বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মহেন্দ্র চলিয়া যাওয়ার কিছুদিন
পরেই আশা যখন কাশীতে আসিল,
তখন অন্নপূর্ণার মনে বড়োই আশঙ্কা
জন্মিল। আশাকে তিনি
নানাপ্রকারে নানা প্রশ্ন
জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন, “হাঁ
রে চুনি, তুই যে তোর সেই চোখের
বালির কথা বলিতেছিলি, তোর
মতে, তার মতন এমন গুণবতী মেয়ে
আর জগতে নাই?”
“সত্যই মাসি, আমি বাড়াইয়া
বলিতেছি না। তার যেমন বুদ্ধি
তেমনি রূপ, কাজকর্মে তার তেমনি
হাত।”
“তোর সখী, তুই তো তাহাকে
সর্বগুণবতী দেখিবি, বাড়ির আর-
সকলে তাহাকে কে কী বলে শুনি।”
“মার মুখে তো প্রশংসা ধরে না।
চোখের বালি দেশে যাইবার কথা
বলিতেই তিনি অস্থির হইয়া ওঠেন।
এমন সেবা করিতে কেহ জানে না।
বাড়ির চাকর দাসীরও যদি কারো
ব্যামো হয় তাকে বোনের মতো, মার
মতো যত্ন করে।”
“মহেন্দ্রের মত কী।”
“তাঁকে তো জানই মাসি, নিতান্ত
ঘরের লোক ছাড়া আর-কাউকে তাঁর
পছন্দই হয় না। আমার বালিকে
সকলেই ভালোবাসে, কিন্তু তাঁর
সঙ্গে তার আজ পর্যন্ত ভালো বনে
নাই।”
“কী রকম।”
“আমি যদি-বা অনেক করিয়া
দেখাসাক্ষাৎ করাইয়া দিলাম, তাঁর
সঙ্গে তার কথাবার্তাই প্রায় বন্ধ।
তুমি তো জান, তিনি কী রকম কুনো–
লোকে মনে করে, তিনি অহংকারী,
কিন্তু তা নয় মাসি, তিনি দুটি-
একটি লোক ছাড়া কাহাকেও সহ্য
করিতে পারেন না।”
শেষ কথাটা বলিয়া ফেলিয়া হঠাৎ
আশার লজ্জাবোধ হইল, গাল-দুটি
লাল হইয়া উঠিল। অন্নপূর্ণা খুশি
হইয়া মনে মনে হাসিলেন–কহিলেন,
“তাই বটে, সেদিন মহিন যখন
আসিয়াছিল, তোর বালির কথা
একবার মুখেও আনে নাই।”
আশা দুঃখিত হইয়া কহিল, “ঐ তাঁর
দোষ। যাকে ভালোবাসেন না, সে
যেন একেবারেই নাই। তাকে যেন
একদিনও দেখেন নাই, জানেন নাই,
এমনি তাঁর ভাব।”
অন্নপূর্ণা শান্ত স্নিগ্ধ হাস্যে
কহিলেন, “আবার যাকে
ভালোবাসেন মহিন যেন
জন্মজন্মান্তর কেবল তাকেই দেখেন
এবং জানেন, এ ভাবও তাঁর আছে।
কী বলিস, চুনি।”
আশা তাহার কোনো উত্তর না
করিয়া চোখ নিচু করিয়া হাসিল।
অন্নপূর্ণা জিজ্ঞাসা করিলেন,
“চুনি, বিহারীর কী খবর বল্ দেখি।
সে কি বিবাহ করিবে না।”
মুহূর্তের মধ্যেই আশার মুখ গম্ভীর
হইয়া গেল–সে কী উত্তর দিবে
ভাবিয়া পাইল না।
আশার নিরুত্তর ভাবে অত্যন্ত ভয়
পাইয়া অন্নপূর্ণা বলিয়া উঠিলেন,
“সত্য বল্ চুনি, বিহারীর অসুখেিবসুখ
কিছু হয় নি তো?”
বিহারী এই চিরপুত্রহীনা রমণীর
স্নেহ-সিংহাসনে পুত্রের মানস-
আদর্শরূপে বিরাজ করিত।
বিহারীকে তিনি সংসারে
প্রতিষ্ঠিত দেখিয়া আসিতে
পারেন নাই, এ দুঃখ প্রবাসে
আসিয়া প্রতিদিন তাঁহার মনে
জাগিত। তাঁহার ক্ষুদ্র সংসারের
আর-সমস্তই একপ্রকার সম্পূর্ণ
হইয়াছে, কেবল বিহারীর সেই
গৃহহীন অবস্থা স্মরণ করিয়াই
তাঁহার পরিপূর্ণ বৈরাগ্যচর্চার
ব্যাঘাত ঘটে।
আশা কহিল, “মাসি, বিহারী-
ঠাকুরপোর কথা আমাকে জিজ্ঞাসা
করিয়ো না।”
অন্নপূর্ণা আশ্চর্য হইয়া জিজ্ঞাসা
করিলেন, “কেন বল্ দেখি।”
আশা কহিল, “সে আমি বলিতে
পারিব না।” বলিয়া ঘর হইতে উঠিয়া
গেল।
অন্নপূর্ণা চুপ করিয়া বসিয়া
ভাবিতে লাগিলেন, “অমন সোনার
ছেলে বিহারী, এরই মধ্যে তাহার
কি এতই বদল হইয়াছে যে, চুনি আজ
তাহার নাম শুনিয়া উঠিয়া যায়।
অদৃষ্টেরই খেলা। কেন তাহার সহিত
চুনির বিবাহের কথা হইল, কেনই-বা
মহেন্দ্র তাহার হাতের কাছ হইতে
চুনিকে কাড়িয়া লইল।”
অনেক দিন পরে আজ আবার
অন্নপূর্ণার চোখ দিয়া জল পড়িল–
মনে মনে তিনি কহিলেন, “আহা,
আমার বিহারী যদি এমন-কিছু
করিয়া থাকে যাহা আমার
বিহারীর যোগ্য নহে, তবে সে
তাহা অনেক দুঃখ পাইয়াই
করিয়াছে, সহজে করে নাই।”
বিহারীর সেই দুঃখের পরিমাণ
কল্পনা করিয়া অন্নপূর্ণার বক্ষ
ব্যথিত হইতে লাগিল।
সন্ধ্যার সময় যখন অন্নপূর্ণা
আহ্নিকে বসিয়াছেন, তখন একটা
গাড়ি আসিয়া দরজায় থামিল, এবং
সহিস বাড়ির লোককে ডাকিয়া রুদ্ধ
দ্বারে ঘা মারিতে লাগিল।
অন্নপূর্ণা পূজাগৃহ হইতে বলিয়া
উঠিলেন, “ঐ যা, আমি একেবারেই
ভুলিয়া গিয়াছিলাম, আজ কুঞ্জর
শাশুড়ির এবং তার দুই বোনঝির
এলাহাবাদ হইতে আসিবার কথা
ছিল। ঐ বুঝি তাহারা আসিল। চুনি,
তুই একবার আলোটা লইয়া দরজা
খুলিয়া দে।”
আশা লণ্ঠন-হাতে দরজা খুলিয়া
দিতেই দেখিল, বিহারী দাঁড়াইয়া।
বিহারী বলিয়া উঠিল, “এ কী
বোঠান, তবে যে শুনিলাম, তুমি
কাশী আসিবে না।”
আশার হাত হইতে লণ্ঠন পড়িয়া
গেল। সে যেন প্রেতমূর্তি দেখিয়া
এক নিশ্বাসে দোতলায় ছুটিয়া
গিয়া আর্তস্বরে বলিয়া উঠিল,
“মাসিমা, তোমার দুটি পায়ে পড়ি,
উঁহাকে এখনই যাইতে বলো।”
অন্নপূর্ণা পূজার আসন হইতে
চমকিয়া উঠিয়া কহিলেন, “কাহাকে
চুনি, কাহাকে।”
আশা কহিল, “বিহারী-ঠাকুরপো
এখানেও আসিয়াছেন।” বলিয়া সে
পাশের ঘরে গিয়া দ্বার রোধ
করিল।
বিহারী নীচে হইতে সকল কথাই
শুনিতে পাইল। সে তখনই ছুটিয়া
যাইতে উদ্যত–কিন্তু অন্নপূর্ণা
পূজাহ্নিক ফেলিয়া যখন নামিয়া
আসিলেন, তখন দেখিলেন, বিহারী
দ্বারের কাছে মাটিতে বসিয়া
পড়িয়াছে, তাহার শরীর হইতে
সমস্ত শক্তি চলিয়া গেছে।
অন্নপূর্ণা আলো আনেন নাই।
অন্ধকারে তিনি বিহারীর মুখের
ভাব দেখিতে পাইলেন না,
বিহারীও তাঁহাকে দেখিতে পাইল
না।
অন্নপূর্ণা কহিলেন, “বেহারী!”
হায়, সেই চিরদিনের
স্নেহসুধাসিক্ত কণ্ঠস্বর কোথায়। এ
কণ্ঠের মধ্যে যে কঠিন বিচারের
বজ্রধ্বনি প্রচ্ছন্ন হইয়া আছে। জননী
অন্নপূর্ণা, সংহার-খড়গ তুলিলে কার
‘পরে। ভাগ্যহীন বিহারী যে আজ
অন্ধকারে তোমার মঙ্গলচরণাশ্রয়ে
মাথা রাখিতে আসিয়াছিল।
বিহারীর অবশ শরীর আপাদমস্তক
বিদ্যুতের আঘাতে চকিত হইয়া
উঠিল, কহিল, “কাকীমা, আর নয়, আর
একটি কথাও বলিয়ো না। আমি
চলিলাম।”
বলিয়া বিহারী ভূমিতে মাথা
রাখিয়া প্রণাম করিল, অন্নপূর্ণার
পাও স্পর্শ করিল না। জননী যেমন
গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন করে,
অন্নপূর্ণা তেমনি করিয়া
বিহারীকে সেই রাত্রের অন্ধকারে
নীরবে বিসর্জন করিলেন, একবার
ফিরিয়া ডাকিলেন না। গাড়ি
বিহারীকে লইয়া দেখিতে
দেখিতে অদৃশ্য হইয়া গেল।
সেই রাত্রেই আশা মহেন্দ্রকে
চিঠি লিখিল-
“বিহারী-ঠাকুরপো হঠাৎ আজ
সন্ধ্যাবেলা এখানে
আসিয়াছিলেন। জেঠামশায়রা কবে
কলিকাতায় ফিরিবেন, ঠিক নাই–
তুমি শীঘ্র আসিয়া আমাকে এখান
হইতে লইয়া যাও।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now