বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
শীতের রাত।
বুকের মধ্যে পাথর চাপা কষ্ট নিয়ে নবশীকে শেষবারের মত মেসেজ লিখলাম, ভাল থেকো।
দুটি মাত্র শব্দ কিন্তু লিখতে যেয়ে মনে হলো, বিশাল এক পাহাড় ঠেলছি।
হয়তো পরদিন নবশীর ঘুম ভেঙ্গে গেলে ওর কাছে এই দুটি শব্দ নিত্য দিনের শুভ কামনার চেয়ে বেশি কিছু নয়, কিন্তু আমার কাছে এ যেন হৃদয়ে রক্তক্ষরণের চেয়ে বেশি। অথচ একদিন ছিল নবশী আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝত না। আমার তিন বছরের প্রেম, কোথায় শুরু হলো ভাঙন, কিভাবে তার পঁচন, আমি জানি না।
আমি হিসেব মেলাতে পারি না কোন কিছুরই।
রাত ১১টা।
সিগারেটের প্যাকেট খালি, আর একটিও অবশিষ্ট নেই।
মাসের শুরু কেবল, কিন্তু টিউশনির টাকাটা এখনো পাইনি। এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা খুচরো পয়সা একত্র করে ১১ টাকা বানিয়ে নিলাম। তারপর সেই টাকাটা নিয়ে বাসার নিচে ফুটপাতে সাইদুল মামার দোকান থেকে একটা বেনসন এন্ড হেজেস কিনে টান দিতেই, দেখি বছর দশেকের একটা টোকাই দুটো লাড্ডুর জন্য বার বার অনুরোধ করছে, কাকুতি মিনতি করছে। সাইদুল মামা দিচ্ছে না কিছুতেই, শেষমেশ কাছেই একটা ডাস্টবিনে ছেলেটা পঁচা এক কমলা খুঁজে পেয়ে সেখানে খাওয়ার মতন কোন অংশ আর অবশিষ্ট আছে কিনা তাই দেখছে, লোভী চোখে।
আমি ফের সিগারেটে টান দিতেই, নিজেকে পশু মনে হলো। মধ্যযুগীয় সামন্ত প্রভু কিংবা আধুনিক সমাজব্যবস্থার কোন পুঁজিপতির মতন ক্ষুধার্ত এক শিশুর সামনে আমি টাকা পুড়িয়ে ধোয়া পান করছি!
কাকে গালি দেই আমরা? নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন করে দেখেছি, কখনো?
ছেলেটাকে কাছে ডেকে বললাম, তোর নাম কি?
ও আমার দিকে আমার গায়ে পরিধেয় গরম কাপড়ের দিকে এমন করে তাকালো যেন দুজনে তখন দুটি ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা। কিছুক্ষণ পর বলল,ছোটন।
ছোটনকে দুটো লাড্ডু কিনে দিলাম, বাকীতে।
জিজ্ঞেস করলাম,
-তোর মা বাবা কোথায়?
-বাপে মায়রে থুইয়া গেছে গা। মায় অন্য আরেকজনরে বিয়া করছে।
-এই কনকনে শীতে শুধু একটা হাফ হাতা শার্ট পরে আছিস, শীত লাগে না তোর?
ছোটন আমার গায়ে জড়ানো জ্যাকেটের ওপরে চাদরের দিকে তাকিয়ে রইল, কোন জবাব দিল না।
আজ রাত আমার নিঃস্ব হবার রাত।
রিক্ত হৃদয়ে দুঃখ কুড়াবার রাত।
আমি চাদরটা দিয়ে দিলাম ছোটনকে, ওর চোখে মুখে কৌতূহল কিন্তু জিজ্ঞেস করছে না কিছুই। কি বলবে ও, বুঝতে পারছে না।
বললাম, স্কুলে যাস না?
-ফাইভে উঠছিলাম। পড়া ছাইড়া দিছি।
-কেন?
-মায় বাপে গেছে গা। খামু কি? ঠোঙ্গা কুঁড়াইয়া খাই।
-কত পাস প্রতিদিন?
-৪০, ৫০।
-থাকিস কোথায়?
-কনে থাকমু আর। এহানে ওহানে। মায় বাপ যাওনের পরে ঘর ভাড়া দিবার পারি নাই, মালিক বাইর কইরা দিছে।
ছোট্ট এই ছোটনের প্রতি কেমন যেন মায়া হলো, নিজের দুঃখ ভুলে ছোটনের দুঃখটা বুকের মধ্যে বিঁধল বেশি। এমন কত ছোটনই তো আছে, কিন্তু আজকের এই রাতে আমার এমন করে ভাববার পেছনে কি রয়েছে নবশীর অবহেলা? হঠাৎ করে সুনীলের একটি কবিতা মনে পড়ে গেল, হেসে উঠলাম মনে মনে।
"সার্থক মানুষদের আরো-চাই মুখ আমার সহ্য হয় না
আমি পথের কুকুরকে বিস্কুট কিনে দিই
রিক্সাওয়ালাকে দিই সিগারেট
অন্ধ মানুষের সাদা লাঠি আমার পায়ের কাছে
খসে পড়ে
আমার দু‘হাত ভর্তি অঢেল দয়া, আমাকে কেউ
ফিরিয়ে দিয়েছে বলে গোটা দুনিয়াটাকে
মনে হয় খুব আপন"
ছোটনকে বললাম, তোর খাওয়ার চিন্তা নেই।
কাল থেকে স্কুলে যাবি। প্রতিদিন খাওয়া বাবদ ১০০ টাকা করে নিয়ে যাবি আমার কাছ থেকে।
টোকাই হলেও ছোটনের আচরণটা বেশ মার্জিত।আমি জানি না কেন জানি আমার মনে হল, আমার ভুল হচ্ছে না।
পরদিন বিকেলবেলা ছোটন সাইদুল মামার দোকানের পাশে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। আমি গেলাম,ছোটন বলল আপনি আমারে টেহা দিবেন কেন?
-তোর পড়াশুনার জন্য।
-আফনের লাভ কি?
-আছে। তুই বুঝবি না।
-তাইলে ডেলি ৪৫ টেহা দিবেন। এতেই খাওন যায়।
-আর তোদের বস্তিতে ঘর ভাড়া কত?
-১০০০ টেহা।
-লেখাপড়া বাবদ আরো কিছু দিব। তোকে পড়তে হবে কিন্তু।
মাসে টিউশনি করে আমি আট দশ হাজার টাকা পাই। কিন্তু ব্যাচেলর জীবনে মেস থাকতে গেলে এই টাকাটা লেগেই যায়। কিন্তু যদি আমি সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দেই, তবে মাসে আমার প্রায় তিন হাজার টাকা বেচে যায়। সেই টাকাটা আমি ছোটনকে দিব, সিদ্ধান্ত নিলাম।
কিছুদিনের ব্যবধানে ছোটন বদলে গেল, বদলে গেলাম আমি নিজেও। এখন ছোটনকে আর কেউ টোকাই বলতে পারবে না। স্কুলে পড়ুয়া এক সুবোধ ছেলে। আমার নিজেরও কষ্ট বেশ কমে গেল, কারো জন্যেই তেমন শূন্যতা অনুভব করি না।
আমি ইদানীং সুযোগ পেলেই টাকা বাচানোর চেষ্টা করি।
টিউশনিতে প্রায়ই হেটে যাই। এর কারণ আছে।
সেদিন বিকেলবেলা সাইদুল মামার দোকানের পাশে ছোটন এসে দাঁড়িয়ে আছে আমার জন্য। বললাম, কিছু বলবি?
-আফনে টেহা পান কোনহানে? আমারে যে দেন কই পান?
-টিউশনি করি। আর সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। আমার এতে যে টাকাটা সেভ হয় তাতেই তোর পড়াশুনা চলে।
ছোটন আমার মুখের দিকে ভাবলেশহীন তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর বলল, আফনেরে আমি কি ডাকুম?
হ্যাঁ, এই যে এতদিন ধরে ছোটনকে আমি দেখছি,
ও আমাকে এখনো কিছু ডাকেনি। বললাম, ভাইয়া ডাকিস। তারপর ছোটন যেদিন ভাইয়া বলে প্রথম ডাকল আমাকে, আমার এত বেশি আনন্দ হয়েছিল যে সারাদিন আমি আর অন্য কোন কাজে মনযোগ দিতে পারিনি। পরদিন ছোটনকে একটা টি শার্ট কিনে দিলাম।
এভাবে এটা সেটা কিনে দিতে চাইতাম ওকে, ছোটন বস্তির ছেলে হলেও নিতে চাইত না। ওর মূল্যবোধ আমাকে প্রায়ই নাড়া দিত অথচ যেদিন শীতের রাতে ওকে প্রথম চাদর দিয়েছিলাম ও একটুও ইতস্তত করেনি। কিন্তু এখন করে, কারণ ও বুঝতে শিখছে আমার কষ্ট হয়। ছোটনের এই উপলব্ধিটুকুই আমি চেয়েছিলাম, মানুষ হওয়ার জন্য এর চেয়ে বেশি আর কিছুই দরকার নেই।
এরমধ্যে নবশীর সাথে আমার কথা হয়েছে একবার। ও নিজেই ফোন দিয়েছিল এতদিন পর। ও বলল,
-ভুলেই তো গেলে, একটা সময় কত পাগল ছিলে আমার জন্য।
- না ভুলিনি। আমাদের দেশে মানুষের গড় আয়ু ৭০ বছর হলে, সেখানে তিনটে বছর নেহাতই কম নয়।
সেই তিনটে বছর জীবন থেকে মুছে ফেলা যায় না, স্মৃতিগুলোও না।
-তবে?
- এতদিন ধরে আমি শুধু এটাই চেয়েছি, আমার জীবনের অন্য সব স্মৃতির মতন তোমার সাথে আমার স্মৃতিগুলোও নিতান্তই সাধারণ হোক, তা যেন বেদনাবিধুর না হয়ে উঠে।
-অ!আমি তোমার কাছে সাধারণই ছিলাম তবে?
-ভাল থেকো।
আমি ফোন রেখে দেই।
দেখতে দেখতে প্রায় এক বছর কেটে গেল। ছোটন আমাকে সেদিন বলল, ভাইয়া আমার পরীক্ষা। দোয়া কইরেন।
ছোটন পিএসসি দিবে এবার। শুধু আমার সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দেয়া আর সদিচ্ছার কারণেই শিক্ষাজীবনে একটা সনদ পেতে যাচ্ছে ও।
অথচ আমার কষ্ট হয়নি যে তা নয়। প্রথম প্রথম খুব নেশা হত সিগারেটের জন্য।
কেউ একজন বলেছিল, পকেটে লবঙ্গ রাখতে।
ঝাঁঝালো স্বাদটা নাকি সিগারেট ছেড়ে দিতে সাহায্য করবে, কিন্তু না;ছোটনের প্রতি ভালবাসা আর সেই ভালবাসা থেকে দায়বদ্ধতা এই ছিল সিগারেট ছাড়ার কারণ।
কতদিন পকেটে টাকা থাকতেও, বিকেলে নাশতা করিনি আমি। ছোটনের খাতা, কলম, পরীক্ষার ফি টুকটাক এটা সেটা তো লাগতই।
আমার সেই একটা বছর গেছে, ছোটন এসেছে দোয়া চাইতে।
তারপর?
একবছরে ছোটন কখনোই আমার মেসে আসেনি। সেদিন রেজাল্ট নিয়ে প্রথম এলো, পা ছুঁতে।
আমি বুকে টেনে নিলাম।
আমার ছোটনটা জিপিএ ফাইভ পেয়েছে, পি এস সি তে। ছোটন পকেট থেকে এক প্যাকেট বেনসন এন্ড হেজেস বের করে বলল, ভাইয়া আফনের জন্য?
এসময়ে চোখে জল কার না আসে?
ছোটনকে বললাম, তুই সিগারেটের প্যাকেট ফেরত দিয়ে টাকা নিয়ে নিস। আমি আর খাব না সিগারেট। তুই বরং আমাকে একটা গোলাপের কলি কিনে দিস, আমি জল ঢেলে বাঁচিয়ে রাখব সেটা-একদিন ফুল হয়ে ফুঁটবে।
তারপর,
ছোটন তাকিয়ে রইল আমার দিকে, ওর ভবিষ্যৎ শিক্ষা জীবনের নিশ্চয়তা চেয়ে?
আমি তাকিয়ে রইলাম বেলকুনি দিয়ে দূরের দিগন্তে,
একটি শিশুর অনিশ্চিত জীবনের শঙ্কা নিয়ে......
জীবনের গল্প
বিভ্রান্ত বাউন্ডুলে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now