বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

বোকা সাথী

"মজার গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান MD.Belal Hosan (০ পয়েন্ট)

X এক নাপিত। তার সঙ্গে এক তাঁতীর খুব ভাব। নাপিত লোককে কামাইয়া বেশি পয়সা উপার্যন করিতে পারে না। তাঁতি কাপড় বুনিয়া বেশি লাভ করিতে পারে না। দুই জনেরই খুব টানাটানি। আর টানাটানি বলিয়া কাহারও বউ কাহাকে দেখিতে পারে না। এটা কিনিয়া আন নাই, ওটা কিনয়িা আন নাই বলিয়া বউরা দিনরাই কেবল মিটির মিটির করে। কাতই আর ইহা সহ্য করা যায়। একদিন তাঁতি যাইয়া নাপিতকে বলিল, ‘বউ এর জ্বালায় আর ত বাড়িতে টিকিতে পারি না’। নাপিত জবাব দিল, ‘ভাইরে ! আমারও সেই কথা। দেখনা আজ পিছার (ঝাড়ু) বাড়ি দিয়া আমার পিঠের ছাল আর রাখে নাই’। তাঁতি জিজ্ঞাসা করে, ‘ আচ্ছা ভাই, ইহার কোন বিহিত কারা যায় না?’। নাপিত বলে, ‘চল ভাই, আমরা দেশ ছাড়িয়া বিদেশে চলিয়া যাই। যেখানে বউরা আমাদের খুজিয়াও পাইবে না; আর জ্বালাতনও করিতে পারিবে না’। সত্যি সত্যিই একদিন তাহারা দেশ ছাড়িয়া পালাইয়া চলিল। এদেশ ছাড়াইয়া ওদেশ ছাড়াইয়া যাইতে যাইতে তাহারা এক বিজন বন-জঙ্গলের মধ্যে আসিয়া পড়িল। এমন সময় হালুম হালুম করিয়া এক বাঘ আসিয়া তাদের সামনে খাড়া। ভয়ে তাঁতি ত ঠির ঠির করিয়া কাপিতেছে। নাপিত তাড়াতাড়ি তার ঝুলি হইতে একখানা আয়না বাহির করিয়া বাঘের মুখের সামনে ধরিয়া বলিল, ‘এই বাঘটা ত আগেই ধরিয়াছি। তাঁতী ! তুই দড়ি বাহির কর- সমনের বাঘটাকেও বাঁধিয়া ফেলি’। বাঘ আয়নার মধ্যে তার নিজের ছবি দেখিয়া ভাবিল, ‘এরা না জানি কতবড় পালোয়ান। একটা বাঘকে ধরিয়া রাখিয়াছে। আবার আমাকেও বাঁধিয়া রাখিতে দড়ি বাহির করিতেছে’। এই না ভাবিয়া বাঘ লেজ উঠাইয়া দে চম্পট। তাঁতি তখনো ঠির ঠির করিয়া কাঁপিতেছে। বনের মধ্যে আঁধার করিয়া রাত আসিল। ধারে কাছে কোন ঘর বাড়ি নাই। সেখানে দাঁড়াইয়া থাকিলে বাঘের পেটে যাইতে হবে। সামনে ছিল এক বড় গাছ। দউজনে যুক্তি করিয়া সেই গাঠে উঠিয়া পড়িল। এদিকে হইয়াছে কি? সেই যে বাঘ ভয় পাইয়া পালাইয়া গিয়াছিল, সে যাইয়া আর বাঘদের বলিল, ‘অমুক গাছের তলায় দুইজন পালোয়ান আসিয়াছে। তাহারা একটা বাঘকে ধরিয়া রাখিয়াছে। আমাকেও বাঁধিতে দড়ি বাহির করিতেছিল। এই অবসরে আমি পালাইয়া আসিয়াছি। তোমরা কেহ ওপথ দিয়া যাইও না’। বাঘদের মধ্যে যে মোড়ল- সেই জাঁদরেল বাঘ বলিল, ‘কিসের পালোয়ান? মানুষ কি বাঘের সাথে পারে? চল সকলে মিলিয়া দেখিয়া আসি’ জঙ্গী বাঘ-সিঙ্গিবাঘ-মামুদ বাঘ- খুতখুতে বাঘ-কুতকুতে বাঘ, সকল বাঘ তর্জন-গর্জণ করিয়া সেই গাছের তলায় আসিয়া পৌছিল। একে ত রাত অন্ধারী, তার উপর বাঘের হুঙ্কার- অন্ধকারে জোড়া জোড়া বাঘের চোখ জ্বলিতেছে। তাই না দেখিয়া তাঁতি ত ভয়ে কাঁপিয়া অস্থির। নাপিত যত বলে- ‘তাঁতী এক সাহসে ভর কর!’ তাঁতী ততই কাপেঁ। তখন নাপিত দড়ি দিয়া তাঁতীকে গাছেল ডালের সঙ্গে বাঁধিয়া রাখিল’। কিন্তু তাহারা গাছের আগডালে আছে বলিয়া বাঘ তাহাদের নাগাল পাইতেছে না। তখন জাঁদরেল বাঘ আর সব বাঘদের বলিল, ‘দেখ তোরা একজন আমার পিঠে ওঠে-তার পিঠে আরেক জন ওঠ- তার পিঠে আরেক জন ওঠ-এমন কলিয়া উপরে উঠিয়া হাতের থাবা দিয়া এই লোক দু’টোকে নামাইয়া লইয়া আয়’। এই ভাবে একজনের ঠিঠে আর একজন তার পিঠে আর একজন করিয়া যেই উপরের বাঘটি তাঁতিকে ছুতে যাইবে, অমনি ভয়ে ঠির ঠির করিয়া কাঁপিতে কাঁপিতে দড়িসমতে তাঁতী ত মাটিতে পড়িয়া গিয়োছে। উপরের ডাল হইতে নাপিত বলিল- ‘তাঁতী তুই দড়ি দিয়া মাটির উপর হইতে জাঁদরেল বাঘটিকে আগে বাধ, আমি উপরের দিক হইতে একটা একটা করিয়া সবগুলি বাঘকে বাঁধিতেছি’। এই কথা শুনিয়া নিচের বাঘ ভবিল আমাকেই ত আগে বাঁধিতে আসিবে। তখন সে লেজ উঁচাইয়া দে দৌড়- তখন এ বাঘের উপর পড়ে ও বাঘ, সে বাঘের উপর পড়ে আরেক বাঘ। নাপিত উপর হইতে বলে, ‘ জোলা মজবুত করিয়া বাঁধ- মজবুত করিয়া বাঁধ। একটা বাঘও যেন পালাইতে না পারে’। সব বাঘ তখন পালাইয়া সাফ। বাকি রাত টুকু কোনরকমে পাড় করিয়া পরদিন সকাল হইলে তাঁতী আর নাপিত বন ছাড়াইয়া আর এক রাজার রাজ্যে আসিয়া উপস্থিত হইল। রাজা রাজসভায় বসিয়া আছেন। এমন সময় নাপিত তাঁতীকে সঙ্গে লইয়া রাজার সামনে যাইয়া হজির। ‘মহারাজ প্রণাম হই’। রাজা বলিল, ‘ কি চাও তোমরা?’ নাপিত বলিল’ ‘আমরা দুইজন বীর পালোয়ান। আপনার এখানে চাকুরি চাই’। রাজা বলিলেন, ‘তেমারা কেমন বীর তা পরখ না করিলে ত চাকরি দিতে পারি না? আমার রাজবাড়িতে আছে দশজন কুস্তিগীর, তাহাদের যদি কুস্তিতে হারাইতে পার তবে চাকরি মিলিবে’। নাপিত বলিল, ‘মহারাজের আর্শিবাদে নিশ্চয় তাহাদের হারাইয়া দিব’। তখন রাজা কুস্তি পরখের একটি দিন স্থির কলিয়া দিলেন। নাপিত বলিল, ‘মাহারাজ ! কুস্তি দেখিবার জন্য ত কত লোক আসবে, কত মজা হইবে। মাঠের মধ্যে একখানা ঘর তৈরী করিয়া দেন। যদি বৃষ্টি-বাদল হয়, লোকজন সেখানে যাইয়া আশ্রয় লাইবে’। রাজার আদেশে মাঠের মধ্যে প্রকান্ড খড়ের ঘর তৈরী হইল। রাতে নাপিত চুপি চুপি যাইয়া তাহার ক্ষুর দিয়া ঘরের সমস্ত বাঁধন কাটিয়া দিল। প্রকান্ড খড়ের ঘর কোনরকমে খামের উপর খাড়া হইয়া রহিল। পরের দিন কুস্তি দেখিতে হাজার হাজার লোক জমা জইয়াছে। রাজা আসিয়াছেন- রানী আসিয়াছেন- মন্ত্রী, কোটাল, পাত্রমিত্র কেহ কোথাও বাদ নাই। মঠের মধ্যখানে রাজাবাড়ির বড় বড় কুস্তিগীরেরা গায়ে মাটি মাখাইয়া লড়াইয়ের সমস্ত কায়দাগুলি ইস্তেমাল করিতেছে। এমন সময় কুস্তিগীরের পোশাক পরিয়া নাপিত আর তাঁতী মাঠের মধ্যখানে উপস্থিত। চারিদিকে লোক তাহাদের দেখিয়া হাততালি দিয়া উঠিল। নাপিত তখন তাঁতীকে সঙ্গে করিয়া লাফাইয়া একবার একদিকে যায় আবার ওদিকে যায়। আর ঘরের এক একখানা চালা ধরিয়া টান দেয়। হুমড়ি খাইয়া ঘর পড়িয়া যায়। সভার সব লোক অবাক। রাজবাড়ির কুস্তিগীরেরা ভাবে ‘হায় হায় না জানি ইহারা কত বড় পালোয়ান। হাতের এক ঝাঁকুনি দিয়া এত বড় আটচালা ঘরখানা ভাঙ্গিয়া ফেলিল। ইহাদের সঙ্গে লড়িতে গেলে ঘরেরই মত উহারা আমাদের হাত-পাগুলো ভাঙ্গিয়া ফেলিবে। চল আমরা পালাইয়া যাই’। তাহারা পালাইয়া গেলে নাপিত তখন মাঠের মধ্যখানে দাঁড়াইয়া বুক ফুলাইয়া রাজাকে বলিল, ‘মহারাজ ! জলদি করিয়া আপনার পালোয়ানদের ডাকুন দেখি ! তাগাদের কার গায়ে কত জোর’। কিন্তু কে কার সঙ্গে কুস্তি করে? তাহারা ত আগেই পালাইয়াছে। রাজা তখন নাপিত আর তাঁতীকে তাঁর রাজ্যের সেনাপতি নিযুক্ত করিলেন। সেনাপতির চাকরি পাইয়া তাঁতী আর নাপিত ত বেশ সুখেই আছে। এর মধ্যে কোথা হইতে এক বাঘ আসিয়া রাজ্যে মহা উৎপাত লাগাইয়াছে। কাল এর ছাগল লইয়া যায়, পরশু ওর গরু লইয়া যায়, তারপর মানুষও লইয়া যাইতে লাগিল। রাজা তখন নাপিত আর তাঁতীকে বলিল, ‘ তোমরা যদি এই বাঘ মারিতে পার তবে আমার দুই মেয়ের সঙ্গে তোমাদের দুই জনের বিবাহ দিব’। নাপিত বলিল, এর আর এমন কঠিন কাজ কি? অবে আমাকে পাঁচ মন ওজনের একটি বড়শি আর গোটা অস্টেক পাঁঠা দিতে হইবে। রাজার আদেশে পাঁচমন ওজনের একটি লোহার বড়শি তৈরি হইল। নাপিত তখন লোকজনের নিকট হইতে জানিয়া লইল. কোথায় বাঘের উপদ্রব বেশি, আর কোন সময় বাঘ আসে। তারপর নাপিত সেই বড়শির সঙ্গে সাত-আটটা পাঁঠা গাঁথিয়া এক গাছির লোহার শিকলে সেই বড়শি আটকাইয়া এক গাছের সঙ্গে বাঁধিয়া রাখিল। তারপর তাঁতীকে সঙ্গে লইয়া গাছের আগ ডালে উঠিয়া বসিয়া রহিল। অনেক রাতে বাঘ আসিয়া সেই বড়শি সমতে পাঠা গিলিতে লাগিল। গিলিতে গিলিতে গলায় বড়শি আটকাইয়া গিয়া তর্জন-গর্জন করিতে লাগিল। সকাল হইলে লোকজন ডাকাইয়া নাপিত আর তাঁতি লাঠির আঘাতে মাঘটিকে মারিয়া ফেলিল। এ খবর শুনিয়া রাজা ভারী খুশী। তারপর ঢোল-ডগর বাজাইয়া নাপিত আর তাঁতীর সঙ্গে দুই মেয়ের বিবাহ দিয়া দিল। বিবাহের পরে বউ লইয়া বাসর ঘরে যাইতে হয়। তাঁতী একা বাসর ঘরে যাইতে ভয় পায়। নাপিতকে সঙ্গে যাইতে অনুরোধ করে। নাপিত বলে, ‘বেটা তাঁতী! তোর বাসর ঘর আমি যাইব কেমন করিয়া ? আমাকে ত আমার বউ এর সঙ্গে ভিন্ন বাসর ঘরে যাইতে হইবে। তুই কোন ভয় করিস না। খুব সাহসের সঙ্গে থাকবি’। এই বলিয়া তাহাকে বাসর ঘরের মধ্যে ঠেলিয়া দিল। বাসর ঘরে যাইয়া তাঁতী এদিক চায়-ওদিক চায়। আহা হা কত ঝাড়-কত লণ্ঠন ঝিকিমিকি জ্বলিতেছে। আর বিছানা ভরিয়া কত রঙ্গের ফুল। তাঁতী কোথায় বসিবে তাহাই ঠিক করিতে পারে না। তখন অতি শরমে পাপোশখানার উপর কুচিমুচি হইয়া বসিয়া তাঁতী ঘামিতে লাগিল। কিছুক্ষণ পরে পানের বাটা লইয়া, পায়ে সোনার নুপুর ঝুমুর ঝুমুর বাজাইয়া পঞ্চসখী সঙ্গে করিয়া রাজকন্যা আসিয়া উপস্থিত। তাঁতী তখন ভয়ে জড়সড় । সে মনে করিল, হিন্দুদের কোন দেবতা যেন তাহাকে কাটিতে অসিয়াছে। সে তখন তাড়াতাড়ি উঠিয়া রাজকন্যার পায়ে পড়িয়া বলিল, ‘মা ঠাকরুন ! আমার কোন অপরাধ নাই। সকলই নাপিত বেটার কারসাজি’। রাজকন্যা সকলই বুঝিতে পারিল। কথা রাজার কানেও গেল। রাজা তখন তাঁতী আর নাপিতকে তাড়াইয়া দিলেন। নাপিত রাগিয়া বলে, ‘বোকা তাঁতী। তোর বোকামীর জন্য অমন চাকুরিটাত গেলই- সেই সঙ্গে রাজকন্যাও গেল। তাঁতী নাপিতকে জড়াই ধরিয়া বলিল, ‘তা গেল ! চল ভাই , দেশে যাইয়া বউদের লাথি গুতা খাই। সেত গা সওয়া হইয়া গিয়াছে। এমন সন্দেহ আর ভয়ের মধ্যে থাকার চাইতে সেই ভাল’। মূলঃ বাঙ্গালীর হাসির গল্প-পল্লীকবি জসীমউদ্দীন


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯৭ জন


এ জাতীয় গল্প

→ বোকা সাথী
→ বোকা সাথী
→ বোকা সাথী

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now

১০.বলকানের কান্না (৬)

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান আরাফাত হোসেন (০ পয়েন্ট)

X লাল কার্পেটে মোড়া বিশাল কক্ষ। কক্ষের এক কোণে একটা সেক্রেটারিয়েট টেবিল। টেবিলের উপর বলকান অঞ্চলের একটা ম্যাপ মেলে রাখা। টেবিলের ওপাশে বিরাট একটা রিভলভিং চেয়ার। চেয়ারের পিছনে দেয়ালে বেশ উঁচুতে সম্রাট সার্লেম্যানের পূর্ণ দৈর্ঘ্য একটা ছবি। ছবিতে সার্লেম্যানের সঙ্গে আরেকজন রয়েছেন। তিনি পোপ তৃতীয় লিও। পোপ ‘সার্লেম্যানের মাথায় রোমান সম্রাটের মুকুট পরিয়ে তাকে খৃষ্টান জগতের সম্রাট হিসেবে বরণ করে নিচ্ছেন। ঘটনাটি ঘটে ৮০০ খৃষ্টাব্দে রোমে। সার্লেম্যান ইউরোপ ও খৃষ্টান জগতের ঐক্য ও উত্থানের প্রতীক। ঘরে মিলেশ বাহিনীর নেতা কনষ্টানটাইন অস্থিরভাবে পায়চারি করছিল। তার মুষ্ঠিবদ্ধ হাত দু’টি পেছনে। মাথা তার নিচু। কি এক অস্থিরতা, উদ্বেগে সে যেন বিপর্যস্ত। শিথিল পায়ে পায়চারি করতে করতে একবার সে আসছিল টেবিলের কাছে, আবার যাচ্ছিল দরজার দিকে। তার মনে দুঃসহ চিন্তার জট। হাসান সেনজিক একজন ব্যাক্তিমাত্র। অথচ সেই একজন ব্যাক্তিকে তারা বাগে আনতে পারছে না সকলে মিলে। তাদের সকলের ব্যর্থতার স্বাক্ষর হিসাবে এখনও বেঁচে আছে। হোয়াইট ওলফকে তারাই অনুরোধ করেছিল হাসান সেনজিককে ধরে দেয়ার জন্যে। বিনিময়ে বিরাট পুরস্কার। পোস্ট অফিস থেকে হাসান সেনজিকের মা’র চিঠির সেনসর রিপোর্ট পড়ে তারা জেনেছিল স্পেনে হাসান সেনজিকের ঠিকানা। এই ঠিকানা হোয়াইট ওলফকে দিয়ে তারা ঐ অনুরোধ করেছিল। তারা নিজেরাও এটা পারত, কিন্তু যেহেতু ইটালি ও স্পেন এলাকায় হোয়াইট ওলফের বন্ধু-বান্ধব বেশী তাই এ দায়িত্বটা তাদেরকে দিয়েছিল। কিন্তু এমন হবে কে জানত! তারাও শেষ হলো, আমাদেরও সর্বনাশ করে গেল। হাসান সেনজিক আবার হাতের মুঠোর বাইরে। উপরন্তু এখন সে ককেশাস ক্রিসেন্টের সাহায্য পাচ্ছে। আলবেনিয়া থেকে যে খবর এসেছে তা উদ্বেগজনক। জেমস জেংগার মত ভয়ংকর, ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী ব্যক্তিকে পরাজিত করে, হত্যা করে যারা হাসান সেনজিককে উদ্ধার করে এনেছে, তারা ছোট কেউ নয়। একজন মাত্র লোক নাকি জেমস জেংগার ঘাঁটিতে ঢুকে এই কান্ড ঘটিয়েছে। এই সাংঘাতিক লোকটি কে? এদের ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্যে আর্মেনিয়া ও আলবেনিয়ায় ম্যাসেজ পাঠানো হয়েছে। বড্ড দেরী হচ্ছে ওদের উত্তর আসতে। আজও কি আসবে না নাকি। এই সময় ঘরে প্রবেশ করল একটি মেয়ে। মিস লিন্ডা। ইনফরমেশন ডেস্কের সহকারী। তার হাতে একটা কাগজের শিট। মিস লিন্ডাকে দেখে কনস্টানটাইন থমকে দাঁড়াল। তার মুখটা উজ্জল হয়ে উঠল। সে তার ডান হাত বাড়িয়ে মেয়েটার গালে একটা টোকা দিয়ে বলল পেয়েছ তাহলে উত্তর, কোথেকে? মিস লিন্ডা কাগজের শিটটি কনস্টানটাইনের হাতে তুলে দিতে দিতে বলল, আর্মেনিয়ায় হোয়াইট উলফের আমাদের জানা সব ঠিাকানায় আমরা ম্যাসেজ পাঠিয়েছিলাম কিন্তু জর্জিয়া সীমান্তের আলাভার্দি কেন্দ্র থেকে মাত্র এই জবাবটা এসেছে। বলে মিস লিন্ডা চলে গেল। কনস্টানটাইন দাঁড়িয়ে ম্যাসেজটি পড়তে লাগল। লিখেছেঃ “হাসান সেনজিককে উদ্ধার করেছে ককেশাস ক্রিসেন্ট কিন্তু ককেশাস ক্রিসেন্ট আসলে কিছু নয়। আসল ব্যক্তি আহমদ মুসা নামের একজন সাংঘাতিক লোক। সেই এসে আমাদের সর্বনাশ করেছে। আমরা শেষ হয়ে গেছি। আজকের দিনের পর এই আলাভার্দি ঘাটিতেও আমাদের পাবেন না। আমরা এখান থেকে সরে যাচ্ছি জর্জিয়ায়। আমরা আর্মেনিয়ায় নিরাপদ নই্ আমাদের ফটো, ঠিকানা সব কিছু ওরা টের পেয়ে গেছে। হাসান সেনজিকের সাথে কে গেছে, কে তাকে সাহায্য করছে জানতে চেয়েছেন। আমাদের পক্ষে তা জানা আপনাদের মতই সম্ভব নয়।” ম্যাসেজটি পড়ে ‘কনস্টানটাইন কাগজটি হাতের মুঠোতে দলা পাকিয়ে ছুড়ে ফেলে দিল মেঝেতে। বিরক্তি তার মুখে। এই সময় মিস লিন্ডা আবার ঘরে প্রবেশ করল। তার হাতে আগের মতই একটা ম্যাসেজ ফ্যাক্সে আসা। কনস্টানটাইন গম্ভীরভাবে তার হাত বাড়িয়ে ম্যাসেজটি নিয়ে নিল। মিস লিন্ডা কনস্টানটাইনের গম্ভীর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। ম্যাসেজটি খুলল কনস্টানটাইন। ম্যাসেজটি এসেছে আলবেনিয়া থেকে। জেমস জেংগার সহকারী টনি টমাস পাঠিয়েছে। এতে আগের ম্যাসেজের পুনরাবৃত্তি, হাসান সেনজিকের পেছনে কারা আছে, কে তাকে সাহায্য করছে তা তাদের জানা নেই। তারা আরও লিখেছে, যারাই তার পেছনে থাক, তারা বড় ঘড়েল লোক। জেমস জেংগার ঘাটিতে ঢোকার সাধ্য এবং সাহস আলবেনিয়ার কারো নেই। কিন্তু এ কাজটা তারা ছেলে-খেলার মতই করেছে। ম্যাসেজটি পড়ে ক্রোধে, বিরক্তিতে কনস্টানটাইনের মুখটা বিকৃত হয়ে উঠল। ‘বেটারা নিজেরো কিছু পারেনি, আবার ওকালতি করছে ওদের’ বলে কনস্টানটাইন টুকরো টুকরো করে ম্যাসেজটি ছিড়ে ফেলে মেঝেই তা ছুড়ে মারল। এদের গাল দিল ঠিকই, কিন্তু হৃদয়টা তার দুরু দুরু করছিল। হাসান সেনজিকের সাথে ঐ সাংঘাতিক ‘লোকটি‌ কে’? আহমদ মুসা কি হাসান সেনজিকের মত একজন ব্যক্তির পিছু পিছু বলকানে আসতে পারে! কনস্টানটাইন ধীর পায়ে এগিয়ে এল টেবিলের দিকে। এসে দাঁড়াল একেবারে সার্লেম্যানের বিশাল ফটোটার নিচে। তারপর হাত জোড় করার মত দু’হাত তুলে বলতে লাগল, হে মহামহিম সম্রাট, হে গুরু, এক ইউরোপ, এক ধর্ম, এক রাজ্য গঠিত হবার আর কত দেরী। তোমার স্বপ্ন সার্থক হবে কবে‍! দুই জার্মানী এক হয়েছে, একক এক ইউরোপীয় পার্লামেন্ট হয়েছে যতই তা প্রতিকী হোক, ইউরোপের জন্য একক এক মুদ্রাও হচ্ছে, তবুও মনে হচ্ছে তোমার স্বপ্ন অনেক দূর। খৃস্টান ধর্মের অবসর এবং বেঈমান হিদেন মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং অস্তিত্ব তোমার স্বপ্ন সফল করার পথে বড় বাধা। ওদের আহবান, ওদের কথা ইউরোপীয়দের সম্মোহিত করে ওদের দিকে ঠেলে যাচ্ছে। ওদের নির্মূল করা ছাড়া তোমার স্বপ্ন.... এই সময়ে কনস্টানটাইন তার পেছনে পায়ের শব্দ শুনে কথা শেষ না করেই পেছনে তাকাল। দেখল, সহকারী ইয়েলেস্কু ঘরে প্রবেশ করছে। তার হাতে কাগজ। ইয়েলেস্কুর গলা শুকনো, মুখ বিষন্ন। --কোন খারাপ খবর? জিজ্ঞাসা করল কনস্টানটাইন। --হ্যাঁ, খারাপ। বলল ইয়েলেস্কু। সংগে সংগে কাগজ দু’টি ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলল, বল কি ঘটেছে? ইয়েলেস্কু বলল, কাকেজীতে ব্ল্যাকক্যাটের হাতে ওরা ধরা পড়েও আবার ফসকে গেছে। ব্ল্যাকক্যাটের তিনজন হাসান সেনজিকের সাথের সেই লোকটির হাতে খেলনার মত পরাজিত হয়েছে। প্রিজরীন থেকেও এ ধরণেরই খবর। সীমান্ত থেকে ওদের প্রিজরীনগামী বাসে উঠতে দেখে আমাদের টম ও টিটো ওদের চিনতে পারে তারাও বাসে ওঠে। কিন্তু প্রিজরীনে এসে ওরা হঠাৎ বাস থেকে কোথায় হারিয়ে যায়। --আর তখন ঐ গর্দভ দু’টো ঘুমাচ্ছিল, না” চিৎকার করে উঠল কনস্টানটাইন। --না, ওরা.... --চুপ, সাফাই গেয়োনা ইয়েলেস্কু। ওদের কাছে পেলে এখন গুলি করে মারতাম। ব্যাটারা পুতুল খেলা পেয়েছে। ওদের ঘুমিয়ে রেখে ব্যাটারা নিশ্চয় আরেক বাসে চড়ে চলে এসেছে। একটু দম নিল কনস্টানটাইন। তারপর বলল, যাও ইয়েলেস্কু গাড়ি রেডি করতে বল। হাসান সেনজিকের মা’র ওখানে যাব। ওটাই এখন ষড়যন্ত্রের কেন্দ্র, সব খবর ওখানেই পাওয়া যাবে। বলে কনস্টানটাইন ফিরে দাঁড়িয়ে চেয়ারে গিয়ে বসল। চেয়ারে গা এলিয়ে চোখ বুজল সে। বিষন্ন মুখে বেরিয়ে গেল ইয়েলেস্কু। বেলগ্রেডের পুরতান এলাকায় হাসান সেনজিকদের বাড়ি। নগরীর একদম উত্তর প্রান্তে বিশাল এলাকা নিয়ে বাড়িটি। বাড়ির উত্তর পাশে বিরাট বাগান। বাগানের গা ছুঁইয়ে প্রবাহিত হচ্ছে দানিয়ুব। বাড়ির বিশাল এলাকাটা প্রাচীর ঘেরা হাসান সেনজিকের গৌরবান্বিত পুর্বপুরুষ সার্বিয়া রাজ স্টিফেনের রাজবাড়ি এখানেই ছিল। কিন্তু তার কোন চিহ্ন এখন নেই। বিরান মাঠ পড়ে আছে, উঁচু-নিচু টিবিতে পূর্ণ। যুগোশ্লাভিয়ার কম্যুনিষ্ট সরকার বাগান সমেত গোটা এলাকাকেই কম্যুনিষ্ট পার্টির সম্পত্তি হিসাবে ঘোষণা করেছিল। টিটোর পরিকল্পনা ছিল এখানে তিনি বলকান এলাকার কম্যুনিষ্ট পার্টির হেডকোয়ার্টার গড়ে তুলবেন। কিন্তু এ পরিকল্পনা তার সফল হয়নি। আলবেনিয়া, বুলগেরিয়াকে তিনি তাঁর সাথে একমত করতে পারেননি। নতুন অকম্যুনিষ্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পর কম্যুনিষ্ট পার্টির এ ধরনের দখলকে ছেড়ে দেয়। সুতরাং স্টিফেন পরিবার অর্থাৎ হাসান সেনজিকরা তাদের এই সম্পত্তি আবার ফিরে পেয়েছে। প্রাচীর ঘেরা এলাকার একদম দক্ষিণ প্রান্তে হাসান সেনজিকদের বর্তমান বাড়ি। বাড়ির পেছনের অংশ প্রাচীরের ভেতরে পড়েছে এবং সামনের অংশ প্রাচীরের বাইরে। বাড়ীটি নতুন হলেও প্রায় দুই পুরুষ আগে তৈরী। হাসান সেনজিকের দাদা তৈরী করেছিলেন এ বাড়ী। বাড়ীর সামনে গিয়ে শহীদ মসজিদ রোড। এ নামের পেছনে একটা ইতিহাস আছে। হাসান সেনজিকদের বাড়ীর পূর্ব দিকে এ রোডটির মাঝ বরাবর রোডটির পাশে একটা মসজিদ আছে। ১৯৪৬ সালের কথা। বেলগ্রেডসহ গোটা যুগোশ্লাভিয়া তখন বিজয়ী সোভিয়েত সৈন্যের পায়ের তলে। সোভিয়েত সৈন্যের ছত্রছায়ায় কম্যুনিষ্ট পার্টি গঠিত হয়েছে তখন। নতুন উৎসাহে তখন তারা বেপরোয়া। একদিন স্থানীয় কম্যুনিষ্ট পার্টির কর্মকর্তারা সেখানে এসে মসজিদের একটা অংশ তাদের অফিসের জন্য দাবী করে বসল। বলল, সেখানে তাদের একটা আলমারী থাকবে। কাগজ-পত্র থাকবে। সকাল-বিকেল তারা সেখানে বসবে। বসার জন্যে কয়েকটা চেয়ার, একটা, দু’টো টেবিল থাকবে এই যা। মসজিদের লোকজন মসজিদের জায়গা ছেড়ে দিতে অপারগতা জানাল। মসজিদের লোকরা কম্যুনিষ্ট পার্টির উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগকরে যুক্তি প্রদর্শন করলো। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। একদিন ভোর বেলা ফজরের নামাজ শেষে মুসল্লিরা তখন সবে বাসায় ফিরেছে। এই সময় রাস্তার দু’পাশের মহল্লায় অনেক মুসলমানের বাস ছিল। সেই দিন ভোর বেলা কম্যুনিষ্ট পার্টির কর্মীরা একটা ট্রাকে করে চেয়ার-টেবিল নিয়ে তাদের অফিসের জন্যে মসজিদ দখল করতে আসে। খবরটা চারপাশের মহল্লায় সংগে সংগে আগুনের মত ছড়িয়ে পড়ে। চারদিক থেকে এল মানুষ। তারা কম্যুনিষ্ট পার্টির কর্মীদের অনুরোধ করল চেয়ার, টেবিল, আলমারী মসজিদে না প্রবেশ করাবার জন্যে। কিন্তু তারা শুনল না। তারা পিস্তল বের করে মুসলমানদের হুমকি দিল এবং বাঁধা দিতে নিষেধ করল। তারা মসজিদের দরজা ভেঙে চেয়ার-টেবিল মসজিদে তুলতে উদ্যোগ নিল। নিরুপায় মুসলমানরা মসজিদের ভাঙা দরজার সামনে সার বেঁধে কম্যুনিষ্টদের গতিরোধ করে দাঁড়াল। তারা বলল, লড়াই করে বাধা দেয়ার সাধ্য আমাদের নেই, কিন্তু মসজিদে ঢুকতে হলে আমাদের বুক পদলিত করেই ঢুকতে হবে। কম্যুনিষ্ট কর্মীদের কাছে এটা চরম ঔদ্ধত্য মনে হয়েছিল। তারা প্রতিশোধ নিতে বিলম্ব করেনি। তাদের হাতের পিস্তলগুলো গর্জে উঠেছিল। মরে লাশ হয়ে পড়ে ছিল নিরস্ত্র মুসলমানরা মসজিদের দরজায়। ৫০টি লাশের স্তূপ মসজিদের দরজায় বাধার দেয়াল রচনা করেছিল। প্রবাহিত রক্তে মসজিদের মেঝে ও পাশের রাস্তা ভেসে গিয়েছিল। কম্যুনিষ্ট কর্মীরা ফার্নিচার ভর্তি ট্রাক নিয়ে ফিরে গিয়েছিল। আর কোন দিনই আসেনি। জীবন্ত মানুষের দেয়াল কম্যুনিষ্টদের ফিরিয়ে দিতে পারেনি। কিন্তু মৃত মানুষের লাশের দেয়াল তাদের ফিরিয়ে দিয়েছিল। জীবন্ত মানুষরা তাদের পরাজিত করতে পারেনি, কিন্তু তারা পরাজিত হয়েছিল মৃত মানুষের কাছে। শহীদের রক্ত বিজয় লাভ করেছিল অসীম শক্তিধর কম্যুনিষ্ট পার্টির বিরুদ্ধে। সেই থেকে মসজিদটির নাম হয়েছে শহীদ মসজিদ এবং রোডটির নাম মুসলমানরা দিয়েছে শহীদ মসজিদ রোড। মুসলমানরা এখনও রোডটিকে এ নামেই ডাকে। কিন্তু কম্যুনিষ্ট সরকার এর নাম দিয়েছিল ‘টিটো স্মরণী –এক’। শহীদ মসজিদ রোড ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে হাসান সেনজিকদের বিরাট বাড়ী। বাড়ীর সামনেটাও প্রাচীর ঘেরা। এ নতুন প্রাচীরটা দু’পাশ দিয়ে গিয়ে পুরাতন প্রাচীরের সাথে যুক্ত হয়েছে। বাড়ীর সম্মুখভাগে প্রাচীরের সাথে বিরাট গেট। গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকলে একটা বড় চত্তর, তারপর বাড়ী। বাড়ীর সামনে গাড়ি বারান্দা। গাড়ি বারান্দা থেকে লম্বা করিডোরে উঠলেই একটা বড় দরজা। দরজা দিয়ে ঢুকলে বড় হলরুম। এটাই বাইরের বৈঠকখানা। কার্পেট মোড়া এবং সোফায় সাজানো। কিন্তু এক নজর দেখলেই মনে হয়,কার্পেট, সোফা ও ঘরের অন্যান্য আসবাবপত্রের উপর দিয়ে অনেক সময়ের অনেক ঝড় বয়ে গেছে। সবগুলোকেই মনে হয় যেন তারা অতীতের কংকাল। নিরব বাড়ীটি। বাইরের গেটের সাথে লাগা গেটরুমে এক বৃদ্ধ। সেও যেন অতীতেরই এক কংকাল। বিরাট বাড়ীর হেরেম অংশ বাইরের অংশথেকে আলাদাই বলা যায়। একটা দরজার সংযোগ পথ ছাড়া দুই অংশ বিচ্ছিন্নই বলা যায়। হেরেম এলাকা শুধু মেয়েদেরই জন্যে। এখানে পুরুষ চাকরদেরও প্রবেশ নিষিদ্ধ। এখন সে রাজাও নেই,রাজ্যও নেই। কিন্তু সে নিয়মটি এখনও আছে। এতবড় বাড়ী যা একদিন আনন্দ কোলাহলে মুখরিত থাকত, তা আজ মৃতপুরীর মত নিরব। বাড়ীতে আছেন হাসান সেনজিকের মা বেগম আয়েশা খানম,হাসান সেনজিকের ফুফু বেগম নফিসা এবং বেগম নফিসার দশ বছরের মেয়ে নাজিয়া। এছাড়া রয়েছে দু’জন বয়স্কা আয়া। বাহির বাড়ীতে বাজার-ঘাট ও বাইরের কাজ দেখা-শুনা করার জন্যে কয়েকজন চাকর-বাকর। সংসারের আয়ের উৎস কয়েকটা দোকান। বাড়ীর পূব পাশেই শহীদ মসজিদ রোডে কয়েকটা দোকান রয়েছে। চাকর-বাকররাই চালায়। এ সবের খোঁজ-খবর রাখেন বেগম নফিসা। চাকর-বাকররা ষ্টিফেন পরিবারের অংশ হয়ে গেছে। বংশ পরস্পরায় এরা এ পরিবারের খেদমত করে আসছে। হাসান সেনজিকের মা বেগম আয়েশা খানমের বয়স হবে পঞ্চাশ। কিন্তু তাকে দেখলে মনে হবে বয়স তার ষাট পেরিয়ে গেছে। একের পর এক আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হয়েছে তার হৃদয়। তারই প্রকাশ ঘটেছে দেহে। ভেঙে পড়েছে দেহ। অসুস্থ বেগম আজ দু’মাস থেকে শয্যাশায়ী। বেগম নফিসার বয়স তিরিশ। হাসান সেনজিকের পিতার সবচেয়ে ছোট বোন। বিয়ে হয়েছিল ষ্টিফেন পরিবারেরই এক ছেলের সাথে। পেশায় ছিল ডাক্তার। থাকত ওরা বসনিয়া প্রদেশের রাজধানী সারাজেভোতে। পাঁচ বছর আগের কথা। একদিন তাকে বুলেট বিদ্ধ অবস্থায় মৃত পাওয়া যায় তার ডাক্তার খানায়। সবার কাছেই পরিষ্কার ছিল মিলেশ বাহিনীরই সে এক শিকার। এই ঘটনার পর পাঁচ বছরের সন্তান নাজিয়াকে নিয়ে এসে বাস করছে ভাবী হাসান সেনজিকের মার কাছে। বাড়ির হেরেম অংশের পূব পাশের বড় একটি কক্ষ। কক্ষের গোটাটাই লাল কার্পেটে মোড়া। ঘরের উত্তর অংশে একটা বড় পালংক। পূব দেয়ালের সাথে কাঠের বড় একটা আলমারী। আর পশ্চিম দেয়ালের সাথেও একটা আলমারী। এক এক সারিতে জরির কুশনওয়ালা গোটা তিনেক চেয়ার। আর খাটের ওপাশে মাথার কাছে একটা টেবিল। টেবিলে পানির একটা বোতল। ঔষধের কয়েকটা শিশি। পালংকে শুয়ে আছে একজন মহিলা। পা থেকে গলা পর্যন্ত চাদরে ঢাকা। মুখটাই শুধু দেখা যাচ্ছে। বনেদী সার্বিয়ানরা যেমন হয় সে রকম। কাগজের মত সাদা গায়ের রং। সাদা মুখে নীল চোখ। মহিলাটি দু’চোখমেলে উদ্দেশ্যহীনভাবে তাকিয়েছিল ছাদের দিকে। মাথায় কাঁচা-পাকা চুল। মুখে বয়সের ভাঁজ খুবই সুস্পষ্ট। কিন্তু সব কিছুকে ছাপিয়ে উঠেছে মহিলাটির চেহারায় এক রাজকীয় আভিজাত্য। এই-ই হাসান সেনজিকের মা বেগম আয়েশা খানম। বেগম খানম নিরবে উপরের দিকে তাকিয়ে ছিল। এই সময় ঘরে ঢুকল বেগম নাফিসা। সে টেবিল থেকে শূন্য পানির বোতলটা নিয়ে চলে যাচ্ছিল। মুখ ঘুরিয়ে সেদিকে তাকিয়ে বেগম খানম ডাকল, নফিসা। বেগম নফিসা ডাক শুনে ঘুরে দাঁড়িয়ে বেগম খানমের পালংকের পাশে এসে দাঁড়াল। বলল, কিছু বলবে ভাবী। বেগম খানম বলল, একটু বস নফিসা। বেগম নাফিসা পানির বোতলটা টেবিলে রেখে পালংকের উপর বেগম খানমের মাথার কাছে বসল। বেগম খানম চোখ দু’টি তখন বন্ধ করেছে। ঐ অবস্থায় বলল, ডেসপিনা কবে এসেছিল নফিসা? --সে তো সাতদিন আগে। --আমার হাসান ছাড়া পেয়েছে, কার আশ্রয়ে আছে যেন বলেছিল? --ককেশাস ক্রিসেন্টের হাতে। --আরও কি যেন সে বলেছিল? --বলেছিল, আর ভয় নেই। যাদের হাতে হাসান সেনজিক আছে, তারা একটা ব্যবস্থা করবেই। --কিন্তু সাতদিন হয়ে গেল, আর কোন খবর দিচ্ছেনা কেন ডেসপিনা? --নতুন কিছু জানতে পারলে অবশ্যই সে জানাত ভাবী। মাত্র সাতদিন তো হলো, এটা কতটুকুই বা আর সময়। বেগম খানম হাসল। বলল, সাতদিন কম সময় নয় নফিসা। গোটা দুনিয়ায় একটা ওলট-পালট হয়ে যেতে পারে এ সময়ে। --কিন্তু সে শক্তি তো আমাদের নেই ভাবী। --শক্তি আছে, শক্তির প্রকাশ নেই, প্রকাশের জন্যে যে জ্ঞান দরকার তা নেই। --আপনি কি মনে করেন এ অন্ধকারে আলো জ্বলবে? --একবার জ্বলেছিল, আবার জ্বলবেনা কেমন করে বলব? --কিন্তু আমি তো কোন চিহ্ন দেখছি না ভাবী। --কেন সেদিন ডেসপিনা ‘হোয়াইট ক্রিসেন্ট’ এর কথা বলল শুননি তুমি? --শুনেছি, কিন্তু হতাশার অন্ধকার এত ঘনিভূত যে কোন কিছুতে আস্থা রাখতে ইচ্ছা হয়না ভাবী। --তোমার কথা ঠিক। কিন্তু আশা নিয়েই তোমাকে বাঁচতে হবে নফিসা। আশার নামই জীবন। হাসানকে আমি দেখতে পাব, এ আশা যদি আমি হারিয়ে ফেলি তাহলে বাঁচার সব শক্তি আমার উবে যাবে। বেগম নফিসা বেগম খানমের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল, তোমার আশা অবশ্যই সার্থক হবে ভাবী। --জান নফিসা, সেদিন ডেসপিনার কথা শোনার পর আশায় আমার বুক ভরে গেছে। এই সময় একজন আয়া দৌড়ে ঘরে ঢুকল। হাঁফাতে হাঁফাতে বলল,গেট দিয়ে কারা যেন ঢুকেছে, হাতে বন্ধুক,পিস্তল আছে। শুনেই বেগম খানম বালিশ থেকে মাথা তুলল। দ্রুত বলল,নিশ্চয় ওরা মিলেশ বাহিনীর লোক। নাফিসা তুমি সরে যাও। --ভাবী তোমাকে একা রেখে…... --আর কথা বলো না, কুকুরদের সামনে তোমাকে ফেলতে চাই না। বেগম নফিসা আর কোন কথা বলল না। মিলেশ বাহিনীর লোকদের সন্বন্ধে সে জানে। বেগম নফিসা দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের বড় আলমারির দিকে এগুলো। আলমারী খুলল। ভেতরে হাংগারের সারিসারি কাপড় টাঙানো। বেগম নফিসা দু’হাত দিয়ে কাপড়ের মধ্যে দিয়ে পথকরে নিয়ে আলমারিতে ঢুকে গেল। ভিতরে ঢুকে আলমারির তলার পাটাতনের বিশেষ এক জায়গায় চাপ দিতেই একপাশে তা সরে গেল। তার পরেই একটা সুড়ঙ্গ পথ। বেগম নফিসা নেমে গেল সে সুড়ঙ্গ পথে। সঙ্গে সঙ্গে পাটাতন আবার তার জায়গায় ফিরে এল। দরজাও আপনাতেই বন্ধ হয়ে গেল আলমারীর। ঘরের এ সুড়ঙ্গ পথটি পাশেই বাড়ীর বাউন্ডারী দেওয়ালের ওপারে তাদেরই একটা দোকানের পিছনের কক্ষে গিয়ে উঠেছে। সেখানেও অনুরূপ একটা আলমারী আছে। খবর দিয়েই আয়া ছুটে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিল। বেগম নফিসা চলে যাবার পর বেগম খানম মাথার ওড়নাটা ঠিক করে নিয়ে ভালো করে শুয়ে পড়ল। চাদরটা মুখ পর্যন্ত টেনে নিল। স্বয়ং কনষ্টানটাইন এবং মিলেশ বাহিনীর আরও সাত-আট জন লোক বাড়ীতে প্রবেশ করেছে। চাকর-বাকররা মুর্তির মত দাঁড়িয়েছিল। কেউ কোন বাধা দিলনা। বাধা না দেওয়ার নির্দেশ ছিল বেগম খানমের। বাইরের বৈঠকখানার বারান্দায় দু’জনকে রেখে সবাই এসে দাঁড়াল হেরেমের দরজায়। হেরেমের দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিল দু’জন আয়া। তাদের দিকে অগ্নিঝরা দৃষ্টিতে চেয়ে বলল, তোদের বেগম সাব কোথায়? --উনি খুব অসুস্থ। শুয়ে আছেন। বলল একজন আয়া। --নিয়ে চল, কোথায় সে রাজরাণী। কোন কথা না বলে আয়া দু’জনে চলতে লাগল বেগম খানমের ঘরের দিকে। ঘরে ঢুকে আয়া দু’জনের একজন বেগম খানমের মাথার কাছে, আরেকজন পায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। একজনের হাত বেগম খানমের মাথায়,আরেক জনের হাত বেগম খানমের পা ছুঁয়ে আছে। যেন তারাও অভয় পেতে চায়,আবার অভয় দিতেও চায়। কনষ্টানটাইন এবং তার সহকারী ইয়েলেস্কু ঘরে প্রবেশ করল। অন্যেরা দাঁড়িয়ে থাকল দরজার বাইরে। ঘরে ঢুকেই কনষ্টানটাইন ঘরের মেঝেতে এক খাবলা থুথু নিক্ষেপ করে বলল, গাদ্দার ষ্টিফেন তুমি আজ কোথায়। দেখে যাও,তোমার গৌরবের প্রাসাদ আজ আমাদের পায়ের তলে। তারপর ঘরের চারদিকটা একবার দেখে নিয়ে চোখ রাখল বেগম খানমের দিকে। বেগম খানম চোখ বন্ধ করে শুয়েছিল। --শয়তানের বাচ্চা শয়তান,শয়তানের স্ত্রী শয়তানী,শয়তানের মা শয়তানী দেখেছ আমরা এসে গেছি? চিৎকার করে বলল কনষ্টানটাইন। --দেখেছি। ধীর কন্ঠে বলল বেগম খানম। --কি জন্যে এসেছি জান? --জানিনা। --তোমার সন্তান হাসান সেনজিককে কোথায় লুকিয়ে রেখছ? হাসান সেনজিকের নাম শুনে চোখ খুলল বেগম খানম। তারপর মাথাটা কাত করে কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে কনষ্টানটাইনের দিকে চেয়ে বলল, কোথায় আমার ছেলে হাসান সেনজিক? --সেটা তো আমিই জিজ্ঞেস করছি তোমাকে। কোথায় লুকিয়ে রেখেছ বল? আবার চোখ বুজল বেগম খানম। বলল, আজ দেড় যুগ আমার ছেলেকে দেখিনি। কান্নায় ভেংগে পড়ল খানমের কথা। --কান্না দিয়ে ভোলাতে পারবেনা। বল তোমার ছেলে কোথায়? --আমি জানিনা। আমার কান্না তোমাদের প্রতারণা করার জন্যে নয়। মুসলমানরা প্রতারণা করেনা। --চুপ বুড়ি। ঐনামটা আর মুখে আনবেনা। জিব কেটে দেব তাহলে। বলে একটু দম নিল কনষ্টানটাইন। তারপর আবার বলল,তুমি তোমার সন্তানকে দেখনি, কিন্তু কোথায় আছে জান তুমি। --আমি জানিনা। কনষ্টানটাইন পাশে দাঁড়ানো ইয়েলুস্কুর দিকে চেয়ে বলল, তোমরা বসে আছ কেন, সবটা একবার খুঁজে দেখ। বলে কনষ্টানটাইন নিজেই এগুলো বড় আলমারীটার দিকে। প্রচন্ড একটা লাথি মারল দরজায়। লাথিটা লেগেছিল দুই পাল্লার সংযোগ স্থলে। দরজার মুখ বরাবর লম্বভাবে কাঠের যে বাড়তি কাঠামোটা ছিল, সেটা সমেত দরজাটা মচকে ভিতরের দিকে ভাঁজ হয়ে গেল। লাথি মেরেই একটানে আলমারীটা খুলে ফেলল। তারপর টাঙানো কাপড়গুলো টেনে ছড়িয়ে দিল মেঝেয়। তারপর পশ্চিম দেয়ালের দিকে এক সারিতে রাখা চেয়ারের দিকে এগুল। একটা চেয়ার তুলে আরেকটা চেয়ারের উপর আছড়ে ফেলল। ভেঙে গেল দু’টি চেয়ারই। কনষ্টানটাইন যেন পাগল হয়ে গেছে। তার রক্তবর্ণ চোখ দিয়ে যেন আগুন ছুটছে। বেগম খানম শুয়েছিল নির্বিকার। তার চোখ দু’টি ওপর দিকে নিবদ্ধ। মুখে কোন ভাবান্তর নেই। সেদিকে চেয়ে কনষ্টানটাইন আরও যেন আহত হলো। সে পাগলের মত পালংকের রেলিং এ একটা লাথি দিয়ে বলল,বুড়ি শয়তান,কথা কিভাবে বলাতে হয় আমরা জানি,আজ যাচ্ছি,ক’দিন পরে আবার আসব। ৭দিন সময় দিয়ে গেলাম। এর মধ্যে তোর সন্তানকে আমাদের হাতে দিতে হবে,নয়তো বলতে হবে কোথায় সে। না হলে তোকেই নিয়ে যাব। মনে রাখিস ৭দিন। বলে কনষ্টানটাইন হন হন করে বেরিয়ে গেল। কনষ্টানটাইনের লাথিতে পালংকের রেলিং এর একটা অংশ ভেঙ্গে পড়েছিল। ভয়ে কাঁপছিল আয়া দু’জন। কনষ্টানটাইন বেরিয়ে গেলে তারা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। গোটা বাড়ীতে তখন চলছিল ভাঙার মহোৎসব। চেয়ার,টেবিল,বাক্স, আলমারী যা যেখানে পেল ভেঙ্গে তছনছ করল তারা। রান্না ঘর ভাঁড়ার ঘরও বাদ গেল না। বড্ড আরামের সাথে তারা ভাঙল। কেউ বাধা দিলনা। চাকর-বাকরা দাঁড়িয়ে ছিল পাথরের মত। তারাও লাথি ও কিল-থাপ্পড় অনেক খেল। হাসান সেনজিক এসেছে কিনা,কিংবা আর কে এখানে আসে,ইত্যাদি। কিন্তু তারা সকলে একই জবাব দিয়েছে, বেগম সাহেব ছাড়া কাউকে তারা দেখেনি, কেউ এখানে আসে না। ভাঙার মহোৎসব শেষে গাড়ি বারান্দা দিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে কনষ্টানটাইন হো হো করে হাসতে হাসতে তার আগের সেই কথা উচ্চারণ করল,কোথায় সেই গাদ্দার ষ্টিফেন,কোথায় তার রাজত্ব। গাড়ি বারান্দা থেকে বেরিয়ে কনষ্টানটাইনরা যখন গেটের দিকে এগুচ্ছিল, ঠিক তখনই ডেসপিনার ট্যাক্সিটি গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। বৃদ্ধ গেটম্যান আলিস্কু ওসমান মাথা নিচু করে বন্ধ গেটের বাইরে একপাশে বসেছিল। ডেসপিনা গাড়ি থেকে দৃশ্যটা দেখে অবাক হলো। অবাক হলো গেটে আরও দু’টো গাড়ি দেখে। তারপর ডাকল, চাচা ওভাবে বসে কেন,গেট খুলুন। বৃদ্ধ ওসমান চমকে উঠে গাড়ির দিকে তাকাল। তার মুখে উদ্বেগ-আতঙ্ক এবং চোখে পানি। বৃদ্ধ ডেসপিনাকে দেখেই তার শাহাদাৎ আঙুলি ঠোঁটে ঠেকিয়ে দ্রুত নেড়ে ইশারা করল চলে যাবার। ডেসপিনা বৃদ্ধ ওসমানের ‍মুখ দেখেই বুঝল বড় কিছু ঘটেছে। মন তার মোচড় দিয়ে উঠল। কিন্তু পা চাপ দিল গিয়ে একসেলেটারে। ডেসপিনা দ্রুত গাড়ি সরিয়ে আরও পূর্ব দিকে নিয়ে বাড়ীর পূর্ব পাশের দোকানগুলোর সামনে দাঁড় করাল। তারপর মাথাটা পেছনে ঘুরাতেই দেখল হাসান সেনজিকদের বাড়ীর গেট দিয়ে সাত আট জন বেরিয়ে দু’টি গাড়িতে গিয়ে উঠল। তাদের কাউকেই ডেসপিনা চিনলনা। কিন্তু মনের সন্দেহটা দানা বেঁধে উঠল। এই সময় পাশেই যে দোকান তার সেলস গার্ল মধ্যবয়সী রাবেয়া এসে ডাকল,আপা,দোকানে আসুন। মুখ ফিরিয়ে রাবেয়াকে দেখে প্রশ্ন করল, ব্যাপার কি রাবেয়া আপা? জবাব না দিয়ে রাবেয়া বলল, আপনি আসুন। ডেসপিনা গাড়ি থেকে নেমে গাড়ি বন্ধকরে দোকানে গিয়ে ঢুকল। রাবেয়ার ইশারায় ডেসপিনা দোকানের ভেতরের কক্ষে গিয়ে প্রবেশ করল। ডেসপিনা সেখানে বেগম নাফিসাকে বসে থাকতে দেখে ভীষণ চমকে উঠল। কিন্তু ডেসপিনা কিছু কথা বলার আগেই বেগম নাফিসা ডেসপিনাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল। বলল, মা ডেসপিনা, মিলেশ বাহিনী বাড়িতে ঢুকেছে, ভাবিকে একা রেখে এসেছি। বেগম নাফিসার কথা শুনে কেঁপে উঠল ডেসপিনা। কয়েক মুহূর্ত আগে হাসান সেনজিকদের গেট দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া লোকদের চিত্র তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। ঠিকই তাহলে ওরা মিলেশ বাহিনীর লোক। ওরা ফুফু আম্মার কোন ক্ষতি করেনি তো? ওরা ক্ষ্যাপা কুকুরের মত পাগল হয়ে গেছে এখন। ডেসপিনা তাড়াতাড়ি বলল, ফুফু আম্মা ওরা চলে গেছে। তাড়াতাড়ি চলুন, ফুফু আম্মার যদি কিছু হয়। কান্নায় জড়িয়ে গেল ডেসপিনার কথা। বেগম নাফিসা ও ডেসপিনা সেই আলমারীর ভিতর ঢুকে সুড়ঙ্গ পথে বেগম খানমের ঘরে গিয়ে উঠল। উঠবার সিঁড়ির মুখে আলমারী খোলা ও ভাঙ্গা দেখে বেগম নাফিসা ও ডেসপিনা দু’জনেরই হৃদয়টা কেঁপে উঠল। প্রথমে ঘরে ঢুকল বেগম নাফিসা। ঢুকেই ছুটে বেগম খানমের কাছে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, আপনি ভাল আছেন ভাবী? বেগম খানম কিছু বলার আগেই ঘরে ঢুকল ডেসপিনা। বেগম খানম নাফিসার মাথায় হাত বুলিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ডেসপিনাকে দেখে তার কথা বন্ধ হয়ে গেল। প্রবল আনন্দ উচ্ছাসে মুখটি হেসে উঠল বেগম খানমের। রোদ ঝলসানো গাছ যেমন বৃষ্টির পানিতে জেগে ওঠে, বেগম খানম যেন তেমনি ডেসপিনাকে দেখেই সজিব হয়ে উঠল। মাথাটা একটু তুলে দু’হাত বাড়াল বেগম খানম। ডেসপিনা ঝাঁপিয়ে পড়ল তার দু’বাহুতে। বেগম খানম জড়িয়ে ধরল তাকে বুকে। ডেসপিনা বেগম খানমের বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। বেগম খানম বুক থেকে ডেসপিনার মুখ তুলে নিয়ে চুমু খেল। বলল, কেঁদনা মা। হাসান সেনজিক নেই। তোমার মধ্যে আমি হাসান সেনজিককে কল্পনা করি। তুমি কাঁদলে আমি বাঁচার সাহস হারিয়ে ফেলব। ডেসপিনা চোখ মুছে বলল, আমি কাঁদব না ফুফু আম্মা, আমাদের বাঁচতে হবে.... বাঁচার মত করেই। দৃঢ়কণ্ঠ ডেসপিনার। বেগম খানম ডেসপিনার চিবুকে আরেকটা চুমু খেয়ে বলল, এই না উপযুক্ত কথা ষ্টিফেন পরিবারের মেয়ের। --আমি তো শুধু ষ্টিফেন পরিবারের মেয়ে নই ফুফু আম্মা, আমি মুসলিম পরিবারের মুসলিম মেয়ে। খুশীতে মুখটি উজ্জ্বল হয়ে উঠল বেগম খানমের। সে পাশেই বসা নাফিসাকে উদ্দেশ্য করে বলল, শুনেছ নাফিসা, আমার ডেসপিনার কথা। --দোয়া করো ভাবি, আমরা কিন্তু এভাবে ভাবার সুযোগ পাইনি। আমরা বংশের ঐতিহ্যের কথা ভেবেছি, কিন্তু ঐতিহ্যের যেটা ভিত্তি, যেটা শক্তি তা নিয়ে কখনও মাথা ঘামাইনি। এ সময় ঘরে ঢুকল আয়া। বলল, বেগম আম্মা আন্ডার গ্রাউণ্ড ঘরের খোঁজ ওরা পায়নি। ও ঘরটা অক্ষত আছে। আয়ার কথা শুনে মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল বেগম খানমের। ঐ আন্ডার গ্রাউণ্ড ঘরে ষ্টিফেন ও লেডি ডেসপিনা থেকে শুরুকরে সব পারিবারিক স্মৃতি-চিহ্নগুলো সংরক্ষিত আছে। বলা যায় ওটা একটা পারিবারিক মিউজিয়াম। আর ঐ ঘরেরই মেঝের এক কোণে মাটির তলায় লুকানো আছে একটা সিন্দুক। ওখানে গচ্ছিত আছে ষ্টিফেন রাজত্বের স্মৃতি, কয়েক কেজি সোনার মোহর। ষ্টিফেনের উত্তরাধিকার সূত্রে হাসান সেনজিকের আব্বা এর মালিক হয়েছিল। এখন বেগম খানম এ আমানত আগলে রেখেছেন হাসান সেনজিকের জন্যে। কথা বলেই আয়া বেরিয়ে গিয়েছিল। ভাঙ্গা দু’টো চেয়ারের দিকে চোখ বুলিয়ে ডেসপিনা বলল, ওরা গোটা বাড়ীই এভাবে তছনছ করেছে বুঝি? --হ্যাঁ মা, বাড়ীতে ভাঙ্গার মত কিছুই আর বাদ রেখে যায় নি। বলল বেগম খানম। --কি জঘন্য হিংস্রতা। বলল, বেগম নাফিসা। --ওদের মনে হচ্ছিল জ্বলন্ত আগুন, বাড়ী ওরা পুড়িয়ে দিয়ে যায় নি এটাই বড়, নাফিসা। কিন্তু ৭ দিন পর ওরা আবার আসবে। বেগম নাফিসা ও ডেসপিনা দু’জনেই চমকে উঠে তাকাল বেগম খানমের দিকে। তাদের চোখে নতুন আতংক। --কেন ওরা আসবে? কথা বলল ডেসপিনা। --ওরা বলে গেছে, সেদিন তাদের হাতে হাসান সেনজিককে তুলে দিতে হবে, না হলে খোঁজ দিতে হবে সে কোথায়। অন্যথায় সেদিন তারা আমাকে নিয়ে যাবে। আজ ওরা হাসান সেনজিকের খোঁজেই এসেছিল। ওদের ধারণা আমি জানি হাসান সেনজিক কোথায়। উদ্বেগ-আতংকে বেগম নাফিসা প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর বুক কাঁপছিল ডেসপিনার। সে ওদের কথার অর্থ বুঝতে পারছে, ওদের ধারণা হাসান সেনজিক বেলগ্রেড পৌঁছেছে। অথবা মনে করতে পারে, না পৌঁছালেও হাসান সেনজিক এখন যুগোশ্লাভিয়ার কোথায় এ খবর তার মা অবশ্যই জানে। অতএব মিলেশ বাহিনী যে আবার আসবে এবং হাসান সেনজিককে তখন পর্যন্ত না পেলে যে বেগম খানমকে পণবন্দি হিসেবে নিয়ে যাবে এতে কোন সন্দেহ নেই। কথাটা ভাবতেই বুক কেঁপে উঠছে ডেসপিনার। ডেসপিনা অস্বস্তিকর নিরবতার মাঝে ধীরে ধীরে মুখ খুলল। বলল, ফুফু আম্মা হাসান ভাইয়ার আরও কিছু নতুন খবর আছে। মিলেশ বাহিনীর লোকদের এমন উম্মাদ হয়ে ওঠার কারণ বোধ হয় এ নতুন খবরগুলোই। বেগম খানম বালিশ থেকে মাথা তুলল। অস্থিরভাবে বলল, এতক্ষণ বলছ না কেন, তুমি এত নিষ্ঠুর মা। বেগম নাফিসার মুখেও একরাশ উম্মুখ জিজ্ঞাসা। ডেসপিনা বলতে লাগল, আমি খবরগুলো শুনেছি আমার বান্ধবী নাদিয়া নূরের কাছ থেকে। নাদিয়া নূর জেনেছে ওর আব্বার কাছ থেকে। একটু থামল ডেসপিনা। ‘ক’দিন আগে হাসান ভাইয়া’ শুরু করল ডেসপিনা আবার, ‘তিরানায় পৌঁছেছেন। মিলেশ বাহিনীর লোকরা তাকে চিনতে পারে। ভাইয়া ওদের হাতে আটক হন। কিন্তু ভাইয়ার সাথী যিনি এসেছেন, তিনি মিলেশ-এর লোকদের পরাভূত করে তাকে উদ্ধার করেন। তারপর যুগোশ্লাভ সীমান্তের ওপারে আলবেনিয়ার কাকেজী শহরে হাসান ভাইয়া আবার মিলেশ বাহিনীর হাতে পড়েন, কিন্তু ভাইয়ার সেই সাথীই আবার তাঁকে বাঁচান। যুগোশ্লাভিয়ার সীমান্ত ফাঁড়ি দারিনীতে আবার হাসান ভাইয়া মিলেশ বাহিনীর লোকদের চোখে ধরা পড়েন। ভাইয়া এবং ভাইয়ার সাথী প্রিষ্টিনার বাসে চড়েন। তাঁদের অনুসরণ করে মিলেশ বাহিনীর লোকরাও বাসে ওঠে। কিন্তু ভাইয়ারা নাকি তা টের পেয়ে যান। তারা প্রিজরীন শহরে বাস থামলে দু’জনেই হঠাৎ নেমে যান। তারা নেমে গেছে বুঝতে পেরে মিলেশ বাহিনীর লোকরাও বাস থেকে নেমে যায়। কিন্তু ভাইয়াদের তারা খুঁজে পায়নি। বেগম খানম গোগ্রাসে ডেসপিনার কথা শুনছিল। তার চোখ দু’টি আনন্দের আলোতে উজ্জ্বল, কিন্তু চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রু। ডেসপিনার কথা শেষ হতেই বেগম খানম ‘আমার হাসান যুগোশ্লাভিয়ার মাটিতে পা দিয়েছে’ বলে অতি কষ্টে বসে সেজদায় পড়ে গেল। অনেকক্ষণ পর সেজদা থেকে উঠে দু’টি হাত উপরে তুলে বলল, ‘হে সর্বশক্তিমান প্রভু, তুমি আমাদের দয়া কর, আমার সন্তানকে আমার কাছে পৌঁছে দাও মা’বুদ। মোনাজাত শেষ করে বেগম খানম ধীরে ধীরে শুয়ে পড়ল। শুয়ে চোখ দু’টি বন্ধ করে ক্লান্তিতে ধুঁকতে লাগল বেগম খানম। মাথায় তখন হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল ডেসপিনা। বেগম খানম তার দুর্বল একটি হাত ডেসপিনার হাতের উপর রেখে ধীর কণ্ঠে বলল, ডেসপিনা সাথের লোকটি কে? --আমরা জানিনা ফুফু আম্মা। তবে সন্দেহ হয় তিনি আহমেদ মুসা হতে পারেন। তিনি ছাড়া এমন দুঃসাহসী এবং দূর্ধর্ষ আর কে হতে পারেন। --পরের জন্যে একজন এত করতে পারে? --তিনি যদি আহমেদ মুসা হন, তাহলে বলতে হয় তিনি পরের জন্যেই বেঁচে আছেন ফুফু আম্মা। যেখানেই মুসলমানরা মজলুম, সেখানেই তিনি হাজির হন। --আল্লাহ বাছার হায়াত দারাজ করুন, জাতির খেদমতে এমন লোকও আজ আছেন। --জাতির জন্যে জীবন দেওয়ার জন্যে এমন হাজার হাজার তরুণ তৈরী হচ্ছে ফুফু আম্মা। --নতুন কথা শুনছি ডেসপিনা, আল্লাহ আমাদের বাঁচিয়ে রাখুন। --হাসানকে ওরা এভাবে চিনতে পারছে কেমন করে? বলল বেগম নাফিসা। --মিলেশ বাহিনী হাসান ভাইয়ার ছবি সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছে। --তাহলে ওরা কি বেলগ্রেড পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে, পৌঁছাতে পারলেও কি নিরাপদ থাকবে? মুখ শুকনা করে বলল বেগম নাফিসা। --দোয়া করুন ফুফু আম্মা। --হাসান বেলগ্রেড এলেই তো তুমি জানতে পারবে? --বলতে পারছিনা ফুফু আম্মা, আমি চেষ্টা করব। --হাসানকে চিনতে পারবে তুমি? বলল বেগম নাফিসা। ডেসপিনা মুখ নিচু করে বলল, কি জানি। একটু থামল ডেসপিনা। তারপর মুখ নিচু রেখেই বলল, আমাকে তো উনি জানেনই না। বেগম নাফিসা একটু হাসল। বলল, সব জানে। ভাবী তোমার কথাই বেশী লেখেন। ছবিও অনেক পাঠিয়েছেন। ডেসপিনার মুখ লাল হয়ে উঠল লজ্জাই। বেগম এক দৃষ্টিতে ডেসপিনার রাঙ্গা মুখের দিকে তাকিয়ে দু’জনের কথা শুনছিল। তার ঠোঁটে মিষ্টি হাসি। নাফিসা থামলে বেগম খানম হেসে বলল, আমি বুঝি খালি লিখি। ডেসপিনার নাম ছাড়া হাসানের কোন চিঠি আছে? ডেসপিনার মাথা আরও নুয়ে গেল লজ্জায়। সে তাড়াতাড়ি উঠে বলল,আপনারা কথা বলুন, আমি আসছি। বলে ডেসপিনা ছুটে বেরিয়ে গেল ঘরের বাইরে। সেদিকে তাকিয়ে বেগম খানম মিষ্টি হেসে বলল, লক্ষী মা আমার। দু’জনকে এক সাথে দাঁড় করিয়ে কবে যে দেখতে পাব। নাদিয়া নূর তাদের গেস্ট রুমটা গোছগাছ করছিল। গতকাল চলে গেছে সালেহ বাহমন। সে সুস্থ হয়ে উঠেছে। এরপরও সে চলে যাক, নাদিয়া নূরের মন সায় দেয়নি। কেন জানি তার মনে হয়েছে সালেহ বাহমন এখানে নিরাপদ,বাইরে বেরুলে আবার বিপদে পড়বে। কিন্তু নাদিয়া নূর এবার বাধা দিতে পারেনি লজ্জায়। এমনকি সালেহ বাহমনের বিদায়ের সময় নাদিয়া নূর সেখানে হাজির ছিল না। ‘মা’ পরে বলেছিল, এ কেমনরে নূর,ছেলেটা চলে গেল,বাড়ীতে থেকেও তুই সেখানে গেলি না। কি ভাববে বলত? জবাবে নাদিয়া বলেছিল,উনি কিছুই ভাববেন না আম্মা, মুসলিম মেয়েদের এভাবে যাওয়া উচিত নয়, উনিই এটা সবচেয়ে ভাল জানেন। মা একটু মিষ্টি হেসে নাদিয়ার মুখটি উপরে তুলে ধরে বলেছিল,ছেলেটাকে কেমন মনে হয় নূর? এক ঝলক রক্ত এসে নাদিয়া নূরের মুখ ঢেকে দিয়েছিল। লজ্জায় মুখ রাঙ্গা হয়ে উঠেছিল নাদিয়ার। মায়ের এ কথার অর্থ সে বোঝে। সে ‘আম্মা’ বলে মায়ের বুকে মুখ গুজেছিল। মা আর কিছু বলেনি। হাসি ভরা মুখে মেয়ের পিঠে আদর করে হাত বুলিয়ে দিয়েছিল। গেস্টরুমের টেবিল গোছাচ্ছিল নাদিয়া। রাইটিং প্যাড তুলে ড্রয়ারে রাখতে গিয়ে প্যাডের তলায় প্যাডের একটা আলগা পাতা পেল। পাতাটিতে সুন্দর করে নাদিয়া নূরের নাম লেখা। চার দিকের নানা আঁচড়-অক্ষর দেখে মনে হয় লেখক যেন আনমনে আঁকা-আঁকি করতে গিয়েই অনেকক্ষণ ধরে নামটি লিখেছে। নাদিয়ার চিনতে অসুবিধা হলোনা সালেহ বাহমনের হস্তাক্ষর। প্রসন্ন একটুকরো হাসি ফুটে উঠল নাদিয়ার ঠোঁটে, তাতে লজ্জাও মেশানো ছিল। নাদিয়া পাতাটি যত্নের সাথে ভাজ করে বুকে জামার নিচে গুঁজে রাখল। বাইরে গেটে নক করার শব্দ হল এ সময়। নাদিয়ার আব্বা ঘরে ঢুকছিল। নাদিয়াকে গেটের দিকে যেতে উদ্যত দেখে বলল, তুমি দাঁড়াও নাদিয়া, আমি দেখি। নাদিয়ার আব্বা ওমর বিগোভিক গিয়ে দরজা খুলল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে একটা ফুটফুটে তরুণী। গায়ে ঢিলা জামা। মাথায় ওড়না জড়ানো। চোখে—মুখে আভিজ্যাত্যের ছাপ। ওমর বিগোভিক কিছু বলার আগেই মেয়েটি সালাম দিল। বলল, আপনিকি নাদিয়ার আব্বা? --হ্যাঁ মা। --নাদিয়া আছে? --আছে এস, মা। বলে ওমর বিগোভিক দরজার এক পাশে সরে তরুণীটিকে অভ্যার্থনা জানাল এবং পাশের গেস্টরুম দেখিয়ে বলল, নাদিয়া ওখানেই আছে। তরুণীটি ঘরের দিকে গেল। আর ওমর বিগোভিক দরজা বন্ধ করার জন্যে সামনে এগুলেন। দরজা বন্ধ করতে করতেই ওমর বিগোভিক নাদিয়ার হৈ চৈ শুনতে পেল। গেস্টরুমের দরজা দিয়ে ঢোকার সময়ই তরুণীটি নজরে পড়ল নাদিয়ার। তার উপর নজর পড়তেই ভূত দেখার মত চমকে উঠে নাদিয়া বলল,‘আরে ডেসপিনা’ তুমি? বিস্ময়ের ঘোর নাদিয়াকে মুহূর্ত কয়েকের জন্যে বোবা করেদিয়েছিল। হা করে তাকিয়ে ছিল ডেসপিনার দিকে। তারপরেই ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল ডেসপিনাকে। বলতে লাগল ‘কি সৌভাগ্য আমাদের’, ‘কি সৌভাগ্য আমাদের’। চিৎকার করে ডাকল,আব্বা-আম্মা এস, দেখ কে এসেছে,আমাদের কি সৌভাগ্য! নাদিয়ার আব্বা-আম্মা দু’জনেই এসে ঢুকল। নাদিয়া ডেসপিনাকে জড়িয়ে ধরেই তার আব্বা-আম্মার সামনে টেনে নিয়ে বলল,তোমাদের ডেসপিনার কথা বলেছিলাম না। এ সেই ‘ডেসপিনা জুনিয়র’-স্টিফেন পরিবারের মেয়ে। ডেসপিনা সালাম দিল নাদিয়ার আব্বা-আম্মাকে। তারা সালামের উত্তর দিল। নাদিয়ার আব্বা হাত তুলে বলল, বেঁচে থাক মা। নাদিয়ার মা এগিয়ে এল ডেসপিনার দিকে। ডেসপিনার চিবুকে আলতো একটা চুমু দিয়ে বলল, আল্লাহ তোমাকে বাঁচিয়ে রাখুন মা। --কিছুতেই বিশ্বাস হতে চাইছে না,ডেসপিনা আমাদের বাড়ীতে,সত্যিই আমাদের সৌভাগ্য। বলল নাদিয়া। --কিছু মনে করবেন না খালাম্মা, খালুজান, নাদিয়া ছেলে মানুষী করছে। লজ্জায় মুখ লাল করে বলল ডেসপিনা। --ঠিক আছে মা। তোমাকে আমাদের মাঝে পেয়ে আমরা গর্ব বোধ করছি। তুমি জাননা,স্টিফেন পরিবার বলকানের মুসলমানদের জন্যে কি। সবাই পরম শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সাথে এ পরিবারকে দেখে, এ পরিবারের কথা স্মরণ করে। নাদিয়ার উচ্ছাস সবার অন্তরকেই প্রতিধ্বনিত করছে। কথাটা বলে নাদিয়ার মা ডেসপিনার হাত ধরে তাকে নিয়ে সোফায় বসাল। পাশের সোফায় গিয়ে বসল নাদিয়ার আব্বা-আম্মা। নাদিয়া বসল ডেসপিনার পাশে। নাদিয়ার মা’র কথায় ডেসপিনা মাথা নিচু করে গম্ভীর হয়েছিল। সোফায় বসে মুখটা একটু তুলে ডেসপিনা নাদিয়ার মা’র দিকে চেয়ে বলল, আজকের স্টিফেন পরিবার সেই স্টিফেন পরিবারের এক কংকাল, তাদের তো কিছু নেই খালাম্মা। --জানি বাছা। কিন্তু স্টিফেন পরিবার সেই স্টিফেন পরিবারই আছে। না হলে তাদের উপর আজ দুঃখ-মুসিবত কেন? বলল নাদিয়ার মা। --কিন্তু খালাম্মা এই পরিবার তো তার দায়িত্ব পালন করতে পারছে না,বরং তারই কারণে জাতির মুসিবত আরও বাড়ছে। --দিন কারো সমান যায় না মা, আজ পারছে না, কাল পারবে। --আপনি বলছেন পারবে খালাম্মা? চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠল ডেসপিনার। --পারা তো শুরু হয়ে গেছে মা। হাসান সেনজিক ইতিমধ্যেই মিলেশ বাহিনীর রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। এত বছর গেল, ওদেরকে এইভাবে চ্যালেঞ্জ আর কেউ করতে পারেনি। বলল ওমর বিগোভিক। --আপনার কথা ঠিক খালুজান। কিন্তু এ ব্যাপারটা এখানে বিরাট বিপদের সৃষ্টি করেছে। আমি সেই বিপদের কথা নিয়েই আপনাদের এখানে ছুটে এসেছি। --কি বিপদ মা? উদ্বেগ ভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল ওমর বিগোভিক। --গতকাল মিলেশ বাহিনির লোকেরা আমার খালাম্মার বাড়ীতে মানে হাসান সেনজিকের বাড়িতে এসেছিল হাসান সেনজিকের খোঁজে। গোটা বাড়ীতে তারা ভাংচুর করেছে, তছনছ করে দিয়েছে বাড়ীর সব কিছু। তারা দাবি করেছিলো হাসান সেনজিককে বের করে দিতে অথবা সন্ধান দিতে কোথায় আছে। অবশেষে যাবার সময় অসুস্থ খালাম্মা কে বলে গেছে, ঠিক সাত দিন পরে তারা আসবে, এসে হাসান সেনজিককে না পেলে বা তার কোন সন্ধান না দিলে খালা আম্মাকেই ওরা পণবন্দী করে নিয়ে ......। কথা শেষ করেতে পারলনা ডেসপিনা। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। নাদিয়া ডেসপিনাকে কাছে টেনে নিল। নাদিয়ার মা এসে ডেসপিনাকে কাছে টেনে সান্তনা দিতে লাগল। ডেসপিনা রুমাল দিয়ে দু’চোখ মুছে বলল, ফুফু আম্মা খুবেই অসুস্থ। বিছানা থেকে উঠবার শক্তি তার নেই। অবস্থার এই চাপ তিনি সহ্য করেতে পারবেন না, কিছু যদি ঘটে যায়......। কথা শেষ করল না, কথা বন্ধ করে কান্না চাপতে লাগল ডেসপিনা। এই সময় বাহিরের দরজায় আবার নক করার শব্দ হল। ওমর বিগোভিক উঠে দাঁড়াল। দেখি কে এল বলে ওমর বিগোভিক বের হয়ে গেল। দরজায় নক করেছিল সালেহ বাহমন। ওমর বিগোভিক সালেহ বাহমনকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলো। কথা শুনেই নাদিয়া বুঝতে পেরেছিল। গেস্ট রুমের পাশেই ফ্যামেলি ড্রয়িং রুম। মাঝখানে একটা সংযোগ দরজা। নাদিয়া, নাদিয়ার মা এবং ডেসপিনা গিয়ে ভিতরের ড্রয়িং রুমে বসলো। ওমর বিগোভিক সালেহ বাহমনকে নিয়ে গেস্ট রুমে এল। সালেহ বাহমন বসেই বলল চাচাজান আপনার লন্ড্রি হাউসে মিলেশ বাহিনীর যে লোকটি আসে তাকে চিনে নিতে চাই। মিলেশ বাহিনির হেডকোয়ার্টার যেখানে ছিল সেখানে এখন আর নেই। বদলেছে। কোথায় আমরা তার সন্ধান পাচ্ছিনা। আপনার ঐ লোকটাকে ফলো করে কোন ঠিকানায় পৌঁছা যায় কিনা দেখতে হবে। --তোমরা ওদের ফলো করছো কেন? --ওদের গতিবিধি সম্পর্কে অবহিত হবার জন্য। --কিন্তু ওরা টের পেলে তো সংঘাত বেধে যাবে। --সংঘাত তো বাধবেই, কিন্তু আমরা যদি ওদের সম্পর্কে না জানি, ওদের গতি বিধি আমাদের কাছে পরিস্কার না থাকে, তাহলে সে সংঘাতে আমারা জয়ী হতে পারবো না। --জয়ী হবার আশা কর বাহমন? --করতেই হবে চাচাজান, দেশ শুদ্ধ সব মুসলমান দেশ ছেড়ে চলে যেতে পারে না। সুতরারং টিকে থাকার জন্য আত্মরক্ষার সংগ্রামে আমাদের জয়ী হতেই হবে। দরজার ওপাশে নাদিয়াদের গল্প বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। তারা কান দিয়েছিল সালেহ বাহমন এবং নাদিয়ার আব্বার আলোচনার দিকে। নাদিয়ার আম্মা কি কাজে উঠে গিয়েছিলো। নাদিয়া নূর ডেসপিনার পাশেই বসেছিলো। ডেসপিনা তাকে কনুই-এর এক গুতা দিয়ে বলল, এই বুঝি তোমার সেই সালেহ বাহমন? আমার কেন বলছ? আমি যদি বলি হাসান সেন...... ডেসপিনা নাদিয়ার মুখ চেপে ধরে বলল। মাফ চাচ্ছি, প্রত্যাহার করে নিচ্ছি কথা। বল এই কি সেই সালেহ বাহমন? --উত্তর দিবনা। অভিমান করে বলল নাদিয়া। --ঠিক আছে উত্তর দিওনা এসব প্রশ্নের উত্তর না দেওয়াই বড় উত্তর। নাদিয়া হেসে ডেসপিনাকে জড়িয়ে ধরে বলল, তুমি যাই ভাব, আসল ব্যাপার হল ও আমাকে জানে না, ওকে আমি জানি না। --কিন্তু আমি তো তোমাকে জানি। নাদিয়াকে একটা চিমটি কেটে বলল ডেসপিনা। ঠিক এই সময়েই সালেহ বাহমন ও নাদিয়ার আব্বার মধ্যে কথা শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং ওদিকে কান দিতে গিয়েই তাদের কথা বন্ধ হয়ে যায়। সালেহ বাহমনের কথায় ওমর বিগোভিকের মুখ উজ্জল হয়ে উঠেছিল। বলল সে, ধন্যবাদ বাহমন আশার কথা শুনালে। আমাদের ছেলেরা সবাই এভাবে ভাবছে? --সবাইকে তো জানিনা চাচাজান, যাদের জানি তারা এর চাইতেও বেশি ভাবছে। --কিন্তু সংখ্যা শক্তি ও সুযোগ সব দিকেই ওরা ভালো অবস্থায়, ওদের মোকাবিলা কি সহজ হবে ? --হবে না। কিন্তু মোকাবিলার তো বিকল্প নাই। আমরা তো নিরবে আত্নসমর্পণ করে জাতির অস্তিত্ব বিলীন করে দেবার পথ বেছে নিতে পারি না। --তুমি তো ডেসপিনার নাম শুনেছ। সে এসেছে। একটা............... --ডেসপিনা মানে স্টিফেন পরিবারের ডেসপিনা এসেছে? --হাঁ --আল-হামদুলিল্লাহ। আজকেই আমরা স্টিফেন পরিবারের সাথে যোগাযোগের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছি। চেষ্টা করেও ওদের পরিবারে কারো সাথে আলোচনা করার সুযোগ হয়নি। একদিকে পরিচিত বাড়িগুলি মিলেশ বাহিনীর চররা চোখে চোখে রেখেছে, অন্যদিকে বড়ীগুলোর চাকর-বাকর কিংবা কেউ মুখ খুলতে নারাজ। আলোচনা করতে গিয়ে মনে হয়েছে, ওরা সবাইকে মিলেশ বাহিনীর লোক বলে সন্দেহ করছে। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি, ডেসপিনা যোগাযোগের একটা পথ বাতলে দিবে। ডেসপিনা মারাত্নক একটা দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছে। বলল ওমর বিগোভিক। কি দুঃসংবাদ? উদ্ভিগ্ন কন্ঠে বলল সালেহ বাহমন। ওমর বিগোভিক সেদিন হাসান সেনজিকের বাড়ীতে যা ঘটেছিল তার পুরো বিবরণ দিল। শেষে বলল হাসান সেনজিককে ওদের না দিলে বেগম খানমকে ওরা পণবন্দী করবেই। শোনার পর সালেহ বাহমন অনেকক্ষন কথা বললেন না। তার উদাস দৃষ্টি দেয়ালে নিবদ্ধ ছিল। অনেকক্ষণ পর তার দৃষ্টি ফিরে এল। সে সোফায় হেলান দিয়ে বসল। তার ঠোঁটে ফুটে উঠলো এক টুকরো হাসি। বলল, ওরা পাগল হয়ে উঠেছে। --কিন্তু এই পাগলামিকে যদি রোধ করা না যায়? সাত দিন তো দেরি আছে চাচাজান, হাসান সেনজিকরা ততোদিন বেলগ্রেড এসে পৌঁছাবে। --তুমি নিশ্চিত হচ্ছ কেমন করে ? --আমার নিশ্চিত হবার কারণ, হাসান সেনজিকরা এ পর্যন্ত তাদের প্রতিরোধ খেলনার মত ভেঙ্গেছে। আমার আর একটি ধারনা, যে শক্তি ও যে বুদ্ধি দিয়ে ওরা মিলেশদের প্রতিরোধ ভাঙছে, সেই শক্তি ও বুদ্ধি যদি মিলেশদের রুখে দাঁড়ায় তাহলে ওদের পাগলামি বন্ধ করা যাবে। --এসবই তোমার একটা অনুমান। --শুধু অনুমান নয় চাচাজান, আমরা খবর পেয়েছি আলবেনিয়ার রাজধানীর দুধর্ষ সন্ত্রাসী জেমস জেংগা এবং কাকেজীর ত্রাস ব্ল্যাক ক্যাটকে ওরা যে ভাবে নিমিষে শেষ করেছেন তাতে আমাদের বুক ফুলে উঠেছে। --কিন্তু ভুলে যেওনা মিলেশ বাহিনী জেমস জেংগা এবং ব্লাক ক্যাট নয়, বলকান অঞ্চলের সবচেয়ে সুগঠিত ও শক্তিশালী বাহিনী। --জানি চাচাজান কিন্তু ওদের মধ্যে কম্পন শুরু হয়েছে, হেডকোয়ার্টার গোপন স্থানে সরিয়ে নেয়া এরই প্রমাণ। ওমর বিগোভিক মুহুর্ত কয়েক চুপ থাকল। তারপর বলল আচ্ছা বাহমন, হাসান সেনজিকের সাথের ঐ লোকটা কে যে আমাদের কল্পনাকেও হার মানাচ্ছে। --আমি জানি না তিনি কে? কিন্তু আমি অনুমান করি, তিনি আহমদ মুসা ছাড়া আর কেউ নন। হাসান সেনজিককে নিয়ে যুগোস্লাভিয়ার চরম প্রতিকুল মাটিতে পা রাখার দুঃসাহস একমাত্র তিনিই রাখেন। --কিন্তু একজন মানুষ কি করে এত বড় চ্যালেঞ্জ ... ওমর বিগোভিক কথা শেষ না করেই থেমে গেল। সালেহ বাহমন একটু হাসলো। বলল, তার ইতিহাস তো এটাই চাচাজান। ফিলিস্তিনে তিনি একা গিয়েছিলেন, মিন্দানাও, সোভিয়েত মধ্যে এশিয়া, সিংকিয়াং এবং ককেশাশেও তিনি একা গিয়েছিলেন এবং আল্লাহ তাকেই জয়ী করেছেন। চাচাজান, তিনি রূপ কথার রাজপুত্র,তার সামনে কোন প্রতিরোধই টিকে না। ওমর বিগোভিক কোন কথা বলল না। তার মুখ দু'টি আনন্দে উজ্জল হয়ে উঠল। তার শূন্য দৃষ্টি দেয়ালে নিবদ্ধ। বোধ হয় সে মনে মনে সালেহ বাহমনের সুন্দর কথাগুলো নাড়াচাড়া করছে। ডেসপিনা এবং নাদিয়া নূরের মুখেও কোন কথা নেই। তাদের সামনেও তখন সালেহ বাহমনের কথাগুলোই প্রতিধ্বনি হচ্ছে। অনেকক্ষণ পর নাদিয়া নূর বলল, ওর কথা সত্য হলে আহমদ মুসা আমাদের জন্যে সৌভাগ্য বহন করে আনছেন। ‘কিন্তু আমি ভাবছি নাদিয়া'বলতে লাগল ডেসপিনা, 'মানুষের ভার নিয়ে দেশ থেকে দেশান্তরে এইভাবে ঘুরে বেড়ায় এমন মানুষও আজ দুনিয়াতে তাহলে আছে।' নাদিয়া কিছু বলতে যাচ্ছিল। এই সময় ডাইনিং রুম থেকে নাদিয়াকে ডাকল তার মা। ‘আসি' বলে নাদিয়া ছুটে গেল ডাইনিং রুমের দিকে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৭৯ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ১০.বলকানের কান্না (৬)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন