বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ধ্বংস টাওয়ার
চ্যাপ্টার- ৪
বাকি অংশ
‘আ’ করে এক শব্দ তুলে বারবারা ব্রাউন পড়ে গেল চেয়ার থেকে।
হিংস্র উন্মত্ততায় জ্বলে উঠল অ্যালেক স্টিভেন্সের দুচোখ।
দুধাপ এগিয়ে সে নির্বিচারে একটা লাথি চালাল বারবারা ব্রাউনের দিকে। তার পয়েন্টেড জুতার অগ্রভাগ গিয়ে আঘাত করল বারবারা ব্রাউনের পেটের বাম পাশে।
যন্ত্রণায় কুকড়ে গেল তার দেহ।
লাথি চালিয়েই অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিয়ে স্টিভেন্স বলে উঠল, ‘কোন ইহুদীবাদীরই আলাদা কোন জীবন নেই, নিজস্ব কোন সত্তা নেই। তার গোটাটাই জাতির। তোকে বলতে হবে সেদিনের সব কথা।’
কথা শেষ করেই সে একজন প্রহরীকে বলল, ‘ওকে তুলে বসাও।’
একজন প্রহরী ছুটে গিয়ে বারবারা ব্রাউনকে তুলে বসাল।
‘বল হারামজাদি। সেদিন আইজ্যাক দানিয়েল কি কথা বলেছিল, তোরা কি বলেছিলি?’ ক্রোধে গর গর করতে করতে বলল অ্যালেক স্টিভেন্স।
উঠে বসা বারবারা ব্রাউন মুখ তুলল। বিপর্যস্ত চেহারা। কিন্তু চোখ দুটি তার শান্ত এবং তাতে অনড় দৃঢ়তার ছবি। বলল বারবারা ব্রাউন, ‘যে জাতি ব্যাক্তি সত্তাকে বিলিন করতে চায়, সে জাতি-সত্তাও টেকে না। আমরা জুইস বা ইহুদীরা সেরকম কোন ধর্ম-জাতি নই। সুতরাং অন্যায় ও অনুল্লেখিত জাতীয় স্বার্থে আমার ব্যাক্তিস্বার্থ কোরবানী দেবার প্রশ্ন উঠে না।’
‘তুই আমাকে নীতি-কথা শিখাচ্ছিস!’ বলে সামনের দেয়ালের দিকে ছুটল সে। দেয়ালের হ্যাংগার থেকে নামিয়ে নিল একটা চাবুক। স্টিভেন্সের চোখ দুটি বাঘের মত জ্বলছে।
সে চাবুক বাগিয়ে ছুটে গেল বারবারা ব্রাউনের কাছে।
শপাং শপাং করে চাবুক পড়তে লাগল বারবারা ব্রাউনের গায়ে।
বারবারা ব্রাউনের পরনে ফুলপ্যান্ট ও গায়ে হাফসার্ট।
মুহর্তেই তার সাদা সার্ট রক্তে লাল হয়ে গেল। যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে বারবারা ব্রাউন।
এক সময় চাবুক চালানোয় ক্ষান্ত দিল অ্যালেক স্টিভেন্স। বারবারা ব্রাউনকে বলল, ‘প্রথম ডোজ কেমন দেখলি, দ্বিতীয় ডোজ শুরুর আগে জিজ্ঞেস করছি, মত বদলেছে কিনা, সেদিনের সব কথা বলছিস কিনা।’
বারবারা ব্রাউন উপুড় হয়ে পড়েছিল। মাথা ঘুরিয়ে মুখটা ফিরাল স্টিভেন্সের দিকে। বলল, ‘জাতি আপনাদের একার নয়। আমরা জাতির অংশ। আপনারা কি করছেন তা জানার অধিকার আমাদের আছে। হাইম হাইকেলকে নিয়ে আপনারা কি করছেন তা জানার আগে কোন সহযোগিতাই আমি আপনাদের করব না।’ হাঁপাতে হাঁপাতে দুর্বল কণ্ঠে বলল বারবারা ব্রাউন।
হুংকার দিয়ে উঠল অ্যালেক স্টিভেন্স। ক্রোধে মুখ বিকৃত হয়ে উঠল তার। বলল, ‘ও তুই এখন আমাদের নয়, শত্রুর এজেন্ট। তাদেরই শেখানো কথা বলছিস। দেখাচ্ছি মজা। বলে দেয়াল থেকে টাঙানো ‘ইলেকট্রিক শক-ব্যাটন’ নামিয়ে হাতে নিল।
বিশেষ ব্যাটারি চালিত ব্যাটনটি সুইচ টেপার সাথে সাথে নির্দিষ্ট ভল্টের বিদ্যুত ওয়েভ সৃষ্টি করতে পারে। ব্যাটনের নিচের মাথায় রয়েছে কোয়ার্টার ইঞ্চি মাপের একটি আলপিনের অগ্রভাগ সেট করা। ব্যাটনের আলপিনটি কারও দেহে বিঁধে যাওয়ার সাথে সাথেই নির্দিষ্ট ভল্টের বিদ্যুত তার দেহে সঞ্চালিত হয়। তাতে তার মৃত্যু ঘটে না, কিন্তু মৃত্যু যন্ত্রণা তাকে ভোগ করতে হয়।
এই মৃত্যুযন্ত্রণা নেমে এল বারবারা ব্রাউনের দেহে।
অ্যালেক স্টিভেন্স ব্যাটনটির আলপিন ঢুকিয়ে দিয়েছে বারবারা ব্রাউনের দেহে।
যন্ত্রণায় বুক ফাটা চিৎকার দিয়ে উঠল বারবারা ব্রাউন। গোটা দেহ তার কুকড়ে গেল।
মাঝে মাঝে বিরতি দিয়ে এই নির্যাতন অব্যহত রাখল স্টিভেন্স।
বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত বারবারা ব্রাউন এক সময় চিৎকার করে বলল, ‘তোমাদের এই নির্যাতন আমার এই বিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে যে, তোমরা জাতির শত্রু। জাতিকে ভালবাসে এমন কেউই তোমাদেরকে জীবন থাকতে সাহায্য করবে না। চালাও নির্যাতন। মৃত্যু দেবার চেয়ে বড় কোন কিছু তোমাদের হাতে নেই।
নির্যাতন চালিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে অ্যালেক স্টিভেন্স। একদিকে বারবারা ব্রাউনকে নতি স্বীকারে ব্যর্থতা, অন্যদিকে ব্রাউনের কথা তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দিল। সে তার ব্যাটন বাগিয়ে আবার ছুটল বারবারা ব্রাউনের দিকে তার দেহে বিদ্যুতের আগুন জ্বালাবার জন্যে।
‘স্যার থামুন। যে মৃত্যু চায় তার উপর নির্যাতন চালিয়ে জেতা যাবে না। অন্য পথ দেখতে হবে স্যার।’ বলল রক্সি।
থমকে দাঁড়াল অ্যালেক স্টিভেন্স। বলল, ‘মৃত্যুর বাইরে আর কোন পথ থাকতে পারে রক্সি?’
‘আছে স্যার। মিস ব্রাউনরা আদর্শবাদী, পিউরিটান। ওদের কাছে স্যার জীবনের চেয়ে বড় ওদের ওদের পবিত্রতা। ওদের পবিত্রতায় হাত দিন, দেখবেন কেমন করে ভেজা বেড়াল হয়ে যায় ওরা।’ বলল রক্সি।
আনন্দে উজ্জল হয়ে উঠল অ্যালেক স্টিভেন্সের মুখ। বলল সানন্দে চিৎকার করে, ‘ধন্যবাদ তোমাকে রক্সি। যে উপহার সে সাজিয়ে রেখেছে তার প্রেমিক হাইম বেঞ্জামিনের জন্য, তাকে লুট করাই হবে তার জন্য মৃত্যুর চাইতে বড় শাস্তি। এ মোক্ষম কথাটা আমার মনে ছিল না। তোমাকে ধন্যবাদ।’
একটু থামল স্টিভেন্স। তারপর একগাল হেসে বলল রক্সিকে, ‘বিষয়টা যখন তোমার মাথায় প্রথম এসেছে, তখন সুযোগটা তোমাকেই প্রথম দিচ্ছি! যাও এগোও।’
‘ধন্যবাদ স্যার। বলল রক্সি। লোভের আগুন তার চোখ দুটিতে চক চক করে উঠেছে।
তার সামনেই উপুড় হয়ে পড়ে আছে বারবারা ব্রাউন। তার গায়ের সার্ট ছেঁড়া। প্রায় অনাবৃত তার পৃষ্ঠদেশ।
শিকারী নেকড়ের মত এক পা’ দু’পা করে এগুলো বারবারা ব্রাউনের কাছে। ঝুঁকে পড়ে বারবারা ব্রাউনের দেহ উল্টিয়ে তাকে চিৎ করল রক্সি।
বারবারা চিৎ হয়েই তার দু’পায়ের একটা প্রচন্ড লাথি মারল রক্সির ঝুকে পড়া দেহে।
আকস্মিক লাথি খেয়ে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গেল রক্সি।
হোঁ হোঁ করে হেসে উঠল স্টিভেন্স। বলল, ‘লজ্জার কথা রক্সি।’
লাথি মেরেই উঠে দাঁড়িয়েছিল বারবারা ব্রাউন।
অপমানিত হয়ে দুচোখ ভরা আগুন নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল রক্সিও।
‘লাথির মাশুল শয়তানির কাছ থেকে সুদে-আসলেই তুলব স্যার’ বলেই সে ঝাঁপিয়ে পড়ল বারবারা ব্রাউনের উপর।
ছিটকে পড়ে গেল বারবারার দেহ। তার উপর আছড়ে পড়ল রক্সিও।
ঠিক এই সময় এক সাথে দুটি রিভলবারের গর্জন করে উঠার শব্দ ভেসে এল।
ঘরের দরজায় দাঁড়ানো দুই প্রহরী গুলী খেয়ে পড়ে গেল দরজার উপরেই।
বারাবারা ব্রাউনকে ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে রক্সি।
অ্যালেক স্টিভেন্সও রিভলবার বাগিয়ে উঠেছে চেয়ার থেকে।
এক ধরনের ভাইব্রেশন থেকে তাদের দুজনেরই মনে হলো, কেউ যেন পুরু কার্পেটের উপর দিয়ে দ্রুত ছুটে আসছে।
গুলী করেছে সেই কি?
দুজনেরই রিভলবারের নল দরজার দিকে ঘুরল দ্রুত।
উত্তর-পূর্ব ফিলাডেলাফিয়ার পার্কসিন খাড়ির উত্তরে পার্ক হ্যাভেন রাস্তার উপর এসে পৌঁছতে আহমদ মুসার কোনই অসুবিধা হলে না। কিন্তু মুস্কিলে পড়ল তারপর। বারবারা ব্রাউনের কম্পিউটার থেকে পাওয়ার ঠিকানায় বলা আছে, ‘৩৯, গার্ডেন রীচ, নর্থ অব পার্কসিন খাড়ি এন্ড সাউথ অব পার্ক হ্যাভেন রোড।’ এই নির্দেশিকা থেকে আহমদ মুসা বুঝেছে পার্কসিন খাড়ি থেকে উত্তরে এবং পার্ক হ্যাভেন রোড থেকে দক্ষিণে হবে গার্ডেন রীচ স্ট্রীটের ৩৯ নম্বর বাড়িটা। কিন্তু পার্ক হ্যাভেন রোড ও পার্কসিন খাড়ি দুটোই উত্তর-পুর্ব থেকে উত্তর-দক্ষিণে প্রলম্বিত। আহমদ মুসা বেছে বেছে পার্ক হ্যাভেন রোডের একটা বাঁক ঘুরে এমন জায়গায় এসে দাঁড়াল যেখান থেকে পার্কসিন খাড়ির অবস্থান সোজা দক্ষিণে।
এখন সোজা দক্ষিণে এগুবার একটা রাস্তা চাই।
সামনে তাকাল আহমদ মুসা। পার্ক হ্যাভেন রোড ও পার্কসিন খাড়ির মাঝের জায়গায় সবুজের সমুদ্র। গার্ডেন রীচ কি এলাকার নাম, না কোন রোডের নাম? এলাকা ও রোড দুয়েরই নাম হতে পারে,ভাবল আহমদ মুসা।
রাস্তার খোঁজ করতে গিয়ে সামনেই রাস্তা পেয়ে গেল আহমদ মুসা। দুপাশের সবুজ দেয়ালের মাঝখানে দিয়ে কংক্রিটের সাদা রাস্তাটা।
রাস্তাটার নাম দেখার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। রাস্তাটা দিয়ে তার গাড়ি চলতে শুরু করেছে। বাড়ির নাম্বার খুঁজতে হবে, তার সাথে রাস্তার নামও জানা যাবে, ভাবল আহমদ মুসা।
রাস্তার পাশে একটা বাড়ি থেকে পেয়ে গেল রাস্তার নাম। হ্যাঁ, এ রাস্তাই গার্ডেন রীচ।
নাম্বার ধরে এগিয়ে পেল ৩৭ নাম্বার বাড়ি। কিন্তু রাস্তা ধরে চারপাশ খুঁছে ৩৯ নম্বর বাড়ি পেল না, ৩৮ নম্বরও নয়। অনেক হয়রান হওয়ার পর ৩৭ নম্বর বাড়িতে নক করল আহমদ মুসা।
একটা কিশোরী এসে দরজা খুলে দিল। আহমদ মুসা সাদর সম্ভাষণ শেষে জিজ্ঞাসা করল ৩৯ নম্বর বাড়ি কোনটা।
কিশোরী হাসল। বলল, ‘কেন খুঁজে পাচ্ছেন না? এই তো কাছেই।’ বলে সে বর্ণনা দিতে যাচ্ছিল।
এই সময় ডুপ্লেক্স বাড়িটার দুতালা থেকে দুজন যুবক সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল। তাদের দৃষ্টি আহমদ মুসার দিকে। চোখে তাদের তীক্ষ্ণ অনুসন্ধান। তাদের একজন বলল, ‘জামি, কে উনি, কি চান?’
কিশোরীটি থেমে গেল। বলল, ‘ইনি ৩৯ নম্বর বাড়ি খুঁজছেন। আমি বাড়িটা চিনিয়ে দিচ্ছিলাম।’
‘চিনিয়ে দিয়েছ?’ তাদের একজন পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল।
‘না। বলছিলাম।’ বলেই কিশোরীটা আবার শুরু করল উৎসাহের সাথে।‘
‘থাম।’ কিশোরীকে কড়া ধমক দিয়ে দুজনের দ্বিতীয় জন বলল, ‘পাকামো আর করতে হবে না। যাও, তোমার আন্টিকে আনতে যাও। দেরি করে ফেলেছ। বস জানলে রক্ষা থাকবে না।’
কিশোরীটি মুখ কালো করে বেরিয়ে গেল দরজা দিয়ে বাইরে।
দরজা বন্ধ হয়ে যেতেই সেই লোকটি আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘৩৯ নম্বরে কার কাছে যাবে?
‘বিশেষ কারো কাছে নয়। যাকেই পাই চলবে। একটা খোঁজ জানতে এসেছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কি খোঁজ নিতে? কার খোঁজ নিতে?’ বলল দুজনের প্রথম জন।
প্রথম থেকেই ওদের মতলব আহমদ মুসা বুঝতে পেরেছে। ওরা ৩৯ নম্বর বাড়ির ঠিকানা কিশোরীকে বলতে দেয়নি। তাদের প্রশ্নের অর্থও হলো তারা আহমদ মুসাকে সন্দেহ করেছে। বাজিয়ে দেখতে চাচ্ছে তারা আহমদ মুসাকে। এর আরও অর্থ হলো, তারা ৩৯ নম্বরের সবকিছু জানে। হতে পারে এই ৩৭ নম্বর ৩৯ নম্বরেরই অংশ। কিশোরীর সাথে ওদের কথা বলার সময় ‘বস’ শব্দের উচ্চারণ এই সন্দেহের সাথে মিলে যায়।
ওদের প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘আমি ৩৯ নম্বর বাড়ির খোঁজ জানতে চেয়েছি। আপনারা উকিলের মত এসব কি জেরা শুরু করেছেন? জানলে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।
‘তুমি আমেরিকান নও। কোথায় বাড়ি তোমার?’ বলল ওদের দুজনের একজন।
আহমদ মুসা মনে মনে হাসল। ওদের আরেকটু এগুতে দেয়া দরকার, ভেবে নিল আহমদ মুসা।
‘ঠিক আছে, আমি একটা বাড়ির সন্ধানে এসেছিলাম, তোমাদের অহেতুক জেরার জবাব দেয়ার জন্যে নয়। আসি। বাই।’ বলে আহমদ মুসা বেরিয়ে আসার জন্যে ঘুরে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াবার সাথে সাথে একজন লাফ দিয়ে এসে পেছন থেকে আহমদ মুসার জ্যাকেটের কলার চেপে ধরল।
চিৎকার করে বলল, ‘কোথায় পালাচ্ছ! পরিচয় সন্তোষজনক হলে তবেই মুক্তি।’
আহমদ মুসা ঘুরল। ঘোরার সাথে সাথেই বাঁ হাতের এক প্রচন্ড কারাত চালাল লোকটির ঘাড়ে ঠিক কানের নিচে।
আহমদ মুসা যখন সম্পূর্ণ ঘুরে দাঁড়াল তখন লোকটি টলতে টলতে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল।
দ্বিতীয় লোকটি প্রথমটায় বিমুঢ় হয়ে পড়লেও মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়েছে। তারপর মুহূর্ত দেরি না করে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল আহমদ মুসার উপর।
চোখের পলকে আহমদ মুসা এক পাশে সরে দাঁড়াল। লোকটি আছড়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল মেঝের উপর।
আঘাত সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছিল লোকটি।
আহমদ মুসা তার দিকে রিভলবার তাক করে বলল, ‘আর উঠে লাভ নেই। তখন অনুরোধে বলনি, এবার অস্ত্রের মুখে বল ৩৯ নম্বর বাড়ি কোনটা। আর তোমরা কে?’
‘রিভলবার দেখিয়ো না। এখানে সবচেয়ে ছোট অস্ত্র যেটা সেটাই হলো সাব-মেশিন গান।’ বলল লোকটি নির্ভিকভাবে।
আহমদ মুসা তার কথার উত্তরে ট্রিগার টিপল। রিভলবারের একটা গুলী লোকটির কানের এক পাশ ছিঁড়ে নিয়ে গেল।
লোকটি আর্তনাদ করে তার কান চেপে ধরল।
‘দেখ আমার প্রশ্নের জবাব যদি এই মুহূর্তে না দাও, তাহলে দ্বিতীয় গুলী তোমার মাথা গুড়ো করে দেবে।’ বলল আহমদ মুসা ঠান্ডা গলায়। যা চিৎকারের চেয়েও ভীতিকর শোনাল।
লোকটি মাথা ঘুরিয়ে ভীত চোখে আহমদ মুসার দিকে তাকাল। আহমদ মুসার কথা এবার সে পুরোপুরিই বিশ্বাস করছে। মুখ খুলল সে। বলল, ‘স্যার এ বাড়ি থেকে দুশ গজ দক্ষিণে তিনতলা বাড়ি। ওটা ৩৯ নম্বর।
‘বারবারা ব্রাউনকে তোমরা কোথায় বন্দী করে রেখেছ?’ আবার সেই শান্ত, কিন্তু কঠোর কণ্ঠ আহমদ মুসার।
লোকটি দ্বিধা করছিল।
আহমদ মুসা তার তার দিকে রিভলবার তুলতেই বলল,‘স্যার ঐ বাড়িতেই তাকে রাখা হয়েছে।’
‘ঐ বাড়িতে এখন আর কে আছে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
লোকটি উত্তর না দিয়ে ভয়ে ভয়ে তাকাল আহমদ মুসার দিকে।
‘দেখ, তোমাকে আমি মারব না। কিন্তু যদি মিথ্যা বল, তাহলে ওখান থেকে ফিরে এসে মিথ্যা বলার শাস্তি তোমাকে দেব।’ বলল আহমদ মুসা।
‘স্যার ওখানে আমাদের বস আছেন। তাঁর সাথে রক্সি। আর গেটম্যানসহ তিনজন প্রহরী।’ বলল লোকটি।
‘বস কে? রক্সি লোকটা কে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘স্যার বস আমাদের অ্যালেক স্টিভেন্স। তিনি আমাদের ফিলাডেলাফিয়ার চীফ। আর রক্সি আমাদের অপারেশন টিম লিডার।’ বলল লোকটি।
‘এবার বল হাইম হাইকেলকে তোমরা কোথায় রেখেছ?’ বলেই আহমদ মুসা তার রিভলবার লোকটার মাথা তাক করল।
ভয়ে লোকটার মুখ পাংশু হয়ে গেল। বলল, ‘স্যার এটুকু জানি, কয়েকদিন আগে প্রাইভেট এক মানসিক হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া আমরা আর কিছু জানি না স্যার। শুনেছি, টপ কয়েকজন বস ছাড়া আর কেউ জানে না সেই হাসপাতালের নাম ঠিকানা।’ লোকটি কাঁপতে কাঁপতে কাতর কণ্ঠে বলল।
আহমদ মুসা তার কথা বিশ্বাস করল। বলল, ‘তুমি উঠ, তোমার সংজ্ঞাহীন সাথীকে নিয়ে চল সিঁড়ির পাশে ছোট ঘরটায়।’
লোকটি সঙ্গে সঙ্গেই নির্দেশ পালন করল। আহমদ মুসা দেখল ঘরটিতে কোন টেলিফোন নেই। দেখল তাদের সাথেও কোন মোবাইল নেই।
আহমদ মুসা পিছমোড়া করে ওদের হাত-পা বাঁধল এবং নাকে ওদের ক্লোরোফরম স্প্রে করে ওদের সংজ্ঞাহীন করল। তারপর ঘরটির দরজা বন্ধ করে ছিটকিনি লাগিয়ে এবং বাড়িটার মূল গেটও লক করে দিয়ে বেরিয়ে এল বাড়ি থেকে।
ঠিক দুশ গজ দূরেই তিনতলা বাড়ি পেয়ে গেল আহমদ মুসা। বাড়িটিতে কোন নম্বর নেই।
বাড়িটার গেটে একজন প্রহরী গেট বক্সে বসে ছিল। আহমদ মুসাকে গেটের দিকে আসতে দেখে সে গেট বক্স থেকে বেরিয়ে এগিয়ে এল গেটে। আসার সময় সে তার সাব মেশিনগান হাতে করে নিয়ে এসেছে।
আহমদ মুসা কিছু বলার আগেই সে বলে উঠল, ‘কি চাই, কাকে চাই আপনার?’
‘অ্যালেক স্টিভেন্স আমার বন্ধু। তিনি আমাকে ডেকেছেন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ওয়েলকাম স্যার। কিন্তু স্যার আপনাকে একটু বসতে হবে। আমি স্যারকে বলি।’ বলে সে আহমদ মুসাকে নিয়ে এল গেট বক্সের পাশের ওয়েটিং রুমে।
ওয়েটিং রুমে ঢুকে সে আহমদ মুসাকে বসাবার জন্যে একটা সোফা মুছে দিচ্ছিল।
আহমদ মুসা পকেট থেকে ক্লোরাফরম স্প্রে বের করে বলল, ‘স্যরি গেটম্যান, তোমাকে ঘন্টা দুই ঘুমিয়ে থাকতে হবে।’
আহমদ মুসার কথা শুনে চমকে দাঁড়িয়ে পড়ল গেটম্যান।
কিন্তু সে কথার বলারও সুযোগ পেল না। আহমদ মুসা তার নাকে স্প্রে করল সে উঠে দাঁড়াবার সঙ্গে সঙ্গেই।
সংজ্ঞা হারিয়ে ঢলে পড়ল গেটম্যান।
আহমদ মুসা তাকে তুলে সোফায় শুইয়ে দিল এবং দরজা লক করে বেরিয়ে এল।
বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল আহমদ মুসা। শুরুতেই বিশাল ড্রইংরুম। ড্রইংরুম থেকে উপর তলায় সিঁড়ি উঠে গেছে।
নিঃশব্দ বাড়ি।
কোন দিক থেকেই মানুষের কোন সাড়া শব্দ নেই।
তিন তলাই কি শেষ। না নিচে আন্ডার গ্রাউন্ডে আরও ফ্লোর আছে? আহমদ মুসা ভাবনায় পড়ে গেল। কোত্থকে কাজ শুরু করবে? উপরে গেলে নিচটা অরক্ষিত থাকে, আবার নিচে গেলে ওরা ওপর থেকে চলে যেতে পারে।
হঠাৎ আহমদ মুসার মনটা প্রসন্ন হয়ে উঠল। সে পিঠে ঝুলানো ব্যাগ থেকে সাউন্ড মনিটরের পার্টসগুলো বের করে সংযোজন করে নিল। যন্ত্রটি সাউন্ডের আল্ট্রা মনিটর। সিকি মাইল দূরত্ব পর্যন্ত এলাকার যে কোন শব্দ, যা দুগজ দূর থেকে মানুষ শুনতে পায়, এই যন্ত্র পরিষ্কারভাবে মনিটর করতে পারে। প্রয়োজন অনুসারে মনিটরিং এলাকা কমিয়ে আনা যায় এবং শব্দ মনিটরের ক্ষেত্রেও সিলেকটিভ হওয়া যায়।
আহমদ মুসা ৫০ ফিট রেঞ্জ দিয়ে মনিটরটি অন করতেই নারী কণ্ঠ ও পুরুষ কণ্ঠের বাদানুবাদ ভেসে আসতে লাগল এবং সে শব্দগুলো আন্ডার গ্রাউন্ড ফ্লোরের।
নারী কণ্ঠটি বারবারা ব্রাউনের তা শুনেই বুঝতে পারল।
আনন্দে মুখ উজ্জল হয়ে উঠল আহমদ মুসার।
মনিটরে শব্দের দিক নির্দেশক কাঁটা সিঁড়ির গোড়ার দিকে।
আহমদ মুসা এগুলো সিঁড়ির দিকে। ঠিক সিঁড়ির নিচে ৬ ফুটের মত একটা ল্যান্ডিং। ল্যান্ডিং থেকে একটা সিঁড়ি নিচে নেমে গেছে। সিঁড়ি মুখটা উন্মুখক্ত কেন ভেবে পেল না আহমদ মুসা। হতে পারে অ্যালেক স্টিভেন্সের অতি আত্নবিশ্বাসই এর কারণ। খুশি হলো আহমদ মুসা বাড়তি এই সুবিধা পেয়ে।
দুহাতে রিভলবার নিয়ে অতি সন্তর্পনে সিঁড়ি দিয়ে নামা শুরু করল আহমদ মুসা।
সিঁড়ির মাঝামাঝি পৌঁছতেই আন্ডার গ্রাউন্ড ফ্লোরটির একটা দৃশ্য তার নজরে এল। সে দেখতে পেল দক্ষিণ প্রান্তের একটা ঘরের সামনে সাব-মেশিনগান নিয়ে দুজন প্রহরী দাঁড়িয়ে আছে। ঘরটি দক্ষিণমুখী করিডোরটার মাথায়।
আহমদ মুসা যে সিড়িঁ দিয়ে নামছে, সেটার গোড়ায় লাউঞ্জ মত একটা বিরাট গোলাকার জায়গা। তার চারদিকে ঘিরে ঘর। লাউঞ্জ থেকে বিভিন্ন দিকে করিডোর চলে গেছে। সেরকম একটা পাশের এক ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সাব-মেশিনগানধারী প্রহরী দুজন।
আহমদ মুসা প্রহরীদের সর্ম্পকে কিছু ভেবে উঠার আগেই সে ওদের দুজনেরই নজরে পড়ে গেল। আর তখনই অসাধারণ ক্ষীপ্রতার সাথে তাদের সাব-মেশিনগানের ব্যারেল ঘুরে আসছিল তার দিকে।
আহমদ মুসা ওদের দেখার সাথে সাথে তার দুহাতের রিভলবারের নলও তাদের দিকে ঘুরে গিয়েছিল। সিদ্ধান্ত আহমদ মুসা এবার নিয়ে নিল। তার দুহাতের রিভলবার ওদের দুজনকে লক্ষ্য করে গর্জন করে উঠল।
গুলী খেয়ে ওরা দুজনই দরজার উপর পড়ে গেল।
গুলী করেই আহমদ মুসা কয়েক লাফে সিঁড়ির অবশিষ্টটা অতিক্রম করে মেঝেয় নেমে এল। সেই একই দৌড়ে সে ছুটল ঘরটির দিকে।
৩৭ নম্বর বাসার ওদের তথ্য অনুসারে এখন অ্যালেক্স ও রক্সিই মাত্র অবশিষ্ট আছে। আহমদ মুসা ওদের দুজনকে এক সাথেই পেতে চায়। দুজন ভিন্ন অবস্থানে যাবার সুযোগ পেলে সে অসুবিধায় পড়তে পারে।
আহমদ মুসা দরজার দিকে দৌড়ে যেতে যেতে ভাবল, তার মুখোমুখি হলে, বিপদে পড়লে ওরা মিস ব্রাউনকে ঢাল বানাতে পারে। সেই সুযোগ ওদের দেয়া যাবে না। আকস্মিকভাবে ওদের উপর চড়াও হতে হবে। ওরা অস্ত্র বাগিয়ে আছে নিশ্চয় এবং তারা দাঁড়িয়ে থাকাই স্বাভাবিক। সুতারাং দেখার সঙ্গে সঙ্গে ওরা গুলী করতে পারে। দেখতে হবে ওদের এই তাৎক্ষণিক গুলী যাতে লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়। তাৎক্ষণিক গুলী না করে ওরা যদি টার্গেট ঠিক করতে যায়, তাহলে আহমদ মুসার দুই রিভলবারের গুলী তাদের সে সুযোগ দেবে না।
এইভাবে চিন্তা গুছিয়ে নিয়ে আহমদ মুসা শিকারী বাঘের মত নিঃশব্দে দৌড়ে গিয়ে দরজার পাশে একটু থমকে দাঁড়িয়ে দুহাতের রিভলবারকে দরজার দিকে উদ্যত রেখে দেহকে ছুঁড়ে দিল দরজায় পড়ে থাকা দুটি লাশের পেছনে। তার দেহের বাম পাঁজর গিয়ে মাটিতে পড়ল।
তার দেহ মাটি স্পর্শ করার আগেই এক ঝাঁক গুলী চলে গেল তার তিন ফিট উপর দিয়ে।
মাটি স্পর্শ করার সাথে সাথেই আহমদ মুসার দুই তর্জনী ট্রিগার টিপল দুই রিভরবারের।
পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিল অ্যালেক স্টিভেন্স ও রক্সি। তাদের পেছনে বলতে গেলে মাটি কামড়ে শুয়েছিল বারবারা ব্রাউন।
আহমদ মুসা নিক্ষিপ্ত দুগুলীর একটি গিয়ে বিদ্ধ হয়েছিল অ্যালেক স্টিভেন্সের বুকে, অন্যটি মাথা গুড়িয়ে দিয়েছিল রক্সির।
নতুন টার্গেট লক্ষ্যে ওরা সাব-মেশিনগানের ব্যারেল নামিয়ে নিচ্ছিল। কিন্তু টার্গেটে গুলী করার সুযোগ তারা আর পেল না।
দুজনের লাশ গিয়ে বারবারা ব্রাউনের পাশেই পড়েছে।
আতংকিত বারবারা ব্রাউন উঠে দাঁড়িয়ে লাশের কাছ থেকে দূরে সরে গেছে। কাঁপছে সে।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
বারবারা ব্রাউনের উপর চোখ পড়তেই চোখ নামিয়ে নিল সে। তাড়াতাড়ি সে নিজের জ্যাকেটটি খুলে না তাকিয়েই ছুড়ে দিল বারবারা ব্রাউনের দিকে। বলল, ‘আপনি তো ঠিক আছেন মিস ব্রাউন?’
বারবারা ব্রাউন দুহাত দিয়ে তার দেহের প্রায় নগ্ন উর্ধদেশ ঢাকার ব্যার্থ চেষ্টা করছিল। সে আহমদ মুসার ছুঁড়ে দেয়া জ্যাকেটটি কুড়িয়ে নিল। পরে ফেলল দ্রুত। তারপর বলল, ‘ভাল ছিলাম বলতে পারব না। তবে আপনি পৌঁছতে আর কয়েক মিনিট দেরি করলে আমার এক মৃত্যু ঘটত। আপনি আমাকে বাঁচিয়েছেন।’ বলে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল বারবারা ব্রাউন। কাঁদতে কাঁদতেই সে বাধো বাধো গলায় বলল,‘আপনি মানুষ নন, ফেরেশতা মি. দানিয়েল। আপনি ঠিক সময় এসেছেন।
‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দাও বোন। তিনি আমাদের সাহায্য করেছেন।’ বলল আহমদ মুসা। দ্রুত ঘরে ঢুকে অ্যালেক স্টিভেন্স ও রক্সিকে সার্চ করল। মানিব্যাগ ছাড়া পকেটে আর কিছুই পেল না। মানিব্যাগে টাকা পয়সা ছাড়া আর কোন কাগজপ্রত্র নেই।
টাকা ভর্তি মানিব্যাগগুলো ওদের পকেটে আবার রেখে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘এস মিস ব্রাউন, বাড়িটাকেও একবার সার্চ করে দেখি।
আহমদ মুসা ঘর থেকে বাইরে বেরুবার জন্যে পা বাড়াল।
পেছনে পেছনে হাঁটতে লাগল বারবারা ব্রাউন।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now