বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
এই বুড়ো বয়সে আর প্রাক-যৌবনের কথা আমার ঠিকঠাক মনে নেই। সম্ভবত আমি সবে বহরমপুর থেকে কলকাতায় জীবিকার খোঁজে চলে এসেছি। তখন তরুণ এক যুবক। এখানে-সেখানে ঘোরাঘুরি - আত্মীয়স্বজনের বাসায় উঠি। থাকি খাই। আমার সমুদ্র মানুষ বইটি তখন মিত্রালয় থেকে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশক গৌরিশঙ্কর ভট্টাচার্য সস্নেহে বইটি প্রকাশ করেছেন। এবং দুশো টাকা অগ্রিম দিয়েছেন। মানিক স্মৃতি পুরস্কারেও সম্মানিত হয় বইটি। মতি নন্দী পান প্রথম পুরস্কার, দ্বিতীয় পুরস্কার পান পূর্ণেন্দু পত্রী, তৃতীয় পুরস্কারের জন্য আমি নির্বাচিত হই। উল্টোরথ পত্রিকার এই প্রতিযোগিতা এবং
তৃতীয় পুরস্কার আমার সাহিত্যজীবনের প্রথম ধাপ বলা যেতে পারে। বহরমপুরের হবু সাহিত্যিকদের কাছে এজন্য আমি ঋণী। তাঁদের প্রেরণাতেই আমার উপন্যাস রচনা। তাঁদেরই একজন পা-ুলিপিটি উল্টোরথ পত্রিকা অফিসে কলকাতায় এসে জমা দেন।
আর সেইসব প্রিয় বন্ধু বেঁচে আছে কিনা জানা নেই। তাঁদের কারো সঙ্গে আমার আর যোগাযোগও নেই। কখনো বহরমপুরে গেলে খোঁজ যে না করেছি তাও নয়, আমার বন্ধুরা অধিকাংশই পিডবিস্নউডির কোয়ার্টারের বাসিন্দা। আমার বন্ধু প্রশান্ত কান্তি সেনগুপ্তর দাদা পিডব্লিউডির হেডক্লার্ক সম্ভবত।
প্রথমদিকে খোঁজখবর নিতে পিডব্লিউডির অফিসেও গেছি। কারো খোঁজ পাইনি। শুধু একজন হদিস দেয় - প্রশান্ত বিয়ে করেছে, কোনো এক বেসিক কলেজের প্রিন্সিপাল সে। তাও আবার উত্তরবঙ্গে। আমার প্রিয় বন্ধুর সঙ্গেও সেই যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল আজ পর্যন্ত আমার আর তাঁর সঙ্গে দেখা হয়নি। এই নগণ্য লেখকের এই বেদনার কথা বড় গভীর। প্রশান্ত না থাকলে আমার লেখকসত্তা যে বন্ধ্যা তাও বুঝি। আর লেখা থেকে আর্থিক উপার্জন ক্রমশ বাড়তে থাকে। রয়েলটি থেকেও ভালো আয় হয়। স্কুলের বেতন যতই সামান্য হোক, বেতনে আমাদের ভালোই চলে যায়। কিন্তু বিধি বাম, স্কুলের চাকরিটি কপালে সইল না।
আবার বাসাবদল। আবার বাড়ি ফিরে আসা। তবে ইতোমধ্যে স্ত্রীর একটি চাকরি জুটে গেল - শ্যামবাজার বালিকা বিদ্যালয়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট টিচার। কলকাতায় এসে, মহারাজকুমার সোমেন নন্দীর সঙ্গে দেখা - বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনে তাঁর সঙ্গে আলাপ, তাঁর সঙ্গে দেখা করতেই তিনি তাঁর সঙ্গে তাঁর বাড়িতে দেখা করতে বলেন।
কাশিমবাজার রাজবাটিতে একটি অংশে আমার দুই নাবালক পুত্রসহ আমি এবং আমার স্ত্রীর থাকার বন্দোবস্ত করে দেন তিনি।
কাশিমবাজার হাউসের একপ্রান্তে তিনটি ঘরে আমার থাকার ব্যবস্থা করে দেন।
সেখানেই আমার দুই পুত্র বড় হয়েছে - কাশিমবাজারের এই রাজপরিবারটির পূর্বপুরুষ মহারাজ মনীন্দ্র চন্দ্র নন্দী, তাঁর প্রচুর
দানধ্যানের খ্যাতি আছে। মহারাজকুমার সোমেন্দ্র চন্দ্র নন্দীর সঙ্গে বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনে আলাপ। তারপর সখ্য। তিনি বললেন, তোমার লেখা আমি পত্রপত্রিকায় পড়েছি।
এখন কী লিখছ!
কী যে বলি! বললাম থাকারই সংস্থান নেই। দেশে স্ত্রী-পুত্রকে রেখে এসেছি।
- তোমার পুত্রদের পড়াশোনা -
কিছু বলতে পারি না, চুপ করে থাকি।
তিনি সোজা বলে দিলেন, আমি তোমার লেখা পড়েছি। আর কোথাও ছোটাছুটি করবে না - তাঁর ক্যালকাটা অফিস থেকে কাউকে ডেকে পাঠালেন - তিনি এলে বললেন, বাগানের সংলগ্ন ঘরগুলোতে ও থাকবে। ওর স্ত্রী-পুত্ররাও থাকবে। কথাবার্তা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে আছি। এত বড় রাজপ্রাসাদের কোনো এক অংশে আমাদের থাকার বন্দোবস্ত করে দিচ্ছেন। কিন্তু কোনো কাজের কথা বলছেন না। শুধু ওঠার সময় বললেন, পরেশবাবুকে বলে দেবেন, এখন থেকে এই ছেলেটি কলার প্রিন্টিংয়ে ম্যানেজারের অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করবে।
বাড়িটা রাজবাড়ি - তার দুপাশে বিশালমতি দোতলা রাজপ্রাসাদ। স্বপ্ন না সত্যি, বিশ্বাস করতে পারছি না।
অগত্যা কলকাতা। মহারাজকুমার সোমেন্দ্র চন্দ্র নন্দী বলেছিলেন কোনো অসুবিধা হলে আমার কাছে চলে এসো - সেই থেকে কাশিমবাজার হাউসে আশ্রয়। তাঁর কলার প্রিন্টিং কোম্পানির অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার।
সেখানেও গণ্ডগোল। বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন।
মিছিল-মিটিং-অনশন যাবতীয় অস্ত্র প্রয়োগের ফল লকআউট। মাসের পর মাস লকআউট, বেতন নেই, থাকার জায়গা নেই,
মা-বাবা, ভাই-বোন এবং স্ত্রী-পুত্র পরিবার, নিঃস্ব এক মানুষ। বাধ্য হয়ে রাজবাড়ি ছাড়তে হয়। বাগুইহাটির দিকে বাসা ভাড়া নিয়ে চলে আসি।
ঠিক এই সময়েই কবি মনীন্দ্র রায় অমৃত পত্রিকায় একটি ধারাবাহিক উপন্যাস শুরু করতে বলেন। নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে উপন্যাসটি সেই থেকে ধারাবাহিক শুরু হয়। ধারাবাহিক লেখার ফলে লেখক হিসেবে স্বীকৃতিও কিছুটা বৃদ্ধি পায়।
প্রথমে মিত্রালয় প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয় সমুদ্র মানুষ, তারপর সমুদ্র পাখির কান্না - এবং অমৃত, দেশ, আনন্দবাজার, যুগান্তর পত্রিকায় তখন নিয়মিত লেখক।
এত বেশি লেখার চাপ সবসময় বহন করতে-করতে লেখক ছাপও পড়ে গেল। করুনা প্রকাশনী, আনন্দ - আরও সব প্রকাশকের আগ্রহে বইও প্রকাশ হতে থাকে এবং ক্রমশ এভাবেই নিয়মিত লেখক বলে চিহ্নিত হই।
ততদিনে বিমল করেরও এক আস্থাভাজন লেখক।
কার্জন পার্কে প্রায় বিকেলেই হবু লেখকদের একটি আড্ডাও বসে। বিমল কর সেই আড্ডার মধ্যমণি। আমরা যাঁরা হবু লেখক তাঁরাই এই আড্ডার প্রাণ বলা যায়। বিমলদার প্রিয় কেসি দাসের দোকান থেকে জলযোগ সেরে সাঁজবেলায় আমরা সব হবু লেখকরা গোল হয়ে বসতাম। কার্জন পার্কে, বিমলদা আড্ডা সেরে আমাকে নিয়ে বাস ধরতেন। কলেজ স্ট্রিটে নামতাম। তারপর আনন্দ পাবলিশার্সের বাদলের (বাদল বসু) অফিসে আর এক প্রস্ত আড্ডা, শেষবেলায় বিমলদা আর আমি একই বাসে রওনা দিতাম।
একাদশীর সকালেই নদীর ঘাটে নৌকা এসে ভিড়ত শীতলক্ষার বাবুদের ঘাটে। ভরা নদী - শীতলক্ষা নদী তখন সমুদ্র হয়ে যেত। এপার-ওপার অদৃশ্য হয়ে যেত - জোয়ারের সময় জল বাড়ত, ভাটার সময় নদীর চরের দু-একটা বেলা ঘাসের মাথা দেখা যেত।
জল কমে গেলে নদীতে ভাটা শুরু, জল বাড়লে নদীতে জোয়ার এসে যায়।
এই জোয়ার-ভাটার সুযোগে জলে ফেলা ডালপালার ঝোপে শ্যাওলা খেতে মাছেরা উঠে আসত নদী থেকে। ঠিক জল নেমে যাওয়ার মুখে সেঁচা বাঁশের বেড়া দিয়ে জলে ফেলা ডালপালা ঘিরে ফেলা হতো। পাঁচ-সাত দিন অন্তর-অন্তর জলে ফেলা ডালপালা ঘিরে মাছ ধরার কৌতূহলে আমরা সুকুমারদাকে জ্বালিয়ে মারতাম। কবে ফের ডালপালা তুলে মাছ ধরা হবে। এই এক কৌতূহল।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now