বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ম্যাকবেথের তরোয়াল—০৪

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X "ম্যাকবেথের তরোয়াল" --------------------- ( ৪ র্থ পর্ব) ( লেখক : মানবেন্দ্র পাল) --------------------- সাহেব সকালেই কোথায় বেরিয়েছিল, এইমাত্র ফিরল একটা ইংরেজি খবরের কাগজ হাতে করে। বাইরের ঘরে ছেলেমেয়েদের নিয়ে সুধীনবাবুকে বসে থাকতে দেখে সাহেব টুপি খুলে সবাইকে " গুড মর্নিং " জানাল। সুধীনবাবু হেসে জিজ্ঞেস করলেন, " এত সকালে কোথায় বেরিয়েছিলে?" সাহেব বললে, " একটা কাজ ছিল। এবার তো যেতে হবে। তাই কাজগুলো চুকিয়ে ফেলছি।" অভিজিৎ মনে মনে হাসল, কাজ যে কত তা জানতে বাকি নেই। পুরনো ভাঙাবাড়ি খুঁজে বেড়ানো। কত রকমের পাগলই না আছে! জুলির মা এক কাপ কফি তৈরি করে নিয়ে এসে সাহেবের হাতে দিলেন। সাহেব হেসে বলল, " থ্যাঙ্ক ইউ।" মুশকিল হয় সাহেবের সাথে কথা বলতে গেলে। সে নিজে থেকে যদি কিছু বলে তাহলে শোনা যায়, কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে হয় উত্তর দেয় না, নইলে এলোমেলো উত্তর দেয়। যেমন জুলি হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, " সাহেব, তুমি কি স্নান করো না? দু'দিন তো তোমায় স্নান করতে দেখলাম না?" সাহেব উত্তর দিলেন, " তোমাদের এই জায়গাটা তোমাদের মতোই বড়োই সুন্দর। আমার খুব ভালো লেগেছে। যেখানে যাচ্ছি, সেখান থেকে যদি ফিরে আসতে পারি তাহলে আবার তোমাদের সঙ্গে দেখা করে যাব।" সুধীনবাবু বললেন, " ধন্যবাদ। কিন্তু তুমি এখান থেকে কোথায় যাবে?" সাহেব কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে রইল। তারপর বলল, " আমার যাওয়ার কি কোথাও ঠিক আছে বাবু? আমি সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়েছি। যা খুঁজছি তা এখনও পাইনি।" জুলি বলল, " তাহলে তুমি ঠিক ট্যুরিস্ট নও। ট্যুরিস্টরা নানা জায়গা দেখবার জন্যই ঘুরে বেড়ায়। কোনও বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে ঘোরে না। কিন্তু দেখছি তোমার ঘুরে বেড়াবার পেছনে একটা বিশেষ উদ্দেশ্য আছে। তাই না?" সাহেব যেন ধরা পড়ে গেল। তাই গম্ভীর ভাবে বলল, " তা হয়ত ঠিক।" " তোমার উদ্দেশ্যটা আমাদের কাছে বলতে বাধা আছে কি?" " হ্যাঁ আছে", সাহেব থমথমে মুখে বলল, " অবশ্যই আছে। আর আমার সন্মন্ধে বেশি কৌতূহলটা আমি মোটেই পছন্দ করি না"... বলতে বলতে সাহেবের মুখটা চাপা রাগে লাল হয়ে গেল। সাহেবের কাছ থেকে এইরকম উত্তর কেউই আশা করেনি। সবাই যেন গালে চড় খেলো। হঠাৎ সাহেবের চোখ পড়ল দেওয়ালে টাঙানো সেই ছবিটার দিকে, যেটা চঞ্চল দিয়ে গিয়েছিল জুলিকে, সেই আসামের উত্তর কাছাড়ের পাহাড়ের কোলে রহস্যময় বাড়িটার ছবি। সে বসে বসেই ছবিটা দেখতে লাগল। তার মুখের ভাবের পরিবর্তন হলো। মুগ্ধ স্বরে বলে উঠল, " বাঃ, চমৎকার ছবি তো!" বলতে বলতেই সাহেব গৃহকর্তার অনুমতি না নিয়েই ছবিটার কাছে উঠে গেল। তারপর গভীর মনোযোগের সাথে ছবিটা দেখতে লাগল। দেখতে দেখতে সাহেবের দু'চোখ বড়ো বড়ো হয়ে উঠল, গা কাঁপতে লাগল। উত্তেজিত গলায় জিজ্ঞেস করল, " এ ছবি তোমরা কোথা থেকে পেয়েছ?" সাহেবের এইরকম উত্তেজনায় সকলেই চমকে উঠল। সুধীনবাবু ভয়ে ভয়ে বললেন, " আমাদের একজন ফ্যামিলি ফ্রেন্ড এটা দিয়েছিল।" " এ ছবি সে কোথায় পেল?" সুধীনবাবুই উত্তর দিলেন, " কলকাতার একটা পুরনো কাগজের দোকানে। বিলেতের একটা ইংরেজি ম্যাগাজিনে ছবিটা ছাপা হয়েছিল। ছবির সঙ্গে বাড়ির ইতিহাসটাও ছিল। আনফরচুনেটলি সেটা পাওয়া যায়নি। ছিঁড়ে গিয়েছিল।" " ওহ, মাই গড!" বলে সাহেব সেখানেই একটা চেয়ারে বসে পড়ল। একটু পরে বলল, " তোমরা কি প্লিজ তোমাদের সেই ফ্যামিলি ফ্রেন্ডের সঙ্গে আমার দেখা করিয়ে দেবে?" অভিজিৎ বলল, " সরি সাহেব, হি ইজ নো মোর। সে আর বেঁচে নেই।" মূহুর্তে ঘরটায় যেন শোকের ছায়া নেমে এল। সবাই চুপ করে রইল। জুলিই প্রথম নীরবতা ভাঙল। বলল, " জান সাহেব, তোমার মতো সেও ছবিটা দেখে কেমন হয়ে গিয়েছিল। বলেছিল, ঐ বাড়িটা তাকে খুঁজে বের করতেই হবে। তারপর সেই যে চলে গেল, আর ফিরল না। কোথায় কিভাবে মরল কে জানে!" সাহেব ভ্রু কুঁচকে বলল, " সে যে মরেছেই, তার কোনও প্রমাণ আছে?" " প্রমাণ? কাগজেকলমে প্রমাণ না পেলেও এমন কিছু প্রমাণ এ বাড়ির লোক পেয়েছে যা প্রকাশ করে বলা যায় না। "। সুধীনবাবু বললেন, " সে বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই এতদিনে ফিরে আসত।" সাহেব যেন নিজের মনেই বলল, " যদি ঐ বাড়িতে গিয়ে থাকে তাহলে কোনওদিনই ফিরবে না। শয়তান ম্যাকবেথের হাত থেকে কারো নিষ্কৃতি নেই। " এবার প্রকাশ্যে সাহেব বলল, " কিন্তু ছবির এই বাড়ি কোথায় তা সে জানবে কি করে?" জুলি ভুল করে ফেলল। বলল, " ছবির এক কোণে ছেঁড়া ছেঁড়া কতগুলো অক্ষর আছে। তাই থেকেই......' " ছেঁড়া ছেঁড়া অক্ষর"! বলে সাহেব লাফ দিয়ে উঠে ছবিটার কাছে গিয়ে অক্ষরগুলো দেখতে লাগল। তারপর হতাশ হয়ে বলল, " নাহ, কিছুই বুঝলাম না।" জুলি হেসে বলল, " কিন্তু আমাদের সেই ফ্রেন্ডটি বুঝে নিয়েছিল। 'As' for Assam, 'N' for North......'ar' for Kachar." সাহেব উত্তেজনায় ছুটে এসে জুলির হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বলল, " থ্যাঙ্ক ইউ......থ্যাঙ্ক ইউ। জায়গাটার কত খোঁজ করেছিলাম......কোথায় না গিয়েছিলাম.... পাহাড়ে, জঙ্গলে, নদীর ধারে ধারে। এমনও দিন গেছে, খেতে পাইনি, জন্তু মেরে কাঁচামাংস পর্যন্ত খেয়েছি। আজ সে জায়গার সন্ধান পেলাম"। বলতে বলতে হঠাৎ সে উঠে নিজের ঘরে চলে গেল। তারপর একটা কাঠের ছোট বাক্স হাতে নিয়ে চেয়ারে এসে বসল, বাক্সটা খুলে একটা হলদে হয়ে যাওয়া জীর্ণ কাগজ বের করল। তাতে অনেক কিছুই লেখা। কাগজটা সবার সামনে টেবিলের ওপর রেখে বলল, " বাড়িটার বর্ননা এখানে পরিষ্কার দেওয়া আছে। তোমাদের এখানে এসে সেই বাড়ির ছবিটাই নিজের চক্ষে দেখলাম। কাগজের বর্ননার সঙ্গে ছবিটা হুবহু মিলে যাচ্ছে। থ্যাঙ্ক ইউ.....থ্যাঙ্ক ইউ।" জুলি বলল, " ও বাড়িতে কি আছে? ওখানে যেতেই বা চাইছ কেন?" সাহেব আবার রেগে উঠল। বলল, " বেশী কৌতূহল ভাল নয় মিস। ওটা আমার পার্সোনাল ব্যাপার।" জুলি ঘাবড়াল না। বলল, " আমাদের বললে তোমার কোনও ক্ষতি হবে না। ঐ বাড়িটা সন্মন্ধে আমাদের বন্ধুটিরও কৌতূহল ছিল। আর সেই কৌতূহল মেটাতে গিয়েই যে সে মরেছে তাতে আমাদের সন্দেহ নেই।" সাহেব বলল, " হ্যাঁ, যদি সত্যিই সে সেখানে পৌঁছে থাকে তাহলে মরবেই।" জুলি বলল, " এই জন্যই আমাদের কৌতূহল স্বাভাবিক। তাছাড়া একটু আগেই তুমি বললে, ' শয়তান ম্যাকবেথের হাত থেকে কারোর নিস্তার নেই'। যদি এতই গোপনীয় হয় তাহলে ও কথাটা বললে কেন?" জুলির কথায় সাহেব থমকে গেল। একটু ভেবে বলল, " ম্যাকবেথের নাম শুনেছ কখনো? " জুলি বলল, " তা শুনব না কেন? 'ম্যাকবেথ' হচ্ছে গ্রেট ড্রামাটিস্ট উইলিয়াম শেক্সপীয়রের লেখা একটা বিখ্যাত নাটকের নাম।" সাহেব অবাক হয়ে বলল, " তুমি শেক্সপীয়র পড়েছ?" " অবশ্যই। শুধু ' ম্যাকবেথ' কেন? ' রিচার্ড দ্য সেকেন্ড ', ' দ্য টেমপেস্ট', ' কিং লিয়ার', ' জুলিয়াস সিজার'......কত বলব?" গোয়ালপাড়ার মতো একটা গ্রামের মেয়ে শেক্সপীয়রের এতগুলো বই পড়ে ফেলেছে জেনে সাহেব অবাক হলো। সেই সঙ্গে একটু নরমও হলো। বলল, " ম্যাকবেথকে তোমার কিরকম লাগে?" জুলি বলল, " দুনিয়ায় যদি একশো জন লোভী, নিষ্ঠুর আর অকৃতজ্ঞ রাজা থাকে তাহলে ম্যাকবেথ তাদের মধ্যে অন্যতম। " সাহেব বলল, " শুধু লোভী আর অকৃতজ্ঞই নয়, লোকটা ছিল একটা পাক্কা শয়তান। অরণ্য অঞ্চলের এক নির্জন প্রান্তরে যে একদল ভয়ঙ্কর দেখতে, গালে দাড়ি ডাইনিরা ঘুরে বেড়াত, তাদের সঙ্গে বোন সম্পর্ক পাতিয়ে ম্যাকবেথ তাদের ইচ্ছেতেই দেশের আর নিজেরও সর্বনাশ করেছিল।" জুলি বলল, " অথচ ম্যাকবেথের মতো অতবড়ো বীর সেনাপতি যদি না সেদিন রাজা ডানকানের পাশে না থাকত তাহলে কিছুতেই নরওয়ের রাজা সোনোর হাত থেকে স্কটল্যান্ডকে রক্ষা করতে পারত না।" " থামো! " সাহেব গর্জে উঠল, " তুমি দেখছি সেই শয়তানটারই গুণগান করে যাচ্ছ। রাজার আর একজন অতি বিশ্বস্ত বীর সেনাপতি ব্যাংকোর কথা তো বলছ না? আর ম্যাকবেথ যে এত বড় যোদ্ধা হয়ে উঠেছিল তা শুধু ওর নিজের ক্ষমতায় নয়, ডাইনীদের মন্ত্রপড়া তরোয়ালটার জোরে। তরোয়ালটা সে এক মূহুর্তের জন্যও কাছছাড়া করত না।" জুলি তরোয়ালের কথায় গুরুত্ব না দিয়ে বলল, " তুমি মিথ্যে রাগ করছ। ম্যাকবেথের কথা তুললে বলেই ম্যাকবেথের কথা বলেছিলাম। নইলে ব্যাংকোকে কি উপেক্ষা করতে পারি? আমার তো মনে হয় 'ম্যাকবেথ' নাটকে ব্যাংকোর মতো অত ভালো, অত বিশ্বস্ত, অত হতভাগ্য চরিত্র আর দুটি নেই।" সাহেব আবার নরম হলো। বলতে লাগল, " একবার সেই দৃশ্যটা কল্পনা করো মিস, ম্যাকবেথ আর ব্যাংকোর নেতৃত্বে একদিকে ডানকান বাহিনী, অন্যদিকে বিদ্রোহী ম্যাকডোনাল্ড আর স্যেনোর নরওয়ে বাহিনী। ফাইডের আকাশ শুধু ঘোড়ার খুরের ধূলোয় অন্ধকার..... বিস্তীর্ণ প্রান্তর রক্তে রক্তাক্ত! সেই অসম্ভব যুদ্ধে জয়ী হলো ঐ ম্যাকবেথটা আর সকলের প্রিয় ব্যাংকো। তারপর......' জুলি বলল, " তারপর ম্যাকবেথ ফের দেখা করলরল সেই ছাগলদাড়ি ডাইনী বোনদের সাথে। তারা মুখ টিপে হেসে বলল, এবার তুমি রাজা হবে। ম্যাকবেথ অবাক হয়ে বলল, আমি রাজা হব! কি করে তা সম্ভব? আমি তো সামান্য সেনাপতি। তাছাড়া, মহামান্য রাজা ডানকানের নিজেরই তো ছেলে আছে। ডাইনীরা তাকে মন্ত্রনা দিল, একটু বুদ্ধি খরচ করে চেষ্টা করলেই হবে। বলেই ডাইনীরা অদৃশ্য হয়ে গেল। সাহেব বলে উঠল, " আর মনে করে দ্যাখো তখনই ব্যাংকো বন্ধুকে পরামর্শ দিয়েছিল.....সাবধান! ডাইনীদের কথায় ভুলো না, বন্ধু। কিন্তু ততক্ষনে ম্যাকবেথের মনে রাজা হবার লোভ জেগে উঠেছে।" জুলি বলল, " রাজা ডানকান ম্যাকবেথের ওপর খুশি হয়ে তাঁকে অন্য একটি জায়গা......আহা, কি যেন নাম....." সাহেব বলল, " কডর!" জুলি বলতে লাগল, " হ্যাঁ, কডরের অধিপতি করে দিলেন। আর সেই অকৃতজ্ঞ লোকটা গোটা স্কটল্যান্ডের রাজা হবার লোভে শেষ পর্যন্ত নিজের হাতে খুন করল রাজা ডানকানকে।" " তারপর..... তারপর বলো"......সাহেব উত্তেজিত হয়ে বলল, " তারপর কি করল শয়তানটা? যেহেতু ব্যাংকো বলেছিল, বন্ধু, ডাইনীদের কথা শুনো না, সেই কারনে ম্যাকবেথ ভাবল, ব্যাংকো বুঝি তার সৌভাগ্যে হিংসে করছে, তাই একদিন রাতে, বন্ধুকে নেমন্তন্ন করে ডেকে মাঝপথে লোক লাগিয়ে খুন করে দিল!"......বলতে বলতে সাহেব পাগলের মতো চেঁচিয়ে উঠল, " এই অপরাধের কি কোনো ক্ষমা আছে?" জুলি বলল, " ম্যাকবেথ তো জনসাধারনের হাতে ক্ষমা পায় নি। সেও তো খুন হলো।" সাহেব বলল, " খুন হয়ে সে কি ভেবেছে পাঁচশো বছর ধরে দিব্যি নিশ্চিন্তে কবরের মধ্যে ঘুমোবে? না, তা হতে দেব না।" সাহেবের এই কথায় ঘরের সকলে অবাক হয়ে গেল। এ তো বদ্ধ পাগলের কথা! যে মৃত..... কবরের মধ্যে যার হাড়গুলো পর্যন্ত ধূলো হয়ে গেছে, তার ওপর আজ কি প্রতিশোধ নেবে? কেনই বা অতি তুচ্ছ অতি সাধারণ স্কটল্যান্ডবাসী একটা আধপাগলা সাহেব প্রতিশোধ নিতে যাবে?' সে কথাটাও সাহেব ধীরেধীরে পরিষ্কার করে দিল। একবার উঠে নিজের ঘরে গেল। তারপর সেই মস্ত পোঁটলা থেকে বের করে আনল পেতলের একটা ছোট ক্যাশবাক্স। জুলি দেখল ক্যাশবাক্সটার দু'হ্যান্ডেলে মোটা সুতো বাঁধা। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, " এরকম সুতো বাঁধা কেন?" সাহেব গম্ভীর ভাবে বলল, " আমার পোঁটলার গায়ে এটা সেফটিপিন দিয়ে লাগান থাকে। বলা তো যায় না কখন কে এটা তুলে নেয়!" " কি অমূল্য রত্ন আছে এর মধ্যে", ঠাট্টা করে বলল জুলি। " সেটা দেখাবার জন্যই তো নিয়ে এলাম।" বলে খুব যত্ন করে ক্যাশবাক্সের ডালাটা খুলে তার মধ্যে থেকে শক্ত কাগজের একটা খাম বের করল। তার মধ্যে থেকে বেরুল ঠিকুজি কুষ্ঠির মতো পাকানো একটা কাগজ। সাহেব গম্ভীর গলায় বলল, " আজ পর্যন্ত বাইরের কাউকে আমার সত্যিকারের পরিচয় দিইনি। আজ তোমাদের কাছে তাই দেব।" এই পর্যন্ত বলে সাহেব কয়েক মূহুর্ত চুপ করে রইল। তারপর ধীরেধীরে বলল, " আমি হচ্ছি সেই গ্রেট ব্যাংকোর একমাত্র বংশধর। " এই বলেই সে পাকানো কাগজটা সবার সামনে খুলে দেখাল। এমন একটা অদ্ভুত কথা শোনার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিল না। সবাই ঝুঁকে পড়ল কাগজটার ওপর। খুব ছোট ছোট জড়ান অক্ষরে অনেকগুলো নামের তালিকা। পড়ার সাধ্য কারো নেই। সাহেব গর্বভরে বলল, " এরা সব আমার পূর্বপুরুষ। " জুলি কিছুমাত্র ইতস্তত না করে বলল, " তুমি কি বলতে চাইছ আমি তো তার মাথামুণ্ড কিছুই বুঝতে পারছি না।" সাহেব বললে, " না বুঝতে পারার কারণ কি? আমি যে মহামান্য ব্যাংকোর বংশধর তার প্রমাণ তো দেখালাম।" জুলি বলল, " কিন্তু সাহেবদাদা, ম্যাকবেথ বা ব্যাংকো বলে সত্যিই কি কেউ ছিল? কবিরা ঐরকম কত চরিত্র কল্পনায় সৃষ্টি করে থাকেন।" " কখনওই না", সাহেব বলতে লাগল, " পোয়েটসরা যা কিছুই সৃষ্টি করে তার অনেকখানিই সত্য। শেক্সপীয়রের অন্য নাটকগুলোর মধ্যে রিচার্ড দ্য সেকেন্ড, জুলিয়াস সিজার, কিং লিয়ার, কিং জন.....এঁরা কি সত্যি সত্যিই ছিলেন না? কাজেই প্লিজ বাজে তর্ক কোর না। আমি যে ব্যাংকোর বংশধর তা বিশ্বাস করতে চাও কোরো, না হলে কোরো না। তাতে আমার কিছু আসে যায় না। " বলে সাহেব রাগে গোঁজ হয়ে বসে রইল। সুধীনবাবু বললেন, " বেশ, আমরা মানলাম তুমি সেই ব্যাংকোরই বংশধর। কিন্তু তুমি যে বললে, এতকাল পর ম্যাকবেথের ওপর প্রতিশোধ নেবে, কি করে তা সম্ভব? " অভিজিৎ এতক্ষণ মুখ টিপে হাসতে হাসতে সাহেবের পাগলামির কথা শুনছিল। এবার বলল," তুমি কি মনে কর সাহেব, ম্যাকবেথের মৃতদেহ স্কটল্যান্ডে সমাধি না দিয়ে সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে আসামে সমাধি দিতে এসেছিল?" " ও নো নো মাই ডিয়ার", সাহেব বলল, " আমি ম্যাকবেথের ডেডবডির কথা তো বলিনি।" " তাহলে ঐ বাড়িতে কি আছে? কি জন্য ওখানে যেতে চাইছ? কোনো গুপ্তধন? " " আই হেট মানি", সাহেব বলল, " ধন-দৌলতকে আমি ঘৃণা করি। দেখবে আমার কত টাকা?" বলে সাহেব তার লম্বা কোটের পকেটে হাত ঢোকাতে যাচ্ছিল, অভিজিৎ বলল, " থাক। দেখাবার দরকার নেই। আমরা জানি তোমার অনেক টাকা। তুমি শুধু বলো ঐ বাড়িতে কি আছে, যার জন্য তুমি ওখানে যেতে চাইছ?" সাহেব এদিক ওদিক বার দুই মাথা নেড়ে বলল, " সে কথা আমি কিছুতেই বলব না। এইটুকু শুধু বলতে পারি, ঐ বাড়ির মধ্যে সুরক্ষিত ভাবে যে জিনিসটি আছে তার খোঁজে পাঁচশো বছর ধরে কত দেশের কত মানুষ পাগলের মতো ঘুরে বেড়িয়েছে। কেউ তার ট্রেস পায়নি। পেয়েছি শুধু আমি। এই দ্যাখো......সেইসব পুরনো পুঁথি.....বই।" সবাই ঝুঁকে পড়ল। কিন্তু সেই দূর্বোধ্য লাতিন ভাষা কেউ বুঝতে পারল না। কিছুক্ষণ চুপচাপ। কেউ কথা বলছে না। জুলি আর অভিজিৎ লুকিয়ে চোখ চাওয়া চাওয়ি করে হাসছে। আর সাহেব একটা পায়ের ওপর অন্য পা-টা তুলে হাতের ওপর থুতনি রেখে কি যেন ভাবছে। " এবার তাহলে কি করবে?" জিজ্ঞেস করলেন সুধীনবাবু। সাহেব মনে মনে বোধহয় ছবির সেই রহস্যময় বাড়িতে চলে গিয়েছিল। চমক ভাঙল। বললে, " হাঁ? কি করব? কালই এখান থেকে স্টার্ট করব।" একটু থেমে আবার বললে, " এখানে তোমাদের ভালো ব্যবহারের কথা কোনওদিন ভুলব না। আমি স্কচ। যে উপকার করে সে যে দেশের মানুষই হোক তার ওপর কৃতজ্ঞ থাকাই আমাদের ধর্ম। তোমরা প্রত্যেকেই ভেরি গুড। তবে......." " তবে কি?" জুলি জিজ্ঞেস করল। " শুনলে তোমরা দু:খ পাবে, আমার ঘরের সামনেই যে লোকটি ছিল সে মোটেই ভালো লোক নয়। আমার সন্মন্ধে তার বড্ড বেশী কৌতূহল ছিল। জানই তো বেশী কৌতূহল আমি মোটেও পছন্দ করি না। " এই পর্যন্ত বলে সাহেব হঠাৎ থেমে গেল। বলল, " ভাবছি কাল সকালেই আমি যাব।" অভিজিৎ হঠাৎ নরম গলায় বলল, " সাহেব, একটা রিকোয়েস্ট করব। রাখবে?" সাহেব কথা না বাড়িয়ে অভিজিতের দিকে তাকাল। অভিজিৎ বলতে লাগল, " তুমি যদি আমায় সঙ্গে নাও তাহলে আমি বড়ই খুশী হই। আর সেই সঙ্গে........" কথা শেষ করতে না দিয়েই সাহেব রেগে উঠে বলল, " নো! আমি কাউকে সঙ্গে নেব না।" অভিজিৎ রাগল না। বলল, " সঙ্গে নিতে আপত্তি কি? আমি তো ঐ বাড়িটার ধারে কাছে যাব না। শুধু তোমার সঙ্গে গিয়ে আসাম টা ঘুরে দেখে নেওয়া আর কি?" সঙ্গে সঙ্গে জুলি বলল, " হ্যাঁ সাহেব, প্লিজ আপত্তি কোরো না। আমিও তাহলে দাদার সাথে যাব।" সাহেব গম্ভীর গলায় বলল, " তোমরা ছেলেমানুষি করছ। যে জায়গার খোঁজে আমি একা একা কত বছর ধরে ঘুরে বেড়িয়েছি, আজ আমি সঙ্গে করে কাউকে নিয়ে যেতে পারি, ভাবলে কি করে? সে গোপন জায়গার খোঁজ আমি কাউকে দেব না। এমনকি ওখানে পৌঁছে যদি তোমাদের সেই ফ্যামিলি ফ্রেন্ডকেও দেখতে পাই তাহলে তাকেও তখুনি মরতে হবে। হ্যাঁ, আমার হাতেই মরতে হবে। আমার ক্ষমতা কতখানি তা জান না। আমার পথে বাধা দিতে এসেছিল তিনজন। তিনজনকেই আমি এইভাবে গলা টিপে শেষ করে দিয়েছি। " বলে দু'হাত তুলে মোটা মোটা আঙুলগুলো ছড়িয়ে দিল। জুলির মা আঁৎকে উঠলেন। জুলি বলল, " আমরা তোমায় কথা দিচ্ছি যদি ঐ বাড়ি তুমি খুঁজে পাও তাহলে তার ত্রিসীমানাতেই আর যাব না। কারণ ঐ বাড়িতে কি আছে আমরা জানি না, জানার কৌতূহলও নেই।" জুলির কথায় সাহেব একটু নরম হলো। বলল, " তাহলে সেই ভয়ঙ্কর জঙ্গলে তোমরা যেতে চাইছ কেন?" অভিজিৎ বলল, " শুধু জায়গাটা দেখব।" জুলি বলল, " দেখো সাহেব, তুমি অনেক জঙ্গল, পাহাড় পর্বত ঘুরেছ। তোমার সঙ্গে যদি আমরা ক'দিন থাকতে পারি,তাহলে তোমার কাছ থেকে কত গল্প শুনতে পাব। সেটাই আমাদের লাভ। তাছাড়া...." এই পর্যন্ত বলে জুলি একটু থামল। সাহেব তাকাল। জুলি বলতে লাগল, " তাছাড়া এই দুদিনেই তুমি আমাদের ফ্যামিলির একজন হয়ে গেছ। তোমার সঙ্গে গেলে আমাদের একটুও ভয় থাকবে না।" সাহেব অনেকক্ষণ চুপ করে কি যেন ভাবল। তারপর বলল, " বেশ নিয়ে যাব। কিন্তু কতগুলো কন্ডিশন আছে।" " কি শর্ত বলো।" সাহেব বলতে লাগল, " প্রথমত, সেখানে আমি যেখানে থাকব, সেখানে তোমরা থাকবে না।" " বেশ রাজি", জুলি বলল। " দ্বিতীয়ত, আমার কাজে কোনও কৌতূহল দেখাবে না। আমি কোথায় যাচ্ছি না যাচ্ছি সেদিকে তাকাবে না। সেখানে তোমরা অসুখে পড়লে বা বিপদে পড়লে আমি কাছে গিয়ে দাঁড়াব না।" " ঠিক আছে, ওখানে আমরা ইন্ডিপেনডেন্টলি নিজের মতো থাকব।" " থার্ডলি, তোমরা নিজের মতো ফিরে আসবে। আমি কবে ফিরব, না ফিরব, কোন দিক দিয়ে ফিরব, সে আমার ব্যাপার।" অভিজিৎ বলল, " হ্যাঁ অবশ্যই।" " ফোর্থলি, আমি আবার বলছি, যদি দেখি তোমরা আমায় ফলো করছ, তাহলে তার পরিণতির জন্য তোমরা দায়ী থাকবে।" " হ্যাঁ। রাজি।" " লাস্টলি, খরচ সব তোমাদের। তোমাদের জন্য আমি একটি রুপিও খরচ করব না।" জুলি আর অভিজিৎ দুজনেই হেসে উঠল। বলল, " ওর জন্য ভেবো না সাহেব। আমরা বেগার ( begger ) নই।" খুব বিরক্ত হয়েই সাহেব ওদের নিয়ে অসমের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। ওরা চলে গেল আর পরদিনই কলকাতা থেকে এল গুরুদেবের ছেলের চিঠি। সে লিখেছে, প্রথমেই জানাই কয়েক দিনের জন্য কলকাতায় এসেছি। তারপর বাংলাদেশে চলে যাব। পরে জানাই.....ঐভাবে হঠাৎ চলে আসার জন্য আপনারা নিশ্চয় অবাক হয়েছেন। আমার অভদ্রতাও হয়েছে স্বীকার করি। কিন্তু কেন ঐভাবে চলে আসতে হলো সে কথা সেদিন বলতে ভরসা পাইনি....বিশেষ করে আপনার মেয়ের সামনে। আপনার মেয়ে আমায় দু'চক্ষে দেখতে পারে না, অপমান করে। আমার অপরাধ, আমি বলেছিলাম, আপনাদের বাড়িতে প্রেতাত্মার যাওয়া আসা আছে। সেই কারণে আপনাদের মঙ্গলের জন্যই ছোটখাটো যজ্ঞশান্তি করতে চেয়েছিলাম। আপনারা তো আমার কথা বিশ্বাস করেনইনি, আপনাদের মেয়ে আমায় যাচ্ছেতাই অপমান করে। সেই কারণে হঠাৎ কেন চলে আসতে হলো, তা তখন বলতে চাইনি। আজ বলছি। ঐ সাহেবটি আসার পর থেকেই ওর ওপর আমার সন্দেহ হয়। লোকটা ঠিক স্বাভাবিক নয়। আমার সামনাসামনি ঘর। তাই লক্ষ্য রাখতে লাগলাম। এই গরমেও দু-দিনের মধ্যে ওকে স্নান করতে দেখিনি। প্যান্ট জামা ছাড়তে দেখিনি, কোনওদিন রান্না করতে দেখিনি। শুনেছিলাম ও নাকি বাইরে থেকে খেয়ে আসে। কেন? আপনাদের বাড়িতে তো আদর যত্নের ত্রুটি নেই। আমি তো আপনাদের কাছে বেশ কয়েকদিন থেকে সেটাই বুঝলাম। তবে সাহেব কেন খেতে চাইত না? সেদিন রাত তখন এগারোটা হবে। সাহেবের ঘরে খুটখাট শব্দ হচ্ছিল। ভাবলাম, এত রাতে কি করছে সাহেব? উঁকি মেরে দেখলাম সাহেবের ঘরের দরজা ভেজানো। অন্যদিন ঘরে ঢুকেই খিল দেয়। আজ বোধহয় খিল দিতে ভুলে গেছে। খুব কৌতূহল হলো। পা টিপে টিপে ওর ঘরের দরজার কাছে দাঁড়ালাম। সাবধানে দরজাটা ফাঁক করলাম। অমনি যে দৃশ্য নজরে পড়ল তা দেখে আঁৎকে উঠলাম। দেখলাম সাহেব দু'হাতে করে বড়ো বড়ো কাঁচা মাংসের টুকরো খাচ্ছে। মাংসের রক্ত ওর দু'কষ বেয়ে গড়াচ্ছে। আর ঠিক তখনিই সাহেব আমায় দেখে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে ও সেই রক্তমাখা হাত তুলে মোটা মোটা আঙুলগুলো ফাঁক করে আমার গলা টিপে ধরতে এল। আমি ভয়ে " বাপরে" বলে চিৎকার করে ছুটে ঘরে গিয়ে খিল দিলাম। এই হলো ব্যাপার। আমি নিশ্চিত, ও মানুষ নয়.....রাক্ষস কিংবা দানব কিংবা পিশাচ। আপনাদের আবার সাবধান করে দিলাম। যত শীঘ্র সম্ভব ওকে তাড়ান। নইলে পুলিশে দিন। নতুবা বিপদে পড়বেন...... চিঠিটা পড়ে সুধীনবাবু অবাক। জুলির মা'ও চিন্তায় পড়লেন। এ কি সম্ভব? লোকটা একটু পাগলাটে ঠিকই কিন্তু ঠাকুরমশাই যা বলছেন তা সত্যি হলে মারাত্মক ব্যাপার। আর এই লোকের সাথে ওঁর ছেলেমেয়ে দুটো অজানা অচেনা জায়গায় গেল! কোনও ঠিকানা পর্যন্ত নেই। এখন তো ওদের সাবধান করে দেবারও উপায় নেই। তাহলে? গভীর দুশ্চিন্তায় পড়লেন সুধীনবাবু ও তাঁর স্ত্রী। ( চলবে) ----------------


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৩৮ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now