বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
শুন্যতার সায়াহ্ন
- অর্থহীন অমিত
-- কি রফিক সাহেব, আজ দেখি আমার আগেই চলে এসেছেন
আরাফাত সাহেবের কথায় রফিক সাহেব পিছনে তাকালেন। আর বললেন,
- প্রতিদিন চেষ্টা করি আপনাকে হারানোর জন্য কিন্তু পারি না। তবে আজ ঠিকই হারিয়ে দিলাম, অবশ্য এর পুরো কৃতিত্ব আমার নাতিটার।
-- কেনো?? ঘুমের মধ্যে পানি ঢেলে দিয়েছে নাকি আজ।
বলেই আরাফাত সাহেব প্রচন্ড শব্দ করে হাসতে লাগলেন। রফিক সাহেবও হাসলেন আর বললেন,
- ঠিক তা নয় তবে আজ সে আমার ঘুম ভাঙ্গিয়েছে। তার আজ জন্মদিন তো তাই
-- তাই নাকি!!
- হ্যা ভাই,আজ সে ভীষন খুশি।
-- তা তো হবেই। কি দিচ্ছেন নাতিটাকে?
- কি দেয়া যায় বলুনতো?
-- চলেন, হাটতে হাটতে ডিসাইড করি।
রফিক সাহেব আর আরাফাত সাহেব এক সময় কলিগ ছিলেন তবে এখন দু-জনেই রিটায়ার্ড। তবে এখনো সেই পুরনো অভ্যাসটা রয়ে গেছে। ভোরের ব্যায়াম করাটা এক সময় অবধারিত ছিলো, এখনো আছে তবে সেটা এখন শুধুমাত্র হাটায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। তারা এক সাথে চাকরী জীবনের শেষের অংশটুকু কাটিয়েছেন। অনেক আনন্দ বেদনার সাক্ষী একজন আরেক জনের। তারা সকালের মিষ্টি রোদের শুভ্র আলোয় পার্কের নরম ঘাসের উপর দিয়ে হাটছেন আর কথা বলছেন,
-- আচ্ছা আপনার নাতির বয়স কতো?
- ৬ বছর, ক্লাস ওয়ানে পড়ে
-- হুম
- কি মিষ্টি করে কথা বলে জানেন। ওর কথা শুনলে আত্মাটা শান্তি হয়ে যায়।
-- রফিক সাহেব আপনি সত্যি খুব ভাগ্যবান।
এটা বলার পর আরাফাত সাহেবের মুখটা বিমর্ষ হয়ে গেলো কারন উনার একটা মাত্র ছেলে, সে সস্ত্রীক আমেরিকায় থাকে। উনার এক নাতি ও এক নাতনি। তবে নাতি অথবা নাতনিকে সরাসরি দেখার কপাল হয়নি উনার। মাঝে মাঝে স্কাইপে কথা হয় তাদের সাথে, তাতে কি স্বাদ মিটে? রফিক সাহেব বললেন,
- হ্যা ভাই তা ঠিক বলেছেন। আমার পরিবারে হাজারো সমস্যা আছে, ছেলেদের কাঁধে বোঝা হয়ে গেছি। মাঝে মাঝে অনেক কিছু শুনেও না শুনার ভান করি তবে এই নাতি নাতনির মুখ দেখলে সব দুঃখ মিলিয়ে যায়।
-- আচ্ছা ভাই বাদ দেন এইসব। এখন বলেন আপনার নাতি কি পছন্দ করে?
- হাপিয়ে উঠেছি ভাই, দাড়ান একটু আর আমি মনে করার চেষ্টা করি।
কিচ্ছুক্ষণ পর রফিক সাহেব বললেন,
- আমার এই নাতিটা ছবি আঁকতে বেশ পছন্দ করে। মাঝে মাঝে এটা সেটা এঁকে এনে আমাকে দেখায়।
-- তবে তাকে রং পেন্সিল দেয়া যায়
- ভালো বলেছেন smile emoticon
চলুন আজ আর হেঁটে কাজ নেই। একটা স্টেশনারী দোকান খুঁজে বের করতে হবে। সেই উচ্ছিলায় ক্ষাণিকটা হাটাও হবে।
-- তবে চলুন
রফিক সাহেব আর আরাফাত সাহেব হাটতে হাটতে একটা স্টেশনারী দোকানে উপস্থিত হলেন। দোকানি মাত্র দোকান খুলেছে। তারা বিভিন্ন রকমের রং পেন্সিলের প্যাকেট দেখলেন অবশেষে একটা পছন্দও হলো। আরাফাত সাহেব দোকানিকে ঐ রং পেন্সিলের দুটো প্যাকেট দিতে বললেন আর রফিক সাহেবকে বললেন
-- একটা আপনার আর একটা আমার পক্ষ থেকে নাতিকে দিলাম। আপনার নাতি তো আমারও নাতি।
*****
রফিক সাহেব রং পেন্সিলের প্যাকেট দুটো পাঞ্জাবীর পকেটে করে বাসায় ফিরলেন।
বাসার ঢুকতেই সবাইকে ভীষন ব্যস্ত দেখলেন। কিন্তু বুঝতে পারলেন না এই ব্যস্ততার কারণ, তিনি নিজের রুমে গেলেন। এটা উনার রুম ছিলো না, এক সময় খালিই পড়ে থাকতো ছাদের এর ঘরটা। রফিক সাহেবের ৪ ছেলে আর ১মেয়ে। মেজো ছেলের বিয়ের পর বুঝতে পারলেন ঘরের জায়গার সমস্যা হচ্ছে তখনই তিনি নিজে থেকেই এই ঘরটা বেছে নিয়েছেন। একা মানুষ, উনার স্ত্রী মারা গেছেন তাও ১০ টি বছর পার হয়ে গেছে। উনি সারা দিনই এই ঘরটাতে পরে থাকেন, শুধু খাওয়ার সময় নিচে যান। তাও মাঝে মাঝে যখন অতিথি আসে তখন এটাও বদলাতে কারন তখন উনার ভার্সিটিতে পড়ুয়া ছোট ছেলেটা উনার সাথে ঘুমায়। উনার ঘরে ছোট একটা চৌকি, একটা বুক সেলফ, চেয়ার টেবিল আর একটা ফ্যান। ফ্যানটাও উনার মতো বার্ধক্যের শিকলে বন্দী। পত্রিকা আর বই এই দুইটাই অবসরের সঙ্গী। ছোট্ট একটা জানালাও আছে উনার রুমে। মধ্য রাতে যখন ঘুম ভাঙ্গে উনার, তখন চুপটি করে ঐ জানালাটা খুলে প্রচন্ড অভিমানে তাকিয়ে থাকেন আকাশের একটা তারার দিকে। ঐ তারাটাকে উনি এখন খুব সহজেই অনুমান করতে পারেন । মাঝে মাঝে মেজো ছেলের নাতিটা আসে উনার কাছে ছবি আঁকার বায়না নিয়ে আর আজ তারই জন্মদিন।
রফিক সাহেব হাত মুখ পরিষ্কার করে নাস্তার জন্য নিচে গেলেন। টেবিলে সবাই একসাথে। রফিক সাহেবের বড় ছেলে পিয়াল উনাকে বললো,
-- বাবা, আমরা সবাই রাঙামাটি যাচ্ছি
- তাই!!! আগে বলবি না আমায়। মানসিক একটা প্রস্তুতি আছেনা আমার, তুই বড় হয়েছিস ঠিক কিন্তু বুদ্ধি হলো না।
-- না মানে আমরা এখনি বের হবো। তোমার নাতি নাতনির পরীক্ষা শেষ সব গুলোর তাছাড়া আজ রাতুলের ছেলেটার জন্মদিনও সেই উপলক্ষেই এই আয়োজন।
- ভালোতো। আমাকে ১০ মিনিট সময় দে, আমি প্রস্তুত হয়ে আসছি।
রফিক সাহেব অর্ধেক চা রেখে উঠে যাচ্ছিলেন তখন পিয়াল বললো,
-- বাবা ঐ খানে এখন অনেক শীত। তাছাড়া তুমি ঐ জায়গার ঠান্ডটা সহ্য করতে পারো না।
- এটা নিয়ে চিন্তা করিস না। গরম কাপড় বেশী করে নেবো
-- আমি বলছিলাম কি, বাসাতো খালি আর প্রচন্ড শীত এই বার। তাই তুমি বরং বাসায় থাকো। তুমি এই শীত সহ্য করতে পারবেনা বাবা, অসুস্থ হয়ে পড়বে।
রফিক সাহেব আবার চেয়ারটাতে বসলেন,তিনি তার ছেলের দিকে তাকালেন না। প্রায় ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন,
- তা ঠিক বলেছিস, ইদানীং ঠান্ডা মোটেও সহ্য হয় না রে। আর বাসাটাও খালি থাকবে, তোরাই বরং ঘুরে আয়। মাত্রই কয়েকটা দিন, আমি বেশ কাটিয়ে দিবো।
পিয়াল আর কিছু বললো না। রফিক সাহেব চুপ করে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চা টা শেষ করলেন। আজকের চা টা শেষ করতে বেশ ক্ষাণিকটা সময় নিলেন। চা শেষ করে উনি রুমের দিকে রওনা দিলেন। ছাদে দাড়িয়ে দাড়িয়ে ওদের চলে যাওয়া দেখলেন, তাকিয়ে রইলেন দৃষ্টির শেষ সীমা পর্যন্ত তার পর, আবার একা। নাতির জন্য কেনা রং পেন্সিলের প্যাকেট গুলো টেবিলেই পড়েছিলো, এগুলোর দিকে দৃষ্টি যেতেই আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না, হু হু করে কেঁদে উঠলেন রফিক সাহেব। বেশ ক্ষাণিকটা সময় পর উনি জানালাটার কাছে গেলেন, নিঃশব্দে গ্রীল ধরে দাড়ালেন। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ঐ আকাশ পানে। দিনের বেলা আকাশে তারা দেখা যায় না, তবুও উনি বিষন্ন দৃষ্টিতে গভীর ঐ নিঃশব্দ মহাশুন্যের দিকে তাকিয়ে রাইলেন কারন আজ এই মহাশুন্যের সাথে নিজের অদ্ভুত একটা মিল খোঁজে পেয়েছেন আর সেটা হলো ঐ মহাশুন্যের মতো তিনিও নি:স্ব, স্তব্ধ আর প্রচন্ড একাকী।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now