বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
স্যর দিগিন্দ্র আজ বসিবার ঘরেই ছিলেন, আমাদের
দেখিয়া সাড়ম্বরে সম্ভাষণ করিলেন, “এই যে
মাণিক জোড়, এসো এসো। আজ যে ভারি সকাল
সকাল? ওরে কে আছিস, বাবুদের চা দিয়ে যা।
ব্যোমকেশবাবুকে আজ বড় শুকনো শুকনো
দেখছি! দুশ্চিন্তায় রাত্রে ঘুম হয় নি বুঝি?”
ব্যোমকেশ টেবিল হইতে নটরাজের মূর্তিটি
হাতে লইয়া আস্তে আস্তে বলিল, “এই
পুতুলটিকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি। কাল
সমস্ত রাত্রি এর কথা ভেবেই ঘুমোতে পারিনি।”
পূর্ণ এক মিনিটকাল দু’জনে পরস্পরের চোখের
দিকে একদৃষ্টে তাকাইয়া রহিলেন। দুই
প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে নিঃশব্দে মনে মনে কি
যুদ্ধ হইল বলিতে পারি না, এক মিনিট পরে স্যর
দিগিন্দ্র সকৌতুকে হাসিয়া উঠিলেন, বলিলেন,
“ব্যোমকেশ, তোমার মনের কথা আমি
বুঝেছি, অত সহজে এ বুড়োকে ঠকাতে
পারবে না। ওটার জন্যে রাত্রে তোমার ঘুম হয়নি
বলছিলে, বেশ তোমাকে ওটা আমি দান করলাম।”
ব্যোমকেশের হতবুদ্ধি মুখের দিকে
ব্যঙ্গপূর্ণ কটাক্ষ করিয়া বলিলেন, “কেমন? হল
তো? কিন্তু মূর্তিটা দামি জিনিস, ভেঙে নষ্ট
করো না।”
মুহূর্তমধ্যে নিজেকে সামলাইয়া লইয়া
ব্যোমকেশ বলিল, “ধন্যবাদ।” বলিয়া মূর্তিটি রুমালে
মুড়িয়া পকেটে পুরিল।
তারপর যথারীতি ব্যর্থ অনুসন্ধান করিয়া বেলা দশটা
নাগাদ বাসায় ফিরিলাম। চেয়ারে বসিয়া পড়িয়া
ব্যোমকেশ বলিল, “নাঃ, ঠকে গেলুম।”
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “কি ব্যাপার বল তো? আমি
তো তোমাদের কথাবার্তা ভাবভঙ্গি কিছুই বুঝতে
পারলুম না।”
পকেট হইতে পুতুলটা বাহির করিয়া ব্যোমকেশ
বলিল, “নানা কারণে আমার স্থির বিশ্বাস হয়েছিল যে,
এই নটরাজের ভিতরে হিরেটা আছে। ভেবে
দেখ, এমন সুন্দর লুকোবার জায়গা আর হতে
পারে কি? হিরেটা চোখের সামনে টেবিলের
উপর রয়েছে, অথচ কেউ দেখতে পাচ্ছে না।
পুতুলটা স্যর দিগিন্দ্র নিজে ছাঁচে ঢালাই করেছেন,
সুতরাং প্ল্যাস্টারের সঙ্গে সঙ্গে হিরেটা ছাঁচের
মধ্যে ঢেলে দেওয়া কিছুমাত্র শক্ত কাজ নয়।
তাতে স্যর দিগিন্দ্রের মনস্কামনা সম্পূর্ণ সিদ্ধ হয়,
অর্থাৎ যে হিরেটার প্রতি তাঁর এত ভালোবাসা, সেটা
সর্বদা কাছে কাছে থাকে, অথচ কারুর সন্দেহ হয়
না। আজ ঠিক করে বেরিয়ছিলুম যে পুতুলটা চুরি
করব। যে দিক থেকেই দেখ, সমস্ত যুক্তি
অনুমান ঐ পুতুলটার দিকে নির্দেশ করছে। তাই
আমার নিঃসংশয় ধারণা হয়েছিল যে, হিরেটা আর
কোথাও থাকতে পারে না। কিন্তু বুড়োর কাছে
ঠকে গেলুম। শুধু তাই নয়, বুড়ো আমার মনের
ভাব বুঝে বিদ্রুপ করে পুতুলটা আমায় দান করে
দিলে! কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিতে বুড়ো এক
নম্বর। মোটের উপর আমার থিয়োরিটাই
ভেস্তে গেল। এখন আবার গোড়া থেকে
শুরু করতে হবে।”
আমি বলিলাম, “কিন্তু সময়ও তো আর নেই। মাঝে
মাত্র একদিন।”
ব্যোমকেশ পুতুলটার নীচে পেন্সিল দিয়া
ক্ষুদ্র অক্ষরে নিজের নামের আদ্যক্ষরটা
লিখিতে লিখিতে বলিল, “মাত্র একদিন। বোধ হয়
প্রতিজ্ঞা রক্ষা হল না। এদিকে কুমার বাহাদুর এসে হানা
দিয়ে বসে আছেন। হাঃ, বুড়ো সব দিক দিয়েই
হাস্যাস্পদ করে দিলে। লাভের মধ্যে দেখছি
কেবল এই পুতুলটা!” মুখের একটা ভঙ্গি করিয়া
ব্যোমকেশ মূর্তিটা টেবিলের উপর রাখিয়া দিল,
তারপর বুকে ঘাড় গুঁজিয়া নীরবে বসিয়া রহিল।
বৈকালে নিয়মমতো স্যর দিগিন্দ্রের বাড়িতে
গেলাম। শুনিলাম কর্তা এইমাত্র বাহিরে গিয়াছেন।
ব্যোমকেশ তখন নতুন পথ ধরিল, আমাকে সরিয়া
যাইতে ইঙ্গিত করিয়া উজরে সিং থাপার সহিত ভাব
জমাইবার চেষ্টা আরম্ভ করিল। আমি একাকী
বাগানে বেড়াইতে লাগিলাম; ব্যোমকেশ ও
উজরে সিং বারান্দায় দুই টুলে বসিয়া অমায়িকভাবে
আলাপ করিতেছে, মাঝে মাঝে চোখে
পড়িতে লাগিল। ব্যোমকেশ ইচ্ছা করিলে খুব
সহজে মানুষের মন ও বিশ্বাস জয় করিয়া লইতে
পারিত। কিন্তু উজরে সিং থাপার পাহাড়ী হৃদয় গলাইয়া
তাহার পেট হইতে কথা বাহির করিতে পারিবে কি না,
এ বিষয়ে আমার মনে সন্দেহ জাগিতে লাগিল।
ঘণ্টা দুই পরে আবার যখন দু’জনে পথে বাহির
হইলাম, তখন ব্যোমকেশ বলিল, “কিছু হল না।
উজরে সিং লোকটি হয় নিরেট বোকা, নয় আমার
চেয়ে বুদ্ধিমান।”
বাসায় ফিরিয়া আসিলে চাকর খবর দিল যে একটি লোক
দেখা করিতে আসিয়াছিল, আমাদের আশায় আধ ঘণ্টা
অপেক্ষা করিয়া আবার আসিবে বলিয়া চলিয়া গিয়াছে।
ব্যোমকেশ ক্লান্তভাবে বলিল, “কুমার বাহাদুরের
পেয়াদা।”
এই ব্যর্থ ঘোরাঘুরি ও অণ্বেষণে আমি
পরিশ্রান্ত হইয়া পড়িয়াছিলাম, বলিলাম, “আর কেন
ব্যোমকেশ, ছেড়ে দাও। এ যাত্রা কিছু হল না।
কুমার সাহবকেও জবাব দিয়ে দাও, মিছে তাঁকে
সংশয়ের মধ্যে রেখে কোনও লাভ নেই।”
টেবিলের সম্মুখে বসিয়া নটরাজ মূর্তিটা উল্টাইয়া
পাল্টাইয়া দেখিতে দেখিতে মৃয়মাণ কণ্ঠে
ব্যোমকেশ বলিল, “দেখি, কালকের দিনটা এখনও
হাতে আছে। যদি কাল সমস্ত দিনে কিছু না করতে
পারি- ”
তাহার মুখের কথা শেষ হইল না। চোখ তুলিয়া
দেখি, তাহার মুখ উত্তেজনায় লাল হইয়া উঠিযাছে,
সে নিষ্পলক বিস্ফারিত দৃষ্টিতে নটরাজ মূর্তিটার
দিকে তাকাইয়া আছে।
বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “কি হল?”
ব্যোমকেশ কম্পিতহস্তে মূর্তিটা আমার
চোখের সম্মুখে ধরিয়া বলিল, “দেখ দেখ –
নেই। মনে আছে, আজ সকালে পেনসিল দিয়ে
পুতুলটার নীচে একটা ‘ব’ অক্ষর লিখেছিলুম? সে
অক্ষরটা নেই।”
দেখিলাম সত্যিই অক্ষরটা নাই। কিন্তু সেজন্য এত
বিচলিত হইবার কি অছে? পেনসিলের লেখা – মুছিয়া
যাইতেও তো পারে।”
ব্যোমকেশ বলিল, “বুঝতে পারছ না? বুঝতে
পারছ না?” হঠাৎ সে হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিল, “উঃ,
বুড়ো কি ধাপ্পাই দিয়েছে! একেবারে উল্লুক
বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল হে! যা হোক, বাঘেরও
ঘোগ আছে। – পুঁটিরাম।”
ভৃত্য পুঁটিরাম আসিলে ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল,
“যে লোকটি আজ এসেছিল, তাকে কোথায়
বসিয়েছিলে?”
“আজ্ঞে এই ঘরে।”
“তুমি বরাবর এ ঘরে ছিলে?”
“আজ্ঞে হাঁ। তবে মাঝে তিনি এক গ্লাস জল
চাইলেন, তাই – ”
“আচ্ছা – যাও।”
ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ নিঃশব্দে বসিয়া হাসিতে
লাগিল, তারপর উঠিয়া পাশের ঘরে যাইতে যাইতে
বলিল, “তুমি শুনে হয়তো আশ্চর্য হবে, হিরেটা
আজ সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত এই
টেবিলের উপর রাখা ছিল।”
আমি অবাক হইয়া তাকাইয়া রহিলাম। বলে কি? হঠাৎ মাথা
খারাপ হইয়া গেল না কি?
পশের ঘর হইতে ব্যোমকেশ ফোন
করিতেছে শুনিতে পাইলাম – “কুমার ত্রিদিবেন্দ্র?
হঁযা, আমি ব্যোমকেশ। কাল বেলা দশটা মধ্যে
পাবেন। আপনার স্পেশাল ট্রেন যেন ঠিক
থাকে। পাবামাত্র রওনা হবেন। না না, এখানে থাকা
বোধ হয় নিরাপদ হবে না। আচ্ছা আচ্ছা, ও সব কথা
পরে হবে। ভুলবেন না সাড়ে দশটার মধ্যে
কলকাতা ছাড়া চাই। আচ্ছা, আপনার কিছু করে কাজ নেই
– স্পেশাল ট্রেনের বন্দোবস্ত আমি করে
রাখব। কাউকে কিছু বলবেন না; না আপনার
সেক্রেটারিকেও নয়, আচ্ছা নমস্কার।”
তারপর হ্যাটকোট পরিয়া বোধ করি স্পেশাল
ট্রেনের বন্দোবস্ত করিতে বাহির হইল।
‘ফিরতে রাত হবে – তুমি শুয়ে পোড়ো’
আমাকে শুধু এইটুকু বলিয়া গেল।
রাত্রে ব্যোমকেশ কখন ফিরিল, জানিতে পারি
নাই। সকালে সাড়ে আটটার সময় যথারীতি দু’জনে
বাহির হইলাম। বাহির হইবার সময় দেখিলাম, নটরাজ
মূর্তিটা যথাস্থানে নাই। সেদিকে
ব্যোমকেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে সে
বলিল, “আছে। সেটাকে সরিয়ে রেখেছি।”
স্যর দিগিন্দ্র তাঁহার বসিবার ঘরেই ছিলেন, আমাদের
দেখিয়া বলিলেন, “তোমাদের দৈনিক আক্রমণ
আমার গা সওয়া হয়ে গেছে। এমন কি, যতক্ষণ
তোমরা আসনি, একটু ফাঁকা ফাঁকা ঠেকছিল।”
ব্যোমকেশ বিনীতভাবে বলিল, “আপনার উপর
অনেক জুলুম করেছি, কিন্তু আর করব না, এই কথাটি
আজ জানাতে এলুম। জয় পরাজয় এক পক্ষের
আছেই, সে জন্য দুঃখ করা মূঢ়তা। কাল থেকে
আর আমাদের দেখতে পাবেন না। আপনি অবশ্য
জানেন যে, আপনার ভাইপো এখানে গ্র্যাণ্ড
হোটেলে এসে আছেন – তাঁকে কাল
একরকম জানিয়েই দিয়েছি যে তাঁর এখানে
থেকে আর কোনও লাভ নেই। আজ তাঁকে
শেষ জবাব দিয়ে যাব।”
স্যর দিগিন্দ্র কিছুক্ষণ কুঞ্চিত চক্ষে
ব্যোমকেশকে নিরীক্ষণ করিলেন; ক্রমে
তাঁহার মুখে সেই বুলডগ হাসি ফুটিয়া উঠিল, বলিলেন,
“তোমার সুবুদ্ধি হয়েছে দেখে খুশি হলাম।
খোকাকে বোলো বৃথা চেষ্টা করে যেন
সময় নষ্ট না করে।”
“আচ্ছা বলব।” টেবিলের উপর আর একটি নটরাজ
মূর্তি রাখা হইয়াছে দেখিয়া সেটা তুলিয়া লইয়া
ব্যোমকেশ বলিল, “এই যে আর একটা তৈরি
করেছেন দেখছি। আপনার উপহারটি আমি যত্ন
করে রেখেছি; শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, আপনার
স্মৃতি চিহ্ন হিসাবেও আমার কাছে তার দাম অনেক।
কিন্তু যদি কখনও দৈবাৎ ভেঙে যায়, আর একটা পাব
কি?”
স্যর দিগিন্দ্র প্রসন্নভাবে বলিলেন, “বেশ, যদি
ভেঙে যায়, আর একটি পাবে। আমার বাড়িতে
ঢুকে তোমার শিল্পকলার প্রতি অনুরাগ জন্মেছে
এটাও কম লাভ নয়।”
গভীর বিনয় সহকারে ব্যোমকেশ বলোক,
“আজ্ঞে হঁযা। এত দিন আমার মনের ওদিকটা
একেবারে পর্দা ঢাকা ছিল। কিন্তু এই ক’দিন আপনার
সংসর্গে এসে ললিত কলার রস পেতে আরম্ভ
করেছি, বুঝেছি, ওর মধ্যে কি অমূল্য রত্ন
লুকোনো আছে – ঐ ছবিখানাও আমার বড়
ভালো লাগে। ওটা কি আপনারই আঁকা?”
স্যর দিগিন্দ্রের পশ্চাতে দেয়ালের গায়ে একটা
সুন্দর নিসর্গ দৃশ্যের ছবি টাঙানো ছিল,
ব্যোমকেশ অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া দেখাইল।
মুহূর্তের জন্য স্যর দিগিন্দ্র ঘাড় ফিরাইলেন।
সেই ক্ষণিক অবকাশে ব্যোমকেশ এক অদ্ভুত
হাতের কসরত দেখাইল। টিকটিকি যেমন করিয়া শিকার
ধরে, তেমনি ভাবে তাহার একটা হাতে টেবিলের
উপর হইতে নটরাজ মূর্তিটি তুলিয়া লইয়া পকেটে
পুরিল এবং অন্য হাতটা সঙ্গে সঙ্গে আর একটি
নটরাজ মূর্তি তাহার স্থানে বসাইয়া দিল। স্যর দিগিন্দ্র
যখন আবার সম্মুখে ফিরিলেন, তখন
ব্যোমকেশ পূর্ববৎ মুগ্ধভাবে দেয়ালের
ছবিটার দিকে চাহিয়া আছে।
আমার বুকের ভিতরটা এমন অসম্ভব রকম ধড়ফড়
করিতে লাগিল যে, স্যর দিগিন্দ্র যখন সহজ কণ্ঠে
বলিলেন, “হঁযা, ওটা আমারই আঁকা,” তখন কথাগুলো
আমার কানে অত্যন্ত অস্পষ্ট ও দূরাগত বলিয়া মনে
হইল। ভাগ্যে সে সময় তিনি আমার মুখের প্র্তি
দৃষ্টিপাত করেন নাই, নতুবা ব্যোমকেশের
হাতের কসরত হয় তো আমার মুখের উদ্বেগ
হইতেই ধরা পড়িয়া যাইত।
ব্যোমকেশ ধীরে সুস্থে উঠিয়া বলিল, “এখন
তাহলে আসি। আপনার সংসর্গে এসে আমার লাভই
হয়েছে, এ কথা আমি কখনও ভুলব না। আশা করি,
আপনিও আমাদের ভুলতে পারবেন না। যদি কখনও
দরকার হয়, মনে রাখবেন, আমি একজন
সত্যাণ্বেষী, সত্যের অনুসন্ধান করাই আমার
পেশা। চল অজিত। আচ্ছা, চললুম তবে, নমস্কার।”
দরজার নিকট হইতে একবার ফিরিয়া দেখিলাম স্যর
দিগিন্দ্র ভ্রুকুটি করিয়া সন্দেহ প্রখর দৃষ্টিতে
আমাদের দিকে চাহিয়া আছেন, যেন
ব্যোমকেশের কথার কোন একটা অতি গূঢ়
ইঙ্গিত বুঝি বুঝি করিয়াও বুঝিতে পারিতেছেন না।
বাড়ির বাহিরে আসিতেই একটা খালি ট্যাক্সি পাওয়া গেল;
তাহাতে চাড়িয়া বসিয়া ব্যোমকেশ হুকুম দিল,
“গ্র্যাণ্ড হোটেল।”
আমি তাহার হাত চাপিয়া ধরিয়া বলিলাম, “ব্যোমকেশ,
এসব কি কাণ্ড?”
ব্যোমকেশ হাসিয়া বলিল, “এখনও বুঝতে পারছ না,
এই আশ্চর্য। আমি যে অনুমান করেছিলুম হিরেটা
নটরাজের মধ্যে আছে, তা ঠিকই আন্দাজ
করেছিলুম। বুড়ো বুঝতে পেরে আমাকে
ধোঁকা দেবার জন্যে পুতুলটা আমাকে দিয়ে
দিয়েছিল। তারপর আর একটা ঠিক ঐ রকম মূর্তি তৈরি
করে কাল সন্ধ্যাবেলা গিয়ে আসলটার সঙ্গে বদল
করে এনেছিল। যদি এই অস্পষ্ট ‘ব’ অক্ষরটি লেখা
না থাকত, তাহলে আমি জানতেও পারতুম না।” বলিয়া
পুতুলটা উল্টাইয়া দেখাইল। দেখিলাম, পেন্সিলে
লেখা অক্ষরটি বিদ্যমান রহিয়াছে।
ব্যোমকেশ বলিল, “কাল যখন এই ‘ব’ অক্ষরটি
যথাস্থানে দেখতে পেলুম না, তখন এক
নিমেষে সমস্ত ব্যাপার আমার কাছে জলের মত
পরিষ্কার হয়ে গেল। আজ প্রথমে গিয়েই
বুড়োর টেবিল থেকে নটরাজটি উলটে
দেখলুম, আমার সেই ‘ব’ মার্কা নটরাজ। অন্য
মূর্তিটা পকেটেই ছিল। ব্যস! তারপর হাত সাফাই
তো দেখতেই পেলে।”
আমি রুদ্ধশ্বাসে বলিলাম, “তুমি ঠিক জানো, হিরেটা
ওর মধ্যেই আছে?”
“হঁযা। ঠিক জানি, কোন সন্দেহ নেই।”
“কিন্তু যদি না থাকে?”
ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিল, শেষে
বলিল, “তাহলে বুঝব, পৃথিবীতে সত্য বলে
কোনও জিনিস নেই। শাস্ত্রের অনুমান খণ্ডটা
একেবারে মিথ্যা।”
গ্র্যাণ্ড হোটেলে কুমার ত্রিদিবেন্দ্র একটা
আস্ত স্যুট ভাড়া করিয়া ছিলেন, আমরা তাঁহার বসিবার
ঘরে পদার্পণ করিতেই তিনি দুই হাত বাড়াইয়া ছুটিয়া
আসিলেন, “কি? কি হল, ব্যোমকেশবাবু?”
ব্যোমকেশ নিঃশব্দে নটরাজ মূর্তিটি টেবিলের
উপর রাখিয়া তাহার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া
দেখাইল।
হতবুদ্ধিভাবে কুমার বাহাদুর বলিলেন, “এটা তো
দেখছি কাকার নটরাজ, কিন্তু আমার সীমন্ত হীরা
– ”
“ওর মধ্যেই আছে।”
“ওর মধ্যে?”
“হঁযা, ওরই মধ্যে। কিন্তু আপনার যাবার বন্দোবস্ত
সব ঠিক আছে তো? সাড়ে দশটার সময় আপনার
স্পেশাল ছাড়বে।”
কুমার বাহাদুর অস্থির হইয়া বলিলেন, “কিন্তু আমি যে
কিছু বুঝতে পারছি না। ওর মধ্যে আমার সীমন্ত
হীরা আছে, কি বলছেন?”
“বিশ্বাস হচ্ছে না? বেশ, পরীক্ষা করে
দেখুন।”
একটা পাথরের কাগজ চাপা তুলিয়া লইয়া ব্যোমকেশ
মূর্তিটার উপর সজোরে আঘাত করিতেই সেটা বহু
খণ্ডে চূর্ণ হইয়া গেল।
“এই নিন আপনার সীমন্ত হীরা।” ব্যোমকেশ
হীরাটা তুলিয়া ধরিল, তাহার গায়ে তখনও প্ল্যাস্টার
জুড়িয়া আছে, কিন্তু বুঝিতে বিলম্ব হইল না যে, ওটা
সত্যই হীরা বটে।
কুমার বাহাদুর ব্যোমকেশের হাত হইতে হীরাটা
প্রায় কাড়িয়া লইলেন; কিছুক্ষণ একাগ্র নির্নিমেষ
দৃষ্টিতে হাহার দিকে চাহিয়া থাকিয়া মহোল্লাসে বলিয়া
উঠিলেন, “হঁযা, এই আমার সীমন্ত হীরা। এই যে
এর ভিতর থেকে নীল আলো ঠিকরে
বেরুচ্ছে। ব্যোমকেশবাবু, আপনাকে কি বলে
কৃতজ্ঞতা জানাব -”
“কিছু বলতে হবে না, আপাতত যত শীঘ্র পারেন
বেরিয়ে পড়ুন। খুড়োমশাই যদি ইতিমধ্যে
জানতে পারেন, তাহলে আবার হীরা হারাতে
কতক্ষণ?”
“না না, আমি এখনই বেরুচ্ছি। কিন্তু আপনার -”
কুমার বাহাদুরকে স্টেশনে রওনা করিয়া দিয়া আমরা
বাসায় ফিরিলাম। আরাম কেদারায় অঙ্গ ছড়াইয়া দিয়া
ব্যোমকেশ পরম সার্থকতার হাসি হাসিয়া বলিল, “আমি
শুধু ভাবছি, বুড়ো যখন জানতে পারবে, তখন কি
করবে?”
দিন কয়েক পরে কুমার বাহাদুরের নিকট হইতে
একখানি ইন্সিওর করা খাম আসিল। চিঠির সঙ্গে একখানি
চেক পিন দিয়া আঁটা। চেক-এ অঙ্কের হিসাবটা
দেখিয়া চক্ষু ঝলসিয়া গেল। পত্রখানি এইরূপ –
প্রিয় ব্যোমকেশবাবু,
আমার চিরন্তন কৃতজ্ঞতার চিহ্নস্বরূপ যাহা পাঠাইলাম,
জানি আপনার প্রতিভার তাহা যোগ্য নহে। তবু, আশা
করি আপনার অমনোনীত হইবে না। ভবিষ্যতে
আপনার সহিত সাক্ষাতের প্রত্যাশায় রহিলাম। এবার
যখন কলিকাতায় যাইব, আপনার মুখে সমস্ত বিবরণ
শুনিব।
অজিতবাবুকেও আমার ধন্য্বাদ জানাইবেন। তিনি
সাহিত্যিক, সুতরং টাকার কথা তুলিয়া তাঁহার সারস্বত সাধনার
অমর্যাদা করিতে চাই না। [হায় রে পোড়াকপালে
সাহিত্যিক!] কিন্তু যদি তিনি নাম ধাম বদল করিয়া এই হীরা
হরণের গল্পটা লিখিতে পরেন, তাহা হইলে আমার
কোনও আপত্তি নাই জানিবেন। শ্রদ্ধা ও নমস্কার
গ্রহণ করিবেন।
ইতি
প্রতিভামুগ্ধ
শ্রীত্রিদিবেন্দ্রনারায়ণ রায়
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now