বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

স্কুল মাস্টার

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X স্কুল মাস্টার - লুৎফুন নাহার লুৎফা (১) কালাচর গ্রামের একমাত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়টির একজন শিক্ষক হচ্ছে ওয়াহেদ কুমার। অপরিচিত কেউ যদি তার নামটা শোনে তবে হয়ত তার মনে দুই রকমের ভাবনা উদয় হতে পারে। এক, এর বাবা মা কেউ একজন হিন্দু কেউ একজন মুসলমান। হয়ত একারণে দুই ধর্মের সংমিশ্রণে এমন একটা নাম রাখা হয়েছে। আরেক রকমের ধারণা আসতে পারে সেটা হল, জন্মের বহু বছর পরে নামের শেষে কুমার শব্দটি যোগ হয়েছে। হয়ত সঠিক সময়ে বিয়ে করতে অপারগতার কারণে কিংবা স্বেচ্ছায় এখনো পর্যন্ত বিয়ে না করার কারণেই তার নামের সাথে কুমার শব্দটি যোগ হয়েছে। ওয়াহেদ নামের পরের অংশটুকু যে কি সেটা কেউ জিজ্ঞেস করে কিংবা সার্টিফিকেট ঘেঁটে জানার প্রয়োজন মনে করে না। অথবা কুমার ভিন্ন অন্য কোন নামের অংশ যে থাকতে পারে এটা কখনো কারও মনে উদয়ই হয় নি। সবচেয়ে বড় কথা ওয়াহেদ কুমার কখনো এটা নিয়ে প্রতিবাদ করা তো দূরের কথা একটি বাক্যব্যয় বা বিনিময় কোনটাই করেনি। ভাবখানা যেন এমন যার যা খুশি ডাকুক না আমি তো আমিই রয়ে গেলাম। নামে কিইবা আসে যায়। পাঠক আপনাদের মনে হচ্ছে আমি রবীন্দ্রযুগীয় কোন স্কুলমাস্টারের বর্ননা দিতে বসেছি। যদিও ওয়াহেদ কুমারের চালচলনে সে-যুগীয় কিছু ভাব আছে তবে সেটা প্রকট কিছু না। তবে ব্যাপারটা হচ্ছে ওয়াহেদ কুমার বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মনে বিভিন্ন ধরনের আবেশ তৈরী করে। এখানে শ্রেণী বলতে নারী, পুরুষ, শিক্ষিত অশিক্ষিত, টাকাওয়ালা মানুষ, গরীব মানুষ বোঝানো হয়েছে। তবে প্রত্যেক শ্রেণীর মনোভাবনা আমাদের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে না জানলেও চলবে। গল্পের স্বার্থে কিংবা ওয়াহেদ কুমারের চারিত্রিক বিশ্লেষণের স্বার্থে ওয়াহেদ কুমার সম্পর্কে গুটিকয় শ্রেণীর ধারণা বা চিন্তাভাবনা জানলেই আমাদের চলবে। ওয়াহেদ কুমার সহজ সরল মানুষ, গ্রামের অধিকাংশ মানুষই মনে মনে এমন ধারণা পোষণ করে। তবে কিছু সন্দেহপ্রবন কুটনৈতিক বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এটা মেনে নিতে পারে না। তারা ভাবে ওয়াহেদ কুমার হয়ত ছদ্মবেশী গুপ্তচর বা গোয়েন্দা পুলিশ। সে সহজ সরল ভাব নিয়ে লোকজনকে ভুলিয়ে তার কাজ আদায় করছে। কাজ আদায় করা হয়ে গেলে তার আসল রুপ বেরিয়ে আসবে। এরকম সব কুটনৈতিক ধারণার মাঝেও ওয়াহেদ কুমার মানুষের কৌতূহলের বস্তু। বিশেষত একটা শ্রেণীর মানুষ ওয়াহেদ কুমারকে দেখে অহেতুক লজ্জা পাওয়া বা মুখ টিপিয়া হাসা কিছুতেই বন্ধ করতে পারে না। এই শ্রেণীর মানুষের মধ্যে রীতিমত স্নায়ুযুদ্ধ চলে ওয়াহেদ কুমারকে নিয়ে। যদি কারও কানে যায় যে অমুকে ওয়াহেদ কুমারের দিকে আজকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে ছিল বা ওয়াহেদ কুমার আজকে তমুকের বাড়ির পাশ দিয়ে গেছে তবে তার সেই দিনটাই বরবাদ। পাঠক আপনারা নিশ্চয়ই অনুমান করতে পেরেছেন যে শেষোক্ত শ্রেণীটি হচ্ছে নারী প্রজাতি। এই নারী প্রজাতির বেশিরভাগই হচ্ছে কলেজ পড়ুয়া। এদের কলেজের নামমাত্র পড়াশোনার বাইরে যদি বিনোদন বলে কিছু থেকে থাকে সে হচ্ছে ওয়াহেদ কুমার। ওয়াহেদ কুমারের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটা খবরাখবর এদের নখদর্পনে থাকে। আর এক্ষেত্রে বিশেষ বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করে যারা তারা সকলেই ওয়াহেদ কুমারের ছাত্রী। এরা অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে বড় আপুদের এই বিশেষ কাজটি করে। খবরগুলো যদিও বিশেষ কোন খবর থাকে না। তারপরও বার্তাবাহক আর বার্তাগ্রাহক এর বার্তা বিনিময় দেখে মনে হবে এরা যদি এই খবর আদান প্রদান না করে তবে পলাশীর যুদ্ধ আরেকবার সংঘটিত হয়ে যাবে। (২) গ্রামের পুর্বদিকে আকাশী ও সবুজ রঙে সাজানো যে বড় পাকা বাড়িটা রয়েছে সেটাই ওয়াহেদ কুমার এর বর্তমান আবাসস্থল। এর পুর্বে আবাসস্থল কোথায় ছিল সেটা পরে জানলেও চলবে। ওয়াহেদ কুমার যে বাড়িটাতে থাকে সেটা এমনভাবে তৈরী যে একমাত্র সদর দরজা বাদে অন্য কোনও দিক দিয়ে বাড়িটাতে প্রবেশের কোন উপায় নেই। সদর দরজা বন্ধ থাকার পরও যদি নতুন কাউকে বাড়িতে পাওয়া যায় তবে সে চোর বলিয়াই বিবেচিত হবে। বাড়িটার দক্ষিণ দিকে উঁচু দেয়ালের বাইরে কিছু নিচু শ্রেণীর মানুষের বসবাস রয়েছে বহুদিন আগে থেকেই। এরা কেউ হয়ত পেশায় রিকশাচালক, কেউ বা মাছ বিক্রি করে। উঁচু দেয়ালের কারণে যদিও ওদের সাথে বাড়ির ভেতরকার কোন যোগাযোগ নেই। কিন্তু ওরা যখন হই-হট্টগোল শুরু করে তখন তা না শুনে পারা যায় না। আর বাড়ির ঐদিকটাতে খোলা জায়গায় বড় গাছের নিচে বসার একটা জায়গা আছে। ওয়াহেদ কুমার সুযোগ পেলেই ওখানে হাঁটাহাঁটি করে নয়ত বই পড়ে কিংবা এক কাপ চা হাতে বসে থাকে। কিন্তু দেয়ালের ওপাশের মানুষগুলো যখন ওদের জিহ্বার প্রতিভা দেখানো শুরু করে তখন আর ওখানে টিকে থাকা সম্ভব হয় না। এখন ওপাশ থেকে যে আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে তা কোন এক মেয়েলোকের চিৎকার। চিৎকারের সুর একটু পর পর বদলাচ্ছে। তবে যে সুরেই চিৎকার করুক না কেন তার গগনবিদারী চিৎকারে মনে হচ্ছে সবকিছু চৌচির হয়ে যাবে। মেয়েলোকটির এরূপ চিৎকারের কারণ হচ্ছে তার মহামান্য স্বামী তাকে শক্ত কোন কিছু দিয়ে গায়ের জোরে প্রহার করছে। গায়ে যতক্ষণ শক্তিতে কুলোচ্ছে ততক্ষণ আঘাত করছে। এই সময় মেয়েলোকটির চিৎকারের সুর একরকম হচ্ছে। আর যখন তার স্বামী প্রহার করে ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে তখন চিৎকারের সুর অন্যরকম হচ্ছে। এসময় সে তার স্বামীকে মনের মাধুরী মিশিয়ে গালিগালাজ করার সুযোগ পাচ্ছে। কি আজব দুইটা প্রাণী। কেউ যেন কারও চেয়ে কম যায় না। একজন গলার জোরে পেরে না উঠে গায়ের জোর খাটাচ্ছে। আরেকজন গায়ের জোরে পেরে না উঠে গলার জোর খাটাচ্ছে। বেশিক্ষণ এদের কোলাহল সহ্য করা ওয়াহেদ কুমারের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠল না। উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের দিকে রওনা দিল। মনে মনে ভাবল বিয়ে ব্যাপারটা এই গন্ডমূর্খদের কাছে কতটা সহজলভ্য। না চাইলেও একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। দীর্ঘশ্বাসের রেশ ধরে রেখেই ওয়াহেদ কুমার উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের দিকে রওনা দিল। চশমা ঠিক করতে করতে সামনের দিকে হাঁটতে লাগল। এমন সময় কোথা থেকে যেন এক ছায়ামুর্তি সামনে এসে দাঁড়াল। চোখ তুলে তাকিয়ে দেখল নিতান্ত গ্রাম্য এক কিশোরী। হঠাৎ করে এই মেয়ে কেন তার সামনে এসে দাঁড়াল ওয়াহেদ কুমার কিছুই আন্দাজ করতে পারলো না। কিশোরীর ভাবভঙ্গী দেখে মনে হচ্ছে সে অনেক কিছু বলতে এসেছে কিন্তু তার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছে না। অনেকক্ষণ পরে তার মুখ দিয়ে যে বাণী উচ্চারিত হল তার সারমর্ম হল ছোট্ট একটা কৈফিয়ত। ক্লাস করানোর ফাঁকে ফাঁকে ওয়াহেদ কুমার কার সঙ্গে ফোনে কথা বলে। কি এত কথা থাকতে পারে কারও সাথে ওয়াহেদ কুমারের। নির্বাক ধরণী কয়েক সেকেন্ডের জন্য ওয়াহেদ কুমারের কাছে অপরিচিত মনে হল। ক্লাসের ফাঁকে সে কার সাথে কথা বলে এই খবর এই মেয়ের কাছে কিভাবে পৌঁছাল। ওয়াহেদ কুমার শুধু অবাক হয়ে তাকিয়েই রইল। কিশোরী বালিকাও চুপচাপ। আর কোন কথা বলছে না। অবশেষে বহুকষ্টে ঠোঁট বাকিয়ে একটি বাক্য বের হল মুখ দিয়ে ‘আপনি আর কখনো ক্লাসের ফাঁকে কারও সাথে কথা বলবেন না।’ এই বাক্যের শেষ শব্দটি যখনই উচ্চারিত হল তখনই বালিকা সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে গেল। ওয়াহেদ কুমার শুধু বুঝতে পারলো এটা কিশোরী বালিকার অবুঝ ভালবাসার কিঞ্চিৎ বহিঃপ্রকাশ মাত্র। প্রিয় পাঠক, অবুঝ ভালবাসা সবসময় উহ্যই থেকে যায়। তাই এই বালিকাও আমাদের গল্পে উহ্যই থেকে যাবে। (৩) তিন মাস এগারো দিনের মেয়েকে কোলে নিয়ে সবজি কাটছে কাদের ব্যাপারীর বউ বেলী। নিপুণ ভঙ্গিমায় কোলের মাঝে বাচ্চাটাকে কাত করে রেখে হাতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে বাচ্চাটার প্রায় চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়ার অবস্থা তবুও একটু টুঁ শব্দও করছে না। কখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে কখনও মায়ের বুকের দুধ টানছে। কিভাবে বড় হতে হবে সেভাবে ছোটবেলা থেকেই যেন এরা অভ্যস্থ হয়ে পড়ছে। আর দেয়ালের ওপাশ থেকে ওয়াহেদ কুমার চিৎকার চেঁচামেচির যে ঘটনা শুনেছে সেটা হচ্ছে কাদের ব্যাপারীর বউ পিটানোর ঘটনা। এখন সব ঠিকঠাক। বেলীও ঠিক কাদের ব্যাপারীও ঠিক। এখন কাদের ব্যাপারীকে দেখে বোঝার কোন উপায় নেই যে সে এভাবে বউ পিটাতে পারে। পাঁচ নম্বর বাচ্চাটাকে নিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাড়ির প্রতিটা ঘর মাটির দেয়াল তোলা আর খড়ের চালা দেয়া। ঘরগুলো একটার সাথে আরেকটা এত কাছে লাগানো যে শুধু একজন মানুষ কোনরকমে পার হতে পারে। প্রায় প্রতিটা ঘরের সামনেই একটা করে গরু বাঁধা। গরুটাকে এরা নিজেদের চেয়ে বেশি যত্ন করে লালন পালন করে যাতে বিক্রির সময় ভাল দাম পাওয়া যায়। ওয়াহেদ কুমার গ্রামের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে বাড়িটার একেবারে কাছাকাছি চলে এল। তাকিয়ে তাকিয়ে ঘরগুলো দেখতে লাগল। এমন সময় বাড়ির ভেতর থেকে একটা ছেলে বেরিয়ে এল। ওয়াহেদ কুমার গ্রামের সবাইকে না চিনলেও সবার কাছে ওয়াহেদ কুমার অতি প্রিয়জন। ছেলেটি ওয়াহেদ কুমারকে দেখে চিৎকার করে উঠল, ‘স্যার আপনে আমাদের বারিতে আইছেন?’ ওয়াহেদ কুমার কি বলবে বুঝতে পারলো না। হাঁটতে হাঁটতে কখন যে বাড়ির এত কাছে চলে এসেছে বুঝতেই পারেনি। এরমধ্যে বাড়ির উৎসুক জনতাও তাকে দেখতে পেয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। সবাই অবাক বিস্ময়ে ওয়াহেদ কুমারের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের প্রিয় স্কুলমাস্টার কোনদিন তাদের বাড়িতে আসতে পারে এটা যেন তাদের ধারণাতেই ছিল না। ওয়াহেদ কুমারও সবার মুখের দিকে একের পর এক তাকাচ্ছে। বিভিন্ন বয়সের মানুষজন। দারিদ্রতার ছাপ পোশাকে, চেহারায় স্পষ্ট লেগে আছে। ওয়াহেদ কুমার সবার মুখের দিকে তাকায় আর কি যেন খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু কিছুই পায় না। এতটুকু মিলও সে কারও চেহারার মধ্যে পায় না। এদের মধ্যে মুরুব্বি গোছের একজন লোক ওয়াহেদ কুমারকে বাড়ির ভেতরে গিয়ে বসতে বলে। কিন্তু ওয়াহেদ কুমার এদেরকে আর বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ফেলতে চায় না। তাই এদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের পথে রওনা দেয়। যেতে যেতে ভাবতে থাকে আর কতদিন সে গ্রামে পড়ে থাকবে। যা খুঁজতে এসেছিল তা কি সে পেয়েছে? নাকি তা পাওয়ার আদৌ কোন দরকার আছে। জীবন কি তাকে কম কিছু দিয়েছে। (৪) ‘আচ্ছা তোমার ছেলেটার এরকম হেঁয়ালিপনা কি কোনদিন কমবে না?’ মায়ের কাছে বাবাদের চিরাচরিত অভিযোগ। ‘ছেলে কি আমার একা নাকি। তুমিও তো ছেলে মানুষ করেছো’ মায়ের পাল্টা জবাব। ‘আসলে আমরা মানুষ করেছি ঠিকই কিন্তু আমরা তো ওর বাবা মা নই’ বাবা আক্ষেপের সুরে বলে। ‘তাতেই বা কি হয়েছে শুনি। আমরা কি ওকে কম ভালবাসা দিয়েছি নাকি। একটা চোরের ঘরে মানুষ হওয়ার চেয়ে আমাদের কাছে মানুষ হওয়া এটা কি কম কিছু।’ ‘এভাবে বোলো না অবনী। ও তো এখন আমাদের ছেলে। রাগ করে দূরে আছে। রাগ ভাঙলে ঠিকই চলে আসবে।’ খাটের উপর বসে খুব অলস ভঙ্গিতে কথা বলছে ভাসানী মজুমদার ও অবনী হালদার। এরাই ওয়াহেদ কুমারের বর্তমান বাবা মা। ছোটবেলায় কোন এক ঘটনাচক্রে এরা ওয়াহেদ কুমারকে দত্তক নেয়। ওয়াহেদ কুমার ছাড়াও এদের আরো দুটি ছেলে আছে। ভাসানী মজুমদার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আর অবনী হালদারও বেশ ভাল একটা চাকরী করে। তিন সন্তান নিয়ে এদের বেশ সুখের সংসারই ছিল বলা যায়। পারিবারিক সচ্ছলতা, বাধ্যগত সন্তান এসবের কোন কমতি ছিল না। ভাসানী মজুমদার এবং অবনী হালদার ছিল সেই প্রজাতির বাবা মা যারা সন্তানদের কাছে নিজেদের সদা প্রকাশ করতে প্রস্তুত। নিজেদের প্রায় সব ব্যাপারেই সন্তান্দের সাথে খোলামেলা আলাপ করা চাই। শাসন যে একেবারে ছিলনা তা না। তবে সেটার খুব একটা প্রয়োজন পড়েনি কখনো। এরকম একটা পরিবেশেই মানুষ হয়েছে ওয়াহেদ কুমার ও তার ছোট দুই ভাই। ভালই কেটে যাচ্ছিল দিনগুলি। যতই দিন যেতে লাগল ভাসানী মজুমদারের মনে হল মিধ্যে দিয়ে জীবন চলতে পারে না। সবাইকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানো উচিৎ। তাই সে সিদ্ধান্ত নেয় ওয়াহেদ কুমারের পরিচয় ওকে জানিয়ে দিবে। অবনী হালদার যদিও কিছুটা হৈ চৈ করেছিল কিন্তু কোন লাভ হয়নি। ওয়াহেদ কুমারের ডাকনাম ছিল শুদ্ধ। অবশেষে ওয়াহেদ কুমারের বিশতম জন্মদিনে ভাসানী মজুমদার সেই সত্যটা উন্মোচিত করে পাঁচজন সদস্যের সামনে। ওয়াহেদ কুমার বিস্ময়ে কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলে। বাকি দুই ভাই সমস্বরে চিৎকার করে উঠে ‘বাবা তুমি এসব কি বলছ?’ ‘আমি যা বলছি সত্যিই বলছি’ জবাব দিয়েছিল ভাসানী মজুমদার। ‘তাহলে তুমি এতদিন পর কেন ভাইয়াকে নিয়ে এসব কথা বলছ?’ ‘সবারই তার জীবনের জন্মপরিচয় জানার অধিকার আছে। এতদিন বলিনি কারণ সত্যটা জানলে শুদ্ধ হয়ত বিপথে চলে যেত।’ ‘তাহলে আমার বাবা মা কে?’ অনেকক্ষণ পর মুখ তুলে সরাসরি ভাসানী মজুমদার এর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল ওয়াহেদ কুমার। ‘সেটাও আমি বলতে পারি। যেহেতু সামাজিক দিক থেকে বল বা মনের দিক থেকে বল এখনো তুমি আমাদেরই সন্তান তাই তোমার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই আমি সেটা বলব না। তুমিও এটা নিয়ে আর কোন কথা বলবে না।’ ‘আমি জানতে চাই’ খুব জেদের সঙ্গে বলেছিল ওয়াহেদ কুমার। এতটা জেদ ভাসানী মজুমদার এর সামনে ওয়াহেদ কুমার কখনো দেখায়নি। ‘না সেটা তোমাকে জানতে দেয়া হবে না। শুধু এটুকু বলতে পারি গ্রামের একটা দরিদ্র পরিবার থেকে তোমাকে উঠিয়ে আনা হয়েছিল...’ আর কিছুই বলেনি ভাসানী মজুমদার। এমনকি অবনী হালদারও কিছু জানায়নি। এতদিনের সাজানো সংসার তছনছ হয়ে গিয়েছিল। মা কেঁদেছিল, ভাইয়েরা কেঁদেছিল। এরপরও কিছু করার ছিল না। সত্যকে কোনভাবে পাল্টানো যায় না। এর কিছুদিন পরই ওয়াহেদ কুমার বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছিল কাউকে কিছু না বলে। চলে এসেছিল গ্রামে। গ্রামের স্কুলে একটা চাকরী জোগাড় করে নিয়েছিল। ভেবেছিল যে করেই হোক নিজের পরিচয় খুঁজে বের করবেই। পরে অবশ্য ছোট ভাইয়েরা ওর ঠিকানা খুঁজে বের করেছিল। মা এসেছিল, ভাইয়েরা নিতে এসেছিল কিন্তু কোন লাভ হয়নি। ওয়াহেদ কুমার গ্রামেই থেকে যায়। সেই থেকেই শুরু হয় ওয়াহেদ কুমারের স্কুল মাস্টারের জীবন। (শেষ) ‘বজলু, শুদ্ধ’র ব্যাগটা নিয়ে ওর ঘরে রেখে আয়’ ওয়াহেদ কুমার ফিরে আসার পর খুব স্বাভাবিকভাবেই বাড়ির চাকর বজলুকে কথাটা বলেছিল ভাসানী মজুমদার। যেন কিছুই হয়নি। ওয়াহেদ কুমার শুধু কয়েকদিনের জন্য বাড়ির বাইরে গিয়েছিল। অথচ ওয়াহেদ কুমার আজ সাত বছর পর বাড়ি ফিরে এসেছে। আজ ওয়াহেদ কুমারের সাতাশতম জন্মদিন। তবে এতটা শক্ত হয়ে থাকা অবনী হালদার এর পক্ষে সম্ভব হয়নি। ছেলেকে দেখেই কেঁদে উঠেছিল। ছোট ভাইয়েরা অবশ্য মুখ চাওয়াচাওয়ি করে হাসছিল। এরা যেন জানতই ভাইয়া ফেরত আসবে। তবে এরা অবশ্য ভাইয়ের খবর প্রতিনিয়তই রাখত। বড়ভাই যে মেয়েদের স্কুলের একজন আদর্শ স্কুলমাস্টার হয়ে উঠেছে এটা নিয়ে হাসাহাসি করত। ওয়াহেদ কুমার নিজের ঘরে ফিরে দেখল ঘরটি অতি যত্নে গোছানো রয়েছে। যেন এরা জানত যে আজকে ওয়াহেদ কুমার ফেরত আসবে। বিছানার উপর শরীর এলিয়ে দিয়ে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে ওয়াহেদ কুমার এতদিনের ঘটে যাওয়া সবকিছু নিয়ে ভাবতে লাগল। প্রিয় পাঠক, একটি কিশোরী বালিকার অবুঝ প্রেম উহ্য থাকবে বলেছিলাম আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে। আজ ছিল সেই বালিকার বিয়ের দিন। পাত্র ছিল স্কুল মাস্টার। কিন্তু আমাদের সেই স্কুল মাস্টার বিয়ের আসন থেকে পালিয়ে এসেছে। একেবারে পালিয়ে এসেছে বললে ভুল হবে। অবুঝ বালিকাকে বুঝিয়ে চলে এসেছে। অবুঝ বালিকাও সব বুঝতে পেরেছে। বুঝতে পেরেছে অবুঝ বালিকার প্রেমের প্রতি একটা টান বা মোহ কাজ করলেও সেটা কেউ বয়ে বেড়াতে চায় না। হায়রে এই ‘কেউ’ রা যদি বুঝত এই অবুঝ বালিকারাও একদিন বুঝ বালিকা হবে। জগৎ সংসারে এদের কাছে তখন নিজেকে অনেক বোকা মনে হবে। আমাদের স্কুলমাস্টারের একবার মনে হয়েছিল শহরের যে টান একবার ছিঁড়েছে সেটা একেবারেই ছেড়ে দেবে। একটা কিছু ছাড়তে গেলে আরেকটা কিছু ধরতে হয়। তাই এই পথটাই বেছে নিয়েছিল। কিন্তু ভন্ডামী করার মানসিকতা না থাকলেও দায়িত্ব নেয়ার মত সাহসও যে ছিল না এটা হয়ত স্কুলমাস্টার নিজেও জানত না। সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওয়াহেদ কুমারের শুধু মনে হচ্ছে কাজটা কি ঠিক হল। বড্ড বেশি ভুল হয়ে গেলো না তো। ভুল শোধরানোর মত সময় পাওয়া যাবে কি? ভুল শোধরানো না গেলে বহুবছর পর হয়ত অভিজ্ঞ সংসারী কোন রমনীর সাথে দেখা হবে। এসব নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবার সময়ও পেল না ওয়াহেদ কুমার। বাড়ির সবাই জন্মদিনের কেক হাতে ঘরে প্রবেশ করেছে। খবর পেয়ে অনেক আত্নীয়স্বজন চলে এসেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে বেলুনের ঠুসঠাস আওয়াজে ঘর ভরে উঠল। *স্বপ্ন বৈশাখ সংখ্যা ২০১৬ তে প্রকাশিত বিভাগঃ উপন্যাসিকা -----০০০০০০------


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৮ জন


এ জাতীয় গল্প

→ স্কুলের হেডমাস্টার

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now