বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
৫.
গত দেড় ঘণ্টায় সাতকাপ চা আর পাঁচটা সিগারেট খেয়েছে আরিফ। চায়ে মাছি পড়ায় সাত নাম্বার কাপটা শেষ করতে পারেনি। বাইরে ঝা ঝা রোদ। আজকালকার কলেজগুলোর আশেপাশে গাছ থাকেনা। ধূলো ভরা রাস্তায় টুংটাং করে কয়েকটা রিকশা যাচ্ছে। গাড়িগুলো রাস্তার প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে পার্ক করা। ড্রাইভাররা অধিকাংশই গাড়ির ভিতরে বসে জানালা লাগিয়ে ঘুমাচ্ছে। জানালার কাঁচগুলো ঘোলাটে হয়ে এসেছে, গায়ে জমেছে বিন্দু বিন্দু পানির কণা। আরিফের মনে হচ্ছিল, কিছুক্ষণের জন্যে গাড়ির ড্রাইভার হতে পারলে মন্দ হত না। কলেজ ছুটি হতে এখনও প্রায় বিশ মিনিট। আধখাওয়া চায়ের কাপে ভাসতে থাকা মাছিটাকে গভীর মনোযোগের সাথে দেখছিল ও। এর আগেও আরো দু’দিন এসেছিল আরিফ। তৃণাকে খুঁজে পায়নি। আজকে নাকি পরীক্ষা আছে ওদের। কে জানে, আজকে হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে ওকে। ঝাঁকে ঝাঁকে মেয়ে বেরিয়ে আসছে গেট দিয়ে। আরিফের কাছে সবাইকে একইরকম লাগছে। মনে হচ্ছে, একই পোশাক পরা একদল চাইনীজ। ওই তো তৃণা! পাশের ছেলেটা কে? নাহ! এটা ওই ছেলে না! গাড়িগুলোকে পাশ কাটিয়ে ফুটপাত ধরে তৃণা হাঁটতে শুরু করেছে। কেউ নেই ওর সাথে। আরিফ ভাবে, এখনি কথা বলার সবচেয়ে ভালো সময়। কিন্তু, কি বলবে? যা বলতে চেয়েছিল, মনে হচ্ছে সেটা এখানে বলাটা বোকামি হবে। মাথার চুল খামচে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে আরিফ। তারপর তৃণার পিছন পিছন হাঁটতে শুরু করে। হাঁটতে হাঁটতে কয়েকবার আরিফ ভাবে, তৃণার পাশে এগিয়ে গিয়ে থামতে বলবে। এভাবে ভাবতে ভাবতে একসময় তৃণা একটা সবুজ রঙের গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে যায়। বোকার মতো বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে আরিফ। মনে মনে বলে,
“শালা, মানুষের ভালো করা সেই গ্যাঞ্জামের কাজ!”
তৃণার থেকে একটু দূরত্বে হাঁটছে আরিফ। পকেটের ভিতরে একটা হাত চিঠি নাড়াচাড়া করছে। তিন দিন পার হয়ে গেছে এর মধ্যে। আরিফ একদিনও ওর সাথে কথা বলার সাহস জুগিয়ে উঠতে পারেনি। তবু প্রতিদিন মন্ত্রমুগ্ধের মতো ও তৃণার পিছন পিছন আসে। আজ তাই একটা চিঠি লিখে নিয়ে এসেছে। আরিফ একটু দ্রুত হাঁটতে শুরু করে। কিন্তু, তৃণা যেন আজকে একটু বেশিই জোরে হাঁটছে। একটু পরেই ও পাড়ার ভিতরে ঢুকে যাবে। তখন চিঠিটা দেয়া ঝামেলা হয়ে যাবে। আরিফ আরেকটু গতি বাড়ায়। একবার পিছন ফিরে তাকিয়ে তৃণা মোড়ের ওপাশে চলে যায়। মোড়টা ঘুরতেই আরিফ আবিস্কার করে, কয়েকটা লম্বা-চওড়া ছেলে ওকে ঘিরে ধরেছে। একটা ছেলে ওর কাছে চলে আসে। পাশে দাঁড়িয়ে তৃণা অল্প অল্প কাঁপছে। ছেলেটা তৃণার দিকে তাকাতেই তৃণা বলল,
“সাব্বির ভাই, এই ছেলেটাই!”
ছেলেটা আরিফের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ কিছু বোঝার আগেই একটা প্রচণ্ড চড়ে আরিফ মাটিতে পড়ে যায়। আরেকটা ছেলে আরিফকে আবার তুলে দাঁড় করায়। সাব্বির নামের ছেলেটা আরিফের কলার ধরে বলে,
“তুই ওর পিছু নিছিস কেন্?”
আরিফ হঠাৎ ঘামতে শুরু করে। এসব কি হচ্ছে?
“কিরে বাইন**! কথা বলিস না ক্যান? ... ইয়ে তৃণা, তুমি একটু সাইডে গিয়ে দাঁড়াও।”
আরিফ কাঁপছে।
“দেখেন, আমি একটা জরুরী দরকারে তৃণার সাথে কথা বলতে আসছি। প্লিজ, আমাকে একটু ওর সাথে কথা বলতে দেন।”
“জরুরী দরকার? এইজন্যেই তুমি তিন দিন ধইরা ওরে ফলো করো, না?”
“দেখেন, আপনারা ভুল বুঝতেছেন। আমি ওকে ডিস্টার্ব করতে আসিনাই। আমি –”
“আরে ওই! এই শালা তো দেখি মহাজ্ঞানী! ওয় ঠিক বুঝে, আর আমরা সব ভুল!”
“তৃণা, প্লিজ শোন -”
ঠাস করে আরেকটা চড় খেয়ে তাল হারিয়ে ফেলে আরিফ।
“কিরে শুয়োরের বাচ্চা, তুই আমাদের সামনে দাঁড়াইয়া আবার ওরে ডাকোস? ওই, ওরে ভালো কইরা ধর! তৃণা, তুমি বাসায় যাও। আঙ্কেল – আন্টিরে আমার সালাম দিয়ো।”
“সাব্বির ভাই –”
“আরে তোমারে বললাম তো, বাসায় যাও। কোন সমস্যা নাই।”
তৃণা পিছন ফিরে দৌড় দেয়। আরিফ চিৎকার করে ওকে ডাকে,
“তৃণা, শোন... প্লিজ দাঁড়াও! তৃণা, আমি-”
একটা লাথি খেয়ে মাটিতে পড়ে যায় আরিফ। সাব্বির পাশে রাখা একটা হকিস্টিক নিয়ে আসে। এরমধ্যে মাটিতে পড়ে থাকা আরিফের মুখে আর বুকে কয়েকটা লাথি মারে সাব্বিরের সাথে থাকা ছেলেগুলো। বাম পায়ের হাঁটুতে হকিস্টিক দিয়ে একটা বাড়ি মারে সাব্বির। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় চিৎকার করে ওঠে আরিফ। আবার ওই হাঁটুতে বাড়ি মারে সাব্বির। আরিফ আবার চিৎকার করতেই ওর মুখে লাথি মারে সাব্বিরের পাশে থাকা ছেলেটা।
কিছুক্ষণ পর যখন ওকে ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়ায় ছেলেগুলো, আরিফ তখন বালিতে মুখ গুঁজে পড়ে আছে। ওর মুখ দিয়ে বের হয়ে আসা রক্তে কালচে হয়ে গেছে বালি। বামচোখ ফুলে আছে রক্তমাখা কদমের মতো, ডানহাতটা শরীরের পাশে পড়ে আছে বেকায়দা ভঙ্গিতে। সাব্বির ওর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ওর কলার ধরে টেনে তোলে। আরিফের ঠোঁট একটু একটু কাঁপছে। সাব্বির ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে,
“তুই কে, কই থাকস, কাদের সাথে ঘুরস, সবই আমরা জানি। হাউজিং সোসাইটিতে তোর বাপের দোকানও আমি চিনি। এরপর যদি তৃণার কিছু হয়, ওর আশেপাশে যদি কোনদিন তোরে দেখা যায়, তোর যেইটুকুতে আজকে ধরিনাই, সেইদিন ওইটুকুতে আরেকটু আদর কইরা দিমুনে। আর, তোর বাপেরও বয়স হইসে, তারও একটু খাতির যত্নের দরকার। সেইদিকেও খেয়াল রাখুমনে।”
আরিফ বিড়বিড় করে কিছু বলে। সাব্বির ওকে ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
“ওরে মেইন রোডে নিয়া চল।”
আরিফের দুই হাত দুজন ধরে ওকে ছেঁচড়ে নিয়ে যায় রাস্তা ধরে। মেইন রোডের পাশে ফুটপাতে দেয়ালের সাথে ওকে হেলান দিয়ে বসিয়ে দেয় ওরা। ওর ঝুঁকে থাকা মুখ থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়ে ভিজে যাচ্ছে ফুটপাত। কয়েকজন টোকাই ছাড়া ব্যস্ত ঢাকার কোন মানুষের চোখ কাড়েনা এসব।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now