বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
বোরকাওয়ালি বোরকা খুলেছে। ‘অধিক শোকে পাথর’ কথাটি সে সত্যি প্রমাণ করেছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, সে মৃত মানুষ। আমি বললাম, পদ্ম, তুমি কি আমাকে চিনতে পেরেছ?
সে জবাব দিল না, আমার দিকে তাকালও না।
আমি বললাম, খুব ছোটবেলায় তুমি তোমার মাকে নিয়ে আমাদের বাসায় এসেছিলে। হাতে একটা কঞ্চি নিয়ে বিড়াল তাড়াচ্ছিলে। তোমার কি মনে আছে?
পদ্ম মৃদু গলায় কী যেন বলল। বড় বড় করে কয়েকবার নিঃশ্বাস নিয়ে মাথা ঘুরে গাড়ির সিট থেকে নিচে পড়ে গেল। আমি তাকে তুলতে গিয়ে প্রথম লক্ষ করলাম, জ্বরে তার শরীর পুড়ে যাচ্ছে।
পদ্মর মা আমাদের বাসায় চলে এসেছেন। সঙ্গে একটা সুটকেস, দুটা বড় বড় কাগজের কার্টনে তাঁর সংসার। এই মহিলাকে আনানোর ব্যবস্থা ভাইয়া আলাদাভাবে করেছেন।
মহিলা মেয়েকে দেখে আনন্দে পুরো পাগল হয়ে গেলেন। চেঁচিয়ে বলতে লাগলেন, ‘পদ্ম ও পদ্ম, তাকিয়ে দেখ আমি তোর মা। তোর আর কোনো ভয় নাই। তাকিয়ে আমাকে একটু দেখ, লক্ষ্মী মা।’ এই মহিলারও মনে হয় মেয়ের মতো মূর্ছাব্যাধি আছে। কিছুক্ষণ হইচই করে তিনি মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন।
পদ্ম জ্বরে অচেতন। সে কিছুই তাকিয়ে দেখছে না। তবে আমার বাবা ও মা তাকিয়ে দেখছেন। বাবা বাসায় এসেছেন কিছুক্ষণ আগে। ঘটনা এখনো হজম করে উঠতে পারেননি। হজম করার কথা না। বাবা চোখের ইশারায় আমাকে ডাকলেন। আমি কিছুই ঘটেনি ভাব নিয়ে কাছে গেলাম। বাবা বললেন, মা-মেয়েকে তুমি এনেছ?
আমি বললাম, আমি মেয়েটাকে এনেছি। তার মায়ের বিষয়ে কিছু জানি না। ভাইয়া জানতে পারে। ভাইয়াকে ডাকব?
আগে তুমি আমার প্রশ্নের জবাব দাও, তারপর ভাইয়া। মেয়েকে কোত্থেকে এনেছ?
আগারগাঁওয়ে একটা বস্তি আছে, সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাকে জোর করে এক ট্রাক ড্রাইভারের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হচ্ছিল।
সমাজের হিত করার চেষ্টা?
হ্যাঁ।
অভিযানে বের হচ্ছ এই বিষয়টা আমাকে জানানোর প্রয়োজনও বোধ করলে না?
গোপন অভিযান তো বাবা, কাউকে জানানো যাচ্ছিল না।
তোমার ভাইয়াকে আমার শোবার ঘরে আসতে বলো।
আমিও কি সঙ্গে আসব?
আসতে পারো।
রাত আটটা দশ। আমরা বাবার শোবার ঘরে। লোডশেডিং চলছে বলে মোমবাতি জ্বালানো হয়েছে। মায়ের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে, তিনি বিছানায় শুয়ে আছেন। আমরা দুই ভাই তাঁর পায়ের কাছে খাটে পা ঝুলিয়ে বসেছি। ভাইয়া পা দোলাচ্ছেন। আমি দোলাচ্ছি না।
বাবা আমাদের থেকে সাত-আট ফুট দূরে একটা প্লাস্টিকের লাল চেয়ারে বসেছেন। তিনি জাজসাহেব ভাব ধরার চেষ্টা করছেন। মোমবাতির রহস্যময় আলোর জন্যে তাঁর জাজসাহেব ভঙ্গিটা ফুটছে না। তাঁকে বরং অসহায় লাগছে।
বাবা ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, টগর, তোমার কিছু বলার আছে?
ভাইয়া পা দোলাতে দোলাতে বলল, না।
এত বড় ঘটনা তোমরা দুই ভাই মিলে ঘটালে, এখন বলছ তোমাদের কিছু বলার নেই?
ভাইয়া বলল, আমি বলেছি আমার কিছু বলার নেই। মনজুর বলার কিছু আছে কি না সেটা সে জানে। আমার জানার কথা না।
আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, আমার কিছু বলার নেই, বাবা।
বাবার মধ্যে দিশাহারা ভাব দেখা গেল। তিনি কোন দিক দিয়ে এগোবেন তা বুঝতে পারছেন না। ভাইয়া বলল, বাবা, আমি উঠি। পদ্ম মেয়েটার অনেক জ্বর। ওকে ডাক্তার দেখাতে হবে কিংবা হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে।
বাবা বললেন, তোমার মায়েরও তো ঘটনা দেখে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। তাকেও তো হাসপাতালে ভর্তি করাতে হতে পারে।
ভাইয়া বলল, মাকে ভর্তি করাতে হলে ভর্তি করাব। পদ্ম আর মা পাশাপাশি দুই বেডে শুয়ে থাকল।
বাবা হঠাৎ গলার স্বর কঠিন করে বললেন, আমার একটা প্রশ্নের জবাব দিয়ে তারপর যেখানে ইচ্ছা সেখানে যাও। তুমি কোন সাহসে মা-মেয়েকে এখানে এনে তুললে?
ভাইয়া বলল, সাহস দেখানোর জন্যে এখানে আনিনি, বাবা। মানবিক কারণে এনেছি। ওরা ভয়ংকর অবস্থায় পড়েছিল। সেখান থেকে উদ্ধার পেয়েছে। তা ছাড়া এই বাড়ির অর্ধেকের মালিক তো তারা।
তার মানে?
পদ্মর বাবা অনেক কষ্ট করে জমি কেনার অর্ধেক টাকা দিয়েছিলেন। বেচারা মারা যাওয়ায় আপনার জমি দখলের সুবিধা হয়েছে।
তুমি বলতে চাচ্ছ, আমি অন্যায়ভাবে একজনের টাকা মেরে দিয়েছি?
হুঁ।
কী কারণে এই ধারণা হলো?
ঘটনা বিশ্লেষণ করে এ রকম পাওয়া যাচ্ছে, বাবা।
ঘটনা বিশ্লেষণ করে ফেলেছ?
হুঁ। তুমি পাপ করেছ, তার ফল ভোগ করছ।
কী ফল ভোগ করেছি?
দুই অপদার্থ পুত্রের জন্ম দিয়েছ। তোমার ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে ‘মুরগি’ নামে খ্যাতি লাভ করেছ। আরও শুনবে?
বাবা চোখমুখ শক্ত করে রাখলেন। ভাইয়া বলল, আরেকটা ইন্টারেস্টিং কথা বলি, বাবা? তালাবদ্ধ ঘরে একজন বৃদ্ধ ভূত থাকে বলে মার ধারণা। ভূতটা খক খক করে কাশে। মার দৃঢ়বিশ্বাস, এই ভূতটা পদ্মর বাবা। তিনি জমির টানে এখানে নাজেল হয়েছেন। ভূত ঠান্ডা রাখার প্রয়োজন আছে। এখন তিনি আর কাশবেন না। খড়ম পায়ে হেঁটে মাকে ভয়ও দেখাবেন না।
বাবা ইংরেজিতে একটা দীর্ঘ গালি দিলেন। তিনি ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক। তাঁর গালি ইংরেজিতে হওয়ারই কথা। বাবার গালির বাংলা ভাষ্য হলো—এই কুকুরিপুত্র। ঘর থেকে এই মুহূর্তে বিদায় হ। আর যেন তোকে না দেখি।
গালি শুনে ভাইয়া সুন্দর করে হাসল। হাসতে হাসতে বলল, কালো হ্যয়ং নিরবধি বিপুলা চ পৃথ্বী। এর অর্থ হলো, অন্তকাল ও বিশাল পৃথিবী রহিয়াছে।
বাবার ঘর থেকে আমরা দুই ভাই চলে আসছি। বাবা পেছন থেকে স্যান্ডেল ছুড়ে মারলেন। ভাইয়া আগে আগে যাচ্ছিলেন বলে স্যান্ডেল তার গায়ে লাগল না। আমার গায়ে লাগল। দৃশ্যটা দেখল রহিমার মা। সে আমকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, পিতা-মাতার হাতে স্যান্ডেলের বাড়ি খাওয়া বিরাট ভাগ্যের ব্যাপার। যে জায়গায় বাড়ি পড়ছে, সেই জায়গা বেহেশতে যাবে।
(চলবে)
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, মে ১৩, ২০১১
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now