বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
এক নাপিত। তার সঙ্গে এক তাঁতীর খুব ভাব। নাপিত লোককে কামাইয়া বেশি পয়সা উপার্যন করিতে পারে না। তাঁতি কাপড় বুনিয়া বেশি লাভ করিতে পারে না। দুই জনেরই খুব টানাটানি। আর টানাটানি বলিয়া কাহারও বউ কাহাকে দেখিতে পারে না। এটা কিনিয়া আন নাই, ওটা কিনয়িা আন নাই বলিয়া বউরা দিনরাই কেবল মিটির মিটির করে। কাতই আর ইহা সহ্য করা যায়।
একদিন তাঁতি যাইয়া নাপিতকে বলিল, ‘বউ এর জ্বালায় আর ত বাড়িতে টিকিতে পারি না’। নাপিত জবাব দিল, ‘ভাইরে ! আমারও সেই কথা। দেখনা আজ পিছার (ঝাড়ু) বাড়ি দিয়া আমার পিঠের ছাল আর রাখে নাই’। তাঁতি জিজ্ঞাসা করে, ‘ আচ্ছা ভাই, ইহার কোন বিহিত কারা যায় না?’। নাপিত বলে, ‘চল ভাই, আমরা দেশ ছাড়িয়া বিদেশে চলিয়া যাই। যেখানে বউরা আমাদের খুজিয়াও পাইবে না; আর জ্বালাতনও করিতে পারিবে না’।
সত্যি সত্যিই একদিন তাহারা দেশ ছাড়িয়া পালাইয়া চলিল। এদেশ ছাড়াইয়া ওদেশ ছাড়াইয়া যাইতে যাইতে তাহারা এক বিজন বন-জঙ্গলের মধ্যে আসিয়া পড়িল। এমন সময় হালুম হালুম করিয়া এক বাঘ আসিয়া তাদের সামনে খাড়া। ভয়ে তাঁতি ত ঠির ঠির করিয়া কাপিতেছে। নাপিত তাড়াতাড়ি তার ঝুলি হইতে একখানা আয়না বাহির করিয়া বাঘের মুখের সামনে ধরিয়া বলিল, ‘এই বাঘটা ত আগেই ধরিয়াছি। তাঁতী ! তুই দড়ি বাহির কর- সমনের বাঘটাকেও বাঁধিয়া ফেলি’।
বাঘ আয়নার মধ্যে তার নিজের ছবি দেখিয়া ভাবিল, ‘এরা না জানি কতবড় পালোয়ান। একটা বাঘকে ধরিয়া রাখিয়াছে। আবার আমাকেও বাঁধিয়া রাখিতে দড়ি বাহির করিতেছে’। এই না ভাবিয়া বাঘ লেজ উঠাইয়া দে চম্পট। তাঁতি তখনো ঠির ঠির করিয়া কাঁপিতেছে। বনের মধ্যে আঁধার করিয়া রাত আসিল। ধারে কাছে কোন ঘর বাড়ি নাই। সেখানে দাঁড়াইয়া থাকিলে বাঘের পেটে যাইতে হবে। সামনে ছিল এক বড় গাছ। দউজনে যুক্তি করিয়া সেই গাঠে উঠিয়া পড়িল।
এদিকে হইয়াছে কি? সেই যে বাঘ ভয় পাইয়া পালাইয়া গিয়াছিল, সে যাইয়া আর বাঘদের বলিল, ‘অমুক গাছের তলায় দুইজন পালোয়ান আসিয়াছে। তাহারা একটা বাঘকে ধরিয়া রাখিয়াছে। আমাকেও বাঁধিতে দড়ি বাহির করিতেছিল। এই অবসরে আমি পালাইয়া আসিয়াছি। তোমরা কেহ ওপথ দিয়া যাইও না’। বাঘদের মধ্যে যে মোড়ল- সেই জাঁদরেল বাঘ বলিল, ‘কিসের পালোয়ান? মানুষ কি বাঘের সাথে পারে? চল সকলে মিলিয়া দেখিয়া আসি’ জঙ্গী বাঘ-সিঙ্গিবাঘ-মামুদ বাঘ- খুতখুতে বাঘ-কুতকুতে বাঘ, সকল বাঘ তর্জন-গর্জণ করিয়া সেই গাছের তলায় আসিয়া পৌছিল। একে ত রাত অন্ধারী, তার উপর বাঘের হুঙ্কার- অন্ধকারে জোড়া জোড়া বাঘের চোখ জ্বলিতেছে। তাই না দেখিয়া তাঁতি ত ভয়ে কাঁপিয়া অস্থির। নাপিত যত বলে- ‘তাঁতী এক সাহসে ভর কর!’ তাঁতী ততই কাপেঁ। তখন নাপিত দড়ি দিয়া তাঁতীকে গাছেল ডালের সঙ্গে বাঁধিয়া রাখিল’। কিন্তু তাহারা গাছের আগডালে আছে বলিয়া বাঘ তাহাদের নাগাল পাইতেছে না।
তখন জাঁদরেল বাঘ আর সব বাঘদের বলিল, ‘দেখ তোরা একজন আমার পিঠে ওঠে-তার পিঠে আরেক জন ওঠ- তার পিঠে আরেক জন ওঠ-এমন কলিয়া উপরে উঠিয়া হাতের থাবা দিয়া এই লোক দু’টোকে নামাইয়া লইয়া আয়’। এই ভাবে একজনের ঠিঠে আর একজন তার পিঠে আর একজন করিয়া যেই উপরের বাঘটি তাঁতিকে ছুতে যাইবে, অমনি ভয়ে ঠির ঠির করিয়া কাঁপিতে কাঁপিতে দড়িসমতে তাঁতী ত মাটিতে পড়িয়া গিয়োছে। উপরের ডাল হইতে নাপিত বলিল- ‘তাঁতী তুই দড়ি দিয়া মাটির উপর হইতে জাঁদরেল বাঘটিকে আগে বাধ, আমি উপরের দিক হইতে একটা একটা করিয়া সবগুলি বাঘকে বাঁধিতেছি’। এই কথা শুনিয়া নিচের বাঘ ভবিল আমাকেই ত আগে বাঁধিতে আসিবে। তখন সে লেজ উঁচাইয়া দে দৌড়- তখন এ বাঘের উপর পড়ে ও বাঘ, সে বাঘের উপর পড়ে আরেক বাঘ। নাপিত উপর হইতে বলে, ‘ জোলা মজবুত করিয়া বাঁধ- মজবুত করিয়া বাঁধ। একটা বাঘও যেন পালাইতে না পারে’। সব বাঘ তখন পালাইয়া সাফ।
বাকি রাত টুকু কোনরকমে পাড় করিয়া পরদিন সকাল হইলে তাঁতী আর নাপিত বন ছাড়াইয়া আর এক রাজার রাজ্যে আসিয়া উপস্থিত হইল। রাজা রাজসভায় বসিয়া আছেন। এমন সময় নাপিত তাঁতীকে সঙ্গে লইয়া রাজার সামনে যাইয়া হজির। ‘মহারাজ প্রণাম হই’। রাজা বলিল, ‘ কি চাও তোমরা?’ নাপিত বলিল’ ‘আমরা দুইজন বীর পালোয়ান। আপনার এখানে চাকুরি চাই’। রাজা বলিলেন, ‘তেমারা কেমন বীর তা পরখ না করিলে ত চাকরি দিতে পারি না? আমার রাজবাড়িতে আছে দশজন কুস্তিগীর, তাহাদের যদি কুস্তিতে হারাইতে পার তবে চাকরি মিলিবে’। নাপিত বলিল, ‘মহারাজের আর্শিবাদে নিশ্চয় তাহাদের হারাইয়া দিব’। তখন রাজা কুস্তি পরখের একটি দিন স্থির কলিয়া দিলেন। নাপিত বলিল, ‘মাহারাজ ! কুস্তি দেখিবার জন্য ত কত লোক আসবে, কত মজা হইবে। মাঠের মধ্যে একখানা ঘর তৈরী করিয়া দেন। যদি বৃষ্টি-বাদল হয়, লোকজন সেখানে যাইয়া আশ্রয় লাইবে’। রাজার আদেশে মাঠের মধ্যে প্রকান্ড খড়ের ঘর তৈরী হইল। রাতে নাপিত চুপি চুপি যাইয়া তাহার ক্ষুর দিয়া ঘরের সমস্ত বাঁধন কাটিয়া দিল। প্রকান্ড খড়ের ঘর কোনরকমে খামের উপর খাড়া হইয়া রহিল।
পরের দিন কুস্তি দেখিতে হাজার হাজার লোক জমা জইয়াছে। রাজা আসিয়াছেন- রানী আসিয়াছেন- মন্ত্রী, কোটাল, পাত্রমিত্র কেহ কোথাও বাদ নাই। মঠের মধ্যখানে রাজাবাড়ির বড় বড় কুস্তিগীরেরা গায়ে মাটি মাখাইয়া লড়াইয়ের সমস্ত কায়দাগুলি ইস্তেমাল করিতেছে। এমন সময় কুস্তিগীরের পোশাক পরিয়া নাপিত আর তাঁতী মাঠের মধ্যখানে উপস্থিত। চারিদিকে লোক তাহাদের দেখিয়া হাততালি দিয়া উঠিল। নাপিত তখন তাঁতীকে সঙ্গে করিয়া লাফাইয়া একবার একদিকে যায় আবার ওদিকে যায়। আর ঘরের এক একখানা চালা ধরিয়া টান দেয়। হুমড়ি খাইয়া ঘর পড়িয়া যায়। সভার সব লোক অবাক। রাজবাড়ির কুস্তিগীরেরা ভাবে ‘হায় হায় না জানি ইহারা কত বড় পালোয়ান। হাতের এক ঝাঁকুনি দিয়া এত বড় আটচালা ঘরখানা ভাঙ্গিয়া ফেলিল। ইহাদের সঙ্গে লড়িতে গেলে ঘরেরই মত উহারা আমাদের হাত-পাগুলো ভাঙ্গিয়া ফেলিবে। চল আমরা পালাইয়া যাই’। তাহারা পালাইয়া গেলে নাপিত তখন মাঠের মধ্যখানে দাঁড়াইয়া বুক ফুলাইয়া রাজাকে বলিল, ‘মহারাজ ! জলদি করিয়া আপনার পালোয়ানদের ডাকুন দেখি ! তাগাদের কার গায়ে কত জোর’। কিন্তু কে কার সঙ্গে কুস্তি করে? তাহারা ত আগেই পালাইয়াছে। রাজা তখন নাপিত আর তাঁতীকে তাঁর রাজ্যের সেনাপতি নিযুক্ত করিলেন। সেনাপতির চাকরি পাইয়া তাঁতী আর নাপিত ত বেশ সুখেই আছে।
এর মধ্যে কোথা হইতে এক বাঘ আসিয়া রাজ্যে মহা উৎপাত লাগাইয়াছে। কাল এর ছাগল লইয়া যায়, পরশু ওর গরু লইয়া যায়, তারপর মানুষও লইয়া যাইতে লাগিল। রাজা তখন নাপিত আর তাঁতীকে বলিল, ‘ তোমরা যদি এই বাঘ মারিতে পার তবে আমার দুই মেয়ের সঙ্গে তোমাদের দুই জনের বিবাহ দিব’। নাপিত বলিল, এর আর এমন কঠিন কাজ কি? অবে আমাকে পাঁচ মন ওজনের একটি বড়শি আর গোটা অস্টেক পাঁঠা দিতে হইবে। রাজার আদেশে পাঁচমন ওজনের একটি লোহার বড়শি তৈরি হইল। নাপিত তখন লোকজনের নিকট হইতে জানিয়া লইল. কোথায় বাঘের উপদ্রব বেশি, আর কোন সময় বাঘ আসে। তারপর নাপিত সেই বড়শির সঙ্গে সাত-আটটা পাঁঠা গাঁথিয়া এক গাছির লোহার শিকলে সেই বড়শি আটকাইয়া এক গাছের সঙ্গে বাঁধিয়া রাখিল। তারপর তাঁতীকে সঙ্গে লইয়া গাছের আগ ডালে উঠিয়া বসিয়া রহিল। অনেক রাতে বাঘ আসিয়া সেই বড়শি সমতে পাঠা গিলিতে লাগিল। গিলিতে গিলিতে গলায় বড়শি আটকাইয়া গিয়া তর্জন-গর্জন করিতে লাগিল। সকাল হইলে লোকজন ডাকাইয়া নাপিত আর তাঁতি লাঠির আঘাতে মাঘটিকে মারিয়া ফেলিল।
এ খবর শুনিয়া রাজা ভারী খুশী। তারপর ঢোল-ডগর বাজাইয়া নাপিত আর তাঁতীর সঙ্গে দুই মেয়ের বিবাহ দিয়া দিল। বিবাহের পরে বউ লইয়া বাসর ঘরে যাইতে হয়। তাঁতী একা বাসর ঘরে যাইতে ভয় পায়। নাপিতকে সঙ্গে যাইতে অনুরোধ করে। নাপিত বলে, ‘বেটা তাঁতী! তোর বাসর ঘর আমি যাইব কেমন করিয়া ? আমাকে ত আমার বউ এর সঙ্গে ভিন্ন বাসর ঘরে যাইতে হইবে। তুই কোন ভয় করিস না। খুব সাহসের সঙ্গে থাকবি’। এই বলিয়া তাহাকে বাসর ঘরের মধ্যে ঠেলিয়া দিল। বাসর ঘরে যাইয়া তাঁতী এদিক চায়-ওদিক চায়। আহা হা কত ঝাড়-কত লণ্ঠন ঝিকিমিকি জ্বলিতেছে। আর বিছানা ভরিয়া কত রঙ্গের ফুল। তাঁতী কোথায় বসিবে তাহাই ঠিক করিতে পারে না। তখন অতি শরমে পাপোশখানার উপর কুচিমুচি হইয়া বসিয়া তাঁতী ঘামিতে লাগিল। কিছুক্ষণ পরে পানের বাটা লইয়া, পায়ে সোনার নুপুর ঝুমুর ঝুমুর বাজাইয়া পঞ্চসখী সঙ্গে করিয়া রাজকন্যা আসিয়া উপস্থিত। তাঁতী তখন ভয়ে জড়সড় । সে মনে করিল, হিন্দুদের কোন দেবতা যেন তাহাকে কাটিতে অসিয়াছে। সে তখন তাড়াতাড়ি উঠিয়া রাজকন্যার পায়ে পড়িয়া বলিল, ‘মা ঠাকরুন ! আমার কোন অপরাধ নাই। সকলই নাপিত বেটার কারসাজি’। রাজকন্যা সকলই বুঝিতে পারিল। কথা রাজার কানেও গেল। রাজা তখন তাঁতী আর নাপিতকে তাড়াইয়া দিলেন। নাপিত রাগিয়া বলে, ‘বোকা তাঁতী। তোর বোকামীর জন্য অমন চাকুরিটাত গেলই- সেই সঙ্গে রাজকন্যাও গেল। তাঁতী নাপিতকে জড়াই ধরিয়া বলিল, ‘তা গেল ! চল ভাই , দেশে যাইয়া বউদের লাথি গুতা খাই। সেত গা সওয়া হইয়া গিয়াছে। এমন সন্দেহ আর ভয়ের মধ্যে থাকার চাইতে সেই ভাল’।
মূলঃ বাঙ্গালীর হাসির গল্প-পল্লীকবি জসীমউদ্দীন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now
X
বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়। লাইব্রেরীর একটি নির্জন প্রান্তে একটি টেবিলে বসে আছে ডেসপিনা জুনিয়র।
তাঁর সামনে একটি বই খোলা।
তাঁর চোখ বইয়ের দিকে নিবদ্ধ। কিন্তু একটা বর্ণও সে পড়ছে না। ক্ষোভে, দুঃখে, বেদনায় বিপর্যস্ত তাঁর মুখ।
ডেসপিনা জুনিয়র ইতিহাসের একজন অত্যন্ত কৃতি ছাত্রী। অনার্সে সে প্রথম শ্রেনীতে প্রথম হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে সে অধ্যয়ন করছে।
ইতিহাসের ক্লাসে আজ সে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছে। ইতিহাসের প্রধান অধ্যাপক ক্লাসে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। বক্তৃতার মাঝখানে ডেসপিনা বাধার সৃষ্টি করে কিছু বলার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু অধ্যাপক তাকে কিছু বলতে না দিয়ে ধমকে বসিয়ে দেয়। ক্রুদ্ধ ডেসপিনা অনুমতি না নিয়েই ক্লাস থেকে গট গট করে বেরিয়ে আসে।
অপমানিত অধ্যাপক ক্লাসে বসেই বিভাগীয় নির্দেশ জারি করেছেন, ডেসপিনা একমাসের জন্য সাসপেন্ড। একমাস তাকে ইতিহাসের ক্লাসে এলাও করা হবেনা।
এই অপমান এবং ক্ষোভে-দুঃখে জর্জরিত হচ্ছিল ডেসপিনা জুনিয়রের হৃদয়।
কারনিনা, জেমস এবং নাদিয়া লাইব্রেরীতে প্রবেশ করেই ডেসপিনাকে দেখতে পেল।
এরা সবাই ইতিহাস বিভাগের এবং ডেসপিনার সহপাঠী। ডেসপিনাকে ঘিরে বসল সবাই।
কারনিনা বলল, তোমার এভাবে অধৈর্য হওয়া এবং এভাবে বেরিয়ে আসা ঠিক হয়নি। সঙ্গে সঙ্গেই কিছু বলল না ডেসপিনা।
মুখ নিচু করে নিরব রইল। তাঁর দু’চোখ থেকে নেমে এল অশ্রু।
--আমি ঠিকই করেছি, ইতিহাস চুরি করবে কেন, ইতিহাস বিকৃত করবে কেন? বলল ডেসপিনা।
-- কি বলছ, স্যার ইতিহাস চুরি করেছেন? কারনিনাই আবার বলল।
--তোমার এসব বাড়াবাড়ি ডেসপিনা, স্যারের উপর এমন মন্তব্য ঠিক নয়। বলল জেমস।
--না আমার বাড়াবাড়ি নয়। স্যার ইতিহাস শিক্ষকের মত আচরণ করেননি, তাঁর বর্ণনা একচোখা হয়েছে।
--কেমন করে বলত। বলল নাদিয়া।
ডেসপিনা একটু চুপ করে থাকল। তারপর শুরু করল, স্যার বললেন হাঙ্গেরীর রাজা লেডিস লাস ও ওয়ালেচার রাজা ডাকুলের মিলিত বাহিনীর সাথে বুলগেরিয়ার ভার্সায় ১৪৪৪ সালের ১০ ই নভেম্বর তুর্কী সুলতান দ্বিতীয় মুরাদের যে যুদ্ধ হয় তা সুলতানের নিষ্ঠুর দলননীতির ফল। সুলতান নাকি খৃষ্টানদের গ্রামের পর গ্রাম ও গীর্জা ধ্বংস করেন। এছাড়া স্যার যুদ্ধক্ষেত্রে হাংগেরীর রাজা লেডিস লাস-হত্যাকে বর্বর বলে অভিহিত করেছেন। হাংগেরীর রাজা লেডিস লাসকে হত্যা করে তাঁর মাথা তুর্কীরা তাদের পতাকার সাথে তুলে ধরেছিল।
একটু দম নিয়ে ডেসপিনা বলল, স্যারের এই কারণগুলো মিথ্যা ও আংশিক। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে হাংগেরীর রাজা লেডিস লাস হত্যাকে বর্বর বলেছেন, কিন্তু কে এই যুদ্ধ বাঁধাল, কেন এই যুদ্ধ বাঁধল তা তিনি বলেন নি। তিনি বলেননি লেডিস লাস কি ধরণের জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। ১৪৪৪ সালের ১০ই নভেম্বর ১০ বছরের জন্যে হাঙ্গেরী রাজ্যের সাথে সুলতান দ্বিতীয় মুরাদের একটি সন্ধি হয়। হাঙ্গেরী, পোলান্ড, সার্ভিয়া, বসনিয়া, ওয়ালেচিয়া,আলবেনিয়া (বুলগেরিয়া, রুমানিয়াসহ সার্ভিয়া বসনিয়া ও গ্রীসের গোটা অঞ্চল ছিল তখন তুর্কী সুলতানের অধীনে) থেকে সংগৃহীত মিলিত খৃষ্টান বাহিনীর সাথে দীর্ঘ বিশ বছর যুদ্ধের পর উভয় পক্ষের উদ্যোগে এই সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়। সন্ধির শর্ত অনুসারে সার্ভিয়া স্বাধীন হয়। এবং তুর্কীসৈন্যরা দুর্গগুলো খালি করে দিয়ে চলে যায়। কিন্তু দশ বছর শান্তি রক্ষার জন্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির বয়স একমাস না হতেই পোপের পরামর্শে হাঙ্গেরী রাজ সন্ধি ভংগ করলেন। তাঁর মানে ইউরোপের আরও রাজারা যোগ দিলেন। সবাই বললেন, অবিশ্বাসীদের সাথে সন্ধি রক্ষা করা নিষ্প্রয়োজন। সন্ধি ভঙ্গ করে তারা সার্ভিয়াসহ পুর্বদিকে কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত গোটা ভূভাগ দখল করে নিলেন। অবশেষে ১৪৪৪ সালের ১০ই নভেম্বর ভার্সায় তুর্কি সৈন্যদের সাথে তারা মুখোমুখি হল। সন্ধি ভংগের মত বিশ্বাসঘাতকতায় ক্রুদ্ধ তুর্কি সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ সন্ধির দলীলকে তাঁর যুদ্ধের পতাকা হিসেবে ব্যবহার করেন এবং যুদ্ধে নিহত হাঙ্গেরী রাজের কর্তিত মাথা ঐ পতাকার সাথে উত্তোলন করেন। ইতিহাসের রায় অনুসারে তুর্কি সুলতান এখানে কোন অন্যায় করেননি, জঘন্য একজন বিশ্বাসঘাতককে তিনি শাস্তি দিয়েছেন।
একটু থামল ডেসপিনা।
কিছু বলার জন্য জেমস মুখ খুলেছিল।
ডেসপিনা বাধা দিয়ে বলল, আমার কথা শেষ হলে তারপর বলবে।
বলে আবার শুরু করল, যুদ্ধের আগে তুর্কিরা খৃষ্টানদের অজস্র গ্রাম ও গীর্জা পুড়িয়ে ছারখার করেন, স্যারের এ বক্তব্য মিথ্যা শুধু নয়, উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর শামিল। ইতিহাসের সাক্ষী হল, পোপের মন্ত্রনায় হাঙ্গেরীর রাজ লেডিস লাসের নেতৃত্বে গঠিত বিশাল ক্যাথলিক বাহিনী স্বাধীন সার্ভিয়া পদানত করে যখন কৃষ্ণসাগরের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন তখন তাদের হাতেই গ্রীক-খৃষ্টানদের হাজার হাজার গ্রাম ও গীর্জা ধ্বংস হয়েছিল, পুড়ে ছারখার হয়েছিল অসংখ্য শস্যক্ষেত ও জনপদ। তাইতো দেখা যায় ভার্ণা যুদ্ধের পর সার্ভিয়া ও বসনিয়া আবার যখন তুর্কি অধিকারে আসল তখন সেখানকার গ্রীক-ধর্ম সমাজের খৃষ্টানরা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছিল, মুসলমানদের তারা স্বাগত জানিয়েছিল।
একটু দম নিয়েই ডেসপিনা বলল, ইতিহাসের আরেকটা সাক্ষের কথা তোমাদের বলি, সার্ভিয়ার এই দুর্যোগ প্রাক্কালে সার্ভিয়ার খৃষ্টান রাজা ব্রাংকোভিচ হাঙ্গেরী রাজকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি জয়লাভ করলে ধর্ম সম্বন্ধে কি ব্যবস্থা করবেন? উত্তরে হাঙ্গেরী রাজ বলেছিলেন, সমগ্র দেশকে বলপূর্বক রোমান ক্যাথলিক করা হবে। ব্রাংকোভিচ এই প্রশ্ন তুর্কি সুলতান দ্বিতীয় মুরাদকেও করেন। উত্তরে সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ জানিয়েছেন, তিনি প্রত্যেক মসজিদের নিকট একটি করে গীর্জা নির্মাণ করে দেবেন, লোকে স্বাধীনভাবে যেখানে ইচ্ছা গমন করবে। এরপর সার্ভিয়ার মানুষ তুর্কী শাসনকেই স্বাগত জানায়। স্যার এসব ঐতিহাসিক সত্য চেপে গিয়ে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়েছেন।
ডেসপিনা থামল।
জেমস এর চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছে। তাতে বিরক্তি ও ক্ষোভের চিহ্ণ স্পষ্ট। সে বলল, ডেসপিনা তুমি এই যে কথাগুলো আমাদের কাছে বললে, তা বাইরে কখনো বলো না। যতই ইতিহাস হোক আমরা এগুলো মানিনা। স্যার ঠিকই আছেন।
--তুমি তা বলতে পার, ইতিহাস চুরি যদি পাপ না হয়।
--এ পাপ নয়। জাতিকে তুমি ভালোবাসনা ডেসপিনা?
--কোন জাতি কি মিথ্যা বলতে শেখায়, ইতিহাস চুরি করতে বলে?
জেমস-এর মুখ ক্রোধে রক্তবর্ণ ধারন করেছে। সে চিৎকার করে কি বলতে যাচ্ছিল। কারনিনা তার মুখে হাত চাপা দিয়ে বলল, জেমস আমি তোমাকে এখানে টেনে এনেছি ঝগড়া করার জন্যে নয়। তুমি যে দিকটা বলছ সেটা রাজনৈতিক, আর ডেসপিনা যে বিষয়ের উপর জোর দিচ্ছে সেটা ঐতিহাসিক। দু’জনেই ঠিক আছ।
জেমস অনেকখানি শান্ত হল।
কারনিন ও জেমস বিশ্ববিদ্যালয় চত্তরের এক সুপরিচিত জুটি-মঞ্চ-নেপথ্য সবখানেই। আবার এরা ডেসপিনাকে ভালোবাসে তার সারল্য, সুব্যবহার ও সুশিক্ষার জন্যে।
শান্ত হয়ে জেমস বলল, কারনিনা তোমার বান্ধবী ডেসপিনার ক্ষতি হবে যদি এরকম কথা সে বলে। তার ভবিষ্যৎ আছে, আমরা তার ভাল চাই।
ডেসপিনা তখন গম্ভীর হয়ে উঠেছে। বলল, ধন্যবাদ জেমস।
‘ধন্যবাদ’ বলে জেমস ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, কাজ আছে একটু।
জেমস-এর সাথে কারনিনাও চলে গেল।
নাদিয়া তার চেয়ার টেনে ডেসপিনার আরও কাছে সরে এল, ঘনিষ্ঠ হলো আরও।
ডেসপিনার একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল, ডেসপিনা অনেকদিন থেকে একটা সন্দেহ আমার মনে জাগছে, আজ সেটা ঘনিভূত হলো।
--কি সন্দেহ? নাদিয়ার দিকে মুখ তুলে জিজ্ঞাসা করল ডেসপিনা।
--বলব? বলল নাদিয়া।
--বল।
--আমার সন্দেহ তুমি মুসলিম।
ডেসপিনা মুখ নামিয়ে নিল। একটুক্ষণ চুপ থেকে বলল, তোমার সন্দেহ মিথ্যা নয় নাদিয়া।
--তাহলে প্রতিদিন আমার কাছেও পরিচয় গোপন করছ কেন, তুমি জান যে আমি মুসলমান।
--আমার উপর হুকুম, এ পরিচয় কাউকেই বলা যাবে না।
--কেন? আমি তো পরিচয় গোপন করিনি?
--তোমার আব্বা ছিলেন একজন মুসলিম অধ্যাপক, তোমার পরিচয় গোপন করার প্রশ্ন ওঠে না। তাছাড়া......
চুপ করল ডেসপিনা কথা শেষ না করেই।
--তাছাড়া কি?
ডেসপিনা পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে নাদিয়ার দিকে তাকাল। নাদিয়ার চোখে চোখ রেখে কি যেন ভাবছে ডেসপিনা।
--বলতে আপত্তি আছে ডেসপিনা?
--তোমাকে বলতে আপত্তি নেই, তোমার আব্বাও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তিনি চাকুরী হারিয়েছেন দু’জন মুসলিম ছাত্রকে সাহায্য করে।
একটু থামল আবার ডেসপিনা। তারপর শুরু করল, আমি এক হতভাগ্য পরিবারের সন্তান নাদিয়া। আমাদের পরিবারের কোন পুরুষ ছেলেক বাঁচতে দেয়া হয়না, মেয়েরা বাঁচে, কিন্তু তাদেরকেও সংসার গড়তে দেয়া হয়না, দুর্বিসহ একাকিত্ব নিয়ে তাদের জীবন কাটাতে হয়।
নাদিয়ার চোখ দুটি বিস্ময়ে বিস্ফারিত।
সে চোখ দু’টি দিয়ে যেন ডেসপিনাকে গিলছে।
ডেসপিনা চুপ করেছে।
নাদিয়ার মুখেও কথা সরছে না।
অনেকক্ষণ পর নাদিয়া তার বিস্ময়ের ঘোর নিয়েই জিজ্ঞাসা করল, তুমি কি স্টিফেন পরিবারের মেয়ে, যে সার্ভিয়া রাজ স্টিফেনের বোন লেডি ডেসপিনার বিয়ে হয়েছিল তুরস্কের সুলতান বায়েজিদের সাথে?
--হ্যাঁ নাদিয়া। বলল ডেসপিনা।
নাদিয়া জড়িয়ে ধরল ডেসপিনাকে পাগলের মত। কপালে চুমু খেল। বলল, ডেসপিনা, স্টিফেন পরিবারের জন্য আমরা গর্ব করি, কিন্তু এই পরিবারের কাউকে দেখার সৌভাগ্য আমার কোনদিন হয়নি।
--স্টিফেন পরিবারকে তোমরা জান?
--শুধু আমরা নই, বলকান অঞ্চলের সব মুসলিম পরিবারই জানে এবং তারা এ পরিবারের জন্যে গর্ব করে।
--তাদের সম্বন্ধে সবকিছুই কি জান?
--সবকিছু মানে, তুমি যে বিষয়টা বললে, সেটা আমি শুনেছি আব্বার কাছে।
--তিনি কি সব জানেন যে, আমাদের উপর কি নিপীড়ন চলছে যুগ যুগ ধরে?
--মনে হয় তিনি জানেন। তাঁর কাছে আরও আমি শুনেছি, এই পরিবারের মাত্র একজনই নাকি উপযুক্ত ছেলে জীবিত আছে, নাম হাসান সেনজিক। বিদেশে মানুষ হয়েছেন, বিদেশেই থাকেন।
--হ্যাঁ নাদিয়া, হাসান সেনজিক আমার খালা আম্মার ছেলে।
একটা কিছু বলতে গিয়েও ডেসপিনা বলতে পারলনা। তার গলা যেন বন্ধ হয়ে গেল। হঠাৎ থেমে গেল সে।
নাদিয়া তার দিকে তাকিয়েছিল। দেখল, ডেসপিনার চোখ দু’টি ছলছল করছে।
নাদিয়া কিছু বলতে পারল না।
ডেসপিনাই কথা বলল অল্পক্ষণ পরে। বলল, তারও কোন খবর নেই ১৫ দিন হল। আমার খালাম্মা মুমূর্ষ। তাঁকে দেখার জন্যে দেশে আসবে বলে স্পেন থেকে সে যাত্রা করেছিল ১৫ দিন আগে। তারপর আর কোন খোঁজ নেই তার।
ডেসপিনার শেষের কথাগুলো কান্নায় জড়িয়ে গেল।
নাদিয়াও অভিভূত হয়ে পড়েছে। বলল, কোন খোঁজ নেওয়া যায়নি?
--কে নেবে? শত্রুরা জালের মত ছেয়ে আছে, খোঁজ করতে গেলেও তার বিপদ হবে। হাসান সেনজিকের নাম নেওয়াও বিপদের কারণ।
--কিন্তু একটা পরিবারকে এভাবে ধ্বংস করা কেন? ইচ্ছা করলে সবাইকে তো একেবারে মেরে ফেলতে পারে? না, তারা তা করবে না। এই বংশকে তারা তিলতিল করে মারবে।
--ঠিক তাই। আব্বার কাছে শুনেছি, খৃষ্টানরা, খৃষ্টান যাজকরা, বিশেষ করে মিলেশ বাহিনী মনে করে স্টিফেন পরিবারই বলকান দেশগুলোতে ইসলাম প্রচারের নিমিত্ত হিসাবে কাজ করছে। তারা আরও মনে করে স্লাভ ও মুসলিম রক্তকে মিশিয়েছে এই পরিবারই।
--ঠিকই তিনি বলেছেন, এসবই আমাদের পরিবারের অপরাধ।
--কিন্তু ডেসপিনা, সব অত্যাচারেরই তো একটা শেষ আছে। এরও একটা শেষ অবশ্যই আছে।
--কিভাবে, ওদের শক্তির বিরুদ্ধে কে দাঁড়াবে? আগে কম্যুনিষ্ট সরকার ওদের পাপেট ছিল, আজকের গণতান্ত্রিক সরকারও ওদের মন রক্ষা করেই চলছে শুধু নয়, মনে মনে তারা মিলেশ বাহিনীর কাজে ভীষণ খুশি।
সরকার মনে করছে, তাদের কাজটাই মিলেশ বাহিনী করে দিচ্ছে।
নাদিয়ার মনে পড়ল সালেহ বাহমনের কথা। আপনাতেই মুখটা যেন তার আরক্ত হয়ে উঠল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও কাজ হচ্ছে ডেসপিনা।
বলে নাদিয়া সালেহ বাহমনের সব কাহিনী খুলে বলল এবং জানাল যে, মুসলিম যুবকরা হোয়াইট ক্রিসেন্ট নামে একটা সংগঠন গড়ে তুলেছে। মিলেশ বাহিনীকে প্রতিরোধের প্রস্তুতি তারা শুরু করেছে।
ডেসপিনা নাদিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে তার কথা শুনছিল। শুনতে শুনতে ডেসপিনার ঠোঁটে এক টুকরো হাসির রেখা ফুটে উঠেছিল।
নাদিয়া থামলে ডেসপিনা বলল, তোমার সালেহ বাহমন এখন কোথায়?
নাদিয়া চমকে উঠে তাকাল ডেসপিনার দিকে। তার মুখ লাল হয়ে উঠেছে।
হাসল ডেসপিনা। বলল, কিছু মনে করোনা নাদিয়া, সালেহ বাহমন এখন কোথায়?
--এবাবে তোমার বলা ঠিক হয়নি ডেসপিনা। মুখ ভার করে বলল নাদিয়া।
একটু থেমেই আবার বলল নাদিয়া, আমিও তোমার চোখের অশ্রুতে একটা আলো দেখতে পেয়েছি।
--প্রতিশোধ নিচ্ছ ?
--প্রতিশোধ নয়, তোমার হৃদয় কি হাসান সেনজিকের জন্যে উম্মুখ হয়ে নেই ?
উত্তর দিল না ডেসপিনা।
মুহুর্তেই বদলে গেল তার মুখ। বিষাদের এক কালো ছায়া নামল সে মুখে। ধীরে ধীরে বলল, তোমার কথার প্রতিবাদ করব না নাদিয়া। কিন্তু কি জান, আমার দু’চোখ কোন দিন ওকে দেখেনি, দেখবেও কিনা জানিনা।
শেষের কথাগুলো যেন তার গলায় আটকে যাচ্ছিল।
নাদিয়া তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্যে বলল, তোমার প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয়নি ডেসপিনা। সালেহ বাহমন এখনও আমাদের বাসায়, উঠে বসার মত অবস্থা তার এখনও হয়নি।
ডেসপিনা রুমাল দিয়ে চোখ ভাল করে মুছে নিয়ে বলল, তাঁদের যে সংগঠনের কথা বললে সেটা কি শুধু বেলগ্রেডে, না গোটা দেশে?
--গোটা দেশে শুধু নয়, গোটা বলকানে ওরা কাজ শুরু করেছে।
--আলহামদুল্লিাহ। আমাদের সামনে শুধুই অন্ধকার ছিল, আলোর কোন রেশই ছিলনা, কোন অবলম্বনের চিন্তা করতেও আমরা ভুলে গেছি। আমার খালাম্মার শেষ আশা হয়তো পূরণ হবে না। ছেলেকে হয়তো তিনি দেখতে পাবেন না। উনি নিখোঁজ হবার দুঃসংবাদ আমরা তাকে দেইনি। তিনি সহ্য করতে পারবেন না।
নাদিয়া বলল, চিন্তা করো না ডেসপিনা, আল্লাহই আমাদের সাহায্য করবেন।
একটু থেমেই নাদিয়া আবার বলল, কিন্তু ডেসপিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে তোমার পরিচয় গোপন রেখেছ কেমন করে?
--আমি স্টিফেন পরিবারের পরিচিত বাড়ীগুলোর কোনটাতেই থাকি না। আমি জন্মের পর থেকে বাবা মার সাথে বুলগেরিয়ায় মানুষ হয়েছি। বেলগ্রেডে এসেও স্টিফেন পরিবার থেকে ভিন্ন বাড়ীতে বাস করেছি। মায়ের নামও খৃষ্টান নাম। আব্বাও খৃষ্টান নাম নিয়ে আমাদের থেকে ভিন্নভাবে ভিন্ন বাড়ীতে বাস করেন। সবাই এখানে জানে আমার পিতা নেই। মায়ের পরিচয়েই আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। রাতের অন্ধকারে আমরা আব্বার সাথে দেখা করি এবং পরিবারের অন্যান্যদের সাথে দেখা সাক্ষাত এভাবেই আমাদের হয়।
--কি দুঃসহ জীবন। বলল নাদিয়া।
একটু থেমে বলল আবার, ডেসপিনা আমাদের বাসায় যাবে, আব্বা আম্মা খুব খুশী হবেন স্টিফেন পরিবারের লোক পেলে।
--ঠিক আছে,একদিন যাব।
--আরেকটা কথা ডেসপিনা, তোমার নামটা ঠিক হয়নি। রাজা স্টিফেনের বোন সুলতান বায়েজিদের স্ত্রী লেডি ডেসপিনার নামে তোমার প্রকাশ্য নাম রাখা ঠিক হয়নি। ডেসপিনা জুনিয়র বলে আরও প্রকাশ করে দিচ্ছ সব।
--তুমি ঠিকই বলেছ নাদিয়া। কিন্তু আব্বা আম্মা এ নাম গোপন করতে রাজী নন। তারা এ নাম অত্যন্ত ভালবাসেন এবং এতে তারা সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করেন।
--এ নাম আমারও গর্ব ডেসপিনা। লেডি ডেসপিনা বলকানে যে পরিবর্তন একদিন এনেছিলেন, ডেসপিনা জুনিয়র সে পরিবর্তন আবার আনুন আমরা চাই।
আবেগে নাদিয়ার গলা কেঁপে গেল, তার চোখ দু’টি উজ্জল হয়ে উঠল।
--আমার নাম নিয়ে এভাবে বলো না নাদিয়া।
তোমার নাম নিয়ে বলছি না, তোমার নাম আমাদের এক স্বর্ণোজ্জল অতীতের প্রতীক। আমরা চাচ্ছি সেই অতীত আবার ফিরে আসুক।
এক সময় ঢং ঢং করে বারোটা বাজার শব্দ হলো দেয়াল ঘড়িতে। ১২ টা থেকে ৩ টা পর্যন্ত লাইব্রেরীর বিরতির সময়।
ডেসপিনা এবং নাদিয়া দু’জনেই ওঠে দাঁড়াল লাইব্রেরী থেকে বেরুবার জন্যে।
ডাক্তার ড্রেসিং চেঞ্জ করে হাত পরিষ্কার করে এসে তোয়ালেতে হাত মুছতে মুছতে বলল, ইয়ংম্যান তোমার আর ড্রেসিং লাগবে না। তুমি ভাল হয়ে গেছ। যা সময় লাগার কথা, তার অনেক আগেই তোমার ঘাগুলো শুকিয়ে গেল। মানসিক শক্তি রোগ সারায়, কারণ এ শক্তি ঈশ্বরের কাছ থেকে আসে।
সালেহ বাহমন শুয়ে ছিল। ডাক্তারের কথা সে মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। ডাক্তারটি খুব সরল, খবুই ভাল মানুষ। খুবই ভাবপ্রবণ। ডাক্তার না হয়ে দার্শনিক হলেই ভাল হতো।
ডাক্তার থামলে সালেহ বাহমন বলল, ডাক্তার তুমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করো?
ডাক্তার চোখ কপালে তুলে বলল, করব না মানে আমি তো কান্ডজ্ঞানহীন নই।
--কিন্তু বস্তুবাদী সমাজ ঈশ্বর বিশ্বাসীদেরই তো কান্ডজ্ঞানহীন বলে।
--বলে বলেই তো সমাজের আজ এই দূর্গতি। তুমি বেলগ্রেড থেকে প্যারিস পর্যন্ত হেঁটে যাও, দেখবে রাস্তার দু’ধারে শত শত গীর্জা আজ পরিত্যক্ত। উপাসকের অভাবে সেগুলো বিরান হয়ে গেছে। কিন্তু গীর্জাকে পরিত্যাগ করে মানুষ কি পেয়েছে? কিছুই নয়, পরিবারে অশান্তি, সমাজে হানাহানি বহুগুণ বেড়েছে। ঈশ্বর প্রেম ছাড়া শান্তির,ভালোবাসার সমাজ গড়ে উঠতে পারে না।
--এ সমাজ আবার কি করে ভাল হবে ডাক্তার,হানাহানির পথ থেকে সরে আসার উপায় কি?
--আবার যিশুর রাজ্য ফিরিয়ে আনতে হবে।
--ডাক্তার সেটা কি যিশুর রাজ্য হবে,না যাজকদের রাজ্য হবে,যেমন একবার ছিল?
ডাক্তার সঙ্গে সঙ্গে কোন উত্তর দিল না। ডাক্তার তার দিকে বিস্ময়ভরা চোখে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। অনেকক্ষণ পর বলল,ইয়ংম্যান,তুমি সাংঘাতিক প্রশ্ন করেছ। এ প্রশ্ন আমাকেও পীড়া দেয়,যার উত্তর আমার কাছে নেই। উত্তর সন্ধানে যখনই সামনে আগাই,দেখি মনগড়া যাজকতন্ত্র সামনে এসে যাচ্ছে। তোমার কাছে কোন সলিউশন আছে ইয়ংম্যান?
--বাইবেলে কোন সলিউশন নেই।
--নেই? আমি বাইবেলের সব জানিনা। সত্যি নেই?
--নেই। পারিবারিক,সামাজিক,রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানুষের কেমন হবে,যুদ্ধ-সন্ধি কিভাবে চলবে,বিচার-লেনদেন কিভাবে পরিচালনা করা হবে সে ব্যাপারে বাইবেল নিরব।
--তাহলে ধর্মরাজ্য কি হবে? ওরা কি করতে চায় তাহলে?
--কারা?
--জাননা,মহান ধর্মসম্রাট সার্লেম্যান-এর একমাত্র বংশধর কনস্টানটাইন সে ধর্মরাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
--কনস্টানটাইনের নাম শুনে চমকে উঠল সালেহ বাহমন। মিলেশ বাহিনীর নেতা কনস্টানটাইন।
--দুর্ভাগ্য ডাক্তার, আমি জানিনা তাকে।
--জানবে কি করে গীর্জায় তো যাওনা। রোববারে গীর্জায় গীর্জায় ইনি বক্তৃতা দেন।
--সালেহ বাহমনের কৌতুহল বাড়ল। সে এতদিন ভাবত কনস্টানটাইন একজন সেক্যুলার ও সন্ত্রাসবাদী জাতীয় নেতা। সে গীর্জাগুলোও সফর করে ফিরছে।
--কি বলেন তিনি ডাক্তার? বলল সালেহ বাহমন।
--ইউরোপে সার্লেম্যানের সেই ধর্মসম্রাজ্য ফিরিয়ে আনার কথা বলেন। তবে একটা কথা তিনি সাংঘাতিক বলেন।
--কি কথা?
--সাংঘাতিক কথাটা হলো, মুসলমানরা নাকি সাপের মত গোটা ইউরোপ গিলে ফেলার ষড়যন্ত্র করছে। খৃষ্টানদের উদাসিনতার সুযোগে ওরা অঢেল পেট্রোডলার দিয়ে শত শত গীর্জা ইতিমধ্যেই কিনে ফেলেছে। এভাবে চললে সবগুলো গীর্জাই মসজিদে পরিণত হবে।
একটু থামল ডাক্তার। তারপর বলল, এর পরের কথা আরও সাংঘাতিক।
--কি সেটা? বলল, সালেহ বাহমন।
--সেটা হলো,স্পেনে যিশুর সন্তানরা যেমন করে মুসলমানদের এক এক করে নির্মূল করেছে, এখানেও তাই করতে হবে।
--একথা তুমি ভাল মনে কর ডাক্তার? এতো হানাহানির কথা। তুমি কনষ্টানটাইনের কথা বিশ্বাস কর?
ডাক্তার জিভ কেটে বলল, ধর্মরাজ সার্লেম্যানের সন্তান কি মিথ্যা বলতে পারেন?
--তুমি এদেশে এবং ইউরোপে মুসলমানদের দেখেছ, তারা কি অশান্তিপ্রিয়?
--তারা তো সংখ্যালঘু, খুবই শান্তি প্রিয়। তবে গীর্জা মসজিদ হয়েছে তা বেশ কিছু আমি দেখেছি। বিক্রি হয়ে যাওয়া গীর্জা কি ক্লাব রেস্তোঁরা হয়নি?
--হ্যাঁ, হয়েছে হাজার হাজার।
--তাহলে বিক্রি হওয়া গীর্জা কি মসজিদ হতে পারেনা?
--ঠিক বলেছ, হতে পারে।
--তাহলে কনষ্টানটাইন কি মিথ্যা প্রচার করছেনা?
--তা আমি বলতে পারবো না, সে ধর্মপুত্র। আমার কিছু বলা ঠিক হবে না।
--কিন্তু এই ভাবেই কি একদিন যাজকতন্ত্র কায়েম হয়েছিল না,যা ধর্মের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে?
ডাক্তার হাসল। বলল,তুমি অনেক জান ইয়ংম্যান। তুমি একদিন কনষ্টানটাইনের সাথে কথা বলনা!
বলে ডাক্তার তার মেডিকেল কিট নিয়ে উঠে দাঁড়াল। বেরিয়ে গেল ডাক্তার।
ডাক্তার বেরিয়ে যেতেই খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকল নাদিয়া নূর।
খাবার টেবিলে রেখে বলল,ডাক্তারের সাথে এভাবে কথা বলা আপনার ঠিক হয়নি। ডাক্তার একটু চালাক হলে আপনি ধরা পড়ে যেতেন।
নাদিয়ার পরনে সাদা ঢিলা জামা। একদম পা পর্যন্ত নেমে এসেছে। মাথায় জড়ানো সাদা বড় রুমাল। কপালও ঢাকা পড়েছে রুমালে।
চোখ নিচু করে কথা বলছিল নাদিয়া।
নাদিয়াকে ঢুকতে দেখেই চোখ নামিয়ে নিয়েছিল সালেহ বাহমন।
আহত অবস্থায় সেদিনের রাতের ঘটনার পর নাদিয়া সামনে আসলেই বাহমন খুবই অস্বস্তি বোধ করে। সেদিন সালেহ বাহমন যখন টলে পড়ে যাচ্ছিল, তখন নাদিয়া তাকে জড়িয়ে ধরে যে চিৎকার করেছিল তা এখনও তার চোখে ভাসে।
নাদিয়াও সাধারণতঃ তার সামনে আসেনা। কিন্তু বাড়ীতে লোক নেই। আব্বা ওমর বিগোভিক সারাদিন প্রায় বাইরে থাকে, তখন সালেহ বাহমনের দেখা-শুনা বাধ্য হয়ে নাদিয়াকেই করতে হয়।
নাদিয়া থামলে সালেহ বাহমন বলল, ঠিক বলেছেন, বেশীই একটু বলে ফেলেছি। কি করব মিথ্যার জবাব না দিয়ে তো পারা যায় না।
নাদিয়া আর কি বলবে ভেবে পাচ্ছিল না,চলে যাবে কিনা তাও বুঝতে পারছিল না। নাদিয়া অবাক হয় এমন জড়তা,সংকোচ তার তো কোন দিনই ছিল না। এ ঘরে পা দিলেই এক অশরীরি আবেশ যেন তাকে ঘিরে ধরে। মনে পড়ল সেদিনের ডেসপিনার বলা কথা। অস্বস্তিটা তার আরও বাড়ল।
চলে যাবে কি যাবেনা যখন ভাবছিল নাদিয়া,তখন সালেহ বাহমন বললেন,আপনি সেদিন ষ্টিফেন পরিবারের যে ছেলেটির নিখোঁজ হওয়ার কথা বললেন, তার কি কোন ফটো আমাকে দিতে পারেন।
নাদিয়া সালেহ বাহমনের আপনি সম্বোধনে খুবই বিব্রত বোধ করে। আজ আর সে ধরে রাখতে পারলো না। বলল,‘আপনি'না বললে কি হয়না,অন্ততঃ বয়সে ছোট তো আমি।
সালেহ বাহমন মাথা নিচু করেই বসেছিল। মুহূর্তকাল কোন উত্তর দিলনা নাদিয়ার কথায়। পরে ধীরে ধীরে বলল,ঠিক আছে নাদিয়া।
ঐ ফটো আমাকে দেবে।
--যদি পারি।
--কিন্তু ফটো না পেলে খোঁজ করা মুস্কিল হবে।
--আমি চেষ্টা করবো।
এই সময় ঘরে প্রবেশ করল ওমর বিগোভিক।
এ সময় ওমর বিগোভিক কোন সময়েই বাড়ি ফেরেন না।
নাদিয়া বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তার পিতার দিকে তাকাল।
ওমর বিগোভিক সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বলল, আজ মিলেশ বাহিনীর একজন আমার লন্ড্রী হাউসে এসেছিল।
নাদিয়া এবং সালেহ বাহমন দু’জনেই চমকে উঠে ওমর বিগোভিকের দিকে তাকাল।
একটু দম নিয়ে সে বলল, ভয় করোনা ওরা আমাকে চিনেনি। সম্ভবত: সেদিন রাতে শোনা আমার নাম, চেহারা কিছুই তারা মনে রাখেনি। এবং নৌকায় আমার লন্ড্রী হাউসের নেমপ্লেট নিশ্চয় তাদের চোখে পড়েনি।
--তাহলে কেন এসেছিল? বলল, নাদিয়া।
--এসেছিল একটা অর্ডার নিয়ে। এর আগেও অর্ডার নিয়ে এসেছে, কিন্তু তখন পরিচয় জানতে পারিনি। আজ গল্পে গল্পে অনেক কথা বলেছে, পরিচয়ও জানতে পেরেছি।
--কিছু জানতে পেরেছ তাহলে?
--হ্যাঁ, সেজন্যেই এলাম। এ কথা সালেহ বাহমনকে না বলে থাকতে পারলাম না। ওমর বিগোভিকের কথা শোনার জন্যে উদগ্রীব হয়ে উঠল নাদিয়া এবং সালেহ বাহমন দু’জনেই।
ওমর বিগোভিক গম্ভীর হয়ে উঠল। বলল, লোকটি গল্পে গল্পে যে কথা বলল, তার সারাংশ হলো, ষ্টিফেন পরিবারের হাসান সেনজিক আর্মেনীয়ার হোয়াইট ওলফের হাতে বন্দী ছিল। ৫০ হাজার ডলারের বিনিময়ে হোয়াইট ওলফ তাকে মিলেশ বাহিনীর হাতে তুলে দেবে, এটা ঠিক হয়ে গিয়েছিল। এই সময়ই হোয়াইট ওলফের বিপর্যয় ঘটে। আহমদ মুসার নতুন নেতৃত্বে ককেশাস ক্রিসেন্ট হোয়াইট ওলফের সব ঘাটি একদিনেই বিধ্বস্ত করে দেয়। হোয়াইট ওলফের লোকরা হয় মারা পড়ে, নয় বন্দী হয়। হাসান সেনজিক যে ঘাটিতে বন্দী ছিল সে ঘাটিও বিধ্বস্ত হয়, কিন্তু হাসান সেনজিক মারা পড়েনি। মিলেশ বাহিনী মনে করছে ককেশাস ক্রিসেন্ট তাকে উদ্ধার করেছে। এই সম্ভবনাটিই মিলেশ বাহিনীর জন্যে উদ্বেগজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ককেশাস ক্রিসেন্ট হাসান সেনজিককে সাহায্য করলে তাকে হাতে পাওয়া অসুবিধা হবে।
গা থেকে কোট খুলে ফেলার জন্যে ওমর বিগোভিক কথা বন্ধ করেছিল।
ওমর বিগোভিক কোট খুলে নাদিয়ার হাতে দিয়ে এসে আবার বসল।
ওমর বিগোভিক কথা শুরু করার আগেই সালেহ বাহমন মুখ খুলল। বলল, মাফ করবেন, কথায় বাধা দিলাম। আমি জানতে চাচ্ছি, আপনি যে আহমদ মুসার কথা বললেন, সে কোন আহমদ মুসা?
--তুমি কোন আহমদ মুসাকে জান? বলল, ওমর বিগোভিক।
--জানি এক আহমদ মুসার কথা। তিনি ফিলিস্তিন, মিন্দানাও এবং মুসলিম মধ্য এশিয়ার ইসলামী বিপ্লবের নায়ক।
--হ্যাঁ বৎস, ইনিই তিনি।
--তিনি ককেশাসে এসেছিলেন?
--এসেছিলেন এবং আসার পর হোয়াইট ওলফের এ বিপর্যয় ঘটে।
--আলহামদুলিল্লাহ। খুশীতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল সালেহ বাহমনের মুখ।
--কে এই আহমদ মুসা আব্বা? আমি তো শুনিনি তার কথা? বলল,নাদিয়া।
--তিনি আল্লাহর এক রহমত। এক অকুতোভয়, অসীম সাহসী, এবং অসাধারণ ধী সম্পন্ন এক বিপ্লবী যুবক। মুসলিম জাতির যেখানেই বিপদ,সেখানেই ছুটে যান তিনি,থামল ওমর বিগোভিক।
সংগে সংগেই কথা বলে উঠল সালেহ বাহমন। বলল,নাদিয়া তোমার বান্ধবী ডেসপিনাকে বলতে পার, হাসান সেনজিককে আল্লাহ এমন এক স্থানে পৌছেছেন,যার চেয়ে নিরাপদ স্থান আমার মনে হয় এ দুনিয়াতে আর নাই।
বলে একটু থেমেই ওমর বিগোভিককে লক্ষ্য করে বলল, চাচাজান আমি আর শুয়ে থাকতে পারব না। আপনি যে খবর শুনিয়েছেন তাতে আমার মন ছুটে বেড়াতে চাচ্ছে। কেন জানি আমার মন বলছে, আহমদ মুসা বালকানে আসবেন।
--আব্বা,ওর আজ নতুন ড্রেসিং হয়েছে। এ ড্রেসিং খোলা পর্যন্ত ওর রেষ্ট নেওয়া দরকার। সালেহ বাহমনের কথা শেষ হতেই বলে উঠল নাদিয়া।
‘আমার কথা তো শেষ হয়নি, তোমরা অন্য কথায় গেছ' বলে ওমর বিগোভিক আবার তার কথা শুরু করল, ‘আনন্দের কথার মাঝে বিপদের কথাও আছে। আমি মিলেশ বাহিনীর লোককে প্রশ্ন করে ছিলাম, তোমরা কি তাহলে হাসান সেনজিকের আসা ছেড়ে দিলে?
উত্তরে সে তীব্রভাবে মাথা ঝাকিয়ে বলেছিল, না,না,না। আমরা জানি হাসান সেনজিক যেখানেই থাক,যার কাছেই থাক তার মুমূর্ষ মা’কে সে একবার দেখতে আসবেই। সীমান্ত এবং সর্বত্র তার ফটো আমরা ছড়িয়ে দিয়ে রেখেছি। আমাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে সে বলকানে প্রবেশ করতে পারবে না। প্রবেশ করলেও তার মা’র সাথে দেখা করার চেষ্টা করলেই সে ধরা পড়ে যাবে। সিদ্ধান্ত হয়েছে,হাসান সেনজিকের মা’সহ ষ্টিফেন পরিবারের সবগুলো বাড়ী এবং লোকদের উপর চব্বিশ ঘন্টা নজর রাখা হবে। থামল ওমর বিগোভিক।
ওমর বিগোভিকের শেষের কথাগুলো শুনে নাদিয়ার মুখ ছোট হয়ে গেল। সালেহ বাহমন বলল, হাসান সেনজিকের উপর মিলেশ বাহিনীর এত রাগ কেন?
--হাসান সেনজিক মিলেশ বাহিনীকে কাঁচকলা দেখিয়ে এতদিন বেঁচে আছে এটাই তার অপরাধ। তাদের মাথায় ভীষণ জেদ চেপেছে। আর তাছাড়া ষ্টিফেন পরিবারের প্রত্যক্ষ ও পিওর রক্ত যে একমাত্র যুবকের দেহে আছে,সে হলো হাসান সেনজিক। সুতারাং তাকে হত্যা করা তাদের চাই-ই।
--আব্বা ষ্টিফেন পরিবারকে সাবধান করা দরকার? এসব কথা কি আমি ডেসপিনাকে বলব? বলল নাদিয়া।
--অবশ্যই বলতে হবে মা। এই বিপদে ওদের যদি সাহায্য করা যেত! বলল ওমর বিগোভিক।
--চাচাজান আজই এখান থেকে বেরুতে চাই। মুসলিম যুবকদের নিয়ে গড়ে তোলা সংগঠন হোয়াইট ক্রিসেন্টের বেলগ্রেড ইউনিটের প্রধান হিসাবে আমার অনেক কাজ করার আছে।
--তা আমি বুঝেছি সালেহ বাহমন,কিন্তু..............
ওমর বিগোভিক সায় দিতে ইতঃস্তত করতে লাগলেন।
--না আব্বা,ঘাগুলো পুরো শুকাবার আগে বেরুলে ওর ক্ষতি হবে। ওর যাওয়া হবে না। শক্ত কণ্ঠে প্রতিবাদ করল নাদিয়া।
কথা শেষ করেই নাদিয়া দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ওমর বিগোভিক মেয়ের দিকে একবার চাইল। তার ঠোঁটে এক টুকরো স্নেহের হাসি।
তারপর সালেহ বাহমনের দিকে ফিরে ওমর বিগোভিক বলল,নাদিয়া ঠিকই বলেছে,ঘাগুলো না সারলে তোমার বেরুনো ঠিক হবে না। তোমার বাড়ীর লোকেরা তো আসছেই,কোন কথা,কোন কাজ থাকলে তাদের মাধ্যমে করতে পার,আমাকেও বলতে পার।
তাকে নিয়ে নাদিয়ার জেদে সালেহ বাহমন লজ্জায় মরে যাচ্ছিল। ওমর বিগোভিক কি কিছু বুঝেননি? অবশ্যই বুঝেছেন। নাদিয়ার উপর রাগ হলো সালেহ বাহমনের কিন্তু এ রাগের মধ্যে অভূতপূর্ব এক তৃপ্তি আছে অনুভব করল সালেহ বাহমন। সে খুবই অস্বস্তি বোধ করতে লাগল ওমর বিগোভিকের সামনে।
সালেহ বাহমন ওমর বিগোভিকের কথার কোন জবাব দেয়নি।
ওমর বিগোভিক উঠে দাঁড়াল। বলল,তোমার অনেক সময় নিয়েছি। খাবার পড়ে আছে,খেয়ে নাও।
বলে ওমর বিগোভিক ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সালেহ বাহমন উঠে খাবারের টেবিলের দিকে চলল।