বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অথ ভদ্রাবতী

"গ্রাম্য লোককথা" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান নাসরুল্লাহ (০ পয়েন্ট)

X ঢাকে বুঝি পড়ল এবার কাঠি। একে একে এসে পড়ছেন সব দেব-দেবীরা। সম্বৎসরে এই একটিবার করেই তো আসা। তারা নেমে আসছেন রূপ আলো করে, তাঁদের মাহাত্ম্য বিকীর্ণ করতে করতে। এই তো এসে পড়েছেন সিদ্ধিদাতা গণেশ, যাঁর আশীর্বাদে সিদ্ধ হবে সব কাজ। এসেছেন বিশ্বকর্মা, এই পৃথিবীর যিনি কারিগর। আসুন তেনারা, তেনাদের আলো দেখানো পথেই তো আসবেন মা দুর্গা, দেবী দুর্গতিনাশিনী। আলোয় আলোকিত হবে এই অন্ধকারে আচ্ছন্ন ধরাধাম ক’টি দিনের জন্য। কিন্তু শুধু কি এনারাই? এত দেব-দেবীর মাঝে লুকিয়ে আছেন আরও কত গ্রাম্য, লৌকিক, আঞ্চলিক দেবদেবী। আলোর ঝলকানি আর অনেক অনেক দেব-দেবীদের মাহাত্ম্যের গরিমায় তাঁদের কথা মনে রাখি আমরা কজন? এমনই একজন হলেন আমাদের ভাদুমণি, রাজকুমারী ভদ্রাবতী। ছোট্ট একরত্তি এক আঞ্চলিক দেবী যিনি আসেন আদিবাসী অধ্যুষিত পূর্বেকার জঙ্গলমহল আর মানভূমের ঘরে ঘরে। বলতে গেলে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূম জেলার কিছু অংশে আর মানভূম ঘেঁষা বর্ধমানের কিছু জায়গায়। ভাদু দেবীর কাহিনি রূপকথার মতো। কেমন সেই কাহিনি? এসবই মিথ, শোনা কথা, গল্প, কাহিনি। মানভূমের ঘরে ঘরে শোনা যায় ভাদুর দুঃখের কাহিনি। তাই তো সেই দুঃখে দুঃখী হয়ে মেয়েরা আরাধনা করে ভদ্রাবতী নামে মানভূমের পঞ্চকোট রাজার সেই পালিতা কন্যাকে যিনি রাজকন্যা ভদ্রাবতী, আবার দেবী হয়ে ভাদু নামে পূজিতা হন ঘরে ঘরে। এ যেন ভাদুর দুঃখের বারমাস্যা যা লোককথা হয়ে প্রচারিত হয় মেয়েদের গানে গানে। তাঁকে আনা হয় আদর করে, পুজো করা হয় আদর করে। তুমি থাক আমাদের মাঝে, আর চলে যেওনা তোমার প্রেমিকের খোঁজে দূর- দুরান্তরে। আমরা তোমায় যতন করে রাখব আমাদের মাঝে। কিন্তু কে সেই প্রেমিক? সে অনেক কথা, অনেক কাহিনি। কিন্তু এ কাহিনি অনেকদিন আগেকার হলেও তা খুব বেশিদিনের কথা নয়। তখন মানভূমের পঞ্চকোট রাজ্যে রাজা নীলমণি সিংদেও এর রাজত্ব। তাঁর রাজত্বের সীমানায় এক গ্রামে রাজার কাছে সন্ধান মিলল এক পরমাসুন্দরী সুলক্ষণা কন্যার, যিনি সাক্ষাৎ লক্ষ্মী। রাজা সেই কন্যাটিকে চাইলেন নিজের কন্যা রূপে গ্রহণ করতে। কিন্তু মেয়েটির পিতা তাতে রাজি নন। রাজা শেষে সেই মেয়েটিকে রাজার ঘরের মেয়ের মত সুখ-সুবিধা দিয়ে নিজের কন্যারূপেই দেখতে লাগলেন। পিতার ঘরে রাজকন্যার মত বড় হতে লাগলেন ভদ্রাবতী। দেশে তখন সিপাহী বিদ্রোহের ঝড়। রাজা নীলমণি সিংদেও ব্রিটিশদের হাতে বন্দী হলেন। জেল থেকে ফিরে এসে শুনলেন রাজকন্যা ভদ্রাবতী কবিরাজের পুত্রের প্রেমে পাগলিনী। কোন কবিরাজ? তিনি সেই গাঁয়ের, নাকি পাশের গাঁয়ের লোক? কি নাম সেই কবিরাজ পুত্রের? কেউ বলে তাঁর নাম অঞ্জন, আবার কেউ বলেন –কি কইর‍্যে জানব্য, আমরা কি দেখ্যেছি? সুনা কথা, যেমন সুনি, তেমনি জানি’। ঠিক কথাই তো! এ যে লোককথা, যা হয় রূপান্তরিত, পরিবর্তিত। এক প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্মে চলে তার কাহিনির বিন্যাস, কোথাও যুক্ত হয় কিছু কথা, আবার কখনও হয় বিযুক্ত। লোককথার বৈশিষ্ট্যই যে তাই! কিন্তু, আমাদের অত কথায় কাজ কি! আমরা ফিরে যাই রূপকথায়। নাম যাই হোক, ঘটনা শুনে রাজা নীলমণি সিংদেও আদেশ দিলেন কবিরাজপুত্রকে (অঞ্জনকে) বন্দী করার। দুঃখে, অপমানে ভদ্রাবতী তাঁর দুই সখীকে নিয়ে রাজ্যের সমস্ত বন্দীশালায় গান গেয়ে গেয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন এই আশায় যে, তাঁর গান শুনে অঞ্জন চিনতে পারবে তাঁকে। রাজার অনুশোচনা হল, তিনি অঞ্জনকে মুক্তি দিলেন। কিন্তু ততদিনে রাজকন্যা ভদ্রাবতী কোথায় যেন হারিয়ে গেছেন চিরদিনের মত। অনেকের মতে, তিনি আত্মহত্যা করেন প্রেমিক অঞ্জনের দুঃখে। রাজকন্যা ভদ্রাবতীর মূর্তি স্থাপন করে শুরু হল রাজার রাজত্বে ভদ্রাবতীর পূজা যা পরে ভাদু পূজা নামে পরিচিতি লাভ করে। আবার অন্য একটি কাহিনিতে জানা যায় যে, ভদ্রাবতী রাজা নীলমণি সিংদেওয়ের তৃতীয়া কন্যা। বিবাহের পূর্বে ভাবী স্বামী মারা গেলে রাজকন্যা ভদ্রাবতী দুঃখে মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে আত্মহত্যা করেন। ভাবী স্বামী বিবাহ করতে আসার সময় ডাকাতের হাতে পড়েন এবং মারা যান। কিন্তু ভদ্রাবতী সত্যই রাজা নীলমণি সিংদেওয়ের কন্যা ছিলেন কিনা তার কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। বীরভূম অঞ্চলে প্রচলিত আছে যে, ভদ্রাবতী হেতমপুর রাজপরিবারের কন্যা। আগেই বলেছি, লোককথা বা রূপকথা রূপান্তরিত হয়, পরিবর্তিত হয়। সেভাবেই এই লোকথাগুলিও এত বছর ধরে নানাভাবে পরিবর্তিত হয়ে নতুন আকার ধারণ করেছে। ভাদ্র মাসের আজকের দিনটিতে তাঁর পূজা, পূজার পর তাঁকে স্থানীয় নদীর জলে বিসর্জন দেওয়া হয়। আগে ভাদুর কোন প্রতিমা বা মূর্তিপূজার চল ছিল না। ঘরের কুলুঙ্গিতে একটি পাত্রে কিছু ফুল রেখে তাঁকে কল্পনা করে ভাদু গান গাওয়া হত। কিন্তু বর্তমানে ভাদুর প্রতিমা বা মূর্তি নিয়ে আসা হয়। কোন কোন মূর্তির কোলে থাকে কৃষ্ণের ছোট একটি মুর্তি। কখনও বা রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তি। এই ভাদুকে কেন্দ্র করে চলে গান, নাচ। গানগুলি মূখ্যতঃ প্রেমের গান, বিবাহের গান, দুঃখের বারমাস্যাও আছে যা ভাদুর কাছে মনের কথা ব্যক্ত করেন মেয়েরা, কুমারীরা। একদা রাজকন্যা ভদ্রাবতীও যে কুমারী! আছে প্রেমিকের জন্য, প্রেমের জন্য আত্মোৎসর্গের কথাও। ভাদু, ভদ্রাবতীর জীবনদানও তো প্রেমের জন্যই! হয়ত সে কারণেই ভাদু প্রতিমায় কোলে থাকে কৃষ্ণের বা রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তি, যা চিরন্তন প্রেমের প্রতীক।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৮ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now