বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
১
পনের-ষোল বছর আগেকার কথা।
বি.এ. পাশ করিয়া কলিকাতায়
বসিয়া আছি। বহু জায়গায় ঘুরিয়াও
চাকুরি মিলিল না।
সরস্বতী-পূজার দিন। মেসে অনেক
দিন ধরিয়া আছি তাই নিতান্ত
তাড়াইয়া দেয় না, কিন্তু তাগাদার
উপর তাগাদা দিয়া মেসের
ম্যানেজার অস্থির করিয়া
তুলিয়াছে। মেসে প্রতিমা গড়াইয়া
পূজা হইতেছে-ধুমধামও মন্দ নয়,
সকালে উঠিয়া ভাবিতেছি আজ সব
বন্ধ, দু-একটা জায়গায় একটু আশা
দিয়াছিল, তা আজ আর কোথাও
যাওয়া কোনো কাজের হইবে না;
বরং তার চেয়ে ঘুরিয়া ঘুরিয়া
ঠাকুর দেখিয়া বেড়াই।
মেসের চাকর জগন্নাথ এমন সময়
একটুকরা কাগজ হাতে দিয়া গেল।
পড়িয়া দেখিলাম ম্যানেজারের
লেখা তাগাদার চিঠি। আজ মেসে
পূজা-উপলক্ষে ভালো
খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা হইয়াছে,
আমার কাছে দু-মাসের টাকা বাকি,
আমি যেন চাকরের হাতে অন্তত
দশটি টাকা দিই। অন্যথা কাল হইতে
খাওয়ার জন্য আমাকে অন্যত্র
ব্যবস্থা করিতে হইবে।
কথা খুব ন্যায্য বটে, কিন্তু আমার
সম্বল মোটে দুটি টাকা আর কয়েক
আনা পয়সা। কোনো জবাব না
দিয়াই মেস হইতে বাহির হইলাম।
পাড়ার নানা স্থানে পূজার বাজনা
বাজিতেছে, ছেলেমেয়েরা গলির
মোড়ে দাঁড়াইয়া গোলমাল
করিতেছে; অভয় ময়রার খাবারের
দোকানে অনেক রকম নতুন খাবার
থালায় সাজানো-বড়রাস্তার
ওপারে কলেজ হোস্টেলের ফটকে
নহবৎ বসিয়াছে। বাজার হইতে দলে
দলে লোক ফুলের মালা ও পূজার
উপকরণ কিনিয়া ফিরিতেছে।
ভাবিলাম কোথায় যাওয়া যায়। আজ
এক বছরের উপর হইল জোড়াসাঁকো
স্কুলের চাকুরি ছাড়িয়া দিয়া
বসিয়া আছি-অথবা বসিয়া ঠিক
নাই, চাকুরির খোঁজে হেন মার্চেণ্ট
আপিস নাই, হেন স্কুল নাই, হেন
খবরের কাগজের আপিস নাই, হেন
বড়লোকের বাড়ি নাই-যেখানে
অন্তত দশবার না হাঁটাহাঁটি
করিয়াছি, কিন্তু সকলেরই এক কথা,
চাকুরি খালি নাই।
হঠাৎ পথে সতীশের সঙ্গে দেখা।
সতীশের সঙ্গে হিন্দু হোস্টেলে
একসঙ্গে থাকিতাম। বর্তমানে সে
আলীপুরের উকিল, বিশেষ কিছু হয়
বলিয়া মনে হয় না, বালিগঞ্জের
ওদিকে কোথায় একটা টিউশনি
আছে, সেটাই সংসারসমুদ্রে
বর্তমানে তাহার পক্ষে ভেলার
কাজ করিতেছে। আমার ভেলা তো
দূরের কথা, একখানা মাস্তুল-ভাঙ্গা
কাঠও নাই, যতদূর হাবুডুবু খাইবার
তাহা খাইতেছি-সতীশকে দেখিয়া
সে কথা আপাতত ভুলিয়া গেলাম।
ভুলিয়া গেলাম তাহার আর একটা
কারণ, সতীশ বলিল-এই যে, কোথায়
চলেছ সত্যচরণ? চল হিন্দু হোস্টেলের
ঠাকুর দেখে আসি-আমাদের
পুরোনো জায়গাটা। আর ওবেলা বড়
জলসা হবে- এসো। ওয়ার্ড সিক্সের
সেই অবিনাশকে মনে আছে, সেই যে
ময়মনসিংহের কোন্ জমিদারের
ছেলে, সে যে আজকাল বড় গায়ক।
সে গান গাইবে, আমায় আবার
একখানা কার্ড দিয়েছে-তাদের
এস্টেটের দু-একটা কাজকর্ম মাঝে
মাঝে করি কিনা। এসো, তোমায়
দেখলে সে খুশি হবে।
কলেজে পড়িবার সময়, আজ পাঁচ-ছয়
বছর আগে, আমোদ পাইলে আর কিছু
চাহিতাম না-এখনো সে মনের ভাব
কাটে নাই দেখিলাম। হিন্দু
হোস্টেলে ঠাকুর দেখিতে গিয়া
সেখানে মধ্যাহ্নভোজনের
নিমন্ত্রণ পাইলাম। কারণ আমাদের
দেশের অনেক পরিচিত ছেলে
এখানে থাকে, তাহারা কিছুতেই
আসিতে দিতে চাহিল না।
বলিলাম-বিকেলে জলসা হবে, তা
এখন কি! মেস থেকে খেয়ে আসব
এখন। তাহারা সে কথায় কর্ণপাত
করিল না।
কর্ণপাত করিলে আমাকে সরস্বতী-
পূজার দিনটা উপবাসে কাটাইতে
হইত। ম্যানেজারের অমন কড়া
চিঠির পরে আমি গিয়া মেসের লুচি
পায়েসের ভোজ খাইতে পারিতাম
না-যখন একটা টাকাও দিই নাই। এ
বেশ হইল-পেট ভরিয়া নিমন্ত্রণ
খাইয়া বৈকালে জলসার আসরে
গিয়া বসিলাম। আবার তিন বৎসর
পূর্বের ছাত্রজীবনের উল্লাস
ফিরিয়া আসিল-কে মনে রাখে যে
চাকুরি পাইলাম কি না-পাইলাম,
মেসের ম্যানেজার মুখ হাঁড়ি
করিয়া বসিয়া আছে কি না-আছে।
ঠুংরি ও কীর্তনের সমুদ্রে তলাইয়া
গিয়া ভুলিয়া গেলাম যে দেনা
মিটাইতে না পারিলে কাল সকাল
হইতে বায়ুভক্ষণের ব্যবস্থা হইবে।
জলসা যখন ভাঙ্গিল তখন রাত
এগারটা। অবিনাশের সঙ্গে আলাপ
হইল, হিন্দু হোস্টেলে থাকিবার সময়
সে আর আমি ডিবেটিং ক্লাবের
চাঁই ছিলাম-একবার স্যর গুরুদাস
বন্দ্যোপাধ্যায়কে আমরা সভাপতি
করিয়াছিলাম। বিষয় ছিল, স্কুল-
কলেজে বাধ্যতামূলক ধর্মশিক্ষা
প্রবর্তন করা উচিত। অবিনাশ
প্রস্তাবকর্তা আমি প্রতিবাদী
পক্ষের নায়ক। উভয় পক্ষে তুমুল
তর্কের পর সভাপতি আমাদের পক্ষে
মত দিলেন। সেই হইতে অবিনাশের
সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব হইয়া যায়-যদিও
কলেজ হইতে বাহির হইয়া এই প্রথম
আবার তার সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ।
অবিনাশ বলিল-চল, আমার গাড়ি
রয়েছে-তোমাকে পৌঁছে দিই।
কোথায় থাক?
মেসের দরজায় নামাইয়া দিয়া
বলিল- শোন, কাল হ্যারিংটন
স্ট্রিটে আমার বাড়িতে চা খাবে
বিকেল চারটের সময়। ভুলো না যেন।
তেত্রিশের দুই। লিখে রাখ তো
নোটবইয়ে।
পরদিন খুঁজিয়া হ্যারিংটন স্ট্রিট
বাহির করিলাম, বন্ধুর বাড়িও
বাহির করিলাম। বাড়ি খুব বড় নয়,
তবে সামনে পিছনে বাগান। গেটে
উইস্টারিয়া লতা, নেপালি
দারোয়ান, ও পিতলের প্লেট। লাল
সুরকির বাঁকা রাস্তা- রাস্তার এক
ধারে সবুজ ঘাসের বন, অন্য ধারে বড়
বড় মুচুকুন্দ চাঁপা ও আমগাছ।
গাড়িবারান্দায় বড় একখানা মোটর
গাড়ি। বড়লোকের বাড়ি নয় বলিয়া
ভুল করিবার কোনো দিক হইতে
কোনো উপায় নাই। সিঁড়ি দিয়া
উপরে উঠিয়াই বসিবার ঘর।
অবিনাশ আসিয়া আদর করিয়া ঘরে
বসাইল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই
পুরাতন দিনের কথাবার্তায় আমরা
দুজনেই মশগুল হইয়া গেলাম।
অবিনাশের বাবা ময়মনসিংহের
একজন বড় জমিদার, কিন্তু সম্প্রতি
কলিকাতার বাড়িতে তাঁহারা
কেহই নাই। অবিনাশের এক ভগ্নীর
বিবাহ উপলক্ষে গত অগ্রহায়ণ মাসে
দেশে গিয়াছিলেন- এখনো কেহই
আসেন নাই। এ-কথা ও-কথার পর
অবিনাশ বলিল-এখন কি করছ সত্য?
বলিলাম-জোড়াসাঁকো স্কুলে
মাস্টারি করতুম, সম্প্রতি বসেই
আছি একরকম। ভাবছি, আর মাস্টারি
করব না। দেখছি অন্য কোনো দিকে
যদি-দু-এক জায়গায় আশাও পেয়েছি।
আশা পাওয়ার কথা সত্য নয়, কিন্তু
অবিনাশ বড়লোকের ছেলে, মস্তবড়
এস্টেট ওদের। তাহার কাছে চাকুরির
উমেদারি করিতেছি এটা না-
দেখায়, তাই কথাটা বলিলাম।
অবিনাশ একটুখানি ভাবিয়া বলিল-
তোমার মতো একজন উপযুক্ত লোকের
চাকুরি পেতে দেরি হবে না
অবিশ্যি। আমার একটা কথা আছে,
তুমি তো আইনও পড়েছিলে-না?
বলিলাম-পাশও করেছি, কিন্তু
ওকালতি করবার মতিগতি নেই।
অবিনাশ বলিল-আমাদের একটা
জঙ্গল-মহাল আছে পূর্ণিয়া জেলায়।
প্রায় বিশ-ত্রিশ হাজার বিঘে
জমি। আমাদের সেখানে নায়েব
আছে কিন্তু তার ওপর বিশ্বাস করে
অত জমি বন্দোবস্তের ভার দেওয়া
চলে না। আমরা একজন উপযুক্ত লোক
খুঁজছি। তুমি যাবে?
কান অনেক সময় মানুষকে প্রবঞ্চনা
করে জানিতাম। অবিনাশ বলে কি!
যে চাকুরির খোঁজে আজ একটি বছর
কলিকাতার রাস্তাঘাট চষিয়া
বেড়াইতেছি, চায়ের নিমন্ত্রণে
সম্পূর্ণ অযাচিতভাবে সেই চাকুরির
প্রস্তাব আপনা হইতেই সম্মুখে
আসিয়া উপস্থিত হইল?
তবুও মান বজায় রাখিতে হইবে।
অত্যন্ত সংযমের সহিত মনের ভাব
চাপিয়া উদাসীনের মতো বলিলাম-
ও! আচ্ছা ভেবে বলব। কাল আছ তো?
অবিনাশ খুব খোলাখুলি ও
দিলদরিয়া মেজাজের মানুষ। বলিল-
ভাবাভাবি রেখে দাও। আমি
বাবাকে আজই পত্র লিখতে বসছি।
আমরা একজন বিশ্বাসী লোক
খুঁজছি। জমিদারির ঘুণ কর্মচারী
আমরা চাই নে-কারণ তারা প্রায়ই
চোর। তোমার মতো শিক্ষিত ও
বুদ্ধিমান লোকের সেখানে দরকার।
জঙ্গল-মহাল আমরা নূতন প্রজার
সঙ্গে বন্দোবস্ত করব। ত্রিশ হাজার
বিঘের জঙ্গল। অত দায়িত্বপূর্ণ কাজ
কি যার-তার হাতে ছেড়ে দেওয়া
যায়। তোমার সঙ্গে আজ আলাপ নয়,
তোমার নাড়িনক্ষত্র আমি জানি।
তুমি রাজি হয়ে যাও-আমি এখুনি
বাবাকে লিখে অ্যাপয়েণ্টমেণ্ট
লেটার আনিয়ে দিচ্ছি।
২
কি করিয়া চাকুরি পাইলাম তাহা
বেশি বলিবার আবশ্যক নাই। কারণ
এ গল্পের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।
সংক্ষেপে বলিয়া রাখি-
অবিনাশের বাড়ির চায়ের
নিমন্ত্রণ খাইবার দুই সপ্তাহ পরে
আমি একদিন নিজের জিনিসপত্র
লইয়া বি.এন.ডব্লিউ. রেলওয়ের একটা
ছোট স্টেশনে নামিলাম।
শীতের বৈকাল। বিস্তীর্ণ
প্রান্তরে ঘন ছায়া নামিয়াছে,
দূরে বনশ্রেণীর মাথায় মাথায় অল্প
অল্প কুয়াশা জমিয়াছে। রেল-
লাইনের দু-ধারে মটর-ক্ষেত, শীতল
সান্ধ্য-বাতাসে তাজা মটরশাকের
স্নিগ্ধ সুগন্ধে কেমন মনে হইল যে-
জীবন আরম্ভ করিতে যাইতেছি
তাহা বড় নির্জন হইবে, এই শীতের
সন্ধ্যা যেমন নির্জন, যেমন নির্জন
এই উদাস প্রান্তর আর ওই দূরের
নীলবর্ণ বনশ্রেণী, তেমনি।
গোরুর গাড়িতে প্রায় পনের-ষোল
ক্রোশ চলিলাম সারারাত্রি
ধরিয়া-ছইয়ের মধ্যে কলিকাতা
হইতে আনীত কম্বল র্যাগ ইত্যাদি
শীতে জল হইয়া গেল-কে জানিত এ-
সব অঞ্চলে এত ভয়ানক শীত! সকালে
রৌদ্র যখন উঠিয়াছে, তখনো পথ
চলিতেছি। দেখিলাম, জমির
প্রকৃতি বদলাইয়া গিয়াছে-
প্রাকৃতিক দৃশ্যও অন্য মূর্তি পরিগ্রহ
করিয়াছে-ক্ষেতখামার নাই, বস্তি
লোকালয়ও বড়-একটা দেখা যায় না-
কেবল ছোটবড় বন, কোথাও ঘন,
কোথাও পাতলা, মাঝে মাঝে মুক্ত
প্রান্তর, কিন্তু তাহাতে ফসলের
আবাদ নাই।
কাছারিতে পৌঁছিলাম বেলা
দশটার সময়। জঙ্গলের মধ্যে প্রায়
দশ-পনের বিঘা জমি পরিষ্কার
করিয়া কতকগুলি খড়ের ঘর, জঙ্গলেরই
কাঠ, বাঁশ ও খড় দিয়া তৈরি-ঘরে
শুকনো ঘাস ও বন-ঝাউয়ের সরু গুঁড়ির
বেড়া, তাহার উপর মাটি দিয়া
লেপা।
ঘরগুলি নতুন তৈরি, ঘরের মধ্যে
ঢুকিয়াই টাট্কা-কাটা খড়, আধকাঁচা
ঘাস ও বাঁশের গন্ধ পাওয়া গেল।
জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম,
আগে জঙ্গলের ওদিকে কোথায়
কাছারি ছিল, কিন্তু শীতকালে
সেখানে জলাভাব হওয়ায় এই ঘর নতুন
বাঁধা হইয়াছে, কারণ পাশেই একটা
ঝরনা থাকায় এখানে জলের কষ্ট
নাই।
৩
জীবনের বেশির ভাগ সময়
কলিকাতায় কাটাইয়াছি।
বন্ধুবান্ধবের সঙ্গ, লাইব্রেরি,
থিয়েটার সিনেমা, গানের আড্ডা-
এ-সব ভিন্ন জীবন কল্পনা করিতে
পারি না-এ অবস্থায় চাকুরির
কয়েকটি টাকার খাতিরে যেখানে
আসিয়া পড়িলাম, এত নির্জন
স্থানের কল্পনাও কোনোদিন করি
নাই। দিনের পর দিন যায়,
পূর্বাকাশে সূর্যের উদয় দেখি দূরের
পাহাড় ও জঙ্গলের মাথায়, আবার
সন্ধ্যায় সমগ্র বনঝাউ ও দীর্ঘ
ঘাসের বনশীর্ষ সিঁদুরের রঙে
রাঙাইয়া সূর্যকে ডুবিয়া যাইতে
দেখি-ইহার মধ্যে শীতকালের যে
এগার-ঘন্টা ব্যাপী দিন, তা যেন
খাঁ-খাঁ করে শূন্য, কি করিয়া তাহা
পুরাইব, প্রথম প্রথম সেইটা আমার
পক্ষে হইল মহাসমস্যা।
কাজকর্ম করিলে অনেক করা যায়
বটে, কিন্তু আমি নিতান্ত নব
আগন্তুক, এখনো ভালো করিয়া
এখানকার লোকের ভাষা বুঝিতে
পারি না, কাজের কোনো
বিলিব্যবস্থাও করিতে পারি না,
নিজের ঘরে বসিয়া বসিয়া, যে
কয়খানি বই সঙ্গে আনিয়াছিলাম
তাহা পড়িয়াই কোনো রকমে দিন
কাটাই। কাছারিতে লোকজন যারা
আছে তারা নিতান্ত বর্বর, না
বোঝে তাহারা আমার কথা, না
আমি ভালো বুঝি তাহাদের কথা।
প্রথম দিন-দশেক কি কষ্টে যে
কাটিল! কতবার মনে হইল চাকুরিতে
দরকার নাই, এখানে হাঁপাইয়া মরার
চেয়ে আধপেটা খাইয়া কলিকাতায়
থাকা ভালো। অবিনাশের
অনুরোধে কি ভুলই করিয়াছি এই
জনহীন জঙ্গলে আসিয়া, এ-জীবন
আমার জন্য নয়।
রাত্রিতে নিজের ঘরে বসিয়া এই
সবই ভাবিতেছি, এমন সময় ঘরের
দরজা ঠেলিয়া কাছারির বৃদ্ধ মুহুরী
গোষ্ঠ চক্রবর্তী প্রবেশ করিলেন। এই
একমাত্র লোক যাহার সহিত বাংলা
কথা বলিয়া হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচি।
গোষ্ঠবাবু এখানে আছেন অন্তত
সতের-আঠার বছর। বর্ধমান জেলায়
বনপাশ স্টেশনের কাছে কোন্
গ্রামে বাড়ি। বলিলাম, বসুন
গোষ্ঠবাবু-
গোষ্ঠবাবু অন্য একখানা চেয়ারে
বসিলেন। বলিলেন-আপনাকে একটা
কথা বলতে এলাম নিরিবিলি,
এখানকার কোনো মানুষকে বিশ্বাস
করবেন না। এ বাংলা দেশ নয়।
লোকজন সব বড় খারাপ-
-বাংলা দেশের মানুষও সবাই যে খুব
ভালো, এমন নয় গোষ্ঠবাবু-
-সে আর আমার জানতে বাকি নেই,
ম্যানেজার বাবু। সেই দুঃখে আর
ম্যালেরিয়ার তাড়নায় প্রথম
এখানে আসি। প্রথম এসে বড় কষ্ট হত,
এ জঙ্গলে মন হাঁপিয়ে উঠত-আজকাল
এমন হয়েছে, দেশ তো দূরের কথা,
পূর্ণিয়া কি পাটনাতে কাজে গিয়ে
দু-দিনের বেশি তিন দিন থাকতে
পারি নে।
গোষ্ঠবাবুর মুখের দিকে সকৌতুকে
চাহিলাম-বলে কি!
জিজ্ঞাসা করিলাম-থাকতে
পারেন না কেন? জঙ্গলের জন্য মন
হাঁপায় নাকি?
গোষ্ঠবাবু আমার দিকে চাহিয়া
একটু হাসিলেন। বলিলেন, ঠিক তাই,
ম্যানেজার বাবু। আপনিও বুঝবেন।
নতুন এসেছেন কলকাতা থেকে,
কলকাতার জন্যে মন উড়ু উড়ু করছে,
বয়সও আপনার কম। কিছুদিন এখানে
থাকুন। তারপর দেখবেন।
-কি দেখব?
-জঙ্গল আপনাকে পেয়ে বসবে।
কোনো গোলমাল কি লোকের ভিড়
ক্রমশ আর ভালো লাগবে না। আমার
তাই হয়েছে মশাই। এই গত মাসে
মুঙ্গের গিয়েছিলাম মকদ্দমার
কাজে-কেবল মনে হয় কবে এখান
থেকে বেরুব।
মনে মনে ভাবিলাম, ভগবান সে
দুরবস্থার হাত থেকে আমায় উদ্ধার
করুন। তার আগে চাকুরিতে ইস্তফা
দিয়া কোন্কালে কলিকাতায়
ফিরিয়া গিয়াছি!
গোষ্ঠবাবু বলিলেন, বন্দুকটা রাত-
বেরাত শিয়রে শিয়রে রেখে
শোবেন, জায়গা ভালো নয়। এর
আগে একবার কাছারিতে ডাকাতি
হয়ে গিয়েছে। তবে আজকাল এখানে
আর টাকাকড়ি থাকে না, এই যা
কথা।
কৌতূহলের সহিত বললাম, বলেন কি!
কতকাল আগে ডাকাতি হয়েছিল?
-বেশি না। এই বছর আট-নয় আগে।
কিছুদিন থাকুন, তখন সব কথা
জানতে পারবেন। এ অঞ্চল বড়
খারাপ। তা ছাড়া, এই ভয়ানক
জঙ্গলে ডাকাতি করে মেরে নিলে
দেখবেই বা কে?
গোষ্ঠবাবু চলিয়া গেলে একবার
ঘরের জানালার কাছে আসিয়া
দাঁড়াইলাম। দূরে জঙ্গলের মাথায়
চাঁদ উঠিতেছে-আর সেই উদীয়মান
চন্দ্রের পটভূমিকায় আঁকাবাঁকা
একটা বনঝাউয়ের ডাল, ঠিক যেন
জাপানি চিত্রকর হকুসাই-অঙ্কিত
একখানি ছবি।
চাকুরি করিবার আর জায়গা খুঁজিয়া
পাই নাই! এ-সব বিপজ্জনক স্থান,
আগে জানিলে কখনোই অবিনাশকে
কথা দিতাম না।
দুর্ভাবনা সত্ত্বেও উদীয়মান
চন্দ্রের সৌন্দর্য আমাকে বড় মুগ্ধ
করিল।
৪
কাছারির অনতিদূরে একটা ছোট
পাথরের টিলা, তার উপর প্রাচীন ও
সুবৃহৎ একটা বটগাছ। এই বটগাছের
নাম গ্র্যান্ট সাহেবের বটগাছ। কেন
এই নাম হইল, তখন অনুসন্ধান করিয়াও
কিছু জানিতে পারি নাই। একদিন
নিস্তব্ধ অপরাহ্নে বেড়াইতে
বেড়াইতে পশ্চিম দিগন্তে
সূর্যাস্তের শোভা দেখিতে টিলার
উপরে উঠিলাম।
টিলার উপরকার বটতলায় আসন্ন
সন্ধ্যার ঘন ছায়ায় দাঁড়াইয়া
দাঁড়াইয়া কত দূর পর্যন্ত এক চমকে
দেখিতে পাইলাম-কলুটোলার মেস,
কপালীটোলার সেই ব্রিজের
আড্ডাটি, গোলদিঘিতে আমার
প্রিয় বেঞ্চখানা-প্রতিদিন এমন
সময়ে যাহাতে গিয়া বসিয়া কলেজ
স্ট্রিটের বিরামহীন জনস্রোত ও
বাস মোটরের ভিড় দেখিতাম। হঠাৎ
যেন কতদূরে পড়িয়া রহিয়াছে মনে
হইল তাহারা। মন হু-হু করিয়া উঠিল-
কোথায় আছি! কোথাকার জনহীন
অরণ্যে-প্রান্তরে খড়ের চালায় বাস
করিতেছি চাকুরির খাতিরে! মানুষ
এখানে থাকে? লোক নাই, জন নাই,
সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ-একটা কথা কহিবার
মানুষ পর্যন্ত নাই। এদেশের এইসব
মূর্খ, বর্বর মানুষ এরা একটা ভালো
কথা বলিলে বুঝিতে পারে না-
এদেরই সাহচর্যে দিনের পর দিন
কাটাইতে হইবে? সেই দূরবিসর্পী
দিগন্তব্যাপী জনহীন সন্ধ্যার মধ্যে
দাঁড়াইয়া মন উদাস হইয়া গেল,
কেমন ভয়ও হইল। তখন সঙ্কল্প
করিলাম, এ-মাসের আর সামান্য
দিনই বাকি, সামনের মাসটা
কোনোরূপে চোখ বুজিয়া কাটাইব,
তারপর অবিনাশকে একখানা লম্বা
পত্র লিখিয়া চাকুরিতে ইস্তফা
দিয়া কলিকাতায় ফিরিয়া গিয়া
সভ্য বন্ধুবান্ধবদের অভ্যর্থনা
পাইয়া, সভ্য খাদ্য খাইয়া, সভ্য
সুরের সঙ্গীত শুনিয়া, মানুষের
ভিড়ের মধ্যে ঢুকিয়া, বহু মানবের
আনন্দ-উল্লাসভরা কণ্ঠস্বর শুনিয়া
বাঁচিব।
পূর্বে কি জানিতাম মানুষের মধ্যে
থাকিতে এত ভালবাসি! মানুষকে
এত ভালবাসি! তাহাদের প্রতি
আমার যে কর্তব্য হয়তো সব সময়
তাহা করিয়া উঠিতে পারি না-
কিন্তু ভালবাসি তাহাদের
নিশ্চয়ই। নতুবা এত কষ্ট পাইব কেন
তাহাদের ছাড়িয়া আসিয়া?
প্রেসিডেন্সি কলেজের রেলিঙে বই
বিক্রি করে সেই যে বৃদ্ধ
মুসলমানটি, কতদিন তাহার
দোকানে দাঁড়াইয়া পুরোনো বই ও
মাসিক পত্রিকার পাতা
উল্টাইয়াছি-কেনা উচিত ছিল
হয়তো, কিন্তু কেনা হয় নাই- সেও
যেন পরম আত্মীয় বলিয়া মনে হইল-
তাহাকে আজ কতদিন দেখি নাই!
কাছারিতে ফিরিয়া নিজের ঘরে
ঢুকিয়া টেবিলে আলো জ্বালিয়া
একখানা বই লইয়া বসিয়াছি,
সিপাহি মুনেশ্বর সিং আসিয়া
সেলাম করিয়া দাঁড়াইল। বলিলাম-
কি মুনেশ্বর?
ইতিমধ্যে দেহাতি হিন্দি কিছু
কিছু বলিতে শিখিয়াছিলাম।
মুনেশ্বর বলিল-হুজুর, আমায় একখানা
লোহার কড়া কিনে দেবার হুকুম যদি
দেন মুহুরী বাবুকে।
-কি হবে লোহার কড়া?
মুনেশ্বরের মুখ প্রাপ্তির আশায়
উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। সে বিনীত
সুরে বলিল-একখানা লোহার কড়া
থাকলে কত সুবিধে হুজুর। যেখানে
সেখানে সঙ্গে নিয়ে গেলাম, ভাত
রাঁধা যায়, জিনিসপত্র রাখা যায়,
ওতে করে ভাত খাওয়া যায়, ভাঙবে
না। আমার একখানাও কড়া নেই।
কতদিন থেকে ভাবছি একখানা
কড়ার কথা-কিন্তু হুজুর, বড় গরিব,
একখানা কড়ার দাম ছ-আনা, অত
দাম দিয়ে কড়া কিনি কেমন করে?
তাই হুজুরের কাছে আসা, অনেক
দিনের সাধ একখানা কড়া আমার
হয়, হুজুর যদি মঞ্জুর করেন, হুজুর
মালিক।
একখানা লোহার কড়াই যে এত
গুণের, তাহার জন্য যে এখানে লোক
রাত্রে স্বপ্ন দেখে, এ ধরনের কথা
এই আমি প্রথম শুনিলাম। এত গরিব
লোক পৃথিবীতে আছে যে ছ-আনা
দামের একখানা লোহার কড়াই
জুটিলে স্বর্গ হাতে পায়?
শুনিয়াছিলাম এদেশের লোক বড়
গরিব। এত গরিব তাহা জানিতাম
না। বড় মায়া হইল।
পরদিন আমার সই করা চিরকুটের
জোরে মুনেশ্বর সিং নউগচ্ছিয়ার
বাজার হইতে একখানা পাঁচ নম্বরের
কড়াই কিনিয়া আনিয়া আমার
ঘরের মেজেতে নামাইয়া আমায়
সেলাম দিয়া দাঁড়াইল।
-হো গৈল, হুজুরকী কৃপা-সে-কড়াইয়া
হো গৈল! তাহার হর্ষোৎফুল্ল মুখের
দিকে চাহিয়া আমার এই একমাসের
মধ্যে সর্বপ্রথম আজ মনে হইল-বেশ
লোকগুলা। বড় কষ্ট তো এদের!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now