বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
সবাই তখন ছোট। বুঝতাম না তেমন কিছু। সবার
মধ্যে দুরন্তপনা, হৈহুল্লোড় বেশ ছিল। বাড়ির চাতাল
পেরিয়ে, মাঠ মাড়িয়ে, নদীর স্রোত ভেঙে
হরদম ছুটে বেড়াতাম গ্রামের প্রতিটি বাঁকে।
মফস্বলের বিন্দু বালির সঙ্গেও আমাদের মিতালি ছিল
গভীর। কিশোরদের খেলার মাঠে ছিলাম
অধিনায়ক। কলেজের ভিপি, জিএসের মতো
প্রাইমারিতে আমরা ছিলাম নেতা। তখন আনন্দ ছিল
আমাদের জীবনের প্রধান উপজীব্য। সবাই
চলতাম একসঙ্গে, এক পথে, কাঁধে হাত দিয়ে,
পাখির মতো গলায়-গলায় ভাবে। শেষে একবার
পোশাকেও দেখালাম আমাদের ঐক্যের সংসার।
কিন্তু আজ? সময়ের ভেলায় চেপে, জীবনের
বাস্তবতার কাছে পরাজিত হয়ে আমরা এখন কে
কোথায়? বছর ঘুরে বছর শুরু হয়, তবু কারও দেখা
নেই। এই ইলেকট্রনিকসের যুগে কথা হয় না
সপ্তাহ পেরিয়ে মাসেও। জীবন কত বৈচিত্র্যময়!
ব্যস্ততায় ঘেরা। আমরাও কত অদ্ভুত!
অথচ এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। বেদনার দগ্ধ
ছুরিকাঘাতে ভেতর-বাহিরকে বহু খণ্ডিত করে কাছ
থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দূরে বহুদূরে বিবাগির
মতো জীবন যাপনের কথা তো আদৌ ছিল না।
প্রাইমারি ইশকুলের শহীদ মিনারের মেঝেতে
বসে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার যে সৌধ আমরা নির্মাণ
করেছিলাম, কচিকাঁচা মনের নির্ভেজাল প্রণয় দিয়ে
তাতে আজ বোধ হয় ছারপোকা, ঘুণ পোকা
ধরেছে।
২০০৪ সালে সবে প্রাইমারিতে পা দিয়েছি। হাতেখড়ি
হয়েছে বাসায়, ভর্তি হলাম তৃতীয় শ্রেণিতে।
ইশকুলে প্রথম প্রথম আমার খুব নিঃসঙ্গ সময় কাটত।
ভালো লাগত না কিছুই। বন্ধু ছিল না একটাও। ক্লাস
শেষে শীতে কাঁপা পাখির মতো জড়সড় এবং
সঙ্গীহারা বিহঙ্গের মতো উদাস দৃষ্টিতে জানালা
দিয়ে দূরের মেঘনা দেখতাম। তা ছাড়া আমার ভিন্ন
কিছু করার উপকরণ ছিল না।
এক মাস বাদে মডেল টেস্ট দেওয়ার পর আমরা
পাঁচজন বন্ধু হলাম। সম্পর্কের নাটাই বাঁধলাম। আমরা
কম মজা করেই না সবার নাম দেয়ালে লিখলাম। একটা
জুতসই লাভের বৃত্ত এঁকে দিয়েছিল সুমন। আহা!
কী মধুর প্রাণবন্ত ছিল সেই প্রহরগুলো।
চোখের পলকে গত হলো প্রথম বছর। গেল
বছরেই আমাদের জম্পেশ ভাব জমেছিল।
একসঙ্গে ইশকুলে গমন থেকে শুরু করে এক
বেঞ্চে আঁটসাঁট করে আসন পাতা, ভাগ করে
টিফিন খাওয়া, গোল্লাছুট, ডাঙ্গুলি, ক্রিকেট খেলায়
জোট বাঁধা, মেঘনার খাল-বিলে ঝাঁপ দেওয়া।
পরের বছর ঠিক দুপুরে ব্রিজ থেকে ঝাঁপ দিতে
গিয়ে যেদিন সালামের হাত ভেঙে গিয়েছিল,
সেদিনের কথা আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে।
চোখের পানি নরম গাল বেয়ে বুক পর্যন্ত
ভিজিয়ে দিয়েছে আমাদের। আমাদের যেন
রাজ্যের চিন্তা পেয়ে বসেছিল কদিন। তারপর
তো সালাম সুস্থ হওয়া নাগাদ আমরা কোনো খেলায়
মন দিইনি।
প্রাইমারি শেষান্তে সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে ভিন্ন ভিন্ন
প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলাম। দিন কারও যাচ্ছে না। সবাই
উদ্বিগ্ন উদাস বিহ্বল। পড়তে চলতে খেতে
অকেজো। নিঃসঙ্গতার কাঁটাতারে শরীর
ক্ষতবিক্ষত হলে, বন্ধুহীনা অসহায়ত্ব
অক্টোপাসের মতো গ্রাস করলে, ভয়াল উত্তাল
তরঙ্গে বইঠাহীন অক্ষম নাবিক হয়ে যখন আমরা
কেউ আর সামনে চলতে পারছি না, তখন আমরা
আবার আগের সেই আমরা হলাম।
আপন আকাশে ঘুড়ি উড়ালাম। এক আত্মার মঞ্চ
কায়েম করলাম। জড়ো হলাম এক ইশকুলে। হাতে
হাত রেখে ওয়াদাবদ্ধ হয়েছিলাম, প্রাণ যায় যাক, কভু
এ বাঁধন যাবে না ছিঁড়ে।
হায়! প্রেম। ভালোবাসা। বন্ধুত্ব। জীবনের কঠিন
অপ্রিয় বাস্তবতার কাছে হেরে গিয়ে আজ আমরা
কে কোথায়? সবাই কত দূরে দূরে। সালাম আতাউর
সৌদিতে, রবি কুয়েতে, সুমন কাতারে আর আমি
বাঙালি বাংলায় রয়ে গেলাম। সঙ্গে আলী বাবা। কিন্তু
ব্যস্ততা যেন কারও পিঠ আর ছাড়ছে না।
কত দিন হলো কারও সাক্ষাৎ নেই। মনে হয়
কয়েক যুগ ধরে কেউ কাউকে দেখছি না।
সেদিন একাকী অসহায় ভগ্ন হৃদয়ে
অকালবোধনে সেই ছেলেবেলার প্রাইমারি
ইশকুলের শহীদ মিনারে দেখি সুমনের আঁকা লাভ
বৃত্তের ওপর পলেস্তারা পড়েছে কয়েক দফা।
সেই ছেলেবেলার কথা মনে হলে যাতনার
জাঁতাকল সর্বাঙ্গে চেপে ধরে বেলা-অবেলায়।
বিরহ বেদনা কুয়াশার মতো ধেয়ে আসে চারি ধার
থেকে। হাতির পদদলিত গাছের শুকনা পাতার মতো
ভেতরাত্মাটাও পিষে যায় কখনো। তখন আমাকে
আমি হারিয়ে ফেলি।
রায়হান রাশেদ
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now