বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আমি জুনিয়র
- কিশর পাশা ইমন
ভার্সিটির পাশের টং-এ বসে চা-সিগারেট খাচ্ছিল ফরহাদরা ।
শাহরিয়ারই খেয়াল করে প্রথমে ব্যাপারটা ।
‘দোস্ত, রাস্তার ওইপাশের পোলাটারে দ্যাখ ! সিগারেটে জোশের সাথে টান মারতে মারতে আমাদের দিকে স্ট্রেইট তাকায়া আছে! এই পোলারে আমি চিনি । ফার্স্ট ইয়ারের ।’
‘কস কি !’ ফরহাদের মেজাজ লাফ দেয় ওপরের দিকে, ‘র্যাগিং কি জিনিস বুঝে নাই তাইলে এখনও ! ডাক এদিকে বেয়াদবটাকে ।’
‘আরে বাদ দে না তোরা !’ মৃদু আপত্তি তোলে নীরা ।
নীরাকে অগ্রাহ্য করে হাত তুলে হালকা ইশারা করে শাহরিয়ার ।
ফরহাদরা সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র-ছাত্রী । মাত্র কয়েকদিন হল নতুন ব্যাচের ক্লাস শুরু হয়েছে । র্যাগিং- কি জিনিস রাস্তার ওপাড়ের ছেলে হয়ত টের পায় নি – কিন্তু হামেশাই সেটার প্রয়োগ করতে পেরে গত কয়েকটা দিন অসাধারণ কাটছে সেকেন্ড ইয়ারের ছেলেদের ।
চায়ের দোকানের বিল মিটিয়ে ধীর পায়ে এদিকে আসতে থাকে ফার্স্ট ইয়ারের ‘বেয়াদব’টা । হাতে সিগারেট জ্বলছে এখনও । মনে মনে খুশি-ই হয় ফরহাদ, র্যাগিওমিটারের কাঁটা আরও কয়েক ডিগ্রী বাড়িয়ে দেয় মনে মনে ।
‘আমাকে ডাকলেন নাকি, ভাইয়া ?’ কাছে এসে রাজ্যের কৌতুহল চোখেমুখে ফোটায় ছেলেটা ।
‘কোন ব্যাচ?’ থমথমে মুখে জানতে চায় ফরহাদ ।
‘ ’13[২০১৩ HSC] ।’ সিগারেটে উদাস ভঙ্গীতে টান মারে ও ।
‘কি নাম ?’ থমথমে ভঙ্গী বাড়ায় ফরহাদ ।
‘তুর্য । আপনি ?’
‘আমি ফরহাদ । আমাকে দেখে কোন ব্যাচ মনে হয়?’
‘’12 , সম্ভবতঃ ?’ সিগারেটে আরেক টান দিয়ে মনোযোগ দিয়ে ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে আকাশ দেখে তুর্য ।
‘সিনিয়র ভাই জানার পরও সামনে সিগারেট খাচ্ছ – সরাসরি তাকিয়ে আছ – নিজেকে ওভারস্মার্ট মনে কর ?’
‘না । তাছাড়া – আপনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম না, ভাইয়া ।’
‘তাহলে কি দোকানদার মামারে দেখতেছিলা? ’ রাগের ঠেলায় উঠেই পড়ে শাহরিয়ার ।
‘না ভাইয়া । উনাকে দেখছিলাম ।’ চমকে ওঠা নীরার চোখের দিকে তাকায় তুর্য ।
এবার আর মাথা ঠিক রাখতে পারে না ফরহাদ । উঠে একদম গা ঘেষে দাঁড়ায় তুর্যের ।
‘আবার বল তো শালা !’ ‘তুমি’ থেকে এক লাফে ‘তুই’ এ নেমে গেল ফরহাদ ।
সরে এসে নীরার সামনে দাঁড়ায় তুর্য, ‘আপনার চোখ আর চুল অনেক সুন্দর । না তাকিয়ে থাকতে পারিনি, দুঃখিত । আমি তুর্য । আপনার নামটা জানা হল না ।’
পাশ থেকে আহত বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়ে ফরহাদ । তুর্য ধাক্কা সামলাতে পারেনা । ছিটকে পড়ে মাটিতে । ওর ওপর এসে পড়ে ফরহাদ । হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে ও রাগে । একের পর এক ঘুষি মারে তুর্যের মুখে ।
কেউ ঠেলে সরিয়ে দেয় ওকে । তাকিয়ে নীরার রাগত মুখটা দেখতে পায় ফরহাদ ।
‘দিস ইজ টু মাচ’ চিৎকার ছাড়ে নীরা ।
‘সর তুই । শালাকে রেসপেক্ট শিখাতে দে !’ রাগে ফোঁস ফোঁস করে ফরহাদ ।
‘একটা বাচ্চা ছেলেকে এভাবে মারিস ! আমার সামনে থেকে সর তুই ! তোর চেহারা দেখাবি না আর আমাকে ! ’
হতভম্ভ হয়ে তাকায় ফরহাদ । ততক্ষণে লোক জমে গেছে চারদিকে ।
আস্তে করে উঠে বসে তুর্য । থুতু ফেলে রাস্তায় । অনেকটুকু রক্ত বেরিয়ে আসে তার সাথে ।
‘তুমি আমার সাথে আসো । ফার্স্ট এইড দরকার তোমার ।’ তুর্যকে ধরে টেনে তোলে নীরা ।
আলতো করে নীরার হাতটি ছাড়িয়ে নেয় তুর্য । ‘ইটস ওকে ।’
ফরহাদের মুখোমুখি দাঁড়ায় ও । ‘ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিন । সিনিয়রদের প্রতি রেসপেক্ট জিনিসটা কিছুটা আছে । তবে আজ থেকে আপনার প্রতি আর থাকল না ।’
‘শালা আবার আমাকে থ্রেট দিস - ’ বলতে বলতে আবারও তুর্যের মুখ লক্ষ্য করে হাত ছোঁড়ে ফরহাদ ।
বিদ্যুতবেগে রিঅ্যাক্ট করে তুর্যও । ফরহাদের হাত ধরে দ্রুত কয়েক জায়গা ছুঁয়ে দেয় ও ।
ঘুরে দাঁড়িয়ে একটা রিকশা থামায় ও । অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নীরা ।
হাত নড়ানোর চেষ্টা করে ব্যার্থ হয় ফরহাদ । অবশ হয়ে গেছে ওর ডানহাত ।
*
পরের দিন ।
ক্লাস থেকে বেরিয়ে নীরা দেখল দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তুর্য ।
‘আপনার দুই মিনিট সময় হবে ?’ বিনীত গলায় জানতে চায় ও ।
তুর্যের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে নীরা । স্টীচ লাগানো ঠোঁটের পাশে ।
‘তুমি কি পাগল ?’ পালটা প্রশ্ন করে নীরা । ‘একটা ভার্সিটিতে তোমাকে চারটা বছর থাকতে হবে ! সিনিয়ররা সবাই তোমার ওপর ক্ষ্যাপা । মানি – তোমার সাহস আছে । কিন্তু টিকতে পারবা এরকম অ্যাটিচ্যুড নিয়ে চললে ?’
‘ও নিয়ে ভাববেন না ।’ হাসে তুর্য । ওর হাসিটা সুন্দর । ‘কিন্তু গতকাল আপনার নামটা জানা হয়নি ।’
‘আমি নীরা । নাম জেনেছ – প্রাণে শান্তি লেগেছে এবার তোমার ?’ রাগ করতে যেয়েও পারে না নীরা । ‘তোমাকে একটা ভালো বুদ্ধি দেই – ফরহাদকে গিয়ে সরি বলে আসো । ছোটখাট র্যাগিং সহ্য করে নাও – সব ঠিক হয়ে যাবে । নাহলে সত্যি বলছি – তোমার কপালে যথেষ্ট খারাবি আছে ।’
‘অন্যায় করলে তো সরি বলব !’ খুব মজার কিছু বলেছে নীরা এভাবে হাসে তুর্য । ‘আপনাকে কিন্তু আমি আপু-টাপু ডাকতে পারব না । মাইন্ড করবেন না আশা করি – কারণ করলেও কিছু করার নেই । আসি, নীরা । দুই মিনিট দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ আপনাকে ।’
‘কি ভয়ানক ! সিনিয়র আপুর সাথে এভাবে কথা বল তোমার ভয় করে না ?’ রাগতে যেয়ে এবার হেসেই ফেলে নীরা । ‘কোথায় যাও ? তোমার ক্লাস নাই?’
‘না । ভাইয়ারা হলে ডাকল । কালকের ব্যাপারের জন্য । দেখি কি বলে ! ওখানে যাচ্ছি ।’
আৎকে ওঠে নীরা । ‘তুর্য, লক্ষী ভাই আমার – ওখানে গিয়ে এরকম সাহস দেখিও না ! স্রেফ দুই টুকরো করে ফেলবে !’
‘ধ্যাৎ ! রাখো তো । ছাই করবে আমার ।’
‘পাগলামি রাখো ! ওইখানে অন্তত ভদ্রভাবে কথা বলে আসো । অনুরোধ করছি তোমাকে ।’
‘এত ভীতু কেন তুমি ?’ হাসে ছেলেটা । ‘তোমার ল্যাব আছে ! দেরী কর না ।’
হেঁটে চলে যায় তুর্য । তার গমনপথের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে পড়ে তার – আরে! ওর শিডিউল তুর্য জানে কি করে?
কিন্তু তুর্য যে ‘আপনি’ থেকে ওকে ‘তুমি’ করে বলা শুরু করেছে – সেটা খেয়ালই করে না নীরা ।
*
কামরুজ্জামান হল ।
৪০৮ নম্বর রুম ।
ছাত্রলীগের সভাপতি সিরাজের সামনে দন্ডায়মান তুর্য । সিরাজ ফোর্থ ইয়ারে । ফরহাদের আপন বড় ভাই ।
রুমে আরও সাতজন সিনিয়র ভাই থাকলেও চোখেমুখে ঘাবড়ে যাওয়ার কোন লক্ষণই নেই তুর্যের ভেতরে ।
‘বাড়ি কই তোমার?’ সিরাজ মুখ খুলল কি মেঘ গর্জন করল ঠিক বোঝা গেল না ।
‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া ।’
‘বাবা কি করে ?’
‘প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষকতা ।’
‘তারপরও আদব-কায়দা কিছু শেখ নাই? সিনিয়র ভাইয়ের সামনে সিগারেট খাও ! আপুদের সাথে টাংকি মারো !’
‘ভাইয়া – সিগারেট খাওয়ার মধ্যে বেয়াদবীর কি আছে ? আমরা কি বড় ভাইদের সামনে চা খাই না? ভাইয়ারা সামনে দিয়ে গেলে কি চা মাটিতে ফেলে দিয়ে সম্মান দেখাই ?’ পালটা প্রশ্ন করে তুর্য ।
এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায় সিরাজ । ছেলের কথায় যুক্তি আছে । সিগারেটের কি এমন দোষ যে একে ফেলে দিয়ে সম্মান দেখাতে হবে ? এই ছেলের মধ্যে কিছু একটা আছে । ভয়-টয় পাবে না । পালটা কি বলে ফেলে জুনিয়রদের সামনে হাসির পাত্র করে ফেলবে ।
‘বুঝলাম তোমার দৃষ্টিভঙ্গী ।’ মেনে নেওয়ার ভঙ্গী করে সিরাজ । রুমের এক প্রান্তে অসন্তোষের নিঃশ্বাস ছাড়ে ফরহাদ, ‘তাই বলে আপুদের সাথে টাংকি? সিগারেট নাহয় ছেড়ে দিলাম । আপুদের ফ্লার্ট করে বেড়াচ্ছ শুনলাম । সেটা খুবই প্রশংসাজনক কাজ বলতে চাও তো ?’
‘নীরাকে আমার ভালো লাগে ।’ আবারও লাফিয়ে উঠে ফরহাদ । হাতের ইশারায় তাকে বসিয়ে দেয় সিরাজ । বলে চলে তুর্য, ‘ভালো লাগার কথা সামনাসামনি বলে ফেলাটাই সত্যিকারের পুরুষের কাজ বলে মনে হয় আমার । বন্ধুত্বের আড়াল নিয়ে তুই-তোকারি করে কথা বলে ভালো লাগার ব্যাপারটা অস্বীকার করে থাকার মাঝে কোন কৃতিত্ব দেখি না ।’
দ্বিগুন উৎসাহে লাফিয়ে ওঠে ফরহাদ । কিন্তু বড় ভাইয়ের ইশারায় আবারও বসে পড়তে হয় তাকে ।
‘সিনিয়র ভাইয়ের গায়ে হাত তুলতেও বাধে নি তোমার ...’
‘ওহ – ওটা সেলফ ডিফেন্স ছিল ভাইয়া । নাক মুখ সমান করে ফেলতে থাকলেই যে সমান করতে দিতে হবে তা তো নয় । রিফ্লেক্স জিনিসটা সেলফ ডিফেন্স করতই ।’ আঙ্গুল দিয়ে স্টীচ দেখায় তুর্য । ‘নাহয় এরকম আরও আধ-ডজন লাগাতে হত । থ্যাংক্স টু হিম ।’
‘শোন ছেলে - ’ মুখ খোলে সিরাজ । ‘তোমার সাহসিকতা আর সোজাসাপ্টা দৃষ্টিভঙ্গীতে আমি মুগ্ধ । কিন্তু একটা ব্যাপার তোমাকে মাথায় রাখা লাগবে – বেশির ভাগ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গীর ওপরেই ম্যানার জিনিসটাকে বিবেচনা করা হয় । পর্ণোগ্রাফি জিনিসটা পর্ণস্টারদের কাছে খারাপ না । তাই বলে সেটা সমাজে চালাতে চাইলেই তো হবে না, তাই না?’
মনে মনে আটটা পয়েন্ট দেখতে পায় তুর্য – তার আচরণের সাথে ভাইয়ার কথার অমিল ওগুলো । কিন্তু আর কথা বাড়ায় না । সবার সামনে স্ট্রেইটফরোয়ার্ড হয়ে ক্ষেপিয়ে লাভ নেই । তাছাড়া এই ভাইয়া ওকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে । ফরহাদ বেকুবটার মত না ।
‘মাত্র নতুন একটা ভার্সিটিতে আসছ – ভুল ত্রুটি হয়ে যায় দুই তরফ থেকেই । এগুলো ভুলে যেতে হয় । তুমি ছেলেটা খারাপ না । নাহলে এত কথা বলার কিছু ছিল না । তোমার 12 এর ভাইয়াদের কাছেই ছেড়ে দিতাম । কিন্তু তোমার ক্যারেকটারটা ইন্টারেস্টিং । আশা করি যে সম্মানটা তোমাকে দিচ্ছি আমি – সেটার মর্যাদা তুমি রাখবে । আর ভাইয়ারাই দেখবা সব বিপদে সবার আগে উপস্থিত হবে । ভার্সিটিটা একটা ফ্যামিলির মত । থাকো – আস্তে আস্তে বুঝবা নিজেই ।’ হাত বাড়ায় সিরাজ, ‘আমি সিরাজ, মেকানিক্যাল 10’
‘ধন্যবাদ ভাইয়া ।’ হাত মেলায় তুর্য । ‘অপ্রীতিকর কিছু শোনা লাগবে না আর আশা করি আপনাকে ।’
‘অ্যাই তোরা কোলাকুলি কর ।’ ফরহাদকে বলে সিরাজ । ‘ফ্যামিলিতেও ভাই-ভাইয়ের মিলে না সব সময় ।’
বর্জ্র্য আটুনি দিয়ে কোলাকুলি করেই ঝাল মেটাতে হয় বেচারা ফরহাদকে ।
*
‘নীরা !’
লেডিস হোস্টেলের গেট দিয়ে ঢুকতে যেয়েও শব্দের উৎসের দিকে মাথা ঘোরাতে বাধ্য হয় নীরা । পাগল টাইপ জুনিয়র ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে গাছের সাথে হেলান দিয়ে । সাদা টি-শার্টের সাথে নীল জিন্সে অসম্ভব সুন্দর লাগছে তুর্যকে ।
‘কিছু বলবে?’ সিনিয়র-ভাবটা গলায় ফুটিয়ে তুলতে গিয়েও ব্যর্থ হয় নীরা ।
‘আমি এক অসহায় জুনিয়র ।’
কিছুটা ঘাবড়ায় নীরা । পাগলটা কি বলতে কি বলে কোন ঠিক নাই ! সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তুর্যের দিকে ।
‘ফিজিক্সের চোথা লাগবে । যদি কিছু রেখে থাকো এখনও ।’ অবলীলায় ওকে তুমি করেই বলে তুর্য ।
‘তোমার ভাইয়াদের কাছে নাই? আমার কাছে কেন?’
‘ভাইয়াদের কাছে গেলে তো তোমাকে দেখার বোনাসটা পাব না ।’ অকপটে স্বীকারও করে তুর্য ।
ওর সাহস দেখে শুধু অবাকই হয় নীরা । কিন্তু আশ্চর্য – রাগ উঠে না একটুও ।
‘বিকেলের দিকে আসো তাহলে ।’ কেন যেন রাজি হয়েও যায় নীরা ।
‘ক্যাম্পাসের বাইরে ?’ ব্যাপক আশা নিয়ে জানতে চাইল তুর্য ।
‘না । এই গেইটেই ।’ বেচারার আশাতে পানি ঢেলে দেয় নীরা । ‘তোমার সমস্যা কি? এত এক্সট্রোভার্ট কেন?’
‘উপরওয়ালার দান ।’ মোবাইল বের করে তুর্য, ‘নাম্বার তো দাও । আমি গেইটে আসার পর যদি তোমার মনে না থাকে ?’
‘জ্বী না । আমার মনে থাকবে । আমি তো আসব না । দুপুরের মাঝেই মামাকে দিয়ে যাব । এসে আমার নাম বললেই দিয়ে দেবে ।’
ভেতরে ঢুকে যায় নীরা । আশা ভঙ্গের বেদনা নিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় তুর্য ।
*
দেখতে দেখতে একটা বছর ঠিকই পেরিয়ে যায় ।
জুনিয়র – সিনিয়র প্রেম-প্রেম গন্ধ ক্যাম্পাসে রীতিমত সাড়া ফেলে দেয় । চায়ের কাপে ঝড় তুলতে তুলতে মাঝে মাঝে তুর্য – নীরার নাম নেওয়া হয় না তা নয় । যদিও নীরা তার দূরত্ব অটুটই রাখে ।
এর মাঝে ফরহাদ নীরাকে প্রপোজ করে । এককথায় নাকচ করে দেয় নীরা ।
তুর্যের সাথে সেদিনের করা ব্যবহারের পর থেকে আসলেই ফরহাদের সামনে পড়ে নি কখনও ও।
সবচেয়ে বেশি বিরক্ত থাকে নীরার বান্ধবীরা ।
‘তুই এখনও ওকে পাত্তা দিস কেন আমি সেটাই বুঝি না।’ ভ্রু কুঁচকে বলে মালিহা ।
মালিহার সম্পূর্ণ সাপোর্ট দেয় রিয়া । ‘একদম ঠিক বলেছিস । আমি হলেও কান ধরে টেনে দুইটা থাপ্পড় লাগাতাম । পরের দিন থেকে রীতিমত আপু-আপুন্নি শুরু করত।’
‘ওর অনেক সাহস দোস্ত । এই জিনিসটা আমার ভালো লাগে। তাই কিছু বলি না । আমার মনে হয় ওর এই সাহসটা ভালো কোন কিছুর জন্যই আল্লাহ ওর ভিতরে পাঠিয়েছেন । নিরুৎসাহিত করতে ইচ্ছে করে না রে।’
‘নিজেকে ফ্রাংকেনস্টাইনের স্রষ্টা ভাবা শুরু করেছিস দেখি একেবারে ।’ নাক কোঁচকায় মালিহা ।
লেডিস হোস্টেলের সামনের গাছটার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীরা । দুই সপ্তাহ ধরে তুর্য আসে না এখানে ।
মাঝে মাঝেই ছোটখাট সাহায্য চাওয়ার জন্য এখানে এসে দাঁড়িয়ে থাকত ও ।
নীরা বুঝত শুধু ওকে একটু দেখার জন্যই ওখানে আসত ও ।
আড় চোখে একে অন্যের দিকে তাকায় মালিহা আর রিয়া ।
‘মামাকে বলে দিয়েছিলাম ছেলেদের যাতে বাউন্ডারীর আশেপাশে দাঁড়াতে না দেয় ।’ যেন রিয়াকে কথার কথা বলছে এভাবে জানায় মালিহা ।
একটা দীর্ঘশ্বাস চাপে নীরা ।
*
‘ওমা এইটা তো পুরাই Wall E !!’, এক মেয়ে খুশিতে হাততালি দেয় ।
‘কথা বল ! কথা বল !! কথা বলতে পারিস না ?’ আরেক মেয়ে ‘বস্তু’টাকে প্রশ্ন করে যায় ।
‘অ্যাই তোর মালিক কোথায় ?’
‘অ্যাই রোবট ! চোখ খোল !! আমার দিকে তাকা !’
‘ইইইইইইইইইইইই !! আমি রোবট পুষব-ওওও ।’ অতি আদরের কোন এক দুলালী একপাশ থেকে বলে ।
লেডিস হোস্টেলের সামনে মেয়েদের একটা ভীড় লেগে গেছে । গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রোবটটার দিকেই সবার মনোযোগ । ছোট্ট একটা রোবট । ছোট্ট দুটো পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । মাঝে মাঝে পায়চারী করছে । আশেপাশের মেয়েদের টিটকারী ওর ধাতব গায়ে যেন স্পর্শই করছে না ।
হঠাৎ থেমে যায় ওটা । স্পষ্ট উচ্চারণে বলে, ‘ইমতিয়াজ উদ্দীন? সামনে আসুন ।’
‘দাড়োয়ান মামাকে ডেকেছে ! দাড়োয়ান মামাকে ডেকেছে !!’ হাততালি রোগে আক্রান্ত মেয়ে হাততালি দেয় আবারও ।
দাড়োয়ান সামনে আসতেই টিপটিপ করে চোখ খোলে ক্ষুদে রোবট ।
‘আইডেন্টিফাইড । আমি ছেলে নই । রোবট । আমাকে খেদানোর চেষ্টা করলে ফলাফল শুভ হবে না । মাথায় রাখবেন ।’
মাথায় কি রাখবে ! মাথা কোথায় রেখেছে সেটা নিয়ে ভেবে ভেবেই ওটা চুলকাতে চুলকাতে একদিকে হাঁটা দিলেন দাড়োয়ান মামা ।
‘অ্যাই নীরা ।’ নীরার সামনে দাঁড়িয়ে অবিকল তুর্যের কন্ঠে বলে ওঠে রোবটটা । ‘রোবট তোমাকে চেনায় ঘাবড়িও না । আমাকে আসতে দেয় না । তোমাকে দেখি না । একটা রোবট বানাতেই হল । ফেইস রিকগনাইজার আছে । নাহলে এমনি চিনত না । মোবাইল নম্বর তো দিলা না । রোবট দিয়েই কাজ সাড়া লাগছে । শহীদ মিনারে বসে আছি । ইচ্ছে করলে আসো । ক্যাম্পাসে কি বলবে সেই ভয় পেলে এসো না । তোমাকে একটু দেখে চলে যেতাম ।’
ক্যাম্পাসের ভয় ? তুর্যের ভেতর অসামান্য সাহস কেন দেওয়া হয়েছে এতদিনে যেন হঠাৎ-ই বুঝে যায় নীরা । সাহস জিনিসটা সংক্রামক । একজন থেকে ছড়িয়ে যায় সবদিকে । জ্যামিতিক হারে বাড়ে তার পরিমাণ । সামনে পা বাড়ায় নীরা ।
‘তুই একটা জুনিয়র ছেলের সাথে দেখা করতে যাবি !?’ মালিহা পাশ থেকে জানতে চায় একঝাঁক অসন্তোষ গলায় নিয়ে ।
রহস্যময় একটা হাসি হেসে এগিয়ে যায় নীরা – যার অর্থ ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ দুটোই হতে পারে ...
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now