বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
অব্যক্ত বাক্য
------------------------
*** মুর্তজা সাদ ***
“আচ্ছা চাঁদটা কেন রাতে দেখা দেয় জানেন?” রক্তিম বলে ওঠে।
অবাক হয়ে রক্তিমের দিকে তাকায় রোদেলা। “এটা কেমন প্রশ্ন?”
“কেমন প্রশ্ন মানে?” অবাক হয়ে রোদেলার দিকে তাকায় রক্তিম।
“জানি না,বাদ দিন তো।”কেন যেন তর্কে যেতে মন সায় দেয় না রোদেলাকে।
“আচ্ছা।” চোখ ফিরিয়ে লেকের ওপর পাড়ে চোখ ফেরায় রক্তিম।
খুব বেশিদিন না,তিন কি চার মাস আগে ছেলেটার সাথে পরিচয় রোদেলার;এই লেকটিরই ধারে।কোন এক অনির্দিষ্ট কারনে রোদেলা অবিরত চোখের পানি ফেলে যাচ্ছিল।হঠাৎ খেয়াল করল দুহাত দূরে একজন যুবক বয়সী তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। রোদেলার চোখ পড়া মাত্রই ছেলেটি অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নিল।
“এই যে…,” রোদেলা ডেকে ওঠে।ছেলেটা সাড়া দেয় না।
“এই যে শুনছেন?”
এবার ছেলেটি তাকায়। “আমাকে বলছেন?”
“মানুষকে কাঁদতে দেখলে হাসি পায়,না?”
অবাক হয় ছেলেটি। “ঠিক বুঝলাম না।”
“আমার কান্না দেখে আপনার হাসি পাচ্ছিল?”
“আমি তো আপনাকে দেখিই নি।আমি তো আকাশের পাখিগুলোকে দেখছিলাম।”
“তবে কি আমি ভুল দেখেছি?”
“খুব সম্ভবত না।”
“তাহলে?”
“আমি হালকা ট্যারা কিনা…” চশমাটা খুলে চোখটা দেখায় সে।হালকা না ভালই ট্যারা।
“আচ্ছা সরি।” মিন মিন করে রোদেলা বলে ওঠে।ছেলেটি ওপাশ ফিরে যায়।
“এই যে শুনছেন?” আবার ডেকে ওঠে রোদেলা।
“আমার নাম রক্তিম।”
“রক্তিম আপনি কি একটু এখানে এসে বসবেন?খানিকটা গল্প করব।”
রক্তিম কিছু বলে না,পাশে এসে বসে পড়ে।“মনটা কি বেশিই খারাপ?”
“হ্যাঁ।”
“আপনাকে একটা সত্যি কথা বলব।”
“বলুন।”
“আমি আসলে আপনাকে দেখেই হাসছিলাম।”
কটমট চোখে রক্তিমের দিকে তাকায় রোদেলা। “জানতে পারি কেন?”
“কাঁদার সময় আপনার নাক একবার বড় হয় আবার ছোট,ব্যাপারটা অদ্ভুত মজার।”
রোদেলা কিছু বলে না,ফিক করে হেসে দেয়।
“মনটা এখন ভাল হয়ে গেছে, না?”
“কিছুটা।”
“আরেকটা সত্য বলব।”
“বলুন।” হাসি বন্ধ করে রোদেলা বলে ওঠে।
“আমি আসলে ট্যারা না,তবে ট্যারা সাজতে পারি।”চশমাটা খুলে ট্যারা সেজে দেখালো রক্তিম।
এবার রোদেলা হো হো করে হাসি শুরু করল,অনেকটা সময় ধরে সে হাসি থামাতে পারল না।
মাঝে মাঝেই রক্তিমের সাথে দেখা হত রোদেলার,লেকের ধারে পা ডুবিয়ে বসে থাকত ছেলেটা।
আলতো করে রক্তিমকে খোঁচা দেয় রোদেলা।
“কি?” বিরক্তি ভঙ্গিতে বলে ওঠে রক্তিম।
“আম গাছটার উপরে দেখুন কাকের দুটো বাচ্চা হয়েছে।”
“তাতে কি হয়েছে?”
“তাতে কি হয়েছে মানে!দেখছেন না মা পাখিটা কত আদর করে বাচ্চাগুলোকে খাইয়ে দিচ্ছে।এরই নাম বোধহয় ভালোবাসা।”
হো হো করে হেসে ওঠে রক্তিম।
“আপনি হাসছেন?”
“হ্যাঁ হাসছি।”হাসি থামিয়ে রক্তিম বলে ওঠে।
“জানতে পারি কেন?”
“কেননা আপনি ভালোবাসা নামক অবান্তর বিষয় নিয়ে কথা বলছেন।”পাখিগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে রক্তিম।“জানেন এ আদরের স্থায়িত্ব কতদিন?”
“কত?”
“যতদিন খাবারের যোগান আছে।আজ খাবার না পেলে কাল মা কাকটি তার বাচ্চাটাকে হিংস্রভাবে ঠুকরিয়ে খাবে।ইয়েস দ্যাট ইজ লাভ।”হো হো করে হেসে ওঠে রক্তিম। “জানেন আমার বাবাও একজনকে ভালোবেসেছিল,সে আমার মা।একটা সময় বাবাকে মেরে তিনি সব লুটে হারিয়ে গেলেন।আজ তার অনেক স্বামী,অনেক ভালোবাসার মানুষ;সবই আঁধারের।দিন হলেই তারা হারিয়ে যায় কিংবা মা হারিয়ে যান।আমি নিরুপায়,নাটক দেখি।”
কেমন যেন কেঁপে ওঠে রোদেলা। “যদি কখনো কাউকে ভালোবেসে ফেলেন?”
“আমি জীবনে এগিয়ে যেতে চাই।তাই মায়াবতীর খপ্পরে পড়তে রাজি নই।”
“মায়াবতীর সাথে জীবনে এগিয়ে যাবার কি সম্পর্ক?”
রোদেলার দিকে ঘুরে বসে রক্তিম।“জীবনে এগিয়ে যাবার প্রথম শর্ত হল মায়াবতী হতে দূরে থাকা।মায়াবতীদের সাথে কথা বলার সময় এদের চোখের দিকে তাকানো যাবে না। তাকানো মানেই জালে পা দেয়া,ভদ্র ভাষায় একে বলে ট্র্যাপ।এদের চোখে এক ধরনের স্নিগ্ধতা থাকে। দেখা মাত্রই বলতে ইচ্ছে করে জীবনের আশা,হতাশা এবং স্বপ্ন ভাঙ্গার গল্পগুলো।”
“তাই বুঝি?”
“হয়তোবা।”
রোদেলা কিছু বলতে পারে না,রক্তিমের চোখে চেয়ে থাকে অনেকটা সময়। বাঁধা দেয় না রক্তিম,চোখটাকে উন্মুক্ত করে দেয় রোদেলার জন্য।
মাঝে মাঝেই ছেলেটি অবান্তর সব কথা বলত।অবাক হয়ে সেসব শুনে যেত রোদেলা।
“জানেন জগতটা কিসের উপর টিকে আছে?”রক্তিম প্রশ্ন করে বসে।
“ভালোবাসা।”
“আপনি অনেক বোকা।”
“কেন?”
“জগতে ভালোবাসা বলে কিছু নেই।এভরিথিং ইজ বিজনেস।”
“কে বলেছে?”
“জাস্ট থিং এবাউট ইট।আপনিই বুঝবেন।”
“আপনি প্রমাণ করতে পারবেন?”
“পারলে কি দিবেন?”
“একটা সত্য বলব।”
“ওকে ডান।”
“শুরু করুন।”
“বলুন তো একজন পুরুষ একজন মহিলাকে কেন বিয়ে করে?”
“ভালোবেসে সংসার গোছানোর জন্যে।”
“ভুল।তাহলে কেউ সুন্দরী মেয়ে খুঁজত না।”
“তবে?”
“ সুন্দরী দেখিয়ে সমাজে তার লেভেল হাই করার জন্যে।”
রোদেলা কিছু বলে না,অনিশ্চিত মাথা নাড়ে।
“ঠিক তেমনি একটা সুন্দরী মেয়ে টাকা পয়সাওয়ালাকেই বিয়ে করে তার সৌন্দর্যের পরিপূর্ণতার দ্রব্যগুলোর যোগান পাওয়ার জন্য।জীবনে দেখেছেন একজন অপূর্ব সুন্দরী একজন বেকারের হাত ধরে বেরিয়ে এসেছে ভালোবাসার টানে?”
“তাহলে কি বলবেন বাচ্চাকাচ্চা কোন ভালোবাসার চিহ্ন নয়?”
“অবশ্যই না।জাস্ট ফিউচার প্রোটেকশন। আমার মায়ের তা দরকার নেই বলেই আমি অবহেলায়।”
রক্তিমকে কেমন যেন অপ্রকৃতস্থ লাগে রোদেলার।
“আমি কি বোঝাতে পেরেছি?”
মাথা নাড়ে রোদেলা।“হুম।”
“এবার সত্যটি বলবেন?”
“হুম।”
“তবে বলুন।”
“আপনি মায়াবতীর জালে ফেঁসেছেন।”
কেমন যেন হতচকিয়ে যায় রক্তিম।মলিন হয়ে যাওয়া দূর আকাশের দিকে তাকায় সে।“হতে পারে।”
“বাচবেন কি করে মায়াবতীর হাত থেকে?”
“জগতে বেঁচে থাকার প্রধান অস্ত্র অব্যক্ততা।মাত্র তিন শব্দেরই তো বাক্য,থাকুক না অব্যক্ত।”
কোন এক অজানা কারণে ছেলেটি মেঘলা দিন পছন্দ করত না।তেমনই এক মেঘলা দিনে লেকের পাড়ে বসে পড়ে দুজন।
“আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে।”রোদেলা বলে ওঠে।
পা নাড়ানো কিছুটা সময়ের জন্য থামিয়ে দেয় রক্তিম। রোদেলার দিকে তাকায় সে।“কবে।”
“ঠিক পনেরোটা দিন পর।”
কৃত্রিম হাসি দিয়ে ওঠে রক্তিম।“কনগ্রেটস।”
রোদেলা স্পষ্ট দেখতে পায় রক্তিমের চোখের কোণে এক বিন্দু জল;সে জল বেদনার;সে জল ভালোবাসার।
“বের করতে পারলেন?”
“কি?”রোদেলা বলে ওঠে।
“চাঁদ কেন রাতে দেখা দেয়?”
“নাহ।কেন?”
“আঁধার জগতের অবলম্বন হয়ে থাকার জন্য।ছোট্ট একটা চাঁদ কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝা যায় অমাবস্যার দিনে।হাহাকার রব পড়ে যায় পুরোটা আকাশ জুড়ে।হতভাগা আমরাই,যাদের আকাশে অমাবস্যা থাকে সবটা সময় ধরে,চাঁদ জেগে ওঠে মরীচিকা হয়ে।আবার মিলিয়ে যায়,হাহাকার জেগে ওঠে আঁধার আকাশে।”
কেমন যেন এলোমেলো লাগে রোদেলার,উঠে দাঁড়ায় সে। “আমায় যেতে হবে।”
“আপনার সাথে এটাই শেষ দেখা,তাই না?”
“বিয়ের পর কি দেখা হবে না?”
“তখন আপনি অন্য কারো হয়ে যাবেন।মালিকানাবিহীন রোদেলাকে তো আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।”
রোদেলা কিছু বলে না।হাটা শুরু করে,স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা ধীরে।আশায় থাকে কেউ ডেকে বসবে। পেছন থেকে রক্তিম রোদেলাকে এক দৃষ্টিতে দেখতে থাকে।বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে।অব্যক্ত বাক্য ব্যক্ত হতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এখনো রোদেলা হারিয়ে যেতে এক মিনিটের পথ বাকি,চোখটা বন্ধ করে সে।কি করবে সে?অব্যক্ততা তত্ত্বকে বিসর্জন দিবে সে? কেমন যেন গুলিয়ে আসে মাথাটা।রোদেলার অবয়ব ছোট হতে থাকে,আরো;আরো।চিন্তার গতি আরো বাড়িয়ে দেয় রক্তিম,হারিয়ে যাবার আগেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তার।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now