বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
একটা ছেলে ইদানিং প্রচন্ড বিরক্ত করছে! বিকেলে মায়াপুরী পার্কের পাশে একটা সুনসান রাস্তায় সময় কাটে আমার! নিরবতা ভালো লাগে! রাস্তার পাশের কয়েক টা বেঞ্চি তে আমি এসে বসি এই সময় টায়! ছেলেটা প্রতিদিন বিকেলে এই সময় টায় আমার পাশে এসে বসে! তারপর শুরু করে ঘ্যান ঘ্যান! একটা গল্প শোনাতে চায়! আমি প্রথম দিন সুন্দর করে বুঝিয়েছি,
-- দেখো। আমি তোমার গল্প শুনতে একদম আগ্রহী নই! রসকষহীন মানুষ আমি! গল্প উপন্যাস শোনা, গল্প উপন্যাস পড়ায় কোনো আগ্রহ আমার কোনো কালে ছিলোনা, এখনো নেই! তুমি বিরক্ত করো না প্লিজ।
-- স্যার স্যার, প্লিজ গল্প টা আপনাকে শুনতে হবে...!
ছেলেটা ভয়ংকর নাছোড়বান্দা! কথায় কথায় স্যার বলছে যেন আমার ছাত্র! ছাত্র নয় সিউর, আমার ছাত্র ছাত্রী রা আমায় ভালো করেই জানে! সালাম দিয়ে কেমন আছেন জিজ্ঞেস করতেও ভয় পায়! আমি এখানকার একটা কলেজে শিক্ষকতা করি! বিজ্ঞানের শিক্ষক! শিক্ষকতা টা শখের বশে করছি! এটা না করলেও চলে! নয়টা থেকে দু'টো পর্যন্ত বোরিং টাইম। আজ ক্লাসে এসে দেখি তুলি নেই! ক্লাসে আসার পর এই মেয়েটার দিকে আমার চোখ যায় প্রথমে! মেয়েটার চেহারায় পদ্মের মুখ টা ভাসে! পদ্ম আমার মেয়ে! একমাত্র মেয়ে আমার! আমার ছোট্ট পৃথিবী! পিকনিকে গিয়েছিলো বন্ধুদের সাথে! রাস্তায় বাস টা এক্সিডেন্ট করে! তেরোজন আহত হয়, একজন মারা যায়! তুলির বয়স তখন পনেরো বৎসর, সামনের মাসেই ষোল তে পা দেবে! ষোল টা আসেনি আর! আমি তুলি কে প্রথমদিন দেখে চমকে উঠেছিলাম। একদম পদ্মের মতো, তাকানো, হাঁটা, কথা বলা, হাসা..! তুলি বুঝতে পারে ও কে আমি প্রচন্ড পছন্দ করি! এটার সুবিধে নেয়! এই একটা মেয়ে হাজার টা ভুল করলেও আমি মেয়েটি কে একটা বকা ও দিতে পারিনা! আজকাল ও বড্ড লেট করছে কলেজে আসায়, মন টাও খারাপ থাকে ওর, আমি বুঝতে পারি! আগের মতো চটপটে নেই, প্রশ্ন করে করে হয়রান করছেনা! তবে আজগুবি কিছু প্রশ্ন করে! ঐ দিন ক্লাস শেষে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলে,
-- স্যার। হারিয়ে যাওয়ার পর মানুষ কি ফিরে আসতে পারে?
আমি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
-- ফিরে আসতে পারে মানে?
-- না কিছুনা..!
তুলি আজ ও লেট করে আসছে! চুপচাপ ক্লাস করলো, তারপর ক্লাস শেষে পাশে এসে জিজ্ঞেস করলো,
-- স্যার। প্রচন্ডরকম ঘৃনা করা কি পাপ..?
আমি তুলির দিকে তাকালাম। কি হলো মেয়েটির? তারপর কোনো উত্তর না দিয়ে ক্লাস থেকে বের হয়ে গেলাম। ক্লাস শেষ করার পর সারাদিনের ব্যস্ত সময় শেষে বিকেলের এই জায়গায় অল্প কিছু সময় আমার চরম কাটে! একা একা! কিন্তু এই নাছোড়বান্দা ছেলেটা আমার সমস্ত বিকেল মাটি করছে! মাথা খাটিয়ে কয়েকদিন বিকেলে এখানে আসা বন্ধ করেছিলাম। মনে করেছি ছেলেটি এখানে আমায় না পেয়ে হতাশ হবে, চলে যাবে। নাহ, এই ছেলেটা চরম ধৈর্য্য নিয়ে জন্মেছে! একবার মনে হয় থাক, গল্পটা শুনিই! কিন্তু আবার মনে হয় গল্প টা শেষ হবে তো! ছেলেটার কথা বলার স্টাইল দেখে মনে হয়না গল্প টা এতো ছোট! যদি ছোট ও হয় এই বকবক টাইপের ছেলেটি ওটা প্যাঁচিয়ে লম্বা করবে! তাছাড়া অনেকক্ষণ পর্যন্ত কানের পাশে কারো বকবক শোনার চেয়ে ভয়ংকর কিছু আমার জন্যে আর হয় না!
.........
আজকাল কি হয়েছে আমার বুঝতে পারছিনা! ড্রাইভিং এ এতোটা অমনোযোগী তো ছিলাম না! কয়েক দিন আগে একটা সি এন জি কে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়েছি, উল্টে গিয়েছে সি এন জি টা! উল্টে যাওয়া সি এন জির ভেতর থেকে ড্রাইভার কে মোচড় দিয়ে কষ্ট করে বের হতে দেখলাম, তারপর স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেললাম! যাক! তারপর জোর গতিতে গাড়ি টেনে কলেজে ঢুকেছি, মনে হলো বিরাট বড় অনর্থ থেকে বেঁচে গিয়েছি! এর দু'দিন পর একটা রিকশার পেছন দিকে ধাক্কা লেগেছিলো! এ নিয়ে এই পর্যন্ত ছয়বার ভয়ংকর বিপদ থেকে বাঁচলাম। নিজেকে নিজে শাসালাম, এতোটা অমনোযোগী হওয়া ঠিক না। ছিঃ..!
বিকেলঃ আজ ও ছেলেটা ঘ্যান ঘ্যান শুরু করেছে! ছেলেটা ভয়ংকর বিরক্তিকর নয় শুধু, ভয়ংকর বোকা ও! আমি প্রচন্ড বিরক্ত হচ্ছি ছেলেটার উপর ছেলেটা বুঝতে পারছেনা! জিজ্ঞেস করলাম,
-- গল্প টা আমাকেই কেন শুনতে হবে? আর কাউকে শোনাও তুমি..
-- না না স্যার। এটা আপনাকেই শুনতে হবে! এই গল্প শেষ হয়নি, এটার শেষ আপনি করবেন..!
আমি এবার একটু কৌতুহলী হলাম। কি বলে ছেলেটা! বললাম,
-- ওকে বল তোমার গল্প। কিন্তু ছোট্ট করে... মনে রেখো.. ছোট্ট করে, সংক্ষিপ্ত..!
ছেলেটা একটা বড় করে নিঃশ্বাস নিলো, তারপর বলতে শুরু করলো,
-- স্যার আমি নীল! একুশে বইমেলায় একটা মেয়ের সাথে আমার পরিচয় হয়! মেয়েটির হাতে নয়টি বই ছিলো, ভার রাখতে পারছিলোনা বইগুলোর! আমি হেল্প করলাম। বইগুলো আমি হাতে করে নিয়ে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিলাম। সবচেয়ে উপরে যে বই টা ছিলো, ওটা দেখে আমি চমকালাম। বই টা আমি খুঁজছিলাম, পাইনি কোনো খানে! মেয়েটি কোথায় পেলো! জিজ্ঞেস করতেই জানালো এটার আর কোনো কপি নেই। একটাই লাস্ট ছিলো কিনে নিয়েছে! আমি মেয়েটির হাতে বইগুলো তুলে দিয়ে দাঁড়ালাম চুপ করে, মেয়েটি থ্যাংকস জানালো! কি মিষ্টি দেখতে মেয়েটি, আমার মতোই বইপাগল! মেয়েটি জানেনা, মেয়েটি কে হেল্প করতে গিয়ে নয়টি বই নিয়ে আটটি বই ফেরত দিয়েছি! দুর্লভ কপি টা রেখে দিয়েছি! উহু.. এটা চুরি নয়! পরে ঠিক ফেরত দিয়ে দেবো..! গাড়ি চলে যাওয়ার পর খেয়াল হলো আরে এড্রেসই তো জানা হলোনা ফেরত দেবো কি করে!
...........
-- হুম। ইন্টারেস্টিং.. তারপর?
-- স্যার আমি বইপাগল। মেসে থাকি, আমার বাবা মা নেই। বই ই আমার সব। টিউশনি করে পড়ার খরচ চালাই। টিউশনির স্বল্প টাকায় চাইলেও গাদা গাদা বই কিনতে পারিনা। যাইহোক, মেসে এসে বইটা পড়া শুরু করলাম..! বই পড়ার সময় আমার আর কিছু খেয়াল থাকেনা। বই পড়া শেষ করে কয়টা বাজে দেখতে গিয়ে খেয়াল হলো আমার হাতঘড়ি টা নেই। মাথা ঘুরিয়ে উঠলো। কি যে হলো আমার ঠিক বুঝতে পারছিনা। সম্ভবত আজ বইমেলায় কোথাও পড়ে গিয়েছে। ভীষন আফসোস হলো! পরদিন বইমেলায় গিয়ে আমি ঐ জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে মেয়েটির সাথে দেখা হয়েছিলো প্রথম। আমার হাতে ঐ বই টা। আমি জানি মেয়েটি আসবে। মেয়েটি এলো, আমি বইটা ফেরত দিলাম। মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলো, "আপনি কি করে জানলেন আজ আমি আসবো?" আমি বললাম, "বইপাগল দের মানসিকতা বই পড়তে পড়তে বইয়ের মতো হয়ে যায়, কেউ কেউ চাইলে পড়তে পারে!" মেয়েটি হাসলো। হেসে বললো, "আমি বইটার জন্যে আসিনি! বইটা এই বইমেলায় নেই আমি জানি, আমার মামা কাল রাতে এই বইটার আরেক টা কপি পাঠিয়ে দিয়েছেন! আমি চাইলে উনি পুরো লাইব্রেরী এক রাতের মধ্যে হাজির করাতে পারেন! বই টা যে চুরি করছিলেন আমি দেখতে পেয়েছি তখন! কিছু বলিনি! আপনি লজ্জ্বা পাবেন তাই!" আমি এমনিতেই লজ্জ্বিত মুখে দাঁড়িয়ে আছি! মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে বললো, "আপনি কোথায় থাকেন? কি করেন? সব জেনে নিয়েছি আমি! আপনি লজ্জ্বা পাবেন না, লজ্জ্বা পেলে আমার খারাপ লাগবে! আসুন গাড়ি তে আসুন.. সামনে কোথাও গিয়ে বসবো!" মেয়েটি আমাকে নিয়ে এই জায়গায় আসলো। জানালো এই জায়গাটা তার অনেক পছন্দের। এখানে বসে আমরা অনেকক্ষণ গল্প করলাম। সব গল্প বই সম্পর্কিত। দুই টা বই পাগলের গল্প। হা হা। ফিরে আসার সময় মেয়েটি আমার হাতে কিছু একটা গুজে দিলো..!
-- কি? চিঠি?
-- নাহ। ঘড়ি। একটা নতুন দামি ঘড়ি! অনেক দামি! দেখলাম আমার পুরনো ঘড়ি টা তার হাতে। আমি তো অবাক। মেয়েটি হেসে বললো, "চুরি করতে শুধু যে আপনিই পারেন তা না, আমিও পারি। যখন নয়টা বই নিয়ে আটটা বই দিচ্ছিলেন তখন খেয়াল করেননি ঘড়িওয়ালা হাত দিয়ে খালি হাত ফেরত নিচ্ছিলেন..! এই ঘড়িটা আমার কাছে থাকুক, আপনি আমার দেয়া ঘড়ি টা পরেন! না বলবেন না। আমার ভয়ংকর রাগ। আর একটা অফার দিচ্ছি, প্রতিদিন আপনি আমার সঙ্গে এখানে বসে আমাকে সময় দেবেন বিনিময়ে প্রতিদিন আমি আপনাকে একটা করে বই দেবো!" আমি হাসলাম। মেয়েটি অদ্ভুত জেদী, রাগী! মেয়েটি আমায় মাস ফুরোলেই টাকা দিতো, পনেরো বিশ হাজারের মতো! না নিতে চাইলে প্রচন্ড রাগ করতো! মাস ছয়েক কাটলো! হঠাৎ একদিন মেয়েটা জানালো সে ভালোবাসে আমায়! আমার মনে হলো মেয়েটির মাথায় নির্ঘাত সমস্যা আছে। মেয়েটি হুলস্থুল বড়লোক। আর আমার শখ করে দুই টা বই কেনার ও সামর্থ্য নাই। তখন উত্তর দিই নি! সারারাত চিন্তা করলাম। তারপর রাতে ফোন দিয়ে বললাম সকালে এই জায়গায় আসতে।
-- তারপর?
-- পরদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে ও কে ফোন দিয়ে বললাম, "দুই লক্ষ টাকা জোগাড় করে দিতে পারবে?" আমায় একবার ও জিজ্ঞেস করলোনা, কেন নিচ্ছি এত টাকা? কিসের জন্যে? স্রেফ বললো, "আমি ড্রাইভার কে দিয়ে টাকা পাঠাচ্ছি!"
-- দুই লক্ষ?
-- হ্যাঁ। যে মানুষটি আমার অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়ার খরচ চালিয়েছেন ঐ মানুষটি অসুস্থ। অপারেশন করানো লাগবে আর্জেন্ট! জটিল অপারেশন! টাকা জমা দিয়ে ওর সাথে দেখা করার কথা আমার। মেয়েটি সারাদিন বসে রইলো এখানে! আমি আসতে পারিনি!
.........
ছেলেটি কাঁদছে! আমি প্রচন্ড অবাক হলাম। প্রায় একঘন্টা হয়ে এলো, আমি ছেলেটার বকবক মনোযোগ দিয়ে শুধু যে শুনছি তা নয়, আরো শোনার অপেক্ষায় আছি। ছেলেটা কাঁদছে খুব, আমি কাঁধে হাত রাখলাম ছেলেটির, জিজ্ঞেস করলাম,
-- কেন আসতে পারোনি?
ছেলেটা চোখ মুছে বললো,
-- আমি মরে গিয়েছি স্যার! মেয়েটি জানেনা! মেয়েটি ভাবে দু'লক্ষ টাকা নিয়ে আমি পালিয়েছি। প্রচন্ড ঘৃনা করে আমায়! আমার লাশ হাসপাতালের মর্গে পড়ে আছে আজ নয়দিন হলো...!
ছেলেটির কথা শুনে আমি চমকে উঠে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আছি, মনে হলো পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের একটা আমার পাশে বসে আছে। জলজ্যান্ত একটা মানুষ বলছে সে নাকি মারা গিয়েছে। এটা সম্ভব? আমি বললাম,
-- ফাইজলামি করো?
-- না স্যার। মৃত মানুষের ওসব করার ক্ষমতা নেই...!
আমি হাসলাম। হাসি থামিয়ে বললাম,
-- তো গল্প টা আমায় কেন শোনানো হলো? অন্য কাউকে শোনানো যেতোনা? তোমার কি মনে হয়, আমিও মৃত?
-- না স্যার! মেয়েটি আপনার কথা সবসময় বলতো! বলতো তার দুই টি বাবা। একটা জন্মদাতা আরেক টা আপনি! জন্মদাতা বাবার প্রতি ওর প্রচন্ড ঘৃনা রয়েছে। ওর বাবা মায়ের ডিভোর্স হয়েছে ও অনেক ছোট থাকতেই! মেয়েটি কে চিনতে পেরেছেন স্যার? মেয়েটির নাম তুলি! আমি তুলির সামনে যেতে পারিনা, ও প্রচন্ড ঘৃনা করে আমায়! এই ঘৃনা ওর সামনে যেতে দেবেনা আমায়! সামনে গিয়ে যদি সব খুলে বলি তবে ও কষ্ট পাবে, ওটা সহ্য করার ও ক্ষমতা নেই আমার! সামনে যাওয়ার চেষ্টা করেছিও, ওর প্রচন্ড ঘৃনা চেপে ধরে আমায়! কাছে যেতে দেয়না! স্যার গল্প টা অর্ধেক হয়ে আছে, এটা শেষ করবেন আপনি! ও কে সব খুলে বলবেন! স্যার প্লিজ...
আমি হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছি ছেলেটির দিকে! মনে পড়লো তুলি কিছুদিন আগে কিছু অদ্ভুত প্রশ্ন করেছিলো! আমি কন্ঠে দৃঢ়তা এনে বললাম,
-- তুমি আমায় এসব বিশ্বাস করতে বলছো? ওকে, যাহোক, বিশ্বাস করলাম। তবে এটা বুঝতে পারছিনা প্রচন্ড ঘৃনা টা ভালোবাসায় রুপান্তরিত হয়ে যাবে যখন তুমি ওর সামনে গিয়ে সব খুলে বলবে!
-- স্যার। ঘৃনার জন্যে দুরে আছি! ঘৃনা টা যদি আগের মতো প্রচন্ড ভালোবাসায় রুপান্তরিত হয় তবে ওর কাছ থেকে আর আমি আলাদা হতে পারবেনা!
-- মানে?
-- স্যার, ওর ঘৃনা আমায় মুক্তি দিচ্ছেনা, ঘৃনা টা ভালোবাসায় রুপান্তরিত হলে আমি মুক্তি পেয়ে যাবো, কিন্তু তখন তো ওর কাছ থেকে দুরে সরে যেতে ইচ্ছে করবেনা আমার। স্যার, ঘৃনা আর প্রচন্ডরকম ভালোবাসা একিই ব্যাপার। দু'টো থেকেই মানুষ দুরত্ব নিয়ে নেয়! তাছাড়াও স্যার আমি ও কে সব বলতে পারবোনা আরো একটি কারনে। আমার মৃত্যুর কারন টা আপনি! এটা ও কে বলতে পারবোনা, মিথ্যেও বলতে পারবোনা! মৃতদের মিথ্যে বলার ক্ষমতা নেই!
আমি চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলাম,
-- তোমার মৃত্যুর কারন আমি?
ছেলেটি মাথা নিচু করে আছে। আমি আবারো জিজ্ঞেস করলাম, ছেলেটি মাথা নিচু করে বললো,
-- হ্যাঁ স্যার! আট দিন আগে, গাড়ি দিয়ে আপনি একটা সি এন জি কে ধাক্কা দিয়ে উল্টে দিয়েছিলেন! ড্রাইভার বেঁচে যায়, আমিও বেঁচে যেতাম। সি এন জির ভেঙ্গে যাওয়া সামনের লোহার শক্ত শিক গুলো আমার বুকের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে বুক ফুঁড়ে পেছন দিয়ে বের হয়ে যায়! ওখানে মরে যাই আমি! হাসপাতালে আমার লাশ পৌছে, ঐ লাশে প্রান ছিলোনা! আমি তুলির সামনে যেতে পারবোনা স্যার! ও আমায় ঘৃনা করে, সামনে গিয়ে সব খুলে বললে ও আপনাকে ঘৃনা করবে! জন্মদাতা বাবার উপর চরম ঘৃনা নিয়ে বেঁচে আছে ও, আমি চাইনা আপনার উপরও প্রচন্ড ঘৃনা নিয়ে বেঁচে থাকুক! আপনি ও কে মর্গে নিয়ে যাবেন। তারপর রফিকউদ্দিন নামের একটা পেশেন্টের সাথে দেখা করবেন। এই মানুষটির অপারেশনের জন্যেই দু'লক্ষ টাকা নিয়েছিলাম! স্যার, আমি খুব কষ্টে আছি.. আপনি তুলি কে সব বলবেন তো..! বলবেন ওকে আমি খুব ভালোবাসি...!
আমি চুপ করে আছি! সন্ধ্যে হয়ে আসছে, বাসায় ফেরা দরকার।
........
নয়দিন পরঃ আজকাল আমার মন খারাপের মৌসুম চলছে। সারাক্ষন মন খারাপ! ক্লাস শুরু হওয়ার পর যথারীতি তুলি ক্লাসে আসতে লেইট। ক্লাস শেষে ও কে ডাকলাম! পাশে এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে বললো,
-- স্যার, আজ কোনো প্রশ্ন নেই!
আমি হাসলাম। বললাম,
-- তুমি একদিন একটা প্রশ্ন করেছিলে! হারিয়ে যাওয়া মানুষ কি কখনো ফিরে আসতে পারে....?
তুলি চুপ করে আছে। আমি বললাম,
-- আমি যদি বলি উত্তর টা হ্যাঁ তবে কি তুমি খুব অবাক হবে...?
তুলি চমকে উঠলো! আমি ক্লাসের বাইরে তাকালাম, বাইরে তখন ঝলমলে রোদ।
.......
(এতোক্ষ্ন পর্যন্ত গল্প টা শুনছিলাম কবিরের কাছ থেকে! কবির আমার বন্ধুমানুষ! আমি গল্পের কেউ না, তবে ওর বন্ধু! একজন বিজ্ঞান শিক্ষকের কাছ থেকে অবৈজ্ঞানিক একটা গল্প শুনছি! কি অদ্ভুত....!!)
কবির এখন চুপ করে আছে। জিজ্ঞেস করলাম,
-- এরপর তুলি কে সব বলেছিস?
-- হ্যাঁ।
-- তারপর?
-- তারপর তুলির সাথে আমার আর দেখা হয়নি কখনো! প্রচন্ড ঘৃনা করে আমায় ও!
-- ঘৃনা কেন?
-- ওর ভালোবাসার মানুষটির খুনি টা কে ও ঘৃনা করবে এটাই তো স্বাভাবিক!
-- কিভাবে জানলো? তুই জানিয়েছিস?
-- হ্যাঁ।
-- কিন্তু কেন?
-- জানিনা। কেমন একটা অপরাধবোধে ভুগছিলাম। ও কে বলে দিয়ে হালকা হলাম।
কবির মাথা নিচু করে চুপ করে আছে। বললো,
-- আমি জানি, প্রতিদিন একটি মেয়ে পুরনো একটা ঘড়ি হাতে নিয়ে, একটা বই হাতে ঐ রাস্তার বেঞ্চি গুলো তে গিয়ে বসে! একা। অপেক্ষায় থাকে ও, এই বুঝি একটা ছেলে এসে বলবে, "একটা গল্প শুনবে?"
আমি একা ছিলাম, একাই আছি। পদ্ম কে তো মনে পড়েই, এখন তুলি কেও বড্ড মনে পড়ে! তুলি, পদ্ম দু'জনই দুরে! পৃথিবীর সব অদ্ভুত নিয়ম! প্রচন্ড ঘৃনা মানুষ কে তো দুরে ঠেলে দেয় ই, প্রচন্ড ভালোবাসা ও মানুষ কে দুরে সরিয়ে রাখে...! প্রকৃতি "প্রচন্ড" শব্দ টা প্রচন্ড অপছন্দ করে...!
//
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now