফিলিপ ও ফিলিপের বোন মাদ্রিদে এলে এক ভাড়া বাড়িতে থাকে, সেই বাড়িটার সন্ধান এখনও আমরা করতে পারিনি।’ জুবি জাড়িটা একটু থেমেই আবার মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল, ‘স্যার একটা কথা বলব।’ ‘কি কথা ?’ ‘ফ্রান্সিসকো জেমেনিজ সিসনারোসার মেয়ে জেন ক্যাথারিনার গতিবিধি সন্দেহজনক। তাকে শিক্ষা সফরে পাঠানো ঠিক হয়নি, বিশেষ করে জোয়ান যেহেতু সেখানে গিয়েছিল।’ ‘তোমার সন্দেহ অমূলক গর্দভ। জেনের পিতার কাছ থেকেই শুনেছি, জেন শিক্ষা সফরে কিছুতেই যেতে চায়নি, তাকে সবাই জোর করে নিয়ে গেছে। তাছাড়া জোয়ান সেখানে গেছে এটা কারোই জানা ছিলো না। জেনের সম্পর্কে তোমার কথা সত্য হলে, জেন জানত যে জোয়ান ট্রিয়েস্ট গেছে এবং সেক্ষেত্রে জেন আগ্রহী হতো ট্রিয়েস্ট যাবার জন্যে।’ একটু থামল। তারপর চেয়ারে নড়ে-চড়ে বসে আবার বলল, ‘জুবি, ভবিষ্যতে জেন সম্পর্কে এইভাবে কথা বলবে না। সে ফ্রান্সিসকো জেমেনিজের মেয়ে। আর ফ্রান্সিসকোর অবদান ক্লু-ক্যাক্স-ক্ল্যানে তোমার আমার চেয়ে অনেক বেশী।’ ‘স্যরি স্যার।’ ‘করণীয় তো কিছু বের করতে পারলে না। এখন শুন, গোটা মাদ্রিদ ঘিরে ফেলতে হবে।’ ‘ইয়েস স্যার। কিন্তু.. ..।’ কেন ঘিরে ফেলতে হবে সেটাই তো বলবে? বলত আহমদ মুসা তেজস্ক্রিয়া রিপোর্ট নিয়ে এখন কি করবে? এর এন্টিডোট খুজবে অথবা তেজস্ক্রিয় ক্যাপসুল গুলো তুলে ফেলার চেষ্টা করবে তাদের উল্লেখযোগ্য স্থাপনা গুলো থেকে। গর্দভ তেজস্ক্রিয়ের কোন এন্টিডোট নেই। তাদের হাতে একটাই বিকল্প। সেটা হলো তেজস্ক্রিয় ক্যাপসুল গুলো মাটির তলা থেকে তুলে ফেলা। এই কাজের জন্য প্রথমেই আহমদ মুসা আসবে মাদ্রিদ, এখন পরিষ্কার হয়েছে কেন মাদ্রিদ ঘিরে ফেলতে হবে ? ইয়েস স্যার। এতক্ষণে হাসি ফুটে উঠল জুবি জারিটার মুখে। শুধু ইয়েস স্যার নয়। আজকেই কাজে লেগে যাও। মাদ্রিদ প্রবেশের প্রতিটি পথে পাহারা বসাও। তোমাদের নজর এডিয়ে একটা পিপড়াও যেন মাদ্রিদ প্রবেশ করতে না পারে। যাও এখন। ইয়েস স্যার। বলে উঠে দাডাল জুবি জারিটা। চারদিন পরের ঘটনা। ভাসকুয়েজ তার টেবিলে জুবি জারিটার রিপোর্ট পডেছিল। জুবি জারিটা মাদ্রিদ বন্দের জন্য কি কি পদক্ষেপ গ্রহন করেছে এ তারই রিপোর্ট। ভাসকুয়েজের ঘরে ঢুকল তার মিডিয়া অপারেটর মেয়েটি। তার হাতে সদ্য আসা একটা ফ্যাক্স মেসেজ। পায়ের শব্দে মুখ তুলল ভাসকুয়েজ। ভ্রু কুচকে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল জরুরী কিছু? জরুরী মেসেজ অপারেটর নিজেই সোজাসুজি নিয়ে এল ভাসকুয়েজের কাছে, এটাই নিয়ম। সাধারণ ও রুটিন মেসেজ গুলো ফাইল আকারে পি এস এর কাছে যায় পি এস সেগুলো নিয়ে আসে ভাসকুয়েজের কাছে। জি স্যার। তুলুজ থেকে জরুরী মেসেজ। ভাসকুয়েজ হাত বাডিয়ে মেসেজটি নিল নজর বুলাল মেসেজটিতে তুলুজের ক্ল ক্ল্যাক্স ক্ল্যান ইউনিটের সহকারী ডুপ্লে লিখেছে। গতকাল সন্ধ্যায় আমরা ভেনিস থেকে জানতে পারি আহমদ মুসা তার দুইজন সাথী সহ তুলুজ গামী বিমান উঠেছে। বিমান বন্দরে আমার তিনটি গাডির একটা ফাদ তৈরী করি। আহমদ মুসা সহ তারা তিনজনই আমাদের ফাদে পডে যায়। আমার ট্যাক্সিতেই ওরা ভাডায় উঠে। আমিই গাড়ি চালাচ্ছিলাম। অন্য দুটি গাডি নিয়ে আমাদের কমান্ডারসহ চারজন আমাদের গাডির পেছনে আসছিল। আমাদের টার্গেট ছিল ওদেরকে আমাদের ঘাটিতে নিয়ে আটকানো। ওরা গেবোনে হাইওয়ে হয়ে সুরেট যাবার জন্য আমার গাডিতে উঠেছিল। ওরা তিনজন কেউ রাস্তা চেনে না তবু ওদের সন্দেহ হয় আমি ঠিক পথে চলছি না। পেছনে থেকে একটা হাত এসে আমার গলা চেপে ধরে আমাকে অজ্ঞান করে ফেলে। পুলিশ আমার জ্ঞান ফেরায়। দেখতে পাই আমাকে অজ্ঞান করে কমান্ডার সহ চারজনকে খুন করে আহমদ মুসারা পালিয়েছে। আমাকে জড়িয়ে কেস হয়েছে। আমি পুলিশ কাস্টোডিতে থেকেই একজনকে পয়সা দিয়ে এই মেসেজটি পাঠালাম। মেসেজটি পডে কুইনাইন খাওয়ার মতো বিকৃত হয়ে গেল ভাসকুয়েজের মুখ। আবার আহমদ মুসার কাছে পরাজয়। কিন্তু এ পরাজয়টা হলো কি করে। একজনকে না হয় অজ্ঞান করে একটা গাডি দখল করল অন্য দুটি তখন কি করছিল। কিছু করতে তারা না পারুক দুটি গাডির সবাই আহমদ মুসার হাতে হাওয়া খেতে বেরিয়ে গুলী খেয়ে টপটপ করে ঝরে পডেছে। মন বিষিয়ে উঠল ভাসকুয়েজের। ভাসকুয়েজ কিছুক্ষণ পায়চারি করল। তারপর এসে দাডাল দেয়ালে টাঙানো বিশাল মানচিত্রের সামনে। দৃষ্টি নিবন্ধ করল দক্ষিণ ফ্রান্সের উপর। তুলুজে ওদেরকে খুন করে আহমদ মুসা নিশ্চয় মুরেটে এসেছে মুরেটে কেন? আসলে মুরেট একটা স্টপেজ। সে আসছে স্পেনে সম্ভবত গোরোনে হাইওয়ে ধরে মন্টেজূ ও ম্যানোনা হয়ে বাসাক এলাকার মধ্যে দিয়ে সে স্পেনে প্রবেশ করবে। দুঃখের মধ্যেও এ হদিসটুকু পেয়ে খুশি হলো ভাসকুয়েজ। চেয়ারে আবার ফিরে এল ভাসকুয়েজ। ইন্টারকমে যোগাযোগ করল জুবি জারিটার সাথে। বলল শুনো পিরেনিজ থেকে বিশেষ করে পিরিনিজ এর ভেল্লা এলাকা থেকে যে সব রাস্তা সে সব রাস্তার উপর বিশেষ নজর রাখতে হবে। আহমদ মুসা ঐ পথ দিয়েই স্পেনে প্রবেশ করছে। আর মাদ্রিদের উত্তর মুখি রাস্তা গুলোর উপরই পাহারা জোরদার কর। তুলুজে ক্লু ক্ল্যাক্স ক্ল্যানের বিপর্যয় ও চারজন নিহত হবার কথা ভাসকুয়েজ জুবি জারিটার কাছে চেপে গেল। ভাসকুয়েজ চায় না যে ওদের মধ্যে একটা আতংক সৃষ্টি হোক। আত্মবিশ্বাস কমে যাক এবং আহমদ মুসাকে ভয় করতে শুরু করুক। জুবি জারিটার সাথে কথা শেষ করে ভাসকুয়েজ সবে একটা ফাইলে মনোযোগ দিয়েছে এমন সময় ইন্টারকম কথা বলে উঠল জুবি জারিটার গলা। উদ্বিগ্ন কণ্ঠ। বলল স্যার সর্বনাশ হয়ে গেছে। কি সর্বনাশ হয়েছে? তুলুজে আহমদ মুসা আমাদের চারজন লোককে খুন করেছে। আহমদ মুসাকে ওরা ...। তুমি কোথেকে জানতে পারলে এ খবর? জুবি জারিতাকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল ভাসকুয়েজ। ফরাসি ইন্টেলিজেন্সের একটা মেসেজ এইমাত্র পেলাম। হু করে একটা শব্দ বেরুল ভাসকুয়েজের মুখ থেকে। বলল হ্যা ওরা খুশী হয়ে খারাপ খবরটা তাডাতাডি দিয়েছে, ভাল কোন খবর ওদের কাছ থেকে পাওয়া যায় না। বলে ভাসকুয়েজ ইন্টারকম অফ করে দিল। মুখটা বিরক্তিতে ভরা। সামনে খোলা ফাইলটি বন্ধ করে চেয়ারে গা এলিয়ে দিল ভাসকুয়েজ। চোখ বন্ধ করল। কিছুক্ষণ সব ভুলে থেকে শান্তি পেতে চায় সে কিন্তু চোখ বন্ধ করতেই ব্যর্থতার ভয়াবহ চিত্রগুলো এক এক করে ছায়াছবির দৃশ্যের মত তার সামনে এসে হাজির হতে লাগল। বিশ্রাম হলো না। উঠে দাডালো ভাসকুয়েজ। ঘরময় আবার পায়চারি শুরু হলো তার। তুই আমাকে বিশ্বাস করিস না। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল হান্না জেনকে। তোকে বিশ্বাস না করলে দুনিয়াতে আর কাকে বিশ্বাস করি বলত? আমার গোটা হৃদয় তোর কাছে খোলা। বলল জেন হান্নার একটি হাত নিজের বুকে জডিয়ে ধরে। কেন কেউ নেই? জোয়ান? জোয়ানের সাথে তো আমার বিশ্বাসের সম্পর্ক নয় ও আমার সত্তা আমার সব। আর তুই আমার একমাত্র বন্ধু যার কাছে আমার হৃদয় খোলা। না তুই আমাকে বিশ্বাস করিস না জেন। আবার জোর দিয়ে বলল হান্না। তুই বাজে বকছিস। বাজে বকছি? আচ্ছা বলত ত্রিয়েস্তে সি কুইন মোটেলের সামনে যে দিন হত্যার ঘটনা ঘটল। সেদিন রাত আটটায় তুই কোথায় গিয়েছিলি ? প্রশ্ন শোনার পর জেন কিছুক্ষণ হান্নার দিকে নির্বাক চোখে তাকিয়ে থাকল। যেন জেন পাঠ করার চেষ্টা করছে হান্নাকে। একটু পর ধীরে কণ্ঠে বলল তুই কত টুকু জানিস হান্না? কিছুই জানিনা তুই কোথাই গিয়েছিলি বল? হেসে বলল হান্না। জেনের মুখে কিন্তু হাসি নেই। হান্নার একটি হাত তুলে নিয়ে বলল না তুই জানিস। বল কতটুকু জানিস? জেনের অবস্থা দেখে হান্নার বোধ হয় করুনা হলো বলল সেদিন বিকেলে থেকেই তোকে আমি আনমনা দেখি। তারপর রাত ৮টার দিকে তুই যখন বাইরে যেতে চাইলি এবং আমাকে সাথে নিতে চাইলি না তখন আমার সন্দেহ হলো নিশ্চয় জোয়ানের ওখানে যাচ্ছিস। তোর অভিসার যাত্রাকে অনুসরন করলাম। জোয়ানের রেস্ট হাউসের দিকে যাচ্ছিস দেখে আমার অনুমান সত্য হওয়াই ভীষণ খুশী হলাম কিন্তু শীঘ্রই আমার খুশী কৌতুহলে রূপ নিল যখন দেখলাম তুই ওঁত পেতে বসলি। ভাবলাম এই লুকোচুরি খেলার শেষ দেখতে হবে। অভিসারের এ আবার কোন রূপ, অবশ্য পরক্ষনেই জোয়ানের ঘরের দরজা খোলা দেখে আমার মনে হয়েছিল নিশ্চয় জোয়ানের ঘরে লোক আছে এ জন্য তোর এই লুকানো। মজা দেখার লোভ নিয়ে তোর থেকে সামান্য দুরে একটা ঝাউগাছের আডালে বসে রইলাম। মজা দেখার আনন্দ আতংকে রূপান্তরিত হলো যখন দেখলাম দু জন স্টেনগানধারী জোয়ানের ঘরের দরজায় গিয়ে স্টেনগান উদ্যত করে দাঁড়াল। তারপর তোর দিকে তাকিয়ে তো আমার বুকের কাঁপুনি ধরে গেল। দেখলাম তোর হাতে উদ্যত পিস্তল, তুই গুড়ি মেরে এগুচ্ছিস জোয়ানের ঘরের দিকে। ভয়ে আমি আড়ষ্ট, কিন্তু চোখ সরাতে পারলাম না তোর উপর থেকে। তারপর দেখলাম তোকে গুলি করতে এবং ঐ দুই স্টেনগানধারীকে পড়ে যেতে। আমি তখন কাঁপছি। আমার পাশ দিয়েই দৌড়ে চলে গেলি। কিন্তু আমি নড়তে পারছিলাম না, কথাও বলতে পারছিলাম না। তুই চলে আসার পর আমার ভয় ধরে গেল, আমি না ধরা পড়ে যাই। কম্পিত পায়ে গুড়ি মেরে ফুলের গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলাম রাস্তায়। তারপর ছুটলাম। মটেলে আসতে ভয় করছিল। মনে হচ্ছিল আমিই যেন খুন করেছি, কারও সাথে দেখা হলেই ধরা পড়ে যাব। চলে এলাম নিচে। এক বেঞ্চিতে নিরিবিলি বসে থাকলাম আধা ঘন্টা। ভয় কমলে, মনটা শান্ত হলে মটেলে ফিরে এলাম। তোর সাথেও কথা বলতে ভয় হচ্ছিল। শুয়ে পড়লাম কম্বল মুড়ি দিয়ে।’ থামল হান্না। জেনের মুখে কোন কথা নেই। মুখ নিচু। হান্নাই আবার কথা বলল। বলল, ‘এত বড় ঘটনা আমার কাছ থেকে লুকিয়েছিস, নিশ্চয় তুই আমাকে বিশ্বাস করিস না। মুখ তুলল জেন। বলল,’তোকে বলিনি কেন জানিস, তোকে বললে তুই আমাকে যেতে দিতিস না ঐ কাজে। ‘প্রায় কান্না ভেজা কন্ঠে বলল, জেন। ‘অবশ্যই যেতে দিতাম না। কি সর্বনাশা পথ ওটা! যদি স্টেনগানধারীরা টের পেত, যদি কিছু ঘটত! তোর ভয় করেনি?’ ‘ভয়ের কথা তখন মনে হয়নি, এখন ভয় করে মনে হলে। তখন আমার সমগ্র চেতনা জুড়ে জোয়ানের নিরাপত্তার প্রশ্ন। বিকেলে দাউদ ইমরানের ঘরের পাশ দিয়ে যাবার সময় শুনেছিলাম, রাত ৯টায় অপারেশন জোয়ানের ঘরে। সন্ধ্যায় জোয়ানের আনা স্যাম্পুল, তেজস্ক্রিয় রিপোর্ট, এমনকি ডিস্ক গায়েব হবার খবর যখন শুনলাম, তখন বুঝলাম জোয়ানকে সরানোর পরিকল্পনাও চূড়ান্ত। এটা বোঝার পর আর আমার জ্ঞান ছিল না।’ তাই বলে তুই নিজ হাতে পিস্তল ধরে খুনিদের মোকাবিলা করার সাহস করলি, খুন করতেও পারলি?’ ‘কেমন করে পেরেছি জানিনা, একটা চিন্তাই তখন আমার মনে ছিল, জোয়ানকে বাঁচাতে না পারলে আমার বেঁচে লাভ নেই। আমি মরেও যদি ওকে বাঁচাতে পারি। থেমে গেল জেন। ভারি হয়ে উঠেছিল ওর কন্ঠ। ‘আমি দুঃখিত জেন, এটা তোর বাড়াবাড়ি। জোয়ানের অবস্থা তুই জানিস। তার সাথে তোর জীবনকে এভাবে জড়ালে তার পরিণতি কি? ‘আমি জানিনা। আমি ওসব ভাবি না।’ না ভাবলে চলবে কি করে? ট্রিয়েস্টে তুই তাকে বাঁচালি। কিন্তু ও এখন স্পেনে ফিরবে কি করে? ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান তাকে ছাড়বে মনে করিস?’ ‘জেন, মা, তোমার এ্যাটলাস বইটা একটু দাও তো দেখি’-বলতে বলতে ঘরে প্রবেশ করল জেনের আব্বা মিঃ ফ্রান্সিস্কো জেমেনিজ। ঘরে ঢুকে হান্নাকে দেখে বলে উঠল, ‘বাঃ হান্না, কখন এসেছ মা?’ ‘এই অল্পক্ষণ।’ উঠে দাঁড়িয়ে বলল হান্না। এ্যাটলাস বুক নিয়ে চলে যেতে শুরু করে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে জেনের আব্বা বলল, শুনেছ মা জেন, মা হান্না, ট্রিয়েস্টে কি ঘটেছে? তোমরা কিছু তো দেখেছও।’ জেন কিছু বলল না। ‘কি ঘটেছে চাচাজান? আমি তো একজন লোক খুন হয়েছে দেখে এসেছি। ‘বলল হান্না। ‘একজন বলছ, দশজন খুন হয়েছে এবং এই সবগুলো খুনের জন্যে আহমদ মুসা দায়ী। আর তোমাদের জোয়ান এখানে নাটের গুরু হিসেবে কাজ করেছে।’ ‘মুখটা লাল হয়ে উঠল জেনের।’ হান্নাই আবার কথা বলল। বলল, ‘চাচাজান, আমরা তো তেমন কিছু দেখিনি। সে তো কি একটা কাজে আই সি টি পি’তে গিয়েছিল। ওখানে কারও সাথে তার তেমন কোন পরিচয়ও নেই’। ‘তোমরা ছেলে মানুষ কি জান। সে এক সাংঘাতিক মিশনে ট্রিয়েস্টে গিয়েছিল। ওটাকে কেন্দ করেই তো ঐসব খুন-জখম। ছেলেটা নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারল।’ ‘কিভাবে চাচাজান? সে কি কাউকে খুন করেছে? কারও ক্ষতি করেছে?’ ‘ওর পক্ষে এসব কথা বাইরে বলো না হান্না। সে এখন আমাদের জাতীয় শত্রু। ও স্পেনে আর ফিরতে পারবে না, ফিরতে পারলেও বাঁচবে না।’ বলে জেনের আব্বা বেরিয়ে গেল। জেনের মুখে তখন কোন রক্ত নেই। কাঁপছে তার ঠোঁট। হান্না তার একটা হাত ধরে বলল, ‘জেন তোকে পাগলামি ছাড়তে হবে, শুনলি তো সব?’ জেন হান্নার দুই হাত জড়িয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। বলল, ‘আমি পারবো না, আমি পারবো না। আমি ওসব কথা বিশ্বাস করি না। জোয়ান নির্দোষ। বরং জোয়ান ষড়যন্ত্রের শিকার।’ ‘এ কথা কাউকে বিশ্বাস করাতে পারবি?’ ‘কোন ক্ষতি নেই কেউ বিশ্বাস না করলে। আমি শুধু বিশ্বাস করতে চাই।’ ‘জোয়ান যদি স্পেনে না ফিরতে পারে?’ একটু চুপ করে থেকে জেন বলল, যেখানেই থাকুক, ভাল থাকলে, নিরাপদ থাকলে আমি খুশী হবো। তবে আমি কি মনে করি জানিস, জোয়ান স্পেনে আসবে, কোন বাধা তাকে রুখতে পারবে না।’ ‘এতবড় কথা কি করে বলছিস? ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের ক্ষমতা তুই জানিস?’ ‘জেনেই বলছি হান্না।’ ‘কিন্তু আমি কোন যুক্তি দেখছি না, জোয়ান তো শান্ত-শিষ্ট এক ছেলে। ওর মাথা আছে, কিন্তু হাত তো নেই।’ ‘ট্রিয়েস্টে বাকি যে আটটি খুনের ঘটনা ঘটল, তার একটিও জোয়ান করেনি। তাহলে এসব ঘটল কি করে বলতে পারিস?’ ‘আমারও বিরাট জিজ্ঞাসা এটা।’ ‘সব ঘটনা একজনে ঘটিয়েছেন না।’ ‘একজনে? কে সে?’ ‘আহমদ মুসা।’ ‘আহমদ মুসা? কোন আহমদ মুসা?’ ‘আজকের বিশ্বে সবাই চেনার মত আহমদ মুসা একজনই আছে।’ ‘সেই আহমদ মুসা স্পেনে এসেছে? ট্রিয়েস্টে গিয়েছিল? চাচাজানের কথা তাহলে ঠিক?’ চোখ কপালে তুলে বলল হান্না। ‘হ্যাঁ।’ ‘তুই কি করে জানলি?’ মুহূর্তের জন্যে দ্বিধায় পড়ে গেল জেন। তারপর বলল, ‘আমি তার ফটো দেখেছিলাম, ট্রিয়েস্টে দেখেই চিনতে পারি।’ ‘ট্রিয়েস্টে দেখেছিস, কোথায়?’ ‘মটেল সি-কুইনের সামনে তিনিই হত্যা করলেন অধ্যাপক ভিলারোয়ার সাথের লোকটিকে।’ ‘ওই লোক আহমদ মুসা?’ একটা ঢোক গিলল হান্না। তারপর আবার বলল, ‘তাই হবে আমিও ভেবেছি, এতগুলো লোকের সামনে এত শান্তভাবে এতগুলো কান্ড ঘটিয়ে গেল যে লোক সে সাধারণ নয়। তাছাড়া মিঃ ভিলারোয়াকে যে লোকটি নিয়ে এসেছিল, সেই তো প্রথম পিস্তল বের করে, কিন্তু ব্যবহার আগে করতে পারেনি। আহমদ মুসা লোকটি কিভাবে কখন পিস্তল বের করল, ব্যবহার করল বোঝাই গেল না।’ আবার থামল হান্না। থেমেই আবার শুরু করল, ‘কিন্তু আহমদ মুসা জোয়ানের সাহায্যে আসবে কেন?’ ‘আহমদ মুসা বিপদগ্রস্ত মানুষ, বিপদগ্রস্ত জাতির পাশে দাঁড়ান।’ ‘কিন্তু জোয়ান যে বিপদে পড়েছে, সে বিপদ তো দু’চারশ’ লোকের বিরুদ্ধে লড়াই করে দূর করা যাবে না।’ ‘আমি এসব কিছুই জানিনা হান্না,কিন্তু মনে হচ্ছে বড় একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে।’ ‘তুই এটা বোঝার পরেও জোয়ানের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলছিস কি করে? ‘হয়তো এটাই আমার ভাগ্য।’ ‘তুই বুদ্ধিমতী, কিন্তু এই ব্যাপার নিয়ে তুই এত অবুঝ হবি, ভাবতে বিস্ময় লাগছে।’ কেঁদে ফেলল জেন। বলল, ‘ও নিরপরাধ, ওর প্রতি আমার দেশ, আমার জাতি, সরকার সবাই অবিচার করছে। আমি ওকে আঘাত দিতে পারিনি।’ ‘জেন, আমি তো সাক্ষী, জোয়ান তোর কাছ থেকে সরে যেতে চেয়েছিল।’ ‘সরে যেতে চেয়ে ও প্রমান করেছে ও অসাধারন। কেন আমি প্রমান করব না যে, আমি ওর চেয়ে ছোট নই। থাক এসব কথা হান্না। তুই সব বুঝেও এমন করে বলছিস। জানি তুই আমার ভাল চাস। কিন্তু চরম অবিচারের শিকার হয়ে জোয়ান যদি শেষ হয়ে যায়, আমি বাচঁব না। তার চেয়ে ভাল, যতটুকু পারি ওর পাশে থেকে লড়ব জাতির অবিচারের বিরুদ্ধে। তাতে জীবন যদি আমার যায়, তাতে আমার এই কার্ডিনাল পরিবারের কিছুটা প্রায়শ্চিত্ত হবে। মরিসকোদের উপর জুলুম আমার মনে হয় আমার পরিবারের চেয়ে বেশী কোন পরিবার করেনি।’ জেনের দু’চোখ থেকে দু’ফোটা অশ্রু খসে পড়ল, নেমে এল গন্ড বেয়ে। হান্না জড়িয়ে ধরল জেনকে। বলল, ‘হতভাগী বান্ধবী আমার। তোকে আমার চেয়ে কে বেশী বোঝে! আমি যাই মনে করি আমাকে তোর পাশে পাবি।’ ‘আমি জানি হান্না।’ হান্নাকে জড়িয়ে ধরে বলল জেন। দুই বান্ধবীর চোখেই তখন অশ্রু। ঘরের বাইরে জেনের আম্মার কন্ঠ শোনা গেল, তার সাথে পায়ের শব্দ। জেন ও হান্না দু’জনেই তাড়াতাড়ি তাদের চোখের পানি মুছে ফেলল। আলবাসেট-মাদ্রিদ হাইওয়ে ধরে ছুটে চলছিল আহমদ মুসার গাড়ি মাদ্রিদের দিকে। তারা ঠিক দক্ষিন দিক দিয়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে মাদ্রিদে। পিরেনিজ থেকে সোজা এলে উত্তরের যে কোন পথে তাদের মাদ্রিদ প্রবেশের কথা, কিন্তু আহমদ মুসা ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানকে কাঁচ কলা দেখাবার জন্যে দিক পরিবর্তন করেছে। চারদিক থেকে মাদ্রিদ প্রবেশের মোট হাইওয়ে আছে সাতটা। মাদ্রিদ-সারাগোসা ও মাদ্রিদ বারগোস হাইওয়ে উত্তর দিক থেকে, পশ্চিম দিক থেকে মাদ্রিদ-ভেল্লাদলিত ও মাদ্রিদ-বাজোস হাইওয়ে এবং দক্ষিনে তিনটি হাইওয়ে মাদ্রিদ-টলেড, মাদ্রিদ-আলবাসেট এবং মাদ্রিদ-ভ্যালেন্সিয়া। পিরেনিজের ভেল্লা থেকে মাদ্রিদের সোজা পথ ছিল লেরিদা-সারাগোসা-মাদ্রিদ হাইওয়ে। এ পথে এলে তারা পূর্ব-উত্তর প্রান্ত দিয়ে মাদ্রিদ প্রবেশ করতো। কিন্তু আহমদ মুসা এ সোজা পথ পছন্দ করেনি। আহমদ মুসা পরিষ্কারই বুঝতে পেরেছিল, ভেনিস থেকে ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের লোকরা যখন তুলুজকে আহমদ মুসাদের ব্যাপারে সতর্ক করে দিতে পেরেছে, তখন তুলুজ মাদ্রিদকে অবশ্যই জানাতে পারে যে, আহমদ মুসারা গোরোনে হাইওয়ে ধরে ভেল্লার পথে স্পেনে প্রবেশ করছে। ভেল্লা থেকে আহমদ মুসারা যে সারাগোসা-মাদ্রিদ হাইওয়ে ধরে মাদ্রিদ প্রবেশ করছে, এ কথা ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান চোখ বন্ধ করেই ধরে নেবে। সুতরাং তুলুজে তারা যে জাল পেতেছিল, তার চেয়েও বড় জাল ভাসকুয়েজ পাতবে মাদ্রিদ-সারাগোসা হাইওয়েতে। সুতরাং আহমদ মুসা ভেল্লা থেকে বেরুবার সময়ই মনস্থির করে নিয়েছিল, ভিন্ন রুটে তারা মাদ্রিদ প্রবেশ করবে। ভেল্লা থেকে উত্তর-পূর্ব স্পেনের ক্যাটালোনিয়া প্রদেশের রাজধানী লেরিদায় প্রবেশ করে ড্রাইভিং সিট থেকে আবদুর রহমান বলেছিল, ‘তখন আমরা তো পশ্চিমে সারাগোসার দিকে চলব, তাই না মুসা ভাই?’ ‘না আবদুর রহমান, সোজা পূর্ব দিকে এগিয়ে উপকুল শহর টেরাগন চল।’ ‘টেরাগন? আমরা মাদ্রিদ যাব না মুসা ভাই?’ চোখ কপালে তুলে বলেছিল আবদুর রহমান। ‘যাব, তবে সোজা পথে নয়। টেরাগন থেকে যাব ভ্যালেনসিয়া, ভ্যালেনসিয়া থেকে আলমানসা হয়ে অলবাসেট এবং সেখান থেকে মাদ্রিদ।’ ‘এত ঘুরার কি প্রয়োজন ছিল মুসা ভাই?’ ‘ছিল না। কিন্তু ওদের চোখ এড়িয়ে আমি মাদ্রিদ প্রবেশ করতে চাই। ওরা জানুক যে, আমরা মাদ্রিদে আসিনি, তাহলে কাজের একটু সুবিধা হবে। সবচেয়ে বড় কাজ এখন আমাদেরকে মাদ্রিদে করতে হবে। ওরা যত অপ্রস্তুত থাকে তত ভাল আমাদের জন্যে।’ ‘কিন্তু মুসা ভাই, ভ্যালেনসিয়া থেকে সোজা একটা হাইওয়ে গেছে মাদ্রিদে, ও পথেও তো আমরা যেতে পারি?’ বলেছিল জোয়ান। ‘পারি, কিন্তু তারচেয়েও আলবাসেট-মাদ্রিদ হাইওয়েটা নিরাপদ হবে বলে আমি মনে করি। সারাগোসা-মাদ্রিদ হাইওয়ের পাশেই তো অনেকটা ভ্যালেনসিয়া-মাদ্রিদ হাইওয়ে।’ একে তো ঘুরা পথ, তার উপর ভ্যালেনসিয়া এসে একদিন দেরী হয়েছিল আহমদ মুসাদের। ভ্যালেনসিয়া শহরটি জোয়ান এবং আবদুর রহমান দু’জনেরই আবেগের সাথে জড়িত। তাছাড়া আহমদ মুসাও স্পেনের পুর্ব উপকুলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বন্দর নগরী ভ্যালেনসিয়া একটু ঘুরে দেখার লোভ সামলাতে পারেনি। এখনকার ভ্যালেনসিয়া একেবারে নতুন, আগের ভ্যালেনসিয়ার কোন চিহ্নই এখন বর্তমান নেই। তবু জোয়ান এবং আবদুর রহমান পাগলের মত ছুটে বেড়িয়েছে ভ্যালেনসিয়ার এগলি থেকে সেগলিতে। ভ্যালেনসিয়ার পুরানো এলাকার যে বাড়িই দেখেছে, মনে হয়েছে এখানেই হয়তো তাদের পুর্ব পুরুষ আবদুর রহমান থাকতেন অথবা এই বাড়িতেই শুরু হয় আবদুল্লাহ বিন আবদুর রহমানের দাসজীবন। তারা ঘুরে ঘুরেই জানতে পারল, অতীতের দুটো স্মৃতিই মাত্র বর্তমান। একটি হলো, আবদুর রহমান ও জোয়ানের পুর্ব পুরুষ বিজ্ঞানী আবদুর রহমানের ‘দারুল হিকমা’ বা বিজ্ঞান বিদ্যালয়ের স্থানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভ্যালেনসিয়া বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়। আরেকটি হলো, ভ্যালেনসিয়া বন্দরের ইসাবেলা জেটি। বহু আশা করে জোয়ানরা গেয়েছিল বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে আধুনিক বিল্ডিং-এর সারি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায়নি জোয়ানরা। তবু সেখানে গিয়ে সজল হয়ে উঠেছিল জোয়ান ও আবদুর রহমানের চোখ। সেখানকার মাটিতে, বাতাসে দারুল হিকমার স্পর্শ তারা খুঁজছিল। বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তারা চলে এসেছিল ভ্যালেনসিয়া বন্দরে ইসাবেলা জেটিতে। এখানে জোয়ান, আবদুর রহমান, আহমদ মুসা সকলেই ভাবপ্রবন হয়ে পড়েছিল। ভ্যালেনসিয়া ও পুর্ব স্পেন থেকে উচ্ছেদকৃত মুসলিম নর-নারীদের সর্বশেষ দলটিকে নিয়ে সর্বশেষ জাহাজটি ছেড়েছিল এই জেটি থেকে। জাহাজ ছাড়লে স্বদেশভুমি স্পেনের জন্যে কান্নারত পাগল নারী-পুরুষরা চিৎকার করে অভিসম্পাত দিচ্ছিল রানী ইসাবেলা ও রাজা ফার্ডিন্যান্ডকে। এর জবাবে রানী ইসাবেলা ও ফার্ডিন্যান্ডের সৈনিকরা উপকূল থেকে কামান দেগে জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। নারী-পুরুষ সবাই ডুবে মরে, কাউকেই উপকূলে উঠতে দেয়া হয়নি। এই কৃতিত্বপূর্ন ঘটনার স্মরনে স্থানীয় খৃষ্টানরা এই জেটির নাম দেয় ইসাবেলা জেটি। এই জেটিতে দাঁড়িয়ে সাগরের দিকে তাকাতে গিয়ে অশ্রুতে চোখ ভরে উঠেছিল জোয়ান, আবদুর রহমান এবং আহমদ মুসা তিনজনেরই। আহমদ মুসা তার এক হাত আবদুর রহমান আরেক হাত জোয়ানের কাঁধে রেখে সামনে সাগরের বুকের উপর দৃষ্টি রেখে বলেছিল, ‘আমরা এক জাহাজের কথাই শুধু ভাবছি, কিন্তু জান কি স্পেনের মুসলিম উদ্বাস্তু বোঝাই কত জাহাজ সামনের ঐ মেজর্কা, মানর্কা দ্বীপে লুন্ঠিত হয়েছে, কত জাহাজ ডুবেছে, ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে সামনের ঐ ভূমধ্যসাগরে? স্পেনে একটি জাতি স্বত্ত্বা ধ্বংসের যে ঘটনা, ইতিহাসে তার নজীর নেই, আবার এই সাগরে মুসলিম উদ্বাস্তুদের যে পরিনতি হয়েছে ইতিহাসের কোন অধ্যায়ে তা আর ঘটেনি। অথচ এই সাগরের দুইদিক ঘিরে তখনও মুসলিম সাম্রাজ্য!’ ভেজা চোখে তারা ফিরে এসেছিল ইসাবেলা জেটি থেকে। তিনজনেরই পর্যটকের ছদ্মবেশ। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, কোমরে চওড়া বেল্ট। তিনজনের মুখেই দাঁড়ি ও গোঁফ লাগানো। খুব পরিচিত না হলে তাদেরকে চেনার উপায় নেই। আহমদ মুসা সাধারণত ছদ্মবেশ নেয় না, কিন্তু এবার নেয়ার প্রয়োজন বোধ করেছে। সে নিরপদ্রুপে মাদ্রিদ পৌঁছাতে চায়। তার লক্ষ্য এখন কোন সংঘাত নয়, তার লক্ষ্য তেজস্ক্রিয় সেটের পরিকল্পনার মানচিত্র উদ্ধার করা। সাগরের কূল ছেড়ে বন্দরের অনেক খানি উপরে তারা উঠে এসেছে। পার্ক করা গাড়ির দিকে এগুচ্ছিল তারা। পাশেই এ সময় ছেলে-মেয়েদের একটা জটলা দেখতে পেয়েছিল। আহমদ মুসারা তিনজনেই সেদিকে তাকিয়ে ছিল। দেখলো, বৃদ্ধ-প্রায় একটা মহিলাকে ছেলেরা উত্যক্ত করছে। সমস্বরে তারা বলছে, মরিসকো পাগলী। বার বার একথা বলছে। সুবেশা মহিলাটা কোন ভ্রুক্ষেপই করছেনা। একমনে একটা রুটি চিবাচ্ছে। ‘মরিস্‌কো পাগলী’র মরিস্‌কো শব্দটি আহমদ মুসাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। হৃদয়ে এসে ঘা দিয়েছিলো শব্দটা। মহিলাটি কি মরিস্‌কো জোয়ানের মনটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল। আহমদ মুসারা এগিয়ে গিয়েছিল জটলার দিকে। জোয়ান আগে আগে। জটলা থেকে একজন যুবক ছেলে, বয়স আঠার, উনিশ হবে, চলে যাচ্ছিল আহমদ মুসাদের পাশ দিয়েই। জোয়ান তাকে ডেকে বলেছিল, ঐ যে মহিলাটিকে তোমরা উত্যক্ত করছ সে কে?’ কেন ওকে চিনেন না। সবাই বলে মরিস্‌কো পাগলী। বলেছিল ছেলেটি। ‘কে ও? ওকি সত্যি পাগল? আবার জিজ্ঞাসা করে জোয়ান। ‘জানি না, সবাই বলে পাগল। কখনও হাসে, কখনও কাঁদে।’ ‘ওঁর আপন কেউ নেই?’ ‘ছিল, ওর আব্বা ও ভাই ছিল। কিন্তু তারা এখন নাই। ওদের হত্যা করা হয়েছে।’ ‘হত্যা করা হয়েছে? কে হত্যা করেছে?’ ‘ওরা মরিস্‌কো পরিচয় গোপন করে ওদের মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিল সেই অপরাধে ওদের হত্যা করা হয় শুনেছি। আর স্বামী ওকে তাড়িয়ে দিয়েছে।’ ছেলেটির কন্ঠ ভারি। ‘বুঝেছি, তোমরা এমন দুঃখী মেয়েকে কষ্ট দাও, খারাপ লাগে না?’ ‘আমি দেখতে গিয়েছিলাম, আমি কিছু বলিনি, আমি কিছু করিনি’ ছেলেটির কণ্ঠ ভারি ও ক্ষুব্ধ মনে হলো। সে কণ্ঠে চমকে উঠেছিল জোয়ান এবং আহমদ মুসারাও। ‘তুমি খুব ভাল ছেলে, মানুষের প্রতি তোমার দরদ আছে। চল তুমি একটু সাহায্য করবে, আমরা ওর সাথে কথা বলতে চাই।’ ছেলেটি বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে ছিল জোয়ান এবং আহমদ মুসাদের দিকে। পরে গম্ভীর কণ্ঠে বলেছিল, ‘কোন লাভ নেই, ওঁ কাউকে চিনে না, কারও সাথে কথাও বলে না। যা বলে আপন মনে বলে।’ ‘তবুও চেষ্টা করে দেখি চল।’ বলেছিল জোয়ান। পাগলিনীকে ঘিরে ছেলেদের জটলা তখন ছিল না। চলে গিয়েছিল সবাই। মরিস্‌কো পাগলী একটা পাথরে হেলান দিয়ে বসে ঢুলছিল। আহমদ মুসারা তার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাদের সাথে ছেলেটি। ছেলেটি হয়ে পড়েছিল গম্ভীর, তার মুখটা হয়ে উঠেছিল কেমন যেন ফ্যাকাশে। ব্যাপারটা আহমদ মুসার দৃষ্টিতে পড়েছিল। জোয়ান মহিলাটির সামনে গিয়ে বসে পড়েছিল। মহিলাটিকে সম্বোধন করে বলেছিল, ‘মা’। স্পষ্ট ওঁ দরদভরা কণ্ঠ ছিল জোয়ানের। মরিস্‌কো পাগলী মহিলাটি মাথা খাড়া করেছিল অনেকটা চমকে উঠার মত করে। চোখ তুলে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল জোয়ানের দিকে। আবার ডেকে ছিল জোয়ান, ‘মা।’ স্থির দৃষ্টি কাঁপছিল মহিলাটির। কাঁপছিল তার ঠোট। হঠাৎ তার কম্পিত ঠোট থেকে বেরিয় এল, মা, মা, মা। ‘মা’ শব্দ উচ্চারণের সাথে সাথে তার চোখের কম্পন বাড়ছিল, দৃষ্টি তীব্র হচ্ছিল। তার মধ্যে কি যেন খুঁজে পাবার আকুলি বিকুলি। অসহায়ভাবে অকূল সমুদ্রে সে যেন সাঁতরাচ্ছে, কূল খুঁজে পাচ্ছেনা। এ সময় সেখানে দু’জন মহিলা পুলিশ এসে হাজির। তারা দু’জন দু’হাত ধরল মরিস্‌কো পাগলীর। টেনে তুলতে তুলতে তুলতে বলেছিল, চলুন ফেরার সময় হয়েছে। মরিস্‌কো পাগলী জোয়ানের দিকে চোখ উঠিয়ে হেসে উঠেছিল উচ্চস্বরে। পুলিশ দু’জন পাগলীকে নিয়ে চলে গিয়েছিল। জোয়ানের বুক জুড়ে তোলপাড় করছিল, একটি কথা- ‘স্পেনে মরিসকোদের হয় দাস হতে হয়, নয়তো মরতে হয়, অথবা হতে হয় পাগল’।’ চোখের দু’কোণ ভিজে উঠেছিল জোয়ানের। ছেলেটি ভারি চোখে, পাংশু মুখে জোয়ানের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছিল। বলেছিল, ‘আপনি কে?’ ‘আমি? আমি ওঁর মতই একজন মরিস্‌কো ছিলাম। এখন মুসলমান।’ হঠাৎ ছেলেটি দেহ বাঁকিয়ে, মাথা ঝুকিয়ে বাও করেছিল জোয়ানকে। সেই সাথে তার দু’চোখে নেমে এসেছিল অশ্রু। জোয়ান বিস্মিত হয়েছিল। বলেছিল, তুমি এভাবে বাও করলে কেন? তুমি কাঁদছোই বা কেন ? ‘আমি একজন মরিস্‌কো, একজন মুসলমানকে শ্রদ্ধা জানালাম। আর কাঁদছি আমি আমার দুর্ভাগ্যের জন্যে।’ ‘কি দুর্ভাগ্য?’ ‘আমি আমার মাকে মা ডাকতে পারি না, মা বলতে পারিনা, তার কোন সাহ্যায্যে আসতে পারি না।’ বলতে বলতে কান্নায় ছেলেটির কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে উঠেছিল। আহমদ মুসা এগিয়ে এসে দু’হাত দিয়ে ছেলেটিকে কাছে টেনে বলেছিল, ‘বুঝতে পেরেছি, ঐ মরিস্‌কো পাগলিনী তোমার মা, তুমি তোমার মাকে মা বলতে পার না, কোন সাহায্য করতে পার না সমাজের ভয়ে। সত্যিই তুমি দুর্ভাগা।’ ছেলেটি কান্না চাপতে মুখে রুমাল চাপা দিয়েছিল। ছেলেটির সব কাহিনী শুনেছিল আহমদ মুসারা। তার বড় দুই ভাই সরকারী অফিসার, আর সে ভ্যালেনসিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ বর্ষের ছাত্র। তাদের পিতার মৃত্যু ঘটেছে অনেক দিন আগে। এরপর তারা তাদের মাকে এনে সেনিটোরিয়াসে রাখার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু মায়ের চিকিৎসার জন্যে তার কাছে মায়ের সন্তান হিসেবে হাজির হওয়া প্রয়োজন, তা তারা পারছে না। পারছে না কারন, তাতে তারাও সমাজ থেকে বিচ্যুত হবে, সব হারাবে, অন্যদিকে মায়েরও কোন উপকার করতে পারবে না। এই দুর্ভাগ্য নিয়েই তারা বেঁচে আছে। মাঝে মাঝে তারা সেনিটোরিয়াসে যায়। দূর থেকে দেখে আসে। সপ্তাহে একদিন পাগলিনী সকলকে শহরে ছেড়ে দেয়া হয়, আবার নির্দিষ্ট সময়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সপ্তাহের এ দিনটিতে তারা নিয়মিত মায়ের সান্নিধ্যে আসে, কিন্তু পরিচয় নিয়ে তার সামনে দাঁড়াতে পারে না। কাহিনী শেষ করে ছেলেটি বলেছিল, ‘একজন মরিস্‌কো পাগলিনীকে, যে সকলের ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের পাত্র, মা বলে ডাকতে পেরেছেন, আপনারা কে?’ ‘জোয়ান বলেছেই আমরা মুসলমান।’ জবাব দিয়েছিল আহমদ মুসা। ‘এদেশের মরিস্‌কো আরো আছে, মুসলমানও গোপনে আছে, কিন্তু কেউ তো এই সাহস, এই আন্তরিকতা দেখাতে পারে না?’ ‘তোমার ঠিকানা তো দিয়েছই, দরকার হলে তোমার সাথে পরে যোগাযোগ করব। এখন পরিচয় নিয়ে কি করবে?’ ‘জানি, আমাকে বিশ্বাস করতে পারবেন না। তবে একটা কথা বলি, আমরা মায়ের সন্তান, বাপের সন্তান নই। আমরা কিছুই করতে পারিনি, কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যেও পিতাকে সমর্থন করিনি।’ ‘অর্থাৎ তুমি নিজেকে মরিস্‌কো মনে কর তাই না?’ বলে জোয়ান জড়িয়ে ধরেছিল ছেলেটিকে। ছেলেটির পিট চাপড়ে বলেছিল, ‘মরিস্‌কো হওয়া গর্বের, দুঃখের নয়।’ এই সময় আব্দুর রহমান জোয়ানের কাহিনী বলেছিল ছেলেটিকে। ছেলেটি আনন্দে জড়িয়ে ধরেছিল আবার জোয়ানকে। বলেছিল, ‘আপনারা যদি আমার বড় দুই ভায়ের সাথে দেখা না করে চলে যান, তাহলে ওঁরা আমার উপর ভীষণ রাগবেন। আপনারা খুশী হবেন আমার দু’ভাইয়ের সাথে দেখা করে।’ কিন্তু আহমদ মুসারা ছেলেটিকে সময় দিতে পারেনি। বলেছিল, ‘তোমাদের টেলিফোন থাকলে, আমরা কথা বলব তোমার ভাইদের সাথে।’ বিদায়ের সময় ছেলেটি ভারি কণ্ঠে বলেছিল, আপনাদের এক ঘণ্টার সঙ্গ আমার কাছে এক যুগের মত মনে হচ্ছে। আপনারা আমাকে নতুন জীবন দিয়ে গেলেন, সেই সাথে করে গেলেন অসহায়। কারণ চলার পথ আমার জানা নেই।’ আহমদ মুসা ছেলেটির কপালে চুমু খেয়ে বলেছিল, ‘আমরা গোটা স্পেনের জন্যে নতুন জীবনের সন্ধান করছি, হতাশ হয়ো না।’ আলবাসেট-মাদ্রিদ হাইওয়ে ধরে চার দিকের অখণ্ড নিরবতার মধ্যে কালো রাতের বুক চিরে চলার সময় এই কথাগুলো আহমদ মুসা, জোয়ান ও আব্দুর রহমান সকলের মনকেই তোলপাড় করে তুলছিল। ভ্যালেনসিয়ার সেই মরিস্‌কো পাগলিনী এবং সেই পাগলিনীর হতভাগ্য ছেলে জোসেফ ফার্ডিনান্ডের কথা তারা ভুলতেই পারছিল না। মাদ্রিদ আর খুব বেশী দূরে নয়। সামনেই মাদ্রিদকে বেষ্টন করে তৈরি রিং রোড। রিং রোডের উপর দিয়ে ফ্লাইওভার। ট্রাফিকের কোন ঝামেলা নেই। একশ’ তিরিশ কিলোমিটার বেগে চলছিল আহমদ মুসার গাড়ি। ড্রাইভ করছিল আহমদ মুসাই। তার পরনে শিখের পোশাক। মাথায় পাগড়ী, ইয়া বড় দাঁড়ি-গোঁফ। আর জোয়ান ও আবদুর রহমান দু’জন তরুণ ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীক কাজ সেরে তারা মাদ্রিদে ফিরছে। জোয়ানের মুখে পরিপাটি করে ছাটা দাঁড়ি-গোঁফ। রিং রোডের ফ্লাইওভারটি তখনও পাঁচশ গজের মত দূরে। হঠাৎ ফ্লাইওভারের মুখে লাল আলো জ্বলে উঠল। দেখেই বুঝা গেল আলোটি লাইট স্টিকের। কেউ একজন উঁচিয়ে ধরে আছে। আহমদ মুসা গাড়ির গতি কমিয়ে দিল। চলে যেতে চেষ্টা করে লাভ নেই, গুলী করতে পারে। পুলিশ হতে পারে। আবার শত্রু হওয়াও বিচিত্র নয়। ফ্লাইওভারের প্রায় কাছাকাছি এসে থেকে গেল আহমদ মুসার গাড়ি। গাড়ি থামতেই ছুটে এল দুইজন। মনে হলো, শিখ ড্রাইভারের উপর নজর পড়তেই ওরা একটু থমকে গেল। পরক্ষণেই বলে উঠল, ‘তোমরা আরোহী ক’জন, কারা?’ ‘দু’জন। ব্যবসায়ী।’ পাঞ্জাবী ও স্প্যানিশ ভাষা মিশিয়ে শিখ ড্রইভারদের মতই উত্তর দিল আহমদ মুসা। ‘ওদের নামতে বল।’ ‘তোমরা কে, পুলিশ তো নও?’ ‘আমরা পুলিশের বাবা।’ ‘তাহলে গোয়েন্দা পুলিশ, কোন আসামী ফেরার হয়েছে বুঝি?’ ‘হ্যাঁ, কথা বাড়িও না, যা বলছি কর।’ আহমদ মুসা ভেতরের আলো জ্বেলে দিয়ে দরজা খুলে দিয়ে বলল, ‘দেখো।’ দরজা দিয়ে উঁকি দিল দু’জন। সামনেই বসে ছিল আবদুর রহমান। তারপর জোয়ান। মাথায় হ্যাট পরা, লম্বা কালো ওভার কোটে দেহ ঢাকা লোক দু’জন পকেট থেকে ফটো বের করে আবদুর রহমান ও জোয়ানের সাথে মিলিয়ে দেখল। তারপর দরজা থেকে সরে গিয়ে ফটো পকেটে ফেলে বলল, ‘যাও।’ ‘আর কত জায়গায় এভাবে আমাদের সময় নষ্ট হবে বলতো?’ জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা। ‘না আর চেক হবে না। মাদ্রিদের দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে শুধু রিং রোড়ের পয়েন্টেই চেক করা হচ্ছে।’ ‘আর ওদিকে? খুব বড় কিছু ঘটেছে নাকি?’ ‘ওদিকে মানে উত্তর ও পুবদিকে মাদ্রিদে পৌঁছা পর্যন্ত বার বার চেক হচ্ছে।’ ‘কি ঘটেছে তা তো বললেন না?’ ‘আমরা জানি না। হুকুম হয়েছে আমরা কাজ করছি।’ ‘ফটোগুলো সেই ক্রিমিনালদের বুঝি?’ ‘ক্রিমিনাল কিনা জানি না।’ ‘ফটো মিলিয়ে দেখছ, অথচ তারা কে জান না?’ ‘জানি না কে বলল, ও আহমদ মুসা নামের একজন লোক। এত জানার তোমার কি দরকার, যাও।’ ‘ধন্যবাদ’ বলে আহমদ মুসা গাড়ি স্টার্ট দিল। লাফিয়ে উঠে চলতে শুরু করল গাড়ি। আবার সেই গতিবেগ- একশ’ তিরিশ কিলোমিটার বেগে ছুটতে লাগল গাড়ি। রাত তখন এগারটা। রাস্তায় গাড়ি খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। রাতের নিরবতায় একটানা শো শো শব্দের স্পন্দন তুলে ছুটছে আহমদ মুসার গাড়ি। আহমদ মুসা মুখটা একটু পাশে টেনে পেছনে জোয়ানকে লক্ষ্য করে বলল, ‘জোয়ান ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্নানের তালিকায় আহমদ মুসার পাশে তোমারও নাম উঠল মনে হয়। দ্বিতীয় ফটোটা ছিল সম্ভবতঃ তোমারই।’ ‘আমার সৌভাগ্য মুসা ভাই।’ বলল জোয়ান। ‘তোমার বাড়িতে থাকা তোমার জন্যে নিরাপদ হবে?’ ‘দ্বিতীয় বার পরিবর্তন করে যে বাসা নিয়েছি, সেটার সন্ধান ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ন্যান কিছুতেই পাবার কথা নয়।’ ‘তবু আজ রাতেই ফিরবে বাড়িতে?’ ‘অসুবিধা নেই মুসা ভাই।’ ‘ঠিক আছে, চল ফিলিপের ওখানে আগে যাই, তারপর তোমাকে পৌঁছে দেব।’ ‘ঠিক আছে। আবদুর রহমান ভাই আমার বাসাতে তো যাবেই।’ ‘তোমাদের সম্মিলনিতে আমিও যেতে পারলে খুশী হতাম। কিন্তু ঘুমাব। ভোর রাতে আমাকে বেরুতে হবে।’ ‘ভোর রাতে? কোথায় মুসা ভাই?’ বলল আবদুর রহমান। ‘যে বাঘ আমাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে, তার গুহায়।’ ‘তার মানে ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ন্যানের হেড কোয়ার্টারে?’ ‘হ্যাঁ।’ ‘আমরাও তো যাচ্ছি।’ বলল জোয়ান। ‘এবার না, কাল একাই যাব।’ আবদুর রহমান এবং জোয়ান দু’জনেরই মুখটা মলিন হলো। বলল জোয়ান, ‘কি ক্ষতি হবে আমাদের নিলে, আমরা বাইরে পাহারায় তো থাকতে পারবো। ‘কালকে আমি সংঘাত করতে যাচ্ছি না, যাচ্ছি চোরের মত গোপনে অনুসন্ধান অভিযানে। এখানে লোক যত কম, তত ভাল।’ আবদুর রহমান ও জোয়ান আর প্রতিবাদ করলো না। কিন্তু তাদের মুখ দেখে মনে হলো, আহমদ মুসার এ যুক্তি তারা গ্রহন করতে পারেনি। আবার নিরবতা নামল গাড়িতে। সামনে একটু দূরে লিওন সাইনে ‘ওয়েলকাম’ শব্দটি জ্বল জ্বল করছে। ওখান থেকেই মাদ্রিদ শহরের শুরু। অল্পক্ষণের মধ্যেই মাদ্রিদ শহরে প্রবেশ করল আহমদ মুসার গাড়ি। স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল আহমদ মুসার বুক থেকে। স্টিয়ারিং-এ হাত রেখেই সিটে হেলান দিয়ে আরাম করে বসল আহমদ মুসা। ধীর ভাবে এগিয়ে চলল গাড়ি শহরের পথ ধরে। তাহাজ্জত নামায শেষ করে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। তারপর পোশাক পরে রাতের অভিযানের জন্যে প্রস্তুত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল আহমদ মুসা। রাতেই আহমদ মুসা তার এ অভিযানের কথা ফিলিপকে বলেছিল। ফিলিপও আহমদ মুসাকে একা যেতে দিতে রাজি হয়নি। আহমদ মুসা তাকে বুঝিয়ে বলেছিল, সে যাচ্ছে একটা অনুসন্ধান মিশনে- তেজস্ত্রিয় পাতায় পরিকল্পনা- ম্যাপের সন্ধানে। এমন গোপন মিশন এক ব্যক্তির জন্যেই মানায় ভাল।’ ফিলিপ আর আপত্তি করতে পারেনি। আহমদ মুসার বিবেচনাকে সে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে। ঘর থেকে বেরিয়ে আহমদ মুসা চলে এল দু’তালায় নামার সিঁড়ির মুখে। বাড়িটা তিনতলা। তিনতলায় থাকে ফিলিপের পরিবার। দু’তলা জুড়ে লাইব্রেরী, স্টাডিরুম, স্টোর রুম, গেস্ট রুম ইত্যাদি। নিচের তলাটা রান্না, খাবার ও কর্মী ও কর্মচারীদের বাসের জন্যে। আর বড় ড্রইং রুমটা নিচের তলাতেই- একেবারে বাড়িতে ঢোকার মুখেই। সিঁড়ি দিয়ে নামার জন্যে পা তুলতে গিয়ে হঠাৎ বাম দিকে তিন তলায় উঠার সিঁড়ির শেষ ধাপে একটি নারীমুর্তির উপর নজর পড়ল আহমদ মুসার। আবছা আলো-অন্ধকারেও বুঝতে পারল ও মারিয়া। আহমদ মুসার দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্থিরভাবে। আহমদ মুসা চমকে উঠার চাইতে বিরক্তি বোধ করল বেশী। এই রাতে, এইখানে, এইভাবে সে মারিয়াকে আসা করেনি। নামার জন্যে এগিয়ে দেয়া পাটা টেনে এনে দৃষ্টি নিচু করে বলল আহমদ মুসা, ‘এত রাতে এখানে? কিছু বলবে মারিয়া?’ গলার স্বরটা কঠোর শোনাল আহমদ মুসার। মারিয়ার কাছ থেকে কোন উত্তর এল না। মাথার রুমালের একটা অংশ মুখ দিয়ে কাপড় ধরে ঘুরে দাঁড়িয়ে দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে উঠে গেল তিন তলার দিকে। আহমদ মুসা মুহূর্ত কয়েক দাঁড়িয়ে পা বাড়াল সিঁড়ির দিকে দোতলা থেকে নামার জন্যে। বিরক্তির চিহ্ন তার মুখ থেকে তখনও যায়নি। মারিয়ার কাছ থেকে এই আচরণ সে মেনে নিতে পারছে না। নিচের তলার ড্রইং রুমের দরজায় এসে আহমদ মুসা দেখল ফিলিপ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ি বারান্দায় তাকিয়ে দেখল গাড়ি রেডি। বিস্মিত আহমদ মুসা ফিলিপের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এমন তো কথা ছিল না ফিলিপ, তুমি এভাবে উঠে বসে আছ! আমি তো দারোয়ানকে বলে রেখেছিলাম। কোনই অসুবিধা আমার হতো না।’ ফিলিপ বলল, ‘আমাকে দোষ দেবেন না মুসা ভাই। মারিয়া আমাকে ঘুমাতে দেয়নি। রাত ৩টার সময় ডেকে তুলেছে। বলেছে, ‘আপনি আমাদের মেহমান, তার উপর যাচ্ছেন ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ন্যানের ঘাটিতে। কিছুতেই আপনাকে একা ছেড়ে দেয়া ঠিক হবে না। তার কথা, আমি যেন আপনাকে আবার অনুরোধ করি আমাকে সাথে নেয়ার জন্যে।’ আহমদ মুসার মনটা নরম হলো। একধাপ এগিয়ে ফিলিপকে দু’হাত দিয়ে কাছে টেনে নিয়ে বলল, ‘এ অভিযানের জন্যে যদি এমন প্রয়োজন থাকতো, তাহলে আমি অবশ্যই বলতাম ফিলিপ। যদি পারি আজ শুধু ভাসকুয়েজের ঘরটা অনুসন্ধান করব, আর কিছু নয়। যখন প্রয়োজন হবে, তখন দেখবে ডেকে নিয়ে যাব।’ বলে আহমদ মুসা বেরিয়ে এল গাড়ি বারান্দায়। গাড়ির ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলে ফুয়েল মিটারের দিকে তাকিয়ে দেখল, ফুয়েল ট্যাঙ্ক ভর্তি। আহমদ মুসা ফিরে দাঁড়িয়ে পেছনে দাঁড়ানো ফিলিপের সাথে হ্যান্ডশেক করে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে গাড়িতে উঠে বসল। দরজা বন্ধ করে গাড়িতে স্টার্ট দিল। গাড়ি একটা গর্জন করে জেগে উঠে চলতে শুরু করল। দারোয়ান আগেই গেট খুলে দিয়েছিল। গেট দিয়ে বেরিয়ে এল আহমদ মুসার গাড়ি। নিস্তব্ধ রাতের নিরব রাজপথ ধরে ছুটে চলল আহমদ মুসার গাড়ি তীর বেগে। লক্ষ ক্লূ-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের হেড কোয়ার্টার।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ১৩.আন্দালুসিয়ার প্রান্তরে (৫-শেষ)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন