বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ডুবো পাহাড় চ্যাপ্টার- ২ বাকি অংশ

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X ডুবো পাহাড় চ্যাপ্টার- ২ বাকি অংশ গভর্নর হাউজের খাস বৈঠকখানা। গভর্নর বিবি মাধব একটা সোফায় বসে। তার সামনে আরেক সোফায় আরও দু’জন লোক বসে। কথা বলছিল বিবি মাধব, ‘হ্যাঁ, আমাদের সামনে থেকে প্রধান বাধা, প্রধান শত্রু আহমদ মুসা শেষ হয়েছে। কিন্তু আমাদের আসল কাজ একটুকুও এগোয়নি। আহমদ শাহ আলমগীর মুখ খোলেনি। সে মুখ না খুললে বাক্স পাওয়া যাবে না। বাক্স না পাওয়া গেলে আমাদের জন্য শিবাজী মহাপ্রভুর রেখে যাওয়া মহাভারত গঠনের নীলনকশা আমরা পাব না এবং মোগলদের গোপন ধনভা-ারও আমরা হাত করতে পারবো না। দুটোই আমরা চাই, একটা জাতির জীবন হিসেবে, আরেকটা জাতির সমৃদ্ধির জন্যে।’ থামল বিবি মাধব। তার সামনের সোফায় বসে থাকা দুজনের একজনের চেহারা ভারতীয়, অন্যজন বিদেশী, সেমেটিক চেহারা। বিবি মাধব থামতেই ভারতীয় চেহারার লোকটি বলে উঠল, ‘এটা খুবই আশ্চর্যের যে, এতদিনে সবকিছু করেও একজন লোকের কাছ থেকে কথা আদায় করা গেল না। অবিশ্বাস্য ঘটনা।’ ‘অবিশ্বাসের কিছু নয় জেনারেল স্বামীজী। যে মৃত্যু চায়, কোন নির্যাতন, কোন ভয় তাকে বাধ্য করতে পারে না।’ জেনারেল স্বামীজীর পুরোনাম জেনারেল জগজিৎ জয়রাম। দু’বছর আগে তিনি ভারতীয় সেনা প্রধানের দায়িত্ব থেকে অবসর নিয়েছেন। অবসর নেয়ার পরেই তিনি ‘শিবাজী সন্তান সেনার সদস্য হয়েছেন। আজ তিনি ‘মহাসংঘ’ এর একজন মহাগুরুত্বপূর্ণ নেতা। তার নাম আজ জেনারেল স্বামী জগজিৎ জয়রাম মহাগুরু। মহাগুরু স্বামী শংকরাচার্য শিরোমনি গ্রীনভ্যালি অপারেশনে নিহত হলে তার দায়িত্ব নিতে মহারাষ্ট্র থেকে এসেছেন। তিনি আন্দামানে ‘মহাসংঘ’ এর দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে কাজ করছেন। বিবি মাধব থামলে জেনারেল স্বামীজি বলে উঠল, ‘তাহলে উপায় কি?’ ‘উপায় তার মানসিক প্রতিরোধ ভেঙ্গে দেয়া। এ ধরনের আদর্শবাদীদের দৈহিক কষ্ট দিয়ে তাদের মানসিক প্রতিরোধ ভাঙ্গা যায় না। আহমদ শাহ আলমগীরের মা-বোনের ইজ্জত আহমদ শাহ আলমগীরের মত লোকদের কাছে নিজ জীবনের চেয়ে লক্ষগুণ বেশি মূল্যবান।’ জেনারেল স্বামীজির কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কথা বলল বিদেশী চেহারার লোকটি। বিদেশী চেহারার লোকটির নাম দানিয়েল ডেভিড। ইসরাইলী গোয়েন্দা কর্মকর্তা সে। ইসরাইলের সেরা চৌকষ গোয়েন্দা কোলম্যান কোহেন আহমদ মুসার হাতে নিহত হবার পর তার স্থানে কাজকরতে এসেছে দানিয়েল ডেভিড। দানিয়েল ডেভিড থামতেই বিবি মাধব বলল, ‘ওদের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। আহমদ মুসা ওদের উদ্ধার করে নিয়ে গিয়েছিল উত্তর আন্দামানের গ্রীনভ্যালিতে। আহমদ মুসা সেখান থেকে চলে আসার পর এবং বিস্ফোরণে বোটসহ আহমদ মুসা ধ্বংস হবার পর কয়েকবার আমরা গ্রীনভ্যালিতে গোপনে খবর নিয়েছি সেখানে আহমদ শাহ আলমগীরের মা-বোনরা নেই। আহমদ মুসাই তাদেরকে সরায় অথবা পরে তারা সরে যায়। তাদেরকে চারদিকে খোঁজা হচ্ছে। কিন্তু তারা কোথায় এ সম্পর্কে কোন ক্লু আমরা এখনও পাইনি।’ থামল বিবি মাধব। ‘তাহলে উপায় কি? তাদের খোঁজ পাওয়ার উপরই নির্ভর করছে আমাদের লক্ষ অর্জন।’ বলল জেনারেল স্বামীজি। সোফায় হেলান দিয়ে ছিল বিবি মাধব। জেনারেল স্বামীজি থামলেও বিবি মাধব সঙ্গে সঙ্গে কথা বলল না। তার চোখে-মুখে গভীর চিন্তার ছাপ। দানিয়েল ডেভিডের মুখেও কোন কথা ছিল না। এক সময় বিবি মাধব সোজা হয়ে সোফায় বসল। বলল, ‘হ্যাঁ, আর কোন উপায় না দেখে আমি একটা উপায় বের করেছি। নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করার মত।’ ‘সেটা কি?’ উদগ্রীব জেনারেল স্বামিজী জিজ্ঞাসা করল। ‘সেটা বলার জন্যে আমি আজ আপনাদের ডেকেছি।’ এটুকু বলে মুহূর্তের জন্যে থামল বিবি মাধব। পরক্ষণেই শুরু করল আবার, ‘আজ সকালে আমার মেয়ে আমার স্ত্রীর সাথে মন্দির থেকে আসার পথে কিডন্যাপ হয়েছে। কিডন্যাপ হয়েছে মানে আমি কিডন্যাপ করিয়েছি।’ থামল বিবি মাধব। জেনারেল স্বামিজী ও দানিয়েল ডেভিড দু’জনেরই মুখ হা হয়ে গেছে বিস্ময়ে। তাদের মুখে কোন কথা নেই। তাদের বিস্ফোরিত চোখ গভর্নর বিবি মাধবের উপর নিবদ্ধ। শুরু করল বিবি মাধব আবার, ‘আহমদ শাহ আলমগীরের কাছ থেকে কথা আদায়ের শেষ, নিরাপদ ও অব্যর্থ ব্যবস্থা হিসেবে আমরা এটা করেছি।’ গলাটা পরিষ্কার করার জন্যে একটু থেমেছিল। সেই সুযোগে দানিয়েল ডেভিড বলে উঠল, ‘আপনার মেয়ের কিডন্যাপ হওয়ার সাথে আহমদ শাহ আলমগীরের কাছ থেকে কথা আদায়ের কি সম্পর্ক রয়েছে! আমরা তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’ ‘আছে। আপনারা একটা বিষয় জানেন যে, আমার মেয়ে ও আহমদ শাহ আলমগীর এক সাথে পড়তো। আহমদ শাহ আলমগীর ভালোবাসে আমার মেয়ে সুষমাকে। আমরা সুষমাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করতে চাই, আহমদ শাহ আলমগীরের কাছ থেকে কথা আদায়ের জন্যে।’ ‘কিভাবে?’ বলল দানিয়েল ডেভিড। ‘আহমদ শাহ আলমগীরের সামনে একটা নাটক করা হবে। তার কাছ থেকে যা জানতে চাওয়া হচ্ছে তা না বললে তার প্রেমিকা ধর্ষিতা হচ্ছে, এই হবে সে নাটক। আমার বিশ্বাস আহমদ শাহ আলমগীরের মা-বোনকে ব্যবহার করে যে ফল পাওয়া যেত, এক্ষেত্রেও সে ফল পাওয়া যাবে।’ বিবি মাধব বলল। ‘কিন্তু আপনার মেয়ে এবং আহমদ শাহ আলমগীর দুজনেই এটা ধরে ফেলতে পারবে। তাদের এত দিনে জেনে ফেলা স্বাভাবিক যে, আপনি বা আপনার সরকার আহমদ শাহ আলমগীরের আটক করার পেছনে রয়েছে।’ বলল জেনারেল স্বামিজী। ‘আহমদ শাহ আলমগীর এ ব্যাপারে কিছুই জানে না। আমার মেয়েও নয়। সে কোনওভাবে সন্দেহ করলেও কিডন্যাপ হওয়ার পর নিশ্চিত হবে যে, তার পিতা কিংবা পিতার সরকার আহমদ শাহের কিডন্যাপের সাথে নেই।’ ‘কিন্তু কিডন্যাপ, মানে কিডন্যাপ নাটকের যে কোন পর্যায়ে তার কাছে প্রকাশ হয়ে পড়তে পারে যে, তার পিতা বা পিতার সরকার তাকে একটা রক্তাক্ত নাটকের উপকরণে পরিণত করেছে। তখন সব পরিকল্পনা প- হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া আপনার মেয়ে সব কথা প্রকাশ করে সমস্যা বাড়াতে পারে, আমি ভয় করছি।’ বলল দানিয়েল ডেভিড। ‘সেটা আমি চিন্তা করেছি মি. ডেভিড। চারজন চৌকশ মহিলা গোয়েন্দা সুষমাকে পাহারা দিয়ে রাখবে। অধিকাংশ সময় তাকে রাখবে ঘুম পাড়িয়ে। প্রয়োজনীয় কয়েকটা কথার বাইরে কেউ একটা কথাও তার সাথে বলবে না। মহাসংঘের সুরক্ষিত অফিসগুলোতেই তাকে রাখা হবে। সুতরাং আপনি যে আশঙ্কা করছেন তার কোনই সম্ভাবনা নেই।’ বিবি মাধব বলল। ‘কিন্তু মহামুনি স্যার, আহমদ শাহ আলমগীর যদি মুখ না খোলে। মুখ খোলার জন্যে ধর্ষনের নাটকও শুরু করতে হতে পারে। তারপরও যদি মুখ না খোলে। নাটককে যদি শেষ পর্যায় পর্যন্ত নিতে হয়?’ বলল জেনারেল স্বামীজি। হঠাৎ মলিন হয়ে উঠল বিবি মাধবের মুখ। কিন্তু মুহূর্তেই তা মিলিয়ে গেল। শক্ত হয়ে উঠল তার মুখ। তার মুখের পেশীগুলো যেন শক্ত পাথরের রূপ নিল। বলল, ‘আহমদ শাহ আলমগীরের কাছ থেকে বাঞ্জিত তথ্য আদায়ের জন্যে যে কোন পর্যায় পর্যন্ত আমি যাব। মেয়েকেও আমি কুরবানী দেব।’ একটু থামল বিবি মাধব। তার মুখটি সহজ হয়ে এল। বলল, ‘তবে আমি মনে করি, সে পর্যন্ত যেতে হবে না। তার আগেই কথা তার কাছ থেকে পাওয়া যাবে।’ ‘ধন্যবাদ ‘মহামুনি স্যার’ আপনাকে। আপনার এই ত্যাগের মনোভাব জাতির জন্যে একটা মহান দৃষ্টান্ত এবং আমাদের জন্য একটি অফুরন্ত প্রেরণা। কিন্তু স্যার, আহমদ শাহ আলমগীর যদি বিষয়টা আসলেই না জানে, তাহলে বলবে কি করে? সে ক্ষেত্রে আমাদের তো দু’কুলই যাবে।’ বলল জেনারেল স্বামীজী। ‘এমন ভাবার কোন অবকাশ নেই। আহমদ শাহ আলমগীরের বাপ বেঁচে নেই। সুতরাং তাকে এটা জানতেই হবে। প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে তার কাছে তথ্যটা থাকবেই। সেসব কথা বললেই আমরা সেটা বুঝতে পারব।’ ‘ধন্যবাদ। ঠিক বলেছেন, মহামুনি স্যার।’ জেনারেল স্বামীজী বলল। ‘বাই দি বাই। দি গ্রেট শিবাজীর সেই দলিলে কি আছে, আপনারা সেটা কি জানেন?’ বলল দানিয়েল ডেভিড। ‘মহাপ্রভু শিবাজী দলিলটি প্রনয়ের পর দ্বিতীয় যে ব্যক্তি এটা দেখেছেন, তিনি তার পুত্র শম্ভুজী। শিবাজী মহাপ্রভু ও শম্ভুজীর ডাইরি থেকে দলিল সম্পর্কে কিছু জানা গেছে। শিবাজী মহাপ্রভু তার ডাইরীর এক জায়গায় লিখেছেন, ‘বাইশ বছর বয়সকালে ১৫৭১ সালের বৈশাখ শুক্লা নবমী বৃহস্পতিবার মহারাষ্ট্রের এক পাহাড়ে স্বর্গীয় পুরুষ গুরু রামদাস স্বামীর কাছে পরমার্থতত্ত্ব সম্পর্কে দীক্ষা লাভের পর দিব্যজ্ঞান লাভ হল। তাতে দেখলাম, আমি যে রাজ্য ফেলে পাহাড়ে এসেছিলাম, সে রাজ্য আসমুদ্র হিমাচল এবং সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াব্যাপী বিস্তৃত হয়ে মায়ের পবিত্র রূপ নিয়ে শুধু আমাকে নয় আমার পেছনে দাঁড়ানো আর্য সন্তানদের ডাকছে। সে দিব্যজ্ঞানের নির্দেশেই সেই পাহাড়ে বসে মা-রূপী সে সা¤্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা ও প্রশাসনের জন্যে একটা দলিল রচনা করলাম। তারপর রাজ্যে ফিরে এসে রাজপাটে বসে ‘মহাভারত’ এর সংগ্রাম শুরু করলাম।’ তাঁর ডাইরীর সর্বশেষ বাক্য হিসেবে লিখেছেন, ‘মহাপবিত্র’ দলিলটির মহাগুরুভার আমি পুত্র শম্ভুজীকে অর্পণ করে গেলাম।’ আর শম্ভুজী তার ডাইরীর এক জায়গায় লিখেছেন, ‘বাপুজীর মহাপবিত্র দলিলটি আমি সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায় রেখেও রক্ষা করতে পারলাম না। মোগল স¤্রাট আলমগীর আওরঙ্গজেব আমার মত দলিলটিকেও বন্দী করে দিল্লী নিয়ে যাচ্ছে।’ দলিলটি সম্বন্ধে শম্ভুজীর ডাইরীতে আর কিছু পাওয়া যায়নি। আর শিবাজী মহাপ্রভু দলিলের বিষয় সম্পর্কে যেটুকু বলেছেন, তার চেয়ে বেশি জানা যায়নি।’ থামল বিবি মাধব। আবেগে ভারী হয়ে উঠেছিল তার কণ্ঠ। গম্ভীর হয়ে উঠেছিল দানিয়েল ডেভিডের মুখও বলল, ‘বুঝলাম, দলিলটা আমাদের ‘টেন কমান্ডমেন্ট’ এর মতই আপনাদের কাছে মূল্যবান। অবশ্য আমাদের ‘টেন কমান্ডমেন্টটা ডিভাইন।’ একটু থামল দানিয়েল ডেভিড। একটা ঢোক গিলে সঙ্গে সঙ্গেই সে আবার বলে উঠল, ‘একটা সা¤্রাজ্যের সীমা সেন্ট শিবাজী এঁকেছেন তার ডাইরীর ঐ বক্তব্যে। তাঁর দলিলেও নিশ্চয় এটা আরও তিনি সুনির্দিষ্ট করেছেন। ষোড়শ শতকের এই চিন্তাকে আপনারা এখন বাস্তব মনে করেন?’ ‘শুধু বাস্তব নয়, আমরা একে ‘ধ্রুব’ মনে করি। আমরা সর্বশক্তি দিয়ে এর জন্যেই কাজ করছি। আমাদের মহাসংঘের এই একটাই লক্ষ্য। এর জন্যে যা করা দরকার, তা আমরা করব। আমার জীবন তুল্য সন্তান আমার মেয়েকে এই লক্ষ্যেই বলি দিতে রাজি হয়েছি।’ বলল বিবি মাধব। আবেগে প্রায় রুদ্ধ হয়ে উঠেছিল তার কণ্ঠ। ‘স্যার, আপনাদের উদ্দেশ্যের প্রতি আমার আন্তরিক সম্মান। কিন্তু এতবড় উদ্দেশ্যের বাস্তবায়ন আপনাদের সংবিধান ও সরকার ব্যবস্থার সহায়তা ছাড়া কিভাবে হতে পারে, আমি বুঝতে পারছি না। আপনাদের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষ এবং আপনাদের সরকারকে সে সংবিধানকেই মান্য করতে হবে। আপনারা তাহলে কিভাবে শিবাজীর মানে আর্য সন্তানদের ‘মহাভারত’ গঠন করবেন?’ দানিয়েল ডেভিড বলল। ‘সংবিধান, সরকার সবই জনতার জন্যে এবং জনতার দ্বারা। সুতরাং জনতা সবকিছু পরিবর্তন করে যা চায়।’ বলল বিবি মাধব। ‘কিন্তু আপনাদের সমর্থিত দল তো জনতার সমর্থনে ক্ষমতায় গিয়েছিল, তারা তো কোন পরিবর্তনই আনতে পারেনি।’ দানিয়েল ডেভিড বলল। ‘কমপক্ষে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় যেতে হবে। সে সুযোগ আমাদের এখনও হয়নি। তাছাড়া প্রস্তুত হওয়ার কাজ আমাদের শেষ হয়নি।’ বলল বিবি মাধব। ‘কি প্রস্তুতি?’ দানিয়েল ডেভিড বলল। ‘মহাসংঘের কাজ এখনও সব জায়গায় পৌছেনি। শিবাজী মহাপ্রভুর ‘দলিল’ এখনও আমাদের হাতে আসেনি। ওটাই তো আমাদের মূল পাথেয় এবং ওটা আমাদের বাস্তবায়নের বিষয়ও।’ বলল বিবি মাধব। ‘তাহলে তো দেখা যাচ্ছে আপনারা যা চান, যা করবেন, তা এখনও নির্দিষ্ট নয় আপনাদের কাছে।’ দানিয়েল ডেভিড বলল। ‘এ কথা ঠিক নয়। রামচন্দ্রের মহাভারত আমাদের সামনে আছে। আমরা যা করব, আমরা তা জানি। শিবাজী মহাপ্রভুর নির্দেশনা সেটাকে আরও সুনির্দিষ্ট ও পূর্নাঙ্গ করবে মাত্র।’ বলল বিবি মাধব। ‘বুঝেছি। ধন্যবাদ।’ ‘ওয়েল কাম মি. দানিয়েল ডেভিড।’ কথা শেষ করেই উঠে দাঁড়াল বিবি মাধব। বলল, ‘আপনারা বসুন। আরও কিছু কথা আছে। আমি ছোট্ট একটা কাজ সেরে আসছি।’ ড্রইংরুম থেকে দ্রুত বেরিয়ে বিবি মাধব তার রেসিডেন্ট অফিসের দিকে ছুটল। জ্ঞান ফিরে আসার সাথে সাথে সুষমা রাও চোখ খুলেই এক ঝটকায় উঠে বসল। দেখতে পেল একটু দূরে ঘরের ঠিক মাঝখানে চারজন মুখোশধারী মহিলা মেঝেতে বসে চাদর পেতে তাস খেলছে। তাদের প্রত্যেকের পাশে একটি করে রিভলবার। মনে পড়ল সুষমা রাওয়ের, সে মন্দির থেকে মায়ের সাথে তাদের বাড়ির দিকে আসছিল। মন্দিরটা তাদের বাড়ির পাশেই এবং তা তাদের গভর্নর হাউজের নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেই। বাড়ি ও মন্দিরের মাঝামাঝি জায়গায় তারা আসতেই একটা মাইক্রো তীর বেগে এসে তাদের পাশে দাঁড়ায়। মাইক্রো থেকে মুখোশধারী কয়েকজন নেমে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। একজন তার মুখে একটি রুমাল চেপে ধরে, অন্যেরা তাকে চ্যাংদোলা করে তুলে নেয় মাইক্রোতে। রুমাল থেকে একটা মিষ্টি গন্ধ তার নাকে প্রবেশ করে। তারপর আর কিছু মনে নেই। আতংকের এক প্রবল চাপ নামে তার মনের উপর। শাহ বানুরা যেভাবে কিডন্যাপ হয়েছিল, তাহলে সেও ঐভাবে কিডন্যাপ হয়েছে। শরীল ও মন তার থর থর করে কেঁপে ওঠে। চারজন মুখোশধারী মেয়ের দিকে তাকিয়ে ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল, ‘কে আপনারা? আমাকে কেন ধরে এনেছেন?’ তারপর হাত-পায়ের বাঁধনের দিকে চেয়ে কান্না জড়িতকণ্ঠে বলল, ‘আমি কি অপরাধ করেছি?’ চারজন মুখোশধারীর কেউ কোন কথা বলল না। ফিরেও তাকাল না তার দিকে। ‘কেন কি করেছি আমি, ছেড়ে দাও আমাকে?’ কান্নার সাথে বলল সে। এবার মুখোশধারীদের একজন পাশে রাখা রিভলবার তুলে নিয়ে তার দিকে ঘুরল। হাত উঠাল উপরে। তর্জনি তার রিভলবারের ট্রিগারে। চাপল সে ট্রিগার। একটা গুলী বেরিয়ে সুষমা রাওয়ের চুল ছুঁয়ে গিয়ে বিদ্ধ করল পেছনের দেয়ালকে। বুক ফাটা আতংকে সুষমা রাওয়ের চোখ দু’টি বিস্ফোরিত হয়েছিল। মাথার উপর দিয়ে গুলী চলে গেলেও বেঁচে যাওয়ার কোন স্বস্তি তার চোখে মুখে ফুটে উঠল না। বুঝল সে, এরা পাখির মত মানুষও মারতে পারে। এবার গুলী তার চুল ছুঁয়ে গেছে পরের গুলী হয়তো মাথা ভেদ করে যাবে। কারা এই নিষ্ঠুররা? যারা শাহ বানুদের কিডন্যাপ করেছিল, যারা আহমদ শাহ আলমগীরকে কিডন্যাপ করেছে, যারা ডজন ডজন মানুষকে আন্দামানে খুন করেছে, তারাই কি এরা? কিন্তু তারা আমার জন্যে মেয়ে প্রহরী দিয়েছে কেন? মেয়ের জন্যে মেয়ে প্রহরী এমন নীতিবোধ তো তাদের থাকার কথা নয়? আসলে এরা কারা? এই সময় ঘরের একটা মাত্র দরজা নিঃশব্দে খুলে গেল। ঘরে প্রবেশ করল বিশাল বপু একজন মহিলা। তার পেছনে সৈনিকের পোশাকধারী একজন পুরুষ। দুজনেরই মুখে মুখোশ। মহিলার হাতে রিভলবার, আর সৈনিকের হাতে ষ্টেনগান। সুষমা বুঝল সৈনিক লোকটি পদস্থ মহিলাটির গার্ড। ‘কি ঘটনা, গুলী কেন?’ ঘরে ঢুকেই বলল মহিলাটি। ভেতরের চারজন মহিলা বিশাল বপু মহিলাটি ঘরে ঢুকতেই তাকে দু’হাত তুলে নমষ্কার করেছিল। তার প্রশ্নের উত্তরে একজন বলল, ‘মহা মাতাজী, মেয়েটি কান্না জুড়ে দিয়েছিল। থামিয়ে দেবার জন্যে ওই ব্যবস্থা করেছি আমরা।’ ‘গুড।’ বলল বিশাল বপু মহিলাটিই। ‘ধন্যবাদ, মহামাতাজী।’ সেই মেয়েটিই বলল। ‘তবে দেখ, এখনই গুলীটা যেন মাথায় ঢুকে না যায়। তার ডার্লিং এর কাছ থেকে যদি কথা আদায় করে দিতে পারে, তাহলে দুজনেরই মুক্তি। আর কথা আদায় করে দিতে না পারলে তাকে মরার আগেই মরতে হবে। তারপর এক সময় আসল মরণ।’ বলল বিশাল বপু মহিলাটি। বিশাল বপু মেয়েটির কথা শুনে কৌতুহল ও আশা জাগল সুষমা রাওয়ের মনে। বলল, ‘আমার ডার্লিং, কে সে ম্যাডাম?’ বিশাল বপু মেয়েটিকে লক্ষ্য করে বলল সুষমা রাও। ‘কেন আহমদ শাহ আলমগীর? সে তোমার প্রেমিক নয়?’ সুষমা রাও মহিলাটির প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলল, ‘তার কাছ থেকে কি কথা আদায় করতে হবে?’ ‘একটি বাক্সের কথা। বাক্সটি তার বাসায় কোথাও লুকানো আছে। আমরা বাক্সটি চাই।’ বলল বিশাল বপু লোকটি। ‘বাক্সের জন্যেই কি তাকে ধরেছেন?’ সুষমা রাও বলল। ‘হ্যাঁ, তাই।’ ‘ওঁদের বাড়িতে তো এখন কেউ নেই। বাক্সটি আপনারা খুঁজে নিতে পারেন।’ ‘আমরা আগেই খুঁজেছি। না পেয়েই তো তাকে ধরা হয়েছে।’ ‘বাক্সের কথা উনি তোমাদের বলছেন না?’ ‘বলছে না। সে মানুষ নয়, একটা পাথর। এত আঘাতে পাথরও ভেঙে যেত, কিন্তু তাকে মুখ খোলানো যায়নি।’ মুহূর্তেই মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল সুষমা রাওয়ের। বেদনার এক প্লাবন নামল তার চোখে-মুখে। ছল ছলিয়ে উঠল তার দুচোখ। এক অসহনীয় যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ল বুক থেকে সর্বত্র। একটু সময় নিয়ে বলল, ‘বাক্সটি কি এমন গুরুত্বপূর্ণ যে এজন্যে তাকে কিডন্যাপ করেছেন, নির্যাতন করছেন?’ ‘ওর মধ্যে আমাদের প্রাণ আছে। ও বাক্সটা আমাদের।’ ‘বাক্সটা আপনাদের হলে উনি দেবেন না কেন?’ ‘সেটাই তো আমাদের কথা। দেবে না কেন?’ সে মরতে রাজি, কিন্তু বাক্সের ব্যাপারে মুখ খুলতে রাজি নয়।’ মুখ মলিন হয়ে গেল সুষমা রাওয়ের। মরতে রাজি, কিন্তু বাক্স দিতে রাজি নয়। তাহলে কি বাক্সটি তাদের জন্যেও মূল্যবান? বাক্সটি কি.........।’ সুষমা রাওয়ের ভাবনায় ছেদ পড়ল মহিলাটির কথায়। সে বলছে, ‘বাক্সটি তুমি আমাদের আদায় করে দাও। এজন্যে আমরা তোমাকে এনেছি।’ ‘যদি এমনই হয় যে, তিনি মরতে রাজি বাক্স দিতে রাজি নয়, তাহলে আমার কথায় তা তিনি অবশ্যই দেবেন না।’ ‘সে তোমাকে ভালোবাসে।’ ‘যদি তাই হয়, তিনি যা চান না, আমি সেটার জন্যে চাপ দেব কেন? আর অন্যায় কথা তিনি শুনবেন কেন? আর ভালোবাসলেই যে সব কথা শুনতে হবে, মানতে হবে, তা স্বাভাবিক নয়।’ ‘হ্যাঁ, ওটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা অস্বাভাবিকটা চাচ্ছি। তুমি অবশ্যই তাকে বলবে, তাকে শুনতেও হবে এবং সে শুনবেই।’ বিস্ময় নামল সুষমা রাওয়ের চোখে-মুখে। বলল, ‘শুনবেই, এ কথা কেমন করে বলছেন ম্যাডাম?’ সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল না মহিলাটি। সে হো হো করে হেসে উঠল। কিন্তু সেটা যেন হাসি নয়, একটা বিকৃত চিৎকার। তার চোখে-মুখে লালসার বন্যা। তার চিৎকার ও চেহারা দেখে আঁৎকে উঠল সুষমা রাও। বিশাল বপু মহিলাটি একটু সময় নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘সে চোখের সামনে তার সুন্দরী প্রেমিকা ধর্ষিতা হচ্ছে এটা দেখতে চাইবে না। সুতরাং কোন অসুর পুরুষ তোমার দেহের কাপড় টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে নেকড়ে যেমন শিকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সেভাবে তোমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, তখন তার মুখ থেকে বাক্সের কথা সুড় সুড় করে বেরিয়ে আসবে।’ মহিলাটির কথা শেষ না হতেই থর থর করে কেঁপে উঠেছে সুষমা রাওয়ের দেহ। সে বুঝতে পারল ওরা কি ষড়যন্ত্র করেছে! ভয় ও আতংকে কুঁকড়ে গেল সুষমা রাওয়ের দেহ। আবার হেসে উঠল মহিলাটি। কুৎসিত হাসি। বলল, ‘এখনই কুঁকড়ে অর্ধেক হয়ে গেছ! তখন কেমন হবে অবস্থা! আর তোমার সে অবস্থা দেখে কি অবস্থা হবে তোমার প্রেমিকের!’ কোন কথা বলল না সুষমা রাও। চোখ বন্ধ করেছে সে। তার মনে হচ্ছে সে এক গহীন জঙ্গলে। চারদিক থেকে তাকে ছিঁড়ে খাবার জন্যে নেকড়েরা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় মনে পড়ল তার আহমদ মুসার কথা। তিনি কি জানতে পারবেন তার কিডন্যাপ হওয়ার কথা! আর.......। সুষমা রাওয়ের ভাবনা ছিড়ে গেল আবার বিশাল বপু মহিলাটির অট্টহাসিতে। হাসতে হাসতে বিজয়ীর ভঙ্গিতে সে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। সুষমার দেহটা লুটিয়ে পড়ল খাটিয়ার উপর।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১০০ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ডুবো পাহাড় চ্যাপ্টার- ৪ বাকি অংশ
→ ডুবো পাহাড় চ্যাপ্টার- ৩ বাকি অংশ
→ ডুবো পাহাড় চ্যাপ্টার- ১ বাকি অংশ

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now