বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
পদ্ম বলল, ছোটবেলায় একবার রিকশায় হুড ধরে বসেছিলাম। হঠাৎ ধুম করে হুড পড়ে গেল। আঙুলে প্রচণ্ড ব্যথা পেলাম। একটা আঙুল ভেঙে গিয়েছিল। এর পর থেকে আমি রিকশার হুড ধরতে পারি না। রিকশায় উঠলেই ভয়ে আমার দম বন্ধ হয়ে যায়।
তোমাকে দেখে তো মনে হচ্ছে না তোমার ভয়ে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
পদ্ম বলল, আপনি সঙ্গে আছেন, তাই ভয় পাচ্ছি না। যখন আমি পড়ে যাব তখন নিশ্চয় আপনি আমাকে ধরবেন। ধরবেন না?
পদ্ম কথা শেষ করার পরপরই রিকশা থেকে গড়িয়ে পড়ে গেল। প্রথমে পড়ল পাটাতনে, সেখান থেকে রাস্তায়। তার বাঁ পায়ের ওপর দিয়ে রিকশার চাকা চলে গেল। আমি রাস্তা থেকে তাকে টেনে তুললাম। পদ্ম বলল, দেখুন, আইসক্রিম ঠিক আছে। আমি ভেবেছিলাম আইসক্রিম হাত থেকে ছিটকে পড়বে।
ব্যথা পেয়েছ?
পেয়েছি। পায়ের ওপর দিয়ে রিকশা চলে গেল, রিকশায় আপনি বসা, ব্যথা পাব না! তবে ব্যথার চেয়ে মজা বেশি পেয়েছি।
মজা পাওয়ার কী আছে?
মজা পাওয়ার কী আছে সেটা আরেক দিন আপনাকে বলব।
পদ্ম ব্যথা ভালোই পেয়েছে। সে ঘরে ঢুকল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। পদ্মর মা আতঙ্কিত গলায় বলছেন, তোর কী হয়েছে?
পদ্ম বলল, ট্রাকড্রাইভারের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছিল, এটা ওনাকে বললাম। উনি রেগে গিয়ে ধাক্কা দিয়ে আমাকে রিকশা থেকে ফেলে দিলেন। মা, তুমি বলেছ না আলাদা আলাদা রিকশা নিতে? আমি একটা রিকশা নিলাম, উনি লাফ দিয়ে সেই রিকশায় উঠলেন। রাস্তায় তো আমি এই নিয়ে হইচই করতে পারি না।
পদ্মর মা কঠিন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি তাকিয়ে আছি পদ্মর দিকে। পদ্মর চেহারা স্বাভাবিক। এতই স্বাভাবিক যে একপর্যায়ে আমার মনে হলো, আমি হয়তো সত্যিই পদ্মকে ধাক্কা দিয়ে রিকশা থেকে ফেলেছি।
তুমি আমার মেয়েকে রিকশা থেকে ফেলে দিয়েছ?
আমি বললাম, হুঁ।
তোমার এত বড় সাহস?
আমি বললাম, আমাদের দুজনের মধ্যে আরগুমেন্ট হচ্ছিল। পদ্ম বলছে, পৃথিবীতে ডিম আগে এসেছে। ডিম থেকে মুরগি। আমি বলছি, প্রথম এসেছে মুরগি, তারপর ডিম। তর্কের এক পর্যায়ে হাতাহাতি শুরু হলো। তারপর দুর্ঘটনা।
এসিড-মাতা মেয়ের দিকে তাকালেন। পদ্ম মুখ গম্ভীর করে বলল, তর্কে উনি হেরে গিয়ে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলেছেন। এই বিষয়ে তোমাকে কিছু করতে হবে না, মা। আমি শোধ নেব। আমার স্যান্ডেল এখনো কেনা হয়নি। একদিন স্যান্ডেল কিনতে ওনাকে নিয়ে যাব। তারপর ধাক্কা দিয়ে রিকশা থেকে ফেলে দেব।
এসিড-মাতা মেয়েকে নিয়ে ঘরে ঢুকে গেলেন। তাদের ঘরের দরজা খোলা, সেখানে বারো-তেরো বছরের নির্বোধ চেহারার এক বালিকাকে ঝাঁটা হাতে দেখা যাচ্ছে।
বালিকার নাম মরি। মরিয়ম থেকে মরি। কাজের মেয়েদের দীর্ঘ নামে ডাকা সময়ের অপচয় বলেই মরিয়ম হয়েছে মরি।
মরি পদ্মদের বাড়িতে আগে কাজ করত, এখন আবার যুক্ত হয়েছে। পদ্মর মা তাঁর সংসার গুছিয়ে নিতে শুরু করেছেন। ভ্যানে করে একদিন একটা নতুন ফ্রিজ চলে এল। মিস্ত্রি এসে ফ্রিজ পদ্মদের শোবার ঘরে সেট করে দিল। পদ্ম আমাকে এসে বলল, আপনার ঠান্ডা পানি খেতে ইচ্ছা হলে আমাকে বলবেন। ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানি খেতে দেব।
আচ্ছা বলব।
আমি যে খুব ভালো রাঁধতে পারি তা জানেন?
না।
আমাদের নিজেদের রান্নাঘর হোক, আপনাকে রেঁধে খাওয়াব।
তোমাদের আলাদা রান্নাঘর হচ্ছে নাকি?
মা বলছে, হবে। যেদিন রান্নাঘর প্রথম চালু হবে, সেদিনই আপনাকে স্পেশাল একটা আইটেম খাওয়াব। আইটেমটার আমি নাম দিয়েছি ‘সালামত ডিলাইট’। ও এই আইটেম খুব পছন্দ করে বলে ওর নামে নাম। আপনিও যদি পছন্দ করেন তাহলে নাম বদলে দেব ‘মনজু সালামত ডাবল ডিলাইট’। নাম সুন্দর না?
হুঁ।
আমার লাগবে বাংলাদেশের মাশরুম। এই মাশরুম চাক চাক করে কেটে গোলমরিচ-লবণ দিয়ে বেসনে চুবিয়ে ডুবোতেলে ভাজা হবে।
পদ্ম মিটমিট করে তাকাচ্ছে। তার চোখের ভাষা পড়তে পারছি না। খানিকটা অস্বস্তি লাগছে। পদ্মর চোখের ভাষা পড়াটা জরুরি কেন বুঝতে পারছি না।
বাবা আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। পারিবারিক জরুরি মিটিং না বলে মনে হচ্ছে। পারিবারিক মিটিংয়ে ভাইয়া উপস্থিত থাকত। তাকে ডাকা হয়নি। এমনও হতে পারে যে বাবা তাকে পরিবার থেকে বের করে দিয়েছেন।
বাবা বললেন, পদ্মর মা একটা নতুন ফ্রিজ কিনেছেন বলে শুনলাম।
আমি বললাম, হুঁ। আট সিএফটির ফ্রিজ। লাল রং। স্যামসাং কোম্পানি।
এত বিস্তারিত শুনতে চাচ্ছি না। অল্প কথায় মনের ভাব প্রকাশে অভ্যাস করো। হড়বড় করে দুনিয়ার কথা বলার কিছু নেই।
জি, আচ্ছা।
ওই মহিলা কি স্থায়ীভাবে থাকার পরিকল্পনা করছে?
জি। তাদের আলাদা কাজের মেয়ে চলে এসেছে। নাম মরি। মরিয়ম থেকে মরি। শুনেছি তাদের আলাদা রান্নাঘরও হবে।
তোমার কি মনে হয় না যে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন?
কী ব্যবস্থা?
ব্যবস্থা একটাই—ঘাড় ধরে মা-মেয়েকে বের করে দেওয়া। তবে আমরা সিভিল সোসাইটিতে বাস করি। ইচ্ছা থাকলেও অনেক কিছু করা সম্ভব না।
আমি বললাম, সম্ভব হলেও করা ঠিক হবে না। পদ্মর মায়ের কাছে নীল রঙের বোতলে ভর্তি এসিড আছে। এসিড ছুড়ে একটা কাণ্ড করে বসতে পারেন।
এসিডভর্তি বোতল?
জি, বাবা।
বাবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, তোমার ভাইয়াকে বলো একটা ব্যবস্থা করতে। যে কাঁটা বিঁধিয়েছে, তারই দায়িত্ব কাঁটা বের করা। তোমার ভাইকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেছিলাম। সে যাচ্ছে না কেন?
অমাবস্যার জন্যে অপেক্ষা করছে। প্রথম অমাবস্যাতেই ঘর ছাড়বে। গৌতম বুদ্ধ পূর্ণিমাতে গৃহত্যাগ করেছিলেন, ভাইয়া করবে অমাবস্যায়। উনি নতুন এক ধর্ম প্রচার করবেন। ধর্মের নাম রগট ধর্ম। তিনটি মূলনীতির ওপর এই ধর্ম দাঁড়িয়ে আছে। নীতিগুলো বলব, বাবা?
বাবা অদ্ভুত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। বাবার চোখের ভাষাও আমি পড়তে পারছি না।
চলবে....
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, মে ২৭, ২০১১
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now